প্রদীপ দাস
প্রকাশিত ০৫ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
আমার ভুবন : সম্পর্ক সৌন্দর্যের নিম্নবর্গীয় আখ্যান
প্রদীপ দাস

যেখানে সত্য-বাস্তব এবং চলচ্চিত্র একাকার
গল্পটা সত্য। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার রাজাবাড়ি গ্রামে বাড়ি হাকিমের। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে হাকিমের বড়ো কেবল লালু। ছুতু মিয়ার এই চার ছেলের সুনাম ছিলো এলাকায়। সমবয়সি অন্য ছেলেদের একটা অংশ যখন বিড়ি ফুঁকাতো আর জুয়া খেলতো, মাস্তানি করে বেড়াতো, ছ্যাঁচড়া চুরিচামারি করতো, নারীদের উত্যক্ত করতো; তখন ছুতু মিয়ার মাদ্রাসা পড়ুয়া ছোটো ছেলে সুরুজ বাদে তিন জনই কীভাবে দু’পয়সা আয় করা যায়, সেই চেষ্টায় মাঠেঘাটে দিনরাত খেটে মরতো। এভাবে কয়েক বছরের মাথায়, একদিন কাজ না করলে চুলা জ্বলবে না, এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে তারা।
রাস্তার পাশে অল্প যে জায়গায় তাদের বাস, এর পশ্চিম দিকের ঘরটা ছিলো হাকিমের। খুব সম্ভবত ২০০০ খ্রিস্টাব্দের অল্প আগে বিয়ে করেছিলেন হাকিম। বিয়েতে তেমন আয়োজন ছিলো না। তবে বিয়ের তিন থেকে চার মাস পেরিয়ে গেলেও--নতুন বউয়েরা যে রূপ নেয়--সেটা দেখা গিয়েছিলো বউয়ের বিকেল বেলা উঠান ঝাড়ু দেওয়া, পাশের বাড়ির কেউ আসলে পিঁড়ি টেনে বসতে দেওয়া, ছোটো দেবরের সঙ্গে দুষ্টুমি করে কথা বলার মধ্যে।
হাকিমের বউয়ের আগে একবার বিয়ে হয়েছিলো। খুব বেশিদিন সেখানে ঘর করা হয়নি তার। অবশ্য হাকিম আগে বিয়ে করেননি, তাহলে কেনো এমন একটি মেয়েকে তিনি বিয়ে করলেনএই বাস্তবতায় স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের পুরুষালি ভাবনা মনে মনে খেলা করতো অনেকের। অবশ্য হাকিমকে জিজ্ঞাসা করে, সেই উত্তর কখনো কেউ নেয়নি।
ওই সময় নিম্নবিত্ত মুসলমান পরিবারের মধ্যে খুব বেশি যৌতুক নেওয়ার প্রচলন ছিলো না। ১০-২০ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো যৌতুকের টাকা। হাকিম খুব বেশি যৌতুক নিয়েছিলেন, এমনটাও শোনা যায়নি। বউকে হাকিম পিশাচের মতো অসংখ্যবার পিটিয়েছেন, সেটা দেখেছেও পাড়া-প্রতিবেশী। তবে এই পেটানোর কারণ আগের ঘর-সংসার, এমনটা কখনোই শোনা যায়নি। তাদের সংসারে তিন মেয়ে আসে। একেবারেই অল্প বয়সে দুই মেয়ের বিয়েও দিয়ে দেন হাকিম। সবমিলিয়ে গ্রামের আর দশ জনের মতো চলছিলো হাকিম ও তার বউয়ের জীবন-সংসার।
এই বাস্তবতায় নিম্নবর্গের মানুষগুলোকে কিন্তু কখনো দাবি করতে দেখা যায় না, তারা সম্পর্কে উদার, শরীর তাদের কাছে মুখ্য নয়। বরং মূলধারায় এমনটাই প্রতিষ্ঠিত যে, নিম্নবিত্তের কাছে নারী শরীরের ‘সতীত্বই’ সব। শরীরে কারো হাত পড়লে বা ‘নাপাক’ হলে পুরুষালি মন নারী শরীরকে পিটিয়ে, টেনেহিঁচড়ে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেয়। হাজার বছর ধরে অন্য লোকের সঙ্গে হেসে কথা বলায় ‘আবুলের বউ’ পেটানোর মতো অনেকটা। এর বাইরেও যে শরীরী শুদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে গ্রামীণ নিম্নবিত্ত নারী-পুরুষ জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায়, সেই চিন্তাকাঠামো কই? নিম্নবিত্ত নারী-পুরুষের শরীরী শুদ্ধতা নিয়ে মূলধারায় যেনো চলে শ্রেষ্ঠত্ব-নিকৃষ্ট নির্মাণের লড়াই।
নিম্নবিত্তের মন শরীরী শুদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠেও যে মানবিক জীবন গড়ে, সে চিন্তাকাঠামো মিহি সুরে হলেও সমাজে রয়ে গেছে। এই চিন্তা-চেতনা ধারণ করতেন, তেমন একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা সদ্যপ্রয়াত মৃণাল সেন। উচ্চ ও মধ্যবিত্তের লোভনীয় নারী-পুরুষের শরীর উপস্থাপনের বাইরে কামজাগ্রতহীন শরীর ও আবহে সেই মিহি গল্পটি তিনি হাজির করেছেন আমার ভুবন চলচ্চিত্রে। উচ্চ ও মধ্যবিত্তের বাইরেও নিম্নবিত্তের নারী-পুরুষের সম্পর্কেরও যে নানা মাত্রা থাকে, টানাপড়েন থাকে, নিজস্বতা থাকে, সবমিলিয়ে সম্পর্কের সৌন্দর্য থাকে, তা হাজির আমার ভুবন-এ।
মূল চিত্রপট
নূর আলী ছিলেন অতি দরিদ্র এক কাঠমিস্ত্রী। বড়োভাইয়ের ঘরে মানুষ তিনি। জানাশোনা মেয়ে সখিনার সঙ্গে তাকে বিয়ে দেন বড়োভাই। তাদের বিচ্ছেদও আবার ওই বড়োভাই-ই ঘটিয়ে দেন। বছর যেতে না যেতেই সত্যি-মিথ্যে মিলিয়ে নালিশ তৈরি হয়, পঞ্চায়েত বসে। কনের বাড়ি, বরের বাড়ি থেকে যা কিছু এসেছে-গেছে, হিসাব হয়। ভাগাভাগি হয়; তালাকনামা হয়; বিচ্ছেদ হয়। আবার বছরখানেকের মধ্যে বিয়েও হয় ওই দুজনেরই। আবারও বড়োভাইয়ের ইচ্ছায় নূরের বিয়ে হয়। আর নূরের খালাতো ভাই মেহের, যিনি বাড়ি বাড়ি জন খাটেন, এটা-ওটা করেন, তার আছে কেবল এক চিলতে ধানি জমি। সেই মেহের ভালোবেসে বিয়ে করেন সখিনাকে।
নূর দ্বিতীয় বিয়ের পর পরই আরব দেশে চলে যান। কয়েক বছর পর যখন তিনি ফেরেন, তখন তার অনেক টাকাপয়সা। তবে তাদের কোনো সন্তান নেই। আর তিন সন্তান ও স্বামী মেহেরকে নিয়ে সখিনার ছোট্ট সংসার। আর্থিক অনটন তাদের নিত্যসঙ্গী। তবে স্বাভাবিক জীবনযাপনের চেয়ে আর্থিক অনটন কখনোই বড়ো হয়ে ওঠে না সখিনা-মেহেরের সংসারে। সংসারে ভালোবাসায় খাদ না থাকা সত্ত্বেও সময়ে সময়ে মনের অজান্তেই সখিনা-নূরের মন খুঁজে-ফেরে একে অন্যকে। কাছে পাওয়ার আকাক্সক্ষাও তাদের মধ্যে রয়ে যায়। এসব অনুধাবন করতে পারলেও সখিনা ও তার তিন সন্তান এবং খালাতো ভাই নূর ও ভাবিকে নিয়ে সামাজিক জীবনযাপনে কোনো আপত্তি থাকে না মেহেরের। মোটাদাগে এটুকুই আমার ভুবন।
প্রান্তিকতার রাজনীতি
আমার ভুবন-এ যে নূর, মেহের, সখিনাসহ অন্যদের গল্প বলা হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই অজোপাড়া গাঁয়ের, মানে ভারতের প্রান্তিক চরিত্র। অন্যদের তুলনায় তাদের প্রান্তিকতার মাত্রা আরো বাড়তি, কারণ একে তারা গ্রামীণ, দ্বিতীয়ত নিম্নবিত্ত এবং মুসলিম। তাই তাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রাটাও ওই রাষ্ট্রে একটু বেশি। কারণ সব রাষ্ট্রেই এই সংখ্যালঘু শ্রেণিকে নিয়ে চলে ‘সমর্থন রাজনীতি’র খেলা। ভারত রাষ্ট্রে কোনো রাজনৈতিক পক্ষ সংখ্যালঘু ‘ভুখা-নাঙ্গা’, ‘উটকো ঝামেলা‘ মুসলিমকে হটানোর কথা বলে বা নির্যাতনের মাধ্যমে সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় করে নেয়। অন্যপক্ষ সংখ্যালঘুদের পক্ষ নিয়ে ভালো সাজার ‘ভান’ করে, সুশীল সমাজ ও রাষ্ট্রের সংখ্যালঘুদের সমর্থন আদায়ে মত্ত থাকে। সবমিলিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে থাকা নূর, মেহের, সখিনাদের ওপর নির্যাতন আর কমে না।
এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের খড়গ উপেক্ষা করে সমর্থন আদায়ের রাজনীতির বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে নূর-মেহের-সখিনাদের শক্তির কথা, তাদের সৌন্দর্যের কথা, তাদের মুক্তির কথা কেউ বলতে গেলে, তিনিও হয়ে পড়েন তাদের মতোই প্রান্তিক। তার ওপরও চলে আসে নির্যাতন।
‘কথক প্রান্তিকের’ ওপর নির্যাতন নেমে আসার গল্প বলার আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হিন্দু মুসলমান’ শিরোনামে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে (৭ আষাঢ়, ১৩২৯ বঙ্গাব্দ) লেখা একটি প্রবন্ধের ওপর আলোকপাত করা যাক। কালিদাস নাগকে (গ্রেটার ইন্ডিয়া, ডিসকোভারি অব এশিয়া, টলস্টয় অ্যান্ড গান্ধী বইয়ের লেখক কালিদাস) লেখা ওই প্রবন্ধে রবী ঠাকুর বলেছিলেন, ‘হিন্দু-মুসলমানের মিলন যুগপরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু এ কথা শুনে ভয় পাবার কারণ নেই; কারণ অন্য দেশে মানুষ সাধনার দ্বারা যুগপরিবর্তন ঘটিয়েছে, গুটির যুগ থেকে ডানা মেলার যুগে বেরিয়ে এসেছে।’১ ইউরোপ ডানা মেলা বা আধুনিক যুগে পৌঁছেছে বলে প্রবন্ধে দাবি করেছেন রবী ঠাকুর। পাঠকই বিবেচনা করে নেবে, গুটি যুগ থেকে কতোটা বেরোতে পেরেছে ইউরোপ।
ভারতবর্ষের হিন্দু-মুসলমান সাধনা ও জ্ঞান চর্চার মধ্য দিয়ে গুটি থেকে ডানা মেলার যুগে বেরিয়ে আসবে--এমন স্বপ্নের কথা রবী ঠাকুর যে বছর লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তার পরের বছর ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম নেন মৃণাল সেন। মানুষটিকে হয়তো হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বের জেরেই স্বদেশত্যাগী হয়ে হিন্দু অধ্যুষিত রাষ্ট্র ভারতে থিতু হতে হয়েছিলো। রবী ঠাকুরের এমন স্বপ্নের প্রায় আট দশক পরে ভারতে মৃণাল আমার ভুবন-এ মুসলিম পরিবারের গল্প বলার কারণে শুটিং শুরুর ১৫ দিন আগে চলচ্চিত্রের অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় প্রযোজক প্রতিষ্ঠান।২ ২০০২ খ্রিস্টাব্দে গুজরাট দাঙ্গার পরের ঘটনা এটি। এবার কি স্পষ্ট নয়, সাধনা করে কারা; হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অন্তরায় কারা; ভারত রাষ্ট্র কিংবা অন্যান্য রাষ্ট্র কতোটা অগ্রসর?
বিষয়টা আরো পরিষ্কার করতে জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডের ‘ভগ্নাংশের সমর্থনে: দাঙ্গা নিয়ে কী লেখা যায়?’ শিরোনামে লেখা প্রবন্ধের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। তাতে বলা আছে, “‘বিবিধের মাঝে মিলন’ আজকের এই রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের শ্লোগান নয়। বরং শাসক শ্রেণী ছাড়া অন্য যে-কোনও সংখ্যালঘুর পরিচয়--যা ভিন্ন, ক্ষুদ্র, আঞ্চলিক, স্থানীয়--বস্তুত, সব রকমের প্রভেদই রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপজ্জনক, বিজাতীয়।”৩ বিবিধের মাঝে মিলনই হয়তো হিন্দু-মুসলিম, খ্রিস্টান-বৌদ্ধ কিংবা অন্য কোনো সাম্প্রদায়িক যুগপরিবর্তন ঘটাবে। আমার ভুবন-এ মৃণাল বিবিধের মাঝে মিলনের কথা বলতেই হয়তো মুসলিম পরিবারকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় থাকা প্রযোজকের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও সুবিধাভোগীরা এবং রাষ্ট্রীয় রাজনীতিকদের পক্ষ-বিপক্ষ নূর-সখিনা-মেহেরদের বিজাতীয় বা বিপজ্জনক হিসেবেই দেখতে চায়। মৃণালরা এর বাইরে গেলে তাদের চলচ্চিত্রের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যায়।
রবী ঠাকুর, মৃণাল সেন, জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডেদের এমন স্বপ্নের ফসল কী? ফল হয়তো নন্দিতা দাস। অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় আমার ভুবন-এ বিনে পয়সায় মৃণাল সেন তাকে অভিনয়ের জন্য বললে তিনি পিছু হটেন না। তার ফসল হয়তো আমার ভুবন। মৃণালের মৃত্যুর পরও চলচ্চিত্রটি মৃণালের কিংবা তার পূর্বসূরিদের জ্যোতি ছড়াবে। ধর্ম, রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবারের ঊর্ধ্বে উঠে বলবে ভালোবাসার গল্প। এর ফসল হয়তো লেখার এই প্রয়াস, চারপাশে বিরাজিত রবী-মৃণাল-জ্ঞানেন্দ্র-নন্দিতা, আমার ভুবন-এর মতো ব্যক্তি, বস্তুরা।
কে মেহের, কে সখিনা আর কে নূর
সখিনাকে বিয়ের আগে বাপ-মা, ভাইবোন, পরিবারহীন মেহেরের ছিলো কেবল বসতভিটা আর এক চিলতে ধানি জমি। ছিলো খালাতো ভাই নূরের পরিবারের লোকজন। খেলেও কেউ জানতে চাইতো না, সে খেয়েছে কি না; না খেলেও কেউ খোঁজ নেওয়ার ছিলো না। দুঃখ-সুখ, আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করারও ছিলো না কেউ। একাকী এক নিশাচরের জীবন মেহেরের। সখিনাকে যখন তিনি ভালোবাসার মানুষ হিসেবে পেয়ে যান, তখন মেহেরের জীবনের যে অপূর্ণতা, তা যেনো চিরতরে ঘুচে যায়। সখিনার বিয়ে হয়েছে কি না, তার ‘সতীত্ব’ আছে কি না, এসব মলিন হয়ে ধরা দেয় মেহেরের জীবনে। তার কাছে উজ্জ্বল হয় সখিনার ভালোবাসা। তাদের ঘরে আসে তিন সন্তান। আর্থিক অনটন থাকলেও স্ত্রী, সন্তান আর পড়শিদের নিয়ে পরিপূর্ণ জীবনযাপন করেন মেহের। তাই হয়তো হতাশা, বিষণ্নতা, অস্থিরতা স্থান করে নেওয়ার পরিবর্তে অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও সামাজিক মেহের।
এই সমাজে সখিনাদের তো জন্ম নেওয়াটাই বড়ো ‘অপরাধ‘। জীবনসঙ্গী কে হবে, কে হবে না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের দেওয়া হয়নি। এ রকম সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে নূরের বড়োভাইয়ের ইচ্ছাতে যখন সখিনা-নূরের সম্পর্ক ভেঙে যায়, তখন তো এ সমাজে সখিনার টিকে থাকাই দায় হয়ে দাঁড়ায়। একে তো সখিনা ‘সতীত্ব’ খুইয়েছেন, দ্বিতীয়ত সংসার করার ‘ক্ষমতা নেই’ বলে প্রমাণিত হয়েছেযে ‘যোগ্যতা’র বলে নারীরা সংসার করে, তার মুখ্য দুটো গুণ হারানো সখিনার এ সমাজে আর মূল্য থাকে কী! এ রকম ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে মেহেরের ভালোবাসার নিখাদ আহ্বান পেয়ে সখিনাও যেনো তার অস্তিত্বের সন্ধান পান। তবে মেহের ভালোবাসার মানুষকে সম্মান দিতে জানেন, কোনো বড়োভাইয়ের ইচ্ছার কাছে নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দেন না। তাইতো সখিনাও ভালোবেসে ঘর বাঁধতে দ্বিধা করেন না চাল-চুলোহীন মেহেরের সঙ্গে।
মেহের আর নূরের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, মেহের নিজের ভালোবাসা, ইচ্ছা, পছন্দকে মূল্যায়ন করেছেন, আর নূর সেটা পারেননি। তাইতো বড়োভাইয়ের ইচ্ছাতেই সখিনাকে বিয়ে করেছেন আবার ছেড়েও দিয়েছেন। বড়োভাইয়ের ইচ্ছাতে আবার বিয়ে করেছেন। নূর যখন আরব দেশে পাড়ি জমান, তখন সেই বড়োভাই আছেন কি নাই, তা চলচ্চিত্র দেখে জানা যায় না। আরব দেশ থেকে টাকাপয়সা করে যখন দেশে ফেরেন নূর, তখনও বড়োভাই নেই, এটা চলচ্চিত্র থেকে স্পষ্ট। বড়োভাই না থাকার সময় নূরের চারিত্রিক যে বৈশিষ্ট্য, তা থেকে এটুকু পরিষ্কার হয় যে, কেবল টাকাপয়সার প্রতি লোভ বা মোহ থেকেই নূর আরব দেশে যাননি। বিদেশ থেকে আনা টাকাপয়সা তিনি এ-কাজে ও-কাজে খাটান ঠিকই, মানুষের বিপদে-আপদে স্বার্থের বাইরে গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াবেন না--এমন আচরণও তার মধ্যে দেখা যায় না। বরং বিপদে পড়লে মেহেরের পাশেও দাঁড়াতে দেখা যায় নূরকে।
মানুষের পাশে, ভালোবাসার পাশে দাঁড়ানোর এই যে মানসিকতা নূরের, এটা কিন্তু বড়োভাই বর্তমান থাকা অবস্থার চিত্র নয়। অর্থাৎ নূরের ভিতরকার যে রূপ তা প্রকাশ পায়, বড়োভাই গত হওয়ার পর। আর ততোদিনে নূর হারিয়েছেন সখিনাকে। এরই বর্ধিতাংশ নিচের অংশে তুলে ধরার প্রয়াস থাকছে।
বড়োভাই বনাম শূন্যতা
বড়োভাইয়ের ইচ্ছাতে জানাশোনা মেয়ে সখিনার সঙ্গে নূরের বিয়ে হওয়ার সময় তাদের দুজনের অমত ছিলো কি না, তা জানা যায় না। তবে বিয়ে পরবর্তী জীবনে নূর-সখিনা যে একে অন্যকে গভীরভাবে আপন করে নিয়েছিলো, সেই ধারণা চলচ্চিত্র থেকে পাওয়া যায়। বাংলার সমাজ বা পৃথিবীর বুকে এমন অনেক সম্পর্ক দেখা যায়, যেখানে হালকা জানাশোনা বা অপরিচিত দুজনের পরিবারের ইচ্ছায় বিয়ের পর তারা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় নিজেদের পরমাত্মীয় করে নেয়।
কাউকে পরমাত্মীয় করতে হলে আপন আত্মার প্রত্যাশা রাখতে হয়। কারণ ১০ জনের সঙ্গে মিলেমিশে থাকলেও প্রতিটি আত্মাই স্বতন্ত্র থাকে। স্বাতন্ত্র্যের জায়গা থেকে স্বতন্ত্র কিছু চাওয়া-পাওয়া-প্রত্যাশাও থাকে। আমার ভুবন-এর পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, নূরের সেই স্বাতন্ত্র্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন বা করেছেন তার বড়োভাই। বড়োভাই হয়তো তার জায়গা থেকে, তার মতো করে নূরের ‘ভালো’ চেয়েছেন। কিন্তু বড়োভাইয়ের চেয়ে নূর অগ্রবর্তী সময়ের মানুষ। আর ছোটোভাইয়ের চাওয়া-পাওয়া, পছন্দ মেনে নেওয়ার মানসিকতা বড়োভাইয়ের না থাকায় হয়তো এ সমস্যার জন্ম নিয়েছে। মোদ্দাকথা, আমার ভুবন-এ বড়োভাই পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজের প্রতিচ্ছবি। এটা তো গেলো নূর-সখিনা বিচ্ছেদে বড়োভাইয়ের হাত থাকার বিষয়।
অন্যদিকে বড়োভাইয়ের ইচ্ছাই কি সব; নূর ও সখিনার ইচ্ছা বলে কিছু নেই? এর দায় সখিনা ও নূর কতোটা এড়াতে পারেন? সখিনার যে সমাজে বাস, সেই সমাজে নারীরা অরক্ষিত, অনিরাপদ। স্বামীর মধ্যে তারা নিরাপত্তা খুঁজে পায়। তাই নূরকে ছেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিতান্ত কিছু ভুলত্রুটি ছাড়া মুখ্য ভূমিকা সখিনার থাকার কথা নয়। চলচ্চিত্রেও তেমন কোনো ইঙ্গিত মেলে না। তাহলে নূর কতোটা এর দায় এড়াতে পারেন? প্রশ্নটির উত্তর সন্ধানে ভূপেন হাজারিকার গাওয়া ‘আমি এক যাযাবর’ গানের কিছু কথা তুলে ধরা যেতে পারে।
আমি গঙ্গার থেকে মিসিসিপি হয়ে ভলগার রূপ দেখেছি/ অটোয়ার থেকে অস্ট্রিয়া হয়ে প্যারিসের ধূলো মেখেছি/ আমি ইলোরার থেকে রঙ নিয়ে দূরে শিকাগো শহরে দিয়েছি/ গালিবের শের তাশখন্দের মিনারে বসে শুনেছি/ বহু যাযাবর লক্ষ্যবিহীন, আমার রয়েছে পণ/ রঙের খনি যেখানে দেখেছি, রাঙিয়ে নিয়েছি মন/ আমি দেখেছি অনেক গগণচুম্বী অট্টালিকার সারি/ তার ছায়াতেই দেখেছি অনেক গৃহহীন নরনারী/ আমি দেখেছি অনেক গোলাপ-বকুল, ফুটে আছে থরে থরে/ আবার দেখেছি না ফোটা ফুলের কলিরা, ঝরে গেছে অনাদরে/ প্রেমহীন ভালোবাসা দেশে দেশে, ভেঙেছে সুখের ঘর।
বড়োভাই বা পুরুষ প্রাধান্যশীলতাকে ভেদ করতে হলে ‘রঙের’ প্রয়োজন হয়। নূর বোধহয় ওই সময়টাতে ‘রঙের খনি’ থেকে ‘মন রাঙিয়ে’ নিতে তখনো পারেননি। তাইতো আরব দেশ থেকে নূর যখন টাকার পাশাপাশি মনও রাঙিয়ে নিয়ে আসেন, তখন তার আপন ভুবন নির্মাণে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। নিজের মতো করে বাড়িঘর সাজিয়েছেন, আর দশজনকে নিয়ে খেয়েছেন নূর। রক্তচোষা রহমত আলীর বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন নূর, করেছেন প্রতিবাদও। কিন্তু মন রাঙার আগে বড়োভাইকে ভেদ করে তিনি প্রিয়তমা বা পরমাত্মীয়কে ধরে রাখতে পারেননি।
মনকে রাঙাতে যে কেবল আরব দেশ বা ভিন দেশেই যেতে হয়, তা তো নয়; কিংবা বই-পুস্তক, টেলিভিশন-সিনেমা-রেডিও দেখাশোনা ছাড়াও যে মন রাঙে না, তাও নয়। পাখির ডাকেও মন রাঙে, পাতার নড়াচড়া, ঝরাতেও মন রাঙে। পোকার চলা দেখাতে, গল্পগুজবে, পড়শির ঝগড়াতেও রাঙে, বিকশিত হয়। গাছের স্থবির দাঁড়িয়ে থাকা, নদীর পাড় ভাঙাতেও মন রাঙে। মেহের আর সখিনার হয়তো সেভাবেই রেঙেছিলো। তাইতো পাওনাদার রহমত আলীর সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলা থেকে রেহাই পেতে নূরের মতো মেহের আরব দেশে পাড়ি জমাতে চাইলে সখিনার রাঙা-মন তাতে সায় দেয় না। পরমাত্মীয়ের সান্নিধ্য অবিরাম চলতে হলে বোধ হয় এই সক্ষমতাটুকু থাকতে হয়।
জীবনে রঙের খেলায় মেহের যতোটা পূর্ণ, নূর ততোটাই অপূর্ণ। আর নূরকে হারালেও ভালোবাসার মানুষ হিসেবে মেহেরকে পেয়েছেন সখিনা। তাছাড়া নূরকে হারানোর ক্ষেত্রে সখিনার কোনো হাত ছিলো না। এর দায় হিসেবে নিজের প্রতি ঘৃণা বা দোষারোপ জন্ম নেয়নি সখিনার মনে। যে ঘৃণা, ব্যর্থতা বা দোষারোপ হয়তো জন্ম নেয় নূরের মনে। তার পরও তো নূরের মতো কিছু একটা হারিয়েছেন সখিনা। তাই হয়তো ক্ষণে ক্ষণে নূরের কথা মনে পড়ে সখিনার, সখিনাকে মনে পড়ে নূরের। নিজের অজান্তেই তারা একে অন্যকে খুঁজে বেড়ান। সময়ের বিবর্তনে ‘পূরণ হয়ে যাওয়া’ বাস্তবতায়ও তারা অনুভব করে ‘বিচ্ছিন্নতার বেদন’। তাই হয়তো কবি রুদ্র গোস্বামী বলেন,
মুক্তি নিবি? (যে মুক্তি তাদের ঝুলিতে জোর করে ঢুকানো হলেও তারা রোধ করতে পারেননি)
চল তোকে আজ মুক্তি দিলাম!
একা একা তুই যখনই দেখবি আকাশ
দেখবি মেয়ে (ছেলে) আমিই তোর আকাশ
ছিলাম,
আকাশ ছিলাম।
আমার ভুবন-এর সৌন্দর্য
আমার ভুবন-এর শুরুতেই গ্রামের রাস্তা দিয়ে শব্দ করে মোটরসাইকেল চালিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন নূর। আর রাস্তার ধারের পুকুরে মেহের ও তার বড়ো ছেলে সাজু কাজ করছিলো। মোটরসাইকেল চলতে দেখে উৎসুক সাজু বলে ওঠে ‘আরে বাস!’ উৎসুক মেহেরও হাসিমাখা বদনে বলেন, ‘নতুন কিনেছে, কলকাতা থেকে।’ সাজুর জিজ্ঞাসা, ‘কে গো আব্বা?’ আবারও একগাল হেসে মেহেরের উত্তর, ‘নূর ভাই।’
চলচ্চিত্রে এভাবে নূরের প্রথম পরিচয় মেলে মেহেরের কণ্ঠে। নূর আর মেহের খালাতো ভাই। একসময় এই নূরের স্ত্রী ছিলো সখিনা। সখিনা এখন মেহেরের স্ত্রী। এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে নূরের মোটরসাইকেল দেখে সাজুর উৎসুক চোখে-মুখে থাপ্পড় বসিয়ে দিতে পারতেন মেহের। নূর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করায় ছেলের মুখ তিনি চেপে ধরতে পারতেন। নূরের মোটরসাইকেলের দিকে না তাকিয়ে জোর করে পানির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারতেন মেহের। এসব না করে সাজুর উৎসাহকে স্বাগত জানিয়েছেন মেহের; ছেলের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। মেহের নিজেও নিষ্কলঙ্কভাবে উৎসুক ও হাসিমুখ নয়নে দেখেছেন নূরের মোটরসাইকেল চালিয়ে যাওয়া। তার চোখে-মুখে, অঙ্গভঙ্গিতে আনন্দ বিনে কোনো ক্লেদ, রাগ-ক্ষোভ, অপরাধবোধ, ঘৃণা কাজ করেনি।
গাঁয়ের লোকজন নূরকে দেখতে গেলে তাদের মধ্যে মেহেরও ছিলেন। মেহের ইতস্তত করে নিজেকে একটু গুটিয়ে রেখেছিলেন, ছিলেন একটু দূরে। সেদিন মেহেরকে অল্প দূর থেকে দেখে নূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। আরব দেশ থেকে ফেরার পর এটাই বোধ হয় তাদের প্রথম কথাবার্তা, চলচ্চিত্রেও প্রথম। মেহেরের ইতস্তত দূর করে দিয়ে ছেলে-মেয়ে, পরিবারের সবার কথা সরল প্রাণে জিজ্ঞাসা করতে থাকেন নূর। সহজসরল ভঙ্গিতে মেহেরও তাকে একদিন বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ জানান।
মেহের ঘরে ফিরে নূরকে বাড়িতে আসার আমন্ত্রণের কথা সখিনাকে জানান। এতে দুজনের মধ্যে ক্ষণিকের জন্য কথা কাটাকাটির জন্ম দিলেও দীর্ঘস্থায়ী কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। বরং বিষয়টা তাদের মধ্যে আরো বেশি স্বাভাবিক ও সহজ হয়ে যায়।
এরপর পেরিয়ে যায় এক বছর। মেহেরের আমন্ত্রণে মেহের-সখিনার বাড়িতে নূর ঘুরতে আসেননি। নূরের না আসার বিষয়টি মেহেরকে কথার ছলে একদিন বলেন সখিনা। তার বক্তব্য, ‘ও (নূর) আর আসবে না।’ কিন্তু মেহের যেনো ঠিকই এই কেমিস্ট্রিটা বোঝেন। উত্তরে সখিনাকে মেহের বলেন, ‘আসবে, আসবে, আসবে। দেখিস, ঠিক আসবে।’ এরপর হঠাৎ একদিন মেহেরের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসেন নূর। টুকটাক খোঁজখবর নিয়ে শুধু পানি খেয়ে সখিনার কাছ থেকে তিনি বিদায় নেন। যাওয়ার পথে রাস্তায় মেহেরের সঙ্গে দেখাও হয় নূরের। বাড়িতে আসায় সখিনা যে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েননি, তা কিন্তু নয়। তবে বিষয়টিকে অস্বাভাবিকভাবে নেন না মেহের।
পুরাতন জমিদার বাড়িতে এরপর সখিনার সঙ্গে নূরের হঠাৎ দেখা। গ্রামের মাতব্বরের সামনেই জমিদার বাড়ির ভাঙাচোরা ইট নিতে আসা সখিনাকে ইটের বোঝা মাথায় তুলে দিতে সাহায্য করেন নূর। একজন সাধারণ মানুষের জায়গা থেকেই হোক, আর ভালোবাসার জায়গা থেকেই হোক, সখিনার বাধা সত্ত্বেও নূর এই কাজ করেন। অন্যদিকে নূরের প্রতি যে সখিনার এমন অস্ফুট ভালোবাসা নেই, তা নয়। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ২২ মিনিটের মাথায় ট্রাঙ্কে রাখা নাকের নথটা পরতে বলেন মেহের। রাতের এই নির্জনতায় নথ পরা প্রিয়তমাকে মেহের দেখবেন। এই নথটা সখিনাকে দিয়েছিলেন নূর। তাদের বিচ্ছেদের সময় সবকিছু ভাগাভাগি হলেও এই নথটার কথা পঞ্চায়েতের কাছে নূর জানায়নি। সখিনাও বলেননি কাউকে, এমনকি মেহেরকেও না। তাই এটা সখিনার কাছেই থেকে যায়। মেহেরের সামনে নথটা সখিনা কখনো পরেছিলো কি না, জানা যায় না। তবে নূরের কথা মনে পড়লে সখিনা ট্রাঙ্ক খুলে নথটা দেখেন, পরেনও। ওইদিন সখিনাকে নথটা পরতে বললে তাতে বাধ সাধেন সখিনা। অনেক চেষ্টা করেও যখন মেহেরকে বোঝাতে পারেন না, তখন তিনি বাধ্য হয়েই নথটা পরেন। কিন্তু সর্বহারা হয়ে যাওয়ার মতো অঝোরে পানি আসতে থাকে সখিনার চোখে। এ দৃশ্য দেখে মেহের মন খারাপ করলেও জানতে পারেন না, সখিনার চোখের পানির মূল কারণ।
সখিনার সামনে মূল চ্যালেঞ্জটা আসে মেহেরকে তার পরিবারসহ নূর ও তার স্ত্রী দাওয়াত দিলে। কিন্তু নূরের বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাওয়ায় আপত্তি জানান সখিনা। ভাই-ভাবি দাওয়াত দিয়েছে, না গেলে তারা কী মনে করবে, এমনটা ভেবে মেহের কাকুতি-মিনতি করতে থাকলে সখিনা রাজি হন। অনুষ্ঠানের দিন দাওয়াত খেয়ে এলাকাবাসী চলে গেলে পরিকল্পনামতো সবার শেষে মেহের, দুই সন্তান ও সখিনা হাজির হন নূরের বাড়ি। সখিনার পুরো পরিবার এবং নূর ও তার স্ত্রী মুখোমুখি হলে শেষ হয় আমার ভুবন।
আচ্ছা, মানুষ কি তার অতীতকে ভুলতে পারে? হয়তো পারে না। তেমনই নূর ও সখিনাও তাদের অতীত সম্পর্কের কথা ভুলে যান না। মানুষ যেমন অন্য অতীতের সংস্পর্শ পেলে সেটা ক্ষণিকের কষ্ট দেয়, কখনো সুখও দেয়; সর্বোপরি সেটার যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করে। তেমনই নূর-সখিনাও যেনো মুখোমুখি হয়ে সুখ-দুঃখ অনুভবের পাশাপাশি অতীতের যত্নও নেন। সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতাকে সামনে রেখে কথাবার্তা বলেন, আচরণ করেন।
মেহেরের কাছ থেকে সখিনাকে কেড়ে নেওয়ার প্রবৃত্তি বা মনোভাব যেমন নূরের মধ্যে পাওয়া যায় না। তেমনই দরিদ্র মেহেরকে রেখে প্রতিপত্তিশালী নূরের কাছেও ফিরে আসার ইচ্ছা বা মনোবাঞ্ছাও সখিনার মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। এ নিয়ে অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয় না নূরের বর্তমান স্ত্রী ও মেহেরের মধ্যেও। শেষ দৃশ্যে সবাই একসঙ্গে হওয়ায় হয়তো নূর ও সখিনার আগের সম্পর্ক নিয়ে যে গুমোট আবহ ছিলো, সেটাও সহজ-স্বাভাবিক হয়। নূর ও তার স্ত্রী, সখিনা-মেহের ও তাদের সন্তান যেনো অতীতকে সঙ্গে নিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে একে অন্যে সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। গ্রামীণ ও প্রান্তিক সমাজে সম্পর্কের এই যে সৌন্দর্য, এটাই যেনো আমার ভুবন-এর প্রাণশক্তি।
সমাপ্তিতে শরীরী শুদ্ধতার সংহার
শান্ত মনে নির্মল প্রকৃতির দিকে তাকালে অনেক উপাদানের দেখা মেলে। গাছের কচি পাতা, মরা পাতা, সুবিশাল আকাশ, তাতে হালকা-ঘন মেঘের উড়াউড়ি; আবার নীলাকাশ। বিশুদ্ধ বায়ু, আবার কোনো মরে পচে যাওয়া পশু-পক্ষীর পচা দুর্গন্ধ; ছোটো বড়ো পাহাড়, টিলা, জলাশয়, মাঝির নৌকা চালানো, জেলের মাছ ধরা, সাপের ব্যাঙ ধরা, জানা-অজানা ছোটো-বড়ো পাখির উড়াউড়ি, কিচিরমিচির। এ রকম হাজারো উপাদানের মধ্যে দুই-একটা উপাদান কিছু সময় প্রকৃতির পানে তাকানো ব্যক্তির মনোযোগ আকর্ষণ করে, ভালো বা খারাপ লাগে। যেগুলো নিয়ে কখনো কখনো কিছু বলার থাকে বা ইচ্ছে করে।
আমার ভুবন-এও এ রকম অসংখ্য উপাদান রয়েছে। যার মধ্যে ভারতের সংখ্যালঘু নিম্নবিত্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানব-মানবীর সম্পর্ককে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তার মানে এই নয় যে, এমন সামাজিক সম্পর্ক নিম্নবিত্ত ছাড়া উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তে নেই। কোনো বিশেষ শ্রেণিকে উপরে তোলা কিংবা কোনো শ্রেণিকে নিচে নামানো নিশ্চয় এ চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্য নয়। সব শ্রেণিতেই এমন সুহৃদ সম্পর্কের হয়তো সন্ধান মিলবে। কিন্তু নিম্নবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও যে মানব-মানবীর এমন উদার সম্পর্ক থাকতে পারে, তা এ সমাজে প্রতিষ্ঠিত নয়।
কারণ মেহের-নূর-সখিনারা যে সমাজের প্রতিনিধি, সব রাষ্ট্রেই ওই শ্রেণির আগে ট্যাগ লাগানো থাকে ‘পিছিয়ে পড়া’, ‘গ্রামীণ’, ‘প্রান্তিক’, ‘অজ্ঞ’, ‘অশিক্ষিত’, ‘খেটে খাওয়া’, ‘দিন মজুর’সহ নানাধরনের বিশেষণ। এসব বিশেষণধারীদের ওপর সহজেই ‘তারা বউ পিটাতে পটু’, ‘একাধিক বিয়ে করে তারা’, ‘তারা পুরুষতান্ত্রিকতার বাইরে বেরোতে পারে না’, ‘নারীর শরীরই সব তাদের কাছে’ এই ধরনের বিশেষণগুলো সহজেই চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এমন ধারণাগুলো একচেটিয়াভাবে মেহের-নূর-সখিনাদের শ্রেণির মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ধারণা আমার ভুবন-এ ভেঙে দিয়েছেন মৃণাল।
লেখক : প্রদীপ দাস, অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কম-এর স্টাফ রিপোর্টার।
pradipru03@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100029026601444
তথ্যসূত্র
১. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (১৯২২ : ১৪৪); ‘হিন্দু মুসলমান’; কালান্তর; সম্পাদনা : অধ্যাপক মো. মফিজুল ইসলাম, আমাদের বাঙলা প্রেস, ৩২/১, আজিমপুর রোড, ঢাকা।
২. https://goo.gl/i6smMX; retrieved on: 20.04.2019
৩. পাণ্ডে, জ্ঞানেন্দ্র (২০০৪ : ২৫৯); ‘ভগ্নাংশের সমর্থনে: দাঙ্গা নিয়ে কী লেখা যায়?’ নিম্নবর্গের ইতিহাস; সম্পাদনা : গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ভারত।
(বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজকি লণ্ঠন ১৭তম সংখ্যা , জুলাই ২০১৯ প্রথম প্রকাশ হয়ছে।)
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন