অধরা মাধুরী
প্রকাশিত ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সৌদি চলচ্চিত্রশিল্পের দ্বিতীয় অধ্যায়
পরিবর্তনের ঢেউ নাকি আধুনিকতার মুখোশ
অধরা মাধুরী

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি
একের চোখে ‘অপর’
মধ্যপ্রাচ্য, সৌদি আরব¾এই শব্দগুলো শুনলে চোখের সামনে, মাথার মধ্যে কিছু ধারণা আর ইমেজ ভেসে ওঠে। যেগুলো বিচিত্র গণমাধ্যমের বদৌলতে আমাদের মাথায় ঢুকে সৌদি আরবের একটা পরিচয় সৃষ্টি করেছে¾মক্কা-মদিনা, হজ, রাজতন্ত্র, স্বর্ণের ঢিবি, মরুভূমিতে সারি সারি খেজুর গাছ, তেলের অফুরন্ত ভাণ্ডার, ঐশ্বর্যের আড়ালে লুকানো চলমান দাসপ্রথা, যুদ্ধ, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি। ধর্মীয় নীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আর নারীদের ক্ষেত্রে এক ডিগ্রি বেশি শিকলবদ্ধ জীবনের কথাও মাথায় আসে। আমাদের মস্তিষ্কে এসবই তো সৌদি আরব, তাই না?
মানসিক এই ইমেজ আর ধারণাগুলো এমনি এমনি তৈরি হয় না। শিল্প ও গণমাধ্যমের প্রতিটা বিভাগ¾গদ্য, প্রবন্ধ, কবিতা, চলচ্চিত্র, সংবাদ, চিত্রকর্ম¾সব মাধ্যম অনবরত এর নির্মাণ করে। পশ্চিম এভাবেই নিজেকে প্রধান করে বাকি সবকিছুকে অপর (other) হিসেবে দেখে ও দেখায়। ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশগুলোর মানুষের মাথায় বিশ্বের অন্য পাশের অংশটি অর্থাৎ এশীয় বিষয়ে এভাবে কিছু ধারণা রোপণ করা আছে; যা প্রায় বিনা বাক্য ব্যয়েই মেনে নেয় বেশিরভাগ বিশ্ববাসী। প্রাচ্যের সম্পর্কে নির্মিত এই ধারণাগুলোই তো প্রাচ্যবাদ (orientalism) চর্চা। আবার প্রাচ্যের কাছে পশ্চিমকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি হলো পাশ্চাত্যবাদ (occidentalism)। প্রাচ্যের চোখে পশ্চিম হলো আধুনিকতার সংজ্ঞা আর পশ্চিমের কাছে প্রাচ্য পশ্চাৎপদতার আরেক নাম। বিশ্বের শাসকশ্রেণি, অর্থাৎ পশ্চিমাদের তৈরি এই ‘জ্ঞান’-এর চর্চা চলমান রয়েছে বিশ্বব্যাপী। ফলে কথায় কথায় নিজেদেরকে পশ্চিমাদের মতো করে তুলতে ব্যস্ত প্রায় সবাই; যেনো ওটাই জীবনযাত্রার মাপকাঠি!
ফিরে আসা যাক মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গে। এরকম কোনো দৃশ্য কি সহজে কল্পনায় আসে যে, অনেক সৌদি নারী-পুরুষ একসঙ্গে প্রেক্ষাগৃহ থেকে চলচ্চিত্র দেখে হাসিমুখে বেরিয়ে আসছে? এমন একটি দৃশ্য সৌদি আরবের প্রেক্ষাপটে এতোদিন খুব একটা স্বাভাবিক ছিলো না। তবে সম্প্রতি এমনটা ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সেখানে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ওপর গত প্রায় ৩৫ বছরের রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর অনুমতি দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ (জানুয়ারি ২০১৮)। প্রেক্ষাপটটা খুব পুরনো নয়। ৮০’র দশকের শুরুতে মুসলিম নেতাদের চাপে সৌদি আরবে ইসলাম ধর্মকে আরো রক্ষণশীল করতে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখা এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। অথচ প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করার আগে (১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ) দেশটিতে ৩০টি প্রেক্ষাগৃহ ছিলো। নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ধীরে ধীরে সেগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়।
তার মানে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় আইন-দণ্ডবিধি, নীতি-নৈতিকতা নির্ধারিত হয় ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও অনুশাসনের ভিত্তিতে। নারী ও পুরুষের নাগরিক অধিকার সেখানে সমান নয়। অভিভাবকত্ব আইনে দেশটির নারীদের নানা কাজে রাষ্ট্রীয় অনুমতি থাকলেও তা করার জন্য পরিবারের পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন হয়। তবে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সঙ্গে আইন এবং চর্চার বৈপরীত্যও ঘটে অনেক ক্ষেত্রে। তার পরেও একথা অস্বীকার করা যাচ্ছে না যে, হঠাৎ এতো বছর পরে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আইনটা কিছু প্রশ্ন ও চিন্তার অবকাশ তৈরি করে। যদিও অল্প কিছু তথ্যের দিকে ভালো করে মনোযোগ দিলেই এর কারণ স্পষ্ট হতে শুরু করে।
চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ওপর থেকে দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নবনির্মিত সিনেপ্লেক্সে যে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী হয়েছে তা হলো হলিউডের অ্যাকশন সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র ব্ল্যাক প্যান্থার (২০১৮)। অথচ সৌদি আরবে নির্মিত মানসম্পন্ন কোনো চলচ্চিত্র নেই, এমনটা কিন্তু মোটেও নয়। সৌদি আরবে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে আলোচিত ওয়াজদা (২০১২) ইতোমধ্যে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবসহ আরো ছয়টি চলচ্চিত্র উৎসব ও নয়টি দেশের মুখ দেখে আসলেও নিজ দেশে মুক্তি পায়নি। হাইফা আল-মনসুর (সৌদির প্রথম নারীনির্মাতা) নির্মিত ওয়াজদা ৮৬তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র ক্যাটাগরিতেও পাঠানো হয়েছিলো। এছাড়া আরো একাধিক দেশি (সৌদি) চলচ্চিত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তাহলে যেখানে আর সব ক্ষেত্রেই ধর্মীয় রীতিনীতির প্রকট প্রভাব রয়েছে, সেখানে কোন যুক্তিতে জায়েজ হয়ে গেলো ভিন্ন সংস্কৃতির ব্ল্যাক প্যান্থার! সেই চলচ্চিত্রে আপাতদৃষ্টিতে নারীর উপস্থাপন, ব্যক্তিত্ব, পোশাক কোনো কিছুর সঙ্গেই সৌদি সংস্কৃতির নারী জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই; না আছে কোনো পুরুষের সঙ্গে সাদৃশ্য। তাহলে একবিংশ শতাব্দীতে এসে আবার কি নতুন কোনো উপনিবেশবাদের সূচনা হতে চলেছে! নাকি সৌদি কর্তৃপক্ষ ব্ল্যাক প্যান্থার-এর ভাষায় অন্যকিছু বলতে চায়?
এই আলোচনায় ব্ল্যাক প্যান্থার-এর টেক্সট বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। সঙ্গে ওয়াজদা নিয়েও থাকছে আলোচনা।
অর্থনীতির প্রয়োজনে চলচ্চিত্রের অনুপ্রবেশ
সৌদি আরবে ব্ল্যাক প্যান্থার প্রদর্শনীর দিন চলচ্চিত্র শুরুর আগে দর্শককে স্বাগত জানানোর পর পরই উপস্থাপকের প্রথম কথা ছিলো¾ ‘আমাদের অর্থনীতির বিস্তারে বিশাল এক পদক্ষেপ হতে চলেছে এই প্রদর্শনীটি।’ অর্থাৎ বর্তমানে সৌদি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি তৈরির যে উদ্যোগ, তার পুরোটাই অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে নেওয়া। এর সঙ্গে হয়তো শিল্পের আদৌ তেমন কোনো সম্পর্ক নেই! শুধু আরেকটি ব্যবসাক্ষেত্রের উদ্বোধন বলা যেতে পারে। তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টাও হতে পারে। সৌদি আরব হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার মরুভূমিকে নতুন শহরে পরিণত করতে চাইছে। এক বছর আগে সৌদিতে এরকম যে দুইটি প্রকল্প নেওয়া হয়, তার একটির আয়তনই বেলজিয়ামের চেয়ে বড়ো; অন্যটি প্রায় মস্কোর সমান। মূলত তেলভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে রূপান্তর করতে, নতুন চাকরির ক্ষেত্র তৈরি ও বিনিয়োগ বাড়াতেই এ উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। নগর তৈরি করতে হলে একই সঙ্গে প্রয়োজন পড়ছে সেবা ব্যবস্থা, পর্যটন শিল্প, বিনোদন কেন্দ্র ইত্যাদি। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে সৌদি সরকার ঘোষণা করে ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’। ৮৪ পৃষ্ঠার এই পরিকল্পনায় সরকার বলেছে, তারা অর্থনৈতিক শহরগুলোকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চায় যেনো গত বছরের ভুলগুলো শুধরে নেওয়া যায়। সেখানকার ৫০টি দ্বীপকে বিশেষভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে।১
অতঃপর ২০১৮-তে তুলে নেওয়া হলো চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর নিষেধাজ্ঞা। এই সবগুলো পদক্ষেপ একটি দিককেই নির্দেশ করে। তা হলো সৌদি আরবের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের পরিকল্পনা। আবার এমন প্রশ্ন আসতে পারে, এতো সব বিনিয়োগের উৎস কোথায়? এই ব্যবসার মালিক আসলে সৌদি আরব নাকি অন্য কেউ?
তবে এতোদিন নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সৌদি শিল্পীরা কিন্তু নিজেদের রাস্তা খুঁজে নিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। নিউ মিডিয়া আর প্রযুক্তির এই যুগে আওয়াজ চাপা দিয়ে রাখা সহজ কাজ না। তাই দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার ফলে ইউটিউব চ্যানেল খুলে নিজেদের মিডিয়া তৈরি করে নিয়েছে অনেক সৌদি শিল্পী। এসব চ্যানেলে বেশি প্রাধান্য পায় বিভিন্ন মিউজিক ভিডিও আর স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। অন্যদিকে হাইফা আল মনসুর-এর মতো সাহসী নির্মাতা রাষ্ট্রের সীমা ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছে আরো কয়েক ধাপ সামনে।২
ব্ল্যাক প্যান্থারই কেনো?
ব্ল্যাক প্যান্থার প্রদর্শনীর সংবাদ দেখেই মনে প্রশ্ন আসে¾৩৫ বছর পর সৌদি আরবে প্রথমবার কোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করা হবে, তাহলে দেশি চলচ্চিত্র নয় কেনো? এর কয়েকটি সম্ভাব্য উত্তর রয়েছে। এক, হতে পারে সৌদি সংস্কৃতির ওপর হলিউডের নব্য উপনিবেশবাদের চেষ্টা। দুই, হতে পারে ব্যবসাসংক্রান্ত বিষয়। অর্থাৎ এতোসব ব্যয়বহুল সিনেপ্লেক্স নির্মাণ, ভবিষ্যতে চলচ্চিত্র নির্মাণে বিনিয়োগ করা, অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা প্রভৃতি। ভাবতে শুরু করলে এগুলো মোটামুটি প্রথমেই মাথায় চলে আসে। এর সবগুলোই একসঙ্গে ঠিক হতে পারে। কিন্তু তিন নম্বর সম্ভাবনাটা একটু ভিন্ন। এমনকি হতে পারে যে, সৌদি কর্তৃপক্ষ আসলে যে ডিসকোর্সকে জনগণের কাছে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, ব্ল্যাক প্যান্থার তার অনেক কিছুই বলেছে হলিউডের ভাষায়? কারণ প্রাচ্যের মানুষ ও প্রাচ্যবাদের চর্চাকারী হিসেবে হলিউড যা বলবে তা অবশ্যই ‘আধুনিক’!
ব্ল্যাক প্যান্থার-এর গল্পের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি একটু মিলিয়ে দেখা যাক। চলচ্চিত্রটিতে আফ্রিকার যে রাজ্য ওয়াকান্ডা’র গল্প বলা হচ্ছে, তা মূলত একটি কনফেডারেশন জাতীয় ব্যবস্থা। যদিও চলচ্চিত্রটি রাজতন্ত্রেরই ওকালতি করে বলে মনে হয়। এই রাজ্যটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ প্রযুক্তির মালিক। মূল্যবান ভাইব্রেনিয়াম ধাতুর সাহায্যে আশ্চর্য সব যন্ত্রের আবিষ্কার করেছে তারা। কিন্তু বাকি বিশ্ব এই প্রাযুক্তিক উৎকর্ষের যোগ্য নয় বলে তারা মনে করে। তাই প্রযুক্তির সাহায্যে পৃথিবীর যেকোনো রাডার-স্যাটেলাইটে অদৃশ্য এই রাজ্য। বাইরের বিশ্বের কাছে ওয়াকান্ডা আফ্রিকার এক গ্রাম বলে পরিচিত। চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র টি’চালা, ওয়াকান্ডার যুবরাজ ও ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ (বংশ পরম্পরায় চলে আসা এক অভিনব শারীরিক শক্তি বা সুপার পাওয়ারের মালিক)। সাবেক রাজার মৃত্যুর পরে পরবর্তী রাজা হিসেবে টি’চালা প্রায় সর্বজনস্বীকৃত, শুধু একজন গোত্রপতি এম’বাকু ছাড়া। ওয়াকান্ডার রাজা হওয়ার জন্য প্রথাগত যে লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করতে হয়, এম’বাকুর সঙ্গে সে লড়াইয়ে জিতে টি’চালা রাজা হয়ে যান। এই রাজ্য ক্ষমতার আরেকজন দাবিদারকে ঘিরেই পরবর্তী কাহিনি এগিয়ে যায়। সেই দাবিদার হলো টি’চালার চাচাতো ভাই এরিক কিলমঙগার, যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এরিকের সঙ্গে টি’চালার আরেক দফা লড়াইয়ে জলপ্রপাত থেকে পড়ে যান টি’চালা। তবু একজন বহিরাগতের শাসন থেকে দেশকে বাঁচাতে টি’চালা মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসেন এম’বাকুর সহায়তায়। চলচ্চিত্রের উপস্থাপন অনুযায়ী টি’চালা একজন আদর্শবান যুবরাজ ও রাজা। ন্যায়-অন্যায়ের বিচারে যে নিজের বাবাকেও দোষারোপের ক্ষমতা রাখেন। তিনি রাজ্য ক্ষমতায় ফিরে যেতে চান নিজের দেশকে বাঁচাতে আর উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে। এর বাইরেও চলচ্চিত্রের কাহিনিতে আরো বহুমাত্রিক জটিলতা রয়েছে। ধীরে ধীরে সেদিকে এগোনো যাবে।
তাহলে দেখা যাক, রাষ্ট্র প্রসঙ্গে ব্ল্যাক প্যান্থার কী বলে? প্রথমত, রাজ্যের প্রতি রাজার নিঃস্বার্থ দায়িত্ববোধের উপস্থাপনা আছে এখানে। দ্বিতীয়ত, ঘুরেফিরে রাজার পুত্রই যোগ্য যুবরাজ/উত্তরসূরি হয়, এই ধারণাও প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। তৃতীয়ত, পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পক্ষে শক্ত যুক্তি দাঁড় করিয়েছে ওয়াকান্ডাবাসী। চতুর্থত, নিজেরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকলেও পৃথিবীর সব সেক্টরে আনাগোনা রয়েছে তাদের। এমনকি রাজা হওয়ার আগে টি’চালা সি আই এ-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন সংযোগও আছে চলচ্চিত্রটিতে।
অন্যদিকে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের জুনে ৩৩ বছর বয়সি মুহাম্মদ বিন সালমান সৌদির নতুন যুবরাজ মনোনীত হওয়ার পর থেকেই বহুল আলোচিত। সৌদি আরবের ক্ষমতা কাঠামোতে দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষমতার অধিকারী তিনি। সালমান যুবরাজ ঘোষিত হওয়ার পর সম্প্রতি নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে সৌদিতে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে সাধারণের মাথায় থাকা সৌদি আরব যেনো ‘আধুনিক’ হয়ে উঠছে।
আবারও ফেরা যাক ব্ল্যাক প্যান্থার-এ; ওয়াকান্ডার নবঘোষিত রাজা টি’চালা অভিষেকের পর পরই সাবেক রাজা ও তার (টি’চালা) বাবা টি’চাকার সময়ে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার সম্মুখীন হন পুনরায়। টি’চালার চাচা ও এরিকের বাবা এন’জবু ওয়াকান্ডার গুপ্তচর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন। বিশ্ববাসীর রোগ-শোক, অভাব-অনটন দেখে এন’জবু মনে করেছিলেন, তাদের সম্পদ ভাইব্রেনিয়ামের ব্যবহার করে এসব সমস্যা দূর করা সম্ভব। কিন্তু ভাই টি’চাকা একথা কখনো মানবেন না তাও জানতেন তিনি। তাই মার্কিন সন্ত্রাসীদের একটা দলের সাহায্যে তিনি ভাইব্রেনিয়াম চুরি করান। এ ঘটনায় রাজার কাছে তিনি প্রতারক হিসেবে ধরা পড়ে যান। একপর্যায়ে ভাইকে নিজ হাতে হত্যা করেন রাজা টি’চাকা। এন’জবুর মৃতদেহ আর কিশোর এরিককে যুক্তরাষ্ট্রে রেখে তিনি ওয়াকান্ডা ফিরে আসেন। এই ঘটনার একমাত্র সাক্ষী এরিক, টি’চালাকে ঘটনাটি বললে, তিনি নিজের মৃত বাবার ওপর ক্ষিপ্ত হন এবং সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারেন এরিকের এই সহিংস ও প্রতিশোধপরায়ণ প্রত্যাবর্তনের আসল কারণ। কিন্তু রাজ্যের কাউকে টি’চালা এই অবিচারের কথা জানতে দেন না। সাবেক মার্কিন সেনা ও হত্যায় সিদ্ধহস্ত এরিকের উদ্দেশ্য ছিলো ভূগর্ভস্থ ভাইব্রেনিয়ামের সাহায্যে বিশ্বকে শাসন করা। অর্থাৎ বিশ্বের সামনে ওয়াকান্ডার অস্তিত্ব ও পরিচয় উন্মুক্ত করে দেওয়া, যা ওয়াকান্ডাবাসী কখনোই সমর্থন করতো না। যে কারণে চলচ্চিত্রের শেষের দিকে টি’চালার হাতেই নিহত হন এরিক। বাবার মতোই নিজের ভাইকে হত্যা করেন তিনি। যদিও তাকে বাঁচানোর ইচ্ছাও প্রকাশ করেন টি’চালা, কিন্তু এরিক নিজেই মৃত্যুকে বেছে নেন! অন্তত নির্মাতা তাই দেখাতে চেয়েছেন। বলার চেষ্টা করেছেন, বন্দি জীবনের চেয়ে মৃত্যু উত্তম। এতোটুকু পার্থক্য না দেখালে টি’চালা যে তার বাবার থেকে আলাদা, তা প্রমাণইবা হতো কীভাবে!
মজার বিষয় হলো, চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে দেখানো হচ্ছে, একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে বিশ্বের সব দেশের প্রতিনিধিদের সামনে ওয়াকান্ডাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন টি’চালা। অর্থাৎ এন’জবু আর এরিককে শত্রু ভাবার যে প্রাথমিক কারণ ছিলো¾তারা ওয়াকান্ডার গোপনীয়তার বিপক্ষে ছিলো¾সেই একই কাজ করেও ‘হিরো’ হয়ে যান ব্ল্যাক প্যান্থার টি’চালা। তবে চলচ্চিত্রটি দেখার সময় এগুলো কিন্তু স্বাভাবিকই মনে হয়। কারণ চলচ্চিত্রে চোখের সামনে নির্মাতা যে ‘হিরো’কে নির্মাণ করে, দর্শকের কাছে তার সবই ঠিক, আদর্শ মনে হয়।
এবারে বাস্তব আর চলচ্চিত্রের গল্পকে একটু মিলিয়ে দেখা যাক। প্রথমত সৌদির বর্তমান যুবরাজ ক্ষমতায় এসেছেন তার চাচাতো ভাই মুহাম্মদ বিন নায়েফ আল সৌদকে প্রতিস্থাপন করে। তারপর থেকে সামাজিক অসঙ্গতি দূরীকরণ আর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন নয়া যুবরাজ। আর প্রয়োজন মতো বিভিন্ন মতাদর্শিক অবস্থানও নিচ্ছেন। অর্থাৎ, এক কথায় তিনি পূর্বপুরুষের ভুল সংশোধন করছেন। আবার সৌদি আরবের অর্থনীতির একটি মূল খুঁটি তাদের খনিজ সম্পদ¾ভূগর্ভস্থ তেল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদির সম্পর্কের মূল ভিত্তিও তেল। সৌদির তেল যেনো ওয়াকান্ডার ভাইব্রেনিয়াম¾উন্নতি ও ক্ষমতার একমাত্র পথ! মানবতার সেবায় তাই এর ভাগাভাগি করতে হয়।
ফলে ৩৫ বছরে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর জন্য ব্ল্যাক প্যান্থার কেনো এবং কে নির্বাচন করেছে, তা জানতে পারা প্রায় সম্ভবই না; সম্ভব শুধু ব্যাখ্যা দাঁড় করানো। তাই এখন প্রশ্ন, সৌদি আরব কি কোনো জাতীয় ‘হিরো’ চরিত্র নির্মাণ করতে চায়? নাকি নতুন একটি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য হলিউডের প্রথম ধাপ এই ব্ল্যাক প্যান্থার?
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি ইতিহাস এমনই
৯০-এর দশকে গাল্ফ ওয়ারের পর থেকে সৌদি আরবে রীতিমতো ঘাঁটি গেড়ে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে যেভাবে ক্ষমতার ব্যবহার করে, দৃশ্যত তা অতীতের উপনিবেশবাদের চেয়ে আলাদা হলেও এর প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। তাত্ত্বিকরা একে নয়া উপনিবেশবাদ বলছে। নয়া উপনিবেশবাদের মূল হাতিয়ার হলো তথ্য প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম। ফলে কোনো দেশের নতুন একটি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে হলিউডের (অথবা বলিউড) মতো প্রভাবশালী ইন্ডাস্ট্রির শিকড় গেড়ে বসতে চাওয়ার প্রয়াস মোটেই নতুন কৌশল নয়। ইতিহাসেও তার প্রমাণ মেলে।
লাতিন আমেরিকায় চলচ্চিত্রের সূচনা হয়েছিলো ঔপনিবেশিক সময়ে। প্রথমে হলিউড আরো পরে বলিউডের চলচ্চিত্র ছিলো সেখানকার মানুষের বিনোদনের প্রধান উপাদান। এক কথায়, ভূমি উপনিবেশবাদ শেষ হওয়ার আগেই সেখানে সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ শুরু হয়। একসময় লাতিন আমেরিকার সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পীরা টের পায়, সেই সব চলচ্চিত্র আসলে তাদের জীবনের কথা বলে না; একধরনের ফ্যান্টাসি নির্ভর চিন্তাকেই তুলে ধরে। তখন তারা ভাবে, নিজেদের নিপীড়িত জীবনের গল্পগুলোই তো একেকটি চলচ্চিত্র! ফ্যান্টাসি আর কল্পনায় ভরপুর বানোয়াট কাহিনির তো প্রয়োজন নেই। বাস্তবতাকে শৈল্পিক উপায়ে চলচ্চিত্রে তুলে আনার মধ্য দিয়েই শুরু হতে পারে তাদের নিজস্ব চলচ্চিত্রের নির্মাণ। ব্রাজিলে তখন দুর্ভিক্ষ, খাদ্য ঘাটতি, অনাহারে মৃত্যু, সহিংসতা নৈমিত্তিক ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে সেখানে চলচ্চিত্রের বিষয় হয়ে ওঠে দেশটির ইতিহাস, মিথ, প্রাধান্য বিস্তারকারী জনপ্রিয় সংস্কৃতি, ভূমিহীন কৃষকের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। গত শতকের ৫০-এর দশকে নব্য-বাস্তববাদ ও নুভেলভাগ ধারা দিয়ে ব্রাজিলে যে সিনেমা নোভো আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো, অল্প সময়ের মধ্যে তার বিষয় হয়ে ওঠে এসব। এই ‘চলচ্চিত্র আন্দোলন সমাজ-সত্যকে তথা দ্বন্দ্বসমূহকে আবিষ্কার ও সমাজ-রূপান্তরকরণের প্রয়োজন থেকেই উদ্ভূত।’৩ পরে কিউবার বিপ্লব আর ব্রাজিলের গ্লাউবার রচা’র নেতৃত্বে সিনেমা নোভো’র হাত ধরে আবির্ভাব হয় থার্ড সিনেমা নামে নতুন এক চলচ্চিত্র আন্দোলনের।
থার্ড সিনেমা মূলত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নিজস্ব চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগকে নির্দেশ করে।৪ অর্থাৎ ভূমি উপনিবেশবাদের শিকার দেশগুলো; যাদের ভূমি থেকে লর্ড’রা চলে গেলেও মস্তিষ্ক আর সংস্কৃতি থেকে তাদের বের করা যায়নি বহুদিন, হয়তো এখনো না। গত শতকের ৬০-এর দশকে (১৯৬৮, দ্য আওয়ার অব দ্য ফার্নেসেস) প্রথম শোনা গিয়েছিলো থার্ড সিনেমার কথা। সিনেমা নোভো আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিলো জনগণের মস্তিষ্কে ঔপনিবেশিক বুর্জোয়া শ্রেণির আধিপত্যের বিপরীতে স্থান নেওয়া। অর্থাৎ চলচ্চিত্র জগৎ এবং সমাজকে বি-উপনিবেশায়নকরণ। ফলে চলচ্চিত্রে দেশজ রাজনৈতিক বাস্তবতার ইতিহাস চিত্রায়ণ শুরু হয়। এই ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করে এটাকে তাত্ত্বিক ভিত্তি দেয় আর্জেন্টিনার ফার্নান্দো সোলানাস ও অক্তোভিও গেতিনো, বলিভিয়ার জর্জ স্যাঞ্জিনেস, চিলির মিগুয়েল লিত্তিন প্রমুখ। তারা দর্শককে কোনো নির্জীব বস্তু হিসেবে মনে না করে চলচ্চিত্রে তাদের জীবনের গল্পের অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। চলচ্চিত্রের সংলাপগুলোর উপস্থাপনও তেমনটা নির্দেশ করে।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে কিউবায় বিপ্লবের পরেই চলচ্চিত্রশিল্পের বিবর্তনের অংশ হিসেবে থার্ড সিনেমা আন্দোলন শুরু হয়। এরপর তা বিস্তার লাভ করে এশিয়া ও আফ্রিকায়। লাতিন আমেরিকা পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত (১৪৯২Ñ১৮১০) সরাসরি স্প্যানিশ এবং পর্তুগিজদের উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। আর আফ্রিকা সরাসরি ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ সহ্য করেছে ঊনবিংশ থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত (১৮৮১ Ñ১৯১৪)। চলচ্চিত্র আবিষ্কারের পর পরই লাতিন আমেরিকায় পৌঁছে যায় প্রোজেকশনের প্রযুক্তি, ১৮৯৫-এর ডিসেম্বরে। অর্থাৎ উপনিবেশবাদের একদম রমরমা সময়ে তাদের চলচ্চিত্র দিয়েই যাত্রা শুরু করে লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি। তার কিছু পরে ইন্ডাস্ট্রিকে দখলে নিয়ে নিতে থাকে হলিউড। কিন্তু উপনিবেশবাদের অবসানের পরও এর থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিলো। এমন সময়ে এই দখলদারিত্ব আর সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে চলচ্চিত্রে নিজেদের কথা বলার প্রয়াসই হলো থার্ড সিনেমা।৫ থার্ড সিনেমা মূলত উত্তর উপনিবেশের সেই সব নির্মাতাদের চলচ্চিত্র, যারা নিজেদের দেশের অন্যায্য প্রতিষ্ঠান এবং ইউরোপ-আমেরিকা কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নন্দনতত্ত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করতে সচেষ্ট।৬ ফলে থার্ড সিনেমা ‘দর্শককে লড়াকু হতে উৎসাহী করে, রাজনৈতিক ও আর্থনীতিক [অর্থনীতিক] বাস্তবতাকে নিরীক্ষণ করে এবং প্রচলিত নন্দনতাত্ত্বিক পরিকাঠামোকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে।’৭
থার্ড সিনেমায় নিজেদের কথা বলতে শুরু করার পর লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি এখন অন্যতম সমৃদ্ধ চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির খাতায় চলে এসেছে। প্রতিবছর তারা ভাঙছে বক্স অফিস রেকর্ড। সেখানে এখন নিজেদের দেশে নির্মিত চলচ্চিত্রই সেরা। তারা দখলদারিত্বের চক্র থেকে বের হয়ে এসেছে। কিন্তু তাতে সময় পার হয়ে গেছে প্রায় ৫০ বছর। চিন্তার বিষয় হলো, এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে যুক্তরাষ্ট্র কি সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে চায়? তাহলে সৌদি আরবের নিজেদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হতেও কি আরো অর্ধ শতক বা তারও বেশি পার হয়ে যাবে!
একটি স্বপ্নের গল্প ওয়াজদা
এই পর্যন্ত আলোচনা অনুযায়ী, প্রথম প্রদর্শিত চলচ্চিত্র ব্ল্যাক প্যান্থার সৌদি আরববাসীর সামনে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবন তুলে ধরে না। এবার দেখা যাক, তাদের নিজেদের চলচ্চিত্রে কী আছে? সৌদির প্রথম চলচ্চিত্র ওয়াজদা (২০১২) তাহলে কার কথা বলে?
চলচ্চিত্রটির মূল চরিত্র ওয়াজদা নামের এক কিশোরী। আশপাশের আর দশটা মেয়ের চেয়ে একটু আলাদা, একটু বেশি স্বাধীনচেতা মেয়ে ওয়াজদা মায়ের সঙ্গে থাকে; বাবা কিছুদিন পর পর আসেন সেখানে। ওয়াজদার মায়ের ছেলেসন্তান না হওয়ায় বাবার দ্বিতীয় বিয়ে দিতে চান ওয়াজদার দাদি। তাই ওয়াজদার মা সবসময় চেষ্টায় থাকেন স্বামীকে খুশি রাখার, তাকে মুগ্ধ করার। যেনো তিনি দ্বিতীয় বিয়েতে রাজি না হন। ওয়াজদার মায়ের শখ ছোটো করে চুল কাটানোর। কিন্তু স্বামীর লম্বা ও মসৃণ চুল পছন্দ। তাই যেদিন করে তার আসার কথা থাকে, সেদিন মেশিন দিয়ে হালকা কোঁকড়ানো চুলগুলো টান টান করে পরিপাটি হয়ে অপেক্ষা করেন ওয়াজদার মা। আর ওয়াজদা রোজ সেই দৃশ্য দেখে।
এদিকে প্রতিবেশী এক কিশোর আব্দুল্লাহর সঙ্গে ওয়াজদার বন্ধুত্ব। একই রাস্তা দিয়ে স্কুলে যায় তারা। আবদুল্লাহ রোজ তার সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায়। ওয়াজদার ইচ্ছা তারা প্রতিযোগিতা করবে। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় একটা সাইকেলের দোকান পার হয় সে। দোকানের সামনে সবুজ একটা সাইকেল দেখে ওয়াজদা স্বপ্ন দেখে ওটা কেনার। কিন্তু মাকে যতোবার বলতে যায়, ততোবারই বকা শুনতে হয়। শুনতে হয়¾মেয়েরা সাইকেল চালায় না, এটা সম্মানিত মেয়েদের কাজ না। কিন্তু সেই সমাজের নারীরা যে প্রতিনিয়ত নিজেরা নিজের সম্মানকে অবহেলা করছে, এই বাস্তবতা তারা বুঝেও বোঝে না।
ওয়াজদা বিচিত্রভাবে টাকা জমানোর চেষ্টা করতে থাকে, কিন্তু ছোট্ট ওয়াজদার সাধ্যের তুলনায় সাইকেলের দাম অনেক। একপর্যায়ে স্কুলে কোরআন তেলাওয়াতের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ওয়াজদা। প্রতিযোগিতায় জিতে গেলে সেই টাকা দিয়ে সাইকেল কেনার কথা বললে সবার সামনে তাকে অপমান করেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। একই সঙ্গে পুরস্কারের সেই টাকা দান করে দিতে বাধ্য করেন ওয়াজদাকে। এদিকে নিজের জমানো টাকা দিয়ে একটা সুন্দর লাল জামা কেনার পরিকল্পনা করেন ওয়াজদার মা, তার দেবরের বিয়েতে পরার জন্য। যেনো শাশুড়ি ও স্বামী তার সৌন্দর্য দেখে দ্বিতীয় বিয়ের চেষ্টা বন্ধ করেন। প্রতিযোগিতায় জিতেও টাকাগুলো হারিয়ে ওয়াজদা মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে আসে। সন্ধ্যাবেলায় ছাদে উঠে ওয়াজদা দেখে, মা দাঁড়িয়ে আছেন কিনারে, দূরে আতশবাজি ফুটছে। ওই দিনই ওয়াজদার দাদি বাড়িতে তার বাবার দ্বিতীয় বিয়ের অনুষ্ঠান। ওয়াজদার মা তার পছন্দ মতো চুলগুলো ছোটো করে কাটিয়ে এসেছেন, যেনো তার এতোদিনের যত্নে রাখা সবকিছুর অপ্রয়োজনীয়তা হঠাৎ তিনি উপলব্ধি করেছেন। ওয়াজদা মাকে বলে, চলো ওই লাল জামাটা কিনে আনি। উত্তরে মা বলেন, তার আর দরকার নেই; তাছাড়া টাকাটা তিনি খরচ করে ফেলেছেন। পাশের ঘরটায় আলো জ্বালাতেই ওয়াজদা দেখে মা তার জন্য সবুজ সাইকেলটা কিনে এনেছেন।
শেষ দৃশ্যে ওয়াজদা আর আব্দুল্লাহ পাশাপাশি সাইকেল চালিয়ে যেতে দেখা যায়। প্রতিযোগিতায় জয়ের অনুভূতি নয়, ওয়াজদা তখন স্বাধীনতার উন্মত্ততায় ছুটে চলতে থাকে। ছোটো রাস্তা শেষ করে মহাসড়কটার সামনে দাঁড়িয়ে দূরে তাকায়। যেনো গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর বিশ্বে তার প্রথম ধাপ পড়লো।
ওয়াজদার মা যেদিন উপলব্ধি করেন, অন্যের সংজ্ঞায় ‘ভালো মেয়ে’ বা ‘সম্মাননীয় মেয়ে’ বলে যেসব নৈতিকতা চাপিয়ে দেওয়া হয় নারীদের ওপর, তা নিতান্তই অর্থহীন এক পুরুষতান্ত্রিক ডিসকোর্স; ঠিক তখন মেয়ের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে নিজের অবস্থান জানিয়ে দেন ওয়াজদার মা।
ব্ল্যাক প্যান্থার-ওয়াজদার বৈপরীত্যের ভাষায় কথা বলে ক্ষমতা
ব্ল্যাক প্যান্থার ও ওয়াজদা একদম ভিন্ন প্রকৃতির দু’টি টেক্সট। একদিকে কাল্পনিক একটি রাজ্যের রাজ্য ক্ষমতা নিয়ে তৈরি সায়েন্স ফিকশন; অন্যদিকে সাধারণ সৌদি নাগরিকের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা। সৌদি আরবের মতো রক্ষণশীল একটা দেশ সহজে অন্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ পছন্দ করবে না, সাধারণ অনুমান এমনটাই বলে। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সাত মাস পার (জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত) হয়ে গেলেও সৌদির প্রথম চলচ্চিত্রটি আর নিজ দেশে মুক্তি পায় না!
তাহলে ব্ল্যাক প্যান্থার ও ওয়াজদার মৌলিক পার্থক্যগুলোর দিকে একটু মনোযোগ দেওয়া যাক। প্রথমত, ওয়াজদা সৌদি মানুষের জীবনের গল্প বলে, চোখে আঙুল দিয়ে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবতাকে দেখিয়ে দেয়। অন্যদিকে ব্ল্যাক প্যান্থার এমন একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, যা সৌদির শাসনব্যবস্থা ও ক্ষমতার ডিসকোর্সকে জায়েজ করতে দৃষ্টিনন্দন সব রূপকের ব্যবহার করেছে।
দ্বিতীয়ত, ব্ল্যাক প্যান্থার-এর গল্পের মূল বিষয়বস্তু বর্ণনা করতে গুরুত্ব সহকারে কোনো নারীচরিত্রের বিবরণ দিতে হয়নি। অথচ বেশ কয়েকটি শক্তিশালী নারীচরিত্র ছিলো চলচ্চিত্রটিতে। অন্যদিকে ওয়াজদার প্রায় প্রতিটি চরিত্রের কথা উল্লেখ না করে গল্পটা ঠিকভাবে বলা যায় না। অর্থাৎ ওয়াজদা জীবনকে দেখেছে পাশাপাশি কয়েকটি জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। যার সবগুলোতেই কিছু বৈপরীত্য আছে; জীবনে যেমন থাকে। যেখানে ব্ল্যাক প্যান্থার বলে শাসকের গল্প। সাধারণ মানুষের কথা সেখানে অনুপস্থিত।
তৃতীয়ত, ওয়াজদার শেষ দৃশ্যে ওয়াজদা যখন বড়ো রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে সামনে তাকিয়ে থাকে, তার চোখ দিয়ে একটা স্বপ্ন দেখায় চলচ্চিত্রটি। অথচ ব্ল্যাক প্যান্থার ঘুরেফিরে একই ক্ষমতা কাঠামোর কথা বলে চলচ্চিত্রজুড়ে। পরিবর্তনের আবছা একটা অবয়বের বিভ্রম দিয়ে শেষ হয় চলচ্চিত্রের কাহিনি।
তাহলে সৌদি আরব প্রশাসন আসলে কোন ডিসকোর্সটি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তা বুঝতে বোধহয় বিশেষ কোনো বাধা থাকে না আর। রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরবের যে চরিত্র এবং ব্ল্যাক প্যান্থার আর ওয়াজদার টেক্সটের যে বৈপরীত্য, তা থেকে পরিষ্কার যে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী শুধু আধুনিকতার এক বিভ্রম তৈরি করতে চায় দেশবাসীর সামনে। ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে আন্তনিও গ্রামসির ধারণা অনুযায়ী বলা যায়, সৌদিতে এতোদিন চলে আসা শাসনব্যবস্থা টিকে ছিলো প্রভুত্বের বল প্রয়োগ করে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং আইনব্যবস্থা মিলে টিকিয়ে রেখেছে এই প্রভুত্বের রাজ। যদিও প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধর্ম প্রভুত্বের অংশ না। তবে ধর্মীয় নিয়ম দিয়ে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করার ফলে সৌদি আরবে ধর্ম প্রভুত্ব কায়েমেরই কাজ করে।
কিন্তু প্রযুক্তির যুগে জনগণকে প্রভুত্ব দিয়ে আটকে রাখা দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে ক্ষমতার জন্য। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিদ্রোহ-আন্দোলন তার প্রমাণ। তাই এখন সৌদি শাসকগোষ্ঠীর প্রয়োজন দেশবাসীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা। আর গ্রামসির মতে, এই কাজ করে রাষ্ট্রের সুশীল নাগরিক সমাজ বা সিভিল সোসাইটি। এ কারণে উদারতা, আধুনিকতা ইত্যাদির বিভ্রম তৈরি করে সৌদিবাসীর কাছে বর্তমান শাসকের পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করতে হবে। আর এই সম্মতি আসতে হবে সাধারণ জনগণের ভিতর থেকেই। গ্রামসির তত্ত্ব অনুযায়ী, তাহলেই প্রভুত্ব আর আধিপত্য একসঙ্গে হয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখবে। শাসকের পক্ষের ডিসকোর্সকে প্রতিষ্ঠিত করবে।
ব্ল্যাক প্যান্থার-এর মতো চলচ্চিত্র একই সঙ্গে যেমন সৌদি শাসকের পক্ষের কথা বলে, তেমনই দর্শকের মনে একটি ফ্যান্টাসি জগতেরও জন্ম দেয়। যা ধীরে ধীরে হয়তো দেশবাসীকে ভুলিয়ে দিবে কীভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হয়। ভুলিয়ে দিবে ফ্যান্টাসিতে মশগুল থাকা কোনো সমাধান নয়, বরং পরিবর্তনের জন্য অনবরত চেষ্টা করতে থাকাই শিল্পের আসল উদ্দেশ্য।
লেখক : অধরা মাধুরী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।
adharamaadhuri18@gmail.com
https://www.facebook.com/adhara.paroma
তথ্যসূত্র
১. ‘মরুভূমিতে কেন এত শহর বানাচ্ছে সৌদি আরব?’; প্রথম আলো, ১২ আগস্ট ২০১৭
২. https://goo.gl/5E6g3a; retrieved on: 10.08.2018
৩. আউয়াল, ড. সাজেদুল (২০১১ : ৮৮); ‘চলচ্চিত্র ধারাসমূহের অন্তর্গত পাঠ’; চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা।
৪. www.britannica.com/art/Third-Cinema; retrieved on: 12.08.2018
৫. www.britannica.com/art/Third-Cinema; retrieved on: 15.08.2018
৬. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৮৯); ‘চলচ্চিত্রে মতানৈক্যের কণ্ঠস্বর : বিকল্প চলচ্চিত্র’; সিনেমা; ধানমণ্ডি, ঢাকা।
৭. প্রাগুক্ত; আউয়াল (২০১১ : ৮৯)।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন