কবীর সুমন
প্রকাশিত ০৭ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
পৃথিবীর জিম্মায় রইল তাঁর জীবিত সময়
কবীর সুমন

বিষ্ণু দে-র অনুবাদ করা রুশ ভাষার নাটক ‘সমুদ্রের মৌন’ নিয়ে কথার সূত্রে মৃণাল সেন চলে যাচ্ছেন কমিউনিজ্ম, পরমতসহিষ্ণুতা, গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এসব প্রসঙ্গে। আমার সঙ্গে তাঁর কখনও দেখা হয়নি, কথা হয়নি। কিন্তু সাবলীলভাবে কথা বলে যাচ্ছেন তিনি।
কথার শুরুর দিকেই তিনি আমাকে বলেছেন, ‘আপনাকে কি সুমন বলবো, না কি কবীর?’
আমি, ‘আজ্ঞে, কবীরই বলুন, সুমন নামটা এখন অনেকেরই। কবীর সেই তুলনায় কম।’
তিনি কবীর বলছেন। আমি তাঁকে ‘মৃণালবাবু’ বলছি। তিনি একবারও বলছেন না, ‘আবার বাবু কেন, মৃণালদা বলুন।’
‘চিন্তার জায়গাটা কোথায় জানেন’, বলছেন মৃণাল সেন, ‘ওই নাটকটিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে খারাপ কিছু বলা হচ্ছে না। নাটকের প্রধান চরিত্র এক তরুণ জার্মান সৈনিক--যিনি একবুক অদ্ভুত স্বপ্ন নিয়ে ফ্রান্সে এসেছেন জার্মান সেনাবাহিনীর একজন হয়ে। এক ফরাসি পরিবারের বাড়িতে উঠেছেন তিনি। কেউ তাঁকে আমন্ত্রণ জানায়নি। জার্মান বাহিনী অনেক ফরাসি নাগরিকের বাড়ির আংশিক দখল নিয়েছে। সেইরকমেরই একটা বাড়ির উপরতলায় জার্মান তরুণ থাকতে শুরু করেছেন। ফরাসি পরিবারের কাছে তিনি তাঁর ধ্যানধারণার কথা বলেন। তাঁর স্বপ্নময় ধারণা। জার্মানি আর ফ্রান্স পরস্পরের শত্রু নয়। দুই বিশিষ্ট জাতির মিলন ঘটতে চলেছে--‘সাংস্কৃতিক মিলন’, যা থেকে মানবজাতির পক্ষে কল্যাণকর এক মহৎ সংস্কৃতির উদ্ভব হবে।
কালক্রমে জার্মান তরুণটি তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছেন জার্মান সেনাবাহিনীর অন্যান্য সৈনিকের কথা থেকে। জার্মানি চায় ফ্রান্সকে গোলামেরও গোলাম বানাতে। দুই মহান সংস্কৃতির মিলন-টিলন নয়, য্দ্ধু। ধ্বংস। হত্যা--এই বাস্তবতার ধাক্কায় জার্মান তরুণটি প্রথমে ফরাসি পরিবারের দুই সদস্যের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তারপর যেচে ফ্রন্টে চলে যাচ্ছেন খোদ যুদ্ধে অংশ নিতে।
এইখানেই হয়তো সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের আপত্তি! যা দেখা যাচ্ছে জার্মান তরুণটি মার্কামারা নাৎসি নয়, সে কবি স্বভাবের, তার ভাবনায়, কল্পনায় যুদ্ধ নেই, শত্রুতা নেই, ধ্বংস নেই, আছে মৈত্রী।
মৃণাল সেন বলে চলেছেন, ‘জার্মানদের তো এমন হওয়ার কথা নয়। তাদের আমরা কীভাবে দেখাতে চাই? তারা যুদ্ধবাজ, মারকুটে, নিষ্ঠুর, অন্য জাতিদের অবজ্ঞা অপমান করে। এই নাট্যকার তাঁর মূল চরিত্রকে এভাবে দেখাননি, অতএব এই নাটক নিষিদ্ধ করতে হবে।’
আমি বলছি, ‘অনেকটা মুসলমানদের সম্পর্কে ভারতের অনেক হিন্দু আর পশ্চিমি দেশের ধারণা ও মনোভাব যেরকম।’
মৃণাল সেন, ‘একেবারেই। কাশ্মীরে ভারত কী করছে ভাবুন একবার। কাশ্মীরিদের যে আত্মনির্ধারণ অধিকার আছে, ভারত তা মানতে চায় না। যে মুহূর্তে কাশ্মীরের কোনো মুসলমান গলা তুলে ভারতের নীতির বিরুদ্ধে কথা বলবেন অমনি তিনি জঙ্গি। তাঁকে মেরে ফেলা যায়।’
আমি, ‘আমেরিকাতে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের অবস্থা অনেক সময়ে ভারতের মুসলমানদের মতো--কাশ্মীরের বাইরেও।’
‘সে তো বটেই। এদিকে ভারত নাকি সেকুলার রাষ্ট্র। কী করে সেকুলার কে জানে!’ মৃণাল সেন বলছেন।
‘কিছু বছর আগে, মৃণালবাবু, আপনি কলকাতার ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বা ওই ধরনের এক উৎসবে পঞ্চপ্রদীপ জ্বালানো নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন।’
‘আপনার মনে আছে? হ্যাঁ, করেছিলামই তো।’ মৃণাল সেন বলছেন। ‘এই শুনি সেকুলার দেশ। তা সেকুলার দেশে সরকারি উৎসবের শুরুতে পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে হিঁদুয়ানি দেখানোর প্রয়োজনটা কোথায়!’
‘আপনার এই মন্তব্যটা কাগজে পড়েছিলাম। এ রাজ্যের আর কাউকে এই খাঁটি কথাটা এত সরাসরি বলতে শুনিনি, মৃণালবাবু।’
আপনি চলে গেলেন। ৯৫ তো অনেক বয়স। কত কাজ করে গেলেন আপনি। ১৯৮৭-’৮৮ সালে পশ্চিম জার্মানিতে চাকরি করার সময়ে সেখানকার টেলিভিশনে আপনার ‘আকালের সন্ধানে’ ছবিটি জার্মান ডাবিং-এ দেখেছিলাম। ছবিটি দেখেছিলাম আমার জার্মান বান্ধবী কাথরিনের সঙ্গে। আমার বয়স তখন ৩৮, কাথরিনের ২১। ছবিটি এত ভালো ডাব করা যে, দেখে মনে হচ্ছিল জার্মানই সকলেরই মাতৃভাষা। শেষ হওয়ার পর খানিকক্ষণ নীরব আমরা দু’জন। তারপর কাথরিন আমায় বললেন, ‘এমন ছবি যে-দেশে যে-ভাষায় হয় সেই দেশের কারও সঙ্গে, সেই ভাষার কারও সঙ্গে আমি আমার প্রথম সন্তানটি চাই। আমাকে দেবে?’
কারও সঙ্গে শারীরিক মিলনের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দিয়ে তাকে নিজের সন্তান বলা আমার ধাতে নেই, তাই কাথরিনের কথা মেনে নিতে পারিনি। তেমনই, আপনি আমাকে প্রথম ফোন করার পর আমরা যখন নানা কথা বলছিলাম তখন এই কথাটি আপনার কাছেও বলতে পারিনি, যদিও আপনার ছবি জার্মান ভাষায় দেখার অভিজ্ঞতার কথা আপনাকে বলেছিলাম, আপনি অপ্রস্তুত হয়ে হেসেছিলেন অল্প।
আজ আপনি নেই। কৈশোর থেকে মাঝবয়স অবধি আপনার একাধিক ছবি দেখে ভেবেছি, বারবার ভেবেছি। কাগজ থেকে জানলাম আপনার লেখার পাণ্ডুলিপি, চিত্রনাট্য, আপনার ঘরের সব কাগজ লেখাপত্র আপনি পুরসভার জঞ্জালের গাড়ি ডেকে তুলে দিয়েছিলেন। কিছু রাখেননি। এই খবরটা আমাকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলল।
এই প্রথম এমন কোনও খবর পড়লাম। এমন কারও কথা পড়লাম যাঁর রেখে যাওয়া লেখাপত্র, কাগজ, নথি, ডায়েরি, নোটবুক, চিত্রনাট্য দিয়ে একটা সংগ্রহশালা তৈরি করা যেত। আপনি তার উপায় রাখলেন না, মৃণাল সেন।
আপনার নির্দেশমতো ফুল দেওয়া হয়নি আপনার মৃতদেহে। ফুলঢাকা মালাঢাকা কারও ছবি মানেই তিনি মৃত। নিঃসন্দেহে মৃত। আপনার তেমন কোনও ছবি রইল না। পৃথিবীর জিম্মায় থেকে গেল আপনার জীবিত সময়ের ছবিগুলোই। কারও কাছে থাকল না আপনার লেখার পাণ্ডুলিপি, চিত্রনাট্য, নোট্স।
আপনি জীবিতই থেকে গেলেন, মৃণাল সেন। কোথাও একটা আরও লিখে চলেছেন আপনি। সব সংগ্রহশালার বাইরে।
দায়স্বীকার : বিখ্যাত নির্মাতা মৃণাল সেন পরোলকগমনের পর কবীর সুমন ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ ভারতের ‘সংবাদ প্রতিদিন’ সংবাদপত্রে ‘তিন দু’গুণে সাত’ টাইটেলে তার সাপ্তাহিক কলামে ‘পৃথিবীর জিম্মায় রইল তাঁর জীবিত সময়’ শিরোনামে প্রবন্ধটি প্রকাশ করেন। মৃণালের মূল্যায়নে ব্যতিক্রমধর্মী এই প্রবন্ধটি ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর পাঠকের জন্য হুবহু পুনর্মুদ্রণ করা হলো।
লেখক : কবীর সুমন, ভারতের প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও লেখক।
kabirsuman2013@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন