রুবেল পারভেজ
প্রকাশিত ১৯ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ঢাকা অ্যাটাক : অবিচ্ছিন্ন ঢাকায় বিচ্ছিন্ন অ্যাটাক
রুবেল পারভেজ

এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নয়
সৃষ্টির পর থেকে পৃথিবীর অন্যতম আলোচনার বস্তু লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা চিত্রকর্ম মোনালিসা। মোনালিসার ওষ্ঠ কোণের রহস্যময় এক চিলতে হাসি নিয়ে তামাম দুনিয়ায় গভীর গভীর সব ব্যাখ্যা দাঁড়িয়েছে এবং এ নিয়ে যথারীতি পর্যবেক্ষণ চলছে। সময়ের ধারাবাহিকতায় সভ্যতা-রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি ও জ্ঞান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মোনালিসার ওই হাসি নিয়ে মানুষের করা ব্যাখ্যায়ও এসেছে পরিবর্তন। মানুষ তার ‘বর্তমান-ইন্দ্রিয়’ দিয়ে যুগের পর যুগ মোনালিসার হাসিকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করছে। ফলে এটাই স্বাভাবিক, মোনালিসাকে নিয়ে আজ থেকে পাঁচশো বছর আগের করা ব্যাখ্যা-যুক্তি আর আজকের দিনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মিলবে না। মোনালিসার মতো যাবতীয় বিষয়ের ব্যাখ্যাই এভাবে নতুন নতুন সব আলোচনার পথ তৈরি করে। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি বা কোনো মতবাদ নিয়েও যদি বিশ্লেষণ হয়, তাহলে সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে ওই বিষয়সমূহেও যুক্ত হবে নতুন সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ।
এক ভিঞ্চির মোনালিসা স্থির। একজন শিল্পীর গড়া একটি মাত্র স্থির বিষয় নিয়ে নানামাত্রিক আলোচনার একটা তল খুঁজে পাওয়া অতোটা জটিল নয়। বিপরীতে শিল্পীর পরিবর্তিত মন, সময়ের প্রেক্ষাপট, প্রয়োজনীয়তা, এজেন্ডা বাস্তবায়নসহ নানান কারণের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে যদি কোনো নির্মাতা শিল্পের আরেক মাধ্যম চলচ্চিত্রে মোনালিসাকে তুলে আনে, তাহলে চলচ্চিত্রের প্রধান শর্ত গতিশীলতা, সেই ইমেজকে এক বিভ্রমতার মধ্য দিয়ে বিচিত্র ভঙ্গি ও নানামাত্রিক ব্যাখ্যায় হাজির করবে। এবং তাতে স্থিরচিত্রকর্মের চেয়ে অনেক বেশি জটিল বিষয়ের অবতারণা যুক্ত হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
চলতি আলোচনার পথরেখা ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠান পুলিশ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণকে যদি উদাহরণ হিসেবে নিই, তাহলে দেখা যাবে, এদেশে চলচ্চিত্র ইতিহাসের শুরু থেকে নানাভাবে পুলিশ চলচ্চিত্রের পর্দায় আবির্ভূত হয়েছে গৌণভাবে, অর্থাৎ সাবজেক্ট হয়ে বা শুধু পুলিশকে মূল বিষয় ধরে চলচ্চিত্র বানানো হয়নি। তবে যে উপস্থাপনাই হোক না কেনো, চলচ্চিত্রে পুলিশবিষয়ক একটা ‘ধারণা’ দর্শকের মানসপটে এরই মধ্যে গেঁথে গেছে।
‘নেতিবাচক’ অর্থে বাস্তবে যেমন পুলিশের বিরুদ্ধে সমাজের ক্ষমতাশালী লোকদের সঙ্গে আঁতাত ও রাষ্ট্রীয় মদদে সাধারণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উদাহরণ আছে। তেমনই ‘ইতিবাচক’ অর্থেও ‘ভালো’ ও ‘সৎ’ পুলিশের উদাহরণ বিদ্যমান। যার উপস্থাপন অল্পবিস্তর হলেও বাংলা চলচ্চিত্রে বর্তমান। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি চলচ্চিত্র এই ‘অল্পবিস্তর’ শব্দটিকে ভেঙে দিয়েছে। আপাদমস্তক পুলিশের ইতিবাচক বৃত্তান্ত নিয়ে ঢাকা অ্যাটাক নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া এ চলচ্চিত্রটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি দেশ-বিদেশে ব্যবসা করেছে অর্থাৎ সাধারণ মানুষ ঢাকা অ্যাটাক দেখেছে।
উল্লেখ্য যে, প্রায় পাঁচ কোটি টাকায় নির্মিত এ চলচ্চিত্র প্রযোজনার মধ্য দিয়ে প্রথম বারের মতো দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে প্রযোজক হিসেবেও নাম লিখিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে এর চিত্রনাট্য রচনা, সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন ও বেশকিছু প্রপস কস্টিউমও পুলিশের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনী তার ইমেজকে বিশ্বময় করতে যেভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য হলিউডকে নিজেদের ব্যবহৃত হেলিকপ্টার ও অস্ত্র সরবরাহ করে১, ঠিক সেভাবেই ঢাকা অ্যাটাক-এর নির্মাতাকে এসব নানা অনুষঙ্গের যোগান দিয়েছে পুলিশ। এছাড়া এতে পুলিশের বেশকিছু সদস্যও অভিনয় করেছে। এমনকি ঢাকা অ্যাটাক্ল-এর দর্শকের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলো পুলিশ পরিবারের সদস্য। সবমিলিয়ে বলা চলে, পুলিশকে নিয়ে নির্মিত পুলিশের চলচ্চিত্র ঢাকা অ্যাটাক।
এবার তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশ পুলিশের জন্মলগ্নের দীর্ঘ সময় পর কেনো শুধু পুলিশের আধেয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দিলো? কেনো পুলিশই এ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করলো? এবং কীভাবে ও সমষ্টিগত কোন কোন কারণে এ চলচ্চিত্রের জন্য নির্ধারিত একটি গল্পকে বেছে নেওয়া হলো? বিশেষ করে এ চলচ্চিত্রের গল্পে ঢাকা শহরের মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনার ওপর যে হামলার ঘটনাগুলো ঘটেছে তার সঙ্গে বাস্তবে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার মিল আছে কিনা এবং থাকলেও সে হামলাগুলো শুধুই কেনো একজন মানসিক রোগীর দ্বারাই ঘটানো হলো?
অথচ বাস্তবতা বলছে, এ হামলাগুলোর ধরনের সঙ্গে গেলো কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া ‘জঙ্গি হামলা’গুলোর একটা বড়ো ধরনের সাযুজ্য আছে। এমনকি এ চলচ্চিত্রের কিছু জায়গায় ঘটে যাওয়া হামলা ‘জঙ্গি হামলা’ কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে সংবাদমাধ্যম। কিন্তু তাদের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে পুলিশ পুরোপুরি বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। এবং চলচ্চিত্রের পুরো দৃশ্যায়নেও ‘জঙ্গিবাদ’ বিষয়টিকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখে। যদিও চলচ্চিত্রটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটি ঘটনা উপস্থাপনে পুলিশ তার নিজের ত্যাগী ও ইতিবাচক ইমেজ নির্মাণ করতে এতোটুকু ভুল করেনি। অন্যদিকে ঢাকা অ্যাটাক-এর মূল হোতাকে ধরতে গিয়ে সাংবাদিক, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গেও পুলিশের সম্পর্ক ও স্পর্শকাতর কথোপকথন হয়। সেসব কথাবার্তার মাজেজা কী? আর কেনোইবা ঘটা করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম চলচ্চিত্রে পুলিশ এসব কিছু উপস্থাপনের বিরাট আয়োজন করলো? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা এ কারণেও গুরুত্বপূর্ণ যে,
ছবিটির গল্প ও চিত্রনাট্য রচনা করেছেন পুলিশেরই এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা; ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার সানী সানোয়ার। এমনকি এও লক্ষণীয়, তিনি প্রথমে গল্পের নাম দিয়েছিলেন ‘থ্রিল পয়েন্ট’, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা ঢাকা অ্যাটাক নামে পরিবর্তিত হয়। দেড় বছর ধরে সানীসহ ঢাকা ও কলকাতার ১০ জন এ ছবির গল্প ও পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন এবং ১২টি পাণ্ডুলিপি থেকে এ গল্পটি নির্বাচন করা হয়।২
সুতরাং গল্প নির্বাচন থেকে শুরু করে ‘জঙ্গিবাদ’কে এড়িয়ে এতোসব আয়োজন ও সতর্কতার সঙ্গে কেনো সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা এগোলেন, সে বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে। এমনকি বাংলাদেশের ইতিহাসে মুখ ও মুখোশ থেকে শুরু করে অন্যান্য সব চলচ্চিত্রের গল্প নির্বাচনের প্রক্রিয়াতে এ রকম ঘটনা আর একবারের জন্যও ঘটেছে কিনা, তা গবেষণাসাপেক্ষ।
জল পড়ে পাতা নড়ে
ঢাকা অ্যাটাক গোছালো ও পরিচ্ছন্ন একটি গল্প ছাড়াও ‘দৃষ্টিগত-উপস্থাপনা’র অন্যান্য আয়োজনে বহুলাংশে আকর্ষণীয়। চলচ্চিত্রটির অন্যতম আকর্ষণ ক্যামেরা, সম্পাদনা ও আবহসঙ্গীতের ব্যবহার। অ্যাকশনধর্মী কোনো চলচ্চিত্রে যে ধরনের কাজ হওয়া উচিত তার সুচারু প্রয়োগ এতে রয়েছে। অন্যদিকে যে সময় ও প্রেক্ষাপটে পুলিশের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে চলচ্চিত্রটি নির্মিত, সে সময়টিও নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি নির্মাণের কিছু সময় আগে থেকে ও চলাকালীন দেশের নানা প্রান্তে একের পর এক ‘জঙ্গি’ হামলার ঘটনা এবং এ হামলাগুলোর খবর বিশ্বময় হওয়ায় দেশ-বিদেশে মডারেট বাংলাদেশের ইমেজ বিনষ্টের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে এদেশের ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আই এস-এর সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন, এমনকি সরাসরি আই এস-এর সঙ্গে কারো কারো যোগাযোগের বিষয়টি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছিলো তখন। দেখা গেছে, বার বার এ রকম ‘জঙ্গি’ হামলা হওয়া এবং আগে থেকে সে বিষয়ে সতর্ক না থাকতে পারায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে পুলিশ। বলা চলে, দেশীয় যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার চেয়ে এই ‘জঙ্গি বিরোধী’ অভিযানগুলোই পুলিশের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের হয়ে দাঁড়ায়।
চোখ রাখুন, ফিরে আসছি বিজ্ঞাপন বিরতির পর
বিজ্ঞাপন যেহেতু সবখানে তার ‘জরুরি অবস্থা’ জারি রাখে এবং বেশি বেশি বিজ্ঞাপনের সঙ্গী হওয়া এখন যেখানে বিরাট বিরাট প্রতিষ্ঠানের জন্য মর্যাদার কারণ, সেখানে মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করা খুব একটা অপরাধ হবে না নিশ্চয়ই। তাছাড়া যে বিজ্ঞাপনটি এখন হাজির করা হবে, সেটির সঙ্গে পুলিশ প্রপঞ্চটির একটি মিল আছে। কী সে মিল? তাহলে চলুন বিজ্ঞাপনটি প্রচার করি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকা প্রকাশের সময় এর অবস্থান-আদর্শ পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী একটি বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেছিলেন।৩ বহুল আলোচিত সেই বিজ্ঞাপনটি ছিল এমন-
প্রথম দৃশ্যে মাঠের ভিতর থেকে পিচ বাঁধা রাস্তা দিয়ে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিহিত এক বয়স্ক লোক কালো কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধা ছয় জন লোককে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসছে।
দ্বিতীয় দৃশ্যে একটি হাতির সামনে ওই ছয় জনকে দাঁড় করানো হয়। এরপর প্রথমে একজনকে ডেকে সেই বয়স্ক ব্যক্তি বলেন, ‘কি, আমরা ঠিক লিখেছিলাম না, হাতি দেখতে খাম্বার মতো?’
লোকটি কিছু না দেখে বাঁধা চোখেই হাতির পায়ে হাত রেখে পরখ করে হেসে বলেন, ‘হ্যাঁ, হাতি দেখতে খাম্বার মতো’।
এরপর দ্বিতীয় জন হাতির কানে হাত দিয়ে বলে, ‘অবশ্যই, হাতি দেখতে কুলার মতো’।
তৃতীয় জন হাতির সূর ধরে বলেন, ‘হ্যাঁ, পাইপের মতোই তো’।
চতুর্থ জন হাতির দাত ধরে বলেন, ‘তরবারির মতোই তো দেখছি’।
পঞ্চম জন পেটে হাত রেখে-‘হাতি অবধারিতভাবে উঁচু প্রাচীরের মতো’।
সর্বশেষ জন লেজ ধরে বলেন, ‘সব হইলো ফালতু কথা, হাতি হইলো চাবুকের মতো।’
এরপর হাতিটিকে ঘিরে ধরে বাঁধা চোখেই সবাই হাঁটতে থাকে। তো এ বিজ্ঞাপনে যিনি চোখ বাঁধা ছয় জনকে হাতির সামনে দাঁড় করিয়ে এতোসব ভেলকিবাজির আয়োজন করেন, সেই বয়স্ক ব্যক্তিকে যদি আপাততদৃষ্টিতে রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করি; হাতিটিকে যদি পুলিশ হিসেবে ধরি; এবং ওই ছয় জন চোখ বাঁধা ব্যক্তিকে যদি জনগণের সঙ্গে তুলনা করি; তাহলে দেখা যাবে, নিজেকে ন্যায়বিচারক দাবিকারী রাষ্ট্র তার হাত ও চোখ বাঁধা প্রত্যেক নাগরিককে তারই শরীরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুলিশ সম্পর্কে যেভাবে ধারণা দেয় ও হাজির করে, ঠিক সেভাবেই সেই সব চোখ বাঁধা নাগরিক তাদের অভিজ্ঞতা ভেদে পুলিশকে নিয়ে নিজেদের মানসপটে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা পোষণ করে। এখন প্রশ্ন, ওই বিজ্ঞাপনের হাতিটি যদি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেই নিজেকে পরখ করতে ও করাতে চায়-সত্যিই সে দেখতে কেমন ও কীভাবে অন্যরা তাকে দেখবে, তাহলে? তারপর হাতিকে অনুকরণ করে একইভাবে পুলিশও যদি আপামর জনগণের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করতে চায় এবং নিজের একটি ইমেজ পুনর্নির্মাণ করে সেটিওবা কেমন হয়?
ঢাকা অ্যাটাক-এ মূলত পুলিশ নিজেই নিজেকে দেখতে বা দেখাতে চেয়েছে, সে আসলে কেমন। এবং সে বাকি সবার কাছে কী রূপে হাজির হতে ইচ্ছুক। তাহলে চলুন, পুলিশ নিজেকে যেভাবে ঢাকা অ্যাটাক-এ পুনর্নির্মাণ করেছে, সে আলোচনা শুরু করা যাক। তবে তার আগে পুলিশের ইতিহাস সংক্ষেপে চোখ বুলিয়ে নিই।
‘the more we can look backward, the more we can look forward’৪
‘মানবসমাজ তার নিজের সতর্কতার সত্তারূপে আদি ক্ষেত-প্রহরীর জন্ম দিয়েছিল সেই সুপ্রাচীনকালে। সেই ক্ষেত-প্রহরী, কালের ও সমাজের বিবর্তনের সমান্তরালে ক্রমান্বয়ে বিবর্তিত হয়েছে।’৫ এভাবে ভূখণ্ডের চেহারা যতো বেশি রাষ্ট্রের আকার পেয়েছে, রাষ্ট্রের ধারণা যতো বেশি জটিল ও আধুনিক হয়ে উঠেছে ঠিক ততোভাবেই আদি ক্ষেত-প্রহরীদের দায়িত্বে ও তাদের স্বনামে যোগ হয়েছে নতুন নতুন মাত্রা। আর দায়িত্ব পালনের এতোসব বিচিত্র কারণে সেই প্রহরীরা ‘আজকের পুলিশ, মিলিটারি, সীমা সুরক্ষা বাহিনী, রেলপুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ ইত্যাদি শত শত রূপে রূপান্তরিত হয়ে গেছে, হয়ে যাচ্ছে।’৬ মূলত প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র নিজেকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দুটি স্তম্ভের জন্ম দিয়েছিলো-এক. শাসক; দুই. রক্ষক। শাসক তার প্রধান যোগ্যতা জ্ঞান দিয়ে এবং রক্ষক/পুলিশ, যে কিনা বল ও সাহস দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং তা রক্ষার দায়িত্বটি সুচারুভাবে পালন করে। অন্যদিকে মিশেল ফুকো রাজনৈতিক ক্ষমতার তিনটি মাত্রা সার্বভৌমত্ব, অনুশাসন ও প্রশাসনিকতা উল্লেখ করেছেন। তার প্রথম মাত্রা সার্বভৌমত্বের ভিতর পড়ে পুলিশ দিয়ে রাষ্ট্র চালানোর এ ব্যবস্থাটি। তবে পুলিশ যে শুধু তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ‘ইচ্ছেমতো’ পালন করে, তা নয়। তার ‘সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে আইন প্রণয়ন, সেই আইনের প্রয়োগ এবং আইন লঙ্ঘিত হলে লঙ্ঘনকারীকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে। এই অর্থে সার্বভৌমের আরেক অর্থ দণ্ড।’৭ মূলত ‘অপরাধী’কে আইনের আওতায় আনা এবং দণ্ড দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটাই পালন করে পুলিশ।
এ পথ ধরে বাংলার বা ভারতবর্ষে পুলিশিব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, সে বর্ণনা করা যাক। ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রাচীন যুগের পুলিশিব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই সামরিক ও আধাসামরিক বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কর্ম-ফিরিস্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলো। এ প্রবণতা কমবেশি মধ্যযুগেও প্রত্যক্ষ করা গেছে। তবে প্রাচীন যুগের ক্ষেত্রে প্রধান পার্থক্য ছিলো, যুগের প্রয়োজনে তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতোটা অবনতিশীল ও নাজুক না হওয়ায় পুলিশি কাজের জন্য একক ও আলাদা বিভাগের উপযোগিতা অতোটা অনুভূত হয়নি। বরং বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ ও নতুন ভূখণ্ড জয়ের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র যে সামরিক বাহিনী পোষণ করতো, তাদের দিয়েই দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও শান্তি স্থাপনের কাজ চালিয়ে নিতো। তারপরও ভারতবর্ষীয় প্রেক্ষাপটে মৌর্যযুগে এবং বাংলায় গুপ্ত-পাল-সেন প্রভৃতি শাসকদের রাজত্বকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দেখভাল ও তদারকির জন্য দু-একটি দপ্তর ও এর সঙ্গে জড়িত আধিকারিকগণ কাজ করতো।
মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশ রাজত্বকালেই পুলিশিব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে। আধুনিক যুগে অর্থাৎ ইংরেজ আমলে বিদ্যমান মোগল-নবাবী ব্যবস্থা ও প্রশাসনের ওপর ভিত্তি করে প্রথমে ওয়ারেন হেস্টিংস পুলিশিব্যবস্থা চালু করেন। পরবর্তী সময়ে নানা প্রয়োজনের উন্মেষ ঘটায় পুলিশিব্যবস্থা ও প্রশাসন সংস্কার জরুরি হয়ে পড়ে। এরপর পুলিশিব্যবস্থা পরিবর্তনে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ ও কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলেন লর্ড মার্কুইস কর্নওয়ালিশ। বস্তুত তিনি আধুনিক বাংলার তথা ভারতীয় পুলিশিব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর রচনা করেছিলেন। যা কিনা ব্যবহৃত হয়েছিলো বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থাকে আরো সুচারুরূপে বিস্তৃত করতে। যদিও বৃটিশ স্বার্থকে লালন করতে গিয়ে দীর্ঘসময় ধরে চলা কর্নওয়ালিসের সেই আধুনিক পুলিশিব্যবস্থাও এ অঞ্চলের নাগরিকদের কাছে একটা সময় ভীতিকর হয়ে ওঠে। জানা যায়, ‘পুলিশের মধ্যে তখনও নানাবিধ অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং সাধারণ প্রশাসন ও ফৌজদারি বিচার বিভাগের সঙ্গে তাদের প্রত্যাশিত সুসম্পর্কের বদলে প্রায়শ শীতল সম্পর্ক ও ক্ষেত্রত সমন্বয়হীনতা এবং সর্বোপরি জনগণের মধ্যে পুলিশি গ্রহণযোগ্যতা প্রায় শুন্যের কোঠায় তথা নিতান্ত কম থাকায় সরকার চেয়েছিল বিদ্যমান অবস্থার পুনর্মূল্যায়ন।’৮ সেজন্যই ১৯০২-১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জনের সময়ে আরেকটি সর্বভারতীয় পুলিশ কমিশন গঠন করা হয়।
এভাবে বৃটিশ রাজত্বের অবসান, দেশভাগ ও স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের পর পুলিশিব্যবস্থা সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। বলা চলে, রাষ্ট্রের চরিত্র ও জনগণের চেতনার ওপর ভিত্তি করে পুলিশি কর্মকাণ্ডে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয়। তবে রাষ্ট্র তার স্বার্থ হাসিলের জন্য যতো বেশি সাধারণ নাগরিকদের পাশ কাটিয়ে ব্যবসায়ী, ক্ষমতাধরদের সঙ্গে আঁতাত করেছে, ততোই সাধারণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কারণ রাষ্ট্র নিজেকে রক্ষায় বরাবরই সামনে ঠেলে দিয়েছে পুলিশকে। এর উদাহরণ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে গঠিত শিল্পপুলিশ দিয়েও দেওয়া যেতে পারে। শ্রমিকের শ্রম শোষণ করে গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে, রেমিট্যান্স বেড়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার মজবুত হচ্ছে। কিন্তু যাদের দিয়ে এতোকিছু, সেই শ্রমিকের ন্যায্য দাবির পক্ষে সংগঠিত আন্দোলনকে প্রতিহত করতে এবং শিল্প কারখানায় ‘অস্থিতিশীলতা’ ঠেকানোর নামে শিল্পপুলিশের উদ্ভব ঘটানো হয় এবং তাদের দিয়েই ন্যায্য দাবির পক্ষে আন্দোলনরত শ্রমিকের ওপর হামলা চালানো হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র হয়তো নিজেকে ও তার ব্যবসায়ী বন্ধুদের নিরাপদ রাখতে পারছে। কিন্তু পুলিশ ঠিকই জনগণের কাছে নেতিবাচকভাবেই হাজির হয়। এর কারণ, যেহেতু রাষ্ট্র নিজেকে আড়ালে রেখে তার রক্ষক পুলিশকে সামনে ঠেলে দিচ্ছে সেহেতু সাধারণ জনগণের চেতনায় শুধু পুলিশের নেতিবাচক ইমেজই তৈরি হয়।
তুমি খাবা আমি খাবো না, তা হবে না, তা হবে না
এখন রাষ্ট্র যেহেতু পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে নিজেকে সুরক্ষিত রাখছে এবং পুলিশও দেখছে রাষ্ট্র আখেরে ভালো আছে; সেহেতু রাষ্ট্রের কাছে তার বিশেষ কিছু আবদার থাকতেই পারে। ফলে পুলিশ বাহিনীর কেউ কেউ এ সুযোগটি কাজে লাগায় এবং বিভিন্ন অপরাধ ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। যেহেতু এসব ঘটনা সাধারণ নাগরিকদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়, সেহেতু পুলিশের ইমেজ নির্মাণ আরো নেতিবাচকভাবেই হয়।
গত কয়েক বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, চাঁদাবাজি, ঘুষগ্রহণসহ নানাবিধ কার্যকলাপের সঙ্গে পুলিশ বেশি পরিমাণে লিপ্ত হয়েছে, ফলত পুলিশ নিয়ে জনগণের নাভিশ্বাসও চরমে। বিশেষ করে ঘুষকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিশেষ ‘খ্যাতি’ অর্জন করেছে এ বাহিনী। গবেষণা প্রতিষ্ঠান টি আই বি’র প্রতিবেদন বলছে, ‘পুলিশ বলপূর্বক অর্থ আদায় বা ঘুষের সাথে ব্যাপকভাবে জড়িত। ... গবেষণায় ৭০ শতাংশ মানুষই বলেছেন ঘুষ না দিলে কোন সেবাই পাওয়া যাবে না।’৯ এছাড়া রাজনৈতিক দলের সঙ্গী হয়ে অপহরণ-হত্যারও অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক হিসাব বলছে, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘চরম উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংস্থাটির হিসেবে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ‘আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ কিংবা রহস্যজনক নিখোঁজ হয়েছে মোট ৯১ জন। এর (মধ্যে) ফিরে এসেছে বা খোঁজ পাওয়া গেছে মাত্র ২৬ জনের।’১০ সবমিলিয়ে আজ পুলিশ নিয়ে সমাজে এ রকম নেতিবাচক ধারণাই বেশি প্রতিষ্ঠিত। হয়তো এ নেতিবাচক ইমেজ থেকে বের হয়ে আসতেই প্রয়োজন পড়ে ঢাকা অ্যাটাক নির্মাণের।
কেমন গল্প ঢাকা অ্যাটাক-এর
অপরাধজগতের ক্ষমতাধর এক নেতা দিয়ে একটি কেমিকাল ফ্যাক্টরিতে হামলা চালিয়ে কয়েক জনকে হত্যা করে এবং কিছু কেমিকাল নিয়ে যায়। পুলিশ এ ঘটনার সূত্র খুঁজতে যখন হয়রান, তখন ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে একের পর হামলা, বোমা হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে। এরপর এসব হামলার সঙ্গে জড়িতদের ধরতে ব্যক্তিগত আবেগ অনুভূতিকে বিসর্জন দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা মরিয়া হয়ে ওঠে। যদিও তাদের এতোসব প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সংবাদমাধ্যমগুলোও মরিয়া হয়ে ওঠে। বিশেষ করে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক চৈতি এ ঘটনার সঙ্গে ‘জঙ্গিবাদী’ কোনো ঘটনার সূত্রপাত আছে কি না, এমন প্রশ্ন তোলেন এবং তিনি নিজেও ‘অনুসন্ধান’ শুরু করেন।
পুলিশ-সাংবাদিক সবাই মিলে শেষ পর্যন্ত জানতে পারে, ঢাকায় এ যাবৎ যতোগুলো সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, সবগুলোই করেছে একজন মানসিক রোগী। শৈশবে ঘটে যাওয়া পারিবারিক সঙ্কট এবং চাচা হাসনাত করিমের (গুলশানে হলি আর্টিজান ক্যাফেতে হামলার সময় হাসনাত করিম নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে ‘জঙ্গি’দের নেতা হিসেবে সন্দেহভাজনের তালিকায় রাখা হয়েছিলো। পরে অবশ্য হাসনাত করিম, তথ্য প্রমাণ দিয়ে সে ঘটনা থেকে আপাতত নিস্তার পেয়েছেন। তার নামের সঙ্গে মূলত জিসানের বিশ্বাসঘাতক চাচার নামের হুবহু মিল রয়েছে) প্ররোচনায় জিসান নামের এই মানসিক রোগী তার বাবা-মাকে হত্যা করেন। একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, সম্পত্তির লোভে তার চাচা তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে চাইছে। এরপর জিসান শহর ছেড়ে ভারত হয়ে মালয়েশিয়ায় চলে যান। সেখানে গিয়ে চাচার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজেকে তৈরির পণ করেন এবং যোগ দেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে; জিসান হয়ে ওঠেন অপরাধজগতের দুর্ধর্ষ নেতা। শুধু পারিবারিক কারণে জিসান এমন দুর্ধর্ষ হলেও তার প্রতিশোধের বলি হয়, দেশের সাধারণ মানুষ, পুলিশ ও সাংবাদিক। এমনকি দোয়েল চত্বরের মতো জাতীয় স্থাপনায় হামলা চালানো থেকে শুরু করে বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত পতাকা তৈরির উৎসবে হাজারো শিশুর ওপর বোমা হামলার পরিকল্পনাও করেন তিনি। একপর্যায়ে মালয়েশিয়া পুলিশের সহায়তা এবং নিজেদের প্রাণপণ চেষ্টায় বাংলাদেশের পুলিশ সক্ষম হয় জিসান ও তার ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপ থামাতে।
কোথায় হরিদ্বার, কোথায় গৃহদ্বার
“সভ্যতার সেই ঊষা লগ্ন থেকে সবদেশেই অভ্যন্তরীণ শান্তি তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় এক শ্রেণীর তুলনামূলকভাবে শক্ত-সমর্থ দেহী লোকজন কাজ করত। দেশ ও স্থান বিশেষে এদের নাম ছিল বিভিন্ন। কালক্রমে মূলত ‘পুলিশ’ নামেই এরা রাষ্ট্রের একটি নিয়মিত ও অপরিহার্য প্রশিক্ষিত বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল।”১১ এর মানে দাঁড়ায়, শক্ত-সমর্থ পুলিশ নামের এ প্রশিক্ষিত বাহিনী দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় দুর্দান্ত সফল এবং ত্যাগ স্বীকার করে তারা এ কর্তব্যটি পালন করে যায় নিয়মিত। ঢাকা অ্যাটাক-এ এ আলামতই মেলে। দেখা যায়, চলচ্চিত্র শুরুর কয়েক মিনিটের মাথায় দেশ বোমা হামলার ঝুঁকিতে আছে, এমন প্রসঙ্গ তুলে পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের প্রধান আবিদ রহমানকে যখন টেলিভিশন সাংবাদিক চৈতি বলছেন, ‘পুলিশকে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে না।’ প্রত্যুত্তরে আবিদ বলেন, ‘আপনি যখন গরমের দিনে এসির নিচে নরম বিছানা অথবা শীতের দিনে গরম বিছানায় যখন আরাম করে কাঁথা মুড়ে শুয়ে থাকেন, তখন আপনার গলির মাথায় দাঁড়িয়ে কোনো না কোনো পুলিশ আপনাকে পাহারা দিচ্ছে। সো দয়া করে এমন বলবেন না যে, পুলিশ প্রস্তুত নয়।’
যদিও তার দৃঢ় এ বক্তব্যের প্রমাণ চলচ্চিত্রের শুরু থেকে পাওয়া যায় না। কারণ তার এ বক্তব্যের আগেই তিন জন নাগরিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এবং কীভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তাও জানাতে পারে না পুলিশ। ফলে চলচ্চিত্রের শুরুতেই পুলিশ কর্মকর্তা আবিদ দৃঢ়চিত্তে পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ে যে বক্তব্য দেন, তার কোনো মিল পাওয়া যায় না গল্পের শুরুর সঙ্গে। অর্থাৎ শুরুতেই ধরে নিতে হয়, পুলিশ তার ব্যর্থতা স্বীকারের চেয়ে নিজের সফলতাকে তুলে ধরতে বেশি সজাগ। তাছাড়া সাংবিধানিক ও গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশের দায়িত্বই যেখানে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেখানে ঢাকা অ্যাটাক-এর শুরুতেই তিনটি হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে না পারার ব্যর্থতা পুলিশের স্বীকার করার কথা। কিন্তু ঘটেছে উল্টো।
আমার আমি নাই রে ...
সমাজের ‘স্বাভাবিক’ পরিবেশ বজায় রাখতে ও বিশেষ সময়ে বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্র নিজেই পাগল-উন্মাদ সৃষ্টি করে।১২ অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র টুয়েলভ ইয়ারস অ্যা স্লেভ -এ হিংস্র দাসপ্রভূ এডউইন এপ্স একজন উন্মাদ, মানসিক বিকারগ্রস্ত। যিনি প্রায় পুরো চলচ্চিত্রে দাসদের ওপর মারধর, ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড বজায় রাখেন। যে ব্যক্তি দাসদের ওপর এমন নির্মম আচরণ করেছে, সেই দাসপ্রভূ এপ্সকে পাগল আর মানসিক বিকারগ্রস্ত চরিত্রে উপস্থাপন করে মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়!
টুয়েলভ ইয়ারস অ্যা স্লেভ-এর পথ ধরে ঢাকা অ্যাটাক নিয়ে কথা বলা যায়। এ চলচ্চিত্রের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একজন ব্যক্তির পরিকল্পনায় অসংখ্য হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটে। যিনি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে এতোটাই ঝানু হন যে, তিনি বিশেষ কায়দায় বোমা বানান, যা দিয়ে শত শত মানুষ মেরে ফেলা ও বড়ো বড়ো স্থাপনা ভেঙে ফেলা সম্ভব। এই ব্যক্তি এমনই এক মানসিকতার অধিকারী, যিনি কিনা নিজের দেশের জাতীয় সব স্থাপনায় হামলা চালান; বোমা মেরে শিশুদের হত্যা করে নগ্ন আনন্দ উপভোগ করেন। জিসান নামের এই ব্যক্তিকে ধরতে এককথায় পুলিশের দম যায় যায় অবস্থা। কোনো উপায় না পেয়ে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট থেকে সবচেয়ে দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ বাহিনী পর্যন্ত গঠন করতে হয়। শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়া পুলিশের সহায়তা ও নিজেদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় জিসানকে পাকড়াও করতে সক্ষম হয় পুলিশ। চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ও বুদ্ধিমত্তার বহিঃপ্রকাশ অনুযায়ী, স্বাভাবিকভাবেই জিসান সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি মেধাবী। এছাড়া তিনি যেভাবে দেশসেরা পুলিশ কর্মকর্তাদের চোখে ধুলো দিয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় একের পর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালান এবং চাতুরীর আশ্রয় নেন, তাতে তাকে একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ বলা ছাড়া উপায় নেই।
কিন্তু অবাক করার ব্যাপার, পুলিশের তদন্তেই বেরিয়ে আসে, জিসান মানসিক বিকারগ্রস্ত। ছোটোবেলা থেকেই পারিবারিক নানা কারণে তিনি বিপর্যস্ত ও নৃশংস মানসিকতার অধিকারী। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা সাজেদুল করিমের তদন্তের সঙ্গেও এ কথার প্রমাণ মেলে-‘নৃশংসতায় মজা পেতো জিসান। বাবা পাওয়ারফুল হওয়ার কারণে তার সব অপরাধ ঢাকা পড়ে যেতো। জিসানের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর বাবার সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে জিসানের। জিসানের জীবনের সবচেয়ে বড়ো শত্রু হয়ে ওঠে তার (সৎ) মা।’ এখন তাই দর্শক হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যে ব্যক্তি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত, যে পুরো দেশ, দেশের পতাকা-মানচিত্র-ঐতিহ্যের ওপর হামলা চালায়, যে ব্যক্তি এতো ভয়ঙ্কর কিছুর অবতারণা করে-তার সবগুলোই কি শুধু শৈশবের মানসিক বিকারগ্রস্ততা ও পারিবারিক জিঘাংসার জায়গা থেকে? সম্পত্তি দখলের স্বার্থে যে চাচা তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করে, সেই ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে ও প্রতিশোধ নিতে?
ধরে নিলাম, জিসান পারিবারিক কারণেই সন্ত্রাসী হয়ে উঠেছে। যদি তাই হয়, তাহলে তিনি তো চাইলেই এসব কিছুর জন্য দায়ী তার চাচা হাসনাত করিমকে শুরুতেই হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। তার চাচাকে হত্যা করা তার জন্য মোটেও কঠিন কিছু ছিলো না। এমনও দেখা গেছে, তিনি তার চাচার চলাফেরার জায়গাগুলো চেনেন এবং সেরকমই একটি জায়গায় তাকে হত্যা করেন। অথচ যুক্তিহীনভাবে পুরো চলচ্চিত্রে যে বোমা হামলাগুলো দেখানো হয়, তার একটিও জিসান তার চাচাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেননি। তাহলে বোমা হামলা চালিয়ে তিনি শুরু থেকেই সারাদেশ ধ্বংস করতে মেতে উঠলেন কেনো? এও লক্ষণীয় যে, জিসান বোমা হামলা চালিয়েছেন দোয়েল চত্বরসহ ঢাকা শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনাতে। এ স্থাপনাগুলোর সঙ্গে অবশ্যই ব্যক্তির আদর্শ ও জাতীয় চেতনা খুবই গুরুত্বপূর্ণভাবে জড়িত থাকার কথা। হামলার এ ধরনগুলো পর্যালোচনা করে আল-কায়দা, আই এস কিংবা অন্য কোনো উগ্র ধর্মভিত্তিক কিছু সংগঠনের দিকে আঙুল তোলার কথা পুলিশের। কারণ ওই সমস্ত সংগঠনগুলোর বেশিভাগ মতাদর্শই বাংলাদেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতীক হিসেবে দোয়েলের মতো ভাস্কর্যের বিরোধী। তাছাড়া বাংলাদেশে এ যাবৎ যতো বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে, তার বেশির ভাগের সঙ্গেও এ রকম দলগুলোর সম্পৃক্ততার অভিযোগ ও প্রমাণাদি আছে। জানা যায়,
বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার সূচনা হয় ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে। হুজি (হরকাতুল জিহাদ) প্রথম হামলা করেছিল কবি শামসুর রাহমানের ওপর। তবে সে বছরেরই মার্চে বড় আকারে প্রথম বোমা হামলা হয় যশোরের উদীচী সমাবেশে। এ হামলায় ১০ জন নিহত এবং ১৫০ জনের বেশি আহত হয়েছিল। উদীচীর রেশ কাটতে না কাটতে খুলনা শহরে আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলায় ৮ জন নিহত হয়। ২০০১ খ্রিস্টাব্দের শুরুতেই রাজধানীর পল্টন ময়দানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশে বোমা হামলা হয়েছিল। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন এবং পরে একজন হাসপাতালে মারা যান। তিন মাস না পেরুতেই রমনার বটমূলে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হয়েছিল।১৩
এমনকি ২০০০ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই ‘গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় সমাবেশস্থলের কাছে শক্তিশালী বোমা পুঁতে রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল জঙ্গিরা। এরপর আরও অন্তত তিনবার একই চেষ্টা করে তারা।’১৪
মোটামুটি তারপর থেকে গেল ১৮ বছরে নিয়মিতভাবে অসংখ্য বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং এর বেশির ভাগের সঙ্গে দেশ-বিদেশি সমর্থনের অভিযোগ আছে। বিশেষ করে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে গুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফেতে যে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছিলো এবং হামলাকারীরা নিজেরাই আই এস-এ উদ্বুদ্ধ হয়ে এমন ‘জঙ্গি’ হামলা চালায় বলে দাবি করেছিলো এবং এতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাই আক্রান্ত ও নিহত হয়। তাছাড়া এসব হামলার ধরন দেখে এখন পর্যন্ত গণমাধ্যম কিংবা অন্য কোনো জায়গায় এমন কোনো কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি যে, এ হামলাগুলোর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন একক কোনো ব্যক্তি দায়ী এবং কেবল একজন ব্যক্তি তার স্বতঃপ্রণোদিত ইচ্ছাতেই এসব হামলা সংগঠিত করেছেন; যা শুধুই তার পারিবারিক মনোবেদনা ও প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাবের জায়গা থেকে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ঢাকা অ্যাটাক-এর প্রধান ও একমাত্র ‘সন্ত্রাসী’ জিসানকে ঢাকা শহরব্যাপী চালানো হামলার হোতা হিসেবে একজন ‘ইউটোপিয়ান’ ব্যক্তি হিসেবে হাজির করেছে পুলিশ।
সমাজের দর্পণ ও গণমাধ্যমের দায়িত্বের জায়গা থেকে বোমা হামলার এ ঘটনাগুলোকে যুক্তিসঙ্গতভাবে উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্ত্বেও পুরো চলচ্চিত্রের কোথাও এ রকম কোনো বিষয়ের ছিটেফোঁটা উল্লেখ নেই। তাহলে কি নির্মাতা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এতো সব বোমা হামলার আয়োজন করেছেন? এতে কার লাভ? আর কেনোইবা পুরো বিষয়টি আড়াল করা হয়েছে? অবশ্য আড়ালইবা কেনো করবেন না? কারণ বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ইতালিয়ান নাগরিক সিজার তাভেলা হত্যা থেকে শুরু করে ঢাকা অ্যাটাকের মতো হামলার ঘটনাগুলোকে, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের দ্বারা সংগঠিত হয়েছে বা হচ্ছে, তা স্বীকার করতে নারাজ। এই নারাজের হেতু কী হতে পারে? এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্তাব্যক্তির বক্তব্যে চোখ রাখতে চাই। তিনি বলছেন, ‘আমরা যতো জঙ্গিকে ধরছি এখন, সবগুলো মাদ্রাসার ছাত্র কিন্তু নয় এরা। ... এখন যতো জঙ্গি ধরা হচ্ছে, এরা সবাই অন্য শিক্ষায় শিক্ষিত। কিন্তু নামকরণটা আপনাদের (কথাটি বলার সময় তিনি আলেম ও মাদ্রাসা ছাত্রদের দিকে ইঙ্গিত করে আঙুল তুলেছিলেন) হচ্ছে।’১৫ ঢাকা অ্যাটাক-এর জিসানকে জঙ্গি হিসেবে হাজির না করা হলেও পুলিশের ঊর্ধ্বতন এই কর্তার ‘সংজ্ঞায়িত জঙ্গি’র সঙ্গে তার সবকিছুরই মিল খুঁজে পাওয়া যায়, শুধু ‘ধর্মভিত্তিক জঙ্গি মতাদর্শ’ ছাড়া। দেখা যায়, ‘জঙ্গি’দের মতোই দুর্ধর্ষ, ভয়াবহ ও খুনি চরিত্রের অধিকারী জিসান। বোমা বানিয়ে তার হামলা চালানোর কৌশলের পুরোটাই ‘জঙ্গি’দের কৌশলের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। খানিক ক্ষেত্রে জিসান অনেক বেশি এগিয়ে।
এখন প্রশ্ন, পাশ্চাত্যের তোলা দাড়ি, টুপি, মাদ্রাসাসমেত ‘জঙ্গি’র প্রচলিত ডিসকোর্স থেকে হঠাৎই কেনো বের হতে চাইছে পুলিশ? আর কেনোইবা এদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর কোনো প্রভাব বা সম্পর্ককে বার বারই অস্বীকার করছে তারা? এ নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে দেশের মধ্যে জঙ্গি নেই বলে ঘোষণা দেওয়া, এমনকি জঙ্গি মিডিয়ার সৃষ্টি-এ ধরনের কথাও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে বার বার প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু সেই ভোল উল্টে দিয়ে বর্তমানে ঘটা করে প্রচার করা হচ্ছে আই এস বা আল-কায়দার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ‘জঙ্গি’ নয়, শুধু ‘দেশীয় জঙ্গি’র অস্তিত্ব রয়েছে দেশে। এমনকি সড়কের পাশে ট্রাফিক পুলিশের ছাউনিতেও এখন জঙ্গিবিরোধী স্লোগান লেখা দেখতে পাওয়া যায়। তাহলে এখন কেনো রাষ্ট্রের ‘দেশীয় জঙ্গি’ নিয়ে এতো হাঁকডাক? নাকি নিজেকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এভাবে ‘দেশীয় জঙ্গি’র উপস্থিতি দরকার?
অবশ্য এই ‘দেশীয় জঙ্গি’র উপস্থিতি থাকলে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হওয়ার কিছু সুযোগ তৈরি হয়। যেমন, একদিকে ‘দেশীয় জঙ্গি ধরা’র মধ্য দিয়ে বিদেশি মতাদর্শের জঙ্গির সংশ্লিষ্টতাকে অস্বীকার করা সহজ হয়। আবার নিজেদের বিরুদ্ধমত ও স্বার্থবিরোধী লোকদেরও ‘জঙ্গি’ বলে চালিয়ে দেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। এ কারণেই কি তাহলে পুলিশ নিজেই রাষ্ট্রের ফরমান জারি রাখতে গিয়ে নতুন নতুন ‘দেশীয় জঙ্গি’র সন্ধান পায়। যদিও ঢাকা অ্যাটাক-এ সে গল্পের পুরোটাই অনুপস্থিত। কারণ ঢাকা অ্যাটাক-এর সন্ত্রাসী এতোটাই দক্ষ যে, তাকে যদি জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে মূল আঘাতটা লাগবে রাষ্ট্রের গায়ে, পুলিশের নয়। কারণ রাষ্ট্র নিজেই দাম্ভিকতার সঙ্গে বলছে, ‘এখানে কিছু উগ্রবাদী (দেশীয়) জঙ্গিরা আছে। সেগুলো সবসময় আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে।’ সে কারণেই হয়তো জিসানের দ্বারা সংগঠিত হামলাগুলোকে পারিবারিক ঘটনা এবং জিসানকে মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে হাজির করা হয়।
গণমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম = সঙ মাধ্যম
টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদপত্র কিংবা রেডিওর মতো গণমাধ্যমগুলো (কিছুক্ষেত্রে কারখানা বলা যেতে পারে) কোনোভাবেই গণমাধ্যম/সংবাদ শ্রমিকের স্বেচ্ছাশ্রমে চলে না। আবার হাওয়া খেয়েও টিকে থাকা সম্ভব নয় তাদের। তাহলে কীভাবে চলে? সোজাভাবে বললে, গণমাধ্যম চলে টাকায়। তা সে বিজ্ঞাপন থেকে আয় হোক, আর কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যমূলক বিনিয়োগের মাধ্যমেই হোক। উত্তর একটাই, পুঁজির সরবরাহকারীরাই গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পুঁজিপক্ষ তার বিনিয়োগকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে চাইবে, এতে দোষের কিছু নেই। কারণ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সংবাদ/আধেয়/পণ্য হিসেবে যিনি বা যারা গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে, তাদের কাছে কোনো আদর্শ/মতাদর্শের চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা বাস্তবায়ন। বলতে গেলে এজেন্ডার চরিত্রই গণমাধ্যমের চরিত্র।
এদিকে পুঁজি দিয়ে মালিকপক্ষ তার দায় সারলেও গণমাধ্যমকে সক্রিয় রাখতে ও মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বগুলো প্রত্যক্ষভাবে পালন করে কিন্তু গণমাধ্যম কর্মী বা সংবাদ শ্রমিকরাই। তাদের সরবরাহ করা আধেয়ই সংবাদ/পণ্য আকারে পাঠক/ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। যে কারণে সংবাদ নিয়ে যেকোনো প্রতিক্রিয়া সমালোচনা স্ব স্ব সংবাদ শ্রমিককেই মোকাবিলা করতে হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে সংবাদ শ্রমিককে তো তার নির্মিত আধেয় প্রকাশের পরই আরেক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। দেখা যায়, কোনো সংবাদ কারো বিরুদ্ধে গেলেই সংবাদ শ্রমিকের ওপর নেমে আসে হত্যার মতো অসংখ্য খড়গ। এমনটি ঘটানোর ক্ষেত্রে পরিমাণগত দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেক দেশকেই টপকে গেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক ২০১৮’র প্রতিবেদনে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। জানা যায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের অধিকার প্রশ্নে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। সংস্থাটির পরিসংখ্যান বলছে, ‘১৮০ দেশের ওই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম। গত বছর বাংলাদেশ একই অবস্থানে থাকলেও নেতিবাচক সূচকে পরিস্থিতি আগের চাইতে খারাপ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবারের নেতিবাচক সূচক বেড়েছে দশমিক দুই-ছয় শতাংশ।’১৬ তাদের তথ্যমতে, ‘২০১৭ সালে বাংলাদেশে অন্তত ২৫ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ওপর সহিংসতা এবং এর পেছনে দায়ী ব্যক্তিরা সহজে রেহাই পাওয়ায় গণমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ বেড়েই চলছে ...।’১৭ এর চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবাদ শ্রমিকের এতো আয়োজন ছাড়াও সরকার গণমাধ্যম আইন সংশোধনের পরিবর্তে, চলতি বছর নতুন একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেন। সেখানে ভিন্নমত দমনে কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে এতোসব হুমকি, বাঁধার মুখে দিন দিন সংবাদ শ্রমিকেরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে এবং অনেকেই সেল্ফ সেন্সরড হয়ে গেছে। অর্থাৎ সংবাদ শ্রমিক নিজ থেকেই সংবাদ লেখার আগে সাবধান হয়ে যায় যে, কী কী বিষয় তাকে এড়িয়ে যেতে হবে। এর ফলে ইদানীং অনুসন্ধানী সংবাদের চাইতে সংবাদবিজ্ঞপ্তি প্রচারের দিকেও বেশি নজর দিচ্ছে গণমাধ্যম। এর মানে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে পাঠানো সংশ্লিষ্ট কোনো আধেয় যাচাই-বাছাই না করে, সেই ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের লেখা বিজ্ঞপ্তিকে সত্যি ধরেই সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করে দেয় সংবাদমাধ্যম। এছাড়া সংবাদ শ্রমিকদের একটি উচ্চবর্গীয় শ্রেণি এতোকিছুর সঙ্গেও যায় না। তারা সোজাসুজি ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ অবলম্বন করে এবং নিজের উদর পূর্তি করে। কারণ এসব না করলে যে চাকরি থাকবে না! এতে করে তাবেদারিও হবে আবার পদ-পদবি পেয়ে নিজের ভবিষ্যৎও নিশ্চিত হবে।
ঢাকা অ্যাটাক-এর অন্যতম প্রধান চরিত্র চৈতি। তিনি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদক। যিনি ‘সন্ত্রাসী’ হামলায় ঢাকা বিপর্যস্ত হওয়ার পর থেকে শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও নিজের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত অপরাধবিষয়ক সংবাদ সরবরাহের কাজটি করেন। সঙ্গত কারণে চলচ্চিত্রে চৈতি পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথোপকথন ও প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন। এছাড়া যেকোনো হামলার পর পরই টেলিভিশন লাইভে এসে ঢাকা অ্যাটাক নিয়ে তিনি সর্বশেষ তথ্য সম্প্রচার করেন। এখন স্বাভাবিকভাবেই জানার আগ্রহ জাগে যে, দেশের সংবাদমাধ্যম ও সংবাদ শ্রমিকের ওপর যে বিধিনিষেধ ও সেন্সরশিপ আরোপ হয়ে আছে, যেখানে চাইলেই কি চৈতির মতো একজন সংবাদকর্মী প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে পারে? আর যদি পারেনও, তাতে তিনি নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে চাকুরিচ্যুত কিংবা হুমকি-ধামকির মুখোমুখি হয়েছিলেন কি? এ রকম পরিস্থিতিতে যারা এ আইন প্রয়োগের সঙ্গে জড়িত, সেই পুলিশের সঙ্গে চৈতি কীভাবে সম্পর্ক রক্ষা করে গেলেন? তিনি কি কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছিলেন? তিনি কি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বলতে যা বোঝায়, তা করতে পেরেছেন? নাকি প্রচলিত নিয়মে সংবাদ সম্মেলন থেকে প্রাপ্ত সংবাদবিজ্ঞপ্তি বা পুলিশের ভাষ্যকেই সংবাদ বলে প্রচার করেছেন?
এছাড়া পুলিশকে উদ্দেশ করে চৈতি যেসব প্রশ্ন ছোঁড়েন সেগুলোর গভীরতাওবা কতোখানি? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে শুরুতেই চোখ রাখতে চাই, পুলিশকে উদ্দেশ করে চৈতি ও অন্যান্য গণমাধ্যমের করা প্রশ্নগুলোতে। এখানে গণমাধ্যমগুলো প্রধানত তিনটি উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এক. সরাসরি পুলিশের বক্তব্য মারফত; দুই. ঘটনাস্থল থেকে; তিন. অনুসন্ধানের ভিত্তিতে। চলচ্চিত্রের শুরুতে সংবাদমাধ্যম প্রধানত প্রথম উৎস তথা পুলিশের বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়েছে। এছাড়া পুলিশকে লক্ষ করে তাদের বেশিরভাগ প্রশ্নই ছিলো উপরিতলের। যেমন, কেমিকাল ইন্ডাস্ট্রিতে ঘটা হামলা, মানুষ খুন ও কেমিকাল চুরির পর সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষ থেকে পুলিশ কর্মকর্তা আবিদকে এ রকমই প্রশ্ন করা হয়-‘আচ্ছা, এই ঘটনায় কার বা কাদের হাত রয়েছে বলে আপনার মনে হয়? আজকে এই ঘটনা কখন ঘটে? কয়জন খুন হয়েছে?’ ইত্যাদি। অর্থাৎ একেবারে সাধারণ সব প্রশ্ন করা হয়।
এছাড়া পুরো চলচ্চিত্রে সাংবাদিক হিসেবে চৈতিকে শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছাড়া, আর তেমন কোনো প্রশ্ন করতে দেখা যায় না পুলিশকে উদ্দেশ করে। তার করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ছিলো এমন-‘স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চেষ্টা কে করেছে? কোনো রাজনৈতিক দল নাকি কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী? নাকি বিদেশি কোনো শক্তি?’ আর এসব প্রশ্নের বিপরীতে আবিদ বলেন, ‘আপনাদের উত্তর দেয়ার মতো কোনো সিচুয়েশনে আমরা পৌঁছাইনি।’ অর্থাৎ পুলিশকে উদ্দেশ করে সংবাদকর্মীদের এ প্রশ্নগুলো এমনই যে, সেগুলোর খুব একটা গভীরতা নেই। তবে প্রশ্ন সাধারণ হলেও তার উত্তর আবিদ যে ভঙ্গিতে দিয়েছেন, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, তার দিকে ধেয়ে আসা প্রশ্নগুলোর অত্যন্ত জটিল ও ব্যাপক তদন্তসাপেক্ষ। এছাড়া ওই মুহূর্তে চৈতি যখন প্রশ্ন করেন, উত্তর দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে ‘কোনো দিন পৌঁছবেন কি?’ এ সময় এমন একধরনের আবহসঙ্গীত ভেসে আসে যাতে, সবার দৃষ্টি চৈতির দিকে গিয়ে পড়ে; এবং চৈতিই যে উপস্থিত অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা, ‘উচ্চমার্গীয়’ ও বুদ্ধিমান সাংবাদিক তা বুঝে নিতে হয়। তাছাড়া ওই সময়ে চৈতির এ প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে আবিদ কোনো উত্তরই যেখানে দেননি, সেখানে এমনভাবে ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল চৈতির কাছে ছুটে আসতে হবে কেনো? মূলত এ ধরনের দৃশ্যায়ন ফরমুলাভিত্তিক চলচ্চিত্রেই বেশি দেখা যায়, যা বাহুল্য দোষে দুষ্ট ও আরোপিত।
এরপর দ্বিতীয় উৎস তথা হামলা বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল নিয়ে যখন সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, তখন টিভি পর্দায় ঘটনাস্থলের বর্ণনা ছাড়া আর তেমন কোনো প্রশ্ন তুলতে দেখা যায় না চৈতিকে। দুয়েকটি উদাহরণ এমন-‘লোটাস স্কুলের সামনে বোমা বিস্ফোরণের পর থেকেই শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বোমাসদৃশ্য কিছু দেখলেই জনগণ পুলিশকে ফোন দিচ্ছে, পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে।’ এছাড়া: ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাজধানীতে একটি মরদেহ পাওয়া গেছে এবং সেই মরদেহটি কার, সেটি শনাক্তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন এসেছে। তার বুক পকেট থেকে একটি স্মাইলি সংগ্রহ করেছে এবং লাশটি ঘিরে সাধারণ মানুষ সেখানে ভিড় করছে।’ দেখা যাচ্ছে, দুটো বর্ণনাতেই একবারে বোমা হামলা নিয়ে উপরিতলের কথাবার্তা। আর চৈতি যে দুয়েকটি প্রশ্ন তুলতে চেয়েছেন, তা পুলিশের বক্তব্যেরই প্রতিফলন। যেমন, ‘গ্লোরি কেমিকালসের ডাকাতি এবং তাদের মালিকানাধীন স্কুলের সামনে বোমা ব্লাস্ট কী শুধুই কাকতালীয়, নাকি এর ভিতর আরো কোনো ঘটনা আছে? দেখতে চোখ রাখুন ...’। আবার পরের একটি দৃশ্যে চৈতি হাজির হচ্ছেন, এই বলে, ‘একটার পর একটা হুমকি, এতোগুলো মানুষের প্রাণহানি, খুলছে না প্রশ্নের জট। ... জানতে হলে চোখ রাখুন ...।’ তার প্রত্যেক বক্তব্যের শেষেই ‘চোখ রাখুন’ উচ্চারিত হলেও দর্শকের চোখকে আশ্বস্ত করার মতো কোনো তদন্ত প্রতিবেদন হাজির করতে ব্যর্থ হন তিনি। তাহলে কী নির্মাতা বোঝাতে চাইছেন, কৌতুহলের নামে চোখ রাখুন বলে দর্শকের সঙ্গে প্রতারণাও করে গণমাধ্যম? তবে গণমাধ্যম ব্যর্থ হলেও পুলিশ কিন্তু ঠিকই পুরো ঘটনাকে উন্মোচনের মধ্য দিয়ে মূল হোতা জিসানকে খুঁজে বের করে এবং তার বৃত্তান্ত উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়।
ঢাকা অ্যাটাক-এর একপর্যায়ে চৈতি যখন পুনরায় হামলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘উত্তর আছে কোনো আজ?’ তখন গোয়েন্দা পুলিশ কমকর্তা আবিদ বলেছিলেন, ‘প্রশ্নটা যখন তখন করা যায়। আর উত্তরটা খুঁজে বের করতে হয়।’ তিনি এর আগে আরো বলেছিলেন, ‘আতঙ্ক বাড়িয়ে খবরের কাটতি বাড়ানো যাদের কাজ, তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার (তথা পুলিশের) কাজ নয়।’ এসব কথা ও গণমাধ্যমকর্মীদের কাজকর্মের উপস্থাপন দিয়ে কি নির্মাতা এটাই প্রমাণ করতে চান যে, জঙ্গিবাদ প্রশ্নে গণমাধ্যমের নাক গলানোর প্রয়োজন নেই? তাছাড়া গণমাধ্যম আতঙ্ক বাড়িয়ে খবরের কাটতি বাড়ায় বলে একচেটিয়াভাবে পুলিশ যে দোষারোপ করছে, তাতে গণমাধ্যম নিয়ে তাদের যে নেতিবাচক ধারণা আছে তাও প্রমাণ পায়।
তবে মজার ব্যাপার হলো, এতোকিছুর পরও রাষ্ট্র কিন্তু চায় গণমাধ্যম তার প্রচারযন্ত্র হয়ে তার পাশে থেকে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক বজায় রাখুক। যার প্রমাণ মেলে, তিক্ততার পর্যায় থেকে গড়ে ওঠা পুলিশ আবিদ ও সাংবাদিক চৈতির প্রেমের সম্পর্ক দিয়ে। শুরু থেকে হামলা ও হামলাকারী সম্পর্কে আবিদ তথা পুলিশের ঠিক বিপরীত অবস্থানে ছিলো চৈতি/গণমাধ্যমের অবস্থান। গণমাধ্যম দু-এক বার পুলিশকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করলেও গল্পের শেষে এসে দেখা যায়, হাসপাতালে বোমা বিস্ফোরণের নাশকতার সময় পুলিশ যখন চেষ্টা করছে তা নিস্ক্রিয় করতে, তখন টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারে এসে চৈতি কোনো সংবাদ পরিবেশন না করে, একেবারে আবেগী হয়ে দেশবাসী ও পুলিশের জন্য প্রার্থনা শুরু করে দেয়। তিনি আওড়ান, ‘... এখন শুধু অপেক্ষা। অপেক্ষা জীবনের জন্য, অপেক্ষা সফলতার (পুলিশের সফলতা) জন্য। সমগ্র দেশবাসী আসুন, যে যার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি। তিনি যেনো এই বিপদে আমাদের রক্ষা করেন। আমরা যেনো আমাদের প্রিয় মুখগুলো আবার দেখতে পাই। আবার একসাথে পথ চলতে পারি।’ লক্ষণীয় ব্যাপার, শেষ দুই বাক্যের ‘প্রিয় মুখ’ ও ‘একসাথে পথ চলতে পারি’ শব্দগুলো যখন চৈতি বলছিলেন, তখন ক্যামেরা এমনভাবে তার অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলে ও আবহ তৈরি করে যাতে দর্শক মনে করবে, চৈতি তথা গণমাধ্যম তাদের দায়গুলোকে পুলিশের কাছেই সমর্পণ করেছে।
তুমি না চাইলেইও তুমি আমার শত্রু
রাষ্ট্রের বন্ধু কে? কাকে রাষ্ট্র বিনা স্বার্থে ভালোবাসে? উত্তর যদি হয়, পুলিশ, তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, আমলা, সাংসদ ও মন্ত্রী। তাহলে হয়তো ভুল ভাবছেন। কারণ এরা তো সবাই রাষ্ট্রের ঔরস। সুতরাং বাবা হয়ে সন্তানকে তো ভালোবাসতেই হবে। তাহলে রাষ্ট্রের শত্রু কে? বহিঃরাষ্ট্র? তাতো পরের কথা, কারণ রাষ্ট্র তো তার সীমানার ভিতরে প্রতিনিয়ত অসংখ্য ‘বিশৃঙ্খলা’ নীতি বিরুদ্ধতাকে দমন করতে বিশাল বাহিনী তৈরি করে রেখেছে। তার মানে, রাষ্ট্রের ঘরের ভিতরও শত্রু বিদ্যমান। খুনি, ডাকাত, প্রতারকসহ অসংখ্য শত্রু রয়েছে রাষ্ট্রের। তবে বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা অনেকে আরেকটি গোষ্ঠীকে শত্রু বলে ঠাওর করে; তারা হলো সংখ্যালঘু আদিবাসী সম্প্রদায়, যাদের রাষ্ট্রীয় নাম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।
আবার দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নিরাপত্তায় চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবানের প্রত্যন্ত জায়গায় রাষ্ট্রকে সেনাবাহিনী পর্যন্ত মোতায়ন করতে হয়। অর্থাৎ শুধু পুলিশ দিয়ে এই ‘নৃগোষ্ঠীদের’ সামলে রাখা কঠিন। সবমিলিয়ে মস্তিষ্কে এ ধারণাই চর্চিত হয় যে, রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি একধরনের ‘শত্রুতা’ আছে এই ‘নৃগোষ্ঠী’ তথা সংখ্যালঘু মানুষের। অবশ্য বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে শুধু এ দোষ দিয়ে লাভ নেই। ‘রাষ্ট্র, সমাজ ও তার সংস্থা গণতান্ত্রিক না হলে যে সংখ্যালঘুত্বের অপরত্বের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা হয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোয়। সোভিয়েত দেশে চেচনিয়দের, যুগোস্লাভিয়ায় বসনিয়াদের মিশিয়ে ফেলা হয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে। আরব দেশগুলোতে আবার সংখ্যালঘুর অস্তিত্ব স্বীকারই করা হয় না।’১৮ আসলে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ওয়েলফেয়ার স্টেটরূপে নির্মাণের জন্য শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে মাথায় রাখা তথা সংখ্যার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের এ ইয়োরোপিয়ান চিন্তাটিই মনে ধরে যায় বেশিরভাগ রাষ্ট্রের। ফলে অপর তকমাটি যোগ হয় সংখ্যালঘু আদিবাসীদের নামের সঙ্গে। এবং সেভাবেই তারা রাষ্ট্রের অন্যান্য মাধ্যম এমনকি গণমাধ্যমেও উঠে আসে এবং সেভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এ নৃগোষ্ঠীকে দেখতে অভ্যস্ত।
এ পথ ধরে ঢাকা অ্যাটাক-এ নির্মাতা আদিবাসীদের উপস্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে তাদের বসবাসের অন্যতম এলাকা বান্দরবানকে তুলে এনেছেন নিখুঁত দক্ষতায়। চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্যই শুরু হয় ঘন গহীন বনে সন্ত্রাসীদের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ঢাকা অ্যাটাকের পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে। এরপর পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, এতোসব পরিকল্পনার হোতার বসবাস এ বান্দরবানেই। এরপর পুলিশের বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা হেলিকপ্টারে চেপে বান্দরবান অভিযানে বের হয়। সেখান থেকে ধরা পড়ে রাসেল নামের সন্ত্রাসী। তবে এর আগে অভিযানের সময় মং নামের একজন আদিবাসীর সঙ্গে পুলিশের সাক্ষাৎ হয়। মূলত সন্ত্রাসী রাসেল গহীন এ বনে কোথায় লুকিয়ে আছে সে পথের খোঁজ একমাত্র মংই দেয় পুলিশকে।
চলচ্চিত্রের এ রকম পর্যায়ে এসে যখন পুলিশের বাঘা বাঘা কর্তারা হন্যে হয়ে রাসেলকে খুঁজছে, সবাই যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই আদিবাসী মংকে এই ‘সন্ত্রাসী’র সন্ধানদাতা হিসেবে দেখে খটকা লাগে। প্রশ্ন জাগে, এতোসব ঘটনা ও হামলার সঙ্গে দেশের মূলধারা বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সম্পৃক্ততা থাকলেও মূল হোতাকে খুঁজতে কেনো একজন সংখ্যালঘু আদিবাসীকেই হাজির করা হলো? মংকে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে নির্মাতা তথা পুলিশ ঠিক কী বোঝাতে চাইছে? তাদের উদ্দেশ্য কী সেটা যদিও বলা মুশকিল। কিন্তু দৃশ্যের পরম্পরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে এসে হঠাৎই মংকে দিয়ে সন্ত্রাসীর খোঁজ পাওয়ার ঘটনাকে নিছক কাকতালীয় মনে হয়নি।
এ মুহূর্তে ঢাকা অ্যাটাক-এর আরো একটি দৃশ্যে চোখ না রেখে পারছি না। যেখানে আদিবাসীদের নিয়ে পুলিশের চেতনার খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায় আবিদ, আশফাক ও মংয়ের এই কথোপকথনে :
আবিদকে উদ্দেশ করে আদিবাসী
মং : স্যার
আবিদ : পুলিশের সাথে উল্টাপাল্টা করলে লাভের চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে জানো তো?
মং : জি স্যার
আবিদ : ধান্ধাটা কী?
মং : রাসেলের কাছে আমি বহু টাকা পাই। ওর ফাঁসি হলে আমি শ্যাষ। ম্যাডাম (চৈতি) কইলো, আসগরকে পাইলে রাসেল ফাঁসি থেকে বাঁচবো।
আবিদ : হু, মুভ মুভ।
এরপর সোয়াটের প্রধান আশফাক বলেন, মং, তোমার ইনফরমেশন যদি ভুল হয়, তাহলে তোমাকেই লাশ বানিয়ে নিয়ে যাবো। মং ভয়ে আঁতকে ওঠে বলেন, স্যার! উত্তরে আশফাক বলেন, কথাটা যেনো মনে থাকে।
এ কথোপকথন মন দিয়ে খেয়াল না করলেও বুঝতে বাকি থাকে না, পুলিশ কর্মকর্তা আবিদ ও আশফাকের প্রায় প্রতিটি প্রশ্নই সরাসরি হুমকিসূলভ? এখানে লক্ষণীয়, দেখা হওয়ার শুরু থেকেই আবিদ চড়া আচরণ করেন মংয়ের সঙ্গে। আশফাক তো যথারীতি লাশ বানিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী হিসেবে আবিদ-আশফাকের এ ধরনের মন্তব্য আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ প্রবর্তিত ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৪৬ (ত)-এ বলা হয়েছে, ‘এ ধারার কোনো কিছুই কোনো মানুষকে হত্যার অধিকার দেয় না। যদি সে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে এমন কোনো অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত না হয়।’ এর মানে দাঁড়ায় ‘কোনো আসামী যদি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে এমন অপরাধ সংগঠনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয় তাহলে, পুলিশ তার গ্রেফতার নিশ্চিত করার জন্য এমন পদক্ষেপ নিতে পারে যাতে সে নিহত হতে পারে।’১৯ কিন্তু মংকে তো চলচ্চিত্রের কোথাও কোনোভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। তাহলে সোয়াট প্রধান আশফাকের এমন মন্তব্যের সঙ্গে আইনের সাযুজ্য কোথায়? নাকি সংখ্যালঘুত্বে অপরত্বের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র তথা সংখ্যাগরিষ্ঠের মস্তিষ্কে চর্চিত যে ধারণা প্রতিষ্ঠিত, তাকেই সমর্থন জানালেন আশফাক।
যা করো তাই করো রে মন
পিছের কথা রেখো স্মরণ বরাবরই
চলচ্চিত্রে ঢাকা অ্যাটাকের মূল রহস্য উদ্ঘাটন ও এর প্রধান হোতাকে ধরতে পুলিশ নানা কৌশল গ্রহণ করে। এর মধ্যে অন্যতম ‘ছিচকে সন্ত্রাসী’দের রিমান্ডে নিয়ে তাদের কাছ থেকে ক্লু বের করা। চলচ্চিত্রে একাধিকবার পুলিশ এদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে। ‘প্রকৃত সত্য’ উদ্ঘাটনে পুলিশ সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে, এটা যুক্তিযুক্ত ও সংবিধানসম্মত। তবে স্বীকারোক্তি কেমনভাবে নিতে হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট বিধানও বেঁধে দেওয়া আছে। এবং দেশের সংবিধানে পরিষ্কারভাবে জিজ্ঞাসাবাদের নামে কোনো প্রকার নির্যাতন করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩ মতে নির্যাতন হল কোন ব্যক্তি দ্বারা অন্যকোন ব্যক্তিকে বা তৃতীয় ব্যক্তি দ্বারা যন্ত্রণা বা কষ্ট হয় এমন ধরনের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা যার মাধ্যমে অপর কোন ব্যক্তিকে ভয়ভীতি দেখানো।’২০ এছাড়া অপরাধের স্বীকারোক্তি বা দোষ কবুল সম্পর্কে সাক্ষ্য আইনের ২৪ হতে ৩০ ধারা ও ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৬৩, ১৬৪ ও ৫৩৩ এ বিধানে বলা হয়েছে: ‘কোন অপরাধের স্বীকারোক্তি আদায় যদি প্রলোভন, ভীতি এবং প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে করা হয় তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি কোন স্বীকৃতি পুলিশ অফিসারের কাছে বা পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় করা হলে তা সাক্ষ্য হিসাবে গ্রহণীয় হবে না। নির্যাতনের মাধ্যমে আদায়কৃত স্বীকারোক্তির কোনই আইনগত মূল্য নেই।’২১ এ পর্যায়ে চলুন যাচাই করা যাক, ঢাকা অ্যাটাক-এ পুলিশ কোন কোন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হামলার সঙ্গে যুক্তদের স্বীকারোক্তি আদায় করেছে এবং তা আদৌ উল্লিখিত আইন ভঙ্গ করেছে কিনা।
চলচ্চিত্রের গল্প তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছে আপাত প্রধান হোতাকে ধরতে। পুলিশের বিশেষ বাহিনী সোয়াট দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অবশেষে রাসেল নামের সন্ত্রাসীকে আটক করে। পুলিশের দাবি, এ ব্যক্তিই ঢাকা অ্যাটাকের মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন। এ পর্যায়ে রাসেলকে হেলিকপ্টারে চড়িয়ে পুলিশের আস্তানায় নিয়ে আসা হয়। এ সময় রাসেল আর্তনাদ করে বলেন, ‘আমারে কোর্টে চালান দিয়া দেন’। এরপর শুরু হয়, রিমান্ড। পুলিশ কর্মকর্তা রাসেলকে উদ্দেশ করে ভয় দেখিয়ে বলেন,
পুলিশ কর্মকর্তা : জিজ্ঞাসাবাদের সময় তো কিছু বললেন না। এখন আমরা যেটা করার সেটাই করবো। কপালের ঠিক মাঝখানে, দুই চোখের মাঝখানে, কে পারবে গুলি করতে? এবার ট্রেইনিংয়ে এইম শট সবচেয়ে খারাপ ছিলো কার?
উত্তরে পুলিশ সদস্য-১ : আমার স্যার।
পুলিশ কর্মকর্তা : তোমার? আসো, শুট হিম, দুই চোখের মাঝখানে। (এরপর শুট করে কিন্তু সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়)। এরপর তিনি বলেন, ‘এত বাজে এইম শট কারো হয়? এবার ট্রেইনিংয়ে সবচেয়ে ভালো এইম শুটার ফার্স্ট হয়েছে কে?
পুলিশের সদস্য-২ : ইয়েস স্যার।
পুলিশ কর্মকর্তা : ও, আসো। একদম কপালের মাঝখানে। শুট হিম।
এ রকম গুলি করে হত্যার হুমকি পাওয়ার পর রাসেল ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং জীবন বাঁচানোর তাগিতে বাধ্য হয়ে স্বীকারোক্তি দিতে সম্মত হন এবং বলেন, ‘আল্লাহ, আল্লাহ। আমারে জানে মাইরেন না স্যার। আমি সব কমু। আমি যা জানি সব কমু।’ মূলত এভাবেই জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় চলচ্চিত্রে। যা পুরোপুরিই বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অথচ জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলা পুলিশের এ নির্যাতন দেখতে দেখতে সবার এতোটাই গা-সওয়া হয়ে গেছে যে, এ নিয়ে স্পষ্ট আইন থাকার কথাটিও হয়তো দর্শক ভুলেই গেছে। এর ফলে সমাজে এ রকম নির্যাতন সহনশীল, চোখ-সওয়া ও চিরাচরিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এমনকি ঢাকাই চলচ্চিত্রে অসংখ্য বার রিমান্ডে নিয়ে পুলিশের নির্যাতন স্বাভাবিকভাবেই দেখানো হয়। প্রশ্ন তুলতেই পারেন, এতোদিন কথা হয়নি, শুধু ঢাকা অ্যাটাক নিয়ে বলছি কেনো? এর উত্তর, ঢাকা অ্যাটাক-এর চিত্রনাট্য যিনি লিখেছেন তিনি পুলিশেরই ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা এবং এটি নির্মাণের সমস্ত আয়োজন করেছে পুলিশ। যা এর আগে অন্য কোনো চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ঘটেনি। সুতরাং, এখানে পুলিশ রিমান্ডে নিলে আইনগত দিকগুলো জেনে শুনেই করবে, এমনটাই ধরে নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য, পুলিশ রিমান্ডের এ চিত্রায়ণ করে তারা হয় না জেনেই আইন ভেঙেছে, নয়তো উদ্দেশ্যমূলকভাবেই এটি করেছে।
পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে আরেকটি উদাহরণ হাজির করতে চাই ঢাকা অ্যাটাক-এ
ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার আবিদ রহমান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ বাহিনী সোয়াটের কমান্ডার আশফাক হোসেন একান্তে কথা বলছেন। তাদের কথোপকথন ছিলো এমন-
আশফাক : আচ্ছা, ওই রিপোর্টার মেয়েটির (সংবাদকর্মী চৈতি) ব্যাপার কী বলুন তো?
আবিদ : বুঝতে পারছি না। এই কেসে যেখানেই যাই সেখানেই সে।
আশফাক : কেনো? তুলে এনে দেবো, ইন্টারোগেট করবেন?
আবিদ : পাগল! এরা হচ্ছে মিডিয়াগ্রুপ। প্রমাণ ছাড়া কিছু করলে একদম জোঁকের মতো পেঁচিয়ে ধরবে। যা করার তা লবণ হাতে নিয়ে করতে হবে।
একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আশফাক-আবিদের শেষ দুই লাইনের কথোপকথন ও এতে ব্যবহৃত দুয়েকটি শব্দ নিয়ে খটকা লাগে। আশফাক যখন বলছেন, ‘কেনো? তুলে এনে দেবো, ইন্টারোগেট করবেন?’ এখানে তুলে আনার মানে সোজা বাংলায় উঠিয়ে আনা। প্রায়োগিক ভাষা চর্চায় এ তুলে আনা বলতে কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করে উঠিয়ে আনা বোঝায়। এ প্রক্রিয়ায় পুলিশ যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে তুলে আনে, তাহলে তা সম্পূর্ণ আইনের লঙ্ঘন। এছাড়া আশফাকের কথার উত্তরে আবিদ যখন বলেন, ‘পাগল! এরা হচ্ছে মিডিয়াগ্রুপ। প্রমাণ ছাড়া কিছু করলে একদম জোকের মতো পেঁচিয়ে ধরবে। যা করার তা লবণ হাতে নিয়ে করতে হবে।’ একথা বলে এ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা কি পরোক্ষোভাবে সংবাদকর্মীদের হুমকি দিলেন? এবং বুঝিয়ে দিলেন পুলিশ একটু কৌশলী হলে সংবাদকর্মীদেরও কুপোকাত করতে পারে! সবচেয়ে কার্যকরী গণমাধ্যম চলচ্চিত্রের পর্দায় দৃশ্যায়িত আবিদ ও আশফাকের মতো পুলিশের দুজন কর্তাব্যক্তির কাছ থেকে এ রকম বিধান বিরুদ্ধ বক্তব্যের মাজেজা হলো, পুলিশ খুব সুচিন্তিতভাবে এ সংলাপগুলোর মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ করেছে এবং হয়তো বাকিদেরও তাদের ক্ষমতার দাম্ভিকতার গল্পটুকু পৌঁছে দিতে চাইছে।
তাহলে তোমায় নমস্য
ধ্বংসপ্রায় এক ইন্ডাস্ট্রিকে কাঁধে চড়িয়ে শবযাত্রার সঙ্গী হয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র হেঁটে চলছে তো চলছেই। সমালোচক, দর্শকের অভিযোগ কিংবা দুঃখ-জহির রায়হান, আলমগীর কবির ও তারেক মাসুদের মতো নির্মাতাদের হারানোর পর বাংলা চলচ্চিত্র ফ্যারায় পড়েছে। দক্ষ ও দূরদর্শী চলচ্চিত্রনির্মাতাদের অভাবেই রূপালি ইন্ডাস্ট্রি আজ পরিণত হয়েছে রূপহীন ইন্ডাস্ট্রিতে। এই পরিস্থিতিতে বেশ কয়েক বছর ধরে দর্শক মস্তিষ্কে এ জ্ঞান দানা বেঁধেছে যে, এদেশের চলচ্চিত্রনির্মাতারা নিতান্তই বোকা, যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে অক্ষম, কূপমণ্ডূক। কিন্তু এতোসব নেতিবাচক ভাবনাকে উবে দিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম চলচ্চিত্র ঢাকা অ্যাটাক দিয়ে নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন নিঃসন্দেহে আলো জ্বেলেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের নির্মাতাও পারে, প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ দিলে তারা যেমন গল্প বলতে পারে, তেমনই ‘শাসক-শ্রেণির ভিজ্যুয়াল মনস্তত্ত্বের অভিব্যক্তি’ও২২ প্রকাশ করতে পারে।
দীপন এও প্রমাণ করেছেন, কেউ কেউ চাইলে ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে চলচ্চিত্রকে রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেও সক্ষম। বিষয়বস্তু, উপস্থাপনশৈলীসহ সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আকর্ষণীয় ও বুদ্ধিদীপ্ত চলচ্চিত্রের যে স্থবিরতা ছিলো, তাকে সচল করতে ঢাকা অ্যাটাক হয়তো উদাহরণ হয়ে থাকবে। তবে সময়ের টানে তা কতোদিন টিকে থাকবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক : রুবেল পারভেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি বণিক বার্তায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
rubelmcj@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. পারভেজ, রুবেল; ‘লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন চলচ্চিত্র-ময়দানে যুদ্ধ’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; বর্ষ ৩, সংখ্যা ৬, জানুয়ারি ২০১৪, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পৃ. ২৫-৩৯।
২. https://bit.ly/2JaGgbD; retrieved on: 10.05.2018
৩. https://www.youtube.com/watch?v=mY98gx6Ay5U; retrieved on: 12.05.2018
৪. হোসেন, ডা. টি (২০০০ : ৮); ‘ভূমিকা’; এম এন রায়ের ওডেসী ১. ভারতের অস্ত্র বিপ্লব (১৯০২-১৬); মানবতাবাদী প্রকাশন, ঢাকা।
৫. খান, কলিম (১৪০৬ : ১৮); ‘জগৎস্রষ্ঠার জন্ম-মৃত্যু: শতাব্দীশেষের ঈশ্বরভাবনা’; দিশা থেকে বিদিশায় : নতুন সহস্রাব্দের প্রবেশ বার্তা; হাওয়া ৪৯ প্রকাশনী, কলকাতা।
৬. প্রাগুক্ত, কলিম (১৪০৬ : ১৮)।
৭. মামুন, আ-আল (২০০৬ : ৩০); ‘ভূমিকার বদলে’; মানবপ্রকৃতি : ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা, মুখোমুখি নোম চমস্কি এবং মিশেল ফুকো; ভাব-ভাষান্তর : আ-আল মামুন; রোদ, রাজশাহী।
৮. ইসলাম, কাবেদুল (২০১২ : ১৬৬); ‘পুলিশিব্যবস্থা : ইংরেজযুগ ১৮০০-১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ’; অবিভক্ত বাংলার পুলিশের ইতিহাস; অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা।
৯.https://www.bbc.com/bengali/news-42600510; retrieved on: 12.05.2018
১০.https://www.bbc.com/bengali/news-42528907; retrieved on: 12.05.2018
১১. ইসলাম, কাবেদুল (২০১৪ : প্রচ্ছদের গায়ে লেখা সারসংক্ষেপ); বাংলাদেশের জেলা পুলিশ অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনা : উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ; অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা।
১২. পারভেজ, রুবেল; ‘টুয়েলভ ইয়ারস অ্যা স্লেভ : ডানা লাগালেই যায় না ওড়া’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; বর্ষ ৪, সংখ্যা ৮, জানুয়ারি ২০১৫, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পৃ.১৯১Ñ২০২।
১৩.https://blog.bdnews24.com/alauddinvuian/187693; retrieved on: 17.05.2018
১৪. ‘শেখ হাসিনার ওপর প্রথম হামলা, শেষ হামলা’; প্রথম আলো, ২১ আগস্ট ২০১৭।
১৫. https://yhoo.it/2seg8TC; retrieved on: 17.05.2018
১৬. http://archive.li/JCq6X; retrieved on: 20.05.2018
১৭. http://archive.li/JCq6X; retrieved on: 20.05.2018
১৮. সিন্হা, রঞ্জন; ‘সংখ্যালঘুর অপরত্ব’; হাওয়া ৪৯; সম্পাদনা : অরবিন্দ প্রধান; কলকাতা, বর্ষ ১৪০৯, ত্রয়োবিংশ সংকলন, পৃ.১১৭।
১৯. রশীদ, হারুন ও কাইয়ুম, হাসনাত প্রমুখ (২০১৩ : ৪৬); ‘সংবিধান সংশোধন ও বিবিধ : অসীম যাহার সীমা’; বাংলাদেশ সংবিধান পর্যালোচনা; প্রকাশক-গণতান্ত্রিক আইন ও সংবিধান আন্দোলন, ঢাকা।
২০. http://archive.li/uzX5g; retrieved on: 22.05.2018
২১. http://archive.li/uzX5g; retrieved on: 22.05.2018
২২. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৮৪); ‘চলচ্চিত্রে মতানৈক্যের কণ্ঠস্বর : বিকল্প চলচ্চিত্র’; সিনেমা; ধানমণ্ডি, ঢাকা।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন