Magic Lanthon

               

ফারুক আলম

প্রকাশিত ০৫ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

জৈবিক পদ্মার দেহাতীত বিসর্জন

ফারুক আলম



কাহিনি, চিত্রনাট্য, দৃশ্যায়ন, বিচিত্র চরিত্রের উপস্থাপন, ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহ ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ও সীমানা নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র সমাজ সচেতনতার এক ভিন্ন মাত্রার দাবিদার; প্রথা ও কাঠামো পরিপন্থি। শুধু বিভিন্ন পুরস্কার, জনপ্রিয়তা বা দর্শকপ্রিয়তা বিবেচনা করে সেসব চলচ্চিত্রের গভীরে প্রবেশের আগ্রহ জন্মায় না। বরং তা শিল্পগুণে গুণান্বিত। সেসব চলচ্চিত্রের নির্মাতারা যা বলেছে, যা বলতে চেয়েছে বা সময়, সামর্থ্য, সামাজিকতা ও আইনের কারণে যা বলতে পারেনি, যথাযথ বিবেচক সমঝদার দর্শক তা নিজগুণে আত্মস্থ করে। শিল্পের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। আর্থসামাজিক বাস্তবতার নিরিখে সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার ও ব্যক্তিকে দর্শক পর্যবেক্ষণ করে। অর্থনীতি হলো সমাজের প্রাণশক্তি আর সংস্কৃতি হলো দেহাবয়ব। কারণ অর্থনীতি হলো একটি সমাজের ভৌত-কাঠামো আর সংস্কৃতি হলো তার উপরি-কাঠামো। যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক না কেনো, অর্থনীতি ব্যতীত সব আলোচনা ও বিশ্লেষণ অর্থহীন।


ভাষা, রাজনীতি, আচরণ, শিক্ষাদীক্ষা ইত্যাদি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিকে বাদ দিয়ে কোনো কিছুই হয় না। না চলচ্চিত্র, না নাচগান, না সাহিত্য-শিল্প চর্চা। অর্থনীতি ছাড়া এমনকি প্রেম-ভালবাসাও অসম্ভব। ভালোলাগার বেড়াজালে একটু বেয়াড়া হলেও অর্থনীতি এসব ভালোলাগাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কখনো কখনো দারুণভাবে নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। তেমনই কৌশিক গাঙ্গুলির বিসর্জন দেখতে দেখতে দর্শক পেয়ে যায় পদ্মা, নাসের আলী ও গণেশ মণ্ডলকে। পদ্মা যখন নাসের আলীকে বলেন, ‘একটা কথা মনে রাখবেন, আজকালকার দিনে কেউ কারো জন্য এমনই এমনই কিছু করে না। তখন আমরা আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিশ্লেষণের তাগিদ খুঁজে পাই। স্বার্থের নিগূঢ়ে বাঁধা আধুনিক রাষ্ট্রের নগরবাসীরা ব্যক্তিমানুষদের শুধু সমাজ ও প্রেম সম্পর্ক নিয়ে ভাবায় না-ভাবায় রাষ্ট্রযন্ত্রের অসারতা নিয়েও। ভাবনাকে ঘনীভূত করে যখন ছোট্ট মন্টু বলে, ‘মা, এপারে বাংলাদেশ ওপারে ইন্ডিয়া মাঝখানে ইছামতি নদীটা কার?’ ‘ও দেশে চাঁদ ওঠে?’ ‘ও দেশের মাইনষে মরে?’ তার এই প্রশ্নে এপার-ওপার দুদেশের আন্তঃসম্পর্কটা সামনে চলে আসে। প্রশ্ন গভীরতর হয়ে ওঠে, যখন মন্টুর প্রশ্নের জবাবে মা (পদ্মা চরিত্রে জয়া আহসান ) বলেন, ‘প্যাঁচাল না পাইরা ছড়াটা শিখ।


আহারে, সীমানা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সর্বদাই প্যাঁচাল, সর্বদাই অবান্তর। আর যারা এ প্রশ্ন তোলে তারা যতো সহজসরল ভালো মানুষই হোক, যতো জ্ঞানী-গুণী নমস্যই হোক না কেনো, তারা সবাই মন্টুর মতো ছেলেমানুষ। চলচ্চিত্র এগোতে থাকে। পদ্মা বিস্মৃত অতীতে ফিরে যায়। তৈরি হয় বিসর্জনের আবহ। পদ্মার মাতাল স্বামী অতিরিক্ত মদ্যপানে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান-ইছামতির চরে পড়ে থাকা মৃতপ্রায় নাসের আলী পদ্মার যত্ন, আতিথেয়তায় সুস্থ হয়ে ওঠে। স্বামীর পোশাক নাসেরের গায়ে চড়িয়ে তার মধ্যে পদ্মা খুঁজে পান মৃত স্বামীর স্মৃতিচিহ্ন। তার জন্য সিগারেট ও মদের ব্যবস্থা করেন। সিগারেটের ধোঁয়া ও মদের গন্ধে স্বামীকে পাওয়ার আকুলতায় ব্যাকুল হয়ে ওঠেন পদ্মা। বিদায় রাতের স্মৃতিকে নিজের দেহে রোপিত করেন। ভারতের নাগরিক প্রেমিক নাসেরের স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন হয় ঔরসে জন্ম পদ্মার ছেলে মন্টু। নাসের আলীর ডাকনাম মন্টু; সেই নামেই তার নাম। জীবন চালিয়ে নিতে সর্বশেষ গণেশ মণ্ডলকে বিয়ে করে পুনরায় সংসার করেন পদ্মা। এই সংসারে যাপিত জীবনের স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে বিসর্জন। ‘গঙ্গা যমুনা স্বরস্বতী ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর ...’ আবহসঙ্গীত দিয়ে আমরা বিসর্জনের মন্ত্রবৎ উচ্চারণে মনোসংযোগের নিমগ্নতায় নিমজ্জিত হই; নানান উপাদানে সমৃদ্ধ চিত্র চিত্রায়ণ ও উপস্থাপনের মাধ্যমে কাহিনির অগ্রায়ন হয়।


দুই.   

পদ্মা। পুরো নাম পদ্মা দাশ। বৈবাহিক সূত্রে পাওয়া নাম পদ্মা হালদার; স্বামী রতন হালদার; শ্বশুর রমেন হালদার। ইছামতি নদীর পাড়ে শিবপুর গ্রাম। এপারে বাংলাদেশ ওপারে ভারত। মাঝখানে বয়ে চলে নদী। ইছামতির মাঝ বরাবর দু-দেশের সীমানা। একপাড়ে টহল দেয় বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বি জি বি) অন্যপাড়ে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বি এস এফ)। পদ্মার বৈধব্য কাহিনির শৈল্পিক চিত্রনাট্যের নামকরণ হয়েছে বিসর্জন। চলচ্চিত্রে উপস্থাপিত হয়েছে সীমান্ত এলাকার মানুষের গ্রামীণ সংসার, নর-নারীর জীবন যন্ত্রণা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, গ্রাম্য ও ধর্মীয় উৎসব, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার বেতার বার্তা, ব্যবসায়ীদের প্রতিপত্তি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও প্রতিবেশী দেশের শোষণ-শাসন। এই চিত্রায়ণ কখনো সরাসরি, কখনো প্রতীকী। ভাবনার গভীরে ডুব দিলে উঠে আসে বিশ্ব রাজনীতি। পুঁজিবাদী মোড়লের মাতব্বরিতে গরীব সংসারের বিধবা দখল। স্বামীর স্মৃতি রোমন্থনে খুঁজে পাওয়া প্রতিস্থাপিত প্রেমিক পুরুষের ঔরসে জন্ম গোপন সম্পত্তি বিধবার সন্তান। গোপন ভালোবাসা নিয়ে প্রতিবেশী দেশ থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। বিজয়া দশমীতে সবকিছু বিসর্জনের উৎসবের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে পদ্মার জীবনে নব জন্ম লাভ। স্বামীর স্মৃতি, শ্বশুরের ভিটা, স্বামীর বিকল্প নতুন পুরুষ, সংস্কার, সংসার সবকিছু ফেলে বেঁচে থাকার তাগিদে গ্রামের মাতব্বরের প্রতিষ্ঠিত পরিবারে সমাজ স্রোতের মূল ধারায় ফিরে মাতৃত্বে, পত্নীত্বে প্রাপ্ত পদ্মার অমরত্ব।


তিন.

বিসর্জন শুরু হয় ছোটোশিশু মন্টুর ছড়া দিয়ে।

চাক্কা ঘুরে বনবন

কাচ ভাঙিলে ঝনঝন

বাতাস বয়  শন শন

কু ঝিক ঝিক ইস্টিশন

ঘেঙর ঘ্যাঙ ব্যাঙের ডাক

ধ্যাঙ কুরাকুর পূজা ঢাক

সপাং কইরা ব্যাতের বাড়ি

টগবগায় এক্কা গাড়ি।


নাসের ও পদ্মার বিদায় রাতের গোপন ও ‘অবৈধ মিলনে জন্মায় মন্টু। সমাজের সবাই জানে গণেশ মণ্ডলের ছেলে মন্টু। ভারতের ‘অবৈধ প্রেমে জন্মানো বাংলাদেশকে আমেরিকার কর্তৃত্ববাদী পিতৃত্বে বিশ্বের বুকে টিকে থাকতে হলো। নেতিবাচক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এমনটা অবশ্য শোনা যায়। তবে এভাবে না বলাই ভালো। মন্টুর ছড়ার উচ্চারণের পাশাপাশি তার হাতের রঙ পেন্সিলের রঙিন বিচরণ, রঙিন চরকার ঘূর্ণন, মায়ের সঙ্গে কথোপকথন, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাস তথা বিভাজনের রাজনীতি দিয়ে ভারত ভাগ ও বাংলা ভাগের মর্মান্তিক ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। দুই দেশের সীমানা সংক্রান্ত তার উক্তি পুনর্বার স্মরণ করিয়ে দেয় সীমানা রাজনীতির অসারতাকে।


সম্রাট আকবরের শাসনামলে ভারতবর্ষ সুবিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হলেও বাংলা সব দিন সব দিক থেকে স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র বজায় রেখেছে। কালক্রমে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলা বিহার উড়িষ্যার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার মাধ্যমে ভারতবর্ষের ভাগ্যাকাশে নেমে আসে পরাধীনতা ও অমানিশার অন্ধকার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দখল নেয় ভারত। শাসন ক্ষমতা যায় ইংল্যান্ডের রানির হাতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতে বিশ্ব রাজনীতিতে দুর্বল্যের কারণে বৃটিশ তার হাত গুটিয়ে নেয়। এক এক করে তাদের কলোনি স্বাধীন হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন হয় ভারত। ইংরেজ শাসনের প্রথম ভাগে উচ্চবিত্তদের তথা সামন্তপ্রভুদের শ্রেণি স্বার্থে গড়ে ওঠে ধর্মভিত্তিক সংগঠন। কালক্রমে স্বার্থ সংরক্ষণে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ রোপিত হয়। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ ভিটে ছাড়া হয়। তারা নিঃশেষিত হয় ধনে-প্রাণে-মানে। ধর্ষিত হয় হাজারো নারী। নির্বিচারে খুন হয় নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশু। বাংলার মানুষ ও অধিকাংশ নেতা ভারত ভাগের বিরোধী ছিলো বলে নির্যাতনের মাত্রা ছিলো সর্বাধিক। দ্বি-জাতি তত্ত্বে ভাগ হয় ভারতবর্ষ। জন্ম হয় হিন্দুস্তান বা ভারত ও পাকিস্তানের। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ও ১৫ আগস্ট স্বাধীন হয় পাকিস্তান ও ভারত।


মুসলিম প্রধান এলাকা নিয়ে হয় পাকিস্তান ও হিন্দু প্রধান এলাকা হয় হিন্দুস্তান। র‌্যাডক্লিফ কমিশন পাকিস্তান-হিন্দুস্তানের বর্ডার লাইন নির্ধারণ করে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতারা সরেজমিনে এসে তাদের দেশের অংশ বুঝে নেয়। আপত্তি সত্ত্বেও ভাগ হয় বাংলা। বাংলার পূর্ব অংশ যা পূর্ব বাংলা বা পূর্ববঙ্গ বলে পরিচিত তা যায় পাকিস্তানের সঙ্গে, নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম অংশ যা পশ্চিমবঙ্গ নামে পরিচিত তা চলে যায় ভারতের সঙ্গে। স্বাধীনতার পর পরই বাংলার মানুষ বুঝতে পারে মুসলিম লীগের অর্জিত পূর্ব পাকিস্তান হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের অধীনস্থ পরাধীন একটি রাজ্য; তারা বাঙালি জাতির ভাষা-সংস্কৃতি, অস্তিত্ব ধ্বংস করতে চায়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। শুরু হয় স্বাধিকারের আন্দোলন। যা পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার সংগ্রামে পরিণত হয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। মুক্তিযুদ্ধে ভারত প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে। বাঙালিদেরকে শরণার্থী হিসেবে শুধু আশ্রয় দেয় না, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। অস্ত্র ও সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে মিত্রবাহিনী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে সহযোগিতা করে দ্রুত দেশকে স্বাধীন করার জন্য। মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলো এবং বাঙালির স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলো। ১৯৭৫-এর পর আমেরিকা নানারকম সহযোগিতা করে এবং মানুষের চিন্তাকে ঘুরিয়ে মার্কিন নির্ভরতায় পরিণত করে। বস্তুত তারা কারো প্রকৃত বন্ধু না হলেও বাংলাদেশ তাদেরকে শুধু বন্ধু না, ত্রাণকর্তা ভাবতে থাকে। বিশ্ব বাস্তবতায় অবশ্যই যেকোনো দেশ মার্কিন সম্পর্ককে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে থাকে। বাংলাদেশকে তা করতে হয় আরো বেশি করে।


চার.

পদ্মার জন্ম বৃহত্তর ফরিদপুরে। বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি থানায়। মধুমতি নদীর পাড়ের গ্রাম রাতুল। বাবা পরিমল দাশ; মা কমলা দাশ। বাবার শাড়ি-কাপড়ের ব্যবসা ছিলো। তার বিয়ে হয় ইছামতি নদী পাড়ের শিবপুর গ্রামে রমেন হালদারের ছেলে রতন হালদারের সঙ্গে। স্বামী রতন বেকার, মাতাল। চারদিকে ধার-দেনা। যতো মদ খায়, ততো দেনা বাড়ে। পদ্মা স্বামীকে ভালোবাসতো। ভালোবাসতো তার মদ আর সিগারেটের গন্ধ। কিন্তু তার ভালোবাসা তাকে বাঁচাতে পারলো না। ধার-দেনা আর নেশা তাকে শেষ করে দিলো। অতিরিক্ত মদ্যপানে লিভার সিরোসিসে মৃত্যু হয় মাতাল রতনের। বৃদ্ধ অথর্ব শ্বশুরকে নিয়ে স্বামীর ভিটায় জরাজীর্ণ বাড়িতে বাস করেন পদ্মা। ইটের বাড়ি, টালির চাল। ভাঙাচোরা, প্লাস্টার ওঠা স্যাঁতা পড়া দেয়াল। বারান্দায় বাঁশের বেড়া দেওয়া। উঠোনের কোণায় রান্নাঘর। চা বানানোর সময় সেখানকার অগোছালো অপ্রতুল তৈজসপত্র চোখে পড়ে। এসবের মধ্যেও ধনিক বণিকের দেবতা সিদ্ধিদাতা গণেশের সঙ্গী ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি করে। অভাবের ঘর গৃহস্থালিতে তাদের সঙ্গে নিত্য বসবাস। মাতাল স্বামীর স্মৃতি আঁকড়ে তার বাড়িতে থাকেন পদ্মা। শ্বশুরের সেবা শুশ্রƒষা করেন। কাপড় সেলাই করে যৎসামান্য রোজগারে চলে তাদের সংসার।


গ্রামের ধনী ব্যবসায়ী গণেশের নজর পদ্মার ওপর। এ নজরকে না বলা যায় কু, না বলা যায় নেক। মোট কথা, ধনিক বণিক গণেশের ধ্যান-জ্ঞান রূপসী বিধবা পদ্মা। গণেশের প্রভাব প্রতিপত্তি সর্বত্র। কিন্তু মনে শান্তি নেই। তিনি পদ্মাকে বিয়ে করে সংসার করবেন। নানাভাবে তাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা চলে। পদ্মার ঘরসংসার বাজার-ঘাট সব দিকে তার নজরদারি। লোক লাগিয়ে রাখে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। বাজারের দোকানদারদের পদ্মার কাছ থেকে টাকা নেওয়ায় মানা আছে। পদ্মা সবকিছু বুঝেও না বোঝার ভান করেন। নিরুপদ্রুব জীবন নির্বাহে তিনি সবকিছু এড়িয়ে তার মতো করে চলেন। জগৎ সংসারে কারো বিরুদ্ধে তার কোনো নালিশ নেই।




সে বার বিসর্জনের পরদিন রোজকার মতো ভোরে বাজারের থলে হাতে নদীর পাড়ের রাস্তা ধরে যাচ্ছিলেন পদ্মা। থলেটা সযত্নে কখনো হাতে কখনো বোগল দাবায় রাখছিলেন। গত রাতের ঝড় জলে নদীর পাড়ে আটকে আছে বেশকিছু বিসর্জন করা প্রতিমার ভগ্নাবশেষ। নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা স্বদেশের পতাকা উড়িয়ে নিজস্ব গতিতে চলছে। গতিশীল চলচ্চিত্রের দৃশ্য বদলাতে থাকে। নদীর পাড়ে একজন মানুষের দেহ দেখতে পান তিনি। কাদায় মাখামাখি। পাড়ে নামেন পদ্মা। লোকটার কাছে যান। এতোক্ষণে হাত থেকে পড়ে গেছে বাজারের থলেটা। উপুড় হয়ে থাকা লোকটাকে বহু কষ্টে চিৎ করেন। বুকে কান পেতে দেখেন বেঁচে আছে লোকটা। নিজের গায়ে কাদা মাখতে কসুর করে না তিনি। পায়ে হাতে বাম চোয়ালে এমনকি পরিপাটি করে সযত্নে রক্ষিত বুকের উপরি অংশে কাদার প্রলেপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দূরে শোনা যায় আযানের সুর। পদ্মা সিদ্ধান্ত নেন লোকটাকে বাঁচাবেন। তিনি দেখেন লোকটার হাতে এক টুকরো কাপড়। পাশে পানিতে কাদা ধুয়ে দেখা গেলো ভারতের পতাকা। বোঝা যায়, লোকটা বাংলাদেশি নয় ভারতীয়।


পাশে জমির আইল রাস্তায় ততোক্ষণে বি জি বির টহল। বাঁশির সতর্ক সঙ্কেত ও কথাবার্তার শব্দ। সতর্ক হতে হয়। পতাকাটাকে পড়ে থাকা প্রতিমার বেদির বাঁশ কাঠের কাঠামোতে রেখে ভারতের লোকটার পা ধরে টেনে নিয়ে, সেই বেদির আড়ালে রাখেন পদ্মা। বি জি বি টহল এগিয়ে যায়। তাদের সামনে ও পিছনে কিছু লোক, গরু, মাজায় দড়ি বাঁধা বন্দি। পদ্মা বেদির আড়ালে কাদায় শুয়ে পড়েন। হাত, পা, শাড়ি ও বুক তরল কাদায় মাখামাখি। কাদা থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় থাকে না। মানুষের জীবনে এমনও সময় আসে যখন কাদায় নামতে হয়। নিজের জন্য শুধু নয়, অন্যকে বাঁচাতেও ক্লেদাক্ততার শিকার হতে হয়। ক্লেদাক্ত পদ্মা নিজেকে গোপন করে লুকিয়ে রাস্তার দিকে চোখ রাখেন। বি জি বি টহলের পিছনে চার জন লোক চটের বস্তায় বাঁশ ঢুকিয়ে লাশ বহন করছে। বাঁশটা লোকগুলোর কাঁধে। লাশের ঠ্যাঙ ও মাথা বের হয়ে আছে। পদ্মার সামনে দিয়ে সবাই চলে যায়। লোকটাকে কীভাবে বাঁচানো যায়, সেই চেষ্টা করেন পদ্মা। পড়ে থাকা পাত্র থেকে পানি নিয়ে মুখে ছিটিয়ে দিলে লোকটার জ্ঞান ফেরে।


পাঁচ.

নদীর পাড়ে পাওয়া লোকটাকে নিয়ে বাড়ি আসেন পদ্মা। তাকে সুস্থ করার জন্য ডাক্তার ডাকেন। ধীরে ধীরে ধাতস্থ হয়ে ওঠে লোকটা। জানা যায়, তার নাম নাসের আলী। বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাট। অবৈধ অনুপ্রবেশ। নাম ভাঁড়িয়ে থাকতে হবে তাকে, না হলে বি জি বি তাকে গুলি করে মারবে। পদ্মার ক্ষতিও হবে ভয়াবহ। লোকটাকে শেখাতে পড়াতে শুরু করেন পদ্মা। অনেক আলাপ-আলোচনা হয়। সাব্যস্ত হয় তার নাম সুভাষ দাশ। ভারতের একজন জাতীয় নেতার নামে নাম। সে নেতা একসময় এদেশেরও নেতা ছিলেন; ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। অথচ কী আশ্চর্য কালক্রমে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার গাড্ডায় বাঙালি হয়েও তিনি কেবল ভারতের হয়ে রয়ে গেলেন। সুভাষ দাশ পদ্মার চাচাতো বা জ্যাঠাতো ভাই। তাকে ফরিদপুর গোপালগঞ্জের কাশিয়ানির বিবরণ সহজে মুখস্ত করানো যখন অসম্ভব হয়ে পড়লো, তখন ছোটোখাটো একটা গল্প বলার প্রস্তুতি নিতে বলা হলো তাকে। যাহোক, ভারতের লোক হিসেবে ধরা পড়লে সমূহ বিপদ, এটা তাকে মনে রাখতে বলা হলো। এখন থেকে তিনি এখানে থাকবেন পদ্মার জ্যাঠাতো ভাই সুভাষ হয়ে। ফরিদপুর গোপালগঞ্জের লোক, থাকে বশিরহাটে। শাড়ি-কাপড়ের ব্যবসা করেন। ভাষা শিক্ষার ব্যাপারেও তাকে মনোনিবেশ করতে বলা হয়।


পদ্মা : আপনি আমাগোর ভাষায় কথা কইতে পারেন?


নাসের : বাঙ্গাল! ভালো না, তবে আপনি কইলে, শিখাই দিলে ট্রাই করতে পারি।


পদ্মা : ভালোই তো কইতাছেন। এহন থাইকা আমার লগে এই ভাষায় কথা কওনের অভ্যাস করেন।


পরীক্ষা শুরু হয়। বাড়িতে আসেন গণেশ। তিনি পদ্মার শ্বশুরের কাছে গিয়ে শুভ বিজয়া জানান। তার কাছে তথ্য আছে-পদ্মা ভোরে বাইরে গিয়েছিলো। পদ্মা লুকিয়ে রাখে নাসেরকে। গণেশ বেরিয়ে পড়েন। এবার আসেন ডা. লিয়াকত আলী। তিনি এলাকায় বেশ পরিচিত, বয়স্ক ও রসিক। ডাক্তারকে দেখে খটকা লাগে গণেশের। তিনি ডাক্তার আসার হেতু জানতে চান। শ্বশুরের অসুস্থতার সংবাদে আশ্বস্ত হয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকেন। তবু তার সন্দেহ কাটে না। বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়ান। অবশেষে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকেন। ডাক্তার শ্বশুরকে দেখার পর পদ্মার অনুরোধে আহত নাসেরকে দেখেন। ডাক্তার প্রথমে এসেই নাসেরকে তার নাম পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। পরীক্ষায় সহযোগিতা করেন পদ্মা। নাসের আলী হয়ে যান পদ্মার জ্যাঠাতো ভাই শাড়ির ব্যাপারি সুভাষ। ডাক্তার জানান, ক্ষত মারাত্মক হলেও এক সপ্তাহে সেরে উঠবেন। পায়ের যে হাড় ভেঙেছে বলে মনে হচ্ছিলো, তা অবশ্য ভাঙেনি। ডাক্তারি বিদ্যায় পরখ করে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। কাটা জায়গায় মলম, মচকা ব্যথার স্থানে চুন-হলুদ গরম করে লাগানোর পরামর্শ দেন ডাক্তার। সুভাষকে বাজিয়ে দেখারও চেষ্টা করেন ডাক্তার। নেশা করে কি না জিজ্ঞাসা করেন। নেশার কথায়, রতনের মৃত্যুর কাহিনিতে পদ্মার দুঃখ গাঁথা স্মৃতির স্মরণী ধরে এক এক করে বেরিয়ে আসে। আবহসঙ্গীতে দর্শকের উপচে পড়া বেদনা সিক্ত স্বতঃস্ফূর্ত আবেগকে উন্মথিত করে-‘বন্ধু তোর লাইগারে/ আমার তনু জড় জড়/ মনে লয় ছাড়িয়ারে যাইবাম থুইয়া বাড়িঘর/ অরণ্য জঙ্গলার মাঝে আমার একখান ঘর/ ভাইও নাই বান্ধবও নাই মোর কে লইব খবর’।


ছয়.

নাসেরকে পেয়ে পদ্মা শুধু একজন অসুস্থ ভিনদেশি ভিন্ন ধর্মের লোকের প্রাণ বাঁচানোর জন্যই সচেষ্ট হন না। তার মনের মধ্যে ঘুরেফিরে আবর্তন করতে থাকে তার মৃত মাতাল স্বামী। নাসেরকে তিনি তার স্বামীর পোশাক পরান। স্বামী মারা গেলেও তার পোশাক সংরক্ষিত আছে তার কাছে। তার সেই সিগারেট ও মদের অভ্যাসের কথা তিনি ভুলতে পারেননি। মাতাল রতনের নেশার জাগ্রত গন্ধ ও বেসামাল টালমাটাল অবস্থা তাকে প্রতিনিয়ত টানে। তিনি বলেন, ‘সব দাগ কি ধুলে যায়?’ কলার ছাড়া শার্ট দেওয়ার কথা বললে নাসের জানতে চান, ‘এই পোশাকগুলো কার?’ পদ্মার উত্তর, ‘আমার সাথে যার ছবি দেখতাছেন তার। রতন হালদারের। মদ আর সিগারেটের গন্ধ কাছলেও যাইত না। পদ্মা সেই গন্ধ খোঁজেন। নাসেরকে নিয়ে তিনি একধরনের সংসার-সংসার খেলা খেলেন। নিজের মুখে তিনি বলেন, ‘এই যে মৃত স্বামীর পোশাক পরাইয়া আপনার সাথে সংসার সংসার খেলতাছি। একপর্যায়ে হাজির হন গণেশ। তিনি যখন নাসেরের প্রেসক্রিপশন নিয়ে যান, তৈরি হয় ফ্রয়েডিয়ান সাইকোলজির এক সরল আবহ। এক নারী দুই পুরুষ। পদ্মা যখন বলেন, ‘হেই যখন জানছে আপনার আর কোনো ত্রুটি হইবো না। নাসের জানতে চান, ‘সে কি সবার জন্য এই রকম করে, না শুধু আপনার বেলায়?’  


পদ্মাকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন গণেশ। ঠাকুর মশাইকে তার শাস্ত্র শুদ্ধির আদেশ করেন-‘এবার মহালক্ষ্মীর পূজার ব্যাপারে একটু ডিসকাস করেন দেখি।


ঠাকুর : মহালক্ষ্মী?


সাগরেদ : আপনাকে তো একবারে মাটি ভেদ কইরা বুঝাতে হয়, ডাইরেক্ট বুঝতে পারেন না? ম্যারেজ, শাদি, বিয়া, বিয়া।


ঠাকুর : কার বিয়া?


সাগরেদ : মাগো! ... এটাকে আপনিই ঠিকঠাক বুঝিয়ে দেন, গণেশ বাবু। আমার মাথা গরম হইয়া যাইতেছে।


গণেশ : শোনেন, এসব বনবাস, পুত্রবাস কেচ্চা বাদ দিয়া সরাসরি কনতো, একজন পুরুষ, সে চাইলে যখন ইচ্ছা তখন বিয়া করতে পারবো না ক্যান? নারী এবং পুরুষ উভয় যদি ইয়েস কইরা দেয়, তাইলে আপনার পঞ্জিকা ব্যাগড়া মারে কোন সাহসে?


ঠাকুর : কই, ব্যাগড়া তো মারতাছে না!


গণেশ : হ, মারতাছে। আশ্বিন মাসে বিয়ার কোনো তারিখ নাই। একজনের যদি আশ্বিন মাসে বিয়া পায়, হ্যায় কী করবো?


ঠাকুর : না, মানেটা হইতাছে কী ... মানে, আসলে।


সাগরেদ : আবার?


ঠাকুর : শাস্ত্র মতে তো বাধা নাই। কিন্তু কথা হইতাছে গিয়া ...।


সাগরেদ : দেখছেন, আবার সুর টানটাছে।


ঠাকুর : নাবালিকা?


গণেশ : হ, মনের বয়স নাবালিকা, দেহের বয়স ধরেন ...।


ঠাকুর : বাধা নাই, বাধা নাই। ঋতুবতী কন্যার কোনো বাধা নাই।      

  

গণেশের স্বপ্ন পূরণের সর্বোচ্চ উদ্যোগ চলতে থাকে। পদ্মাকে এখন ইশারা-ইঙ্গিত বাদ দিয়ে গণেশ সরাসরি বলেন। তবে একথাও তিনি স্পষ্ট করে বলে দেন যে, কোনো জোর জবরদস্তিতে তিনি বিশ্বাসী নন। ‘আপনি তো জানেন কাউকে জোর করাটা আমার ক্যারেক্টারে নেই। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মতন; আমেরিকার মতন। নয়াপুঁজির দেশ ভারতের মতন। অক্টোপাসের গ্রাস। ধীরে ধীরে করায়াত্ব করে। আত্মস্থ করে। পাচন ক্রিয়ায় পরিপাক করে। পদ্মা দৃশ্যত বিব্রত হন। কিন্তু গণেশকে প্রতিহত করার কোনো পরিকল্পনা করেন না। পদ্মা বহু আগেই ষাটোর্ধ্ব দোকানির সতর্কবার্তায় বুঝেছেন, ‘জলে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই করে বাঁচা যায় না। বরং বাঁচার জন্য কুমিরের সঙ্গত সহবাস মেনে নিয়েই তিনি সাংসারিক জীবনযাপন করতে থাকেন। অসহায় মানুষেরও শর্ত থাকে। সেও একেবারে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে না। বলে, ‘তবে আমার একখান শর্ত আছে। গণেশের সঙ্গে নিজের বিয়ে ঠিক করে মনের মানুষ নাসেরকে তার স্বদেশ ফেরার ব্যবস্থা করতে হয়। পরিস্থিতির জটিলতায় পদ্মা নিজেই একবার ঘুমের ওষুধ ও মদ খেয়ে নেন। নেশার ঘোরে মনের সুপ্ত বাসনা জাগ্রত হয়ে যায়। নরম-শরম পদ্মার ওপর ভর করে অসম্ভব সাহস। পদ্মার ভাষ্য মতে, ‘ছিনালি সেজে প্রেম নিবেদন করতে হয়। সাদা শাড়ি পরিহিত বিধবা রঙিন হয়ে আসে। শেষ অভিসারে সন্তানের সুপ্ত বাসনার বাস্তবায়ন করতে হয়। এখানে নাসের আর পদ্মার কথোপকথন বেশ চিত্তাকর্ষক হেঁয়ালিতে ভরা।


নাসের : এইডা তুমি একদম ঠিক করোনি পদ্মা। তোমার তো নেশা হয়ে গেছে।


পদ্মা : বারে মানুষ! ব্যাটাছেলে নেশা করলে কোনো দোষ নেই, নাহ? আর মাইয়ারা করলেই আপনাগো যতো ঢঙ। একদম ঠিক করেননি ব্যাপারটা। তুমি কেনো মদ খাইতেছো সুভাষ দা? কইলা না? মদ খাইলে ব্যথার বোধ কইমা যায়। আমারও ব্যথার বোধ কইমা গেছে আজকে।


নাসের : এমন জানলে আমি কখ্খনও রাজি হতাম না। কী দরকার ছিলো এই বোতলটা আনার?


পদ্মা : দরকারটা তো আমার আছিলো সুভাষ দা। এইডা ক্যান আনছি জানো? হেই এডাই খাইতো। সেই মদ, সেই সিগারেটের গন্ধ। আর তখন না এই রকম ছাপার শাড়ি পরতাম। এই রকম। একটু হা করো, করো না একটু, একটু শ্বাস নেও, নেও। সব আবার একদম আগের মতন হইয়া গেলো। তুমি তো কাল যাইবাগা সুভাষ দা। আমার তো বাঁচন লাগবো।


নারীবাদী পদ্মা জাগ্রত হয়ে ওঠেন। বৈষম্যের এই সমাজের বিরোধিতা করেন তিনি। নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী তিনি একটা রাত চলতে চান। নাসেরের মধ্যে তার মৃত স্বামী রতনকে অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হন। নিবিষ্ট চিত্তে নিজেকে নিবেদন করেন। ‘কী, সকালের ছিনালির সাথে রাতের বিধবার কোনো মিল নাই, না? এই ছবিডা মনে রাইখো, দেখবা সব কিরম পট কইরা ভুইলা গেছো। কী হইলো?’ পদ্মা মাতলামি করেন। গান গান, ‘নাগর আমার কাঁচা পিরিত; বলেন, ‘বিশ্বাস করো আমার কোনো দোষ নাই। সব দোষ ওই শুয়োরের বাচ্চার। ধার কইরা মদ খাইয়া নিজেও মরছে, আমারেও মারছে। নর-নারীর জীবন যন্ত্রণার চিত্র এখানে প্রকাশ হয় শৈল্পিক গভীরতায়। 


সাত.

দুই দেশের পতাকা তৈরি করেছেন পদ্মা। তা তুলে দেন নাসেরের হাতে। ‘দুইডা দেশের পতাকা নিজ হাতে বানাইছি। ভালো হইছে?’ নাসেরের উত্তর, ‘সুন্দর, খুব সুন্দর হয়েছে। পদ্মা তাকে সতর্ক করে বলেন, ‘মাঝ নদী পার হলেই ইন্ডিয়া। তখন ইন্ডিয়ার পতাকা টাঙাতে হবে। এরপর দুজনের কথোপকথন চলতে থাকে-


নাসের : তুমি কিন্তু একদম এই রকমই থেকো পদ্মা।


পদ্মা : ধুর, আর আপনারা পদ্মায় জল ছাড়তাছেন না। আমি ক্যামন কইরা একই রকম থাকুম? আমার কথা বাদ দ্যান।


নাসের : না, একদম না। একদম বদলাবে না তুমি পদ্মা। আর তার জন্য যদি দরকার হয়, সারাজীবনই সাদা থান পরেই থাকবা।


পদ্মা : আমার সব সাদা থানগুলো তো রঙিন ছাপা হয়ে গেছে। গণেশ মণ্ডলের লগে আমার বিয়া অইবো। আইজ সকালে আমি কথা দিয়া আইছি। আর তো তোমার কোনো চিন্তা নাই। আমার আর কোনো অভাব থাকবো না, কষ্ট থাকবো না। মাথায় আর কোনো রতন থাকবো না, নাসের আলী থাকবো না। সুভাষ থাকবো না, শুধু থাকবে পদ্মা মণ্ডল। তুমি এ রকম করতাছো ক্যান? তোমারে তো আমি একবারও কই নাই, তোমারে বাঁচানোর লাইগা আমি এ কাজ করছি। আমি একটু শান্তিতে থাকতে চাই। অনেক খাটছি, অনেক মেহনত করছি। আর পারতাছি না।


নাসের : একবারও আমার মতামত নিলে না তুমি?


পদ্মা : তুমি কে, তোমার মতামত আমি কেন নিবো? তুমি কি আমারে তোমার আয়শা খাতুন পাইছো যে, তুমি মত দিবা আর আমি ওই মত নেবো? কে তুমি?

নাসের : অতিথি।


পদ্মা : ঠাকুর জলে ভাসায় দিয়ে আর ফিরে তাকাতে হয় না।


এখানে বিসর্জনের যে সুর বেজে ওঠে, তাতে ব্যক্তি আর একক থাকে না সামগ্রিক হয়ে ওঠে। ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক উঠে আসে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি আমলে আসে। পদ্মায় জল ছাড়া, না-ছাড়া যেমন ফারাক্কাকে স্মরণ করায়, তেমনই এই বিসর্জন ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের দেশভাগ তথা বাংলা ভাগ ও ৭১-এ বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এর মাঝে পদ্মার কাহিনি অগ্রসর হয়।


কথা দিলাম এই বাংলাদেশ থেকে যে গোপন ভালোবাসা, গোপন আদর নিয়ে যাচ্ছি, সেটাই আমার শেষ চোরাকারবার। নাসেরের এই কথার পর ভ্যানগাড়িতে চড়ে দুজন যায় নির্ধারিত ঘাটে। বিদায়ের যে চিরচেনা দৃশ্য তা দিয়েই দুজন চিরতরে আলাদা হয়ে যায়। একটি এলাকা ভাগ হয়ে যে দুটো দেশ হলো, তার বিভক্তির অন্তর্বেদনার সঙ্গে মিলেমিশে আইনি জীবনযাত্রায় বসবাস। রাষ্ট্র কাঠামোকে মান্য করতে গেলে প্রেম-ভালোবাসাও আইনের চোখে চোরাকারবার হয়ে উঠতে পারে। পদ্মা আর কখনো নাসেরকে মনে করতে চান না। ছোট্ট মন্টু বলে বিসর্জনের দিন বর্ডার খোলা থাকে, সবাই গেলেও তার মা যায় না। ‘তুমি তো কোনো বার যাও না, একা বাড়ি থাকবা ক্যান?’ পদ্মা মেনে নিয়েছে এই সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র কাঠামোকে। বিসর্জন দিয়েছে তার অতীতকে। বিসর্জন দিয়েছে মৃত মাতাল স্বামীকে, নাসের আলীকে। সে তার ছেলে সংসার অর্থাৎ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দিন কাটায়।


আট.

নাসেরকে বিদায় দেওয়ার পর পদ্মার হাত ধরে গণেশ; গ্রহণ করে দীর্ঘদিনের কাক্সিক্ষত নারীকে। গণেশ বলেন, ‘খুব কাঁদছেন না, সারারাত? বড্ড মায়া আপনার শরীরে। গণেশ যে মাছের ব্যবসা করেনতিনি ছোটো মাছ বড়ো করে বাজারে ছাড়েন। সব রকমের মাছ নিয়ে তার কারবার। তিনি সবকিছু বুঝে তার নিজের হিস্যাটুকু নিয়ে তৎপর। অযথা অস্বচ্ছতার কাদা গায়ে নিয়ে ঘুরতে তিনি রাজি নন। পদ্মাকে নিয়ে তিনি নিজের মতো করে সুখে স্বাচ্ছন্দে থাকতে চান। পত্নী-পুত্র নিয়ে তার সমৃদ্ধ সামাজিক জীবন গতিশীল। অধিকার, কর্তৃত্ব, প্রভাব, প্রতিপত্তি কিছুই তার বিসর্জন দিতে হয়নি। অনেক কষ্টে তিনি পদ্মাকে পেয়েছেন। কতোটুকু পেয়েছেন, তা তিনি না জানলেও দর্শক জানে। তার অপ্রাপ্তির ন্যায্যতা বিসর্জন হয়েছে। এতে দর্শক খুশি বা অখুশি নয়। তা নিয়ে কারো দুঃখবোধও নেই।


নয়.

গণেশ তার সাগরেদ ও ছোট্ট মন্টুকে নিয়ে দূর্গা দেবীর বিসর্জনে চলেন। মন্টু ছড়া বলে, ‘চাক্কা ঘোরে বন বন ...’। পদ্মা এক খিলি পান মুখে দিয়ে দূর থেকে বিসর্জনকে উপলব্ধি করেন। তারপর নিজেই দেবী মূর্তি বনে যান দর্শকের চোখে। কানে আসে মুয়াজ্জিনের আযান আর পাখির ডাকের সঙ্গত। পর্দায় বড়ো বাড়ির দৃশ্য। শেষ হয় এক ঘণ্টা ৫৯ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের বিসর্জন। আবহসঙ্গীত-সোনার বদর আল্লা রসুল, যা, যায়, যায় রে ভাইস্যা ভাটির টানে/ অনন্ত ভাসানে কান্দে ভাটিয়ালি গানে/ যারে ভাসাই দিছো যাইবারে দেও রেখো না তার পানে/ মিঠার আদর ভাসান দিলা, আর তো ফিরা আইবো না/ প্রতিমা তোর নরম মাটির নদীর পানি সইবো না/ সোনার রঙ সোনার দেহ, সোনার সাজের টোপর/ কলঙ্কিনীর বুকের আঁচড় আলগা পানির উপর/ কাজল তোমার চোখ্খের পানি। বিসর্জন দেখতে দেখতে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বার বার নাড়া দেয়, তার সামান্য কিছুর সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ দাবি করে।


ক. ভাষা


পদ্মা : হইবো না, আপনাগো ভাষার সুরটাই কেমন যেনো আলাদা।


নাসের : হ্যাঁ।


পদ্মা : হ্যাঁ না, জি।


নাসের : এই একটা নদী, তার এপারের ভাষা আর ওপারের ভাষায় কতো আলাদা!


পদ্মা : হ, সবই আলাদা। এমনকি বাংলাদেশের এক অঞ্চলের সাথে আর অন্য অঞ্চলের ভাষা টোনের কোনো মিল নাই। আমগোর সিলেটি চাটগায়ী ভাষা শুনলে তো আপনি কিচ্ছু বুঝবার পারবেন না।


এসব কথায় সারা পৃথিবীর বৈচিত্র্যের সঙ্গে মানুষের ভাষার বৈচিত্র্য যে প্রকৃতির অঙ্গ তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভাষার উচ্চারণ যে সহজাত, শিখে-পড়ে তার উৎকর্ষতা হয় না; তার এক সরল পাঠ দিয়েছে নাসের ও পদ্মা। গণেশও নাসেরের সঙ্গে আলাপের সময় সেকথা বলেন- ‘আপনি কিন্তু ইজিলি ইন্ডিয়ার লোকের সাথে মিশে যেতে পারবেন। আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি ঠিক ঠিক বাংলা বলার; ওখানকার মতো। কিন্তু ধরে ফেলেছে। বলেছে আপনি বাংলাদেশি।


ভৌগোলিক অবস্থান


ভারতের বর্ডারজুড়ে যে নদী দেখা যায় বিসর্জন-এ তার নাম ইছামতি। হতে পারে ইছামতি। চলচ্চিত্রে কতো কী হয়। সেখানে ভূগোল, ইতিহাস, রাজনীতি খোঁজা নির্বুদ্ধিতা। তবু এসব জ্ঞান সেখানে থাকে, সর্বোপরি পোয়েটিক জাস্টিস বলে একটা কথা থেকে যায়। যুক্তিগ্রাহ্যতা দিয়ে কাহিনি বিনির্মাণ হয়। পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমানা বরাবর রাজশাহীর পদ্মা মেহেরপুরে মাথাভাঙ্গার শাখা ইছামতি ও তার প্রবাহ যশোর-সাতক্ষীরা সীমানার নো ম্যানস্ ল্যান্ড দিয়ে রায়মঙ্গলে মিশে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। শিবপুর গ্রাম তথা ইছামতি নদীর পাড়ে যে আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগ হয়েছে তা বেমানান। ‘আইছি খাইছি গেইছি মূলত গ্রাম বাংলার লোক মুখের কথা। কিন্তু যে টোন এখানে ব্যবহার করা হয়েছে, তা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তথা পশ্চিম সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী এলাকায় পাওয়া যায় না।


এটা মূলত পূর্ববঙ্গ তথা ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের কিছু জেলা বিশেষত ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ ঢাকা এলাকার ভাষা। পদ্মা হালদার তথা পদ্মা দাশ গোপালগঞ্জের মধুমতি পাড়ের কাশিয়ানি উপজেলার রাতুল গ্রাম থেকে আগত। সুতরাং তার মুখে এ ভাষা মানানসই কিন্তু গণেশ, তার সাগরেদ, দোকানদার, ডা. লিয়াকত আলী, সবাই তো শিবপুরের মানুষ। তাদের কথ্য ভাষা হবে সাতক্ষীরার, যশোর, চুয়াডাঙ্গা বা মেহেরপুরের আঞ্চলিক ভাষা। কাহিনির জন্য এসব কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু চিত্রনাট্যের সংলাপে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করলে বাস্তবতার কারণে সেই অঞ্চলের ভাষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া যুক্তিযুক্ত। বাংলাদেশের ভাষা লেখ্য বা কথ্য যাই হোক না কেনো, তা রক্ষণশীলের পরিবর্তে গতিশীল। ভারতের পশ্চিম বাংলা থেকে বেশ স্বতন্ত্র। কাজেই ভাষার যে ভিন্নতা এখানে দেখানো হয়েছে তা চলিত ভাষা প্রয়োগে এমনিতেই দেখানো যেতো। 


ধর্ম    


গঙ্গা যমুনা সরস্বতী ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর/ আল্লা রসুল পীর ফকির দেও দৈত্য পিশাচ চর। এখানে ধর্মের বিভাজনে সমাজ বিভক্ত নয়। সার্বজনীন উৎসবে সবাই সমন্বিত। হিন্দু পদ্মার ঘরে মুসলমান নাসের পরম যত্নে সমাদৃত। দুই ধর্মের মানুষেরা ধর্মের বিভাজনে বিভাজিত নয়। ধর্ম এখানে মানুষের মধ্যে কোনো বিভেদ টানেনি। হিন্দু সমাজেও মুসলমানের অবাধ যাতায়াত। লিয়াকত ডাক্তার তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এমনকি বিসর্জনকে কেন্দ্র করে যে জনসমাগম, সেখানে শুধু নয়, যে সঙ্গীত তাতেও হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত সুর। ‘নাও যায় রে নাও যায় বাইয়া, ... কি ঠাকুর দেখলাম নানি/ কি দুখ্খী দেখলাম চাচি/ ... ভবেরও ভবানি আমার ভবন ছাড়িল।


সামাজিকতা


সামাজিক প্রশ্নে পদ্মা সচেতন হয়ে ওঠেন। নাসেরকে বাড়িতে রেখে উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। তাকে ভারতে ফেরত পাঠাতে হবে নির্ঝঞ্ঝাট। অনেক কিছু ভেবে পদ্মা তাকে তার জ্যাঠার ছেলে সুভাষ পরিচয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিলে নাসের ইতস্তত করেন। তিনি নিজ নামেই থাকতে চান। বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ। নাসের এখানে যুতসই একটা নাম। কিন্তু পদ্মা প্রশ্ন তোলেন।


পদ্মা : হিন্দু যুবতী বিধবার ঘরে জোয়ান মর্দ্দ মুসলমান থাকতাছে আপনাদের ইন্ডিয়ান বুদ্ধিতে কী কয়?


নাসের : আমাদের দেশেও ব্যাপারটা কেউ ভালো চোখে দেখবে না।


সামাজিকতার কারণে নাম বদলে যায় নাসেরের, সে হয়ে যায় সুভাষ।


অতিথি পরায়ণতা


নাসেরকে বাঁচানোর পর তাকে রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন পদ্মা। নাসের বলেন, ‘আপনার দম আছে। পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করেন পদ্মা। নাসেরকে জীবিত দেখে তার সেবা শুশ্রƒষা না করে, তাকে রক্ষা না করে কিইবা করার ছিলো তার? ভারতের নাসের তো বাংলাদেশের অতিথি। বাংলাদেশের লোক অতিথিকে ভগবান জ্ঞান করে। তাই নিজের জীবন বাজি রেখে তাকে তো বাঁচাবেনই।


রাজনীতি


রেডিওর সংবাদ বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপস্থাপন করে। শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে বি এন পি-জামায়াত জোটের বিভিন্ন অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়। বালু ব্রিজ নির্মাণের মতো সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সহজেই কানে আসে। দর্শক বুঝতে পারে, দেশ এক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলেছে। বৃদ্ধের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বেতার বার্তা শেষ হয়ে যায়। বৈধব্যের গতানুগতিক ধারা বাদ দিয়ে, স্বামীর স্মৃতিকে আঁকড়ে প্রেমিক পুরুষ নিয়ে সময় পেরুনোর চিন্তা বাদ দিয়ে, বিয়ে করে নতুন সংসারের সরল জীবন, পদ্মার জীবন গতিকে বদলে দেয়। ইঙ্গিত করে বাংলাদেশের প্রাচীন ধারার বিশ্ব রাজনীতির বদলে নতুন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের।


পদ্মাকে নিয়ে নাসের বনাম গণেশের টানাপড়েনে দেশীয় ও জাতীয় রাজনীতি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক তথা সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি স্পষ্ট হয়। যখন নাসের আফসোস করে জানতে চান, গণেশকে বিয়ের কথা দেওয়ার আগে পদ্মা কেনো তার মতামত নিলো না। তখন পদ্মা স্পষ্ট বলে দেন, তিনি তো তার প্রেমিকা আয়শা না। নাসেরের এ দাবি অন্যায্য হলেও অনধিকার চর্চা মনে হয় না। বিশেষত যখন নাসের (ডাক নাম মন্টু) ও পদ্মার দৈহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং চলচ্চিত্রের শুরুতে ছোট্ট মন্টুকে দেখা যায়; শেষে দেখা যায় নাসেরের মতোই জন্মদাগওয়ালা পদ্মার ছেলেকে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক অমø-মধুর। ১৯৪৭-এ ধর্মভিত্তিক দেশভাগ দেশ-মাটি-মাকে নিষ্ঠুরভাবে দুই টুকরো করেছে। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা বাংলাদেশের অস্থি-মজ্জায় মিশে আছে। ১৯৯১-এর পর বি এন পির সঙ্গে জামায়াতের জোট তথা স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে বি এন পির জোট, স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীকে রাষ্ট্র ক্ষমতার শরিক করা, তাদের হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলে দেওয়া ইত্যাদি ঘটনায় ভারতের সঙ্গে স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির যে মৈত্রী ছিলো তা আবার জেগে ওঠে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে সাম্রাজ্যবাদের ছত্রছায়ায় নিজেকে সমর্পণ করতে হয়। গণেশের সঙ্গে ঘর বাঁধতে হয় পদ্মার। যদিও গণেশ যেমন জানে ভারতের নাসেরের সঙ্গে পদ্মার কী সম্পর্ক, তেমনই আমেরিকাও জানে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কী সম্পর্ক। তাতে কারো কিছু যায় আসে না। নারী ও টাকার মতো হাতবদল হলে রাজনৈতিক ক্ষমতাও বদলে যায়।


লেখক : ফারুক আলম, সাহিত্যিক ও ছড়াকার। তিনি খুলনায় একটি কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়ান। তার প্রকাশিত ছড়ার বই ‘গোলাপ-কাঁটা


falamsmc@gmail.com

                          

 

                          

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন