আব্দুর রাজ্জাক রাজ
প্রকাশিত ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘চলচ্চিত্রের সাথে বোঝাপড়া’
স্বল্প আয়োজনে চলচ্চিত্রের লোভনীয় সব কথা
আব্দুর রাজ্জাক রাজ

নানা প্রসঙ্গেই একটা প্রবাদ চালু আছে¾ঘরের খেয়ে বনের মোষ (মহিষ) তাড়ানো। কিছু মানুষ সম্পর্কে খুব সহজেই এই প্রবাদটি ব্যবহার করেন ‘বড়োরা’। কিন্তু আশঙ্কার কথা হলো, দিন দিন এই বনের মহিষ তাড়ানো লোকের সংখ্যা সমাজ থেকে কমে যাচ্ছে। যদিও ‘বড়োদের’ কথায় এটা মোটেও আশঙ্কা নয়, বরং তাতে সমাজের উপকারই হয়। এই বিতর্কটা বেশ জটিল, এগিয়ে নেওয়াও কঠিন। তবে বিতর্ক যাই থাক, পৃথিবীর যেকোনো সমাজের জন্য যেকোনো সময়ে বনের মহিষ তাড়ানো এসব মানুষ খুব বেশি প্রয়োজন। এরা কেমন করে জানি সমাজের গতিটাকে ধরে রাখে। চলচ্চিত্রকর্মী বেলায়াত হোসেন মামুনকে এমনই একজন মানুষ বলে মনে হয়েছে। তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে অনুসারী হওয়ার সুবাদে তার কর্মকাণ্ডকে এই প্রবাদের মতোই মনে হয়।
দেশে বর্তমানে একটা চলচ্চিত্রিক পরিবেশ তৈরিতে যারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন তাদের অন্যতম বেলায়াত হোসেন মামুন। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংক্রান্ত নানা আয়োজন, সমন্বয়, পরিকল্পনা ও পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। চলচ্চিত্র সংসদকর্মী মামুন বাংলাদেশের অন্যতম চলচ্চিত্র সংসদ ‘ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং বর্তমান সভাপতি। সম্পাদনা করেছেন একাধিক চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা। তিনি সরাসরি যুক্ত আছেন চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখালেখির সঙ্গেও। তার এ কার্যক্রমে মনে হয়েছে, চলচ্চিত্রকে তিনি মিশিয়ে ফেলেছেন জীবনের সঙ্গে। যতোদূর জানা যায়, চলচ্চিত্র বিষয়ে নানা সময়ের লেখালেখি নিয়ে মামুনের প্রথম গ্রন্থ ‘চলচ্চিত্রের সাথে বোঝাপড়া’। এই আলোচনা মামুনের সেই গ্রন্থ নিয়ে।
দুই.
‘চলচ্চিত্রের সাথে বোঝাপড়া’র প্রথম অধ্যায়ের প্রথম প্রবন্ধটিতে আলোচনা করা হয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের ইতিহাস নিয়ে। মূল আলোচনা শুরুর আগে এখানে চলচ্চিত্রশিল্পের ইতিহাসকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সে বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন বোধ করছি। পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন হীরালাল সেন। চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য তিনি ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ এপ্রিল বায়োস্কোপ কোম্পানি গঠন করেন এবং নানা জায়গায় চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতে থাকেন। চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি তিনি সেসময় কিছু শুটিংও করেছিলেন। সেলুলয়েডে ধারণ করা এসব দৃশ্য নিয়ে হীরালাল নির্মাণ করেন বিভিন্ন চলচ্চিত্র; যদিও চলচ্চিত্রের বর্তমান ধারণার প্রেক্ষাপটে সেগুলোকে হয়তো চলচ্চিত্র বলা যায় না। তাছাড়া সেসব চলচ্চিত্রের প্রিন্টও পাওয়া যায় না এখন আর।
সেজন্যই হয়তো অধিকাংশ চলচ্চিত্র-গবেষক হীরালালকে উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ হিসেবে কৃতিত্ব দেয় না। এই গ্রন্থে হীরালাল সেনের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশে হীরালালের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে ঢাকার নবাব পরিবার। নবাব পরিবারের তরুণরা স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্র সুকুমারী এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট কিস নির্মাণ করে। কিন্তু চলচ্চিত্র-গবেষকরা এটাকেও এদেশের অভিষেক চলচ্চিত্র হিসেবে মেনে নেয়নি। জাকির হোসেন রাজু তার ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস : একটি পুনর্পঠন’ প্রবন্ধে এর কারণ হিসেবে চলচ্চিত্রটির ফিল্মপ্রিন্ট খুঁজে না পাওয়াকে দায়ী করেছেন। তার মতে, ‘নবাব পরিবার পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জড়িত ছিলো; যা বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’১ তাই তাদের কৃতিত্বকে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার অনুবর্তী দেখতে নারাজ। মামুনও তার প্রবন্ধে এদেশের চলচ্চিত্র বিকাশে নবাব পরিবারের ভূমিকার কথা বিস্তারিত বললেও তাদেরকে এদেশীয় চলচ্চিত্রের অগ্রবর্তী হিসেবে স্বীকার করেননি। তার এই প্রবন্ধে অবশ্য এর পিছনের কারণ সম্পর্কেও কোনো ইঙ্গিত নেই।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সূচনাবিন্দু হিসেবে ধরা হয় ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দকে। ওই বছরেই আব্দুল জব্বার খান নির্মাণ করেন প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ। এই চলচ্চিত্রের সফলতার পর এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা নিজেদের একটি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার তাগিদ অনুভব করেন এবং সেই তাগিদ থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (ই পি এফ ডি সি)। এখানে এফ ডি সি প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া মামুন এদেশীয় চলচ্চিত্রের বিকাশকালকে বিভিন্ন দশকে ভাগ করে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোকে সংক্ষিপ্ত পরিসরে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে শুধু ব্যবসাসফল, শিল্পগুণসম্পন্ন ও কোনো বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের নামও তুলে ধরেছেন।
এই প্রবন্ধে ‘বিকল্প চলচ্চিত্র আন্দোলনের সূচনা ও আশির দশকের চলচ্চিত্র’ শিরোনামের আলোচনায় কেবল শিল্পগুণসম্পন্ন চলচ্চিত্র নিয়েই কথা বলেছেন মামুন। অথচ ৮০’র দশক নানা কারণেই দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এই দশকের একটা বড়ো অংশ জুড়ে ছিলো পোশাকি-ফ্যান্টাসি ধারার চলচ্চিত্র। ৭০ থেকে ৮০’র মাঝামাঝি পর্যন্ত ইবনে মিজানের এ ধারার চলচ্চিত্রগুলো বেশ জনপ্রিয় ও ব্যবসাসফল ছিলো। কিন্তু তার লেখায় এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
৯০-এর দশকের চলচ্চিত্রের আলোচনায় জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী সালমান শাহ্ এবং অশ্লীলতা ও যৌন দৃশ্যের কাটপিস সংযোজনের বিষয়টি উঠে এসেছে। সালমান সম্পর্কে বলা হয়েছে, তার মৃত্যু সুস্থধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু দেশীয় চলচ্চিত্রে সালমান শাহের গুরুত্বের জায়গাটা ঠিক কোথায় তা অবশ্য কেউই খতিয়ে দেখে না, মামুনও দেখেননি। সালমান যখন চলচ্চিত্রে আসেন, তখন অনেক জনপ্রিয় নায়ক থাকা সত্ত্বেও তিনি দর্শকের মধ্যে ভিন্ন এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি করেছিলেন। পরে সালমান তার অভিনয় দিয়ে সেই প্রত্যাশা পূরণও করেন।
চলচ্চিত্রে তার প্রথম বাজারজাত হয় ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে কেয়ামত থেকে কেয়ামত-এর মাধ্যমে। ওই সময়টাতে নায়ক বলতে যাদের বোঝায়¾আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, জসিম, ওমর সানি, রুবেল, আমিন খান, নাঈম কারো জনপ্রিয়তাই কম ছিলো না। ফলে এলাম, দেখলাম, জয় করলাম¾পরিস্থিতি তখন মোটেও এরকম ছিলো না। কিন্তু প্রথম চলচ্চিত্রেই সালমান দর্শকের কাছে স্বকীয়তার আলামত দেখান।২
প্রতিটি চলচ্চিত্রেই সালমান তার স্বকীয়তা বজায় রাখতে পেরেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে বোধ করি সালমানই একমাত্র নায়ক যার জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের চেয়ে অজনপ্রিয় ছবির তালিকা করা সহজ।৩ যে সালমান একটা নির্দিষ্ট সময়ের চলচ্চিত্রের জন্য এতো গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, তাকে নিয়ে মূল্যায়নভিত্তিক লেখালেখি একেবারেই নেই। সালমানকে নিয়ে প্রায় সব লেখাই স্মৃতিকথামূলক। তাই বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে সালমান শাহ্ ঠিক কী কারণে গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নতুন প্রজন্ম বুঝতে পারে না।
এছাড়া ২১ শতকের চলচ্চিত্রে অশালীন ও কদর্য ভাষার প্রয়োগের জন্য নির্মাতা কাজী হায়াৎ এবং মান্না-ডিপজল অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর সমালোচনা করা হলেও তাদের ব্যবসায়িক সফলতা নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি। অথচ মান্না অভিনীত প্রচুর চলচ্চিত্র সেসময় ব্যবসায়িক সফলতা পায়। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের করা একটি জরিপে উঠে আসে প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখতে আসা দর্শকের শতকরা ৪৫ ভাগ মানুষের প্রিয় নায়ক মান্না।৪ এই বিশাল দর্শক মান্নাকে ভালোবেসেছে কারণ¾
মান্না সাধারণত ক্ষমতাশালীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। কখনো তিনি অপরাধী পুষছেন এমন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সৎ পুলিশ অফিসার, কখনো বা গুণ্ডা বাহিনীর বিরুদ্ধে বস্তি রক্ষায় নিয়োজিত রাগী যুবক, কখনো ধনীর ধন কেড়ে এনে গরিবের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া দাতা। আমাদের দেশে যেখানে অপরাধের সংখ্যা অনেক, সমাজের প্রভাবশালীরা অনেক সময়ই এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকেন, এবং প্রায়শই অপরাধের বিচার হয় না, সেখানে মান্না নিম্নবর্গের দর্শকের কাছে তাদের একমাত্র কণ্ঠস্বর। পর্দায় তিনি ধর্ষককে খুন করেন, কুচক্রী প্রভাবশালীদের নাস্তানাবুদ করেন, মাস্তানের পিলে চমকে দেন। সিনেমায় তাই সমাজের অসহায় শ্রেণীর এই দর্শকদের সাময়িক রাগ মোচন হয়। বাস্তবে তারা যা করতে পারে না, পর্দায় তাদের প্রতিনিধি হয়ে মান্না তা-ই করেন।৫
তার মানে এক শ্রেণির দর্শক মান্নার চলচ্চিত্রকে গ্রহণ করেছিলো। সারা পৃথিবীর নানা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতেই মান্নার মতো জনপ্রিয় নায়ক আছে। একসময়ের অমিতাভ, মিঠুন, আজকের সালমান খান, শাহরুখ খান, আমির খান, তাপস পাল, প্রসেনজিৎরা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলো। এদের অনেকেরই জনপ্রিয়তা এখনো কমেনি। কিন্তু মান্নার এই ধরনের জনপ্রিয়তা কেনো জানি চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেনি।
এই প্রবন্ধের শেষাংশে বাংলাদেশের প্রামাণ্যচিত্র, এর বিকাশের ধারা, প্রামাণ্যচিত্রের তালিকা এবং এর আগাম সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
তিন.
প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় প্রবন্ধে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের আলোচনায় এই ধারার চলচ্চিত্রকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্বে, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বের চলচ্চিত্রপ্রয়াস; দ্বিতীয় পর্বে, যুদ্ধ চলাকালীন চলচ্চিত্রপ্রয়াস এবং তৃতীয় পর্বে, বিজয়ের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নির্মিত চলচ্চিত্র। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বের চলচ্চিত্রপ্রয়াস প্রসঙ্গে আলোচনায় সেই সব চলচ্চিত্রের কথা উঠে এসেছে, যেগুলো বাঙালি জাতিকে জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত করেছিলো। মুক্তিযুদ্ধের দলিল হিসেবে পাওয়া যায় যুদ্ধকালীন নির্মিত বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্রকে। তখন বেশ কয়েকজন নির্মাতা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলার চেহারা ক্যামেরায় তুলে এনে নির্মাণ করেন এসব প্রামাণ্যচিত্র। যেগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী হয়ে আছে।
লেখকের হিসাব মতে, স্বাধীনতার পর থেকে ২০১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র ৪৫টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে; এর খুব কম চলচ্চিত্রই প্রচলিত বয়ানভঙ্গির বাইরে যেতে পেরেছে। প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ওরা ১১ জন-এ যে বয়ানভঙ্গিতে মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ফুটে উঠেছে, পরবর্তী সময়ের চলচ্চিত্রগুলোতেও সেই একই বয়ানভঙ্গির পুনরাবৃত্তি ঘটে। প্রচলিত বয়ানভঙ্গি বলতে এখানে দাড়ি-টুপি পরিহিত যুদ্ধাপরাধী, পাকিস্তানি সেনার হাতে নারী ধর্ষণ এইসব বোঝানো হয়েছে। তবে অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, ধীরে বহে মেঘনা, মেঘের অনেক রঙ, রূপালী সৈকতে, আগুনের পরশমনি, হাঙর নদী গ্রেনেড, নদীর নাম মধুমতী ও আগামী’র মতো সামান্য কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রচলিত বয়ানভঙ্গির বাইরে যেতে পেরেছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।
এই প্রবন্ধে মাটির ময়নাকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সফল চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও চলচ্চিত্রটিতে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে পরোক্ষভাবে। এ রকম আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র শ্রাবণ মেঘের দিন; এটি মুক্তিযুদ্ধের সময়কালকে না ধরলেও এর গল্পের সমান্তরালে মুক্তিযুদ্ধ আছে। সাধারণ প্রেমের গল্পে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেই বিশেষ কারণেই। জমিদার ইরতাজউদ্দীনের সঙ্গে তার ঢাকায় থাকা ছেলের বিরোধ; কারণ ইরতাজউদ্দীন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে গ্রামে আশ্রয় দিয়েছিলেন; তার আশ্রয়েই তারা হামলা চালিয়েছিলো সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর। এই ক্ষোভে ঢাকা থেকে বাবার সঙ্গে দেখা করতে পর্যন্ত আসেন না সেই ছেলে। নাতনিরা বৃদ্ধ দাদাকে দেখতে এসে তাকে গ্রামবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতে বলে। একপর্যায়ে ইরতাজউদ্দীন সিদ্ধান্ত নেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় করা তার ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইবেন। অবশেষে চলচ্চিত্রের শেষে গ্রামবাসীর সামনে প্রকাশ্য ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান ইরতাজউদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধোত্তর কোনো চলচ্চিত্রে যতোদূর সম্ভব এ ধরনের কোনো বিষয় আর দেখা যায়নি। প্রবন্ধে এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে কথা বলার প্রাসঙ্গিকতা ছিলো। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি লেখক এখানে এর পিছনের বেশকিছু কারণও উল্লেখ করেছেন।
চার.
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ নির্মাতা বাদল রহমান, দ্বিতীয় অধ্যায়ের একমাত্র প্রবন্ধের আলোচনার বিষয়বস্তু। এটি মূলত বাদল রহমানকে নিয়ে লেখা স্মৃতিকথা। লেখক বাদল রহমানের ঘনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন বলেই প্রবন্ধে অনেক অজানা কথা সহজ ভঙ্গিতে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রশিক্ষার্থী হিসেবে বাদল রহমান ভারতের ‘পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউট’-এ পড়তে যান। এই প্রসঙ্গে একবার তিনি লেখককে ঠাট্টাচ্ছলে বলেছিলেন, তখন বিয়ে করার ক্ষেত্রে পাত্রের প্রধান এবং একমাত্র যোগ্যতা ছিলো সরকারি চাকরি করা, আর আমি সরকারি চাকরি ছেড়ে চলচ্চিত্রে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছিলাম। এই কথা থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি বাদলের ভালোবাসা ও ত্যাগ উপলব্ধি করা যায়।
দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বাদল রহমানকে নিয়ে তেমন লেখালেখি হয়নি বললেই চলে। সেই দিক থেকে এই লেখাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ‘চলচ্চিত্রকার বাদল রহমান : জীবন ও কর্ম’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ হয়; এর লেখক আবু সাঈদ মো. মেহেদী হাসান। এটি বাদলকে নিয়ে একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ। অন্যদিকে স্মৃতিকথা যখন লেখা হয়, মানে যাকে নিয়ে যিনি লেখেন, তার সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই ব্যক্তিত্বের একটা জোরালো সম্পর্ক থাকে। ফলে সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রবন্ধ বা আলোচনায় যেভাবে কোনো ব্যক্তিকে উপস্থাপন করা হয়, স্মৃতিকথায় খানিকটা সেই প্রাতিষ্ঠানিক ভাবটা থাকে না। ফলে ছোটো কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্মৃতিকথায় উঠে আসে।
লেখক যেহেতু বাদল রহমানকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন, সেহেতু তার লেখায় বাদল রহমানের জীবন ও কর্মের অনেক প্রামাণ্য দিক উঠে এসেছে। তাই বাদল রহমানকে নিয়ে এ ধরনের লেখা তিনি আরো লিখলে, তার মাধ্যমে হয়তো একজন ভিন্ন বাদলকে আবিষ্কার করা সম্ভব হতো। এর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রশিক্ষার্থীরাও বাদল রহমানকে অন্যভাবে জানতে পারতো।
তৃতীয় অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে তিনটি প্রবন্ধ। সত্যজিৎ, ঋত্বিক ও মৃণাল এই তিনটি প্রবন্ধের আলোচনার বিষয়। প্রথম প্রবন্ধের শিরোনাম ‘সত্যজিতের ক্যামেরায় রবীন্দ্রনাথ’। বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড়ো দুই সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের তুলনামূলক আলোচনা এ প্রবন্ধে লক্ষণীয়। রবীন্দ্র সাহিত্যকে সত্যজিৎ কতোটা সার্থকতার সঙ্গে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তাই-ই এ প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয়। লেখক এখানে একতরফাভাবে সত্যজিতের রবীন্দ্র সাহিত্য চিত্রায়ণের প্রশংসা করে গেছেন। প্রবন্ধটি পড়তে পড়তে চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক হায়দার রিজভীর একটি কথা মনে পড়ে যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘... বাংলা সাহিত্য থেকে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে এর প্রাচুর্য কমে যায়; কিন্তু চলচ্চিত্র থেকে সত্যজিৎকে বাদ দিলে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ক্ষতি হয়ে যাবে।’৬ অর্থাৎ বাঙালির সাংস্কৃতিক-ইতিহাসে সত্যজিৎ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনই বিশ্ব-চলচ্চিত্রেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরের প্রবন্ধটি বাংলা চলচ্চিত্রের আরেক কিংবদন্তি ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে। স্মৃতিকাতর ঋত্বিকের প্রায় প্রতিটা চলচ্চিত্রে দেশভাগের ব্যথা ও পূর্ববাংলার প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে। লেখক তাই তাকে ‘বাঙালিত্বের অহংকার’ বলতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। ঋত্বিক একবার বলেছিলেন, ‘দেশটারে ভাগ করিবার পারিছো, কিন্তু দিলটারে ভাগ করিবার পারিবা না।’ ঋত্বিকের এই উক্তির প্রতিফলন তার চলচ্চিত্রে বার বার এসেছে। ঋত্বিক কখনো দেশভাগকে মেনে নিতে পারেননি। দুই বাংলা ভাগ হওয়ার কারণে তার মতো আরো অনেকেই শিকড়ছেঁড়া হয়েছেন। মেঘে ঢাকা তারা’য় উঠে এসেছে এই শিকড়ছেঁড়াদের গল্প। এ রকম আরো দুটি চলচ্চিত্র হচ্ছে সুবর্ণরেখা ও কোমল গান্ধার। লেখক এই তিনটি চলচ্চিত্র নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তিনি এই তিনটি চলচ্চিত্রকে আখ্যা দিয়েছেন ঋত্বিকের ‘ত্রয়ী চলচ্চিত্র’ হিসেবে। ঋত্বিক মোট আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। লেখক এই প্রবন্ধে কেনো জানি বাড়ি থেকে পালিয়ে ছাড়া বাকি সবগুলো চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন।
এই প্রবন্ধের শুরুতেই উঠে এসেছে ঋত্বিকের একান্ত কিছু অনুভূতির কথা। পরের অংশে আছে ঋত্বিকের জন্ম, পরিবার ও বেড়ে ওঠা। এরপর ঋত্বিকের শিক্ষাজীবন, রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া এবং নাটকের জীবন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ঋত্বিকের তিতাস একটি নদীর নাম বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ঋত্বিক চাইলে চলচ্চিত্রটি পশ্চিম বাংলায় নির্মাণ করতে পারতেন। তিনি তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সে সময় অনেকেই পাশ্চিম [পশ্চিম] বাংলায় সিনেমার কাজ শুরু করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আমাকে কিন্তু আমি তা মানতে পারিনি। নদী, মাটি, নৌকা, মুখচ্ছবি¾তুমি সীমান্তের এ পাড়ে [কলকাতা] এগুলো পাবে না। ফলে তিতাস নিয়ে ভাবনার জায়গাতেই আমাকে অনেকদিন থাকতে হয়েছে।’৭ এ কারণেই হয়তো তিনি বাংলাদেশে এসে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন। যদিও চলচ্চিত্রটির এই গুরুত্বের জায়গাটা আলোচনায় অনুপস্থিত।
প্রবন্ধের শেষে শিক্ষক এবং বাঙালি হিসেবে ঋত্বিককে মূল্যায়ন করা হয়েছে ভিন্ন দৃষ্টিতে। লেখক ঋত্বিকের ছাত্র বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতাদের নাম তুলে ধরেছেন¾মনি কাউয়াল, জন আব্রাহাম, আদুর গোপালকৃষ্ণ প্রমুখ। যোগ্য ‘গুরু’ পেয়েই যে তারা উপযুক্ত ‘শিষ্য’ হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলেছিলেন এমন ইঙ্গিতই লেখক এখানে দিয়েছেন। লেখকের অভিমত, ঋত্বিকের শিক্ষকতাই ভারতীয় চলচ্চিত্রবিদ্যা শিক্ষাদানে একটি দেশীয়, জাতীয় আঙ্গিক এনে দিয়েছিলো। এছাড়া একজন বাঙালি হিসেবে ঋত্বিককে সত্যজিৎ যেভাবে মূল্যায়ন করেছেন, সে ব্যাপারেও সত্যজিতের মন্তব্য এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
সত্যজিৎ ও ঋত্বিকের সমকালীন নির্মাতাদের মধ্যে অন্যতম মৃণাল সেন। তিনি প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ‘মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রজগত’ নামের প্রবন্ধে তার নির্মিত সেইসব চলচ্চিত্রের কথা উঠে এসেছে। লেখক এখানে মৃণালের চলচ্চিত্রজগতকে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। কোন পর্যায়ে কোন কোন চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে, তার একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। কথা হয়েছে মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রের ভাষা ও নির্মাণশৈলী নিয়েও। প্রথম আলোচনাটি করা হয়েছে হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রথম ‘প্যারালাল সিনেমা’ হিসেবে স্বীকৃত ভুবন সোম নিয়ে। পরের আলোচনায় উঠে এসেছে মৃণালের তিনটি বিখ্যাত চলচ্চিত্রের কথা¾ইন্টারভিউ, কলকাতা ৭১ ও পদাতিক। তার অন্যান্য চলচ্চিত্রেরও অনেক খুঁটিনাটি বিষয় প্রবন্ধটিতে লেখক তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন।
পাঁচ.
‘আমার ভাষার ঘর-বাহির’ অধ্যায়ে আছে চারটি প্রবন্ধ, এদেশের চলচ্চিত্রের চার দিকপালের কথা ওঠে এসেছে এসব প্রবন্ধে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অভিভাবক জহির রায়হানের জীবন ও তার চলচ্চিত্র প্রথম প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়। যদিও প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘জহির রায়হানবিহীন বাংলাদেশের ৪০ বছর’, কিন্তু এখানে মূল আলোচনায় জহির রায়হানের ‘মৃত্যু’ পরবর্তী ৪০ বছরের চলচ্চিত্র সঙ্কটের কথা আসেনি। প্রথম অনুচ্ছেদে শিরোনামের বিষয়টি সংক্ষেপে আলোচনার পরই জহির রায়হানের জীবনী তথা তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে। জহির রায়হান পরিচালনার আগে সহকারী পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি নির্মাণ করেন কখনো আসেনি। জহিরের প্রথম চলচ্চিত্র কখনো আসেনি নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হয়েছে।
জহির দুইটি উর্দু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন¾সঙ্গম ও বাহানা । এই দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রসঙ্গে লেখক বলেন, এসব চলচ্চিত্র উর্দু ভাষায় নির্মাণের মধ্য দিয়ে জহির আসলে পুরো পাকিস্তানের বাজার দখল করতে চেয়েছিলেন। তবে জহির রায়হানকে লেখক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অভিভাবক হিসেবে উল্লেখ করে অত্যুক্তি করেননি, জহির রায়হান বেঁচে থাকলে সত্যিই এদেশের চলচ্চিত্র হয়তো পৌঁছে যেতো এক অনন্য উচ্চতায়।
‘তারেক মাসুদের শিল্পে অন্তর্যাত্রা’ প্রবন্ধে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা তারেক মাসুদের জীবন, চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ও তার চলচ্চিত্র-ভুবনের অন্তর্নিহিত ভাব-গরিমা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। তারেকের প্রতিটি প্রামাণ্যচিত্র ও পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রই বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটভূমিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রবন্ধটিতে লেখক এই মহান চলচ্চিত্রকারের গুরুত্বের জায়গা তুলে ধরেছেন। পরবর্তী প্রবন্ধে এসেছে বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রনির্মাতাদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব তানভীর মোকাম্মেলের জীবন ও তার চলচ্চিত্রের কথা। তানভীরের প্রথম চলচ্চিত্র হুলিয়া; এর বিশেষত্ব হচ্ছে এটি কবিতা অবলম্বনে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র। তিনি মোট পাঁচটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন¾লেখক তার সব চলচ্চিত্র নিয়েই আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধের শেষ অনুচ্ছেদে তানভীরের প্রামাণ্যচিত্র ও এর সফলতা নিয়ে একটি তথ্যবহুল আলোচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের বিকল্প ধারার অন্যতম চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলামকে নিয়ে ‘মোরশেদুল ইসলামের অন্তর-বাহির’ প্রবন্ধটিতে তার জীবন ও চলচ্চিত্রজীবনের সামগ্রিক দিক ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রথম অংশে আলোচনা হয়েছে ইন্ডাস্ট্র্রির বাইরে গিয়ে মোরশেদুলের চিন্তাশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়াস নিয়ে। পরের অংশে তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, থিয়েটারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। মোরশেদুলের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আগামী’র শৈল্পিক গুরুত্বও উঠে এসেছে এখানে। এছাড়া এই চলচ্চিত্রটি ঠিক কী কারণে গুরুত্বপূর্ণ সে বিষয়েও কথা হয়েছে। এরপর একে একে আলোচনা হয়েছে চাকা, দুখাই, দীপু নাম্বার টু, খেলাঘর ও প্রিয়তমেষু নিয়ে। সবশেষে আমার বন্ধু রাশেদ এবং সংগঠক ও আন্দোলনকর্মী হিসেবে মোরশেদুলের কর্মময় জীবন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ছয়.
পঞ্চম অধ্যায়ের প্রথম প্রবন্ধটি সমকালীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের সমালোচনা। রানওয়ে চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে সমকালীন বাংলাদেশের মানুষের জীবনের জটিল সব দিক। জঙ্গিবাদকে কেন্দ্রে রেখে রানওয়েতে প্রবাসী শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিক, এনজিও’র ঋণদান চক্রের মতো বিষয় উঠে এসেছে। প্রবন্ধটিতে রানওয়ে’র নামকরণের সার্থকতা নিয়ে আলোচনার পরই ঢুকে যাওয়া হয়েছে এর পরিবারের গল্পে। লেখক এই পরিবারটিকে বাংলাদেশের মেটাফোর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী সময়ে লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে বাংলাদেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা এই পরিবারটির ভিতর দিয়ে হাজির হয়েছে।
রানওয়ে’র মূল বিষয় জঙ্গিবাদ হলেও নির্মাতা তারেক এটাকে জঙ্গিবাদনির্ভর চলচ্চিত্র বলতে রাজি নন। তারেক এখানে জঙ্গিবাদকে কীভাবে এবং কোন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন তার বিস্তারিত বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা দেখা যায় “রানওয়ে’র গল্পে অন্তর্যাত্রা” অনুচ্ছেদটিতে। লেখক এখানে প্রমাণ করতে চেয়েছেন, চলচ্চিত্রটিতে সমকালীন বাংলাদেশের বাস্তবতার চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। ‘জঙ্গি’ আরিফকে এই চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে একজন সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে। এছাড়া চলচ্চিত্রটিতে জঙ্গি চরিত্রের এই উপস্থাপন আমাদের জানা গণ্ডির বাইরে যেতে পেরেছে বলেও লেখকের দাবি। তার মতে, সাধারণের ধারণা, জঙ্গিরা মূর্খ এবং মুক্তচিন্তা ও আধুনিকতাবিরোধী। লেখক ঠিক কোন ধরনের পর্যবেক্ষণ থেকে এমন মত দিলেন, তা পরিষ্কার নয়। বাস্তবে কিন্তু এর ভিন্ন রূপই দেখা যায়। বিশেষ করে ৯/১১ এর যে হামলার কারণে সারাবিশ্বে জঙ্গিবাদ আলোচিত, সেই হামলার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলো, তারা কিন্তু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ¾মদ্যপান করে, মেয়েবন্ধু নিয়ে নাইটক্লাব ঘুরে এসে হামলা তারা চালিয়েছিলো। তাছাড়া
এই চলচ্চিত্রে দুটি ভিন্ন আদর্শের প্রধান চারটি মুসলমান চরিত্র আছে। একদিকে রুহুলের দাদা ও মামা, আরেকদিকে উর্দু ভাই ও মসজিদের ইমাম। এই দুই পক্ষকে তিনি [নির্মাতা] যথাক্রমে ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ মুসলমান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বলেই মনে হয়। ... পশ্চিমা তত্ত্ব মতে, মুসলমানকে প্রথমত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয় যে, সে ‘ইসলামি’ সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের পক্ষে না বিপক্ষে, ‘বিশ্ব মানবতা’র পক্ষে না বিপক্ষে অথবা শিক্ষা-দীক্ষায় পাশ্চাত্যের পক্ষে না বিপক্ষে। ব্যস, তাহলেই নির্ধারিত হবে সে ‘ভালো’ নাকি ‘খারাপ’ মুসলমান?৮
তারেক রানওয়েতে ‘ভালো’ কিংবা ‘খারাপ’ মুসলমান নির্ণয়ের একই মাপকাঠি ব্যবহার করেছেন। সুতরাং জঙ্গি অথবা জঙ্গিবাদের ভিন্ন উপস্থাপন বলে যে দাবি মামুন করেছেন তার পিছনের কারণ নির্ণয় দুরূহ হয়ে পড়ে।
তবে মামুন রানওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা চিহ্নিত করতে পেরেছেন। তিনি বলেছেন, “পরমপিতা’ যখন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে বিচারকদের ওপর কোনো হামলা হলে তারা আর কোনো প্রটেকশন দেবে না, তখন আমরা দর্শকরা বুঝতে পারি উর্দুভাইদেরও আসলে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। তাদের দিয়ে যতটুকু কাজ ক্ষমতাকাঠামোর করিয়ে নেয়া দরকার ততটুকুই করানো হবে।” তিনি স্বীকারও করেছেন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আসলে তাই এবং বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ শুধু দেশীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে কি জঙ্গিবাদের আসল চেহারা বোঝা যায়! জঙ্গিবাদ তো আর এমন সহজ কোনো বিষয় না; যা শুধু একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। এর পিছনে রয়েছে বিরাট ভূ-রাজনীতি। অরুন্ধতী রায়ের ভাষ্যমতে, যে তালেবানদের ধ্বংস করতে চায় আমেরিকা, সেই তালেবানদের একসময় অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করেছিল আমেরিকাই, সোভিয়েত ইউনিয়নকে আফগানিস্তান থেকে তাড়ানোর জন্য। ... যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিজেই বিশ্বজুড়ে বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ ও অস্ত্রের যোগান দিয়েছে, আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। (আফগান) মুজাহীদিনদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে সিআইএ ও আইএসআই।৯
এছাড়া রানওয়ের শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, মা তার ছেলের মুখ দুধ দিয়ে ধুইয়ে দিচ্ছেন। লেখক এই দৃশ্যটিকে দেখেছেন অত্যন্ত সাদামাটাভাবে। তিনি এই দৃশ্যে ‘মায়ের স্নেহ’ ছাড়া আর কিছু খুঁজে পাননি। চলচ্চিত্র-গবেষক সাজেদুল আউয়াল অবশ্য এটাকে দেখেছেন চলচ্চিত্রে লোকজ ভাবনার ব্যবহার হিসেবে। তার ভাষায়, ‘আমাদের লোকসমাজে একটি আচার আছে যে কাউকে বা কোনো কিছুকে পরিশুদ্ধ করতে হলে নারকেলের পানি অথবা দুধ দিয়ে তা ধুইয়ে দেওয়া। লোকসমাজের এই বিশ্বাসটি ব্যবহার করে ছেলেটিকে পরিশুদ্ধ করা হয়। এটি একটি সিনেম্যাটিক কোড।’১০ অর্থাৎ এই দুই লেখকের আলোচনাতেই ইঙ্গিত আছে ছেলেটির জঙ্গিবাদ থেকে ফিরে আসার। কিন্তু বাস্তবে কি আসলে তাই ঘটে?
... জঙ্গিবাদ এমন সহজ ও সস্তা কোনো বিষয় না যে, ‘রুহুলরা’ যখন খুশি যাবে, আর যখন খুশি ফিরে আসবে। নিজ ধর্ম নিয়ে যথেষ্ট বোঝাপড়া থাকা সত্ত্বেও রুহুল কিন্তু জঙ্গিবাদীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তার মানে সে কিন্তু দৃঢ় বোঝাপড়া থেকেই এই পথে পা বাড়িয়েছিলো। এখন সেই রুহুল যদি জঙ্গিবাদ ছেড়ে হঠাৎ করে বাড়ি ফিরে আসে, সকালের রোদে সোনাঝরা জল, ঘাসফড়িংয়ের লুকোচুরি আর পিঁপড়ের সুশৃঙ্খল জীবন দেখে, জীবনের আসল মানে খুঁজে পায়, সেটা অবাস্তব ছাড়া আর কিছু নয়। এটা এনজিওদের কোনো ছয় মাসের প্রজেক্ট নয় যে, কাজ ধরলো আর যেনো-তেনো করে বাস্তবায়ন করে বা ব্যর্থ হয়ে চলে গেলো। এটির সঙ্গে আদর্শ জড়িত, আবেগ আর ভয়ঙ্কর বাস্তবতা জড়িত; অন্তত এ বিষয়টি নির্মাতার ভেবে দেখা অবশ্যই উচিত ছিলো।১১
পরের প্রবন্ধটিতে প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা সাইফুল ওয়াদুদ হেলালের কথা এসেছে। প্রবাসী সাইফুল বাংলা ভাষায় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের জন্য বার বার বাংলাদেশে ছুটে আসেন। তার প্রামাণ্যচিত্রের মধ্যে রয়েছে¾সিনেম্যানিয়া, বিশ্বাসের রঙ, অপরাজেয় বাংলা এবং সর্বশেষ বাংলাদেশের হৃদয়। বাংলাদেশের হৃদয় শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন নিয়ে নির্মিত। বাংলাদেশের হৃদয় এই প্রবন্ধের আলোচনার বিষয়।
সাত.
বাংলাদেশে একসময় শতাধিক চলচ্চিত্র সংসদ গড়ে উঠলেও, এখন অল্প কয়েকটি টিকে আছে। এদের কর্মকাণ্ডও চলছে ঢিমে তালে। ষষ্ঠ অধ্যায়ের প্রথম প্রবন্ধটিতে চলচ্চিত্র সংসদগুলোর এমন দুরবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান চলচ্চিত্রের দুরবস্থার মধ্যেও যে সম্ভাবনা টিকে আছে, এজন্য লেখক কৃতিত্ব দিয়েছেন এই চলচ্চিত্র সংসদগুলোকেই। আর দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সপ্তম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘মলাটবন্দি অনুভব’; এই অধ্যায়ের দুটি প্রবন্ধে চলচ্চিত্রবিষয়ক দুইটি বইয়ের পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রথমটি মাহমুদুল হোসেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘সিনেমা’ ও দ্বিতীয়টি তারেক মাসুদের ‘চলচ্চিত্রযাত্রা’। এই গ্রন্থে অধ্যায় আছে সাতটি। এতে মোট ১৬টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে।
এভাবেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও তার নানা খুঁটিনাটি বিষয় ধারাবাহিকভাবে আলোচনার মাধ্যমে মামুনের ‘চলচ্চিত্রের সাথে বোঝাপড়া’ শেষ হয়েছে। তবে নিশ্চয় এ বোঝাপড়া চলমান একটি প্রক্রিয়া। তাই আশা করা যেতেই পারে, ভবিষ্যতে তিনি চলচ্চিত্রের নতুন বোঝাপড়া নিয়ে হাজির হবেন।
বইয়ের নাম : চলচ্চিত্রের সাথে বোঝাপড়া
লেখক : বেলায়াত হোসেন মামুন
প্রকাশক : কথাপ্রকাশ
প্রথম প্রকাশ : আগস্ট ২০১৬
প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা
মূল্য : ৬৫০ টাকা
লেখক : আব্দুর রাজ্জাক রাজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
razzakrajru95@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. রাজু, জাকির হোসেন (২০০২ : ২৩২); ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস : একটি পুনর্পঠন’; গণমাধ্যম ও জনসমাজ; সম্পাদনা : গীতি আরা নাসরীন প্রমুখ; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।
২. লাবলু, আসাদ; ‘হারায়ে তাহারে খুঁজিয়া ফিরি : সালমান শাহ : ভাটির আগে উজানের শেষ ঢেউ’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; বর্ষ ৪, সংখ্যা ৮, জানুয়ারি ২০১৫, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পৃ. ৫১।
৩. প্রাগুক্ত; লাবলু (২০১৫ : ৫২)।
৪. নাসরীন, গীতি আরা; ‘একজন নায়কের মৃত্যু, অসংখ্য ভক্তের মুখ’; প্রথম আলোর বৃহস্পতিবারের বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘আনন্দ’, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৮।
৫. প্রাগুক্ত; নাসরীন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৮।
৬. রিজভী, হায়দার; ‘এখনকার নির্মাতাদের খালি মগজটা নাই’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; বর্ষ ৭, সংখ্যা ১৩, জুলাই ২০১৭, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পৃ. ৩৩৬।
৭. ঘটক, ঋত্বিক (২০১৩ : ৪২); ‘সিনেমা বানানো হয় না, তৈরি হয়’; মুখোমুখি ঋত্বিক-সত্যজিৎ মুখোমুখি; অনুবাদ ও সম্পাদনা : উদিসা ইসলাম; ভাষাচিত্র, ঢাকা।
৮. পারভেজ, রুবেল; ‘রানওয়ে : একটি মুসলমানি চলচ্চিত্র’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; বর্ষ ৩, সংখ্যা ১, জুলাই ২০১৩, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পৃ. ১৩৭।
৯. অরুন্ধতী রায়, উদ্ধৃত, প্রাগুক্ত; পারভেজ (২০১৩ : ১৩০)।
১০. আউয়াল, সাজেদুল (২০১৭ : ২৮); চলচ্চিত্রচর্যা; জার্নিম্যান বুক্স, ঢাকা।
১১. প্রাগুক্ত; পারভেজ (২০১৩ : ১৪০)।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন