Magic Lanthon

               

অনুপম হায়াৎ

প্রকাশিত ১৭ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সামগ্রিক চলচ্চিত্র নিয়ে এখন অনেকের কোনো আগ্রহ নেই

অনুপম হায়াৎ


চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক পথচলা লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের হাত ধরে শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে যে ইতিহাসের জন্ম হয়েছিলো, তা পরম্পরায় এক মহাসমুদ্রে রূপ নিয়েছে। ভারতবর্ষে প্রথমবারের মতো ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুলাই লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে যে ইতিহাস রচনা করেন, সেই ইতিহাস তৎকালীন পূর্ববঙ্গে রচিত হতে সময় লেগেছিলো মাত্র এক বছর নয় মাস। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ এপ্রিল পূর্ববঙ্গে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন হয় এবং তা করেন এ ভূখণ্ডেরই হীরালাল সেন। এরপর ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়ে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু দুভার্গ্যজনক হলেও সত্য, ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে চলচ্চিত্র অনেক দূর এগিয়ে গেলেও এদেশের চলচ্চিত্রের পথচলাকে লিপিবদ্ধ বা ইতিহাসের মর্যাদায় উন্নীতকরণের প্রচেষ্টা দেখা যায়নি।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সবাক কাহিনিচিত্র মুখ ও মুখোশ নির্মাণের ১৩ বছর পর বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা, শিক্ষক, সংগঠক আলমগীর কবির লেখেন ‘সিনেমা ইন পাকিস্তান’ নামের বই। তবে সে বইয়ে পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অতোটা উল্লেখ ছিলো না। দেশ স্বাধীনের দেড় দশক পার হয়ে গেলেও পূর্ববঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সেই ইতিহাস রচনায় কেউ এগিয়ে আসেনি। বিভিন্ন জায়গায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লেখা প্রকাশ হলেও এ নিয়ে কোনো সামগ্রিক প্রচেষ্টা চোখে পড়ে না। বৃহৎ এই কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে যে মানুষটি সর্বাগ্রে এগিয়ে এসেছিলেন, তিনি অনুপম হায়াৎ। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে অনুপম হায়াৎ চলচ্চিত্রবিষয়ক নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন।

অনুপম হায়াতের আসল নাম মতিউর রহমান ভূঁইয়া; চলচ্চিত্রকে ভালোবেসে নিজের নামটিই বদলে ফেলেন; রাখেন অনুপম হায়াৎ। ৭০-এর দশক থেকে ‘চিত্রালী’, ‘বিচিত্রা’র মতো সাময়িকীতে তিনি লেখালেখি দিয়ে শুরু করেন। এরপর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের পরিসরকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করছেন তিনি। সে বিবেচনায় তার রচিত চলচ্চিত্রের ইতিহাসবিষয়ক ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ বইটি এদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস পঠন-পাঠন ও বিশ্লেষণে তথ্যকোষ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। অন্য সব বাদ দিলে এই একটি বই দিয়েই অনুপম হায়াৎ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে আছেন। তিনি একাধারে সাংবাদিকতা, গবেষণা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে অনুপম বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইন্সটিটিউটে (তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন) শিক্ষকতা করছেন। এর আগে শিক্ষকতা করেছেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও গ্রিন ইউনিভার্সিটির ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগে। নানা সময় দায়িত্ব পালন করেছেন ফিল্ম আর্কাইভ, চলচ্চিত্র সেন্সরবোর্ড ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কমিটিতে। তিনি ‘চলচ্চিত্রের খোলা জানালায়’, ‘প্রথম বাঙালি চলচ্চিত্রকার : হীরালাল সেন ও অন্যান্য’, ‘চলচ্চিত্র জগতে নজরুল’, ‘পুরানো ঢাকার সংস্কৃতি : নানা প্রসঙ্গ’, ‘চলচ্চিত্রবিদ্যা’, ‘চলচ্চিত্র সমালোচনা’, ‘জহির রায়হানের চলচ্চিত্র : পটভূমি, বিষয় ও বৈশিষ্ট্য’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও চলচ্চিত্র’সহ ৪৬টি বই রচনা করেছেন। অনুপম হায়াতের সঙ্গে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর হয়ে কথা বলেছেন রুবেল পারভেজ। চলতি সংখ্যায় এই আলোচনার প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হলো।

 

রুবেল পারভেজ : ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ আগস্ট প্রকাশ পায় আপনার লেখা চলচ্চিত্রের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’। এই বই নিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক তাহলে।

অনুপম হায়াৎ : আলমগীর কবিরের লেখা চলচ্চিত্রের প্রথম ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থ ‘সিনেমা ইন পাকিস্তান’ প্রকাশ পায় ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে। তাকে অনুসরণ করে ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র’ নামে আরেকটি বই বের হয় ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে, এর লেখক ফরিদ উদ্দিন নীরদ। এরপর ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের জুনে ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সামাজিক অঙ্গীকার’ নামে ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশ করেন চিন্ময় মুৎসুদ্দী। একই বছরের আগস্টে প্রকাশ পায় আমার গ্রন্থটি। আমি আমার এ গ্রন্থের প্রকাশ তারিখ উল্লেখ করেছিলাম ৩ আগস্ট। এর একটা কারণ ছিলো--১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৩ আগস্ট মুক্তি পেয়েছিলো বাংলাদেশের প্রথম সবাক কাহিনিচিত্র মুখ ও মুখোশ। সেই তারিখটিকে সিগনিফাই করার জন্যই মূলত গ্রন্থটির প্রকাশকাল ৩ আগস্ট দিয়েছিলাম। এখনো মনে আছে, আধা বাইন্ডিং ও কাভার ছাপা না হওয়া অবস্থায় এ বইয়ের কয়েকটি কপি মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভালে পাঠানো হয়েছিলো। তৎকালীন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব এম নূরউননবী চৌধুরী তা নিয়ে গিয়েছিলেন। শুনেছিলাম, মস্কোয় খুব শীত থাকায় বইটির আঠা খসে খসে পড়েছিলো।

রুবেল : তার মানে এই বইটি লেখার কিছুকাল আগে বাংলাদেশ চলচ্চিত্রবিষয়ক একাধিক বই প্রকাশ পেয়েছিলো। তাহলে আপনি কেনো ইতিহাসের বই লিখতে সচেষ্ট হলেন। এর মুখ্য উদ্দেশ্যইবা কী ছিলো?

অনুপম : চলচ্চিত্র নিয়ে আমার লেখালেখির আগ্রহ জন্মে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সময়। তখন গণযোগাযোগ পড়াতেন ড. সামসুল হুদা হারুন। ওখানে মোশন পিকচার নামে একটি বিষয় ছিলো। অবশ্য তার আগে থেকেই আলমগীর কবির আমার আরাধ্য ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় তার সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। যেখানে তিনি বলেছিলেন, বাবা-মা তাকে নাকি ভুল শিক্ষা দিয়েছিলেন। সেজন্য যাবতীয় সার্টিফিকেট ছিড়ে লন্ডনের টেমস নদীতে ফেলে দিয়ে তিনি শিল্প-সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা শুরু করেছিলেন। ‘চিত্রালী’, ‘হলিডে’, ‘অবজারভার’-এ তার লেখা সমালোচনাগুলোও মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। এভাবে ধীরে ধীরে তার ভক্ত হয়ে যাই। মানসিকভাবে তাকে মেন্টর হিসেবে গ্রহণ করি। তার লেখা পড়ার ফলে চলচ্চিত্র অধ্যয়নের ব্যাপারটি আমার মাথায় কাজ করতে থাকে। এরপর ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে আলমগীর কবিরের তত্ত্বাবধায়নে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে ভর্তি হই। যদিও ততোদিনে আমি চাকরিতে ঢুকে গেছি। তারপরও চাকরির ফাঁকে ফাঁকে আমেরিকা, বৃটেন, ভারতের চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ালেখা শুরু করি। তখনই মনে হলো, সবার চলচ্চিত্রের লিখিত ইতিহাস আছে, আমাদেরটা তো ওইভাবে নেই। আলমগীর কবির ‘সিনেমা ইন পাকিস্তান’ নামে একটি বই লিখেছেন। কিন্তু বাংলা ভাষায় ওই অর্থে ইতিহাস ধরে ধরে কোনো বই নেই। তখন ভাবলাম আমাদেরও তো এরকম একটা বই হতে পারে। এভাবেই শুরু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস লেখা।

রুবেল : আপনি যখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস লিখতে সচেষ্ট হলেন, তখন ঠিক কোন ধরনের সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিলেন? চলচ্চিত্র ইতিহাস সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে আত্মস্থইবা করলেন কীভাবে?

অনুপম : ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখালেখি শুরু করি ‘চিত্রালী’তে। এরপর ‘চিত্রাকাশ’, ‘পূর্বাণী’, ‘জনপদ বাংলাদেশ সংবাদ’-এ লিখি। চলচ্চিত্রবিষয়ক পঠন-পাঠন ও তা আত্মস্থ করার ব্যাপারে বেশ কয়েকটি বিষয় ভূমিকা রেখেছিলো। প্রথমত, আমার সাহিত্য চর্চার ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো; এরপর আলমগীর কবিরের কাছ থেকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের নানা বিষয় জানার সুযোগ পাই। এছাড়া তার মাধ্যমে সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী ও ইউরোপের নানা চলচ্চিত্রের সমালোচনা পড়ার সুযোগ হয়। এসব করতে করতে দেখলাম, ওই সব লেখালেখির সঙ্গে আমাদের চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখালেখির কোনো মিল নেই। যা আছে সবই মান্ধাতার আমলের। মূলত সেই শূন্যতা অনুধাবনের জায়গা থেকে চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা, ইতিহাস ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত বোধ আমার মধ্যে জন্ম নেয়।

১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে চিন্ময় মুৎসুদ্দীর মাধ্যমে সাজ্জাদ কাদিরের সহযোগিতায় সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় নিয়মিত লেখা শুরু করি। ‘বিচিত্রা’য় ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন প্রকাশ পায় আমার ইতিহাসভিত্তিক একটা স্টোরি, যার শিরোনাম ‘স্মৃতির মুখ : হারানো ছবি’। মূলত সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র মাধ্যমে এটি দিয়েই আমার ইতিহাসভিত্তিক লেখালেখির শুরু। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমার সঙ্গে নবাব পরিবার, ফতেহ লোহানী ও আবদুল জব্বার খানের পরিচয় হয়। এছাড়া গণযোগাযোগ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা, ফিল্ম ইন্সটিটিউটে এক বছরের মৌলিক কোর্স ও অন্যান্য নানা বিষয়ে পড়ালেখা আমার চলচ্চিত্রের ইতিহাস অনুসন্ধানে ভূমিকা রাখে।

রুবেল : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরপরই তো চলচ্চিত্রের নবজাগরণের প্রচেষ্টা শুরু হয়। ওই সময় আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে চলচ্চিত্র নিয়ে কোনো কিছু করার ক্ষেত্রে?

অনুপম : আলমগীর কবিরের নেতৃত্বে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রে নবজাগরণ শুরু হয়। তিনি ঢাকা ফিল্ম ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। মুহাম্মদ খসরু, বাদল রহমান, সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকীরাও তখন আলমগীর কবির দ্বারা প্রভাবিত হন। একপর্যায়ে বাদল রহমান, সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী ভারতের পুনে চলে যান চলচ্চিত্রের ওপর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য। বাদল রহমানের মাধ্যমে আমি বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে যুক্ত হই। ওই সময় আমার ভিতরও আগ্রহ জন্মে নতুন প্রজন্মের জন্য লেখালেখি করার। মন দিয়ে চাইতাম সালাহউদ্দীন জাকী, বাদল রহমানের মতো তরুণরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করে নবতরঙ্গ সৃষ্টি করবে। আর আমি হবো তাদের লেখক।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও জাকী ভাই ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ততোদিনে বি এফ ডি সি’তে অপারেটর ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একদিন তাকে বললাম, চলচ্চিত্র ইতিহাসের ওপর আমার একটা পাণ্ডুলিপি আছে। এরপর তিনি বি এফ ডি সি’র তৎকালীন এম ডি সাইফুল আজমের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। আজম সাহেব দেখে বললেন, এগুলো সব এক সঙ্গে করে বড়ো আকারের বই করেন। এরপর তার পরামর্শ মোতাবেক চলচ্চিত্রবিষয়ক সব সমিতি, সংগঠনকে চিঠি দেওয়া হলো। বলা হলো, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস নেই, লিখতে হবে। এরপর সেখানে কী কী থাকবে তার তালিকা করা হলো। এবং এ সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো। গবেষণা ও প্রকাশনা সহকারী হিসেবে আমি সঙ্গে নিলাম সুব্রত ঘটক প্রণবকে। এরপর শুরু হলো বিভিন্ন জায়গায় চষে বেড়ানো। আগে যেসব জায়গায় গিয়েছি, সেসব জায়গায় আবারও গেলাম। কারণ ইতিহাস লিখতে গেলে তো আরো তথ্য দরকার। এরপর তৈরি হলো পাণ্ডুলিপি। তারপর এটা প্রকাশের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হলো।

আমাদের কাছে মনে হয়েছিলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসবিষয়ক এ বইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি থাকাটা জরুরি। কারণ তিনিই ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে এফ ডি সি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু এ সময় কোথাও বঙ্গবন্ধুর ছবি ছাপা হতো না। কিন্তু আমি ও জাকী ভাই সিদ্ধান্ত নিলাম, যেভাবেই হোক তার ছবি দিতে হবে এই বইয়ে। ওই সময় আবার তার ছবিও পাওয়া যাচ্ছিলো না। আমি জাতীয় আর্কাইভে গিয়ে ওখান থেকে পার্লামেন্টে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণ খুঁজে নিলাম। এরপর তার ছবি সংগ্রহ করলাম ‘দৈনিক বাংলার বাণী’ থেকে।

রুবেল : আপনার এ বইটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এতে চলচ্চিত্র ইতিহাসের বিশ্লেষণমূলক আলোচনা ও মূল্যায়ন সম্পর্কিত তথ্য কম। শুধুই বছর, তারিখ ধরে ক্রমানুসারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল তুলে ধরা হয়েছে। বলা যেতে পারে, চলচ্চিত্রবিষয়ক তথ্যের একটি ভাণ্ডার বা আকরগ্রন্থ এটি। এ নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?

অনুপম : আমার মূল লক্ষ্যই ছিলো এটা। কোনো সমালোচনা, বিশ্লেষণ বা কোনো পলিটিকাল পক্ষপাতিত্ব নয়, শুধু ডকুমেন্টেশন দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অগ্রগতি ও নিদর্শনকে আমি তুলে ধরতে চেয়েছি। বইটিকে প্রামাণ্য দলিলের মর্যাদায় উন্নীত করাই আমার লক্ষ্য ছিলো। চলচ্চিত্রে যাদের অবদান আছে, আমি চেয়েছিলাম তাদের পরিচয় ধরে রাখতে। তাই কে কী বলেছে, বিশেষজ্ঞদের অভিমত কী, আমার ভাবনা কী--এসবের কোনো উল্লেখ করিনি সচেতনভাবেই।

রুবেল : এর কারণগুলো যদি ব্যাখ্যা করতেন?

অনুপম : অভিমত, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিলে ইতিহাসের আসল সত্য চাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে; সত্য চাপাও পড়ে। ইতিহাস তখন এক দোষে দুষ্ট হয়ে যায়। ব্যক্তি, যিনি লিখছেন তার অভিমত তখন বড়ো হয়ে প্রভাব বিস্তার করে। এতে ইতিহাস তার মূল হারাতে পারে! একারণে শুধু ডকুমেন্ট দিয়েছি। ডকুমেন্ট যাচাই-বাছাই করে মানুষ সিদ্ধান্ত নিবে কোনটি ভুল আর কোনটি সঠিক। কোনো ইতিহাস মতামতনির্ভর হলে তা শুধুই ব্যক্তির হয়ে ওঠে। আর নিরপেক্ষভাবে শুধু ফ্যাক্ট বা ডকুমেন্ট দিলে সেটা হয় সমাজ-সত্যের। এখান থেকে মূল তথ্য নিয়ে যে যার মতো করে ভাবার স্বাধীনতা পাবে। বইটির প্রকাশনা উৎসবে অধ্যাপক ও গল্পকার শওকত আলী বলেছিলেন, ‘এটা ইতিহাস হয়নি। কিন্তু ইতিহাসের মাতৃভাণ্ডার হয়েছে, আকরগ্রন্থ হয়েছে।’ আর ভারতের ‘দেশ’ পত্রিকা এ বইয়ের প্রশংসা করে লিখেছিলো, এটি বাংলাদেশের ফিল্মের মিনি আর্কাইভ। আমার মনে হয়, এ মন্তব্যই যুতসই এ বইয়ের ক্ষেত্রে।

রুবেল : তাহলে দিনপঞ্জি তুলে ধরাকে ইতিহাস বলা হচ্ছে কেনো?

অনুপম : না না। ইতিহাসের তো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ থাকবেই। তারপরও বইটির নামে ইতিহাস কথাটি রাখা হয়েছে। কারণ এটাও চলচ্চিত্রের ইতিহাসের একটা অংশ। এখানে রাজনীতি আনতে পারিনি। কারণ বঙ্গবন্ধুর ছবি ছাপতে গিয়েই তো বাধার মুখে পড়েছিলাম। রাষ্ট্র, সময়ের বিবেচনায় তখন কিন্তু অন্যান্য সরকার প্রধানের ছবি ছাপতে হয়েছে আমাকে। এর বাইরেও মনে রাখতে হবে, এটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা থেকে প্রকাশ হয়েছিলো। কাজেই আমাকে তথ্যমন্ত্রী, সচিবের বাণী পর্যন্ত দিতে হয়েছে। আমি এটা কেনো করবো? কারণ এগুলোও তো ইতিহাসের অংশ। আর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে হলো চলচ্চিত্র, বি এফ ডি সি; সেখানে আমলাদের বাণী থাকবে না! অনেকেই এর প্রচণ্ড সমালোচনা করেছে। কিন্তু তারা কি একবারও এর রাজনৈতিক পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় এনেছে?

রুবেল : এ বইয়ের কী কী দুর্বলতা রয়ে গেছে বলে আপনি নিজেই মনে করেন?

অনুপম : আমার এ বইয়ে অনেকগুলো বিষয় আসেনি। দর্শকের কথা, রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট, কারিগরি ও নান্দনিকতার দিক আসেনি। বললাম না, আমি শুধু ডকুমেন্ট আকারে বইটি সাজিয়েছি। আমি জোর দিয়েছি সঠিক তারিখ উদঘাটনের ওপর। কারণ চলচ্চিত্রের আর্ট ইকোনমি, এর সামাজিক প্রভাব, গণযোগাযোগের অংশ; এটা একধরনের সাহিত্যও; এটাকে তাই সঠিকভাবে তুলে আনতে হবে।

রুবেল : ইতিহাসের সঠিক বিশ্লেষণে আপনি শুরু থেকেই দিন তারিখকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন ...।

অনুপম : একটু আগে আপনি একটা কথা বললেন না, দিনপঞ্জি। আসলেই কি পৃথিবীতে দিন বলে কোনো কিছু আছে? রাত বলে কোনো কথা আছে? সূর্য তার নিজ কক্ষপথে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি শুধু ঘুরে আসছেন। আর নিজেই নিজের প্রয়োজনে ভাগ করছেন সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টা-দিন-রাত। কসমিক ওয়ার্ল্ডে রাত-দিন বলে কোনো জিনিস নেই। আমরা আমাদের মতো করে, আমাদের প্রয়োজনে সাজিয়ে নিয়েছি সময়কে।

১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ও ১৯৭৪-এর ১৫ আগস্ট কি এক কথা? তো চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও সময় বড়ো ফ্যাক্টর। কারণ এরও কিন্তু প্রতি সেকেন্ডে ২৪টি ফ্রেম যায়। আমাকে অনেকে বলে, আমি শুধু দিনপঞ্জি লিখি। আমি কি বুঝি না, একথা বলার মধ্য দিয়ে আমাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়! কিন্তু তারা হয়তো লক্ষ করে না, তারা তো সেসময় পৃথিবীতেই ছিলো না, তাদের কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। তুমি যখন পৃথিবীতে এসেছো, ওই সময় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কতো ছিলো, তুমি খেয়াল করেছো? ওই সময় কোন দ্রব্যের মূল্য কতো ছিলো জানো? তোমার জন্মের সময় তোমার বাবার আবেগের পরিমাণ জানো? তুমি কি মেপে দেখেছো, তোমার মায়ের আবেগ? সুতরাং সময় ফ্যাক্টর। পৃথিবীর সবকিছুই সময় দিয়ে বাঁধা। পৃথিবীতে আসা মানেই একদিন চলে যেতে হবে, এটাও বাঁধা সময়ের নিয়মে। চলচ্চিত্রে ওই যে ২৪ ফ্রেম যায়, কেনো যায়? কারণ পৃথিবীর সবকিছু নির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্য চলমান। সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা বলি, সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে, তা কখনোই না। এগুলো আমরা ভাগ করে নিয়েছি। এগুলো চিন্তার ব্যাপার। সময়কে বিবেচনায় নিয়েই কিন্তু সবকিছুর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে হয়।

ধরো, কেউ একজন কনটেন্ট অ্যানালিসিস করবে। সেক্ষেত্রে আমি তাকে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট মানুষদের জন্ম তারিখ জানিয়ে দিয়েছি। এ তথ্য নিয়ে তার কিন্তু শুধু জন্ম তারিখটাই দেখলে চলবে না। ওই সময়টাও দেখতে হবে। ওই সময়ের পারিপার্শ্বিকতা খুঁজে বের করা গবেষকেরই দায়িত্ব। তাকে দেখতে হবে, মানুষটি যখন জন্ম নিয়েছিলো তখন সকালটা কেমন ছিলো? বাতাসের আর্দ্রতা কতোটুকু ছিলো? কারণ মানুষ পৃথিবীতে এমনিতেই আসে? আল্লাহ, স্রষ্টা, যাই বলো না কেনো, তিনি নিশ্চয়ই একটি পরিমিতিবোধের মধ্য দিয়ে তোমাকে পৃথিবীতে পাঠান এবং মানুষকে নির্দিষ্ট পরিমাণে একটা সময় দেন। সোজা কথায় যদি বলি তাহলে, আমি আমার এ বইয়ে ব্যক্তি বা চলচ্চিত্রের জন্ম তারিখটা জানিয়ে দিলাম। এরপর কারো যদি আরো জানতে ইচ্ছে করে, তাহলে সে ওই সময়ে যাবে এবং ওই সময় আরো অন্যান্য কী পরিস্থিতি ছিলো, তা অনুসন্ধান করে বিশ্লেষণ ও গবেষণা করবে।

রুবেল : একদম শুরুতে এ কারণেই কি বলেছিলেন, বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশকে সিগনিফাই করতে ৩ আগস্টে এটির প্রকাশকাল দিয়েছিলেন?

অনুপম : হ্যাঁ। তবে শুধু তাই নয়, আমার কাছে ১৮৯৮ থেকে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের প্রদর্শনের বিস্তারিত ইতিহাস আছে। কোন ঈদে কোন চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে, তাও আমার জানা। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের এক ঈদে আটটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়, সব কয়টিই বিদেশি। আপনাকে সেটাও চিন্তা করতে হবে। ওই সময় মন্ত্রী কে ছিলো সেটাও জানতে হবে।

যাহোক, আমাকে ছোটো করে দেখার জন্য অনেকে দিনপঞ্জির গুরুত্বকে হালকা করে দেখতে পারে। সেটা তাদের স্বাধীনতা। কিন্তু আমি হাসি, এই লোকদের জ্ঞান কতো সীমিত! আমার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, আপনার শরীরে দুইশো ছয়টি হাড়, আপনি কি সেই হাড়গুলো দেখতে পান? দেখা যায় না। কিন্তু তাই বলে কি হাড় নেই!

রুবেল : বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের ইতিহাস দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের। আপনার কী মনে হয়, এদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসবিষয়ক চর্চা সঠিক পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে? প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ইতিহাস রচনার যে চর্চা, আমাদের দেশে তা ঠিকঠাক নিয়মের মধ্যে হচ্ছে?

অনুপম : গবেষণায় সামগ্রিকতা বা টোটালিটি বলে একটা কথা আছে। যেকোনো কিছুকে টোটালিটি ধরা যায়। কিন্তু এর পারিপার্শ্বিক দিকগুলো নিয়ে আমরা কখনো চিন্তা করি না। আমরা সবসময় একভাবেই চিন্তা করি। শুধু ব্যক্তি কেনো, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তাই। কেউই সামগ্রিকভাবে কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করে না। দেশের সর্বোচ্চ নেতা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকও ব্যক্তি স্বার্থে যেকোনো কাজ করছে। কেউই নিজের বাইরে অন্য কারো কথা ভাবছে না। নিজের উন্নতি, ভালো পদ-পদবীর জন্য সবসময় ধ্যান-জ্ঞান করছে। আমার তো ডক্টরেট ডিগ্রি নেই; কিন্তু এমনও ডক্টরেট ডিগ্রিধারী আছে, যাদের চিত্ত সংকীর্ণ। ভাবাই যায় না, তারা কতোটা স্বার্থপর। তারা ভাবে, তাদের এই এই লেখা এখানে ছাপা হলে তাদের পদোন্নতি হবে, ইনক্রিমেন্ট বাড়বে। সামগ্রিক চলচ্চিত্র নিয়ে এখন অনেকের কোনো আগ্রহ নেই।

শুধু চলচ্চিত্র কেনো, ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে চালের দর কীভাবে বেড়েছে দেখো। পানির মতো বাড়ছে! তুমি ওই সময়ের বাজার দর দেখো, তাহলে বুঝতে পারবে। যদিও আমি অন্য প্রেক্ষাপটে বলছি, তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছো? যারা সাফারার, তারা কী করবে? সংসার তাদের বিরাট, ঢাকায় থাকে। মধ্যরাতে রেশনের লাইনের জন্য ছোটোভাইকে দাঁড় করানো, ভোরের মধ্যে গোপনে রেশন পাচার হয়ে যাওয়া। এ কষ্টের কথা তো কাউকে বলা যাবে না। আমি নিজ চোখে তা দেখেছি। আমরা সবাই এখন স্বর্ণমুকুট মাথায় নিয়ে আছি। সব জায়গায় একই কথা, সোনার বাংলা ছিলো আমাদের, তাই না!

একাত্তরে সবাই মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেনি। তাই বলে তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিলো না? এই চেতনাকে ধারণ করেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি একজন। সবাই তো তা করতে পারেনি। আমার বাবা, দাদা, নানা, আমার সবার সম্মিলিত চেতনা একটা স্ফুরণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ দিয়ে বের হয়েছিলো। এ কারণে তিনি জনতার হয়ে গেছেন। আমি টোটালিটির কথা বলছি এ কারণে যে, সামগ্রিকভাবে সবকিছু চিন্তা করতে হবে। আমাদের এই সামগ্রিকতা বোধ নেই, সেটা ইতিহাস, চলচ্চিত্র, অ্যাকাডেমিক সবখানেই।

অ্যাকাডেমি তো চূড়ান্ত মাত্রায় দূষিত হয়ে গেছে। এটা বলার মতো নয়। এখানে প্রচণ্ড রকমের চৌর্যবৃত্তি চলছে। মূলে কেউ যাচ্ছে না। আমি বলছি, আপনি আমাকে কোট করছেন। অথচ আমি সত্য বললাম কি না, এটা কেউ যাচাই করছে না। একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালের আমি লেখক। একজন ডক্টরেট, যিনি সে বোর্ডের মেম্বার, আমিও বোর্ডের মেম্বার। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে তার একজন ছাত্র লিখছে, সেখানে তিনি তার নামটাও ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এরপর দেখলাম, সেখানে ১০টি মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের নাম দিয়েছে তারা, যেগুলোর বিষয়বস্তু আসলে মুক্তিযুদ্ধের নয়। আমি ইচ্ছা করলে লেখাটা বাতিল করে দিতে পারতাম। আমার সে ক্ষমতা আছে। কিন্তু ভাবলাম যেহেতু উনিও বোর্ড মেম্বার, তাই বাতিল করিনি। শুধু বললাম, এখানে সমস্যা আছে, এগুলো সংশোধন করে দিন। তা না করে উনি করলেন কী, তার সেই ছাত্র আর তিনি আমার বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্টের ডি জি বরাবর চিঠি লিখলেন এবং আবারও বললেন, অমুক অমুক বইয়ে আছে এগুলো মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র। ওরা তথ্য দিয়েছে, মির্জা তারিকুল কাদের, ড. মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ও কাবেরী গায়েনের বইয়ে নাকি সেসব তথ্য আছে। আমি তখন সরাসরি প্রশ্ন করেছি, হুলিয়া কি মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র? ‘হুলিয়া’ কবিতা তো মুক্তিযুদ্ধের আগের বিষয় নিয়ে লেখা। এটা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হয়! আজো ভুলিনি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তেতাল্লিশের মন্বন্তর নিয়ে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত চলচ্চিত্র, সেটাকে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র বলে লিখে দিলেই হলো! এসব দেখে তখন অসুস্থ হয়ে গেলাম। যাহোক, পরে আমি বললাম, ফুল বোর্ডে দেখানো হোক চলচ্চিত্রগুলো। একথা শুনে তারা ভয় পেয়ে গেলো।

সাম্প্রতিককালে এক ঈদে কয়েকটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। সেন্সরবোর্ডে যারা আছে, তারাও জানে এর মধ্যে দুটি চলচ্চিত্র নকল। একেবারে নাম ধরিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তাতে তাদের কিছু যায় আসেনি। একজন নায়িকা তো বলেই ফেলেছেন, নকল তো হতেই পারে। তখন আমি বলেছি, এটা ক্রাইম। আমরা ক্রাইমকে সমর্থন করতে পারি না। তখন তিনি বললেন, তাহলে ইন্ডাস্ট্রি চলবে কী করে? বললাম, সেটা ভিন্ন বিষয়। আসলে এখানকার মূল্যবোধ এমনই।

আরেকটি কমিটিতে ছিলাম। ভাগ্যক্রমে ওইদিন অসুস্থ ছিলাম, যেতে পারিনি। গেলে কী হতো জানি না, হয়তো ওখান থেকে রিজাইন দিয়ে আসতাম। তো সমাজের বেশিরভাগ জায়গায় দুর্নীতি, অসততা ঢুকে গেছে--সেটা শিক্ষা, গবেষণা, পরীক্ষা সব ক্ষেত্রেই। এই কারণে চলচ্চিত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে চর্চা করাটা বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা জানে তাদেরকে জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। আমাকে কেউ গাইড হিসেবে নেবে না, কারণ আমার তো পিএইচ ডি ডিগ্রি নেই। বাংলা বিভাগ থেকে পাস করে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে ফিল্ম বিভাগের চেয়ারম্যান হচ্ছে, পিএইচ ডি গাইড হচ্ছে! তো কী করে কী হবে? তোমাকে তো মূলের কাছে যেতেই হবে। মূলের কাছে না গেলে টোটালিটির দেখাও পাবে না। আগে মূলে যেতেই হবে, তারপর না হয় দেখবে টোটালিটি, সমাজ, সময়, সংস্কৃতি, অর্থনীতি আর জেন্ডারের মতো বিষয়গুলো।

রুবেল : একটু আগে বলছিলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নতুন প্রজন্ম চলচ্চিত্র বানাবে আর আপনি হবেন সেই নতুন ধারার নির্মাতাদের লেখক বা পর্যবেক্ষক। আপনি তাদের নির্মাণ নিয়ে কথা বলবেন, তারা আপনার কথা বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে পরবর্তী নির্মাণে হাত দেবে।

অনুপম : আমার এ চিন্তার স্ফুরণ দেখেছিলাম সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী, বাদল রহমান, মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, ক্যামেরাম্যান আনোয়ার হোসেন ও সম্পাদক জোনায়েদ হালিমের মধ্যে। পরিচালনা, ক্যামেরা, চিত্রনাট্য, শব্দ দিয়ে চিন্তা-চেতনায় তারা পথ দেখিয়েছে। আমাকে প্রভাবিত করেছে যুদ্ধোত্তর পরিবেশে পূর্ব ইউরোপের চিন্তাধারা। আমার পাঠ্য ছিলো বুলগেরিয়ান চলচ্চিত্র। যুদ্ধের পর একটা ধ্বংসস্তুপের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিউরিয়ালিস্টরা কী করে নতুন কিছু করেছিলো। আঁভগার্দ আন্দোলনও তাই। ওগুলো পড়ে পড়ে আমার ভিতর চিন্তা জাগে নতুন কিছু করার। এরকম আরো নানা আন্দোলনের প্রভাবই তো পড়েছিলো সত্যজিৎ রায়, আকিরা কুরোসাওয়ার মতো নির্মাতাদের ওপর। আমিও চেয়েছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের ধ্বংসস্তুপ থেকে আমাদের চলচ্চিত্রের সোনালি ফসল জন্মাবে। নির্মাণশৈলী, নতুন উপস্থাপনা রীতি দাঁড়াবে, নতুন করে চলচ্চিত্রের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হবে এবং আমি হবো তার লিপিকার।

রুবেল : আপনি আপনার জায়গা থেকে হয়তো সফল; কিন্তু আপনার পর এ বিষয়ে আর নতুন লোকজন পাওয়া গেলো না কেনো, আর কেউ কাজ করছে না কেনো?

অনুপম : এর অনেকগুলো কারণ আছে--প্রযুক্তির প্রভাব, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, সততা-নিষ্ঠার অভাব। মূলধারার ইন্ডাস্ট্রিও ভেঙে পড়লো। অল্পতে এখন অনেকে সফলতা পেতে চায়। সরকার হয়তো চলচ্চিত্রকে সহায়তার জন্য অনুদান দিচ্ছে, কিন্তু সেই অনুদান নিয়েও বাহানা হয়। অনুদানের টাকা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ না করে অনেকে ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটায়। সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেমের অভাব, লোভ, দুর্নীতি এগুলো গ্রাস করেছে দেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে। এসব কিছুর প্রভাবই তরুণদের ওপর পড়েছে। তাছাড়া তরুণরা তো জায়গাই পাচ্ছে না। তারেক মাসুদ এমনও বলেছেন, মাটির ময়না চলার পরও তার পাওনা টাকা দেয়নি প্রেক্ষাগৃহওয়ালারা।

ওদিকে আবার কিছু কিছু তরুণ নির্মাতাদের মধ্যে একটা নাক সিটকানো ব্যাপার আছে। তারা মূলধারায় না গিয়ে নিজেদের ইচ্ছা মতো কাজ করেছে। সত্যি কথা বলতে কী, মৌলবাদ শুধু ধর্মান্ধদের মধ্যে নয়, এই পরিসরেও একধরনের মৌলবাদ আছে। ‘প্রগতিশীল’দের মৌলবাদীতা বড়ো ভয়ঙ্কর। এরা ব্যক্তিস্বার্থকে বড়ো করে দেখে। বুদ্ধিজীবী, বামপন্থি যাই বলো--যারা সারাদিন পুঁজিবাদের নিন্দা করে তারাই পুঁজিবাদী দেশ আমেরিকা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি বানায়, সন্তানদের লেখাপড়া করতে পাঠায়!

রুবেল : আপনার কথায় স্পষ্ট যে, চলচ্চিত্র একটি সামগ্রিক শব্দ হলেও আমাদের চলচ্চিত্রের লোকদের মধ্যে বিভিন্ন দল বা ধারা ঢুকে গেছে, তাইতো?

অনুপম : অবশ্যই, বিশেষ করে যারা মূলধারায় কাজ করে, তারা প্রচণ্ড মাত্রায় দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তো সবকিছু অসততায় ঢেকে গেলো। নকল চলচ্চিত্র এমনভাবে আসা শুরু করলো--একেবারে হুবহু। সরদার ফজলুল করিম বলতেন, মূল যখন তার চরিত্র হারায়, তখন বিকল্পই তার মূল হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দুভার্গ্য যে, মূলধারার চলচ্চিত্রে যে আন্দোলনের প্রয়োজন ছিলো নানাভাবে তা পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি বা তরুণরাও একটু সরে গেছে এখান থেকে। একমাত্র নিষ্ঠাবান হিসেবে এখানে কাজ করেছেন তারেক মাসুদ। সেই রকম মানসিকতা কারো মধ্যে তো দেখলাম না! তিনি নিজের কাঁধে চলচ্চিত্র নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে গেছেন। তার প্রচেষ্টায় বিকল্পধারা বেগবান হচ্ছিলো, কিন্তু সেই বেগবান ধারা তারেকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে থমকে দাঁড়ালো। এটির লালন-পালন, পরিচর্যা আর হলো না। এটা খুবই দুঃখজনক।

রুবেল : প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র উপভোগের সংস্কৃতি নষ্ট হওয়ার জন্য নিত্য নতুন প্রযুক্তিকে কতোটা দায়ী করবেন? 

অনুপম : প্রযুক্তির বদৌলতে এতো সব পথ তৈরি হয়েছে যে, চলচ্চিত্র দেখার জন্য দর্শকের হাতের কাছেই এখন অসংখ্য মাধ্যম। তার ওপর আবার আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে বসে যদি দেড় হাজার টাকায় মোবাইলফোন সেট কিনে তাতে দেশ-বিদেশের অসংখ্য চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ থাকে, তাহলে কেনো এতো কষ্ট, টাকা খরচ করে দর্শক প্রেক্ষাগৃহে যাবে? প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখতে গেলে টিকিটের তিনশো টাকার সঙ্গে আরো কমপক্ষে দুইশো টাকা যোগ করতে হয়। পাঁচশো টাকা দিয়ে চলচ্চিত্র দেখো, তারপর সারাদিন এতেই চলে যাবে। এর বাইরে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা মানুষজনকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। এর মধ্যে সবকিছু গুছিয়ে ওঠাও কষ্টকর। আগে গৃহবধূরাও প্রেক্ষাগৃহে যেতো। এখন তাদের এক চোখ ফুটন্ত হাড়ির দিকে, অন্য চোখ মোবাইলফোন সেটের পর্দায়। তাহলে তারা কেনো প্রেক্ষাগৃহে যাবে? তার ওপর এখন প্রায় চলচ্চিত্রই নকল। টাকা দিয়ে তারা তামিল চলচ্চিত্রের রিমেক কেনো দেখতে যাবে? তার বদলে সরাসরি তামিল চলচ্চিত্রই দেখবে ঘরে বসে। প্রেক্ষাগৃহে যে যাবে, তার পরিবেশও তো ঠিক নেই। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, একদিকে সারা পৃথিবীতে চলচ্চিত্র নির্মাণের ধুম পড়েছে; সেগুলো দেখানোর জন্য একের পর এক সহজ উপায় বের হচ্ছে; অন্যদিকে আমাদের দেশের চলচ্চিত্র দিনের পর দিন শুধু নিচের দিকেই নামছে।

রুবেল : চলচ্চিত্রের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য মূলধারাকে আপনি কীভাবে গুরুত্ব দিতে চান?

অনুপম : দেখো, সবাই কিন্তু আর বুদ্ধিজীবীর মগজ নিয়ে চলচ্চিত্র দেখতে যায় না। চলচ্চিত্রের ইতিহাসের বিকাশ লক্ষ করলে দেখবে, মূলধারা দিয়েই চলচ্চিত্রের বিকাশ লাভ হয়েছে, প্রেক্ষাগৃহকেন্দ্রিক ব্যবসা হয়েছে। এটা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও হয়নি আবার প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমেও হয়নি। এগুলো সবাইকে বুঝতে হবে। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সত্যজিৎ রায় কিন্তু প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা নন, তিনি মূলধারার নির্মাতা হিসেবে পরিচিত। ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনরা কোথাকার? আমি বলবো, আমাদের তরুণরাও কিছু ভুল করে ফেলেছে। স্বল্পদৈর্ঘ্য দিয়ে আমরা হয়তো নিরীক্ষাধর্মী কাজ করতে পারি। আলমগীর কবিরও বলতেন, একজন পরিচালক স্বল্পদৈর্ঘ্য বা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণকে তার শিক্ষানবিশ পাঠ হিসেবে নিতে পারে কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাকে অবশ্যই মূলধারায় আসতে হবে।

আলমগীর কবির নিজেও তো এসেছেন। তার মোহনা, সূর্যকন্যা, সীমানা পেরিয়ে, পরিণীতা, মহানায়ক--এগুলো সবই পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। মোরশেদুল ইসলামও তাই করেছেন। তার খ্যাতি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আগামী দিয়ে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দুখাই, চাকা, আমার বন্ধু রাশেদ-এর মতো চলচ্চিত্র তিনি বানিয়েছেন। তারেক মাসুদও তাই; মাটির ময়না, রানওয়ের আগে তার হাতেখড়ি হয়েছিলো প্রামাণ্যচিত্র দিয়েই। তানভীর মোকাম্মেল হুলিয়া দিয়ে শুরু করলেও পূর্ণদৈর্ঘ্যতে ফিরে এসেছেন। তো মূলধারা মানে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে আসতেই হবে।

অন্যদিকে আমাদের কিছু তরুণ নির্মাতা এখন বিদেশে ছোটোখাটো পুরস্কার পেলে ওটাকেই বড়ো করে দেখছে। এটার কারণ হতে পারে, তারা প্রযোজক পাচ্ছে না, সঠিকভাবে তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এই অধঃপতনের মূল কারণ হলো, মূলধারার প্রযোজকদের বেশিরভাগই অসৎ। তারা চায় নকল চলচ্চিত্র। তারা ব্যবসা ছাড়া কিছুই বোঝে না। হয়তো অনেকে কর ফাঁকি দেওয়ার জন্যও এখানে আসে।

রুবেল : তাহলে তারা কেনো মৌলিক কোনো গল্প নিয়ে কাজ করছে না। খরচ তো ঠিকই হচ্ছে?

অনুপম : আসলে তাদের সেই সত্যিকারের কমিটমেন্টটা নেই। ৬০ বা ৭০-এর দশকে যারা চলচ্চিত্রে অর্থ লগ্নি করতো, তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ছিলো। দেশপ্রেম ছিলো বলেই তারা নকলের প্রতি এতোটা নির্ভরশীল হয়নি। তাদের কাছে দেশপ্রেম বড়ো ছিলো। তারা দায়িত্বশীল ছিলো সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের প্রতি। এখন তো সেটা নেই। বেশিরভাগই অসততার পথ বেছে নিয়েছে। অসৎরাই তো নকল করে। অসৎরাই তো অন্যের ধন চুরি করে।

রুবেল : এটা কি নিজেদের সক্ষমতার অভাব?

অনুপম : না, সক্ষমতার অভাব নয়। অসৎ বলেই তারা নকল করে। অসৎদের নিয়ন্ত্রণের জন্য, মানে দুষ্টের দমন সৃষ্টের পালন তো রাষ্ট্রের কর্তব্য। রাষ্ট্রই যেখানে তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে অসৎদের উল্লম্ফন তো ঘটবেই।

রুবেল : কথার শুরুতেই বলেছিলেন আলমগীর কবির আপনার গুরু। সামগ্রিকভাবে এই মানুষটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করতে চান?

অনুপম : হ্যাঁ, আলাপের শুরুতেই বলেছিলাম, কীভাবে, ঠিক কোন কোন কারণে আমি আলমগীর কবিরের ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কোথায় জানি এও বলেছিলাম, লোকে প্রেমে পড়ে নারীর কিন্তু আমি বোধহয় আলমগীর কবিরের ইন্টেলেকচুয়াল সত্ত্বার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আলমগীর কবির সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার পরিবার আমাকে ভুল শিক্ষা দিয়েছে।’ তিনি ফিজিক্স, গণিত বিষয়ে পড়েছেন। ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়তে গিয়ে বার্গম্যানের সেভেন্থ সিল দেখে উনার চিন্তাধারা পরিবর্তন হয়ে গেলো। পরে উনি লন্ডনের টেমস নদীতে তার সমস্ত সার্টিফিকেট ছিড়ে ফেলে দেন। এসব জেনে আমি তার প্রতি আকৃষ্ট হই। ভাবলাম, লোকটা বলে কী! তার লেখা, তার বাক্য গঠন দেখে অভিভূত হয়ে যেতাম। তিনি ‘হলিডে’ তে লিখতেন, এজন্য আমি হলিডে পড়তাম।

১৯৭০-এ ‘এক্সপ্রেস’ নামের একটি পত্রিকা বের করেছিলেন আলমগীর কবির (এর সঙ্গে জহির রায়হান, কাইয়ুম চৌধুরী, গাজী শাহাবুদ্দিন, শফিক রেহমানও ছিলেন)। আমি সেই পত্রিকার গ্রাহক হলাম; পুরস্কারও পেলাম শ্রেষ্ঠ প্রশ্নকর্তা হিসেবে। আবার তার ‘সিকোয়েন্স’ নামের পত্রিকা বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করতাম। আমার মনে হয়, আলমগীর কবির একজন প্রগতিশীল ও আধুনিক মানুষ। সৃষ্টিশীলের চেয়ে তিনি অনেক বেশি টেকনিকাল ওরিয়েন্টেড ছিলেন। তার কাজে আবেগের উপস্থাপন কম, উনি যুক্তিবাদী। যুক্তির পক্ষে তার সমস্ত সৃষ্টি নিবেদিত ছিলো। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কাজ করেছেন তিনি। তার চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু লক্ষ করে দেখবে, উনি সবকিছুর ওপর মানবিকতাকে বড়ো করে দেখতেন। আলমগীর কবির মূলত ব্যতিক্রমধর্মী কিছু চাইতেন সমাজের জন্য।

তার জীবনকাহিনি নিয়ে একটু ধোঁয়াশা আছে। তিনি অনেকটা বিপ্লবী ঘরানার মানুষ। কবির সবসময়ই চাইতেন, পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী ধ্যান-ধারণা বাদ দিয়ে নতুন কিছু করতে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন মঞ্জুরাকে। পরবর্তী সময়ে তিনি আবার প্রেমে পড়েন জয়শ্রীর। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। আলজেরিয়ায় গেছেন যুদ্ধ করতে; ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে দেখা করেছেন। সবমিলিয়ে তিনি ছিলেন আজীবন মুক্তিযোদ্ধা। রাজনৈতিকভাবে বললে, শিল্প-সাহিত্য-সাংবাদিকতা-চলচ্চিত্র সবক্ষেত্রেই তিনি যুদ্ধ করে গেছেন। তিনি তার চিন্তাধারাকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন।

আলমগীর কবির ইংরেজিতে লেখাপড়া করেছেন। তার বাক্যগঠন একেবারে আলাদা; সেখানে তিনি মুক্তির আভাস দিতেন। তার চিন্তার মধ্যে একটা আলাদা ব্যাপার ছিলো। তার কাজগুলো লক্ষ করলে সেটা বোঝা যায়। আলমগীর কবিরের প্রথম লেখা চলচ্চিত্রবিষয়ক বই ‘সিনেমা ইন পাকিস্তান’; ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে, রক্ষণশীল সমাজের মধ্যে থেকে তিনি চলচ্চিত্রের ইতিহাস লিখেছেন! ১৯৬৯-এ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ফিল্ম ইন্সটিটিউট। ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট করেছেন। সেই ফিল্ম সোসাইটি ভেঙে দিয়ে আবার আলাদা প্লাটফর্ম গড়লেন। সেখানেও তিনি মুক্তি চেয়েছেন, রাজনীতির সঙ্গে আপস করেননি।

আলমগীর কবিররা কিন্তু সেই ৫০-এর দশকেই বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য লড়াই শুরু করেছিলেন। ওই যে লিবারেশন হাউজ করেছিলেন তারা! তাহলে? ওই সময় তিনি জেলও খেটেছেন। একবার তো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার দেখাও হয়েছিলো জেলের মধ্যে। অন্যদিকে আবার তিনি তার ছাত্রদেরকে নতুন মুভমেন্টের মধ্যে নিয়ে গেছেন। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন আলমগীর কবির। দক্ষ সংগঠক হিসেবে নতুন বাহিনী তৈরি করেছেন। আপনি কতোভাবে তাকে মুক্তিযোদ্ধা না বলে পারবেন? সরকারিভাবে চলচ্চিত্রনীতি নিয়ে পরিকল্পনাতেও আলমগীর কবির ছিলেন। ফিল্ম আর্কাইভে কোর্স করিয়েছেন, এর সমন্বয়কও ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর চলচ্চিত্রের ওপর তিনি আরেকটি বই লিখেন। এদেশের চিত্রনাট্যবিষয়ক প্রথম বইও কিন্তু আলমগীর কবিরেরই।

স্বাধীনতাযুদ্ধে কতোভাবে আলমগীর কবির ভূমিকা রেখেছেন। সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে কাজ করেছেন; স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অনুষ্ঠান করতেন। বিপ্লবী সরকারের তিনি ছিলেন চিফ রিপোর্টার। তিনি অগ্রসৈনিক। তাকে কতোভাবেই না আমরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে পারি।

রুবেল : আলমগীর কবিরের চলচ্চিত্রকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

অনুপম : তার চলচ্চিত্রের প্রধান বিষয় হলো নতুনত্ব। আমাদের প্রথাগত দর্শক, নির্মাতার মতো তিনি ছিলেন না। প্রথমত, তিনি তাত্ত্বিক ছিলেন। কিন্তু আলমগীর কবির যে মাপের জ্ঞানসাধক ও তাত্ত্বিক, সেই মাপের পাঠক, দর্শক-সমাজ তিনি পাননি। তার চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু অনেকের বোধগম্যতার বাইরে ছিলো।

রুবেল : দর্শক আর পাঠকের বোধগম্যতার অভাবকে দায় দেওয়াটা কি ঠিক হলো?

অনুপম : না, না। আমি বোঝাতে চেয়েছি, উনি সময়ের চেয়ে অনেক অগ্রগামী ছিলেন। অনেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র বানিয়েছে, কিন্তু তার ধীরে বহে মেঘনা একেবারেই আলাদা। তিনি এটাকে নির্মাণ করেছিলেন সিনেমা ভেরিতে শৈলীতে। তিনি ডকুমেন্টরি ও ফিকশনের সমন্বয়ে চলচ্চিত্র বানিয়েছেন। তিনি তার চলচ্চিত্রে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মানুষ হত্যা, ধর্ষণ, রাজাকার দেখাননি। একেবারেই ভিন্ন রকম ন্যারেটিভ বিধায় ধীরে বহে মেঘনা অনেকে বুঝতেই পারেনি। সমালোচকরা তো এও বলেছে, এটি অক্ষম চলচ্চিত্র।

তার সূর্যকন্যা চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র লেনিন ইন্দিরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, কেউ অফিসে আসবেন না, বেতন নিয়ে যাবেন। এখানে কোনো ক্ষুধা থাকবে না। এই চরিত্রটির মাধ্যমে আলমগীর কবির তার স্বপ্নের কথা বলতে চেয়েছেন। অন্যদিকে রাসেল চরিত্রে অভিনয় করেছেন আহসান আলী সিডনি। রাসেল ভোগবাদী সমাজের প্রতিনিধি। সেখানে নারী মুক্তির কথাও বলার চেষ্টা করেছেন তিনি। একদল নারীকে ব্যবহার করছেন, আরেক দল নারীর সঙ্গে প্রেম করে তাকে জীবন্ত করে তুলেছেন। এই যে বৈপরীত্য, এটা বুঝতে হলে মাথা দরকার।

তার পরের চলচ্চিত্র সীমানা পেরিয়ে। ৭০-এর জলোচ্ছ্বাস হলো; ভোগবাদী সমাজের লোকজন তখন বিদেশি কালচার নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু একটা সময় জলোচ্ছ্বাস এসে সবকিছু এক করে ফেলে। পরিস্থিতি মানুষকে রিয়ালাইজেশন দেয় জীবন সম্পর্কে। এই যে চলচ্চিত্রটির নাম সীমানা পেরিয়ে; এই সীমানা কোন সীমানা--হিউম্যান ব্যারিয়ার, ধনী-দরিদ্রের প্রভেদ, মূল্যবোধের প্রভেদ। আলমগীর কবির এই প্রভেদের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। আমার দৃষ্টিতে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র রূপালী সৈকত। এর নির্মাণকৌশল অন্যরকম। সেনাবাহিনী মারছে, মারামারির দৃশ্যের কাটগুলো দেখো। একটা কাট এমন--বুলবুল আহমেদ সাংবাদিক, তিনি টাইপ রাইটারে কাজ করছেন, তারপর কাট করে এক ধাক্কায় ঢাকা দেখানো হলো। এই যে কাট, এটা তখনকার দিনে বাংলাদেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। কেউ কক্সবাজারে কাজ করছেন, তার পরের শটে একেবারে ঢাকার পত্রিকা অফিস। এই কাটে কোনো জার্কিং নেই। এ ধরনের জাম্পকাট বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কেউ আগে ব্যবহার করেনি। এই যে কৌশল, এগুলোও কিন্তু স্টাইলের দিক থেকে একেবারে আলাদা।

রুবেল : আমরা যে তাকে ধরতে পারিনি, এটা আমাদের ব্যর্থতা হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে একেবারেই বোঝাতে না পারার যে ব্যর্থতা, সেটার দায় কি তারও নয়?

অনুপম : আমি এটাই বোঝাতে চেয়েছি যে, তিনি সময়ের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। এই অগ্রগামীকে বুঝতে হলে তাকে তো সার্চ দিতে হবে।

রুবেল : তার মৃত্যুকে আপনি কীভাবে দেখেন? চলচ্চিত্রে এই মৃত্যুর প্রভাব কতোখানি?

অনুপম : অবশ্যই এর বড়ো প্রভাব আছে। আলমগীর কবির বেঁচে থাকলে হয়তো আরো অনেক কিছু হতো। তিনি সরকারি অনুদান কমিটি, সেন্সরবোর্ড, ফিল্ম ইন্সটিটিউটে থাকলেও স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন। আবার সরকারকে সহযোগিতাও করেছেন। তিনি সমন্বয়বাদী ছিলেন। চলচ্চিত্রের স্বার্থে তিনি সবকিছু করেছেন; স্যাক্রিফাইস করেছেন নিজেকে। তিনি এগুলো আমাকেও বলেছেন। কারণ উনার সঙ্গে আমি ‘সিকোয়েন্স’ পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত ছিলাম; আমি উনার ছাত্র ছিলাম। আমি উনার সঙ্গে বেটার সিনেমা ফ্রন্ট করেছি। যাহোক, তার মৃত্যু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য হঠাৎ প্রগতিশীলতার ফিতাটা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো। আলমগীর কবিরের মৃত্যু চলচ্চিত্রের চলমান রিল ছিড়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার।

বি. দ্র. এই সাক্ষাৎকার/প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৬তম সংখ্যা , জানুয়ারি ২০১৯ প্রথম প্রকাশ হয়েছে।

(চলবে)

রুবেল পারভেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি বণিক বার্তায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

rubelmcj@gmail.com

https://www.facebook.com/rubel.pervez.14

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন