Magic Lanthon

               

অনিক ইসলাম

প্রকাশিত ১৭ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দেখা অতঃপর লেখা

দ্য লাইভস অব আদারস : রাষ্ট্রের নয়, মানুষ ও ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ

অনিক ইসলাম



যুদ্ধ কেনো হয়? স্থান, কালভেদে তার আলাদা কারণ থাকতেই পারে। কিন্তু যুদ্ধের শেষে যা হয়, তা এই গ্রহের সবখানে প্রায় একই। একবার বিজয়ী ও বিজিত নির্দিষ্ট হয়ে যাওয়ার পর পরিত্যক্ত সম্পদ অর্থাৎ গণিমতের মালের ভাগবাটোয়ারায় ব্যস্ত হয়ে পড়াই মানুষের আদিম প্রবৃত্তি। সেই একই প্রক্রিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জার্মানিকে নিয়েও শুরু হয়েছিলো, উপরি হিসেবে সেখানে আবার মিত্র দেশগুলোর যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ তোলার ব্যাপারও ছিলো। জার্মানিকে দু-ভাগে বিভক্ত করার ইচ্ছে প্রথমে না থাকলেও মিত্র বাহিনী অচিরেই টের পেয়েছিলো, যৌথ কমান্ড থেকে জার্মানি পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সেটা কোনো দেশকে পুনর্গঠনের বেলায় হয়তো হয়, কিন্তু লুটপাটে যৌথ শাসন কার্যকরী নয়। ভাগাভাগিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার নিজ চাহিদা মতোই পেয়েছিলো পূর্ব জার্মানি, যেটা ছিলো প্রকৃতপক্ষে একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল। মূলত নিজের সীমান্তে সোভিয়েত ইউনিয়নের দরকার ছিলো এমন একটি বাফার রাষ্ট্র, যেটি ভবিষ্যতে তাকে তার ঐতিহাসিক শত্রুদের থেকে নিরাপত্তা দেবে।


এরই ধারাবাহিকতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রেপ্লিকা চালু হয়েছিলো পূর্ব জার্মানিতে (জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, GDR)। আরো একটি রাষ্ট্র ‘সমাজতন্ত্রের সাম্য’র স্বপ্ন দেখতে লাগলো। কিন্তু তা কি তারা পেয়েছিলো, কেউ কি তা পেয়েছে? সত্যিকার সাম্য সম্পদের না, আত্মার হতে হয়। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র কি মানুষের আত্মাকে সুরক্ষা দিতে পেরেছে? মানবজাতি অনেক প্রত্যাশা নিয়ে যুগে যুগে অনেক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, অনেক স্বপ্ন নিয়ে অনেকটা পথ তাদের সঙ্গে হেঁটেছেও; কিন্তু সব পথই তাদের হতাশ করেছে একটা পথ পর্যন্ত যাওয়ার পর। হয়তো কোনো কোনো আদর্শের আলো অধিক সময় নিয়ে জ্বলেছে, সান্ত্বনা কেবল এটুকুই। তাই শিল্পে, সাহিত্যে এবং অধুনা চলচ্চিত্রে যখন কোনো আদর্শ, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে সমালোচনা করতে দেখা যায়, তখন দর্শকের ওপর বাড়তি দায়িত্ব এসে পড়ে। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভিন্ন কোনো সমাধানের দৃষ্টান্ত না দিয়েই কোনো আদর্শ বা ব্যবস্থার সমালোচনা করা হয়। যা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ হয়তো করে কিন্তু কোনোভাবেই সাধারণ জনতার নয়।


তাই যখন দীর্ঘদিন ধরে এনার্কিস্টদের মুখে বলতে শোনা যায় ‘সাম্যবাদী রাষ্ট্র’ বলে কিছু হয় না; তখন সেটাকে উপেক্ষা করা কঠিন হয়। কারণ সাম্য ও রাষ্ট্র সম্পূর্ণ দ্ব্যর্থবোধক দুটি শব্দ, এটা রাষ্ট্রের উৎপত্তির ইতিহাসে চোখ বোলানো মাত্রই টের পাওয়া যায়। আসলে আধুনিক রাষ্ট্র প্রকৃত প্রস্তাবে দু-রকম হয়-চালাক রাষ্ট্র ও বোকা রাষ্ট্র। চালাক রাষ্ট্র কৌশলে তার অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, ক্ষোভকে বাকি পৃথিবীতে আউটসোর্স করে দিতে পারে। কিন্তু বোকা রাষ্ট্র তা পারে না, বা পারার ক্ষমতা তার থাকে না। তাই আপাতদৃষ্টিতে কোনো কোনো দেশকে কল্যাণকর, সাম্যবাদী বলে ধোঁকা খায় মন, চোখ। সেকারণে পূর্ব জার্মানি যখন সোস্যালিজমের মাধ্যমে তাদের সাম্যের কথা প্রকাশ করেছিলো, তখন সেটাও যে ভবিষ্যতে এক রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডাই হবে তাতে আর বিস্ময় কোথায়!


আজ ইসলামকে নিয়ে পৃথিবীজুড়ে চলা অবিরাম ভীতির মধ্যখানে পড়ে দিশেহারা এই প্রজন্মের কল্পনা করা দুঃসাধ্য যে, অতীতে আরেকটি ভীতি ছিলো, যাতে কাঁচুমাচু হয়ে থাকতো বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রের মানুষ। সেটা হলো নিজেকে রক্ষা করতে কম্যুনিজমের ঐশ্বরিক নজরদারি ভীতি। তাইতো ১৬ মিলিয়ন জনসংখ্যার পূর্ব জার্মানির এজেন্ট ও ইনফরমার প্রয়োজন পড়েছিলো প্রায় দুই লাখ। কিন্তু এটাও মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে, নজরদারি শুধু কমিউনিজমের একান্ত কোনো বিষয় নয়। আজকের পৃথিবীতে একটু খোঁজ রাখলেই দেখা যায়, ‘সভ্য’ সব রাষ্ট্র-সমাজ-গোষ্ঠিই কর্তৃপক্ষের সম্পূর্ণ এখতিয়ারে থাকে। যদিও কেউ রেয়াত পায় সেটা কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাতেই। তাইতো ধনতন্ত্রের পোষক ও বাহক এবং ‘মুক্তবুদ্ধির’ প্রধান ইজারাদার আমেরিকাকে যখন সম্পূর্ণরূপে তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুটি গোয়েন্দা সংস্থা এফ বি আই ও সি আই এ-এর ওপর নির্ভর করতে দেখা যায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না এটা আসলে সমাজতন্ত্র, ধনতন্ত্র কিংবা একনায়কতন্ত্রের ব্যাপার নয়। প্রত্যেক তন্ত্রেরই এই খবরদারি, নজরদারি অতিআবশ্যক।


মোদ্দা কথা হলো,  কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আদর্শকে যখন শৃঙ্খলা ও নীতি-নিয়মের গণ্ডিতে বেঁধে ফেলা হয়, তখন তার প্রাণ শুকিয়ে যেতে থাকে, তা অসাড় ও নিস্তব্ধ হতে থাকে। সেখানে নীরবতাই সবচেয়ে জোরে বলা শব্দে পরিণত হয়। মানবীয়তা পরিণত হয় সংখ্যালঘু অনুভূতিতে, আর নির্মমতা ও নিপীড়ন সেখানে সকালবেলার চায়ের সঙ্গে এক টুকরো বিস্কুটের মতো রোজগেরে অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন সেই রাষ্ট্রের জ্বালানি হিসেবে হাসি নয়, জনগণের ভয়ের দরকার পড়ে। এমনই এক ‘ধূসর’ রাষ্ট্রের গল্প বলতে চলচ্চিত্র বানালেন ফ্লোরিনা হেনকেল ভন ডোনারস্মার্ক (Florian Henckel von Donnersmarck), যার নাম দিলেন দ্য লাইভস অব আদারস (The Lives of Others, ২০০৬)। এটি নির্মাতার প্রথম চলচ্চিত্র।


দুই.

অনেক সময় কোনো নির্মাতার ‘প্রথম চলচ্চিত্র’ দর্শককে অনভিজ্ঞতার স্বাদ দেয়। গল্প বলায় একধরনের অস্থিরতা, তাড়াহুড়ো দর্শকের ইন্দ্রিয়তে ধরা পড়ে, যেটি খুবই স্বাভাবিক। আবার এর উল্টোটাও যে হয় না, তা কিন্তু নয়। অনেক ক্ষেত্রে নির্মাতা তার অতীতে সঞ্চিত জ্ঞান ও উপলব্ধি পুরোটা দিয়েই দৃশ্যের মালা গাঁথতে থাকে, নিজের যাপিত গোটা জীবনটাই উপহার দিতে সক্ষম হয় তার চলচ্চিত্রে। দ্য লাইভস অব আদারস, তেমনই এক মাস্টারপিস।


শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্র এখন বোধ হয় সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী, সর্বাপেক্ষা ধন-লক্ষ্মী সম্পন্ন। প্রতিদিনই সারা পৃথিবীতে প্রায় অসংখ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। তাই আধুনিক জীবনের সঙ্গে চলচ্চিত্রের যে গভীর যোগাযোগ গড়ে উঠেছে, তা অস্বীকার করার যুক্তি অনুপস্থিত। আমার নিজের পক্ষেও এই সর্বগ্রাসী শিল্প-মাধ্যমকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তাই যখন থেকে চলচ্চিত্র উপভোগ করতে শুরু করেছি, সেই থেকে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যে নিকটবর্তিতা তৈরি হয়েছে, তা আর কখনো ছিন্ন হয়নি, বরং ক্রমেই তা আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে।


যাই হোক, কোনো ব্যক্তি এক জীবনে যতো গান শোনে তার কয়টাইবা হৃদয়ের কোণায় ঘর বানিয়ে বসবাস করে? কিংবা যতো বই পড়ে তার কয়টা চরিত্র পাঠকের সঙ্গে নিত্যকাল বসবাস করে? আর কয়টা চলচ্চিত্রের অনুভূতি প্রায়ই চেতনায় ফিরে ফিরে আসে, কিছুক্ষণের জন্য এক আচ্ছন্নতায় মগ্ন করে রাখে? এ রকম ঘোরলাগা চলচ্চিত্রের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশি হয় না; আসলে খুব বেশি হওয়ার কথাও নয়। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক রাতে দেখা দ্য লাইভস অব আদারস আমার জীবনের ঠিক তেমনই এক অনুভূতি, আমার বোধে এর নিত্য যাতায়াত। আর সেটিই আমার লিখতে চাওয়ার বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়ার যথার্থতা দেয়। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া এই জার্মান চলচ্চিত্রটি পরের বছরই বিদেশি ভাষা ক্যাটাগরিতে অস্কার জিতে নেয়। আরো অসংখ্য পুরস্কারের পাশাপাশি এটি জিতে নেয় সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে ৬১তম ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড (বাফটা)।


পুরস্কারের কথা যখন উঠলো এই সুযোগে একটি কথা বলে নেওয়া দরকার-চলচ্চিত্রের খোঁজখবর রাখা যে কেউই পুরস্কার বিশেষ করে অস্কারের রাজনীতি সম্পর্কে নিশ্চয়ই জ্ঞাত হবে। আমেরিকার আদর্শকে প্রত্যক্ষ বা প্রকারান্তরে উপরে তুলে ধরা চলচ্চিত্রগুলো সবসময়ই অস্কারে সুদৃষ্টি লাভ করে। তাইতো বার বার ইরানি চলচ্চিত্রের অস্কার স্বীকৃতি এরই ধারাবাহিকতা বললে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। যদিও এতে করে দুর্দান্ত সেসব ইরানি চলচ্চিত্রকারদের নিজেকে অতিমূল্যায়িত ভাবার কারণ নেই; কারণ চলচ্চিত্রিক মূল্যায়নে তাদের চলচ্চিত্রগুলো লেটার মার্কসই পাবে। তাই কেনো যেনো মনে হয় দ্য লাইভস অব আদারস-এর অস্কার প্রাপ্তি চলচ্চিত্রটিকে তার উদ্দেশ্য ও অনুভূতি থেকে খানিকটা বিচ্যুত করে। আসলে প্রত্যেক অস্কার প্রাপ্ত চলচ্চিত্রকেই এখন দর্শকের এই সন্দেহের পুলসিরাত পার হতে হয়। দ্য লাইভস অব আদারস কোনো পুরস্কার না পেলেও এর চলচ্চিত্রিক উৎকর্ষতাই এটিকে ইতিহাসে জায়গা করে দিতো।


তিন.

দ্য লাইভস অব আদারস-এ গল্প বলতে বেছে নেওয়া হয়েছে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দকে। যেখানে দেখা যায়, সফল ও জনপ্রিয় নাট্যকার জর্জ ড্রেইমান’কে (সেবাস্টিয়ান কোচ)। বেশ অদ্ভুত আর খেয়ালি জীবনে অভ্যস্ত আত্মভোলা এই মানুষটি নিজের টাইটা পর্যন্ত ঠিকভাবে বাঁধতে পারেন না। কিন্তু ক্ষমতাসীন পার্টির রোষানল থেকে নিজের ক্যারিয়ারকে নিরাপদ রাখতে একধরনের সচেতন সতর্কতা নিয়ে চলেন। যেই সমঝোতা তার অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুই করতে পারেনি বা রাজি হয়নি এবং তাদেরকে অনেক মূল্য চোকাতে হয়েছে এর জন্য। ক্রিস্টা-মারিয়া জিলান্দ (মার্টিনা গেদেক) তৎকালীন পূর্ব জার্মানির অন্যতম প্রতিভাবান, জনপ্রিয় ও সুন্দরী মঞ্চাভিনয়শিল্পী। তিনি ড্রেইমানের সঙ্গে সম্পর্কে আবদ্ধ এবং তারা একই সঙ্গে থাকেন। ড্রেইমানের নাটকের মূল চরিত্রে অভিনয়ও করেন জিলান্দ। কিন্তু পূর্ব জার্মানিতে এই অসাধারণ অভিনয় প্রতিভা তার ক্যারিয়ারের রক্ষাকবচ হতে পারে না। বরং প্রতিনিয়ত তাকে মন্ত্রী হেমফ’র (থমাস থিয়েম) কাছে গোপনে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয়, নইলে অচিরেই অভিনয়ে সে ব্রাত্য হয়ে পড়বে বলে তার আশঙ্কা।




এরপর চলচ্চিত্রে প্রবেশ করে গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র ক্যাপ্টেন জার্ড উইসলার (উলরিখ মুহে)। স্ট্যাসি’র (Stasi, পূর্ব জার্মানি সিক্রেট পুলিশ) সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ, শৃঙ্খলা পরায়ণ কর্মকর্তাদের একজন তিনি। হিটলারের যেমন ছিলো গেস্টাপো, সোভিয়েত ইউনিয়নের কে জি বি, আমেরিকার সি আই এ এবং পূর্ব জার্মানির এই স্ট্যাসি। ক্ষমতাসীন দলের কাছে নাট্যকার ড্রেইমান ছিলেন সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকা হাতেগোনা কয়েকজন লেখকের একজন, যিনি পশ্চিম জার্মানিতে জনপ্রিয়ও। কিন্তু উইসলারের কাছে ড্রেইমানকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে কখনোই মনে হয়নি; কোনো প্রমাণ ছাড়াই একধরনের শঙ্কার বশবর্তী হয়ে তিনি ড্রেইমানের ওপর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।


পরবর্তী সময়ে দর্শক সত্যি দেখে যে, ড্রেইমান রাষ্ট্রের প্রতি, সোস্যালিজমের প্রতি অনুগত হলেও ক্ষমতাসীন পার্টির সব সিদ্ধান্তে তার আনুগত্য প্রশ্নাতীত নয়। উইসলার পরে ড্রেইমানের ওপর নজরদারির আদেশ পায় এবং তিনি ড্রেইমানের ঘরের প্রতি ইঞ্চিতে আড়িপাতা যন্ত্র বসান। যাতে বিশ্বাসঘাতকতার কোনো সূত্র যদি ওই বাড়িতে উচ্চারণও হয়, তবে তা যেনো তার অগোচরে না হয়। নজরদারি শুরুর অল্প কয়েকদিনের মাথায় উইসলার বুঝতে পারেন, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য নয় বরং মন্ত্রী হেমফের ব্যক্তিগত আক্রোশের ফল। তিনি ড্রেইমানকে ধ্বংস করতে চান, কারণ জিলান্দের প্রতি তার একতরফা মোহ আছে। উইসলারের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল গ্রুবিটজ (উলরিখ টুকুর) বিষয়টি জেনেও মন্ত্রীর সুনজরে থাকার জন্য চুপ থাকেন।


এই অবস্থায় সোস্যালিজমকে আগলে রাখতে প্রাণপাত করা উইসলার জটিল এক মানসিক দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হন। আসলে জীবনের প্রায় সবটা সাম্যের জন্য বিনিয়োগ করা উইসলার যখন দেখেন, তাদের জীবনটা আসলে কারো ব্যক্তিগত স্বার্থ সুরক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে, জনগণের মঙ্গলের জন্য নয়, তখন দেশের চলমান সিস্টেমের কর্দযতা ও ভবিষ্যত সম্পর্কে তার ধারণা পরিবর্তিত হতে থাকে। সূক্ষ্ম এক পরিবর্তন তার নিজের মধ্যেও আসতে থাকে ধীরে ধীরে।


নিবেদিতপ্রাণ অফিসার উইসলারকে পরিবারবিহীন, এক প্রকার নিঃসঙ্গ অবস্থায় চলচ্চিত্রে দেখা যায়। কিন্তু যখন তিনি ড্রেইমান ও জিলান্দের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখতে লাগলেন, তখন তিনি তার নিজ জীবনের একাকিত্বের মুখোমুখি দাঁড়ান। সেই একাকিত্ব যে কী ভয়ঙ্কর, তা বোঝা যায় যখন একজন যৌনকর্মীকে তিনি বলছেন, ‘কিছু সময় অন্তত আমার কাছে বসে থাকো। শুধু আমার সঙ্গে আরেকজন আছে, এই অনুভূতিটুকুকে আরো একটু দীর্ঘস্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য।’


তাই ড্রেইমানের চিলেকোঠায় বসে বাকি পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, উইসলার যখন কানে হেডফোন তুলে নেন এবং জিলান্দ ও ড্রেইমানের জীবনের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর শব্দে, অনুভূতিতে প্রবেশ করেন, তখন সেই জীবন তাকে গ্রাস করতে থাকে। তার স্বীয় নিঃসঙ্গতা থেকে উৎসারিত শূন্যতা যেনো ভরতে থাকে জিলান্দ ও ড্রেইমানের জীবনের এই স্বাভাবিকতায়, ভালোবাসায়। ক্রমেই উইসলার তার ‘সন্দেহভাজন অপরাধী’র জীবনের ভালো দিকগুলো অনুভব করতে থাকেন। তাই ড্রেইমান-জিলান্দের জীবন আর উইসলারের কাছে ‘অন্যের জীবন’ থাকে না। তিনি নিজেও সংযোগ করতে পারেন ওদের ওই জীবনের সঙ্গে। ওদের সুখ, আনন্দ, ভয়, শঙ্কাকে তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারেন এবং বদলে যেতে থাকেন। উইসলার সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে পড়েন জিলান্দ ও ড্রেইমানের জীবনে। ওদের কষ্টগুলো ওর কষ্ট আর ওদের লক্ষ্যগুলো ওর লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। উইসলার অগোচরে ওদের সাহায্য করতে শুরু করেন। পূর্ব জার্মানির ক্রমবর্ধনশীল আত্মহত্যার হার এবং তাতে রাষ্ট্রীয় ভূমিকা এবং অব্যবহিত মিথ্যাচার সংক্রান্ত ড্রেইমানের প্রবন্ধটি যেনো পশ্চিম জার্মানির একটি সাময়িকীতে ছাপানোর জন্য পাচার হতে পারে, তার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করেন উইসলার। যা প্রকাশ হলে দুই জার্মানিতে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।


চার.

দ্য লাইভস অব আদারস-এ দেখা যায়, পূর্ব জার্মানি ও সোস্যালিজমের প্রতি গভীর আস্থা রাখা সত্ত্বেও শুধু কর্তৃপক্ষের সব কর্মকাণ্ডে জি হুজুর বলতে না পারার কারণে মঞ্চ নাটকে দেশের সবচেয়ে মেধাবী পরিচালক ইয়ার্সকা’কে (ভোকমার ক্লেইনার) দীর্ঘদিন কোথাও কাজ করতে দেওয়া হয় না। তাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। এমনকি সেখানে ‘কালো তালিকা’ শব্দটিও কালো তালিকাভুক্ত, কেউ প্রকাশ্যে মুখে আনে না। এ যেনো ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে লেখা জর্জ অরওয়েল-এর উপন্যাস ‘১৯৮৪’ এর ঘটনার পরম্পরা। যেখানে কর্তৃপক্ষ তার সুবিধা অনুযায়ী অনেক শব্দে নিষেধাজ্ঞা বসিয়েছিলো। আবার পরিবর্তন করে দিয়েছিলো অনেক শব্দের অর্থ। যেখানে উপর থেকে সবার ওপরে নজর রাখে এক অদৃশ্য, সর্বদ্রষ্টা ‘বিগ ব্রাদার’। অধুনা জনপ্রিয় টিভি রিয়েলিটি শো ‘বিগ বস’ এবং ‘বিগ ব্রাদার’-এর ধারণা জর্জ অরওয়েলের ওই উপন্যাস থেকেই এসেছে। অবাক হয়ে দেখি চলচ্চিত্রে যে সময়ের গল্প বলা হয়েছে, সেটিও ১৯৮৪! এটি কি নিছক কাকতাল, নাকি নির্মাতার সংবেদনশীল রাজনৈতিক অনুভূতির আরেকটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত?


নিপীড়ক রাষ্ট্রের প্রথম কোপটা সাধারণত স্বাধীন মত প্রকাশ তথা সাংবাদিকদের ওপর বসে, এখানেও তা সগৌরবে উপস্থিত। স্পষ্টবাদী সাংবাদিক হাউসার (হান্স উই বাউয়ার)-এর প্রতি যে বিতৃষ্ণা মন্ত্রী হেমফের চোখে-মুখে দেখা যায়, তা রীতিমতো ভীতি জাগানিয়া। আর এ রকম ব্যবস্থায় যে সংবাদ মাধ্যমগুলো সম্পূর্ণভাবেই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে তা তো অনুমিতই। সেখানে আর যাই হোক সাধারণ জনতার সংবাদ থাকে না। তাই উইসলার যখন টিভি চালু করে তখন টিভি চ্যানেলকে গুরুত্ব সহকারে রাষ্ট্রের মুরগীদের হালহকিকত দেখাতে দেখা যায় এবং তারপরই শুরু হয় ক্ষমতাসীন পার্টির সংবাদ!


পাঁচ.

নির্মাতা ফ্লোরিনা হেনকেল একজন আপাদমস্তক আশাবাদী মানুষ। তাই গোটা চলচ্চিত্র এক অদ্ভুত বিষণ্ন সুরে বাঁধা থাকলেও এর পরতে পরতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এক ধরনের আশাবাদ-মানুষ অবশ্যই পরিবর্তিত হবে। সেটা শুধু উইসলার না, নাট্যকার ড্রেইমানের বেলায়ও দেখা যায়। বন্ধু ইয়ার্সকা আর প্রেমিকা জিলান্দের আত্মহত্যা মহাপ্রলয়ের মতো ধাক্কা দিয়ে উইসলারের ভয়-ভীতি আর সমঝোতার বাঁধ ভেঙে দেয়। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে শঙ্কা তাকে আর সত্য বলা থেকে বিরত রাখতে পারে না। আর কে না জানে যে এটাই মানুষের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য, দেয়ালে পিঠ ঠেকলে সে ঘুরে দাঁড়ায়।


নিজের প্রথম হলেও কী জাদুকরী এক চলচ্চিত্রই না নির্মাতা বানিয়েছেন! দক্ষ নির্মাতার মতোই শব্দে কম বরং সচল দৃশ্যকল্পে বেশি আস্থা রেখেছেন। চলচ্চিত্রে রঙের ব্যবহারেও নির্মাতা মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন দারুণ। গোটা চলচ্চিত্রে একবারের জন্যও কোনো উজ্জ্বল রঙ ব্যবহৃত হতে দেখা যায় না। বিষণ্ন আবহ ধরে রাখতে তিনি সবসময় ধূসর রঙকে আশ্রয় করেছেন। জীবনের যে ধূসরতা সেখানে বহমান ছিলো, সেটি চলচ্চিত্রে তুলে আনতে এই ব্যাপারটি খুব বড়ো ভূমিকা রেখেছে।


ছয়.

চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের একটি বড়ো ভূমিকা আছে। চিলেকোঠায় একা বসে হেডফোন কানে নজরদারি করতে করতে ড্রেইমেনের বাজানো বেটোভেন শোনেন উইসলার। যা তাকে ভিতর থেকে পরিবর্তন করে। এছাড়া আবহসঙ্গীতও চলচ্চিত্রটিকে বুঝতে যথেষ্ট সাহায্য করেছে, তাই সেই দিক থেকে সঙ্গীত পরিচালক গ্যাব্রিয়েল ইয়ারেদ প্রশংসাই পাবেন। আর সিনেমাটোগ্রাফার হেগেন বোগদানস্কি’র ক্যামেরায় ছিলো প্রত্যাশিত পরিমিতিবোধ। কোনো দেখনদারি ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল বা আরোপিত কোনো দৃশ্যায়ন তার ক্যামেরাতে ছিলো না, যেটা এই চলচ্চিত্রের গোটা এক সুরে বাঁধা আবহকে এলোমেলো করতে একাই যথেষ্ট ছিলো। আর অভিনয়ের কথা বলতে গেলে, প্রত্যেক অভিনয়শিল্পী তার চরিত্রকে এতো অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে যে, আলাদা করে কারো নাম বলা অপ্রয়োজনীয়।


তবে চলচ্চিত্রটি নিয়ে একটি বিতর্ক আছে তা হলো, প্লট হিসেবে কোনো স্ট্যাসি কর্মকর্তার এতো ‘মানবিকীকরণ’-এর মতো বিষয় বেছে নেওয়া। নির্মাতা তখন নিজের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে উদাহরণ হিসেবে নাজি পার্টির শিন্ডলারকে নিয়ে বানানো শিন্ডলার লিস্ট-এর কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু একজন শিন্ডলার সত্যিই ছিলেন এই পৃথিবীতে, কিন্তু একজন মানবিক স্ট্যাসি অফিসারের অস্তিত্ব আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়েই চলচ্চিত্রটি বানানো হোক, তা সফল। অর্থাৎ কোনো মানবিক স্ট্যাসি কর্মকর্তা না থাকলেও কোনো একজনও যদি ভবিষ্যতে তৈরি হয়, তা পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেনো।


২০১৪ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলের সম্ভ্রান্ত সামরিক শাখা ‘ইউনিট ৮২০০’-এর ৪৩ জন কর্মকর্তা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা এক চিঠিতে তাদের পদত্যাগের কথা জানান। কারণ সহিংসতায় জড়িত এবং জড়িত নয় এমন ফিলিস্তিনিদের ভিতর কোনো পার্থক্য ইসরায়েল করে না, বরং সবাইকে একই পরিণাম ভোগ করতে হয়। সেই ৪৩ সেনার একজন বলেছিলেন, দ্য লাইভস অব আদারসই ছিলো তার এই বদলে যাবার কারণ।


সাত.

ভালোলাগা, মন্দলাগা, দুঃখলাগা, ক্রোধ এমন নানা অনুভূতি দর্শকের হয়। সেগুলো কাউকে বললে, সেও ঠিকঠাক ধরতে পারে, দর্শক ঠিক কেমন বোধের কথা বলছে। তবে কিছু অনুভূতি আছে যেগুলো প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট কোনো শব্দ তৈরি হয়নি, কাউকে ঠিকঠাক বোঝানোও যায় না। ঠিক তেমনই এক অনুভূতি হয় দ্য লাইভস অব আদারস-এর শেষ দৃশ্যটি দেখলে। যখন উইসলার একদিন হঠাৎই আবিষ্কার করেন, তার স্ট্যাসি কোড নামটিকে উৎসর্গ করে একটি বই লিখেছেন ড্রেইমান-মোমবাতি নিভে যাওয়ার আগের মুহূর্তে শেষ বারের মতো যেভাবে মৃদু জ্বলে ওঠে ঠিক তেমনই এক টুকরো অনুভূতি চলচ্চিত্রে প্রথম বারের মতো ভেসে ওঠে তার শক্ত কঠিন মুখাবয়বে। সেটি আসলে ঠিক হাসি না প্রশান্তি বোঝা যায় না। বইটি কাউকে গিফট দেবেন কি না বইয়ের দোকানদার জিজ্ঞেস করলে, এক অপার্থিব অধিকারবোধ নিয়ে উইসলার ছোট্ট করে বলেন, ‘না, বইটি আমার জন্য’। সেই দৃশ্যটি দর্শককে একটি নতুন ধরনের ভালোলাগার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। যেই ভালোলাগাটি তার কখনো লাগেনি আগে।


লেখক : অনিক ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। বর্তমানে চাকরির খোঁজে দিনাতিপাত করছেন।


anikislam.ru@gmail.com

 

পাঠ সহায়িকা


১. https://www.imdb.com/title/tt0405094/fullcredits; retrieved on: 17.05.2018

২. https://goo.gl/JsTT97; retrieved on: 17.05.2018

৩. হাই, হাসনাত আবদুল (২০১৫); চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা; বেঙ্গল পাবলিকেশন্স লিমিটেড, ঢাকা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন