সৌমিত্র দস্তিদার
প্রকাশিত ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
প্রসঙ্গ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ
তত্ত্ব এবং বাস্তবতার ফারাক
সৌমিত্র দস্তিদার
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি
কখনো কখনো এক অদ্ভুত ধাঁধার মধ্যে ঘুরপাক খাই; বুঝে উঠতে পারি না; এতো বছর ধরে এতো এতো তথ্যচিত্র-প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছি বটে; কিন্তু কোনোটাই কি ঠিকঠাক সিনেমা হয়ে উঠতে পেরেছে! আসলে বলতে চাচ্ছি, সবসময় কি ব্যাকরণ মেনে কাজ করতে পেরেছি? কলকাতায় নানা সময়ে আমাকে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, এখনো হতে হয়। কোনো কোনো সময় শিক্ষার্থীরা জানতে চেয়েছে, অমুক সিনেমায় আপনি এতো এতো শট ব্যবহার করেছেন, এগুলো কি ঠিক? কারো চিন্তা ভয়েজওভার সাউন্ড নিয়ে, আবার কেউ মন্তব্য করেছে, সিনেমাটা আরো ভালো হতে পারতো; ইত্যাদি ইত্যাদি। মূলত সব প্রশ্ন ফর্ম নিয়ে, কনটেন্ট নিয়ে কম।
কনটেন্ট নিয়ে প্রশ্ন কম, তার একটা কারণ হতে পারে, আমি যে ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক সিনেমা করি, তা অনেক নির্মাতাই করে না। গুজরাট গণহত্যা; মনিপুরের আফস্পা (সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন) বিরোধিতায় কাংলা দুর্গের সামনে ভারতীয় মায়েদের নগ্ন প্রতিবাদ; ভূপাল গ্যাস ট্রাজেডির ২৫ বছর; ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে বসতার উত্তর-পূর্ব ভারতে বাঁধ নির্মাণের কুফল; মাওবাদী রাজনীতির অন্দরের চিত্র, দিনের পর দিন তাদের সঙ্গে থেকে এক নিষিদ্ধ নির্মাণ; কিংবা স্বাধীনতার এতো বছর বাদে পশ্চিম বাংলার বাঙালি মুসলমানের জীবনের বারমাস্যা; দেশভাগ ও আজকের আসামের ৪০ লাখ লোকের নাগরিকত্ব হারানো¾এসব নিয়ে আমি কাজ করেছি। পাশাপাশি কাজ করেছি সুন্দরবনের প্রান্তিক জীবন নিয়ে। এগুলো নিয়ে আমার যে সিনেমা, তা যদি কেউ ভালোভাবে লক্ষ করে, তাহলে দেখবে সবকটি তথ্যচিত্র-প্রামাণ্যচিত্রের পিছনেই কোনো না কোনোভাবে অন্য এক অজানা দেখা আছে; যা সরকারি তথ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই ভিন্নতা আমি ক্যামেরার মধ্যে দিয়ে তুলে ধরতে চেয়েছি।
ফলে যেটা হয়েছে, সিনেমা বানানোর ব্যাকরণ নিয়ে মাথা ঘামাইনি, ঘামাতেও পারিনি। কী করে করবো! ধরুন, মনিপুরে আফস্পা বিরোধী গণআন্দোলনের সিনেমা করতে আমি যখন ইম্ফল, তখন সেখানে কারফিউ চলছে রাস্তায় রাস্তায়; আধা সামরিক বাহিনী ও পুলিশের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ চলছে, তারা রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছে; আবার কোথাও কোথাও জনতা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভও করছে। তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমার দুজনের ইউনিট, আমি আর ক্যামেরাম্যান, তখন যা সব ছবি তুলেছি¾এডিটিং টেবিলে বসে বুঝেছি¾কেতাবি সিনেমায় তার অধিকাংশই বাতিল, এন জি। কিন্তু আমি সেগুলো ব্যবহার করেছি; কারণ ওই সময়ের ‘অশান্তির’ এই প্রামাণ্য দলিলকে বাদ দেওয়া অসম্ভব। আসলে জন্মলগ্নেই সিনেমা পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ পথ চলতে চলতে আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে। সুতরাং আজ যখন প্রযুক্তির এতো প্রাচুর্য, সেখানে তথাকথিত ব্যাকরণ মেনে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে আমি বিশ্বাস করি না।
২.
আসলে আমি প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা হবো এটা ঠিক ছিলো না, ছিলাম তো সাংবাদিক। তবে সিনেমাপ্রেম আমার আশৈশব। পরিচালক হবো হবো, এই সময়ে সেসময়কার দুই ক্ষ্যাপাটে নির্মাতাকে পেয়েছিলাম। বস্তুত তারা আমার নির্মাণ দর্শনই শুধু পাল্টে দেয়নি; বলা ভালো জলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে যেমন হয়, ডুববে না হয় সাঁতার শিখবে। তেমনই আমাকেও প্রায় জলে ফেলে দিয়ে¾আজকের যেটুকু আমি হতে পেরেছি, তা হয়েছে ওই দুই বিখ্যাত নির্মাতার জন্য।
প্রথমজন, আজও আমার পরম অভিভাবক, বন্ধু ফরাসি নির্মাতা কাথরিন বার্জ। অন্যজন আমেরিকান নির্মাতা জন জোস্ট (Jon Jost)। কাথরিনের শেখানোর পদ্ধতি একেবারেই অন্যরকম। ও কলকাতায় এসেছিলো বিখ্যাত অভিনয়শিল্পী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ওপর একটা তথ্যছবি নির্মাণের কাজে। যার প্রযোজক ছিলো মার্চেন্ট আইভরি প্রোডাকশন। প্রজেক্টটা নিয়ে কলকাতায় ছুটে এসেছিলেন স্বয়ং ইসমাইল মার্চেন্ট। কাথরিন আর ইসমাইল সাহেবের সৌজন্যেই ইন্টারভিউ দিয়ে চান্স পেয়েছিলাম ইউনিটের একমাত্র বাঙালি সদস্য হিসেবে। ক্যামেরাম্যান ও ইউনিটের অন্যান্যরা ছিলো হয় বিদেশি, না হয় মুম্বাইয়ের টেকনিশিয়ান। এ এক আন্তর্জাতিক ব্যাপার-স্যাপার! এজন্য প্রথম প্রথম আমি একটু কুণ্ঠিতই ছিলাম। তখন বয়স কম, সেরকম অভিজ্ঞতা নেই। কিছুদিন এক পরিচালকের সহকারী হয়ে কাজ করেছি মাত্র। কাথরিনের ইউনিটে আমার মুখ্য কাজ ছিলো স্ক্রিপ্টে সাহায্য করা। কারণ সিনেমার ভাষাটা বাংলা। ফ্রেন্স ও ইংরেজি সাবটাইটেল থাকলেও মূল গুরুত্ব ছিলো বাংলায়। ফলে অনুবাদ পরিমার্জন, খুঁটিনাটি সংলাপ দেখা, সবমিলিয়ে প্রচুর চাপ ছিলো।
কিন্তু ক্রমে ক্রমে আমি আবিষ্কার করলাম, আমার ভিতরের আড়ষ্ট, কুণ্ঠিত ভাবটা কোথায় কখন দূর হয়ে গেছে। আমি টেরও পাইনি। আসলে কাথরিনের কাজের স্টাইলটাই ছিলো এমন¾ও তথাকথিত ডিরেক্টরস মুভিতে বিশ্বাস করতো না। ইউনিটের সবার আলাদা আলাদা দায়িত্ব থাকলেও এখানে যেনো সিনেমাটা সবার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
কাথরিন শট নেওয়ার আগে দলের সব সদস্য, এমনকি লাইট বয়কেও জিজ্ঞাসা করতেন, ঠিকঠাক আছে কিনা শটটি? টানা শুটিং হয়েছে, আমরা একটি বাড়ি ভাড়া করে সবাই রেসিডেন্সিয়াল ক্যাম্প করে থেকেছি। প্রত্যেক দিন প্যাক আপ-এর পর আমরা কাথরিনের মুখোমুখি হতাম। সারাদিনের কাজ নিয়ে ভুলত্রুটি মনে হলে নির্দ্বিধায় তাকে বলতে পারতাম। এই স্টাইলটা ইউনিটের সবার মধ্যেই আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয় এবং সবাই স্রেফ টাকাপয়সার জন্যে নয়, সিনেমাটা কতো ভালো হয়, তা নিয়ে নিজের নিজের সেরাটা বের করে আনতে থাকে।
জন জোস্ট-এর সঙ্গে অবশ্য আমি কাজ করিনি। ছোটো একটা ওয়ার্কশপে কিছু সময় অংশ নিয়েছি। জন আন্ডারগ্রাউন্ড চলচ্চিত্রনির্মাতা। বস্তুত বিদেশে অন্যধারার, প্রথার বাইরে থাকা, কম বাজেটের নির্মাতাদের আন্ডারগ্রাউন্ড চলচ্চিত্রনির্মাতা বলা হয়ে থাকে। জন-এর কাজের সঙ্গে ব্রেখটিয়ান ঘরানার নাট্যশিল্পীদের মিল আছে। কিছুটা থার্ড থিয়েটারের সঙ্গেও ওর কাজের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। ও সাধারণত একাই একটা ইউনিট। ক্যামেরা নিয়ে ও অসম্ভব অ্যাবস্ট্রাক্ট কিছু শট সাজিয়ে অদ্ভুত সব সেরিব্রাল দৃশ্যের জন্ম দিতো। এতোটাই সেরিব্রাল, যা বার বার দেখে সামান্যই বোধগম্য হতো সাধারণের।
৩.
যদিও দুজনের কাজকর্মের সঙ্গে আমার সিনেমার কোনো মিল নেই। তবু এতো সময় ধরে এদের কথা বলছি এজন্যেই যে, ওই দুই জন আমাকে প্রথা ভাঙার সাহস ও প্রবল উৎসাহ জুগিয়েছে। ফলে সবসময় সব সিনেমায় আমি কিছু না কিছু পরীক্ষা চালিয়ে গেছি। গুজরাট গণহত্যা নিয়ে আমি দুটি সিনেমা করি। একটি ২০০২ খ্রিস্টাব্দে, গুজরাট যখন জ্বলছিলো। তখন ক্যামেরা নিয়ে প্রায় লুকিয়ে লুকিয়ে সেখানকার ছবি তুলেছি। অন্যটি তার ঠিক দুই বছর বাদে, আহমেদাবাদ, সুরাত, বদোদরার রাস্তা-মহল্লায় জনবসতির মধ্যে গিয়ে জেনোসাইড ভিকটিমদের¾জনজীবনে ২০০২-এর ক্ষত তখনো কতো গভীর, জীবন্ত, তা বোঝার চেষ্টা করেছিলাম ক্যামেরা নিয়ে। ওই একেকটা সিনেমা করতে গিয়ে আমি যা যা শিখেছি, কোনো ফিল্ম ইন্সটিটিউটের ক্লাসঘর তা কখনোই শেখাতে পারবে না। শুধু নির্মাণ শিখেছি তা নয়, দেখার চোখ, বোধ, দর্শন সবই কেমন পাল্টে গেছে প্রামাণ্যচিত্র বানাতে গিয়ে। আমার দেশের সংখ্যালঘু জীবন-যন্ত্রণা কোনোদিন টের পেতাম না, ওই গণহত্যার ছবি যদি তুলতে না যেতাম!
গোটা শুটিং প্রক্রিয়াই এক মস্ত অভিজ্ঞতা। চার জনের ইউনিট নিয়ে যখন আহমেদাবাদে পৌঁছলাম, তখন প্ল্যাটফর্ম থিকথিক করছে মানুষে। বলাই বাহুল্য সবাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। মহল্লা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে নিরাপত্তার খোঁজে সেখানে বাস করছে। আপাত শান্ত মনে হলেও বাইরে মিলিটারি টহল দিচ্ছে। তখন দুপুর। অদ্ভুত এক হলুদ রঙের আলো সারা আহমেদাবাদকে যেনো ঢেকে রেখেছে। স্টেশন থেকে বেরোনোর পর আমরা কোনো জায়গা পাচ্ছিলাম না থাকবার। বাইরের লোকদের থাকবার অনুমতি নেই। সংঘ পরিবার মানে আর এস এস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) হুমকি দিয়ে রেখেছে। অনেক চেষ্টার পর পুলিশ-থানার উল্টো ফুটপাতে যাওবা একটা হোটেল পেলাম, সেখানে পানি দেবারও লোক নেই; খাবার পাবার তো প্রশ্নই উঠে না। ছাদে উঠে দেখি, চারপাশে আগুন জ্বলছে। নিচে নামলাম। মিলিটারি জিপ টহল দিচ্ছে। মাইকে ঘোষণা দিচ্ছে, এক ঘণ্টার মধ্যে কারফিউ জারি হবে¾সব আপনা-আপনা মহল্লা মে ভাগ যাও। আগের দিন থেকেই প্রায় খাওয়া নেই। আহমেদাবাদের ট্রেনে ফেরিওয়ালাও ওঠেনি। ঝালমুড়ি খাবারও জো নেই। কাছের এক রেস্তোরাঁতে তুমুল ভিড়। সবাই খেতে ঢুকেছে। এক বাঙালি মিলিটারি কোত্থেকে আমাকে চিনতে পেরে বলে, ‘দাদা যান, ধীরে-সুস্থে খেয়ে নিন। রাতে আর কোথাও খাবার পাবেন না। আমি আছি। আপনাদের খাওয়ার পর পৌঁছে দেবো।’ কতো বছর আগের ঘটনা, আজও ছবির মতো মনে আছে। মনে আছে সেই হাসি হাসি মিলিটারির মুখও। খাওয়া শেষ হতে না হতেই সন্ধ্যে এবং কারফিউ একসঙ্গে নামলো।
৪.
পরের দিন প্রবল ঝুঁকি নিয়ে জ্বলন্ত গুজরাটের ছবি তোলা শুরু হয়। আমরা বিশাল এক ক্যাম্পে যাই। সেখানে থিকথিক করছে লোক¾বৃদ্ধ, নারী, শিশু। সবাই শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মসজিদ লাগোয়া এই শিবিরে এসেছে কোনোরকমে প্রাণটুকু নিয়ে। কোনো পরিবার চোখের সামনে তার সব সদস্যকে খুন হতে দেখেছে। কোনো মা হারিয়েছে সন্তানকে, বাবা মেয়েকে, স্ত্রী স্বামীকে। একজনও ক্যামেরার সামনে মুখ খুলছে না। তাদের চোখের দিকে তাকাতে ভয় করছে। কী ভীষণ ঠাণ্ডা সেসব চোখ!
তিন দিন ধরে ক্যাম্পে যাচ্ছি। দ্বিতীয় দিন বাচ্চাদের জন্যে মুঠোভর্তি লজেন্স নিয়ে গিয়েছিলাম। ফলে বাচ্চাদের সঙ্গে একটু একটু ভাব জমার পরে মায়েরা কাছে এলো; মুখ খুললো। যন্ত্রণা আর বিষাদে মেশা সেই মুখ আজও আমার রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। আস্তে আস্তে ক্যামেরায় ধরে ফেললাম ইতিহাসের কালো সময়কে।
আপনারা যদি সেই ছবি দেখেন, খেয়াল করবেন, তথাকথিত কোনো ভাষাপাঠ সেখানে নেই। যা আছে তা যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাওয়া জনতার নিজেদের কথা আর অজস্র নির্বাক মুখ। ওই মুখই এক অন্য ধরনের চিত্রকল্প জন্ম দিয়েছিলো। নীরবতার ভাষায় এতো জোর ছিলো যে, আজও আমার গুজরাট জেনোসাইডের প্রথম পাঠ নাথিং অফিসিয়াল লোকে দেখে। দ্বিতীয় পাঠ গুজরাট জেনোসাইড অ্যান্ড আফটার-এর ব্যাপ্তি ৪০ মিনিটের। সেখানে শুরুতেই আমি নাচের ব্যবহার করেছি¾ত্রিশুল হাতে শিবের ধ্বংসলীলা।
পুরাণ আখ্যানের এক ছোটো অংশকে ব্যবহার করেছি গুজরাট হত্যালীলার কথামুখ হিসেবে। পাশাপাশি চার্লি চ্যাপলিনের দ্য গ্রেট ডিকটেটর-এর অংশ রেখেছি ফ্যাসিবাদের বিবাদের সম্ভাবনার কথা সাধারণ লোককে জানান দিতে। এসব শুনে কারো মনে হতে পারে, কিছুটা যেনো আমি খালি আমি আমি করছি। আসলে একটা সিনেমার যথাযথ তৈরি চিত্রনাট্য না থাকলে, সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে কীভাবে চিত্রনাট্য তৈরি করতে হয়¾এটা বলতে গিয়েই খানিকটা নিজের সিনেমার কথা বলে ফেললাম।
বিহারেও নকশালবাড়ি রাজনীতি ও উচ্চবর্গের রনবীর সেনার লড়াই নিয়ে সিনেমা করতে গিয়েও দেখেছি, জমিদারের লেঠেল বাহিনীর হাতে খুন হওয়া শহীদ পরিবারের লোকেরা আমাদের মতো বাইরে থেকে আসা ফিল্মবাবুদের কাছে সহজে মুখ খুলতে চায় না। কী করে তাদের সঙ্গে কথা বলবেন, তা কোনো সিনেমার বইয়ে লেখা নেই। চলতে চলতে আবিষ্কার করতে হয়।
নির্মাণের প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো, কেনো সিনেমা করবেন? কাদের জন্য করবেন? আপনি ক্যামেরা হাতে নিয়েছেন কি শুধু বিদেশের সিনেমা উৎসবে অংশ নিতে বা বোদ্ধাদের পিঠ চাপড়ানি পেতে? না। ঋত্বিক ঘটকের কথামতো¾রাস্তায় নেমেছি বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানবিরোধী গণজাগরণের অংশ হতে।
যদি লাতিন আমেরিকার নির্মাতাদের মতো আপনিও দ্বিতীয় পথটা বেছে নেন, নিজেই হয়ে যান গণসংগ্রামের একজন, তাহলে সেখানে সিনেমা কতোটা ব্যাকরণসম্মত হচ্ছে বা হচ্ছে না; তা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। কেউ বলবে হয়তো এসব অ্যাজিটেটর ফিল্ম; তাতে কান দেবেন না। দুনিয়ায় সিনেমা আন্দোলনে এরকম অজস্র নির্মাতা আছে, যাদের কাজ সময়ের দলিল হয়ে রয়ে গেছে। রাশিয়ার জিগো ভের্তভ থেকে ভারতের সুখদেব, বাংলাদেশের জহির রায়হান, এরকম অনেক নাম আপনি পাবেন, যারা প্রাণ বিপন্ন করে ডকুমেন্টারি নির্মাণ করে গেছে।
হতে পারে পথটা কঠিন। কখনো কখনো নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হবে। সিনেমাবাজদের প্রশংসা নাও জুটতে পারে। সিনেমা উৎসবে উপেক্ষিত হবেন। তবু চলতে চলতে বুঝতে পারবেন, আপনারও দর্শক তৈরি হয়ে গেছে। অ্যাকটিভ সিনেমার জন্য চাই অ্যাকটিভ দর্শক। দর্শক তখনই তৈরি হবে, যখন শুধু সিনেমা নয়, স্টাডি সার্কেল, দেশ-বিদেশের শিল্পকলা, ইতিহাস, সমাজচিত্রের সঙ্গে একজন নির্মাতা নানাভাবে নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে।
৫.
আমি আজকাল খুব স্বপ্ন দেখি, কোনো গ্রামে, আদিবাসী, দলিত বা সংখ্যালঘু মহল্লায় একটি ফিল্ম স্কুল হবে। সেখানে ওই হতদরিদ্র কিশোর-তরুণেরা সিনেমা পড়বে, দেখবে ও নিজেরা তৈরি করবে। স্বপ্ন দেখি দর্শক জন্ম নিচ্ছে এক্কেবারে নীরস খেতমজুর, প্রান্তিক কৃষক, খনি-চটকল শ্রমিক, মৎস্যজীবী ও রিকশাওয়ালাদের মধ্য দিয়ে। আজ যিনি দর্শক কাল তিনি বা তার পরের প্রজন্ম হবে অন্য ধারার চলচ্চিত্রনির্মাতা, যার সিনেমা, বুনুয়েলের ভাষায়¾সাদা পর্দায় বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে।
কী দরকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়াম, বিদেশি দূতাবাসের প্রেক্ষাগৃহ! খোলা মাঠে পর্দা টাঙিয়ে সিনেমা দেখান। সামনে শাল গায়ে যে কালো কালো মাথার সারি, ওরাই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। আসল ভারত বা বাংলাদেশ।
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি
স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে শিখুন। দেখবেন আপনি কখনো তৈরি করে ফেলেছেন সম্পূর্ণ নতুন এক পথ। উপমহাদেশের সিনেমাতেও আজ আধিপত্যবাদীদের প্রবল বিক্রম। এক একটা চক্র নিয়ন্ত্রণ করে সিনেমার মতো শক্তিশালী শিল্পমাধ্যমকে। এই চক্রে তথাকথিত প্রগতিবাদীদেরও পাবেন, যারা মুখে জনগণের নির্মাতা, কাজে প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখার যন্ত্র মাত্র। আপনার এবং নতুন প্রজন্মের কাজ আধিপত্যকামীদের আক্রমণ করা। সিনেমার ক্ষেত্রেও একথা প্রবলভাবে সত্য। আপনি ভাঙুন এবং গড়ুন। নিজের মতো করে সিনেমা করে যান। তা সে তথাকথিত ব্যাকরণসম্মত হোক বা না হোক।
লেখক : সৌমিত্র দস্তিদার, ভারতের প্রখ্যাত প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা। তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের মধ্যে রয়েছে নাথিং অফিসিয়াল, গুজরাট জেনোসাইড অ্যান্ড আফটার, সীমান্তআখ্যান, মুসলমানের কথা প্রভৃতি।
https://www.facebook.com/profile.php?id=100008406968120
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন