Magic Lanthon

               

জ্যোতির্ময় বসুরায়

প্রকাশিত ১৪ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

হিন্দী ছবির জোর কোথায়

জ্যোতির্ময় বসুরায়


যে-বছর সত্যজিৎ রায়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা তৈরি হয়েছিলো, সেই ’৬২ সনেরই মাঝামাঝি বোধ করি কলকাতায় দেখানো হয় জংলী। ঘটনাটা মনে করার একটা কারণ আছে। ওই সময়েই লক্ষ করলাম, যারা সত্যজিৎ দেখে তারাওজ্জইয়ানি তাদের অনেকেজ্জশাম্মি কাপুরের ছবিও দেখে এবং তা গোপন করে না। সেবার পূজার সময়ে পুরীর সমুদ্র তীরে কলকাতার কলেজের দুটি মেয়েকে মৃদু কন্ঠে ‘এ পরবাসে রবে কে’ গাইবার পরেই গলা খুলতে শুনিজ্জ‘চাহে কোয়ি মুঝে জংলী কহে।’ প্রথম দিন একটু কেমন-কেমন লেগেছিলো, ক্রমে সয়ে গেলো, যখন দেখলাম জংলীর গানটা ওই আসরের নিত্যকার ব্যাপার।

হিন্দী সিনেমার প্রতি বাঙালি দর্শকের আগ্রহ ’৬২ সন তথা ষাটের দশকের আগে ছিলো না, এটা আমার বলার উদ্দেশ্য নয়। তবু মনে হয়, যাঁদের আমরা মোটামুটি রুচিবান বলে থাকি, তাঁদের আগ্রহ আগে সীমিত থাকত বিমল রায়, শান্তারাম বা ওই রকমের চলচ্চিত্রকারের কিছু প্রয়াসের মধ্যে। রাজ কাপুরের আওয়ারা, বরসাত জাতীয় ছবিও হয়তো মুখ বদলানোর জন্য কখনও-সখনও তাঁরা দেখে ফেলতেন। কিন্তু দেখলেও সকলের সামনে সে-বিষয়ে মুখ খুলতেন না।

গত দশ-বারো বছরের মধ্যে চেহারাটা বদলে গিয়েছে। আধুনিক কবিতাতেও এখন হিন্দী ছবির গানের অনুষঙ্গ আসে। বেরিলির বাজারে নায়িকার সেই ঝুমকো হারানোর দুঃখ নিয়ে রচিত যে-গানটি (‘বেরিলি কা বাজার মে ঝুমকা গিরা রে!’) সিনেমার হল থেকে ক্রমে দিকে দিকে ছড়িয়ে গেল; তার মুখটিকে কি একটি আধুনিক কবিতায় নতুন করে আবিষ্কার করিনি? ব্যাপারটাকে হিন্দী সিনেমার মর্যাদা লাভের একটি দৃষ্টান্ত হিসাবে স্বীকার করে নিতে হয়তো অনেকের বাধবে। তা বাধুক, এটা কিন্তু মানতেই হবে যে, হিন্দী সিনেমাকে আমরা স্বীকার করে নিয়েছি।

বোম্বাই ফিল্ম সম্পর্কে আমাদের ঘরোয়া আলোচনায় ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সুর অবশ্যই থাকে। কিন্তু যা ঠাট্টার বিষয়, তার টান এড়ানো যে যায় না, যাচ্ছে না, তা-ও তো ঠিক।

বোম্বাই [মুম্বাই] চিত্রের আকর্ষণী শক্তির মূলে কী? কারও মতে রং এবং জাঁকজমক। কেউ কেউ মনে করেন, অ্যাকশন এবং নাচগানসহ নানা প্রমোদ-উপকরণ দিয়ে সে আসর মাৎ করে। আবার অনেকের ধারণা, হিন্দী ছবিকে দর্শনযোগ্য করে তোলেন সুদর্শন নায়ক আর সুরূপা নায়িকারা।

এই সব যুক্তির মধ্যেই কিছু সত্য আছে। আর হিন্দী সিনেমার প্রযোজকরা ছবির বিনোদন-মূল্যের ওপর জোর দেন এবং তাদের আর্থিক সামর্থ্যও প্রভূত বললেই কিন্তু ব্যাখ্যাটা সম্পূর্ণ হয় না। আসলেও জনরুচির চাহিদা মেটানোর কাজেও তাদের আছে একধরনের নিষ্ঠাজ্জযা সংশয়াতীত। হিন্দী ছবির জোরও সেইখানে। নির্মাতাদের যা কিছু অবহেলা, বিষয়বস্তু তথা গল্পের ক্ষেত্রে। অধিকাংশ বোম্বাই চিত্রেই কিন্তু প্রয়োগ নৈপুণ্যের এবং সে ব্যাপারে যত্নের পর্যাপ্ত নিদর্শন মেলে। ওখানকার কলাকুশলীরা যেমন দক্ষ, তেমনই সুরকারদের আছে সুরের ওপর দখলজ্জশাস্ত্রীয়, লোক এবং পাশ্চাত্য সংগীত সম্পর্কে তাঁদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান প্রতিফলিত হয় তাঁদের সৃষ্টিতে। আর যারা নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী? গায়ক-গায়িকা হিসেবে তাঁদের কয়েকজন যে অসাধারণ গুণসম্পন্ন সে কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

একই কথা প্রযোজ্য অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের সম্পর্কেও। অশোককুমার, দিলীপকুমার, দেব আনন্দ, রাজ কাপুরের কথা এখানে তুলছি না। বাদ রাখছি বৈজয়ন্তীমালা, মালা সিংহ, নূতন অথবা পরলোকগত মীনাকুমারীর প্রসঙ্গও। সঞ্জীবকুমার, রাজেশ খান্না, ধর্মেন্দ্র, তনুজা, ওয়াহিদা, শর্মিলা, মুমতাজ, হেমা মালিনী প্রভৃতি শিল্পীর অভিনয় ক্ষমতাও কি কম বিস্ময়কর? অথবা রেহানা সুলতান, জয়া ভাদুড়ির? এদিকে তাঁর প্রথম ছবিতেই (ববি) চমক লাগিয়ে দিয়েছেন ডিম্পল। যেমন লাগিয়েছিলেন ঋষি কাপুর মেরা নাম জোকার-এ। ঋষি এবং রণধীর কাপুর পরিবারের মান রাখতে চেষ্টা করছেন। স্বভাবত অধীর রণধীর অবশ্য কতটা পেরে উঠবেন, বলা শক্ত। তবে তারও চেষ্টা আছে। অধ্যবসায় সুফল দিয়েছে রেখার ক্ষেত্রে। তার অভিনয়ে এখন প্রাণের স্পর্শ অনুভব করছি। এই প্রসঙ্গে আরো দুটি নাম করবো : রাধা সালুজা এবং পদ্মা খান্না। দুজনেই সুরূপা, অভিনয়ে সপ্রতিভ।

মনে রাখতে হবে; সাধারণত অসার, অবাস্তব কাহিনীর চরিত্রে এঁদের রূপ দিতে হয়, ঘোরাফেরা করতে হয় সাধারণ কিছু সেন্টিমেন্টের মধ্যে। এই সীমিত পরিসরেও তাঁরা যে দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখেন, সেটা কম কৃতিত্বের কথা নয়। অভিনেয় চরিত্রের মধ্যে তাঁরা নিজেদের যেভাবে মিশিয়ে দেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এঁদের সাফল্যের পিছনে আছে অনুশীলন ও কলাচর্চার ইতিহাস। হিন্দী ছবির নায়িকাদের নাচ শিখতেই হয়জ্জসে পাঠ সযত্নে তাঁরা নিয়ে থাকেন। হিন্দী যাঁদের মাতৃভাষা নয়, তাদের শিখতে হয় ওই ভাষা। দক্ষিণের হেমা মালিনী এবং বাংলার শর্মিলা-রাখী-জয়ার শুদ্ধ হিন্দী, উর্দু উচ্চারণে তাদের সার্থক অনুশীলনেরই প্রমাণ পাই।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, হিন্দী ছবির নির্মাতা, শিল্পী এবং কলাকুশলীরা তাঁদের কাজ জানেন। এবং সেই কাজে তাঁদের আছে নিষ্ঠা। হিন্দী ছবির জনপ্রিয়তা, বলা যায় তার-ই পুরস্কার। তবু কিছু দুঃখ থেকে যায় বই কি! নির্মাতাদের সমস্ত আয়োজন আর শ্রম যে খরচ হয়ে যায় ছবির প্রমোদমূল্য বজায় রাখবার জন্য! গুণী শিল্পীদের সমাবেশ ঘটিয়ে তাঁরা জীবনকে যে ছু’তে [ছুঁতে] চেষ্টা করেন না, অথবা কদাচিৎ করেনজ্জদুঃখ সেইখানেই।

 

দায়স্বীকার : জ্যোতির্ময় বসুরায়-এর এই প্রবন্ধটি ৪৫ বছর আগে ১৩৮০ বঙ্গাব্দে (১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে) প্রখ্যাত দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন