মো. মমিনুল ইসলাম
প্রকাশিত ০৬ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ছোটো সিনেমার বড়ো লেখা
সত্যজিতের টু
মো. মমিনুল ইসলাম

শুরুর কথা
শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্র সবসময় মানুষের পক্ষে কথা বলবে এটাই প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা পূরণে চলচ্চিত্র যে সবসময় সফল হয়, এমনটা বলা মুশকিল। কারণ শিল্প ও পুঁজির দ্বন্দ্ব নতুন কোনো বিষয় নয়। তার পরও শিল্প ও শিল্পস্রষ্টার লক্ষ্য থাকে মানবিক হওয়া বা থাকার। বিখ্যাত নির্মাতা বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত যেমনটা বলেন, চলচ্চিত্রনির্মাতাদের উদার মানবিকতাবাদে বিশ্বাসী হতে হয়। এটাই একজন নির্মাতার প্রধান গুণ, এটাই হওয়া উচিত।১ সারাবিশ্বের নির্মাতাদের মধ্যে এই গুণটি যারা সবসময় নিজের মধ্যে ধারণে সচেষ্ট ছিলেন, সত্যজিৎ রায় তাদের অন্যতম। তার প্রতিটি চলচ্চিত্র দিনশেষে মানুষ, মানবিকতার কথা বলেছে। প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী থেকে আগন্তুক সব টেক্সটে মানুষ নানাভাবে এসেছে। সত্যজিতের ১২ মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র টু এমনই এক মানবিকতাবাদের দৃশ্যায়ন। চলচ্চিত্রের গল্প এগিয়েছে ধনী ও দরিদ্র পরিবারের দুই শিশুকে ঘিরে। সমাজের দুই শ্রেণির দুই প্রতিনিধিকে সত্যজিৎ তার মতো করে তুলে ধরেছেন সেলুলয়েডে। তবে তিনি কখনো দারিদ্র্যকে সস্তা ভাবালুতায় আচ্ছন্ন করবার চেষ্টা করেননি। টু-এ মনুষ্য মনঃস্তত্ত্বের গভীর প্রতিফলন প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে কর্তৃত্ব, প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা অনেক কিছুকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে টু। এ ধরনের ভাবনা থেকেই এ লেখার চেষ্টা।
টু-এর আখ্যান
ধনী ও গরিব পরিবারের দুটি ছেলেশিশুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই চলচ্চিত্রের কাহিনি। দুজনের অবস্থান, সাজ-পোশাক, ঘরবাড়ি, খেলনা ইত্যাদি দেখে তাদের পরিচয় বুঝতে কষ্ট হয় না। একজনের বিশাল বাড়ি, মাথায় মিকি-মাউস ক্যাপ, হাতে কোমল পানীয়র বোতল, মুখে চুইঙগাম; অন্যজনের শীর্ণ উদোম শরীর, ছেঁড়া পোশাক, হাতে বাঁশের বাঁশি আর পিছনে ভাঙা ঘর। তারা একে অন্যের থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা। ধনী ছেলেটির বসার ঘরের ছাদে বেলুন ঝোলানো; মেঝেতে পড়ে থাকা বেলুন দেখে অনুমান করা যায়, সম্প্রতি হয়তো তার জন্মদিন ছিলো। বসার ঘরের সেলফে, ডিভানে, মেঝেতে সাজানো নতুন নতুন খেলনা¾ড্রামবাদক পুতুল, বাঁশি, গিটারবাদক পুতুল, রোবট, মুখোশ¾আরো কতো কী! গরিব ছেলেটির হাতে ঘুড়ি, বাঁশের বাঁশি, হাতে বানোনো মুখোশ ও ঢোলক।
দিনের শুরুতে ধনী শিশুর বাবা-মা তাকে বাড়িতে একা রেখে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়। শিশুটি হাত নেড়ে বাবা-মাকে শুভকামনা জানিয়ে আপনমনে ঘরে ফেরে। তার আচরণে বোঝা যায়, সে তখন স্বাধীন। অন্তত কিছু সময়ের জন্য তাকে শাসন করার কেউ ওই বাড়িতে নেই। এই সময়ে খুশি মতো অনেক কিছুই করতে পারে শিশুটি। তারই প্রথম প্রকাশ ঘটে কোমল পানীয় খেতে খেতে ফুটবলে লাথি দেওয়ার মাধ্যমে। এরপর সে দিয়াশলাই হাতে নিয়ে আগুন জ্বালায় বেলুন ফাটানোর জন্য। এভাবেই কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর শিশুটি বাঁশির আওয়াজ শুনতে পায়। শব্দের উৎস সন্ধানে সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালে দেখতে পায়, নিচে বাড়ির পাশের ক্ষেতে এক শিশু সেটি বাজাচ্ছে।
নিচের শিশুটির বাঁশি বাজানো দেখে দোতলায় থাকা শিশুটিও বাজারে কেনা প্লাস্টিকের বাঁশি বাজাতে শুরু করে। প্লাস্টিকের তৈরি ‘সুন্দর’ বাঁশির শব্দে নিচে থাকা শিশুটির চোখ-মুখ চুপসে যায়। নিচের শিশুটি এবার বাঁশি রেখে হাতে তৈরি একটি ঢোল নিয়ে বাজাতে থাকে। ঢোল দেখে এবার উপরের শিশুটি দম দেওয়া ড্রাম বাজানো বানরকে চালু করে দেয়। উপরের শিশুটির দম দেওয়া ড্রামবাদক পুতুল দেখে নিচের শিশুটি এবারও থেমে যায়।
এমনই রেষারেষির একপর্যায়ে ধনী ছেলেটি দেখে, দরিদ্র ছেলেটি একটি ঘুড়ি উড়াচ্ছে। সে একটা গুলতি দিয়ে প্রথমে ঘুড়িটি ফুটো করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তারপর এয়ারগান দিয়ে গুলি চালিয়ে ঘুড়ি ফুটো করে দেয়। জয়ের আনন্দে ধনী ছেলেটি এবার সব দম দেওয়া খেলনা একসঙ্গে চালু করে দিয়ে শ্রুতিকটু পরিবেশ সৃষ্টি করে। দম কমে এই যৌথ আওয়াজ স্তিমিত হলে, আবার শোনা যায় নিচের সেই বাঁশের বাঁশির শব্দ। এবার ধনী ছেলেটি বিমর্ষ হয়ে পড়ে। আর পর্দায় দেখা যায়, খেলনা রোবটটি হেলেদুলে উৎকট শব্দ করতে করতে মেঝের উপর প্লাস্টিকের ইটে গড়া মিনারে ধাক্কা দিচ্ছে। একপর্যায়ে মিনার ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। চারপাশে মেঝেভর্তি হাজারো রকম খেলনার মধ্যে মিনারের সামনে ছেলেটি ধপাস করে বসে পড়ে, যেনো ধ্বংসস্তুপের মধ্যে বসে আছে সে। ওদিকে বাঁশের বাঁশি বেজেই চলেছে। শেষ হয় টু।
দুই কী?
‘দুই’ একটি ধনাত্মক যৌগিক বা কৃত্রিম সংখ্যা; একটি অঙ্ক। কিন্তু এর বাইরেও দুইয়ের নানা অর্থ তৈরি হয়। দুই মানেই কিন্তু ভিন্নতা, দুই মানেই আলাদা, দুই মানেই শ্রেণি। দুই কখনো বৈপরীত্য আবার কখনো বন্ধুত্ব প্রকাশ করে। এক অর্থে জগতের সব বস্তুতেই দুই নিহিত। সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা-বেদনা, কষ্ট-আনন্দ, শুরু-শেষ, আলো-অন্ধকার সবখানেই কিন্তু এক রকম দুইয়ের অবস্থান। আলো না থাকলে যেমন অন্ধকারকে উপলব্ধি করা যায় না, তেমনই অন্ধকার না থাকলেও আলোকে উপলব্ধি করা যায় না। এদিক থেকে বিশ্লেষণ করলে পৃথিবীতে দুই-এর গুরুত্ব অপরিসীম। যদিও উত্তরাধুনিকতাবাদে ‘দুই’ নিয়ে বাইনারি চিন্তা যৌক্তিকভাবে খুব বেশি টেকে না। তবে সত্যজিৎ তার টু-এ জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দুইকে আরেকভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
টু-এ আলোকপাত
১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত ১২ মিনিটের চলচ্চিত্র টু। এটি সত্যজিতের একমাত্র নির্বাক চলচ্চিত্র। আমেরিকার একটি টেলিভিশন সংস্থার প্রযোজনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি ধারণ করা হয়েছিলো ১৬ মিলিমিটার ক্যামেরায়। তারা সত্যজিৎকে বাংলার পটভূমিতে ইংরেজি ভাষায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের অনুরোধ করেন। কিন্তু সত্যজিৎ এই বৈপরীত্য পছন্দ করেননি। ফলে নির্বাক হিসেবেই তৈরি হয় টু।২ মাত্র তিন দিনে শুটিং করা এই চলচ্চিত্রে অসাধারণ দৃশ্যপট, সাজ-পোশাক, আবহসঙ্গীত এবং সম্পাদনা তথা অভিনয়ের অসামান্য নজির রয়েছে।
টু-এর মূল বিষয় শ্রেণি-বৈষম্য। শ্রেণির উৎপত্তির মধ্যে দিয়ে আদিম সাম্যবাদী সমাজের অবসান হয়। তারপর থেকে শ্রেণি ও তা থেকে সৃষ্ট বৈষম্য রাষ্ট্র সৃষ্টির অন্যতম কারণ। যতোক্ষণ পর্যন্ত শ্রেণি বিদ্যমান থাকে, ততোক্ষণ পর্যন্ত সমাজে স্থিতিশীলতা আসে না। বর্তমান বিশ্বে বলতে গেলে মোট সম্পদের এক শতাংশ সম্পদের মালিক ৯৯ শতাংশ মানুষ, বিপরীতে ৯৯ শতাংশ সম্পদের মালিক এক শতাংশ। প্রতিদিন ওই এক শতাংশ মানুষের সম্পদ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে, সঙ্গে বৈষম্যও। আর এই সম্পদ ও বৈষম্য যতো বাড়ে রাষ্ট্র নামের প্রতিষ্ঠানটি ততো বেশি শক্তিশালী হয়। কার্ল মার্কসও সমাজের যে ধারণা দেন, সেখানে বৈষম্য ও ব্যক্তি-মালিকানাকে রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।৩
দৃশ্যমান এই বৈষম্য টিকে থাকে শোষণের মাধ্যমে। শ্রমিক, কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষ সমাজের চালিকাশক্তি, তাদেরকে ঘিরেই সমাজ আবর্তিত হয়। অথচ তারা উপেক্ষিত, শোষিত। যারা ক্ষমতাশালী তারা লুটে নেয়, বাকিরা নিরুপায় না হয় পলায়নপর। টু-এর প্রতিটি দৃশ্যে সম্পদ ও সম্পদহীন মানুষের যে বৈপরীত্য, তা তুলে ধরা হয়েছে। এক দরিদ্র পরিবারের শিশুর নানা কর্মকাণ্ডকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে এক ধনী পরিবারের শিশুর মনোভাব।
‘নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা’
টু-এ দেখা যায়, ধনী পরিবারের শিশুটি অনুকরণপ্রিয়। দরিদ্র পরিবারের শিশু নতুন কোনো খেলনা নিয়ে হাজির হলেই তার অনুকরণে ধনী শিশু তার থেকে ‘উন্নত’ কিছু প্রদর্শন করে। দরিদ্র শিশুর বাঁশের বাঁশির বিপরীতে মস্ত বড়ো খেলনা বাঁশি নিয়ে আসে ধনী শিশু। এভাবেই দরিদ্র শিশুর হাতে বানানো ঢোলের পরিবর্তে ধনী শিশু দম দেওয়া ড্রাম বাজানো পুতুল নিয়ে হাজির হয়। এমনকি দরিদ্র শিশুটি বন্য শিকারি সাজ নিয়ে আসলে ধনী শিশু একেক সময় একেক সাজ নিয়ে নিজেকে বিত্তবান-ক্ষমতাবান বলে জানান দেয়। তবে অন্তর্দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, ধনী শিশুর এই অনুকরণপ্রিয়তা কিন্তু তার সৃজনশীলতার অক্ষমতাই ফুটিয়ে তোলে। অন্য অর্থে ধনী শিশুটিই কিন্তু দরিদ্র। কারণ ধনী শিশু যা কিছু হাজির করে, তার কোনো কিছুই তার নিজের নয়; তার মধ্যে কোনো নিজস্বতা নেই। সবই এক রকম ধার করা বা বাজার থেকে কেনা। অন্যদিকে দরিদ্র শিশুটির ঢোল, বাঁশি, তীর-ধনুক সবই তার নিজের তৈরি।
এভাবে দেখলে, প্রকৃত দরিদ্র কিন্তু ধনী শিশুটিই। সে কৃত্রিমতার ওপর নির্ভর করে। চলচ্চিত্রটি দেখতে দেখতে রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে যায়।
বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই¾
“কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই;
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে,
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।”
বাবুই হাসিয়া কহে¾ “সন্দেহ কি তায়?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়;
পাকা হোক, তবু ভাই, পরেরও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।”
শুধু ধনী শিশু কেনো, বর্তমানে সারা পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের মানুষ যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তার কোনোটির মালিকানাই কিন্তু ওই ব্যবহারকারীর নয়। কিংবা এসবের কোনো নিয়ন্ত্রণই ব্যবহারকারীদের হাতে নেই। গুগল, ইউটিউব, ইয়াহু, ফেইসবুক, টুইটার যাই বলি না কেনো, এই প্রযুক্তির সবগুলোর মালিকানা মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, দেশের হাতে। এসবের ব্যবহারকারীরা ধনী শিশুর মতোই অন্যের বানানো জিনিস নিয়ে বড়াই করছে। এভাবে প্রযুক্তি সৃষ্টির গোড়া থেকেই, এক শ্রেণির মানুষ কেবল এর ভোক্তা, মহাজন নয়।৪
অন্যদিকে এই প্রযুক্তির মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজ্ঞাপনের সাহায্যে ভোগবাদিতা প্রচার এবং সামাজিক প্রশ্নে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। ফেইসবুক, ইন্টারনেট, মোবাইলফোন সেট ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার আত্মসন্তুষ্টি দানের অন্তরালে মানুষকে কেবলই পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও অসামাজিক করে তুলছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিমানুষের সমস্ত খবর ছেঁকে তুলে নেওয়া হচ্ছে। আবার পুঁজিবাদীরা এখন চাইছে মানুষের বদলে যন্ত্রই তাদের হয়ে কাজ করুক। কারণ যন্ত্র কখনো অবাধ্য হবে না। কিন্তু যন্ত্রের রাজত্ব কায়েম হলে মানুষ যে আর মানুষ থাকবে না, মালিকেরা নিজেরাও যে যন্ত্রে পরিণত হবে, সে চিন্তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। যন্ত্রকে খাটিয়ে শ্রমিককে বেকার করলে লোকের ক্রয়ক্ষমতা যে হ্রাস পাবে সেটাও তারা হিসাবের মধ্যে রাখে না।৫ টু-এর ধনী শিশুর সঙ্গে এদের অন্তর্নিহিত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।
যেভাবে তুমি সকাল দেখো, সূর্য কিন্তু একটাই
টু-এ ধনী পরিবারের শিশুর যে একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা তা থেকে তার মধ্যে একধরনের জেদ এবং ধ্বংসাত্মক মনোভাব তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়। এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য বিখ্যাত বিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণ তত্ত্বের সাহায্য নিতে হয়। ফ্রয়েডের ধারণায়, এই ধ্বংসাত্মক মনোভাবের আদি উৎস মরণ প্রবৃত্তি বা Death instict। চলচ্চিত্রে ধনী শিশু সবসময় প্রতিযোগিতা বা রেষারেষির পরিবেশ সৃষ্টি করে। সবসময়ই সে চেয়েছে দরিদ্র শিশুকে দমন করতে। দরিদ্র শিশুর মধ্যে কিন্তু এই দমনমূলক মনোভাব দেখা যায় না। গুলি করে ঘুড়ি ফুটো করার ঘটনায় ধনী শিশুর সর্বোচ্চ ধ্বংসাত্মক মনোভাবের প্রতিফলন ঘটে। ফ্রয়েডীয় চিন্তায়, মানুষের মধ্যে যে রাগ, ক্ষোভ বা ধ্বংসাত্মক মনোভাবের সৃষ্টি হয়, তা সে অপস্থাপন (Displacement) করতে চায়। অপস্থাপন হলো, মানুষ যখন কোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে তার মনের রাগ, ক্ষোভ বা আগ্রাসন প্রকাশ করতে পারে না, তখন এই অবরুদ্ধ রাগ, ক্ষোভ বা আগ্রাসন কোনো দুর্বল ও নিরপরাধ ব্যক্তির ওপর প্রকাশ করে স্বস্তি লাভ করে। একজনের আগ্রাসন অন্য কারো প্রতি প্রকাশ করাকেই আগ্রাসনের অপস্থাপন বা Displacement of Aggresive ।৬
মরণ প্রবৃত্তির অপস্থাপনের ফলেই মানুষের মধ্যে আগ্রাসন ও ধ্বংসাত্মক প্রবণতার উৎপত্তি ঘটে। ধনী শিশুর যে একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা তা সে তার পরিবারের কারো কাছে প্রকাশ করতে পারে না। এ থেকে ধনী শিশুর মধ্যে মরণ প্রবৃত্তির সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তী সময়ে সেটি একধরনের ধ্বংসাত্মক মনোভাবে রূপ নেয়।৭ আর ধনী শিশুটির এই ধ্বংসাত্মক মনোভাব অপস্থাপিত হয় দরিদ্র শিশুর ওপর। গোড়ার দিকে একটি দৃশ্যে দেখা যায়, ধনী শিশুটি বসার ঘরে ডিভানে শুয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বেলুনগুলো দিয়াশলাই জ্বেলে বিকট আওয়াজে ফাটিয়ে আনন্দ পাচ্ছে। এর মধ্যে দিয়ে তার তীব্র ধ্বংসাত্মক মানসিকতারই প্রকাশ পায়। হয়তো নিঃসঙ্গতা থেকেই শিশুর মনে এই ধ্বংসাত্মক মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘুড়ি তুমি কার আকাশে উড়ো
টু দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না, প্রকৃতির সংস্পর্শে এসে স্বাধীনভাবে খোলা আকাশের নিচে থাকলে, মনের যে আত্মতুষ্টি আসে, তা থেকে ধনী শিশু বঞ্চিত। শিশু দুইটির খেলনার রেষারেষিতে প্রথম দিকে দরিদ্র শিশুটি নিজের প্রতি হীন ও অপমানবোধে ভোগে বলে মনে হয়। কিন্তু একটি দৃশ্যে দরিদ্র শিশু ঘুড়ি উড়াতে শুরু করলে, ধনী শিশু বুঝতে পারে, তার পক্ষে সেটা করা সম্ভব নয়। তখন সে একধরনের নিপীড়নের পথ বেছে নেয়। প্রথমে ঘুড়িটি গুলতি দিয়ে ফুটো করার চেষ্টায় ব্যর্থ হলে, সে ঘর থেকে বন্দুক নিয়ে গুলি ছোঁড়ে। এতে ঘুড়িটি ফুটো হয়ে যায়। বর্তমানের ধনতান্ত্রিক অর্থ-ব্যবস্থায় শাসকরাও ঠিক ওই শিশুটির মতোই, তাদের ওই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। ফলে যখনই কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে, তখনই তারা স্বার্থরক্ষায় দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়।
পৃথিবীর সব সৃষ্টির মধ্যে কোনো না কোনোভাবে ধ্বংস লুকিয়ে থাকে। কোনো কিছুই পৃথিবীতে অবিনশ্বর বা অমর নয়। সেটা যতোই প্রশংসনীয়, ক্ষমতাবান, কালজয়ী হোক। কোথাও না কোথাও তার ধ্বংস বা সমাপ্তি আছেই। টু-এর শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, ধনী শিশু তার সবগুলো খেলনা একসঙ্গে চালু করে দিয়েছে। তবে সেই সব খেলনার এতো শব্দকেও ছাপিয়ে আবহে ভেসে আসছে দরিদ্র শিশুর বাঁশির সুর। অন্যদিকে ধনী শিশুর খেলনা রোবটটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ভেঙে দেয় তারই বানানো একটি স্তম্ভকে।
তার মানে কোনো সিস্টেম যতোই ক্ষমতাবান হোক না কেনো, তার ধ্বংস আসবেই। ফলে যে যন্ত্র সভ্যতার দিকে পুঁজিবাদ দিনে দিনে এগিয়ে যাচ্ছে, সেই যন্ত্র সভ্যতাই একদিন হয়তো ধ্বংস করবে সবকিছু। কেননা মানুষকে তো বাঁচতে হবে, তাকে মানুষের মতোই বাঁচতে হবে। মনুষ্য জাতির ইতিহাস হচ্ছে কখনো প্রকাশ্য, কখনো গোপন শ্রেণি-সংগ্রামের কাহিনি এবং ইতিহাসের গৌরবময় যুগগুলো আসে তখনই যখন একটা শ্রেণি আর একটা শ্রেণিকে বিপ্লবের দ্বারা উৎখাত করার চেষ্টা করে।৮ সত্যজিতের টু হয়তো কোনো না কোনোভাবে সেই শ্রেণি উৎখাতের কথাই বলে।
লেখক : মো. মমিনুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
mominulmcj27@gmail.com
https://www.facebook.com/mominul.islam.50159
তথ্যসূত্র
১. দাশগুপ্ত, বুদ্ধদেব (২০১৩ : ৪৯); ‘সত্যজিৎ রায় : একজন সমাজসচেতন শিল্পী’; সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তি; সম্পাদনা : সাজেদুল আউয়াল; নান্দনিক, ঢাকা।
২. সেন, নবীনানন্দ (২০১৩ : ৪০৭); ‘সত্যজিৎ রায়ের ছোট ছবি’; সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তি; সম্পাদনা : সাজেদুল আউয়াল; নান্দনিক, ঢাকা।
৩. বিস্তারিত পড়তে পারেন : চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম; ‘জিতবে কারা’; নতুন দিগন্ত; সম্পাদনা : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী; বর্ষ ১৬, সংখ্যা ৪, ২০১৮, ঢাকা, পৃ.৭-৩৪।
৪. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৬৩); ‘জাতীয় চলচ্চিত্র : পরিপ্রেক্ষিত ও সম্ভাবনা’; সিনেমা; ধানমন্ডি, ঢাকা।
৫. চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম; ‘জিতবে কারা’; নতুন দিগন্ত; সম্পাদনা : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী; বর্ষ ১৬, সংখ্যা ৪, ২০১৮, ঢাকা, পৃ.৮।
৬. আহ্মদ, মঞ্জুর ও অন্যান্য (১৯৯২ : ২৫Ñ২৬); মনঃসমীক্ষণ অভিধা; ইমপিরিয়্যাল বুকস্, রাজশাহী।
৭. প্রাগুক্ত; আহ্মদ (১৯৯২ : ২৪)।
৮. ভদ্র, গৌতম (২০১৩ : ১০৩); ‘সত্যজিৎÑচলচ্চিত্রে কালচেতনা’; সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তি; সম্পাদনা : সাজেদুল আউয়াল; নান্দনিক, ঢাকা।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন