হিরু মোহাম্মদ
প্রকাশিত ১৫ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
জাফরের দ্য সার্কেল
দিনশেষে বৃত্তেই বাঁধা থাকলো নারী
হিরু মোহাম্মদ

ক্যামেরাই যে তার জীবন
শিল্পীর মনে থাকে সৃষ্টির নেশা; সেই নেশার টানে শিল্পী কখনো ছুটে যায় প্রকৃতির কাছে আবার কখনো জীবনের কাছে। সেসব জায়গা থেকে তুলে আনা বাস্তবতা তারা রূপ দেয় শিল্পকর্মে। কারো কারো শিল্পকর্মে অবশ্য বাস্তবতার চেয়ে বেশি কিছু থাকে। যা প্রচলিত শিল্পভাবনাকে ছাড়িয়ে কথা বলে প্রান্তিক মানুষের, হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানবিরোধী। এতে কখনো কখনো রাষ্ট্রের টনক নড়ে, প্রশ্ন ওঠে শিল্পীর সাহস ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে। এসব ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই শিল্পীর ওপর নেমে আসে খড়গ। এটা কখনো আঘাত হানে সৃষ্ট শিল্পে, আবার কখনো শিল্পীর জীবনে। সময়ের স্রোতে শিল্পের অন্যান্য অনেক ফর্মে এই ঝুঁকি কিছুটা কমলেও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে বরং বেড়েছে। কোনো চলচ্চিত্রনির্মাতা যখন রাষ্ট্র-সমাজের চলমান পরিস্থিতি সেলুলয়েডে তুলে ধরে, তখন তা অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের মাধ্যম। সেই চলচ্চিত্রের ভাষা হয় রাষ্ট্র ও সমাজের শোষণের বিরুদ্ধে; তা কখনো কখনো উদ্বুদ্ধ করে, সাহস জোগায় প্রতিবাদ করতে।
তবে রাষ্ট্রযন্ত্র বসে থাকে না, নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে শত্রু মনে করে চলচ্চিত্র এবং এ সংশ্লিষ্ট সবাইকে। ফলে দেশে দেশে এ ধরনের নির্মাতারা রাষ্ট্রের রোষানলে পড়ে, বাধা আসে চলচ্চিত্র নির্মাণে, কখনো গৃহবন্দি কিংবা জেলে যেতে হয়; এমনকি কখনো দেশ ছাড়া হতে হয়। পৃথিবীতে এ ধরনের নির্মাতার সংখ্যা কম নয়-যুক্তরাষ্ট্রের চ্যার্লি চ্যাপলিন থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার ফার্নান্দো সোলানাস, অক্টোভিয়া গেতিনো, তুরস্কের ইলমাজ গু’নে, আফ্রিকার উসমান সেমবেন, সুলেমান সিসে, ইরানের মোহাম্মদ রসুলভ, জাফর পানাহি অন্যতম। এরা প্রত্যেকেই চলচ্চিত্রে রাষ্ট্র-সমাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, কথা বলেন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। কেউ কেউ রাষ্ট্রকে কখনো কিছুটা ছাড় দিয়েছে, আবার কখনো রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছে। আবার কেউ কেউ রাষ্ট্রকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে রাজি হয়নি।
শেষভাগের নির্মাতাদের অবশ্য রাষ্ট্রও কোনোভাবে ছাড় দেয় না। চলচ্চিত্রে প্রতিবাদের ভাষা যতো বেশি হয়, নির্মাতাদের ওপর রাষ্ট্রীয় চাপের মাত্রা ততোই বাড়তে থাকে। কিন্তু দু-একজন কোনোভাবেই মাথা নত করে না। রাষ্ট্র তার প্রভুত্বের সবটুকু দিয়ে সেসব নির্মাতাকে দমানোর চেষ্টা করে, কেড়ে নেয় বাকস্বাধীনতা, নিষিদ্ধ করে তার চলচ্চিত্র এবং নিষেধাজ্ঞা আসে চলচ্চিত্র নির্মাণে। তেমনই একজন নির্মাতা জাফর পানাহি। যার প্রতিটি চলচ্চিত্রে উঠে আসে ইরানি রাষ্ট্র-সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সব সমালোচনা। ফলে সরকারের সঙ্গে পানাহির দ্বন্দ্ব শুরু হয় চলচ্চিত্র নির্মাণের শুরুতেই। বেশ কয়েক বার জাফর নানা কারণে গ্রেপ্তারও হন। নিজ দেশে নিষিদ্ধ হয় তার চলচ্চিত্র দ্য সার্কেল (২০০০), ক্রিমসন গোল্ড (২০০৩), অফসাইড (২০০৬)।
তার পরও যখন জাফরকে দমানো যাচ্ছিলো না, তখন তার বিরুদ্ধে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তায় হুমকি এবং ইসলামিক রিপাবলিকের প্রোপাগান্ডার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এর দায়ে ২০১০ খ্রিস্টাব্দে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় ছয় বছর। শাস্তি এখানেই শেষ নয়, কারাগারে থাকাকালীন কোনো স্ক্রিপ্ট লিখতে পারবেন না জাফর। গল্প, স্মৃতিকথা, ডায়েরি এগুলো লেখাও নিষিদ্ধ ছিলো। এমনকি পরবর্তী ২০ বছর তার জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ নিষিদ্ধ; এছাড়া এই সময়ে তিনি কোথাও কোনো সাক্ষাৎকার দিতে পারবেন না এবং দেশের বাইরে যাওয়া বন্ধ। এই নিষিদ্ধ জাফর পানাহির নিষিদ্ধ চলচ্চিত্র দ্য সার্কেল নিয়ে মূলত এই প্রবন্ধের আলোচনা। দ্য সার্কেল নিয়ে আলোচনার আগে পানাহির নিষিদ্ধ চলচ্চিত্রগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
নিষিদ্ধ জাফরের নিষিদ্ধ কর্ম!
নির্মাতা জাফর পানাহি প্রতিটি চলচ্চিত্রে তুলে আনেন সমসাময়িক ইরানকে; বিশেষ করে ইরানের সামাজিক, রাজনৈতিক সমস্যাকে। অন্যভাবে বললে, তার চলচ্চিত্র ইরানের মানুষের নানা সমস্যার ‘প্রতিচ্ছবি’। কিন্তু রাষ্ট্র তো জনগণের সমস্যা দেখতে অভ্যস্ত নয়, তাই গোল বাঁধে। দ্য সার্কেল, ক্রিমসন গোল্ড ও অফসাইড নিয়ে সেই গোলই বেঁধেছিলো। ফলে তা নিষিদ্ধ হয় ইরানে। এখন দেখা যেতে পারে, কী আছে এসব চলচ্চিত্রে। দ্য সার্কেল মূলত ইরানি সমাজে নারীর পরাধীনতার গল্প। যেখানে নারী চাইলেও অনেক কিছু করতে পারে না। নিজের কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া তো দূরের কথা, একা এক স্থান থেকে অন্য স্থানেও যেতে পারে না। সংসার-সমাজের বেশিরভাগ নেতিবাচক বিষয়ের দায়ভার নিতে হয় নারীকেই।
মানুষ কেনো অপরাধে জড়ায়, এরপর তার মনে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়; এর পরিণতি ঠিক কোন দিকে যায়-এমন একটি গল্প নিয়ে ক্রিমসন গোল্ড। সেখানে এক ছিচকে ছিনতাইকারীর ডাকাত হয়ে ওঠা এবং শেষ পরিণতি হিসেবে তার আত্মহত্যা করা দেখানো হয়। ক্ষমতা-কাঠামোর বাইরে থাকা প্রান্তিক মানুষেরা যে সবসময় অবহেলিত, নির্যাতিত তারই খণ্ডচিত্র উঠে এসেছে অফসাইড-এ। কয়েকজন নারী ফুটবলপ্রেমীর স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যাওয়া এবং সেখানে ঢুকতে গিয়ে যেসব বাধার সম্মুখীন হতে হয় তা-ই তুলে ধরা হয়েছে এখানে। শত চেষ্টার পরেও নারীরা স্টেডিয়ামে ঢুকতে পারে না। শেষ পর্যন্ত যেনো গোল করতে না পেরে অফসাইড হয়ে ফিরে আসতে হয় তাদের।
নারী মানেই বোঝা!
মহাভারতের কাম্পিল্য রাজ্যের রাজা দ্রুপদ প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও মেয়ে দ্রৌপদীকে কোনোভাবেই দেবতাদের কাছ থেকে নিতে চাননি। তার বিশ্বাস মেয়েরা কখনো বাবার কোনো উপকারে আসতে পারে না, পারে না পরিবারকে সাহায্য করতে। রাজা দ্রুপদের এও ধারণা, মেয়ে সন্তান মানেই অভিশাপ, অপমান! তাই তিনি শুধু ছেলে সন্তান কামনা করেন। নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য তিনি যেকোনো মূল্যে আশা করেন ছেলে সন্তানের। কিন্তু দেবতাদের ইচ্ছানুযায়ী ছেলের পরেই মেয়ে দ্রৌপদীর ‘জন্ম’ হলে, রাগে-ক্ষোভে তিনি দ্রৌপদীর জন্য সারাজীবন দুঃখ বর কামনা করেন। যাতে দ্রৌপদী সারাজীবন দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেন।
মহাভারতের ওই কাল বহু আগে শেষ হলেও মেয়ে সন্তান সম্পর্কে যে ধারণা সেটা কিন্তু এখনো রয়ে গেছে। তেমনটা দেখা মেলে দ্য সার্কেল-এর একেবারে শুরুতে। এক প্রসূতি মায়ের দীর্ঘ আর্তনাদ শেষে নবজাতকের কান্না ভেসে আসে। সেই কান্নায় খুশি চিকিৎসকরাও। আনন্দের সংবাদ দেওয়া হয় বাইরে অপেক্ষমান নানীকে-‘তার মেয়ে সুন্দর এক মেয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন’। কিন্তু সেই আনন্দের খবর শুনে চুপসে যান তিনি! কিছুটা সময় থেমে আবার চিকিৎসককে ডেকে প্রশ্ন করেন, তার মেয়ে কী সন্তান জন্ম দিয়েছেন? চিকিৎসক আবারও নিশ্চিত করেন, তার মেয়ে সত্যিই মেয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এই শুনে তিনি আরো চুপসে যান।
তিনি চিকিৎসককে বলেন, ‘আমি আশা করেছিলাম আমার মেয়ের ছেলে সন্তান হবে। ওর শ্বশুরবাড়ির সবাইও ছেলে সন্তান চায়। কিন্তু তাদের ওই ইচ্ছা আমার মেয়েটা পূরণ করতে পারলো না। তাই শাস্তি হিসেবে এখন অভাগা মেয়েটাকে তালাক দেওয়া হবে।’
নানী ছাড়াও চিকিৎসাকেন্দ্রে থাকা অন্য স্বজনরাও মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়াটাকে খুবই খারাপভাবে দেখে। তাই তারা বার বার এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতে থাকে। এজন্য তারা মাকেই দায়ী করে। শেষ পর্যন্ত তাই হয়তো মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য নারীকে তালাক দেওয়ার কথা শুনতে হয় এবং দেওয়াও হয়! কিন্তু জানা কথা হলো, সন্তান ছেলে বা মেয়ে হওয়ার ব্যাপারে নারী বিন্দুমাত্র ভূমিকা রাখে না। পুরোটা নির্ভর করে পুরুষের ওপর। অথচ এর যাবতীয় দায় নারীকেই নিতে হয়। তাই চলচ্চিত্রে এক ঘণ্টা এক মিনিটে দেখা যায়, এক মা তার মেয়েকে হোটেলের সামনে রেখে গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে আছেন। যাতে কেউ এসে তার মেয়েটাকে নিয়ে যায়। কারণ ওই মেয়ে তার কাছে সামাজিকভাবে ‘বোঝা’, যা থেকে তিনি মুক্তি চান! যদিও মা-সন্তানের মধ্যকার সম্পর্কের কাছে ওই মা বার বার পরাজিত হন। তারপরেও ত্যাগ করতে চান মেয়েকে। কোন পরিস্থিতিতে একজন মা তার সন্তানকে ত্যাগ করতে চায়, তা আরো পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী শিরিন এবাদির বয়ান খুবই গুরুত্বপূর্ণ-
সন্তানের প্রতি বাবার নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবারের অন্যান্য কর্মচারী বিব্রত হলো। আমার ভাইকে তারা তাদের ভবিষ্যতের মনিব হিসেবে ভাবতে শুরু করলো; এবং তারা চাইতো সে যেন তখন থেকেই পরিবারের বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের ওপর কর্তৃত্ব খাটাতে শুরু করে। তারা যেভাবে দেখে এসেছে, তাতে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ভাবনা ছিলো ছেলেদের একটু বিশেষ ধরনের স্বাধীনতা পাওয়া উচিত। ১
নজরদারি চলছে, চলবে!
রাষ্ট্র সবসময় প্রচার করে জনগণের প্রয়োজনে ও কল্যাণে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র যাই বলুক না কেনো, বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করে তারা নিজের প্রয়োজনে সর্বদা জনগণকে ব্যবহার করে। তারাই রাষ্ট্রের গায়ে কল্যাণের চাদর মুড়িয়ে জনগণের কল্যাণ, জনগণের কল্যাণ বলে মন্ত্র জপে। জনগণকে বিভ্রমে রাখে কল্যাণের জোয়ারে, বুঝতে দেয় না রাষ্ট্রের ‘আসল চরিত্র’। অন্যদিকে সবসময় চলে জনগণের ওপর রাষ্ট্রের নজরদারি। যে নজরদারিতে ঘর-বাড়ি, দোকান, অফিস-আদালত, পথ-ঘাট কোনো কিছুই বাদ পড়ে না। তবু রাষ্ট্র নিজেকে নিরাপদ মনে করে না, বিশ্বাস পায় না কোনো কিছুতেই। এই বুঝি কে কোন দিক থেকে তার ‘পাপ’ দেখে ফেলে। এই ভেবে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, চিত্রকলা শিল্পের প্রত্যেক শাখা থেকে শুরু করে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রসহ সব মাধ্যমের ওপর প্রভুত্ব চালায় রাষ্ট্র। যাতে কোনোভাবে তার ‘পাপের আঁচ’ জনগণের কাছে না পৌঁছায়।
দ্য সার্কেল-এর ১১ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে দেখা যায়, রাস্তার পাশে ছোটো এক খোলা দোকান, যাতে কিছু বইসহ সংবাদপত্র রয়েছে। পথচারীরা চলাচল করার সময় দু-চার জন সেগুলো পড়ছে আবার কেউ কেউ কিনছে। হঠাৎই সেখানে হাজির রাষ্ট্রের প্রতিনিধি দুই পুলিশ এবং কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগে দোকানের দায়িত্বে থাকা বালকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় সংবাদপত্রগুলো। বালক অবশ্য অনেক অনুরোধ করে সংবাদপত্রগুলো না নিয়ে যেতে এবং বলতে থাকে, দোকানের মালিক আব্দুল্লাহ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কিন্তু তার কথায় কর্ণপাত না করে পুলিশ চলে যায়। তাদের যেনো কারো কোনো কথা শোনার সময় নেই; না জীবিকার কথা, না ভবিষ্যতের কথা। তাদের লক্ষ্য, যেনো কেউ কোনোভাবে রাষ্ট্রের সমালোচনা করতে না পারে। তাই কোনো কিছুর চিন্তাভাবনা না করে তারা সংবাদপত্রগুলো নিয়ে যায়। অবশ্য এই সংবাদপত্র নিয়ে রাষ্ট্রের শঙ্কার জায়গা; যখন কোনো রাষ্ট্র নিজের ওপর আস্থা রাখতে পারে না অথবা অন্যায়কে আড়াল করতে চায়, তখন যেকোনো কিছুতেই রাষ্ট্র ভয় পায়। এই ভয় পাওয়ার পিছনে অবশ্য যথেষ্ট যুক্তিও আছে। পৃথিবীর যতো ছোটো-বড়ো বিপ্লব, বিদ্রোহ সবকিছুতেই শিল্প, সাহিত্য, গণমাধ্যমের বড়ো ধরনের ভূমিকা আছে। আবার গণমানুষের কণ্ঠকে দমিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও শিল্প, সাহিত্য, গণমাধ্যমকে ব্যবহারের অনেক দৃষ্টান্ত রেখেছে রাষ্ট্র।
এদিকে দ্য সার্কেল-এর তিন বান্ধবী নার্গিস, অরিজু ও পারির মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রভুত্ব এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে, পুলিশের গাড়ির হর্ন শুনলেই তারা ভয়ে লুকায় আবার কেউ চমকে ওঠে। রাস্তার দোকানদার থেকে শুরু করে টিকিট কাউন্টারের লোক প্রত্যেকেই তাদের ওপর নজরদারি করে। কেউ বলে, রাস্তার খোলা জায়গায় সিগারেট খাওয়া যাবে না, আবার কেউ বলে, সঙ্গী ছাড়া মেয়েরা একা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারবে না। যদিও নার্গিস অনেক অনুরোধ ও মিথ্যা বলে একটি বাসের টিকিট সংগ্রহ করতে সক্ষম হন, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না। কারণ রাষ্ট্রের প্রভুত্ব স্থাপনকারী পুলিশ সবসময় পাহারায় বাস টার্মিনালে, সেই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে নার্গিস কোনোভাবেই বাস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না।
কীসে হয় অধিকার!
দ্য সার্কেল-এ পারি গর্ভপাতের জন্য চিকিৎসকের কাছে যান, কিন্তু কোনো চিকিৎসক এটা করতে রাজি হয় না। কারণ পারির সঙ্গে স্বামী, বাবা, ভাই কোনো ধরনের পুরুষ নেই; কিংবা নেই কোনো পুরুষ অভিভাবকের অনুমতিপত্র। যদিও পারি বার বার চিকিৎসককে বোঝানোর চেষ্টা করেন, তার স্বামী মারা গেছেন; কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয় না। শেষ পর্যন্ত পারিকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়। এমনকি নিজের সেবিকা বান্ধবী ইলহামও বুঝতে চান না পারিকে, যার সঙ্গে তিনি দীর্ঘ দিন চলেছেন। পারি কোনো উপায় না দেখে চলচ্চিত্রের ৫৪ মিনিট আট সেকেন্ডে ইলহামকে প্রশ্ন করেন, ‘আমি এখন কী করবো?’ তার উত্তরে ইলহামকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি জানি না, কিছুই জানি না।’ পারি তাকে আবার বলেন, ‘তোমার সঙ্গে কতো চিকিৎসক!’ এর জবাবে ইলহাম বলেন, ‘তোমার গর্ভপাত কে করাবে? কেউ করাবে না, সেটা আমি জানি, তুমিও জানো! তাছাড়া প্রথমবার মা হচ্ছো, ইতোমধ্যে তুমি চার মাসের গর্ভবতী। তোমার বাবার অনুমতি বা কাগজপত্র ছাড়া কে তোমার গর্ভপাত করাবে?’ অথচ ইলহাম কিন্তু সবকিছুই জানেন, পারির স্বামী নেই; তার বিয়েও হয়নি। একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি সন্তানসম্ভবা হয়েছেন। তাই পারির গর্ভপাত ছাড়া কোনো উপায় নেই, যাওয়ার মতো কোনো জায়গায়ও নেই।
সবকিছু জেনে বুঝে ইলহামের কিছু করার থাকে না পারির জন্য, কারণ তিনি পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজের অনুশাসনের জালে আবদ্ধ। সেই অনুশাসনে নারীরা চাইলেও বেশিরভাগ সময়ে মানুষ থাকতে পারে না, কোনো না কোনোভাবে পুরুষ হয়ে ওঠে! এই পুরুষ হয়ে ওঠা অবশ্য শারীরিক নয়, মানসিক। নারীরা তখন পুরুষের মতো করে সমাজের সবকিছু বিচার করে। অনেক ক্ষেত্রে করতে বাধ্য হয়! পারির দীর্ঘদিনের একসঙ্গে চলা বান্ধবী ইলহাম চাইলেও তার চিকিৎসক স্বামীকে গিয়ে বলতে পারেন না বান্ধবীর গর্ভপাত করানোর কথা। যদিও এক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত ‘দুর্বলতা’ আছে। তিনি চাইলেও পারির পরিচয় স্বামীর কাছে বলতে পারেন না, কারণ পারির পরিচয় দিলে ইলহামের অতীত সামনে চলে আসবে। তিনি যে একসময় পকেটমার ছিলেন, পারিদের সঙ্গে কাজ করতেন। এটা প্রকাশ হলে হয়তো তার দাম্পত্য জীবনে সঙ্কট তৈরি হবে।
শেষ পর্যন্ত বান্ধবীর কাছে কোনো সাহায্য না পেয়ে চলে যাওয়ার সময় ইলহামকে উদ্দেশ করে পারি বলেন, ‘তুমি অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছো।’ তখন পারির কথার কোনো জবাব দেন না ইলহাম। কারণ তিনি পরিবর্তনকে মেনে নিয়েছেন।
ইরানি সমাজে মূলত নারীর জীবনের দাম পুরুষের জীবনের অর্ধেক মনে করা হয়।২ অর্ধেক মানে ‘অপূর্ণ’, আর অপূর্ণ কোনো নারী গর্ভপাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। যেখানে একজন পুরুষ সঙ্গী ছাড়া একজন নারী একটি বাসের টিকিটও কিনতে পারে না, রাস্তায় চলতে হলেও একজন পুরুষ সঙ্গীর দরকার হয়; আবার বিবাহবিচ্ছেদের জন্য একজন নারীকে তার স্বামীর অনুমতি নিতে হয়, সেখানে পারিরা কোনোভাবেই গর্ভপাত করতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে ইরানের আইন অনুযায়ী ‘অবৈধ’ সম্পর্কের দায়ে পারিকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার বিধানও রয়েছে। সেখানে ব্যক্তির পছন্দানুযায়ী যৌন সম্পর্কের চিন্তা একেবারেই অকল্পনীয়।
অথচ ইরানের সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদের (ক)-এ নারীদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি এবং নারীর অধিকারের কথা বলা হয়েছে। যে অধিকার শারীরিক এবং মানসিক উভয়ই।৩ কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ সম্পূর্ণ ভিন্ন, নারী পারির শরীর ও মনের চাওয়া পাওয়ার অধিকার নেই। তিনি চাইলেও নিজের ভালো-মন্দের কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। পুরুষরাই সিদ্ধান্ত দিবে পারিদের। তারাই পারিদের নামে ভালো-মন্দ, পছন্দ-অপছন্দ বাছবিচার করে হুকুম দিবে। এতে কারো মত-দ্বিমত আছে কিনা, সে বিষয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই।
অন্যদিকে ইসলাম ধর্মে গর্ভপাত সম্পর্কে কী বিধান রয়েছে সেটা দেখে নেওয়া যেতে পারে। কারণ বিশ্বে ইরানই একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে সবকিছু ইসলাম অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ইসলামে সরাসরি গর্ভপাত নিয়ে কোনো আয়াত নেই। তবে সূরা আল-মায়িদা ২৭-৩০ আয়াতে বলা হয়েছে-‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার জন্য কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করল, আর কেউ কারও প্রাণরক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।’৪ আর এই আয়াতকেই অধিকাংশ ইসলামি চিন্তাবিদ গর্ভে থাকা ভ্রুণের ক্ষেত্রে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি বলেই স্বীকৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, এক নারী ব্যভিচার (অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক) করে এসে নবী মুহাম্মদ (স.)-এর কাছে ইসলাম অনুযায়ী তার নিজের শাস্তি দাবি করেন। কিন্তু নবী তাকে সন্তান না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। কারণ নবী যুক্তি দেন, যেহেতু ওই নারী ব্যভিচার করেছেন তাই তার শাস্তি প্রাপ্য, কিন্তু তাদের মিলিত হওয়ার ফলে তার গর্ভে যে সন্তান জন্ম নিয়েছে সেই শিশুর তো কোনো অপরাধ নেই।৫ ফলে সূরা মায়িদাহ্-তে যে আত্মার কথা বলা হয়েছে এক্ষেত্রে এ আত্মার মিল রয়েছে।
অন্যদিকে কেউ যদি মনে করে, দারিদ্র্যের জন্য আগত শিশুকে লালনপালন করা তার পক্ষে সম্ভব নয় এবং সেই ভয়ে গর্ভের ভ্রুণকে হত্যা করবে, তাহলেও ইসলাম অনুযায়ী সেটা মহাপাপ বলে বিবেচিত হবে। এ বিষয়ে সুরা বনি-ইসরালের ৩১ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে দারিদ্র্যভয়ে হত্যা কোরো না। ওদেরকে ও তোমাদেরকে আমিই জীবিকা দিয়ে থাকি। নিশ্চয় ওদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।’৬
কিন্তু দ্য সার্কেলজুড়ে এ সংক্রান্ত কোনো ইঙ্গিত বা কথা বলা হয়নি। বরং পারি চাইলেই গর্ভপাত করতে পারবেন; সেক্ষেত্রে শুধু অভিভাবক হিসেবে পুরুষের অনুমতি দরকার। এর মানে পুরুষরা চাইলেই এ সমাজে অনেক কিছু করার সুযোগ আছে! তাতে রাষ্ট্র-সমাজের খুব বেশি অসুবিধা হয় না!
কেনো এই পর্দা!
দ্য সার্কেল-এর পাঁচ মিনিট ১০ সেকেন্ডে দেখা যায়, নার্গিস ও অরিজু’কে রেখে মেদিহ একা একটি সোনার চেইন বিক্রির জন্য যাচ্ছেন। যতোদূর সম্ভব নার্গিস, অরিজু ও মেদিহ মিলে অবৈধ কোনো উপায়ে ওই চেইনটি হস্তগত করেছিলো। রাস্তায় হঠাৎই একজন পুরুষ মেদিহ’র হাত থেকে চেইনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে পালিয়ে যায়। পাশ থেকে এ ঘটনা দেখে পুলিশ দৌড়ে এসে মেদিহকে ধরে ফেলে। এটা দেখে নার্গিস আর অরিজু ভয়ে গাড়ির আড়ালে লুকায়। তারা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে থাকে মেদিহর সঙ্গে পুলিশের আচরণ। তবে আড়ালে থেকেও তারা স্বস্তি পাচ্ছিলো না, কারণ পুলিশের অন্য গাড়ি তখন যাতায়াত করছিলো। ফলে যেকোনো মুহূর্তে পুলিশ তাদের এই লুকোচুরি দেখে সন্দেহ করতে পারে। তাই তাদের ভয় শুধু পুলিশকে নিয়ে, এর বাইরে চারপাশে কী হচ্ছে, তা তারা খেয়ালই করছিলো না। একপর্যায়ে নার্গিস ও অরিজু ব্যাগ থেকে কালো চাদর বের করে স্কার্ফের উপর পরে। এভাবে কিছু সময় থাকার পর তারা দুজন রাস্তা থেকে পাশের এক গলিতে ঢুকে যায়। গলিতে ঢুকেই তারা চাদর খুলে ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলে।
আবার ৩১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে নার্গিস যখন বাস স্টেশনে পুলিশের ভয়ে ছোটাছুটি করেন, তখনো তিনি চাদর দিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখেন। তাদের এই আচরণ দেখে মনে হয়, শুধু পুলিশের হাত থেকে বাঁচতেই নার্গিসরা কালো চাদর গায়ে মোড়ায়। চলচ্চিত্রজুড়ে অন্যান্য নারীদেরও স্কার্ফ আর চাদর পরে বাইরে চলাচল করতে দেখা যায়; মনে হয় ইরানের সব নারী নিজে থেকেই এই পর্দা করে। অথচ এই বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে দেখার অবকাশ আছে।
১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমিনির নেতৃত্বে যখন ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র চালু হয়, তখন রাষ্ট্রে পর্দাপ্রথা (হিজাব) চালু হয়। প্রথম থেকেই নারীরা এই নিয়মের বিরোধিতা করে রাস্তায় নেমে স্লোগান তোলে, ‘স্বাধীনতা মানে নিষেধাজ্ঞা নয়’। কিন্তু বিপ্লবোত্তর সরকার তা আমলে নেয়নি। তাদের ইচ্ছা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তারা শাসন করতে থাকে। এর আগে রেজা শাহ ১৯৩০-এর দশকে ইরানি নারীর মুক্তির জন্য পর্দাপ্রথা তুলে দেওয়ার আইন করেন। তিনি অবশ্য এই চিন্তা ধার করেন তুরস্কের কামাল পাশার কাছ থেকে। তুরস্ককে কামাল পাশা ইউরোপের ধাঁচে ঢেলে সাজানোর জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ নানা সংস্কারের সঙ্গে নারীর শিক্ষা-দীক্ষা, পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপক সংস্কার আনেন। এক্ষেত্রে কামাল পাশা সফলও হন। তা দেখে ইরান ও আফগানিস্তানে এ ধরনের সংস্কারের প্রচেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু ইরানে রেজা শাহের এই পদক্ষেপ সফল হয় না। কারণ জনগণের চাওয়া-পাওয়ার শক্তির চেয়ে তিনি রাষ্ট্রের প্রভুত্বকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
তবে রাষ্ট্র-ক্ষমতার পালা বদলের ফলে রাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন হলেও, রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য তো বদলায় না। শাহরা যেমন ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করতে নারীদের উদারনীতির কথা বলেছে, অন্যদিকে বিপ্লবোত্তর সরকার বলেছে পর্দার কথা। এখানে দুই সরকারের কার্যক্রমের ভিন্নতা থাকলেও উদ্দেশ্য এক-কেউ নারীকে পর্দায় মুড়িয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে; কেউ পর্দা না করিয়ে। ফলে পর্দা করা, না করা নিয়ে খোদ নারীর অবস্থান কী সেটাকে কখনোই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আর গুরুত্ব দেওয়া হলেও নারীর যে খুব লাভ হতো এমনটা নয়।
পৃথিবীর অনেক মুসলিম প্রধান দেশে নারীদের পর্দাপ্রথা ‘কড়াকড়িভাবে’ না থাকলেও সেখানে নারীদের অবস্থার যে আমূল পরিবর্তন হয়েছে, তা কিন্তু নয়। সেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য; ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও। ইরান তার প্রমাণ শাহদের শাসনকালেই পেয়েছে। তাই নার্গিস, অরিজু, পারি কিংবা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ২ ফেব্রুয়ারি তেহরানের রাস্তায় পর্দাপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় যে ২৯ ইরানি নারী জেলহাজতে যায়৭, তাদের মুক্তি শুধু পর্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আরো অনেক বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই সার্বিক অবস্থার পরিবর্তন না হলে, নারীর অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়!
প্রতিবাদ যে হচ্ছে না, তা নয়!
দ্য সার্কেল-এ নারীর যে অবস্থান উঠে এসেছে, তা দেখে মনে হতে পারে এ সমাজ হয়তো এভাবেই বৃত্তের মধ্যে ঘুরবে! এ থেকে মুক্তির কোনো পথই নেই। চলচ্চিত্রের শেষে প্রতিবাদী-অপরাধী সবধরনের নারীদের ধরে জেলে বন্দি করা হয়। শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, জেলের একটি ঘরে নারীদের বন্দি করে রাখা হয়েছে; সেই ঘরের দরজায় একটি মাত্র ফুটো দিয়ে বাইরের আলো ঢোকে-দরজা না খুলে বাইরে থেকে খাবার বা টুকটাক কাজ সারার জন্য ওই ফুটোটি ব্যবহৃত হয়-সেই ফুটোটাও খট শব্দ করে বন্ধ করে দেওয়া হয় বন্দি নারীদের মুখের ওপর। দৃশ্যটা দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কী ফুটোটা বন্ধের মধ্য দিয়ে নির্মাতা জাফর স্বপ্ন দেখার শেষ পথটাও বন্ধ করে দিলেন! তার মানে কী, যেভাবে জীবন যেমন চলছে, সেভাবেই চলবে! শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তো মানুষের স্বপ্ন মরে না। মানুষ তার সবটুকু দিয়ে আশা-স্বপ্ন জিইয়ে রাখে। ভয় দেখিয়ে, বন্দি করে কিংবা হত্যা করে অধিকার আদায়ের আন্দোলন, বিপ্লবকে তো দমানো যায়নি। ইতিহাসে এর প্রমাণ তো ভূরিভূরি। যেকোনো পরিবর্তনের আগে-পরে অসংখ্য মানুষের বন্দিত্ব-হত্যা তো পরিবর্তনকে থামাতে পারেনি।
দ্য সার্কেল-এর পাঁচ মিনিট ২০ সেকেন্ডে দেখা যায়, নার্গিসকে এক পুরুষ ‘উত্ত্যক্ত’ করলে তার প্রতিবাদ করেন অরিজু। দৌড়ে গিয়ে সেই পুরুষের সঙ্গে অরিজু ধস্তাধস্তি করেন এবং উচিত শিক্ষা দিতে চান। কিন্তু শক্তি ও কৌশলের কাছে হেরে যান তিনি। এছাড়া অরিজু রাস্তায় সিগারেট ধরাতে গেলে, দোকানদার তাকে নিষেধ করে; অরিজু তা মেনেও নেন। আবার পারিও হাসপাতালের বিশ্রামকক্ষে সিগারেট ধরাতে গিয়ে বান্ধবী ইলহামের কথায় তা থেকে বিরত থাকেন। অরিজু, পারির ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কেউই নিজের মতো কিছু করতে পারেন না। তারা বার বার পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখেন; নিজের ভালোলাগার চেয়ে অন্যকে বেশি প্রাধান্য দেন।
অন্যদিকে এক ঘণ্টা ১৬ মিনিটে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন পুরুষের সঙ্গে একজন নারী যৌনকর্মীকে পুলিশের গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে; ওই নারী তখন পকেট থেকে সিগারেট বের করে আগুন ধরাতে গেলে গাড়িতে থাকা এক পুরুষের কথায় নিজের ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখেন। তবে একটু পরে গাড়ির চালক যখন সিগারেট ধরান, তখন তিনি আর বাধা মানেন না; সবার সামনেই সিগারেট ধরান।
কিন্তু দ্য সার্কেল-এ জাফর দিনশেষে নার্গিস, পারি কিংবা রাস্তায় মেয়েশিশুকে রাখতে আসা ওই নারীর যে অসহায়ত্ব তুলে ধরেন, সেখানে অরিজু আর যৌনকর্মীর প্রতিবাদ মলিন হয়ে যায়। শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে এই প্রতিবাদ যেনো আলাদা করা দায়! পেশাদার চোর অরিজু আর যৌনকর্মী নারী কিন্তু বৃহৎ সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। অথচ ইরানের বৃহৎ ‘সভ্য’ সমাজের কোনো নারী বা অন্য কাউকে চলচ্চিত্রে কোনো বিষয়ে টুঁ শব্দটি করতে দেখা যায় না। যদিও দ্য সার্কেল নির্মাণের ১৬ বছর পর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে ভিদা মভায়েদ নামে এক ইরানি নারী রাস্তায় স্কার্ফ খুলে প্রতিবাদ করলে তার সঙ্গে বেশকিছু নারী যোগ দেয়।৮ তার মানে অরিজু, যৌনকর্মী কিংবা ভিদা মভায়েদ ক্ষীণ হলেও আলো তো জ্বালিয়ে রেখেছে। অথচ দ্য সার্কেল-এ জাফর কেনো জানি আলো আসার, স্বপ্ন দেখার সব পথ একেবারে বন্ধ করে দিলেন, স্বপ্নহীনতার কথা বললেন!
নিষিদ্ধ করে কি পার পাওয়া যায়!
‘প্রান্তিক’ জনগণের ওপর সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা নিরন্তর। যেকোনো মূল্যে তারা প্রান্তিক জনগণের ওপর আধিপত্য স্থাপন করতে চায়। এখানে প্রান্তিক জনগণ বলতে শুধু অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগণকে বোঝায় না, এ প্রান্তিকতা সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এমনকি মতাদর্শগত। সাম্রাজ্যবাদ নিজেদের প্রয়োজনে খুঁজে খুঁজে প্রান্তিক জনগণের দুর্বলতাকে বের করে এবং সেগুলো ইস্যু করে সামনে আনে। তারপর এতে কখনো জঙ্গি, কখনো গণতন্ত্রের শত্রু, স্বাধীনতাবিরোধী, নারী স্বাধীনতা হরণকারী, পারমাণবিক পরাশক্তিধর তকমা লাগায়। এই তকমা প্রমাণের জন্য কখনো কখনো ওই প্রান্তিক দেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, গণমাধ্যমকে পুঁজি করে সাম্রাজ্যবাদ। তবে অন্যান্য মাধ্যম অপেক্ষা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে যেটা ঘটেগুটি কয়েক নির্মাতা চলচ্চিত্রে দেশ-সমাজের যে চিত্র তুলে ধরে, তা বাস্তবতাকে অনেকখানি ছুঁয়ে যায়। এ ধরনের উপস্থাপন দেশ ও দেশের বাইরের দর্শকের ওপর প্রভাব ফেলে; ওই দেশের ইমেজ নির্মাণে ভূমিকা রাখে। তাই চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে কড়াকড়িটা অনেকটা বেশিই।
কখনো কখনো এসব চলচ্চিত্র ওই প্রান্তিক দেশ-সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি ভেদে আলোচনা-সমালোচনা তীব্র হয়। দেশ ও দেশের বাইরের একটা শ্রেণি ওই দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আবার কখনো কখনো নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যও প্রান্তিক দেশে থাকা তাদের প্রতিনিধিদের দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করিয়ে নানা সমস্যা তুলে আনে। ধর্মীয়ভাবে প্রান্তিক দেশ ইরানের দু-একজন নির্মাতার বিরুদ্ধে এ রকম অভিযোগ যে নেই, তা কিন্তু নয়। যদিও জাফর পানাহি এ দলের নন।
যাহোক, সাম্রাজ্যবাদ চিরকালই নিজ স্বার্থে ভালো-মন্দ দুটোকেই কাজে লাগায় এবং নিজেদের বাছবিচার না করে অন্যের দুর্বলতা খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু জাফর পানাহির মতো নির্মাতারা যে পরিবর্তনের আশায় এতো ঝুঁকি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তা পরিপূর্ণ হয় না। নিজ দেশে জাফরদের চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতে দেয় না প্রান্তিক দেশ-সমাজের কর্ণধাররা। তারা না পারে সেলুলয়েডে নিজেদের সমালোচনা-বাস্তবতা দেখতে, না দেয় অন্যকে দেখাতে। উল্টো সাম্রাজ্যবাদ এটাকে তার স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করে।
হয়তো জাফর কিংবা গুণে’রা এসবের কিছুই ভাবেন না, তারা মানুষের জন্য শিল্প সৃষ্টি করে। তাই দিনশেষে তাদের চলচ্চিত্র মানুষের মনে প্রশ্ন জাগায়, ভাবায়, আনন্দ দেয়; একই সঙ্গে রাষ্ট্র-সমাজ নিয়ে নতুন করে চিন্তার খোরাক দেয়। আর এখানেই জাফর-গুণে-সেমবেন’দের সার্থকতা।
লেখক : হিরু মোহাম্মদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।
তথ্যসূত্র
১. এবাদি, শিরিন (২০১৬ : ২৭); ‘তেহরানে বালিকাবেলা’; জেগে উঠেছে ইরান; অনুবাদক : অবনি অনার্য; সন্দেশ, ঢাকা।
২. প্রাগুক্ত; এবাদি (২০১৬ : ৫৮)।
৩.. http://www.wipo.int/edocs/lexdocs/laws/en/ir/ir001en.pdf; retrieved on: 20.03.2018
৪. রহমান, মুহাম্মদ হাবিবুর (২০১৫ : ৩৩৭); ‘নরহত্যা’; কোরানসূত্র; বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
৫. http://shodalap.org/rk-rizvi/28593/; retrieved on: 22.02.2018
৬ . প্রাগুক্ত; রহমান (২০১৫ : ৩৩৬)।
৭. https://goo.gl/cUvTGW; retrieved on: 22.02.2018
৮. https://goo.gl/QAqbnx; retrieved on: 22.02.2018
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন