অধরা মাধুরী
প্রকাশিত ১৬ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ভালবাসার শহর : সশস্ত্র যুদ্ধের সমান্তরালে জীবন-যুদ্ধের টানাপড়েন
অধরা মাধুরী

শিল্পের জন্য যুদ্ধ আর যুদ্ধ নিয়ে শিল্প
মানব মস্তিষ্ক ও তার চিন্তা অদ্ভুত একটা জগৎ। যদি প্রশ্ন করা হয়, মানবজীবনে স্বাধীনতা কোথায় থাকে? আমি বলবো, স্বাধীনতার অস্তিত্ব আছে শুধু মানুষের মস্তিষ্কে, চিন্তায়। শিল্পীমন সেই চিন্তার নান্দনিক প্রকাশের জন্য ব্যাকুল থাকে। নিজের স্বাধীনতাকে ছড়িয়ে দিতে চায় অন্যের মধ্যে। কবিতা, গল্প, চিত্রকর্ম, চলচ্চিত্র-কতো রূপ আছে শিল্পীর চিন্তার! কিন্তু এই রূপে আসতে শিল্পকে যে যুদ্ধ করতে হয়, তার খবর ক’জন রাখে? কতো শত শিল্পীর স্বপ্ন সেই স্বপ্নদ্রষ্টার মস্তিষ্কেই দম বন্ধ হয়ে পড়ে থাকে, তা কি আমরা জানতে পারি!
শিল্পীর মননে-চিন্তায় থাকে চিত্রকল্প। সেই চিত্রকল্প বাস্তবে রূপ দেন তিনি নিজেই। একজন চিত্রশিল্পী বা কবির জন্য এই ভাবপ্রকাশ যতোটা না সহজ, একজন চলচ্চিত্রনির্মাতার জন্য মোটেও ততো সহজ নয়। কেবল ‘ফিল্ম’ আর ‘ক্যামেরা’ থাকলেই একজন নির্মাতা তার মননে থাকা চিত্রকল্প বাস্তবে রূপ দিতে পারে না। এজন্য সহায়ক আরো নানা উপকরণের দরকার পড়ে। তার ওপর আবার চলচ্চিত্রনির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী অরসন ওয়েলস্ বলছেন, ‘একটি চলচ্চিত্র তখনই ভালো হতে পারে, যদি ক্যামেরাটা একজন কবির চোখ হয়’ (A film is never really good unless the camera is an eye in the head of a poet.)।১
‘চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে আপনার স্বপ্ন দেখা উচিত নয়, নির্মাণ করে ফেলা উচিত’ (You shouldn’t dream your film, you should make it.)।২ পৃথিবীর সর্বাধিক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রনির্মাতাদের একজন স্টিভেন স্পিলবার্গ-এর কথা এটি। কিন্তু একজন নির্মাতার স্বপ্ন, তার ইচ্ছা আর পরিচালনার যোগ্যতা থাকলেও এতো সহজে চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে না। তাই ইন্ডাস্ট্রির প্রতিযোগিতায় টিকে যাওয়া একজন নির্মাতা এ কথা যতো সহজে বলে ফেলতে পারে, বিষয়টি মোটেও ততো সহজ নয়। এখানে আছে পুঁজির প্রশ্ন। কবির চোখ, চলচ্চিত্রের স্বপ্ন, নির্মাণের স্পৃহা-সবকিছুর পরেও প্রয়োজন পড়ে অর্থের। তাহলে শিল্পের স্বাধীনতা পেলাম কই!
তারপরও স্বপ্নদ্রষ্টা এইসব নির্মাতা স্পৃহার মূল্য দেওয়ার চেষ্টা করে চলছেন নানাভাবে। তাদের মধ্যে একজন ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী। গত বছর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা নিয়ে তিনি নির্মাণ করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ভালবাসার শহর। শিল্পজগতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে নামতে চেয়েছেন তিনি, দর্শকের সামনে নিয়ে এসেছেন যুদ্ধের এক নতুন রূপ।
নির্মাতার নিবেদন এবং কিছু প্রশ্ন
চলচ্চিত্র এক বিশাল ব্যবসাক্ষেত্র, এটা নতুন কোনো কথা নয়। তবে ব্যবসা হলেও চলচ্চিত্র একটি শিল্প, আর শিল্পের মূল উদ্দেশ্য টাকা রোজগারের চেয়ে অনেক বড়ো কিছু। ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী পরিচালিত ভালবাসার শহর স্বয়ং নির্মাতার ভাষায় একটি ‘উদ্যোগ’; কিছু দরকারি কথা বলার মাধ্যম। ৩১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডের চলচ্চিত্রটি প্রচুর আনুষ্ঠানিকতা করেও প্রেক্ষাগৃহে ছাড়া হয়নি। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন বাংলাদেশ আর ভারতের দর্শকের জন্য ইউটিউবে, আর অন্য দেশের দর্শকের জন্য ভিমিও’তে (ইউটিউবের মতো খোলা প্ল্যাটফর্মে ভিডিও শেয়ার করার মাধ্যম) মুক্ত করে দেওয়া হয়। ইউটিউবে চলচ্চিত্রটি আসে এবেলা.ইন-এর মাধ্যমে। এই প্রথম কোনো বাংলা নিউজ ওয়েবসাইট বাংলা চলচ্চিত্রকে উপস্থাপন করলো। অন্তত এতোটুকু হলেও নতুন কিছু এনেছে ভালবাসার শহর। তবে হয়তো এখানেই শেষ নয়। চলচ্চিত্র শুরুর আগে স্বয়ং নির্মাতা পর্দায় হাজির হয়ে জানিয়েছেন, তারা এই চলচ্চিত্রটি বানিয়েছেন এই মনে করে যে, এই ধরনের বাংলা চলচ্চিত্র তৈরি হওয়া দরকার। তারা দর্শকের প্রতিক্রিয়া জানতেও ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তবে সেই প্রতিক্রিয়া দেওয়ার প্রক্রিয়াটা অর্থকেন্দ্রিক। তাতে চিন্তাশীল সব দর্শকের প্রতিক্রিয়া আদৌ জানা সম্ভব কি না সেখানে যথেষ্ট প্রশ্নের সুযোগ আছে।
এদিকে চলচ্চিত্র তৈরি করতে অর্থ লাগবেই, একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাহলে ব্যবসা করার ইচ্ছা না থাকলে চলচ্চিত্র তৈরি হবে কীভাবে! এই প্রশ্নের সামনে পড়ে বিকল্প পদ্ধতির কথা ভাবছেন অনেক নির্মাতা। নির্মাণের আগেই টিকিট বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর উদ্যোগ যেমন হয়েছে, তেমনই ভালবাসার শহর নির্মাণের পরে ক্রাউড সোর্সিং পদ্ধতিতে অর্থ জোগাড়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে এই চিন্তা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা কতোখানি, তা এখনো নিশ্চিত হয়ে বলার সময় আসেনি। তবে উপায় তো কিছু একটা বের করতেই হবে। চলচ্চিত্র শুধু ব্যবসা হয়ে আর কতোদিন! শিল্পকে শিল্পের মর্যাদা দিতে হলে তাকে স্বাধীন হওয়ার সুযোগ দিতে হয়।
অন্যদিকে বিখ্যাত ফরাসি লেখক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা জঁ ককতো (১৮৮৯-১৯৬৩) চলচ্চিত্রের শিল্প হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র তখনই শিল্প হয়ে উঠবে যখন এর নির্মাণের উপাদানগুলো পেন্সিল-কাগজের মতো সহজলভ্য হবে।’ অর্থাৎ সাহিত্যের জন্য সহজলভ্য পেন্সিল-কাগজ প্রয়োজন বলে সাহিত্যের শিল্প হয়ে উঠতে বাধা কম; তেমনই চলচ্চিত্রের জন্য ক্যামেরা-ফিল্ম সহজলভ্য হয়ে গেলে চলচ্চিত্রও আরো সহজে শিল্প হয়ে উঠবে। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন, চলচ্চিত্রের শিল্প হয়ে ওঠার পথে একমাত্র বাধা, এর জন্য দরকারি কিন্তু সহজলভ্য নয় এমন সব প্রযুক্তি। অর্থাৎ ক্যামেরা-রিল এইসব সুবিধা। কারণ জঁ ককতোর সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে ক্যামেরা ছিলো চূড়ান্ত বিলাসিতা।
বর্তমানে একথা না মেনে উপায় নেই যে, হাতে হাতে এখন উচ্চমানের ক্যামেরাযুক্ত মোবাইলফোন সেট আর পেশাদার ক্যামেরার উপস্থিতি প্রায় পেন্সিল-কাগজের মতোই। কিন্তু প্রতিবছর মুক্তি পাওয়া হাজারো চলচ্চিত্রের মধ্যে শিল্প হয়ে ওঠে কয়টা! তাহলে শুধু ক্যামেরার খরচই কি চলচ্চিত্রের শিল্প হয়ে ওঠার পথের কাঁটা ছিলো?
সমস্যা আসলে আরো অনেকটা বিস্তৃত। মূল সমস্যা-ক্ষমতা আর ব্যবসা। যদি ক্ষমতার স্বার্থে আঘাত লাগে, তাহলে শিল্পী তার মনের মতো করে নিজের কথা বলতে পারে না; আবার চলচ্চিত্রের আধেয় বিক্রি করে যদি ঠিকঠাক ব্যবসা না হয়, তাহলে সেখানে পুঁজি বিনিয়োগ হয় না। যদিও ক্ষমতা-পুঁজির আত্মীয়তা নিয়ে এখানে আলোচনা ফেঁদে বসা নিছক বাহুল্য হবে। তারপরও এই চক্রাকার সমস্যা থেকে বের হওয়ার উপায় কী?
সমাধানটা ঠিক অঙ্কের মতো নয়, নানা সময়ে শিল্পীরা নিজের শিল্পের স্বাধীনতার জন্য বিভিন্ন রাস্তায় হেঁটেছেন। শিল্পের মুক্তির জন্য চলচ্চিত্রকেও আন্দোলনের পথ ধরতে হয়েছে। যেমন, স্বাধীন চলচ্চিত্র বা ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম। পরিবেশকের ব্যবসার যাঁতাকলে নিজের শিল্পকে বিসর্জন দিতে অস্বীকার করেছিলো যেসব নির্মাতা, তারা এই স্বাধীন চলচ্চিত্রের ধারণায় বিশ্বাস করেছে। তারা মনে করে, নিজের সৃষ্টিকে মুক্তভাবে প্রদর্শনের অধিকার থাকা উচিত প্রত্যেক শিল্পীর। তারা সিদ্ধান্ত নেয়-স্টুডিও থেকে বেরিয়ে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণের এবং কোনো পরিবেশকের শরণাপন্ন না হয়ে স্বাধীনভাবে প্রদর্শনের। এই আন্দোলন ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসার একটা অংশকে অস্বীকার করে ঠিকই, কিন্তু পুঁজির প্রয়োজনকে কীভাবে অস্বীকার করা যাবে? জঁ ককতো বলেছেন ‘ম্যাটেরিয়াল’ বা প্রযুক্তিগত যন্ত্রের সহজলভ্যতার কথা। যেমনটা আগে বলেছি, ক্যামেরা এখন অতি সহজলভ্য এবং রিলের আর দরকারই নেই। তবুও তো অর্থের প্রয়োজন। কয়েকজন ভালো ও পেশাদার অভিনয়শিল্পীকে নিজের চলচ্চিত্রে আনতে অর্থ লাগে; সেট, লোকেশন, অনুমোদন, আলো, সম্পাদনা, সঙ্গীত এমন আরো হাজারটা কাজের জন্য বড়ো একটা অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয়। চলচ্চিত্রকে ব্যবসা হিসেবে না দেখে একজন নির্মাতা যদি শুধু শিল্প হিসেবেও দেখে, তবুও এই বিপুল অর্থের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না। এতোগুলো টাকা খরচ করে নির্মাতা যদি অন্তত এর মূল পুঁজিটাও ফিরে না পায়, তাহলে তার পরবর্তী চলচ্চিত্রের পুঁজিটাইবা পাবে কোথায়!
আবার ক্ষমতা আর প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করতে চলচ্চিত্রজগতে বিকল্প চলচ্চিত্র বা অলটারনেটিভ ফিল্ম আন্দোলনও হয়েছে। তবে এই আন্দোলনের মূল কথাটা চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু কেন্দ্রিক, নির্মাণ-প্রক্রিয়া কেন্দ্রিক নয়।
মোদ্দা কথা হলো, শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্র জঁ ককতোর উদ্ধৃতি অনুযায়ী শুধু ‘ম্যাটেরিয়াল’ বা যন্ত্রের সহজলভ্যতার অভাবে পরাধীন নয়। এই সমীকরণে অসংখ্য চলক আছে। যার অনেকগুলোর পিছনে কাজ করে পুঁজি। তাই কাগজ-কলমের মতো চলচ্চিত্রের ফিল্ম ও ক্যামেরা সস্তা হওয়ার পরও নির্মাতা ইন্দ্রনীলকে শিল্পসৃষ্টির জন্য দর্শকের কাছে হাত পাততে হয়। যদি তিনি এতে সফল না হন, তাহলে কিন্তু পরবর্তী শিল্পসৃষ্টিতে তিনি অবশ্য অবশ্যই বাধার মুখে পড়বেন। ফলে ককতোর ওই কথা তখন আর ধোপে টিকবে না। তাই চলচ্চিত্রকে শিল্প হয়ে উঠতে হলে অথবা শিল্পকে স্বাধীন হতে হলে ক্ষমতার থাবার বাইরে অর্থের একটা উৎস তৈরি করতে হবে।
যুগে যুগে শিল্পের স্বার্থে এমন অনেক পদক্ষেপ নিতে হয়েছে নির্মাতাদের। ভালবাসার শহরও হয়তো একটা নতুন উদ্যোগ। অনেকটা স্বাধীন চলচ্চিত্রের মতোই। যদিও এর বিপণনে সহায়তা করেছে ‘এবেলা ডট ইন’। তবুও নতুন, একথা অস্বীকার করা কৃপণতা হবে। তাহলে জঁ ককতোর উদ্ধৃতির বিরোধিতা করে বলতে হচ্ছে, শুধু হাতের কাছে ক্যামেরা-রিল থাকলেই চলচ্চিত্র শিল্প হয়ে উঠবে না। স্বাধীনতা-ক্ষমতা-অর্থের সম্পর্কের জটিলতার কারণে চলচ্চিত্রশিল্পের এই সমীকরণ সমাধান করা এখনো অনেক কঠিন বলেই মনে হয়। তবে অসম্ভব নিশ্চয় নয়!
ভালবাসার শহর : যুদ্ধ ও জীবন
৩১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডের চলচ্চিত্রটির শুরুতে নির্মাতা কিছু কথা বলেছেন দর্শকের উদ্দেশে। যা ইঙ্গিত দেয় যে ভালবাসার শহর গতানুগতিক চলচ্চিত্র থেকে কোথাও একটা আলাদা। কথাগুলোর কারণে প্রথম থেকেই হয়তো একটু পক্ষপাতদুষ্ট চোখ নিয়ে ভালবাসার শহর দেখতে শুরু করলাম কিনা এখনো জানি না। এই পূর্বধারণা চলচ্চিত্র দেখার অনুভূতির ওপর প্রভাব ফেলেছে কিনা সে বিষয়েও আমি এখনো নিশ্চিত নই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অতীত ও বর্তমান ঘটনাকে পাশাপাশি দেখিয়ে একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত পরিবারের গল্প বলা হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে। পরিবারটি কলকাতা শহরের, যুদ্ধটা সিরিয়ার। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুদ্ধের ধ্বংসলীলা কলকাতায় নেমে আসার গল্প।
কলকাতার মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারের এক তরুণী অন্নপূর্ণা দাস আর হিন্দিভাষী এক মুসলমান তরুণ আদিল হায়দারের একসঙ্গে জীবন শুরু করার স্বপ্ন, তাদের নিয়ে যায় সিরিয়ার হোমস্ শহরে। সেখানেই জন্ম নেয় তাদের মেয়ে সন্তান নুরি। যুদ্ধের সহিংসতা যখন সিরিয়াবাসীর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে, সেসময় আহত হয় নুরি ও তার বাবা। মাথায় আঘাত লেগে নুরি কোমায় চলে যায়। নুরিকে নিয়ে কলকাতায় একা ফিরে আসেন অন্নপূর্ণা। আহত আদিল থেকে যান দূরদেশে একলা-জীবিত অথবা মৃত। চলচ্চিত্রজুড়ে দেখলাম অসুস্থ বাচ্চা আর বাবাকে নিয়ে দরিদ্র সংসারে অন্নপূর্ণার সংগ্রাম আর রোজ আদিলকে খুঁজে পাওয়ার আশায় একটা একটা করে দিন পার করা। আশার সমাপ্তি আসে একটা ফোনকলে; তারপর মায়ের বুকে শেষ হয় সন্তান নুরির নিঃশ্বাস। একই সঙ্গে সংগ্রামটা বোধহয় আরো অনেক কঠিন হয়ে যায় বাকি জীবনটার জন্য।
মধ্যপ্রাচ্য যখন কলকাতায়
বিশ্ব মূলত সবসময়ই যুদ্ধপ্রবণ। ইতিহাসে এমন যুগ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যে সময়ে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও কোনো জাতি-গোষ্ঠী অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ বা যুদ্ধে লিপ্ত ছিলো না। কিন্তু পার্থক্য হলো, অনেকদিন পর্যন্ত পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে এইসব যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব বুঝতে পারা কঠিন ছিলো। জীবনযাত্রা বা সংস্কৃতিতে প্রভাব পড়তো ঠিকই, কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে সব ঘটনা প্রবাহ জানা সম্ভব ছিলো না। ফলে একাত্ম হওয়া বা সমানুভূতি অনুভব করাও খুব একটা সহজলভ্য ছিলো না। তারপরে প্রযুক্তির উন্নয়নে প্রথম যখন এই একাত্মতা বোধের অনুভূতি মানুষ পেতে শুরু করলো, খুব সহজেই পৃথিবীর দুই পৃষ্ঠের দুটি জীবনযাত্রার সংগ্রাম আর যুদ্ধ একে অন্যকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করতে পারলো। মানুষ মানুষের কষ্ট দেখে প্রভাবিত হতে শিখলো, শিখলো চিন্তা করতে।
এখন ক্ষণে ক্ষণে যেকোনো ঘটনাপ্রবাহের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা জানা সম্ভব। সব তথ্য সহজলভ্য। সবাই সব ধরনের দুর্যোগ সম্পর্কে অবহিত। আর তাই বিশ্বজুড়ে ঘটে চলা যাবতীয় সংঘাতের প্রতি এখন মানুষের শুধু সহানুভূতি আসে, সমানুভূতি নয়। এখন মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে যাওয়া দুঃসহ হত্যাযজ্ঞ ভারত উপমহাদেশ থেকে কেবলই সংবাদ মনে হয়। মিয়ানমারের নিজ ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য ভাবনা খরচ করা বাকি বিশ্বের জন্য বোঝা হয়ে যায়। পাশের দেশে কেনো, পাশের শহরে ঘটে যাওয়া ঘটনাও সংবাদের বিবেচনায় ‘নৈকট্য’র সূত্রে পাঠকের যথেষ্ট কাছে আসতে পারে না। তাত্ত্বিকদের ভাষায়, প্রযুক্তি নাকি পৃথিবীকে ছোটো করে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু মোবাইলফোন সেট-টেলিভিশনের পর্দা থেকে সরিয়ে খোলা চোখে পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যায়, হাতের কাছের মানুষটিও যোজন দূরে চলে গেছে।
মানুষ এখন সাজানো নাটক আর চলচ্চিত্র দেখে কাঁদে, পৃথিবীর অন্য পৃষ্ঠে পড়ে থাকা শিশুর লাশ দেখে তার কান্না আসে না। তাই হয়তো শিল্পের সেই দায়িত্বটা নেওয়ার সময় এসেছে-যেনো একজন মানুষের আনন্দ বা কষ্ট আরেকজন অচেনা মানুষকে স্পর্শ করতে পারে। সমানুভূতি আর সহানুভূতির পার্থক্যটা খালি চোখে ধরা পড়া খুব সহজ নয়। অপ্রিয় সত্য, কষ্টকর বাস্তবতা থেকে নিজেকে দূরে রাখার জন্য মানুষের যে মানসিক আত্মরক্ষার (সেল্ফ ডিফেন্স) ধরন, তা খুব শক্তিশালী। আত্মরক্ষার এই খোলস বেশ শক্ত। তা ভাঙতে মানুষের মতোই সংবেদনশীল কিছু প্রয়োজন-শিল্প, মানব মনের দৃশ্যমান এক্সটেনশন।
মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে চলা নৃসংশতা যখন পৃথিবীর কাছে খুব সহজে সহনীয় হয়ে উঠেছে, তখন সেখানকার ধ্বংসলীলাকে চেনাজানা কলকাতায় নিয়ে এসেছেন নির্মাতা ইন্দ্রনীল। কলকাতার নিম্নমধ্যবিত্ত একটি পরিবারের ক্যানভাসে মানবতার সঙ্কটের ছবি এঁকেছেন তিনি। যেখানে জীবনের অর্থই নিরন্তন অনিশ্চয়তা আর সংগ্রাম; মৃত্যুর অস্বাভাবিকত্ব যেখানে স্বাভাবিক।
দুটি ভিন্ন মৃত্যু : অস্বাভাবিক মৃত্যুর স্বাভাবিকরণ
যেদিন অন্নপূর্ণার কাছে আদিলের মৃত্যু সংবাদ আসে, সেদিন পারলারে কাজের সূত্র ধরে একটা বাসায় গিয়েছিলেন তিনি। সেই বাসার গৃহিণীর শরীর ম্যাসাজ করে দিচ্ছিলেন অন্নপূর্ণা। এই বাড়ির মা-মেয়ের জীবন অন্নপূর্ণা আর নুরির থেকে ষোলো আনায় আলাদা। বাড়ির গৃহিণী হচ্ছেন সেবা গ্রহীতা, অন্নপূর্ণা সেবাদানকারী। কলকাতা শহরের এই বাড়ির মা তার শরীরে ম্যাসাজ করানোর সময় শুয়ে শুয়ে নিজের কিশোরী মেয়েকে ইংরেজি গানের সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর মতো আবেদনময়ী নাচের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। আর ওদিকে চলচ্চিত্রটির প্রথম দৃশ্যতে দেখতে পেলাম, বিদেশের মাটিতে বাস করেও হিন্দিভাষী বাবার মেয়ে নুরিকে অন্নপূর্ণা গাইতে শিখিয়েছিলেন শচীন দেববর্মনের ‘রঙ্গিলা রঙ্গিলা রঙ্গিলা রে, আমারে ছাড়িয়া বন্ধু কই গেলা রে’। বলেছিলেন বাংলা শুধু ভাষা না, মাতৃভাষা।
অন্নপূর্ণা যখন গৃহিণীর শরীর ম্যাসাজ করে দিচ্ছিলেন ঠিক সেই সময় অ্যাম্বাসির ফোন আসে অন্নপূর্ণার মোবাইলফোন সেটে। ব্যাকগ্রাউন্ডে উঁচু ভলিউমে বাজছে নাচের গান। তাই ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় যান অন্নপূর্ণা; যেনো ফোন পেয়ে অন্য একটা জগতে চলে গেছেন তিনি। এদিকে নাচের গান আর ফোনের ওপাশের কণ্ঠস্বরে মৃত্যু সংবাদ দেওয়ার চাপা অস্বস্তি দর্শক হিসেবে আমার মনের মধ্যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করে। যুদ্ধে নিখোঁজ আদিলের খোঁজ যখন আসবে, সেটা যে মৃত্যু সংবাদ হবে তা দর্শক হিসেবে আগে থেকেই বুঝেছিলাম। কিন্তু জানা গল্প উপস্থাপনের গুণে চরিত্রের অনুভূতির সঙ্গে দর্শককে একীভূত করার ক্ষমতা রাখে। আদিলের মৃত্যু সংবাদ অন্নপূর্ণার মধ্যে যে শূন্যতা তৈরি করে, যে একাকিত্ব তৈরি করে, তা নির্মাতা শহরের একটি লঙ শট্ ব্যবহার করেই বুঝিয়ে দেন। সেই নৈঃশব্দ আর একাকিত্বের মধ্যে মৃত্যু সংবাদটির আর সংলাপের প্রয়োজন হয় না। বাসার পাশে রেললাইন দিয়ে বিকট শব্দ করে ট্রেন চলে যায়। সেই যান্ত্রিক শব্দ যেনো অন্নপূর্ণার চিৎকার হয়ে আসে, না হয় চিৎকারটা ঢেকে দিতে। অন্নপূর্ণার সংগ্রামময় স্থবির জীবনে ধ্বংসের গতি হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে।
গতিশীলতা আর স্থবিরতা। চরম দু’টি বৈপরীত্য। মৃত্যু সংবাদটা অন্নপূর্ণার জীবনে একটা পরিবর্তন আনলো, একটা গতি আনলো বলে মনে হলো আমার। পরিবর্তন যে সবসময় সুখকর হবে, তা নয়। চরম বেদনাদায়ক হলেও মৃত্যুর খবরটা কেমন যেনো একটা গতি এনে দিলো; কিছু একটা পাল্টে গেলো। অন্নপূর্ণা বিধবা হলেন শাখা-সিঁদুর ফেলে, আর নুরি হলো পিতৃহারা। পরিবারটা বুঝতে পারলো, আর অন্তত অপেক্ষা করতে হবে না। আশা শেষ হয়ে গেছে। এবার নতুন কিছুর পালা।
এরপরই ১৪ মিনিট ১৬ সেকেন্ড থেকে হঠাৎ করে পর পর কয়েকটি খণ্ড দৃশ্য। সত্যি কথা বলতে, প্রথমবার দেখে বিশেষ খেয়াল করিনি। কলকাতার রাস্তা-ঘাট, দালান, মানুষের সাধারণ কিছু দৃশ্য। তবে একটু খেয়াল করতেই গভীরতর অনেক কিছু একসঙ্গে চোখে পড়ে গেলো!
ট্রেনটা চলে যেতেই প্রথমে কলকাতা শহরের একটি লঙ শট্; গিজগিজ করছে ঘরবাড়ি, তার পাশ দিয়ে চলে গেছে রেললাইন, শহরের শেষ সীমানায় একটা দালানের বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে অন্নপূর্ণা। বিশালতা, একাকিত্ব আর অসহায়ত্ব সব অনুভূতিগুলো একসঙ্গে টের পেলাম এই একটি শটেই। ১৪ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে রাস্তার পাশে একটা পুরনো ভবনের দৃশ্য। সামনে বিদ্যুতের এলোমেলো তার, আর পিলারের সঙ্গে ঝুলে আছে তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা। একটু আউট অব ফোকাসে বাতাসে দুলছে একটা পুরনো ব্যানার। দীর্ঘ ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা সি পি আই’কে (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া) নির্বাচনে পরাজিত করে ২০১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে টানা সাত বছর (২০১১-২০১৮) ক্ষমতায় বহাল তৃণমূল কংগ্রেস।
তৃতীয় দৃশ্যটিতে আছে নির্মাণাধীন বহুতল দালান; শহরের আর সবকিছু ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ উচ্চতা নিয়ে বেড়ে ওঠা একা একটি দালান। সামনে একটা পিলার থেকে একসঙ্গে উড়ে গেলো দুটো পাখি। হয়তো তারা ঘর বাঁধছে একসঙ্গে। চতুর্থ দৃশ্যটি আবারো কলকাতার একটি পুরনো বাড়ি। বাড়ির ছাদ থেকে ধুয়ে মেলে দেওয়া একটা শাড়ি ঝুলে আছে; ছাদে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা। একা, নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। জীবনে গতি নেই তার।
পঞ্চম দৃশ্যটায় অনেকজন যুবক-যুবতী কোনো এক দালানের সামনের সিঁড়িতে বসে আছে। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছে না। সবার হাতে মোবাইলফোন সেট, দৃষ্টি নিবদ্ধ তার স্ক্রিনে। একা বসে নেই তারা, আবার প্রত্যেকেই একা, প্রযুক্তির কৌশলে। জীবন চলছে, কিন্তু সময় যেনো থেমে গেছে! আগের সবগুলো দৃশ্যের অনুভূতি যেনো একসঙ্গে মাথার মধ্যে ভিড় করে ফেলে এই একটি দৃশ্যে। এই সবগুলো দৃশ্যের পুরো সময়টাজুড়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে শোনা যায়, অ্যাম্বাসির সার্ভিস লাইনের অস্পষ্ট শব্দ।
প্রতিটা দৃশ্য আগের এবং পরের দৃশ্যের বিপরীত। হঠাৎ করে চোখে পড়ে না, আমিও প্রথম বার ঠাওর করতে পারিনি। কিন্তু অনুভূতিটা এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। সূক্ষ্মভাবে খেয়াল না করলেও অনুভূতিটা কিন্তু মাথার মধ্যে আঘাত করেছে ঠিকই। জীবনের বৈপরীত্য আছে সেগুলোতে-গতিশীলতা আর স্থবিরতা। কিন্তু সময়টা চলছে, তার কোনো ক্লান্তি নেই; থাকে না কখনো।
পঞ্চম দৃশ্যটা নিয়ে আরো কিছু বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। দৃশ্যটিতে সেটের প্রতিটা অংশ উপস্থাপন করেছে সাম্রাজ্যবাদ আর প্রযুক্তির নজরদারি। সিঁড়িতে বসে আছে অনেকগুলো মানুষ, সবার হাতে মোবাইলফোন সেট। বসে থাকার যে ধরন, তাতে একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে সবাইকে নজরে রাখা যায়। মনে করিয়ে দেয় কারাগার, স্টেডিয়াম গ্যালারি ইত্যাদির নকশার কথা। আর প্রযুক্তি, আধুনিকতার নামে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিক্ষণে। মোবাইলফোন সেট আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে সবাইকে চোখে চোখে রাখছে সারাক্ষণ। এই নরজদারি সম্ভব হয়েছে বিচ্ছিন্নতার প্রভাবেই। একসঙ্গে বসে থেকেও এখন মানুষ আর নিজেদের মধ্যে কথা বলে না। যোগাযোগ হয়ে গেছে যান্ত্রিক। জীবনের সবকিছুই চলে গেছে ভার্চুয়াল জগতে। কারণ সাম্রাজ্যবাদ বরাবরই মানুষের ঐক্যকে ভয় পায়, বিচ্ছিন্নতা তাকে সুযোগ দেয় ফুলে ফেঁপে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠার।
এদিকে কাক্সিক্ষত হলেও আদিলের মৃত্যুর কথা ও নিজের এই পরিণতি অন্নপূর্ণা মেনে নিতে পারেননি। রাস্তার পাশে বসে বমি করে ফেলেন তিনি। অনুভূতিগুলো এতোটাই অসহ্যকর হয়ে যায় তার জন্য।
দ্বিতীয় মৃত্যুটি অন্নপূর্ণা আর আদিলের মেয়ে নুরির। মায়ের বুকে, মায়ের হাতেই শ্বাসরোধ হয় তার। আমার মনে হয়েছে, নুরির মৃত্যুর এই চিত্রায়ণ নির্মাতার জন্য খুব স্পর্শকাতর একটি ঝুঁকি ছিলো। দৃশ্যটিতে অন্নপূর্ণা যখন নিজের আদরের শিশুটিকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে তার শ্বাসরোধ করে ফেলছেন, সেসময় আমি অবাক আর অস্বস্তি নিয়ে খেয়াল করলাম, নির্মাতা প্রতিটি শটে আশপাশের বাড়ি আর সেখানকার মানুষের প্রতিদিনের জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্ম দেখাচ্ছেন। এই চরম অস্বাভাবিক হত্যাকাণ্ডটিকে স্বাভাবিক কাজের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে প্রকাশ করেছেন তিনি। সবার জীবন গতিশীল। শুধু দুইটা জীবন থেমে গেলো। মায়ের বুকে মৃত্যু হলো মেয়ের; সেই সঙ্গে নিজের সন্তানের শ্বাসরোধের মাধ্যমে একজন মায়ের জীবনও স্থির হয়ে গেলো ওই মুহূর্তটায়। মানবতা, মাতৃস্নেহ সবকিছু কি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশের মতো ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়ে গেলো? নাকি এই অসহ্য, অসহায় জীবনটা থেকে শেষমেষ মুক্তি চাইলো অন্নপূর্ণা?
পর্দাজুড়ে প্রতীকের খেলা
ভালবাসার শহর-এ নির্মাতা একসঙ্গে অনেকগুলো বিষয়কে সামনে আনতে চেয়েছেন বলে আমার মনে হয়েছে। কয়েকবার চলচ্চিত্রটি দেখে টের পেলাম-যেই যুদ্ধের কথা বলেছে ভালবাসার শহর তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা সিরিয়ার যুদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ জীবনের। চলচ্চিত্রের তিন মিনিট ৪০ সেকেন্ডে অন্নপূর্ণা সকালবেলা তার অচেতন অসুস্থ মেয়েকে পরিষ্কার করে জামা পরাচ্ছেন। ওদিকে চার মিনিট নয় সেকেন্ডে অন্নপূর্ণার বাবা ছাদে রাখা টবের গাছগুলোর শুকনো-মরা পাতাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছেন। পরপর এই দৃশ্য দুটি জীবনের নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে।
অন্নপূর্ণা যে বিউটি পারলারে কাজ করতেন, সেখানকার আরেকজন নারী তাকে একটি বিকল্প রাস্তায় উপার্জনের প্রস্তাব দেন। পুরুষ ক্লায়েন্টের বাসায় গিয়ে তাদের শরীর ম্যাসাজ করা ও যৌন আনন্দ দেওয়া। তিনি বলেন, এই কাজ করে অন্নপূর্ণার পক্ষে একবেলাতেই পুরো সপ্তাহের সমান রোজগার করা সম্ভব। কিন্তু নিজের নৈতিক-সামাজিক-ধর্মীয় মূল্যবোধ অন্নপূর্ণাকে তাতে রাজি হতে সায় দেয় না, আবার নিজের অসহায়ত্বের চাপে মুখের ওপর তিনি মানাও করতে পারেন না। তাই একজন ক্লায়েন্টের ফোন নম্বর নিয়ে রাখেন অন্নপূর্ণা। অথচ মনের মধ্যে চলতে থাকে অবিরাম যুদ্ধ। একদিকে অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসা আর বাড়ির খরচ, অন্যদিকে তার নৈতিকতা। সারাদিন ১২-১৪ ঘণ্টা নানারকম কাজ করেও যখন নিজের পরিবারকে সামাল দিতে পারছেন না, তখন বাধ্য হয়েই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে হয় অন্নপূর্ণাকে।
কথায় আছে, একজন মানুষের নাম তার চরিত্রের ওপর অনেক প্রভাব ফেলতে পারে। আর চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আমার ধারণা, একটি চরিত্রের নাম ও তার পরিণতি দর্শকের অনুধাবনের ওপর তার থেকেও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। ভালোবাসার শহর কলকাতায় অভাব, কষ্ট, অসহায়ত্ব আর দুশ্চিন্তায় জর্জরিত নারীচরিত্র অন্নপূর্ণা। দেবীর নামে নাম তার, সার্বজনীন অন্নের দেবী, অভাব পূরণকারী। কী চমৎকার বৈপরীত্য! অন্যদিকে তার স্বামী আদিল; আদিল অর্থ ন্যায় পরায়ণ, ন্যায় বিচারক। আদিলের মৃত্যু হলো যুদ্ধে, যেখানে মৃত্যু হয় মানবতার। অন্নপূর্ণা আর আদিলের সন্তান নুরি; জ্যোতিময় বা আলোকিত। যুদ্ধের ছোবলে বিছানায় নিথর পড়ে থাকে ছোট্ট নুরির দেহ। চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক সব আলোচনা করতে গিয়েও আমার বার বার একটা কথাই মনে হয়েছে, ভালবাসার শহর শুধু একটি পরিবারের কথা নয়, চরিত্রগুলো হয়তো শুধু মানুষ নয়। দেখতে গিয়ে খালি মনে হয়েছে, মানবতা যেনো দম আটকে মরে যাচ্ছে তার একমাত্র আশ্রয়ে-মানুষের বুকে।
চলচ্চিত্রটির ২৭ মিনিট ৩২ সেকেন্ড থেকে ২৯ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড পর্যন্ত টপ শটে দেখলাম দুটি শহর। রঙিন কলকাতা থেকে শুরু হলো যাত্রা, দালানের মাথাগুলো অক্ষত, রাস্তায় চলন্ত গাড়িগুলো ছোটো ছোটো দেখা যায়, হলুদ রঙয়ের ট্যাক্সিক্যাবগুলো কলকাতার পরিচয় দিচ্ছে। ধীরে ধীরে শহরের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে আসে, কলকাতার ছাপ মুছে গিয়ে স্পষ্ট হতে থাকে ধ্বংসের ছাপ। দালানগুলো সব ছাদ থেকে আধা-ভাঙা, জনমানবশূন্য রাস্তা, যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটা শহর-সিরিয়ার হোমস্। কলকাতা থেকে কাট টু শটে কখন যে হোমসে পৌঁছে গেলাম, চোখ যেনো তা টেরই পেলো না! দর্শকের মনের অজান্তেই নির্মাতা বুঝিয়ে দিলেন এই পরিবর্তন কতো সহজ! কীভাবে মুহূর্তে হারিয়ে যেতে পারে সব প্রাঞ্জলতা! কাট টু-এর সময় পর্দায় কাটা কাটা ঢঙে লেখা আসতে থাকলো-
হোমস। দু’হাজার বছরের একটি শহর।
২০১১-এর আগে প্রতিদিন এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ দিনের শেষে তাদের প্রিয়জনদের কাছে ফিরতো
এখনও যেমন ফেরে কলকাতায় ঢাকায় মুম্বইতে [মুম্বাইতে] লাহোরে ...
ব্যাকগ্রাউন্ডে ভেসে আসে ‘বন্ধু রঙ্গিলা রঙ্গিলা রঙ্গিলা রে, আমারে ছাড়িয়ারে বন্ধু কই গেলা রে ...’। এখনো আমাদের শহরে দিনশেষে প্রিয় মানুষটির ঘরে ফিরে আসাটাই স্বাভাবিক। হোমসে হয়তো এই স্বাভাবিক ঘটনা এখন সারাদিনের প্রার্থনা। বিষয়টা প্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিম বা পূর্বের নয়। বিপর্যয়টা একটি দেশ বা শহরের নয়। যে ভালবাসার শহরকলকাতার জীবন নিয়ে এই গল্প, সেরকম হাজারো ভালোবাসার শহর আছে এই পৃথিবীর বুকে। কলকাতায়, ঢাকায়, মুম্বাইতে, লাহোরে এখনো আমাদের ঘরের মানুষগুলো ফিরে আসে বলেই যে আমরা নিরাপদ, এমনটা ভাবা চূড়ান্ত বোকামি। প্রতিরোধ না করলে হোমসের মতো কলকাতাও হয়তো একদিন রঙহীন, ধুলো ওড়া, নিঃস্তব্ধ শহরে পরিণত হতে পারে। অসাড় হয়ে যেতে পারে পৃথিবীর যেকোনো ভালোবাসার শহর।
লেখক : অধরা মাধুরী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।
adharamadhuri18@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. https://www.brainyquote.com/quotes/orson_welles_132082; retrived on: 30.04.2018
২. https://www.brainyquote.com/quotes/steven_spielberg_584033; retrived on: 30.04.2018
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন