Magic Lanthon

               

জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশিত ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সাক্ষাৎকার

সন্ত্রাসবাদের পূর্বশর্ত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা একেক দেশে একেক রকম

জাহাঙ্গীর আলম

সাক্ষাৎকারের দিন সকাল ১০টার দিকে যখন আ-আল মামুনের চেম্বারে পৌঁছালাম, তখন মনে হলো বেশকিছু সময় ধরেই তিনি অপেক্ষা করছিলেন। তাই সামান্য কুশল বিনিময়ের পরেই রেকর্ডার চালু করতে হলো¾ ‘এবার আমরা শুরু করতে পারি?’ মামুন বললেন, ‘তুমি তো খুব ফরমাল ইন্টারভিউ নিচ্ছো দেখছি। তার চেয়ে বরং গল্প করতে করতে আলাপ করি।’ কিন্তু গল্প শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যে সেটা আর গল্প থাকলো না। যখন তিনি নেশনের ধারণা, বাইনারি পদ্ধতিতে অর্থ উৎপাদন, সেক্যুলারাইজেশন ও ইসলামিক র‌্যাডিকালাইজেশন প্রক্রিয়া, জঙ্গিবাদী তৎপরতা, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বলতে শুরু করলেন, তখন আলাপ ‘কঠিন’ হয়ে উঠলো। একপর্যায়ে তো মামুনই প্রশ্ন করে বসলেন, ‘আচ্ছা তোমার সঙ্গে আমার কথার লেভেল মিলছে তো? আমার কথা বুঝতে পারছো?’ তাত্ত্বিক আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে মামুন যখন শাহবাগ আন্দোলনের খুঁটিনাটি এবং হলি আর্টিজান হামলার পূর্বাপর ও পশ্চিমা গণমাধ্যমে এর উপস্থাপন নিয়ে কথা বললেন, আলাপ তখন আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠলো। শাহবাগ আন্দোলনের প্রথম স্লোগান, ‘আঁতাতের রায় মানি না, মানব না’ বিশ্লেষণ করে তিনি বললেন, ‘কার সঙ্গে কার আঁতাত? সরকারের সঙ্গে জামায়াতের। সরকারের জন্য এটা ছিলো এক ভয়ঙ্কর স্লোগান।’

এভাবেই গল্প/আলাপ/কথা চলে ঘণ্টা দুয়েক। আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে থাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থীর সঙ্গে। প্রায় দুই দশক ধরে নিজেই এখন সাংবাদিকতা পড়ান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। যোগাযোগ, সাংবাদিকতার সঙ্গে সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্রের সম্পর্ক, বোঝাপড়া নিয়ে লেখা তার প্রবন্ধ আগেই পড়েছি। দীর্ঘদিন ধরে যৌথভাবে সম্পাদনা করছেন যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘যোগাযোগ’। এই পত্রিকাটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনায় এক নতুন পথ তৈরি করেছে। অনেক আগেই অনুবাদ করেছেন নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস. হারম্যানের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ম্যানুফেকচারিং কনসেন্ট: দ্য পলিটিকাল ইকোনমি অব দ্য ম্যাস মিডিয়া’। এছাড়া মামুন ক্ষমতা নিয়ে মিশেল ফুকো, চমস্কির বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ একখণ্ড ভূমিকাসহ ভাব-ভাষান্তর করেছেন ‘মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা¾মুখোমুখি নোম চমস্কি এবং মিশেল ফুকো’ নামে। বর্তমানে মামুন শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করছেন কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস-এ।

[গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র কলাভবনের ৩৩৩ নম্বর কক্ষে আ-আল মামুনের সঙ্গে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পক্ষ থেকে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীর আলম। চলতি সংখ্যায় এই আলোচনার শেষ কিস্তি প্রকাশ করা হলো।]

 

ম্যাজিক লণ্ঠন : পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশকে মডারেট ইসলামিক স্টেট বলে থাকে। তারা এদেশকে জঙ্গিবাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করছে। আবার যেনো পুরোপুরি জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত না হয় সেদিকেও নজর রাখছে।

আ-আল মামুন : দার্শনিক কিংবা রাজনৈতিক, যেভাবেই বলি না কেনো স্টেট ইটসেল্ফ থিওলজিকাল। রাষ্ট্র শপথ বাক্য পাঠ করাচ্ছে, তাই না? তারপর তার সভ্রিন পাওয়ার হচ্ছে গডের পাওয়ারের সমতুল্য। গডকে তুমি প্রশ্ন করতে পারো না। সার্বভৌমত্বকে প্রশ্ন করতে পারো না। কিংবা এই যে পবিত্রতার ধারণা; যেমন, পতাকা হচ্ছে পবিত্র। এই ধারণাগুলো ধর্ম থেকেই এসেছে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলোকে ব্যবহার করা হয় পুঁজিবাদ বিকাশের পাটাতন হিসেবে এবং পুঁজিবাদ একটা ধর্মই বটে। ৩০-এর দশকে এ সংক্রান্ত একখানা বিশেষ উল্লেখযোগ্য পুস্তক ইংরেজিতে ছাপা হয়েছিলো। ম্যাক্স ওয়েবারের ‘দ্য প্রটেস্ট্যান্ট এথিক্স অ্যান্ড দ্য স্পিরিট অব ক্যাপিটালিজম’, যেখানে তিনি দেখান ইহজাগতিক কর্তব্য পালনের যে প্রটেস্ট্যান্ট নৈতিকতাকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে গণ্য করা হয়, তাই পুঁজিবাদের বিকাশে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। এই নৈতিকতায় বিত্তবৈভব অর্জনের প্রচেষ্টাকে ভোগবিলাসের পথ প্রশস্ত করবার উপায় নয় বরং ‘ধর্মীয় কর্তব্য’ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এ সময়েই ওয়াল্টার বেঞ্জামিন লিখেছিলেন ‘ক্যাপিটালিজম অ্যাজ রিলিজিয়ন’ প্রবন্ধটি; তার প্রধান দাবি, ধর্মের নৈতিকতা অবলম্বন করে পুঁজিবাদ গড়ে উঠেছে বললে কমই বলা হয়, বরং পুঁজিবাদ নিজেই সবচেয়ে শক্তিশালী ধর্মীয় কাল্ট হিসেবে সক্রিয় হয়েছে! ধর্ম যেমন পাপ উৎপাদন করে, পুঁজিবাদও করে। কিন্তু ধর্মে পাপ স্খলনের সুযোগ থাকলেও পুঁজিবাদে থাকে না।

পুঁজিবাদের নৈতিকতা কোথা থেকে এসেছে? প্রটেস্ট্যান্ট এথিক্স থেকে। ক্রিশ্চিয়ানিটির দুটো ভাগ রয়েছে, জানো বোধ হয়¾ক্যাথলিক আর প্রটেস্ট্যান্ট। প্রটেস্ট্যান্ট এথিক্সের মূল কথা হলো, কাজটাই আমাদের ধর্ম। প্রচুর কাজ করতে হবে; প্রচুর সম্পদ গড়ে তুলতে হবে। এই যে এথিক্স, কাজ এবং সম্পদ গড়ে তোলা¾তার জন্য সে সবকিছুই করতে পারে। সেখান থেকেই এই প্রটেস্ট্যানিজম অন্য সব জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। আমাদের দেশে জামায়াতে ইসলাম নামের যে রাজনৈতিক দল, আমি তাকে বলবো প্রটেস্ট্যান্ট ইসলাম। জামায়াতের সঙ্গে পুঁজিবাদের সম্পর্ক ওতপ্রোত। তুমি দেখবে যে, জামায়াতে ইসলামের কোনো শ্রমিক সংগঠন নাই। জামায়াত মনে করে, কারখানার মালিক আর শ্রমিকের মধ্যে স্বার্থের কোনো বিরোধ নাই, যেনো শ্রমিকদের কোনো শোষণ ও বঞ্চনার গল্প নাই। জামায়াত পুঁজি পুঞ্জিভূত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সিদ্ধহস্ত। তাই আমি জামায়াতকে বলি বাংলাদেশের প্রটেস্ট্যান্ট ইসলাম। পশ্চিমারা এই ইসলামটাই চায়; যে কারণে তারা এই ইসলামকে রক্ষা করে। আমেরিকা এই কারণেই জামায়াতকে রক্ষা করে, তার ভাবাদর্শ টিকিয়ে রাখতে চায়। হেফাজত যে ইসলামের কথা বলে কিংবা আমরা যদি নবীজির জীবন দেখি, নবীজি কী ধরনের ইসলামের কথা বলেছিলেন, তার সঙ্গে এই ইসলাম (জামায়াত) মেলে না। এ কারণে হেফাজতে ইসলাম মওদুদিকে মুরতাদও বলে।

ম্যাজিক লণ্ঠন : পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়, আবার জঙ্গিবাদ দমনে সহায়তা করতে চায়। এভাবে তাদের খেলা চলতে থাকে, ব্যবসাও হয়।

মামুন : এটাই তো ব্যাপার। যে কথাটা বলতে গিয়ে আমি প্রটেস্ট্যানিজমের কথা বলেছি, সেটা হলো, ধর্মীয় রাষ্ট্র বলে কোনো রাষ্ট্রই পৃথিবীতে নেই। আধুনিক সময়ে ধর্মরাষ্ট্র বলে কোনো রাষ্ট্রই হতে পারে না। এমনকি জামায়াত বা অন্য দলগুলো ইসলামিক রাষ্ট্র কায়েম করবে বলে যে ধারণাগুলো নিয়ে আসে সেটাও সমস্যাপূর্ণ। কারণ খোদ ইসলামের ভিতরে রাষ্ট্র সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তারা মুসলিম উম্মার কথা বলছে। উম্মার ধারণাটা রাষ্ট্রের খুপরিতে আঁটানো যায় না। তাছাড়া উম্মা ধারণা ইনক্লুসিভও নয়। আজকে যে ইনক্লুসিভ ডেমোক্রেসির কথা বলা হচ্ছে, ইনক্লুসিভ পলিটিক্সের কথা বলা হচ্ছে, মুসলিম উম্মা সেটা অ্যাড্রেস করতে পারে না। তাকে তো আগে মুসলিম হতে হবে। ইসলামে কোনো রাষ্ট্রের ধারণা নেই। তো তাহলে এই ইসলামিক রাষ্ট্র কী রকম রাষ্ট্র, ইসলামপন্থিরা কী ধরনের রাষ্ট্রের কথা বলছে? ইসলামিক রাষ্ট্রটা হচ্ছে মূলত পশ্চিম থেকে ধার করা কিছু আইডিয়া এবং তার সঙ্গে কোরআনের কিছু জায়গা থেকে ধার করা টেক্সটের এক গোঁজামিল। এই দুইটা মিলে তারা একটি হসপস তৈরি করেছে। যেটাকে তারা বলছে, ইসলামিক রাষ্ট্র।

সেই রাষ্ট্রের অর্থনীতি কী হবে? মওদুদি তো একজন বড়ো চিন্তাবিদ। তিনি বলছেন, এটা না সমাজতন্ত্র, না পুঁজিবাদ। এটা মধ্যপন্থা। ইসলামিক রাষ্ট্রের অর্থনীতি হচ্ছে মধ্যপন্থা। এখন মধ্যপন্থা কোনটা? সেটা আবার কিন্তু মালিক-শ্রমিকের প্রশ্ন মীমাংসা (অ্যাড্রেস) করতে পারে না। মানে ইসলামিক রাষ্ট্রে শ্রমিকের প্রশ্ন কী হবে, তা মীমাংসা করতে পারে না। ফলে ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণা চূড়ান্তভাবে পশ্চিমা কনসেপ্টের কাছে নির্ভরশীল একটি ধারণা। ফলে পশ্চিমারা এখন বলে, এটা জঙ্গি রাষ্ট্র হয়ে যাচ্ছে¾এসবই মূলত অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চর্চার অংশ। এর অংশ হিসেবেই বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার কথা বলা হচ্ছে।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশের পক্ষে আসলে কখনো জঙ্গি রাষ্ট্র হওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষের প্র্যাকটিস, বর্তমান অর্থনীতির চালচলন¾এই সবকিছুই বলে দেয় বাংলাদেশ জঙ্গি রাষ্ট্র হবে না। খুব ইন্টারেস্টিঙলি দেখবে, নাস্তিকেরা যেটা করছে, তারা অসম্ভব অশালীন ভাষায় ইসলামকে আক্রমণ করছে, নবী মোহাম্মদকে আক্রমণ করছে। এ নিয়ে অনেক দিন সবাই চুপচাপই ছিলো। শাহবাগ আন্দোলনের আগেই কয়েকবার হেফাজত ইসলাম সরকারকে বলেছে, এই ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করতে হবে। তার পরও সকলে চুপচাপ ছিলো। শাহবাগ আন্দোলনের পর এটা চূড়ান্ত বোঝাপড়ার জন্য হাজির হয়। শাহবাগের ভিতরেরই একটা অংশ এটা করতে চেয়েছে। ইসলামকে সম্পূর্ণ নাকচ (নেগেট) করার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে তার একটা প্রতি-আক্রমণ করেছে হেফাজতে ইসলাম। কাউন্টার একটা শক্তি হিসেবে হেফাজত ও ইসলামিস্টরা দাঁড়িয়ে গেছে। এখন এখানে যেটা ঘটেছে, নাস্তিকদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনের পর বেশকিছু নাস্তিক-ব্লগার খুন হলো। এর ফলে কী ঘটতে পারে? যদি একটা ইসলামিক রাষ্ট্র হওয়ার প্রবণতা থাকে, যদি এখানে জঙ্গি তৎপরতা বাড়ার প্রবণতা থাকে, তাহলে যেটা ঘটার কথা সেটা হলো, জঙ্গি তৎপরতা আরো বেড়ে যাবে। কিন্তু ব্যাপারটা একদমই বিপরীত হয়েছে। এদেরকেই বরং মানুষ নেতিবাচকভাবে দেখেছে এবং কোনো জনসমর্থন তারা পায়নি।

পাকিস্তানে যেমন হয় বা অন্য যেকোনো ইসলামিক দেশে যেরকম হয়, বাংলাদেশে কিন্তু সেটা হয়নি। আমি বলবো, মরক্কোসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশ আছে¾সেখানকার ইসলামিক চর্চার সঙ্গে বাংলাদেশের অনেকটা মিল রয়েছে। কারণ এখানে ইসলাম যেভাবে এসেছে তার প্রকৃতি ভিন্ন, আমরা ইতিহাসের এই জায়গাটি একেবারে অস্বীকার করি। কিন্তু আরব ভূমিতে কিংবা অন্যান্য জায়গায় ইসলামিক চর্চা যেভাবে হয়েছে, বাংলায় ইসলামের চর্চা কিংবা আগমন সেভাবে ঘটেনি। এখানে ইসলামাইজেশনের প্রক্রিয়াটি একেবারেই আলাদা। এখানে ইসলাম স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে গড়ে ওঠেছে। ফলে ইসলাম ও সংস্কৃতি মিলে এখানে ভিন্ন কিছু ঘটার সম্ভাবনা বিদ্যমান। অথচ পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস থেকে জঙ্গি তৎপরতার ন্যারেটিভ আমরা গ্রহণ করছি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বা আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে, কৌম সংস্কৃতিচর্চার পার্থক্য। যে ট্রাইবাল আসাবিয়া বা কৌম ভার্তৃত্বের বোধ ইসলামিস্টরা ব্যবহার করে তা বাংলাদেশে নেই। কৌম চর্চা থেকে আমরা বহু দূরে বসবাস করি। ফলে ওখানে ধর্মের যে প্রভাব ও প্রতিপত্তি, সেটা এদেশে অসম্ভব। ফলে এখানে ওই রকম কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই।

যেমন ধরো, শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাই কী করার চেষ্টা করেছে? তখনকার মিডিয়ার হাইপটা যদি তোমরা দেখো¾আমি সেটা নিয়ে কাজ করেছিলাম। যখন ৬৪ জেলায় তারা বোমা ফাটালো, তখন মিডিয়ার রিপ্রেজেন্টেশন কী রকম ছিলো? এটা একটা স্পেকট্যাকুলার ঘটনা ছিলো; ভয়াবহ ঘটনা। ৬৪ জেলায় একসঙ্গে বোমা ফাটানো হয়েছে! তাই তো? এবং বৈশ্বিকভাবে এটার হিউজ সার্কুলেশন হলো¾বাংলাদেশে এই রকম একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে, ৬৪ জেলায় একসঙ্গে বোমা ফেটেছে! আমি নিজে যদি চাই, ৬৪টি জেলায় ৬৪টি বোমা ফাটাবো এবং একটা করে হাতে লেখা চিরকুট দেবো¾আমি কি পারবো? মনে হয়, আমি পারবো। আমার মাত্র এক লাখ টাকা লাগবে। এবং যেটা বলা হয়নি, বেশিরভাগ জায়গায় যে বোমাগুলো ফেলা হয়েছিলো, সেগুলো ঠিকঠাক জায়গায় ফেলতে পারেনি। বেশিরভাগ বোমাই ফাটেনি।

তবে তারা বোমা ফেলেছে। আর এর পরিণতিতে প্রচারটা কোথায় গেলো? আবার যেমন, ব্লগার রাজীব হায়দার নিহত হলো। যখন শাহবাগে জানাজা পড়ানো হচ্ছে, তখন ফারাবি নামের একটি ছেলে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিলো, যে রাজীবের জানাজা পড়াবে সেও মুরতাদ, তাকেও জবাই করা হবে। এই বিষয়টা আমাদের সেক্যুলার ব্লগাররা বিপুলভাবে প্রচার করতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমা গণমাধ্যম এটা পিক করলো। পুলিশ ফারাবিকে ধরে নিয়ে গেলো। সে বেশ কয়েকদিন জেলে থাকলো। তদন্ত হলো এবং পরে সে বেকসুর খালাস পেলো। এখন প্রশ্ন, ফারাবি কে? ফারাবিকে কট্টর জঙ্গি হিসেবে হিউজ প্রচার কিন্তু হয়ে গেছে। প্রচারের একেকটা স্তর একেক রকম। যখন বাংলাদেশে একটি ঘটনা ঘটে, সেটার গ্রাউন্ড রিয়্যালিটি যাই হোক, এটার আঞ্চলিক বাস্তবতা আরেক রকম। যখন ভারতের ‘পিটিআই’ (প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া), ‘আনন্দবাজার’ কাভার করছে, এটা আরেক রকম। পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে¾বাংলাদেশেও ইসলামিস্টরা এ রকম এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মূল এসেন্সটা যদি ভাবো, ফারাবি আসলে কী বলেছে? জবাই করে দেওয়া হবে। ফারাবি কি এ রকম কথা আগেও বলতো? এর আগে অসংখ্য বার সে এ রকম কথা ফেইসবুকে বলেছে। সে মূলত ছিটগ্রস্ত। ইসলামিস্ট ফারাবি ও অন্য সেক্যুলার ব্লগার যারা, মূলত সামহয়্যারইন-এর ব্লগার, তারা ইসলাম নিয়ে নানা কথা বলেছে ইতোপূর্বে। ওদের নানারকমের ঝগড়া হয়। ফারাবি কারো কাছে পয়সা চায়। ফারাবি ও সেক্যুলার ব্লগাররা ‘ছবির হাটে’ বসে বসে আড্ডা দেয়। সেসব ছবি ফারাবি নিজেই ফেইসবুকে আপলোড দিচ্ছে¾ ‘কয়েকজন নাস্তিক ব্লগারের সাথে আমি ফারাবি।’ এদের সম্পর্কটা এমনই বন্ধুত্ব ও দূরত্বের। অভিজিৎ রায় তার লেখায় ফারাবির সঙ্গে তাদের কেমন সম্পর্ক ছিলো সেটা বলেছেন। কিন্তু সেই ফারাবি যখন এটা করছে, তখন তাকে ভয়ঙ্কর জঙ্গি হিসেবে হাজির করা হচ্ছে। আলটিমেটলি ও আসলে জঙ্গি-ফঙ্গি কিছুই ছিলো না। ফারাবি লিখে গুগলে সার্চ দিলে প্রচুর নিউজ পাবে। কিন্তু ফারাবিকে যারা ব্যক্তিগতভাবে চেনে, তারা সবাই জানে, ফারাবি নানা হুজুগ ও হাইপ তৈরি করে অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য। এই হলো ঘটনা। তাহলে এখানে যে হাইপগুলো তৈরি হয় এবং গণমাধ্যম যেভাবে তা নির্বাচন করে, তুলে ধরে, কিংবা ধরে না¾তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা খুবই রাজনৈতিক অভিলাষপূর্ণ।

মিডিয়া কেনো, কীভাবে পোর্ট্রেইট করে সেই প্রশ্নগুলো তোলা জরুরি। যেমন, রাজীব হায়দার খুন হলো, সঙ্গে সঙ্গেই শেখ হাসিনা বললেন, এটা জামায়াত-শিবির করেছে। এবং মিডিয়াতে এই দাবির হিউজ কাভারেজ দেওয়া হলো। কিন্তু পরবর্তী অনুসন্ধানে আমরা প্রধানমন্ত্রীর দাবির সত্যতা পাইনি। রাজীব হায়দার কে? এটা খুঁজতে গেলে তোমরা দেখবে, সে আসলে পর্নোগ্রাফির সাইট ‘যৌবন জ্বালা’র সদস্য। তারা পর্নোগ্রাফি লিখেছে। সেই পর্নোগ্রাফিতে ইসলাম ও একাত্তরের পাল্টা ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করেছে। অমি রহমান পিয়াল’কে চেনো বোধ হয়। এরা এখানে বেশ তৎপর ছিলো। ২০০৪Ñ ০৫ খ্রিস্টাব্দ থেকেই তারা পেইড ব্লগার। বাংলা ব্লগ কালচারের এই পর্বে ইসলামিস্ট ও সেক্যুলার ন্যাশনালিস্ট উভয়পক্ষই র‌্যাডিকালাইজড হয়েছে। এই পর্বে বাংলাদেশে সেক্যুলার ব্লকের র‌্যাডিকালাইজেশন ঘটে, সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদ খুব র‌্যাডিকাল হয়ে ওঠে। ভীষণ আক্রমণাত্মক। এটা ৯০ দশকে ছিলো না। তখন হুমায়ূন আহমেদ ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’ বলছেন। খুবই সাহসি উচ্চারণ। তারেক মাসুদ মুক্তির গান দেখাচ্ছেন। ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি আন্দোলন করছে, তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে সেক্যুলার ব্লক ও ইসলামিস্টদের একটা খণ্ড লড়াই করে যাচ্ছে। এ রকম আরো বেশকিছু ঘটনা আছে। কিন্তু তখনো ইসলাম ও একাত্তর পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় নাই। অথচ যখনই অনলাইন আসতেছে, মানে ব্লগ প্র্যাকটিস আসছে; সেখানে ইসলাম ও একাত্তরের যে বাইনারিটা তৈরি হচ্ছে, সেটা ভয়ঙ্করভাবে র‌্যাডিকালাইজড। এই বাইনারি বস্তুত ইসলামাইজেশনকে উসকে দিয়েছে।

যদিও তারা বলছে, আমরা আসলে ইসলামের কুসংস্কার বিদায় করতে চাই। কিন্তু চূড়ান্তভাবে তা র‌্যাডিকাল ইসলামাইজেশনকেই উৎসাহিত করেছে। ছয়Ñ সাত বছর ধরেই প্রক্রিয়াটি চলছিলো, যার প্রদর্শনী হয়েছে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, রাজীব হায়দার হচ্ছে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ। কিন্তু সে বক্তব্য টিকাতে পারেননি। কারণ ইসলামপন্থিরা হিউজ একটা চাপ তৈরি করে। দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর যেদিন ফাঁসির রায় হলো, তারপর সারাদেশে সহিংসতা শুরু হলো। সেই সহিংসতা শুধু জামায়াত ও শিবিরের পক্ষে করা সম্ভব ছিলো না। পুলিশের ওপর আক্রমণাত্মক হামলা হয়েছে, ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। যারা মারা গেছে তাদের বেশিরভাগই শিবির নয়, সাধারণ মানুষ। তারা রাস্তায় নেমে এসেছে, হামলা করেছে। কারণ তাদের কাছে রিলিজিয়ন একটা সেন্টিমেন্ট। বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করেছে সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে। সাঈদী অ্যাজ এ পারসন, তার স্টিগমার কথা যাই বলি না কেনো, কনটেম্পোরারি কালচারাল স্পিয়ারে তার একটা উপস্থিতি মানুষের জীবনে আছে। এইগুলো শুধু ‘ফ্যানাটিজম’ বা অন্ধত্ব ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। জঙ্গিবাদ ও ফ্যানাটিজম¾এগুলোর বিষয়ে আরো গভীর ব্যাখ্যার প্রয়োজন।

ম্যাজিক লণ্ঠন : শাহবাগ আন্দোলনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সুশাসন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি¾এই বিষয়গুলোতে তারা সোচ্চার হয়নি। বর্তমানে এসব সমস্যায় সবাই ভুগছে। কিন্তু এগুলো নিয়ে তারা সোচ্চার নয় কেনো?

মামুন : শাহবাগে কিন্তু পুঁজিবাদ নিয়েও কোনো কথা উচ্চারিত হয় নাই। নায়ক-নায়িকারা এসে হাজির হচ্ছে। ওখানে সেলিব্রেশন হচ্ছে। ওখানে একটা উৎসবের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। অর্থনীতি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। দুর্নীতি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। এমনকি বিচারব্যবস্থা নিয়েও কোনো মাথাব্যথা নেই। ট্রাইবুন্যাল নিয়েও মাথাব্যথা নেই। তবে ইন্টারেস্টিঙ ভাবনার বিষয় হলো, শাহবাগে  কেনো এতো মানুষ জড়ো হয়েছিলো? এটা ছিলো ঘৃণা ও ক্ষোভের প্রকাশ। সে ক্ষোভটা গত কয়েক বছরে তৈরি হয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে। এবং শাহবাগের স্লোগানের মধ্যে প্রধান স্লোগান কোনটা? প্রথম দিকে প্রধান স্লোগান ছিলো¾ ‘আঁতাতের রায় মানি না, মানবো না।’ এই স্লোগানটার কারণেই আসলে মানুষ জড়ো হয়েছিলো। এখন প্রশ্ন, কার সঙ্গে কার আঁতাত? জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আঁতাত। এর মানে কী? শাহবাগে যে মানুষগুলো জড়ো হয়েছে, তারা জামায়াত ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাই না? এটার প্রবণতা প্রথম দুদিন দেখা গেছে। হানিফকে (মাহবুবুল আলম হানিফ) জুতা ছুঁড়ে মারা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাদের স্টেজে উঠতে না দেওয়ার ঘটনা এর প্রমাণ।

কিন্তু কালচারাল লেয়ারে আওয়ামী লীগের ভীষণ শক্তিশালী লেফট উইঙ আছে, যারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। যেমন, ইমরান, সে তো আওয়ামী লীগের লোক। তার একটা ব্যানার দেখা গেছে। অন্যদেরটা দেখা যায়নি। অন্যরা নানাভাবে এসে হাজির হয়েছে। ইমরানকে তারা দ্রুত পকেটে নিয়ে নিলো। তাকে তারা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে এবং আশ্বস্ত থেকেছে। ইমরানকে সমর্থন দিয়েছে আওয়ামী লীগ ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। তো এই স্লোগান নিয়ে তারা হাজির হলো যে, আঁতাতের রায় মানি না, মানবো না। এটা তো ভয়ঙ্কর কথা; এটা কমপ্লিটলি ডেন্জারাস স্লোগান। এই স্লোগান একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন সরকার, বিচারব্যবস্থা এবং জামায়াতে ইসলাম, যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে¾সবকিছুকে নাকচ করে দিয়েছে। খুবই ডেন্জারাস পরিস্থিতি। এবং এই পরিস্থিতিতে একেক জনের ভূমিকা একেক রকম। বিএনপি’র তো কোনো ভূমিকাই নেই, তারা তো অনুপস্থিত। জামায়াতে ইসলাম আতঙ্কিত। তারা এই জন্য আতঙ্কিত যে, তাদের রাজনীতি আর এদেশে থাকবে না। আওয়ামী লীগও আতঙ্কিত, কারণ তাকেও ক্ষমতা থেকে উৎখাত হতে হবে।

ওখানে যে উপস্থিতি, মানে মানুষের উপস্থিতি যদি আমরা দেখি, প্রথম জমায়েত হয়েছিলো কালচারাল অ্যাক্টিভিস্টরা, বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে, বোরকা পরা মেয়ে থেকে শুরু করে নানাধরনের মানুষেরা জমায়েত হয়েছিলো। প্রথমে এরা সবাই বলেছে¾এই আঁতাত আমরা মানি না। সেখানে জামায়াত-বিএনপি কোনো পক্ষ নেই। সেখানে হেফাজতে ইসলাম বিরোধী বা ইসলামপন্থি কোনো হিসাব নেই। তারা আঁতাতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। মানুষ পুরোপুরি পলিটিকাল সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। এটা খুবই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। এবং ওই দিন থেকেই ম্যানেজ করার ম্যাকানিজমটাও শুরু হয়েছিলো। রাতের বেলা থেকেই শুরু হয়েছিলো। পরের দিনগুলোতে এটা আরো তীব্র হয়েছে। এবং দুই¾তিন দিনের মধ্যেই এটা সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

ফলে যেটা হয়েছে, যখনই সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলো, ঠিক তখনই পুরনো ব্লগাররা এলো। যেমন, প্রথমে পিয়াল (অমি রহমান পিয়াল) আসবেই না ওখানে। তারপরে সে এসে হাজির হচ্ছে। এ রকম আরো যারা আওয়ামী লীগপন্থি ব্লগার¾আরিফ জেবতিক¾গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে লাগলো। ইমরান কিন্তু ব্লগার নন। তার চারপাশে এই ব্লগার চক্র; যারা আওয়ামী লীগ করে। এবং কালচারাল ফ্রন্টের আমাদের নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ভাই, এরা নিয়ন্ত্রণটা নিলেন। সরকার যেনো কোনো রকমের ঝামেলায় না পড়ে, এবার সেই রকম সেøাগান তৈরি হলো। ফলে ‘আঁতাতের রায় মানি না, মানবো না’¾স্লোগানটা দুদিন পর থেকেই একেবারে নাই হয়ে গেলো।

যেহেতু ট্রাইবুনাল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তাই ট্রাইবুনালের প্রশ্নটা আন্দোলনকারীদের এজেন্ডা থেকে নাই হয়ে গেলো। সরকার উৎখাত বা সরকারের অপরাধ নিয়ে যে প্রশ্ন ছিলো; সরকারকে ঝামেলায় ফেলা যাবে না¾এ রকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ফলে এই পুরো মবিলেইজেশনটা, যারা ওখানে গেছে, নানাভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছে, তাদের আবেগ সবটুকুই ছিলো। কিন্তু সেই আবেগ ধীরে ধীরে চুপসে যায়। এই ম্যানুপুলেশন যে ঘটেছে, তা খুব পরিষ্কার। এর প্রমাণ পাওয়া যাবে, তুমি যদি ‘আমার দেশ’ পত্রিকা দেখো। ‘আমার দেশ’-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান কিন্তু জামায়াতি নন। তিনি বিএনপির লোক। তার পত্রিকার প্রথম দিনের লিড শিরোনাম দেখো¾ ‘বিপুল জোয়ার শাহবাগে’। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে এই অবস্থান। কিন্তু ৯ তারিখে তার পত্রিকার লিড¾ ‘শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি’। মানে এই তিন দিনের মধ্যে হিসাবনিকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। শাহবাগ আওয়ামী লীগের দখলে চলে গেছে এবং আওয়ামী লীগের বাইরে আর কিছুই হবে না। ইমরান এই চক্রের মূল হোতা। ফলে মাহমুদুর রহমান তার সৈন্য-সামন্ত সাজাতে শুরু করেছে এবং শাহবাগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তারপরে এটা একটা বাইনারি ওয়েতে টার্ন নিচ্ছে। পরের ঘটনা তো বাস্তবতা।

এই যে, জিহাদের বাসনা, ছোটো বা বড়ো জিহাদের বাসনা¾এটা অনেক কাল আগে থেকেই ছিলো। যেমন, তুষার সিরিজ, সায়মন সিরিজ। এদেশের মুসলিমরা ফিলিস্তিনে, আফগানিস্তানে যাওয়ার চেষ্টাও করেছে। যখন তসলিমা নাসরিন উপন্যাসগুলো লিখতেছে, তখন আরেকভাবে ইসলামাইজেশনের উপন্যাস লেখা হচ্ছে। এখন উপন্যাস লেখা হোক কিংবা হিজাব পরা হোক বা টেলিভিশনে নাটক হোক¾কালচারাল ফ্রন্টে এটার একটা প্রভাব আছে। সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

কিন্তু যেটা অস্বীকার করতে হবে সেটা হলো, কালচারাল ফ্রন্ট কখনোই একটা মনোলিথিক ব্যাপার নয়। কালচারাল ফ্রন্টে সবসময়ই নানারকম কনটেক্সের আইডিয়া থাকে। আরেক ধরনের উল্টো আইডিয়াও তো কালচারাল ফ্রন্টের ছিলো, ইসলামকে সবসময়ই নেগেটিভ কন্সট্রাকশনের মধ্যে যেতে হয়েছে। একাত্তর মানেই রাজাকার, আর রাজাকার মানেই হচ্ছে তার মাথায় টুপি থাকবে। অথচ যার ফাঁসি নিয়ে এতো কথা হলো, সে কি একাত্তরে টুপি পরেছিলো? তখন বেশিরভাগ রাজাকারের মাথায় টুপিই ছিলো না।

ম্যাজিক লণ্ঠন : তবে এই চর্চাটা শুরু হলো কীভাবে?

মামুন : এটা হচ্ছে আমাদের সহজ কালচারাল প্র্যাকটিসের উপায়। ধরো যে, আমরা বাইনারি করি; বাইনারি মানে যেমন, ভালোর বিপরীত মন্দ। ধর্মের বিপরীত সেক্যুলার। তাহলে ধর্মের সবকিছুই হচ্ছে নন-সেক্যুলার। তাই না? তাহলে ধর্মের যেটা টুপি সেটা নন-সেক্যুলার। দাড়িটা হচ্ছে নন-সেক্যুলার। একাত্তর বলে আমি এক বিচিত্র সেক্যুলার কন্সট্রাকশন তৈরি করতে শুরু করেছি। অথচ একাত্তরেও বেশিরভাগ মানুষ নামাজ পড়েই যুদ্ধ করতে গেছে। তাহলে কেনো সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, ইনসাফের জন্য। আমরা এটা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ এপ্রিলের ঘোষণাতেই পাবো। সেখানে ইনসাফের কথা বলা হচ্ছে, সাম্যের কথা বলা হচ্ছে, ন্যায়বিচারের কথা বলা হচ্ছে। ওখানে কিন্তু সেক্যুলারিজম নাই, বাঙালি জাতীয়তাবাদ নাই, সমাজতন্ত্রও নাই।

এখন ধরো, মুক্তিযুদ্ধ যে করেছে তার ইসলাম এবং পাকিস্তানের ইসলামের পার্থক্য সে কীভাবে বুঝেছে? একটা পার্থক্য সে করেছে। যদিও ঢাকার মুষ্টিমেয় কিছু কালচারাল, লেফটিস্ট কিছু লোকজন তাদের মতো করে কল্পনা করেছে যে, এটা হচ্ছে সেক্যুলারিজম, এটা হচ্ছে সেক্যুলার প্র্যাকটিস¾বাঙালিয়ানা বলতে এই বুঝায়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের কাছে যুদ্ধের ব্যাপারটা ছিলো একদমই অন্যরকম। তাদের কাছে এটা ছিলো পেটের-ভাতের প্রশ্ন। আমি ইনসাফ পাচ্ছি না, আমার ছেলে চাকরি পাচ্ছে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পাঞ্জাবিরা ধর্মের কথা বলছে কিন্তু অন্যায়ও করছে। ওরা আমাকে ন্যায্য অধিকারটা দিচ্ছে না। অত্যাচার করছে। এবং সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে, আমি নাকি খাঁটি মুসলমান না! ওরা নাকি খাঁটি মুসলমান, আমি নাকি ভেজাল। আমার বাঙালিয়ানা নিয়ে, হিন্দুত্ব নিয়ে কটাক্ষ করছে।

আমি যে কারণে যুদ্ধটা করেছি, সেখানে ইসলাম একটা বড়ো কারণ। একাত্তরে ইসলাম একটা বড়ো ভূমিকা পালন করেছে¾ওদের ইসলাম এবং আমাদের ইসলাম¾এই দুই ইসলামের পার্থক্য। কিন্তু যে কালচারাল কন্সট্রাকশন পরবর্তী সময়ে ঘটেছে বা ঘটানো হয়েছে সেটা ছিলো একদমই ভিন্ন। সেখানে ইসলাম বাইনারিভাবে বিপরীত দিকে চলে গেছে। মেহেরজান এটা বোঝাপড়া করতে চেয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ওই সময়ের আর একটি সিনেমা যদি তুমি দেখো, গেরিলা। এর পুরো আড়াই ঘণ্টার দৃশ্যায়ণে তুমি দেখবা একটা স্ন্যাপশটে কয়েক সেকেন্ড একটা মসজিদের দৃশ্য চলে আসবে। এটা বাদে ইসলামের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের আর কোনো সম্পর্ক এই সিনেমাতে নেই। শেষ দৃশ্যটাও খুবই কৌতুহলোদ্দীপক। ওই দৃশ্যে জয়া আহসানের সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধাকে মেরে ফেলা হয়েছে। জয়াকে ধর্ষণ কিংবা অত্যাচার করা হবে। পাকিস্তানি সেনারা তাকে আটকে রেখেছে। হঠাৎ সেনা কর্মকর্তা ফোনে কথা বলতে গেছে। এই সময় জয়া একটা গ্রেনেড হাতে তুলে নেয়। ওই কর্মকর্তা জয়াকে ধরতে আসছে। ও গ্রেনেডের চাবিটা খুলে দিলো। এই সময় যে মিউজিকটা বেজে উঠলো সেটা খুবই সুন্দর¾পূজার মিউজিক, জয়ার ভঙ্গিও নৃত্যের।

এটা নির্মিত; মুক্তিযুদ্ধ মানে হচ্ছে বিশেষ ধরনের বাঙালিয়ানা। এটা প্রতিনিয়ত নির্মিত হয়েছে। একাত্তরের পর থেকে এটা একটা বাইনারি হিসেবে হাজির করা হয়েছে। একাত্তরের আগে হয়তো এইভাবে বাঙালি সংস্কৃতি নির্মাণের প্রয়োজন ছিলো। যেহেতু আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়ছি। পাকিস্তানের কালচার ও আমাদের কালচার নির্ধারণ করতে সেটার প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু একাত্তরের পরের একটা বাংলাদেশ, যেখানে আমাদের কালচারাল আর্টিকুলেশনগুলো কী রকম হবে? ধর্মকে শুধু পারলৌকিক রিলিজিয়ন হিসেবে, সম্পূর্ণভাবে প্রাইভেট পরিসরের বিষয় হিসেবে দেখবো, নাকি দেখবো, ধর্ম অ্যাজ অ্যা কালচার¾যে ধর্মীয় কালচারের মধ্য দিয়েই আমরা বেড়ে উঠি। এই প্রশ্নগুলোর সুরাহা করা যায়নি।

ম্যাজিক লণ্ঠন : কালচারের একটা বড়ো অংশকে ধর্ম বলবো?

মামুন : রিলিজয়ন ইটসেল্ফ ইজ অ্যা কালচার। ধর্মের সব চর্চা, সবকিছুই কালচার। আমার মা যেভাবে জায়নামাজে বসে, গল্প করে, ধর্মের কাহিনি বলে¾এসব কিছুই তো কালচার। কিংবা ধরো, হিন্দু ধর্ম এটাকে সেক্যুলারাইজড করে ফেলতে পেরেছে। আমাদের সেক্যুলারিস্টদের সবচেয়ে বড়ো ব্যর্থতা হচ্ছে, তারা ইসলামের সব রকমের উপাদানকে নেগেটিভাইজ করেছে, একাত্তরের পরে থেকে, মুক্তিযুদ্ধের সব গল্পে। অনেক পরে শ্যামলছায়া এবং কিছু কিছু সিনেমায় একটু ভিন্নতা আসতে শুরু করেছে। তো এই যে ধর্ম অ্যাজ অ্যা কালচার¾এভাবে না দেখতে পারাটা সেক্যুলার এসটাবলিসমেন্টের একটা বড়ো ব্যর্থতা। এ কারণেই সে শাহবাগে ফেইল করে। আমি কে? আমি তো জন্মগতভাবে মুসলমান। মুসলিম কালচারের মধ্যে বড়ো হয়েছি। ঈদ আসলে আমার ভালো লাগে। কারণ ওই উৎসবের মধ্যে আমি থেকেছি। কিন্তু এটা তো কালচার। আমি নামাজ পড়তে গেলাম কি গেলাম না, তাতে তো আমার মুসলমানিত্ব খারিজ হয়ে যাওয়ার কথা না। কারণ আমি ওই মুসলিম পরিবেশের মধ্যে বড়ো হচ্ছি। আমি নাস্তিকতার প্র্যাকটিস করলাম কি করলাম না, তাতে তো কিছু যায় আসে না। আমি মুসলিম, এ কারণেই এই মুসলিম কমিউনিটির স্বভাব-চরিত্র আমি ভালো বুঝি।

আমি এই কালচারাল ইসলামকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দেব¾এটা ঠিক নয়, বরং হঠকারিতা। পশ্চিমা সেক্যুলার ধারণার বারভারশানের কারণেই এটা ঘটে। বাঙালি কালচার বলতে এখন বোঝানো হচ্ছে হিন্দু কালচার। এতে সমস্যা দেখা দেয়। বাঙালি কালচার বলে আমরা আজকে যে কালচারের কথা বলি, তার হিস্টোরিকাল ফরমেশন কখনো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। ভাষা হিসেবে বাংলা গড়ে উঠেছে বস্তুত মুসলমানদেরই হাত দিয়ে। কিন্তু আজকে তুমি যে বাংলাটা পড়ো বা তোমার স্কুলের পাঠ্য কিংবা আমাদের বাংলা একাডেমি যে ধরনের বাংলা প্রমোট করে¾এসব কিছুই হচ্ছে কলকাতার সংস্কৃত প্রভাবিত বাংলা। এটা হচ্ছে ফোর্ট উইলিয়াম ও সংস্কৃত কলেজের বাংলা।

যখন এখানে ব্রিটিশরা আসছে, তখনই একটা সেপারেশন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। নতুন ধরনের একটা বাংলা গদ্য চালুর চেষ্টা করা হয়েছে। যেটাকে আমরা কেরি’র বাংলা বলি। সেই বাংলা গদ্যটা হচ্ছে ভীষণভাবে সংস্কৃত ভাষা দ্বারা প্রভাবিত। সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণের নিয়মকানুন, প্রচুর শব্দ ওখান থেকে বাংলা ভাষায় আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু আগের বাংলাটা এ রকম ছিলো না। সে বাংলাটাই এখানকার বাংলা ভাষা হিসেবে অনেকাংশে রয়ে গেছে। এখন কতো শতাংশ মানুষ বাংলাতে কথা বলে? তাদের কতো শতাংশ হিন্দু, আর কতো শতাংশ মুসলমান? এখনো মুসলমানের সংখ্যা বেশি। বাংলাদেশ-ভারত মিলিয়ে ৬০ ভাগ বাঙালি মুসলমান বাংলায় কথা বলে। এটা তাদের মাতৃভাষা। এই ভাষায় তারা চর্চা করে। অথচ তুমি বাঙালি নও, তুমি হচ্ছো মুসলমান¾এই যে বাঙালি ও মুসলমানের বাইনারি ক্যাটাগরি, এটা করা হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলে। আমাদের এখানকার বাঙালি মুসলমান কালচারাল এলিটদের বড়ো ব্যর্থতা হলো, তারা বুঝতে পারেনি মুসলমানেরা বাঙালি সংস্কৃতি তৈরি করেছে। তারা বরং মুসলমানী বাঙালি বলে এই সংস্কৃতি থেকে দূরে থেকেছে।

আমি একটু আগে যে কথাটা বলছিলাম, পাকিস্তানের ইসলাম এবং আমার ইসলাম¾এটার একটা অসমাপ্ত পরিস্থিতি রেখে মাটির ময়না শেষ করেছেন তারেক মাসুদ। এই সিনেমায় দেখবে, ওদের ইসলাম এবং আমাদের ইসলাম। মাটির ময়নার পরের সিনেমাতে তার এটা ডিল করার কথা ছিলো তা আর হয়নি। কাগজের ফুল-এ যেটা করার কথা ছিলো। মাটির ময়নায় আনুর বাবাকে ওর মা বলছে, পাকিস্তানি সৈন্যরা আসতেছে, সব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে, চল আমরা পালাই।

বাবা বলছে, ওরা কেনো আমার ঘর পোড়াবে? ওরা তো আমাদের রক্ষা করতে আসছে। পাকিস্তানের সৈন্যরা তো আমাদেরকে রক্ষা করতে আসছে। এখানে যারা দুর্বৃত্ত, যারা দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতেছে, তাদেরকে ওরা মারবে। আমাকে কেনো ওরা মারবে?

আনুর বাবা থেকে গেলো। আনুকে নিয়ে ওর মা পালিয়ে গেলো জঙ্গলে। সেনাবাহিনী এসে তাদের বাড়িটা পুড়িয়ে দিলো। ঘর পুড়ে গেছে; কোরআন শরিফও পুড়ে গেছে। আনুর মা এসে দেখছে, আনুর বাবা খুব বিধ্বস্ত, বিস্মিত হয়ে বসে আছে। কোরআনের পোড়া পাতাগুলো সে দেখতেছে। তার বিস্মিত চোখ কোন আগামীর দিকে তাকিয়ে আছে, তা আর আমাদের জানা হলো না।

এর মানেটা কী? মানেটা হলো তুমি মুসলমান বলো, ইসলাম বলো; আমিও মুসলমান, আমি ইসলাম ধর্ম পালন করি। কিন্তু আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না যে, তুমি কীভাবে এ কাজটি করতে পারো! একজন মুসলমান হয়ে তুমি এই কাজ কীভাবে আরেকজন মুসলমানের সঙ্গে করো। একজন পাকিস্তানি হয়ে তুমি আরেকজন পাকিস্তানির সঙ্গে এই কাজটি তুমি কীভাবে করো! একটা অবিশ্বাস তৈরি হয়। আনুর বাবার মধ্যে ইসলাম নিয়ে নতুন ধরনের ব্যাখ্যা করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এরপর একাত্তর এলো। সিনেমা শেষ হয়ে গেলো। এটা খুব ইন্টারেস্টিঙ কাহিনি। এই ব্যাখ্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। বাংলাদেশের ইতিহাস যারা লিখেছেন, বোরহান উদ্দীন খান জাহাঙ্গীর থেকে শুরু করে সালাউদ্দিন আহমেদ, রওনক জাহান, মুনতাসির মামুন¾এরা সবসময় এই জায়গায় একধরনের অসততার আশ্রয় নিয়েছেন বলেই আমার মনে হয়েছে।

ম্যাজিক লণ্ঠন : কেমন সেটা?

মামুন : ইসলামের এই ভিন্ন রূপটা মুক্তিযুদ্ধের একটা উপাদান ছিলো। এই রূপটা মানুষ সবসময় ধারণ করেছে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদরা সেটা গোপন করে গেছে। তারা বাঙালি ও ইসলাম এই বাইনারির খপ্পরে থেকে গেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করতেছে, পাকিস্তানিরা ইসলামের নাম-ডাক করতেছে। কিন্তু এখানকার মানুষ ইসলামের নামে নিজের মুসলমানিত্ব বিনির্মাণ করতে শুরু করেছে। এটা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। ও সাচ্চা মুসলমান বলতেছে; কিন্তু ও আসলে সাচ্চা না। আমিই আসল মুসলমান। ইসলামের নামেই লড়াইটা করতে হবে। এই ন্যারেটিভের সম্ভাব্যতা, এই জায়গাটা এরা কেউ দেখেনি। এটা তাদের বড়ো ব্যর্থতা।

বোঝা গেছে? আলোচনা কি ভালো হলো?

ম্যাজিক লণ্ঠন : অবশ্যই, ভালো হচ্ছে। আরেকটা বিষয়, জামায়াতের তাত্ত্বিক মওদুদি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র অর্থাৎ ইসলামি রাষ্ট্রের কথা বলেছেন। সেক্ষেত্রে অন্য ধর্মের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হবে। স্যামুয়েল হান্টিংটন ‘সভ্যতার সংঘাতের’ কথা বলেছেন। এই দুই ধারণার মধ্যে মৌলিক কী পার্থক্য?

মামুন : হিন্দু ও মুসলমানের দুইটা আলাদা রাষ্ট্র হবে¾এই ধারণাটা আরেকটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা দরকার।  একসময় তো জিন্নাহ-গান্ধী এক সঙ্গেই রাজনীতি করেছেন। জিন্নাহ বেরিয়ে যাচ্ছেন খেলাফত আন্দোলনের পরে। তারপর পাকিস্তান আন্দোলন চলছে। এটা আসলে কী ধরনের আন্দোলন ছিলো? লাহোর অধিবেশনে ফজলুল হক কয়েকটি স্টেটের কথা বললেন। মাউন্ট ব্যাটেন সেটা মেনে নিলেন না। তিনি দুটো স্টেটের কথা বললেন। পরে ছোটো আকারে বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিলো, তারা বাংলাকে এক রাখতে চায়। কিন্তু এখানকার হিন্দুরা সেটা চাইলো না। তাদের ভয় ছিলো, বাংলা যদি এক থাকে সেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে। মুসলমানদের কর্তৃত্বে থাকতে হবে। ৪৭-এর আগের যে ইতিহাস, সেখানে ধর্মরাষ্ট্র গঠন¾এইভাবে চিন্তার সুযোগ কম ছিলো। এটা প্রধানত অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব। পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। মুসলিম লীগ ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে গড়ে উঠেছিলো ঢাকায়। পাকিস্তান আন্দোলন মূলত ছিলো সিন্ধু মাড়োয়ারি ব্যবসার স্বার্থ সংরক্ষণে। বাংলার ক্ষেত্রে একই কথা। কলকাতার আধিপত্য থেকে বেরিয়ে একটা স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জায়গা পাওয়া¾এটাই ব্যাপার। আমি মুসলিম বা হিন্দু বলে আলাদা রাষ্ট্র চাই¾ব্যাপারটা এ রকম ছিলো না।

পাকিস্তান আন্দোলনকে গান্ধী বহুদিন পর্যন্ত মানতে চাননি। তিনি বলেছেন, ‘দেশ যদি দুইভাগ হয়, আমি অনশনে যাবো, আত্মহত্যা করবো।’ ১৯৪৩Ñ ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে এসে তিনি বিষয়টি মেনে নিলেন। কিন্তু মুসলমানরা দেখতেছে, যেসব অঞ্চলে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাদের অধিকার যদি রক্ষা করতে হয়, তাদের একটা আলাদা রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ রাজনীতির যে ইতিহাস তারা দেখেছে, সেখানে হিন্দু আধিপত্যের বাইরে তারা যেতে পারছে না। ফলে তারা একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র চায়। মুসলমানদের জন্য একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র চাই, ইসলাম ধর্মের জন্য নয়।

ওটার সঙ্গে স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ ধারণা মেলানোর সুযোগ নেই। স্যামুয়েল হান্টিংটনের ধারণার মূল কথাগুলো হলো ইউরোপীয় সভ্যতার সঙ্গে অন্য সভ্যতার সংঘাত। এখানে মুসলিম সভ্যতা, ভারতীয় সভ্যতা ব্যাপারটা এ রকম না। কারণ প্রাক-ঔপনিবেশিক ইতিহাসের যে গতি-প্রকৃতি, রাষ্ট্রের যে প্রকৃতি, তার সঙ্গে ঔপনিবেশ পরবর্তী রাষ্ট্রের ইতিহাস ও গতি-প্রকৃতি এক হবে না। কারণ ওই সময় জনগণের যাতায়াত ও উপস্থিতি আলাদা। যেমন, মুসলমানরা এদেশে এসে নিশ্চিতভাবে ধাওয়া খায়নি। প্রাক-উপনিবেশিক আমলে ধর্মপ্রচারকরা যখন যে দেশে গেছে, তখন স্থানীয় লোকজন বলেছে, ঠিক আছে, তুমি কী বলতে চাচ্ছো, শুনি? তোমারটা ভালো কি মন্দ, শুনি। তারপরে সেটা গ্রহণ করা, তাদেরকে বসবাস করতে দেওয়া¾এই ব্যাপারগুলো ঘটেছে। ধর্মপ্রচারকরা বিভিন্ন জায়গায় যেতো, ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জায়গায় যেতো। এটা একটা খোলামেলা ব্যাপার ছিলো।

ইসলামি সভ্যতা বিকাশের বড়ো একটা কেন্দ্র ভারত। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সিংহভাগ মানুষ বাস করে ভারতে। ইসলামি চিন্তা বিকাশের বড়ো ক্ষেত্রও ভারত। হিন্দুত্ববাদীরা যে বৈদিক সভ্যতার কথা বলে, সেটা কোথায় ছিলো? সেটা ছিলো সিন্ধু উপত্যকায়। সিন্ধু উপত্যকতার যে জায়গা, সেটা তো পাকিস্তানে। মহেঞ্জোদারো-হরপ্পা সভ্যতার জায়গা পাকিস্তান ও ইরানে। ফলে ওই সভ্যতার অংশীদার সবাই, শুধু হিন্দুরা নয়। যেমন, ঋগ্বেদে কী বলা হয়েছে, কীসের কাহিনি?

দেব ও অসুরের লড়াই। দেবপন্থি এবং অসুরপন্থি। তো এখন দেবপন্থি যারা, তারা হচ্ছে বাহ্মণ, এরিয়ান ব্রাহ্মণ। আর্য বলতে বুঝায় কালচারড। আর্য বলতে একটা জাতি বুঝায় না, যদিও ব্রিটিশরা আমাদের তাই শিখিয়েছে। এটা মিথ্যা। আর্য মানে, হু আর কালচারড। তো যারা সংস্কৃতিবান মানুষ, তারা হচ্ছে আর্য। তো ওখানে কালো, সাদা যেকোনো রঙের লোক হোক, মঙ্গোলীয়, ককেশীয় যাই হোক¾সবাই হচ্ছে আর্য। যারা কৃষি কাজ করতে পারে, বাঁধ দিতে পারে, যারা সফিস্টিকেটেড চিন্তা করতে পারে, যারা নগর রাষ্ট্র তৈরি করতে পারে¾তারা হচ্ছে আর্য। সিন্ধু উপত্যকায় ওই সময় বন্যা হচ্ছে, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এই সময় ঋগ্বেদে দেখানো হচ্ছে দেব ও অসুরের লড়াই। মূলত বাঁধ থাকবে কি থাকবে না, সেটা নিয়ে লড়াই। বাঁধ দেওয়া মানে নদীর উচ্চতা বৃদ্ধি, কিছুদিন পর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এবং ওই জায়গা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যায়। তাহলে কী করতে হবে¾হয় পলি সরিয়ে ফেলতে হবে অথবা বাঁধ ভাঙতে হবে? বাঁধের পক্ষে যারা তারা দেবপন্থি। আর বিপক্ষে যারা তারা অসুরপন্থি। এই গল্পই ঋগ্বেদে লেখা হয়েছে। বাঁধের পক্ষের এবং বিপক্ষের দুই গোষ্ঠী সিন্ধু উপত্যকায় তর্ক করছে, যুদ্ধ-লড়াই করছে। যারা অসুরপন্থি তারা পরাস্ত হচ্ছে। সেখান থেকে তারা চলে যাচ্ছে ইরানে।

ইরানে জরাস্ত্রাইজম নামে একটা ধর্ম আছে। তাদের দেবতার নাম আহুর মাজদা। সে হচ্ছে অসুর। দেবপন্থিরা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের অনুসারী। পরে জলাবদ্ধতার কারণে তারাও সেখানে টিকতে পারেনি। উত্তর ভারতে চলে এসেছে। পরে গঙ্গা তীর পর্যন্ত এসেছে। পূর্ব বাংলায় আসতে পারেনি।

সিন্ধু সভ্যতার একমাত্র অংশীদার ভারত, এটা অস্বীকার করা যায়। যেমন, আল্লাহ ধারণাটা বেদেও আছে। কাবা কিংবা হাজরে আসওয়াদকে প্রদক্ষিণ করার ধারণা, কিংবা পবিত্র হওয়ার জন্য চুল কাটা¾এগুলো হিন্দুরাও করে। এই ধর্মীয় আচারের চর্চা পরস্পর সংযুক্ত। এগুলোকে আমরা হিন্দু, মুসলমান ক্যাটাগরি করে চিন্তা করি। এগুলো অনেক কানেকটেড প্র্যাকটিস। সভ্যতার সীমানা এঁটে এগুলো দেখার সুযোগ কম।

এখানে তিনটা প্রশ্ন তিন রকম। ভারত ভাগের প্রশ্ন, সভ্যতার অংশীদার ও হান্টিংটন প্রসঙ্গ। হান্টিংটন যে অর্থে সভ্যতার কথা বলছেন, সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। উনি হেলেনিক সভ্যতা সেলিব্রেট করছেন। এই সভ্যতা বলতে বোঝাচ্ছি, যে সভ্যতা প্লেটো, সক্রেটিস থেকে ইউরোপে ছড়িয়েছে। এই যে হেলেনিক সভ্যতা, যেটা ক্রিশিয়ানডমের সভ্যতা। এর বাইরে মুসলিম সভ্যতা, ভারতীয় সভ্যতা, চীনের সভ্যতা¾এগুলো এক একটা সভ্যতার কেন্দ্র। এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে তিনি (হান্টিংটন) সংঘাতের আশঙ্কা দেখেছেন। বিশেষত ইসলামের সঙ্গে।

মূলত হেলেনিক সভ্যতার সঙ্গে পারসিয়ান সভ্যতার লড়াই দীর্ঘ দিনের। পারস্য অঞ্চল দখল নিয়ে দুই সভ্যতার লড়াই। এটা ইসলাম আসার আগে, খ্রিস্টধর্ম আসারও আগে। এটা তুমি ইলিয়াড, ওডেসির যুগেও পাবে। এই লড়াই সবসময়ই ছিলো। কিন্তু আবার একই সঙ্গে এর মধ্যে বিনিময়ও ছিলো। বলা হয়, ইউরোপের আধুনিক যুগের সূচনা হলো, জ্ঞান-বিজ্ঞানের যখন সূচনা ঘটলো। সেই এনলাইটমেন্টের আলোটা প্রথমত গ্রিস থেকে এসেছে। মুসলমানরা বাগদাদে ক্ষমতার অধিকারী। তারা ওখানকার (গ্রিস) লাইব্রেরি থেকে প্রচুর বইপত্র সংগ্রহ করেছে। সেগুলো আরবিতে অনুবাদ করেছে। আরবি থেকে ইউরোপিয়ান ভাষা জার্মান, ফরাসি, ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে।

শুধু যে অনুবাদ হয়েছে তা নয়, তারা এটাকে ব্যাখ্যা করেছে। ইসলামের সঙ্গে বার বার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। ১১, ১২, ১৩শ খ্রিস্টাব্দের ইতিহাসে এগুলো পাওয়া যায়। তারপর ইউরোপিয়ানরা প্রাধান্য বিস্তার করে। ফলে সভ্যতার সংঘাতের যে তত্ত্ব হান্টিংটন দিয়েছেন, এটা ভয়ঙ্কর রকমের সমস্যাপূর্ণ। এমনকি ইউরোপের সভ্যতা বলতে যে সভ্যতা আমরা বুঝি¾ইউরোপের স্পেনে যে সভ্যতা, ফ্রান্সে যে সভ্যতা, আলজেরিয়ায় যে সভ্যতা গড়ে উঠেছে¾এগুলোর বড়ো অবদান মুসলমানদের। ফলে সভ্যতার সংঘাত বলে যে বাইনারি তৈরি করা, বিরোধ তৈরি করা¾এটা খুবই সমস্যাপূর্ণ ধারণা। হান্টিংটনের তত্ত্ব কেবল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকেই জাস্টিফাই করেছে।

ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, বর্তমানে একদিকে যেমন ধর্মীয় আচার-আচরণ বেড়ে যাচ্ছে, আবার একই সঙ্গে মানুষের নীতি-নৈতিকতার বোধ কমছে।

মামুন : একদিকে ধর্মের চর্চা বেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু দিন দিন ধর্মের এসেন্সটা কমে যাচ্ছে। সবচেয়ে সমস্যাপূর্ণ ধারণা হচ্ছে, ধর্ম বলতে বুঝছি লেনদেনকে। আমি পাঁচ টাকা দান করলাম। এটা আমি দান হিসেবে, বিনিময়হীন দান হিসেবে করছি না। নির্লোভ বা নিরঙ্কুশভাবে যে দান, সেই অনুভূতি তার মধ্যে থাকে না। আমার একশো টাকা আছে, আমি পাঁচ টাকা দান করবো। আমি একটি অপরাধ করেছি, এতে ৭০টা গুনাহ হয়েছে। এটা করলে ৯০টা পূণ্য হবে। একটা মসজিদ তৈরি করলে, আমি বেহেশতে যাওয়ার জন্য বেশ খানিকটা এগিয়ে থাকবো। এই যে বিনিময়ের হিসাব, এটা ধর্ম নয়। এটা পুরোপুরি পুঁজিবাদী হিসাব। ইহজাগতিক হিসাবের মধ্যে আমি ধর্ম পালন করছি, এটাকে ধর্ম বলছি। এটা একেবারেই অসম্ভব।

ধর্মে যেগুলো শেখানোর কথা¾নিয়মনিষ্ঠা, আনুগত্য, স্নেহ মানে মানবিক অনুভূতি। কিন্তু এই ধর্ম তা শেখাচ্ছে না। সে হিসাব শেখাচ্ছে। সে অহংকারী হওয়া শেখাচ্ছে, অথবা ঘৃণা করতে শেখাচ্ছে। আমার ধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম, অন্যদের ধর্ম নিকৃষ্ট। ধর্ম বলে সমাজে যে ধারণাগুলো তৈরি হচ্ছে, তা ভীষণভাবে সমস্যাপূর্ণ।

মৌলবিরা ওয়াজ করেন, কেনো? মানুষকে ধর্মের কথা শেখানোর জন্য। কিন্তু এটাই সব নয়। যার ওয়াজ ভালো হবে, পাবলিক ততো বাড়বে, তার পয়সা বেশি হবে; নাম ছড়াবে। এর সঙ্গে অর্থনীতির হিসাব আছে। তাকে যদি টেলিভিশনে ডাকা হয়¾টেলিভিশনে কীভাবে পারফরমেন্স করতে হবে, কী পোশাক পরতে হবে, কী ভঙ্গিতে কথা বলতে হবে¾সবই এর অংশ। সে ওয়াজ করে হিন্দি গানের সুরে সুরে। এটা কেনো করে? সে বাড়িতে হিন্দি গান দেখে ও শোনে। যারা ওয়াজ মাহফিল শুনতে যায়, তারাও হিন্দি গান দেখে ও শোনে।

আমি যদি বলি আলো তোমার মনে, কিন্তু এর বিপরীত অর্থাৎ অন্ধকারের কথা আসবে। ধরো, আমি হিন্দি গানের সুরে ধর্মের কথা বলছি, ক্যাটরিনা কাইফ বা সানি লিওনির গানের সুরে ওয়াজ করছি, আমি ধর্মের কথা বলছি। আমার অচেতন মনে, কল্পনার মধ্যে সানি লিওনি কিন্তু নাচতে থাকবে। যে ওয়াজ করছে এবং যে শুনছে দুজনের মনের মধ্যেই এই পরিস্থিতি তৈরি হবে।

ধর্ম এখন বেশিরভাগ মানুষের কাছে দারুণ দারুণ সব হিসাবনিকাশ। আগের ধর্ম প্রচারকেরা বা সুফিরা যেভাবে ধর্ম প্রচার করেছেন তা এখন অনুপস্থিত। এখানে যে মুশকিলটা হয়, ধর্ম এখন আইডেন্টিটি পলিটিকসেরও অংশ। ধর্মের পরিচয় যেভাবে শনাক্ত করি, ধর্মের স্পিয়ারে যেভাবে আমরা বসবাস করি, সেটাকে সম্মান করা, অন্তর্ভুক্তমূলক (ইনক্লুসিভ) রাজনীতির জায়গা থেকে সেটাকে সম্মান করা ও স্থান করে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সমসাময়িককালে মানুষ এটা বুঝতে পারছে। বর্তমান সময়ে অনলাইনসহ নানাভাবে কমিউনিটি গড়ে উঠতে পারে। ফলে কমিউনিটির ধারণায়, রাষ্ট্রের ধারণায় বা একটা জাতির ধারণায় ধর্মকে যদি বাতিল করে দিই; ধর্ম পাবলিক স্পিয়ারের বাইরে থাকবে, সেটা অসম্ভব।

বরং, অন্তর্ভুক্তমূলক রাজনীতিতে ওই জায়গা ও সংলাপগুলো তৈরি করা জরুরি। এবং সেটা র‌্যাডিকালাইজেশন থামানোর একটা উপায়। নইলে এটা থামানোর উপায় নেই। অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পক্ষগুলো র‌্যাডিকালাইজেশন ঘটাতেই থাকবে।

ম্যাজিক লণ্ঠন : প্রাচ্যবাদে যেমনটা বলা হয়, পশ্চিমের চোখ দিয়ে প্রাচ্যকে দেখি, তেমনই আমাদের আজকের আলোচনাও কি সেই পথে যাচ্ছে? আমরা কি পশ্চিমের জঙ্গিবাদের ডিসকোর্সের মধ্যেই আছি? যদি তাতে থাকতে না চাই, তাহলে কীভাবে আলোচনা হবে?

মামুন : পশ্চিম একটা লেন্স তৈরি করে দেখে পূর্বের দিকে; সেটা কোনো বাস্তবতা নয়, সেটা নির্মিত। যখন তুমি পূর্বের দিকে তাকাবে, যেমন ধরো, আমার দিকে, আমি যে বাঙালি, এই শব্দটা, প্রাচ্যবাদী ফ্রেমওয়ার্কের ভিতর দিয়ে তৈরি করা। এটার বাইরে আসা ভীষণ জরুরি। এটাই এডওয়ার্ড সাঈদ বলেছেন, কীভাবে সাম্রাজ্যবাদ টিকে থাকে¾এই কালচারাল আর্টিকুলেশনের মধ্য দিয়ে, কালচারাল পলিটিক্সের ভিতর দিয়ে। এর মধ্যে রয়েছে আইন ব্যবস্থা, নাগরিকবোধ, নানা মূল্যবোধ, ভালো-মন্দ ক্যাটাগরি প্রভৃতি। এগুলো আমাদের উপনিবেশিত করে রাখে। এ থেকে বের হয়ে আসা খুবই জরুরি। স্থানীয় যে সংস্কৃতিক চর্চা ও মূল্যবোধ ছিলো সেগুলোকে তুলে ধরা দরকার। আগের মূল্যবোধগুলো রিকন্সট্রাক করা দরকার। যে মূল্যবোধগুলোকে বুঝে-না-বুঝে আমরা এতোদিন নেতিবাচক বলেছি, সেগুলোকে আবার ইতিবাচক হিসেবে দেখতে শুরু করা দরকার। রাষ্ট্র বলতে আমরা যা বুঝি, রাষ্ট্রের আইন, রাষ্ট্র নিজে কী¾যে ধারণাগুলো আছে, তার বাইরে আসা প্রয়োজন। এটাই প্রধান একটা কাজ।

জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রথমত প্রশ্ন করা দরকার, সহিংসতা কেনো হয়? এই সময়ে কেনো জঙ্গি তৈরি হচ্ছে? একশো বছর আগে তো মুসলিম জঙ্গি হয়নি। ইসলাম ধর্ম তো আছে ১৪শ বছর ধরে। কোন পরিস্থিতি, কোন পূর্বশর্ত জঙ্গি তৈরি করে? অর্থনীতির সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা কী? আমার একজন প্রিয় লেখক আছেন, ফয়সাল দেবজি। তিনি তার ‘ল্যান্ডস্কেপ অব জিহাদ’ বইয়ে বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে এই অঞ্চলগুলো যুক্ত ছিলো না। লাদেনের সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে এগুলো যুক্ত হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশও বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তিনি দেখাচ্ছেন, এফ বি আই-এর যে ভাষা, সেই ভাষাতেই কথা বলে সন্ত্রাসীরা। দুটো ভাষা তুমি আলাদা করতে পারছো না। একজন বলছে সন্ত্রাস দমনের কথা; আরেকজন বলছে জিহাদ করার কথা। কিন্তু দুজনের ভাষাই এক।

সন্ত্রাসী বা জঙ্গি হওয়ার যে বাস্তবতা সেটা আমাদের দেখার বিষয়। তা আফগানিস্তানে যেভাবে সম্ভব, বাংলাদেশে সেভাবে সম্ভব নয়। আবার পাকিস্তানে যেভাবে সম্ভব, এখানে তাও সম্ভব নয়। ভারতে যেটা হবে, তুরস্কে তা হবে না। সন্ত্রাসবাদের পূর্বশর্ত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা একেক দেশে একেক রকম। সেই উপাদনগুলোকে ম্যানিপুলেট করা হচ্ছে কিভাবে সেটা বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

আমাদের দেশে নাস্তিকতা কিংবা পর্নোপ্রাফি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমি বলি, পর্নোগ্রাফি ইজ অ্যা প্রজেক্ট। মুসলিম দেশগুলোয় পর্নোগ্রাফি একটা প্রজেক্ট। শুধু এটা নয় যে, পুরুষদের যৌন অবদমন আছে এজন্য। পর্নোগ্রাফিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, মনে করা হচ্ছে ইসলামি র‌্যাডিকালাইজেশনের বিরুদ্ধে এটা কাজ করবে। কিন্তু প্যারালাল ন্যারেটিভ হচ্ছে, এর সঙ্গে সহিংসতার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। রিপ্রেজেন্টেশনের ক্ষেত্রে যেমন ধরো, ইরান সম্পর্কে, আফগানিস্তান সম্পর্কে দুই ধরনের ছবি উপস্থাপন করা হয়। দেখা যাচ্ছে, আফগানিস্তানের কোনো মেয়ে রাস্তায় মিনি স্কার্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পাহাড়ে চড়ছে। বারে বসে বন্ধুর সঙ্গে চা পান করছে। ইরানেও ওই রকম দেখা যায়। শাহের আমলে মেয়েরা মুক্ত ছিলো। কিন্তু বাস্তবতা কী? এই স্বাধীনতার আর্টিকুলেশন দেখে কী সিদ্ধান্ত নেবো? কয়েকটা ছবি দেখে, কাবুল বা তেহরানের অ্যালবাম দেখে কি বোঝা সম্ভব তখনকার তুলনায় এখন মেয়েরা খারাপ আছে? কোন মানদণ্ড দিয়ে আমি বিচার করি। শুধু স্কার্টের সাইজ দিয়ে নাকি অন্যান্য কিছু? যেমন ধরো, শিক্ষার হার, স্বাস্থ্যের অবস্থা এগুলো কী রকম ছিলো? ৭০-এর দশকে কেমন ছিলো, এখন কেমন? এগুলো বিচার করলে ইরানে দেখা যাবে, আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সে বোরকা পরছে ঠিকই কিন্তু অসংখ্য অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। আরেকটা বিষয়, বোরকার যে সংস্কৃতি দেখাচ্ছে, ৭০-এর দশকে সারা আফগানিস্তানের নারীরা মিনি স্কার্ট পরে ঘুরে বেড়াতো? একেবারেই তা নয়। হাতেগোনা কয়েকটা এলিট সার্কেলে এটা হতো। যেমন ধরো, আমাদের গুলশানে যদি তিনটা মেয়ে মিনি স্কার্ট পরে হাঁটে, সেটাকে তো তুমি সমগ্র বাংলাদেশ বলতে পারো না।

পশ্চিমে যেটা প্রচার করা হয়, ওই সময়ের মিনি স্কার্ট, এ সময়ের রোরকা। সে সময়ে ইরানে মিনি স্কার্ট ছিলো, এখন আছে রোরকা। মানে নারী হচ্ছে এখন পরাধীন। ব্যাপারটা আদৌ তা নয়। নারীর অবস্থা অন্যান্য কিছু মানদণ্ড দিয়ে বিচার করা দরকার। আসলে নারীদের অবস্থা কী? সেখানে মানুষের অধিকার কেমন? কাপড়ের মাপ দিয়ে এটা বিচার করা সম্ভব নয়।

যেটা আমি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বলছি। এখানে হিজাব-বোরকা যতো বেড়ে যাচ্ছে, তা দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয় যে র‌্যাডিকালাইজেশন বেড়ে যাচ্ছে। রিলিজিয়ন অ্যাজ অ্যা কালচার¾চর্চা বেড়ে যাচ্ছে। এখানে ‘সুলতান সুলেমান’ দেখার হার বেশি। আমার মনে হয়েছে, ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের পর এক ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা (সোল সার্চ) শুরু হয়েছে। বাঙালি, মুসলমান, সেক্যুলারিজম ও ইসলাম¾এগুলো মিলিয়ে তার যে সত্তা, সেটা তৈরির চেষ্টা করছে। হিজাব-বোরকার প্রাধান্য দিয়ে এটা বলা সম্ভব নয়, এখানে র‌্যাডিকালাইজেশন হচ্ছে। এটা ঘটার অন্য শর্ত আছে, যার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক আছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতির।

 

জাহাঙ্গীর আলম, প্রথম আলো পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

alam_rumc05@yahoo.com

 

টীকা

১. ম্যাক্স ওয়েবার (১৯৩০), দ্য প্রটেস্টট্যান্ট এথিক্স এন্ড দ্য স্পিরিটি অব ক্যাপিটালিজম। মূল জার্মানিতে লেখা হয়েছিলো বস্তুত ১৯০৪ ও ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে।

২. ওয়াল্টার বেঞ্জামিন (১৯২১), ‘ক্যাপিটালিজম অ্যাজ রিলিজিয়ন’।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন