Magic Lanthon

               

শেখ আবদুর রহমান

প্রকাশিত ১৪ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

জীবনের সত্য বনাম সিনেমার সত্য

শেখ আবদুর রহমান



জীবনের সত্য

জীবনসত্য অর্থাৎ জীবনের সত্য। জীবন যাপনের সত্য আমরা যেভাবে বেঁচে আছি তার সত্য। এই সত্যকে বিসর্জন দিয়ে আমরা বাঁচতে পারি না। আমাদের জীবনের সুন্দর দিকগুলো যেমন সত্য, অসুন্দর দিকগুলোও সমান সত্য। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ যেমন পরার্থে প্রাণদান করেন, তেমনি কেউ কেউ স্বার্থের বশবর্তী হয়ে অন্যের প্রাণ হরণ করতেও কুণ্ঠিত হন না।

দেখা যায়, মানুষ প্রমোদ-সঙ্গিনীর কোমর বেষ্ঠন [বেষ্টন] করে দৈনিক ভোজনালয়ে প্রবেশ করছেন। তার পথরোধ করে দাঁড়ায় হা-ভাতের দল। দেখা যায়, উদায়াস্ত পরিশ্রম করে একজন, ছেলেমেয়ের মুখে অন্ন জোগাতে পারে না। অন্যপক্ষে, ঘুষের টাকায় তারই প্রতিবেশী নিত্যনতুন উৎসব রচনা করেন। বছরে একই ছেলের দুবার বার্থডে পালন করেন! দেখা যায়, সত্যের বাজারদর মন্দা। টাকার বিনিময়ে প্রজ্ঞে, ধীমান লোকেরা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস মিথ্যাকে লালন করে চলেছেন। দেখা যায়, তিন টাকা রেটের দেহোপজীবিনীদের জন্য কারও মাথাব্যথা নেই। অপিচ [অফিস], অভিজাত হোটেলের দামী বারবণিতাদের নিয়ে সমাজপতিরা বিশেষ চিন্তিত।

দেখা যায়, গ্রামের ছেলে শহরের চাকচিক্য দেখে দুঃখিনী মায়ের কথা বেমালুম ভুলে যায়। বন্ধুর কাছে জন্মদাতাকে ‘বাড়ীর চাকর’ বলে পরিচয় দেয়। দেখা যায়, এককালে যারা রাজাকার ছিল, তারাই আজ থানা পুলিশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে লোকের সর্বনাশ করছে। দেখা যায়, রিলিফের মাল, বন্টনকারীর নিজস্ব গুদামেই চালান হয়ে যায়। দেখা যায়, কাপড়ের অভাবে মা-বোনেরা গলায় দড়ি দিয়ে মরার সুযোগও পায় না। মৃতের ভাগ্যে কাফন জোটে না। দেখা যায়, লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার যুবক চাকুরীর জন্য হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছে। আবার চাকুরী পেয়েও হাজার হাজার লোক কাজে ফাঁকি দিচ্ছে।

দেখা যায়, দিনের আলোতে যে লোক কালোবাজারী, মজুতদার, চোরাকারবারী আর সুদখোরদের শাস্তিবিধানের জন্য গলা ফাটাচ্ছে, রাতের অন্ধকারে সেই একই লোক কালোবাজারী চোরাকারবারী ঘুষখোর আর মজুতদারদের সঙ্গে মদের আসরে বসে নরক গুলজার করছে। দেখা যাচ্ছে, যে কোন অজুহাতে মানুষ মানুষকে দলবেঁধে পিটিয়ে হত্যা করছে। ... ইত্যাদি ইত্যাদি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে আমাদের সমাজ ও জীবনে এই ধরনের অসঙ্গতির কোনো অভাব ছিল না। আজও নেই। অথচ এগুলোর কোনো সার্থক প্রতিফলন আমাদের ছায়াছবিতে নেই।

সিনেমার সত্য

সিনেমার সত্য বলতে এখানে বাংলাদেশে তৈরী সিনেমার সত্যকে নির্দেশ করতে চাইছি আমি। সিনেমায়, বাংলাদেশে নির্মিত ছায়াছবিতে, জীবনকে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে সেটাই বাংলাদেশের সিনেমার সত্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যেসব ছবি তৈরী হয়েছে সেগুলির একটিও জীবনের প্রতি বিশ্বস্ত নয়। অর্থাৎ আমাদের মরা বাঁচার সমস্যার কোনো প্রতিফলন এই ছবিগুলিতে নেই।

প্রসঙ্গত, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ এবং ‘ধীরে বহে মেঘনা’ ছবি দুটির কথা অনেকে উল্লেখ করে থাকেন। ছবি দুটির কোনো কোনো দৃশ্য দেখতে ভালো লাগে। এই ভালো লাগার সুদূরপ্রসারী কোনো প্রভাব নেই। তার কারণ, এই দুটি ছবির কোনো একটি চরিত্রও বাস্তবসম্মত নয়। ‘ধীরে বহে মেঘনা’র সাংবাদিক এবং ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’র নায়ক--এই দুটি চরিত্রই মনগড়া এবং সে কারণে এদের সঙ্গে দর্শক একাত্মবোধ করেন না। ‘ওরা ১১ জন’ একটি ব্যবসাসফল ছবি। কিন্তু এই ছবিতে জীবনসত্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। এমনকি গোঁজামিলও দেওয়া হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে, অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাই শহুরে ছেলে। গ্রাম বাংলার লক্ষ লক্ষ চাষি, কুলি, মজুর যাদের অবদান মুক্তিযুদ্ধে সবচে বেশী তাদের কোনো ভূমিকা এই ছবিতে নেই। এই ছবিটি দেখলে মনে হবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলার সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষের কোনো অবদানই ছিল না। অতএব, দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে নির্মিত ছায়াছবিতে [যে] জীবনের বা রূপের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটেছে, তার সঙ্গে জীবন-সত্যের কোনো মিল নেই।

কেন এই গরমিল?

এই গরমিলের কারণ জানতে হলে, আমাদের দেশে কারা কিভাবে ছবি তৈরী করেন, তা জানতে হবে। ছায়াছবি কিভাবে তৈরী হয় এবং তৈরী হয়ে যাওয়ার পর কিভাবে সেটা প্রদর্শিত হয়, তা জানতে পারলে আমাদের দেশে তৈরী ছায়াছবিগুলো কেন এত জীবনবিমুখ হয় তাও জানা যাবে।

দু’ধরনের ব্যবসায়ী আমাদের দেশে বর্তমানে ছায়াছবি নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এক, শখের চিত্রনির্মাতা। এরা কোনো ‘সূত্র’ থেকে পাওয়া অর্থ নিয়ে ছায়াছবি করতে আসেন। ছবি তৈরী করাটা এদের কাছে কখনও কখনও গৌণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ছবির জগতের গ্ল্যামার এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার লোভেই এরা ছবি করতে ছুটে আসেন। দুই, কট্টর ব্যবসায়ী। এরা ছবি তৈরী করেন স্রেফ ব্যাংক-ব্যালেন্স স্ফীত করার জন্য। ছবির শিল্পগত সৌকর্য অথবা সামাজিক অবদান সম্বন্ধে এরা আদৌ ভাবিত নন। বাংলাদেশের ছায়াছবির ব্যবসা এখন সম্পূর্ণভাবে এদের করায়ত্ত।

উপরে যে দু’ধরনের ছায়াছবি নির্মাতাদের কথা উল্লেখ করা হলো, তার বাইরে আর এক দল চিত্রনির্মাতা আছেন। এরা ‘আর্ট’ ছবি করার জন্য মাঝে মাঝে স্টুডিওতে আসেন। ছবি তোলেন। এদের উন্নাসিকতা প্রবল। হৃদয়ের চেয়ে বুদ্ধির প্রয়োগ বেশি দেখা যায় এদের ছবিতে। এরা প্রকাশ্যে বলে বেড়ান, আমরা পয়সার জন্য ছবি করি না। পয়সা দিয়ে এদের ছবি অবশ্য খুব কম লোকই দেখতে যায়।

ছায়াছবিকে যারা ব্যবসার পণ্য ছাড়া আর কিছু ভাবেন না, তাদের কাছ থেকে জীবনধর্মী ছবি আশা করা যায় না। মানুষের স্থূল রুচিকে প্রশ্রয় দিয়েই তারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করবেন।

প্রতিকার

ভাল, জীবনধর্মী ছবিও ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করতে পারে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্মিত ছবি দেখলে এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়। আমাদের দেশের জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে আমরা যদি ছবি তৈরী করতে পারি তাহলে দর্শকরা নিশ্চয়ই অসতী নারীর কাহিনী দেখতে ছুটবেন না।

ছায়াছবির ব্যবসাকে সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রায়ত্ত না করতে পারলে জীবনধর্মী, সুস্থ, মানবিক আবেদন সম্পন্ন ছবি তৈরী করা সম্ভবপর নয়। একক প্রচেষ্টায় আমাদের দেশে ভালো ছবি তৈরী কোনোদিন সম্ভব হবে না। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া এই মহতী উদ্দেশ্য কার্যকরী করা যাবে না। বাংলাদেশ সরকারকে এ ব্যাপারে সজাগ, সচেতন হতে হবে। সচেতন করার দায়িত্ব চলচ্চিত্রবেত্তাদের। তারা এগিয়ে আসবেন কি?

দ্বায়স্বীকার : ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুলাই ‘বিচিত্রা’র ২য় বর্ষ, ৭ম সংখ্যায় ছোটো এই প্রবন্ধটি প্রকাশ হয়। তখন ‘বিচিত্রা’র সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন