Magic Lanthon

               

শাওলিন শাওন

প্রকাশিত ০৬ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চালচিত্র : ফরমাল অ্যানালিসিস

দীপুর ‘কেচ্ছা’ ও মৃণালের ভাবনা

শাওলিন শাওন


ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ২০ শতকের অন্যতম গুণী নির্মাতা হিসেবে বিবেচিত মৃণাল সেন। তার কথা শুনলেই নীল আকাশের নীচে (১৯৫৮), বাইশে শ্রাবণ (১৯৫৮), ভুবন সোম (১৯৬৯) কিংবা কলকাতা ট্রিলজি ইন্টারভিউ (১৯৭১), কলকাতা ৭১ (১৯৭২) ও পদাতিক (১৯৭৩)-এর মতো চলচ্চিত্রগুলোর কথা মনে পড়ে। অথচ মৃণালের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র চালচিত্র (১৯৮১) নিয়ে বোধহয় অপেক্ষাকৃত কমই আলোচনা হয়েছে। চলচ্চিত্রটির প্রধান চরিত্র দীপু। এই লেখায় ফরমাল অ্যানালিসিসের মাধ্যমে মৃণালের ভাবনাগুলো কীভাবে দীপুর সঙ্গে মিলে তার আনুষঙ্গিক নানা চরিত্র, সংলাপ, অবজেক্ট, আইডিয়া এবং ইম্প্রেশনের মাধ্যমে প্রকাশ হয়, তা নিয়ে আলোচনার চেষ্টা থাকবে।

ফরমাল অ্যানালিসিস

যেকোনো বিশ্লেষণমূলক রচনাকে বিকশিত করার অন্যতম প্রক্রিয়া হলো ফরমাল অ্যানালিসিস। একে ‘ক্লোজ রিডিং’ও বলা হয়। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে, সেই চলচ্চিত্রের বিভিন্ন অংশনির্মাতার দর্শন, প্লট সেগমেন্টেশন, শিল্প নির্দেশনা, সিনেমাটোগ্রাফি, কম্পোজিশন, সম্পাদনা ইত্যাদিকে কিংবা সামগ্রিকভাবে যেকোনো একটিকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করাকে ফরমাল অ্যানালিসিস বলে। ফরমাল অ্যানালিসিসের মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্রের সামাজিক এবং তাত্ত্বিক বিশ্লেষণগুলো ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করেছে।

    যেকোনো চলচ্চিত্র বিশ্লেষণের মূল উদ্দেশ্য হলোএকটা চলচ্চিত্র কেনো এবং কীভাবে এর নিজস্ব ভাষাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় তা বোঝা। ‘How a Film Works’ বলতে মূলত বোঝায় ‘grammar of film’ অর্থাৎ গল্প বলার মাধ্যম হিসেবে এবং বাস্তবতা-কল্পনা প্রকাশক মোড হিসেবে অন্যান্য মাধ্যম থেকে চলচ্চিত্রের মূল পার্থক্য কোথায়, তা বোঝা। এক্ষেত্রে ফরমাল অ্যানালিসিস প্রক্রিয়া জোর দেয়, চলচ্চিত্রের মূল ভাবনাগুলো কীভাবে নানা আইডিয়া এবং ইম্প্রেশনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়; চরিত্রগুলো কীভাবে ধীরে বিকাশ লাভ করে; চরিত্রগুলোর সংলাপের ধরন কেমন, একেকটা চরিত্রকে কখন ক্লোজ আপ দেখানো হয়, কখন ওয়াইড শটে নেওয়া হয়, চরিত্রগুলো কী ধরনের অবজেক্ট দ্বারা বেষ্টিত, এই অবজেক্টগুলো কীভাবে চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো তুলে ধরছে ইত্যাদি। সবমিলিয়ে ফরমাল অ্যানালিসিস ফর্ম, স্ট্রাকচার, নানাবিধ সিনেমাটিক টেকনিক গল্পের সঙ্গে কীভাবে একাকার হয়ে আছে তার ব্যাখ্যা করে। এক্ষেত্রে ফরমাল অ্যানালিসিস একটা নির্দিষ্ট সিন বা সিকোয়েন্সের ‘ক্লোজ অ্যানালিসিস’ও হতে পারে। আবার সমগ্র চলচ্চিত্রে কীভাবে একটা নির্দিষ্ট সিনেমাটিক টেকনিক (ধরা যাক লঙ টেক) ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও হতে পারে।

চালচিত্র, মৃণালের ভাবনায় দীপুর কেচ্ছা : আনুষঙ্গিক চরিত্র, সংলাপ ও অবজেক্ট

চালচিত্র-এর নামকরণ নিয়ে বলতে হয়, এটি একটি শিল্প। নামকরণ নানাভাবে হয়ে থাকেপ্রধান চরিত্রের নাম অনুসারে, বিষয়বস্তু অনুসারে, লেখকের ইচ্ছানুযায়ী কিংবা অন্তর্নিহিত ভাব অনুযায়ী। এই ক্ষেত্রে চালচিত্র-এর নামকরণ করা হয়েছে বিষয়বস্তু অনুসারে। কেননা ‘চালচিত্র’ শব্দটি দ্বারা সাধারণত বোঝায় হালচাল বা বিদ্যমান অবস্থা। চালচিত্র-এ সমাজের নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্তের আর্থসামাজিক দশা এবং উচ্চবিত্তের সঙ্গে তাদের শ্রেণি বৈষম্যের কথা উঠে এসেছে। শ্রেণি বৈষম্যময় সমাজব্যবস্থা এভাবেই চলে আসছে যুগের পর যুগ।

    সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রগুলোর প্রতি নজর রাখলে দেখা যায়, কখনো কখনো এগুলো শুরুই হয় গাননাচ দিয়ে। বাণিজ্যিক প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রে এমনটা বেশি ঘটে। পর্দায় ক্রেডিট লাইন দেখানো হচ্ছে সঙ্গে চলছে গাননাচ, এমনকি কখনো সেটা আইটেম সঙও হয়। আবার কখনো চলচ্চিত্র শুরুর আগে ওই চলচ্চিত্রেরই কোনো গানের সুর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর হিসেবে শোনা যায়। চালচিত্র শুরু হয় কলকাতা শহরের ট্রাম, ট্যাক্সি আর বাসের হর্নের নানাধরনের শব্দ দিয়ে। অর্থাৎ শুরুতেই যেনো নির্মাতা মৃণাল স্পষ্ট করে দেন, এই গল্প কলকাতার এবং এই শহরের মানুষের জীবনযাত্রার। কলকাতা শহর মৃণালের চলচ্চিত্রে বার বার উঠে এসেছে। কলকাতাকে যেনো তিনি শহর নয়, সত্ত্বা হিসেবে দেখিয়েছেন সব চলচ্চিত্রে। সেইসব চলচ্চিত্রে এই শহরের মানুষ, মূল্যবোধ, শ্রেণিসংঘাত, বৈষম্য, সড়ক অনেক বার উঠে এসেছে।

    এরপর শোনা যায় ভয়েসওভার। মৃণালের চলচ্চিত্রে ভয়েসওভার প্রায়শ শোনা যায়। ভুবন সোম-এ অমিতাভ বচ্চন প্রথম ভয়েসওভার দিয়েছিলেন যা বেশ দর্শকনন্দিত হয়েছিলো। চালচিত্র-এর শুরুর ভয়েসওভারটি কার তা দর্শকের কাছে পরিষ্কার হয়, যখন দীপু (অঞ্জন দত্ত) পর্দায় হাজির হন। আবার ভয়েসওভারটির দীপুর মনোলগে পরিণত হতেও খুব বেশি সময় লাগে না। একজন অবস্থা সম্পন্ন পোশাকি ভদ্রলোক কীভাবে পোশাক ছাড়া মাত্রই নিম্নবিত্তে পরিণত হয়, তা দীপুর মনে মনে বলা কথা অর্থাৎ মনোলগে বোঝা যায়। সবশেষে দেখা যায়, এই ভয়েসওভার মনোলগটি প্রকৃতপক্ষে একটি সাউন্ড ফ্ল্যাশব্যাক বা অডিও ফ্ল্যাশব্যাক, যেটি দীপু লিখেছে এবং পত্রিকার এক নামকরা সম্পাদক (উৎপল দত্ত) সেটি পড়ে নানা মন্তব্য করছে।

   আমরা ডাইজেটিক (উৎস পর্দায় বিদ্যমান) কিংবা নন-ডাইজেটিক (উৎস পর্দায় বিদ্যমান নয়) সাউন্ডের বিষয়টি জানি; চালচিত্র-এর শুরুর দিকের সিকোয়েন্সগুলোতে ডাইজেটিক এবং নন-ডাইজেটিক সাউন্ড দারুণভাবে পরস্পর মিলিত হয়েছে। সাউন্ডের এই মুন্সিয়ানা কাজগুলো চলচ্চিত্রজুড়ে দারুণভাবে করেছেন রঞ্জন পাণ্ডে, দুর্গা মিত্র, সত্যেন চট্টপাধ্যায় (শব্দ গ্রহণ), জ্যোতি চট্টপাধ্যায় (শব্দ পুনঃ) এবং সঙ্গীত পরিচালক আলোকনাথ দে। মৃণাল সেন সাউন্ড নিয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন, কারণ তার ছিলো কলকাতায় অডিও টেকনিশিয়ানের চাকরির অভিজ্ঞতা।

সংলাপ

সংলাপ চিত্রনাট্যের অন্যতম অংশ। চালচিত্র-এর চিত্রনাট্যকার মৃণাল সেন। এর সংলাপগুলো বেশ গভীর অর্থাৎ শুধু আক্ষরিক অর্থ নয়, ভাবার্থও আছে।

‘পোশাকি বনেদি মানুষটা গরিব হয়ে গেলো’

সংলাপটি প্রথমে দীপুর ভয়েসওভারে শোনা যায়, এর পরের সিকোয়েন্সে সংলাপটি আসে পত্রিকা সম্পাদকের মুখে। সম্পাদক বাক্যটি পড়ে খুবই মজা পেয়ে অট্টহাসি দেন। এসময় তাকে জুম ইন শটে দেখানো হয়। অর্থাৎ সম্পাদক বেশ প্রভাবশালী। বাস্তব জীবনেও গণমাধ্যমের সম্পাদকেরা যেনো উঁচুতলার মানুষের পক্ষেই কথা বলে কিংবা তাদের বিষয়টি অন্তত মাথায় রাখে। কেননা বিজ্ঞাপনদাতারাই যে গণমাধ্যমের রুজি-রুটি। গণমাধ্যম নিম্নবিত্তের এক একটি ইমোশনকে এক একটি স্টোরি বা ফিচার হিসেবে বিক্রি করে। সহজ কথায় বলতে গেলে, পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য প্রকাশ করে। পরে এসব ইমোশনই পত্রিকার স্টোরি হয়ে ‘সোমবারের ফিচার’ হিসেবে বিশেষ জনপ্রিয়তা যায়। সম্পাদকের ভাষায়‘ফিচারটা খুব পপুলার হয়েছে ... লোকে খুব খাচ্ছে ... পাবলিককে খাওয়াতে জানতে হবে ... ওরা পড়ে আমরা বেচি।’

    শুধু কি সংবাদ? পুঁজিবাদের রাজ্যে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয় শ্রম। চালচিত্র-এ হোটেলের শিশুশ্রমিক নিতাই বুঝতে পারে না সে শোষিত হচ্ছে; দুই বেলা খাওয়া আর ১৫ টাকা বেতন মাকে দিতে পেরেই সে খুশি। অথচ নিতাইরা এভাবেই বই ফেলে অল্প বয়সে হাতে তুলে নেয় সংসারের দায়িত্ব; যেখানে পুঁজিবাদ তাকে স্বল্প অর্থ যোগানের নিশ্চয়তা দেয়; কিন্তু বিনিময়ে বহুলাংশে নিতেও ভুলে নাসঙ্গে নিয়ে নেয় শৈশব, শিক্ষার অধিকার, নিরাপত্তা, স্বপ্ন দেখার অধিকার ইত্যাদি। আবার পুরনো কাপড়ের বিনিময়ে বাসনপত্র কেনাবেচা বেশ পরিচিত মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে। পুরনো কাপড়ের বিনিময়ে মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়েরা দরাদরি করে নিম্নবিত্ত বাসনওয়ালির কাছ থেকে সেরা বাসনটাই বেছে নেয়। মধ্যবিত্ত দীপুর মা নিজে বুর্জোয়া শোষণের শিকার হলেও, প্রতিবেশী উচ্চবিত্তের ফেলা ময়লা কাগজের কুঁচিতে বিরক্ত হলেও, বাসন নেওয়ার সময় কম কাপড়ের বিনিময়ে বেশি বাসন দিতে বলে নিম্নবিত্ত বাসনওয়ালিকে শোষণ করতে ভোলে না। এ কেমন বেচাকেনা! এও কি শোষণ করার, পারস্পরিক শ্রেণি বৈষম্য বজায় রাখার একরকম পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নয়?

    কথা হচ্ছিলো ‘পোশাকি বনেদি মানুষটা গরিব হয়ে গেলো’ নিয়ে। এই সংলাপটির উৎস দীপুর লিটল ম্যাগাজিনে লেখা এক গল্প। যেখানে কোনো এক রাতে ১২টা ৪০ মিনিটে দীপুর কাছে যখন ট্যাক্সি করে বাড়ি যাওয়ার পয়সা থাকে না, তখন এক ‘স্মার্ট-বনেদি-সভ্য-মার্জিত’ ভদ্রলোক এগিয়ে এসে সেই রাতখানা দীপুকে তার বাড়িতে কাটানোর জন্য বলেন। কিন্তু তার বাড়িতে গিয়ে দীপু বুঝতে পারেন ‘স্মার্ট-বনেদি-সভ্য-মার্জিত’ ভদ্রলোক মূলত একজন নিম্নবিত্তের মানুষ।

    উইলিয়াম শেক্সপিয়র বলেছিলেন, এই পৃথিবী হলো এক রঙ্গশালা এবং আমরা সবাই এই রঙ্গশালার অভিনেতা। উক্তিটি যেনো দীপুর ‘গরিব হয়ে যাওয়া’ লোকটির সঙ্গে একেবারে মিলে যায়। সম্পাদকের মতেও, আমরা সবাই এই লোকটির মতো বেশ ধরে থাকি নিজেদের স্বার্থে, কেনাবেচার স্বার্থে। হয়তো লোকটি মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ, ওষুধ বিক্রির স্বার্থে এমন বাবুবেশ ধরে থাকেন। কিন্তু দিনশেষে ফিরে যান নিজের ক্ষুদ্র কুটিরে। জীবনের প্রয়োজনে মৃণাল সেন নিজেও একসময় মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ করেছিলেন কলকাতার বাইরে গিয়ে। কিন্তু দিনশেষে মৃণালের মনও হয়তো পড়ে থাকতো ফিল্ম য়েস্থেটিকসের বইয়ের পাতায়। দীপুর এই ‘পোশাকি বনেদি মানুষটা গরিব হয়ে গেলো’ গল্পটি সম্পাদকের ভালোলাগায় তিনি দীপুকে তার পত্রিকার জন্য মধ্যবিত্ত জীবনের চালচিত্র নিয়ে ‘ফরমায়েশি লেখা’র সুযোগ করে দেন।

‘কিছুদিনের মতো নিশ্চিন্ত’

সংলাপটি সাধারণ মনে হলেও এর আছে গভীর অর্থ। দীপুর মায়ের মুখে এই সংলাপটি শোনা যায় এবং কৌতুকের সৃষ্টি হয়; যখন দেখা যায় দীপু ‘নিশ্চিন্ত’ বানানটি লিখতে গিয়েই নিশ্চিত নন। অর্থাৎ নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তের জীবনে নিশ্চিন্ত হওয়াটা যেনো সত্যি সন্দিহান।

    এই সংলাপের প্রেক্ষাপট এখানে বলা প্রয়োজন। দীপুদের তিনতলা ভাড়া বাড়ির এস্টাবলিশমেন্ট শট্টি লো অ্যাঙ্গেলে নেওয়া। সিনেমাটোগ্রাফির ভাষায়, এই ধরনের শট্কে কোনো কিছুর আধিপত্য বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এর পরেই দেখা যায়, হাই অ্যাঙ্গেল শট্, দীপুর মা শেওলায় পিছলে পড়ে আছে। হাই অ্যাঙ্গেল ধরনের শট্ কোনো কিছুর অধীনতা বোঝায়। ঘটনাক্রমেই দীপুদের প্রতিবেশী হলো উচ্চবিত্ত এক পরিবার; যাদেরকে দীপুদের রান্নার উনুনের কালো ধোঁয়া মাঝেমধ্যে বিরক্ত করে। আবার তারা প্রায়শ ময়লা-আবর্জনা-কাগজের কুঁচি নিচে ফেলে এর প্রতিশোধও নেয়। অর্থাৎ দীপুরা তথা মধ্যবিত্তরা ওই উচ্চবিত্তদের অধীন। তাই দীপুর মার মতে, কীভাবে মধ্যবিত্ত জীবনে নিশ্চিন্তি আসবে? এই নিশ্চিন্তি তো কিছুদিনের।

    মার্কসবাদে যেমনটা বলা হয়, পুঁজিবাদের শোষণের বিরুদ্ধে নিম্নশ্রেণি বা শ্রমিকেরা একতাবদ্ধ হয়ে বিপ্লব করে ফেলে। তেমনই দীপুদের বাড়ির নারীদের জিদ করে পুরো উঠানের শেওলা পরিষ্কার করাটা যেনো তারই ইঙ্গিত দেয়। মৃণালের চলচ্চিত্রের বিষয়-কাহিনি ব্যষ্টিকে দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তাতে সমাজের সমষ্টির অন্যান্য প্রসঙ্গও এসে যায়। বস্তুত ব্যষ্টিসত্ত্বার দ্বন্দ্বকে এক বিশেষ সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করেই সমাজের সার্বিক মুক্তির উপায়ের সন্ধান তিনি করে গেছেন তার চলচ্চিত্র সমগ্রে।১০ মার্কসবাদ বলে, একতাবদ্ধ থাকলে শ্রমিকের বিপ্লব সহজ হয়। আর উপদলে ভাগ হয়ে গেলে বিপ্লব মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসে, আন্তঃকোন্দলের সৃষ্টি হয়। দীপুর মা শেওলায় পড়ে যাওয়ায়, প্রথমে বাড়ির নারীরা দোষারোপ করে পুরুষদের; পুরুষেরা চাইলেই পারে এসব শেওলাজনিত সমস্যা দূর করতে, পরিষ্কার করতে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষেরা এই ‘সমাজের শেওলা সরানোর’ ইচ্ছা বাস্তবজীবনে কতোটা রাখে?

    দীপুর মা শেওলায় পড়ে যাওয়ায় প্রথমে পুরুষদের গোষ্ঠী উদ্ধার করে; এরপর তারা শেওলা জমার জন্য দোষারোপ করে কর্মজীবী নারী কল্পনার শাড়িতে মাড় ব্যবহার করাকে। বাড়ির সব নারী মিলে একজন কর্মজীবী নারীকে আক্রমণ করছে; আবার ওই নারীও তাদের বলতে ছাড়ছেন না‘আপনাদের মতো তো আর ঘরে বসে থাকি না’। এটিও কি একরকম পুরুষতান্ত্রিকতার পরিচয় নয়? এতে মুহূর্তেই সৃষ্টি হয় নানা ছোটো ছোটো দল এবং পক্ষ-বিপক্ষ মিলিয়ে শুরু হয় ঝগড়া, তর্কাতর্কি। যদিও পরে দীপুদের বাড়ির নারীরা একতাবদ্ধ হয়ে ঠিকই সব শেওলা পরিষ্কার করে। সবাই মিলে ঝাঁটা দিয়ে শেওলা নয়, গৃহিণী-কর্মজীবী নির্বিশেষে যেনো সমাজে নিজেদের চলার পথের বাধাগুলো একসঙ্গে সরাচ্ছে। বিষয়টা অনেকটা এ রকম যে, একতাবদ্ধ না থাকলে যেমন বিপ্লব হয় না, তেমনই শেওলার মতো পুঁজিবাদের শোষণ গজিয়ে ওঠে চারদিক দিয়ে।

‘তুই কেচ্ছা খুঁজে বেড়াচ্ছিস?’

সম্পাদকের ‘ফরমায়েশি স্টোরি’ লেখার জন্য নিবেদিত দীপু বাড়ির নারীদের ঝাঁটা অভিযান ক্যামেরায় ধারণ করতে ব্যর্থ হয়ে দোষারোপ করেন মাকে। তখন এই সংলাপটা শোনা যায় দীপুর মায়ের মুখে। দীপু চেয়েছিলো হাঙ্গামা আরো বাড়ুক, যাতে একটা স্টোরি হয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত দীপুর মায়ের কাছে এটি শুধু ‘কেচ্ছা’; মানুষের হাঁড়ির খবর শুনে মজা নেওয়া; স্টোরির নামে চটুল খবর বিক্রি করা। দীপুর কাছে এই ঝাঁটা অভিযান শুধুই ঝগড়ার একটা প্রতিফল, আর যেকোনো দ্বন্দ্বই চটুল খবর। সম্পাদকের ভাষায়, ‘পাবলিক খাওয়ার’ মতো। দীপুর পরিচিত ফটোগ্রাফার সুভাষ দা’কে এই ছবি তোলার জন্য আনার পর দেখা গেলো সব শেওলা পরিষ্কার, আর এটি দীপুকে খুব হতাশ করে।

    আরেকটা ‘কেচ্ছা’ পাওয়া যেতো চিংড়ি-বুড়ির রাতে কয়লা চুরির মধ্য দিয়ে। ছোটোভাই অপুর কাছ থেকে কয়লা চুরির তথ্য পাওয়া মাত্রই দীপু চুরির ঘটনার চাক্ষুষ প্রমাণ পায়। কিন্তু প্রতিবাদ না করে বরং তিনি মাকে ডেকে তোলেন; উদ্দেশ্য একই ‘কেচ্ছা’ পাওয়া, দ্বন্দ্ব তৈরি করে সম্পাদকের ফরমায়েশ মতো চটুল সংবাদ দেওয়া পত্রিকায়। একইভাবে শোষকশ্রেণি ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম চাহিদার সৃষ্টি করে, মধ্যবিত্তের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে নিজেদের ফায়দা লুটে নেয়। এখানেও নিম্নবিত্ত-নিম্নবিত্তে লড়াই করবে, এটাই যেনো মজার স্টোরি! দ্বন্দ্ব না করলেও পরের দিন দীপুর মা ঠিকই কয়লাগুলো নিজের অধীনে এনে রাখেন। অথচ এই কয়লা আগে উঠানে সবার মধ্যেই থাকতোএ যেনো সাম্যবাদে ভাঙন। আর এই ভাঙনের খবরটাই কেচ্ছা। কিন্তু দীপুর মা চিংড়ি-বুড়ির সঙ্গে হাঙ্গামায় না যাওয়ায় বিষয়টা জমে উঠলো না বলে কেচ্ছা হারিয়ে দ্বিতীয়বার হতাশ হন দীপু।

    এদিকে গণমাধ্যমের ভূমিকা শুরু থেকেই হতাশ করে সম্পাদকের কেচ্ছা চাওয়ার মাধ্যমে। আরো একবার দীপুকে ‘কেচ্ছার’ সন্ধানে হতাশ হতে হয়, ‘আই ক্যান স্পিক ইংলিশ’ সাইনবোর্ডওয়ালা জ্যোতিষী শিবপ্রসাদের বেলায়। শিবপ্রসাদ বিদেশি পর্যটকদের হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলে দেন‘বেশ কয়েকবার বিদেশ ভ্রমণ আছে’তাদের কাছে জড়িবুটি-মাদুলি ‘ফিক্সড প্রাইসে’ বিক্রি করেন। ‘কেচ্ছার’ এই পর্যন্ত অংশ দীপুকে বেশ আকৃষ্ট করে অর্থাৎ চটুল খবর ‘পাবলিক খাওয়ার’ মতো। পরে শিবপ্রসাদ সম্পর্কে আরো জানার আকাক্সক্ষায় তার বাড়িতে গিয়ে দীপু কেচ্ছার আগ্রহই হারিয়ে ফেলেন। শিবপ্রসাদের ছেলে বেঁচে নেই, পরিবারের উপার্জনক্ষম তিনিই। উপার্জনক্ষম বলতে জ্যোতিষী শিবপ্রসাদ নিজে এবং তার ঠোঙাবিক্রেতা ছেলের বউ; কিন্তু খাওয়ার মুখ আছে আরো চার জনতিন নাতনি ও এক নাতি। এজন্যই হয়তো ‘ছোট পরিবার সুখী পরিবার’এই সরকারি প্রজ্ঞাপন সম্বলিত ইনসার্ট দিয়ে শিবপ্রসাদের সিকোয়েন্স শুরু হয়। এই সন্তান সংখ্যা কিন্তু ভারতীয় বাঙালি সমাজের সেই প্রচলিত ছেলে সন্তানের ধারণাকে তুলে ধরে। ভারতীয় বাঙালি সমাজের ধারণা এই যে, ছেলে হলো বাবা-মায়ের শেষ বয়সের সম্বল, সংসারের ভবিষ্যৎ উপার্জন উৎস এবং বংশের ধারাকে অগ্রসরকারী। শিবপ্রসাদের ১০ বছরের ব্যবসা ছিলো কিন্তু সেটায় সুবিধা না হওয়ায় তিনি জ্যোতিষী হয়েছেন। মানুষ তার কাছে আশার কথা শুনতে চায়। অথচ এই মানুষটিকেই আশা দেওয়ার কেউ নেই। এমনকি যে আশা নিয়ে শিবপ্রসাদ ‘সাংবাদিক’ দীপুর সঙ্গে এতোসব কথা বলছিলেন; অর্থাৎ যে গণমাধ্যম তার এই দুর্দশার কথা তুলে ধরবে, তার ব্যবসার প্রচার হবে, তা কিন্তু হয়নি। বরং দীপু শিবপ্রসাদের এসব গল্পকে ‘ধাপ্পাবাজি’ বলে মনে করেছে, যেটি ‘পাবলিক নাও খেতে’ পারে।

    দিনেশেষে ‘কেচ্ছা’ পেয়ে-হারিয়ে-বানিয়ে দীপু যখন চালচিত্রের কথা খাতায় লিখছেন, তার টেবিলঘড়িতে তখন ১২টা। এই ১২টা কি শুধু দীপুর ঘড়িতেই বাজে? নাকি মৃণাল বুর্জোয়াদের শোষণে প্রোলেতারিয়েতদের ১২টাও বুঝিয়েছেন?

‘একটা গ্যাস কিনে দে না ... আরাম করে রাঁধবো। পারবি?’

দীপুর মায়ের এই ‘গ্যাস চাওয়া’ মানে যেনো শুধু গ্যাস চাওয়া না; শ্রেণি বৈষম্যের স্থায়ী ব্যবস্থা বা সমাধান চাওয়া। কেননা দীপু মধ্যবিত্তের একজন হয়েও তার ‘কেচ্ছা পাওয়ার আকাক্সক্ষা’ তাকে শোষক শ্রেণির মতোই চিন্তা করতে শেখাচ্ছে। এই শ্রেণি মধ্যবিত্তের জন্য যদি ভাবেও, তবে সেটা অবশ্যই নিজের স্বার্থে। সম্পাদকের ‘ফরমায়েশি লেখা’ লেখার জন্য দীপু বাড়ির আঙিনায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখে খুশি হয়ে ছবি তুলতে চায় এবং সম্পাদকের কাছে বেচতে চায় চটুল খবর হিসেবে। এই বেচতে চাওয়ার প্রবণতাই পুঁজিবাদী চিন্তাধারা। এই চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে দীপু যখন নিখাদ মায়ের জন্যই মাকে প্রশ্ন করেন, তিনি কীভাবে এতোকাল উনুনের কালো ধোঁয়ায় রান্না করেছেন, তখন ‘জীবনে কোনোদিন রান্নাঘরে না ঢোকা’ দীপুর কথায় মায়ের ওই সংলাপটি যথার্থ মনে হয়।

    অন্যদিকে, দীপুর মা ইচ্ছে করে রান্নাঘরের জানালা খোলেন না, কেননা মধ্যবিত্তের উনুনের কালো ধোঁয়া পাশের উচ্চবিত্তের বাড়িতে গিয়ে উপদ্রব সৃষ্টি করতে পারে। উচ্চবিত্তের সঙ্গে মধ্যবিত্তের লাগতে নেই। দীপু প্রথম দিন জানালা খোলেন ধোঁয়া বের করার জন্য, মায়ের যাতে চোখ না জ্বলে সেজন্য। যদিও দীপুর মায়ের কাছে এসব আলগা দরদ। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত যেনো চাইছে না আর ‘শোষক শ্রেণির’ আলগা দরদ। আগেই বলেছি, দীপুর মায়ের এই গ্যাস চাওয়া মানে শুধু গ্যাস চাওয়া নয়, শ্রেণি বৈষম্যের স্থায়ী সমাধান চাওয়া।

    পরেরবার দীপু জানালা খোলেন কেচ্ছার আশায়। মধ্যবিত্তের কালো উনুনের ধোঁয়া জানালা খুলে উচ্চবিত্তের ঘরে পাঠালে একটা দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ হবে, আর যেটা না হলে কেচ্ছা পাওয়া যাচ্ছে না সম্পাদকের মন মতো। অন্যদিকে, দীপুর মা কিন্তু এই আগুন জ্বালাতে দীপু-অপুকে সাহায্য করে উচ্চবিত্তের বিরুদ্ধে অচেতন মনের সুপ্ত বিপ্লবের আশায়। নিম্নবিত্তের উনুনের ধোঁয়া উড়ে উচ্চবিত্তের বাড়িতে, যার প্রতিশোধ স্বরূপ উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েটি অসংখ্য ময়লা কাগজ কুঁচি নিচে দীপুদের বাড়িতে ফেলে।

    এখানে পর্দায় শোষক হিসেবে নারীকে দেখালেও, মনস্তত্ত্ব কিন্তু বলে পর্দায় চলছে পুরুষ প্রাধান্যশীলতা। একইভাবে বাড়ির শেওলা পরিষ্কারে পুরুষেরা যেমন নির্লিপ্ততা দেখিয়েছিলো, তেমনই ময়লা কাগজ কুঁচি ফেলার সময়ও, অপুর মা-কল্পনারা হইচই করলেও পুরুষেরা কেউ প্রতিবাদ করেনি। এদিকে বাড়ির ছোটো ছেলেটিকে দেখা যায় সে মহা খুশি, সে যেনো উচ্চবিত্ত মেয়েটির ফেলা ময়লা কাগজের কুঁচির বৃষ্টিতে এক অনাবিল আনন্দ খুঁজে নিয়েছে। একইভাবে পুঁজিবাদ যেমন সুন্দর মোড়কের আড়ালে অসুন্দর জিনিসটিও ঠিক বিক্রি করে ফেলে, আর হাসতে হাসতে ওই শিশুটির মতো না বুঝে শোষণের শিকার হয়েও অবুঝের মতো আমরা তা কিনে ফেলি। শেওলা পরিষ্কারের মতো, আবারও সেই কাগজের ময়লা কুঁচিগুলো পরিষ্কার অভিযানে কিন্তু নারীরাই ঝাঁটা হাতে নামে।

    পুঁজিবাদের স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়, রমেনের গর্ভবতী বউকে হাসপাতালে নিতে দীপু যখন ট্যাক্সি খুঁজতে যায়। ট্যাক্সি কিন্তু একেবারে অপ্রতুল নয়, তবে যারা আছে তারা যেতে নারাজ, তাদের চাহিদা উচ্চ। এই উচ্চ চাহিদা পূরণ করে যারা ট্যাক্সিতে উঠতে পারবে, তারাই গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পারবে। এই বিষয়টি কি ইচ্ছাকৃতভাবে যোগান বন্ধ রেখে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির মতো নয়? দীপু আর রমেনের বার বার ট্যাক্সি ট্যাক্সি বলে চিল্লানোটা যেনো বলে দিচ্ছিলো, এই কৃত্রিম সঙ্কট বন্ধ হোক। বহু খুঁজে যে ট্যাক্সি পাওয়া গেলো, সেই ট্যাক্সিও ১০ শতাংশ বেশি চায় মিটারের ওপর। চালচিত্র-এর ট্যাক্সি চালকের এই বেশি চাওয়ার স্বেচ্ছাচারিতা কিন্তু অনেকাংশে বাংলাদেশের সি এন জি-চালিত অটোরিকশা চালকদের কথা মনে করিয়ে দেয়।

‘কতো উনুন কলকাতায়’

মধ্যবিত্তের উনুনের ধোঁয়া নিয়ে কতো কি হয়ে গেলো! এই ধোঁয়া কি শুধুই ধোঁয়া? মৃণাল পরাবাস্তববাদ ও জার্মান অভিব্যক্তিবাদী শিল্প-দর্শনকে ব্যবহার করে পর্দায় আলাদা ভাবার্থ তৈরি করেছেন। বাস্তবকে তিনি মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করেই চলচ্চিত্রের কাহিনি-কাঠামোতে স্থান করে দিয়েছেন।১১ বক্তব্যের কাঠামোকে শান দিয়েছেন মার্কসবাদ, অস্তিত্ববাদের সারাৎসার দিয়ে। ‘কতো উনুন কলকাতায়’--সংলাপটি ছোটোভাই অপু বলেছিলো দীপুকে। এই সংলাপটি দিয়ে উনুনের ধোঁয়ার অপকারিতার ব্যাপকতা বোঝায় নাকি শহুরে মধ্যবিত্তের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও তাদের শোষিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়?

    দীপুর কেচ্ছা খোঁজার পালায় উনুনের কালো ধোঁয়ার ব্যাপারটি কিন্তু সম্পাদকের কাছে বেশ ‘পাবলিক খাওয়ার’ মতো বলে মনে হয়।১২ দীপুর বাড়ির উনুনের কালো ধোঁয়া প্রতিবেশী উচ্চবিত্তের ঘুম হারাম করেছিলো। সম্পাদক নিজেও উঁচুতলার একজন হিসেবে কি এই মধ্যবিত্তের উনুনের ধোঁয়া বন্ধের জন্য উঠে পড়ে লাগলেন! যেহেতু গত কয়েক দশকে ও বর্তমানে পরিবেশ ও জলবায়ু বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে, তাই হয়তো দীপুকে ‘ফরমায়েশি লেখা’ দেওয়া হয় কলকাতায় বায়ু দূষণ সচেতনতা নিয়ে। কিন্তু মধ্যবিত্তের উনুনের ধোঁয়া বায়ু দূষণ করছে ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি সাধন করছেব্যাপারটি কি এখানেই সীমিত? গ্যাস সিলিন্ডারের দাম উনুন ব্যবহারকারী মধ্যবিত্তের ক্রয় সীমানার বাইরে। উনুন বন্ধ হলে কালো ধোঁয়া বন্ধ হবে, কিন্তু এই মানুষগুলোর পেট ভরবে কীভাবেতা নিয়ে কি উচ্চবিত্ত সমাজ ভেবেছে? মধ্যবিত্তের উনুন নিভলেই কি বায়ু দূষণ বন্ধ হবে? উচ্চবিত্তের কল-কারখানার ধোঁয়া কি বায়ু দূষণে কোনোই ভূমিকা রাখছে না?

    মধ্যবিত্ত দীপু শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদী চিন্তাধারার দীপুকে কিছুটা শনাক্ত করতে সক্ষম হলেও শেষ রক্ষা কি হয়? স্বীয় স্বার্থে-আদর্শে-অস্তিত্বে আঘাত আসা মাত্রই উচ্চবিত্ত শোষক শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে সম্পাদক বেঁকে বসেন এবং দীপুকে তার আর্থিক প্রয়োজনের কথা মনে করিয়ে দেন। একইভাবে পুঁজিবাদ যেমন মানুষের প্রয়োজনীয়তা মেটায়, নতুন নতুন প্রয়োজন তৈরিও করে। পুঁজিবাদে যেমন প্রোলেতারিয়েত শোষিত হয়, আবার তাদের কোনো রকমে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার প্রয়োজনটুকুও মেটায়। তাই দীপুর মতো পুঁজিবাদকে একেবারে অবজ্ঞা কিন্তু করা যায় না। এজন্যই হয়তো পুঁজিবাদ আজও টিকে আছে; দীপুরাও একদিন গ্যাস সিলিন্ডার কেনার মতো অবস্থায় যায়--আদর্শ, স্বপ্ন না হয় বিসর্জন গেলোই।

উপসংহার

মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রের শেষে কোনো একক সমাধানের সন্ধান না থাকায় দর্শকের ওপর সমাধান খুঁজে নেওয়ার ভার পড়ে যায়। এতে করে দর্শক যুক্ত হয় চলচ্চিত্রের সঙ্গে; দর্শক পরিণত হয় চলচ্চিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে।১৩ এই প্রক্রিয়ায় দর্শক তাদের ভাবনা বলয়ের আদলে নানামুখী সমাধানের কথা ভাবার সুযোগ পায়। চালচিত্র-এ মৃণালের জীবন-ভাবনা এবং সমাজকে প্রশ্ন করার প্রবণতা তার সৃষ্ট চরিত্র দীপুর মাধ্যমে যথার্থভাবে পর্দায় ফুটে উঠেছে।

চালচিত্র দেখে যদি প্রশ্ন জাগেদীপু কেনো হন্যে হয়ে ‘কেচ্ছা’ খুঁজছে? কেনো সে মধ্যবিত্ত হয়েও, মধ্যবিত্ত জীবনের হাসি-কান্না-পাওয়া-না পাওয়ার নানা দিককে অনাবৃত করছে উচ্চবিত্তের কাছে? এর কারণ হয়তো অনেকে বলবে, উচ্চবিত্তদের কাছে এই ‘কেচ্ছা’ পরিবেশন তাকে দিবে পত্রিকায় চাকরি। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, পত্রিকা তথা গণমাধ্যমও যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শোষণের অন্যতম হাতিয়ার। গণমাধ্যমের এই শোষণ কিন্তু বেঁধে রেখে নির্যাতন করার মতো নয়, বরং সামনের জনকে এমনভাবে প্রলুব্ধ করা, যাতে সে নিজেই নিজেকে ও আরো ১০ জনকে বেঁধে রাখে। এটাও কি শোষক শ্রেণির সমাজে শ্রেণি ব্যবধান টিকিয়ে রাখার অন্যতম কৌশল নয়? গণমাধ্যমের প্রকৃত দায়িত্ব আসলে কি এই?

    আরো প্রশ্ন জাগেদীপুর এই ‘কেচ্ছা’ না পাওয়ার হতাশা তাকে আসলে কোন শ্রেণিভুক্ত করে? মধ্যবিত্ত হিসেবে শেওলা পরিষ্কার অভিযানকে শুধুই পরিষ্কার অভিযান হিসেবে দেখলে দীপুর তো ‘কিছুদিনের জন্য নিশ্চিন্ত’ হওয়া উচিত। কিন্তু ‘শোষক শ্রেণি’র মতো চিন্তা করলে দীপুর হতাশার কারণ হলোএই পরিষ্কার অভিযানকে তিনি ‘পাবলিক খাওয়ার মতো’ চটুল একটা সংবাদ হিসেবে দেখেছিলেন। পরিষ্কার হয়ে যাওয়া মাত্রই দীপু তার চটুল সংবাদটি হারিয়ে যাওয়ায় হতাশ হন। পুঁজিবাদী চিন্তাধারায় দীপু যেনো দেখতেই পান না, উচ্চবিত্তের বড়ো বড়ো ‘ধাপ্পাবাজি’র জন্যই হয়তো শিবপ্রসাদদের এই দুর্দশাগণমাধ্যম তা কতোটা তুলে ধরে? তবে গণমাধ্যম ‘ধাপ্পাবাজি’র গল্প বলতে না পারলেও ঠিকই কোনো এক ‘সোমবারের ফিচার’ স্টোরি হিসেবে শিবপ্রসাদদের কাহিনি বিক্রি করে দেয়; কারণ সহানুভূতির বাজারে সেটা ভালো কেনাবেচা হয়।

 

লেখক : শাওলিন শাওন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী।

shaolinshaon1213@gmail.com

 

 

তথ্যসূত্র

১.Geiger, J. (2005: 1031); Film Analysis: A Norton Reader; W. W. Norton & Company Inc., Inc. Editor: R. L. Rutsky. https://books.wwnorton.com/books/webad.aspx?id=4294978498

২. প্রাগুক্ত; Geiger(2005: 1032).

৩. প্রাগুক্ত; Geiger(2005: 1033).

৪.Bosu, H. (2008); Seminar on ‘বাংলা সাহিত্যে নামকরণ’; Holy Cross Girls High School, Dhaka.

৫. https://youtu.be/5zan3y4x5Uk; retrieved on: 05.02.2019 

৬. Mukherjee, C. (2010); Mrinal Sen movies and Kolkata-Kolkata in Mrinal Sen movies.

7. https://www.bbc.com/bengali/news-46714823; retrieved on: 10.02.2019 

8. https://youtu.be/5zan3y4x5Uk; retrieved on: 05.02.2019 

9.https://www.newsg24.com/culture/film/1373/; retrieved on: 12.02.2019

10.https://www.prothomalo.com/entertainment/article/1200426/; retrieved on: 20.02.2019  

11.https://www.prothomalo.com/entertainment/article/1200426/; retrieved on: 20.02.2019

12.https://youtu.be/5zan3y4x5Uk; retrieved on: 05.02.2019

13.https://www.prothomalo.com/entertainment/article/1200426/; retrieved on: 20.02.2019


(বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজকি লণ্ঠন ১৭তম সংখ্যা , জুলাই ২০১৯ প্রথম প্রকাশ হয়ছে।)  


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন