Magic Lanthon

               

হিরু মোহাম্মদ

প্রকাশিত ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ভগ্নাংশের সমর্থনে চলচ্চিত্রে

যেভাবে দেখা যায় কিউবাকে

হিরু মোহাম্মদ

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি



টিকে থাকার রাজনীতির মারপ্যাঁচ 

সমুদ্র ঘেরা দেশ কিউবা। যা সবার কাছে কুখ্যাত, ক্যাসিনো আর জুয়ার দেশ হিসেবে পরিচিত। পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা একে প্রমোদের কেন্দ্র মনে করে। তারাই এদেশকে আখ্যা দিয়েছে ‘বেশ্যালয়’ হিসেবে। সেই ক্যাসিনো, জুয়া আর বেশ্যালয়ের দেশ কিউবায় ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবের মাধ্যমে গণেশ পাল্টে দিয়ে ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের’ সূচনা করে চে, ফিদেলরা। সদ্য বিপ্লব শেষ হওয়া এই রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার কাজটা মোটেও সহজ ছিলো না; অনেকটা নদীতে থেকে কুমিরের সঙ্গে টক্কর দিয়ে চলার মতোই অবস্থা। কেননা সারা দুনিয়ায় পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে দানবীয় রূপ, সেখান থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী রাষ্ট্র কিউবার অবস্থান। বিপ্লবের পর থেকে বিপ্লবী সরকারকে পণ্ড করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্ঘাত, সরাসরি হামলাসহ নানা চক্রান্ত চালায়। এতোসব সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র দমাতে পারেনি কিউবার বিপ্লবী হাওয়াকে। তবে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে সমাজতান্ত্রিক মহাজোট সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো মহোৎসবে ফেটে পড়ে, বিশ্বে একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় যুক্তরাষ্ট্র।

চারদিকে হইহই রটে যায় কিউবা আর বেশিদিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় টিকে থাকতে পারবে না। যদিও কিউবা তার মতো করে টিকে আছে ২০১৮ তে এসেও। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কিউবাবিরোধী কাজকর্ম থেমে নেই¾

কিউবার মুক্তি সংগ্রামের প্রতীক হোসে মার্তির নাম ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র আর তার মাফিয়া দল কিউবা বিপ্লব বিরোধী রেডিও প্রচার শুরু করেছে ১৯৬১ থেকেই। পরে টিভি স্টেশনও খুলেছে। এগুলোর নাম দেয়া হয়েছে রেডিও মার্তি, টিভি মার্তি। এখন ২০টির বেশি রেডিও স্টেশন চলছে। এগুলো এত বছর ধরে অব্যাহতভাবে বিপ্লব, ফিদেল বিরোধী এবং ভোগবাদ সম্প্রসারণে প্রচার চলছে।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক অবরোধ তো শুরু থেকেই চলছে। এতোকিছুর পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য একটাই, কিউবার চলমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করা। কেননা বিশ্বের মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের পাশেই সম্পূর্ণ বিপরীত এক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা চলছে; যে দেশের অনেক কিছু অনুসরণ করার মতো, প্রভাবিত হওয়ার মতো। তাই যুক্তরাষ্ট্র সবসময় কিউবাকে কোণঠাসা করে রাখতে চেয়েছে, রাখছেও।

পুঁজির উত্তাল স্রোতকে পাশ কাটিয়ে তারপরও কিউবা চলছে তার মতো। নিজের জনগণের মধ্যে বিপ্লবের সুফল তুলে দিতে বদ্ধপরিকর রাষ্ট্রটি। তারা জনগণকে পুঁজির খেলা থেকে দূরে রেখে সংস্কৃতির সব ধাপে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের এই বিপরীতমুখী অবস্থান, তা প্রতিনিয়তই দু-দেশের সংস্কৃতিতে চর্চা হয়। আর এই সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম মাধ্যম চলচ্চিত্র। এটা অবশ্য অনেকেরই জানা, শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমের চেয়ে চলচ্চিত্র সহজেই কোনো বিষয়কে মানুষের কাছে বাস্তব, গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। সেজন্য হয়তো রাশিয়ায় বিপ্লবের পর লেনিন চলচ্চিত্রকে জাতীয়করণ ও ব্যবহার করেন নিজেদের স্বার্থে।

বিপ্লব পরবর্তী কিউবায় চলচ্চিত্র ব্যবহার হয়েছে নানাভাবে। চলচ্চিত্রে কিউবার উপস্থাপন দেখার জন্য সেখানে নির্মিত ভাইভা কিউবা (২০০৫) ও ইউনা নোছে (২০১৩) নামে দুটি চলচ্চিত্রকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ভাইভা কিউবা নির্মাণ করেন কিউবান নির্মাতা জুয়ান কারলোস ক্রিমাটা মালবার্তি (Juan Carlos Cremata Malberti) আর ইউনা নোছে নির্মাণ করেন বৃটিশ বংশোদ্ভূত মার্কিন নির্মাতা লুসি মুললয় (Lucy Mulloy)। আলোচনার জন্য এই চলচ্চিত্র দুটি বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ হলো, দুটি চলচ্চিত্রের বিষয় কিউবা হলেও একেবারে বিপরীতভাবে কিউবাকে রিপ্রেজেন্ট করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, নির্মাতারাও পৃথক দেশের¾একজন কিউবান, অন্যজন আমেরিকান।

চলচ্চিত্র সম্পর্কে আলোচনার আগে নির্মাতাদের নিয়ে প্রাথমিক কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক। জুয়ান কারলোস ক্রিমাটা মালবার্তি’র জন্ম হাভানার ভেদাদো শহরে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে। কোরিওগ্রাফার ও নির্মাতা মা আরাইদা মালবার্তি কাব্রেরা’র (Iraida Malberti Cabrera) ইচ্ছায় জুয়ান ছোটোতেই কাজ শুরু করেন শিশুতোষ টেলিভিশন শো’তে। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে জুয়ান ‘হাভানা সুপিরিওর ইন্সটিটিউট অব আর্ট’ থেকে ড্রামাটিক আর্টস ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৯০-এ ‘সান আন্তনিও দে লুস বানোস আন্তর্জাতিক ফিল্ম স্কুল’ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বেশ কয়েক বছর লেখালেখি ও শিশুতোষ টেলিভিশনে অভিনয় করা জুয়ান ২০০১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম চলচ্চিত্র নাদা নির্মাণ করেন। নাদা সেসময় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর নির্মিত নাদিনুনকা দর্শকের নজর না কাড়লেও ভাইভা কিউবা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়।

এদিকে ইউনা নোছে’র নির্মাতা লুসি মুললয় অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন ও অর্থশাস্ত্র নিয়ে। এরপর তিনি চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টিচস্ স্কুল অব দ্য আর্ট’ থেকে। সেখানে অধ্যয়নের সময় লুসি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দিস মর্নিং নির্মাণ করে স্টুডেন্ট অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ইউনা নোছে, যা তিনি কিউবাতে কিছুকাল থেকে গবেষণা করে নির্মাণ করেন। প্রথম চলচ্চিত্রেই আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত ও অনেক পুরস্কার পান লুসি।

কেনো, কাকে বলি সমস্যা

প্রত্যেক দেশেরই নিজস্ব কিছু সমস্যা থাকে, সেটা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্ন হয়। সেই সঙ্গে সমস্যাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং তা সমাধানের পথও হয়ে থাকে ভিন্ন। মূলত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ নানা কারণেই একই বিষয়ের নানা রিপ্রেজেন্টেশন হয়। ক্ষমতা বা জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে কোন রিপ্রেজেন্টেশন সমাজে টিকে থাকবে। যদিও দেশ ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী একই সমস্যা ভিন্নভাবে হাজির হয়ে থাকে। রিপ্রেজেন্টেশনকে বিবেচনায় নিলে ভাইভা কিউবাইউনা নোছে তেমনই দুটি চলচ্চিত্র।

ভাইভা কিউবা’তে বাবাহীন পরিবারে মায়ের একমাত্র মেয়ে মালু। মা, নানি আর মালু মিলে তাদের সংসার। মালুর খেলতে, ঘুরতে ভালো লাগে পাশের বাড়ির জারগিটো’র সঙ্গে। কিন্তু জারগিটোর পরিবারের সামাজিক অবস্থান মালুদের চেয়ে খারাপ। এছাড়া জারগিটোর বাবা মদে আসক্ত হওয়ায় মালুর মা সবসময় তাকে জারগিটোর সঙ্গে চলতে বারণ করেন। এদিকে জারগিটোকেও তার পরিবার মালুর সঙ্গে মিশতে নিষেধ করে এই বলে যে, মালুর বাবা-মার বিচ্ছেদ হয়েছে, মা একা থাকেন। ফলে দুই পরিবারের সম্পর্ক অনেকটাই দা-কুমড়া। কিন্তু মালু ও জারগিটোর পরিবারের এসব কথা ভালো লাগে না, তারা মিলেমিশে থাকতে চায়। তাই তারা কারো কথায় কর্ণপাত না করে হেসে-খেলে দিন কাটায়। হঠাৎই মালুর নানি মারা যান। বাড়িতে মালুর একমাত্র মন খুলে কথা বলার ও খেলার মানুষ ছিলো নানি। তিনি চলে যাওয়ায় মালু অসহায় হয়ে পড়ে। সেই সময় মালুর মা সিদ্ধান্ত নেন, মেয়েকে নিয়ে তিনি বিদেশে প্রেমিকের কাছে চলে যাবেন। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর মালুর মায়ের সঙ্গে বিদেশে থাকা এক ব্যক্তির যোগাযোগ হয়। মূলত ফোনেই নিয়মিত তাদের মধ্যে কথা হতো।

মালু কোনোভাবে মেনে নিতে পারে না হাভানা ছাড়ার বিষয়টি। চেনা পরিবেশ, খেলার সাথি, এই শহর ছেড়ে সে কোনোভাবেই থাকতে পারবে না। তখন মালু আর জারগিটো মিলে বুদ্ধি করে, যদি তারা মালুর বাবাকে কোনোভাবে তার দেশ ছাড়ার অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর না দেওয়ার জন্য রাজি করাতে পারে; (সন্তান মা-বাবা দুজনেরই, তাই তাদের সমান অধিকার আছে সন্তানের প্রতি। তাদের যেকোনো একজন সন্তানকে নিয়ে দেশ ছাড়তে চাইলে অন্যজনের অনুমতি লাগে কিউবার আইনে।) তাহলে মালুকে আর দেশ ছাড়তে হবে না। এই উদ্দেশ্যে তারা মালুর বাবার কাছে যাত্রা করে। এদিকে সন্তানরা বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর মালু ও জারগিটোর মা বুঝতে পারে, তাদের সন্তানরা ভাই-বোনের মতো ছিলো, মিলেমিশে থাকতো; শুধু শুধু তারা নিজেদের মধ্যে হিংসার কারণে সন্তানদের কষ্ট দিয়েছে। একপর্যায়ে তারা জানতে পারে, তারা দুজন মালুর বাবার কাছে যাচ্ছে। তাই দুই পরিবার তাড়াতাড়ি করে সেখানে যায়। সন্তানদের পেয়ে তারা আবার শাসন, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে থাকে। এই ফাঁকে মালু আর জারগিটো আবার পালিয়ে যায়!

অন্যদিকে রাহুল, এলিও ও লীলা নামের তিন কিশোর-কিশোরীর পারিবারিক সমস্যা নিয়ে আবর্তিত হয় ইউনা নোছে-এর কাহিনি। রাহুল দরিদ্র পরিবারের হতাশাগ্রস্ত কিশোর। কাজ করে এক রেস্টুরেন্টে। সেখানে আসা বিদেশি পর্যটকদের নাচগান, আমোদ-ফূর্তি দেখে তারও ইচ্ছা হয় এসব করতে। এ নিয়ে তার মনে ক্ষোভ জমা হতে থাকে¾কেনো সে এসব করার সুযোগ পায় না? তার পরও রাহুল স্বপ্ন দেখে এবং তা বাস্তবায়নে সমুদ্র পথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি (Miami) শহরে যেতে চায়। তার ধারণা সেখানে গেলেই সে স্বর্গ পাবে। রাহুল জানায়, মায়ামিতে তার বাবা আছে। এরই মধ্যে একদিন মা’র ঘরে এক পর্যটক খদ্দেরকে দেখে তার চোখে আঘাত করে রাহুল। সেই অভিযোগে পুলিশ তাকে তাড়া করে বেড়ায়।

এদিকে বন্ধু এলিওকেও মায়ামিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক আগে থেকে নানাধরনের কথা বলতে থাকে রাহুল। এলিওর পরিবারেরও একই অবস্থা; তার বাবার অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় তিনি মায়ের সঙ্গে নিয়মিত ঝগড়া করেন। একদিন রাহুলের সঙ্গে যাওয়ার জন্য এলিও তার বোন লীলার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসে। বাড়ি থেকে ভাইয়ের বেরিয়ে যাওয়া সন্দেহজনক মনে হলে লীলাও তার পিছু নেয়। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত রাহুল, এলিও ও লীলা টিউবের ভেলায় করে স্বপ্নের পথে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিতে রওনা হয়। ঝড়-বৃষ্টি-রোদ উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত তাদের আর স্বপ্নের পৃথিবীতে যাওয়া হয় না, পথিমধ্যেই দুর্ঘটনায় জীবন দিতে হয় এলিওকে। রাহুল ও লীলা বেঁচে ফিরে কিউবায়। পুরো ঘটনা চলচ্চিত্রে উঠে আসে লীলার স্মৃতিচারণে।

চলচ্চিত্রে কিউবা নির্মাণ

দুটি চলচ্চিত্রই কিউবাকে নির্মাণ করেছে। আগেই বলেছি, চলচ্চিত্র দুটি কিউবার অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে হলেও নির্মাতারা ভিন্ন দেশ ও সমাজব্যবস্থার। প্রথমে দেখে নেওয়া যাক, যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতা কীভাবে কিউবাকে তার চলচ্চিত্রে তুলে এনেছেন। তারপর দেখবো একজন কিউবান কীভাবে তার দেশকে তুলে ধরেছেন চলচ্চিত্রে।

প্রসঙ্গ ইউনা নোছে

ক. এই দেশেতে এই সুখ আর হলো না!

স্বভাবতই মানুষ ভালো থাকতে চায়, ভালো রাখতে চায় প্রিয়জনদের। একই সঙ্গে ভুলে যেতে চায় দুঃখ-কষ্টের মুহূর্তকে। এই প্রবৃত্তি মানুষের সহজাত। তবে পুঁজির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ভালো থাকার এই প্রবণতা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। দিন যতো গড়িয়েছে, এই আত্মকেন্দ্রিকতা কমেনি বরং বেড়েছে। পরিস্থিতি এমন যে, মানুষ অন্যের খবর রাখা তো দূরের কথা, নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। অন্যকে নিয়ে ভাববার তিলমাত্র সময় নেই তার। এই প্রবণতা শুধু পুঁজি প্রাধান্যশীল দেশগুলোতে চলছে এমন নয়, সমাজতান্ত্রিক দেশ কিউবাও এর ব্যতিক্রম নয়¾এমনটাই ইঙ্গিত দেন ইউনা নোছে-এর নির্মাতা লুসি মুললয়। যেখানে দারিদ্র্য ও সামাজিক অশান্তির মধ্যে রাহুল এক মুহূর্ত থাকতে চায় না। সে স্বপ্ন দেখে কিউবা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি শহরে যাওয়ার। যে শহর যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্নের শহরগুলোর অন্যতম, যাকে বলা হয় পুরো লাতিন আমেরিকার রাজধানী।

মায়ামি যাওয়ার জন্য বন্ধু এলিওকে সঙ্গে নিয়ে নানা জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে বের হয় রাহুল। জিনিসপত্র নেওয়ার সময় রাহুলদের সঙ্গে অন্যদের কথোপকথন শুনে মনে হয়, যারা এসব জিনিস কিনে, তারা প্রত্যেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এটা যেনো প্রতিদিনের সাধারণ কোনো ঘটনা। যখন রাহুল-এলিও চোরাই মোবাইলফোন সেট কিনতে যায়, তখন ফোন বিক্রেতা নারীকে বলতে শোনা যায়, এটা দিয়ে হাভানা থেকে মায়ামি ভালো কথা শোনা যাবে। কথা শুনে হতভম্ব রাহুল বলতে থাকে, ‘আমরা মায়ামি যাচ্ছি না!’ মোবাইলফোন সেট দেখে দামে বনিবনা না হওয়ায় রাহুল আর এলিও যখন চলে যায়, তখন পিছন থেকে ফোন বিক্রেতা নারীকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমাদের জীবন রক্ষা করো!’ বুঝতে কষ্ট হয় না, রাহুলরা দেশ ছেড়ে যেখানে পালিয়ে যাবে, সেখানে তাদের জীবন শঙ্কার মুখে পড়তে পারে। এবং তা থেকে সাবধান করে দিচ্ছেন ওই ফোন বিক্রেতা নারী।

আবার এলিও যখন হাসপাতালে ওষুধের সঙ্গে অতিরিক্ত স্যালাইন নেওয়ার জন্য যায়, তখন ওষুধের তালিকা দেখে চিকিৎসককেও বলতে শোনা যায়, ‘তুমি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছো, না?’ টিউবের ভেলায় মোটর লাগিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য এলিও পুরনো মোটর কিনতে গেলেও সেখানে দোকানদার মোটরের ক্ষমতা বোঝাতে গিয়ে বলেন, কোনো সমস্যা ছাড়াই এটা দিয়ে ৯০ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়া যাবে। এখানে দোকানদার ৯০ কিলোমিটার মানে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেওয়াই বুঝিয়েছেন। কারণ কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার।

রাহুল, এলিও সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য যে তিনটি জিনিস তিন জায়গায় কিনতে যায়, তাদের প্রত্যেকেই বুঝে যায় রাহুল ও এলিও দেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ কথায় তাদের মধ্যে কোনো অনুভূতি তৈরি করে না। তাদের আচরণ দেখে মনে হয়, এটা আর দশটা ঘটনার মতো সাধারণ বিষয়। চিকিৎসক তো এ কাজে তাদের সরাসরি সাহায্য করেন এবং পুলিশ যাতে দেশত্যাগের বিষয় বুঝতে না পারে সেজন্য এলিওকে রোগি বানিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। সবার এই আচরণে এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, কিউবার জনগণ মোটেও সেখানে ‘ভালো’ নেই! তাই রাহুল ও এলিওদের এই দেশ ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে অন্যান্য সাধারণ পেশাজীবী মানুষের সমর্থন রয়েছে।

খ. অর্থেই মেলে সবকিছু

আধুনিক রাষ্ট্র জনকল্যাণমূলক, সেখানে সবার আগে জনগণের স্বার্থকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলো সব রাষ্ট্রেই বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়ে থাকে। তবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিষয়গুলোকে আরো বেশি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে এগুলো নিশ্চিত হলেই পর্যায়ক্রমে নজর দেওয়া হয় অন্য বিষয়গুলোর দিকে। ইউনা নোছে-এর কিউবায় জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণেও ঘুষ দিতে হয়। এখানে সরকারি হাসপাতালে ওষুধ নিতে গেলে টাকা গুণতে হয়, অবশ্য সে টাকা হাসপাতালের ফান্ডে জমা হয় না, যায় চিকিৎসকের পকেটে। সহজভাবে বললে, ঘুষ দিয়ে কিউবার জনগণের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হয়। যদিও সমাজতান্ত্রিক কিউবায় রাষ্ট্রীয়ভাবে জনগণের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হওয়ার কথা। কিন্তু চলচ্চিত্রের ১৩ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে এলিও যখন ওষুধের তালিকা নিয়ে হাসপাতালে যায়, তখন চিকিৎসক তালিকা দেখে তাকে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি এইচ আই ভি পজেটিভে আক্রান্ত?’ এলিও বলে, ‘না’! চিকিৎসক বলেন, ‘ওষুধের তালিকা তো এইচ আই ভি আক্রান্ত হওয়ার কথাই বলছে। ... আমার কাছে এর টিকা নেই, বাকি ওষুধ আছে। তবে এটার জন্য ১৫ টাকা দিতে হবে।’ এলিও এ শুনে অবাক হলে চিকিৎসক বলেন, ‘শোনো, আমি এ টাকা একা নিই না। এখানে কাজ করা সবাইকে এই টাকা দিতে হয়।’ এ কথা শুনে কোনো কিছু না বলে এলিও টাকা দিয়ে দেয় এবং কিছুক্ষণ পরে চিকিৎসক তাকে গোপনে ওষুধও দিয়ে যান।

এলিও নয়, মূলত বন্ধু রাহুলের মা এইচ আই ভি’তে আক্রান্ত। এটা সবার জানা যে, এইচ আই ভি রোগের যে কয়েকটি কারণ তার মধ্যে অনিরাপদ যৌন মিলন একটি। চলচ্চিত্রে এটি দেখানো হয়, রাহুল যখন তার অসুস্থ মা’কে রেখে ওষুধ আনতে যায়, সেখান থেকে ফিরে সে তার মায়ের সঙ্গে এক খদ্দেরকে দেখে। ফলে রাহুলের মায়ের এইচ আই ভি’তে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়। এদিকে এইচ আই ভির টিকা হাসপাতালে না থাকলেও ঠিকই পাওয়া যায় চোরাকারবারিদের কাছে। সেখানে টাকার বিনিময়ে মেলে এই গুরুত্বপূর্ণ টিকাটি। রাহুলের কাছে টাকা না থাকায়, যে মোবাইলফোন সেটটি সে কিনেছিলো মায়ামিতে কথা বলার জন্য, সেটির বিনিময়ে মায়ের জন্য টিকা নেয়। চলচ্চিত্রে এভাবেই কিউবার অভ্যন্তরীণ দারিদ্র্য পরিস্থিতি ও দুর্নীতিগ্রস্ত চিকিৎসাব্যবস্থার কথা উঠে আসে।

গ. এ যেনো এক পুলিশের রাষ্ট্র

বর্তমান সময়ে এমন রাষ্ট্র খুঁজে পাওয়া দায়, যে রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা পুলিশ নেই। পুলিশ প্রশাসন সব দেশে থাকবে এটা স্বাভাবিক বিষয়। তবে এই পুলিশ কখনোই সাধারণ জনগণের ছিলো না; পুলিশের জন্ম ইতিহাস অন্তত সে কথাই বলে। আদিম সাম্যবাদী সমাজের শেষের দিকে যখন ধীরে ধীরে ব্যক্তিমালিকানা দেখা দেয়, তখন সৃষ্টি হয় শ্রেণি বিভক্ত সমাজের। সেই সমাজে মালিকের স্বার্থরক্ষার জন্য রাষ্ট্রের জন্ম হয়। আর মালিক শ্রেণির বিরুদ্ধতা দমনকারী হিসেবে আবির্ভাব ঘটে পুলিশের। সময়, রাষ্ট্রের কাঠামো কিংবা সমাজব্যবস্থা ভিন্ন হলেও সব রাষ্ট্রের পুলিশ এক¾পুলিশ সবসময় রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষা করে চলে। তবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণকে এটা বোঝানো হয় যে, রাষ্ট্রের যা কিছু আছে সবই জনগণের কল্যাণে। এখানে থাকবে না কোনো শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন¾সব নাগরিকের জন্য থাকবে প্রয়োজন অনুযায়ী সমান সুযোগ-সুবিধা। যেহেতু রাষ্ট্রের কাছ থেকে নাগরিকরা সব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে, তাই এ ধরনের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি, গুম-খুনসহ অন্যান্য অপরাধের আশঙ্কা অনেকখানি কমে যায়। তাই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ চাইলেও খুব বেশি কিছু করতে পারে না।

কিন্তু ইউনা নোছে’তে পুলিশকে নিয়ে সেরকম কিছু চোখে পড়ে না, যা দেখে মনে হবে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু আছে! রাহুল যখন চলচ্চিত্রের ১৮ মিনিটে রেস্টুরেন্ট থেকে কাজ শেষ করে বের হয়, তখন বাইরে থাকা প্রহরী তার সারা শরীর তল্লাশি করে। কারণ রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের সন্দেহ, রাহুল চুরি করতে পারে। এদিকে ঘরে মায়ের সঙ্গে এক পর্যটক খদ্দেরকে দেখে সেই খদ্দেরের চোখে আঘাত করে আহত করে রাহুল। এরপর থেকে রাহুলের পিছু নেয় পুলিশ। রাহুল যেখানেই যায়, সেখানেই পুলিশ তাকে তাড়া করে। পরিস্থিতি এমন হয় যে, বাড়ি, কর্মস্থল, রাস্তাঘাট সবখানে পুলিশ শুধু রাহুলকেই খুঁজতে থাকে। তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়, রাহুল, এলিও ও লীলা যখন সীমান্তে টিউবের ভেলা তৈরি করে এবং কিউবা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্র পাড়ি দেওয়ার জন্য রওনা হয়; তখন কোনো কিউবান সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যকে চোখে পড়ে না! যদিও কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র চিরবৈরী সম্পর্ক।

ঘ. সুখ সে তো খাঁচায় বন্দি!

সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষের চাহিদার জন্ম। সময় যতো গড়ায় পরিশ্রম ও সাধনার মধ্য দিয়ে মানুষ জীবনকে সহজ করে, একই সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে তার চাহিদা। মূলত যখন মানুষ সামষ্টিক চিন্তা বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত সুখের কথা ভাবতে শুরু করে, তখন তার মধ্যে অসীম চাহিদার সৃষ্টি হয়; স্বাভাবিকভাবেই সে তুলনায় সম্পদ হয়ে পড়ে সীমিত। এই সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম চাহিদা মেটানোর জন্য মানুষ প্রতিযোগিতা শুরু করে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষাসহ বিভিন্ন কারণেই বিভিন্ন সমাজ, স্তরের লোকের চাহিদা ভিন্ন হয়ে থাকে। অর্থ থাকলেই জনগণ ইচ্ছে মতো চাহিদা পূরণ করতে পারে না, এর জন্য ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয়তা থাকা আবশ্যক¾এ নিয়ম পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় না মানা হলেও, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তা কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পেশা অনুসারে ব্যক্তির চাহিদা মেটানো হয়, এর বাইরে অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ইউনা নোছে’তে যে সমাজতান্ত্রিক কিউবাকে দেখানো হয়, সেখানে জনগণের চাহিদা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের জনগণের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

চিকিৎসকরা তাদের অতিরিক্ত চাহিদা মেটানোর জন্য সেখানে রোগীর কাছ থেকে ঘুষ নেয়। সেখানে চোরাই ওষুধ, মোবাইলফোন সেট বিক্রেতাদের দেখা যায়, যারা বেশ দাপটের সঙ্গেই এটা করছে। আবার যাদের এ ধরনের কাজের সুযোগ নেই¾যেমন, রাহুল, এলিও, রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি¾তাদেরকে কিউবা ছেড়ে অন্য দেশে চলে যেতে দেখা যায়।

চলচ্চিত্রের আট মিনিট পাঁচ সেকেন্ডে রাস্তার ধার দিয়ে ব্যাগ হাতে এক বৃদ্ধা হেঁটে যাওয়ার সময় ভয়েসওভারে ভেসে আসে লীলার কণ্ঠ, ‘তুমি হাভানায় যা চাও, তাই পাবে। কিন্তু দোকানগুলোতে কোনো পণ্য-সামগ্রী নেই, কোথায় এসব পাওয়া যাবে, সেটা সবার জানা। এখানে টাকায় সবকিছুই মেলে।’ চলচ্চিত্রজুড়ে যে হাভানা তুলে ধরা হয়, সেখানে প্রত্যেকেরই প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাহিদা আছে এবং সেই চাহিদা মেটানোয় তারা নিজ নিজ পথ বেছে নিয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি সাধারণত পুঁজি প্রাধান্যশীল রাষ্ট্রেই দেখা যায়।

ঙ. এ যেনো ‘পতিতা’র দেশ!

প্রত্যেক ব্যক্তি সাধারণত তার শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পেশায় কাজ করে। তবে সমাজে এমন পেশাও আছে, যা নিয়ে বিতর্ক আছে। প্রশ্ন আছে, সেই পেশার নৈতিক অবস্থান নিয়েও। তেমনই এক বিতর্কিত পেশার নাম পতিতাবৃত্তি। তবে এ পেশা নিয়ে যতো কথাই চালু থাকুক না কেনো, এটি পৃথিবীর আদিমতম পেশাগুলোর একটি। যদিও দরিদ্রতা এ পেশায় সম্পৃক্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। তারপরও সারা দুনিয়ায় এ পেশা ছড়িয়েছে নানা কারণে। তৃতীয় বিশ্বের দেশে এ পেশায় যারা আসে, তারা শুধুই মৌলিক চাহিদা পূরণে এতে সম্পৃক্ত হয়েছে এমন নয়, এর বাইরে সামাজিক নানা সঙ্কট, বিশেষ করে নারী পাচার, ধর্ষণ, এসব কারণেও অনেকে বাধ্য হয়েছে এই পেশায় আসতে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, যে রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের মৌলিক প্রয়োজন নিয়ে ভাবতে হয় না, সেখানে পতিতাবৃত্তি থাকবে কি না? মূলত যে রাষ্ট্রে জনগণের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা থাকে, সেখানেও ব্যক্তি স্বেচ্ছায় পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করতে পারে; সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও তা দেখা যায়।

তবে ইউনা নোছে’তে কিউবায় পতিতাবৃত্তি যেভাবে উঠে এসেছে, তা নিয়ে চিন্তার অবকাশ আছে। চলচ্চিত্রের ২০ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে রাহুল অসুস্থ মাকে রেখে বাইরে যায়, তখন তার মা সেজেগুজে খদ্দেরের খোঁজে বের হন এবং তার পরেই দেখা যায় তিনি কয়েক জন যৌনকর্মীর সঙ্গে খদ্দেরের আশায় দাঁড়িয়ে আছেন। পরিস্থিতি এমন যে, অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও রাহুলের মাকে খদ্দেরের আশায় বের হতে হয়। অন্যদিকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজে খদ্দের হয়ে একজনের বাড়ি যায় রাহুল। সেখান থেকে বের হয়ে মায়ের ওষুধ নিয়ে যখন রাহুল বাড়ি ফেরে, তখন এসে দেখে এক বিদেশি খদ্দের তার মায়ের ঘরে।

চলচ্চিত্রের ১২ মিনিট পাঁচ সেকেন্ডে এলিওর বাবা ওর মায়ের সঙ্গে রাগারাগি করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুটা পথ হেঁটে গিয়ে, খদ্দের হয়ে এক নারীর বাড়িতে ঢোকেন। আবার চলচ্চিত্রের ৩৪ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে রাহুলকে পতিতালয়ে দেখা যায়। সেখানে কয়েক জন যৌনকর্মীকে খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এছাড়াও আট মিনিট ৪০ সেকেন্ডে এবং ৫৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে এক বাড়িতে খদ্দের হয়ে যায় রাহুল ও অন্য এক ব্যক্তি। এভাবে চলচ্চিত্রজুড়ে যে কয়েকটি বাড়ি দেখানো হয়, তার মধ্যে দুটি বাড়ি ছাড়া সব বাড়িতে খদ্দেরের আনাগোনা চোখে পড়ে। হঠাৎ মনে হতে পারে, কিউবার নারীরা বাড়িতে বাড়িতে পতিতালয় খুলে বসেছে!      

প্রসঙ্গ ভাইভা কিউবা

ক. চিকিৎসা ও শিক্ষার দেশ কিউবা

ভাইভা কিউবা’র ৪৭ মিনিটে দেখা যায়, মালুর বাবার খোঁজে মালু ও জারগিটো রেল, বাস ও স্টিমার হয়ে শেষ পর্যন্ত জঙ্গল দিয়ে হাঁটতে থাকে। সেখানেই রাত হলে তারা থেকে যায়। রাতে বৃষ্টি হলে তাতে ভিজে অসুস্থ হয়ে পড়ে জারগিটো। তারপরও সকালে উঠে তারা বাসে করে গন্তব্যে রওনা দেয়। বাসে জারগিটো জ্বরে কাঁপতে থাকে। তা দেখে বাসে থাকা যাত্রীরা জারগিটোকে চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যায়, যদিও প্রথম দিকে মালু ও জারগিটোর কেউই যেতে রাজি হচ্ছিলো না। তারা আশঙ্কা করে, চিকিৎসা কেন্দ্রে গেলে তারা যে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে, তা সবাই জেনে যাবে। শেষ পর্যন্ত তারা চিকিৎসা কেন্দ্রে যায়। জারগিটোকে দেখে চিকিৎসক বলেন, সমস্যা গুরুতর নয়, জ্বর হয়েছে মাত্র। একপর্যায়ে জারগিটোকে ইনজেকশন দিতে গেলে তারা দুজন ভয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় তাদের পিছনে চিকিৎসককেও দৌড়াতে দেখা যায়। যদিও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক তাদের ধরতে পারে না।

কিছুদূর পালিয়ে এসে মালু তার ব্যাগে থাকা পোশাক পরিয়ে জারগিটোকে মেয়ে সাজিয়ে এক স্কুল বাসে ওঠে। যেহেতু কিউবাজুড়ে স্কুল শিক্ষার্থীরা একই পোশাক পরে, তাই তাদের বাসে উঠতে কোনো সমস্যা হয় না। বাস কিছু দূর গেলে দেখা যায়, চিকিৎসক পুলিশের সঙ্গে জারগিটোর ব্যাপারে কথা বলছে। মূলত অসুস্থ শিশু চিকিৎসা না নিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় চিকিৎসকরা তাদের উদ্বেগের জায়গা থেকে পুলিশের কাছে সাহায্য চায়।

চিকিৎসার মতো আরেকটি মৌলিক চাহিদা শিক্ষা। ভাইভা কিউবা’তে সবার জন্য শিক্ষা বিষয়টি লক্ষ করা যায়। চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র মালু ও জারগিটো পড়ে রাজধানী হাভানার এক স্কুলে। সেখানে পড়ালেখা ছাড়াও দেশপ্রেম, খেলাধুলা, বিনোদনসহ নানা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়।

খ. যা পাই ভুল করে পাই, যা চাই তা পাই না

মালুর নানি মারা যাওয়ার পর তাদের পরিবারের সদস্য দাঁড়ায় দুজনে¾মালু ও তার মা। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিন জনকে নিয়ে মালুর মায়ের সংসার ভালোই চলছিলো। এই সময়ে অবশ্য তিনি অন্যান্য কাজের পাশাপাশি¾মালুর খাওয়াদাওয়া, স্কুল, মায়ের সেবা ছাড়াও¾এক ব্যক্তির সঙ্গেও নিয়মিত ফোনে কথা বলতেন। কথাবার্তায় বোঝা যায়, প্রবাসী সেই ব্যক্তির সঙ্গে মালুর মায়ের ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে নানি মারা যাওয়ার পর মালুর মা সিদ্ধান্ত নেন, মেয়েকে নিয়ে তিনি দেশ ছেড়ে প্রেমিকের কাছে যাবেন। যদিও এখানে তাদের কোনো প্রকার সমস্যা হচ্ছিলো না।

দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া নিয়ে অবশ্য মালুর মায়ের মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায় না। এতোদিনের চেনাজানা পরিবেশ, কাছের মানুষদের নিয়ে কোনো চিন্তা, ভালোবাসা কিংবা দেশপ্রেম তার মধ্যে লক্ষ করা যায় না। তিনি কেবল ভাবতে থাকেন, যতো তাড়াতাড়ি কিউবা ছাড়া যায় ততোই মঙ্গল। তাই তিনি নিয়ম অনুযায়ী মালুকে নেওয়ার অনুমতির জন্য মালুর বাবার কাছে চিঠি পাঠান; বাবা সম্মতি দিলেই মালুকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বিদেশে যাবেন।

কিন্তু এ ব্যাপারে মালুর অবস্থান মায়ের একদম বিপরীত। এই চেনা মানুষ, চারপাশটা, দেশ, সমাজটা কোনোভাবেই সে ছাড়তে চায় না। তাই মা যখন এই দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেন, নানা সুবিধার কথা বলেন; তখন সে আনমনা হয়ে বসে থাকে। নানির ছবি নিয়ে একা একা কান্না করে। দেশ ছাড়ার ব্যাপারে মালুর অনীহা এমন পর্যায়ে যায় যে, খেলার সঙ্গী জারগিটোকে নিয়ে সে অজানা পথে বের হয় বাবার খোঁজে; বাবাকে যদি কোনোভাবে অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর না করার জন্য রাজি করাতে পারে, তাহলে তাকে আর মায়ের সঙ্গে বিদেশ যেতে হবে না। তাই সে মাঠঘাট, নদী, বন-জঙ্গল, নানা প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে বাবার কাছে পৌঁছায়। যা মালু ও তার মায়ের মধ্য দিয়ে দুই প্রজন্মের দুই মানুষের বেড়ে ওঠা, পরিবেশ-পরিস্থিতি, চাহিদা, সবকিছুর ভিন্নতা তুলে ধরে।

গ. জনগণের বন্ধু তুমি

আগেই কথা হয়েছে, পুলিশের জন্ম নিয়ে। সাধারণত রাষ্ট্রের চুরি, ডাকাতি, চোরাচালান, অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা মোকাবিলার জন্য পুলিশকে কাজ করতে দেখা যায়। জনগণকে সেবা দেওয়ার কথা বললেও, সেভাবে তা চোখে পড়ে না। কখনো কখনো হয়তো উল্টো চিত্রও পাওয়া যায়। ভাইভা কিউবা’¾মালু আর জারগিটো যখন মালুর বাবার খোঁজে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়, তখন চলচ্চিত্রের ৩১ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে এক উদ্বিগ্ন পুলিশ তাদের বাড়িতে যায়। দুই পরিবারের লোকের সঙ্গে কথা বলে এবং বাচ্চাদের খোঁজার চেষ্টা করে। সেই রাতে মালু ও জারগিটো ট্রেনে, ট্র্যাক্সিতে করে অনেকটা পথ পেরিয়ে রাতে ঘুমায় সমুদ্রের ধারে এক নৌকায়। সকালে উঠে জারগিটো তার ব্যাগ নৌকাতে রেখেই চলে যায়। পরে সেই ব্যাগ পায় টহলরত পুলিশ এবং তারা ব্যাগের তথ্য দেয় থানায়।

এছাড়াও চলচ্চিত্রের ৫১ মিনিট ৫০ সেকেন্ড ও এক ঘণ্টা নয় মিনিটে যে পুলিশ দেখা যায়, তারা ভালোভাবেই দায়িত্ব পালন করছে। যা সাধারণত কম রাষ্ট্রেই দেখা যায়। মালু আর জারগিটোকে খোঁজার জন্য যে পুলিশ তাদের বাড়িতে যেতো, তিনি মালুদের খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত দুই পরিবারের লোকের মতো সারাক্ষণ বাচ্চাদের খোঁজার চেষ্টা করেন। চলচ্চিত্রজুড়ে পুলিশের যে রিপ্রেজেন্টেশন, তা দেখে পুলিশকে জনগণের বন্ধু ছাড়া অন্যকিছু ভাবার সুযোগ নেই।

দেখার যতো উপায়

কিউবার অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে নির্মিত ইউনা নোছেভাইভা কিউবা’র রিপ্রেজেন্টেশন দেখা হলো। দুটি চলচ্চিত্রেই কিউবার অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও সমাধান যেভাবে দেখানো হয়, সেটা নিয়ে ভাববার জায়গা আছে। ইউনা নোছে’র নির্মাতা লুসি মুললয় যে কিউবা তুলে ধরছেন, সেখানে পদে পদে যা দেখানো হয়, তা দেখে মনে হয় এ দেশে বসবাস প্রায় অসম্ভব! চলচ্চিত্রজুড়ে কেবল কিউবার নেতিবাচক নানা দিক! এখন প্রশ্ন, আসলেই কি কিউবা এতো সমস্যার মধ্য দিয়ে চলছে? যদি চলেও, তাহলে এর পিছনে কী কী কারণ আছে? চলচ্চিত্র ইউনা নোছে, ভাইভা কিউবা এবং কিউবাকে এবার একটু ভিন্নভাবে পাঠ করা যাক। 

ক. ‘আপন পাপের বাট্খারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি’

ভাইভা কিউবা’তে জারগিটো যখন অসুস্থ হয়, চিকিৎসকরা তখন রীতিমতো জোর করে তার চিকিৎসা শুরু করে। কিন্তু জারগিটো ভয়ে চিকিৎসা না নিয়ে পালিয়ে যায়। চিকিৎসকরা তার পিছু পিছু দৌড়াতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে না পেয়ে পুলিশের শরণাপন্ন হয়। ভাইভা কিউবাতে কিউবার যে চিকিৎসাব্যবস্থা দেখানো হয়, তার উল্টো নজির দেখা যায় ইউনা নোছে’তে¾রাহুলের মায়ের জন্য এলিও চিকিৎসা কেন্দ্রে ওষুধ নিতে গেলে, জরুরি ওষুধ তো পায়ই না, যা পায়, তাও নিতে হয় ঘুষ দিয়ে। শেষ পর্যন্ত রাহুলকে টিকা কিনতে হয় চোরাকারবারির কাছ থেকে। এছাড়া রাহুলের মাকে অসুস্থতা সত্ত্বেও খদ্দেরের খোঁজে বের হতে হয় জীবিকার তাগিদে। তবে বাস্তবের কিউবার অবস্থা একেবারে ভিন্ন কথা বলে। জনগণের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে যে বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হয় এখানে, তার প্রথম ভাগে আছে চিকিৎসা। একই সারিতে আরো আছে প্রতিবন্ধীদের সবধরনের সুযোগ নিশ্চিত করা, শিশুদের শিক্ষা, প্রয়োজনীয় খাবার, বস্ত্র, ও নারী-পুরুষের কাজের সমতা আনয়ন। কিউবার নাগরিকের সবধরনের চিকিৎসার ভার রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত। এখানে

পাড়ায় পাড়ায় চিকিৎসা তাই খুব ঘরোয়া বিষয়। কোন জাঁকজমক নেই, বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপনের তো প্রশ্ন নেই, বাইরে থেকে সেভাবে বোঝাও যায় না কিন্তু ভেতরে বিশ্বের সর্বোচ্চ সুবিধা। কোন অর্থের কথা না ভেবেই প্রতিটি মানুষ সেখানে যেতে পারে। ফিদেল কাস্ট্রো, মন্ত্রী, শ্রমিক আর ঝাড়ুদার একই অবস্থা। নিজের, সন্তানের কিংবা মা বাবা স্বজনদের বর্তমান বা ভবিষ্যৎ নিয়ে বা তার চিকিৎসা নিয়ে কোন উদ্বেগের বা নিরাপত্তাহীনতার বোধ কিউবায় অকল্পনীয়।’

অথচ ইউনা নোছে’জুড়ে এ ধরনের কোনো ইঙ্গিত তো নেই-ই, উল্টো দেখা মেলে দুর্নীতিতে ভরা এক চিকিৎসা ব্যবস্থা। এতো নেতিবাচক চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে মলিন হয়ে যায় কিউবাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর রোগ-জীবাণু ছড়ানোর ‘বীরত্ব গাঁথা’ কাহিনি। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে কিউবাতে ডেঙ্গু জ্বরের যে মহামারী দেখা দেয়, তার পিছনে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেরই হাত আছে।  

এদিকে রাহুলের মায়ের এইচ আই ভি’তে আক্রান্ত ও তার কারণ হিসেবে দেখানো হয় বিদেশি খদ্দেরদের সঙ্গে মেলামেশা। অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে রাহুলের মা যৌনকর্মীর পেশা বেছে নেন। এছাড়া চলচ্চিত্রজুড়ে বিভিন্ন বাড়িতে এবং পতিতালয়ে নারীদের খদ্দেরের অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। হঠাৎ করে মনে হয় এ যেনো যৌনকর্মীর শহর। অবশ্য এর সঙ্গে মিল পাওয়া যায় বিপ্লবপূর্ব কিউবার, যেখানে ৮৫ লাখ জনসংখ্যার দেশে ছিলো ১০ হাজার পতিতালয়, যাতে যুক্ত ছিলো ১০ লাখ যৌনকর্মী। কিন্তু বিপ্লবী সরকার ক্ষমতায় এসে জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে এসব পতিতালয় তুলে দেয় এবং এরপর থেকে কিউবার কোথাও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পতিতালয়ের দেখা মেলে না। তবে নির্মাতা লুসি ইউনা নোছে’তে হাভানার যে চিত্র তুলে আনেন, তার সঙ্গে প্রায় ছয় দশক আগের কিউবার কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না। লুসির চোখে তাহলে কি এতোদিনে কিউবার কোনো পরিবর্তনই হয়নি! লুসি তাহলে কোন বাস্তবতা ইউনা নোছে’তে তুলে ধরলেন, আর এর উদ্দেশ্যইবা কী?

খ. সুখ তো উপলব্ধির বস্তু, অর্জনের নয়!

ইউনা নোছে’তে রাহুল দেশ ছেড়ে স্বপ্নের দেশে এবং ভাইভা কিউবাতে মালুর মা বিদেশে ভালোবাসার মানুষের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু তারা একা নয়, রাহুল সঙ্গে নেয় বন্ধু এলিওকে এবং মালুর মা মালুকে। এলিও ও মালু কেউওই এদেশ ছাড়তে চায়নি। তারা ভালোবেসে থাকতে চেয়েছে এ দেশে। কিন্তু এরা দুজনেই মায়ার বন্ধনে আটকা, এলিও বন্ধুত্বের এবং মালু মাতৃত্বের। এই মায়ার বন্ধনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রিয়জনের সঙ্গে দেশ ছাড়তে রাজি হয় তারা।

এলিও সবকিছু ছেড়ে রাহুলের সঙ্গে যেতে রাজি হলেও মালু কিন্তু তা করে না। সে মাকে সরাসরি কিছু বলে না ঠিকই, কিন্তু তার সাধ্যের বাইরে গিয়ে বাবার ঠিকানায় রওনা দেয়; তাকে বুঝিয়ে দেশে থাকতে চায়। তবে এলিও খুব সহজেই দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নেয়। এমনকি সে চলে গেলে তার বাবা, মা, বোন কষ্ট পেতে পারে, এ ধরনের কোনো চিন্তার ছাপ তার মধ্যে পাওয়া যায় না। অবশ্য তার দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পিছনে বন্ধুত্ব-ভালোবাসা ছাড়া অন্য কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। হাভানায় এলিওর কোনো সমস্যা নেই বরং ভালোই চলছিলো সব। তার বাড়ি ছেড়ে যাওয়া দেখে বোন লীলা পিছু নেয়। শেষ পর্যন্ত এলিও ও লীলা পর্যায়ক্রমে বন্ধু ও ভাইয়ের ভালোবাসার টানে দেশ ছাড়তে দ্বিধা করে না।

এদেশে সুখ নেই, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নেই, এই রাগ-ক্ষোভে রাহুল দেশ ছেড়ে স্বপ্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রওনা দেয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। তার ইচ্ছা একটাই ভোগ-বিলাসী জীবন যাপন। যে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য রাহুলের এতো আকাঙ্ক্ষা, আসলে কি যুক্তরাষ্ট্রে স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়? এটা দেখার জন্য একটু পিছন ফিরে দেখা যাক। ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে দরিদ্র মানুষের সুরক্ষার প্রশ্ন সামনে এনেছিলেন আমেরিকান সমাজ সংস্কারক মার্টিন লুথার কিং। অহিংস আন্দোলনকে অনুপ্রেরণায় নিয়ে তিনি অর্থনৈতিক সমতার ডাক দেন। মার্টিনের সেই আন্দোলনের ৫০ বছর পরে এসেও যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারিত দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করছে চার কোটি ১০ লাখ মানুষ। আর নিম্ন আয় অথবা দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে ১৪ কোটি মানুষ, যারা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি (৪৩.৫ শতাংশ)। প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে চার জনকে অন্তত এক বছর দরিদ্রতার মধ্যে কাটাতে হয়। প্রতিবছর আড়াই লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কারণে মারা যায়। অর্থনৈতিক এ অবস্থা কিন্তু রাহুলদের অজানা, তারা শুধু ভাবতে থাকে সমুদ্র পার হলেই স্বর্গ; আর কোনো দুঃখ থাকবে না। তারা এও জানে না, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে স্বপ্নের পৃথিবীতে রওনা দিয়েছে, সেখানে গরিবের আয় প্রতিনিয়তই কমছে আর বাড়ছে ধনীদের। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধনী-গরিবের ব্যবধানও।

তবে মার্কিন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পেরেছিলো লীলা। তাই হয়তো এক ঘণ্টা আট মিনিট ৩০ সেকেন্ডে রাহুলের উচ্চাভিলাষী কথা শুনে লীলাকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমরা তো কেউ ইংরেজি জানো না। এখানে ছিলে বাবুর্চি, ওখানে গিয়ে কী করবে! এখানে অসুস্থ হলে অন্তত বিনা পয়সায় চিকিৎসা পাওয়া যায়, ওখানে তো সেটাও পাওয়া যাবে না।’ তবে মালুর এতোসব ভাবনা নেই; তার চাওয়া একটাই, যেকোনো উপায়ে তাকে কিউবাতে থাকতে হবে।  

গ. তুমি বন্ধু না শত্রু!

ইউনা নোছে’তে দেখা যায়, হাভানার সর্বত্রই পুলিশ ঘোরাফেরা করছে। রাস্তাঘাট, অফিস, রেস্টুরেন্ট এমনকি রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশ চোখে পড়ে। দেখে মনে হয়, কেউ অপরাধ করলে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে তার পিছু নেয়। রাহুল যখন তার মায়ের বিদেশি খদ্দেরের চোখে আঘাত করে, তারপর থেকে তার পিছু নেয় পুলিশ। রাহুল যেখানে যান, সেখানেই পুলিশ। যদিও রাহুল আগে থেকেই মায়ামি যাওয়ার জন্য এলিওকে বলে রেখেছিলো; কিন্তু পুলিশের তাড়া খেয়ে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে তারা সিদ্ধান্ত নেয়। পুলিশ ভীতি একপর্যায়ে এতোটা প্রবল হয়, মাঝ-সমুদ্রে গিয়ে এলিও তার ভুল বুঝতে পারলেও দেশে ফেরার আর সাহস পায় না; ফিরলে যদি দেশত্যাগের অপরাধে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তাই পুলিশ ভীতি নিয়ে রাহুলের সঙ্গে অনিশ্চিত জীবনের দিকেই পা বাড়ায় এলিও ও লীলা। তবে একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, চলচ্চিত্রজুড়ে দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সর্বত্র পুলিশ প্রশাসন থাকলেও কিউবা সীমান্তে কোনো সীমান্তরক্ষী বাহিনী চোখে পড়ে না। যদিও কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত বিশ্বের আলোচিত সীমান্তগুলোর একটি। কিন্তু চলচ্চিত্রজুড়ে এ ধরনের কোনো ইঙ্গিতও নেই। তাহলে কি নির্মাতা সচেতনভাবে এ বিষয়টি এড়িয়ে শুধু কিউবার অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো ঘুরেফিরে তুলে ধরেন!

শেষ করার আগে

রাষ্ট্র হিসেবে কিউবা অনেক বেশি ‘বিতর্কিত’। যদিও কিউবা নিজে নিজে বিতর্কিত নয় বরং তাকে বিভিন্নভাবে বিতর্কিত করে তোলা হয়। যেটা সাধারণত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে করা হয়। প্রান্তিক বলছি এ অর্থে, বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বের অধিকাংশ দেশে যে রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু আছে, তার সম্পূর্ণ বিপরীতে কিউবার অবস্থান। প্রান্তিক রাষ্ট্রের কোনো বিষয়কে অন্যদের ভালো চোখে দেখার নজির নেই, অবশ্য এর বাইরে যেতে পারেননি ইউনা নোছে’র নির্মাতা লুসি মুললয়। তাই চলচ্চিত্রজুড়ে তুলে আনেন কিউবার হাজারো সমস্যা। আর সেই সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব ঘুরেফিরে নেয় নিজেরাই, অর্থাৎ খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এখানে কৌশলে লুসি এমন এক শ্রেণির সমস্যা তুলে আনেন, যারা কিউবার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। যাদের দেশের হাল ধরার কথা; তাদের তিনি দেখিয়েছেন বিপদগামী, পথভ্রষ্ট, উচ্চাভিলাষী, স্বার্থপর হিসেবে। আর সব সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবে দেখানো হয়েছে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে গমন।

তবে ভাইভা কিউবা’র নির্মাতা ক্রিমাটা মালবার্তি হাল ছাড়েননি; আশা নিয়ে স্বপ্নের পথে চলেছেন। ক্রিমাটা মালবার্তি চলচ্চিত্রে মালুর মায়ের দেশ ছাড়ার স্বপ্ন দেখান ঠিকই, কিন্তু কোন সেই দেশ, তা নির্দিষ্ট করেন না। অবশ্য দেশ ছাড়ার কারণ হিসেবে দেখান ভালোবাসার সম্পর্ককে। সেখানে কিউবার অভ্যন্তরীণ অন্য কোনো সমস্যা যুক্ত নেই।

 

লেখক : হিরু মোহাম্মদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।

hirumohammad.ru301@gmail.com

https://www.facebook.com/Hirumohammad.ru

 

তথ্যসূত্র

১. আনু মুহাম্মদ (২০১১ : ৮১); ‘একঘরে যুক্তরাষ্ট্র : অক্ষম হিংস্রতা’; বিপ্লবের স্বপ্নভূমি কিউবা; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।

২. প্রাগুক্ত; আনু (২০১১ : ৯৬)।

৩. প্রাগুক্ত; আনু (২০১১ : ৯৪)।

৪. প্রাগুক্ত; আনু (২০১১ : ১৬৭)।

৫. https://goo.gl/KTLkjy; retrieved on 01.09.2018

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন