মারুফ হোসেন ও অন্যান্য
প্রকাশিত ১১ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
দর্শক কী চায় মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমি তা দেখাবো না, আমি আমারটা দেখাবো
মারুফ হোসেন ও অন্যান্য

মারুফ হাসান
ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর নতুন ধরনের একটি আয়োজন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন বাতচিত’। এখানে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর আয়োজনে একজন নির্মাতা তার চলচ্চিত্র নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হন। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শেষে তিনি বাতচিতে অংশ নেন দর্শকের সঙ্গে। প্রথম আয়োজনে উপস্থিত হয়েছিলেন স্বাধীনধারার নির্মাতা মারুফ হোসেন তার ...এবং কান্না নিয়ে। [সম্পাদক]
১২ এপ্রিল ২০১৮, বৃহস্পতিবার, বিকেল পাঁচটা
১২৩, রবীন্দ্র কলাভবন
সঞ্চালক (অধরা মাধুরী) : সম্মানিত উপস্থিতি, সবাইকে ধন্যবাদ। আপনারা এতোক্ষণ দেখলেন নির্মাতা মারুফ হোসেন নির্মিত চলচ্চিত্র ...এবং কান্না। আমরা আজকে উপস্থিত হয়েছি ‘... এবং কান্না দেখুন ও নির্মাতা মারুফ হোসেনের সঙ্গে বাতচিত করুন’ শীর্ষক ম্যাজিক লণ্ঠন-এর এই আয়োজনে। এ পর্যায়ে আমরা আজকের চলচ্চিত্রের নির্মাতা মারুফ হোসেনকে দর্শকের সামনে হাজির করবো। তিনি আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন দর্শকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা ও নিজের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য। মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি নির্মাতা মারুফ হোসেনকে। এ পর্বের শুরুতেই আমি মারুফ হোসেনকে অনুরোধ করবো কিছু বলার জন্য।
মারুফ হোসেন : অনেক ধন্যবাদ। আমার আসলে বলার কিছু নেই। যদি কোনো প্রশ্ন থাকে তো আমি উত্তর দিবো। তবে তার আগে একেবারে সংক্ষেপে এখানে আসার প্রেক্ষাপট আপনাদের জানাতে চাই। আমি এবার দেশে এসেছি ‘সৃষ্টিগড়’ নামক যে সংগঠনটি থেকে ... এবং কান্না নির্মাণ করা, তার এক দশক পূর্তিতে। এর আগে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে আমি অনেক দিন পর দেশে ফিরে আসি। ভাবলাম বাংলাদেশে আসবো এবং সিনেমা বানাবো। ভাবনাটা সহজ হলেও বাস্তবতা অতো সহজ ছিলো না। আমি তখন পাঁচ বছর থাকতে পেরেছিলাম। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে আমি আবার ফিরে যাই। এই যে এখন ডিজিটাল সিনেমাগুলো হয়, কোনো একভাবে হয়তো আমার মাথায় এই স্বপ্নটা এসেছিলো কম খরচে সিনেমা বানানোর। এ ধরনের সিনেমা বানানোর জন্য প্রযুক্তিগত যে শিক্ষাগুলো দরকার¾যেমন, লাইট, ক্যামেরা, কম্পোজিশন ইত্যাদি¾তা আমার ছিলো। বাংলাদেশে যেহেতু আমি বড়ো হয়েছি, এখানে চলচ্চিত্রের বোঝাপড়া আর চলচ্চিত্র নিয়ে কথাবার্তা এগুলো প্রধানত ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন ঘরানাতে থাকতো। মানে আমরা যখন বড়ো হচ্ছিলাম তখন। সেটা য়েস্থেথেটিক সেন্স। আমার মনে হয় না, য়েস্থেথেটিক সেন্স কেউ কাউকে দিতে পারে বা শেখাতে পারে।
আমার যেটা ব্যক্তিগত উপলব্ধি ছিলো, আমাদের এখানে ল্যাকিংস-এর জায়গাটা হচ্ছে টেকনিকাল নলেজ। অন্য আরো অনেক অভিজ্ঞতার পরে ভাবলাম, আচ্ছা নিজেই একটু পড়াশোনা করি। এখানে যা কিছু আপনারা দেখলেন, এখানে যারা যারা জড়িত ছিলো, সবাই আমার ছাত্র কারিগরি দিক থেকে। এবং এটাই সবার প্রথম কাজ। আমার যে ক্ষুদ্র জ্ঞান লাইট, ক্যামেরা ও কম্পোজিশন নিয়ে এবং আমার যা যন্ত্রপাতি¾সেগুলো দিয়েই এই চলচ্চিত্রটি বানানো। এই আর কী! এখন যদি কোনো প্রশ্ন থাকে।
কাজী মামুন হায়দার, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রা বি : স্বাধীনধারার সিনেমা বলতে ইন্ডাস্ট্রির বাইরের সিনেমাটাকে বোঝানো হচ্ছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এখন ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে প্রচুর সিনেমা নির্মাণ হচ্ছে। যেগুলো সেই অর্থে স্বাধীনধারার সিনেমা হয়ে উঠছে না। আমি বলছিলাম, আপনি বিদেশ থেকে এসে সিনেমা বানাচ্ছিলেন। কিন্তু কী হলো? ফিরে গেলেন কেনো? সমস্যাটা কোথায়? ভবিষ্যৎটা কী তাহলে?
মারুফ : আমি কি মন খুলে কথা বলবো নাকি চেপে?
মামুন : হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই। একেবারে খোলাখুলি কথা বলেন।
মারুফ : সমস্যাটা কিন্তু আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত। এই ছবির লোকেশন থেকে শুরু করে যা যা লাগে, প্রত্যেকটা জায়গায় আমি বাধা পেয়েছি। কবরস্থানে কোনো ক্যামেরা ঢুকতে পারবে না। আমি ছয় মাস চেষ্টা করেছিলাম। অলমোস্ট রিজেক্টেড। কিন্তু বোঝেনই তো আমার সিনেমার নায়ক কিন্তু কবরস্থান। পরবর্তী সময়ে আমার চিফ অ্যাসিসটেন্ট ডিরেক্টর, আমার প্রিয়তম ছাত্র, ওর বাবা একদম পার্সোনালি ‘প্রথম আলো’ পত্রিকা থেকে অনুরোধ করাতে, আমি তিন দিনের জন্য কবরস্থানে শুটিংয়ের অনুমতি পাই। সেই তিন দিনের মধ্যে একদিন আমার নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। সেটা ভিন্ন গল্প। হাতে ছিলো দুই দিন। এতোগুলো দৃশ্য আমার করতে হয়েছিলো দুই দিনের মধ্যে। শুধু আমরাই জানি, আমরা কেমন করে এগিয়েছিলাম। এটা হচ্ছে একটা দিক।
আমি ক্লাবের মধ্যে ঢুকতে চেয়েছিলাম, ঢাকা ক্লাব। এখন পর্যন্ত, ওরা খুব গর্বের সঙ্গে বলে¾আমার জন্ম ঢাকায়, শান্তিনগরে আমার বেড়ে ওঠা¾কোনোদিন কোনো ক্যামেরা, কোনো গভর্নমেন্টের সময় এখানে ঢুকতে পারেনি, পারবেও না। এবং আসলেই তারা সাকসেসফুল। আমি অনেক চ্যানেল খুঁজেও সেখানে ঢুকতে পারিনি। পরে আমরা উত্তরা ক্লাবে যাই। সেখানেও পারমিশন পাইনি। আমি গাড়িতে ক্যামেরা রেখে ওকে জাস্ট পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। শট্ নেওয়ার সময় আর্টিস্টকে বলে দিয়েছিলাম¾‘তুই যেয়ে একটু কথা বল; অ্যাজ ইফ ইউ আর কামিং আউট ফ্রম দেয়ার।’ ফলে আমাকে বাইরে থেকে শুট করতে হয়েছিলো।
দেন কাম টু লেডিস মানে মেয়েদের হোস্টেল। পারমিশন পাইনি। যদিও এটা হচ্ছে মিনিমাম সমস্যা। আর সবচেয়ে শেষ সমস্যা যেটা হয়েছিলো, সেন্সর নিয়ে। সেন্সর বোর্ড থেকে সিনেমা ছুটাতে হয়তো একটু ব্যাকডোর বা পয়সা খরচের কিছু বিষয় থাকে। আমার সিনেমার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছিলো, আমি এটা জমা দিতেই পারছিলাম না। মানে উনারা দয়া করে সেন্সর করবে, কিন্তু নিচ্ছিলো না। সিনেমাটা এক্সসেপ্টই করছিলো না। আচ্ছা, কারণটা কী! আমি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নাম নিয়েছিলাম। এবং আমার নাকি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে আসতে হবে। উনি তো ১৪ বছর আগে মারা গেছেন, আমাকে পারমিশন দিয়ে যাননি। তবে আমি তার ভাইয়ের কাছ থেকে পারমিশন নিয়েছিলাম, কিন্তু ভাই নাকি আবার লিগ্যাল অথরিটি না। তারপরে তার বউ-বাচ্চার কাছ থেকে অনেক কষ্ট করে আমি পারমিশন আনি। আনার পরে আবার আমাকে বলে কপিরাইট অফিস থেকে পারমিশন করতে। আবার আমি খোঁজখবর নিই। কিন্তু উনার লেখার আসলে কোনো কপিরাইট নেই। কিন্তু আবারও আমাকে বলা হলো, কপিরাইট করে আনেন। তখন আমি আর মাথা ঠিক রাখতে পারিনি। অল্প কথায়, এই সিনেমা জমা দেওয়ার জন্য আমাকে এম পি, মিনিস্টার, তথ্য সচিবের সঙ্গে আলাপ করতে হয়েছে¾যাতে আমি সিনেমাটা জমা দিতে পারি। তো আপনার প্রশ্ন যেটা ছিলো, আমি কেনো ফিরে গেলাম!
তো যে দেশে একটা সিনেমা জমা দিতে এম পি, মিনিস্টার, সচিবের সঙ্গে আলাপ করতে হয়! তা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। তখন আমার একটা বক্তব্য ছিলো; আমার কিছু ছাত্র ছিলো; তাদেরকে আমি বললাম, ‘ভাই, আমি সরি। তোমাদেরকে আমি বলেছিলাম, বুকের মধ্যে একটু স্বপ্ন, একটু সাহস, সবার সহযোগিতা, যা পাও তা নিয়েই নেমে যাও, যে যেটা জানো সবাই সবাইকে সেটা শেয়ার করো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি পারলাম না, তোমরা যদি পারো তো করো।’ পুরো গল্পটা আসলে আমি বলতে পারছি না। এটা জাস্ট ওয়ান সাইড। আমি সিনেমাটা নিয়ে বলছি। যদি বলেন, টাকার অভাব? আমি একটা ফ্ল্যাট দাদার সূত্রে পেয়েছিলাম, ওটা বিক্রি করে দিয়ে তার পরে এক কোটি টাকার ঋণ নিয়ে আমি নেমে যাই। কিন্তু এটা টাকার বিষয় না, কোনো বিষয়ই না! আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, আমি এখানে অ্যাডজাস্ট করতে পারিনি। এখানে মানিয়ে নেওয়ার যে সংস্কৃতি, তা ছোটোবেলা থেকেই আমি পারি না। তো আমি ব্যর্থ একজন মানুষ হিসেবে ফিরে গেছি। এটা আমি আপনাদের ভিতর ছড়াতে চাচ্ছি না। নিশ্চয় আপনারা এ দেশে থাকেন; মেনে নেওয়া এবং মানিয়ে নেওয়ার মধ্যেই থাকতে হয়। যেটা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আর কোনো প্রশ্ন?
মামুন : অলটারনেটিভ কোনো চ্যানেল ব্যবহার করেননি কেনো? তখন তো ইউটিউব ছিলো, ২০১২ না?
মারুফ : ইউটিউব তখন ওভাবে আসেনি। আর তখন এখানে অতো পপুলারও ছিলো না। অলটারনেটিভ মানে, আমি বগুড়ায় ইলিয়াসের বাড়ি থেকে সিনেমা দেখানো শুরু করি। তিন জন ছিলো আমার প্রথম সিনেমার দর্শক। আমার নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে সিনেমাটা দেখিয়েছি। আচ্ছা আপনাদের আরেকটা কথা বলি, বাংলাদেশের ইতিহাসে সব চাইতে ফ্লপেস্ট সিনেমার নাম হচ্ছে সুরুজ মিয়া। আমি জানি না, আপনারা সিনেমা নিয়ে কতোটুকু জানেন। আমি সুরুজ মিয়ার ছোটোবেলার সুরুজ মিয়া। ওটা আমার কাজিন বানিয়েছিলো। ফলে আমার টার্গেট ছিলো, কাজল ভাইয়ের থেকে বোধ হয় আমি একটু বেটার হবো ফ্লপের দিক থেকে। কিন্তু আনফরচুনেটলি ২০ বছর পরে আমি তার রেকর্ডও ভেঙে ফেলেছি ফ্লপের দিক থেকে। তার পরে আমরা বিভিন্ন জেলায় যাই। আমরা চট্টগ্রামে শো করি, ঢাকায় শো করি। আর কোথায়¾সিরাজগঞ্জ, নেত্রকোণা যতোগুলো পেরেছি¾চেষ্টা করিনি এটা আমাকে বলা ঠিক হবে না আর কী। তবে হ্যাঁ, ‘প্রথম আলো’র আলো আর বাইরের উৎসবের পুরস্কার, এ দুইটা আমি অ্যাভয়েড করতে চেয়েছিলাম। তাই আমি এ সিনেমা কোথাও জমাই দিইনি।
সিনেমাটাতে কিছু রাজনৈতিক ইঙ্গিত আছে, আমি চাচ্ছিলাম যদি ওইগুলা নিয়ে একটু কথা বলা যায়। যদি কেউ করে। তো মানে আপনারা কি সমস্যা বুঝতে পারছেন? এখানে কিছু সমস্যা আমি ফেইস করেছি। প্লিজ এক্সকিউজ হিসেবে নিয়েন না। আই হ্যাভ ট্রায়েড। আমি চেষ্টা করেছি। তার মানে এই নয় যে, আমি থেমে গেছি। আমি আরেকটা সিনেমা বানিয়েছি। আমি এখনো একটা ডকুমেন্টরি বানাচ্ছি। আমি রাজশাহী এসেছি নিউটনকে (সেলিম রেজা নিউটন) আর হাসান (হাসান আজিজুল হক) স্যারকে শুট করতে। আমি বদরুদ্দীন উমরের ওপর একটা ডকুমেন্টরি বানাচ্ছি। আমি সেই চেষ্টাটা করেই যাচ্ছি।
কিন্তু দর্শকের কাছে পৌঁছানো না পৌঁছানো, দেখা না দেখা, ওই ব্যাপারটা আমি আসলে ধরতে পারি না, আসলে তারা কী চায়! আমি যতোটুক বুঝি তাদের মনোযোগের স্ট্রেইনথটা আসলে খুব কম। আমার সিনেমার পোস্টারে আমি কিছু কথা দিয়েছিলাম¾মোবাইল টিপাটিপি করতে করতে আসলে সিনেমা দেখা হয় না। মানে আমি সরি টু সে, এই অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমি অসংখ্য মানুষকে দেখেছি। এবং এটা আবার দেখতে হবে বলেই আমি বাইরে চলে গেলাম। আমি এটাতে পেইন পাই। এখন কথা হলো আমার সিনেমা যদি মনোযোগ দাবি না করে তাহলে কেনো দর্শক দেখবে! মানে দর্শকের তো সেই রাইট আছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় নাই; মানে আর্ট ফর্ম যদি মনে হয়, তবে মনোযোগটা রাখতে হবে। সেজন্য চিত্রনাট্যটা আমি ওভাবেই করেছি, যদি একটু হলেও কেউ সিনেমা ছেড়ে উঠে চলে যায়, সে যেনো বুঝতে না পারে; এটা এনশিওর করাই ছিলো আমার কাজ। ওই ব্যাপারটা আমি কেয়ার করি না যে, কতোজন দর্শক আমার থাকবে। কিন্তু এই সিনেমাটা নাকি অনেক জটিল হয়ে গেছে। কিন্তু আমার ধারণা আমি বেশ সহজসরল করেই এখানে বলেছি। অনেক কিছু আমি ইচ্ছা করে আটকে রেখেছিলাম, যদি দর্শক চলে যায় তাহলে যেনো বুঝতে না পারে। হঠাৎ মাঝখানে এসে যেনো সে বুঝতে না পারে। আমার সব মনোযোগ ছিলো ওই দিকে।
আমার সিনেমা দুই জনও যদি দেখে, তার মধ্যে একজন দুই মিনিটের জন্যও যদি গ্যাপ দেয়, এতে ও লস্ট যদি না হয়, তবে আমি ফেইলিওর। আই ট্রায়েড টু এনশিওর দ্যাট। এবং আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, নান অব ইউ কুড টেল এভরিথিং, যা এখানে আছে। ছোটো ছোটো অনেকগুলো জিনিস আছে। আমি ওইটা নিয়ে আলাপ করতে চাই। যেহেতু তোমরা চলচ্চিত্রের সংগঠন করো, চলচ্চিত্র দেখো, আলাপ করো। আমি চলচ্চিত্র দেখি, খাই, ঘুমাই। যদিও আমি বড়ো কোনো নির্মাতা না। আমার চলচ্চিত্র বানানোর কোনো ইচ্ছাও ছিলো না। একদম ভিন্ন একটা জায়গা থেকে আমি এসেছি এটা করতে। একজন খুব রাজনীতি সচেতন মানুষ হিসেবে আমার কিছু পলিটিকাল এজেন্ডা আছে। আমি তোমার মস্তিষ্কে চড়াও হতে চাই এবং আমি চাই তুমি আমার মস্তিষ্কে চড়াও হও। আমি স্বস্তিতে বসবাস করা পছন্দ করি না। আমি নিজে অস্বস্তিতে থাকি। মানুষ অস্বস্তিতে থাকুক আমি সেটা দেখতে চাই। এতো সহজে রিল্যাক্স আমি পছন্দ করি না। এখন কেউ যদি বলে আপনার পছন্দ না, তাই বলে কি আপনি আমাকে ইয়ে করবেন? হ্যাঁ তাই আমি করবো। আমি চাই তুমি যেনো রিল্যাক্স না থাকতে পারো। কিন্তু সেটা পারা যায় না। আমি চেষ্টা করি ওইটা। তো ওই দাগে কোনো আলাপ থাকলে আমি বলতে পারতাম।
আনতারা সোনিয়া, ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, রা বি : স্যার, চলচ্চিত্রের ভিতর তপু ...
মারুফ : স্যার, স্যারটা আমার পছন্দ না। ভাই, মারুফ ভাই; আমি যদি বড়ো হই ভাই।
সোনিয়া : চলচ্চিত্রে তপু ছিলো আগামীর প্রতীক। কিন্তু তপুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কি সব শেষ হয়ে গেলো?
মারুফ : তপু তো আমিই। আমি তো বেঁচে আছি। না না, ওইটা একটা চরিত্র, ওইটা কাল্পনিক। তপুর ওই ছোটোবেলায় যা যা প্রশ্ন মৌলবিকে, ছোটোবেলায় হুজুরকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম¾আল্লাহ কি সৌদি আরবে থাকে? শবে বরাতে কেনো মানুষ কবর স্থানে যায়? যদিও এর উত্তর আমি এখনো পাইনি। তবে এসব কথায় আমার হুজুর অনেক রেগে গিয়ে বলেছিলেন, খালি আজাইড়া বড়ো বড়ো কথা! যাই হোক তপু মারা যায়নি। তপুর মারা যাওয়াটা সিম্বলিক একটা বিষয়। তপু আমিই। ২০-২৫ বছর বয়সে আমার ওই রকম একটা ইয়ে ছিলো। তবে তপু অ্যাকসিডেন্ট করে মারা যাবে, এটা কথা না। কিন্তু এখন অনেক অনেক তপু দরকার। আবার অনেক অনেক তপু হইলেই যে কিছু একটা হয়ে যাবে, তাও না। মানে আমার কথা হচ্ছে, প্রশ্নটা জারি রাখা। তপুর মনে অনেক প্রশ্ন ছিলো। আপনার উত্তর কি হয়েছে না?
নাজ, বাংলা বিভাগ, রা বি : আমি একটা কথা বলতে চাই, তপু মারা গেছে কি যায়নি, এটা বলার আপনিও কেউ না। (মারুফ : এগজ্যাক্টলি।) আমি দেখছি, আমার কাছে তপু মারা গেছে; আমি যখন আপনার কথাগুলো শুনছি, তখন আমি আবারও অনুভব করলাম, তপু মারা গেছে। তপু মারা যায়নি, এটা আমার মত। যদি আখতারুজ্জামানকে ১৪ বছর আগে জিজ্ঞাসা করা হতো, তাহলে তিনি হয়তো তার মত দিতেন।
আমি প্রথমেই দুঃখ প্রকাশ করছি একটু দেরি করে আসার জন্য। সিনেমায় যখন গাড়িতে ফোনে কথা বলছে¾হয়তো আপনারা যখন ঢাকা ক্লাব, উত্তরা ক্লাবে ঢুকতে পারেননি¾সেই সময় আমি আসি। গাড়িতে কথা যখন বলছে, কথাগুলো আমার স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়নি। মনে হচ্ছিলো লোকটা অভিনয়ই করছে। আর অভিনয় যখন আমি করছি, সেটাকে তো তখন অভিনয় বলা যাবে না। এটা আমার কাছে মনে হয়েছে। তবে আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে যে জায়গাগুলো¾যখন তপু মারা গেলো তার একটা স্যান্ডেল উল্টে আছে, আরেকটা স্যান্ডেল থেকে কী একটা পোকা যেনো বের হচ্ছে, আঁচা হেঁটে যাচ্ছে। মানুষ মরে গেলে শেষ পর্যন্ত কীট-পতঙ্গই খায়। এই যে ব্যাপারটা তুলে আনা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আবার পিঁপড়া দেখানো হয়েছে মৃত্যুর সময়। এগুলো আমার খুব ভালো লেগেছে।
আসলে আপন কেউ মারা না গেলে তো আমরা মৃত্যুকে অনুধাবন করতে পারি না। আরেকটা ব্যাপার, হুজুরের চরিত্রটা আমার কাছে খুব বেশি ভালো লাগেনি। আসলে এখানে আমার কাছে মনে হয়েছে¾তপু ও আর জে যিনি ছিলেন¾এই দুইটা চরিত্রই কিছুটা ফুটে উঠেছে। আর হুজুরের চরিত্রটা আমি ঠিক নিতে পারছিলাম না। আমার মনে হচ্ছিলো, ঠিকঠাক হচ্ছে না, কোথাও একটা গ্যাপ আছে। আবহসঙ্গীত নিয়ে একটু কথা বলি, গিটারের শব্দ ঠিক সুরেলা শুনছিলাম না আমি। গিটার বাজাচ্ছে কেবল তারের শব্দ; তার বাজানোর শব্দ আমি পাচ্ছিলাম, কিন্তু গিটারের সুর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সুরের মূর্ছনার যে ব্যাপারটা সেটা আমি পাইনি। আর সব শেষের যে সঙ্গীতটা, মানে শেষ হওয়ার পর যে গানটা হয়েছে, আমার মনে হয় সিনেমার মধ্যে সেটা কোথাও দিতে পারলে বেশি ভালো হতো। কারণ ওই গানটা ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব বেশি ভালো লেগেছে।
মারুফ : থ্যাঙ্ক ইউ। তোমার অবজারভেশন দিয়ে তুমি সিনেমাটা দেখেছো। আর এটাই তো হওয়ার কথা। মানে কোনো কোনো জিনিস টাচ করবে, কোনো কোনোটা করবে না। এবং আমরা আবার শিখবো, কী কী করা যায়। দ্যাটস ওয়ান্ডারফুল। আমি তোমার প্রত্যেকটা সমালোচনা মাথা পেতে নিলাম। হয়তোবা আমি সাকসেসফুলি পারিনি। মানে চেষ্টা করেছি এই তো। আর বাকিটা তো...
নাজ : না না ওভার অল সিনেমা ভালো ছিলো। মনে হয়েছে, একটা সুন্দর কাজের ইচ্ছা থেকে এটা করা। ক্যামেরার কাজ আমার বেশ ভালো লেগেছে। কিছু কিছু জায়গা থেকে ক্যামেরা ধরার যে ব্যাপারটা বিশেষ করে কবরস্থানে।
মারুফ : আচ্ছা এবার বলি তাহলে। প্রথমে ক্যামেরাতেই আসি। ছোট্ট গল্পটা। আপনারা ক্যামেরায় চার জনের নাম দেখেছেন। খুব কি বেশি কমন এটা? চার জন ক্যামেরাম্যান! কোনো এক বিকল্পধারার ক্যামেরাম্যান, প্রথমে সে আসে আমার কাছে, মারুফ ভাই আমি আপনার সিনেমায় কাজ করতে চাই। তো আমি তাকে একটু প্র্যাকটিস করাই, আমার ক্রেইন ছিলো এগুলো দিয়ে। সিনেমার শুটিংয়ের তিন-চারদিনের মাথায় ও বোধ হয় একটা প্রস্তাব পায় বিখ্যাত কোনো পরিচালকের কাছ থেকে। তখন সে আমাকে বলে, ‘মারুফ ভাই আমি অনেক সরি। কিন্তু আপনাকে আমার বলতে হচ্ছে, আমি এরকম একটা প্রস্তাব পেয়েছি আরেক সিনেমায় কাজ করার।’ তার নামটা না বলি। তখন আমি তাকে বললাম, ‘ঠিক আছে। তার সঙ্গে কাজ করলে নিশ্চয় তোমার জন্য অনেক ভালো হবে। আই উইশ ইউ অল দ্য গুড লাক।’ তার পরের দিন আমাদের শুটিং ছিলো।
আমি আমাদের অফিসে ফিরে আসি এবং আমার ছাত্রদের বলি, কে কে ক্যামেরা চালাতে জানো? দুই জন ছাত্র হাত উঠালো এবং আমার ক্যামেরা রাখতো যে ছেলেটা, সেও হাত উঠিয়েছে। আমি তাদেরকে দিয়েই ক্যামেরা চালিয়ে পরের দিন শুটিং করেছি, থামাইনি। মানে আবারও বলছি, এটা এক্সকিউজ না। আমি মৌলবি আফাজ আলীর দাড়ি নিয়েও গল্প করতে পারি। এই দাড়িটা আমি টোটাল পাঁচশো ডলার দিয়ে কিনি আমেরিকাতে। রিয়েল হিউম্যান হেয়ার। সেই দাড়িটাকে ইস্ত্রি করে একজন সোজা বানিয়েছে। তিনি আমাদের এখানকার পুরস্কার পাওয়া মেকআপ ম্যান। আই ফেল্ট লাইক, দাড়িটা না, উনি আমার বুকের ওপর দিয়ে ইস্ত্রি চালিয়েছেন! তো এভাবে বললে অনেক কথাই আসে।
নুসরাত নুসিন, কবি : আচ্ছা, সিনেমায় কয়েকটা মৃত্যু দেখা গেলো। আমি যে জায়গাটি নিয়ে কথা বলতে চাই সেটা হলো, স্বপ্ন তো কখনো মরে না। মানুষ মরে গেলেও স্বপ্ন থেকে যায়। সিনেমার বক্তব্যে আমার মনে হয়েছে, কিছু জায়গায় একটু অস্পষ্টতা আছে, একটু আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে। য়েস্থেথেটিক জায়গা থেকে আমার মনে হয়েছে, মৃত্যুটাকে এতো সরাসরি বোধ হয় দেখানোর দরকার ছিলো না। বরং এই যে আক্রান্ত হচ্ছে, জর্জরিত হচ্ছে, এ থেকে বুঝে নেওয়া যেতে পারে, স্বপ্ন আসলে কখনো মরে না। স্বপ্ন এক চোখ থেকে আরেক চোখে বেঁচে থাকে, এটা কনটিনিউয়াস। এটা একটা দিক।
মারুফ : আড়াল ব্যাপারটা বুঝিনি; মানে আমি আড়াল করছি? কীভাবে?
নুসিন : এখানে আমার মনে হয়েছে, সিনেমায় আপনি গল্পটা বলছেন একেবারেই সরল ভাষায়। কিন্তু বক্তব্যটা সরলভাবে আসছে না। তো এখানে আমি আপনাকে প্রথমেই সিনেমাটির নির্মাতা হিসেবে অভিনন্দন জানাচ্ছি। তারপর এই সিনেমা নিয়ে আপনার যে বোঝাপড়া, সেটা যদি আমাদের কাছে একটু বলেন। মানে সবসময় আমরা যা দেখছি, সেই দেখার ভিতরেরটা একটু বুঝতে পারলে অনেক সময় ভালো লাগে বা ভালো হয়।
মারুফ : আড়ালের ব্যাপারটা যেটা বললেন, আড়ালটা আসলে কী?
নুসিন : না, এটা আমি আপনার কাছেই জানতে চাইছি। এই সিনেমায় আপনার একটা বক্তব্য আছে, সেই বক্তব্যের কিছু বিষয় আমরা সরাসরি বুঝেছি; তবে এর আরেকটা বক্তব্য আছে আড়ালে। এই আড়ালের বোঝাপড়াটুকু আপনার কাছে জানতে চাই।
মারুফ : সেটা সিনেমার ব্যাপারে নাকি আমার ব্যক্তিগত?
নুসিন : অবশ্যই সিনেমার ব্যাপারে। তবে সিনেমা মানেই তো ইকুয়েলি আপনি। সিনেমা নিয়ে আপনার বক্তব্যটা যদি একটু খোলামেলা আলোচনা করেন, মানে বোঝাপড়ার জায়গাগুলো।
মারুফ : ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে আমরা এই সংগঠনটা শুরু করেছি।
নুসিন : হ্যাঁ এটাই। এই প্রশ্নটাই আপনার জন্যে রাখা হলো। এই সিনেমার ক্যামেরার কিছু কাজ বিশেষ করে ক্লোজ শট্গুলো খুব ভালো লেগেছে। কবরস্থানের দৃশ্যও ভালো লেগেছে। আসলে আপনি চ্যালেঞ্জ নিয়ে কবরস্থানে এই শুটিংটা করেছেন। সত্যিকার অর্থে কবরস্থানের এই ইমেজ বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গার চেয়ে য়েস্থেথেটিক অবস্থা থেকে আমার খুব ভালো লেগেছে।
মারুফ : হাবিবুল্লাহ আর বনানীর কবরস্থানের পার্থক্যটা? আমার চাওয়া এটা ছিলো যে, একদিকে সুন্দর গোলাপের বাগান আরেকদিকে...।
নুসিন : সবার মধ্যে হুজুরকে আমার ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার মনে হয়েছে। হুজুর মানে হাবিবুল্লাহ’র বাবা। আমার কাছে মনে হয়েছে মাটি যেমন সর্বংসহা হয়, হুজুরও তেমন সর্বংসহা। এখানে অবশ্য আপনার উপস্থাপনের বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ।
মারুফ : তাহলে একটু ভেঙেই বলি। আমি শুটিং করেছিলাম একটা আর সিনেমা বানিয়েছি দুইটা। আমার একটা শর্টফিল্মও আছে। সে শর্টফিল্মের নাম কান্না। ওটা হচ্ছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের চিত্ররূপ। আর ... এবং কান্না, মানে বড়ো সিনেমাটার দায়ভার আমার। আমি ইলিয়াসকে খুব পছন্দ করি। তাই আমি চাচ্ছিলাম ওইটা আলাদা থাকুক। এবং শর্টফিল্মটা যদি তোমরা দেখতে, যদিও আফাজ আলী চরিত্রটা আমি আঁকিনি। যতোটুকু ইলিয়াস করেছে, আমি ওইটাই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। বাকি চরিত্রগুলো যেগুলো কবরের ভিতরে থাকার কথা সেগুলো আমরা রিভাইভ করেছি; এবং আমার মতো করে গল্প সাজিয়েছি। তো আফাজ আলী যদি সর্বংসহা মনে হয়ে থাকে এবং গল্প পড়েও তাই মনে হয়, তাহলে আমি সফল। আর যদি গল্পে অন্যকিছু হয়, তাহলে আমি সরি।
নুসিন : তাহলে আমি বলতে পারি, নির্মাতা হিসেবে আপনি একটা চরিত্র দাঁড় করালেন, সেই চরিত্রের সঙ্গে কানেকশন তৈরি করলেন; এখন সেই কানেকশনটা আমাদেরকে একটু বলবেন? চরিত্রের সঙ্গে তো আপনার একটা সংযোগ ছিলো। সেই সংযোগটা আমাদের একটু বলেন। মানে আপনার জায়গা থেকে চরিত্রটাকে দেখা।
মারুফ : ‘কান্না’ কেউ পড়েছেন? (রাজ্জাক নামে একজনের উত্তর, হ্যাঁ পড়েছি) তো গল্পটা আফাজ আলীকে নিয়েই। ওখানে এতো সংলাপ নেই। তো আমি যেটা চেষ্টা করেছি, শর্টফিল্মটাতে আফাজ আলীকে নায়ক করে একটা শুটিং করলাম। আর ... এবং কান্না দেখে যেনো মনে হয় কবরস্থানটা নায়ক। এটা আমার ইচ্ছা ছিলো। এখন সিনেমা সম্পর্কে আমার একটা ধারণা বলি। এটা আপনাদেরকে নিতেই হবে, এমনটা নয়। কারণ এগুলো সব সাবজেক্টিভ।
একটা সিনেমা দেখার পরে যদি চোখ বন্ধ করে তিনটা ভিজ্যুয়াল আসে, তাহলে মনে হয় সিনেমাটা উতরে গেছে। আর যদি একটাও ভিজ্যুয়াল না থাকে তাহলে আমার দৃষ্টিতে, আমার যতোটুকু পড়াশোনা, ওই সিনেমাটা আটারলি ফেইল করেছে কানেক্ট করতে। তো দুটা-তিনটা ভিজ্যুয়াল কি আসে আপনাদের মাথায়? (দর্শকের জবাব, অনেকগুলোই তো আসে) আমি খুশি যে, আমি মিনিমামটা পেরেছি, এতোটুকুই। আর বাকিটা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমরা আলোচনা করতে পারবো, এই জায়গায় অভিনয়টা যদি এরকম না হতো, নাদিয়ার চোখ দিয়ে যদি ওই সময়টায় পানি না বের হতো, এই সময় যদি ফোনটাও না বাজতো। আমার রিয়েল শুটিং টাইমে ওর সবচাইতে বেস্ট অ্যাক্টিং টাইমটার সময়, আমরা যখন সবাই চুপ এটা মোবাইলফোন আমার ওই মোমেন্টটা নষ্ট করে দেয়। কারণ আমার একটা ছেলে তার ফোনটা অন করে রেখেছিলো। আমি জীবনেও ভুলবো না এটা। আই থট নাদিয়ার অভিনয় জীবনেরও বোধ হয় এটা বেস্ট পার্ট ছিলো।
আর আফাজ আলীর কান্নাটা আমি কবরস্থানে পাইনি। এটা আমাকে পরে ডাবিংয়ে করতে হয়েছিলো। সারারাত আমি তাকে আটকে রেখেছিলাম। তার কাছ থেকে আমি যেটা চাচ্ছিলাম, তার থার্টি পার্সেন্ট পেয়েছি। কিন্তু কেনো পাইনি, ওই গল্পটা আমি বলি। বললাম না, তিন দিনের পারমিশন পেয়েছিলাম, তার মধ্যে একদিন আমার সিনেমার মেইন চরিত্র আসেনি। আমরা সবাই বসে ছিলাম। উনি তখন একটা বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে ছিলেন। এইটা আমি তখন জানতাম না, আমি অনেক দিন পর জেনেছি। ইফ আই নিউ ইট, আমি সিনেমাটা ওখানেই বন্ধ করে দিতাম। যাই হোক, থ্যাঙ্ক ইউ।
নুসিন : আপনাকেও ধন্যবাদ। সিনেমাটা অনেক ভালো লেগেছে, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ভালো লেগেছে। এবং সবমিলিয়ে একটা ভালো গল্প আমরা পেয়েছি। এবং আপনি যে কথাটা একটু একটু বলছিলেন, সিনেমাটা নিয়ে কিছু বলবার জায়গা আছে, রাজনৈতিক কিছু বোঝাপড়া আর কী। আমিও ওইটাই বলছিলাম, যদি সেগুলো একটু বলতেন।
মারুফ : এই তো ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ। ১/১১ এর আগের ও পরের ঘটনা, ৯০-এর ঘটনা। আমরা এখন আর শিশুরাষ্ট্র নই। এখন শিশু বললে হাস্যকর হবে। রাষ্ট্রটার বয়স দেখতে দেখতে প্রায় ৪৭। কিন্তু আমার লক্ষ্য ছিলো কিছু কিছু টার্নিং পয়েন্টে একটু ইঙ্গিত করা। ‘এক দফা এক দাবি, এরশাদ তুই কবে যাবি।’ ওইটার মধ্য থেকেই আমার বড়ো হওয়া। রাস্তায় রাস্তায় আমি তখন প্রফেশনাল স্লোগানদাতা। আমি এখনো যদি সেøাগান ধরি, অনেকের চেয়ে ভালো স্লোগান দিতে পারবো। এটার জন্য তখন রিকোয়েস্ট আসতো রীতিমতো। মানে লিডটা যেনো আমি দিই। আই লাইকড ইট। আই ফেল্ট ইট। আমার লোম দাঁড়িয়ে যায়, যদি আমি আবারও ওগুলো দিতে পারি। তখন একদিন আমার পাশে একজন মারাও গিয়েছিলো; একটা মিছিল থেকে ঢাকার কাকরাইলে। আমি অত্যন্ত লজ্জিত হতাম, যদি আমি তখন মারা যেতাম। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যদি আমি মারা যেতাম, এর থেকে খারাপ কিছু আমার জীবনে হয়তো হতো না। সেই এরশাদ এখনো আছে। ৯০-এর আগে পর্যন্ত আমি বলতে পারি, সততার সঙ্গে আমি বিলঙ করেছি এই দেশে। প্রতিদিন আমি মিছিলে যেতাম। কোনো পলিটিকাল পার্টি থেকে না। এটা ছিলো আমার অন্তরের তাগিদ।
আর ২০০৭ কে আমি বাইরে থেকেই দেখি। এবং আই ফেল্ট লাইক, ওটা আরো খারাপ। আওয়ামী লীগ-বিএনপি আরো ২০ বছর দেশ চালাক, পরিস্থিতি আরো খারাপ হোক; তবুও ওই রকম একটা ফিকটিউসাস গভর্নমেন্ট এবং সেটাকে ভালো ভাবা¾দুর্নীতি দমন, আরো কী কী জানি হচ্ছিলো তখন! যদি সেই সময় আরো একবার আসে; আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে, এরকম সময় আরো একবার আসছে। ডু নট এমব্রেস ইট। এই ভুলটাই আমাদের জেনারেশন করেছিলো। এটাকে এমব্রেস করা মানে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। মিনিমাম জবাবদিহিতা যদি না থাকে, এই গভর্নমেন্টও অবশ্য রাখছে না। এখন তো গণতন্ত্রের সময়। গণতন্ত্রের মজাই আলাদা। হ্যাঁ অনেক মজা! আমরা ৯০-এর পরে তো দেখলাম কতো মজা! তার পরেও আফটার এভরিথিঙ ডু নট এমব্রেস দ্যাট কাইন্ড অব গভর্নমেন্ট। যদি আর কখনো আসতে চায় বা আসে; মানে আমি এখনকার পরিস্থিতির জন্য দায়ী করি ওই দিনের ওই ঘটনা; ২০০৭-এর ১/১১। মার্কিন দেশে কিংবা সারাবিশ্বে ৯/১১ যে রকম গুরুত্ব¾৯/১১ এর আগের পৃথিবী আর পরের পৃথিবী ডিস্টিংক্টলি ডিফারেন্ট। আর এই ছোট্ট অভাগা দেশটা ১/১১ এর আগে ও পরে ডিস্টিংক্টলি ডিফারেন্ট। এটা যদি বোঝা না যায়, তোমরা যদি ধরতে না পারো, তাহলে কী আর করা!
সুবন্ত যায়েদ, ইসলামিক স্টাডিজ, রা বি : আমি বলতে চাই, আমরা তো প্রায় ভুলেই গেছি ২০০৭ বা ১/১১ এর বাংলাদেশ। আমরা তো ভুলতেই বসেছি। আপনি কেনো এমব্রেস না করতে বলছেন? ওই জায়গাটা আমি একটু বুঝতে চাই। আমি তো জানিই না ওই সময়ে কী হয়েছে!
মারুফ : বিশ্বের ইতিহাসে কিন্তু এটা নেই। সামরিক সরকার আছে, রাজনৈতিক সরকার আছে। সুশীল-সামরিক সরকার নাই। আমার মনে হয়, এটা দেখে পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়। এটার জন্যে তাকাবে যে, সুশীল-সামরিক যৌথভাবে দেশ চালায়! ইট জাস্ট সামথিঙ, আমরাই পেরেছি করতে!
সুবন্ত : মারুফ ভাই, আমি তো দেখতে পাই ওই সরকার অনেক ভালো ছিলো। সেসময় গাড়িওয়ালারা ভয় পেয়ে গাড়ি রেখে পালাতো। যারা বড়ো বড়ো দুর্নীতিবাজ, তারা তো ভয়ে ছিলো সেসময়ে। এখন যে আওয়ামী লীগ সরকার, তাদের চেয়ে আরেকটা সেনা সরকার, বন্দুকওয়ালা সরকার রাস্তায় নামলে আমরা অনেক ভালো থাকবো। তাহলে আপনি কেনো বলছেন, ওইটাকে এমব্রেস করবো না? করা উচিত না? ওই জায়গাটা একটু পরিষ্কার করেন।
মারুফ : ও আমাকে বার বার খোঁচাচ্ছে পরিষ্কার করতে, সার্ফ এক্সেল দিয়ে আর কী! হ্যাঁ, ইমিডিয়েট লাভ যদি খোঁজো, তাহলে সেনা সরকারের চেয়ে ভালো কিছু আর হয় না। চুল-টুল কেটে সবাই ভদ্র হয়ে যায়, একটা সিস্টেম তৈরি হয়। কিন্তু দুর্নীতি দমন অভিযান করলেই কি দুর্নীতি বন্ধ হয় কখনো? বা র্যাব দিয়ে কি সন্ত্রাস থামানো যায়?
আমি বিএনপিকে ডাকি বুদ্ধু ন্যাশনালিস্ট পার্টি হিসেবে। ওই বুদ্ধু ন্যাশনালিস্ট পার্টি র্যাব গঠন করে ভেবেছিলো, কিছু ঠাস ঠাস করে গুলি মারলেই হয়তো সন্ত্রাস শেষ হয়ে যাবে। এটা কখনোই হয় না। এটা মশার ওষুধ ছিটানোর মতোই। অ্যারোসোল দিয়ে কি মশা নির্মূল হয়? তো এর থেকে বেকুব কোনো ধারণা হতে পারে না।
আচ্ছা, ওই রাজনৈতিক আলাপে না যাই। তুমি যেটা চাচ্ছো। এটা এতো সহজ কোনো কাজ নয়। আমরা একটু ঠান্ডা মাথায় বোঝার চেষ্টা করি, হঠাৎ করে সুবাতাস আসে না। এভাবে রাতারাতি কোনো কিছু হয় না। তাহলে তো ‘প্রথম আলো’ কবে থেকেই বলছে, ‘বদলে যাও, বদলে দাও’। কয়জন বদলেছে? মানে আমার সিনেমা দেখেও কি তুমি বদলে যাবে? ইজ ইট দ্যাট সিম্পল? ওটা আরো খারাপ। কেনো? এখন এটা কীভাবে বলবো আমি জানি না। জলপাই রঙের বেদনা থেকে আমরা বড়ো হয়েছি।
সুবন্ত : এটা তো আমার কাছে গল্পের মতো লাগে। আমি তো খুব ভালো করে বুঝিনি। আপনারা যদি বুঝে থাকেন, সেই বোঝাটা আমি বুঝতে চাই। আপনি কেনো বলছেন, এটা খারাপ, এটা কোরো না! আমার কাছে বা আমার জেনারেশনের কাছে এটা একটা গল্পই। এরশাদের সরকার কী ছিলো তা তো আমরা প্রায় জানিই না বা ভুলে গেছি।
মারুফ : এটা ভুলে গেলে তো দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই না। নব্বইও ভুলে গেছে! আমরা যদি এতো ক্ষণস্মৃতির জাতি হই, তাহলে তো আর কিছু করার নাই। ভুলে গেলে তো আর কিছু বলার নাই। আমি এখানে রাজনৈতিক বক্তার মতো বলতে পারবো না। তবে কোনো এক ক্ষণে কেউ কেউ ঠিক করলো, আজকে থেকে আমি বদলে দেবো দেশটা¾এর চেয়ে ভয়াবহ চিন্তাই হতে পারে না। এটার ওপর যদি আস্থা রাখা হয় এবং মনে করা হয়, সত্যি সত্যিই ক্রিমিনালকে ধরছে, ওকে ধরছে, তাকে ধরছে¾তাতে ওটা আরো বাড়ে।
এখন প্রশ্ন কেনো বাড়ে, কীভাবে বাড়ে? ১৯৯০ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ওইটা তো দেখেছো তোমরা। ২০০৭ থেকে ২০১৮ও তো দেখছো। মানে যদি মনে করো, ইউ আর গোয়িং বেটার, সত্যি সত্যিই আমরা উন্নয়নের রাস্তায় আছি, তাহলে তো হয়েই গেলো। আর যদি মনে করো, এখানে কোনো একটা প্রশ্ন আছে; এই উন্নয়ন সেই উন্নয়ন নয়, তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়িয়ে যায়। উত্তরটা নিজের, একদম নিজের মতো করে বের করতে হবে। এটা কোনো সিম্পল অ্যানসার নয়। আমার অনুভূতি, আমার জীবন দিয়ে পাওয়া উপলব্ধি আমি শেয়ার করছি। আমি জানি নিউটন (অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রা বি) অনেক ভালো বলতে পারবে।
কিন্তু এটা যদি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়¾আমার মনে হয় অলরেডি হচ্ছে¾এর থেকে তো এরশাদই ভালো ছিলো, কিছুদিন পরে আরেকটা কেউ আসলে তখন ওই গভর্নমেন্টটাই তো ভালো ছিলো। ‘অ্যাট লিস্ট’ শব্দটা মনে রেখো। অ্যাট লিস্ট বলে যদি কেউ কিছু বলে, যদি কনসাস থাকো, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওটাকে ৮০ পার্সেন্ট বাড়িয়ে নিতে হবে। তার মানে ওখানে কিছু আছে¾অ্যাট লিস্ট এটা তো ওটার থেকে ভালো। অ্যাট লিস্ট শব্দটা শুনলেই আমার ভয় লাগে। মানে এটা তো একটা অজুহাত।
এখন আমাদের সামনে চয়েস হয়ে গেছে পৃথিবীব্যাপী। এটা খালি বাংলাদেশে আর নাই। কী জানি বলে ওটাকে, কোনটার মধ্যে কোনটা বেটার? (নিউটন : লেসার এভিল থিওরি) লেসার এভিল থিওরি, যেটা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বলেছেন¾চয়েস বিটুইন ম্যালেরিয়া আর গনোরিয়া। ট্রাম্প আর হিলারি হচ্ছে ম্যালেরিয়া আর গনোরিয়া। এখন যদি কেউ বলে, তাহলে বোধ হয় ম্যালেরিয়াই ভালো। সো টেক ইট। আমাদের মিনিমাম চাহিদা হওয়া উচিত, আই উইল নট এমব্রেস ম্যালেরিয়া, আই উইল নট এমব্রেস গনোরিয়া। এখন ম্যালেরিয়া আর গনোরিয়াই হচ্ছে চয়েস। তোমার এর বাইরে কোনো চয়েস নাই। এটাকেও যদি গণতন্ত্র বলা হয়, আর গণতন্ত্র মানে যদি খালি ভোটটা হয়; তাহলে আর কী বলবো! এখন এটা বোঝানোর কী আছে? ভোটের মধ্যে ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো’¾এই আমি মারুফ হোসেন বলছি, এর জন্য আমি লজ্জা পাচ্ছি। আমার তখন বোধবুদ্ধি হয় নাই, আমি তখন বাচ্চা ছিলাম। এখনো যদি তোমরা আবার ওইটাই চাও, আমি এটা শুনে কষ্ট পাবো।
তানভীর শাওন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রা বি : আমি সিনেমাটির কাহিনির ধারাবাহিকতার কথা বলতে চাই। তপু এবং নাফিসার মধ্যে আপনি যে সম্পর্কটা দেখিয়েছেন, এই ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠা আমাদের সমাজে কিন্তু অতো তাড়াহুড়ো করে হয় না। আমি বলতে চাচ্ছি, প্রত্যেকটা সম্পর্কে একটা স্ট্রাগল থাকে। আমার মনে হয়েছে, সেই স্ট্রাগলটা আপনি আনতে পারেননি। আপনি বড্ডো তাড়াহুড়ো করেছেন।
মারুফ : অনেক দিন পর দেশে ফিরে আমি আসলে ঠিক এই ধরনের সম্পর্ক গড়তে দেখেছি। লিটারেলি। এবং সেজন্য একটা গানও আমি ওর সঙ্গে দিয়েছি। এ সম্পর্কটা আসলে হচ্ছে না। গানটা যদি শোনো, এটা জমাট বাঁধা সম্পর্ক আসলে না। এটা হচ্ছে পিওর ফিজিকাল অ্যাট্রাকশান। আর এখানে কোনো সম্পর্কের বিষয়ই নাই। এখন এভাবেই প্রেম হচ্ছে। তোমাদের জেনারেশন, আমি জেনারালাইজ করতে চাই না; কিন্তু এটা হচ্ছে। এটা যদি হচ্ছে না বলো, তবে আমি সরি। আমি তোমাদের কাছে আবার ক্ষমা চাচ্ছি। এতো ক্ষমাও আমি আসলে চাইতে পারবো না। আই হ্যাভ সিন ইন মাই ওন আইজ।
তানভীর : কিন্তু যে সম্পর্কে অভিমানের পাহাড় জমে, যে সম্পর্কে একের প্রতি অন্যের বিচার আসে¾তুমি এটা করছো, এটা আমার পছন্দ না কিংবা এটা তুমি কেনো করবে¾এই রকম একটা আকাক্সক্ষার যে সম্পর্ক, সেটা কিন্তু শুধু ফিজিকাল মনে হয় না। এটার জন্য যথেষ্ট বোঝাপড়ার দরকার হয়, যথেষ্ট হাঁটার দরকার হয়, একসঙ্গে পা মেলানোর দরকার হয়। তো এটার মধ্যে স্ট্রাগল থাকা উচিত, আমার মনে হয়েছে।
মারুফ : আহা, আমি এই ছেলেটার ন্যাচারাল সম্পর্কটা ওই রকম পাইনি। আমি যদি দেখিয়ে বলি এটাই সব¾এই তিনটা নাচ বা দুইটা গান; তারপর? সব সম্পর্ক জমাট বাঁধে না। আমি হরদম এটা দেখছি। সামহাউ আই চুজ দিস প্র্যাকটিস। আচ্ছা, আমি একটু বলি তাহলে। আমার ওই মেয়েটাকে দেখানোর কথা ছিলো¾ও মুচকি হেসে চাকরিটা একসেপ্ট করবে। কিন্তু¾ ‘চাকরিটা আমি আর করছি না’¾এই ডায়লগটা মনে আছে? রেডিও স্টেশনটা আবার খুলে যায়। আমার এই সিদ্ধান্তে তখন আমারই এক ছাত্র, আমার সঙ্গে পাঁচ ঘণ্টা তর্ক করে¾মারুফ ভাই প্লিজ মেয়েটাকে দিয়ে এটা করায়েন না।
এখন এইখানে আমাকে যদি আবার নারীবাদী দিক থেকে বলা হয়, আপনি একটা মেয়েকে এইভাবে দেখালেন আর ছেলেটাকে দেখাচ্ছেন গ্রিডি। আমি অপারগ। আমি পরের সিনেমায় আবার এটা উল্টিয়ে দেবো। আমি এটা এভাবে ভেবে করিনি। আমি দুই জনকেই মানুষ ভাবি। আমি হয়তোবা পলিটিকালি কারেক্ট মানুষ না। যেমন, এইটায় আমি আফাজ আলী, ইসলাম, সুরা, দোয়া, রিচুয়াল এগুলো করেছি না? আমার পরের সিনেমাটা একটা হিন্দু লোয়ার কাস্ট ছেলের আত্মহত্যার গল্প নিয়ে। সেখানে আমি ঠিক ওই রকম রেসপেক্ট নিয়েই তাদের রিচুয়াল, তাদের সাত পাক দেওয়া দেখাবো। প্লিজ কোনো একটা দিক থেকে ঠাস করে জাজমেন্টে যাবেন না। আমাকে অলরেডি বলা হয়েছে, আমি নাকি রিচুয়ালগুলোকে খুব এক্সোটিক করেছি। কিন্তু তার পরেও সিনেমা দেখার পর তোমার যা যা ফিলিংস হবে এটা তোমার। এটা তুমি বলতেই পারো¾ভাই এতো প্যাঁচাল পাইরেন না, আমি যা বোঝার বুঝছি। ইউ হ্যাভ অল দ্য রাইট। আমি জাস্ট আমারটা বলতে পারি। যেহেতু আমি এখানে আছি।
তানভীর : তবে আমি আরেকটা কথা বলবো। নাফিসার প্রতি তপুর যে অভিমান বা সে ঘনঘন সিগারেট ধরায়, এই যে অভিমান বাড়ে; এক্ষেত্রে বিপরীত দিক থেকে নাফিসারও কিন্তু একটা দ্বিধা চলে আসার কথা। আমি কেনো পা বাড়াচ্ছি; একটা ধাপের পর আরেকটা ধাপ আমি কেনো এগোচ্ছি?
মারুফ : এটা তো বান্ধবীটা বলে, তুই তো জানতি তপু তোর জন্য ওয়েট করছে, তার পরেও কেনো বসের সঙ্গে লাঞ্চে গেলি?
তানভীর : দ্বিধাটা কিন্তু পুরোপুরি ভিজ্যুয়ালাইজড হয়নি।
মারুফ : না না, ও তো দ্বিধায় ছিলো না। এই মেয়ে খুবই ক্যারিয়ারিস্ট। দ্বিধা তার ছিলো না।
তানভীর : পুরোপুরি ক্যারিয়ারিস্ট বলাটা ভুল হবে। কেননা তিনি একজন স্টুডেন্ট।
মারুফ : আমি ঠিক সেটা বলছি না। আই আন্ডারস্ট্যান্ড। আমি এমন একটা চরিত্র করতে চাইছিলাম যে ক্যারিয়ার পছন্দ করে। আর ওই মেয়েটা তো বলেও, ‘ক্যারিয়ারের জন্য অনেক রকম স্যাক্রিফাইস করতে হয়।’ সেটা ও বিশ্বাস করে। আমি জানি না তোমার কাছে কেনো খুব খারাপ লাগছে, এটা তো হতেই পারে। আমার মধ্যে অনেকগুলো খামতি আছে, তোমার মধ্যেও আছে। আমরা যদি নিজের দিকে দেখি, অনেক জিনিস আমরা ভাবতে ভালোবাসি যে, আমি বোধ হয় ও রকমই। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করলে এটা দেখবে।
তানভীর : আমার আরেকটা কথা বলার আছে। এ সিনেমায় প্রথম থেকে শেষ অব্দি যে বার্ডস আই ভিউ মানে উপর থেকে আপনি যে কবরগুলোকে দেখিয়েছেন; আমার মনে হয়েছে, এর মধ্যে দিয়ে আপনি কেনো জানি বার বার চেষ্টা করেছেন¾পুরো সমাজটা একমাত্র কবরে এসেই এক হতে পারে, কবরস্থানেই এক হতে পারে। তাদের যে একটা এক হওয়ার প্রবণতা বা এক হওয়ার ক্ষেত্র, সেটা যে ঢাকা শহরও হতে পারে, বা শহরটাকেও একটা বার্ডস আই ভিউয়ে দেখানো যেতো এটার এক হওয়ার ক্ষেত্র। কিংবা মৃত্যুটাই শেষ কথা না, মৃত্যুর বাইরেও কিছু কথা থাকে।
মারুফ : আমার পরের সিনেমার নাম কী জানো? মৃত্যু এবং ...। সামহাউ আমি ‘এবং’ সিরিজের পরিচালক হয়ে যাচ্ছি।
তানভীর : আরেকটা কথা বলতে চাই। আমার মনে হয়েছে, আপনি কেনো জানি সিনেমার মধ্যে ভয় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টাটাই বেশি করেছেন। এইটা আসলে এতোটা দরকার ছিলো না। (মারুফ : ভয় পেয়েছো?) আমি ভয় পাইনি। কিন্তু ভয় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা ...।
মারুফ : অপচেষ্টা তাহলে। বি বোল্ড।
তানভীর : আসলে সে ভয় না, পরকাল সচেতনতার দিকে ইঙ্গিত করছি কিছুটা। ব্যাপারটা তেমনও হতে পারে। কিন্তু একটা মেলবন্ধনের ব্যাপার। এটা কিন্তু পুরো শহরেও তারা এক হতে পারে। তাদের সেই দিকে কোনো যোজনা নেই, কিন্তু তারা কি এসে এক হচ্ছে ওখানেই বা ওখানেই হতে হবে, এমন একটা বাধ্যবাধকতা টেনে আনা হচ্ছে। এমন একটা ব্যাপার আমার কাছে খটকা লেগেছে আর কী।
মারুফ : খটকা কোথায়, আমি এটাই দেখি। ওয়ান থিঙ ইজ ফর সার্টেইন। একটা জিনিসই আমি বুঝি যে, উই অল ডাই। এটা আমি আর কী করলাম, এটা তো হচ্ছেই। দিস ইজ দ্য ওনলি রিয়েলিটি আই ক্যান একসেপ্ট। শেষ পৃষ্ঠার আগে অনেক গল্প; কিন্তু এটা যে শেষ পৃষ্ঠা এটাতে তো কোনো প্রশ্ন নেই। আমি এটা ধরতে পারছি না; এটা কি আমাকে অভিযোগ দিচ্ছো; আমরা কেনো মারা যাচ্ছি?
তানভীর : এটাতে একটু নজর দেওয়া উচিত ছিলো।
মারুফ : কী? মানে যে কেউ সারাজীবন বেঁচে থাকবে?
তানভীর : না তেমনটা না। কবরগুলোকে একখানে করা হচ্ছে যে, কবরগুলো সব সমান।
মারুফ : তুমি কি দুটো কবর দেখতে পাচ্ছো নাকি একটাই, খালি বনানীরটা দেখছো? ওই হাবিবুল্লাহর কবরটা কি দেখেছিলে? এটা যদি তোমার ভিজ্যুয়ালি প্যারালাল না আসে, তাহলে আমি ফেইলিওর। আমি পারিনি তোমার সঙ্গে কমিউনিকেট করতে। আমি চাচ্ছিলাম বনানীর ওই সুন্দর কবরস্থানটা, কারণ বড়োলোকদের দুঃখ-কষ্ট আমার খুব লাগে। আই ফিল ভেরি ব্যাড ফর দেম। ওদের যতো কষ্ট হয়, আমার আরো বেশি কষ্ট হয়। আমার সবসময় মনে হয়, কিছু করি ওদের জন্যে। তো সেজন্যেই গুরুত্বটা হয়তো ওইখানে বেশি। আর গল্পটা আসলে ওইখানেই লেখা, বনানী কবরস্থানে। কিন্তু আমি বার বার হাবিবুল্লাহর কবরটাও দেখছি। আমি যদি তোমাকে দেখাতে না পারি, যদি তোমার মাথায় ওটা না থাকে, আমি ব্যর্থ। তুমি যদি দুইটা কবর আনতে না পারো, তাহলে আমি ব্যর্থ। আর কিছু বলতে পারবো না। আর ওইটা (মৃত্যু) তো ডেসটিনি। ওটাতে আমার কী বলার আছে!
মো. হারুন-অর-রশিদ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রা বি : প্রথমেই বলে নিই, আপনার এই সিনেমাটা দেখে আমার অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছে! কোথায় যেনো একটা ভালো লাগছে! আপনি বলছিলেন, এই সিনেমার মাধ্যমে কিছু পলিটিকাল বিষয়ে খোঁচা দিতে চেয়েছেন। আপনি একই কবর দুইভাবে দেখিয়েছেন, দুইটা রূপ দিয়েছেন¾একটা বনানীর আর একটা অজপাড়াগাঁয়ের।
মারুফ : তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছো, এর পিছনে একটা ঘটনা আছে? মূল গল্প থেকে ইলিয়াসের একটা লাইন বলে দিই¾কেনো আমি এই গল্পটা বেছে নিলাম¾ ‘ওখান থেকে পর্দানশিন মেয়েমানুষের গুয়ের গন্ধ ভেসে আসছিলো।’ এখন তুমি আমাকে বলো, পর্দানশিন মেয়েমানুষের গুয়ের গন্ধ উনি কেনো বললেন?
হারুন : আপনি এজন্য একটা বোতল দেখিয়েছেন।
মারুফ : কিন্তু অ্যাকোর্ডিং টু ইলিয়াস, যেকোনো গন্ধ না এটা; পর্দানশিন মেয়েমানুষের গুয়ের গন্ধ। আমি ইলিয়াসের ভাইয়ের কাছে পারমিশন নিয়েছিলাম এই বলে যে, খালিদ ভাই, আমাকে সিনেমাটা একটু বানাতে দেন। আমার মাথায় যেহেতু ইলিয়াস সবসময় আটকে থাকে। আমি জানি, সায়েন্টিফিকালি ইটস ইম্পসিবল টু শুট স্মেল। কিন্তু একজন মানুষ আছে এই পৃথিবীতে, তারকোভস্কি। তিনি স্মেল শুট করেছেন। আমরা তো আর তারকোভস্কি না! এখানে শুধু গুয়ের গন্ধ হলেও হবে না। অ্যাকোর্ডিং টু চিত্রনাট্য ও গল্প, ওটা নাকি পর্দানশিন মেয়েমানুষের গুয়ের গন্ধই হতে হবে। তো আমার চেষ্টা ছিলো, কিছু হলেও যেনো আনতে পারি, কোনো একটা গন্ধ। বুঝতে পারছো, সাহিত্যের তুমি যতোই চিত্ররূপ করো, ক্যান ইউ পোর্ট্রইেট পর্দানশিন মেয়েমানুষের গুয়ের গন্ধ? তাহলে নিশ্চয় পর্দা ছাড়া মেয়েমানুষের গুয়ের গন্ধ আরেক রকম, বেপর্দা পুরুষের আরেক রকম। তার মানে পাঁচ ধরনের স্মেল আমার ক্যামেরার মধ্য দিয়ে আসতে হবে এবং দর্শককে ফিল করাতে হবে। কিন্তু এই হচ্ছে টেকনোলজির অসুবিধা। যেমন ‘কান্না’র আরেক জায়গায় আছে¾আগরবাতি, পারফিউম, মেশকে আম্বরের ধোঁয়া সবগুলো একসঙ্গে হয়ে কবরের চারপাশে মশারির মতো গুঁজেগুঁজে দিতে থাকলো। ক্যান আই পোর্ট্রেইট দ্যাট? বাট আই ট্রায়েড। কবরে ওই একটুখানি ধোঁয়া-টোয়া দিয়ে।
হারুন : আমি জানতে চাচ্ছিলাম, কবরের যে দুইটা রূপ, এর মধ্যে তো একটা রাজনীতি লুকিয়ে আছে। আমি সেই রাজনীতিটা আপনার মুখ থেকে জানতে চাচ্ছি।
মারুফ : এইটা কী আর রাজনীতি? গরিব মানুষ, জীবন, মরণ। তবে মারা যাওয়ার পর হয়তোবা তাদের মোলাকাত হয় কি হয় না, সেটা তো আমরা জানি না। এখানে এর বেশি রাজনীতি নাই।
হারুন : সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আগে ড্রাইভার যখন ছুটি চাচ্ছিলো, ও দিচ্ছিলো না। তখন ওর স্ত্রীর একটা ডায়ালগ ছিলো এরকম যে, স্কাউন্ড্রেল তুমি ভালো রেজাল্ট করে গ্রাম থেকে আজ এখানে উঠে এসেছো। আরেকটা হচ্ছে যে, হুজুর টাকার জন্যে ওখানে পড়ে আছে, শবে বরাতের জন্য অপেক্ষা করছে। সেটা তো অবশ্যই টাকার জন্য। আবার বলা হচ্ছে, আর এক-দুইটা দিন আগে এলে হয়তো ছেলেটাকে দেখতে পারতো। সবকিছুর মধ্যে একটা রাজনৈতিক-অর্থনীতি কাজ করছে। এটাকে আপনি কীভাবে তুলে ধরেছেন-আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি।
মারুফ : আমরা তো এটা জানিই, তাই না? আফাজ আলী, সে কি আসলে ভালোবেসে এ কাজ করে? করার কি কথা! হি ইজ অ্যা পারফরমার। তার পারফরমেন্স ভালো হলে সে বেশি টাকা পায়, খারাপ হলে পায় না। মৌলবিদের কাজ কী, তারা তো পারফরমার। আমি তাদের খাটো করছি না এখানে। পারফরমেন্সটা কী? আমি যা যা দোয়া-দরূদ জানি, ওইটা পাঠ করি এবং ওটা যেনো কাজ করে। আমাদের চরিত্র আফাজ আলী সেখান থেকে বের হতে চাচ্ছিলো। ছেলেটার জন্যই সে অপেক্ষা করছিলো। ছেলেটা মাদ্রাসায় থাকবে না, সে চাকরি নেবে। সো হোল হার্টেডলি সে চাচ্ছিলো ওখান থেকে বের হয়ে যেতে। কিন্তু তারপরে যখন গিয়ে সে দেখে, এই ছেলেটাও নেই; হি ডাজেন্ট সি এনিথিং। এজন্যে লাস্টে সে আর পারফর্ম করেনি। এবং শেষে তার সব আবেগ বের হয়ে আসে¾ ‘তুমি আমার পোলাটারে নিয়া গেলা আল্লাহ ... !’
আর কী বলবো, চেষ্টা করেছি। অনেক ঘাটতি থাকবে। সিনেমা আমার কাছে অনেক কঠিন একটা জিনিস। দ্য মোস্ট ক্রিটিকাল আর্টফর্ম। সবগুলো আর্টফর্মের সমষ্টি হয় সিনেমায়। তার পরেও আবার দেখেন কলমের কী শক্তি, যা লিখছে কারো সাধ্য নেই, ওটাকে আনার। তাহলে একেক জনের একেকটা পাওয়ার। মানে আমি কোনোটাকেই ছোটো-বড়ো করে দেখি না। আমি পড়তেও ভালোবাসি, সিনেমা দেখতেও ভালোবাসি।
হারুন : আমার আরেকটা প্রশ্ন আছে। আচ্ছা, আপনি ইলিয়াসের প্রতি ঝুঁকলেন কবে থেকে, আর কেনোইবা এতো অনুপ্রাণিত হলেন?
মারুফ : ‘বন্ধ কপাট ইয়েস বন্ধ কপাট/ আগডুম বাগডুম ইন খোলা মাঠ/ ম্যান অফ দ্য কপাট ম্যান ইন দ্য কপাট/ দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট/ কর্নেলে জেনারেলে করলো লোপাট’¾ইন্টারমেডিয়েটে পড়ার সময় বইটা আমি পড়ি। আমি ফুটবল খেলছি, মাতাল মাতাল অবস্থা; আর এই আগডুম বাগডুম মাথার মধ্যে ঘুরছে। বাংলা ভাষায় এমন কিছু আমি আর কোনোদিন পড়িনি। আই নেভার রিড এনিথিঙ বিফোর। তখনই ওটা আমার মধ্যে আটকে গেছে। আর সিনেমাই বানাতে চেয়েছিলাম; ভেবেছিলাম ‘চিলেকোঠার সেপাই’ একদিন বানাবো। কিন্তু ...।
হারুন : এইটা আপনার কবে থেকে মনে হয়েছিলো, ইলিয়াসের বিষয় নিয়ে সিনেমা বানাবেন?
মারুফ : ‘চিলেকোঠার সেপাই’ই আমি বানাতে চাই। এটা আমার অনেক আগের স্বপ্ন। কিন্তু সিনেমা বানানোর টেকনিকাল দিকটা তো আমি জানতাম না। আমি এর আগে একটা নাটকের কাজ করি। সেখানে শুটিং করতে গিয়ে অনেকগুলো অভিজ্ঞতা হয় আমার। তখন বুঝি এ নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। কোথাও কোনো একটা গ্যাপ আছে। আমি আসলে এসেছিলাম ‘তিন গোয়েন্দা’ বানাতে।
আমার ভাইয়েরা আমাকে বললো, ‘এটা কী করলে তুমি!’ আমি বললাম, তিন গোয়েন্দা তো বানাবোই, তার আগে আমার প্রিয় লেখকের একটা শর্টফিল্ম বানাবো না! তারপর কান্না বানাতে গিয়েই আমি ধরা খেয়েছি। যাই হোক ওটা ছিলো আমার প্র্যাকটিস। আই ওয়ান্টেড টু মেইক ‘চিলেকোঠার সেপাই’। ছফাকে নিয়েও একটা সিনেমা বানানোর ইচ্ছা আমার আছে। ছফার ওই উপন্যাস দুটো তোমরা পড়েছো¾ ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ আর ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’? এই দুইটা এবং ‘যদ্যপি আমার গুরু’ তিনটাকে মিলে একটা স্ক্রিপ্ট করার চিন্তা আমার আছে। এটা আমার ড্রিম প্রজেক্ট। কিন্তু ওটার জন্য কোনো স্পন্সর আমি খুঁজছি না। আমি স্পন্সরশিপ নিই না।
হিরু মোহাম্মদ, ইতিহাস বিভাগ, রা বি : চলচ্চিত্রে আপনি অনেকগুলো সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার কথা বলেছেন। কিন্তু সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান হবে, তার কোনো ইঙ্গিত দেননি। হিউম্যান বিঙ হিসেবে আমরা কিন্তু একটা পরিবর্তন বা আশার ইঙ্গিতের অপেক্ষায় থাকি। এই ইঙ্গিতটা আপনি দেননি। তাহলে সমাজ কীভাবে পরিবর্তন হবে? আর দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনধারার চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎটা কী?
মারুফ : প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা আমি আর দেবো না। এটা নিয়ে বলতে গেলে তোমাদের ...।
নাজ: এভাবে তো আসলে কোনো সমাধান হয় না।
হিরু : শিল্প তো মানুষকে স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু আমি তো এখানে কোনো স্বপ্নই পাচ্ছি না।
নুসিন : অবশ্য নাফিসাকে এখানে একটা সমাধান মনে হয়েছে।
নাজ : স্বপ্নটা কিন্তু নাফিসা। আপনার (মারুফকে উদ্দেশ করে) যে স্টুডেন্ট বলেছে, “প্লিজ স্যার নাফিসাকে দিয়ে অন্তত ‘না’ বলান।” সেটা কিন্তু ভালো কাজ হয়েছে।
মারুফ : আমি কিন্তু ভাবছিলাম ওই শুঁয়াপোকাটার কথা। ওই যে স্যান্ডেলটা উল্টে ছিলো, ওখানে একটা শুঁয়াপোকা ছিলো। ওই শুঁয়াপোকাটা বড়ো হবে, প্রজাপতি হবে। আমি এমন একটা স্বপ্ন দেখতে চাচ্ছিলাম। আর শোনো, সমাধান যদি আমার থাকতো বাবা তাহলে আমি ওটাই বেচতাম।
তো আমি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না। এতে সবাই খুব বিব্রত হয়। একটা কথা বলি, আমার গুরু নোম চমস্কি। সারাজীবন তিনি এই প্রশ্নের উত্তর দেননি। অবশ্য একবার দিয়েছিলেন; উত্তরটা কী¾ডু দ্য রাইট থিঙ। তো সমাধান হচ্ছে এইটা¾ডু দ্য রাইট থিঙ। এবং এর থেকে ভালো উত্তর আর দেওয়া যায় না। তবে এটাকে যদি আমরা আবার ‘প্রথম আলো’র সেøাগানের সঙ্গে মিলায়ে নিই, তাহলেও সমস্যা।
আর দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, স্বাধীনধারার চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ। এই শব্দগুলো¾স্বাধীনধারা, বিকল্পধারা, মুক্তধারা, আর্টফিল্ম, কমার্শিয়াল ফিল্ম ইত্যাদি¾আমাদের বয়সের জিনিসপত্র। এই নিয়ে আলোচনা, তর্ক উফ্! সে আরেক জিনিস। সে যাই হোক সিনেমা সিনেমাই¾ভালো, খারাপ। কার কাছে কী ভালো, তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। তোমার কাছে যেটা ভালো, আমার কাছে না। মানে, আই ক্যান নট ফেইস ইউ¾তোমার ওটা ভালো লাগে কিনা। এটা আজাইড়া তত্ত্ব। আর প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের ওই গানটার মতো যদি বলি¾ ‘আলু বেচো, ছোলা বেচো, বেচো বাখরখানি/ বেচো না বেচো না বন্ধু তোমার চোখের মণি।’ তো বেচা-বিক্রি যদি বোঝো, অবশ্য আমাদের চাইতে তোমরা এখন ভালো বুঝছো। বেচা-বিক্রির যে বিষয়টা ওটা যদি তুমি না করতে চাও, মেইনস্ট্রিম ঘরানার বাইরে গিয়ে তুমি যদি হাঁটতে চাও। তাহলে ...।
আরেকটা কথা বলি, নূরুল আলম আতিকের মতো নাট্যনির্মাতা আর ফারুকীর মতো পয়সা কামানো নির্মাতাকে তুমি যদি কমবাইন করতে পারো¾ইট ইজ আপ টু ইউ। মানে আই ডোন্ট নো, ইট ইজ পসিবল! তাহলে ভবিষ্যৎ কী? ভবিষ্যৎ হচ্ছে এটাই, যদি আয়নাবাজি অনেক চলে, তাহলে আরো অনেক আয়নাবাজি আসবে। ভালো-খারাপ আমি জানি না। আমার সেকেন্ড সিনেমায় এটা নিয়ে আলাপ আছে। কারণ আমার বেশি সময় নাই। তাহলে এই উত্তরটা পেতে হলে তোমাকে কষ্ট করে আমার দ্বিতীয় সিনেমাটা দেখতে হবে। ওখানে এটার উত্তর আমার দিক থেকে মানে আমাদের ‘সৃষ্টিগড়’-এর পক্ষ থেকে আমরা দিয়েছি।
শাকিল আহাম্মেদ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রা বি : তপু যখন বন্ধুকে বাঁচানোর জন্য তার বাবার কাছে গেলো, তখন তপু কিন্তু বলেছিলো¾ ‘আমি আমার বাবাকে ঘৃণা করি। শুধু তোর কারণেই আমি বাবার কাছে যাচ্ছি টাকার জন্যে।’
মারুফ : হ্যাঁ, এখানে একটা ইংরেজি সংলাপ দিয়েছিলাম, না দিলেই ভালো হতো। ‘ব্ল্যাক মানি শুড সল্ভ দ্য ব্ল্যাক প্রবলেমস অব ইয়োরস।’ ওর বন্ধুর তো ড্রাগের সমস্যা। আর তপু তো খুব নীতিবান একটা ছেলে। তাই ও ভাবছে, কালো টাকা দিয়েই কালো সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
শাকিল : তার মানে বোঝা যাচ্ছে, তপু কখনো তার বাবার কাছে টাকার জন্য যায় না। বাবা তার কাছে খুবই ঘৃণার পাত্র। কিন্তু কেনো বাবা এতো ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠলো? আর আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, আফাজ আলী তো কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলো। কিন্তু আফাজ আলীর দাড়ি একদম কৃত্রিম মনে হচ্ছিলো। এ ধরনের দাড়ি সাধারণত আমরা মঞ্চনাটক কিংবা যাত্রাপালায় দেখি!
মারুফ : শুরুর দিকে এটা আমি বলেছি ভাই। ওটা অনেক কষ্টের কথা। আর প্রথম প্রশ্নের জন্য গ্যারেজের দৃশ্যটা আরেকবার দেখতে হবে তোমাকে। গ্যারেজে ওই দৃশ্যে মা-বাবার ঝগড়া তপু কিন্তু দেখে। এখন আমি যদি ওটাই বানাতে থাকি, বাবার প্রতি তপুর এতো ঘৃণা কেনো, তাহলে গল্প চলে যাবে আরেক দিকে।
আমি তপুর বন্ধুকে রাস্তায় রেখে এসেছি না¾গল্প কিন্তু ওদিকেও নিয়ে যেতে পারি। এখন সব উত্তর তো আর সিনেমার মধ্যে দিতে পারবো না। তাহলে তো সিনেমা চলতেই থাকবে। তোমরা এক ঘণ্টা ৪০ মিনিটই দেখতে পারো না ঠিকমতো, সরি। তাহলে তো আমাকে সাড়ে তিন ঘণ্টার সিনেমা বানাতে হবে। ইঙ্গিতগুলো দেওয়া আছে সিনেমার মধ্যে। এখন তুমি যদি বলো, এতো দ্রুত কি এতো ঘৃণা হয়! তাহলে তো আবার ডেইলি লাইফ দেখাতে হবে।
অধরা মাধুরী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রা বি : আমার ঠিক প্রশ্ন নেই, দুটো অনুধাবন শুধু বলবো। দুটো গোরস্থান দেখানো হয়েছে। তার মধ্যে লিঙ্ক তো শুধু হুজুর আফাজ আলী। তো যেটা আমাকে হিট করেছে বেশি¾অন্যের জন্য কাঁদাই যার পেশা, সে নিজের ছেলের কবরে গিয়ে খুবই একটা নির্লিপ্ত এক্সপ্রেশন ধরে রেখে দোয়া করে চলে আসে। এবং অন্যের হয়ে কাঁদার জন্য সে টাকা পায়, অথচ নিজের জন্য কাঁদার সুযোগ পায় না। এই জায়গা আমাকে বেশি হিট করেছে।
আরেকটা হচ্ছে, তপু মারা গেলে তার মা সে ঘরে যায়। সেখানে ওর বইগুলো ছিলো টেবিলের উপরে, শুধু ‘দ্য চমস্কি রিডার’ বইটা অর্ধেক পড়া অবস্থায় উল্টো করে রাখা ছিলো। মা বইটা বন্ধ করে চলে আসেন। সিম্বলটায় আমি যেটা বুঝেছি, বই পড়াটা ওটা অর্ধেকেই বন্ধ হয়ে গেলো আসলে। সেটা হয়তো একদিক দিয়ে ঠিক আছে। কিন্তু একজন মায়ের পার্সপেক্টিভ থেকে যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে তিনি বোধ হয় চাইবেন না, ছেলেটা মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গেই সবকিছু বন্ধ হয়ে যাক। বইটা যদি মা খুলেই রেখে যেতেন, তাহলে বোধ হয় আরেকটু বেশি আমার কাছে ফিলিংসটা ধরা পড়তো। ধন্যবাদ।
মারুফ : থ্যাঙ্ক ইউ। সুন্দর বলেছো। ওই বইটা তপু যখন পড়ছিলো, সেখানে আরেকটা বই ছিলো। ওই বইটা কি খেয়াল করেছো, ওই বইটার নাম কী? পরিচালক হিসেবে আমার হয়তো দায়িত্ব ছিলো ওটাকে ক্লোজে দেখানো। কিন্তু আমি চাই ওটাকে পজ করে বড়ো করে যাতে দর্শক দেখে। বলো দেখি বইটার নাম কী?
অধরা : লাল রঙের একটা বই।
মারুফ : বদরুদ্দীন উমরের লেখা ‘ডক্টর ইউনূসের দারিদ্র্য বাণিজ্য’। এখন দেখো এরকম আমি আরো অনেক গল্প বলতে পারি। এগুলো মজার খেলা কিন্তু। অনেকটা পাজল মেকিংয়ের মতো। আর বই বন্ধ করে দেওয়ার ব্যাপারটা হচ্ছে, মায়ের দিক থেকে একটু চিন্তা করো; ছেলে মারা গেছে, উনাকে কিন্তু স্বামীর সঙ্গেই থাকতে হবে। এজন্য সে বইটা বন্ধ করে দেয়। দর্শকের পার্সপেক্টিভ থেকে ব্যাপারটা হয়তো একটু কেমন! কিন্তু মায়ের দিক থেকে চিন্তা করলে বুঝতে পারবে।
আর তোমাকে সত্যিই ধন্যবাদ। তুমি সিনেমার মাঝখানে বেরিয়ে গেছিলে, তার পরেও এগুলো খেয়াল করেছো। এবং আমি আবার ওগুলো খেয়াল করেছি। মোহসেন মাখমালবাফ (ইরানি চলচ্চিত্রনির্মাতা) এর নাম শুনেছো? তিনি তারকোভস্কির একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম ভাঙতেই তিনি পর্দায় দেখলেন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তিনি ওই ভিজ্যুয়াল আর কোনোদিন মাথা থেকে নামাতে পারেননি। সিনেমাটা এর আগে তার এতোই বিরক্তিকর লাগছিলো যে, তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। চোখ খুলেই তিনি ওইটা দেখলেন, আর এই ঘটনার ৩০ বছর পরে তিনি লিখলেন, তৎক্ষণাৎ তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এই আর্ট ফর্মেই থাকবেন। এর আগে কোনোদিন তিনি সিনেমা নিয়ে ভাবেননি।
এখন মাখমালবাফ সেদিন যদি না ঘুমাতেন, তাহলে কি আরো বড়ো কিছু হতেন! আমার তো মনে হয় না। এখানে ঘুমটাই ভালো। আমি বলছি না, সবাই যেনো ঘুমিয়ে যায়; তাহলে তো মুশকিল। কিন্তু এরকম হয়। এটাই ম্যাজিক। আমার যেমন মাথার মধ্যে ‘আগডুম বাগডুম’ গেঁথে আছে। আর কিছু করার নাই। কেউ যতোই বলুক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার ইচ্ছা চাপিয়ে দিচ্ছেন পাঠককে¾বামপন্থি সাহিত্যে এটা একটা সমস্যা। আই ডোন্ট কেয়ার। তাকে নানারকম কথা বলতেই পারে। আমার মাথায় এটা আটকে আছে। আই ফিল লাইক, তিনি আমার প্রিয় লেখক। আমি অতোটা ক্রিটিকাল হতে পারি না। এ দিক থেকে আমি সহজসরল।
সুবন্ত : সিনেমাটা দেখার পর আমার মনে হচ্ছে, এর মধ্যে খুব তাড়াহুড়া করা হয়েছে। হুটহাট দৃশ্যগুলো চলে আসছে, চলে যাচ্ছে। সাধারণত দর্শক হিসেবে আমরা তো একটা দৃশ্যে মিশে যেতে চাই। কিংবা আমাদের ভাবনা ও আমাদের যাপন সেখানে মিশিয়ে দেখতে চাই। তো এই জায়গা থেকে মনে হচ্ছে, হুট করে একটা দৃশ্য চলে আসছে এবং সেই রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটা দৃশ্য ঢুকে পড়ছে। আমরা যদি সত্যজিৎ, ঋতুপর্ণ বা ঋত্বিকের সিনেমা দেখি, খুব ধীরে তারা একটা জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। এবং আমরা সম্পূর্ণভাবে সেখানে মিশে যাচ্ছি।
এখন আমার যেটা মনে হচ্ছে, আমরা এখন একটা অস্থির প্রজন্ম। এজন্যই কি আপনার সিনেমায় এতো অস্থিরতা? মানে পরিচালক হিসেবে আপনার জায়গাটা কোথায়? এতোটুকু সিনেমায় অনেক দৃশ্য আপনি এনেছেন।
মারুফ : তুমি যেটা বলছো সেটা হচ্ছে টেম্পো (গতি)। এটাতে আমি যে তোমাকে পরিষ্কার উত্তর দিতে পারবো, তা না। অনেক স্লো টেম্পোর সিনেমা মাঝে মাঝে আমার ভালো লাগে, মাঝে মাঝে লাগে না। আবার অনেক ফাস্ট টেম্পোর সিনেমা মাঝে মাঝে ভালো লাগে, মাঝে মাঝে থাপ্পড় দিতে ইচ্ছা করে। আজকে তুমি বললে না যে, অনেক তাড়াতাড়ি গেছি। পরশু ঢাকায় একজন আমাকে বললো এতো সেøা সিনেমা বানালে বাংলাদেশে চলবে না। এখন তোমারটাও যদি আমি রাখি আর ওরটাও যদি রাখি, তাহলে কী করতে হবে? আমাকে দর্শকের চাহিদাটা মাথায় রাখতে হবে। আর দর্শক কী চায় মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমি তা দেখাবো না, আমি আমারটা দেখাবো। তুমি যদি বলো, এটা কি আমার স্ট্যান্ড? ইয়েস, এটা আমার স্ট্যান্ড। আমি চেষ্টা করবো তোমার সঙ্গে কমিউনিকেট করতে। যদি পারি ভালো। আর না পারলে আমি ব্যর্থ, আমি আরেকবার চেষ্টা করবো। আমি বার বার চেষ্টা করবো।
কিন্তু তুমি যেটা পছন্দ করো, সেটা আমি সাপ্লাই দেবো¾সেটা তো দোকানদারের কাজ! দোকানে গিয়ে তুমি তোমার পছন্দ অনুযায়ী মাল কিনবে, এটা ভালো না ওটা ভালো। দ্যাট ইজ ইয়োর রাইট। তাহলে টিকিট কাটার পর সিনেমার ক্ষেত্রেও কি তাই? আমি এমনটা ভাবতে ভালোবাসি না যে, টিকিট কাটার পর তার রাইট, তার চয়েসেই সিনেমা চালাতে হবে। এটা একেবারে ভিন্ন।
আমার সিনেমায় সালটা যদি চেক করো একবার; আমি সাল অনুযায়ী টেম্পোটা চেঞ্জ করেছি। আগের সময় থেকে যখনই কিছুটা এগিয়ে এসেছে, আমি একটু ফাস্ট করেছি। আমার বোধবুদ্ধি অনুযায়ী ফাস্ট করেছি, কোনো জায়গায় স্লো করেছি। আমি শিওর না যে, কোনটা দিলে সংলাপ বা সিচুয়েশন অনুযায়ী তোমার ভালো লাগতো। কিন্তু তুমি যদি আমাকে বলো, আমার ব্যক্তিগত পছন্দ কী? আমি দুটোই পছন্দ করি। মাঝে মাঝে স্লো সিনেমা, কখনো ফাস্ট সিনেমাও পছন্দ করি। এখন কোনটা কাকে টানে, য়েস্থেটিকের বিষয়টা একদম অন্যরকম। আমি মনে হয়, লম্বা আলাপে চলে যাচ্ছি।
শফিকুল ইসলাম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রা বি : আমাদের দেশে কয়েক বার সেনাশাসন এসেছে। পাকিস্তান আমলে যেমন, স্বাধীনতার পরও হয়েছে। এই কিছুদিন আগেও ২০০৭-এ, যেটাকে আমরা ১/১১ বলি। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলো, আমাদের শিল্পের একটা বড়ো মাধ্যম চলচ্চিত্র, সেখানে এ বিষয়টা কোনোভাবে উঠে আসেনি বললেই চলে। আমার মনে হয় আপনিও সেনাশাসনে একটু বিরাগ। কিন্তু এ ধরনের চলচ্চিত্র কি আমাদের খুব দরকার? কারণ আমাদের দেশের অনেক মানুষ চায়, সেনাশাসন আসুক। আমি গ্রাম থেকে এসেছি। ২০০৭-এ দেখেছি, গ্রামে সবাই সেনাশাসনকে সমর্থন করছে।
মারুফ : সেনাশাসনের যেটা মানুষ পছন্দ করে, ‘ব্যাডা একখান’। সেটা যদি কোনো মেয়েও ঠিকমতো পারে, বলে ‘ব্যাডা একখান’। ‘ব্যাডা’র প্রতি আমাদের অনেক আসক্তি। এটা যদি সবাই চায়, আমি তো আর বদলে দিতে পারবো না। আমি চাই না, দ্যাটস ইট।
শফিকুল : চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গিটা পরিবর্তন করা যাবে কি না? সেনাশাসনের ভিতরের অনেক কিছুই আমরা জানি না। তারা দুর্নীতি দমন করছে, এটা-সেটা¾আমরা কেবল এগুলোই জানতে পারি। কিন্তু ভিতরেও যে অনেক কিছু আছে, সেটা আপনারা বা অনেকেই প্রত্যক্ষ করেছে। তো সেগুলো কি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মানুষের সামনে আনা উচিত? বা চলচ্চিত্রে এসব বিষয় আনলে আমাদের রাষ্ট্রে পরিবর্তন আসবে কি না?
মারুফ : তোমার প্রশ্ন শেষ? চলচ্চিত্রে কী আনা উচিত¾আমি যা ভাবি তাই-ই তো করছি। আমি একটা ক্যারেকটার বোধ হয় তৈরি করেছি, যে ও রকম কাজ করে, ওই সব সংস্থার কথা বলে। নাম বলার কিছু নাই। মানে ও রকমই যারা মাছ ধরে। হ্যাঁ, এটাই তো আসলে হওয়া উচিত। আমাদের দেশে আরেকটা জিনিস আছে সেল্ফ সেন্সরশিপ। আমরা কিন্তু অনেক সেল্ফ সেন্সরড। এই সিনেমা আমি সেন্সরে দিয়েছি। কিন্তু ওরা ওগুলো ধরতে পারেনি। সেখান থেকে ওরা আমাকে বলেছে, শুধু গালাগালি কাটতে; ‘চ’ দিয়ে কী যেনো একটা গালি ছিলো বোধ হয়। তো আমি ওটা কেটে আবার ‘মাদারচোদ’ করে দিয়েছি।
সেন্সর আরো বলেছে, ধূমপানের দৃশ্য অনেক বেশি। তো আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ভাই কতো হলে অতিরিক্ত হয়?’ তখন ওরা বললো, ‘না, তেমন সমস্যা নাই, খালি কয়েকটা কেটে দেন।’ আমি তাদেরকে যেটা ইঙ্গিত করছিলাম হয়তো খেয়াল করেনি। সরাসরি তো আর ওভাবে বলার দরকারও নাই। আর ওরা জানেও, কয়জন আর এ সিনেমা দেখবে! কিন্তু এটা যদি অনেক লোক দেখতো, তাহলে ঠিক কী হতো আমি জানি না।
আর এ ধরনের চলচ্চিত্র দরকার কি না¾এটা তুমি কী বলছো! এটাই তো আমার কাজ। এটাই তো কাজ হওয়ার কথা। আমার কথা হলো, স্বস্তির সময়ে স্বস্তিতে থাকবো আমরা, কিন্তু অস্থির সময়ে তুমি কীভাবে স্বস্তিতে থাকো ভাই! রহস্যটা কী? এটা ধরতে পারি না আমি। শিল্প-মাধ্যমের তাহলে কাজ কী? খালি ‘চাঁদ-তারা-আকাশ’ বললে তো আর হবে না। ওটা খারাপ, তা নয়। কিন্তু সেটার জন্যে তো একটা সুন্দর সময় লাগবে। এখন সময়টা যদি সুন্দর লাগে তোমার, তুমি যদি সত্যি সত্যিই উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে থাকো, তাহলে ঠিক আছে। আর যদি না উঠতে পারো, তাহলে তো বলতে হবে, না? তো হ্যাঁ, এটা দরকার।
সেলিম রেজা নিউটন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রা বি : সিনেমাটা আমার ভালো লেগেছে। অনেক ভালো লাগলো সিনেমাটা। মানে আমি অনেক আক্রান্ত হয়েছি মুভিটা দেখতে দেখতে। আমার বুদ্ধি অনেক জায়গায় থেমে গেছে। এরকম আমি ফিল করেছি। কী বলবো, খুব চাপে ছিলাম দেখার সময়। এটা আরো অনেকবার দেখতে হবে। অনেক কিছুই মিস করে গেলাম। আমি খুবই মানসিক চাপে থেকেছি; তার মধ্যেও অনেক দৃশ্য দেখলাম; অনেক ইমেজ দেখতে পেলাম; অনেক রকমের অনুভূতি তৈরি হতে থাকলো। কোথাও কোথাও কিছু ভূতুড়ে ফিলিংসের মতো হলো, এমনভাবে লোকগুলোর সঙ্গে, পরস্পরের সঙ্গে দেখা হয়ে যাচ্ছে, নিজেরা জানছে না। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি। এগুলো খুব অতিজাগতিক ফিলিংসও দিয়েছে।
মারুফ : নিউটন, একটা মজার ঘটনা আছে। ওই যে আফাজ আলী একটা রিকশাওয়ালার কাছে যায় না, ওকেও কিন্তু আমি আবার নিয়ে গিয়েছিলাম আরেকটা দৃশ্যে।
নিউটন : হ্যাঁ, ফ্লো আছে, একটা বৃত্তাকার ব্যাপার আছে। মানে কাহিনির গড়নটা সরল না, এক রেখার মতো করে যায় না। উনি যেটা বলছিলেন, দৃশ্যের মধ্যে দৃশ্য ঢুকে যাচ্ছে, ওটা দারুন। এবং সম্ভবত এটাই ঘটেছে মুভিটাতে। তারই মধ্য দিয়ে ওই যে, ‘টাকা কি তোমার একারই দরকার?’ এটা যেনো মনে হলো, গোটা সিনেমার একটা সামারি, একদিক থেকে। আমি এখনো খুব আচ্ছন্ন হয়ে আছি মুভিটা নিয়ে। অনেক দৃশ্য খুব দারুণ। আর ওই যে, মেকআপ বা অন্যান্য ব্যাপার, ওটাকেও আমি অন্যভাবে দেখতে চাইতে পারি। আর ইলিয়াসের গল্পটা তোমার কাছে শুনে মনে হলো পড়েছি, কিন্তু আসলে মাথায় নেই। কিন্তু আবার কেনো জানি মনে হচ্ছে, এটা একটা ইনটুইশন, এটা যে ইলিয়াসের গল্প বা কারো গল্প এটা মনে না রাখলেও চলছে। এটা মনে রাখার দরকার পড়ছে না। এটা একেবারে আলাদা একটা মুভি। কিন্তু আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প না হলেও আমার চলে। আমি একটা সম্পূর্ণ আলাদা কিছু, কিউ সহকারে প্রচুর ইঙ্গিতওয়ালা একটা বর্ণনা পেলাম। ভালো লাগলো। এতো খুঁটিনাটি জিনিস ছিলো যে, একটু নোট না করলে অসুবিধা হচ্ছে।
রানা (মামুন হায়দার) কেবলই বলছিলেন যে, যারা দেখছেন সবাই তো নব্বইয়ের সময়টার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত না। আমাদের গল্পে-সাহিত্যে-কবিতায়-সিনেমায়-নাটকে নব্বইয়ের ঘটনাগুলো আর আসেনি। আমরা ১৯৫২ ছাড়া আর এগোতে পারিনি। ১৯৭১-এর পর আমরা আর আসতেই পারিনি; পারবো হয়তো। অবশ্য পারার সুযোগই হয়ে ওঠেনি। তারপর ২০০৭-এর পরিবেশ পরিস্থিতিও হয়তো আমরা যারা দেখেছি, তার বাইরে সবার কাছে অতোটা পরিচিত না। সবাই একটা চক্করের মধ্যে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা সিনেমার মধ্যে, ক্যারেকটারগুলোরও।
ওহ, একটা জিনিস আমি মিস করে গেছি। ইলিয়াসের গল্পটা মনে রাখার দরকার নাই কেনো বলছি, ওখানে মনে হয় ধর্মের অনুভূতিগুলো খুব কাজের না শেষ পর্যন্ত¾এই ধরনের একটা ইঙ্গিত হয়তো ইলিয়াসের গল্পে ছিলো। যেটা তোমার এখানে নেই। এবং এটা আমার ভালো লেগেছে। মানে এই পেশাটা, এই মানুষগুলোর প্রতি দরদ, মানে মানুষগুলোকে মানুষ হিসেবেই কিন্তু দেখা গেলো। যেমন, তুমি আরেকজনের কথা বলছিলে, তখন গল্প করার সময়। ধর্মীয় দৃশ্যের চিত্রায়ণগুলো নাকি তার কাছে অন্য রকম লেগেছে, বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়, আমি ইমপ্রেশনিস্ট। মানে শব্দটা বলে সুবিধা করতে পারবো না। আমার একটা ছাপ পড়ে। আমি ডিটেইল কম দেখতে পাই; ছাপটা বেশি পড়ে এবং ছাপটা বেশি দেখতে পাই। এই মানুষগুলোকে না এখানে স্রেফ মানুষ হিসেবে দেখা গেলো। আমাদেরই মতো মানুষ হিসেবে দেখা গেলো। এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন ধরনের মানুষের অনুভূতি এবং এগুলোর সঙ্গে ওই মানুষগুলোর অনুভূতি খুব সহজে একাকার হয়ে গেলো। মানে এখানে ইলিয়াসের যে শ্রেণিচেতনা, সেটাও মার খেয়েছে। আমার পছন্দের মতো করে মার খেয়েছে। বা মানুষের যে সর্বজনীন সত্ত্বা, সেটা সুন্দর করে ফুটে উঠেছে। মানে খুব সহজ করে দেখা গেলো। এবং যতোখানি না ওই তপুর বাবা বা অন্যদের দুঃখের প্রতি আমাদের সমবেদনা জাগে, তার চাইতে অনেক বেশি কাছের ফিল করা গেলো ওই দুই মাওলানা সাহেবকে; ওদের সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোকে। তো এটা হয়তো ইলিয়াসের ইনটেনশনের সঙ্গে যাবে না।
মারুফ : শর্টফিল্মটা তাহলে দেখাবো তোমাকে। আছে আমার কাছে।
নিউটন : আমি দেখতে চাই। আর এটা আরো অনেকবার করে দেখতে হবে; আমার ভালো লেগেছে সিনেমাটা। এমন সিনেমা সাধারণত দেখা হয় না। আমাকে খুব মানসিকভাবে আক্রান্ত করেছে সিনেমাটা। এই তো। আরো দেখতে পারলে, নোট নিতে পারলে ভালো হবে। তখন কিছু দোষ-ত্রুটি বলা হয়তো উচিত হবে। আমি এখন দোষ-ত্রুটির দিকে তাকাতে পারছি না। মানে অন্য এতোসব জিনিস দেখে ফেলেছি যে, অন্য অনেক কিছুকেই আর দেখা মুশকিল মনে হচ্ছে।
মারুফ : বন্ধু বলে ছাড় দিও না।
নিউটন : না না। বন্ধু-টন্ধু আমার নাই, কথা বলার সময় ওগুলো নাই। আমি তো খুব আশাবাদ নিয়ে এখানে বসিনি! কিন্তু দারুণ। আমার ভালো লাগলো, খুব সাংঘাতিক। প্রচুর পাওয়ারফুল মুভিং শট্ আছে, একদম নড়িয়ে দেওয়ার মতো¾শুঁয়াপোকাটার উঠে পড়াটা। এটা কি অ্যাকসিডেন্টাল শট্?
মারুফ : হুম, পেয়েছি আর কী; পেয়ে গেলাম।
নিউটন : তাই না! পোকাটাও ওই সময় থাকা লাগবে ওখানে! মানে কতো হেল্প করেছে ওই পোকাটা। ওটা দারুণ একটা ইমেজ হয়েছে। আরো অনেক ছোটো ছোটো ব্যাপার, ওগুলোকে সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ বলে কি না আমি জানি না। ওই সিগারেটের উড়ে চলে যাওয়া; সিগারেটের ওপর একটা পা পড়ে যাওয়া; একটা স্যান্ডেলের উপর দিয়ে রিকশাটা চলে যাওয়া; ক্যাকটাসের একটা ফুল ফুটে থাকা; মায়ের তপুর জামার গন্ধ শোঁকা¾এরকম আরো অনেক শট্।
আবারও বলছি, আমার ভালো লেগেছে সিনেমাটা। অবশ্য ভালো লাগলো শব্দটা দিয়ে পুরোপুরি হচ্ছে না। আমি এখনো খুব বিচলিত হয়ে আছি। আমি কেঁদেওছি আসলে।
মারুফ : ধন্যবাদ তোমাদের। আমি আশা করিনি এতো প্রশ্ন আসবে, আর এতো উত্তর দিতে পারবো। এ সিনেমা তো কেউ দেখেনি তেমন। তোমাদের এখানে আমি আসতে চেয়েছিলাম তখনই। কাদের সঙ্গে যেনো যোগাযোগও হচ্ছিলো, ব্যাটে-বলে মেলেনি। তখন আসলে হয়তো ভালোই হতো। তারপরও দেখা তো হলোই। ধন্যবাদ। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ তোমাদের এই আয়োজনটার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
নিউটন : মুভি দেখে, এটা নিয়ে আলাপ করে, আমাদের জন্য খুব লাভ হলো। অনেক থ্যাঙ্কস।
সঞ্চালক : ধন্যবাদ নির্মাতা মারুফ হোসেনকে। আমরা আমাদের আয়োজনের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। অনেক বাতচিত হলো, অনেক কথা হলো। অনেকটা দেরিও হয়ে গেছে, হয়তো উনার অনেকটা সময় নিয়ে নিলাম আমরা। তবু উনাকে আসার জন্য ধন্যবাদ; আমাদের এই রকম একটি আয়োজন সূচনা করার জন্য ধন্যবাদ। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আজকের আয়োজন শেষ করছি।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন