আমিনুল ইসলাম
প্রকাশিত ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
মনোরোগ চিকিৎসায় চলচ্চিত্র
আমিনুল ইসলাম

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছব
ভূমিকা
চলচ্চিত্র একটি শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক যোগাযোগ মাধ্যম। এই মাধ্যমটি আমাদের ইন্দ্রিয়গত বোধ, চৈতন্য, চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণের ওপর জোরালোভাবে ক্রিয়া করে১; দর্শকের জীবনবোধ, দর্শন, অনুভূতি ও আবেগকে স্পর্শ করে বহুমাত্রিক উপায়ে। কেননা চলচ্চিত্রের গল্প, প্লট, ইমেজ, সঙ্গীত, সংলাপ, আলোকসজ্জা, শব্দ ও স্পেশাল ইফেক্ট দর্শকের গভীর ইন্দ্রিয়কে উদ্দীপিত করে নানাভাবে।২ এই মাধ্যমটি ভাবতে সহায়তা করে জীবন নিয়ে; শেখায় নিজের ও অন্যের জীবনকে আরো ভালোভাবে উপলব্ধি করতে। শুধু তাই নয়, বুঝতে সাহায্য করে চারপাশের মানুষের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির ক্রিয়াশীল প্রক্রিয়াটি। আলোকপাত করে রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর ওপর। দৈনন্দিন জীবন যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ বাতলে দিতে পারে। খুলে দিতে পারে জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, দায়বদ্ধতা সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তার চোখ ও অনুভূতির জানালা। যাপিত জীবনে দিতে পারে নতুন মাত্রা। আর তাই হয়তো কারো মন খারাপ থাকলে যেমন চলচ্চিত্র দেখে, আবার মন ভালো থাকলেও চলচ্চিত্র দেখে। চলচ্চিত্র দেখে যখন খুবই নিঃসঙ্গ ও একাবোধ করে; চলচ্চিত্র দেখে যখন অনেকের সঙ্গে যুক্ত থাকে কিংবা দলবদ্ধ হয়। যাহোক, বিদ্যায়তনিক পরিসরে চলচ্চিত্রের নন্দনতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো, এই যোগাযোগ মাধ্যমটি মানুষের দেহ-মনে কী প্রভাব ফেলে তা? মোটাদাগে মনস্তত্ত্বের মূল জায়গাটি হলো মানবীয় আচরণ, মিথস্ক্রিয়া ও মনোজাগতিক জৈবিক প্রক্রিয়ার অধ্যয়ন। অন্যদিকে চলচ্চিত্রের সারবস্তু হলো পর্দায় মানবীয় ক্রিয়া ও আচরণের রূপায়ন। কাজেই মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে চলচ্চিত্রকে অধ্যয়নের মানে হলো চলচ্চিত্রের ধরন ও উৎপাদনকে শিল্পকলা-মনোবিদ্যার জায়গা থেকে বিচার করা।৩ এখানে মূলত অনুধাবন, কগনিশন, ন্যারেটিভ ও আবেগের জায়গাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।৪ আর আধুনিক চলচ্চিত্রে মনস্তত্ত্বের যেসব বিষয় উপস্থিত থাকে তা হলো¾মানুষের বিকাশ, স্টেরিওটাইপ, ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি, শিক্ষণ প্রক্রিয়া, লৈঙ্গিক পরিচয়, ব্যক্তিত্ব বৈকল্য, ট্রমা, অটিজম এবং চিকিৎসা সম্পর্কিত বিষয়াবলি।
পশ্চিমা ও উন্নত বিশ্বে মনোরোগ চিকিৎসা তথা সাইকোথেরাপি ও কাউন্সেলিং-এর ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র ব্যবহার করা হচ্ছে প্রচুর। গবেষণাও হচ্ছে বিস্তর। বাংলাদেশ, এমনকি ভারতবর্ষেও বিষয়টি নিয়ে তেমন আলোচনা ও গবেষণা নেই বললেই চলে। বর্তমান আলোচনার মনোযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো বিভিন্ন মনোরোগ থেকে আরোগ্য লাভ, বিকশিত হওয়া কিংবা জীবনবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রশ্নে চলচ্চিত্র কীভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারে তা অনুসন্ধান করা। এছাড়াও মনোরোগের বিভিন্ন মাত্রা সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভ, মানবীয় প্রেরণা, আবেগীয় মুক্তি ও স্বাভাবিক পরিবর্তনের প্রশ্নে চলচ্চিত্রের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে এই আলোচনায়। আর সমস্ত আলোচনার ভিত্তিভূমি ও লেন্স হলো মনস্তত্ত্বের কগনিটিভ চলচ্চিত্র তত্ত্ব৫, মনোবিশ্লেষণ তত্ত্ব ও রিসেপশন স্টাডিজ৬।
চলচ্চিত্র, মনস্তত্ত্ব ও রোগ আরোগ্য : তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
আলোচনার শুরুতেই কিছু প্রশ্ন হাজির করা যাক। প্রশ্নগুলো হলো¾চলচ্চিত্রের মধ্যে এমন কী আছে যা আমাদের ইন্দ্রিয়গত বোধকে উদ্দীপিত করে? উদ্দীপনা সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি কী? অর্থাৎ কীভাবে সেই উদ্দীপনা সৃষ্টি করে? চলচ্চিত্র কীভাবে পর্দায়, গল্পে ও বয়ানে মনোযোগ ধরে রাখে? কীভাবে মানুষের মধ্যে আবেগ, অনুভূতি, হাসি, কান্না, সাসপেন্স, হরর, দুঃখবোধ কিংবা বিস্ময়ের জন্ম দেয়? চলচ্চিত্র দেখার মাধ্যমে দর্শকের মনে কীভাবে বোধ সৃষ্টি হয়? চলচ্চিত্র দেখার সময় দর্শকের চিন্তন প্রক্রিয়াটি কেমনভাবে ঘটে? এই চিন্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে জ্ঞান অর্জিত হয় তার প্রকৃতি কেমন? চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জগৎ সম্পর্কে কী ধরনের নিজস্ব অর্থময়তা নির্মাণ করে? এসব প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে, মোটাদাগে বলা যায় চলচ্চিত্রে অভিনয়, শব্দ, ক্যামেরা সঞ্চালন ও সম্পাদনা কৌশলের মধ্য দিয়ে একটি গল্প বয়ানের জন্ম হয়।৭ সেই বয়ানের মধ্য দিয়ে দর্শক পুরোপুরি সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে দৃশ্য, গল্প ও বার্তার সঙ্গে। আর সেই সম্পৃক্তির ফলে দর্শকের দেহ ও মনে সৃষ্টি হয় বহুমাত্রিক জৈবিক ও মনোজাগতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া।৮ এছাড়াও উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া যায় চলচ্চিত্র সম্পর্কিত বিভিন্ন তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে। আর চলচ্চিত্র অধ্যয়নে প্রচলিত তাত্ত্বিক কাঠামোগুলো হলো¾অ্যাপারেটাস তত্ত্ব (apparatus theory), অঁতর তত্ত্ব (auteur theory), কগনিটিভ ফিল্ম তত্ত্ব (cognitive film theory), জনরা অধ্যয়ন (genre studies), ভাষাতাত্ত্বিক চলচ্চিত্র তত্ত্ব (linguistic film theory), মার্কসবাদী চলচ্চিত্র তত্ত্ব (marxist film theory), মনোবিশ্লেষণ চলচ্চিত্র তত্ত্ব (psychoanalytic film theory), কুয়ার তত্ত্ব (queer theory), স্ক্রিন তত্ত্ব (screen theory), বিনির্মাণ তত্ত্ব (deconstruction theory), নারীবাদী তত্ত্ব (feminist theory), আইডিওলজিকাল (ideological perspective), পোস্ট কলোনিয়ালিজম (post-colonial theory), পোস্ট মর্ডানিজম (post modernism theory), রিসেপশন স্টাডিজ (reception studies) ও কাঠামোবাদী দৃষ্টিভঙ্গি (structuralist approach)। অঁতর তত্ত্ব অনুযায়ী চলচ্চিত্র মূলত একজন পরিচালকের চিন্তা, ব্যক্তিত্ব, মনন, মতাদর্শ ও হয়ে ওঠার প্রকাশ। কাজেই একটি চলচ্চিত্রের সামগ্রিক সাফল্য ও ব্যর্থতা চলচ্চিত্রনির্মাতারই। অন্যদিকে ফরমালিজম দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, চলচ্চিত্রের সম্পাদনাগত দিক, ইমেজ, কম্পোজিশন ও অন্যান্য শৈল্পিক আঙ্গিক বিশ্লেষণ করা হয়। এছাড়া চলচ্চিত্রের মধ্যে নিহিত মতাদর্শিক, রাজনৈতিক জায়গাটি বিশ্লেষণ করা হয় আইডিওলজিকাল তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী। একই সঙ্গে খতিয়ে দেখা হয়, মানুষের আচরণ ও মনোভাবে এর প্রভাব। আর বিনির্মাণ তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী একটি চলচ্চিত্রকে বৈচিত্র্যের দিক থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়। বিশ্লেষণ করা হয় চলচ্চিত্রনির্মাতা, দর্শকের চিন্তা ও উপলব্ধির জায়গাটি। চলচ্চিত্রকে কগনিটিভ ও জৈবিক ভিত্তি ভূমিতে বিশ্লেষণ করাকে বলা হচ্ছে সাইকোসিনেমাটিক।৯ এই সাইকোসিনেমাটিকে চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা, মনোজাগতিক ক্রিয়া ও প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়; চলচ্চিত্রের নন্দনতাত্ত্বিক প্রকৃতি খতিয়ে দেখা হয় দৈনন্দিন যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার নিরিখে।
সার্বিকভাবে চলচ্চিত্র অধ্যয়ন করা হয় বহুবিদ্যায়তনিক জায়গা থেকে। আর সেই জায়গাগুলো হলো¾মনস্তত্ত্ব, কগনিটিভ সায়েন্স, নিউরো সায়েন্স, দর্শন, চলচ্চিত্র অধ্যয়ন, চলচ্চিত্রনির্মাণ, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব ইত্যাদি। কগনিটিভ নিউরো সায়েন্সের মতে, দর্শক কোনো চলচ্চিত্র বা চলচ্চিত্রের কোনো কোনো অংশ দেখার সময় তার অনুধাবনগত, আবেগগত ও মনোজাগতিক জৈব প্রক্রিয়া সেই চলচ্চিত্রে রূপায়িত বাস্তবতার সমান্তরালে ক্রিয়া করে।১০ দর্শক চলচ্চিত্র দেখে চোখ এবং কান দিয়ে। কিন্তু চলচ্চিত্রের অভিজ্ঞতা লাভ করে মন ও দেহ। চলচ্চিত্র দর্শকের মনে ক্রিয়া করে। তারা চলচ্চিত্রের প্রতি সাড়া দেয়। চলচ্চিত্র দর্শককে আশ্চর্যান্বিত করলে, তারা লাফ দিয়ে ওঠে। চলচ্চিত্র দৃশ্য হাজির করে, দর্শক সেই দৃশ্য অনুসরণ করে। চলচ্চিত্র কোনো বিষয়বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করলে দর্শক সেটা স্মরণ করে। চলচ্চিত্র দর্শকের আবেগ অনুভবের জন্য তাড়িত করলে, তারা তা অনুভব করে। যাহোক, আগেই যেমনটা বলা হয়েছে, বর্তমান আলোচনার তাত্ত্বিক ভিতটি হলো কগনিটিভ চলচ্চিত্র তত্ত্ব, মনোবিশ্লেষণ চলচ্চিত্র তত্ত্ব ও রিসেপশন স্টাডিজ। কগনিটিভ তত্ত্ব অনুযায়ী একজন দর্শক কীভাবে চলচ্চিত্র দেখে এবং উপলব্ধি করে তা ব্যাখ্যা করা হয়। রিসেপশন স্টাডিজ তত্ত্বের তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী চলচ্চিত্র দেখার পর দর্শকের মন, চিন্তা ও আচরণে প্রভাবের জায়গাটি বিশ্লেষণ করা হয়। খতিয়ে দেখা হয়, চলচ্চিত্রের সঙ্গে দর্শক কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করে সেই বিষয়টি।
চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। এই চলচ্চিত্র দেখার ফলে দর্শকের মধ্যে একধরনের অন্তর্দৃষ্টি ও অন্তর্গতবোধের জন্ম হয়। আর সেই অন্তর্দৃষ্টি ও বোধের কারণে তাদের চৈতন্যে জাগতিক ও মনোজাগতিক বাস্তবতার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। সেই বাস্তবতা নিশ্চিত করে মায়াময়তা। ফলে পর্দায় উপস্থাপিত চরিত্র ও ঘটনাবলিকে দর্শক খুব তীব্রভাবে উপলব্ধি, একাত্মতা কিংবা ভিন্নতা বোধ করে। কাজেই যাপিত জীবনের বাস্তবতা আর চলচ্চিত্রে উপস্থাপিত মায়াময় বাস্তবতার মধ্যে মিল-অমিলের জায়গাটি কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা চলচ্চিত্র থেরাপির পরিসরটি এটিই। চলচ্চিত্র দেখে দর্শক কখনো উদ্বেলিত হয়, আবার কখনো কখনো তাদের দুশ্চিন্তার মাত্রাও বেড়ে যায়। চলচ্চিত্রে ভীতিকর কোনো দৃশ্য দেখে দর্শক হয়তো কেঁদে ফেলে। আবার চলচ্চিত্রের কোনো চরিত্রের শোক-দুঃখ-যন্ত্রণা হলে দর্শক তা অনুভব করে। কিন্তু সেই শোক-দুঃখ-যন্ত্রণা লাঘবে তারা কোনো উদ্যোগ নেয় না; নিতেও পারে না। বরং দর্শক নিজের সঙ্গে মিল-অমিলের জায়গাটি খোঁজে এবং নিজের জীবন ও আচরণে তা প্রয়োগে উদ্যোগী হয়।
চলচ্চিত্র থেরাপি
চলচ্চিত্র থেরাপি বা মুভি থেরাপি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে কোনো পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা থেরাপিস্ট চিকিৎসা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রোগীকে বিশেষ কোনো চলচ্চিত্র দেখার পরামর্শ দেয়। চলচ্চিত্র দেখে রোগী তার রোগ ও জীবন বাস্তবতার বিভিন্ন মাত্রা উপলব্ধির চেষ্টা করে।১১ কোনো কোনো থেরাপিস্ট কখনো কখনো ব্যবহার করে চলচ্চিত্রের উপমা, প্রতীক ও ইমেজ। আর এসব ব্যবহারের মাধ্যমে থেরাপিস্ট রোগীর চিন্তা ও অনুভূতির গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করে; খুঁজে বের করে সমস্যার মূল জায়গাটি। কাজেই চলচ্চিত্র থেরাপি মনোরোগ চিকিৎসায় একটি সৃজনশীল থেরাপি কৌশল।১২ চিকিৎসা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টরা বিভিন্ন চলচ্চিত্র কিংবা চলচ্চিত্রের অংশ বিশেষ ব্যবহার করে থাকে। সাধারণত মনোরোগ চিকিৎসক, সমাজকর্মী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সিলর, সাইকিয়াট্রিস্ট, মনোবিদ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরাও চলচ্চিত্র ব্যবহার করে থাকে চিকিৎসা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে।
যাহোক, মনোরোগ চিকিৎসায় এই থেরাপির মূল বিষয়টি হলো মানুষের দেহ ও মনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার বিপুল সক্ষমতা রয়েছে চলচ্চিত্রের। সাধারণত বিভিন্ন শঙ্কা, বিষণ্নতা, আসক্তি, খাবার বৈকল্য কিংবা সম্পর্কের ভাঙাগড়া, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, সিজো-অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার, ম্যানিক ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার, অ্যাডিকশনের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আরোগ্য প্রক্রিয়ায় সহায়কের ভূমিকা পালন করে চলচ্চিত্র থেরাপি।১৩
চলচ্চিত্র থেরাপি মনোরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন থেরাপি কৌশলের একটি বিশেষ ধরন। অন্যান্য ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে¾শিল্পকলা থেরাপি, সঙ্গীত থেরাপি১৪। এটি একধরনের স্ব-সহায়ক থেরাপি। গত শতকের ৯০-এর দশকে চলচ্চিত্র থেরাপি ধারণাটির জন্ম এবং জনপ্রিয় হয়। এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ড. গ্রে সলোমন, এল বার্গ-ক্রস, পি জেনিংস ও আর বারুখ প্রমুখ।
মনোরোগ চিকিৎসায় চলচ্চিত্র মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।১৫ এক্ষেত্রে যেসব বিষয় গুরুত্ব সহকারে দেখা হয় সেগুলো হলো¾স্থান ও সময়কে ধারণ করার প্রশ্নে চলচ্চিত্রের অসীম সক্ষমতা। কেননা চলচ্চিত্রে বিভিন্ন গল্প, চরিত্র ও দৃশ্য একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। আর এসব কিছুকে অতি বাস্তব করে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব খুবই অল্প সময়ের মধ্যে। ফলে চলচ্চিত্র মনোযোগ কেন্দ্রীভূতকরণ, সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো উপলব্ধির ক্ষেত্রে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এই প্রক্রিয়ায় চলচ্চিত্র মানুষের চিন্তার ধরন ও অনুভূতি প্রকাশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে; সাহায্য করতে পারে জীবনের উত্থান-পতন মোকাবিলায়, মনোজগতের গভীর ও বৈচিত্র্যময় পরিস্থিতি উপলব্ধি ও অনুসন্ধান করতে। তাই বই ও সঙ্গীতের মতোই চলচ্চিত্রও ক্রমেই মনোরোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে। তবে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগীর বর্তমান সমস্যা ও পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটেছে এমন চলচ্চিত্র বাছাই করা।
চলচ্চিত্র থেরাপির মূল শিকড় নিহিত গল্প কথনের ইতিহাসে।১৬ মনোরোগ চিকিৎসায় বিভিন্ন গল্প ও রূপকথা ব্যবহার হয়ে থাকে। এই চিকিৎসায় গল্প ও গ্রন্থের ব্যবহারকে বলা হয় বিবলিও থেরাপি।১৭ চলচ্চিত্র থেরাপি ও বিবলিও থেরাপি বা গ্রন্থ থেরাপির মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। বিবলিও থেরাপি হলো মনোরোগ চিকিৎসায় বই কিংবা পঠনকে কাজে লাগানো। রোগীর নিজের গল্পকে মোকাবিলা করার প্রশ্নে ঐতিহাসিকভাবেই চিকিৎসকরা এসব গল্প ও রূপকথা ব্যবহার করে থাকে। কোনো কোনো দিক থেকে বিবলিও থেরাপির তুলনায় চলচ্চিত্র থেরাপি বেশি কার্যকর, ফলপ্রসূ ও গতিশীল। কেননা বিবলিও থেরাপিতে ব্যবহার করা হয় লিখিত শব্দ। অন্যদিকে চলচ্চিত্র থেরাপিতে ব্যবহার করা হয় চলচ্চিত্র থেকে বাছাই করা ইমেজ ও সংলাপ। ফলে রোগীর ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র থেরাপি গ্রহণ বেশি সহজ। কেননা বই পড়ার চেয়ে চলচ্চিত্র দেখার কাজটি তাত্ত্বিকভাবেও সহজ। তাছাড়া চলচ্চিত্র দেখতে সময়ও কম লাগে। ফলে চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি খুব দ্রুত সম্পাদিত হয়। তবে খুব দ্রুত সম্পাদিত হলেই যে ভালো কাজ করবে বিষয়টা মোটেও সেরকম নয়।
মনোরোগ থেকে আরোগ্য লাভে চলচ্চিত্র
বলা হয়ে থাকে, একটি স্থির ছবি এক হাজার শব্দের সমান অর্থ প্রকাশ করে। গতিশীল ছবির ক্ষেত্রেও কি একথা সমানভাবে প্রযোজ্য? উত্তরে বলা যায়, স্থির ছবির তুলনায় সম্ভবত গতিশীল ছবির ক্ষেত্রে এটা বেশি প্রযোজ্য। তাই মনোরোগের মতো যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তি লাভের ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র হতে পারে এক শক্তিশালী হাতিয়ার১৮; নেতিবাচক চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা মনোভাব পরিবর্তনের প্রশ্নে কার্যকর অনুঘটক।১৯ কেননা চলচ্চিত্র একজন দর্শককে সম্পৃক্ত করে বিভিন্নভাবে। আর সেই সম্পৃক্তির ধরনগুলো হলো¾ভাষাতাত্ত্বিকভাবে (linguistically), দৃশ্য-স্থানিকভাবে (visuospatially), আন্তঃব্যক্তিকতার জায়গা থেকে (interpersonally) ও অন্তমনোজাগতিকতার জায়গা থেকে (intrapsychically)। এটি ব্যক্তিকে তার অন্তর্জগৎ সংলাপে যুক্ত করে। সংযোগ ঘটায় সাংস্কৃতিক অচেতনের সঙ্গে। আর এই সংলাপ ও সাংস্কৃতিক সংযোগটি অত্যন্ত গভীরভাবে ঘটে। এই গভীরতার জায়গাটি কখনো কখনো স্বাভাবিকভাবে উপলব্ধি করা যায় না।
পুরনো আমলের প্রেক্ষাগৃহগুলোর দিকে তাকালে ধর্মীয় উপাসনালয় ও হাসপাতালের থেরাপি দেওয়ার কক্ষগুলোর সঙ্গে একধরনের প্রতীকী মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষাগৃহ কিংবা উপাসনালয় উভয়ই অত্যন্ত পবিত্র জায়গা। এখানে কাজ করে না কোনো ভীতিবোধ। বরং ব্যক্তি এখানে তার একান্ত দুঃখ, যন্ত্রণা ও পীড়া থেকে মুক্তি লাভ করতে চায় এবং করেও। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে¾হোক না সেই চলচ্চিত্রটি হাসির কিংবা কান্নার। চলচ্চিত্রে বিভিন্ন ইমেজ, শব্দ, সংলাপ, আওয়াজ, আলো ইত্যাদির মাধ্যমে বহুমাত্রিক প্রতীকী বার্তা নির্মাণ করা হয়। এই বার্তা মানবীয় আবেগের অতল গভীরে প্রবেশ করে। চলচ্চিত্র দেখার সময় ব্যক্তিকে নিয়ে যায় সক্রিয় চৈতন্যবোধ থেকে একেবারে অচেতন অবস্থায়। চলচ্চিত্রের বহুমাত্রিক প্রতীকী বার্তার সঙ্গে ব্যক্তির আবেগ ও চৈতন্য গভীরভাবে মিশে যাওয়ার কারণে সে বর্তমান আত্মবোধের দিকে নজর দিতে পারে না। সচেতনভাবে উপলব্ধি করতে পারে না নিজের আত্মবোধকে। কেননা সেই আত্মবোধ আর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে না। প্রতিনিয়তই তা গল্পের প্লটের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে, গল্পের গতি ও ক্রিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে থাকে। গল্পের সেই প্লট, ইমেজ, সংলাপ ও শব্দগুলো তাকে আঘাত করতে থাকে খুব জোরালোভাবে। অন্যদিকে চলচ্চিত্রের বহুমাত্রিক প্রতীকী বার্তাগুলো ব্যক্তির অচেতন অবস্থাকে উদ্দীপিত করতে থাকে। ফলে তার মনোজগতে এক বিশেষ ধরনের শক্তি অবমুক্ত হয়। আর আবেগীয়ভাবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে পড়ার কারণে দর্শক তার বর্তমান যাপিত জীবনের অবস্থা ও অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আসলে সে বর্তমানের দুঃখ, কষ্ট, বেদনা ও সমস্ত নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যায়। এই ভুলে যাওয়ার ফলে সে আবারও একান্ত আবেগীয় জীবনের সঙ্গে একধরনের সংযুক্তি লাভ করে।
এছাড়া চলচ্চিত্রের বিশেষ কোনো চরিত্র কিংবা পরিস্থিতির সঙ্গে ব্যক্তি নিজ জীবনের মিল ও অমিলের জায়গাগুলো খুঁজতে থাকে এবং খুঁজেও পায়। চলচ্চিত্রের পর্দায় সে দেখতে পায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া নিজ জীবনের অবস্থা ও অভিজ্ঞতাগুলোকে। ফলে চলচ্চিত্রের বার্তাগুলোকে গ্রহণ করে খুব সহজে। কেননা চলচ্চিত্রের সেই বার্তাগুলো আর অন্য কারো থাকে না। বরং চলচ্চিত্রে দর্শক তার নিজ জীবনের প্রতিফলনই দেখতে পায়। ফলে চলচ্চিত্র ব্যক্তির অন্তর্জগতের বিকাশকে উদ্দীপিত করে। শুধু তাই নয়, সেই বিকাশের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। রূপান্তর ঘটায় তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনোজাগতিক অভিজ্ঞতার। এর ফলে ব্যক্তি নিজেকে আবিষ্কার করে নতুনভাবে, ভিন্ন মাত্রায়। এভাবে চলচ্চিত্রের বড়ো পর্দায় বৈচিত্র্যময় ইমেজ ও শব্দ মনোজাগতিক আয়না হিসেবে কাজ করে। ফলে চলচ্চিত্র একই সঙ্গে দুই স্তরের বাস্তবতায় ক্রিয়া করে; বাস্তবতার স্তরগুলো হলো¾ব্যক্তির অন্তর্জগৎ ও বাহ্যিক জীবন। অন্তর্জাগতিক বাস্ততবতা ও বাহ্যিক বাস্তবতার সমষ্টিতেই একজন সুস্থ মানুষের বাস ও অস্তিত্ব বিদ্যমান।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছে, সঠিক চলচ্চিত্র দেখার অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট ভূমিকা রয়েছে। কেননা অন্তুত দুই ঘণ্টার জন্য হলেও সবচেয়ে গভীর, তীব্র অনুভূতিগুলো ভুলিয়ে রাখে। এ সময় মস্তিষ্ক নতুন করে বিন্যাসিত হয়।২০ শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্র দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি ও বিষণ্নতা প্রশমন২১, আসক্তি দূর করা, পারিবারিক সহিংসতা মোকাবিলা করা২২, আপনজনের মৃত্যু কিংবা অন্য কোনোভাবে হারানোর যন্ত্রণা প্রশমন, আতঙ্ক বৈকল্য দূর করা, সামাজিক ভীতি দূর, চেহারা-সৌন্দর্য-অঙ্গসৌষ্ঠব নিয়ে অতিমাত্রায় চিন্তা-দুশ্চিন্তায় ভোগা, খাদ্য বৈকল্য ও ট্রমা সম্পর্কিত বৈকল্য থেকে আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে খুবই কার্যকারী।২৩
চলচ্চিত্র থেরাপি যেভাবে সহায়তা করতে পারে
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, চলচ্চিত্র খুব সহজেই মানুষের আবেগের খুব গভীরে প্রবেশ করতে পারে। চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়ায় সহায়কের ভূমিকা পালন করে, রোগীর নেতিবাচক মনোভাব দূর করতে সহায়তা করে। ব্যক্তির জীবন, সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে উপলব্ধি, অন্তর্দৃষ্টি লাভ, আত্মবিশ্লেষণকে উৎসাহিত করে।২৪ শুধু তাই নয়, ব্যক্তির মধ্যে নিহিত সুপ্ত, চাপা ও অপ্রকাশিত আবেগ প্রকাশে সহায়কের ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও চলচ্চিত্র ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান অন্তর্নিহিত শক্তিকে চিহ্নিত ও সেই শক্তিকে কাজে লাগাতে সহায়তা করে।
চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা হ্রাস করতে পারে ব্যক্তির যন্ত্রণাময় আবেগের মাত্রা। কিংবা দিতে পারে কষ্টানুভূতি থেকে মুক্তি। মনের গহীনে কুণ্ডলী পাকা অমিমাংসিত সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে। বাড়াতে পারে আত্ম-সচেতনতা। যেকোনো ধরনের আসক্তি থেকে মুক্তি দিতে পারে কিংবা সম্ভব করতে পারে পুনরায় আসক্ত না হয়ে পড়ার আশঙ্কা। চলচ্চিত্র দেখার ফলে ব্যক্তি নিজ ও অন্যের আচরণকে উপলব্ধি করতে পারে আরো গভীর, স্পষ্ট ও ভালোভাবে; জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারে সম্পূর্ণ নতুন ও কল্যাণকর দৃষ্টিকোণ থেকে; জোড়া লাগাতে পারে ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক; পেতে পারে জীবনের নতুন আশা; অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে সুখানুভূতি ও আনন্দের; কিংবা নিজেকে দেখতে পারে নতুন আলোয়। চিন্তা করতে পারে জীবন বাস্তবতার বর্তমান অবস্থার বিকল্প সম্পর্কে। অনুসন্ধান করতে পারে সেই বিকল্পগুলোকে। সমাধান খুঁজে পেতে পারে জটিল সমস্যার। মনের গহীনে বাসা বাঁধা সংকীর্ণ বিশ্বাসগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে। দূর করতে পারে সেই বদ্ধমূল বিশ্বাসগুলোকে। বিদ্যমান সম্পর্কগুলোকে দিতে পারে ইতিবাচক মাত্রা। ফলে আপনজনের সঙ্গে সম্পর্কটি হয়ে উঠতে পারে আরো স্বাস্থ্যকর। আরোগ্য লাভ করতে পারে ট্রমা থেকে। নিজের লক্ষ্য উদ্দেশ্যগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারে। নির্ধারণ করতে পারে জীবনের নতুন লক্ষ্য। শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্র দেখার ফলে একজন ব্যক্তি পারে নিজের আচরণ, বিশ্বাস ও বাস্তবতাকে মেনে নিতে।
মনোরোগ থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে দরকারি হলো অনুপ্রেরণা। চলচ্চিত্র সেই অনুপ্রেরণার অফুরন্ত উৎস হিসেবে কাজ করে। ফলে সে জীবনের উদ্দেশ্য পূরণ এবং লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে আরো উদ্যোগী ও উৎসাহী হয়। কিংবা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনে দীর্ঘ দিনের আচরণ, অভ্যাস, বিশ্বাস ও বোধে। ব্যক্তি উপলব্ধি করে, কেবল তারই নয় বরং আরো অনেক মানুষ একই রকম যন্ত্রণাময় জীবন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিজেকে আবিষ্কার করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নতুনভাবে। নিতে পারে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত। মিটিয়ে ফেলতে পারে পারিবারিক কিংবা বৈবাহিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতগুলো। স্বামী, স্ত্রী কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সংলাপের দরজা খুলে দিতে পারে। বিদ্যমান দুঃখ, যন্ত্রণা, কষ্ট থেকে মুক্তি লাভের জন্য কাজ করতে পারে নিজ উদ্যোগে। দূর করতে পারে পুরাতন আঘাত কিংবা প্রত্যাখাত হওয়ার অনুভূতিগুলোকে। বাড়াতে পারে আত্মমর্যাদাবোধ। খুঁজে পায় আদর্শ ও উপকারী রোল মডেল। অনুভূত বাধাগুলোকে দেখতে পারে অমিত সম্ভাবনা হিসেবে। মুক্ত হতে পারে বিষাক্ত সম্পর্কগুলো থেকে। নিজেকে ও অন্যকে ভালোবাসার প্রশ্নে আরো উন্মুক্ত হতে পারে। নিজ ও অন্যের প্রতি জন্মাতে পারে গভীর মায়া, মমতা ও ভালোবাসা। হয়ে উঠতে পারে আরো সহনশীল। জটিল বাধা মোকাবিলায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কারো কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হলে ভেঙে না পড়ে তা মোকাবিলা করতে পারে শক্তভাবে। অতীত আঁকড়ে ধরে না থেকে এগিয়ে যায় ইতিবাচক জীবনের আহ্বানে। নির্ধারণ করতে পারে নিজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে। এড়াতে পারে অযথা নেতিবাচক অনুমান। শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্র নানান মনোরোগ যেমন পোস্ট ট্রমাটিক ডিসঅর্ডার, বিষণ্নতা, সামাজিক দুশ্চিন্তা বৈকল্য, সবধরনের আসক্তি ও খাদ্য বৈকল্য থেকে আরোগ্য লাভে সহায়তা করতে পারে। আবিষ্কার করে জীবন, মৃত্যু ও জীবন-মৃত্যুর মধ্যে বিদ্যমান অতি জটিল ও সূক্ষ্ম সীমারেখাটিকে। উপলব্ধি করে জীবনের নতুন ও ইতিবাচক অর্থময়তা।
মনোরোগ থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে চলচ্চিত্র দেখার কৌশল
রোগ মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে হলে চলচ্চিত্র দেখার ক্ষেত্রে কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে। আর সেই কৌশলগুলোর অন্যতম হলো চলচ্চিত্র দেখার পর পরই নোট নেওয়া। সেই নোটগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে চিকিৎসক কিংবা পরিবারের আপনজনের সঙ্গে। চলচ্চিত্র দেখার পর যেসব বিষয়ে নোট নিতে হবে তা হলো :
ক. চলচ্চিত্র দেখার সময় সেইসব অনুভূতি সম্পর্কে নোট নিতে হবে কিংবা স্মরণে রাখতে হবে, যেগুলোর মাত্রা ছিলো তীব্র, জন্ম দিয়েছে গভীর ভাবনাচিন্তা কিংবা দুশ্চিন্তার, বোধ হয়েছে অস্বস্তি কিংবা নিজের বিশ্বাস, বোধ, আচরণ, অভ্যাস কিংবা অন্যকিছুর সঙ্গে অমিল রয়েছে। খেয়াল রাখতে হবে, করুণ কিংবা হৃদয়বিদারক কোনো দৃশ্যে কিংবা মৃত্যুর দৃশ্যের সময় হাসি কিংবা উৎফুল্লতার উদ্রেক হচ্ছে কি না। কিংবা কোনো ইতিবাচক দৃশ্য দেখার সময় দুঃখ, রাগ ও ক্ষোভের উদ্রেক হচ্ছে কি না।
খ. যে চরিত্র বা যেসব চরিত্রের সঙ্গে নিজের মিল খুঁজে পাওয়া গেছে, সেই মিলের জায়গা ও কারণগুলো কী কী।
গ. কোনো চরিত্রের বিশেষ কোনো দিক বা গুণাবলি থাকলে সেগুলো কী কী।
ঘ. সবচেয়ে অপছন্দ লেগেছে কোন চরিত্র এবং কেনো?
ঙ. যেসব দৃশ্য শক্তিশালী আবেগ-অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। সেসব দৃশ্যে কী কী ঘটনা ঘটেছে। দৃশ্যগুলোর মূল বক্তব্যইবা কী।
চ. চলচ্চিত্রের সমাপ্তি মনোজগতে কী প্রভাব ফেলেছে। চলচ্চিত্রটির শেষ দৃশ্যের পর নিজেকে কি শূন্য কিংবা হতাশ মনে হয়েছে?
ছ. চলচ্চিত্রটির কোনো চরিত্র কি অতীত কিংবা বর্তমানের কোনো বিষয়, ঘটনা কিংবা ব্যক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে?
জ. চলচ্চিত্রটির কোন দিকটি সবেচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে এবং সবচেয়ে বেশি খারাপ লেগেছে কোনটি?
ঝ. তীব্র আবেগের কারণে কোনো দৃশ্য দেখতে না পারলে।
ঞ. এমন কোনো দৃশ্য যা বিশেষত্ব বহন করে।
ট. চলচ্চিত্রটি থেকে মূল যে বার্তাটি পাওয়া গেছে।
ঠ. চলচ্চিত্রটির এমন কোনো বিষয় বা দিক, যা নিজ জীবনে প্রয়োগ করতে চাই।
উপসংহার
শুরুতেই বলেছি, চলচ্চিত্র খুবই শক্তিশালী যোগাযোগ মাধ্যম। এটি মানুষের মন-চৈতন্য-বোধকে প্রভাবিত করে গভীর মাত্রায়। কিছু কিছু চলচ্চিত্র দর্শকের আবেগীয় যন্ত্রণাকে প্রশমিত করে। শুধু তাই নয়, মনোরোগ সম্পর্কে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতেও চলচ্চিত্র শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। পৌঁছাতে পারে লাখ লাখ মানুষের কাছে। এসব মানুষ হয়তো জীবনে কখনোই মনোবিজ্ঞানের কোনো টেক্সট বই পড়বে না। সারাজীবনে কখনোই মানসিক অসুস্থতার অভিজ্ঞতা লাভ করবে না। কাজেই মানসিক স্বাস্থ্য বৈকল্য আক্রান্ত ব্যক্তিদের জীবন-বাস্তবতার রূপায়ণ চলচ্চিত্রে সঠিকভাবে হলে তা সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে। দূর করতে পারে মনোরোগ সম্পর্কিত সমস্ত কুসংস্কার। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি বা পরিবার চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হবে। বিষয়টি নিয়ে বন্ধুবান্ধব, পরিবার কিংবা আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করতে পারবে খুব সহজেই।
কিন্তু এই ধরনের চলচ্চিত্র বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ না হওয়ার কারণও রয়েছে বহুমাত্রিক। এর অন্যতম কারণ হলো দেশে, সমাজে মনোবৈজ্ঞানিক চর্চা, অনুশীলনও কম। তবে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে অল্প সময়ের মধ্যে এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়বে, যার মূল থিম হবে মনোবিশ্লেষণ ও সমাজ-বাস্তবতা। সেই দিনও হয়তো বেশি দূরে নয়, যখন মনোরোগ চিকিৎসকগণ চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় এদেশেই নির্মিত ”লচ্চিত্র ব্যবহার করবে। তখন চলচ্চিত্র কেবল চটুল বিনোদনের মাধ্যম হবে না। বরং এটি হবে সমাজের শিরায়, উপশিরায় বয়ে যাওয়া এবং মানুষের মনের অতল গহীনে বিদ্যমান হতাশা, যন্ত্রণা, ক্ষোভ, দুশ্চিন্তা ও নিঃসঙ্গতা দূর করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
লেখক : আমিনুল ইসলাম, রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে পড়ান।
https://www.facebook.com/aminuljcms
Z_¨m~Î
1. Fearing, F. (1947); `Influence of the Movies on Attitudes and Behavior’; The ANNALS Of The American Academy Of Political And Social Science; 254(1), 70-79. doi: 10.1177/000271624725400112
2. Poland, J. (2015); Lights, camera, emotion! An examination on film lighting and its impact on audiences’ emotional response (master); Cleveland state university.
3. Tan, Ed S. (2018); `A psychology of the film’; Palgrave Communications, 4:82, doi: 10.1057/s41599-018-0111-y
4. Shimamura, A. (2013); Experiencing art: In the brain of the beholder; Oxford University Press.
5. Nannicelli, T. & Taberham, P. (2014); Cognitive media theory; New York: Routledge.
6. Biltereyst, D. & Meers, P. (2018); `Film, cinema and reception studies’; Reception Studies And Audiovisual Translation; 21-42. doi: 10.1075/btl.141.03bil
7. Branigan, E. (1992); Narrative Comprehension and Film; Routledge, Chapman & Hall, Incorporated
8. Shimamura, A. (2013); Psychocinematics: Exploring Cognition at the Movies; Editor: A. Shimamura; Oxford University Press.
9. Hasson et al (2008); `Neurocinematics: The Neuroscience of Film’; Projections, 2(1); 1-26. doi: 10.3167/proj.2008.020102
10. Shimamura, A. & Palmer, S. (2014); Aesthetic science: Connecting Minds, Brains, and Experience; Oxford: Oxford University Press.
11. Mangin, D. (1999); `Cinema therapy: How some shrinks are using movies to help their clients cope with life and just feel better’; Health and Body; May 27.
12. Berg-Cross, L., Jennings, P. & Baruch, R. (1990); `Cinematherapy: Theory and application’; Psychotherapy in Private Practice; 8(1), 135-156.
13.Schulenberg, S. E. (2003); `Psychotherapy and Movies: On Using Films in Clinical Practice’; Journal of Contemporary Psychotherapy; 1, 36-48.
14. Lowe, L. (2017); Music Therapy; Hauppauge: Nova Science Publishers, Inc.
15.Wedding, D., Boyd, M. & Niemiec, R. (2005); Movies And Mental Illness: Using Films To Understand Psychopathology (2nd ed.); Cambridge [USA]: Hogrefe & Huber Pub.
16.Bergner, R. (2007); `Therapeutic Storytelling Revisited’; American Journal Of Psychotherapy, 61(2); 149-162. doi: 10.1176/appi.psychotherapy.2007.61.2.149
17. Pardeck, J. & Pardeck, J. (1992); Bibliotherapy; San Francisco: EM Text.
18.Wedding, D. & Niemiec, R. (2003); `The clinical use of films in psychotherapy’; Journal Of Clinical Psychology, 59(2), 207-215. doi: 10.1002/jclp.10142
19.Borchard, T. (2018); `Cinematherapy: The Healing Power of Movies and TV’; Retrieved from https://psychcentral.com/blog/cinematherapy-the-healing-power-of-movies-and-tv/
20.Miller, G. (2018); How Movies Synchronize the Brains of an Audience; Retrieved from https://www.wired.com/2014/08/cinema-science-mind-meld/
21. Dumtrache, S. (2014); The Effects of a Cinema-therapy Group on Diminishing Anxiety in Young People. Procedia - Social And Behavioral Sciences, 127, 717-721. doi: 10.1016/j.sbspro.2014.03.342
22.Dutto O, Zilio M. (2012); `Projections: a film therapy intervention project to promote awareness of gender based violence in drug-addicted young men attending an addiction clinic’; Interdisciplinary Journal of Family Studies; 17(2).
23.cÖv¸³; Borchard (2018).
24.Solomon, D. G. (2001); Reel Therapy How Movies Inspire You to Overcome Life’s Problems; New York, NY: Lebhar-Friedman books.
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন