Magic Lanthon

               

এ এইচ মানিক

প্রকাশিত ১১ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ভারতীয় সম্প্রীতির রোজা

জাতীয়তাবাদের জয়গানে শিল-পাটার কিছু না হলেও মরিচের দফারফা

এ এইচ মানিক



প্রাসঙ্গিক কথন


নির্মাতা মনিরত্নম ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র রোজা। নানা কারণেই রোজা আলোচিত। প্রথমত, রোজার বিষয়বস্তু ভারতের অন্যতম সঙ্কটময় অঞ্চল কাশ্মির এবং এর সঙ্গে মূল ভূখণ্ড ভারতের সম্পর্ক। দ্বিতীয়ত, এই চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত সঙ্গীত; তৃতীয়ত, নির্মাতা নিজে। রোজা ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে Best Feature Film on National Integration বিভাগে পুরস্কৃত হয়। এছাড়া রোজার শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে এ আর রহমান এবং গীতিকার হিসেবে ভাইরামুঠু (Vairamuthu) পুরস্কার পান। যেহেতু চলচ্চিত্রটি ভারতের জাতীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে বলে মনে করা হয় এবং সেজন্য পুরস্কারও পেয়েছে; তাই চলচ্চিত্রে ঠিক এই বিষয়টি কীভাবে এসেছে তা খতিয়ে দেখা জরুরি।


এছাড়া দক্ষিণ ভারতের খ্যাতনামা নির্মাতা মনিরত্নম তামিল চলচ্চিত্রে নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ করেছেন। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজে জন্ম নেওয়া মনি ছোটোবেলা থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তিনি ব্যবস্থাপনায় পড়ালেখা করেছেন মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটিতে। চলচ্চিত্রে তার অভিষেক পল্লবী অনু পল্লবী (১৯৮৩)-এর মধ্য দিয়ে। এরপর একে একে অনেকগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন মনি। শুধু রোজা নয়, মনিরত্নমের বম্বেও (১৯৯৫) Best Feature Film on National Integration শাখায় ‘নার্গিস দত্ত অ্যাওয়ার্ড পায়। এছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ২০০২ খ্রিস্টাব্দে মণিরত্নমকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়।


আগেই বলেছি, রোজার বিষয় কাশ্মির সঙ্কট। তাই এই প্রবন্ধের প্রধান নজর থাকবে ভারতের জাতীয় সম্প্রীতি, কাশ্মির সঙ্কট এবং রোজায় এর উপস্থাপন নিয়ে। আলোচনার সুবিধার্থে এই প্রবন্ধে ধারাবাহিকভাবে পুরো চলচ্চিত্রটি ধরে ধরে বিশ্লেষণের চেষ্টা থাকবে। এজন্য রোজার ন্যারেটিভকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে-বিশৃঙ্খল কাশ্মির; সম্প্রীতির ভারত; থমথমে কাশ্মিরে জঙ্গি আস্তানা; সার্বভৌম ভারত রাষ্ট্র। এই আলোচনায় যাওয়ার আগে ইতিহাস থেকে জেনে নেওয়া যাক ভারতে কাশ্মির সঙ্কট কী এবং কেনো?


অমীমাংসিত কাশ্মির সঙ্কট


১৯ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কাশ্মির শব্দটি ভৌগোলিকভাবে শুধু হিমালয় এবং পীর পঞ্চল পর্বতমালার উপত্যকাকে নির্দেশ করতো। তবে বর্তমানে কাশ্মির বলতে বোঝায়, এমন এক বিশাল অঞ্চল যেখানে ভারত শাসিত জম্মু এবং কাশ্মির (এর মধ্যে রয়েছে কাশ্মির উপত্যকা, জম্মু ও লাখাদ), পাকিস্তান শাসিত গির্লগিট বালতিস্তান ও আজাদ কাশ্মির প্রদেশ এবং চিন শাসিত আকসাই চিন ট্রান্স কারাকোরাম ট্রাক্ট অঞ্চলসমূহ। নানা কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সঙ্কটপূর্ণ অঞ্চল কাশ্মির। ঐতিহাসিক এই সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছিলো মূলত বৃটিশের হাত ধরে। ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের রক্তের দাগ ধরে পিছনে ফিরে গেলে দেখা যাবে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সূচনা হয়েছিলো কাশ্মির সঙ্কট থেকেই। সাহিত্যিকেরা যে ভূখণ্ডকে পৃথিবীর স্বর্গ বলে আখ্যা দিয়েছেন, সেই কাশ্মির এখন অঘোষিত যুদ্ধের ময়দান।


১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মিরের রাজা হন হরি সিং। ভারতের স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন এখানকার শাসক। কাশ্মিরের মুসলিম প্রধান অংশের নাম কাশ্মির এবং হিন্দুু প্রধান অংশের নাম জম্মু। তবে দুই অংশের মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় মুসলমানের প্রাধান্য থাকলেও সেখানে শাসক ছিলো হিন্দু, যাকে বলা হতো ‘ডোগরা রাজা। ৪৭-এ ভারত বিভাজনের সময় বৃটিশ পক্ষ থেকে বলা হয়, হরি সিং চাইলে ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবেন। অথবা তিনি স্বাধীনভাবে শাসনকার্য চালাতে পারবেন। হরি সিং তখন ভারত, পাকিস্তানের কোনোটাতেই যোগ না দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। এটি পাকিস্তান মেনে নিলেও ভারত মেনে নেয় না। এছাড়া ৪৭-এ ভারত বিভক্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে কাশ্মিরকে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তরের কথা ছিলো। কিন্তু ওই বছর বৃটিশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ভারত কাশ্মিরে হামলা চালালে হস্তান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।


এ পরিস্থিতিতে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ অক্টোবর হরি সিং কাশ্মিরের ভারত-ভুক্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ২৭ অক্টোবর তা অনুমোদন করেন ভারতের গভর্নর জেনারেল। কথিত আছে, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বান্ধবী লেডি মাউন্ট ব্যাটেনের প্রভাবে ও ভারতের কূটকৌশলে শেষ পর্যন্ত হরি ভারতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। চুক্তি সই হওয়ার পর পরই কাশ্মিরে সেনা পাঠায় ভারত এবং পাকিস্তানি সেনাদের সরিয়ে দিয়ে কাশ্মিরের অংশবিশেষ দখল করে নেয়।


এই শুরু, এরপর তিন বারের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের (১৯৬৫, ১৯৭১ ও ১৯৯৯) দুটিরই কারণ ছিলো কাশ্মির। সর্বশেষ যুদ্ধ হয় ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে। সেসময় পাকিস্তান লাইন অব কন্ট্রোল পেরিয়ে ভারতের কার্গিল এলাকা দখল করে নেয়। অবশ্য পরে ভারতের সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে সরিয়ে দেয়।


কাশ্মির নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের এ বিরোধ বিশ্ববাসীর কাছে এখন পরিচিত ব্যাপার। আগেই বলেছি, কাশ্মিরে জড়িয়ে আছে ভারত, পাকিস্তান ও চিন। কাশ্মিরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রয়েছে চিনের সীমানা। ভারত মনে করে, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে ইসলামাবাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য চিন সহায়তা করছে। এবং চিন ও পাকিস্তান আজাদ কাশ্মির মিলে যৌথ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। ফলে পারস্পারিক অবিশ্বাস ও উভয় দেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে কাশ্মির সঙ্কটের সমাধান আরো জটিল হয়ে যাচ্ছে। সঙ্কটময় এই কাশ্মির ইস্যু নানাভাবে উঠে এসেছে ভারতের বেশকিছু চলচ্চিত্রে। এর মধ্যে বর্ডার, হায়দার, ভেলি অব সেন্টস, ফিতর, ফানা উল্লেখযোগ্য। তেমনই এক চলচ্চিত্র মনিরত্নমের রোজা।


প্রথম পর্ব : বিশৃঙ্খল কাশ্মিরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী


রোজার টাইটেল কার্ড শুরু হয় ‘E THANK THE MINISTRY OF DEFENCE, NEW DELHI.’ এই লেখা দিয়ে। এরপর রোজার দুই মিনিট সাত সেকেন্ডে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে রাতে গাড়ি নিয়ে কাশ্মিরের শ্রীনগরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। দেখেই বোঝা যায়, দুর্গম কোনো জঙ্গলে তারা অভিযানে এসেছে। প্রস্তুতি দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না, তারা অভিযানে এসেছে ভয়ঙ্কর কোনো ব্যক্তি বা বিষয়ে। অল্প সময়ের মধ্যে শুরু হয় এক সাঁড়াশি অভিযান। অভিযান শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা যায়, প্রতিপক্ষ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়েছে। তারাও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। অতর্কিত এই হামলার প্রথমে জঙ্গলে থাকা প্রতিপক্ষ সেনাদের চ্যালেঞ্জ করতে চাইলেও কিছুক্ষণের মধ্যে তারা পিছু হটতে থাকে। ক্লোজ শটে দেখানো হয় তারা বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র ফেলে রেখে জীবন নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।


পালিয়ে যাওয়া প্রতিপক্ষের ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ চলতে থাকে। প্রতিপক্ষও পাল্টা জবাব দেয়। এতে দেখা যায়, ভারতীয় সেনারা হতাহত হয়। সেনাবাহিনীর আক্রমণের তীব্রতা বাড়তে থাকায় প্রতিপক্ষের দলনেতা গোছের একজন তার সহকর্মীদেরকে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি একাই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে সেনাবাহিনী তাকে ঘিরে ফেলে। তারপর পর্দায় ভেসে ওঠে ‘কাশ্মিরের জঙ্গি নেতা ওয়াসিম খান গ্রেপ্তার


দ্বিতীয় পর্ব : সম্প্রীতির ভারত


ওয়াসিম খানের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে শেষ হয় রোজায় প্রথম পর্ব। এরপরই দর্শক দেখে সুখী-সমৃদ্ধ-সম্প্রীতির এক ভারত। যেখানে সবাই একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে বাস করে। গ্রামের ‘অপ্রতিরোধ্য চঞ্চল মেয়ে রোজা ঝরণায় স্নান করেন গান গাইতে গাইতে। গানের কথায় উঠে আসে, সুজলা-সুফলা ভারতের চিরসবুজ মাঠ। কৃষকের ফসল মাড়াইয়ের সঙ্গে ফুটে ওঠে তাদের সোনালি হাসি। কেউ জাল ফেলে মাছ ধরছে, গাভী দোহন করছে, আবার কেউ রোপণ করছে ফসলের চারা।


এরপর ১২ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে রোজার গ্রামে ঋষির আগমন ঘটে। হবু দুলাভাইকে আড়াল থেকে দেখে ধানক্ষেতের আঁকাবাঁকা পথ ধরে দৌড়ে এসে দিদিকে সেকথা জানান রোজা। কিন্তু বোনের মুখে সুদর্শন বরের কথা শুনেও দিদির মুখ ভার থাকে।


ঋষির গাড়ি এবার রোজাদের বাড়ির আঙ্গিনায় আসলে পাড়া-প্রতিবেশীরা তাকে দেখতে ভিড় করে। গ্রামের লোকজন ঋষিকে নানা প্রশ্ন করতে থাকে। ঋষি হয়ে ওঠে গ্রামের লোকজনের প্রধান আগ্রহের বিষয়। রোজার ১৮ মিনিটের দিকে লক্ষ্মীকে বর ও তার মায়ের সামনে আনা হয়। তখন বাড়ি ভর্তি গ্রামের লোকজন। মনে হয় এক বিয়েতে পুরো গ্রাম উৎসবমুখর। কনে লক্ষ্মীকে পছন্দ হলেই বিয়ের কাজ পাকা হবে। লক্ষ্মীকে যেনো বর পক্ষের পছন্দ হয়, সেজন্য রোজা বার বার ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন। কনে দেখানোর প্রাথমিক পর্ব শেষ হলে ঋষি ও লক্ষ্মীকে আলাদা কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া হয়। লক্ষ্মীকে ঋষি যে খুব পছন্দ করেছে সেকথা তাকে জানায়। ২০ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে ঋষি এবার লক্ষ্মীকে কিছু বলতে বলেন। নিজের মতামত দেওয়ার সুযোগ পেয়ে লক্ষ্মী নির্দ্বিধায় বলে ফেলেন, এ বিয়েতে তার মত নেই। তিনি অন্য একজনকে ভালোবাসেন এবং সেই ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে বিয়ে না হলে তিনি মরে যাবেন। ঋষি একথায় চমকে ওঠেন!


কারণ সব প্রস্তুতি শেষ, কেবল বর-কনে নিজেদের মধ্যে একটু কথা বলে নিলেই কনেকে আশীর্বাদ করবেন ঋষির মা। কিন্তু ঋষি সব ঘটনা জানার পর কৌশলে জানান, লক্ষ্মী নয়, তার পছন্দ ছোটো বোন রোজাকে। একথা শোনার পর পুরো গ্রাম যেনো স্তব্ধ হয়ে যায়। বাড়ি ভর্তি গ্রামবাসী একে একে চলে যেতে থাকে। গ্রামের উৎসবমুখর পরিবেশটা ম্লান হয়ে যায়। মনে হয়, গ্রামের একজনের খুশিতে সবাই খুশি; দুঃখে সবাই সমানভাবে দুঃখী।




পরিস্থিতি এমন হয় যে, গ্রামের মেয়েরা দলবেঁধে এসে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য ঋষিকে নানাভাবে বোঝাতে থাকে। কিন্তু কোনো উপায়ান্তর না দেখে রোজার মতামতের তোয়াক্কা না করে ঋষির সঙ্গেই তার বিয়ের ব্যবস্থা করে পরিবারের লোকজন। এবং লক্ষ্মীকেও তার পছন্দের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। সমস্যা হলো, রোজা এই বিয়ে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না। শেষ পর্যন্ত গ্রামবাসীকে নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে বিয়ে সম্পন্ন হয়। তারপর রোজা, লক্ষ্মী দুই বোন নিজ নিজ শ্বশুরবাড়ি চলে যায়।


ঋষি একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, এই প্রতিষ্ঠানটি ভারতীয় সেনাবাহিনীকে প্রাযুক্তিক সহায়তা দেয়। নতুন বউকে অফিসের বড়ো কর্মকর্তা চন্দ্রমোহনের সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে যান ঋষি। ঘটনাক্রমে চন্দ্রমোহন ও রোজার বাড়ি একই এলাকায় হওয়ায় তিনি রোজার কাছে সেখানকার বিখ্যাত লাড্ডু খেতে চান। রোজাও তাতে সায় দেন। এদিকে রোজা-ঋষির দাম্পত্য জীবন মোটেও ভালো যাচ্ছিলো না। কারণ রোজা মনে করেন, ঋষি চাননি বলেই তার দিদির সঙ্গে ঋষির বিয়ে হয়নি এবং সেজন্য তাকে অসময়ে বিয়ে করতে হয়েছে। একদিন রোজা-ঋষি বিকেলে নদীর ধারে বেড়াতে যায়। সেখানে তাদের মধ্যে বিয়ে নিয়ে বাতচিত হয়। রোজা গ্রামে ফিরে যেতে চান। এতে রেগে গিয়ে ঋষি বলেন, ‘১৮ বছর মায়ের কাছে থেকে তুমি এখনো সেখানে থাকতে চাও? এটাই এখন থেকে তোমার গ্রাম, এটাই তোমার ঘর, আমিই তোমার সবকিছু। একপর্যায়ে ঋষি বিয়ে নিয়ে যেসব ঘটনা হয়েছে, তা রোজাকে খুলে বলেন-লক্ষ্মীর কারণেই যে এ বিয়ে হয়নি, সেটা রোজাকে বোঝাতে সক্ষম হন। রোজা প্রথমে বিশ্বাস করতে না চাইলেও ফোনে দিদির সঙ্গে কথা বলার পর সব মেনে নেন। এরপর থেকে ঋষির প্রতি রোজার শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। অন্যভাবে বললে, ঋষি তার কাছে মহান পুরুষ হয়ে ওঠেন।


অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে তাদের সফটওয়্যার-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে ঋষির অফিসের বড়ো কর্মকর্তা চন্দ্রমোহনের ডাক পড়ে। এজন্য তাকে কাশ্মিরে যেতে হবে। কিন্তু হঠাৎই চন্দ্রমোহন অসুস্থ হয়ে পড়লে, ঋষির ওপর দায়িত্ব পড়ে কাশ্মিরে যাওয়ার। যদিও ঋষিকে সতর্ক করে চন্দ্রমোহন বলেন, ‘কাশ্মিরের এই অবস্থায় তোমাকে সেখানে পাঠাতে আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। চন্দ্রমোহনকে অভয় দিয়ে ঋষি বলেন, ‘কাশ্মির ভারতের, তাই ভারতের কোথাও যেতে কেনো আমরা ভয় পাবো!’ চন্দ্রমোহন বলেন, ‘সেখানকার সেনাবাহিনী তোমার সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এরপর ঋষি ও রোজা হাসপাতাল থেকে বিদায় নেয়।


প্রথমে ঋষির একা কাশ্মিরে যাওয়ার কথা থাকলেও পরে রোজার জোরাজুরিতে তাকে নিয়ে যেতে রাজি হন। চলচ্চিত্রের ৫২ মিনিট চার সেকেন্ডে দেখা যায়, রোজা ও ঋষি বিমান থেকে কাশ্মিরে অবতরণের পর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হচ্ছে।


তৃতীয় পর্ব : থমথমে কাশ্মিরে জঙ্গি আস্তানা


রোজার ৫১ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে বিকট বোমা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে সেই সঙ্কটময়, ভয়াবহ কাশ্মিরকে পরিচয় করিয়ে দেন নির্মাতা। এরপর ঋষির বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দেখা যায়, কেউ তার ছবি তুলছে। বোঝা যায়, এতো নিরাপত্তার মধ্যেও যারা অনায়াসে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ছবি তুলতে পারে, তারা সহজ কেউ নয়।


বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে ঋষি-রোজা হোটেলের উদ্দেশে গাড়িতে ওঠেন। সেনা নিরাপত্তায় গাড়ি চলতে থাকে। রাস্তায় নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন ছাড়া আর কাউকে দেখা যায় না। কিছু দূরত্ব পর পর তল্লাশি চৌকি দেখা যায়। সেখানে স্থানীয় লোকজনকে আটক করে তল্লাশি চলছে। পরিস্থিতি এমন যে, নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়িতে থাকার পরও ঋষির গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করা হয়। শহরের এই পরিস্থিতি দেখে রোজা এর কারণ জানতে চায়। উত্তরে ঋষি বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য শহরে কারফিউ চলছে। তাই সাধারণ মানুষের রাস্তায় চলাচল নিষেধ। সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম ঠেকানোর জন্য এই ব্যবস্থা।


এরপরেই দেখা যায়, কিছু লোক-ঋষির ভাষায় যারা ‘সন্ত্রাসী-ঋষির ছবি নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করছে। বুঝতে কষ্ট হয় না, ঋষিকে নিয়ে তাদের কোনো ‘খারাপ পরিকল্পনা আছে। এদিকে ঋষি সেনাদের ক্যাম্পে তাদের সফটওয়্যারের ত্রুটির সংশোধনে কাজ শুরু করেন। অবসরে ভূ-স্বর্গ খ্যাত কাশ্মিরের অপরূপ সৌন্দর্যও উপভোগ করেন রোজা ও ঋষি। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিলো। এক সকালে হোটেলে ঋষির ঘুম ভাঙতেই হঠাৎ চোখে পড়ে রোজা পাশে নেই। বেশ কয়েকবার ডাকার পরও কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে ঋষি চারিদিক হন্য হয়ে খুঁজতে শুরু করেন। কারণ ঋষি কাশ্মিরের ভয়াবহতা বিষয়ে অবগত। তাই এখানে যেকোনো মুহূর্তে বিপদ ঘটতে পারে।


ফলে কোনো কিছু চিন্তা না করেই, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কাউকে না জানিয়েই রোজাকে খুঁজতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ঋষি। এদিকে রোজা মূলত মন্দিরের খোঁজে কাউকে না জানিয়ে বাইরে গেছেন। তিনি একটি মন্দির পেয়েও যান। পূজার নিয়মানুযায়ী রোজা মন্দিরে নারকেল ফাটাতেই শব্দ শুনে চারপাশ থেকে ছুঁটে আসে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা চার সদস্য। কাশ্মিরের পরিস্থিতি এমন যে, সামান্য নারকেল ফাটার শব্দকেও তারা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। এদিকে রোজা পূজা দিচ্ছেন, অন্যদিকে ঋষি তাকে খুঁজে হয়রান। শেষ পর্যন্ত ঋষি খুঁজে পান রোজাকে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে তিনটি গাড়ি নিয়ে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। তারা প্রথমে ঋষিকে ঘিরে ফেলে, নিরাপত্তা বাহিনী বাধা দিলে তাদের গুলি করা হয়। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানে ঋষিকে অপহরণ করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। বুঝতে কষ্ট হয় না, শুরু থেকে যারা ঋষিকে অনুসরণ করছিলো, তারাই তাকে অপহরণ করেছে।


চতুর্থ পর্ব : সার্বভৌম ভারত রাষ্ট্র


রোজার এক ঘণ্টা সাত মিনিট ১২ সেকেন্ডে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পে ঋষির অপহরণের খবর নিয়ে যান রোজা। ভয়ে, আতঙ্কে সেনাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রোজা বার বার থেমে যাচ্ছিলেন। এই থেমে যাওয়ার আরো একটি কারণ, তিনি হিন্দি জানেন না। তারপরও রোজা নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছে ঋষিকে উদ্ধারের জন্য অনুরোধ করতে থাকেন। কিন্তু শুরুতে কেউই কেনো জানি তার কথায় কর্ণপাত করছিলেন না। এদিকে অল্প সময়ের মধ্যে কাশ্মিরে ভারতীয় প্রকৌশলী অপহরণের বিষয়টি গণমাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে সম্প্রচার হতে থাকে।


এক ঘণ্টা নয় মিনিট ২১ সেকেন্ডে অপহরণকারীদের আস্তানার দৃশ্য দেখানো হয়। আধুনিক অস্ত্র হাতে পাহারারত লোকজনদের দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না এরা কতোটা শক্তিশালী। ঘরের ভিতর ঋষিকে খাবার দেওয়া হলে তিনি তা খেতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় অপহরণকারীদের এক নেতা লিয়াকত উপস্থিত হন। ঋষিকে ভয় পেতে নিষেধ করেন লিয়াকত। লিয়াকত বলেন, মানুষ হত্যা তাদের পেশা নয়। তখন ঋষি জানতে চান, তোমরা আসলে কী চাও? জবাবে লিয়াকত বলেন, ‘স্বাধীনতা। কাশ্মিরের স্বাধীনতা। কাশ্মিরে জন্মগ্রহণ করা প্রত্যেক নতুন শিশুর স্বাধীনতা চাই আমরা। আমিসহ কাশ্মিরের প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনতা চাই। কাশ্মিরের ভূমি, পাহাড়, পর্বত সবকিছুর স্বাধীনতা চাই। জাতি হিসেবেও আমরা স্বাধীনতা চাই।


এদিকে কাশ্মিরের স্থানীয় সংবাদপত্রে খবর বের হয়, তিন দিনের মধ্যে ওয়াসিম খানকে ছেড়ে না দিলে ঋষির হাতের ১০ আঙ্গুল টাউনহলে পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় দিন শিবমন্দিরের কাছে পাওয়া যাবে পায়ের আঙ্গুল এবং তার পরদিন পাওয়া যাবে তার টুকরো টুকরো শরীর। এটা শুনে রোজা আরো ভয় পেয়ে যান। তিনি পত্রিকা নিয়ে পুলিশ স্টেশনে যান। রোজা পুলিশের সাহায্য চাইলে তারা বলে, ঋষিকে উদ্ধারের দায়িত্ব পুলিশের নয়, এটা সেনাবাহিনীর কাজ।


এক ঘণ্টা ২০ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে রোজা এক সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন। ওয়াসিম খানকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে হলেও রোজা তার স্বামীকে ফেরত চান। সেনা কর্মকর্তা রোজাকে বলেন, ‘ওয়াসিম খান ৪৩ জন মানুষকে হত্যা করেছে। তাকে ছেড়ে দিলে সে আরো ৪৩ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করবে। কিন্তু রোজা যেকোনো কিছুর বিনিময়ে তার স্বামীকে ফেরত চান। রোজার ভাষায়, ‘আমার কাছে দেশ নয়, আমার স্বামীই সবকিছু। একথা শুনে সেনা কর্মকর্তা রোজাকে ধমক দিয়ে দেশরক্ষায় সবার অবদানের কথা স্মরণ করে দেন। কিন্তু রোজা ছাড়বার পাত্র নন; তিনিও উল্টো প্রশ্ন করে বসেন, ‘ঋষির পরিবর্তে যদি মন্ত্রীর কোনো ছেলে অপহৃত হতো, তাহলে তারা কী করতেন?’ এসব শুনে ওই সেনা কর্মকর্তাকে চুপ থাকতে দেখা যায়।


এক ঘণ্টা ২৬ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে ঋষির সামনে টেপরেকর্ডার ধরে ঋষিকে বলতে বলা হয়, ‘ওয়াসিম খানকে ছেড়ে না দিলে সন্ত্রাসীরা আমাকে মেরে ফেলবে। কিন্তু ঋষি এতে রাজি হন না। উল্টো তিনি বলতে থাকেন, ‘জয় হিন্দ। এই পরিস্থিতিতে ঋষিকে তারা মারধর করতে থাকে; ঋষিও ‘জয় হিন্দ বলতে থাকেন। এদিকে এক ঘণ্টা ৩৫ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে রোজা কাশ্মিরের জঙ্গি নেতা ওয়াসিম খানের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এ সময় রোজা ওয়াসিম খানকে অনুরোধ করেন, তিনি যেনো তার লোকজনদের ঋষিকে ছেড়ে দিতে বলেন। মঙ্গলসূত্র দেখিয়ে রোজা বলেন, আমাদের নতুন বিয়ে হয়েছে। কিন্তু ওয়াসিম খান জানান, তিনি হিন্দুস্থানকে ঘৃণা করেন। কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য তিনি জিহাদের ঘোষণা দেন।


ঋষি এক ঘণ্টা ৩৭ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে অপহরণকারীদের এক সদস্যকে মেরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কড়া নিরাপত্তা থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত তাকে ধরা পড়তে হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায়, ভারতীয় সেনাবাহিনী অপহরণকারীদের আস্তানায় অভিযান চালাচ্ছে। ততোক্ষণে অবশ্য তারা ওই আস্তানা থেকে সরে গেছে। এক ঘণ্টা ৪৭ মিনিট ২৮ সেকেন্ডে দেখা যায়, অপহরণকারীরা ঋষিকে আটকে রেখে ভারতীয় পতাকাতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। এটা সহ্য করতে না পেরে ঋষি মৃত্যু ভয়কে পরোয়া না করে আগুন নেভাতে পতাকার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ সময় আবহসঙ্গীতে বাজতে থাকে-

                                    

নষ্ট হয় না আমাদের আত্মসম্মান

ভাঙে না দেশ

মন্দির এখানে মসজিদ এখানেই

হিন্দু এখানে, মুসলিমও এখানেই

সবাই মিলে ভালোবেসে থাকি এখানে।

জাগো ...

আসাম থেকে গুজরাট, পাঞ্জাব থেকে মহারাষ্ট্র

জাতি অনেক গুণ একই,

ভাষা অনেক সুর একই।

কাশ্মির থেকে মাদ্রাজ সবাই বলে দাও আমরা এক,

চিৎকার করে বলে দাও আমরা এক।

জাগো ...


এক ঘণ্টা ৫৪ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে রোজা এবার ঋষিকে উদ্ধারের জন্য মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। মন্ত্রী তার অবস্থান থেকে ঋষিকে উদ্ধারের সর্বোচ্চ চেষ্টার আশ্বাস দেন। বিনিময় কাজ শুরু হয়। একটি ঝুলন্ত ব্রিজের এক পাশে সেনাবাহিনী ওয়াসিম খানকে নিয়ে দাঁড়ালেও অন্য পাশে অপহরণকারীরা ঋষিকে না এনে তার কাপড় রেখে চলে যায়। এতে ধরে নেওয়া হয়, ঋষিকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু রোজা কোনোভাবেই এটা বিশ্বাস করেন না। তিনি বলেন, ঋষি বেঁচে আছে।


এর কিছু পরে দেখা যায়, অপহরণকারী এক নারী সদস্যের সহায়তায় ঋষি পালিয়ে যাচ্ছেন। পিছনে ধাওয়া করছে অপহরণকারীরা। দুই ঘণ্টা ১২ মিনিট পাঁচ সেকেন্ডে ঋষিকে ধরে ফেলেন লিয়াকত খান। ঠিক সেই সময় রোজা ও সেনাবাহিনীর লোকজনও সেখানে হাজির হয়। ঋষি এবার লিয়াকত খানকে বলেন,


এবার কী করবে তুমি? তুমি তো আমাকে মারতে পারবে না। তোমার ছোটো ভাই মারা যাওয়ার সময় আমি তোমার কান্না দেখেছি। তোমার এই ভয়াবহ রূপ তো শুধু মুখোশ। ভিতর ভিতর তুমি তো ভালো মানুষ। তোমার বিবেক মহান। তুমি আমাকে মারতে পারবে না। এখন আমি যাচ্ছি। তোমার যা করার করে নাও।

এ সময় লিয়াকত গুলি চালালেও ঋষিকে হত্যা করেন না। লিয়াকত কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলেন, ‘যাও, যাও। উগ্রবাদীরা অশ্রু মুছবে এবার। এরপর ঋষি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকার দিকে পা বাড়ান। আর লিয়াকত খানও গা ঢাকা দিতে থাকেন। ঋষিকে পেয়ে রোজা পরম আনন্দে জড়িয়ে ধরেন। ঋষির ফিরে আসার মধ্য দিয়ে শেষ হয় রোজা।


উল্টো চোখে কাশ্মির দর্শন


পাঠক, এতোক্ষণ রোজার ন্যারেটিভ উপস্থাপন করা হলো। সেই ন্যারেটিভে এটা পরিষ্কার যে, কাশ্মির সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদের এক ভয়াবহ আখড়া, আর ভারত এক সম্প্রীতির দেশ। কাশ্মিরের জঙ্গিনেতা ওয়াসিম খান একা ৪৩ জনকে হত্যা করেছে, তারা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত, এরা এতোই শক্তিশালী যে নিশ্ছিদ্রনিরাপত্তার মধ্যে চাইলেই কাউকে অপহরণ করতে পারে এবং দিনশেষে বোঝা যায়, এই জঙ্গিরা ভুল পথে আছে। কিন্তু চলচ্চিত্রজুড়ে কোথাও ঠিক কেনো কাশ্মিরের এই মানুষেরা জঙ্গি হয়, মানুষ হত্যা-অপহরণ করে, তার কোনো চিহ্ন নেই। নির্মাতা মনিরত্নমের দেখা কাশ্মিরের বাইরের কি তাহলে অন্য কোনো কাশ্মির আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা থাকবে এখনকার আলোচনায়।


২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ৯ এপ্রিল। কাশ্মিরের লোকসভার উপনির্বাচন চলছে। অন্যদিকে ফারুক আহমেদ ডার নামে এক যুবককে আটক করে সারাদিন গাড়ির সামনে বেঁধে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভারতীয় সেনারা। বি বি সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফারুক ভোট দেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হলে তাকে আটক করা হয়। তার কাছে ভোটার পরিচয়পত্রও ছিলো। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তাকে নিয়ে মানবঢাল হিসেবে গাড়ির সামনে বাঁধা হয়। এরপর সারাদিন তিনি গাড়ির সামনে বাঁধাই ছিলেন। পরে সন্ধ্যায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর অভিযোগ, ফারুক পেট্রল বোমা ও পাথর ছুড়েছিলেন। কিন্তু ফারুকের দাবি, তিনি কখনোই এটা করেননি।


ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আরো শঙ্কার কথা হলো, ফারুককে এভাবে সারাদিন বেঁধে রাখার জন্য ভারতীয় সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে প্রশংসাপত্র দেওয়া হয় কাশ্মিরে নিয়োগ থাকা সেনা কর্মকর্তা মেজর গগইকে। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তির নতুন পদ্ধতি বের করায় তার প্রশংসাও করা হয়।  অন্যদিকে কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী নেতা আফজাল গুরুকে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি রাতের আঁধারে অত্যন্ত গোপনীয়তায় ফাঁসি দেয় ভারত সরকার। আফজালের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ২০০১ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সংসদ ভবনে হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ফাঁসির আগে ১২ বছর তাকে নিঃসঙ্গ বন্দিজীবন কাটাতে হয়। মৃত্যুর পর তার জন্মভূমি কাশ্মিরেও ঘুমানোর সুযোগ হয়নি আফজালের। ফাঁসির পর তিহার কারাগারেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়। শুধু তা-ই নয়, আফজালের ফাঁসির কথা তার বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান কাউকেই জানানো হয়নি। কারণ ভারত সরকারের ভাষায়, আফজাল অত্যন্ত খতরনাক জঙ্গি।


আফজালের কোনো আইনজীবী ছিলো না। আদালত নিজে থেকে অপেক্ষাকৃত এক তরুণ আইনজীবীকে আফজালের পক্ষে নিয়োগ দিলেও তিনি একবারও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। এমনকি আফজালের সমর্থনে কোনো সাক্ষীকেও আদালতে হাজির করেননি; জেরা করেননি রাষ্ট্রপক্ষের কোনো সাক্ষীকেও। কিন্তু যে অভিযোগের দায়ে আফজালকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়, সেটা ছিলো বেশ ‘রহস্যময়। কারণ হামলার পর পরই বলা হয়েছিলো, সংসদ ভবনের ফটক দিয়ে ভিতরে ঢুকে পাঁচ জন সশস্ত্র ব্যক্তি গাড়িবোমা হামলা চালিয়েছে। এতে আট নিরাপত্তাকর্মী ও এক মালি নিহত হয়েছে। পরে ঘটনাস্থলেই পাঁচ হামলাকারীকে হত্যা করেছে নিরাপত্তাবাহিনী।


এ ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এনকাউন্টার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য ‘খ্যাত দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল দাবি করে, তারা ঘটনার আসল পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে পেয়েছে। এরপর ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর দিল্লি থেকে অধ্যাপক এস এ আর গিলানি, কাশ্মিরের শ্রীনগর থেকে শওকত গুরু ও তার চাচাতো ভাই আফজাল গুরুকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় শওকতের স্ত্রী আফসান গুরুকেও। সেসময় পুলিশ জানিয়েছিলো, গিলানির দেওয়া তথ্য মোতাবেক আফজালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশি রেকর্ডে দেখা যায়, গিলানিকে গ্রেপ্তারের আগেই আফজালকে গ্রেপ্তার করা হয়! হাইকোর্ট একে স্ববিরোধী বললেও এ নিয়ে আর কোনো কথা হয়নি। অন্যদিকে পুলিশ প্রথমে হামলাস্থলে পাঁচ জনের কথা বললেও পরে আদালতে বলা হয় আফজালও নাকি হামলাকারীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন! কিন্তু তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন! পুলিশ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের তথ্য হাজির করলেও আদালত পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। বরং শেষ পর্যন্ত আফজালকে ফাঁসি দেন। একই সঙ্গে বিচার স্বচ্ছ হয়েছে, সেটা প্রমাণের জন্য কয়েকজনকে খালাসও দেওয়া হয়। এই ছিলো ক্ষমতাসীন বি জে পি সরকারের আফজাল গুরু কাহিনি!


এতোক্ষণ আলোচনা হলো, কাশ্মিরের নির্দিষ্ট দুটি ঘটনা ধরে। এবার সার্বিক পরিসংখ্যান কী বলে দেখা যাক। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ পর্যন্ত কাশ্মিরে প্রায় ৯৪ হাজার দুইশো ৯০ জন মানুষকে হত্যা করা করেছে ভারতীয় বাহিনী। এদের মধ্যে সাত হাজার ৩৮ জন মারা গেছে কারাগারে বন্দি অবস্থায়। কাশ্মিরি মিডিয়া সার্ভিস দীর্ঘ গবেষণার পর ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, কাশ্মিরে বিধবার সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার আটশো ছয় জন। আর এতিম শিশু কমপক্ষে ১০ লাখ সাত হাজার পাঁচশো ৪৫ জন। একই পরিসংখ্যানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়; সেটা হলো, ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মিরের একমাত্র হাসপাতালে মানসিক রোগীর সংখ্যা ছিলো প্রায় ৬৮ হাজার। এই হিসাব নিঃসন্দেহে কাশ্মিরের সার্বিক অবস্থা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ভারতীয় বাহিনী এই সময়ের মধ্যে ১০ হাজার একশো ৬৭ জন নারীকে ধর্ষণ করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ১০ লাখ বসতবাড়ি ও ভবন। এমনকি এই ২৭ বছরে প্রায় আট হাজার কাশ্মিরি, ভারতীয় কারাগারে থাকা অবস্থায় নিখোঁজ হয়।


ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক ও পিপলস ট্রাইব্যুনাল-এর যুগ্ম আহ্বায়ক ড. অঞ্জনা চ্যাটার্জি ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মিরের মানবাধিকার পরিস্থিতি তদন্তে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল থেকে ২০ জুন পর্যন্ত কাশ্মিরের বারমুল্লা ও কুপওয়ারি জেলায় তদন্ত চালায়। এ অভিজ্ঞতা নিয়ে ড. অঞ্জনা একটি প্রবন্ধ লিখেন, যা ‘লন্ডন ইন্সটিটিউট অব সাউথ এশিয়া জার্নাল-এ প্রকাশ হয়। প্রবন্ধে বলা হয়, বারমুল্লা ও কুপওয়ারি জেলার কাঁদা, পাথরের স্তুপ, ঘন ঘাসের মাঠে, পাহাড়ের পাদদেশে ও সমতল ভূমিতে ভারতীয় সামরিক বাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনীর নির্যাতনে নিহত কাশ্মিরি মানুষের নয়শো ৪০টি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে।১০


প্রবন্ধে ড. অঞ্জনা কাশ্মিরে ভারতীয় বিশেষ বাহিনী ও পুলিশি নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-আটক করার পর মাথা নিচের দিকে করে ঝোলানো হয়, অতঃপর তার মলদ্বারে সিরিঞ্জ দিয়ে প্রবেশ করানো হয় পেট্রোল। পরবর্তী সময়ে মুখে কাপড় বেঁধে পানিতে চোবানো হয়, কোনো প্রকার খাবার দেওয়া হয় না, অঙ্গহানি করা হয়। আর নারী-শিশুদের ক্ষেত্রে এর পাশাপাশি চলে ধর্ষণ।


এবার দেখা যাক, কাশ্মিরে নিরাপত্তার স্বার্থে কী কী করেছে ভারত সরকার। কাশ্মিরি আজাদী দমন করতে সেখানে শুধু নিয়মিত সেনাবাহিনীর সদস্যই আছে পাঁচ লক্ষাধিক; এছাড়া রয়েছে প্যারা মিলিশিয়া বাহিনী, স্পেশাল ব্রাঞ্চ কাশ্মির, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স কাশ্মির, সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সি আর পি এফ), স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ, নিয়মিত পুলিশ বাহিনী। সবচেয়ে শঙ্কার কথা হলো, এসব বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দানে চালু রয়েছে কালো আইন-আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট-১৯৫৮ (Armed forces Special Power Act-1958) এবং ডিস্টার্বড আর্কাস অ্যাক্ট-১৯৬১ (Disturbed Arcas Act-1961)। প্রথম আইনটি পণ্ডিত নেহেরু ও দ্বিতীয়টি শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী চালু করেন। ভারত ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে আজ পর্যন্ত একদিনের জন্যও কাশ্মিরে আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট-১৯৫৮ স্থগিত করেনি।১১


এবার আসি কাশ্মিরের সাম্প্রতিক প্রসঙ্গে। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি কাশ্মিরের কাঠুয়া শহরের কাছে মুসলমান যাযাবর সম্প্রদায়ের আট বছরের মেয়েশিশু আসিফা বানু নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় কাছের এক জঙ্গলে। ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ এক তরুণকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার জবানবন্দির ভিত্তিতে, মন্দিরের পরিচালক সানজি রাম এবং পুলিশ কর্মকর্তা দীপক খাজুরিকেও গ্রেপ্তার করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, এ ঘটনায় সুরিন্দম কুমার নামে আরো একজন পুলিশ সদস্য জড়িত। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত গ্রেপ্তার ওই তরুণের জবানবন্দিতে ভয়ঙ্কর নৃশংসতার কথা উঠে এসেছে। ওই তরুণ ঘোড়া খুঁজে দিতে সাহায্যের কথা বলে আসিফাকে জঙ্গলে ডেকে নেয়। এরপর তিনি আসিফাকে জোর করে মন্দিরে নেন এবং নেশাদ্রব্য খাওয়ান। ওই তরুণ ও তার বন্ধু প্রবেশ কুমার, মন্দিরের পরিচালক সানজি রাম এবং পুলিশ কর্মকতা খাজুরিয়া শিশুটিকে মন্দিরে আটকে রেখে তিন দিন ধরে ধর্ষণ করে। ওই তিন দিন শিশুটিকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে রাখা হয়েছিলো এবং কিছুই খেতে দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে ধর্ষকরা পাথর দিয়ে আসিফার মাথায় আঘাত করে হত্যা করে এবং লাশ জঙ্গলে ফেলে দেয়।


আসিফা ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের পর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও বিচার শুরু হয়নি। উল্টো হিন্দু অধ্যুষিত জম্মুর কয়েকটি হিন্দু অধিকার গ্রুপ অভিযুক্তদের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। আসিফা হত্যা বিচারের দাবি এখন নীরবে কাঁদছে।


এই সময়ে (২০১৮) কাশ্মিরের ‘আজাদি আন্দোলনের প্রধান নেতা বলা হয়, ৮৮ বছর বয়সি সৈয়দ আলী শাহ গিলানিকে। তার বাড়ি থেকে ২০০ গজের মধ্যে মসজিদ থাকলেও গত আট বছর তিনি মসজিদে গিয়ে জুম্মার নামাজ পড়তে পারেননি। এই দীর্ঘ সময় তিনি প্রায়ই গৃহবন্দি থাকতেন, না হয় তাকে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া হতো। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০ মার্চ শুক্রবার আট বছর পর সৈয়দ আলী শাহ গিলানিকে মসজিদে নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। যেকোনো ধর্মের মানুষেরই তার ধর্মপালন ও প্রার্থনার অধিকার আছে। অথচ একজন মানুষকে আট বছর ধরে সেই অধিকার পালন করতে দেওয়া হয়নি!


১৯৪৭-এ দেশভাগের পর থেকে ভারত-পাকিস্তান চিরবৈরী প্রতিবেশী হিসেবে অবস্থান শুরু করে। ৮০র দশকে কাশ্মিরে আজাদি আন্দোলন শুরুর পর থেকে সেখানকার মানুষের ওপর গণহত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু হয়। এবং কথায় কথায় স্বাধীনতাকামী কাশ্মিরিদের পাকিস্তানের চর বা সন্ত্রাসী বানানোর এক বীভৎস অবদমন নীতি চালায় ভারত সরকার। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরো রোজায় এই অবদমন নীতির সামান্য ইঙ্গিতও নেই!


আরো কী কী ঘটে সম্প্রীতির ভারতে


মনিরত্নমের চোখে দেখা কাশ্মির আর বাস্তবের কাশ্মির যে এক নয়, তা কিছুটা হলেও উল্টো চোখে কাশ্মির দর্শনে বোঝা গেছে। তাই সন্দেহ বেড়েছে রোজা নিয়ে। বহু জাতির ভারতে যে সম্প্রীতি মনিরত্নম রোজায় দেখিয়েছেন বাস্তবেও কি তাই ঘটে; নাকি অন্য কিছু। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এবার।


প্রথমেই আলোচনার প্রয়োজন মনে করছি, ভারতের গ্রাম আর কৃষকদের নিয়ে। কারণ ভয়ঙ্কর কাশ্মির থেকে রোজায় মনিরত্নম সরাসরি ঢুকে গেছেন ভারতের সুজলা-সুফলা, সম্প্রীতির এক গ্রামে। সেই গ্রাম দেখে একবারের জন্যও মনে হয়নি, সেখানে কোনো মানুষ খাদ্যাভাবে আত্মহত্যা করতে পারে! অথচ ভারতের সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস এবং গ্লোবাল জাস্টিস অ্যাক্ট এন ওয়াই ইউ ল স্কুল-এর প্রতিবেদন মোতাবেক ভারতে প্রতি ৩০ মিনিটে একজন করে কৃষক আত্মহত্যা করে। সেখানে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ভালো ফসল না হওয়া, ফলন হলেও ভালো দাম না পাওয়া, বন্যা, খরা ও ঋণখেলাপি।১২


ভারতের সাবেক কৃষিমন্ত্রী শারদ পাওয়ার (২০০৪-২০১৪) ২০০৮ থেকে ২০১১ পর্যন্ত চার বছরে ভারতের ২৯টি রাজ্যের কৃষকদের আত্মহত্যার একটি তালিকা প্রকাশ করেন। তালিকা অনুসারে ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ছয়টি রাজ্যে চার বছরে আত্মহত্যা করা কৃষকের সংখ্যা চার হাজার তিনশো ৮২ জন। ছয়টি রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে মহারাষ্ট্রে। চার বছরে মহারাষ্ট্রে আত্মহত্যাকারী কৃষকের সংখ্যা হলো এক হাজার নয়শো ৫৪ জন। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের এক জরিপে দেখা যায়, ভারতে প্রতিদিন ৪১ জন কৃষক আত্মহত্যা করে। অথচ ভারতে কর্মসংস্থানের মূল উৎসই কৃষি।১৩


বহু জাতি, ধর্ম-বর্ণের মানুষের বসবাস ভারতে। সনাতন ধর্মপ্রধান এই রাষ্ট্রে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম ইসলাম। প্রায় একশো ৩৫ কোটি মানুষের ভারতে মুসলমানের সংখ্যা কমপক্ষে ৩০ কোটি। অথচ দেশটির ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ২২টিতেই গরুর মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ।১৪ ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে মোদির বি জে পি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গরু নিয়ে রাজ্যগুলোতে আরো কড়াকড়ি শুরু হয়। সর্বভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধে বিদ্যমান আইনকে আরো কঠোর করা হয়। যে আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয় যাবজ্জীবন। এ রকম আইন প্রণয়নের মধ্যে ভারতে গো-রক্ষায় সহিংসতা আরো বেড়ে যায়। গরু বহন, ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা কিংবা সন্দেহের বশে হত্যা করা হয় মুসলমানদের। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গো-রক্ষার নামে ভারতে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত মোট একশো ৩৭টি ঘটনা ঘটে, এতে নিহত হয় ২৯ জন। হিসাবে দেখা গেছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মুসলমান ৭৫ শতাংশ ও দলিত ১২ শতাংশ।১৫


এছাড়া সম্প্রীতির ভারতে নারীদের অবস্থা নিয়েও কিছু আলোচনার জায়গা আছে। ইন্ডিয়ান হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট সার্ভে (আই এইচ ডি এস)-এর দেওয়া এক তথ্য অনুসারে, ২০০৪-২০০৫ এবং ২০১১-২০১২ এর মধ্যে ভারতে মাত্র চার দশমিক ৯৯ শতাংশ নারী নিজেদের পছন্দ করা পাত্রকে বিয়ে করেছে। অন্যদিকে বাড়ির বাইরে এমনকি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে ৭৯ দশমিক আট শতাংশ নারীকে বাড়ির পুরুষের অনুমতি নিতে হয়। শুধু ২০১২-এর আই এইচ ডি এস-এর সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, মাত্র পাঁচ শতাংশ নারী নিজেই নিজের স্বামী নির্ধারণের স্বাধীনতা পেয়েছেন।১৬ ভারতে বিভিন্ন রাজ্যে গড়ে ৬৫ শতাংশ নারী বিয়ের দিন তাদের জীবনসঙ্গীর মুখ দেখার সুযোগ পান। অথচ ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনাতে নারী-পুরুষ লিঙ্গ সমতার কথা বলা আছে।


জাতিসংঘ প্রকাশিত বিশ্ব ক্রাইম ট্রেন্ড প্রতিবেদনের ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের সংস্করণ থেকে জানা যায়, বিশ্বে ধর্ষণপ্রবণ প্রথম ১০টি দেশের তালিকায় এক নম্বরে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ভারত চতুর্থ স্থানে।১৭ ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, নারীর জন্য বিশ্বের অন্যতম বিপদজ্জনক রাষ্ট্র ভারত। এখানে প্রকাশ্যে রাস্তায়, গাড়িতে, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে নারী ধর্ষণের শিকার হয়। সর্বশেষ প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভারতে প্রতি ২২ মিনিটে একজন ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।


শুধু কাশ্মির নয়, সম্প্রীতির ভারতে আরেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার নাম মাওবাদ। আদিবাসীদের ভূমির মালিকানা, পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি রক্ষার্থে রাষ্ট্র ও বৃহদাকার খনি-করপোরেশনের বিরুদ্ধে ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশসহ ভারতের ২৪টি রাজ্যে মাওবাদীরা সক্রিয়। আদিবাসী বসতি ঘেরা ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো খনিজ সম্পদে ভরপুর। মার্বেল, তামা, সিলিকা, ইউরেনিয়াম, লাইমস্টোন, খনিজ বক্সাইট, গ্রানাইট, টিন, ডলোমাইট, লৌহ আকরিক, কোরান্ডামের মতো ব্যাপক খনিজ পদার্থ আছে এসব অঞ্চলে। উন্নয়নের ধুয়া তুলে এসব খনিজ সম্পদ তুলতে ভারত সরকার এই অঞ্চলগুলোর ইজারা দেয় বহুজাতিক কোম্পানির কাছে।১৮ এসব কোম্পানি যাতে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারে, এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে সশস্ত্র বাহিনী পর্যন্ত নিয়োগ করা হয়। যে বাহিনী বছরের পর বছর ধরে মাওবাদীদের নির্মূলে ভয়াবহ দমন-নিপীড়ন-ধর্ষণ-হত্যা চালিয়ে আসছে। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাহাড়ি সম্পদ লুট ও মাওবাদী উচ্ছেদে ভারত সরকার গত এক দশকে ১০ হাজার মাওবাদীকে হত্যা করেছে।১৯ তবে ভারত ও তাদের বাণিজ্য প্রাধান্যশীল গণমাধ্যম সেই নৃশংসতার ঘটনা কখনো স্বীকার করেনি। উল্টো তারা মাওবাদীদেরকে ‘সন্ত্রাসী, ‘অসভ্য আখ্যায়িত করে আসছে।


পাঠকের প্রতি

পাঠক, এতোক্ষণ মণিরত্নমের রোজার বাইরে ভারত ও কাশ্মিরের ভিন্ন কিছু চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। সেই চেষ্টার সফলতা কিংবা ব্যর্থতা এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। তবে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত কেবল আপনার।


লেখক : এ এইচ মানিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।


ahmanikrumcj26@gmail.com

 

 

তথ্যসূত্র


1. https://www.bbc.com/bengali/news-40008999; retrieved on: 21.04.18

2. https://www.bbc.com/bengali/news-40008999; retrieved on: 21.04.18

3. https://istishon.com/?q=node/19666; retrieved on: 19.04.18

4. https://istishon.com/?q=node/19666; retrieved on: 19.04.18

5. https://istishon.com/?q=node/19666; retrieved on: 19.04.18

6. https://istishon.com/?q=node/19666; retrieved on: 19.04.18

7. https://goo.gl/rQkP41; retrieved on: 18.04.18

8. https://goo.gl/rQkP41; retrieved on: 18.04.18

9. http://bhorer-dak.com/2016/06/17/51222.php; retrieved on: 25.04.18

10. https://goo.gl/rQkP41; retrieved on: 18.04.18

11. https://goo.gl/rQkP41; retrieved on: 18.04.18

12. https://blog.bdnews24.com/tariqmahmud/30186; retrieved on: 26.04.18

13. https://bit.ly/2jfnzEW; retrieved on: 28.01.18

14. https://bit.ly/2HY986t; retrieved on: 27.04.18

15. http://archive.li/jUAqZ; retrieved on: 01.05.18

16. http://bitarka.com/70th-independence-day-and-indian-women/; retrieved on: 22.03.18

17. https://goo.gl/FfRSaR; retrieved on: 27.04.18

18. http://www.chintaa.com/index.php/networkdetails/showAerticle/3/23/bangla; retrieved on: 01.05.18

19. http://archive.li/2azdc; retrieved on: 01.05.18

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন