শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত ০৩ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
আমজাদের ‘গোলাপী ট্রিলজি’
ইতিহাসের সময় পেরিয়ে সেলুলয়েডে সমকালীনকে ধরার চেষ্টা
শফিকুল ইসলাম

আমজাদ হোসেন পাঠ
২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ডিসেম্বর জীবনমঞ্চ ত্যাগ করেন চলচ্চিত্রনির্মাতা আমজাদ হোসেন। তার চলে যাওয়ার আগে-পরে তাকে নিয়ে নানা মাত্রায় নানা দিকে আলাপ-আলোচনা হয়েছে দেশীয় গণমাধ্যমে। সেই আলোচনা যতোটা তার ব্যক্তিজীবন নিয়ে, ততোটা মোটেও কর্ম অর্থাৎ চলচ্চিত্র নিয়ে হয়নি। তার অসুস্থতা, চিকিৎসার অবস্থা, চলে যাওয়া এবং একাধারে চলচ্চিত্রে তিনি কী কী ভূমিকা রেখেছেন—মূলত সেই গৎবাঁধা আলাপই ঘুরেফিরে এসেছে। এসব খবরাখবর দেখে মনে হয়েছে, নির্মাতা আমজাদ হোসেনকে জানতে হলে তার চলচ্চিত্র পাঠের বিকল্প নেই। সবগুলো সম্ভব না হলেও অন্তত কয়েকটির ভিতরে ঢুকে আমজাদকে পাঠ করা দরকার। তার বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শ্রেণিসংগ্রামসহ সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষের নানা সঙ্কট দেখা যায়। আর তিনি এসব সঙ্কটের মধ্য দিয়েই মূলত রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা চালিয়েছেন।
তার সেই সব চলচ্চিত্র তখনকার বাস্তবতাকে অতিক্রম করে বর্তমানকেও ছুঁয়ে যায়। সে হিসেবে তার প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রই কোনো না কোনোভাবে আলোচনার দাবি রাখে। তবে যতোদূর জানা যায়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তারই একটি ট্রিলজি (একটি একই রকম বিষয়ের ওপর ধারাবাহিক গল্পের তিনটি খণ্ড; যেগুলো একত্রে একটি কাজ কিংবা স্বতন্ত্রভাবে তিনটি কাজ) রয়েছে। তিনি ‘গোলাপী’ চরিত্রটি ধরে পর পর তিন সময়ে তিনটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন—১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে গোলাপী এখন ট্রেনে, ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে গোলাপী এখন ঢাকায় ও সর্বশেষ ২০১০-এ গোলাপী এখন বিলেতে। খালি চোখে দেখলে, তিনটি চলচ্চিত্রেই গোলাপীকে কেন্দ্র করে তিনটি সময়কে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে নারীকে যেমন শক্তিশালী ও সংগ্রামী দেখা যায়, তেমনই পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজালে আটকে থাকতেও দেখা যায়। তবে একটা বিষয় বলাই যায়, তিনি চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের নারীর অবস্থান সমাজ-রাষ্ট্রীক প্রেক্ষাপটে দেখতে চেয়েছেন। তাই হয়তো নারীকেন্দ্রিক একটি চরিত্রকে ধরে তার তিন চলচ্চিত্র। মূলত সেসব ধারণা থেকেই আমজাদ হোসেনের গোলাপী চরিত্রকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হবে এ প্রবন্ধে। সঙ্গে দেখার চেষ্টা থাকবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আমজাদ হোসেন পাঠের গুরুত্বও।
গোলাপী’র সরল পাঠ
গ্রামের আর দশটা পরিবারের মতো এক অসচ্ছল পরিবারের মেয়ে গোলাপী। বাবা কেবলই গান গেয়ে বেড়ান। গোলাপীর মায়ের ওপরই সংসারের দায়িত্ব। সেই পরিবারের মেয়ে গোলাপীর বিয়ে ঠিক হয়। গোলাপীদের মতো দরিদ্র পরিবারে আসলে নারীর পছন্দ-অপছন্দ বলে সেভাবে কিছু থাকে না। তাই গোলাপীর নিজের পছন্দ থাকলেও মত-পথের ঊর্ধ্বে গিয়ে যৌতুকের বিনিময়ে তাকে বিয়ের জন্য রাজি হতে হয়। কিন্তু বিয়েটা ভেঙে যায়। এজন্যে রাগে-ক্ষোভে গোলাপীর বাবা আত্মহত্যা করে আর মাও পাগলপ্রায় হয়ে যান। এ রকম পরিস্থিতিতে গোলাপী হয়ে যান সংসারের কর্তা। তাকে সংসার চালানোর জন্য নামতে হয় ব্যবসায়, শুরু হয় ট্রেনে ফেরি করা।
তবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের বাস্তবতায় একজন নারীর এ সিদ্ধান্ত নেওয়াটা মোটেও সহজ ছিলো না। একটা আধা-সামন্ত সমাজ-বাস্তবতায় মোড়লরা গোলাপীকে ‘গ্রামের মান-ইজ্জতের’ ধুয়া তুলে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করে। গোলাপী প্রথমে প্রতিবাদ করলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেন না; তার নতুন ঠিকানা হয় শহর। গোলাপী এখন ঢাকায়-তে একটু ভালোভাবে বাঁচার আশায় শহরে আসা গোলাপী শুরু করেন ভাতের হোটেল। কিন্তু বস্তিতে থাকা গোলাপীর এ ব্যবসায় নানারকম বাধা আসতে থাকে চারদিক থেকে। সেটা কখনো রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী, আবার কখনো রাজনীতিক, বুর্জোয়াদের দিক থেকে। কিন্তু গোলাপী অনড়, সংগ্রামী। তিনি বস্তিবাসীদের নিয়ে একরকম প্রতিরোধ-প্রতিবাদ করেই টিকে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনোভাবেই পেরে উঠতে পারেন না। তাই ষড়যন্ত্র করে অবৈধ অস্ত্র দিয়ে গোলাপীকে ফাঁসিয়ে জেলে নেওয়া হয়।
নাম গোলাপী এখন বিলেতে হলেও আগের দুটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে গল্পের পরম্পরার কিছুটা ব্যত্যয় ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু এখানেও ঘুরেফিরে একজন গোলাপীর জীবনের কথাই বলা হয়েছে। এতিম গোলাপীকে বিয়ের সময় যৌতুকের টাকা দিতে হয়। সেই টাকা পুরোটা না দিতে পারায় শ্বশুরবাড়িতে নানাধরনের অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে হয় গোলাপীকে। গোলাপী এবার তার স্বামীকে তালাক দিয়ে শ্বশুরবাড়ি ত্যাগ করেন। তবে ঘটনাক্রমে পুরুষ-নির্ভরহীন সেই গোলাপীই এক পুরুষের মাধ্যমে বিলেতে যান। এবার সেখানে তার কাজ এক মা হারা শিশুকে লালন-পালন করা। প্রবাসে একরকম চার দেয়ালে আটকে থাকা গোলাপী সহজেই সেখান থেকে বেরোতে পারেন না। তবে শেষমেষ সেই পুরুষের নির্ভরশীলতায় গোলাপী বাংলাদেশে আসেন। ততোদিনে গোলাপীর জীবন বার্ধক্যের দিকে ধাবমান।
‘আমরা হগলেই এক কেলাসের মানুষ’
বৃটিশ-পাকিস্তান মিলে এদেশের মানুষের ওপর দিয়ে একটা সুদীর্ঘ শোষণ চলেছে। তারা সেই শোষণ থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছে চূড়ান্তভাবে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে। সেই শোষণ মুক্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে ৭২-এর সংবিধানও রচিত হয়েছে এদেশে। সংবিধানের মূলনীতিতে তাই রাখা হয়েছিলো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। কিন্তু যে মুক্তির স্বপ্ন মানুষ দেখেছিলো, সেই অর্থনৈতিক মুক্তিটা আর মেলেনি। দীর্ঘদিনের সেই মুক্তির স্বপ্নটা যে পূরণ হয়নি, স্বাধীনতার অল্প কয়েক বছরেই তারা সেটা বুঝে যায়। ফলে যুদ্ধের আগে যে শোষণ ও সামন্তবাদ সমাজের ছাউনি ছিলো, তা দেশ স্বাধীনের পরও লক্ষ করা যায়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে একটা বিশাল সংখ্যক মানুষের এমন পরিস্থিতি হয়েছিলো--তারা না হতে পেরেছে ভূমি শ্রমিক, না হতে পেরেছে কারখানার শ্রমিক। আধা-সামন্তবাদ ও আধা-পুঁজিবাদের এই সময়ে রাষ্ট্র আসলে কোনো কাঠামোতেই দাঁড়াতে পারেনি। একটা হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতিতে, বিশাল সংখ্যক মানুষ আসলে সেভাবে নিজেদেরকে কোনো শ্রেণিতে ফেলতে পারেনি। ফলে তারা হয়েছে পরিচয়হীন/শেকড়হীন। সেই মানুষগুলোর এবং সেই সময়ের চলচ্চিত্রই গোলাপী এখন ট্রেনে। আর সে কারণেই নির্মাতা আমজাদ গোলাপীকে দিয়ে চলচ্চিত্রের শুরুতেই বলিয়ে নিয়েছেন ‘বাংলাদেশে কোনো কেলাস নাইক্যা গো, আমরা হগলেই এক কেলাসের মানুষ।’
এই ক্লাস বা শ্রেণি না থাকার বিষয়টি তখনো একটা বিশাল সংখ্যক মানুষ ধারণ করেছে। আর করবেই না কেনো, দেশ স্বাধীন তো কোনো একক শ্রেণি করেনি; সবাই একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামারই ফল স্বাধীনতা। সেখানে যেমন ছাত্র-শিক্ষক ছিলো, তেমনই ছিলো বিশাল সংখ্যক খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। যে শ্রেণিহীনতার চিন্তা মাথায় নিয়ে তারা যুদ্ধ করেছিলো, দেশ স্বাধীনের পরও বেশিরভাগেরই মাথায় শ্রেণিহীনতার বিষয়টিই ছিলো। আর সেটাই হয়তো গোলাপীর কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে চলচ্চিত্রে। অবশ্য এটা না ভেবেও কোনো উপায় ছিলো না তাদের। কেননা তারা কোনো শ্রেণির দিকেই আর যেতে পারেনি। কারণ পুঁজিনির্ভর সমাজের দিকে যাওয়ার জন্য অতো কলকারখানা ছিলো না। অন্যদিকে মোড়লদের হাতে ভূমির মালিকানা চলে যাওয়ায়, থাকতে পারেনি ভূমিতেও। তাই গোলাপীর মতো অনেককেই ভিটেবাড়ি ছাড়তে হয়, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায় ফেরি করতে হয়। কিন্তু তাদের মাথায় তখনো রয়ে গেছে দেশ স্বাধীনের মূলমন্ত্রের কথা; যে স্বাধীনতার মূলে ছিলো শোষণহীন এক সমাজের কথা।
তাই হয়তো চলচ্চিত্রে এই শ্রেণিহীন মানুষ আধা-সামন্তবাদ শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়ে একটা নতুন দিনের স্বপ্নের কথা বলতে চেয়েছে। এই মানুষগুলো একত্র হয়ে মোড়লদের আটকে রেখে বলেছে, ‘আমরা কাউকে মারতে চাই না, এই গ্রামে আমরা সক্কলে মিলে সুখে শান্তিতে থাকতে চাই।’ তারপরও তাদের ওপর অত্যাচার চললে এবং তাদের প্রতিনিধি মোড়লের ছেলে মিলনকে বিষপানে মেরে ফেললে; প্রতিশোধ হিসেবে এবার তারা মরণ কামড় দেয়, হত্যা করে কয়েকজন ভূস্বামীকে। এই যে একটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা, লড়া--এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; যা আমজাদ হোসেন বুঝতে পেরেছিলেন।
ট্রেন থেকে ঢাকায়, গোলাপীর সংগ্রাম চলছেই
বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর বাবা আত্মহত্যা করলে সংসারের প্রধান হয়ে ওঠেন গোলাপী। গোলাপীকে এজন্য গ্রামের আরেক নারী ময়নার সঙ্গে ট্রেনে ফেরি করার মতো কঠোর কাজে নামতে হয়। এ কাজে যতো না কষ্ট, তার চেয়ে বেশি সমস্যা কেউ এটাকে সমর্থন করে না। উল্টো প্রশ্ন তোলা হয় গ্রামের মান-ইজ্জত নিয়ে। এই রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গোলাপীর জীবন কাটছিলো। তবে ক্রমেই গ্রামের মোড়লরা গোলাপীদের ওপর আগ্রাসী হয়ে ওঠে। কেননা তাদের জীবনের যে গতি ট্রেন এনে দেয়, সেই গতি সহ্য হয় না গ্রামের মোড়লদের। তারা মনে করে, এই হয়তো হাতছাড়া হয়ে গেলো তাদের কর্তৃত্ব। তাই ট্রেনের গতিতে চলা গোলাপীদের বিরুদ্ধে উদ্ভট সিদ্ধান্ত দিয়ে গ্রাম ছাড়ানোর ফন্দি আটে তারা।
১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে এ ধরনের একটি সমাজে নারীর লড়াইয়ের কাহিনি তুলে ধরেছেন আমজাদ হোসেন। কিন্তু তার এই গল্প বর্তমানেও নানা মাত্রায় ছুঁয়ে যায়। হয়তো তা একেবারে গোলাপীর মতো নয়। কিন্তু গোলাপীদেরকে এখনো নানা নির্যাতন সহ্য করতে হয়। এখনো গ্রামীণ রাজনীতিতে সেই আধা-সামন্তবাদ আরো আধুনিক উপায়ে গেঁড়ে বসেছে। তারাই সেই অর্থে গ্রাম পরিচালনা করে, সব সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে। এজন্য হয়তো নারী ধর্ষণের শিকার হলে ওই নারীকেই তার দায়ভার নিতে হয়। কখনোবা তাকে নতুন করে শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হতে হয়।
২০১৭ খ্রিস্টাব্দে টাঙ্গাইলে এক নারী ধর্ষণের শিকার হলে গ্রাম্য সালিশে মাতব্বররা ওই নারীকেই অর্থ জরিমানা করে। সঙ্গে শারীরিক নির্যাতন তো ছিলোই।১ এ-তো গেলো একদিক। এ ধরনের আরো নানা চর্চা রয়েছে। বাংলাদেশে এক গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি পথে শতকরা ৮৮ ভাগ নারী নানারকম অপমানজনক কথার শিকার হন।২ শহরে এসে গোলাপীসহ অন্যদেরকেও নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হতে দেখা যায়। আসলে পথঘাটে, কর্মক্ষেত্রে নারীকে এ কথাগুলো বলে তারা বোঝাতে চায়, নারী চার দেয়ালেই থাকা ভালো, বাইরে নিরাপদ নয়। সেটা যে কারণেই নারী বাইরে বের হোক না কেনো। তবে নারী সবসময় এগুলো শুনে নীরব থাকে, এমন নয়। কখনো কখনো পরিস্থিতির শিকার হয়েই হোক, আর অন্য কারণেই হোক প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। গোলাপীও সেই প্রতিবাদ করেছেন। তার প্রতিবাদ নিজ গ্রাম, নিজ ভিটেমাটিতে থাকার জন্য। তবে শেষ পর্যন্ত তা টিকে না। গোলাপীকে বাধ্য হয়ে গ্রাম ছাড়তে হয়। তবে গোলাপী থামেননি; ট্রেনের গতির মতোই তার গতিকে ত্বরান্বিত করেছেন; ট্রেন ধরে শহরে পাড়ি দিয়েছেন। সেই গতিময় ও অচেনা শহরে নতুন জীবন শুরু করেন গোলাপী। সেই জীবনে যদিও তাকে গ্রামের মোড়লের মুখোমুখি হতে হয় না। কিন্তু নতুন এ জীবনও সহজ হয় না। ভাতের হোটেল দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানো গোলাপীকে নতুন সব সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যে বস্তিতে থাকেন, তা নিয়েই শুরু হয় ষড়যন্ত্র। মোড়লের জায়গা নেয় শহুরে ‘মোড়ল’, এলিট, রাজনীতিকরা।
বহুকাল ধরেই নিরুপায় গোলাপীরা একটু বাঁচার জন্য শহরের দিকে ধাবিত হয় নানা কারণে। কখনো সেটা গোলাপীর মতো কারণে কখনোবা স্বামীর অত্যাচারসহ অন্য কারণে। তবে শহরে যে আশায় তাদের আগমন ঘটে, তাও পূরণ হয় না বললেই চলে। উল্টো তাদেরকে শহর নামের চোরাবালিতে পড়তে হয়। তবে গ্রামীণ সংগ্রামী এসব নারীরা সেই চোরাবালিও পাড়ি দিয়ে এগিয়ে যায়। অবদান রাখেন নানা ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের শতকরা ৮০ ভাগই নারী।৩ তাদের হাত ধরেই এ শিল্প চললেও এরা সবাই শখের বশে এখানে আসে না। তারাও ওই গোলাপীদের মতোই কোনো না কোনো কারণে গ্রামছাড়া হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই নারীরা দেশের জন্য এতো বড়ো অবদান রাখলেও তাদের খোঁজখবর নেওয়া হয় না।
শুধু গার্মেন্টেই নয়, আরো অন্যান্য ক্ষেত্রেও নারী কিন্তু পিছিয়ে নেই। সরকারি এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৬২ শতাংশ নারী আয় বৃদ্ধিমূলক কাজে যুক্ত। কৃষিক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নারীরা পিছিয়ে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী, এমনকি সেনাবাহিনীর ঝুঁকিপূর্ণ পেশাতেও নারী তার যোগ্যতার দৃষ্টান্ত রাখছে।৪ কিন্তু এসব ক্ষেত্রে অবদান রাখলেও নারীর স্বীকৃতি মিলে কতোটুকু!
জেঁকে বসা বৈষম্যে গ্রামীণ গোলাপীর শহর দর্শন
গ্রামীণ অত্যাচার-নির্যাতন-বৈষম্য থেকে রেহাই পেতে শহরে যেতে বাধ্য হন গোলাপী। কিন্তু শহরে গিয়ে গোলাপীকে আরো ভয়াবহ অবস্থার শিকার হতে হয়। আগেই বলেছি, সেখানেও তার সামান্য মাথা গোঁজার ঠাঁই বস্তি দখলে চলে ষড়যন্ত্র। গোলাপী এখন ঢাকায়তে দেখা যায়, স্থানীয় এলিট বুর্জোয়া শ্রেণির একজন বস্তি দখলে লেগে থাকেন। তার কাছ থেকে টাকা খেয়ে বস্তি উচ্ছেদে সহায়তা করেন রাজনীতিক দাদন মুন্সি। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বস্তি উচ্ছেদে অংশ নেয়। এখানেও গোলাপীকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। গ্রামে যে লড়াইটা গোলাপীকে শুধু গ্রামীণ কতিপয় মোড়লের সঙ্গে করতে হতো। এখানে এসে সেই গোলাপীকে লড়াইটা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে করতে হয়। কেননা, তাকে একই সঙ্গে পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি-রাজনীতিক-রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে মোকাবিলা করতে হয়। বস্তি উচ্ছেদে এসে যখন এক পুলিশ কর্মকর্তা গোলাপীর ভাতের হাড়িতে লাথি মেরে ভাত ফেলে দেন, তখন পুলিশের সঙ্গে শুরু হয় গোলাপীর বাকবিতণ্ডা। একপর্যায়ে পুলিশ এ ঘটনায় ভুল হয়েছে স্বীকার করলে গোলাপী বলেন, ‘আপনারা ভুল করেন আর আমরা হাজত খাটি, আপনারা ভুল করেন আর আমরা উচ্ছেদ হই, আপনারা ভুল করেন আর আমাদের জীবন নষ্ট হয়, বস্তিতে থাকি। আপনাদের ভুলের কারণেই তো ২০ বছরে স্বাধীনতা কী জিনিস বুঝলাম না! ... হায়রে স্বাধীনতা, স্বাধীনতা রে ...।’
বছরের পর বছর ধরে নিম্ন আয়ের মানুষদের মাথা গোঁজার জায়গা বস্তি দখলের নানা খবরাখবর শোনা যায়। কখনো বস্তি দখল করতে আগুন দেওয়া হয়। কখনোবা এদেরকে মাদক ব্যবসায়ী বানিয়ে বস্তি ভাঙা হয়, আর রাষ্ট্রের উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ অভিযান তো আছেই। এসব মেনে, কখনো কখনো প্রতিবাদ করে, এই সব মানুষকে টিকে থাকতে হয়। কখনোবা আগুনে পুড়ে জীবন দিয়ে এর মূল্য দিতে হয়। কেবল রাষ্ট্রকে তেমন কিছুই করতে দেখা যায় না। কোনো বড়ো দুর্ঘটনা কিংবা আগুন লেগে কোনো বস্তি, কারখানা পুড়লে, রাষ্ট্র নানা কৌশলে ‘ভুল স্বীকার’ করে সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে থাকে। কয়েকদিন আলোচনা হয়, টক শো চলে, বিশেষজ্ঞরা গম্ভীর হয়ে মত দেন। কিন্তু সামান্য পরে আর রাষ্ট্রের সেই কথা মনে থাকে না। অথচ এভাবেই বছরের পর বছর মানুষ ঘরছাড়া হয়, কেউ আগুনে পুড়ে মরে, কেউ নির্বিচারে জেলে পচে। এটাই যেনো তাদের স্বাধীনতার স্বাদ। তাই হয়তো জাহালমকে দুদকের ভুলে তিন বছর জেলে থাকতে হয়।৫
কিন্তু সেই ভুল কি আর শুধরায়! গ্রামে থাকা গোলাপীদেরকে শহরে এসে আরো বেশি বৈষম্যের কবলে পড়তে হয়। সেই বৈষম্যঘেরা রাজ্যেই গোলাপীদের বেঁচে থাকার লড়াই চলে। কখনো তারা সেই সিস্টেমে এঁটে যায়, আবার কখনো কখনো একটু বেরোনোর চেষ্টা থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রের পরিচালনা সিস্টেমে সেই বেরোনোটা আর কতোটাইবা হয়।
আমজাদ তার চলচ্চিত্রে গোলাপীসহ অন্যদের জীবনাচরণের মাধ্যমে এই বৈষম্যের কথা তুলে ধরার চেষ্টা চালান। গোলাপীর সঙ্গে থাকা নানি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে স্বাস্থ্যখাত নিয়ে নানা কথা ওঠে। নানি হাসপাতালে ভর্তি হলে তাকে কোনো চিকিৎসক চিকিৎসা দেয় না। নানি বলেন, ‘সাদা কাপড়ওয়ালা বেটিগুলোকে ডাকলে খালি প্যান প্যান করে। আর ডাক্তার ব্যাটা একবার কোনো রকমে আইয়ে নাড়ি ধরে তারপর ঘড়ি দেইখা চলে যায়। ওষুধ দেয় না, স্যালাইন দেয় না।’ দেশের সরকারি হাসপাতালে বৈষম্যের যে চিত্র আমজাদ তুলে ধরেন আজ থেকে দুই যুগ আগে, তা থেকে বাংলাদেশ আর কতোটা বেরিয়ে আসতে পেরেছে। এদেশে তো এখনো শতকরা ৬০ ভাগ চিকিৎসক কর্মস্থলেই থাকে না!৬ অথচ এদেশের নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসা সেবা পাওয়ার একমাত্র স্থান এসব সরকারি হাসপাতাল। আর দেশের এলিটরা তো আর এখানে সেবা নিতে আসে না। তাদের একটু জ্বর-সর্দি হলেই চোখ পড়ে বিদেশের দিকে। তাই হয়তো সরকারি স্বাস্থ্যখাতের এমন দশা!
শুধু তাই নয়, এই মানুষগুলো পেটের দায়ে কোনো ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেও সেখানে বাধা আসে। গোলাপী এখন ঢাকায়-এ দেখা যায়, ময়না ভারতীয় শাড়ি বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়েন পুলিশের হাতে। ভয়ে ভয়ে ময়না পুলিশকে প্রশ্ন করেন, ‘আমরা তো স্যার এই [শাড়ি] ঢাকার দোকান থেকেই আনি। কিন্তু এই ইন্ডিয়ান শাড়ি ঢাকা শহরে ক্যামনে আসে স্যার?’ তখন এই প্রশ্নে খেপে যান পুলিশ কর্মকর্তা। তাকে আটক করার হুমকি দেন। এভাবে ছোটো অপরাধে সবসময় নিগৃহের শিকার হয় গোলাপী-ময়নার মতো মানুষরাই। অথচ রাঘব-বোয়ালরা আড়ালেই থেকে যায়--সেটা শহর, গ্রাম সবখানেই। তারপরও আশার কথা হলো, এই নিগৃহ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে নানা সময়, নানাভাবে সেলুলয়েডে কথা বলেছেন নির্মাতা আমজাদ।
বিলেতের অন্য এক গোলাপী
এ সিরিজের তৃতীয় চলচ্চিত্র গোলাপী এখন বিলেতে। চলচ্চিত্র শুরুর আগে অবশ্য পর্দায় ভেসে ওঠে--‘এই ছবিটি গোলাপী এখন ট্রেনের কোন ধারাবাহিক গল্প নয়। ভারতের প্রখ্যাত নায়ক মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়ে নতুন গল্প তৈরি করা হয়েছে।’ গল্প যাকে নিয়েই হোক, চলচ্চিত্রের নাম কিন্তু গোলাপী এখন বিলেতে। এখানেও ট্রেন দিয়েই চলচ্চিত্রের শুরু। আর চলচ্চিত্রের কাহিনিও ওই গোলাপী নামে নারী চরিত্রকে ঘিরেই। এখানেও একজন সংগ্রামী গোলাপীকেই প্রথমে দেখা যায়। তাই বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এটাও ওই আগের দুই চলচ্চিত্রেরই আরেকটি অংশ।
যৌতুকের টাকা অর্ধেক দেওয়ায় স্বামীর বাড়িতে অত্যাচারের শিকার হন গোলাপী। তাই এই অত্যাচার-নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে গোলাপী স্বামীকে তালাক দিয়ে বাড়ি ছাড়েন। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে আমজাদ দেখিয়েছেন গ্রামীণ জীবনে বেড়ে ওঠা এক নারীর সংগ্রামের কথা; সঙ্গে তুলে ধরেছেন যৌতুক নামক কুপ্রথার প্রতাপ। সময়টা এক দশক আগে হলেও বর্তমানে এদেশে একজন নারীকে বিয়ে দিতে হলে মোটা অঙ্কের অর্থকড়ি/উপঢৌকন দিতে হয় অভিভাবককে। তবে এক দশক আগেও যেটাকে যৌতুক হিসেবে ভাবা হতো; এখন সেই একই বিষয় সমাজে উপহার/উপঢৌকন হিসেবে নতুন রূপে চালু হয়েছে। এখন হয়তো অভিভাবকরাও আর আগের মতো যৌতুক দেওয়ার চাপে থাকে না। কারণ এখন বরপক্ষও ঘটা করে কিছু চায় না বিয়ের সময়। সমাজে একরকম রেওয়াজ হয়ে গেছে যে, বর শ্বশুরবাড়ি থেকে উপহার হিসেবে কিছু না কিছু পাবেই। অভিভাবকরাও এখন অনেকটা ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবেই’ মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সময় এগুলো দিয়ে থাকে। তবে যৌতুক, উপহার, উপঢৌকন এগুলোর চর্চা যে নামেই থাকুক না কেনো, নারী কিন্তু সেই আগের অধস্তনতা থেকে খুব একটা বের হতে পারেনি। তাদের সামাজিক/অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। সে কারণেই নারীকে এখনো শ্বশুরবাড়িসহ নানা জায়গায় হত্যার শিকার হতে হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাব মতে, ২০১১ থেকে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হত্যার শিকার হয়েছে এক হাজার একশো ৫১ জন নারী।৭ তবে তারা হত্যার ধরনগুলোর কথা যেমন বলেনি, তেমনই এই তথ্যও সুনির্দিষ্ট কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা। স্থানীয় পত্রিকাগুলোকে প্রাধান্য দিলে এ সংখ্যা হয়তো আরো বেড়ে যাবে।
গোলাপী এখন ট্রেনে’তেও যৌতুক প্রসঙ্গ এসেছে। আমজাদ তার ‘গোলাপী’ চরিত্রের সবশেষ চলচ্চিত্রেও বিষয়টি দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার মানে তিনি সমাজ-বাস্তবতাকে পড়তে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি যেনো এই সময়ের ভবিষ্যতটাও দেখেছিলেন। এজন্যই হয়তো তিনি একজন গ্রাম পর্যায়ের স্বল্প শিক্ষিত নারী গোলাপীকে দিয়ে তার স্বামীকে তালাক দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরতে পেরেছেন। তবে এক দশক আগে গোলাপী এমন সিদ্ধান্ত নিলেও বর্তমানে গ্রাম পর্যায়ে স্বামীকে তালাক দেওয়ার বিষয়টি খুব বেশি চোখে পড়ে না। তবে গ্রামে দেখা না গেলেও বর্তমানে শহরে পুরুষদের চেয়ে নারীরাই তালাকের আবেদনে এগিয়ে রয়েছে।৮ অবশ্য সেই নারীদের একটা বড়ো অংশই শিক্ষিত ও চাকরিজীবী; যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন। এই নারীদের স্বামীকে তালাক দেওয়ার পর অন্যকিছু করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু গোলাপী এখন বিলেতে-তে গোলাপীর কিন্তু সেই সক্ষমতাও ছিলো না। নিছক আত্মসম্মানের জোরে গোলাপী তার স্বামীকে তালাক দিয়ে গতিময় ট্রেনে ওঠেন। তার সেই গতির কোনো ভরসা ছিলো না; লক্ষ্যও ছিলো না। সেই দিক থেকে আমজাদ খানিকটা এগিয়েই ছিলেন বলা যায়।
তবে সাহসী সেই নারী গোলাপীকে কিছুদিন সংগ্রামের পর তার পালক মায়ের বাড়িতেই ফিরে আসতে হয়। সেখানে তার মা মারা গেলে সেই বাড়ির ছেলে মিঠুনের হাত ধরে তাকে বিলেতে যেতে হয়। যদিও গোলাপী যেতে চান না। কিন্তু গ্রামও তখন গোলাপীর জন্য অনুকূল ছিলো না। তাই বাধ্য হয়ে একজন পুরুষের ওপর নির্ভর করেই তাকে যেতে হয় বিলেতে। যে নারী এতোটা সাহসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তার স্বামীকে তালাক দেয়, সেই নারী গোলাপীকেই এবার বিলেতে গিয়ে চার দেয়ালে আটকে থাকতে দেখা যায়।
বিলেতে মিঠুনের স্ত্রী রত্না গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেলে, মেয়ে টুম্পাকে লালনপালনের ভার পড়ে গোলাপীর ওপর। গোলাপী তার সবকিছু দিয়ে টুম্পাকে বড়ো করেন। বিলেত জীবনে গোলাপীর দেশে আসার নানা আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়। কিন্তু সেই আকাক্সক্ষা মিঠুনের কাছে হেরে যায়। যদিও শেষ পর্যন্ত গোলাপী দেশে ফেরেন। কিন্তু সেটাও মিঠুনেরই ইচ্ছায়। পরিবার/সমাজে নারীর অনেক কিছুই করার ইচ্ছে হয়। কিন্তু সেই ইচ্ছে নামক বেলুন পরিবার/সমাজের কাছে এসে চুপসে যায়। ফলে নারী আর সেই চিরচেনা পুরুষতন্ত্র থেকে বেরোতে পারে না। নির্মাতা আমজাদও কেনো জানি দিনশেষে সেই কারাগার থেকে নারীকে বের করতে পারেননি, ভাঙতে পারেননি সেই তন্ত্র। যে গোলাপীকে দিয়ে তিনি পুরুষের সহায়তা ছাড়াই ট্রেনে ফেরি করালেন, ঢাকায় বুর্জোয়া/রাজনীতিকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করালেন, স্বামীকে তালাক দেওয়ার সাহস দেখালেন; সেই গোলাপীকেই কেনো জানি তিনি তুলে দিলেন পুরুষের কাঁধে!
আমজাদের ‘গোলাপী ট্রিলজি’
চলচ্চিত্র নিয়ে ট্রিলজির কথা বললেই উপমহাদেশে সবার আগে মনে আসে সত্যজিতের ‘অপু ট্রিলজি’ ও মৃণালের ‘কলকাতা ট্রিলজি’ কিংবা ঋত্বিক ঘটকের ট্রিলজির কথা। সত্যজিৎ, মৃণাল ও ঋত্বিক বাদে আর কোনো ট্রিলজির কথা বলতে গেলে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের একটু থেমে যেতে হয়। তাকাতে হয় বিশ্বচলচ্চিত্র ভাণ্ডারে। কেননা, উপমহাদেশে খুব সম্ভবত সত্যজিৎ, মৃণাল আর ঋত্বিকের ছাড়া আর কোনো ট্রিলজি খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে সেই খোঁজায় অবশ্য ‘ভুল’ও হতে পারে। আবার এমন কোনো চলচ্চিত্র-সমষ্টিও খুব একটা দৃষ্টিগোচর হয় না, যেটা দিয়ে নির্মাতা একই রকম গল্পকে এগিয়ে নিতে পেরেছে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে তিনটি চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। সত্যজিৎ রায় সেক্ষেত্রে সফল। তিনি পথের পাঁচালী’র (১৯৫৫) পর অপরাজিতা (১৯৫৭) এবং সবশেষ অপুর সংসার (১৯৫৯) পর্যন্ত একক ও সমষ্টিগতভাবে একটি কাহিনিকে এগিয়ে নিয়েছেন। তিনি সেখানে এক অপু চরিত্রকে ধরে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন ওই সময়কে।
অ্যাকাডেমিকভাবে ট্রিলজি হলো একটা চলমান গল্পের (চলচ্চিত্র, নাটক, সাহিত্য, ভিডিও গেইম) তিনটি খণ্ডাংশ, যা একত্রে একটি কর্ম বা তিনটি স্বতন্ত্র কর্ম। তবে যেভাবেই ট্রিলজিকে সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেনো, এ পর্যন্ত বিশ্বচলচ্চিত্রের প্রতিষ্ঠিত ট্রিলজির দিকে তাকালে ট্রিলজি হয়ে ওঠার একটা অবয়বের দেখা মিলে মোটাদাগে। সেই অবয়ব বা অ্যাকাডেমিক সংজ্ঞা যে ছাঁচেই ফেলি না কেনো বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী’ চরিত্র নিয়ে নির্মিত তিনটি চলচ্চিত্রকে ট্রিলজি বলা যায় খুব শক্তভাবেই। এতে গল্পের ধারাবাহিকতা ও স্বাতন্ত্র্য, নামকরণ এবং একটি নির্দিষ্ট চরিত্রের লড়াই উঠে এসেছে। যদি বিশ্বচলচ্চিত্রের ট্রিলজির কথায় আসি, তবে এখানে একে একে এসে যায় নরিকি ট্রিলজি, কোকার ট্রিলজি, দ্য গডফাদার ট্রিলজির কথা। এই সব চলচ্চিত্রের কাহিনি ও একটি গল্পের সঙ্গে অন্য গল্পের স্বাতন্ত্র্য ও মিল রয়েছে। সেই জায়গায় আমজাদের ‘গোলাপী’ চরিত্রকে নিয়ে নির্মিত তিনটি চলচ্চিত্রকে ‘গোলাপী ট্রিলজি’ বলাই যায়। নরিকি ট্রিলজিখ্যাত জাপানি নির্মাতা ইয়াসুজিরো ওজু’র লেট স্প্রিং (১৯৪৯), আর্লি সামার (১৯৫১) ও টোকিও স্টোরি’তে (১৯৫৩) নরিকি নামের চরিত্র পাওয়া যায়; যাকে নির্মাতা ধারাবাহিক তিনটি চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখিয়েছেন।৯ আমজাদের চলচ্চিত্রেও গোলাপীকে তিনটি চলচ্চিত্রেই প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। এছাড়া ইরানের কিংবদন্তি নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি কোকার ট্রিলজির হয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হোম? (১৯৮৭), লাইফ অ্যান্ড নাথিং মোর... (১৯৯২) ও থ্রু দ্য ওলিভ ট্রিজ’তে (১৯৯৪) একটি এলাকার ভূমিকম্পের আগের ও পরের জীবনপ্রণালি দেখিয়েছেন।১০ সেক্ষেত্রে আমজাদও কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। তিনিও বাংলাদেশি নারীর তিন সময়ের গল্প বলেছেন সমাজ-রাষ্ট্রীক প্রেক্ষাপটে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন চলচ্চিত্রে।
বিশ্বচলচ্চিত্রে প্রশংসিত এমন অনেক ট্রিলজিই রয়েছে--ট্রিলজি বানাবেন এমন ধারণা নিয়ে নির্মাতা চলচ্চিত্র শুরু করেননি। হয়তো পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়িক সফলতার কারণেই হোক কিংবা গল্পের থিম ও ঘটনা প্রবাহ মিলে যাওয়ার কারণেই হোক, সেগুলো ট্রিলজি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যেমনটা বলা যায় ‘ট্রিলজি অব ফেইথ’-এর কথা। সুইডিশ নির্মাতা ইঙ্গমার বার্গম্যান এই সিরিজ ট্রিলজি হিসেবে বানাননি। কিন্তু চলচ্চিত্র তিনটির বিষয়গত সংযোগ, কাহিনির ধারাবাহিকতার জন্য ট্রিলজি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।১১ বাংলাদেশের নির্মাতা আমজাদ হোসেনের ক্ষেত্রেও হয়তো এমনটিই ঘটেছে। তার আলোচিত গোলাপী চরিত্রটি তিনিও হয়তো ট্রিলজি বিবেচনায় নির্মাণ করেননি--যেটা হয়তো সত্যজিৎ করেছিলেন। তবে সত্যজিৎ যেখানে অপুকে নিয়ে কাজ করেছেন; ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমজাদ কাজ করেছেন গ্রামের নারী গোলাপীকে নিয়ে। নিঃসন্দেহে সেই বিষয়টি একজন নির্মাতার অগ্রগামী চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ।
এখন বলি আমজাদ কেনো এগিয়ে
কোন শিল্প সময়কে অতিক্রম করবে আর কোনটা করবে না, তা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। তবে মোটাদাগে বলা যায়, যে শিল্প মানুষের জন্য, মানুষের কথা বলে--তারই টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি। চলচ্চিত্রের মতো শিল্পমাধ্যমে তো এই বিষয়টি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর রয়েছে বৈশ্বিকভাবে মানুষের কথা বলার সক্ষমতা। সে অর্থে মানুষের কথা বলা অনেক চলচ্চিত্রই রয়েছে দেশে দেশে। বিশেষ করে যখন অন্য সব ধারার চলচ্চিত্রের জায়গায় লাতিন আমেরিকায় থার্ড সিনেমা আন্দোলন শুরু হয়। রাজনৈতিক ও নান্দনিকতার মিশেলে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো বেশিরভাগ থার্ড সিনেমার আলোচনা এখনো চলে। বিশ্বের এমন অনেক থার্ড সিনেমা ধারার চলচ্চিত্র রয়েছে—গিলো পন্টেকর্ভোর ব্যাটল অব আলজিয়ার্স, ওসমান সেমবেনের হাল্লা, থমাস গুতিয়েরেজ আলিয়ার মেমোরিজ অব আন্ডারডেভেলপমেন্ট, মৃণাল সেনের পদাতিক, ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখা কিংবা জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া।১২
৬০-এর দশকে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে আসা আমজাদ হোসেনও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর দাঁড়িয়ে চলচ্চিত্রে সমাজ-রাষ্ট্র তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়েছেন। থার্ড সিনেমায় যেমন উপনিবেশ পরবর্তী সময়ে লাতিন আমেরিকার দেশসমূহের রাজনীতি, দুর্ভিক্ষ, খাদ্য ঘাটতি, অনাহারে মৃত্যু, সহিংসতাসহ সমাজচিত্র ও শাসনব্যবস্থার চিত্র উঠে এসেছে, সেখানে আমজাদও একটি যুদ্ধবিধস্ত দেশের পরবর্তী সময়ের ঘটে যাওয়া নানা অস্থিরতাকে চলচ্চিত্রে তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, একটি স্বাধীন দেশেও কীভাবে পরাধীনতার উত্তরাধিকার থেকে গেছে। তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা লেখককেন্দ্রিক চলচ্চিত্র থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখিয়েছেন। ‘জনগণের কাছে যেতে হলে, তাদের জানতে হবে, দূর থেকে উপদেশ দেওয়া, জোর করে তাদের উপর আমাদের মতামত চাপানো উপনিবেশিকতার নামান্তর।’১৩ আমজাদ অবশ্য তার চলচ্চিত্রে এগুলো করেননি; তিনি জনগণের কাছে গিয়ে, তাদের জীবন তুলে এনেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি নারীকে দিয়ে উন্মোচন করেছেন সংগ্রামের নতুন পথ। অন্তত আলোচিত ‘গোলাপী’ চরিত্রকে ঘিরে নির্মিত চলচ্চিত্র সেই কথাই বলতে চেয়েছে।
সমাজ-বাস্তবতা, সমসাময়িক পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য সেই চলচ্চিত্রগুলো এখনো কথা বলে। কেননা, এই সময়ে এসেও তার চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু অনেকটাই প্রাসঙ্গিক। তিনি যে সময়-সচেতন ও দূরদর্শী নির্মাতা তা সেই প্রাসঙ্গিকতা থেকেই খেয়াল করা যায়। তার চলচ্চিত্রগুলো সমাজ-রাষ্ট্রে নিপীড়িত মানুষের কথা বলেছে, উঠে এসেছে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দেখা মিলেছে স্বকীয় সংস্কৃতির। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেওয়া আমজাদ সেই ৭০-এর দশকেই বলেছেন, এদেশে কোনো ভালো চলচ্চিত্রনির্মাতা ও সাহিত্যিক নেই।১৪ তার এই আবেগ মেশানো কথা নিয়ে তখন বেশ ঝড় গেছে তার ওপর। সেই আলোচনার ঝড়ে যোগ দিয়েছিলেন আলমগীর কবিরের মতো চলচ্চিত্রিক ব্যক্তিও।১৫ তবে তিনি যে অসত্য কোনো কথা বলেননি, সেটা হয়তো আজ আন্দাজ করা যায়। কেননা, সেসময়কার বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যেসব সাহিত্য, চলচ্চিত্র হয়েছে, তা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের অস্থিরতাকে অনেকটাই পাশ কাটিয়ে গেছে।
আমজাদ হোসেন ঠিক যে কথাটি সেই সময়ে বলেছিলেন, ঠিক একই রকম বক্তব্য পাওয়া যায় ২১ শতকে এসেও। এখন যারা চলচ্চিত্র বানাচ্ছেন, তাদেরকেও তিনি নির্মাতাই মনে করেন না!১৬ তিনি এও বলেছেন, ‘এগুলো কোনো চলচ্চিত্রই হচ্ছে না।’১৭ তার কারণ খুঁজলেও সেই আমজাদ হোসেনেরই কাছে যেতে হয়। আমজাদই বলতেন, ‘ ... আমরা সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে সচেতন ছিলাম। জানতাম, দর্শকের কাছে সে গল্প কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে। দেশ-কালের সে গল্পও দর্শক লুফে নিত।’১৮ কতোটা রাজনৈতিক চেতনাধারী চলচ্চিত্রিক আমজাদ ছিলেন, তা তার এই কথার মাধ্যমেই পরিষ্কার। যার ছাপ রয়েছে তার চলচ্চিত্রেও। এই ধরনের রাজনীতি সচেতন চলচ্চিত্র পাওয়া খুব কঠিন এ সময়ে। আমজাদ সেই ৭০ দশকে চলচ্চিত্রে সময়কে ধারণ করতে পেরেছিলেন, একই সঙ্গে চেষ্টা করেছিলেন সময়কে অতিক্রমের। তবে সেখানে তিনি ঠিক কতোটা সফল, তা হয়তো আরো সময় পর বোঝা যাবে।
লেখক : শফিকুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি তিনি অনলাইন পত্রিকা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।
shafiqulislamru32@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100008632759356
তথ্যসূত্র
1. https://www.priyo.com/articles/rape-in-tangail-20170708; retrieved on: 12.03.2019
2. https://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1599857.bdnews; retrieved on: 12.03.2019
3.http://archive.fo/0wYsn; retrieved on: 04.04.2019
4. https://bit.ly/2SpwUcE; retrieved on: 15.03.2019
5. https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1576452; retrieved on: 15.03.2019
6.http://www.bhorerkagoj.com/print-edition/2017/08/26/163357.php; retrieved on: 15.03.2019
7.https://bit.ly/2Y3pwb1; retrieved on: 09.04.2019
8.http://www.bd-pratidin.com/last-page/2018/06/23/339587; retrieved on: 12.04.2019
9.https://newtammanycollege.wordpress.com/2006/06/14/ozus-noriko-trilogy/; retrieved on: 12.04.2019
10.https://www.fandor.com/posts/abbas-kiarostami-s-koker-trilogy; retrieved on: 12.04.2019
11.https://screenrant.com/best-film-movie-trilogies-ever-all-time/; retrieved on: 12.04.2019
12. https://bit.ly/2J0WmUA; retrieved on: 20.04.2019
১৩. লিত্তিন, মিগুয়েল; উদ্ধৃত, আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৮৮-৮৯); ‘চলচ্চিত্র ধারাসমূহের অন্তর্গত পাঠ’; চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা।
১৪. কবির, আলমগীর (২০১৮ : ১৭৯); “‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ও আমজাদ হোসেন প্রসঙ্গে খোলা চিঠি”; চলচ্চিত্র ও জাতীয় মুক্তি; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
১৫. প্রাগুপ্ত; কবির (২০১৮ : ১৮০)।
16.https://bit.ly/2VcR1Bf; retrieved on: 20.04.2019
17. https://bit.ly/2VcR1Bf; retrieved on: 20.04.2019
18. https://bit.ly/2VcR1Bf; retrieved on: 20.04.2019
(বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজকি লণ্ঠন ১৭তম সংখ্যা , জুলাই ২০১৯ প্রথম প্রকাশ হয়ছে।)
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন