আলি আহমেদ নিশান
প্রকাশিত ১২ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বলিউডের ‘সত্য’ ঘটনার চলচ্চিত্র
দৃশ্যগত মাধ্যমের দুঃসহ ব্যবহার
আলি আহমেদ নিশান

ভারত, গান্ধী ও সত্য সত্য খেলা
১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর গান্ধী ভারতজুড়ে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিলো ভারতবাসীকে বৃটিশ পণ্য, বিশেষ করে কাপড় ব্যবহার থেকে বিরত রাখা, দেশীয় পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করা, সরকারি চাকরিজীবীদের নিজ পদ থেকে সরে আসা, বৃটিশরাজের আদালত থেকে আইনজীবীদের বেরিয়ে আসা, নিজেদের স্কুল-কলেজ শুরু করা ইত্যাদি। দেশজুড়ে আন্দোলনটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছিলো। কিন্তু উত্তর প্রদেশের কিছু অঞ্চলে গান্ধীর এই অহিংস অসহযোগ আন্দোলন খুব বেশি সুবিধা করতে পারছিলো না। তাই--
১৯২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গান্ধী পূর্ব উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর জেলায় আসেন। এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দিয়ে সেই রাত্রেই বারাণসীতে ফিরে যান। জনসমাবেশে এক থেকে আড়াই লাখ মানুষ তাঁকে আবেগপূর্ণ অভিনন্দন জানিয়েছিল। কিন্তু বিহারের চম্পারনে অথবা গুজরাটের খেড়ায় গান্ধীজি যেমন বেশ কিছুকাল কাটিয়েছিলেন, গোরখপুরকে তিনি তেমন কোনও সময় দেননি, যাতে কৃষক আর জনসাধারণের আন্দোলন সেখানে গড়ে উঠতে পারে। এই অঞ্চলে সশরীরে গান্ধী ছিলেন এক দিনেরও কম, কিন্তু মহাত্মার কল্পরুপ পরবর্তী মাসের পর মাস জনমনের চিন্তাভাবনা জুড়ে ছিল।১
অসাধারণ ব্যক্তিত্ব কিংবা আন্দোলনের মাহাত্ম্যকে ছাপিয়ে গোরখপুরের কৃষকমানসকে আকৃষ্ট করেছিলো গান্ধীর ব্যাখ্যাতীত কিছু (দৈবিক) ক্ষমতা। আর সেসব কল্পিত ক্ষমতার ভিতকে মজবুত করছিলো কংগ্রেসের কিছু সংবাদপত্র। চারদিকে গান্ধীকে নিয়ে তখন গুজবের ছড়াছড়ি--গান্ধীজিতে বিশ্বাস না রাখায় একজন গুড় প্রস্তুতকারীর গুড়ের কড়াই ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যাওয়া; মহাত্মাকে গালি দেওয়ায় একজন পাগল হওয়া, পরে দেশীয় বিদ্যালয়ের জন্য টাকা দান করায় সুস্থ হয়ে ওঠা ইত্যাদি। এমনকি গান্ধীবিরোধী একজন শিবভক্তের মন্দির থেকে শিবমূর্তিটি পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে গেলো! আর এই গুজবগুলো আরো রঙচঙ লাগিয়ে প্রকাশ করছিলো ‘স্বদেশ’-এর মতো কিছু সংবাদপত্র।২ মানুষের সামনে তখন তথ্যগুলোকে যাচাই-বাছাই করার জন্য আজকের মতো প্রযুক্তি, সুযোগ বা সচেতনতা খুব বেশি ছিলো না। এতে করে একই সঙ্গে গান্ধীর ক্ষমতা সাধারণ মানুষের সামনে মূর্ত হয়েছে দেবতার মতো। গান্ধী যা বলতে চাননি, এমনও কিছু প্রসঙ্গ জনগণের ওপর চেপে বসেছে। যেমন, গান্ধী মাছ-মাংস ইত্যাদি ত্যাগ করতে কখনোই বলেননি। তারপরও মাছ-মাংসের মতো কিছু ব্যাপার থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হতে হয়েছে এলাকাবাসীকে।৩ আর এভাবে রাজনীতি থেকে মাইল মাইল দূরে থাকা একটি অঞ্চল দ্রুতই রাজনৈতিক আন্দোলনের আওতায় চলে এসেছে।
আজকের ভারতে তথা বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির ঢেউ লেগেছে সবখানে। তথ্য প্রাপ্তির জন্য এখন মানুষকে আর নির্দিষ্ট কোনো সংবাদ-প্রতিষ্ঠান বা সংবাদপত্রের মুখ চেয়ে থাকতে হয় না। হাজারো টেলিভিশন, সংবাদপত্র, ইন্টারনেট আছে। আবার পুঁজিবাদের বিস্তারের সঙ্গে মানুষের কাজ-ধর্ম-বিশ্বাস-অনুভূতিতেও পরিবর্তন এসেছে বহুভাবে। তাই আজকের বিশাল জনমানুষকে কোনো নির্দিষ্ট দিকে প্রভাবিত করা ততোটা সহজ নয়, একজন মানুষকে ‘দেবতা’ বানিয়ে ফেলাও কঠিন।
এই সময়ে এসে তাই শুধু কোনো এক পক্ষের সাফাই গেয়ে জনগণকে প্রভাবিত করাও সহজ নয়। এখন গণসিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার জন্য জনগণকে তথ্যের সাগরে ডুবিয়ে রাখা হয়, ক্ষমতাসীনদের পক্ষের তথ্য। টেলিভিশন-সংবাদপত্র ক্ষমতাসীনদের দ্বারা প্রভাবিত, কখনো কখনো চাপে পড়ে সরাসরি তাদের পক্ষে কথা বলে। এহেন পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে আরেকটি অমোঘ অস্ত্র। চলচ্চিত্রে মানুষ সবকিছু দৃশ্যগত মাধ্যমে ঘটতে দেখে, শোনে। ফলে ঘটনাপ্রবাহকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস না করলেও অচেতনেই এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব থেকে যায়। সেই প্রভাবের প্রভাব চাইলেই ব্যবহার করা যায় ক্ষমতার স্বার্থে। বলিউডের এই রকম তিনটি চলচ্চিত্র রেইড (২০১৮), পরমাণু : দ্য স্টোরি অব পোখরান (২০১৮) ও দ্য অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার (২০১৯); ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে গণমাধ্যম হিসেবে এই চলচ্চিত্রগুলোর সম্পর্ককে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা থাকবে এই লেখায়।
যা দেখছো তা, তা না
সব দেখা জানা না
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় শুধু আইন প্রয়োগ, নিষেধাজ্ঞা জারি কিংবা পেশিশক্তি দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখা যায় না। শুধু পুলিশ, সামরিক বাহিনী কিংবা বিচারব্যবস্থা দিয়ে জনমানুষকে শাসন করাও চলে না। এতে তৈরি হতে পারে গণঅসন্তোষ। তখন রাষ্ট্রযন্ত্র নামক কাঠামোটির মহত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আর তাই রাষ্ট্রের এই দুর্নাম ঘোচাতে প্রয়োজন পড়ে জনমানুষের সম্মতি উৎপাদনের, তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের। “গ্রামসির বিচারে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি শুধুমাত্র ‘প্রভুত্ব’ বা ‘পশুশক্তি’ নয়; তাঁর মতে, ‘রাষ্ট্র = আধিপত্য + প্রভুত্ব’ অর্থাৎ ‘সিভিল সমাজ + রাজনৈতিক সমাজ’ অর্থাৎ ‘সম্মতি’ ও ‘পশুশক্তির’ এক জটিল সমাহার।”৪
আধিপত্য এমন এক মন্ত্রের নাম, যার দ্বারা শক্তি/বল/পুলিশ প্রয়োগ না করেও সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমে একটি শ্রেণি আরেকটি শ্রেণির ওপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে। চূড়ান্তভাবে প্রাধান্য বা ক্ষমতা রাষ্ট্রের অধীনেই থাকে। রাষ্ট্রের এই আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করে কিছু প্রতিষ্ঠান। যেমন, ধর্ম, বিদ্যালয়, পরিবার, বিয়ে, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল ইত্যাদি। আরো সূক্ষ্মভাবে বলতে গেলে --সাহিত্য, নাটক, গান, চলচ্চিত্র ইত্যাদি। রাষ্ট্র তার প্রয়োজন মতো নানারকম বিষয়-আশয় জনগণের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। মানুষ কী নিয়ে চিন্তা করবে আর কোনটাকে এড়িয়ে চলবে--নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে রাষ্ট্র। আর এ কাজটি খুব সূক্ষ্মভাবে করে চলে জনমানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠানগুলো, শিল্পমাধ্যমগুলো।
শিল্পের আলোচনায় যৌথ শিল্পমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র অন্য মাধ্যমগুলোর থেকে খানিকটা এগিয়ে থাকে। আসলে সবমিলিয়ে চলচ্চিত্রের মধ্যে চলমান ইমেজ দর্শকের মধ্যে এক ব্যাপক সত্যবাদী গ্রহণযোগ্যতা নির্মাণ করে। দর্শক চলচ্চিত্রের ডিটেইলসকে ভিজ্যুয়ালি দেখে, শোনে। আর এতো দ্রুত এতোসব ইমেজ সে দেখতে থাকে যে, তাৎক্ষণিক চিন্তা করার সময়ই পায় না। কিন্তু বই পড়া বা গান শোনার সময় মানুষ অনবরত চিন্তা করতে থাকে, মস্তিষ্কের মধ্যে দৃশ্যপট সাজাতে থাকে। তাই লিখিত টেক্সট, সঙ্গীতের সেই প্রভাব বিস্তারকারী ক্ষমতা অন্যরকম। তবে এটা ঠিক যে, দৃশ্যগত মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র সত্য-বাস্তবের কাছাকাছি থাকায় এর একটা শক্তিশালী প্রভাব থাকে সবসময়।
এই আলোচনা ‘সত্য ঘটনা অবলম্বনে’ নির্মিত তিনটি বলিউডি চলচ্চিত্র নিয়ে। চলচ্চিত্রের শুরুতেই যখন বলে নেওয়া হয় যে, এটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে (কিংবা অনুপ্রাণিত); তখন ধরেই নিতে হয় এর বাইরে ‘অসত্য’ বা ‘অর্ধসত্য’ কিছু ব্যাপার-স্যাপারও আছে। কীভাবে আছে, কেনো আছে--এই ব্যাপারটি বুঝতে সাহায্য নেওয়া যেতে পারে রেহনুমা আহমেদের। ফরাসি তাত্ত্বিক জ্য বদ্রিয়া’কে উদ্ধৃত করে রেহনুমা বলছেন,
বর্তমান সমাজ জীবনে সিনেমা, টিভি, বিজ্ঞাপনের ইমেজগুলোর সর্বব্যাপী প্রভাবের কারণে বাস্তব এবং অবাস্তব, সত্য এবং কল্পিত, আসল এবং নকল, সার্ফেস এবং গভীর--এসবের স্বাতন্ত্র্যতা হারিয়ে গেছে। যার ফলে আমরা পাই একটি ‘হাইপার-রিয়েল’ সংস্কৃতি যেখানে এই দুইয়ের ভিন্নতা ক্ষয়ে যাচ্ছে।
বদ্রিয়া খুব মজার একটা উদাহরণ দিচ্ছেন : ডিজনিল্যান্ড। তিনি বলেন, সকলে জানেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিজনিল্যান্ড হচ্ছে ফ্যান্টাসি। সেটি বাস্তব না। কিন্তু আসলে ডিজনিল্যান্ডকে ফ্যান্টাসি হিসেবে পরিবেশন করা হচ্ছে যাতে আমাদের মনে হয় যে বাদ বাকি সবকিছু, অর্থাৎ ডিজনিল্যান্ডের বাইরের জগৎ হচ্ছে বাস্তব। কিন্তু ‘বাস্তব’ আমেরিকা-ই হচ্ছে ডিজনিল্যান্ড। বাস্তব যে আর বাস্তব নয়, এ সত্যটি লুকানোর জন্যই ডিজনিল্যান্ড জরুরি।৫
শুধু আমেরিকাই নয়, গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে ‘ডিজনিল্যান্ড’ ও ‘বাস্তব’-এর পার্থক্যকে মূর্ত করার চেষ্টা পুরো বিশ্বেই চলছে। চলচ্চিত্রকে ঢাল বানিয়ে ভারত এই কাজটি করছে কি না, বা করলে কীভাবে করছে তা চিন্তাভাবনার সুযোগ আছে। কারণ ভারতের ইদানীংকালের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ‘সত্য ঘটনা অবলম্বনে’ এখানে প্রচুর চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে। ভয়াবহ স্পর্শকাতর একেকটি ইস্যু নিয়ে নির্মিত এসব চলচ্চিত্র দর্শকের কাছে পৌঁছেও যাচ্ছে অনায়াসে, কোনোরকম টু শব্দটি ছাড়াই। অথচ এই ভারতেই দিল্লির মেডিকেল শিক্ষার্থী জ্যোতি সিংয়ের ধর্ষণ নিয়ে নির্মিত ইন্ডিয়া’স ডটারস (২০১৫) নামের প্রামাণ্যচিত্রটি নিষিদ্ধ করা হয়। একটি মিথের ওপর নির্মিত পদ্মাবতকে (২০১৮) দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয় সেন্সরবোর্ডে; কখনো রানী পদ্মাবতীর সম্মানহানির কথা বলে, আবার কখনো রাজপুতদের বংশমর্যাদায় আঘাতের অজুহাতে। পদ্মাবত-এর বিরুদ্ধে তৈরি করা হয় একধরনের গণআন্দোলন। অভিনয়শিল্পীদের নাকের দাম ঘোষণা করা হয় কোটি রুপি। শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রটিকে যদিও মুক্তি দেওয়া হয়, কিন্তু নাম পরিবর্তন করে, বিশেষ দৃশ্য কেটেছেঁটে। ক্ষমতাসীনদের মদদ ছাড়া এতোকিছু নিশ্চয় সম্ভব নয়! অথচ সেই ভারতেই বিশেষ রাজনৈতিক দল, বিশেষ ব্যক্তিকে নিয়ে সত্য ঘটনার ধুয়া তুলে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে বিশেষ সময়ে। একটু ভালো করে খেয়াল করলে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এই সত্যের একটা রাজনীতি আছে।
দর্শক খালি চোখে যা দেখে
রেইড : দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই আর আপসের খেলা
কৌটিল্যর ‘অর্থশাস্ত্র’ থেকে একটি বাক্য দিয়ে রেইড চলচ্চিত্রটি শুরু হয়--‘রাজ কর প্রশাসনের মেরুদণ্ড। রাজ্যের জন্য সেনার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাজস্ব। কারণ জনকল্যাণের জন্য ধন সবচেয়ে প্রয়োজন।’
সময়টা ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দ, ভারতে তখন কংগ্রেসের শাসন চলছে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ঘটনার শুরু লখনৌ, উত্তর প্রদেশে। আয়কর বিভাগের নতুন ডেপুটি কমিশনার (ডি সি) হয়ে আসেন অময় পটনায়ক। আগাগোড়াই নীতিবান ও আত্মবিশ্বাসী অময়কে সততার পুরস্কার হিসেবে গত সাত বছরে ৪৯ বার বদলি হতে হয়েছে।
এক ধনাঢ্য ব্যক্তির পার্টিতে অময়ের সাক্ষাৎ হয় রামেশ্বর সিংয়ের সঙ্গে। রামেশ্বর উত্তর প্রদেশের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি এবং প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ; টানা তিন বারের সংসদ সদস্য; ৫১ জন এম এল এ-এর সমর্থন তার হাতে। একটি অচেনা ফোনকল থেকে রামেশ্বর সিংয়ের কাড়ি কাড়ি কালো টাকার সন্ধান পান অময়। উপরের নির্দেশ নিয়ে সেই মোতাবেক অতি গোপনে রামেশ্বরের বাড়ি তল্লাশির পরিকল্পনায় দল প্রস্তুত করেন। হঠাৎ এক সকালে অময় তার দল নিয়ে হাজির হন সিতাপুরে রামেশ্বর সিংয়ের বাড়ি ‘হোয়াইট হাউস’-এ। সেখানে অময়কে রামেশ্বর প্রকাশ্যে হুমকি দিলেও আমলে না নিয়েই কাজ শুরু করেন তিনি।
সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে কিছু না পেয়ে অময় যখন রীতিমতো ঘামতে শুরু করেছেন, ঠিক এই সময় অময়ের মানি ব্যাগে চুপি চুপি একজন একটা কাগজ রেখে যান। সেটা আসলে হোয়াইট হাউসের নকশা। অময় খেয়াল করেন, ওই নকশার বাইরেও বাড়িতে অতিরিক্ত কিছু কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। অতিরিক্ত সেই কাঠামোর ভিতর থেকে বের হতে থাকে বস্তা বস্তা টাকা, সোনা! রামেশ্বরের আচরণে বোঝা যায়, তিনি টাকা-সোনার বৃহৎ এই আয়োজন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তিনি পরিবারের সবাইকে প্রশ্ন করতে থাকেন, এগুলো কার, কে রেখেছে ইত্যাদি। একই সঙ্গে তিনি অময়কে তল্লাশি বন্ধ করতে বলেন। একপর্যায়ে বিশাল অঙ্কের টাকা ঘুষেরও প্রস্তাব দেন। কিন্তু তল্লাশি থামে না। একের পর এক টাকা-সোনা-অলঙ্কার বেরোতে থাকে। বাড়ির দেয়াল, ছাদ, মাটির নিচ থেকে বের হতে থাকে টাকা, সোনা, হীরা।
অময়কে কঠোরভাবে তল্লাশি বন্ধ করতে বলেও কাজ না হলে, একপর্যায়ে তার পরিবারের ওপর আক্রমণের হুমকি দেন রামেশ্বর। বাগবিতণ্ডায় কাজ না হলে রামেশ্বর বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন। প্রথমেই তিনি উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর সাহায্য চান। মুখ্যমন্ত্রী এই বলে ফিরিয়ে দেন যে, আয়কর বিভাগ কেন্দ্র সরকারের আওতায়। তাই এখানে তার কিছু করার নেই। তিনি সরাসরি যোগাযোগ করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। সেখানে রামেশ্বরকে বলা হয়, তারা গণমাধ্যম নিয়ে চিন্তিত--এই খবর চলে আসলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। জবাবে রামেশ্বর বলেন, যখন পার্টি ফান্ডের নাম করে দিনের পর দিন তার থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে, তখন তো তারা এই চিন্তা করেনি! একরকম বাধ্য হয়েই অর্থমন্ত্রী অময়কে ফোন করেন। কিন্তু অময় খুব বিনয়ের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ ফিরিয়ে দেন।
এবার রামেশ্বর যান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। প্রধানমন্ত্রীর সেক্রেটারি তাকে জানান, এ রকম ছোটো ঘটনায় ম্যাডামকে (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী) বিরক্ত করা যাবে না। রামেশ্বর এবার তার সমর্থনকারী এম এল এ-দের একত্র করা শুরু করেন। যদি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ না হয়, তিনি উত্তর প্রদেশের সরকার ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেন। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাকে দেখা করতে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী একপর্যায়ে অময়কে ফোন করেন। কিন্তু অময় প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত নির্দেশ চান। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীরও কিছু করার থাকে না। রামেশ্বর বাড়ি ফিরে আসেন।
এদিকে অময় ও তার দল তল্লাশি শেষ করে জব্দ তালিকা করতে থাকেন। ঠিক সেই সময় রামেশ্বরের হাজার হাজার ভক্ত-সমর্থক হোয়াইট হাউস ঘিরে ফেলে। রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের জীবন সঙ্কটের মধ্যে পড়ে। অময় দলের সবাইকে ওই বাড়ি থেকে নিরাপদে বের করতে সক্ষম হন। কিন্তু নিজে থেকে যান হোয়াইট হাউসে জব্দ করা মালামালের সঙ্গে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ ফোর্স আসলে অময় প্রাণে বাঁচেন; গ্রেপ্তার করা হয় রামেশ্বরকে।
পরমাণু, দ্য স্টোরি অব পোখরান : দেশপ্রেম আর দায়িত্বশীলতার আখ্যান
পরমাণু দ্য স্টোরি অব পোখরান-এর প্রলগে বলা হয়--
১৯৯৫। ভারী অনিশ্চয়তার সময়। কিছুদিন আগেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে ভারতের কাছে শক্তিশালী কোনো রাষ্ট্রের আশ্রয় থাকলো না। আমেরিকা আর চিনের সঙ্গে নিজেদের মজবুত সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছে প্রতিবেশি পাকিস্তান, যাতে তারা শক্তিশালী সেনা প্রস্তুত করে ভারতকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব ভারতের ওপর একতরফা চুক্তিতে সই করার জন্য চাপ দিয়েই যাচ্ছে, যাতে ভারত সৈন্য এবং আর্থিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সবকিছুর মধ্যে ভারতের সীমানার সামান্য দূরে (চিনে) একটি পারমাণবিক পরীক্ষার দিনক্ষণ গণনা (কাউন্ট ডাউন) শুরু হয়ে গেছে।
এহেন পরিস্থিতিতে ভারত সীমান্তে চিনের পারমাণবিক পরীক্ষার মতো একটি সমস্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে একজন মন্ত্রীসহ উপস্থিত থাকেন সরকারি বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ। ইস্যুটি নিয়ে তারা নানারকম মত দিতে থাকে, মূলত আলাপগুলো সীমাবদ্ধ থাকে সমালোচনার মধ্যেই। হঠাৎ তরুণ এক কর্মকর্তা বলে বসেন, ‘ভারতেরও পারমাণবিক পরীক্ষা করা উচিত। ইটস টাইম ফর ইন্ডিয়া টু বিকাম আ নিউক্লিয়ার স্টেইট।’ এই প্রস্তাব শুনে মন্ত্রী ওই কর্মকর্তার নাম ও বিভাগ জানতে চান--অশ্বত্থ রায়না, রিসার্চ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি বিভাগ। এরপর অশ্বত্থ বলতে থাকেন--আমেরিকা এক হাজারের বেশি পারমাণবিক পরীক্ষা করে ফেলেছে। তাই বিশ্বে আজ তারা সুপার পাওয়ার। আমেরিকার দেখানো পথে এখন চলছে চিন। তারা একের পর এক পারমাণবিক পরীক্ষা করছে আর পাকিস্তানকে সরবরাহ করছে।
সভায় অশ্বত্থকে মন্ত্রী এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে বলেন। পরের দিনই ‘নিউক্লিয়ার পিস’ নামে প্রতিবেদন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে হাজির হন অশ্বত্থ। অশ্বত্থ মন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন, তিনি নিজে এটি প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরতে চান। কিন্তু তাকে প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে ঢুকতে দেওয়া হয় না। কারণ অশ্বত্থের পরিকল্পনাকে নিজের বলে চালিয়ে দেন মন্ত্রী। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের নরসিমহা রাও। নরসিমহা রাওয়ের সরকার রিপোর্টটি দেখে এবং অনুমতি দেয়। অচিরেই একটি দল প্রস্তুত করা হয় পারমাণবিক পরীক্ষার জন্য অশ্বত্থকে ছাড়াই। তাড়াহুড়ো করে পোখরানে কাজও শুরু হয়। অথচ অশ্বত্থের প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটা কারোরই চোখে পড়ে না--গোপনীয়তা। কারণ ভারতের ওপর অনবরত নজর রাখছে আমেরিকার ‘ল্যাক্রোস’ নামের একটি স্যাটেলাইট। ল্যাক্রোসের জুম লেন্স এতোটাই শক্তিশালী যে মাটিতে দাঁড়ানো কারো ঘড়ির সময় পর্যন্ত নজরে রাখা যায়। এটি রাতেও স্পষ্ট ছবি নিতে পারে, এমনকি মেঘলা আকাশ থাকলেও। ফলে নরসিমহার সরকার এই পরীক্ষাটিকে ল্যাক্রোস তথা আমেরিকার নজরদারির বাইরে রাখতে পারে না। এতে বিশ্বগণমাধ্যমে হইচই বেঁধে যায়। আমেরিকা এ নিয়ে ভারতকে সরাসরি হুমকি দেয়। শেষ পর্যন্ত মিশনটি থেকে নরসিমহা সরকারকে সরে আসতে হয়। মিশনের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও বরখাস্ত করা হয় অশ্বত্থকে।
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত ভারত রাজনৈতিকভাবে অস্থির একটি সময় পার করে। বার বার কোয়ালিশন ভেঙে যেতে থাকে, সরকার পরিবর্তন হতে থাকে। ওই তিন বছরের মধ্যে ভারতে পাঁচ বার প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯ মার্চ ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জনতা পার্টির (বি জে পি) হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন অটলবিহারী বাজপায়ী। গণমাধ্যমে প্রচার চলতে থাকে--‘শ্রী অটলবিহারী বাজপায়ীর ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জনতার মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তিন বছর ধরে চলতে থাকা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সমাধানও যেনো মানুষ দেখা শুরু করেছে।’
১৯৯৫-এর ব্যর্থতার পর বাজপায়ী সরকার আবার পারমাণবিক পরীক্ষাটি করার কথা ভাবে। এ উদ্দেশ্যে আগেরবারের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানের জন্য একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। আগেরবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ অশ্বত্থকে ঠিকই খুঁজে বের করে বি জে পি সরকার। এবার অশ্বত্থের নেতৃত্বে একটি দল গঠন করে রাজস্থানের পোখরানে পাঠানো হয়। মিশনের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন শক্তি’। এবার আমেরিকান স্যাটেলাইট ‘ল্যাক্রোস’-এর চোখ থেকে বাঁচতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তাছাড়া পাকিস্তান ও আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখে পড়ার ঝুঁকি তো ছিলোই। তারপরও রাজস্থানের বিরান মরুভূমি পোখরানে শুরু হয় কাজ।
এদিকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে যেতে থাকে। বি জে পি’কে সমর্থনকারী দলগুলো সমর্থন তুলে নিতে চায়। সরকার আবারও ভেঙে যায় যায় পরিস্থিতি! এমনকি ‘নো কনফিডেন্স মোশন’ (সংসদের কোনো সদস্য কিংবা দলের ওপর আপত্তি জানানোর জন্য ভোট) এরও দিন ঠিক হয়। ১৪ দিন পর এই ভোটের দিন ঠিক হয়। অর্থাৎ সেদিনই ঠিক হবে সরকার থাকবে নাকি ভেঙে যাবে। তার মানে পারমাণবিক পরীক্ষা করতে হলে ১৪ দিনের মধ্যেই করতে হবে।
অন্যদিকে পোখরানে সেনাবাহিনীর গতিবিধি নিয়ে সন্দেহ হয় আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার। এতে করে আমেরিকা ল্যাক্রোসের ঘোরাফেরা আরো নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। তখন আমেরিকার নজরদারি এড়িয়ে পরমাণু পরীক্ষা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।এমন পরিস্থিতিতেও ‘অপারেশন শক্তি’ বন্ধ হয় না। ল্যাক্রোস থেকে বাঁচতে তারা কাশ্মিরে সেনা চলাচল বাড়িয়ে দেয়। পাকিস্তানের সঙ্গে একটি যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলতেও পিছপা হয় না সরকার। গণমাধ্যমে হৈ-হুল্লোড় পড়ে যায়। আমেরিকা ল্যাক্রোসকে কাশ্মিরের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। এতে অশ্বত্থ ও তার দল কাজের জন্য দিনের আরো কিছু সময় বেশি পায় এবং সব প্রস্তুতি নিয়ে ফেলে।
শেষ পর্যন্ত ১১ মে ১৯৯৮ প্রথম পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয়। ধারাবাহিকভাবে শেষ করা হয় আরো চারটি পরীক্ষা। এর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটি শেষ হয়। শেষ পর্যায়ে দেখানো হয় প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপায়ীর বিজয়ের হাসি।
দ্য অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার : গল্পটা কিন্তু অ্যাক্সিডেন্টাল নয়
১০ মে, ২০০৪ খ্রিস্টাব্দ। লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয় কংগ্রেস। এবার তাদের সরকার গঠনের পালা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কে হবে, এ নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। পার্টির লোকজন সোনিয়া গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু বিরোধী দল থেকে শুরু করে অন্যান্য সব মহলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। সোনিয়া জন্মগতভাবে ভারতীয় না, এজন্য তাকে নেতা মানতে অনেকের অসন্তোষ। রাহুল গান্ধী তার মাকে নিয়ে শঙ্কিত হন; পার্টির লোকজনকে বলেন, ‘যে ঘটনা আমার দাদি, বাবার সঙ্গে ঘটেছে, তা আমার মায়ের সঙ্গেও যে হবে না, তার নিশ্চয়তা কী?’
পার্টি চেয়ারম্যান সোনিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন ড. মনমোহন সিংকে। ২২ মে ২০০৪, ড. সিং প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ করেন। সোনিয়া যে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন না, এটা বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা আগেই বুঝেছিলেন। ফলে তাদের মনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষীণ আশাও জাগে। তাই ড. সিংয়ের প্রধানমন্ত্রী হওয়া অনেকের কাছেই খুব বেশি খুশির খবর ছিলো না। তাছাড়া ড. সিংয়ের নেতৃত্ব অনেকেই মেনে নিতে অপ্রস্তুত ছিলেন। এদিকে ড. সিং তার উপদেষ্টা হিসেবে পছন্দ মতো কিছু মানুষের নাম সুপারিশ করেন। কিন্তু সেই তালিকার কম মানুষকেই দায়িত্ব দেয় পার্টি। তাছাড়া ‘ন্যাশনাল অ্যাডভাইসারি কমিটি’ (এন এ সি) নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। নামে যাই হোক এই কমিটির কাজ ছিলো মূলত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে পার্টির তাল-মিল ঠিক রাখা। এদিকে সংসদেও প্রধানমন্ত্রীকে সেই অর্থে কথা বলতে দেওয়া হয় না। তিনি বক্তব্য শুরু করলে, বিরোধী দলের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দলের লোকজনও হইচই বাঁধিয়ে দিতে থাকে।
এই রকম পরিস্থিতিতে মনমোহন সিং তার গণমাধ্যম উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করেন সঞ্জয় বারুকে। সঞ্জয় ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’ ও ‘দ্য হিন্দুস্তান টাইমস’-এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। সঞ্জয়ের বয়ানেই মূলত দ্য অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার-এর আখ্যান এগিয়ে চলে। উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের পর সঞ্জয়ের কাজ ছিলো ড. সিংকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া ও তার বক্তব্য লেখা ইত্যাদি।
এর মধ্যেই দুঃসংবাদ আসে--সাবেক প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও মারা গেছেন। নরসিমহার বাড়িতে যান ড. সিং। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানটি রাজধানী নয়া দিল্লিতে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পার্টি। শেষকৃত্যের জন্য লাশ পাঠানো হবে জন্মভূমি হায়দ্রাবাদে।
যাহোক আমেরিকার সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি করতে চান মনমোহন সিং। এই চুক্তিটি ভারতের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কিন্তু বিরোধী দল, বামপন্থি এবং কংগ্রেসের অনেকে এই চুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নেয়। তবে এই চুক্তির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ড. সিং তার অবস্থানে অটল থাকেন। চুক্তিটি নিয়ে বিরোধী দল বি জে পিসহ অন্যান্য দলের রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সভা হয়। সেই সভায় নানা পক্ষের মতামত শুনে প্রধানমন্ত্রী দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান। সব শেষে তিনি বি জে পি নেতা অটলবিহারী বাজপায়ীর মত জানতে চান। কৌশলী বাজপায়ী কোনো কথা না বলে, শুধুই হাসেন। ড. সিং এতে আশ্বস্ত হন। সাক্ষাৎ শেষে সঞ্জয়ের বয়ানে শোনা যায়, ‘চুপ থেকে কথা বলাতে তো বাজপায়ী সাহেব ওস্তাদ! একটা হাসিতেই তিনি অনেক কিছু বলে যান।’
বামপন্থিরা একপর্যায়ে জানায়, পারমাণবিক চুক্তিটি হলে তারা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউ পি এ (ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স) জোট থেকে সমর্থন তুলে নেবে। ড. সিংকে এতেও কোনোরকম বিচলিত হতে দেখা যায় না। বামপন্থিরা সমর্থন তুলে নিলে কী করবেন--এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ‘আমরা তাদের প্রতিরোধ করবো। কারণ আমার কাছে সবার আগে দেশ।’ এদিকে কংগ্রেস থেকে বামপন্থিদের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া হলে ড. সিং পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। এবার পার্টিও নড়েচড়ে বসে। শেষ পর্যন্ত বামপন্থিরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। চুক্তি সম্পন্ন হয়। এর মধ্য দিয়ে ড. সিং দেশের মানুষের কাছে নায়ক বনে যান।
এভাবে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সময় যেতে থাকে। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে লোকসভা নির্বাচন চলে আসে। এবার কংগ্রেসের নেতৃত্ব কে দেবে, এ নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়। কারণ ভিতর ভিতর সবাই জানতো,--সোনিয়া আর এ পদের জন্য এগিয়ে আসবেন না। আবার রাহুল গান্ধীর দ্বারাও এ নির্বাচনে জয় লাভ করা সম্ভব নয়। এমন সঙ্কটের মুহূর্তে কংগ্রেস কাজে লাগায় ড. সিংয়ের জনপ্রিয়তাকে। ড. সিংকেই প্রধানমন্ত্রীর পদের জন্য উপস্থাপন করা হয়। নির্বাচনে ড. সিংয়ের ভোটব্যাংকে ভর করে কংগ্রেস জয়লাভ করলেও এই জয়কে প্রচার করা হতে থাকে রাহুল গান্ধীর জয় হিসেবে। এতে অবশ্য ড. সিংয়ের কিছু আসে-যায় না। কারণ তিনি পার্টির সব সিদ্ধান্তকে এমনভাবে মেনে নিতে থাকেন, মনে হয় তার আলাদা ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই!
দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে মনমোহন সিং কাশ্মীর সমস্যার সমাধান খুঁজতে চান। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে এ নিয়ে তিনি সাক্ষাৎও করেন। সেই সাক্ষাতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি বেলুচিস্তান দাবি করেন ভারতের কাছে। ড. সিং এতে রাজি হন। তার ধারণা ছিলো, বিরোধী দল একটু-আধটু বিরোধিতা করলেও, কংগ্রেস এতে রাজি হবে। তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। কংগ্রেসের চাপে এবং ভাবী দলীয় প্রধান হিসেবে রাহুল গান্ধীর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে বেলুচিস্তান আর দেওয়া হয় না পাকিস্তানকে। ফলে কাশ্মীর দ্বন্দ্বের সমাধানও আলোর মুখ দেখে না।
এভাবে নানারকম ঘটন-অঘটনের মধ্য দিয়ে সময় যেতে থাকে। সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে, রাষ্ট্র চলছে অন্যরকম এক বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। কিন্তু তাদের প্রশ্ন--এতোকিছু দেখেও প্রধানমন্ত্রী কিছু বলছে না কেনো! এভাবে কংগ্রেসের ওপর থেকে জনমানুষের আস্থা কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে কংগ্রেস পরাজিত হয়।
চলচ্চিত্রে দেখা যায়, মনমোহন সিং ও তার ১০ বছরের প্রধানমন্ত্রীত্বকাল নিয়ে সঞ্জয় বারু একটি বই প্রকাশ করেন‘দ্য অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’। এই বইয়ের মাধ্যমেই তিনি কংগ্রেসের পরাজয় এবং ড. সিংয়ের অবস্থান নিয়ে কথা বলেন। বইটি প্রকাশের পরই নানা বিতর্কের মুখে পড়ে। আর এই বিতর্কিত বই অবলম্বনেই বিজয় রত্নাকর গুত্তে নির্মাণ করেন দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার চলচ্চিত্রটি।
কতোই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়
ক. নেতৃত্ব : ফোঁকড় গাছের গোড়াতেই
পরমাণু : দ্য স্টোরি অব পোখরান-এর শুরুতেই দেখা যায়, ৯০-এর দশকে প্রতিবেশী দেশ চিন ও পাকিস্তান একের পর এক পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই পদক্ষেপে ভারত তখন রীতিমতো নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে। অথচ তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ও তার আমলারা নিজ দেশের পারমাণবিক পরীক্ষা নিয়ে কোনো কিছু ভাবতেই প্রস্তুত নয়। চলচ্চিত্রের চার মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে দেখা যায়, অশ্বত্থ রায়না পারমাণবিক পরীক্ষার বিষয়টি কংগ্রেসের একজন মন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব করেন। প্রথমে মন্ত্রী এ নিয়ে উপহাস করলেও পরবর্তী সময়ে অশ্বত্থের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাথমিক পারমাণবিক প্রকল্প শুরু হয়, তাকে ছাড়াই! নয় মিনিট ৪১ সেকেন্ডে দেখা যায়, পুরো পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন সেই কংগ্রেসমন্ত্রী। এবং তা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অশ্বত্থকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেকেও তিনি সেখানে তাকে ঢুকতে দেন না। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মিশন সরকারের পক্ষ থেকে ঠিক কে নেতৃত্ব দেবে সেটাও চলচ্চিত্রে পরিষ্কার করা হয় না। বুঝতে কষ্ট হয় না, এতো গুরুত্বপূর্ণ এই মিশনটি কংগ্রেস সরকার মোটেও গুরুত্ব সহকারে নেয়নি। তার ফলও দেখা যায় অচিরেই। সারাবিশ্বে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। নিরুপায় ভারতকে সরে আসতে হয় মিশন থেকে। তারপরও তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের মধ্যে এ নিয়ে তেমন কোনো পর্যালোচনা করতে দেখা যায় না।
চলচ্চিত্রের ১৯ মিনিট ৫১ সেকেন্ডে দেখা যায়, বি জে পি থেকে অটলবিহারী বাজপায়ী দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রীর। বাজপায়ী সরকার ক্ষমতায় এসেই পারমাণবিক পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী তদন্ত ও অনুসন্ধানের দায়িত্ব পড়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সহকারী হিমানশু শুকলার ওপর। শুকলা প্রথমেই ১৯৯৫-এর পরীক্ষাটির মূল পরিকল্পনাকারী অশ্বত্থকে খুঁজে বের করেন। চলচ্চিত্রের ২২ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে শুকলার সাক্ষাৎ হয় অশ্বত্থের সঙ্গে। ২৬ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে শুকলাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা আবার পরীক্ষাটির পরিকল্পনা করছি। প্রাইম মিনিস্টার ইজ ভেরি এক্সাইটেড।’ অর্থাৎ বুঝতে বাকি থাকে না, এবারের মিশনটি প্রধানমন্ত্রী বাজপায়ী স্বয়ং তদারকি করছেন।
এবার আর ‘ভুল’ হয় না। অশ্বত্থকে (২৭ মিনিট ৩১ সেকেন্ড) নতুন মিশন ‘অপারেশন শক্তি’র প্রধান বানিয়ে একটি দল প্রস্তুতের দায়িত্ব দেওয়া হয়। চলচ্চিত্রের ২৭ মিনিট ৫০ সেকেন্ড থেকে শুরু করে ৩৫ মিনিট চার সেকেন্ড পর্যন্ত দেখা যায়, সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ব্যাপক অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অশ্বত্থ তার দলের একেক জন সদস্য নির্বাচন করছেন। এরপর রাজস্থানের বিরান মরুভূমি পোখরানে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে গোপনীয়তা মাথায় রেখে কাজ শুরু হয় (৩৭ মিনিট ৫০ সেকেন্ড)।
চলচ্চিত্রের ৫৮ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা আবার বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বি জে পি’র কোয়ালিশন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে ‘অপারেশন শক্তি’ বন্ধের চিন্তাভাবনাও করতে দেখা যায়। কিন্তু অশ্বত্থকে কোনোভাবেই থামানো যায় না। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ১৫ দিনের কাজ মাত্র ১০ দিনে করার ঝুঁকি নিতেও চান তিনি। বি জে পি’কে এরপর এই পরিস্থিতিতেও রাজি হতে দেখা যায়।
চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা এক মিনিটে দেখা যায়, বি জে পি সরকারের কোয়ালিশন আবার হুমকির মুখে। তখন একদিকে কোয়ালিশন ভেঙে যাচ্ছেসরকার থাকছে কি না নিশ্চয়তা নেই; অন্যদিকে আমেরিকান স্যাটেলাইটের ২৪ ঘণ্টা নজরদারি। এই রকম উত্তেজনার মুহূর্তেও বি জে পি’কে কৌশলী হতে দেখা যায়। প্রচণ্ড দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে শুধু পারমাণবিক প্রকল্পটিকে সফল করতে পাকিস্তানের সঙ্গে য্দ্ধু-যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করতেও পিছু হটে না বি জে পি।
পুরো চলচ্চিত্রের সব নাটকীয়তার যবনিকাপাত হতে দেখা যায়, এক ঘণ্টা ৪৪ মিনিটে। সবকিছু প্রস্তুত, এখন কেবল প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি পেলেই চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন হবে। তার মানে, এতোবড়ো পরিকল্পনা, এতো মানুষের-ত্যাগ এর পুরোটাই প্রধানমন্ত্রীর মুখ চেয়ে বসে আছে। বুঝতে বাকি থাকে না, চলচ্চিত্রজুড়ে ‘নায়ক’ অশ্বত্থ হলেও, আসল ‘নায়ক’ প্রধানমন্ত্রী বাজপায়ী। এক ঘণ্টা ৫৪ মিনিটে দেখা যায়, তিনি নিজেই গণমাধ্যমের সামনে হাজির হন সাফল্য গাঁথার বিবৃতি নিয়ে।
২০০৪ খ্রিস্টাব্দের লোকসভা নির্বাচনের পর কেবল একটি প্রশ্ন নিয়েই শুরু হয় দ্য অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার। বিজয়ী দল কংগ্রেসের চেয়ারম্যান সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রীত্ব নেবেন কি না? প্রথম কয়েক মিনিটেই বিরোধী বি জে পি, এন ডি এ (ন্যাশনাল ডেমক্রেটিক অ্যালায়েন্স), শিবসেনা ইত্যাদি দলের নেতাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় ইতালীয় বংশোদ্ভূত সোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে। চলচ্চিত্রের দুই মিনিট ১৩ সেকেন্ডের মাথায় রাহুল গান্ধীকে পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে একটি বৈঠকে মায়ের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করতে দেখা যায়।
তার ঠিক পরেই (চার মিনিট ১৩ সেকেন্ডে) সোনিয়া প্রধানমন্ত্রী পদ না গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। চলচ্চিত্রের পাঁচ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে পরিবারের বাইরে গিয়ে ড. মনমোহন সিংকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেন সোনিয়া। এর কয়েক দিনের মধ্যেই চলচ্চিত্রের ১৩ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে দেখা যায়, পার্টির পক্ষ থেকে এন এ সি (ন্যাশনাল অ্যাডভাইজারি কমিশন) নামে এমন একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একেবারে নতুন এই কমিটির কাজ হলো, নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যেকটা পদক্ষেপ সম্পর্কে পার্টি চেয়ারম্যানকে অবগত করা এবং সে অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেওয়া। কিছু সময়ের মধ্যে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ড. সিং থাকলেও এন এ সি কমিটির মাধ্যমে তাকে পরিচালনা করছেন পার্টি চেয়ারম্যান সোনিয়া গান্ধী। যেমন, ড. সিং আমেরিকার সঙ্গে যে পারমাণবিক চুক্তিটি করতে চান, কংগ্রেস সেই চুক্তি থেকে দূরে থাকতে চায় সমর্থন হারানোর ভয়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ড. সিংকে চুক্তিটি থেকে সরে আসার জন্য প্রচুর চাপ দিতে থাকে পার্টি তথা সোনিয়া। যার ফল হিসেবে চলচ্চিত্রের ৪৭ মিনিটে দেখা যায়, ড. সিং তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছেন (যদিও পরবর্তী সময়ে নানা উৎরাই-চড়াই পেরিয়ে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়)। এভাবেই চলচ্চিত্রজুড়ে যেকোনো বড়ো ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ড. মনমোহন সিংকে দেখা যায় পুতুলনাচের পুতুলের ভূমিকায়।
রেইড-এর ৫২ মিনিটে দেখা যায়, উত্তর প্রদেশ রাজ্যসভার প্রভাবশালী এম পি রামেশ্বর সিংয়ের বাড়িতে আয়কর বিভাগের তল্লাশি অভিযান চলছে। একে একে বাড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে বেরিয়ে আসছে বস্তায় বস্তায় সোনার মুদ্রা, অলংকার, টাকা! ভয়-ভীতি, হুমকি, লোভ কোনো কিছু দিয়েই রোধ করা যাচ্ছে না আয়কর বিভাগের কর্মকর্তা অময়কে। এমন পরিস্থিতিতে এক ঘণ্টা ১৮ মিনিটে দেখা যায়, রামেশ্বর সিং তার আর্জি নিয়ে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। কিন্তু প্রথম দিকে সেখানে তাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে দেখা যায় না। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ রামেশ্বর তার অধীনে থাকা এম এল এ-দের জড়ো করা শুরু করেন এবং উত্তর প্রদেশের সরকার ভেঙে ফেলার হুমকি দেন। হুমকিতে তড়িৎ কাজ হয়, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে ডেকে পাঠান। রামেশ্বর সিংয়ের বিরুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধী কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস তো দেখানই না, উল্টো এক ঘণ্টা ১৮ মিনিটে দেখা যায়, তিনি তল্লাশি থামানোর জন্য ডি সি অময় পটনায়ককে ফোনে নির্দেশ দিচ্ছেন। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মকর্তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে না বলা সহজ ব্যাপার না। কিন্তু অময়কে কৌশলে সেই ‘না’ বলার কাজটিই করতে দেখা যায়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত নির্দেশ চান।
বুঝতে আর বাকি থাকে না, রেইড-এ এমন এক ইন্দিরা গান্ধীকে রিপ্রেজেন্ট করা হয়, যিনি রাজ্যসভার একজন এম পি’র হুমকিতে ভয় পেয়ে যান, এই ধাক্কাটি সামলানোর ক্ষমতা তার নেই! এজন্যই নীতিবিরুদ্ধ একটি নির্দেশ করতেও পিছপা হন না তিনি! তবে সেখানেও তিনি ব্যর্থ! বলতে গেলে, আয়কর বিভাগের একজন কালেক্টরকেও ইন্দিরার নির্দেশ মানতে কার্যত অপারগতা প্রকাশ করতে দেখা যায়। অর্থাৎ ইন্দিরার নেতৃত্বকেই যেনো তিনি অস্বীকার করেন!
খ. প্রশ্নের মুখে নৈতিকতাও
দ্য অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার-এর ৩৭ মিনিটে দেখা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাওয়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান। সেখানে জানানো হয়, নরসিমহা রাওকে দিল্লির পরিবর্তে হায়দ্রাবাদে সমাধিস্থ করা হবে। কংগ্রেসের এতো বড়ো একজন নেতার সমাধি কেনো দিল্লিতে হচ্ছে না, তা পরিষ্কার হয় ৩৯ মিনিটে এসে সঞ্জয় এবং ড. সিংয়ের কথপোকথনে। সঞ্জয় বলেন, ‘রাজঘাটে জমি কম পড়েছিলো হয়তো তার সমাধির জন্য।’ জবাবে ড. সিং বলেন, ‘রাও সাহেবের মতো নেতার লিগেসিও পার্টি নির্ধারণ করবে!’ যার অর্থ দাঁড়ায়, নরসিমহা রাওয়ের মতো নেতাকে দিল্লির রাজঘাটে সমাহিত করার সম্মানটুকু পর্যন্ত দেখাতে ব্যর্থ কংগ্রেস।
রেইড-এর ৫২ মিনিট থেকে টাকাপয়সা-সোনা উদ্ধার হতে দেখা যায়। এতো এতো কালো টাকা লুকানোর অর্থ হচ্ছে, রামেশ্বর দেশের জনগণকে কর ফাঁকি দিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এতে ব্যাহত হয়েছে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, বেড়েছে ক্ষুধা-দারিদ্র্য। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয়ভাবে ভয়াবহ অনৈতিক কাজগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে কর ফাঁকি দেওয়া। অথচ চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১৮ মিনিটে দেখা যাচ্ছে, রামেশ্বর সিং ও তার পরিবারের এতোবড়ো একটি অনৈতিক কাজকে সমর্থন দিচ্ছেন স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী। এর মাধ্যমে নির্মাতা বিজয় রত্নাকর গুত্তে হয়তো ইন্দিরা গান্ধী তথা পুরো কংগ্রেসের নৈতিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন।
গ. তোর আপন ঘরে বেঁধেছে গোলমাল
দ্য অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার-এর ৪০ মিনিটের দিকে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডব্লিউ বুশের সঙ্গে ড. সিংকে আলাপ করতে দেখা যায়। সেখানে একটি পারমাণবিক চুক্তির প্রাথমিক আলোচনা করেন ড. সিং। এরপরই কংগ্রেস তথা পুরো জোটের মধ্যে শুরু হয় ঢাকঢাক গুড়গুড়। দলের মধ্যে দুটো পক্ষ তৈরি হয়ে যায়। বামপন্থি দলগুলোকে দেখা যায় এই চুক্তির বিপক্ষে চলে যেতে। এমনকি এই চুক্তি স্বাক্ষরকে কেন্দ্র করে পুরো জোট ভেঙে যাওয়ার উপক্রমও হয়। আলাপ-আলোচনা-বৈঠক কোনো কিছু করেই জোটকে আর সংগঠিত করা যায় না। একদিকে প্রধানমন্ত্রী চুক্তির পক্ষে নাছোড়বান্দা, অন্যদিকে কংগ্রেস পার্টির চেয়ারম্যান হওয়া সত্ত্বেও সোনিয়াকে নির্ধারিত কোনো অবস্থানেই দেখা যায় না। জোটের মধ্যে না দেখা মেলে পাকাপোক্ত সিদ্ধান্তের, না দৃঢ় নেতৃত্বের।
চলচ্চিত্রের একেবারে শেষের দিকে দেখা যায়, ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের রাজ্যসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করছেন রাহুল গান্ধী। এক ঘণ্টা ৩১ মিনিটে কংগ্রেসের একটি জনসভায় দেখা যায়, জনতাকে উদ্দেশ করে উপস্থাপক বলছেন, ‘আপনারা ১০ মিনিট অন্তত বসুন, রাহুল গান্ধীর বক্তব্যটা শুনে যান।’ জনতা আর থামে না। তার মানে এতে বোঝা যায়, রাহুলকে কোনোভাবেই পছন্দ করে না জনগণ। তারা কংগ্রেসের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। আবার কংগ্রেস কোনো ‘যোগ্য’ প্রার্থীও জনগণের সামনে হাজির করতে পারেনি।
ঘ. ব্যক্তিস্বার্থের জয় জয়কার
দ্য অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার-এর আট মিনিট ৩০ সেকেন্ডের দিকে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের পর একটি নৈশভোজের আয়োজন করে কংগ্রেস। সেখানে সঞ্জয় বারুকে কংগ্রেসের একজন নেতা খবর দেন, এবার অর্থ মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রী নিজের কাছেই রাখবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সঞ্জয়কে দেখা যায়, আরেকজন নেতাকে প্রশ্ন করতেআপনি কোন মন্ত্রণালয় পেলেন?--উত্তরে নেতা বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর নিজেই অর্থমন্ত্রী হওয়ার কথা সঞ্জয় ওই নেতাকে জানালে তাকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যদি অর্থ মন্ত্রণালয় সামলান, তাহলে আমি কী করবো!’ এবং দ্রুতই তিনি হাজির হন সোনিয়া গান্ধীর ব্যক্তিগত সহকারীর কাছে। এরপর সহকারীকে কথা বলতে দেখা যায় সোনিয়ার সঙ্গে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটতে থাকা ঘটনাপ্রবাহে সোনিয়াকে কথা বলতে দেখা যায় ড. সিংয়ের সঙ্গে। এভাবে পুরো পার্টির মধ্যে একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধ হয়ে যায় সবার অগোচরে। বুঝতে কষ্ট হয় না, দেশের নয়, কেউ কারো ব্যক্তিস্বার্থ চুল পরিমাণ ছাড় দিতে রাজি নয়। দেশ, দলের চেয়ে কংগ্রেসের নেতাদের ব্যক্তিগত ভাগাভাগিই যেনো মুখ্য। অবশ্য ১১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী নয়, সোনিয়া মনোনীত নেতাই পেয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১২ মিনিটের দিকে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী সিং কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে আলাপ করেন। আলাপে পাকিস্তান ভারতের কাছে বেলুচিস্তান দাবি করে। কার্যত অনুৎপাদনশীল বেলুচিস্তান পাকিস্তানকে দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেন ড. সিং। এক ঘণ্টা ১৩ মিনিটে দেখা যায়, সোনিয়া গান্ধী বেলুচিস্তান সম্পর্কিত সিদ্ধান্তে ড. সিং এর ওপর বেশ ক্ষুব্ধ। তাকে বলতে শোনা যায়, এই সিদ্ধান্তে সিনিয়র মন্ত্রীরাও অখুশি। তিনি এই সময় ড. সিংকে উদ্দেশ করে কিছু কথা বলেন, কিন্তু চলচ্চিত্রের মধ্যে সেই অংশটুকু (প্রায় ২৫ সেকেন্ড) নিঃশব্দ করে ফেলা হয়। বোঝা যায়, পার্টি প্রধান এমন কোনো ভাষায় ভারতের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন, যেটা হয়তো জনপরিসরে বলাই যায় না! কথা না জানা গেলেও চলচ্চিত্রের ঘটনাপ্রবাহে সোনিয়ার সমস্যাটা আন্দাজ করা যায়। পাকিস্তানের সঙ্গে যেকোনো রকম সমঝোতায় যাওয়া মানেই বিরোধী দল ও জোটগুলোর রোষানলে পড়া, জনগণের বিশাল একটা অংশের চাওয়ার বিপরীতে যাওয়া। তাই হয়তো যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই শত্রুতার অবসানের চেয়ে ছেলের অভিষেককেই বড়ো করে দেখতে দেখা যায় সোনিয়াকে।
আবার পরমাণু : দ্য স্টোরি অব পোখরান-এর নয় মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে দেখা যাচ্ছে, অশ্বত্থের পরিকল্পনাকে নিজের বলে চালানোর উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে নিজে যান কংগ্রেসের এক মন্ত্রী। পরিকল্পনাটি প্রকাশ হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে সব জায়গায় শুনতে পাওয়া যায় সেই মন্ত্রীর জয় জয়কার। আবার কিছুদিনের মধ্যেই (১২ মিনিট ৩২ সেকেন্ড) মিশন ব্যর্থ হলে মন্ত্রীকে দেখা যায়, নিজের ঘাড় বাঁচিয়ে অশ্বত্থকে বলির পাঠা বানাতে।
সিদ্ধান্তটা পাঠকের
তিনটি চলচ্চিত্রেই অদ্ভুতভাবে ভারতের দুটো প্রধান রাজনৈতিক দল উপস্থিত। পার্থক্য এই যে, চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যও বর্তমান ভারতে ক্ষমতাসীন বি জে পি’র বিপক্ষে কথা বলে না। অন্যদিকে প্রত্যেকটি চলচ্চিত্র যেনো জায়গায় জায়গায় কংগ্রেসকে শিকলে বেঁধে ফেলে। এগুলোর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বি জে পি’র একই সঙ্গে দুটো পাখিকে ঢিল মারা হয়--কংগ্রেসের সমালোচনা-নিন্দা করা, জনমানুষকে তাদের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তোলা; অন্যদিকে নিজেদের অন্যায়-অত্যাচার-শোষণ-মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে জনমানুষের চোখে আড়াল করা।
তিনটি চলচ্চিত্রেই সত্য ঘটনা বলে দর্শককে অন্য একটা ‘ভারত’ দেখানোর প্রবণতাও লক্ষণীয়। তার মানে চলচ্চিত্রে যা দেখানো হয়, সেটাই বাস্তবের ভারত। আর বাকি সব ডিজনিল্যান্ডের মতোই অলীক, ফ্যান্টাসি। তারা হয়তো বলতে চায়, গত পাঁচ-দশ-পঞ্চাশ বছরে ভারতে মহাগুরুত্বপূর্ণ যতো ঘটনা ঘটার তা ঘটে গেছে। সেগুলোই আজকের ভারতবাসী তথা বিশ্ববাসীর জানা জরুরি। আর তা কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে তারও একটা গতিপথ বাতলে দেয় এই চলচ্চিত্রগুলো।
সত্য ঘটনা জেনে সাধারণ দর্শক এসব চলচ্চিত্র দেখে বিশ্বাস করে। বিশ্বাসের সরল রাজনীতিও আছে‘সত্য ঘটনা অবলম্বনে’ নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ভারতে ইদানীং প্রচুর। উদাহরণ হিসেবে প্যাডম্যান (২০১৮), দাঙ্গাল (২০১৬), সুলতান (২০১৬), গোল্ড (২০১৮) ইত্যাদির নাম চলে আসে। এই চলচ্চিত্রগুলো যাদের নিয়ে নির্মিত, দর্শক সেই মানুষগুলোকে আশপাশে ঘুরতে ফিরতে দেখতে পায়। দাঙ্গাল-এ গীতার কুস্তি কিংবা প্যাডম্যান-এ অরুণাচলম নামের লোকটির কীর্তির দলিলসমেত প্রমাণ দর্শক সহজেই খুঁজে পায়। অর্থাৎ চলচ্চিত্রগুলোর চরিত্র আর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে দর্শক নানাভাবে জ্ঞাত এবং পূর্ব-পরিচিত। আবার ভাগ মিলখা ভাগ (২০১৩), রাজি (২০১৮) কিংবা গাজি অ্যাটাক (২০১৭)-এর মতো চলচ্চিত্রও নির্মাণ হচ্ছে; যেখানে জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে উঠে এসেছে পাকিস্তান বিরোধিতা। আর এই ব্যাপারগুলোর সঙ্গে দর্শকের আবেগের রাজনীতি জড়িত। এতে করে এসব চলচ্চিত্রের ঘটনা দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। আর তখন এতোগুলো ‘সত্য ঘটনা’র চলচ্চিত্র থেকে বিশেষ উদ্দেশ্যে নির্মিত প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্রকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অথচ তা অনেক ক্ষেত্রেই গণসম্মতি উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। তখন বাস্তবের তিতকুটে সত্যকে আর দুঃসহ মনে হয় না--শুধু ফ্রিজে গরুর মাংস রাখার অপরাধে মানুষকে ঘর থেকে টেনে বের করে মেরে ফেলাকে, ধর্মের নাম করে বর্ণবাদকে উসকে দেওয়ার রাজনীতিকে, দাঙ্গা বাঁধিয়ে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে খুন করাকেও অপরাধ মনে হয় না। প্রত্যেকদিন ঋণের দায়ে কৃষকের আত্মহত্যাকে স্বাভাবিক মনে হয়। নাকের ডগায় ঘটতে থাকা দুর্নীতি, অনিয়ম ও শোষণকেও অপরাধ মনে হয় না!
লেখক : আলি আহমেদ নিশান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
nissan.mcj26@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100007251015129
তথ্যসূত্র
১. আমিন, শাহিদ (২০০৪ : ৪৭); ‘গান্ধী যখন মহাত্মা’; নিম্নবর্গের ইতিহাস; সম্পাদনা : গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লি., ভারত।
২. প্রাগুক্ত, আমিন (২০০৪ : ৪৮)।
৩. প্রাগুক্ত, আমিন (২০০৪ : ৬৩)।
৪. রহমান, ডক্টর সাদিকুর (২০১৭ : ৮৮); ‘আধিপত্য’র ধারণা’; আন্তোনিও গ্রামসির সহজ পাঠ : জীবনসংগ্রাম ও চিন্তা; জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ঢাকা।
৫. আহমেদ, রেহনুমা (২০১১ : ১৭); ‘উত্তর-আধুনিকবাদ প্রসঙ্গে’; প্রবল ও প্রান্তিক ১; সিরিজ সম্পাদক : রেহনুমা আহমেদ; সন্ধি প্রকাশনী, ঢাকা।
(বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ সংখ্যায় (১৭ সংখ্যা) ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।)
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন