পেদ্রো আলমোদোভার; ভাব-ভাষান্তর ও ভূমিকা : মো. হারুন-অর-রশিদ
প্রকাশিত ৩১ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সাক্ষাৎকার
চলচ্চিত্র নির্মাণে পারিপার্শ্বিক যা কিছু থাকে তা চলচ্চিত্রের বাইরেও একটা ভিন্ন গল্প বলে
পেদ্রো আলমোদোভার; ভাব-ভাষান্তর ও ভূমিকা : মো. হারুন-অর-রশিদ

চলচ্চিত্র কেবল চলচ্চিত্রই নয়; বরং কখনো তা হয়ে ওঠে এক সীমানাহীন শিল্পমাধ্যম। যে মাধ্যমে সমাজ, রাষ্ট্র তথা মানবিক জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত বিষয়গুলো নিগুঢ় রূপ লাভ করে। হয়তো এই মাহাত্ম্য উপলব্ধি করেই লেনিন চলচ্চিত্রকে শ্রেষ্ঠ শিল্পমাধ্যমের তকমা দিয়েছেন। শতবর্ষী এই শিল্পমাধ্যম আজকের এই অবস্থানে আসার পিছনে রয়েছে শত শত মানুষের নিঃস্বার্থ ভাবনা, নিরলস শ্রম, আত্মিক ভালোবাসা। পেদ্রো আলমোদোভার ক্যাবালারো তেমনই একজন চলচ্চিত্রপ্রেমী। যিনি চলচ্চিত্রকে নিজের জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। স্প্যানিশ এ নির্মাতা ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ সেপ্টেম্বর স্পেনের ক্যালজাদা দ্য ক্যালাট্রাভা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক ও অভিনয়শিল্পী। পেশাগত জীবনে তিনি পেদ্রো আলমোদোভার নামেই পরিচিত।
পেদ্রোকে বলা হয় স্পেনের সবচেয়ে সফল চলচ্চিত্রনির্মাতা। যার চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিকভাবে সাফল্য অর্জন করে একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সমকামিতা, বিকৃত যৌনতা, নারীপ্রধান চরিত্র, যাজকের শোষকরূপ, মাদক, গুপ্তচরবৃত্তি, যৌনব্যবসা, ধর্ষণ, ব্যভিচার, প্রতারণা তার নির্মিত চলচ্চিত্রের অন্যতম বিষয়। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ধর্মান্ধ, বহুরূপ দর্শন তুলে ধরার জন্য সুপরিচিত পেদ্রো আলমোদোভারকে চলচ্চিত্রের একজন নিখুঁত কারিগরও বলা হয়।
স্পেনের একনায়কতান্ত্রিক শাসক ফান্সিস্কো ফ্রাঙ্কো’র (১ অক্টোবর ১৯৩৬-২০ নভেম্বর ১৯৭৫) পতনের পর যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে তার মধ্য দিয়েই পেদ্রো নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে নিজেকে জানান দেন। তার প্রথম কয়েকটি চলচ্চিত্রে তৎকালীন স্পেনের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও যৌনতার অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়। পেদ্রো ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে নিজের সব চলচ্চিত্র প্রযোজনার তাগিদে ছোটো ভাই অগাস্টিন আলমোদোভার’কে সঙ্গে নিয়ে ‘এল ডিজিও’ নামে নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
পেদ্রো চার ভাইবোনের মধ্যে ছিলেন তৃতীয়। তার বাবা ছিলেন মদ প্রস্তুতকারক এবং মা নিরক্ষর প্রতিবেশীদের চিঠি পড়ার কাজ করতেন। আট বছর বয়সে পেদ্রোকে পড়াশোনার জন্য পশ্চিম স্পেনের (কাসেরেস, এক্সট্রেমাদুরা) একটি ধর্মীয় বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করানো হয়। অনেক আশা নিয়ে একজন পুরোহিত হয়ে উঠতে তিনি সেখানে বেশ কিছুদিন কাটান।
বোর্ডিং স্কুলে থাকার সময় ওই এলাকার একটি প্রেক্ষাগৃহে নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র দেখতে দেখতে পেদ্রো এর প্রেমে পড়ে যান। বাবা-মায়ের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি সবকিছু ছেড়ে চলচ্চিত্রনির্মাতা হয়ে ওঠার প্রত্যয়ে রাজধানী মাদ্রিদে যান। ফ্রান্সিস্কো ফ্রাঙ্কো ততোদিনে মাদ্রিদের জাতীয় চলচ্চিত্র স্কুলটি বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে অসুবিধায় পড়ে যান পেদ্রো। এই সময়ে নিজের খরচ চালাতে তাকে খোলা বাজারে বিভিন্ন পণ্য বিক্রির কাজও করতে হয়। এরপর স্প্যানিশ ফোন কোম্পানি টেলিফোনিকা’তে তিনি সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাজ পান। সেখানে তিনি কাজ করেন টানা ১২ বছর। তবে কাজের বাইরে বাকি সময় তিনি চলচ্চিত্রকেই ধ্যান করতেন। তার চলচ্চিত্রনির্মাতা হয়ে ওঠার পিছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা লুই বুনুয়েল।
১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে স্বল্প বাজেটে পেপি, লুসি, বম নামে চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে এ জগতে প্রবেশ করেন পেদ্রো। চলচ্চিত্রটি তিনি ১৬ মিলিমিটার ক্যামেরায় ধারণ করেন। এরপর একে একে তিনি নির্মাণ করেন ল্যাবিরিন্থ অব প্যাশন, ডার্ক হ্যাবিটস (১৯৮৩), হোয়াট হ্যাভ আই ডান টু ডিজার্ভ দিস? (১৯৮৪), ম্যাটাডর (১৯৮৬)। পেদ্রো ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ত্রিভুজ প্রেমের গল্প নিয়ে নির্মাণ করেন ল অব ডিজায়ার; যা তার নিজস্ব প্রোডাকশন কোম্পানি ‘এল ডিজিও’রও প্রথম চলচ্চিত্র।
গুণী এই চলচ্চিত্রব্যক্তিত্বের প্রাপ্তিও কম নয়। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে স্প্যানিশ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ফাইন আর্টসে অবদানের জন্য তিনি গোল্ড মেডেল পান। একই বছর ফ্রান্স সরকার তাকে ‘লায়ন অব অনার’ প্রদান করে। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে পেদ্রো ‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স’-এর সম্মাননীয় বিদেশি সদস্য নির্বাচিত হন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে শিল্পমাধ্যমে অবদান রাখার জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ডক্টরেট ডিগ্রি পান পেদ্রো। পরের বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি জুরি বোর্ডের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে পেদ্রোর অল অ্যাবাউট মাই মাদার বিদেশি ভাষার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে এবং ২০০২-এ টক টু হার শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য বিভাগে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়। এছাড়া পেদ্রো বাফটা পাঁচ বার, গোল্ডেন গ্লোব দুই বার এবং নয় বার গোয়া চলচ্চিত্র অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। এছাড়াও দেশ-বিদেশে অসংখ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হন তিনি।
পেদ্রো নির্মিত অন্যান্য চলচ্চিত্রের মধ্যে উইমেন অন দ্য ভার্জ অব অ্যা নার্ভাস ব্রেকডাউন (১৯৮৮), টাই মি আপ, টাই মি ডাউন (১৯৯০), হাই হেলস (১৯৯১), কিকা (১৯৯৩), দ্য ফ্লাওয়ার অব মাই সিক্রেট (১৯৯৫), লাইভ ফ্লেশ (১৯৯৭), ব্যাড এডুকেশন (২০০৪), ভলভার (২০০৬), দ্য স্কিন আই লিভ ইন (২০১১), জ্যুলিয়েত্তা (২০১৬) উল্লেখযোগ্য।
পেদ্রো আলমোদোভার ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে নিউ ইয়র্ক ভ্রমণে গেলে সেখানে তার সঙ্গে চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলেন আমেরিকান চলচ্চিত্রনির্মাতা পল থমাস অ্যান্ডারসন। ‘ইন্টারভিউ ম্যাগাজিন’ ওই বছরের ২ ডিসেম্বর এটি প্রকাশ করে। ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পাঠকের জন্য সাক্ষাৎকারটি ভাব-ভাষান্তর করা হয়েছে।
পল থমাস অ্যান্ডারসন : আপাতত আপনি নিউ ইয়র্কে কী করছেন?
পেদ্রো আলমোদোভার : এখানে আমার উইমেন অন দ্য ভার্জ অব অ্যা নার্ভাস ব্রেকডাউন (১৯৮৮) চলচ্চিত্রটি থেকে নাটক মঞ্চায়নের কাজ চলছে। এটি ব্রডওয়ে থিয়েটারে গীতিনাট্য হিসেবে মঞ্চায়িত হবে।
অ্যান্ডারসন : সত্যিই! এটি কে করছে?
পেদ্রো : এটি পরিচালনা করছেন বার্টলেট শের (আমেরিকান নাট্য পরিচালক)। তার পরিচালনায় সাউথ প্যাসিফিক চলচ্চিত্রের মঞ্চায়ন আমি দেখেছি, বেশ চমৎকার। তারা আমাকে এ নিয়ে বেশ পরামর্শ দিচ্ছে। বিষয়টি অবশ্য আমার কাছে খারাপ লাগছে না। আচ্ছা, আপনি কি কখনো নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন?
অ্যান্ডারসন : না। আপনি এ ধরনের কিছু কখনো করেছেন?
পেদ্রো : আরে না, এ ধরনের কিছু কখনো করিনি। তাই এটা মানে চলচ্চিত্র থেকে নাটক মঞ্চায়ন করতে গিয়ে আমি অনেক কিছু শিখছি। এই কর্মশালায় আমি এমন অনেক কিছুর মিল পাচ্ছি, যেগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণের সময়ও আমাদের করতে হয়। তবে এটা ঠিক চলচ্চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুতি নিতে হয় নাটক মঞ্চায়নের জন্য। চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের আগে অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে আমি ঠিক এভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। অবশ্য সচরাচর এভাবে কাজ করা হয়ে ওঠে না। আচ্ছা, আপনি কি এভাবে কাজ করেন?
অ্যান্ডারসন : এ বিষয়টি আমার ক্ষেত্রে নানা সময় নানাভাবে হয়ে থাকে। এটা মূলত কোন অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে কাজ করছি তার ওপরও নির্ভর করে। দেয়ার উইল বি ব্লাড (২০০৭) নিয়ে ড্যানিয়েল ডে লুইস-এর সঙ্গে আমার অনেক কথা হয়; আলোচনায় চলচ্চিত্রটির দৈর্ঘ্য কতো হবে, এছাড়া প্রায় সব বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলতাম। লুইস তখন আয়ারল্যান্ডে আর আমি ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিলাম। তখন আমরা মুঠোফোনে কথা বলতাম। আবহাওয়া, খেলাধুলা, নিজেদের পরিবার নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি শেষে আমরা চলচ্চিত্রটি নিয়ে ঠিকই কথা বলতাম। এভাবেই বছর খানিক চলেছিলো।
পেদ্রো : ঠিকই বলেছেন, এটা অভিনয়শিল্পীর ওপরই নির্ভর করে। এই যেমন ধরেন, পেনেলোপ ক্রুজ (স্প্যানিস অভিনয়শিল্পী)-এর কথা, ও আমার শেষ দুটি চলচ্চিত্রে কাজ করেছে। আমরা শুটিং শুরুর কমপক্ষে দুই মাস আগে থেকেই নিয়মিত আলোচনা করতাম।
অ্যান্ডারসন : আমিও পেনোলোপ সম্পর্কে জানি। উনি সবসময়ই একজন বিস্ময়কর অভিনয়শিল্পী। তবে গত কয়েক বছরে তার অভিনয়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ভলভার (২০০৬) ও ব্রোকেন ইমব্রেইসেস (Broken Embraces, ২০০৯)-এ তিনি অভিনয় করেছেন তা আগের সঙ্গে মেলানো প্রায় অসম্ভব। তার অভিনয় দেখে মনে হয়, তিনি সৌন্দর্যের মধ্যেই বেড়ে উঠছেন! অভিনয়ের পরতে পরতে তার দক্ষতার ছাপ পাওয়া যায়। আপনি শেষ কয়েকটি চলচ্চিত্রে তার অভিনয়ের পরিবর্তন লক্ষ করেছেন কি?
পেদ্রো : আমেরিকান দর্শক ও নির্মাতাদের দৃষ্টিতে পেনেলোপ সত্যিই হয়তো আগের চেয়ে উন্নতি করেছে। কিন্তু আপনি যদি তার কাজের শুরুটা দেখেন, ধরুন জ্যামন, জ্যামনই (১৯৯২), সেখানে তার অনেক গুণাবলিই ছিলো। এখনকার তুলনায় সম্ভবত তার সেই গুণাবলি তখন পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। অথচ আমার মনে হয়েছে, সেগুলো তার তখনো ছিলো। তার মধ্যে একধরনের সহজাত আবেগপ্রবণতা রয়েছে, যা তার সত্তায় মিশে আছে। পেনেলোপ একজন যোদ্ধা; আর তিনি এমন একজন মানুষ যিনি জয় করতে জানেন-এমন অনেক শক্তিশালী গুণ তার মধ্যে রয়েছে। অবশ্য একই সঙ্গে তার মধ্যে শিশুসুলভ একটা আচরণও আছে।
অ্যান্ডারসন : আপনি কি তার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবেন বলে ভাবছেন? কেননা আমার ধারণা, কাজের ক্ষেত্রে একটা পর্যায়ে আপনাদের দুজনের মধ্যে নিখুঁত মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে।
পেদ্রো : এটা নিশ্চিত, আমি তার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবো। তবে আমি ঠিক বলতে পারছি না, কবে আমরা আবার একসঙ্গে কাজ করবো। আমি আপাতত দুইটি কাহিনি নিয়ে কাজ করছি। এই কাজের জন্য সেই মানের দক্ষ অভিনয়শিল্পী পাচ্ছি না। আমি ঠিক জানি না, তাকে (পেনেলোপ) এতে আমি পাবো কিনা। তবে এটা ঠিক আমাদের মধ্যে একধরনের মেলবন্ধন তৈরি রয়েছে। গণমাধ্যমও আমাদের সেভাবেই উপস্থাপন করে।
আর ব্রোকেন ইমব্রেইসেস-এর চিত্রটা একেবারে ভিন্ন। পেনেলোপ খুবই সুন্দরী ও দীপ্তিময়। তবে আমাকে তার সেই দীপ্তিময় সৌন্দর্য কিছুটা আড়াল করতে হয় এবং যতোদূর সম্ভব আমি তাকে কুৎসিতভাবে উপস্থাপন করি। এই বিশেষ চরিত্রে তাকে যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিলো, সেটা তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে ছিলো না। এর কারণ, ওই চরিত্রটি ছিলো এমন একজনের জন্য, যিনি তার (পেনেলোপ) চেয়ে কিছুটা বয়োজ্যেষ্ঠ; যাকে দুর্বিষহ একটা অতীত পাড়ি দিতে হয়েছে। তবে তিনি এটা করতে সক্ষম হয়েছিলেন তার কর্মনিষ্ঠা এবং আমার প্রতি আস্থার কারণে।
অ্যান্ডারসন : যখন একজন অভিনয়শিল্পী ভালো করে, তখন কি আপনি তাকে দিয়ে ওই কাজটি বার বার করানোর যে সহজাত প্রবণতা, সেটা দমাতে পারেন? আর আপনি যা করেছেন তা-ই কি আনন্দের সঙ্গে মেনে নেন; ‘আমরা এটা করেছি। এটিই যথেষ্ট ভালো হয়েছে’-এমনটা ধরে নিতে পারেন; নাকি তাদের কাছে আপনি আরো বেশি প্রত্যাশা করেন?
পেদ্রো : পেনেলোপের কাছ থেকে আমি সবসময় বেশি আশা করি। তবে প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীর ক্ষেত্রে এমনটা নয়। কিছু অভিনয়শিল্পীকে দিয়ে এক, দুই বা সর্বোচ্চ তিন বার শট্ নেওয়া যায়। কিন্তু পেনেলোপকে দিয়ে আমি একই শট্ ১০ বারও নিতে পারি। আপনি তাকে দিয়ে যতো কাজ করাবেন, তিনি ততো দক্ষ হয়ে উঠবেন। সাধারণত আমি তার কোনো শট্ চার বার নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি। তবে আমি পেনেলোপকে জানি। আমি এটিও জানি, আমি চাইলে, তিনি ১০ বারের চেয়েও বেশি বার শট্ দিয়ে বিস্ময়কর কিছু দেখাতে পারেন।
অ্যান্ডারসন : ব্রোকেন ইমব্রেইসেস-এ কেন্দ্রীয় চরিত্র হ্যারি কেইন-এর একটি সংলাপ আছে, ‘আমি চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ার আগে গল্প-কথক ছিলাম।’ কেনো জানি এই সংলাপটি আমার কাছে আশ্চর্যজনক মনে হয়। যেনো তিনি নির্মাতা হয়ে নিজেকেই শাস্তি দিচ্ছেন! মনে হয়, তিনি গল্প-কথক হিসেবেই সন্তুষ্ট ছিলেন।
পেদ্রো : এটা অদ্ভুত ব্যাপার, আপনি ওই সংলাপটি নিয়ে প্রশ্ন করে আসলে আমার অভিজ্ঞতা নিয়েই কথা বলতে চেয়েছেন। ছোটোবেলা থেকেই আমি সবসময় গল্প বলেছি। আমার বয়স যখন ১০ বছর, তখনই ভাইবোনদের সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে প্রথম আমি নিজেকে অনুধাবন করি। আমার কাছে এটাই অনেক যে, আমি আমার কৈশোরে এবং এই বিংশ শতাব্দীতে এসেও কিছু করতে পেরেছি। তাই আমি বলবো, সবসময়ই গল্প বলাটাকে আমি উপভোগ করি। সঙ্গে আমি এটাও বলতে চাই, যদি নির্মাতা হিসেবে সফল না হতাম, নিশ্চিত আমি গল্পই বলে যেতাম। এর জন্য হয়তো ১৬ মিলিমিটার কিংবা অন্য কোনো মাধ্যম খুঁজে নিতাম। হয়তো সেটা চলচ্চিত্রের চেয়ে কম আকর্ষক হতো, তবুও আমি গল্পই বলে যেতাম।
অ্যান্ডারসন : ব্রোকেন ইমব্রেইসেস-এ পেনেলোপের চরিত্রটি যখন হ্যারি কেইনের সঙ্গে কথা বলে, সেই দৃশ্যটি আমায় অভিভূত করে। ওই দৃশ্যে হ্যারি কেইন সৈকতের পাশে এক দম্পতির ছবি তুলছিলেন আর পেনেলোপ তখন তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই দম্পতির সঙ্গে কী ঘটছে? গোপনীয় বলতে কি তাদের কিছুই নেই? তাদের গোপনীয়তা কোথায়?’ উত্তরে হ্যারি বলেন, ‘আমি জানি না। এটা জানতে হলে আমাকে লিখতে হবে।’ আচ্ছা, আপনি যেভাবে গল্পটা বলতে চেয়েছেন, এখানে কি তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেছে?
পেদ্রো : আপনি যে দৃশ্যটির কথা বলছেন, তা বেশ অদ্ভুত। কারণ এ নিয়ে কথা বলতে গেলে আবার আমায় নিজের সম্পর্কে বলতে হচ্ছে। যখন আমি লিখতে শুরু করি, তখন প্রথম লাইনটি হয়তো বাস্তব অবস্থা থেকে আসে; দ্বিতীয় বা তৃতীয় লাইনটি কিন্তু আমাকে লিখতে হয়। তাই লেখনীই আমার সৃষ্টির শিকড়। যদি আমি জানতে চাই কী ঘটছে কিংবা গোপনীয় কিছু খুঁজে পেতে চাই, তবে আমাকে লিখতেই হবে।
অ্যান্ডারসন : আপনি যখন লিখতে শুরু করেন, তখন কি এটা ঠিক করে নেন যে, একটি ভূতের গল্প বা ফিল্ম নোয়ার কাহিনি কিংবা কোনো ভালোবাসার গল্প লিখবেন? আর লেখার ক্ষেত্রে আপনার কোনো নিজস্ব রীতি আছে?
পেদ্রো : আমি শুরুতে কমপক্ষে ১০ পৃষ্ঠা লিখি, সেটা যেকোনো বিষয়ের সারসংক্ষেপ হতে পারে। এক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমি একসঙ্গে একাধিক কাজ করি। একই ধরনের কাজ করাটা আমার জন্য অসম্ভব। কারণ ট্রাজেডির সঙ্গে কমেডিও মিশে থাকে। বিশেষ করে চলমান স্প্যানিশ রীতিতে কমেডি এবং ট্র্যাজেডি একটি থেকে অন্যটি বেশ জটিল। আর এই ১০ পৃষ্ঠায় কিন্তু সেই স্বরটি থাকেই। সাধারণত প্রথমে আমি গল্পের মধ্যম অংশটি লিখি এবং বোঝার চেষ্টা করি, কোন চরিত্রটির প্রতি আমি আগ্রহী। তবে সেই চরিত্রটি কীভাবে বিশেষ পরিস্থিতির কারণ হতে পারে, তা মাথায় রেখেই এটা করতে হয়। তারপর চরিত্রটির অতীত এবং শেষে তার ভবিষ্যৎ লিখতে হয়। তবে এটা ঠিক সচেতনভাবে করা হয় না।
অ্যান্ডারসন : আমি জানি, আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাচ্ছেন। এটা বুঝতে পারছি যে, কখনো কখনো লেখায় ভারসাম্য রাখাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পেদ্রো : (হাসি) লেখার সময় আপনাকে একটা ভারসাম্য বজায় রাখতেই হবে।
অ্যান্ডারসন : আপনার চলচ্চিত্র সবসময় একটা গল্পকে মেলে ধরে; শুধু যে গল্প বলে তা নয়। ব্রোকেন ইমব্রেইসেস এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, এটি ‘গার্লস অ্যান্ড স্যুটকেস’ (ব্রোকেন ইমব্রেইসেস-এর কাহিনিতে এই নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়) নামেও পরিচিত। তারপর গিভ ইউর ব্লাড-এর সারমর্মে হ্যারি কেইন ও ডিয়েগোর আলোচনা যেভাবে উঠে এসেছে, তাতে মনে হয়েছে এটি তাদেরই চলচ্চিত্র।
পেদ্রো : তবে একই সঙ্গে এটি কিন্তু আমার কাজেরও পরিচয়। আসলে গল্প বলার একটা আলাদা মহিমা সবসময়ই আছে। এমন গল্প শুধু একটি নয়; অনেক গল্পই আছে যা আমি বলতে পছন্দ করি। এটি একটি সমস্যাও হতে পারে। গল্প ফুটে ওঠার ক্ষেত্রে স্ক্রিপ্ট ভালো নাও হতে পারে, সেক্ষেত্রে আপনাকে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাই আমি এটা বলবো যে, গত ২০ বছরে অনেক গল্প বলা থেকে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি। ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কোনটা মূল গল্প হবে। আমার ধারণা, আমি এখন আরো বেশি মনোযোগী। তবে ব্রোকেন ইমব্রেইসেস-এর বেলায় আমি সাহস করে বলেছি কিনা জানি না-এই চলচ্চিত্রটি সত্যিই আমার কাজের, আমার পেশাদারিত্ব, এমনকি চলচ্চিত্রের সঙ্গে আমার সম্পর্কেরও প্রতিফলন।
আসলে, চলচ্চিত্রের জন্য আমার ভালোবাসার এটি একটি ঘোষণা। চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পর আমি দেখেছি, আমার জন্য চলচ্চিত্র প্রায় জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যভাবে বলতে গেলে, প্রকৃতপক্ষে চলচ্চিত্রই উৎকৃষ্ট জীবন। ব্রোকেন ইমব্রেইসেস-এর চরিত্রগুলোর কথাই ধরুন, সত্যিই সেগুলো ভয়ানক ট্রাজেডির মধ্যে চলে। আবার একই সঙ্গে চলচ্চিত্রটি কমেডিরও ভালো উদাহরণ। এই সবগুলো গল্পের উপস্থিতি চলচ্চিত্রটির অন্যতম মূলভাব হিসেবে কাজ করে। কারণ চলচ্চিত্রের চারপাশে যা থাকে সবকিছুই অর্থপূর্ণ। চলচ্চিত্র নির্মাণে পারিপার্শ্বিক যা কিছু থাকে, তা চলচ্চিত্রের বাইরেও একটা ভিন্ন গল্প বলে।
অ্যান্ডারসন : ব্রোকেন ইমব্রেইসেস-এর কাহিনির ভিতরে যে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ হয়, তাতে এমন কিছু ঘটে, যা একজন নির্মাতার দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। যা চলচ্চিত্রটিকে শেষ করতে দেয় না।
পেদ্রো : এটি চলচ্চিত্রের কাহিনির মূল বিষয়গুলোর একটি।
অ্যান্ডারসন : যদিও এটি কাক্সিক্ষত নয়; এখানে একটি বিষয় আছে, হ্যারি কেইন শুধু একা কিংবা অন্যদেরকে দিয়ে চলচ্চিত্র শেষ করতে পারতেন। তিনি তার ভালোবাসা পেতে পারতেন, চলচ্চিত্রটিও পেতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত এটি একটি অসমাপ্ত প্রেম এবং একটি অসমাপ্ত চলচ্চিত্র। এই কারণে আমি তার ধারণাটি পছন্দ করি-তার হাতে দ্বিতীয়বার চলচ্চিত্রটি শেষ করার সুযোগ রয়েছে।
পেদ্রো : প্রধান চরিত্রের শেষ সংলাপগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘আপনি যদি অন্ধও হন তবুও আপনাকে একটি চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করতে হবে।’ নির্মাতা কোনো চলচ্চিত্র নিয়ে চিন্তাভাবনা করে সেটা সেলুলয়েডে ধারণের পর যদি বাইরের কেউ এসে সেখানে মাথা ঢোকায় তখন সেটা খুবই বিপজ্জনক। এই পরিস্থিতিতে আমি চলচ্চিত্রের বিশুদ্ধতা/অখণ্ডতা রক্ষায় কাজ করি। আমেরিকান নির্মাতারা মনে করে, কাজের পূর্ণতা আসে সম্পাদনার টেবিলে। এর মানে সম্পাদনায় আপনি শুধু আপনার কাজটাই করবেন তা নয় বরং নির্মাতা যা/যেভাবে শুট করে এনেছে সেটাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এটা আসলে নৈতিকতার বিষয়। ইউরোপে এটা অনেক সহজ, সেখানে আমরা সবাই বুঝতে পারি, কে চলচ্চিত্রের প্রকৃত স্রষ্টা। স্পেনের নির্মাতা, চিত্রনাট্যকাররাও ঠিক তাই। কিন্তু হলিউডে, এটা নির্ভর করে প্রযোজকের ওপর।
পক্ষান্তরে, ইউরোপে তিনিই চলচ্চিত্রের নির্মাতা, যিনি অধিকার ধরে রাখেন। আমার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের প্রতিটা অংশই আমার। কারণ এটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যে পাঁচটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন সেগুলোর মালিক আপনিই। আপনি বলতে পারেন, এগুলো সব আপনারই।
অ্যান্ডারসন : হ্যাঁ, এগুলো সব আমার। আমার প্রথম চলচ্চিত্রটি শেষ করতে গিয়ে এক রকম যুদ্ধ করতে হয়েছিলো। অনেকটা পবিত্র হয়ে ওঠার মতো। আমি সব বিষয়ই শিখেছি। আমার ব্যক্তিসত্তা রক্ষা করা এবং কীভাবে সম্পাদনার ক্ষেত্রে সাবধান থাকতে হয়, তা জানতে প্রথম চলচ্চিত্রে আমার শেখার প্রয়োজন ছিলো। ব্রোকেন ইমব্রেইসেস-এ আপনি দেখে থাকবেন হ্যারি কেইন কতোটা আগ্রহ নিয়ে ‘গার্লস অ্যান্ড স্যুটকেস’ সম্পাদনা করেন। তারপর ১৪ বছর পরে, আপনি দেখলেন সবকিছুই ডিজিটাল হয়ে গেছে।
পেদ্রো : আমি আসলে এসব দেখাতে অনেক বেশি আগ্রহী ছিলাম। আমি সেই মানুষ নই যে, যেখানে সেখানে না জেনে ভক্তি দেবো, তবে মুভিওয়ালা (Moviola, সেলুলয়েড ফিল্ম সম্পাদনার মেশিন) নিয়ে আমি অনেকটা স্মৃতিকাতর হয়ে যাই। আমার প্রথম ১৬টি চলচ্চিত্র এই মেশিনেই সম্পাদনা করা। তাই আমি বিশ্বাস করি, মুভিওয়ালাতেই আপনি সত্যিকার ন্যারেটিভ তুলে ধরতে পারবেন।
অ্যান্ডারসন : আপনি যখন মাউসের একটি ক্লিক এবং পর্দায় বিরক্তিকর কিছু দেখেন-দুটোর সৌন্দর্য নিশ্চয় আপনার কাছে এক নয়।
পেদ্রো : মোটেও এক নয়।
অ্যান্ডারসন : পেনেলোপ যখন সিঁড়িটি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়-ব্রোকেন ইমব্রেইসেস-এ সেটি আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য।
আলমোদোভার : কী বলবো! এটা আমারও খুব পছন্দের একটি দৃশ্য। এই দৃশ্যটিকে ছন্দময় করে তুলতে আমি একই সঙ্গে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে চারটি ক্যামেরা ব্যবহার করি। এর মধ্যে থেকে অবশ্য আমি শুধু একটি ক্যামেরার শট্ বেছে নিয়েছি। এই দৃশ্যে আমার আরেকটি পছন্দের মুহূর্ত হলো, যখন পেনেলোপ সিঁড়ির একদম নিচে নেমে আসেন। এরপর তার কাছ থেকে ছাড়া পেতে দুই কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে এগোতে থাকেন, ঠিক সরীসৃপ প্রাণীর মতো।
সূত্র : https://www.interviewmagazine.com/film/pedro-almodovar; retrieved on: 22.01.18
মো. হারুন-অর-রশিদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ডট রিপোর্ট-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।
harunmcj25@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন