শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
পাকিস্তান চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি
নারীর হাত ধরে রাষ্ট্র দর্শনের ইতিহাস
শফিকুল ইসলাম

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি
শিল্পে রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি
কোনো জাতি বা রাষ্ট্রের চরিত্র প্রতিফলিত হয় তার শিল্প-সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে। এসবের মাধ্যমেই উঠে আসে কোনো রাষ্ট্রের মানুষের জীবনাচরণ, রাজনীতিসহ আরো নানা দিক। তাই এই শিল্প নিয়েই বিশ্বব্যাপী চলে যতো রাজনীতি, নিয়ন্ত্রণ, নেমে আসে এর ওপর খড়গ। আর এতে করে শিল্পমাধ্যমে উঠে আসে ক্ষমতাবান বা রাষ্ট্রীয় অনুশাসনের সুর। অবশ্য সেই নিয়ন্ত্রণ বা অনুশাসনের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া শিল্প-পণ্য আসলে কোনো না কোনোভাবে সেই রাষ্ট্রেরই চরিত্র বহন করে। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রের নানা সঙ্কট এবং তা থেকে উত্তরণের কথাও বলে দেয় শিল্প। শিল্পের অনেকগুলো মাধ্যমের একটি চলচ্চিত্র। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, চলচ্চিত্রকে নানা সময়ে নানা কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো এর মাধ্যমে দেশের মানুষের বিরুদ্ধে খোদ রাষ্ট্র বা অন্য কোনো রাষ্ট্র কথা বলেছে, আবার এটা কখনো জাগিয়েছে জনগণকেই। ফলে এর প্রভাব কতোটা শক্তিশালী, তা স্পষ্ট। এই প্রবন্ধে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র ইতিহাস তাদের বিভিন্ন সময়ের চলচ্চিত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। সঙ্গে রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের বেড়ে ওঠা, বিশ্ব রাজনীতিতে তার অবস্থান, টানাপড়েন তো আছেই।
শুরুর ধাক্কা সামলে ওঠা
পাকিস্তানে চলচ্চিত্রের বার্তা এশিয়ার অন্যান্য দেশের সমান্তরালে সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে পৌঁছে। সেখানে তখন থেকেই নানাভাবে চলচ্চিত্র প্রদর্শন হতো। তবে সেখানে স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হয় ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে। সেই সময় লাহোরে ‘রয়াল থিয়েটার’ নামে একটি প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ‘কলন্দর’ নামে একটি চলচ্চিত্র পত্রিকাও বের হয়।১ তবে প্রদর্শিত এসব চলচ্চিত্রের কোনোটাই পাকিস্তানে নির্মাণ হতো না। অবশ্য নিজেদের চলচ্চিত্রের জন্য খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি তাদের। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে জি কে মেহতা নির্মাণ করেন দ্য ডটার অব টুডে নামে প্রথম নির্বাক কাহিনিচিত্র।২ এরপর চলচ্চিত্রশিল্পে আসেন আব্দুর রশিদ কাদের নামে এক ব্যক্তি, যার হাত ধরে দেশটির চলচ্চিত্র এগিয়েছে অনেক দূর। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনিই পাকিস্তানের প্রথম চলচ্চিত্র স্টুডিও ‘ইউনাইটেড প্লেয়ারস করপোরেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই স্টুডিওতেই পরের বছর নির্মিত হয় হুসনে কা ডাকু। পরে অবশ্য এই নির্মাতাই হীরা রঞ্জা (১৯৩২) নামে পাকিস্তানের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।৩ এরপর ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে অনেকের। নির্মিত হতে থাকে সারফারোস (১৯৩১), কিসমাত কে হের ফের (১৯৩২), খাজাঞ্জি (১৯৪১), খান্দানসহ (১৯৪২) আরো বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র। তবে পাকিস্তানে নির্মিত হলেও এগুলো পাকিস্তানি চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। কারণ, এগুলো ছিলো অবিভক্ত ভারতের চলচ্চিত্র।
১৯৪৭-এ ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান-ভারত ভাগ হয়। ফলে চলচ্চিত্র কলাকুশলীরা কেউ ভারতে, কেউ পাকিস্তানে আসতে বাধ্য হয়। দেশভাগের পর দাউদ চান্দ নির্মাণ করেন পাকিস্তানের প্রথম চলচ্চিত্র তেরি ইয়াদ (১৯৪৮)। এরপর স্বাধীন দেশে নির্মিত হয় দো আনসু (১৯৫০), চানওয়ে (১৯৫১), সাসছি (১৯৫৪), ওমর মারভি (১৯৫৬), জাগো হুয়া সাভেরা’র (১৯৫৮) মতো চলচ্চিত্র।
এদিকে সদ্য স্বাধীন হওয়া পাকিস্তানের ছিলো দুটি অংশ¾পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। যদিও পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র এই আলোচনার বিষয় নয়। তবে দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক কিছুই নতুন করে শুরু করতে হয়েছিলো। কারণ আগেই বলেছি, যৌথতা ভেঙে যায়। সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হয় কলাকুশলীদের নিয়ে। তার পরও পাকিস্তান শুরু করে তেরি ইয়াদ দিয়ে। বর্তমানে তেরি ইয়াদ-এর কোনো প্রিন্ট না পাওয়া গেলেও এর দু’বছর পর নির্মিত দো আনসু (১৯৫০)-এর একটা প্রিন্ট পাওয়া যায় ইন্টারনেটে। এই চলচ্চিত্রটি ধরেই পাকিস্তানের প্রথমদিকের চলচ্চিত্রের হালহকিকত জানার চেষ্টা করা যাক।
দো আনসুর গল্প এবং
পাকিস্তানের প্রথমদিকের চলচ্চিত্রগুলোর বেশিরভাগই ছিলো পরিবারকেন্দ্রিক, প্রেম-ভালোবাসা আর প্রাক-বিবাহকেন্দ্রিক সমস্যা নিয়ে। সেই সব চলচ্চিত্রে সামাজিক কোনো অসঙ্গতি কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো ধারণা তেমন ছিলো না বললেই চলে। প্রথমদিকের চলচ্চিত্র দো আনসুতেও তার ব্যত্যয় লক্ষ করা যায়নি।
চলচ্চিত্রটির কাহিনি এগোয় নবাব (হিমালয়াওয়ালা) চরিত্রকে ঘিরে। তার স্ত্রী ও মেয়ে নূরী (সাবিহা খানম) থাকা সত্ত্বেও তিনি দিনরাত যৌনপল্লীতে পড়ে থাকেন। সেখানে এক যৌনকর্মীর সঙ্গে সম্পর্কের বদৌলতে জন্ম হয় শাহনাজ (গুলশান আরা) নামে এক মেয়ে সন্তানের। নবাব চান না তার মেয়ে যৌনপল্লীতে বড়ো হোক। আগের স্ত্রী ও মেয়ে নূরীর কথা না ভেবেই ঘরবাড়িসহ সব বন্ধক রেখে যৌনপল্লী থেকে শাহনাজকে আনতে যান তিনি। কিন্তু শাহনাজকে নিয়ে আসার দিন যৌনপল্লীর মালিকের সঙ্গে নবাবের প্রথমে বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তার গুলিতে মালিক নিহত হন। নবাবের ১৪ বছরের কারাদণ্ড হয়। এদিকে নূরী ও তার মা সব হারিয়ে এক জমিদার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখানে জমিদারের ছেলে আসলামের (সন্তোষ কুমার) সঙ্গে বড়ো হন নূরী। তাদের বিয়েও ঠিক হয়। এরই মধ্যে শহরের কলেজে পড়তে যান আসলাম। শহরে গিয়ে যৌনপল্লীতে থাকা নবাবের আরেক মেয়ে শাহনাজের সঙ্গে আসলামের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নূরী-শাহনাজের বাবা নবাব ততোদিনে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছেন। নবাব ছাড়া পেয়ে প্রথমেই মেয়ের খোঁজে যান যৌনপল্লীতে। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন আসলাম নামে ছেলেকে শাহনাজ বিয়ে করতে চান। কিন্তু তার মা কিছুতেই এতে রাজি নন। এই পরিস্থিতিতে সব দেখেশুনে নবাব শেষ পর্যন্ত আসলামের সঙ্গে শাহনাজের বিয়ে দেন। এদিকে অনেক দিন আসলামের কোনো খোঁজ না পেয়ে নূরী শহরের পথে রওনা হন। কিন্তু শহরে আসার পথেই মা-মেয়ে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়। বিয়ে করে গ্রামে ফেরার পর আসলাম ও নবাব এই খবর জানতে পারে।
পরিবারকেন্দ্রিক ট্র্যাজেডি নিয়ে নির্মিত প্রথম কোনো চলচ্চিত্র হিসেবে দো আনসু পাকিস্তানের প্রেক্ষাগৃহে একনাগাড়ে ২৫ সপ্তাহ চলেছিলো। তবে এই চলচ্চিত্রে এক অর্থে তিন জন ভারতীয় অভিনয়শিল্পী ছিলো। যদিও তারা দেশভাগের পর পাকিস্তানে পাড়ি জমায়। এরা হলেন শাহনেওয়াজ, শামিম, হিমালয়াওয়ালা। চলচ্চিত্রটির পোস্টারে এই তিন জনের নাম ও ছবি ব্যবহার করা হলেও পাকিস্তানের নবাগত সন্তোষ কুমার, আলাউদ্দিন, গুলশান আরা, সাবিহা খানম প্রমুখের ছবি ব্যবহার করা হয়নি।৪ কারণ হিসেবে জানা যায়, এরা ছিলো একেবারেই নতুন। বিপরীতে ভারত-ফেরত অভিনয়শিল্পীরা ছিলো তুমুল জনপ্রিয়। চলচ্চিত্রটি ব্যবসাসফল করার জন্যই হয়তো নির্মাতা আনোয়ার কামাল পাশা ও মুর্তজা জিলানি এই কৌশল নিয়েছিলো।
যাক সে কথা, দো আনসু ব্যবসায়িকভাবে সফল হলেও নির্মাণে খুব বেশি দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি নির্মাতা। একটা বিষয় খুব চোখে লেগেছে। হত্যার দায়ে নবাবের যখন ১৪ বছরের কারাদণ্ড হয়, তখন নূরী ও শাহনাজের বয়স এক বছরও হয়নি। অথচ নবাব ফিরে আসার পর নূরী ও শাহনাজকে যে বয়সি দেখানো হয়েছে তা মোটেও ১৪ বছর বয়সকে ধারণ করে না। তাদের বয়স অনেক বেশি মনে হয়েছে এবং তা দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলেছে। যদিও তারা দুজনই অভিনয়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। তবে চলচ্চিত্রজুড়ে নারীর যে অবস্থান তা জোরালোভাবে পুরুষ প্রাধান্যশীলতাকে ইঙ্গিত করে। নবাবের খামখেয়ালিপনায় চার জন নারীর জীবনে এক করুণ পরিস্থিতি নেমে আসে। যদিও কোথাও নবাবকে এর জন্য অনুশোচনা করতে দেখা যায় না। এমনকি কারাগার থেকে বের হয়ে নবাব সোজা চলে যান যৌনপল্লীতে; অথচ তার যে ওই বয়সি আরো এক সন্তান আছে, সেটা নিয়ে কোনো উদ্বেগই দেখা যায় না।
পাকিস্তান চলচ্চিত্রের ‘ভালো’ সময়
নানারকম সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ৬০-এর দশককে বলা হয় পাকিস্তান চলচ্চিত্রের সোনালি সময়।৫ ইন্ডাস্ট্রি এই দশকে অনেক অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা পায়। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য তারকারা হলেন সৈয়দ কামাল, ওয়াহিদ মুরাদ, মুহাম্মদ আলি, সোহেল রানা, নাদিম প্রমুখ। এছাড়া ৬০-এর দশকেই এ ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম নির্মাণ হয় রঙিন চলচ্চিত্র। পূর্ব পাকিস্তানের (পরে বাংলাদেশ) নির্মাতা জহির রায়হান সেখানে প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে জহির রায়হানের সংগ্রাম ও তার পরের বছর নির্মাতা মোস্তাফিজের মালাকে পাকিস্তানের প্রথম দিকের রঙিন চলচ্চিত্র বলা হয়ে থাকে। এছাড়া ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে ভারতের সব চলচ্চিত্রের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়।৬ ফলে পাকিস্তান চলচ্চিত্রের দর্শক বাড়তে থাকে। এ সময়ের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে শহিদ (১৯৬২), চান্দা (১৯৬২), বাজি (১৯৬৩), মা বেটি (১৯৬৩), ইন্সপেক্টর (১৯৬৪), বন্ধন (১৯৬৪), দেবদাস (১৯৬৫), ডক্টর (১৯৬৫), আরমান (১৯৬৬), নীলা পর্বত (১৯৬৯), আঞ্জুমান (১৯৭০), তেহেজিব (১৯৭১), বিয়ন্ড দ্য লাস্ট মাউনটেইন (১৯৭৬) অন্যতম। সোনালি এই সময়ের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র আরমান (১৯৬৬)। এই চলচ্চিত্রটি টানা ৭৫ সপ্তাহ পাকিস্তানের প্রেক্ষাগৃহে চলে। এখন দেখা যাক, কী আছে সোনালি যুগের আরমান-এ।
সোনালি যুগের আরমান
১৯৫০-এর দশকে চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু থেকে খুব বেশি বের হতে না পারলেও এ সময়ের চলচ্চিত্রে গল্প উপস্থাপনে কিছুটা পরিবর্তন আসে। পরিবার ও নারীর সামাজিক অবস্থানকে স্পর্শ করে পারভেজ মানিক নির্মিত আরমান।
আরমান-এর কাহিনি নাজমা চরিত্রকে ঘিরে। বাবা-মা হারানো নাজমা মুরির এক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। ওই বাড়ির মালিকের নাজমার সমবয়সি দুই মেয়ে আছে—সীমা ও ডলি। সীমা লাহোরে থাকেন। তার সঙ্গে প্রেম হয় সোহেলের। একপর্যায়ে সীমা অন্তঃসত্ত্বা হন। কিন্তু সোহেল বিদেশে চলে যাওয়ায় তাকে সে কথা জানান না সীমা। সীমা এক মেয়েসন্তানের জন্ম দেন। পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসনের ভয়ে সীমা তার সন্তানকে নিয়ে মহাবিপদে পড়েন। ঠিক সেই সময় সীমার সন্তানের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন নাজমা। এদিকে বেগম সাহেবার দূর সম্পর্কের ভাই খান বাহাদুর ওয়াজাদ খানের ছেলে নাসিরের সঙ্গে তার যেকোনো এক মেয়ের বিয়ে আগে থেকেই পাকাপাকি করা আছে। কথা অনুযায়ী, দুই মেয়ের যাকে নাসিরের পছন্দ হবে, তাকেই তিনি বিয়ে করবেন। ঘটনাক্রমে গৃহকর্মী নাজমাকেই পছন্দ করেন নাসির। খান বাহাদুর সাহেবও ‘সংসারী’ নাজমাকে ছেলের বউ করে নিতে রাজি হন। কিন্তু নাজমার কোলে সীমার সন্তান দেখে বিয়ে ভেঙে যায়। নাসির শেষ পর্যন্ত সীমাকেই বিয়ে করেন। পরে সোহেল বিদেশ থেকে ফিরলে নাসির জানতে পারেন, নাজমার কাছে থাকা সন্তান সীমার। এই পরিস্থিতিতে সীমা আত্মহত্যা করেন। পরে নাজমা ফিরে আসেন নাসিরের জীবনে।
নানা ‘বন্ধনে’ নারী আবদ্ধ
দেশে দেশে নারী বাঁধা থাকে নানা শৃঙ্খলে, পারিবারিক-সামাজিক বন্ধনে। সেই বন্ধন বা পারিবারিক-সামাজিক অনুশাসন থাকা সত্ত্বেও নারী কখনো কখনো নিজের ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সিদ্ধান্ত নিলেও সেই অনুশাসন যেনো সহজে ভাঙতে পারে না। চলচ্চিত্রে সীমার সঙ্গে সোহেলের প্রেমের সম্পর্ক, অন্তঃসত্ত্বা হওয়া এবং সোহেলের বিদেশে চলে যাওয়া পর পর ঘটে যায়। সোহেলকে যেমন সীমা এটা জানাতে পারেন না, অন্যদিকে সম্মান ও প্রাণের ভয়ে সীমা সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা সমাজ এমনকি পরিবারকেও জানাতে পারেন না। কেননা পাকিস্তানের মতো রক্ষণশীল দেশে এ ধরনের সম্পর্কে জড়ালে রক্ষা নেই! সেখানে রয়েছে অনার কিলিং-এর (পরিবার বা গোত্রের সম্মানহানির দায়ে আপনজনকে হত্যা করাকে অনার কিলিং বলা হয়ে থাকে) মতো ভয়াবহ এক প্রথা। পরিবারের অমতে বিয়ে, বিবাহ-পূর্ব সম্পর্ক, বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক, ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধ অমান্য করা বিষয়গুলোকে অনার কিলিংয়ের কারণ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয় পাকিস্তানে। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দেই কন্দিল বেলুচ নামে একজন মডেল তার বড়ো ভাইয়ের হাতে অনার কিলিংয়ের শিকার হন।৭ যদিও এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে দেশটি ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে আইন প্রণয়ন করে। কিন্তু পাকিস্তানে এ সমস্যাটি এতোই বেপরোয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, শুধু ২০১৫ খ্রিস্টাব্দেই এক হাজার একশো নারীকে অনার কিলিংয়ের শিকার হতে হয়েছে।৮ তা সত্ত্বেও নারী-পুরুষের এ ধরনের সম্পর্ক কিন্তু থেমে নেই। যদিও এ ধরনের সম্পর্কে নারী-পুরুষ দুজনে জড়ালেও শুধু নারীকেই দায়ী করা হয়।
চলচ্চিত্রের ৫২ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে নাসির বাবার কাছে নাজমাকে বিয়ে করার কথা জানান। তিনি বাবাকে বলেন, ‘ডলি ও সীমা আমার চেয়েও দায়িত্বজ্ঞানহীন। তারা কীভাবে সংসার সামলাবে? বাইরের চেয়ে চার দেয়ালের প্রতি যার মায়া আছে, আমি তাকেই বিয়ে করবো। আর নাজমা সেই ধরনের মেয়ে।’ রক্ষণশীল প্রায় সব সমাজের পুরুষই চায় নারী চার দেয়ালের ভিতরে থাকুক, সংসার করুক, বাইরে না যাক। যেটা চলচ্চিত্রে খান বাহাদুর ও নাসিরের বক্তব্যেও ফুটে উঠেছে। তাই হয়তো খান বাহাদুরও রাজি হয়ে যান নাসিরের যুক্তিতে। ফলে নাসিরদের চাওয়া আর খান বাহাদুরদের মেনে নেওয়ার কারণে অধিকাংশ নারী শেষ পর্যন্ত চার দেয়ালের মধ্যেই আটকে থাকতে বাধ্য হয়।
আবার কখনো এসব বিধিনিষেধ ভুলে একটু গণ্ডি পেরোলেই শিকার হতে হয় অনার কিলিং কিংবা পারিবারিক-সামাজিক নির্যাতনের। আবার কখনো ক্ষণিকের জন্য সাহসী হয়ে ওঠা এসব নারী হেনস্তার কথা ভেবে বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। চলচ্চিত্রে শেষ পর্যন্ত সীমাকেও বেছে নিতে হয় সেই পথ। এক ঘণ্টা ৪৩ মিনিটে সোহেল বিদেশ থেকে ফিরলে নাসির জানতে পারেন, বাচ্চাটি নাজমার নয়—সীমার। বেগম সাহেবাও পুরো ঘটনা জেনে যান। এরকম পরিস্থিতিতে সীমা বিষ পানে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। নারীর সম্পর্ক গড়ার স্বাধীনতা না থাকায় সীমার মতো এমন অসংখ্য নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। পাকিস্তানে বিংশ শতাব্দীর আত্মহত্যার কোনো পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও দেশটিতে শুধু ২০১১ খ্রিস্টাব্দেই আত্মহত্যা করেছে দুই হাজার একশো ৩১ জন, যার অধিকাংশই নারী।৯
নতুন ঘরানার সঙ্গীতের সূচনা ও দর্শকপ্রিয়তা
৪০-এর দশকের শেষদিকে পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হলেও তাতে সঙ্গীতের ব্যবহার ছিলো সাদামাটা ও একই ঘরানার। পরের দশকে আরমান-এর মাধ্যমে এক নতুন ঘরানার সঙ্গীতের দেখা পায় ইন্ডাস্ট্রি। আরমান-এ নির্মাতা বেশ কয়েকটি ব্যান্ড সঙ্গীতের ব্যবহার করেন, যা পাকিস্তান চলচ্চিত্রে প্রথম। চলচ্চিত্রে নতুন ধারার এই গান খুব জনপ্রিয় হয়। তবে এর বাইরে আরমান জনপ্রিয় হওয়ার বেশকিছু কারণ রয়েছে। ৬০-এর দশকে তুমুল জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী ওয়াহিদ মুরাদ এতে নাসিরের ভূমিকায় অভিনয় করেন। আরমান ছাড়াও সে বছর মুক্তি পাওয়া প্রায় ৪৫টি চলচ্চিত্রের কাহিনি আরমান-এর মতো এতোটা টান টান উত্তেজনাকর ছিলো না। আরমান-এ গল্পের উপস্থাপনাতেও ছিলো অনন্যতা। সবচেয়ে বড়ো বিষয় হলো, আরমান-এর বাস্তবতা পাকিস্তানের দর্শকের মন ছুঁয়ে গিয়েছিলো নানা কারণে। বিশেষ করে পুরুষ প্রাধান্যশীলতার জয়জয়কার ছিলো চলচ্চিত্রজুড়ে। তাই হয়তো এই চর্চার মধ্যে থাকা বিপুল পরিমাণ দর্শক এটাকে তাদের জীবনের গল্প মনে করতে পেরেছিলো।
সামরিক শাসনে বিপর্যস্ত চলচ্চিত্র অঙ্গন
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান ভেঙে দুটি রাষ্ট্র হয়। ফলে পাকিস্তান তার এক অংশের বিশাল দর্শক ও চলচ্চিত্র কলাকুশলী হারায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের এই সময়ে রাষ্ট্রপতি হন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করেন তিনি। তবে ওই বছরই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল জিয়া-উল-হক। দেশব্যাপী আন্দোলন ও অস্থিরতার মধ্যে সামরিক শাসন জারি হয়। ক্ষমতায় গিয়ে পাকিস্তানকে ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে কায়েম করার ঘোষণা দেন এই সেনা শাসক।১০ রাষ্ট্রের এই পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্র কলাকুশলীরাও পড়ে মহাবিপদে। চলচ্চিত্রশিল্পে নানারকম নতুন নতুন সেন্সর আইন জারি ও মোটা অঙ্কের কর আরোপ করা হয়। এ কারণে অসংখ্য চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা একেবারে কমে যায়। এ সময় এমনও দেখা গেছে¾যেখানে ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে ৯৮টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিলো, সেখানে পরের বছর মুক্তি পায় মাত্র ৫৮টি। শুধু তাই নয়, এই সময় নির্মিত অনেক চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে আগের দশকে অর্জিত জৌলুস ধীরে ধীরে হারাতে থাকে ইন্ডাস্ট্রি।
এছাড়া এ সময়ে পাকিস্তানে ভিসিআর-এর আগমন ঘটে। ভিসিআর-এর আগমন প্রেক্ষাগৃহ ব্যবসায় বড়ো ধরনের প্রভাব ফেলে। এ অবস্থা চলতে থাকে জেনারেল জিয়া-উল-হক সরকারের পতন (১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত। জিয়া সরকারের পতন হলেও ততোদিনে পাকিস্তানের সমাজ-বাস্তবতার যে পরিবর্তন ঘটে গেছে, তা থেকে পাকিস্তান সহজে বেরুতে পারে না। নানারকম হাঙ্গামা-সহিংসতা পাকিস্তানজুড়ে লেগেই ছিলো। ৮০’র দশকে চলচ্চিত্রেরও বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায় সহিংসতা। সহিংসতাকে ধরে নির্মিত হয় অসংখ্য চলচ্চিত্র। তবে এতোদিন পাকিস্তানের লাহোর ও করাচিতে বেশিরভাগ চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও ৯০ দশকে তা চলে যায় পাঞ্জাবে। এ সময় পাঞ্জাবি ভাষায় বেশিরভাগ চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। এর পরেই স্থান করে নেয় পশতু ভাষার চলচ্চিত্র। এসব চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্যই ছিলো নানারকম সহিংসতাকেন্দ্রিক। এ সময়ের অন্যতম চলচ্চিত্র আলি হায়দার (১৯৭৯), বানদিশ (১৯৮০), দ্য ব্লাড অব হোসাইন (১৯৮১), মিয়া বিবি রাজি (১৯৮২), দূরদেশ (১৯৮৩), হিরো (১৯৮৫), কালকা (১৯৮৯), আসমান (১৯৯০), কসম (১৯৯৩), বাজিগর (১৯৯৬), জান্নাত কি তালাশ (১৯৯৯), তেরি পেয়ার মেইন (২০০০)।
জিয়ার শাসন শেষে ক্ষমতায় আসেন জুলফিকার আলীর মেয়ে বেনজির ভুট্টো। আর তার সময়েই শানি (১৯৮৯) নামে প্রথম সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় পাকিস্তানে। সায়েদ রিজভী নির্মিত শানি ৮০-৯০ দশকের সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। এছাড়া শানি ওই বছরই প্রভাবশালী ‘নিগার পুরস্কার’ পায়। মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবেও পুরস্কার জিতে নেয় শানি।
প্রথম সায়েন্স ফিকশন শানি
চলচ্চিত্রের গল্প এগোয় শানি চরিত্রকে ঘিরে, যাকে শমসের নামে এক শিশু পাচারকারী হত্যা করেছে বলে গ্রামবাসীর ধারণা। এক সন্ধ্যায় গ্রামের ভিতর দিয়ে মহাকাশ থেকে আসা এক বিশাল রশ্মি যায়। সেটা দেখে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। হেনা (যার সঙ্গে শানির বিয়ে ঠিক থাকে) আগ্রহ নিয়ে সেই রশ্মির দিকে এগোয় এবং আতঙ্কিত হয়ে ঘরে ফেরেন। সেই রশ্মি থেকে মানব আকৃতির একটি বস্তু হেনার বাড়িতে এসে শানির ছদ্মবেশ ধারণ করে। পরের দিন ওই আলোকরশ্মি নিয়ে গ্রামে যখন তুমুল আলোচনা চলছিলো, ঠিক সেই সময় গ্রামে হাজির হন শানি। সবাই অবাক হলেও শানিকে পেয়ে খুশিই হয়। নকল শানি ধীরে ধীরে সব জেনে যায়; তিনি ধীরে ধীরে গ্রামবাসীর হৃদয়ে থাকা আসল শানির স্থান দখল করে নেন এবং তাদের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। ঘটনাপ্রবাহে হেনার সঙ্গে বিয়ে হয় তার। এর মধ্যে শানির বেঁচে থাকার কথা শমসের জানতে পারেন। এরপর তাকে হত্যার জন্য শমসের লোক পাঠান। তবে এলিয়েন শানি তার ক্ষমতা দিয়ে লোকজনকে হটিয়ে দেন। হেনা-শানির সংসারে জন্ম নেয় ছেলেসন্তান জিব্রান। একপর্যায়ে হেনা ও তার পরিবার জানতে পারে, এই শানি আসলে মানুষ নন; এলিয়েন। তখন শানি ধর্মীয় নানা কথা বলে বুঝিয়ে দেন, তারা যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে তিনিও তাকেই বিশ্বাস করেন। এদিকে শমসের নানারকম কৌশল নিলেও শেষ পর্যন্ত মারা পড়েন তিনি। শানি চলে যান এলিয়েনের সেই মহাকাশযানে। তবে পৃথিবীতে রেখে যান তার চেয়ে শক্তিশালী জিব্রানকে।
‘এলিয়েন’ পরিচালিত দেশ
জন্মের পর থেকেই নানারকম অনিশ্চতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে পাকিস্তানকে। এই দেশের নেতৃত্বের ইতিহাসে দেখা যায়, অধিকাংশ রাষ্ট্রনায়ক ছিলো সামরিক বাহিনী থেকে উঠে আসা। এ কারণে, সেখানে সবসময়ই একধরনের স্বতঃস্ফূর্ত নেতৃত্বের একটা অভাব ছিলো। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, এশিয়ার প্রায় সব দেশের মতো পাকিস্তানেও রয়েছে বিদেশি পরাশক্তিদের হস্তক্ষেপ। কে দেশ চালাবে, কীভাবে চালাবে—যার প্রেসক্রিপশন আসে পরাশক্তিদের কাছ থেকেই। কখনো পরাশক্তিদের বয়ানে এ দেশটি জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হয়েছে, আবার কখনো হয়েছে জঙ্গিবাদবিরোধী। অর্থাৎ বাইরের শক্তি সবসময়ই সক্রিয় থেকেছে/আছে এখানে। ফলে যে শাসকই আসুক না কেনো, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা খুব একটা পূরণ করতে পারেনি; আস্থাভাজন হতে পারেনি। তারা শুধু শাসক হয়ে উঠেছে। তাই দেশটির জনগণ চেয়েছে এমন কোনো নেতৃত্ব, যে কিনা সব অশুভ শক্তি ধ্বংস করে, তাদের কথা বলবে; এক কথায় তাদের মানুষ হয়ে উঠবে। তবে সেই নেতৃত্ব কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে তারা হয়তো চিন্তা করেনি।
৮০’র দশকের শেষদিকে নির্মিত শানির গ্রামের চরিত্র রাষ্ট্রের মতোই মনে হয়েছে। যেখানে ওই মানুষগুলো রাষ্ট্রের জনগণ আর শানি যেনো তাদের নেতা। কিন্তু শানির মৃত্যু ঘটলে সেখানে একধরনের নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দেয়। তবে শানির পরিবার ও গ্রামের লোকজনের ধারণা শানি একদিন ফিরে আসবে। তবে শানির ছদ্মবেশে হাজির হয় শানিরূপী এলিয়েন।
ওই ‘গ্রামের’ মতোই পাকিস্তানেও এই এলিয়েন শানির আগমন ঘটেছে নানাভাবে। সেই সব শাসকরা ওই এলিয়েনের মতোই কাজ করেছে পাকিস্তানি জনগণের সঙ্গে। তবে ওই সব মদদপুষ্ট নেতাদের ছদ্মবেশী পরিচয় পরে যে ফাঁস হয়নি, তা কিন্তু নয়। পরিচয় ফাঁস হওয়ার পর ওই সব নেতারা আবার অন্য কৌশল প্রয়োগ করেছে। চলচ্চিত্রে যখন এলিয়েন শানির পরিচয় হেনা ও তার পরিবার জানতে পারে, তখন তারা এলিয়েনকে একজন ধোঁকাবাজ হিসেবে দোষারোপ করতে থাকে। কিন্তু এলিয়েন বলেন, ‘আমি তোমাদেরকে ধোঁকা দেইনি। আমার যে অবস্থা ছিলো, তাতে আমি এ পৃথিবীতে থাকতে পারতাম না।’ হেনাকে বলেন, ‘তুমি শানিকে হারিয়ে বেশ কষ্ট পেয়েছিলে। কিন্তু তখন আমাকে দেখে তুমি যে খুশি হয়েছো, তোমাকে খুশি রাখতেই আমি আর আমার আসল পরিচয় বলিনি।’ কিন্তু তাতেও হেনাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন না এলিয়েন। যদিও হেনার চাচা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, তুমি সৎ ও নিষ্ঠাবান। সেটা নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তুমি তোমার পরিচয়-ধর্ম গোপন করে আমাদেরকে ধোঁকা দিয়েছো।’ পরে সবার এরকম আপত্তির মুখে ধর্মের আশ্রয় নিয়ে এলিয়েন বলেন, ‘ শেষ নবীর বার্তা শুধু এ দুনিয়ার জন্য ছিলো। আপনারা যে খোদার ওপর বিশ্বাস করেন, আমাদেরও সেই খোদার ওপরই বিশ্বাস।’ দেখা যাচ্ছে, যখন এলিয়েন তার সততা, নিষ্ঠা এগুলোর কোনো কিছু দিয়েই তাদের প্রতি আস্থা আনতে পারছিলো না, তখন ধর্মের কথা বলে ঠিকই প্রভাবিত করে।
অর্থাৎ পাকিস্তানের জনগণকে প্রভাবিত করার সর্বশেষ অস্ত্র হলো ধর্ম। ধর্ম দিয়ে শাসন করা যায়, তাদের নেতা হওয়া যায়, গ্রহণযোগ্যতাও পাওয়া যায়। সে নেতা যে দেশের, যে শক্তির মদদপুষ্টই হোক না কেনো। শুধু তাই নয়, মানুষ তাদেরকে আদর্শ মনে করে মহিমান্বিত ভাবতে থাকে। সব কর্মকাণ্ডের বৈধতা পেয়ে যায় এই সব এলিয়েন। আবার এলিয়েন চলে গেলেও তাদের একটা প্রভাব বা রেশ কিন্তু থেকেই যায়। চলচ্চিত্রে এলিয়েন ও হেনার সংসারে জন্ম নেওয়া জিব্রানই (আরবি শব্দ জিব্রান অর্থ পুরস্কার) তার প্রমাণ। আসলেই তো তাই, এই সব শাসক জন্ম দিয়ে যায় তাদেরই মতাদর্শের অনুসারীদের। যারা জনগণের নেতৃত্ব দেয়, আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। তাই তো চলে যাওয়ার সময় এলিয়েন বলেন, ‘জিব্রান আমার চেয়েও শক্তিশালী হবে।’ আবার শানি যাওয়ার সময় গ্রামের সবাই জড়ো হয়ে তাকে বিদায় দেয়। বাইরের নেতৃত্ব ছাড়া যে পাকিস্তানের গতি নেই, তা শানি পরোক্ষভাবে মনে করিয়ে দেয় দর্শককে। এজন্যই হয়তো ছদ্মবেশী এলিয়েনরা শানি হয়ে আসে আর শাসন করে পাকিস্তানে। এবং মানুষকে ধর্মের আফিম দিয়ে বশে এনে মিশে যায় তাদের মনে।
ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ইন্ডাস্ট্রি
পাকিস্তানি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি ৯০ দশকের খরা কাটিয়ে ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। ইন্ডাস্ট্রিতে আসতে থাকে তরুণ নির্মাতারা। তারা ছোটো ছোটো বাজেটে ইন্ডাস্ট্রিকে দিতে থাকে দারুণ সব চলচ্চিত্র। সেই সব চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুও আগের দশকের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ক। তবে পাকিস্তানে তখনো বড়ো বড়ো শহরের প্রেক্ষাগৃহগুলো বন্ধই ছিলো। পরে ধীরে ধীরে সেই অবস্থারও উন্নতি হতে থাকে। এমনকি ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি লাহোর থেকে করাচির দিকে যেতে শুরু করে। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কারণে অনেক নির্মাতা, প্রযোজক, কলাকুশলী করাচিতে আসতে থাকে। এখানে এসেই শোয়েব মনসুর নির্মাণ করেন সাড়া জাগানো খোদা কে লিয়ে (২০০৭)। চলচ্চিত্রটি ভারতসহ বিভিন্ন দেশে মুক্তি দেওয়া হয়। আর এর মাধ্যমেই পাকিস্তানি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি আলোর মুখ দেখতে শুরু করে এবং করাচিতে গড়ে ওঠে নতুন চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি। খোদা কে লিয়ে’র পর পাকিস্তানে বেশকিছু আলোচিত চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে—চুপ, প্রিন্স অব অনার, দেবদাস, সান অব পাকিস্তান, সালটানাট, লাভ মেইন ঘুম, রামচান্দ পাকিস্তানি অন্যতম। এ চলচ্চিত্রগুলোও কমবেশি সফলতার মুখ দেখে। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে শোয়েব মনসুর আসেন বোল নিয়ে। এই চলচ্চিত্রটি জনপ্রিয়তায় আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়।
বোল-এর আখ্যান
বোল-এর গল্প লাহোরের এক মুসলমান অস্বচ্ছল পরিবারকে নিয়ে। যে পরিবারে মেয়ে জয়নব তার বাবাকে হত্যা করে। আদালত জয়নবের ফাঁসির দণ্ড দেন। তবে ফাঁসির আগে জয়নব তার শেষ ইচ্ছে হিসেবে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান। সেখানে তিনি বাবাকে হত্যার পিছনের কারণ তুলে ধরেন। জয়নবরা সাত বোন। বাবা হাকিম ছেলের আশায় তার পরও আরেকটি সন্তান নেন। কিন্তু অষ্টম সন্তানটি জন্ম নেয় হিজড়া হিসেবে। হাকিম এই হিজড়া (সাইফুল্লাহ) সন্তানকে মেরে ফেলতে চান, কিন্তু পারেন না। সাইফুল্লাহ বড়ো হয়ে কাজে গেলে সেখানে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। পরে পরিবারের সম্মান বাঁচাতে সাইফুল্লাহকে হাকিম খুন করেন। মুখ বন্ধ রাখতে নিজের কাছে রক্ষিত মসজিদের টাকা পুলিশকে দিয়ে দেন হাকিম। কিছুদিন পর মসজিদ কমিটি সেই টাকা চেয়ে বসলে হাকিম বিপদে পড়েন। এ অবস্থায় যৌনপল্লীর এক মালিকের কাছে শর্তসাপেক্ষে মোটা অঙ্কের টাকা নেন হাকিম। চুক্তি অনুযায়ী, যৌনপল্লীর মালিকের স্ত্রী মিনার সঙ্গে এক মেয়েশিশুর জন্ম দিতে হবে। কথা মতো কাজ হয়। কিন্তু মেয়ের জন্মের পরে হাকিম আর চান না তার সন্তান যৌনপল্লীতে বেড়ে উঠুক বা যৌনকর্মী হোক। মিনাকে একথা বোঝাতেও সক্ষম হন তিনি। হাকিমের বাড়িতে বাচ্চাটিকে এক সন্ধ্যায় দিয়ে যান মিনা। বাড়িতে জানাজানি হয়, তাদের বাবা অন্যত্র সম্পর্ক গড়েছেন এবং তার সন্তানও হয়েছে। একপর্যায়ে ওই সন্তানটিকে যৌনপল্লীর মালিক নিতে আসলে হাকিম শিশুটিকে মেরে ফেলতে উদ্যত হন। শিশুটিকে বাঁচাতে জয়নব তার বাবাকে আঘাত করলে মারা যান তিনি। গণমাধ্যমে জয়নব হত্যার দায় স্বীকার করেন এভাবে যে, ‘আমি হত্যাকারী হতে পারি কিন্তু অপরাধী নই। আমার বাবা আটটি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন মানে আটটি খুন করেছেন।’
বোল প্রতিবাদী নারীর গল্প
বোল-এ জয়নব তার বাবাকে হত্যার পর আদালত ফাঁসির আদেশ দেন। তবে ভাগ্যক্রমে ফাঁসির মঞ্চে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান তিনি। যদিও দেশটিতে এভাবে ফাঁসির মঞ্চে কথা বলার কোনো রেওয়াজ বা আইন নেই। তবুও নির্মাতা গল্প বলার উপায় হিসেবে ফাঁসির মঞ্চকেই বেছে নিয়েছেন। নির্মাতা বোল-এ দেখিয়েছেন, একটি মুসলমান পরিবারে কীভাবে নারীরা প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হয়। চলচ্চিত্রটি পাকিস্তানি নারীর অবহেলিত জীবনের প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত। প্রচণ্ডভাবে পুরুষ প্রাধান্যশীল এই দেশটি ধর্মকে ‘নিজেদের’ মতো করে ব্যবহার করে নারীকে আটকে রাখার নানারকম ফন্দি আঁটে। ধর্মের নামে নানারকম কুসংস্কার তৈরি করে। আর এসব কুসংস্কার টিকিয়ে রাখতে মদদ দেয় পুরুষই।
বোল-এ দেখা যায়, হাকিম সাহেবের সাত মেয়েসহ পরিবারের সদস্য ১০ জন। এরা কীভাবে চলবে, কোথায় যাবে, তার জবাবদিহিতা একমাত্র হাকিম সাহেবের কাছেই দিতে হয়। যদিও হাকিম বাড়ি থেকে চলে গেলে বাড়ির অন্যান্যরা একটু নিজেদের মতো করে চলে, কেউ কেউ গান গায়, নাচে। কিন্তু হাকিম বাড়িতে আসলেই সব বন্ধ হয়ে যায়। এভাবেই দিনের পর দিন চলতে থাকে, কেউ হাকিমের কোনো কাজে প্রশ্ন তোলে না। এদিকে প্রতিপক্ষ না থাকায় হাকিমের নির্যাতনও দিন দিন বাড়তে থাকে। এরকম পরিস্থিতিতে বাড়িতে প্রথম মুখ খোলেন হাকিমের বড়ো মেয়ে জয়নব। হাকিম ধর্মীয় কাজে কয়েকদিনের জন্য বাড়ির বাইরে গেলে মায়ের গর্ভধারণ বন্ধে অস্ত্রোপচার করায় জয়নব ও তার বোনেরা। হাকিম বাড়ি ফিরে বিষয়টি জানতে পেরে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেন, কেনো তিনি এটা করলেন? হাকিম এ নিয়ে স্ত্রীকে মারতে উদ্যত হলে মুখ খোলেন জয়নব। জয়নব তার বাবাকে জানায়, আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবো। কারণ আমি আপনাকে এমন কিছু বলতে চাই; যেটা কোনো মেয়ে তার বাবাকে বলে না। মায়ের এটা বলা উচিত ছিলো, কিন্তু তিনি তার সেই অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন। এই বাড়িতে আর যেনো কোনো লোক না বাড়ে, সেজন্য আমি আম্মুর অপারেশন করিয়েছি।
হাকিম রেগে মেয়েকে অভিশাপ দেন, ‘এটা তুই কী করেছিস, তোর ওপর গজব পড়বে! তুই জানিস না, কতো বড়ো অপরাধ করেছিস!’ জয়নব বলেন, ‘বাবা, যতো বেশি মুখ, ততো বেশি আমাদের খাবার প্রয়োজন।’ এ সময় হাকিম বলেন, খাবার দেওয়ার মালিক আল্লাহ। উত্তরে জয়নব বলেন, ‘আমরা তো পাচ্ছি না। দুনিয়ার অসংখ্য মানুষ না খেয়ে থাকে। খোদা কি তার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করে?’ এ কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে জয়নবের ওপর হাকিম হাত তোলেন। এমনকি হাকিম মেয়েকে হত্যার জন্য উদ্যত হন। জয়নব পালিয়ে যান তার ঘরে। অবশ্য পালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায়ও থাকে না নারীর। কেননা, পাকিস্তানে বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতে হত্যার শিকার হতে হয় নারীকে। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরেও পাকিস্তানে বাবার হাতে খুন হয়েছে দুই মেয়ে।১১
পাকিস্তান-ভারতের বৈরী সম্পর্ক উঠে এসেছে চলচ্চিত্রটিতে। বোল-এ রেডিওর আওয়াজে ভেসে আসে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যকার ক্রিকেট খেলার ধারাভাষ্য। ক্রিকেটপ্রেমী হাকিম তসবি পাঠ করেন যাতে পাকিস্তান জয়ী হয়। এই খেলায় টেন্ডুলকার শত রান করুক, হাকিমের এক মেয়ের এই চাওয়া, বলে দেয় অন্য মেয়ে। হাকিম তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেন। তখন জয়নব আবার মুখ খোলেন। তিনি তার দুই বোনকে বলেন, ‘এই বাড়িতে তোমাদের শুধু নিঃশ্বাস নেওয়া ছাড়া আর কোনো কিছু করার অনুমতি নেই।’ আসলেও তাই, পুরুষ প্রাধান্যশীল পরিবারে নারীরা যেনো একটি কাজই পারে, সেটি হলো প্রয়োজন মতো নিঃশ্বাস নেওয়া। তাছাড়া আর সব কাজেই পুরুষের অনুমতি নিতে হয়। আর অনুমতি না নিয়ে কিছু করলে ভোগ করতে হয় তার পরিণতি। আর এই পরিণতি কখনো কখনো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে হেরে গেলে হাকিম দায়ী করেন তার মেয়েদেরকে। হাকিম বলেন, ‘ তোমরা আমাদেরকে হারিয়েছো। যদি তোমরা মন থেকে আমাদের জন্য দোয়া করতে, তাহলে কবুল হতো।’ এই বলে রাগে রেডিও ভেঙে ফেলেন তিনি। জয়নব তখন তার বাবার কথার প্রতিবাদ করে বলেন, ‘সারা পাকিস্তান দোয়া করার পরও পাকিস্তান হেরে গেলো!’ হাকিম বলেন, ‘আমি তোমার কথা শুনতে চাই না।’ জয়নব বলেন, ‘ কেনো আব্বা, আবার আপনাকে বোবা বানিয়ে দিলাম নাকি?’ হাকিম বলেন, ‘কথা বন্ধ কর নয়তো আমার হাত উঠে যাবে।’ জয়নব বলেন, ‘আপনি কথার মাধ্যমে আমাকে উত্তর দিন। আমাকে যুক্তি দিন।’ এ সময় জুতো ছুঁড়ে মারেন হাকিম।
ধর্মীয় দিক থেকে ভীরু কিংবা কোনো বিষয়ে অন্ধভক্ত লোক রক্ষণশীল সমাজ-বাস্তবতায় কোনো উত্তর দিতে চায় না। সেটা কোনো ধর্মীয় গুরু হোক, কিংবা অন্য কেউ। তারা যখন কোনো বিষয়ের যুক্তিযুক্ত সদ্যুত্তর দিতে না পারে, তখন আশ্রয় নেয় সহিংসতার। সেজন্যই বোধ হয় ‘নাস্তিকদের’ চাপাতির আঘাতে মরতে হয়। চলচ্চিত্রের হাকিম আসলে সেই ধরনেরই লোক। তিনিও তার মেয়ের কাছে বার বার হেরে গিয়ে হাতিয়ার হিসেবে সহিংসতাকেই বেছে নেন। তবে আশার কথা হলো, হাকিমরা সহিংসতাকে বেছে নিলেও তার বিপরীতে নারী দাঁড়ায় নিয়মিত। আর পাকিস্তানের বাস্তবতায় এ বিষয়টি একেবারে মিলে যায়। নির্মাতা খুবই দক্ষতার সঙ্গে তা তুলেও ধরেছেন।
‘আমি হত্যাকারী, অপরাধী নই’
ফাঁসির আগে জয়নব গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘আমি হত্যাকারী, অপরাধী নই।’ সব হত্যাকারীই বলে থাকে সে হত্যাকারী বা অপরাধী নয়। কিন্তু জয়নব বলেন, তিনি কেবলই হত্যাকারী। একথা বলার পরই গণমাধ্যমকর্মী তাকে নানা প্রশ্ন করতে থাকে। তখন একে একে তিনি বলতে থাকেন তার বাবা হাকিমের নানা অত্যাচার, স্বেচ্ছাচার ও অনাচারের কথা। উদাহরণ হিসেবে তার মাকে হেয় করার কথা জয়নব বলেন। হাকিম মেয়েদের সামনে স্ত্রীকে বলতেন, ‘ খোদা তোমাকে দুটি গুণ দিয়েছে—তুমি রান্নাটা বেশ ভালো পারো, আর প্রচুর মেয়েও জন্ম দিতে পারো।’ এমনকি হাকিমের ঘরে অষ্টম সন্তান হিসেবে হিজড়ার জন্ম হলেও মাকে ভর্ৎসনার শিকার হতে হয়। সম্মান বাঁচাতে সাইফিকে (হিজড়ার ডাক নাম) হাকিম বাড়ির মধ্যে আটকে রাখেন। এমনকি সাইফি যৌন নির্যাতনের শিকার হলে পরিবারের সম্মান ও ধর্ম বাঁচাতে তাকে খুন করেন হাকিম। কিন্তু কাউকে হত্যা করা এবং সেটা ধামাচাপা দিতে ঘুষ দেওয়া কোনোটাকেই হাকিম অপরাধ মনে করেন না। অথচ ধর্মীয় দিক দিয়ে কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু পাকিস্তানের বাস্তবতায় এর একধরনের অলিখিত বৈধতা সেখানে রয়েছে।
এদিকে মসজিদের টাকা পরিশোধে যে সন্তানের জন্ম হয়, হাকিম চান না সে যৌনকর্মী হোক। এর কারণ মোটেও হাকিমের মানবিকতা নয়, ধর্মীয় ভয়। এর প্রমাণও পাওয়া যায়—যৌনপল্লীর মালিক শিশুটিকে নিতে আসলে নিজের পাপ-পূণ্যের হিসাবনিকাশে হাকিম শিশুটিকে মেরে ফেলতে উদ্যত হন। তখন ওই শিশুকে বাঁচাতে জয়নব বাবার মাথায় আঘাত করলে তিনি মারা যান। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে জয়নব এর ব্যাখ্যা দেন এভাবে, আমাকে জন্ম দেওয়ায়, বাবার প্রতি আমি প্রতিশোধ নিয়েছি। আমার বাবা শুধু আট সন্তানের জন্ম দেননি, তিনি আট সন্তানকে হত্যা করেছেন। আমি শুধু একটা প্রশ্ন করতে চাই; সবাইকে বলতে চাই; প্রশ্নটা এই সমাজকে করতে চাই। কেনো হত্যা করাই শুধু অপরাধ হবে, জন্ম দেওয়াটা কেনো অপরাধ নয়? জিজ্ঞাসা করুন, কেনো অবৈধ সন্তান জন্ম দেওয়াই শুধু অপরাধ? বৈধ সন্তানের জন্ম দেওয়া এবং তাদের জীবন ধ্বংস করা কেনো অপরাধ হবে না? সন্তানদের ঠিকমতো খাবার দিতে না পেরেও কেনো কেউ এতো সন্তানের জন্ম দিবে?
জয়নবের এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া রাষ্ট্র-সমাজের জন্য এতো সহজ নয়। কিংবা এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো বিশ্বের অনেক দেশের মানুষের কাছেই নেই। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে পরিপ্রেক্ষিতের ওপর। ‘মুখ দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি’—ধর্মীয় এই বিশ্বাসে থাকা মানুষের কাছে হয়তো এটা কোনো প্রশ্নই নয়। অন্যদিকে উত্তরাধিকার, সম্পদের মালিকানার জন্যও মেয়েসন্তানের চেয়ে ছেলেসন্তান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই সন্তান কয়টা জন্ম নিচ্ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্তান ছেলে কি না! এখানে নারী সন্তান প্রসবের যন্ত্র মাত্র! যদিও সন্তান ছেলে বা মেয়ে হওয়ার ক্ষেত্রে নারীর কোনো ভূমিকা নেই। তার পরও এর দায় এই ‘আধুনিক’ সময়ে এসেও নারীর ঘাড়েই চেপে বসে। সবমিলিয়ে পার্থক্য কেবল একটা, জয়নবের মা প্রতিবাদটুকু করতে পারেননি, জয়নব করেছেন। যদিও জয়নবকে জীবন দিয়ে তার ফল ভোগ করতে হয়েছে; সক্রেটিসও করেছিলেন। তাই বলে পৃথিবী থেকে প্রশ্ন করা, প্রতিবাদ করা কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি।
এটা সম্ভব পাকিস্তানে!
জয়নবের ফাঁসি কার্যকরের পর দেশটির রাষ্ট্রপতি টেলিভিশনে এ নিয়ে প্রতিবেদন দেখে মন্ত্রীদের নিয়ে সভা আহ্বান করেন। সেই সভায় ধর্মীয় নেতাদেরও ডাকতে বলা হয়। যদিও ওই সভায় কী সিদ্ধান্ত হয় চলচ্চিত্রে তা দেখানো হয় না! তবে রাষ্ট্রের এই তোড়জোড়ে বোঝা যায়, তারা জয়নবের বক্তব্যকে আমলে নিয়েছে। নির্মাতা হয়তো সচেতনভাবেই সেটা করেছেন। কারণ পাকিস্তানের মতো রক্ষণশীল দেশে নারীর মুখ দিয়ে এই প্রশ্ন তুলে নির্মাতা নিশ্চয় বিপদে পড়তে চাননি।
অন্যদিকে বোল-এর শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, জয়নবের মা ও বোনেরা বাড়ির পাশে খাবারের দোকান করছে। বোনদের কেউ কেউ সাইকেল চালাচ্ছে। সেই খাবারের দোকান একপর্যায়ে ‘জয়নব ক্যাফে’ নামে বড়ো রেস্টুরেন্ট-এ পরিণত হয়। সেখানে অনেক নারী কাজ করে। এই দৃশ্য দেখে মনে হয়, পাকিস্তানে নারীদের অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু বাস্তবে কি তা হয়েছে? এতো সহজে কি হাকিমদের মতো রক্ষণশীল, ধর্মান্ধরা সব মেনে নেয়? হয়তো সেটা চলচ্চিত্রেই সম্ভব। তার পরও নির্মাতা শোয়েব মনসুর স্বপ্নটা দেখেছেন। তবে সেই স্বপ্নে বুঁদ বুঁদ আছে, আলোড়ন নেই, হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।
তাল মিলিয়ে এগিয়ে যায়
না গেলে উপায় নাই
পাকিস্তান চলচ্চিত্রের শুরু থেকে আজোবধি নানারকম উত্থান-পতন লক্ষ করা যায়। রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে এখানে চলচ্চিত্রেরও নানারকম পরিবর্তন হয়েছে। ৪০-এর দশকের শেষে শুরু হওয়া এই ইন্ডাস্ট্রি ৫০-এর দশকজুড়ে নিজেকে গোছানো ও তারকা খোঁজার কাজে ব্যয় করেছে। ৬০-এর দশকে এই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি পেয়ে যায় এক ঝাঁক তরুণ ও উদীয়মান তারকা; যাদেরকে দর্শক লুফে নেয়। ৫০-এর দশকে যে চলচ্চিত্র ২০Ñ২৫ সপ্তাহ প্রেক্ষাগৃহে চলতো, সেই একই ঘরানার চলচ্চিত্র ৬০-এর দশকে চলেছে একÑদেড় বছর। গল্পের প্যাটার্ন প্রায় এক হলেও তার উপস্থাপনা, সঙ্গীতের ব্যবহারে বৈচিত্র্য ছিলো; কিছু কিছু সামাজিক সমস্যা চলচ্চিত্রে উঠে আসতো। তবে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হওয়ার পর দেশটির চলচ্চিত্রে বড়ো ধরনের ধাক্কা আসে। সেই ধাক্কা আরো প্রকট হয় জেনারেল জিয়া-উল-হকের সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে। ফলে দেখা যায়, ৭০-দশকের শেষদিক থেকে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত এই ইন্ডাস্ট্রি তেমন কোনো সফলতা পায়নি। তবে বিভিন্ন সময়ের চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবসময়ের চলচ্চিত্রেই নারীর অবস্থানের খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
৫০-এর দশকের চলচ্চিত্রে নারী পারিবারিক পরিমণ্ডলে থাকলেও ৬০ থেকে ৮০-এর দশকে নারী-সংক্রান্ত কিছু সামাজিক সঙ্কট চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে শূন্য দশকে এসে রাষ্ট্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায় নারীকে। এই দশকে সরাসরি নারীর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যদিও পুরুষের সেই পুরনো অবস্থানই লক্ষ করা যায়। পুরুষকে ঠিক রেখে নারীর অবস্থানের এই অদল-বদল সেটা যে শুধু পাকিস্তানের চলচ্চিত্রেই হয়েছে তা নয়, অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতেও হয়েছে। হয়তো তার সঙ্গে খানিকটা তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করেছে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র। যখন আগের বিষয়বস্তুগুলো চলচ্চিত্রে টেকেনি, ব্যবসায়িকভাবে সফলতা আসেনি, তখন চলচ্চিত্র মোড় নিয়েছে নানা দিকে।
লেখক : শফিকুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি অনলাইন সংবাদপত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।
shafiqulislamru32@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100008632759356
তথ্যসূত্র
১. হায়াৎ, অনুপম (২০১৭ : ৯৯); ‘এশিয়ার চলচ্চিত্র’; বিশ্ব চলচ্চিত্রের রূপরেখা; তৃণলতা প্রকাশ, ঢাকা।
২. প্রাগুক্ত; হায়াৎ (২০১৭ : ৯৯)।
৩. প্রাগুক্ত; হায়াৎ (২০১৭ : ৯৯)।
৪.http://cineplot.com/do-ansoo-1950-review/; retrieved on: 07.08.2018
৫.http://www.app.com.pk/downfall-of-pakistani-film-industry/; retrieved on: 11.08.2018
৬.প্রাগুক্ত; হায়াৎ (২০১৭ : ৯৯)।
৭.https://bangla.bdnews24.com/world/article1183844.bdnews; retrieved on: 26.09.2018
৮.shorturl.at/bgw16; retrieved on: 26.09.2018
৯.https://www.dawn.com/news/724902; retrieved on: 29.09.2018
১০.https://www.app.com.pk/downfall-of-pakistani-film-industry/; retrieved on: 05.10.2018
১১. https://www.jagonews24.com/international/news/345499; retrieved on: 11.10.2018
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন