Magic Lanthon

               

কাজী মামুন হায়দার

প্রকাশিত ০২ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

মুহম্মদ খসরুর মৃত্যুসংবাদ ও একটি ‘প্রাগৈতিহাসিক’ পর্যালোচনা

কাজী মামুন হায়দার




খুব কষ্ট হয় এই ভেবে যে, ৭০ বছরের জীবনে মুহম্মদ খসরু কেনো জানি তার পরিচয়টাই আমাদের কাছে প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারলেন না! অদ্ভুতভাবে কেউ তাকে ‘চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব’, কেউ ‘চলচ্চিত্রের মানুষ’, কেউ ‘চলচ্চিত্র আন্দোলনের প্রাণপুরুষ’, কেউ ‘সুস্থধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের পথিকৃত’ বলছে। অথচ এক জীবনে পরিচয় দেওয়ার মতো কতো কাজই না খসরু করেছেন। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান তাকে নিয়ে লিখেছেন এভাবে--

বাংলাদেশের যে তরুণ বা তরুণী সিনেমার চর্চা করেছেন, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন, চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা নিয়ে লেখালেখি করেছেন বা যিনি মনে মনে শিল্পমান সম্পন্ন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছেন, তাদের মধ্যে একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুহম্মদ খসরুর সঙ্গে পরিচিত নন। ষাট দশকের গোড়ার দিকে চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক এই শিল্পমাধ্যমটিকে সিরিয়াস একটি চর্চার বিষয়ে পরিণত করেছিলেন তিনি।

   ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা করে যে উদ্যোক্তারা তাদের মধ্যে মুহম্মদ খসরু অন্যতম। অন্যান্যদের মধ্যে আরো ছিলেন আনোয়ারুল হক খান, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, ওয়াহিদুল হক, আবদুস সবুর, সালাহউদ্দিন প্রমুখ। এদের অনেকেই পরে আর এই আন্দোলনে খুব বেশি সময় দিতে পারেননি। কিন্তু খসরু আন্দোলনটাকে চালিয়ে নিয়েছিলেন, কখনো কখনো একা হাতে। ১৯৭৮-এ ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’ প্রতিষ্ঠার সময়ও খসরু ছিলেন উদ্যোক্তাদের একজন।

   খসরুর মৃত্যু নিয়ে ‘প্রথম আলো’ তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করে, ‘চলে গেলেন চলচ্চিত্রের মানুষ মুহম্মদ খসরু’। তারা প্রতিবেদন শুরু করেছে এভাবে ‘চলে গেলেন বাংলাদেশের সুস্থধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের পথিকৃৎ মুহম্মদ খসরু।’ এরপর তারা খসরু কবে, কোথায় মৃত্যুবরণ করলেন, কোথায় সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে, দাফন কোথায় সম্পন্ন হবে এসব তথ্য দেয়। এর বাইরে খসরুর কর্মময় জীবন নিয়ে তারা একটি তথ্যও দেয়নি। তারা প্রতিবেদনে একজন মানুষকে সুস্থধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের পথিকৃৎ বললো, কিন্তু কেনো তিনি পথিকৃৎ তা নিয়ে একটা শব্দও ব্যবহার করলো না! এটা দেখে কেমন জানি বিস্ময় লাগে; একই সঙ্গে খুব জানতে ইচ্ছে করে ‘সুস্থধারা’ বলতে ‘প্রথম আলো’ ঠিক কী বোঝাতে চায়। চলচ্চিত্রে সুস্থধারা, অসুস্থধারা বলে কিছু আছে নাকি! কিছু মানুষের মুখে প্রচলিত এই ধারাকে ‘প্রথম আলো’র মতো পত্রিকা (যারা নিজেদের মনে করে, তারা সব ভালোর সঙ্গে থাকে) কেনোইবা উৎসাহিত করবে। কারণ চলচ্চিত্রের এই শ্রেণি বিন্যাস চলচ্চিত্রের জন্য ক্ষতিকর তো বটেই, খসরুর জন্যও। কারণ খসরু পুরো জীবন চলচ্চিত্রের জন্য কাজ করেছেন, নিশ্চয় কোনো জনপ্রিয় শ্রেণি বিন্যাসকে প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। অবশ্য এই সুস্থধারা, অসুস্থধারার ফেরে পড়েই নিজের অস্তিত্বটাই শেষ করে ফেলেছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র।

এর বাইরে দুটো কথা বলাও জরুরি, যে ‘প্রথম আলো’ অপু-শাকিবের বিয়ের খবর প্রথম পাতায় বক্স লিড (দিনের প্রধান খবর) করে। সেই ‘প্রথম আলো’ ‘চলচ্চিত্রের মানুষ’, ‘সুস্থধারার চলচ্চিত্রের পথিকৃত’ উপাধি দিয়ে চার এর পাতায় শেষ কলামে সিঙ্গেলে চার ইঞ্চি প্রতিবেদন প্রকাশ করে মুহম্মদ খসরুকে নিয়ে! এর বাইরে তারা খসরুকে নিয়ে আর একটা কথা লেখার প্রয়োজন মনে করলো না। অবশ্য খসরুকে নিয়ে লিখে কী হবে, তিনি তো আর ‘বিক্রি’ হন না। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারা অবশ্য উপসম্পাদকীয় পাতায় ‘মুহম্মদ খসরুর চলে যাওয়া’ শিরোনামে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রকাশ করে। মানবাধিকার কর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামালের স্মৃতিচারণমূলক সেই লেখাটি তথ্যবহুল, একই সঙ্গে মূল্যায়নধর্মী। কয়েকটা লাইন তো না বললেই নয়,

সেই তারুণ্যে খসরু আমাদের উদ্দীপিত করেছিল চলচ্চিত্র বলে যে শিল্পটি আছে তার পরিচয় নিতে, স্বাদ পেতে। বইয়ের দোকানে সময় কাটাতে কাটাতে বইকে সুহৃদ বানিয়ে নিয়েছিল খসরু। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ধার ধারেননি, বহু শিক্ষিত নামধারীকে বহু পেছনে ফেলার যোগ্যতা অর্জন করে নিয়েছিল সে। ওর শিক্ষা প্রকৃত অর্থেই ছিল নিজেকে গড়ে তোলার প্রত্যয়, প্রগতির পথে নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার বাহন। এসব করতে করতে খসরু একাই একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।

যদিও আলোচনাটি ব্যক্তি পরিসরের, তারপরও সারা পৃথিবীর চলচ্চিত্র নিয়ে স্বপ্ন দেখা খসরুর একটা মূল্যায়ন সেখানে আছে। তবে ওই এক লেখায় মুহম্মদ খসরুকে বোঝা যায় না। কোথায় যেনো একটা বড়ো ফাঁক থেকে যায়।

   ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে খসরুর মৃত্যু সংবাদ দিতে গিয়ে ‘ইত্তেফাক’ শিরোনাম করে, ‘চলে গেলেন মুহম্মদ খসরু’। প্রতিবেদনের শুরুতে এরাও লিখেছে ‘চলে গেলেন বাংলাদেশের সুস্থ চলচ্চিত্র আন্দোলনের পুরোধা মুহম্মদ খসরু।’ ‘বিনোদন প্রতিদিন’ পাতায় ফোল্ডের উপরে ডান দিকের কোণায় ছবিসহ শেষ কলামে সাত ইঞ্চির (পৃষ্ঠা ১২) ওই প্রতিবেদনের শেষের দিকে খসরু সম্পর্কে বলা হয়েছে এভাবে--

উল্লেখ্য, বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম পত্রিকা ধ্রুপদী ও চলচ্চিত্র-এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এছাড়া বেশ কয়েকটি গ্রন্থের প্রণেতাও তিনি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা রাজেন তরফদারের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পালঙ্ক-এ খসরু সহকারী পরিচালক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ঋত্বিক ঘটকের অনবদ্য ও বিশ্লেষণধর্মী একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন ৭০ দশকের প্রথমার্ধে, যা ধ্রুপদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপরই সুধীমহলে ব্যাপক সাড়া পড়েছিল। পরে এই সাক্ষাৎকারটি উপমহাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় পুনঃমুদ্রণ করা হয়েছে।

   সংবাদের উল্টো পিরামিড কাঠামোয় সাদামাটাভাবে যে প্রতিবেদন লেখা হয়, সেখানে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো শেষে দেওয়া হয়। চিন্তা থাকে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠসজ্জার কারণে যদি কিছু তথ্য বাদ দেওয়ার দরকার পড়ে, তাহলে যেনো বাদ দেওয়া যায়। সেই হিসেবে ‘উল্লেখ্য’ দিয়ে যে তথ্যগুলো এই প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে যেগুলো প্রয়োজনে যেকোনো মুহূর্তে ফেলে দেওয়া যায়; অথচ সেগুলোই খসরুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ! তাছাড়া এরাও লিখেছে ‘সুস্থ চলচ্চিত্র আন্দোলনের ...’।

   ‘সমকাল’ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ মুহম্মদ খসরুর মৃত্যু সংবাদের শিরোনাম করেছে এভাবে ‘চলচ্চিত্র আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ খসরু আর নেই’। ওরা শেষ পাতায় ফোল্ডের মধ্যে প্রথম কলামে সিঙ্গেলে ছবিসহ পাঁচ ইঞ্চির প্রতিবেদন করেছে (অবশ্য জাম্প আছে পৃষ্ঠা ১১, কলাম ৭-এ)। প্রতিবেদনের সংবাদ-সূচনা শুরু হয়েছে এভাবে “চলে গেলেন চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘ধ্রুপদী’ সম্পাদক ও বিকল্পধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ খসরু (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)।” প্রতিবেদনের শরীরে বলা হয়েছে, ‘মুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি বেলায়েত হোসেন মামুন বলেন, সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের পথিকৃত মুহম্মদ খসরু দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ...’। এখানেও ‘সুস্থ ধারা’ হাজির!

জাম্পে খসরুর মরদেহে শ্রদ্ধা জানানোর সময় ও স্থান, জন্মস্থান, বাবার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এবং শেষে তারা খসরুকে নিয়ে এভাবে বলেছে,

১৯৬৩ সালে ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ প্রতিষ্ঠা করেন যে উদ্যোক্তারা, তাদের মধ্যে মুহম্মদ খসরু অন্যতম। তার সঙ্গে ছিলেন আনোয়ারুল হক খান, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, ওয়াহিদুল হক, আবদুস সবুর, সালাহ্উদ্দিন প্রমুখ। এ দেশে চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণাধর্মী লেখার ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। তৎকালীন পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি থেকে মুহম্মদ খসরু সম্পাদনা করতেন চলচ্চিত্রের কাগজ ‘ধ্রুপদী’।

   ‘ইত্তেফাক’-এর মতো ‘সমকাল’ও খসরুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সবার শেষে দিয়েছে, যেনো সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাসজ্জার প্রয়োজনে যেকোনো সময় কেটে ফেলে দেওয়া যায়! তবে একমাত্র ‘সমকাল’-ই ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ খসরুর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও দাফন সম্পন্নের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তিন এর পাতায় প্রকাশিত তিন কলাম ছবি ও দুই কলামের সেই প্রতিবেদনের শিরোনাম হলো, ‘মুহম্মদ খসরুকে সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা’। এই প্রতিবেদনে খসরুকে যারা ও যেসব প্রতিষ্ঠান শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলো তাদের নাম, তথ্যমন্ত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল ও নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে।

   ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ তাদের বিনোদন পাতা ‘শোবিজ’-এ খসরুকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে; শিরোনাম ‘চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব খসরু আর নেই’। তারা প্রতিবেদন শুরু করেছে এভাবে ‘বাংলাদেশের সুস্থ চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা মুহম্মদ খসরু (৭৩) আর নেই।’ প্রতিবেদনের শেষে তারা খসরুর আরো পরিচয় দিয়েছে “বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম পত্রিকা ‘ধ্রুপদী’ ও ‘চলচ্চিত্র’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মুহম্মদ খসরু। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন তিনি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা রাজেন তরফদারের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘পালঙ্ক’-এ সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন খসরু।” এখানেও সেই সুস্থ ধারা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সবার শেষে!

   ‘কালের কণ্ঠ’ শিরোনাম করেছে, ‘চলচ্চিত্র সংসদের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ খসরু আর নেই’। তিন এর পাতায় ছবিসহ সিঙ্গেল ১২ ইঞ্চির এই প্রতিবেদন শুরু হয়েছে, ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ খসরু আর নেই। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল সত্তর বছরের বেশি।’

   খসরুকে নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন করেছে ‘কালের কণ্ঠ’। তারা তার জন্ম, বাবার পরিচয়, চাকরিজীবন নিয়ে তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা, তার কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেছে। তারা আরো জানায়, ‘১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার সময় খসরু ছিলেন উদ্যোক্তাদের একজন। তিনি বাংলাদেশে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। খসরু বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠা করেন ফিল্ম স্টাডি সেন্টার।’

   এছাড়া তারা সম্পাদক, সহকারী পরিচালক হিসেবে খসরুকে নিয়ে কথা বলেছে। তারা নির্দিষ্ট করে বলেছে, “পরে নিজেও সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অর্থাভাবে তা আর হয়নি। সর্বশেষ হাসান আজিজুল হকের ‘নামহীন গোত্রহীন’ অবলম্বনে একটি চিত্রনাট্য তৈরি করে বেশ কিছুদিন ঘুরেও প্রযোজক জোগাড় করতে পারেননি খসরু। এমনকি দুই দফা আবেদন করেও সরকারি অনুদান পাননি।”

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিকাশে অবদানের জন্য মুহম্মদ খসরু পেয়েছেন হীরালাল সেন আজীবন সম্মাননা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের আজীবন সম্মাননাসহ বেশ কিছু পুরস্কার। ‘কালের কণ্ঠ’-এর এই প্রতিবেদনে মোটামুটি পূর্ণাঙ্গ এক খসরু উপস্থিত। তারা খসরুর কর্মময় জীবনের একটা পরিপূর্ণ বর্ণনা দিয়েছে, একই সঙ্গে বলেছে তার জীবনের কষ্টের কথাও। এছাড়া ‘কালের কণ্ঠ’ তাদের ২৮ ফ্রেব্রুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবারের বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘রঙের মেলা’য় ভিতরের পাতায় ‘প্রতিবাদের নাম মুহম্মদ খসরু’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেছে। ওই লেখায় চলচ্চিত্রনির্মাতা ও সংসদকর্মী এন রাশেদ চৌধুরী একটু ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেছেন খসরুকে।

খসরু ভাই আমাদের কাছে এক প্রতিবাদের নাম। কিসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কেন প্রতিবাদ? প্রতিবাদ এ দেশের চলচ্চিত্রের বিকাশে সব ধরনের বাধার বিরুদ্ধে। ... সিনেমার ভালো বা ভালো সিনেমার স্বার্থে এসংক্রান্ত কোনো স্থ’ূল কর্মকাণ্ডকে যে বিনা প্রতিরোধে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়--সে শিক্ষাই সব সময় আমাদের দিয়েছেন খসরু ভাই। এ জন্য জীবনভর অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। তবে সৎ সিনেমার অকুতোভয় এই সৈনিক সেসবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছেন জীবদ্দশায়।

   রাশেদের এ মূল্যায়নে নতুন প্রজন্ম খসরুকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করবে নিশ্চয়। একই সঙ্গে খসরুর মতো একজন মানুষকে নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমের খানিক নীরবতার কারণও নিশ্চয় তারা খুঁজে নেবে। যদিও এই নীরবতায় মুহম্মদ খসরুর মতো মানুষদের খুব বেশি কিছু এসে যায় না।

ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’ শিরোনাম করেছে, ‘Film activist Khasru dies’। শেষের পাতায় একেবারে মাখঝানে ফোল্ডে সিঙ্গেল কলামে সিঙ্গেল ছবি দিয়ে (জাম্প দুই এর পাতায় কলাম ১-এ) তারা প্রতিবেদনটি করেছে। এরা প্রতিবেদন শুরু করেছে এভাবে ‘Muhammad Khasru, the pioneer of film society movement in Bangladesh, died at a city hospital yesterday. He was 70.’ খসরুর অসুস্থতা, মৃত্যু, শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও দাফন সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে,

Khasru was renowned for his editorship of the `Drupodi’ magazine and had been involved with the film industry for more than five decades. His efforts led to the formation of the Film Studies Centre under the supervision of the Bangladesh Film Society Association. He led the movement which helped establish Bangladesh Film Federation of Film Societies and the National Film Archive.

এছাড়াও তারা ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের দেওয়া আজীবন সম্মাননা পাওয়ার কথাও বলেছে।

এই আলোচনা যখন শেষ করার কথা ভাবছি, তখন একটা কথা বার বার মনে হচ্ছিলো। সেটা দিয়েই শেষ করছি। ভাবছিলাম, একটা মানুষ শুধু চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করবেন বলে জীবনে আর কিছুই করলেন না। একটা মানুষ অনেকগুলো মানুষকে দিয়ে চলচ্চিত্র করাবেন বলে আর কিছুই করলেন না। হয়তো আজীবন একা ছিলেন শুধু চলচ্চিত্রের কথা ভেবে। হয়তো বিয়ে করেননি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চরাচর-এর লখার কষ্ট দেখে। পাখি শিকারি লখা বলতেন, ‘সারি (স্ত্রীর নাম) থাকলে পাখি থাকে না, পাখি থাকলে সারি থাকে না।’ খসরুরও হয়তো ‘সারি’ আসলে ‘চলচ্চিত্র-পাখি’ থাকতো না। তবে যে যা মূল্যায়নই মুহম্মদ খসরুকে করুক না কেনো, ‘চলচ্চিত্র-পাখিকে’ সঙ্গে নিয়ে তিনি হয়তো ‘সুখেই’ ছিলেন। আর এই সুখে তার সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি হলো, এই সুখের ঠিকানা তিনি বাংলাদেশের অনেক মানুষকে দিতে পেরেছিলেন।

লেখক : কাজী মামুন হায়দার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।

kmhaiderru@yahoo.com 

https://www.facebook.com/kmhaiderru

 

তথ্যসূত্র

১. শাহাদুজ্জামান; ‘চলচ্চিত্র আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ খসরু আর নেই’; সমকাল, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।


(বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজকি লণ্ঠন ১৭তম সংখ্যা , জুলাই ২০১৯ প্রথম প্রকাশ হয়ছে।) 

  

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন