সুশান্ত সিনহা
প্রকাশিত ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
প্রসঙ্গ সম্প্রচার সাংবাদিকতা
প্রতিবেদক ও প্রতিবেদন, একে অন্য পরিপূরক
সুশান্ত সিনহা
1775499595.jpg)
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি
সম্প্রচার সাংবাদিকতা নিয়ে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর ধারাবাহিক আলোচনার শুরুটা ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের জুলাই, সংখ্যা ৯ থেকে। গেলো কয়েক বছরে একে একে প্রকাশ হয়েছে ব্রেকিং নিউজ, পি টি সি, লাইভের ভিতর বাহির, টিকার বা স্ক্রল, অনুসন্ধানী সংবাদিকতা, আউট অব ভিশন নিয়ে পৃথক প্রবন্ধ। এসব প্রবন্ধে সম্প্রচার সাংবাদিকতায় সুনিদিষ্ট কিছু বিষয় ধরে ধরে আলোকপাত করেছেন সুশান্ত সিনহা। সর্বজনীন এসব বিষয়ের আলোচনার ধারাবাহিকতায় একজন প্রতিবেদক বা সংবাদকর্মীর গুণাবলি সংক্রান্ত আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ প্রতিবেদন কখনোই গুণে মানে উন্নত হবে না, যতোক্ষণ পর্যন্ত একজন প্রতিবেদক মৌলিক কিছু গুণ বা বৈশিষ্ট্য না ধারণ করবে এবং মেনে চলবে। এ সংক্রান্ত দুই পর্বের এই আলোচনায় এবারে প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হলো। [সম্পাদক]
গুণের শেষ নেই একজন প্রতিবেদকের। সমাজে যতো ধরনের গুণ ও ভালো বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়, তার সবই প্রতিবেদকের জন্য প্রযোজ্য। দিন যতো বাড়ছে ততোই গুণাবলিতে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন বিষয়। আবার ৯০ পরবর্তী সময়ে দেশের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক বিষয়ে সচেতন থাকতে হয় সংবাদকর্মীদের, বিশেষ করে সম্প্রচার সাংবাদিকদের। হাল আমলে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকসহ সব ধরনের গণমাধ্যমের সংখ্যা এক লাফে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে চাহিদার তুলনায় দক্ষ লোকবলের সঙ্কট প্রকট যেমন হয়েছে, তেমনই হরেদরে চলতে গিয়ে সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতার মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যার সবচেয়ে বেশি ধাক্কা পড়েছে টেলিভিশন বা সম্প্রচার সাংবাদিকতায়।
একজন প্রতিবেদকও মানুষ। অথচ সাংবাদিকতার বই-পুস্তকে প্রতিবেদকের গুণাবলি দেখে মনে হয় তিনি মানুষ নন, বেশি কিছু। অথচ তারা এই সমাজেরই অংশ। আর পাঁচটা মানুষের মতো বিদ্যমান বৈষম্য আর মুনাফামুখীন সমাজব্যবস্থার মধ্যেই তারা বেড়ে ওঠে, শিক্ষা পায়। ফলে তাদের গায়েও সামাজিক অসুস্থ প্রতিযোগিতার দাগ/কালিমা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। যদিও পড়াশোনা শেষে যখন কোনো ব্যক্তিমানুষ সাংবাদিকতা পেশায় আসে, তখন তাকে ধীরে ধীরে ঝেড়ে ফেলতে হয় সেই সব কালিমা। সচেতনভাবে যে যতো দ্রুত এই চেষ্টা করে, সে ততো দ্রুত নিজেকে এই ক্ষেত্রে ‘যোগ্য’ করে তুলতে পারে। তবে এটা মোটেও এক দিন বা এক মাস চেষ্টার বিষয় নয়, প্রতিদিনের সংগ্রামের অংশ। যাতে একটু ঢিলেমি পড়লেই শেওলার আস্তর পড়ে। এতে হয়তো কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিটা সাময়িক, কিন্তু প্রতিবেদক হিসেবে ব্যক্তির ক্ষতি স্থায়ী। নিজেকে প্রতিনিয়ত আরো সমৃদ্ধ, দৃঢ়চেতা ও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর লড়াইয়ের অংশ হিসেবেই দৈনন্দিন কাজের কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরার চেষ্টায় এই আলোচনার অবতারণা।
মূল আলোচনার আগে একটি বিষয় সংক্ষেপে তুলে ধরা জরুরি। ‘আপনারা শুধু খারাপ খবর তুলে ধরেন, ভালোটা দেখতে পান না। সেগুলো নিয়ে লেখেন না, কথা বলেন না’¾সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রায়শই এমন অভিযোগ তুলে ধরেন মন্ত্রী, এম পি, সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী নেতারা। স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় টেলিভিশনসহ পত্রপত্রিকার টানা সংবাদের সময় এই অভিযোগ বেশি এসেছিলো। উত্তরটা অন্যদের মতো অভিযোগকারীদেরও জানা আছে। কিন্তু নিজেদের দুর্বলতা আড়াল করা বা দায়িত্ব এড়াতে তারা এমন হাস্যকর অভিযোগ তোলে। প্রতিদিন সকালে সূর্য উঠে সন্ধ্যায় অস্ত যায়, রাতের আকাশে ওঠে চাঁদ¾এটা চিরায়ত সত্য। এটা কোনো সংবাদ নয়। কিন্তু যখন চাঁদ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে, তখন কিন্তু তা অনেক বড়ো সংবাদ হয়। ঠিক একইভাবে একজন মানুষ তার দায়িত্ব পালন করছে এটা সংবাদ নয়। সংবাদ তখনই হয়, যখন তার দায়িত্বহীনতায় জনমানুষের দুর্ভোগ ও দেশের ক্ষতি হয়। ফলে সংবাদের গুরুত্ব বুঝেই সংবাদ হয়। আবার চরম অব্যবস্থাপনা, অনিয়মের মধ্যেও ভয়-ডর উপেক্ষা করে যখন কেউ নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করে, তখনো তা সংবাদ আকারে উঠে আসে। কেননা ব্যতিক্রমও সংবাদ। ব্যতিক্রম তা যেমনই হোক না কেনো, দিনশেষে সংবাদের গুরুত্ব নির্ভর করে প্রতিবেদকের মুন্সিয়ানার ওপরই। ব্যক্তিমানুষ কতোটা সচেতন তার ওপরে যেমন সংবাদের গুরুত্ব হেরফের হয়, আবার তেমনই দায়িত্বশীলতার অভাবে নিজে ও প্রতিষ্ঠানকে বিপাকে পড়তে হয়। আর সেই পরিস্থিতিতে সম্প্রচার সাংবাদিকতার ধারাবাহিক আলোচনায় এবারের বিষয় প্রতিবেদকের গুণাবলির নানা দিক।
নাছোড়বান্দা মনোভাব
সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে প্রতিবেদক দেখে না। অন্যদের ক্ষেত্রে দেখে-শুনে একটা বর্ণনা দিলেই চলে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর মতো ধারা বিবরণীতে আবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই প্রতিবেদকের। তাকে লেগে থাকতে হয়। প্রতিটি ঘটনার পিছনের ঘটনা খতিয়ে দেখা এবং প্রকৃত কারণ বোঝার প্রয়োজন হয়। আর এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যই আর পাঁচটা মানুষ থেকে আলাদা করে একজন প্রতিবেদককে। এই পার্থক্য তৈরির কাজটি শুধু একদিন বা এক বছরের জন্য নয়, অনেকটা নাছোড়বান্দা মনোভাব সাংবাদিকের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হওয়া জরুরি। আর এই প্রক্রিয়ার মধ্যে মিলবে সংবাদের নতুন নতুন উপাদান। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে সংবাদ করতে গিয়ে এমনই এক সুখকর অভিজ্ঞতা পাঠকের জন্য তুলে ধরছি।
শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চুর হাতে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঋণ লোপাটের ঘটনায় তোলপাড় সারাদেশ। সংবাদ মাধ্যমগুলোর সংবাদে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনা টক অব দ্য কান্ট্রি। ঋণ লোপাট নিয়ে অন্যদের মতো প্রতিবেদন করার পাশাপাশি খুঁজতে থাকি বাচ্চুর অন্যান্য অনিয়ম-দুর্নীতি। এ নিয়ে প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত। ঠিক সেই সময় মতিঝিলের শাপলা চত্বরের পাশেই ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে চোখে পড়ে ‘বেসিক-জামান টাওয়ার’ নামে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা নির্মাণাধীন বহুতল একটি ভবন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, বেসিক ব্যাংক জমির তথাকথিত মালিক সিঙ্কুজামানের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি ফ্লোর কেনায় ভবনটির নাম হয়েছে ‘বেসিক-জামান টাওয়ার’। সিঙ্কুজামান লাপাত্তা হওয়ার কারণে ভবনের কাজ বন্ধ হওয়ায় ৮০ কোটি টাকায় কেনা ভবনটিতে উঠতে পারছে না ব্যাংকটি। নির্মাণ শেষ হলেই ভবনটি পাবো, পাচ্ছি বলে আশ্বাস দিয়ে চলছেন ব্যাংকটির তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
কিন্তু কেনো নির্মাণ আটকে আছে, তা জানা নেই কারো। সন্দেহ হয়, জমির কাগজপত্রে কোনো জটিলতা নেই তো? যেই ভাবা সেই কাজ, হাজির হই মতিঝিলের ভূমি অফিসে। অনেক খোঁজাখুজির পর ভূমি অফিস পেয়ে চোখে-মুখে হাসি ফুটলেও সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ভূমি অফিসের কর্মকর্তা জমির সিটি জরিপ, খতিয়ান আর পর্চা নম্বর জানতে চাওয়ায় বেকায়দায় পড়ে গেলাম। কারণ ভবনের হোল্ডিং নম্বরই আমার কাছে একমাত্র সম্বল। আর ভূমি অফিসে ভবনের হোল্ডিং নম্বরের তেমন কোনো কাজ নেই। ফলে পর্চা-খতিয়ান ছাড়া কিছুই জানা সম্ভব নয়, সাফ জানিয়ে দিলো তারা। হতোদ্যম আমি বসে পড়তে পড়তে জানতে চাইলাম ফাইল ঘাটলে কি কিছু পাওয়া যাবে? আমার কৌতুহলী প্রশ্ন শুনে এক কর্মকর্তা গোটা দশেক জমির রেকর্ডের বিশাল রেজিস্ট্রার খাতা দেখিয়ে বললেন, এত্ত এত্ত পাতা খুঁজে কি বের করতে পারবেন? এক মুহূর্ত দেরি না করে জবাব দিলাম, পারবো।
জানি, এভাবে পাতার পর পাতা খুঁজে ঢাকা শহরের কোনো জমির তথ্য বের করা খুবই সময়সাপেক্ষ ও বিরক্তিকর। তবে পাশে পেলাম ভিডিওগ্রাফারকে; দুজন দুটি ঢাউস আকারের রেজিস্ট্রার নিয়ে বসে পড়লাম মাটিতে। কিছু সময়ের মধ্যে দুজন মিলে দুটো রেজিস্ট্রারের শ’চারেক পাতা খোঁজা শেষ। তৃতীয় রেজিস্ট্রারের মাঝামাঝি আসতেই ইউরেকা-ইউরেকা বলে খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম বহু আকাক্সিক্ষত একটা নোটিশ দেখে। নোটিশটি বেসিক ব্যাংকের কেনা তথাকথিত সিঙ্কুজামানের জমির মালিকানা সংক্রান্ত। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার জেলা প্রশাসক চিঠি দিয়ে জমিটির খাজনা না নিতে আদেশ পাঠান ভূমি অফিসে। সেখানে বলা হয়, “ঢাকা জেলার মতিঝিল সার্কেলাধীন মতিঝিল মৌজাস্থিত ১০/১ টয়েনবী সার্কুলার রোডস্থ হোল্ডিং পরিত্যক্ত জমি হিসেবে ‘খ’ তালিকায় ৩১ নং ক্রমিকে লিপিবদ্ধ থাকা সত্বেও [সত্ত্বেও] দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে উক্ত হোল্ডিংস্থ সিটি জরিপের ৬৫৫ নং খতিয়ানভুক্ত ২৮৫১ নং দাগের ৭২৬০ একর পরিত্যক্ত ... অবৈধভাবে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করায় সরকারের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।”
তার মানে দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি পরিত্যক্ত সম্পত্তি নিজের নামে রেকর্ড করেছে তথাকথিত মালিক সিঙ্কুজামান। তাই তো ভূমি অফিসে নোটিশ দিয়ে তা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। ভূমি অফিসের রেজিস্ট্রারে আরো লেখা আছে পাকিস্তানের সাবেক মন্ত্রী ওহিদুজ্জামানের ছেলে সিঙ্কুজামান জালিয়াতির মাধ্যমে জমির মালিকানা মামলায় সিটি জরিপে রের্কড করেন নিজের নামে। আর এ কারণেই বেসিক-জামান টাওয়ারের নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখেছে প্রশাসন, আটকে আছে বেসিক ব্যাংকের ৮০ কোটি টাকা। এই তথ্য প্রতিবেদনটিকে ভীষণভাবে বিশেষায়িত করে তুলেছিলো। অথৈ সাগর থেকে মুক্তা আহরণের জন্য সেদিনের সেই নাছোড়বান্দা মনোভাব সংবাদকর্মী হিসেবে না থাকলে এটা নিশ্চয় সম্ভব হতো না।
কৌতুলহলী মন
দুই দিনের পানিবিষয়ক আর্ন্তজাতিক সম্মেলনে কুয়াকাটা যাই জানুয়ারি ২০১৭ তে। ফেরার পথে পানি জাদুঘর নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি শেষে দুপুরে পটুয়াখালী সদরে পৌঁছাই। ঢাকা ছাড়ার আগে একটা সূত্রে সৌরশক্তি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে জলবায়ু তহবিলের অনিয়মের খবর জেনেছিলাম। এই প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশন (পি ডি বি এফ)। এর বাইরে আমার কাছে আর কোনো তথ্যই ছিলো না, এমনকি পটুয়াখালীতেও আমার প্রথম যাওয়া। অভিযোগের বিষয়ে জানতে, নেই কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের ফোন নম্বর। স্থানীয় প্রতিনিধিও বিষয়টি নিয়ে অবহিত নন। ফলে শুন্য হাতে অনুসন্ধান শুরুর বিকল্প ছিলো না। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে পি ডি বি এফ-এর এক জেলা কর্মকর্তার ফোন নম্বর পেয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমি আর বুঝিনি ফোনে কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলাই কাল হবে। কারণ কিছু সময় পর সৌরশক্তি উন্নয়ন প্রকল্পের অফিসে গিয়ে দেখি ঊর্ধ্বতন সব কর্মকর্তা দুপুরের আগেই চলে গেছে। এমনকি তাদের ব্যক্তিগত মোবাইলফোন সেটগুলোও বন্ধ। জেলা কার্যালয়ে কাউকে না পেয়ে যাই উপজেলা সদর কার্যালয়ে। সেখানে পাই হিসাবরক্ষককে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমি এসব প্রকল্প-টকল্প সম্পর্কে কিছুই জানি না, শুধু টাকা-পয়সার হিসাব রাখি।’ তার কথা শুনে দ্বিতীয় দফা ধাক্কা খাই। কিন্তু হাল ছাড়ি না। গল্পে গল্পে হিসাবরক্ষকের কাছে রেজিস্ট্রার খাতা আছে কি না দেখতে চাই। নিমরাজি হয়ে তিনি রেজিস্ট্রার খাতা দেখাতে শুরু করেন। খাতায় পেয়ে যাই গ্রাহকদের নাম-ঠিকানা, মোবাইলফোন নম্বর। কিন্তু বেশিরভাগই নাম-ঠিকানায় কাটাকাটি করা। নাম কাটাকাটি কেনো¾এমন প্রশ্নের জবাবে হিসাবরক্ষক জানান, গরিব মানুষ তো ঠিকানা বদল করে, তাই এমন কাটাছেড়া। উত্তর সন্তোষজনক নয়, এতো এতো ঠিকানা পরিবর্তনের পিছনে নিশ্চয় অন্য কারণ আছে।
একটু সময় নিয়ে গ্রাহকদের মোবাইলফোন নম্বরগুলোতে যোগাযোগের চেষ্টা করে দেখি বেশিরভাগই বন্ধ। আমার সন্দেহ বাড়তে থাকে। তিনটি মোবাইলফোন খোলা পাই¾এর মধ্যে একজনের বাসা ঢাকায়, ফলে সোলার প্যানেল নেওয়ার প্রশ্নই উঠে না বলে জানিয়ে দেন। আরেকজনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলায়। বাকি এক গ্রাহকের বাড়ি অফিস থেকে কিলো দশেক দূরে। তার কাছে ভালো করে ঠিকানা জেনে নিয়ে গোধূলি বেলায় রওনা হই এক অজানা পথে। বাড়ির পাশের স্থানীয় বাজারেই পেয়ে যাই সেই গ্রাহককে¾অল্প কথা বলতেই তিনি যেনো অভিযোগের ডালা মেলে ধরেন পি ডি বি এফ-এর সোলার প্যানেল নিয়ে। একদিকে নিম্নমানের সোলার, তার ওপর নাকি দাম বেশি বাজার মূল্যের চেয়ে। সঙ্গে জলবায়ু প্রকল্পের সরকারি টাকায় ২১ শতাংশ সার্ভিস চার্জ! বিপরীতে সেবা দূরের কথা, ফোনের পর ফোন দিলেও আসে না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। সব শুনে আমার আগ্রহ বাড়তে থাকে। ততোক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, গ্রামের বাজার খুব বেশি সময় চলবে বলে মনে হলো না।
ভুক্তভোগী সেই গ্রাহক জানান, এখানে তার মতো আরো অনেকে আছে। তাদের দেখা পেতে গ্রামে যেতে হবে। তখন আর আমার থামার ইচ্ছা-সুযোগ কোনোটাই নেই। গ্রামে গাড়ি নিয়ে যেতে কিলো খানেক ঘুরতে হবে, সরু রাস্তায় অন্ধকারে গাড়ি যাওয়াও ভীষণ কঠিন। অগত্য মাঠের মধ্য দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম ভিডিওগ্রাফারসহ আমরা তিনজন। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার, তারপরও সদ্য ধান কাটা মাঠ। পথপ্রদর্শক গ্রাহকের হাতে টর্চলাইটই আলোর একমাত্র উৎস। সারাদিনের কাজে ক্যামেরার ব্যাটারি শেষ দিকে, তাই সেই লাইট জ্বালানোরও উপায় নেই। হাঁটছি আর ভাবছি, এই অচেনা জায়গায় যদি কেউ সবকিছু কেড়ে নেয়, কিছুই করার থাকবে না। কিন্তু সাহস হারানোর মতো অবস্থায় ছিলাম না। এভাবে মিনিট দশেক হাঁটার পর ভুক্তভোগী সেই গ্রাহকের বাড়ির উঠোনে আমরা। তিনটির জায়গায় জ্বলছে একটি মাত্র সৌরবাতি। পাশের আরো কয়েক বাড়ির সৌরবাতির একই অবস্থা। দ্রুত সৌরবাতির ফুটেজ ও সাক্ষাৎকার নিয়ে আবার মাঠের পথে হাঁটা শুরু। এবার আর উৎকণ্ঠা নয়, মনে আনন্দ একটা সফল অনুসন্ধানের। সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত আমরা বাজারে সামান্য চা-নাস্তা খেয়ে পটুয়াখালী শহরের পথে রওনা দিই।
প্রতিবেদক বয়ানকারী বা ধারাভাষ্যকর নয়
শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, অপরাপর সাংবাদিকদের চেয়ে আলাদা ও আর্কষণীয় সংবাদ করতেও একজন সংবাদকর্মীকে সংবাদের বিষয়বস্তু নিয়ে ভাবতে হয়। একই সংবাদ প্রতিদিনই কাভার করে অনেকগুলো সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল। সবার মধ্যে থেকে একই বিষয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের চ্যালেঞ্জই আলাদা Ñযদিও তা ভালো-মন্দের পার্থক্য করে দেয়। কোনো বিষয়ে একটু নজর দিলেই ভালো কিছু বের করে আনা সম্ভব। আর সেটাই এতো গণমাধ্যমের ভিড়ে আপনার কোনো সংবাদ দেখতে বা পড়তে পাঠক ও দর্শককে আগ্রহী করে তুলবে। যদিও সম্প্রচার সাংবাদিকতায় এই ধরনের ভাবনার উপস্থিতি খুব কমই চোখে পড়ে। উল্টো অনেকটা বয়ানকারী বা ধারাভাষ্যকরের মতো আমরা ঘটনার বর্ণনা হাজির করি। সেই প্রতিবেদনে অনেক তথ্য থাকলেও তা দর্শককে বাড়তি কিছু দিতে পারে না। তাইতো রিমোট কনট্রোল ঘুরিয়ে দর্শক অন্য চ্যানেলে চলে যায়। বিশেষ করে পরদিন সংবাদপত্রে ওই ঘটনার বিস্তারিত সংবাদ পড়লে টিভি প্রতিবেদনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ অক্টোবর দৈনিক ‘বণিক বার্তা’ পড়ে নিজের ভাবনার দৈন্য হারে হারে টের পেয়েছিলাম।
২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেট এক্সপ্রেসওয়ের অনুমোদন পায় ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অক্টোবরের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়। ১৬ হাজার নয়শো এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই উড়াল সেতু উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের সেতুবন্ধন করবে বলে দাবি সরকারের। আর কয়টা প্রকল্প অনুমোদন পেলো এবং মোট কতো টাকা খরচ হবে ইত্যাদি তথ্য দিয়ে একনেক সভার প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিলাম আমার চ্যানেলের জন্য। প্রতিটি একনেক সভার প্রতিবেদনই টেলিভিশনগুলোতে সাধারণত এমন গৎবাঁধাভাবে সম্প্রচার হয়ে আসছে।
পরদিন সকালে ‘বণিক বার্তা’র প্রধান সংবাদ (লিড নিউজ) দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ! সবকিছু থাকার পরও শুধু ভাবনাহীনতায় বয়ানকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলাম, তা ভেবে আফসোসে বুক চাপড়াতে থাকি। ‘বণিক বার্তা’ তার প্রতিবেদনে লিখেছে, ভিয়েতনামে হো চি মিন শহরে ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়াল সেতু নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ধরা হয় দুইশো পাঁচ কোটি টাকা। ভারতের বেঙ্গালুরু শহরে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়াল সেতুর কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ছিলো দুইশো তিন কোটি টাকা। চীন-ভারতসহ বিভিন্ন দেশে কিলোমিটার প্রতি সর্বোচ্চ দুইশো থেকে দুইশো পঞ্চাশ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তাহলে বাংলাদেশে কেনো তা তিন গুণ, টাকার অংকে যা ৭০৪ কোটি টাকা¾সেই প্রশ্নই তুলেছে পত্রিকাটি।
আর এই দুর্দান্ত প্রতিবেদনটি তৈরি করতে কিন্তু খুব বেশি গবেষণা করতে হয়নি সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে। কারণ ইন্টারনেটের বদৌলতে তুলনামূলক সব তথ্য পাওয়া এখন কোনো বিষয়ই না। অথচ আমি সেটা করতে পারিনি। সবার মধ্যে থেকেও তাই আমার প্রতিবেদন আর আলাদা হয়নি, বাড়েনি আমার চ্যানেলের গ্রহণযোগ্যতা।
পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা
সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নানামুখী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় সংবাদকর্মীকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিকল্প থাকে না। তাই কাজের মধ্যেও নিজেকে সবসময় সজাগ রাখতে হয়। চোখ ক্যামেরায় থাকার কারণে পিছনে কী হচ্ছে, তা দেখতে পায় না ভিডিওগ্রাফার। তার কাজ নির্বিঘ্নে করার পরিবেশ তৈরিতেও প্রতিবেদককে সজাগ থাকতে হয়। বিশেষ করে রাস্তায় যানজট বা অন্য কিছুর ছবি নেওয়ার সময় ভিডিওগ্রাফারের পিছনে সামান্য একটু দূরে উল্টো দিকে মুখ করে থাকা জরুরি। ঠিক যেমন দলবদ্ধ হরিণ ঘুমানোর সময় চারদিকে মাথা দেয়, যাতে যেকোনো বিপদেই দ্রুত জানতে পারে। তেমনই উল্টো দিকে দাঁড়ালে পিছন থেকে গাড়ি যেনো ধাক্কা না দেয়, সেটা দেখতে পায় প্রতিবেদক। মিছিল-মিটিং-সমাবেশ-হরতাল-অবরোধের সময়ও এটা বেশি করে মাথায় রাখতে হয়। ভিডিওগ্রাফার ও নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি ক্যামেরা-গাড়িসহ অফিসের প্রতিটি সরঞ্জাম যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, খেয়াল রাখতে হয় সেদিকটাও। এক কথায় প্রতিবেদককে প্রত্যুৎপন্নমতি ও তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। পরিস্থিতি বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে বিপত্তিতে পড়তে সময় লাগবে না। এতে সংবাদ সংগ্রহের কাজও ভয়ানকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
৫ মে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ, হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধের মিছিল আসছে রাজধানীতে। সকাল থেকে মহাখালীতে সেই সংবাদ সংগ্রহের জন্য আসা। সকাল সকাল পৌঁছে গিয়ে দেখি হাজার হাজার মানুষ একের পর এক মিছিল নিয়ে আসছে হেফাজতের ব্যানারে। বিপরীতে মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচে হেফাজতকে প্রতিহত করে প্রতিবাদ সমাবেশ করছে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। শাহরিয়ার কবীরসহ জনা তিরিশেক সংগঠক। ঘটনাস্থলে সকালেই হাজির হওয়ায় ক্রমেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার বিষয়টি অফিসকে অবহিত করি। একই সঙ্গে নজর রাখছিলাম মহাখালীর কাঁচা বাজারের সামনের রাস্তায়। কারণ সেখানে মিছিল নয়, একদল তরুণের জটলা। এদিকে মাইকে হেফাজত-জঙ্গিবাদ বিরোধী বক্তব্য চলছে নির্মূল কমিটির।
মাঝে মধ্যে হেফাজতের মিছিল থেকে অতি উৎসাহী কেউ কেউ ছুটে যাচ্ছে সমাবেশকারীদের দিকে। মিছিলকারীরাই তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ওই কাঁচা বাজারের সামনের জটলা থেকে ক্রমশ মিছিলের পাশ দিয়ে ফ্লাইওভারের সড়ক বিভাজনের গা ঘেঁষে এগিয়ে আসছে কয়েকজন করে। তারা যে নির্মূল কমিটির সমাবেশকারীদের ওপর আক্রমণের লক্ষ্যে এদিকে আসছে অল্প সময়ের মধ্যে তা বুঝতে কষ্ট হলো না। আমার শঙ্কার কথা ভিডিওগ্রাফারকে জানিয়ে ওই গ্রুপের দিকে ক্যামেরা তাক করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা সমাবেশের উল্টো দিকের রোড ডিভাইডারের উপর খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম। কারণ যদি সমাবেশে হামলা হয়, তাহলে নিরাপদে সব ছবিই ক্যামেরাবন্দি করতে পারবো। সমাবেশে বক্তার বাইরে দর্শক সারিতে মাত্র ১০ Ñ১২ জন বসা। আমরা প্রস্তুতি নিতে নিতেই সমাবেশের ওপর শুরু হয়ে যায় বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল বর্ষণ। এই দেখে ছবি নেওয়ার জন্য আমার ভিডিওগ্রাফার সামনে যেতে চাইলে আমি তাকে বাধা দিই। কারণ আমরা ছাড়া আর কোনো টেলিভিশন চ্যানেল নেই সেখানে। ফলে আমরাও আক্রমণের শিকার হতে পারি। আর যেহেতু ক্যামেরার জুম লেন্স আছে এবং তাই সামনে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
ক্রমাগত ইটের আঘাতে টিকতে না পেরে সমাবেশের বক্তারা পাশে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়, কিন্তু কেউই চলে যায়নি। একপর্যায়ে হামলাকারীরা সমাবেশস্থলে এসে মুহূর্তের মধ্যে সব চেয়ার ভেঙে তছনছ করে দেয়। পুলিশি হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত পিছু হটে হামলাকারীরা। হামলার পুরোটা ক্যামেরাবন্দি হয়েছে, তাই দেরি না করে অফিসে পাঠানো হয়। এটি ছিলো ঢাকা শহরে সেদিন প্রথম কোনো হামলার ঘটনা। যদিও এই হামলাকারী তরুণরা ঠিক কারা ছিলো জানা যায়নি। তারপরও পর্যবেক্ষণ থেকে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেই এই এক্সক্লুসিভ ছবি সেদিন ধারণ করা সম্ভব হয়েছিলো।
সবার আগে নিরাপত্তা
সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ পেশাগুলোর একটি। তাই পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিজের ও সহকর্মীর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই সংবাদ সংগ্রহ করতে হবে। সন্ত্রাস বা যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে যেমন রয়েছে নিরাপত্তাহীনতা, তেমনই স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও ঝুঁকি রয়েছে। সরকারি খাস জমি, খাল-বিল-নদ-নদীসহ দখলদারদের বিরুদ্ধে সংবাদ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয়। আর এই দখলবাজ সুবিধাভোগীদের স্বার্থরক্ষায় স্থানীয় বখাটে-চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীরা কাজ করে। ফলে তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে ছবি তুলতে গেলেই তারা তেড়ে আসে অনেক সময়। ফলে সংবাদপত্রের চেয়ে টেলিভিশন প্রতিবেদকের এসব ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। আবার পুলিশসহ সরকারি প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংবাদ হলেও ঝুঁকি থাকে হামলা-মামলার। সাম্প্রতিক ঢাকা শহরে টেলিভিশনের প্রতিবেদক ও ভিডিওগ্রাফার অহরহই হামলার শিকার হচ্ছে। পেশিশক্তির আস্ফালনজনিত নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি নিজের অসর্তকতায় হুমকিতে পড়তে পারে যেকোনো সংবাদকর্মী। চোখের সামনে আজও ভেসে ওঠে এমনই এক মারাত্মক দুর্ঘটনার ছবি।
২০০৯ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাস। তখন ‘একুশে টেলিভিশন’-এ কাজ করি। মিরপুরে গ্রামীণফোনের প্রধান কার্যালয়ের পিছনে বস্তিতে আগুনের ঘটনা কাভার করতে ছুটে যাই। আগুনের ভয়বাহতার ছবি তুলতে একুশেসহ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের ভিডিওগ্রাফার উঠেছিলো ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির ছাদে। পানি দেওয়া শেষে গলিতে দাঁড়িয়ে ছিলো গাড়িটি। আরেকটি গাড়িকে জায়গা দিতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ওই গাড়িটা হুট করেই স্টার্ট দিয়ে হাত দুয়েক সামনে যায়। আচমকা চলায় গাড়ির ছাদে থাকা কয়েকজন ভিডিওগ্রাফার তাল সামলাতে পারলেও সবার পিছনে থাকা ‘এটিএন বাংলা’র ভিডিওগ্রাফার নিচে পড়ে যান। মাইক্রোফোন ও ক্যামেরার ট্রাইপড হাতে আমি গাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে। হঠাৎই খেয়াল করলাম ক্যামেরাসহ ভিডিওগ্রাফার নিচে পড়ে যাচ্ছেন। কিছু বোঝার আগেই ইট পাড়া সেই গলির রাস্তায় আছড়ে পড়ে তার দেহ, ক্যামেরা ভেঙ্গে কয়েক টুকরো হয়ে যায়। সেই এক ভয়বাহ অবস্থা, তাড়াতাড়ি করে ওদের অফিসের গাড়িতেই নেওয়া হয় পঙ্গু হাসপাতালে। মেরুদণ্ডের দুটো হাড় ভেঙে সেবার ওই ভিডিওগ্রাফারকে দুই মাস হাসপাতালে থাকতে হয়। আগুনের সংবাদ করতে গিয়ে অসচেতনতায় সংবাদকর্মীই হয়ে যায় সংবাদ।
ফলে নিজের ও সহকর্মীরা নিরাপত্তায় সবসময়ই সচেতন থাকার বিকল্প নেই। আবার একটু আগে সচেতন ছিলাম বলে এখন গা ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিক্ষণ চারদিকের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সচেতন না হলে জীবন বিপন্ন হতে পারে। এখন এমনই এক ঘটনা তুলে ধরছি।
২০১১ খ্রিস্টাব্দ, খুব সম্ভব মার্চ-এপ্রিল মাস হবে। কাজ করছি সংবাদভিত্তিক চ্যানেল ‘এটিএন নিউজ’-এ। বিমান বন্দরের দিক থেকে সবে পিলারগুলো উঠতে শুরু করেছে কুড়িল ফ্লাইওভারের। নির্মাণাধীন এই ফ্লাইওভারের পিলারগুলো উঠেছে রেললাইনের ধার ঘেঁষে। দুই পাশে পিলারগুলোর অবস্থান এতো কাছে যে ভবিষ্যতে চাইলেও রেললাইন সম্প্রসারণ করা যাবে না। এমনকি অদূর ভবিষ্যতে প্র্রয়োজনে রেল লাইনের উপরে মেট্রোরেলের আদলে রেল লাইন তৈরি করাও যাবে না। অপরিকল্পিত এই ফ্লাইওভার নিয়ে প্রতিবেদনের ছবি নেওয়া শেষে পিস টু ক্যামেরা (পি টি সি) দিতে দাঁড়িয়েছি কুড়িলে দুই রেল লাইনের মাঝামাঝি একটি অংশে। পি টি সি’র শেষ করার আগেই বিমান বন্দরের দিক থেকে হঠাৎই ট্রেন চলে আসায় ভিডিওগ্রাফার চিৎকার করে আমাকে সরে যেতে বলেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিক আমরা লাফ দিয়ে চলে আসি প্রথম লাইনে। শরীরে কাঁপুনি যেনো আর থামে না¾কানের পাশ দিয়ে তখন প্রচণ্ড শব্দ-গতিতে চলছে সেই ট্রেন। নিশ্চিত দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া নিয়েই কথা বলছিলাম আমরা। হঠাৎই আগের রেললাইন ধরে হেঁটে চলা এক নিরাপত্তাকর্মী চেঁচিয়ে আমাদের সরে যাওয়ার ইশারা করছে। পিছনে তাকিয়ে দেখি আমাদের লাইনেও ধেয়ে আসছে ট্রেন। এবং সেটা ঠিক আমার পিছনে। আগের ট্রেনের শব্দ এবং বুমের তার গোছানো নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এবার ভিডিওগ্রাফার ও আমি কেউই সেটা বুঝতে পারিনি। মুহূর্তেই লাফিয়ে পড়ি সড়কের দিকের অংশে। এবার দুজনে গিয়ে পড়ি রেললাইন সংলগ্ন ড্রেনে। বাঁশের খুঁটি আকড়ে আমরা তখন ঝুলন্ত অবস্থায়; নিরাপত্তাকর্মীরা এগিয়ে এসে হাত ধরে টেনে তুলে আমাদের। তখনো ক্যামেরা বন্ধ করার সুযোগ পর্যন্ত হয়নি। ফলে পুরো ঘটনা ক্যামেরাবন্দি হয়। মাত্র ১৫ সেকেন্ডের জন্য মৃত্যুর মুখ থেকে সেদিন দুইজন ফিরেছিলাম সেই নিরাপত্তাকর্মীর আন্তরিকতায়।
প্রথম দফায় যখন ট্রেন এলো তখনই আমাদের উচিত ছিলো রেললাইন থেকে সরে দাঁড়ানো। অথচ প্রথম বার বেঁচে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় নিজেদের জীবন বিপন্ন করতে যাচ্ছিলাম নিজ হাতেই। নিজেদের ভুল আর অসর্তকতায় গুণতে হতো অনেক বড়ো মাশুল। পুনশ্চ : সেই প্রতিবেদনটি আর করা হয়ে ওঠেনি।
ভয়কে জয়
সাংবাদিকতা এমনই এক পেশা যেখানে জীবন ছাড়া হারানোর কিছু নেই। দেশের জন্য, সমাজের জন্য সর্বোপরি গণমানুষের পক্ষে সংবাদ করতে গিয়ে যারা জীবন দিয়েছে, তারা সাংবাদিকতায় সাহসী হিসেবে অনুকরণীয় হয়ে আছে, থাকবে। তবে নিশ্চয়, বোকার মতো রেললাইনে পি টি সি দিতে গিয়ে প্রাণ দেওয়া আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে প্রাণ দেওয়া এক নয়। বিদ্যামান সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে একদম নিচের স্তরের পেশিশক্তির অধিকারী সবাই চোখ রাঙায় সুযোগ পেলেই। পদে পদে বাধা দেয়। হুমকি-ধামকি দেয়, তাতেও কাজ না হলে মিথ্যা মামলা দেয়। হাল আমলে জামিন অযোগ্য তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলায় জেলে পর্যন্ত যেতে হয়েছে সাংবাদিকদের। অনেককে প্রাণও দিতে হয়েছে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে। আর পাঁচটা পেশার চেয়ে কিছুটা আলাদা সাংবাদিকরা; অন্যরা যেখানে অধিকার বঞ্চিত হয়, পেশিশক্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি বিচারের আশায় কেটে যায় বছরের পর বছর, সেই ভুক্তভোগী মানুষগুলোর আশ্রয়স্থল হয় সাংবাদিক। তাই সামাজিক দায়িত্বশীলতার কারণে অনেকক্ষেত্রে অকুতোভয় সাহস নিয়ে সত্যের পক্ষে সাংবাদিক লড়াই করে। তবে দিন যতো যাচ্ছে, ততোই বাড়ছে দুর্নীতি-অনিয়ম আর খুনখারাবি। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বাড়ছে সন্ত্রাস, আর সে কারণে অতীতের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি নতুন নতুন উপায়ে চেষ্টা চলছে সাংবাদিকের কণ্ঠরোধে। এমনই এক অভিনব হুমকি-ধামকিসহ কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা তুলে ধরছি।
৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬, সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে শ’দুয়েক মানুষ চারটি ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়েছে মানববন্ধনে। ব্যানারগুলোর একটিতে ‘যমুনা টেলিভিশনের হলুদ সাংবাদিক সুশান্ত সিনহা ও তার দোসররা হুশিয়ার সাবধান’; আরেকটিতে ‘যুমনা টিভি’র সাংবাদিক সুশান্ত সিনহা পিডিবিএফ ধ্বংসের চক্রান্তে লিপ্ত তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি’ লেখা। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে চলে এই মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ। বক্তারা হুশিয়ার করে বলেন, হলুদ সাংবাদিক সুশান্ত সিনহা পি ডি বি এফ নিয়ে সংবাদ বন্ধ না করলে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। খবর পেয়ে দেখতে গেলাম প্রতিবাদকারীদের। দেখলাম, পি ডি বি এফ-এর দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে সংবাদ করায় আমার বিরুদ্ধে এই মানববন্ধন তথাকথিত সি বি এ’র নামে। প্রধান উদ্যোক্তা এমডি’র নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির অন্যতম সহচর আমিরুল হাসান। তিনিই মাইকে হুমকি-ধামকি দিয়ে চলছেন, ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে বাধ্যতামূলকভাবে সবাইকে এনেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানববন্ধনের সেই ছবি শেয়ার করেছিলাম। অর্থনৈতিক সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞ এক সাংবাদিক সেখানে মন্তব্যের ঘরে বলেন, ‘পত্রিকার বিরুদ্ধে মানববন্ধন বা প্রতিবাদ হতে দেখেছি। কিন্তু একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এমন প্রতিবাদ আগে হয়নি। আপনি তো সফল।’ এই মানববন্ধন অবশ্য আমাকে ভয় দেখাতে পারেনি। বরং আরো বেশি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে শক্তি ও সাহস জুগিয়েছিলো। তথাকথিত সেই সি বি এ নেতার হুমকির পরে অবশ্য ওই বিষয়ে আরো একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করি। টনক নড়ে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। শুরু হয় তদন্ত। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সেই এমডি সারাদেশে পি ডি বি এফ-এর অফিসে বাধ্যতামূলকভাবে মানববন্ধন আর প্রতিবাদ সমাবেশের নির্দেশনাসহ চিঠি পাঠান। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অক্টোবর ‘সুশান্ত সিনহার গংয়েরা হুশিয়ার সাবধান’ লেখা প্লাকার্ড-ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ করেন ২৫ জেলার কর্মচারী-কর্মকর্তারা।
কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। জয় হয়েছে সত্যের। যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে গঠিত হয় সরকারি তদন্ত কমিটি। তদন্তে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর প্রমাণ মেলে। শাস্তি হিসেবে অনিয়ম আর জালিয়াতি করে রকেট গতিতে এক দিনেই নিয়োগ পাওয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমানকে দুর্নীতির দায়ে চাকুরিচ্যুত করে পি ডি বি এফ-এর পরিচালনা পর্ষদ।
সংবাদের সত্যতা, সাংবাদিকের সততা
একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো তার সততা। আমাদের দেশসহ সারা পৃথিবীর ইতিহাসে লেখা আছে অসংখ্য সাংবাদিকের সততার কথা। সততা না থাকলে সত্য-মিথ্যের গোঁজামিল দিয়ে তাকে চলতে হয়। যতো টাকাই আসুক না কেনো তা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু কালিমা চিরস্থায়ী। আমৃত্যু তাকে মাথা নিচু করেই চলতে হয়। বৈষম্য আর লুটপাটের সমাজব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করতে দেওয়া হয় নানা প্রলোভন। এমনকি কখনো ঘনিষ্ঠ লোক দিয়েও চলে তদবির। কখনো কখনো ভিডিওগ্রাফারকেও ম্যানেজের চেষ্টা চলে। নিজেদের ছবি কোনো প্রতিবেদনে দেখানোর জন্য ভিডিওগ্রাফারসহ প্রতিবেদকের হাতে কাউকে কাউকে টাকা গুজে দিতে দেখা যায়। তাই এসব লোভের ফাঁদ থেকে সজাগ থাকতে হয় প্রতিবেদককে। যদিও বেশিরভাগ টেলিভিশন প্রতিবেদকে দেখেছি টাকার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে। তবে ব্যতিক্রম নেই, তাও নয়। অপরাধ ও অর্থনীতি-বাণিজ্য বিটের প্রতিবেদকের কাছে এসব অফার অন্যদের চেয়ে তুলনামূলক বেশি আসে। ফলে এই দুই বিটের প্রতিবেদকে আরো বেশি সতর্ক থাকতে হয়।
২০১৩ খ্রিস্টাব্দে বি এন পি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদে সরব হয় আওয়ামী লীগ। যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, সূত্রাপুরসহ রাজধানীতে আওয়ামী লীগের সমাবেশের ছবি নেওয়া শেষে দেখি এক পাতি নেতা ঘুরে ঘুরে টেলিভিশনের প্রতিবেদক ও ভিডিওগ্রাফারদের টাকা দেওয়ার চেষ্টা করছেন মিষ্টি খাওয়ার জন্য। আমার কাছে আসলে আমিসহ আরো কয়েক সহকর্মী স্বাভাবিকভাবেই ফিরিয়ে দিই তাকে। তবে টেলিভিশনের দু-একজন অতি উৎসাহে বলার চেষ্টা করে আরে নাও মিষ্টি খেতে যখন দিচ্ছে! ভাবটা এমন যে, মিষ্টির টাকা ঘুষের মধ্যে পড়ে না! উল্টো দিকে বি এন পি-জামায়াতের ঝটিকা মিছিল ও রাস্তায় টায়ার জ্বালানোর ছবি তোলার জন্যও দু-একজনকে দেখেছি এমন পয়সা দিতে।
এতো গেলো ছবি দেখানোর ঘুষ পর্ব। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো সংবাদ থামাতেই দেওয়া হয় ঘুষের প্রস্তাব। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করতে গিয়ে প্রায়শ মেলে এমন প্রস্তাব। ঘুষের সেই পর্বের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা জরুরি।
স্বায়ত্তশাসিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পি ডি বি এফ-এর শত কোটি টাকার দুর্নীতির প্রতিবেদন শুরু করি ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে। প্রতিষ্ঠানটির বাগেরহাট শাখায় সাড়ে তিন কোটি টাকা তহবিল তছরুপের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শাখা প্রধানসহ ছয়জনকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিদের যোগসাজশ ছাড়া সাধারণত এই পরিমাণ আর্থিক দুর্নীতি করা সম্ভব নয়। বাগেরহাটের ঘটনা ধরে অনুসন্ধানে নেমে পেয়ে যাই খোদ প্রতিষ্ঠান প্রধানের লাগামহীন দুর্নীতি-অনিয়মের চিত্র। কয়েকটি প্রতিবেদন সম্প্রচারের পর একদিন দেখা করতে চাইলো আমার চাকরিজীবনের প্রথম টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠান বিভাগের সাবেক দুই কর্মী। তারা ফোনে কয়েক দফা কথা বলে আমাকে আর প্রতিবেদন না করার জন্য অনুরোধ করলো। এবং শেষ পর্যন্ত অফিসে এসে দেখা করে আমাকে বোঝাতে লাগলো আর প্রতিবেদন না করার লাভের বিষয়টি।
আমিও তথাস্তু বলে হাসিমুখে তাদের বিদায় দিই। পরে যখন আবারও প্রতিবেদন করি, তখন তারা ফোন করে, দেখা করে আবার সেই তদবির নিয়ে। এতে কাজ না হওয়ায় তৃতীয় একজনের মাধ্যমে আমার কাছে প্রস্তাব আসে নগদ দুই লাখ টাকা আর সপরিবারে বিদেশ ভ্রমণের। যদিও সেদিন লোভটুকু সংবরণ করতে পেরেছিলাম বলেই হয়তো গল্পটা অকাতরে বলার সুযোগ পাচ্ছি। নিঃসন্দেহ এমন অভিজ্ঞতা আছে আমার মতো অনেক সাংবাদিকের।
রাজনৈতিক নেতা নয়, টিম লিডার
সম্প্রচার সাংবাদিকতার পুরোটা যৌথ কাজের অংশ, একা প্রতিবেদকের খুব বেশি কিছু করার থাকে না। খুব ভালো একটা সংবাদের সূত্র ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাগজপত্র পাওয়া গেলে তাকে সম্প্রচার উপযোগী করতে অনেকগুলো মানুষের ওপর নির্ভর করতে হয়। ভিডিওগ্রাফার, ভিডিও এডিটর, গাড়িচালক, গ্রাফিক্স, নিউজ এডিটরসহ চারÑপাঁচ জনের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে সংবাদ সম্প্রচারের উপযোগী হয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্ভর করতে হয় ভিডিওগ্রাফারের ওপর। ফলে কাজের আগে তাকে সংবাদের বিষয়বস্তু বুঝিয়ে রাখলে কঙ্ক্ষিত ছবি পাওয়াটা সহজ হয়। এজন্য সম্ভাব্য কাজের পরিধি সংক্রান্ত ছোট্ট একটা নোট বা চেকলিস্ট সঙ্গে রাখলে এবং তা নিয়ে ভিডিওগ্রাফারের সঙ্গে আলোচনা করলে ফল অনেক বেশি ভালো হয়। এতে করে তাদের মাথায় গেঁথে যায় ঘটনাস্থলের করণীয়। যদিও দিনশেষে সম্মিলিত চেষ্টার ফসল ভালো হলে ক্রেডিট বা বাহাবা যায় প্রতিবেদকের পকেটে।
যানজটের ঢাকা শহরে সময় মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছানোসহ সংবাদ সংগ্রহের জন্যও গাড়িচালকের ভূমিকা কম নয়। বিশেষ করে নতুন প্রতিবেদকরা রাস্তাঘাটসহ ঘটনাস্থল সম্পর্কে না জানলে অভিজ্ঞ ভিডিওগ্রাফারদের ও গাড়িচালকের ওপর নির্ভর করতে হয়। এককথায় প্রতিবেদক, ভিডিওগ্রাফার আর গাড়িচালক একটি টিম হিসেবে কাজ করে, যার দলনেতা প্রতিবেদক। ফলে তাদের সঙ্গে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে তারাও প্রতিবেদনটিকে নিজের মনে করে। আর কোনো কাজে কারো অংশীদারিত্ব থাকলে সেখানে কাজ ভালো না হওয়ার সুযোগ নেই। তাই দলের সদস্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার দক্ষতা-যোগ্যতা অর্জন করাও ভালো প্রতিবেদকের অনন্য গুণ।
এবার ছবি নিয়ে দুঃশ্চিন্তা দূর হওয়ার একটি অভিজ্ঞতা বলবো। এটা অবশ্য যেকোনো টেলিভিশন সংবাদকর্মীর জন্যই প্রযোজ্য। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদ সংগ্রহে রংপুর যাওয়া। দুই দিনের নির্ধারিত সফর শেষে ওই অঞ্চলে বীমা গ্রহীতাদের ভোগান্তির খোঁজ নিতে বেরিয়ে পড়ি রংপুর সদর ও পার্শ্ববর্তী মিঠাপুকুর উপজেলায়। কোন গ্রামে ভুক্তভোগী গ্রাহক পাবো সে সম্পর্কে অবশ্য আমার কোনো ধারণাই ছিলো না। বীমা নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতায় কেবল এতোটুকু জানি, দেশের সব অঞ্চলেই হাজারো মানুষ জীবন বীমা করে মেয়াদ শেষেও বীমা দাবির টাকা পাচ্ছে না। খুঁজতে খুঁজতে সদর উপজেলায় পেয়ে যাই বেশকিছু গ্রাহক।
পরদিন সকালে যাত্রা করি মিঠাপুকুরের দিকে। রাস্তায় যেখানেই মানুষের জটলা দেখি সেখানেই জিজ্ঞাসা করি, ভাই বীমা করে টাকা পায়নি এমন লোকজন আশপাশে আছে? কোথাও আর ভুক্তভোগী লোকের সন্ধান মেলে না, দুই-এক জায়গায় মিললেও সেখানেও কেউ নির্দিষ্ট করে নাম-ঠিকানা বলতে পারে না। এভাবেই মিঠাপুকুর-দিনাজপুর সড়কে কয়েক কিলোমিটার যেতেই চোখ আটকে যায় এক পুরাকীর্তিতে। রাস্তার পাশে গাছগাছালি ঘেরা এমন নান্দনিক শত বছরের সেই পুরাকীর্তি দেখার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ি। এমন নান্দনিক কারুকার্য সমৃদ্ধ চুন-সুড়কীর প্রাচীন মসজিদটির কথা দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার লোভ সামলোনো কঠিন। ভিডিওগ্রাফারেরও একই মত। তাই স্থানীয়দের কাছে ‘ভাঙা মসজিদ’ নামে পরিচিত সেই মসজিদ নিয়ে প্রতিবেদনের কাজ শুরু করি। অন্যান্য পুরার্কীতির মতো এখানেও সাইনবোর্ড টানিয়ে দায় সেরেছে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর। সরকারি দলিলে নাম ‘মিঠাপুকুর মসজিদ’। জরাজীর্ণ সাইনবোর্ডের তথ্য মতে, তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন শেখ মোহাম্মদ সাবেরের ছেলে শেখ বাছের। প্রায় দুশো বছর আগে নির্মিত প্রত্যন্ত অঞ্চলের ইটের তৈরি মসজিদটি শিল্পশৈলীর দিক থেকেও অনন্য।
মসজিদ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি শেষে আবার গাড়ি ছুটতে থাকে অজানা-অচেনা গ্রামের পথে। পথে পথে একই জিজ্ঞাসা, ভাই বীমা করে টাকা পায় নাই এমন গ্রাহক আছে। মহাসড়ক ছেড়ে সরু পাকা সড়ক ধরে কিলোদশেক চলার পর আমরা পৌঁছালাম এক গ্রামে। টেলিভিশনের গাড়ি দেখে একে একে জড়ো হয় গ্রামের ছোটো-বড়ো সব বয়সি মানুষ। এদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো তাদের অনেকেই ভবিষ্যতের আশায় মাসে ৫০/১০০ টাকা করে জমা দিয়েছে বীমা কোম্পানীর ডি পি এস অ্যাকাউন্টে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের কেউই সঞ্চয়ের সামান্য সেই টাকা ফেরত পাচ্ছে না। মুনাফা তো দূরের কথা।
মনে মনে ভাবি প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু খুবই চমৎকার, এর মধ্যে এই মানুষগুলোর জীবনের অনেক বিমূর্ত বিষয় আছে। কিন্তু তা টেলিভিশনের পর্দায় তুলে ধরার দুঃশ্চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে। বিষয়টি ভিডিওগ্রাফারকে বুঝিয়ে বললে তিনি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেন, ‘অসুবিধা নেই, ছবি হয়ে যাবে। আপনি যান মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের বীমার বইগুলো নিয়ে দেখাদেখি করেন, তাইলেই হয়ে যাবে।’ তার পরামর্শ মেনে আমি কথাবার্তা বলতে শুরু করি। কথা প্রসঙ্গে গ্রামবাসী জানায়, খানিক দূরে নতুন পাড়া নামে আরেক গ্রাম আছে। সেখানেও অনেক বীমা গ্রাহক আছে। এই গ্রামে কাজ শেষ করে ছুটলাম নতুন পাড়ায়। গ্রামে গাড়ি ঢোকার মতো রাস্তা নেই; তাই পুকুর পাড় দিয়ে এ-বাড়ি ও-বাড়ির উঠোন ধরে গ্রামের ভিতরে পৌঁছাই। ঠিক গ্রাম নয়, হতদরিদ্র ২০ Ñ২৫টি পরিবার নিয়ে একটি পাড়া। দিনমজুর এই মানুষগুলো তারপরও মাসে কেউ ৫০ টাকা, একশো টাকা সঞ্চয় করেছিলেন একটি বীমা কোম্পানিতে। কিন্তু কোম্পানির প্রতারণায় সেই টাকা এখন ফেরত পাচ্ছে না তারা। সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার হলো, এই দুঃখ-কষ্টের কথা কাউকে জানানোর সুযোগ পর্যন্ত নেই তাদের। এখানেও ভিডিওগ্রাফারের কথা মতোই কাজ করেছি। কাজ তো শেষ হলো, মনের মধ্যে তখন শঙ্কা ভালো ফুটেজ পেয়েছি তো! অবশ্য সেই শঙ্কা দূর হতে বেশি সময় লাগলো না। গাড়িতে বসে ভিডিওগ্রাফার আগ্রহ নিয়ে আমাকে যে ছবি দেখালেন তাতে তো আমি যারপরনাই খুশি। ঢাকায় ফিরে দুটো প্রতিবেদন তৈরি করতে ছবি নিয়ে এতোটুকু সমস্যায় পড়তে হলো না, বরং চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছি। এই অভিজ্ঞতা থেকে ভিডিওগ্রাফারের সঙ্গে আলোচনা করে তার ওপর আস্থা রাখার বিষয়টি পরবর্তী সময়েও কাজে লাগিয়েছি।
ফেইসবুক ম্যানিয়াক
তুফান বইছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের। হাতে হাতে স্মার্টফোনের বদৌলতে অনেকের মতো সাংবাদিকদেরও সরব উপস্থিতি থাকে ফেইসবুকে। নিজেদের সাফল্য, অভিব্যক্তিসহ দুঃখ-সুখের অনেক কথার ভাগাভাগি করার এ সুযোগ নিঃসন্দেহে ভালো। যদিও এই মাধ্যমটি এখন রীতিমতো বিনোদন মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের কারণে ব্যবহার বেড়েছে ইন্টারনেটের। আবার সংবাদসহ তথ্য আদান-প্রদানের জন্য কমবেশি সব অফিসেই ফেইসবুক গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপের কারণে ফোনে কথা না বলেই দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে টিকার বা স্ক্রল-এ দেওয়ার মতো তথ্য জানানো যায়। এটা নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু কখনো কখনো অতিমাত্রায় ফেইসবুক ব্যবহার কাজের মান কমিয়ে দিচ্ছে। সমন্বয়হীনতা তৈরি করছে দলের মধ্যে। গাড়ি নিয়ে অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়ার সময় পুরো রাস্তায় প্রতিবেদক ও ভিডিওগ্রাফার দুজনই ব্যস্ত হয়ে পড়ছে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে। সেখানে পরস্পরের মধ্যে সংবাদের বিষয়বস্তুর আলোচনা নেই বললেই চলে।
অথচ নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া না থাকলে কাজের মেলবন্ধনটা যুৎসই হয় না। অনেকটা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই গানটিরর মতো ‘আজ দু’জনার দুটি পথ, ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে’। কখনো কখনো তো পুরো অনুষ্ঠানেই কেউ কেউ ব্যস্ত থাকে মোবাইলফোন সেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিয়ে। ফলে সশরীরে সংবাদ কাভার করে আসার পরও স্ক্রিপ্ট লিখতে গিয়ে কষ্ট হয়। এতে ভুলের আশঙ্কা অনেকাংশে বেড়ে যায়। অনেক সময় নির্ভর করতে হয়, বসে থাকতে হয় কখন কোন অনলাইনভিত্তিক সংবাদ মাধ্যমে বা পত্রিকা অনলাইন সংস্করণে তা প্রকাশ করবে তার ওপর।
২০১২ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা, মাসটা ঠিক মনে পড়ছে না। সকালে সচিবালয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে এসেছেন এক সহকর্মী। তিনি দুপুর একটা-দেড়টায় অফিসে আসলেও সেই সংবাদটি দুপুরের খবরে নেই, এমনকি বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চেয়েও দিচ্ছি-দেবো বলে প্রতিবেদনটি পায়নি বার্তাকক্ষের লোকজন। প্রতিবেদক অফিসে ঘুরছেন-ফিরছেন, বসছেন ইন্টারনেট সংযুক্ত কম্পিউটারে, কিন্তু কিছুই লিখছেন না। অপেক্ষার প্রহর লম্বা হওয়ায় সন্ধ্যার সংবাদের আগ দিয়ে দায়িত্বরত বার্তা সম্পাদক নিজে উঠে এসে বেশ কঠিন স্বরে তার কাছে জানতে চাইলেন প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে কি না। তখনো কবি নীরব, দিচ্ছি বলে আবারও টাইম পিটিশন দিলেন। আমার মতো উপস্থিত অন্য সংবাদকর্মীদের বুঝতে বাকি রইলো না দেরির মাজেজা কী? আসলে, সচিবালয়ের ওই সংবাদটি তখন পর্যন্ত কোনো অনলাইনে প্রকাশ হয়নি। তাইতো লেখা সম্ভব হচ্ছিলো না প্রতিবেদকের। শেষ পর্যন্ত ওই প্রতিবেদনটি কোনো অনলাইনে না আসায় জোড়াতালি দিয়ে লিখেই সকালের ঘটনা সন্ধ্যার সংবাদে সম্প্রচার হয়।
নকল করে পরীক্ষা দেওয়ার মতো ইন্টারনেটের ওপর ভীষণ নির্ভর এমন দু-একজন প্রতিবেদক সব চ্যানেলেই দেখা যায়। এমনকি অন্য কোনো অনলাইনের প্রতিবেদন থেকে হুবহু তথ্য তুলে দেওয়ার ঘটনাও আছে টেলিভিশন মাধ্যমে। প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে ধরাও পড়তে হয়েছে প্রযুক্তির কারণে। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে প্রধানমন্ত্রীর একটি অনুষ্ঠান কাভার শেষে সংবাদ লিখে অফিসের সম্পাদনা সফটওয়ারে/সার্ভারে দিয়েছেন সেই প্রতিবেদক। সংবাদটি সম্পাদনা করতে গিয়ে দায়িত্বরত সম্পাদকের মাথায় হাত। কারণ শুরুর দু’লাইন আর শেষের অংশটুকু ছাড়া স্ক্রিপ্টে আর কোনো বাংলা ভাষা নেই। হুবহু অন্য কোনো অনলাইন থেকে কপি-পেস্ট করায় পাল্টে গেছে ফন্ট। আর সম্পাদকের কম্পিউটারে ওই ফন্ট না থাকায় হাতেনাতে ধরা। সংশ্লিষ্ট ওই প্রতিবেদক সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় সেটা বুঝতে অবশ্য সম্পাদকের দেরি হয়নি।
চলবে
লেখক : সুশান্ত সিনহা, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টেলিভিশন-এর বিশেষ প্রতিনিধি।
sinhasmp@yahoo.com
sinhaspb@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন