Magic Lanthon

               

মফিজ ইমাম মিলন

প্রকাশিত ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ধারাবাহিক পাঠ

সিনেমা দেখার গল্প

মফিজ ইমাম মিলন

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের কোনো একদিন, আমাদের জেলা শহর ফরিদপুরে নবাব সিরাজউদ্দৌলা এসেছিলেন মহা আড়ম্বরে। অনেক পরে বুঝতে পেরেছিলাম, সেটি ছিলো সিরাজউদ্দৌলার আবরণে শক্তিমান অভিনয়শিল্পী আনোয়ার হোসেনের আগমনের কথা। নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিশাল পোস্টার নিয়ে ব্যান্ড পার্টি ঘুরেছিলো শহরের অলিগলি পথ ধরে। দুই ঘোড়ার টমটম গাড়ি ছিলো সামনে সামনে। ব্যান্ড থামলে সার্কাসের জোকারের মতো পোশাক পরা এক লোক উঠে দাঁড়াতো ঘোড়ার গাড়ির কোচোয়ানের পাশ থেকে। মুখে টিনের চোঙা লাগিয়ে সে আনোয়ার হোসেনের অভিনয়ের অসাধারণ দক্ষতার কথা ব্যাখ্যা করতো। বাংলার মোহনলাল ও নবাব সিরাজের সংলাপের বেশকিছু লাইন অনর্গল সে বলতে পারতো মুখস্থ। সিনেমাহলের সামনে মোটা কাপড়ের উপর অতি যত্নে আঁকা আনোয়ার হোসেনের রঙিন ছবি। দুই পা ফাঁক করে বুক চিতিয়ে নবাবের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন সিংহাসনের সামনে। কোমরের তলোয়ার ডান হাতে টেনে খাপের ভিতর থেকে বের করছেন। নবাবের চোখ দুটো মনে হয় ছিটকে বেরিয়ে আসছে, মুখে বিষণ্নতার ছাপ। খান আতাউর রহমান পরিচালিত নবাব সিরাজউদ্দৌলা এইভাবে এসেছিলো আমাদের শহরের সবেধন নীলমণি ‘অরোরা টকিজ’-এ।

ব্যান্ড পার্টির ছড়ানো হ্যান্ডবিলে লেখা ছিলো¾‘বাংলার শেষ নবাবের করুণ পরিণতি দেখতে পাবেন এই সিনেমাতেই।’ আরো থাকছে নাচ-গানে ভরপুর দৃশ্য। আনোয়ার হোসেন অভিনীত সিনেমা অনেকগুলো দেখেছি সেই শৈশব থেকে। যেগুলোর নাম মনে পড়ছে রাজা এলো শহরে, গোধূলীর প্রেম, রূপবান, রাজা সন্ন্যাসি, চাওয়া পাওয়া, রাখাল বন্ধু, সাত ভাই চম্পা, আবির্ভাব, অরুণ বরুন কিরণমালা, পারুলের সংসার, নাগিনীর প্রেম, নীল আকাশের নীচে, ভানুমতি, নতুন ফুলের গন্ধ, যে আগুনে পুড়ি, ক.খ.গ.ঘ.ঙ, আঁকাবাঁকা, জীবন থেকে নেয়া, ঢেউয়ের পরে ঢেউ, কোথায় যেন দেখেছি, দ্বীপ নিভে নাই, শেষ রাতের তারা; উর্দু সিনেমা তুম মেরে হো, জিনা ইসিকা নাম নেহী। এসব সিনেমার অধিকাংশই মুক্তি পেয়েছিলো ১৯৬২ থেকে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।

এখন আর স্মৃতিচারণের নামে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়ে লাভ কী? যা গেছে তা গেছেই। কিন্তু সিনেমা দেখার গল্প বলতে গেলে এসব স্মৃতিকথা বলতেই হয়। শৈশব-কৈশোরে ওইসব সিনেমাগুলো দেখার সময় যারা সঙ্গী ছিলো¾শাহজাহান, নিখিলেশ, নজির, দিলশাদ, ওয়াসিম, খায়রুল, শাহনেওয়াজ, মন্টু বৈরাগী, খলিলুল্লাহ, আবুল কাসেম, রানা ঠাকুর, রইছ মুন্সী, কুটি মিয়া¾তারা এখন কে কোথায় কে জানে! যাদের সঙ্গে সিনেমা দেখতাম এমন তিন জন স্বাধীনতাযুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। আবার মুক্তিযুদ্ধের পর দুইÑএকজন সপরিবারে দেশত্যাগ করে অন্য কোথাও পাড়ি জমিয়েছে। বন্ধুদের দুইÑএকজনের সঙ্গে হঠাৎ কোথাও দেখা হয়ে গেলে বুঝি, যা গেছে তাকে যেতে দেওয়াই ভালো। জীবন বড়ো কঠিন, এই জীবনের সংগ্রাম বড়ো দুঃসহ, এতো ব্যতিব্যস্ত জীবনে কারও ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে তাকাবার অবকাশ নেই আর।

শুধু বাংলা হিন্দি নয়, তলোয়ারবাজ নায়কপ্রধান ইংরেজি সিনেমাও সেসময় আমাদের প্রিয় ছিলো। সেই থেকে গড়ে ওঠে অ্যাকশন ও অ্যাডভেন্চার প্রধান ইংরেজি সিনেমার প্রতি আকর্ষণ। শৈশব-কৈশোরে দেখা সেসব অনেক সিনেমার দৃশ্য এখনো ভেসে ওঠে মনের পর্দায়। কিন্তু ওই সিনেমাগুলো আবার দেখার কোনো সুযোগ হয়তো নেই। সম্ভবত এজন্যই নামগুলো শুধু ঘুরপাক খায় স্মৃতির কোঠায়-কোঠায়। ৭০-এর দশকের সেকালে প্রায় সিনেমাহলেই সরকারি ছুটির দিন রবিবারে মর্নিং শো চলতো। এগুলোর বেশকিছু ছিলো আবার শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। ইংরেজি সিনেমা দেখা ফেরত বন্ধুবান্ধবদের কাছে ছিলো নানান কৌতূহল। ইংরেজি সিনেমা মানেই একটু বেশি ভালোলাগার। দোস্ত আর কী দেখাইলো নায়িকা, একটু খোলাসা করে বল¾এমন ভাব আর কী।

দুই.

আমরা বর্তমানে বাঁচি, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি, কল্পনা করি। পিছনে যেটা ফেলে আসি সেটা অতীত, তা নিয়ে যখন কথা বলি সেটা হয়ে যায় স্মৃতি। মানুষের জীবনে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ¾অতীত, বর্তমান না ভবিষ্যৎ? নিশ্চয় বর্তমান। কারণ তা সরাসরি এই মুহূর্তে বেঁচে থাকার সঙ্গে যুক্ত। তাহলে ভবিষ্যৎ কতোটা গুরুত্বপূর্ণ? কিছুটা বটে, কিন্তু বর্তমানের সঙ্গে তুল্য নয়। তবে আমার কাছে অতীত স্মৃতির মূল্য এখন সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে এই সিনেমা দেখার গল্প লিখতে বসে তাই মনে হচ্ছে। অতীত হাতড়ে সেই স্মৃতিমধুর বেদনাবিধুর মুহূর্তগুলোকে নতুনভাবে সাজাতে হচ্ছে পাঠকের উদ্দেশে। অবশ্য একথা আমার কাছে বেশ স্পষ্ট যে, লিখে পাঠকের মন জয় করা মোটেই সহজসাধ্য বিষয় নয়।

আগেই বলেছি, বাবার ছিলো বদলির চাকরি। ফলে বাবার পিছে পিছেই ছুটতে হয়েছে পরিবারের সবাইকে। ১৯৬৮-এর শেষের দিকে বদলি হয়ে এলেন ঝিনাইদহ। স্থানীয় লোকেরা সঠিকভাবে লিখলেও উচ্চারণ করেন ঝিনেদা। ঝিনেদা তখন মহকুমা শহর, জেলার নাম যশোহর। বাবার অফিসের সংক্ষেপ নাম ওয়াপদা। কিন্তু অফিসের সামনে বাংলায় লেখা সাইনবোর্ড ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড’। বিভিন্ন সার্কেল অফিস, নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলসহ ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের অফিস তখন ঝিনেদা’তে। এখান থেকেই কুষ্টিয়ার বিখ্যাত জি কে প্রজেক্টের কাজ দেখভাল করা হতো। ওয়াপদা অফিসের বেশ কয়েকটি জিপ কোম্পানির গাড়ি ছিলো, যা অন্য কোনো অফিসে ছিলো না। চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের পাশে সত্যবাবুর বাড়ির নীচতলায় আমরা ভাড়াটে হিসেবে উঠেছিলাম। ৬০-এর দশকের সেকালে ভাড়া থাকা বেশ সম্মানহানির বিষয় ছিলো। যাদের ঘরবাড়ি নেই অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকে, তারাই ভাড়াটে। এছাড়া পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিব্রত হওয়ার মতো শব্দ ব্যবহার করতো বাড়িওয়ালা। যেমন, ভাড়াটিয়ার বউ, ভাড়াটিয়ার ছেলে-মেয়ে, ভাড়াটিয়ার বাসায় বেড়াতে এসেছে তাদের আত্মীয়¾এমন সব কথা। তবে একথা সত্য, সেকালে মানুষের আন্তরিকতা যেমন ছিলো, তেমনই একে অন্যের প্রতি ছিলো শ্রদ্ধাশীল। একসময় আমরা ভাড়াটে বাসা থেকে ওয়াপদা কোয়ার্টারে উঠে আসি।

আমাদের বাসার পিছনে ছিলো মস্ত বড়ো পাকা ঘাট বাঁধানো বিশাল পুকুর। সেই পুকুরে আশপাশের বাসাবাড়ির সবাই আসতো গোসল করতে। আমরা কয়েক বন্ধু অপেক্ষা করতাম একসঙ্গে পুকুরে নামবার জন্যে। এ দলে কয়েকজন বান্ধবীও ছিলো। আমরা ডুবসাঁতার আর ‘ ছোঁয়াছুঁয়ি’ খেলতাম পানির মধ্যে। কী যে আনন্দ ছিলো একটুখানি ছোঁয়া পাবার, তা এখন বর্ণনা করা নানান কারণে মানা। স্মৃতির ধুলো জমেছে বেশ, অতীতের মরচেও ধরেছে কম নয়। তারপর আবার দীর্ঘদিনের ব্যস্ততার বিস্মৃতি। কিন্তু ষোলো আনা ভুলে গেলে কী আর চলে! সেই পুকুর পাড়ে বসেই বন্ধুরা সন্ধ্যাবেলা শুনতাম ‘ছবিঘর’ সিনেমাহলের মাইকের গান। তখন সিনেমা শুরুর আগে মাইকে গান বাজানো হতো। আমাদের বাসা থেকে হেঁটে বাঘা যতীন সড়ক পার হয়ে দুই বাড়ি পরেই ছিলো ঝিনেদার একমাত্র সিনেমাহল ‘ছবিঘর’। ‘ছবিঘর’-এর প্রথম নাম ছিলো ‘স্বপ্নপুরী টকিজ’। এর মালিক ছিলেন ডা. নির্মল ভৌমিক। তিনি দেশত্যাগের পর প্রায় পরিত্যক্ত এই ভবনে টকি দেখানোর ব্যবস্থা করেন চুয়াডাঙ্গা মহকুমা শহরের সিরাজ মিয়া মহাজন। চুয়াডাঙ্গা থেকে গরুর গাড়িতে মেশিনপত্র নিয়ে ঝিনেদা এসে তিনি কয়েকদিন টকি-বায়োস্কোপ দেখিয়ে আবার মেশিন গুছিয়ে চুয়াডাঙ্গা ফিরে যেতেন। এই ‘স্বপ্নপুরী টকিজ’-এর সঙ্গে যুক্ত হন ই এ নোমানী। নোমানী সাহেবের যশোর শহরে ‘তসবীর মহল’ নামে একটি সিনেমাহল ছিলো। ‘স্বপ্নপুরী’র সাজ-সজ্জা বদলে আধুনিকতার ছাপ লাগান তিনি। সিনেমাহলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ছায়াবাণী’। শুরু হয় জমজমাট ব্যবসা। সন্ধ্যায় গরুগাড়ি, ঘোড়াগাড়িতে চেপে নারীরা আসতে শুরু করে সিনেমা দেখতে। গরু, ঘোড়ার গাড়িতে ছৈ-মাচা ছিলো বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা। শুধু তাই নয়, গেরস্থ বাড়ির বউদের পরনের শাড়ি দিয়ে তা সম্পূর্ণভাবে ঘিরে দেওয়া হতো¾যাতে বউ, ঝি’দের দেখা না যায়।

তবে এই দৃশ্য বেশি ছিলো যখন সালাহউদ্দিন পরিচালিত রূপবান সিনেমাহলে আসে তখন। পরে অবশ্য আলোমতি, রহিম বাদশাহ, রূপবান, রাখাল বন্ধু, গুণাই বিবি’সহ লোকসংস্কৃতিভিত্তিক সিনেমা মুক্তি পেলেই এমন দৃশ্য দেখা যেতো বেশি। নোমানী সাহেব তখন সিনেমাহলের দেখভাল লাভ-ক্ষতি দেখার পরামর্শক নিয়োগ করেন ঝিনেদার কালাম মিয়াকে। এই কালাম মিয়া সাহেবের নামে এখনো একটা পেট্রোল পাম্প রয়েছে। তার ছেলেরা অবশ্য এখন সেটা দেখাশোনা করে।


চুয়াডাঙ্গার সিরাজ মিয়া মহাজন ‘ছায়াবাণী’ সিনেমাহল বিক্রি করে দেন ঝিনেদার ভুটোরগাদীর সিরাজ মিঞার কাছে। নোমানী সাহেব তখন ‘ছায়াবাণী’র ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন। কারণ, ভুটোরগাদীর সিরাজ মিঞার সঙ্গে তার কোনো দিক দিয়েই ব্যবসায়িক মিল হচ্ছিলো না। ‘ছায়াবাণী’র একচ্ছত্র আধিপত্য চলে আসে সিরাজের হাতে। তিনি সিনেমাহলের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দেন ‘ছবিঘর’। সেই পাকিস্তান আমলের ‘ছবিঘর’ এখনো চলছে। তবে ইতোমধ্যে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে; যেমন, সিনেমাহলের সামনের সড়কটির নাম ছিলো ‘বাজারপাড়া সড়ক’, পরে নাম পরিবর্তন করে মহাকবি ইকবালের স্মরণে ‘ইকবাল সড়ক’ করা হয়। মু্ক্তিযুদ্ধের পরে নাম রাখা হয় ‘গীতাঞ্জলি সড়ক’। ‘ছবিঘর’-এর সামনেই ছিলো কালীগঞ্জÑনলডাঙ্গা এলাকার সংসদ সদস্য ইকবাল আনোয়ারুল ইসলামের দোতলা দালান। সিনেমা শুরুর আগে যখন মাইকে গান বাজানো হতো, তখন তার বাড়িতে টিকে থাকা ছিলো বেশ কষ্টের। ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকীর বাবা নূরনবী সিদ্দিকীর বাসাও সিনেমাহল লাগোয়া ছিলো। তিনিও মাঝেমধ্যেই সিনেমাহলে গান বাজানোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন।

‘ছবিঘর’ সিনেমাহলের মালিক, ম্যানেজারকে সাধারণ দর্শক যতো না চিনতো তার চেয়ে বেশি জানতো-চিনতো অপারেটর হাবু গাজী, মানু আহমেদ, আবু বাক্কারাম আর ভুটোরগাদীর আলী কদরকে। সেকালে রিকশা এবং বেবিট্যাক্সিতে সিনেমার প্রচার করা হতো। প্রচারকারী বিভিন্ন হাট, বাসস্ট্যান্ড ও স্কুল-কলেজের সামনে যেতো। এদেরকেই সিনেমাহলের লোক ধরে নিতো সাধারণ মানুষ। অনেকে অ্যাডভান্স টিকিটের জন্য প্রচারকারীর কাছেই টাকা দিয়ে দিতো। পরে সিনেমাহলে এসে তাকে খুঁজে বের করতো। এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই প্রচারকারী সিনেমাহলের চেকারদের ম্যানেজ করে টিকিট ছাড়াই সিনেমা দেখার ব্যবস্থা করে দিতো। আমরা স্কুলপড়ুয়া ছাত্র। সব ছাত্রের জন্যেই হাফ টিকিট। টিকিট কাউন্টারের ভিতরে স্কুলের পরিচয়পত্র ঢুকিয়ে শুধু বলা ‘স্টুডেন্ট’। অমনি অর্ধেক দামে টিকিট পাওয়া যেতো। তবে মুরুব্বিরা বলতো, আইয়ুব খান (পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট) দেশটাকে ধ্বংস এবং ছাত্র-যুবকদের সর্বনাশ করার জন্যেই এই পন্থা বের করেছে।

‘ছায়াবাণী’ সিনেমাহলে প্রথম প্রদর্শিত হয়েছিলো উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত পথে হলো দেরী। সিনেমাটি অর্ধেক চলার পর মেশিন নষ্ট হওয়ায় বাকি অংশ আর দেখানো সম্ভব হয়নি। ‘ছায়াবাণী’ চলতো মূলত ‘আটা-ময়দার কল’ দিয়ে। বিকট ভট-ভট আওয়াজ করতো সেই কল। ওই আওয়াজে সিনেমার সংলাপ প্রায় বোঝাই যেতো না। সেই কলও আবার বন্ধ হয়ে যেতো মাঝেমধ্যে, তখন শুরু হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পালা। ইভনিং শো শেষ হতো রাত ১১টাÑ১২টায়; তারপর শুরু হতো সেকেন্ড শো অর্থাৎ নাইট শো। ঝামেলা ছিলো আরো। সেসময় সিনেমার রিল ঘোরানো হতো হাতে। সেই গতি প্রায়ই শ্লথ হয়ে যেতো, তখন সিনেমাহলসুদ্ধ লোক চেঁচামেচি, বকাঝকা শুরু করতো। এমন সব বর্ণনা দিলেন ঝিনেদার প্রবীণতম ব্যক্তি নন্দ দুলাল সাহা। ৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘আনা’র হিসাব চালু ছিলো। যেমন, ষোলো আনায় এক টাকা। এক আনা দুই আনা করে ষোলো আনায় টাকা হতো। নন্দ দুলাল সাহা তিন আনায় টিকিট কেটে ‘ছায়াবাণী’তে সিনেমা দেখেছেন। এরপর যখন পয়সার হিসাব চালু হয় (একশো পয়সায় এক টাকা) তখন রূপবান দেখবার জন্যে তিনি সিনেমাহলে ঢুকেছেন ছয় আনায় টিকিট কেটে। দেশ স্বাধীনের পর দেখতে গিয়েছিলেন সুভাষ দত্তের অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী; ১০ আনায় দেখেছেন। এরপর আর সিনেমা দেখতে সিনেমাহলমুখো হননি নন্দ। তবে স্বাধীনতার পর শহরের বিডি হলে ‘প্রিয়া’ নামে আরেকটি সিনেমাহল চালু করা হয়।

তিন.

অতি সম্প্রতি গিয়েছিলাম ঝিনাইদহ, ‘ছবিঘর’-এর বর্তমান অবস্থা দেখতে। দর্শকের কাছ থেকে জানতে পারলাম, বৃষ্টি এলে সিনেমাহলে ঝপঝপ করে যেমন বৃষ্টি পড়ে, তেমনই আওয়াজ হয়। বৃষ্টি, হায় বৃষ্টি! তুমি শহরতলীতে যেমন, গ্রামে ঠিক অন্যরকম। ছেলেবেলায় ছিলো একরূপ, বয়সকালে আজ সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ। একসময় বৃষ্টি ছিলো খেলার সঙ্গী, এখন বৃষ্টি দেখলে দৌড়ে পালাই। ঝিনাইদহের ওয়াপদা মাঠ, সত্যবাবুর ঘাটলা পুকুর, মডেল স্কুল, পাগলা কানাই সড়ক দিয়ে দাপিয়ে বেড়াতাম হাসু, টমি, নান্নু, শেলী, মতিন, ঝন্টু আরো কয়েকজন একসঙ্গে। টমি বেঁচে থাকলে বলতে পারতো ভালো। বিডি হলের মাঠেও দৌড়েছি কতোদিন আমরা। আজ যেমন সারাদিন শহরময় ঘুরলাম সযত্নে নিজেকে লুকিয়ে। ঝিনাইদহ শুধু বৃষ্টি ভেজা শহর নয়। সেই শহরে সাঁতার কাটতে, সাইকেল চালাতে, গাছে উঠে লাফিয়ে নামতে, স্কুলের গেটে চোখ-ফুল-চিঠি ছুড়ে মারতে, পুরাতন খবরের কাগজ বিক্রি করে ‘ছবিঘর’-এ ঢুকে সিনেমা দেখতে শিখেছি; সেই শহর আজ আমার কাছে পুরোটাই অচেনা।

যে শহরে বাবার কর্মজীবনের পাঁচটি বছর মা-ভাইবোনসহ কাটিয়েছি, সেই শহরতলী ঠিকই আছে, নেই তারা অনেকেই। ওয়াপদার কোয়ার্টার জরাজীর্ণ হলেও মনে হচ্ছিলো মা ওই ঘরেই বসে আছেন। এইতো বললেন, মিলু আয় বসে যা, বাইরে রোদের তাপ। মা আমায় মিলু বলে ডাকতেন। জীবনেও যে এখন সেই তাপ¾মা আর খোঁজ নেন না। আমার মা ঝিনাইদহ থাকতে তরুণী ছিলেন, কোঁকড়া কালো চুল, নাকে আজীবন বরইফুলের মতো নাকফুল পরতেন। নীল পাথর বসানো মাঝখানে। গলায় সোনার মটরদানা মালা। সিনেমা দেখতে খুবই পছন্দ করতেন আর বেড়াতেন, আগেও লিখেছি অবশ্য। ওইতো আমি আর মা যাচ্ছি সিনেমাহলের দিকে। একটু পরেই সিনেমাহলের মধ্যে মা চোখ মুছবেন শবনম-রহমান জুটির কষ্ট দেখে।

ফরিদপুর থেকে ছোটো সাইকেল চালিয়ে অনেকদিন ঝিনাইদহ গিয়েছি, ক্লান্ত হইনি। কিন্তু আজ ওয়াপদার সেই ‘সি টাইপ’ কোয়ার্টারের সামনে যেতেই বড়ো ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। কেনো যেনো কথা বের হচ্ছিলো না। খুব মনে পড়ছিলো ঝাড়ুদার বানঠার কথা। প্রতিদিন যেমন ঝাড়ু দিতেন নিয়ম করে, তেমনই মদও খেতেন নিয়ম করে। মাতাল হলেও বানঠার মুখে গান থাকতো¾ ‘ও ওয়ো বাচুপানকে দিন ভোলা না দে না।’ ওকে পেলেও জিজ্ঞেস করতাম, কী খেলে অতীত ভুলে থাকা যায়।

‘ছবিঘর’-এ মায়ের সঙ্গে দেখেছিলাম খান আতাউর রহমানের জোয়ার ভাটা (১৯৬৯)। শবনম আর রহমান ছিলেন নায়ক-নায়িকা। অসাধারণ জুটি। রহমান অভিনীত বেশ কয়েকটি উর্দু সিনেমা দেখেছিলাম সেই শৈশবেই। এর মধ্যে এহতেশাম পরিচালিত চান্দা, জহির রায়হানের বাহানা, রহমানের যাহা বাজে শেহেনাই, চলো ম্যান গাঁয়েদর্শন ছিলো অন্যতম। রহমান অভিনীত তালাশ সেসময় পূর্ব পাকিস্তানে খুবই জনপ্রিয়তা পায়। রহমান একসময়ের সাড়া জাগানো নায়ক, যাকে তুলনা করা হতো উত্তম কুমারের সঙ্গে। অবশ্য রহমান শুধু নায়কই ছিলেন না, ছিলেন প্রযোজক ও পরিচালক।

রহমান প্রীত না জানে রীত-এ চুক্তিবদ্ধ হয়ে ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে শুটিং করার জন্য সিলেটে গিয়ে দুর্ঘটনায় এক পা হারান। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুলাই রহমানের জীবনাবসান হয়। রহমানের জীবনের শেষ ১৫ বছর কেটেছে হুইল চেয়ারে অনেকটা নিঃসঙ্গ অবস্থায়। জোয়ার ভাটায় শবনমের লিপে একটি গান ছিলো। সেই গান শোনার জন্যে মা তিনবার জোয়ার ভাটা দেখেছিলেন। গানটি এখনো আমার মুখস্থ, কোথাও ভুল থাকতে পারে। গানটি গেয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমীন।

মন যদি ভেঙ্গে যায় যাক, যাক কিছু বলবো না

তোমার যাবার বেলায় আমার প্রেমের কথা তুলবো না

 

নাইবা মানলো বাঁধা চোখের জলের এই নদী

পথ চেয়ে একা একা কাঁদবো না আর নিরবধি।।

তোমার পথের চলা, তোমার পায়ের ধুলা

মুছিয়ে দিয়েছি আঁখি জলে

সেইতো অনেক বড়ো সান্ত্বনা

 

কী আছে না হয় আমি কেঁদেই কাটাবো এ জীবন

না হয় ছলনা দিয়ে বুঝিয়ে রাখবো এ মন

তোমার জীবন তৃষ্ণা, পেয়েছে পথের দিশা

এগিয়ে চলেছো সেই পথে

সেই তো অনেক বড় সান্ত্বনা

মন যদি ভেঙ্গে যায় যাক, যাক কিছু বলবো না

এই গানটা কুলসুম বু’রও মুখস্থ ছিলো। কুলসুম বু আমাদের বাসায় কাজ করতো। মা খুব আদর করতো তাকে। তার বিয়ে হয়েছিলো, স্বামী ছেড়ে চলে গেছে। দুটি সন্তান আছে, তাদেরকে নানির কাছে রেখে বাসায় বাসায় সে কাজ করতো। একবার মা তাকে সিনেমা দেখতে নিয়ে গিয়েছিলো। ফিরে এসে সে আমাদের সব ভাইবোনকে বলেছিলো¾‘এখন বুঝতি পারিছি, আফারা সিনেমা দ্যাখে ক্যা।’ আমরা জানতে চাইতাম কেনো, কী জন্যে দেখে? সে তার আঞ্চলিক ভাষায় হাসি হাসি মুখে বলতো¾‘সিনেমা দ্যাখাও যা, নাচগান ঢঙ-রঙ দ্যাখাও তাই।’ ভাড়া বাসা ছেড়ে আমরা যখন ওয়াপদা কোয়ার্টারে চলে আসি, তখন কুলসুম বু ওই এলাকাতেই থেকে যায়। আমাদের নতুন কাজের লোক মা ঠিক করে নেন। অনেকদিন পরে জানতে পারি, কুলসুম বু এক দাঁতের ডাক্তারের বাসায় কাজ করতো। তার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়। এ ঘটনায় সেই ডাক্তার লজ্জায় ভয়ে সবকিছু ফেলে ঢাকায় চলে যায়। কুলসুম বু পরে গাছ-গাছড়ার চিকিৎসা নিয়ে গর্ভপাত করাতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে রক্তশূন্যতার কারণে পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কয়েকদিন পর মা এই খবর পান। খুঁজে খুঁজে তিনি আরাফপুরে কুলসুম বুর বাড়ির সন্ধান বের করেন। তারপর আমাকে নিয়ে কুলসুম বুর বাচ্চা দুটোকে দেখতে যান মা। বাচ্চা দুটো মার কাছে বায়না ধরে, নানি আমরা তোমাদের বাসায় যাবো। মা হঠাৎ ওদের প্রস্তাব শুনে হকচকিয়ে অন্য কথা বলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে বলতে থাকেন, তোমরা আজকের মতো থাকো, পরে এসে নিয়ে যাবো। মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেনো ভাবছিলেন। আর আমি মাথা নিচু করে মায়ের অসহায়ত্বের কথা ভাবছিলাম। কুলসুম বুর সেই কথা খুব মনে পড়ছিলো¾‘সিনেমা দ্যাখাও যা, নাচগান ঢঙ-রঙ দ্যাখাও তাই।’ কুলসুম বু, কেনো তুমি এমন একজনের সঙ্গে ‘ঢঙ-রঙ’ করতে গেলে যে, জীবন দিয়ে তোমাকে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হলো। কথাগুলো মনে মনে উচ্চারণ করলাম আর ঘৃণা জানালাম সেই দাঁতের ডাক্তারের প্রতি।

চার.

‘ছবিঘর’ সিনেমাহলের অদূরেই জব্বারের একটা ছোট্ট কাঠের দোকানে থাকতো কয়েকজন হিজড়া। এই ঘরে না ছিলো জানালা, না ছিলো সেই অর্থে কোনো দরজা। কোনো রকম যেয়ে শুয়ে থাকা যেতো আর কী। হিজড়ারা শুধু সিনেমার দর্শককে নয়, আশপাশের বাড়িতে গিয়েও তাদের খুব বিরক্ত করতো। অবশ্য ওরা করবেইবা কী? ওদের না থাকে নির্দিষ্ট কোনো আয়, না আছে সামাজিক মর্যাদা। একরকম সমাজচ্যুত ওরা। পরিস্থিতি এমন যে, মৃত্যুর পরে দাফন-কাফন নিয়েও সমস্যা হয়। দিনের বেশিরভাগ সময় হিজড়ারা দলবদ্ধভাবে চলে যেতো শহরের বিভিন্ন এলাকায়। আশপাশের মানুষকে নিজেদের অসামান্য জ্ঞান, বুদ্ধি ও মেধা দিয়ে চমৎকৃত করতো ওরা; রস-মধুর কথাবার্তা বলে মুগ্ধ করতো। একই সঙ্গে বখশিশ না পেলে ওরা অবশ্য ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতো। আহত সাপের মতো হয়ে উঠতো প্রতিশোধপরায়ণ। হিজড়ারা দুই হাতের তালু একসঙ্গে করে একধরনের আওয়াজ করতে পারতো। তখন সবাই মিলে সেই আওয়াজ করতো।

এছাড়া ছোট্ট একটা ঢোল থাকতো ওদের সঙ্গে, নিজেরাই বাজাতো আর নাচতো। এছাড়া কোনো বাড়িতে নবজাতকের সন্ধান পেলেই ওরা সে বাড়িতে হাজির হতো দলবল নিয়ে। নিজস্ব ঢঙে শুরু করতো নাচগান। জোর করে হলেও নতুন শিশুকে নিয়ে কিছুক্ষণ নাচিয়ে, দোল খাইয়ে বখশিশ আদায় করে ছাড়তো। হিজড়ারা নিজেদের মধ্যে নারী-পুরুষের ব্যবধান করতো। এটা বোঝা যেতো ওদের নাম দিয়ে। হিজড়া মেয়েদের নাম হতো বিউটি, স্বপ্না, রাশেদা, শামিমা আবার পুরুষ হিজড়াদের নাম ছিলো মদন, খোকন, সাধন¾এমন আর কী। সেই ছেলেবেলায় হিজড়া সম্পর্কে তেমন বুঝিনি; তবে ওরা যে খানিক আলাদা তা বুঝতে পারতাম। আমার কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই হিজড়াদের ভালো লাগতো, বিশেষ করে তাদের বাচনভঙ্গি¾‘আয়লো বু তুই আয়, এ বাড়ির মিনষেরা মরদা না, মরদা হলি আমাগো পছন্দ না করে থাকতি পাইরতো না।’ ওদের নিজেদের রূপ গুণের প্রশংসা নিজেরাই করতো। বখশিশ দেবেন না¾বলে যখন হাসি দিতো তখন খুবই ভালো লাগতো ওদের। অবশ্য সব মানুষই হাসলে সুন্দর লাগে।

(চলবে)

লেখক : মফিজ ইমাম মিলন, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক। তিনি ফরিদপুর থেকে ‘উঠোন’ নামে একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।

uthon.faridpur@gmail.com

https://www.facebook.com/milan.imam

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন