Magic Lanthon

               

প্রকাশিত ১৭ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

যৌনতার হাত ধরেই কি বাংলা ছবি সাবালক হবে?




নারী অভিনয়শিল্পীরা শরীরের কতোটুকু দেখাতে পারবে, কতোটুকু দেখালে ‘অশ্লীল’ হবে; আবার পুরুষ অভিনয়শিল্পীদের ক্ষেত্রে নিয়মের বালাই নেই কেনো--এই বিতর্ক দীর্ঘদিনের। তবে এই বিতর্ককে আরো জোরালো করে ছত্রাক (২০১১) নামের একটি চলচ্চিত্র। যার নির্মাতা শ্রীলঙ্কান বিমুক্তি জয়সুন্দরা। কোনোভাবে চলচ্চিত্রটির একটি ‘ন্যুড’ ভিডিও ক্লিপ ইন্টারনেটে প্রকাশ পায়, যেটি কিনা মূল চলচ্চিত্রে দেখানো হয়নি। যদিও সেই ক্লিপে টালিগঞ্জের পাওলি দাম ও অনুব্রত’কে দেখা যায়; কিন্তু ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে কেবল পাওলিকে নিয়ে; বাংলা চলচ্চিত্রের মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ রকম পরিস্থিতিতে ‘যৌনতার হাত ধরেই কি বাংলা ছবি সাবালক হবে?’ শিরোনামে ভারতের স্যাটেলাইট চ্যানেল ‘স্টার আনন্দ’ আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে সুমন দে’র সঞ্চালনায় উপস্থিত হন সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা পাওলি দাম ছাড়াও গৌতম ঘোষ, অঞ্জন দত্ত, ঋতুপর্ণ ঘোষ, হরনাথ চক্রবর্তী, প্রীতম, চন্দ্রিল ভট্টাচার্য, সুমন মুখোপাধ্যায়পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলা চলচ্চিত্র, নারী স্বাধীনতা, যৌনতার নানা দিক ও সেন্সরশিপ। সেই আলোচনার ভিডিওটি ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করে ম্যাজিক লন্ঠন-এর পাঠকের জন্য অনুলিখন করা হয়েছে। যে কেউ চাইলে অবশ্য এই লিঙ্কটিতে https://www.youtube.com/watch?v=OOpDLGkCtjg; retrieved on: 10.10.2016 ঢু মেরে আসতে পারেন মূল ভিডিওটি দেখার জন্য। আড্ডার তৃতীয় ও শেষ পর্ব এবার প্রকাশ করা হলো।

পাওলি দাম : উনি (প্রীতম) যেটা প্রথমে বলছিলেন, ক্লিপটা প্রোডাকশন থেকে বেরিয়ে গেছে। প্রথমত বলি, আমাদের টিমে নানা দেশের ক্রু ছিলো। ফিল্মটি শুটিং হয়েছিলো সিঙ্ক সাউন্ডে, সেখানে সাউন্ড রেকর্ডিস্ট ছিলো ফরাসি। আমাদের এডিটিং হয়েছে ভিয়েতনামে। তারপর আরো কিছু পোস্ট প্রোডাকশন হয়েছে প্যারিসে। তো অনেক জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ হয়েছে। ফলে কোনো জায়গা থেকে কোনোভাবে লিক হয়েছে কি না, কেউ ইচ্ছাকৃত লিক করেছে কি না, এটা বলা মুশকিল। তবে আমাদের যদি সেরকমভাবে পাবলিসিটি করার ইচ্ছা থাকতো, তাহলে যখন শুটিং হয়েছে; তখনই বলে দিতে পারতাম। ইনফ্যাক্ট পার্সোনালি এই শটটার ব্যাপারে অনেকে জানতো--ডিরেক্টর মৈনাক (মৈনাক ভৌমিক, চলচ্চিত্রনির্মাতা) জানতো। অনুব্রত ও আমি দুজনে বলেছি, আমরা এরকম একটা শট্ দিয়েছি, আরো কয়েকজন জানতো; কিন্তু সেটা পার্সোনাল লেভেলে। সেটা প্রফেশনালি আমি কোনোদিনও চাইনি, এটা নিয়ে আলাদা করে কিছু বলতে। যখন সিনেমাটা লোকে দেখবে, সিনটা যদি থাকে, শটটা যদি থাকে--তখন দর্শক এমনিতেই দেখবে। এখানে আমার আলাদা করে বলার নেই।

গৌতম ঘোষ : শটটার মধ্যে আমি তো কোনো অশ্লীলতা দেখি না!

পাওলি : আর একটা জিনিস ...।

গৌতম : কিন্তু কেনো?

পাওলি : তুমি সিনেমা বোঝো বলে; কিন্তু যারা বোঝে না বা বুঝতে চায় না, তাদের তো বক্তব্য থাকতেই পারে।

প্রীতম : আমি কিন্তু একবারও শটটা শ্লীল বা অশ্লীল, এই যুক্তিতে যাইনি!

পাওলি : আমি এতোক্ষণ তোমার (প্রীতম) কথা শুনেছি। যেদিন আমাদের প্রেস কনফারেন্স ছিলো--ফ্লপ ই’র, নামটাও অদ্ভুত--ঠিক তার আগের দিন দুপুরবেলা অব্দি আমাকে ফোন করা হয়েছিলো। ডিরেক্টর-প্রোডিউসার নিজে আমাকে ফোন করেছিলেন, আমি যখন মুম্বাইতে তখনো ফোন করেন--প্লিজ, তুমি কি একবার আসতে পারবে?

ফ্লপ ই’র আগে ততোদিনে আমার আরেকটা সিনেমা রিলিজ হয়ে গেছে, সংঘমিত্রা দি’র (সংঘমিত্রা চৌধুরী, চলচ্চিত্রনির্মাতা) সিনেমা। সেটা গোয়িং অন দ্য ভেইল; সেটা নিয়ে তাদের কিন্তু কোনো রকম সমস্যা হয়নি। আমি তাদের প্রেস কনফারেন্সে গিয়েছি। সেখানে ছত্রাক নিয়ে কোনো আলোচনা বা কোনো প্রশ্ন আমাকে কেউ করেনি ওই মুহূর্তে। আমি যে কাজটার জন্য গেছি, যে সিনেমার জন্য গেছি; সেটা নিয়েই আলোচনা হয়েছিলো।

ফ্লপ ই’র লোকজন তাদের প্রেস কনফারেন্সের আগের দিন দুপুর অব্দি আমাকে ফোন করেছে। যেই উনারা বুঝতে পারলো; আমার পক্ষে সত্যিই আসা সম্ভব নয়, কারণ আমি কলকাতায় ছিলাম না। তখন উনারা হয়তো ...।--আমি অনেক রাতে, প্রায় ১১টার পর খবরটা পেয়েছি; তাও ফ্রম অ্যা জার্নালিস্ট। আমাকে নিয়ে ফ্লপ ই টিমের যদি সেরকম কোনো বক্তব্য থাকতো, তাহলে উচিত ছিলো প্রোডাকশন থেকে আমাকে সেটা জানানো। আমার মনে হয়, এটা ডিরেক্টরের ভূমিকার মধ্যে পড়ে।

এখানে সবাই বসে আছে, অভিয়াসলি আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি এটা, এটা ডিরেক্টরের কাজের মধ্যে পড়ে। ডিরেক্টর যেহেতু একজন অ্যাক্টরকে ডিরেকশন দেন, তাকে নিয়ে যখন প্রোডাকশন থেকে কথা ওঠে, সেটা সামলানোর দায় তার (ডিরেক্টর)। প্রোডাকশন থেকে যেকোনো ডিসিশন আসতেই পারে, সেটা ডিরেক্টরের আমাকে জানানো উচিত। উনার সিনেমাবোধ থেকে উনি এই ডিসিশনটা নিয়েছেন, সেটা ইউনিভার্সাল ডিসিশন নাও হতে পারে। উনি বা উনারা যে ডিসিশনটা নিয়েছেন, সেটা অন্তত আমাকে জানানো উচিত ছিলো! আমি তো থার্ড পারসন থেকে জেনেছিলাম এটা। দুপুরের পর থেকে ডিসিশনটা চেঞ্জ হয়ে গেলো। ছত্রাক তো তার আগে থেকেই চলছিলো। এটা আমার কাছে খুব কনফিউজিং।

গৌতম : একটু উত্তরণ খুঁজি। (সবার হাসি)

সুমন দে : এবার সুমনের কাছে যাবো।

সুমন মুখোপাধ্যায় : আমি এতোক্ষণ কিছুই বলিনি। চলছে তো চলছেই। একটা জিনিস আমার প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিলো, একদম শুরুতে আমি একটু মিস করেছি। যৌনতা এবং যৌন ব্যবহার, সেক্সুয়ালিটি অ্যান্ড সেক্সুয়াল অ্যাক্ট এই দুটার মধ্যে বিশদ ফারাক আছে। আমরা এই মোশনটার নাম দিয়েছি ‘যৌনতার হাত ধরে বাংলা সিনেমা সাবালক হলো কি না’। প্রথম কথা হলো, এই মোশনটার বিরুদ্ধে আমার বেশ গভীর একটা আপত্তি আছে। আপত্তিটা হচ্ছে, বাংলা সিনেমা অনেক আগে সাবালক হয়েছে। আমার প্রশ্নটা হলো, যৌনদৃশ্য থাকলেই কি যৌনতা? অরণ্যের দিনরাত্রিতে যৌনতা যেভাবে ছিলো, গভীর যৌনতা; সেখানে যৌনতা নিয়ে অনেক কমেন্ট করা হয়েছে, অনেকগুলো প্রকাশও হয়েছে। সুতরাং প্রথমে একটু পরিষ্কার জেনে নেওয়া দরকার, যৌনদৃশ্য থাকলেই সেখানে যৌনতার কথা বলা হচ্ছে না!

যৌনতাটা একটা প্যারাডাইম, একটা পরিকল্প, যেটার মধ্যে অনেক কিছু থাকে। একটা ভাষার মধ্যে যৌনতা থাকে, ভাষার হেজেমনি থাকে, সেটা যে সবসময় যৌনদৃশ্য দিয়ে বোঝাতে হবে--এমন নয়। যৌনতা কিন্তু ভারতীয় এবং বাংলা চলচ্চিত্রে গভীরভাবে এসেছে, নানা প্রসঙ্গে এসেছে; আগেও এসেছে এবং ইদানীংও অনেক সিনেমায় আসছে। যৌন ব্যবহার নিয়ে অনেক কথা হয়েছে এবং তার সঙ্গে যৌনতার নানা প্রসঙ্গ এসেছে। সেখানে কিন্তু বাংলা সিনেমা অনেক আগেই তার সাবালকত্বের প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনাকে ঘিরে যেটা ঘটছে, সেটা নিয়ে বাংলার সাংস্কৃতিক, সামাজিক মানুষেরা বোধ হয় নাবালক আচরণ করছে!

গৌতম : একেবারেই।

সুমন : বাংলা সিনেমা অনেক আগেই সাবালক হয়েছে; গৌতম দা, অঞ্জন দা, ঋতুর সিনেমা যৌনতা নিয়ে অনেক কথা বলেছে; সেগুলোতে গভীর প্রকাশ আছে যৌনতার; সেখানে তারা যৌনতা নিয়ে অনেক প্রশ্নও তুলেছেন। তার মানে সেখানে যৌনদৃশ্য দেখাতে হয়নি। এবং যে সমাজে যৌনদৃশ্য নিয়ে কোনো বাধা নেই, কোনো সেন্সরশিপ নেই, সেই সমাজ যদি ইউরোপ বা প্রথম বিশ্বের সমাজ হয়; সেখানেও তো অনেক পরিচালক আছে, যারা যৌনতা নিয়ে অনেক গভীর প্রশ্ন তুলেছে--যৌনদৃশ্য বাদ দিয়ে। আমার মনে হয়, যৌনদৃশ্য ও যৌনতার মধ্যে পার্থক্যটা দর্শকের সামনে তুলে ধরা দরকার। যৌনদৃশ্য আর যৌনতা এক নয়। ওটা (যৌনতা) অনেক বড়ো প্যারাডাইম। যেমন, যদি আমি ইরানিয়ান সিনেমার কথা বলি, তারা ভীষণভাবে সেন্সরড। সেখান থেকে গত ৩০ বছরে আন্তর্জান্তিক চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ অনেক কীর্তি বের হয়েছে। সেখানে এক ফোঁটা কোনো যৌনতা নেই; যৌনদৃশ্য তো দূরের কথা, যৌনতা নিয়ে কোনো প্রসঙ্গই উত্থাপন করা যায় না। তারা তো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে সাবালক এবং প্রথম সারির (পরমব্রত : সেটা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না)। সেখানে যৌনতা ...।

গৌতম : ইরানি সিনেমায় যে যৌনতার প্রসঙ্গ তোমরা এনেছো, সেখানে এর সঙ্গে একটা পুরনো পারসিয়ান সংস্কৃতি জড়িয়ে রয়েছে।

সুমন : এগ্জেক্টলি, সেখানে শিরিন বলে যে সিনেমাটা আব্বাস কিয়ারোস্তামি করেছেন; সেটা শুধু মেয়েদের ক্লোজ আপ। আমি যেটা বলতে চাইছি, বা যে প্রসঙ্গে আসতে চাইছি, সবসময়ে যৌনদৃশ্য আর যৌনতার মধ্যে সম্পর্ক থাকে না। যেখানে শিল্পীর অবাধ স্বাধীনতা আছে; যেমন, নুরি বিলজি সেয়লান, টার্কিশ ফিল্মমেকার। তার সিনেমায় অসম্ভব শৈল্পিকভঙ্গিতে যৌনদৃশ্য এসেছে এবং যৌনতা প্রসঙ্গে কথা উঠেছে। তারপর সাই মিয়াঙ লিয়াঙ (Tsai Ming-liang) তাইওয়ানের ডিরেক্টর; তার সিনেমাও অসম্ভব যৌনদৃশ্যে ভর্তি। তার দ্য ওয়েওয়ার্ড ক্লাউড সিনেমার প্রধান চরিত্র একজন পর্নস্টার। গোটা সিনেমাটা কিন্তু যৌনদৃশ্যে ভর্তি। সে দৃশ্য যেমন শিল্পীর দৃষ্টিতে ভালো লাগছে, তেমন কিয়ারোস্তামির সিনেমাও ভালো লাগছে।

যৌনতার হাত ধরে সাবালক বা নাবালক হওয়ার প্রসঙ্গটা আমার কাছে প্রথমত অবান্তর লাগছে। আমার মনে হয়েছে, আমাদের সমাজে কতোগুলো সঙ্কীর্ণতা আছে। সেই সঙ্কীর্ণতা সব ক্ষেত্রে দেখা যায়--ভাষা, চলচ্চিত্র, নাটক। আমি যখন ‘কাঙ্গালমাসা’ নাটক করি, তখন সে ভাষা নিয়ে মারাত্মক ঝামেলা হয়েছিলো; পরে নবারণ ভট্টাচার্যের উপন্যাস নিয়েও হয়েছিলো। আমার মনে হয়, আমাদের কতোগুলো সঙ্কীর্ণতা রয়েছে, সেটা মূলত যৌনদৃশ্য নিয়ে। যৌনতা নিয়ে আমাদের যে গভীর প্রশ্ন, সেটা সত্যজিৎ বাবু তুলেছেন এবং কোমল গান্ধার-এর কথা ঋতুও বললো। এই যে পথের পাঁচালীতে শুয়ে থাকে চুল বেনী করে, তার মধ্যে অসম্ভব যৌনতা আছে, সেক্সুয়ালিটি রয়েছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে বাংলা চলচ্চিত্র এতো উচ্চাঙ্গে পৌঁছেছে, সেখানে আমাদের যারা দর্শক, যারা এটা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করছে--সেটা মিডিয়া হোক, সাধারণ মানুষ হোক, যে জ্যাঠার কথা চন্দ্রিলও বললো, এগুলো কিন্তু আমাদের সমাজে চিরকালেই ছিলো। আমরা বার বার বলে আসছি, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমরা কোনো জ্যাঠামো চাই না। আমাদের কথা আমাদের বলতে দিন; বিভিন্ন শিল্পী বিভিন্ন স্বরে কথা বলবে। কেউ যৌনদৃশ্য দিয়ে কথা বলবে, যৌনদৃশ্য বাদ দিয়ে যৌনতার কথা বলবে, রাজনীতির কথা বলবে। এই যে বিবিধ রাজনৈতিক স্বর, সামাজিক স্বর, প্রশ্ন, সেটা যে কারো হোক, তা উঠে আসুক। মানুষের কাছে অধিকার দেওয়া হোক, তা প্রত্যাখ্যান বা গ্রহণ করার। কারণ তারাই প্রধান।

সুমন দে : সুমন, আমি এই জায়গায় অঞ্জন দার একটা কথা নিয়ে তোমার কাছে যাই। তুমি যে শব্দটা ব্যবহার করছো, সঙ্কীর্ণ--এটার জন্য কি তুমি পরিচালক হিসেবে প্রভক হচ্ছো? আমি একটা উচ্চাঙ্গের দৃশ্য করবো কিন্তু রূপকধর্মী। যেহেতু সরাসরি যৌনতা দেখানো যাবে না, কারণ সঙ্কীর্ণ দর্শক আমাকে রিজেক্ট করতে পারে। তাহলে এটা কি পরিচালকের ওপর চাপও বটে?

সুমন : আমি একটা কথা বলি, মানুষ কিন্তু সামাজিকভাবে সঙ্কীর্ণ নয়। কী হচ্ছিলো (সুমন দে : তাহলে কাদের সঙ্কীর্ণতা?), আমাদের ইতিহাস যেভাবে লিখা হচ্ছে--সেন্সরবোর্ড যেটা করলো স্বাধীনতার পর থেকে, তারা তো একটা মাপকাঠি তৈরি করলো, এটা শ্লীল ওটা অশ্লীল ভাষা, এটা শ্লীল ওটা অশ্লীল দৃশ্য। আমার যতোদূর মনে পড়ে ১৯৮৬-এর দিকে--শ্লীলতা-অশ্লীলতা নিয়ে ভয়ঙ্কর প্রশ্ন উঠেছিলো, সুভাষ চক্রবর্তীর প্রসঙ্গে। (সুমন দে : তখন অপসংস্কৃতি কথাটা জন্ম নিলো নতুন করে।) হ্যাঁ অপসংস্কৃতি কথাটা। (ঋতুপর্ণ ঘোষ : তার আগে একটা গান নিয়ে) হ্যাঁ এগ্জেক্টলি। আমরা কিন্তু নতুন নতুন বয়ান, নতুন নতুন পরিকল্প সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টাছি। (সুমন দে : তাহলে এই সঙ্কীর্ণতাটা কাদের?) কিন্তু একটা গভীর লেভেলে ফান্ডামেন্টালি কতোগুলো মরালিটির কঠোর চাপ রয়েছে সমাজ থেকে। সেটা কিন্তু আমাদের ইতিহাস তৈরি করেছে, আমাদের সামাজিকতা তৈরি করেছে। ধরুন, রবীন্দ্রনাথের যে নতুন চিত্রাবলি প্রকাশ হয়েছে, সেখানে অনেক উইমেন ন্যুডের সঙ্গে মিল আছে। (গৌতম : আগে বের হয়নি কিন্তু) আগে বের হয়নি এবং একটা চিত্রের কথা শোনা যায়, আমি এটার তথ্য সম্পর্কে জানি না। একটা উত্থিত যৌনাঙ্গ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের একটা ন্যুড ছবি আছে। এটা কিন্তু এখনো প্রকাশ হয়নি। ফলে এটা সম্বন্ধে আমাদের সামাজিক মোড়ল ও সংস্কৃতির হর্তাকর্তারা চিরকাল একটা মরাল কোড তৈরি করতে চেয়েছে।

চন্দ্রিল ভট্টাচার্য : একটা লাইন শুধু বলে নিই। যার জন্য রবীন্দ্রনাথকে লিখতে হয়েছে--ঝরে যায়, উড়ে যায় গো আমার মুখের আঁচলখানি। এখানে মুখে আঁচল থাকতে পারে না, উনিও জানেন।

সুমন : এগ্জেক্টলি, ফলে আমাদের অবগুণ্ঠন দিয়ে দিয়ে চলতে হচ্ছে। কিন্তু যে সমাজে এই অবগুণ্ঠনটা বাধ্যতামূলক, সেখানে তারা তাদের স্বার্থে অবগুণ্ঠনটা রেখেই কিন্তু একটা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের ভাষা তৈরি করতে পেরেছে--আমাদের উপায় ছিলো না। আমাদের আগের প্রজন্মের পরিচালকদের সত্যিই উপায় ছিলো না। যেখানে বিশ্বভারতীর মিউজিক বার চারুলতা’কে ওইভাবে আটকে দেয়--আমাদের উপায় ছিলো না। কিন্তু আমরা নতুন প্রজন্মের যারা পরিচালক--আমি নতুন পরিচালক বলতে গৌতম দাকেও সেই প্রজন্মের মধ্যে ধরে নিচ্ছি। আমরা কিন্তু একটা বোধ--আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের যে নতুন নতুন বিবিধ ভাষার পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে, এর মধ্যে যৌনদৃশ্য রয়েছে, যৌনতা নিয়ে আরো গভীর প্রশ্ন রয়েছে--যেগুলো আমাদের কতোগুলো পরিকাঠামোগত কারণে আমরা প্রকাশ করতে পারছি না।

আমার মনে হয়, আর একটা সিনেমার কথা উল্লেখ করা উচিত। যেটা কিছুদিন আগে রিলিজ হয়েছে, গান্ডু--যেটি সেন্সরবোর্ডে যায়নি। আমি কিন্তু এখানে শিল্পের মান নির্ণয় করছি না--সিনেমাটা ভালো কি মন্দ, শিল্পগুণে উত্তীর্ণ হলো কি না, কতোটা উৎকর্ষ--এটা তো সবুজ-লাল খাতায় লেখা নেই! তবে আমাদের বহু স্বর তৈরি সমাজে, আমরা এমন এক সামাজিক জায়গায় এসেছি, সেখানে এই বহু স্বরকে বলতে দাও। বিরোধীদেরকেও বলতে দাও, নিজেও বলো, আলোচনার জায়গাটা খোলা থাকুক। জোর করে কোনো কিছু আটকে দিও না, অপ্রয়োজনীয় সেন্সরশিপ তৈরি করো না।

একটা ছোট্ট গল্প বলি, ঋত্বিক ঘটকের কথা উঠেছে, দালির (সালভাদর দালি, পরাবাস্তববাদী চিত্রকর, ১৯০৪-১৯৮৯) কথা উঠেছে। আমরা আত্মজীবনী পড়েছি, সেখানে দেখেছি বহু মানুষ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সমাজের নানাবিধ ঘটনা ঘটিয়েছে। তারা অসম্ভব ভালো সিনেমা করেছে, কবিতা লিখেছে, ছবি এঁকেছে। আমরা দেখলাম, এক শ্রেণির লোক কেবল তাদের মদ্যপান, গঞ্জিকা সেবনটা নিলো, রাস্তায় গিয়ে বিশ্রী কাণ্ডকারখানা করলো; কিন্তু তারা চলচ্চিত্রটা করতে পারলো না, কবিতাটাও লিখতে পারলো না। ফলে তারা হয়ে গেলো মদের নেশারু। আমরা যেনো এই মডেলটা না গ্রহণ করি। মানে ওই শিল্পী ওইভাবে গড়ে উঠেছে, তা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রটা ভালো বানিয়েছে। ফলে একটা যৌনদৃশ্য থাকলেই যে একটা সিনেমায় উদার ও সুন্দর এক্সপ্রেশন প্রকাশ হয়ে গেলো, তা কিন্তু নয়। (পাওলি : সেটা একেবারে ঠিক।) 

পাওলি এখানে ইমাটিয়্যারাল। পাওলি যদি কোনো আক্রমণের মধ্যে পড়ে, সেটা খুব ভুলভাবে পড়ছে; সেটা অকারণে পড়ছে। এখানে পাওলি একজন অভিনয়শিল্পী, সে স্ক্রিপ্ট পড়েছে। ডিরেক্টর বলেছে তোমাকে এই দৃশ্য করতে হবে; সে রাজি হয়েছে, সম্মতি দিয়েছে এবং সে এটা করেছে। (পাওলি : এটাই আমি বলেছি। একজন অ্যাক্টর হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব।) সে যদি প্রথমে বলতো, আমি এটা করবো না। যেমন, জুলিয়া রবার্টস তো (হলিউডের বিখ্যাত অভিনয়শিল্পী) একটা কথা বলেছিলো, আই উইল নট অ্যাকসেপ্ট ন্যুডিটি ইন সিনেমা। আই অ্যাক্ট উইথ ক্লথস, হোয়েন আই অ্যাক্ট ক্লথস, আই পারফর্ম। হোয়েন আই থিঙ্ক সামবডি অ্যাক্ট উইদআউট ক্লথস, ইট ইজ ডকুমেন্টরি; ইটস নট অ্যাক্টিং। তার মতো অভিনয়শিল্পীর এই মত; আবার জুলিয়েট বিনোস-এর মতো অভিনয়শিল্পীর কাছে অবাধ্য যৌনতা, শরীর কোনো কিছু নয়।

আমার মতে সব মত থাকুক, যে যেভাবে চলচ্চিত্রকে দেখে, সেটা আমাদের খুলে দেওয়া দরকার। কোনো মোড়লগিরি চলবে না। সেন্সরশিপ নিয়ে আমার কথা--চতুরঙ্গও অ্যাডাল্ট, কেনো, হস্তমৈথুনের দৃশ্য ছিলো--এই অ্যাডাল্টের প্যারামিটারগুলো কে ঠিক করবে? আমাদের স্বাধীনতার এতো বছর হয়ে গেলো; আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে এতো রদবদল হয়ে গেলো। অথচ ইরানি সিনেমা থেকে আমরা আরো বেশি কনজারভেটিভ। ইরানিরা ভালো আছে, তারা চাপে আছে, কিছু করতে পারে না; অনেক কিছু ভাবতে হয়। আমাদের সামনে অবাধ স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটছে, অথচ কিছুই করতে পারছি না; কিছুই করতে দেওয়া হচ্ছে না। তার চেয়ে বরং সিনেমা করে সেন্সরে না দিয়ে সোজা চলে যান মানুষের কাছে; ইউটিউবে আপলোড করুন।

হরনাথ চক্রবর্তী : সে সিনেমা হচ্ছে তো; সিনেমা করে সেন্সর না নিয়ে ভারতের বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

পাওলি : আমি একটু বলি সুমন দা। সুমন দা যেগুলো বলেছে, ঠিকই বলেছে। ন্যুডিটিই মানে যে ফিল্মটা একটা মারাত্মক জায়গায় গেলো, সেটা নয়। আবার ন্যুডিটি যে সেল্যেবল পয়েন্ট সেটাও না; আবার থাকা মানে খারাপ সেটাও নয়। একেকটা সিনেমা তো একেক রকম হয়। যে রকম আমি মনের মানুষ-এর কথা বলি, লালন আর কলমির মধ্যে একটা দৃশ্য ছিলো; অন্তরঙ্গ দৃশ্য। সেটা গৌতম দা আরো ভালো বলতে পারবেন। উনি পুরো ডিটেইলটা আমাকে বলেছিলেন, এই এই ভাবে হবে। গৌতম দা ওইভাবে শটটা নিয়েছিলেন--কলমি যখন আস্তে আস্তে নিচে নেমে যায়। গৌতম দা ওটা এইভাবে টেক করেছিলো, অন্য কেউ মানে অঞ্জন দা, সুমন দা হলে হয়তো অন্যভাবে নিতো। এটা ভেরি করে ফ্রম ডিরেক্টর টু ডিরেক্টর।

সুমন : তোমার মনে আছে, ইউনিভার্সাল সিনেমাটা। ওই সিনেমাটা একটা যৌন অ্যাক্ট, দ্য হোল ফিল্ম ইজ ...। অথচ সিনেমাটা দেখে তোমার (সবাইকে উদ্দেশ করে) একবারও মনে হয়, সেক্সুয়াল অ্যাক্ট দেখা হচ্ছে! মনে হয় না। একটা যন্ত্রণা লাগে, একটা বিষাদ লাগে।

পাওলি : এটাই ফিল্ম!

পরমব্রত : আমি তো কেঁদে ফেলেছিলাম; সেটা অন্য কথা।

সুমন : সেটা অন্য কথা, অন্য ধরনের।

পাওলি : সুমন দা আমি বলছি, সেটার জন্য পুরো সিনেমাটা দেখা দরকার। একটা ক্লিপ দেখে বা একটা কিছু দেখে মন্তব্য করা ঠিক নয়।

সুমন : এতো আলোচনাইবা কেনো হচ্ছে একটা ক্লিপ নিয়ে, আমি সেটাই বুঝতে পারছি না!

পাওলি : শকিং!

গৌতম : আমার মনে হয়, ক্লিপ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না, আলোচনা হচ্ছে ...।

সুমন : আমরা একটা অ্যাটিটিউটের বিরুদ্ধে আলোচনা করছি।

ঋতুপর্ণ : একটা অ্যাটিটিউট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

সুমন দে : আমি পরমব্রতের কাছে যাবো। পরম দুটি শব্দ ব্যবহার করলো, পরিকাঠামো আর সঙ্কীর্ণতা। সুমন বলছে, বৃহত্তরও মানুষ যেখানে আছে, সেখানে সঙ্কীর্ণতা নেই; সিস্টেমের কোথাও সঙ্কীর্ণতাটা আছে। তুমি যখন পরিচালনার কাজ করো, বা পরবর্তী সময়ে করবে, তখন কোথাও তোমার এই পরিচালকের সৃষ্টিশীলতা কি এই মাপকাঠিগুলো বিচার করবে? সমাজ কতোটা নিবে, কে কতোটা বলবে; এটা কি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে? এই মুহূর্তে ২০১১-এ দাঁড়িয়ে!

পরমব্রত : সুমন দা, আমার কাছে এটা বড়ো একটা টাইক্রোমিটিয়া। তার কারণ হচ্ছে,--আমি পার্সোনালি আজকের দিনে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ফিল দ্যাট, আই উড ওয়ান্ট টু চ্যালেঞ্জ দ্যাট। আমার একটা জিনিস মনে হয়, প্রত্যেক জায়গায় নিজস্ব লোকাল রিয়্যালিটি থাকে। সুমন দা (সুমন মুখোপাধ্যায়) ইরানের প্রসঙ্গটা তুলে যেটা বলছিলেন, কিন্তু একটা জিনিস আমার অদ্ভুত লাগে, বাংলা সিনেমা সম্বন্ধে একটা আলাদা ব্যাপার আছে, যেটা ঋতু দা একটু আগে বললো। আমার কাছে মনে হয়, এখানে বাংলা সিনেমা কথাটা অপমানজনক। তার কারণ, আমার কাছে মনে হয়, বাংলা কিন্তু অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় অনেক বেশি লিবারেল, এটা আমি অন্তত বিশ্বাস করতে চাই। আমি কি কথাটা খুব বেশি ভুল বলছি? উত্তর ভারতে আমার প্রচুর বন্ধু আছে; স্পেশালি বিদেশে আমি দেখেছি, দক্ষিণ ভারত থেকে যারা পড়তে যায়, দৈনন্দিন বিষয়ে তারা অনেক বেশি সঙ্কীর্ণ।

যদি বিষয়টাকে সঙ্কীর্ণ বলি, এমনকি তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে শ্রেণি বা কাস্ট নিয়ে সচেতন। বরং সেখানে আমরা অনেক বেশি লিবারেটেড, হিন্দু-মুসলমান বিয়ে, এস কমপেয়ার টু দ্য কান্ট্রি এখানে বেশি হয়। (সুমন দে : জাতপাতের রাজনীতি কম হয়।) এইখানে কাম টু দ্য কোয়েশ্চেন অব, সুমন দা (সুমন মুখোপাধ্যায়) বললেন, ঋতু দা সাপোর্ট করলেন--একটা বিরাট ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আমাদের ইনফ্যাক্টচারের জায়গায় এগ্জিস্ট করে। একদিকে আমাদের দীর্ঘ বামপন্থি ঐতিহ্য আছে, যেটা আমাদের শিখিয়েছে অনেক বিষয়ে লিবারেটেড হওয়া। অ্যাট দ্য সেম টাইম কোথাও একটা মরাল পলিসি মাথার মধ্যে সুচারুভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে। যার ফলে যে বাতাবরণটা তৈরি হয়েছে--ধরি মাছ না ছুঁই পানি। তার ফলে ফ্যাসাদটা তৈরি হয়।

আমরা খুব লিবারেটেড, যা খুশি করি। (ঋতুপর্ণ : সেটাকে আমরা রূপকল্প বলে ভুল করি।) এগ্জেক্টলি, একদম এটাই। আমি অনেস্টলি বলছি, আমরা যারা এখানে--অঞ্জন দা’সহ অলমোস্ট এখানকার প্রত্যেকের সঙ্গেই আমি কাজ করেছি, সুমন দা (সুমন মুখোপাধ্যায়) বাদে। সুমন দা আমার বন্ধুর মতো। এদের সিনেমা দেখে আমরা শিখেছি, কিন্তু সবসময় মনে হয়েছে, এদের বোধহয় আর একটা মাইল যাওয়ার ছিলো; যে মাইলটায় এরা আটকে যাচ্ছে। সেই প্রসঙ্গে বলি, আমি পাওলিকে সাহসী অভিনয়শিল্পী মনে করি না; একদম করি না। সাহসী অভিনয়শিল্পী কথাটা আমার কাছে বাহুল্য মনে হয়। পাওলি একজন অভিনয়শিল্পী, (ঋতুপর্ণ : একেবারে।) এটা তার কাজ, শরীরটা তার প্রপার্টি।

গৌতম : অ্যাজ ইফ যৌনকর্মটাই খুব সাহসী কর্ম; সবগুলো কর্ম ...।

পরমব্রত : আমি এটাতে যেমন পাওলিকে রিডিকিওল করার সুযোগ দেখছি না, তেমনই ভেরিফাই করারও কোনো চান্স নেই। তার কারণ, দিস ইজ অ্যা নরমাল অ্যাক্ট অব আওয়ার, ফর অ্যানি অ্যাক্টর--আমি অনেক দিন আগের কাগজে ইন্টারভিউ পড়েছি, তারা (অভিনয়শিল্পীরা) খুব বুক বাজিয়ে বলে, তারা পর্দায় চুমু খাবে না। কোট আনকোটে তারা সাহসী দৃশ্যে অভিনয় করবে না। আমি অত্যন্ত নিমিত্ত ছোটো-খাটো। (সুমন : অনেকে করবে না বলেন সরাসরি; আবার ওপেন না হলেও অনেকে বলেন।)। আমি তার মধ্যে পড়ি, (সুমন মুখোপাধ্যায় : কোনটার মধ্যে পড়ো?) সিরিয়াসলি বলছি, যারা করবেন বলেন তাদের। আমি সিরিয়াসলি ওই ভাগেই পড়তে চাই। কারণ, গোটা ব্যাপারটার আমার কাছে হাস্যকর লাগে, গোটা ডিসকোর্সটা--পর্দায় চুমু খাবো কি খাবো না? এটা আমার কাছে ডাবল বা মাল্টিপল স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে যে বেশিকিছু হয় না। এখন ঘটনাটা হচ্ছে, পাওলি হ্যাজ ওয়ার্কড অ্যানাদার মাইল, ডান সামথিং; ফল ইন আপ। এটা ওর ব্যাপার, ওর সমস্যা, ওর সিনেমা এবং ও সেটা করেছে।

ঋতুপর্ণ : অবশ্যই এটা ওর ডিসিশন, ওর চয়েস।

সুমন : আমি বিমুক্তির আগের সিনেমাটা দেখেছি। ওর যে সিনেমাটা কান-এ ...।

পরমব্রত : আমি পুরোটা দেখিনি।

সুমন : আমি ওইটা দেখেছি, (পাওলি : দ্য ফরসাকেন ল্যান্ড।) বিদেশে এক ফেস্টিভালে দেখেছি। এই চলচ্চিত্রে যেভাবে ও (বিমুক্তি জয়সুন্দরা) যৌনদৃশ্য ব্যবহার করেছিলো, সেটা আমার কাছে শ্লীল মনে হয়েছে। আমার মনে হয় না বিমুক্তি যে ধরনের পরিচালক, যে মাপের পরিচালক--তাতে ও খুব অকারণে কিছু একটা ব্যবহার করবে--সেটা আমি বিশ্বাস করি না। জানি না ইতোমধ্যে পাল্টে গেছে কি না।

পরমব্রত : আমি আবার সেই প্রসঙ্গে যাচ্ছি, সিরিয়াসলি মনে হয়--আমাদের পরিকাঠামোয় চাপ আছে, তুমি যেটা বললে। সমস্ত কিছু থাকা সত্ত্বেও আমি এটা বিশ্বাস করতে চাই--যদিও বলতে পারো এটা আইডিয়ালিস্ট বা ইউটোপিয়ান ধারণা--আমি ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেটার্নিটির একজন সদস্য, একজন অ্যাক্টর এবং ফিল্মমেকার। অবশ্যই বাংলা চলচ্চিত্রের ঐতিহ্য আমার কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। যারা এই বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে মনোপলিসিং করছে, আমি মনে করি, তাদের অনেকের চেয়ে এর ঐতিহ্য সম্পর্কে আমি বেশি জানি। এটাও বলতে পারি, ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেটার্নিটির একটা অংশ বাংলা চলচ্চিত্র এবং তার একজন সক্রিয় সদস্য আমি। সেই জায়গা থেকে আমার কাছে মনে হয় না, এটা এতো সাহসী কোনো কাজ! এটা খুব স্বাভাবিক একটা কাজ। সুযোগ পেলে এটা আমিও করবো।

সুমন দে : তুমি কি সুমনের সূত্র ধরে এটা বলছো? যদি উল্টোটা হয়, সুমন যেটা বলছে, উনি অকারণে এই দৃশ্য তুলবেন না। যদি অকারণেও তুলে থাকেন, সেটা পরিচালকের স্বাধীনতা এবং সেই স্বাধীনতাটাও দেওয়া উচিত।

গৌতম : আর একটা ব্যাপার; তুই (পরমব্রত) যে ডাইকোটামি’র কথা বললি, সেটা আমাদের পুরো সিস্টেম, আমাদের জুডিশিয়ালি, অ্যাডমেস্ট্রিশন দেখ (পরমব্রত : এভ্্রিহয়ার।), ঊনবিংশ শতাব্দীর আইন এখনো চলছে। আমাদের যে সহজ পথ ছিলো, এর ওপরে যে ভিক্টোরিয়ান মরালিটি চাপানো হয়েছে, তা থেকে এগুলো তৈরি হয়েছে।

সুমন : গৌতম দা এটা নিয়ে একটা কথা আছে। নোরা (ডলস্ হাউজ) যখন প্রথম ইংল্যান্ডে এলো, তখন ইংলিশরা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। ও রকম একটা দৃশ্য--ঘরের বউরা দরজা খুলে চলে যাচ্ছে--এটা দেখানো হবে কি না। বার্নাড শো’কে কলম তুলতে হয়েছিলো তার বিরুদ্ধে, ইংল্যান্ডের মতো একটা দেশে! এতোটাই ভিক্টোরিয়ান মরালিটি ছিলো!

গৌতম : ভীষণ ভীষণ, আমরা ইনহেরিট করেছি ওটা। এই মরাল পলিসিগুলো ওখান থেকে তৈরি হয়েছে।

ঋতুপর্ণ : তুই (পরমব্রত) যেটাকে লোকাল রিয়্যালিটি বলছিস, সেটা সম্পর্কে তুইও জানিস না। (পরমব্রত : আমিও জানি না, কেননা ...।) হোয়াট ইজ লোকাল রিয়্যালিটি? লোকাল রিয়্যালিটি ইজ কমপ্লিটলি একটা আনডিফাইন ইবালুয়েন্স।

পরমব্রত : না না ঋতু দা। লোকাল রিয়্যালিটি বলতে আমি মিন করলাম, যে রিয়্যালিটি ফিল্মমেকাররা ফেস করে ইনটার্মস অব ...।

ঋতুপর্ণ : তুই বলতে পারিস, অ্যাপেয়ারেন্ট লোকাল রিয়্যালিটি।

পরমব্রত : আমাদের সেন্সর, ওই জাতীয় রিয়্যালিটির কথা আমি বলছিলাম। সত্যি বলছি, আমরা কেউই বোধ হয়, রিয়্যালিটি সম্পর্কে খুব ছোট্ট ...।

গৌতম : যৌনতা নিয়ে আমাদের আদিবাসীরা কী ভাবে?

ঋতুপর্ণ : সেন্সরবোর্ডের কোনো সদস্য একটা সিনেমা সেন্সর করে এসে, বাড়িতে আর একটা সিনেমা দেখে, সেটা সম্পূর্ণ অন্যরকম হতে পারে। সেই সময় সে ওটাকে মনে মনে সমর্থন করে। আমরা জানি, কমিটিতে বসলে একটা পলিটিকাল ইকার্ডস বিহাভিয়ার অ্যাসপেক্ট থাকে তার কাছে। এই পলিটিকাল ইকার্ডস হতে গিয়ে আমরা আস্তে আস্তে সবকিছু খোয়াচ্ছি; এমনকি আমাদের নিজের পলিটিক্সটাকেও।

গৌতম : একদম। তবে আর একটা বিষয়ে এই বিতর্কটা আসা উচিত। আমাদের ইন্টারনেট, টেলিভিশনের ওপর কোনোরকমের কিছু নেই, শুধু সেল্ফ সেন্সরশিপ। তাহলে কেনো সিনেমার সেন্সর সার্টিফিকেশনের দরকার হয়।

পরমব্রত : আরেকটা কথা। কেউ প্রশ্ন করলে না তো, গোটা এইটিজে এবং লাস্ট নাইন্টিজে হিন্দি সিনেমায় দেয়ার আর এক্সেসিভ রেপ সিকোয়েন্স, কেনো? ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের যে কথা উঠছে ...।

সুমন দে : গৌতম দা যেটা বলছে, প্রযুক্তির দিক থেকে দেখলে আজকের যুগে কি এটা সম্ভব--কোনো তথ্যপ্রযুক্তি, কোনো জ্যাঠা মশাই, ইউটিউবের গলা টেপা যায়? এটা সম্ভব?

চন্দ্রিল : এই সেন্সর বোর্ড আর কতোদিন! ইন্টারনেট আসার পর তুমি আর কী করতে পারো? কিছুই করতে পারো না। কথাটা প্রযুক্তির নয়, কথাটা যুক্তির। যদি প্রযুক্তি নাও আসতো, তাহলেও তোমাকে এটা করতে দিতে হবে। সুমন একটু আগে খুব ভালো বলেছে; সেখানে একটা কথা এমন যে, আগের সিনেমা দেখেছি তিনি (বিমুক্তি জয়সুন্দরা) খুব শিল্পিতভাবে ব্যবহার করেছেন। আমার কথা হচ্ছে, আমার তো অশিল্পীতভাবে ব্যবহার করারও অধিকার আছে, আমি তো একজন খারাপ শিল্পীও হতে পারি--পারি না? তাই বলে আমার মৌলিক অধিকার হারিয়ে যাবে! আমি খারাপ কবিতা লিখি, তাই বলে কেউ আমাকে বলতে পারে, ও এটা করতে পারবে না। (ঋতুপর্ণ : ওর কবিতা ছাপিও না।) আর ও ভালো লিখে বলে ও পারবে।

সুমন : চন্দ্রিল, একটা জিনিস আছে। ঠিক যেভাবে আমার সমস্ত বিষয়ে সিনেমা করার বা কথা বলার অধিকার আছে, তেমনই আমার ভালো-মন্দ লাগারও তো অধিকার আছে। (চন্দ্রিল : নিশ্চয়।) আমি যখন কথাটা ব্যবহার করছি শিল্পিত অর্থে, সেটা আমার কাছে শিল্প। তোমার কাছে বা অন্য একজনের কাছে এটা খারাপও মনে হতে পারে। আমার প্যারামিটারটা আমি তৈরি করেছি। আমি এসব বিশ্বাস করি না, কোনটা প্রাসঙ্গিক কোনটা অপ্রাসঙ্গিক। আমি মনে করি, শিল্পের একটা সংহত রূপ আছে, সেটা আমার মতো করে। সেই সংহত রূপের মধ্যে কিছু সিনেমা পড়ে, কিছু পড়ে না--এটাই বলেছি।

চন্দ্রিল : আমি বলছি, কারো একটা এরকম অধিকারও আছে, অত্যন্ত কর্কশ এবং ডেলিবারেটলি রুচিকে আঘাত করার জন্যই যৌনদৃশ্য নির্মাণের। কারণ রুচিকে যদি তুমি আঘাত না করো, রুচি বাড়বে না; প্রাচীর ভাঙবে না। (অঞ্জন : সেরকম আছে, সেরকম ঘটেছে।) এটা পৃথিবীর ইতিহাসে বারে বারে ঘটেছে। একটা লোক রুচিকে এমন করে আঘাত করেছে, সেজন্য তাকে জেলে দেওয়া হয়েছে। সে আইকন হয়েছে তারপরও। পরে সে কাল্ট হয়েছে, ও রুচিকে আঘাত করেছিলো বলেই শিল্পটা এই জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে।

গৌতম : কেনো! আমাদের হাঙ্গরি জেনারেশনের লেখকরা, তারা ভয়ঙ্করভাবে ভাষাকে আক্রমণ করেছিলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো, আমি এই ভাষার ব্যবহার করবো, আক্রমণ করবো এবং রাষ্ট্রদ্রোহী হবো। তাদের বলা হয়েছিলো ‘অশ্লীলতা ও রাষ্ট্রদ্রোহী’।

সুমন : তার মানে আমরা একটা সুপার স্ট্রাকচারের কথা বলছি, বলছি তো। তার মানে আমরা গোটা ব্যাপারটা নিয়ে একটা প্যারাডাইম করার কথা বলছি। তুমি (চন্দ্রিল) যেটা বলছো, আমরা ইচ্ছা করে একটা খারাপ কথা ব্যবহার করতে পারি, ইনফরমাল, আঙ্গিকগতভাবে এবং কন্টেন্টের জায়গা থেকে--ওটা আমার রাজনীতি। কিন্তু তা সত্ত্বেও কি এটা আমরা এড়িয়ে যেতে পারি? এটা নিয়ে বহু মানুষ ব্যবসা করছে, তার কোনো এজেন্ডা নেই, পরিকল্প নেই--এরকম মানুষও তো আছে। (গৌতম : পণ্য পণ্য, কমোডিটি।) আমরা কি এটা অস্বীকার করতে পারি! (গৌতম : আমি যেটা প্রথমে বললাম, নারীদের পণ্য করা হয়েছে, পুরুষদের করা হয়নি।) গালাগালি করার এজেন্ডা আছে।

যখন পলাটস-এ চাকরগুলো রাজতন্ত্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে গালাগালি করতো, কারণ রাজতন্ত্রের মধ্যে অন্য কিছু করা যাবে না। লোকে গালাগালি নিয়ে বাড়ি চলে গেলো। এই সাবভার্সনটা তৈরি করতে পারছে না। সুপার স্ট্রাকচার আছে। আমি ওটাই বলছি, কিছু মানুষ শুধু ব্যবসার কারণে এটা ব্যবহার করছে। তার আর কোনো এজেন্ডা নেই। সে শুধু ওটাকে ব্যবহার করছে, কমোডিফাই করছে, সেটাকে নোংরামো করছে; এটাও কিন্তু বোঝা যায়।

চন্দ্রিল : এটা তুমি বা সবাই বলবে; কিছু লোক ব্যবসার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে সাধারণ বাঙালি যে মানুষ, তারা কিন্তু এটাতে যথেষ্ট নাড়া খেয়েছে এবং তারা নাড়া খেয়েছে ওই দিকে হেলে। তার মানে কিন্তু আম-বাঙালি--ইনফ্যাক্ট এখানে আমি পরমকে কনক্রিট করবো, এটা ঠিক ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বাঙালিরা অনেক বেশি লিবারেটিভ। কিন্তু শিল্প-ধারণার ক্ষেত্রে নয়। আমরা এখানে যতো বির্তক করি না কেনো--হয়তো মনে হচ্ছে বিরাট কোনো কাণ্ড করে ফেলবো--সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ বলবে, ও ভাই যাই বলো আর তাই বলো না কেনো, এটা কি ইয়ার্কির জায়গা নাকি! বাঙালি হয়ে তুমি এরকম করবে?

পরমব্রত : আমি ঠিক সেটাই বলার চেষ্টা করছিলাম। আমরা বাঙালি হিসেবে দৈনন্দিন জীবনে কিছু ক্ষেত্রে হয়তো অনেক বেশি লিবারেটিভ, কিন্তু তুমি (চন্দ্রিল) যেটা এগ্জেক্টলি বললে, শিল্পভাবনার ক্ষেত্রে।

চন্দ্রিল : কিন্তু এই গোটা যাত্রার শিল্পভাবনার ধারণা কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে ন্যাকামো আর ভণ্ডামির ওপর।

পরমব্রত : হ্যাঁ।

সুমন : একটা পরিবারের সবাই একসঙ্গে কোনোদিন ডিনার করতে পারে না, আর সিনেমার ক্ষেত্রে একসঙ্গে বসে দেখতে হবে, কেনো? এর মানদণ্ড ...।

ঋতুপর্ণ : আর একটা জিনিস আছে, শিল্পীর নিজস্ব কন্ট্রাডিকশনের কোনো জায়গা নেই। তুমি একবার একটা সিনেমা করেছো, ইউ হ্যাভ কনফার্ম দ্যাট অল ইউর লাইফ। তুমিও যে শিল্পী হিসেবে নিজেকে কন্ট্রাডিক করতে পারো, সেটাই তোমার আর্টিস্টিক ইউনিভার্স। আমি একটা সিনেমায় একটা জিনিস দেখালাম, পরের সিনেমায় ঠিক তার উল্টো একটা জিনিস দেখালাম। (অঞ্জন : তাহলে তো বার্ট্রান্ড রাসেল এগ্জিস্ট করে না।) (সুমন : রবীন্দ্রনাথের ভূরি ভূরি আছে।) সুনীলের একটা বই আছে, ‘রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার এবং পুনঃআবিষ্কার’; সেটার শুরুই হয় তিন জোড়া পায়ের আঘাতে ছিটকে পড়ে রবীন্দ্র রচনাবলি দিয়ে। (চন্দ্রিল : তিন জোড়া পায়ের ঘা’র রবীন্দ্র রচনাবলি লুটোয় পাপ্সে।) লুটোয় পাপ্সে, তার কারণ তারা সন্দ্বীপ দা’র বাড়ি থাকতেন, তিন জনেই শোয়ার সময় পায়ের কাছের যে বইগুলো ছিলো, তা পা দিয়ে ফেলে দিতেন। এবং সুনীল দা লিখেছেন, ততোদিনে আমরা বুঝে গেছি, পা’টা হাতের থেকে বেশি অপবিত্র নয়। (সবার হাসি)

পাওলি : এই পুরো ঘটনাটা নিয়ে ...। যেহেতু বিমুক্তি এখানকার নয়--লোকাল রিয়্যালিটি--এসব নিয়ে কথা হচ্ছিলো, ও (বিমুক্তি) তো ওর মতো করে সিনেমা করে। ইনফ্যাক্ট সুমন (মুখোপাধ্যায়) দা বললো এবং আমিও দ্য ফরসাকেন ল্যান্ড দেখেছিলাম সিনেমা করার আগে। কারণ আমি জানতান না, ও কেমন সিনেমা করে। আমার কাছে মনে হয়েছিলো যথেষ্ট সেন্সেবল। উনি উনার মতো করে বিখ্যাত। উনার কাজে আমার আস্থা ছিলো আর মনে হয়েছিলো, এই চরিত্রটা যে রকম--স্ক্রিপ্ট বা চিত্রনাট্যে ও রকম একটা চরিত্র ডিমান্ড করছে। তাই পার্সোনালি একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে আমার মনে হয়েছে, এটা করতে কোনো অসুবিধা নেই; আমি করেছি সেটা। সেইটা নিয়ে এতো বিতর্ক--দুদিন আগেও কথা হয়েছে ওর সঙ্গে আমার--ওখান থেকে শুনে হাস্যকর মনে হচ্ছে। কিন্তু কেনো এতো আলোচনা, বিতর্ক হবে! সত্যিই আমার কাছে শকিং, যখন আমি কলকাতার বাইরে প্রথম খবরটা পাই। প্রথমে ভেবেছিলাম বিষয়টা অ্যাকসেপ্টটেড হবে; কারণ বাঙালি আন্তর্জাতিক, গ্লোবাল হচ্ছে, বাংলা চলচ্চিত্রও বাইরে যাচ্ছে।

সুমন : সাহেবরাও যে খুব উদার তা বলবো না। অ্যান্টিক্রাইসিস নিয়ে যে কাণ্ড সাহেবরা করলো! (ঋতুপর্ণ : কান ফেস্টিভালে।) সাহেবদের সিনেমা আমি ফ্রান্সে বসে দেখেছি; তারাও কিন্তু ওই যৌনতার প্রকাশটা গ্রহণ করতে পারছে না। এটা সংস্কৃতি, সভত্যার সমস্যা। (সবার হাসি)

চন্দ্রিল : তবে এটা সত্য বাঙালিরা অনেক যোজন পিছিয়ে আছে। ওরা (ইউরোপিয়) তো বসে দেখছে, পর্দায় কেউ ঢিল ছুড়ে মারবে না। হয়তো উঠে যাবে, এর বেশি কী করবে! এটা মানতে হবে।

সুমন : তুমি বলছো, ইট ছুড়ে মেরে দিবে না।

ঋতুপর্ণ : পরের দিন রাস্তায় দেখলে গায়ে থুথু দিয়ে দেবে।

চন্দ্রিল : এ ঘটনা ঘটেছে। আমরা বড়ো বড়ো কথা বলছি--একটু বয়স্ক, মধ্যবিত্ত, তারা কিন্তু সিস্টেম চাপিয়ে দিচ্ছে না।--ও (সুমন) যেটা বলছে একটা সিস্টেম তো আছে। তাছাড়া স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাদের কাছ থেকে এই আপত্তিটা উঠে আসে। আমি বহু ক্ষেত্রে এরকম দেখেছি।

সুমন : ম্যানুফেকচারিং কন্সেন্ট।

গৌতম : একটা কথা বলি, এটা কিন্তু কুশিক্ষা। যেভাবে কুশিক্ষা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, তার একটা দিক। আমি একটা ঘটনা বলি। আমার এক প্রোডাকশন ম্যানেজার বিরভূম থেকে ফোন করে বললো, ‘স্যার আমি তো আটকে পড়েছি, আমাদের একটা টক শোর শুটিং চলছে; আমি বিকেল বেলা আসবো।’ আমি বললাম, ঠিক আছে, তুমি এসো। হাঁপাতে হাঁপাতে একজন এসে বললো, যা কাণ্ড গৌতম দা, আপনাকে বলবো কী দেখলাম! টক শোতে আমাদের পরিচিত অভিনেতা-অভিনেত্রী ...। (ঋতুপর্ণ : রিয়্যালিটি শো, টক শো নয়।) সরি, রিয়্যালিটি শো। উনি আমাকে বললেন, চ্যানেল থেকে ফোন আসছে, আরো গালাগাল করো; আরো অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করো, আমরা পুক করে দিবো। এটা পুরনো একটা আমেরিকান টক শোর নকল। আমি ভাবলাম, গ্রামের মানুষ তো শুনছে এটা, তাদের প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছে। আরো বলছে, গালাগালি দাও, আরো প্রভক করছে। তারপর বলছে, ওটাকে পুক করে দিবো।

সুমন : গোটা খালি বিব বিব চলছে নাকি! (সবার হাসি)

হরনাথ : আমি শুধু একটা কথা বলবো। এই গোটা আলোচনার মধ্যে বাংলা বা ভারতীয় দর্শকের এগিয়ে যাওয়া নিয়ে কথা হলো। কিন্তু এর পিছনের কারণ নিয়ে মনে হয় আলোচনা হলো না। আমাদের এই এগিয়ে যাওয়ার জন্য শিক্ষার দরকার আছে। আমাদের এখানকার মানুষ এখনো অতোটা শিক্ষিত হয়নি যে, তারা দেখেই অনেক কিছু মেনে নেবে।

সুমন : এটা আমি মানতে পারছি না। আজকের জেনারেশন অনেক বেশি অ্যাডভান্স।

গৌতম : অনেকগুলো স্তর আছে।

হরনাথ : অনেক জায়গা আছে, যেগুলো এখনো অ্যাডভান্স হয়নি।

গৌতম : আজকের জেনারেশন কোথাকার? শহরের কোন শ্রেণির, কোন অংশে থাকে? সেটা একটা ব্যাপার।

সুমন : সবমিলে মফস্বল, গ্রাম, শহরে থাকে।

হরনাথ : সেটা দেখতে হবে।

সুমন দে : আপনাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ, আমাদের সময় সত্যি শেষ। হর দা যেটা দিয়ে শেষ করতে চাইছেন--শিক্ষা। শিক্ষার একটা পরিবেশ চাই। সেই শিক্ষায় যদি কেউ রুল উঁচিয়ে বা চোখ রাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, সেই শিক্ষার পরিবেশও ব্যাহত হয়। একটা সিনেমায় একজন অভিনয়শিল্পী কী করলেন এবং এক পরিচালক কতোটা শিল্পসম্মতভাবে সেটা করলেন; সেই ক্লিপে আদৌ কী আছে; সেই ক্লিপে যেটা আছে, সেটা সিনেমার সঙ্গে কতোটা সঙ্গতিপূর্ণ; এই বির্তকগুলো বিচ্ছিন্ন না হয়ে কোনো একসময় সামগ্রিকভাবে আমাদের সমাজে আসতেই পারে।

কিন্তু তার সঙ্গে যে ছি ছি ধ্বনি উঠেছে, সেইটাকে আমরা অ্যাডড্রেস করার চেষ্টা করলাম। আমি শুরুতে চেয়েছিলাম, এই আলোচনা একটা ফিল্ম, একজন অভিনয়শিল্পী, তার দায়িত্ব এবং একজন পরিচালক, তার দায়িত্ব, রুচি, সামগ্রিকভাবে আমাদের রুচি, এসবের বাইরে নিয়ে যাবে। আমার মনে হয়, টাউনহলের এই মঞ্চ থেকে সেই আশা-সম্ভাবনা পূরণ হয়েছে। অবশ্য এই নিয়ে বিতর্ক থাকবে। তবে একটা সমাজে সবধরনের বিষয় উত্থাপিত, আলোচিত, সমালোচিত, প্রশংসিত হবে, সেই জায়গা যেনো আমরা পাই। সেটাই বোধহয় সামাজিক পরিবর্তন, যা সামাজিক শিক্ষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। সেই শিক্ষায় যেনো আমরা শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারি। আপনাদের চোখ থাকুক ‘স্টার আনন্দ’-এ।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন