তানভীর শাওন
প্রকাশিত ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
চলচ্চিত্রের মানুষেরা
মুখ ও মুখোশ-এর মুখাবয়ব পেয়ারী কালের দর্পনে ঝাপসা প্রতিবিম্ব
তানভীর শাওন

যদি তারে নাই চিনি গো
তুমি দেবী তবে পুষ্পার্ঘ্য পাবে না, পাবে খানিক
শয্যা-কামনা। তুমি বৃষ্টিস্নাত আকাশের রামধনু
তবে সাতরঙা হতে পারবে না, থাকবে ফিকে হয়ে।
তোমাকে আরো বলা হবে তুমি হাওয়ার মতোই
উদ্দাম, কিন্তু বয়ে যেতে দেয়া হবে না তোমায়।
অবশেষে বলা হবে তোমাকে, আরো কিছুক্ষণ থেকে যাও
এ দিকটায়, বদ্ধ কুঠুরিটায় বড্ড দমবন্ধ হাওয়ার চলাচল,
তুমি বরং তার সাথে করো কিছুক্ষণ বিচরণ;
পাছে সুবাস বেরোলে ডেকো আমায়।১
সময়টা তখন ২০ শতকের ৫০-এর দশক। পুরান ঢাকার আগামছি লেনের এক তরুণী পেয়ারা। পড়ালেখা কামরুন্নেচ্ছা স্কুলে। সহজ সাদাসিধে জীবন সেই বালিকার। সময় কাটে গান করে, খেলাধুলা আবার কখনো দলবেঁধে কারো বাসায় দাওয়াত খেয়ে। তবে একটা অস্বাভাবিক ব্যাপারও আছে। পরিবারের রক্ষণশীলতার নজরদারি বজায় রেখে তাকে রোজ স্কুলে যেতে হয় ঘোড়ার গাড়িতে। সে চাইলেও অন্য সব বালিকার মতো পায়ে হেঁটে বা কোনো খোলা গাড়ি করে স্কুল যেতে পারে না। তাকে যেতে হয় তিন দিক বন্ধ এক গাড়িতে করে, পিছনটা যদিও খোলা সেখানে বসে তদারকি করে এক আয়া। বোঝাই যায়, পেয়ারাকে ঘিরে যে খাঁচাটা রয়েছে, সেটা বেশ দক্ষ কারিগরের হাতেই তৈরি। এদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর নায়িকা পেয়ারী বেগমের বাল্যকাল যেনো ঠিক এমনই ছিলো। স্বচ্ছ স্বাভাবিক জলের মাঝে রঙিন মাছের চলাচল থাকলেও জলটা কোথাও একটু ঘোলা রয়ে গেছে।
পেয়ারা নাম্নী এ নারী স্বদেশি বাংলা চলচ্চিত্রে ‘নায়িকা’ কথাটার আলাদা একটা মানে তৈরি করেছেন। সেই সময় নায়িকা, বাইজি, পতিতা এসবই ছিলো এক শ্রেণির শব্দ। শব্দগুলোর মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যেতো না; এদেশের মানুষের ভাষা কিম্বা দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে। চলচ্চিত্রের মতো এহেন শিল্পে নারীর অংশগ্রহণের প্রতি এদেশের মানুষের যে বিরূপ ধারণা, তা যে কতোখানি ভয়াবহ ছিলো, এই যুগে বসে তা অনুভব করা বেশ কষ্টসাধ্য। এমন সমস্যা ও বিরূপ সম্ভাবনার মধ্যে থেকেও যে নারীসত্তা সেই পরিস্থিতিকে বদলে দিতে চেয়েছিলেন কিংবা বেশ খানিকটা পেরেছিলেনও তার নামই পেয়ারী বেগম। সেই সাহসিকতার বিবরণটুকু আমাদের বেশ উৎসুক করে তোলে, জানার আগ্রহকে যথার্থই উসকে দেয়। এ লেখায় শুধু তার পেয়ারা থেকে পেয়ারী হওয়া আর বাইজি কিংবা পতিতা থেকে নায়িকা শব্দের আলাদা মানে খুঁজে পাবার গল্পই থাকবে না; উঠে আসবে দেশীয় বাংলা চলচ্চিত্রের একজন সত্যিকারের শিল্পীর ব্যক্তিজীবনের নানা বাঁক।
আকাশে যখন শঙ্খচিল উড়তো
পারিবারিক শৃঙ্খলিত শাসন পেয়ারাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখলেও একেবারে গলা অব্দি ওঠেনি কখনো। যাতে না শ্বাস আটকে যায়! চোখ বুজে প্রশস্ত চিত্তে নিঃশ্বাস ছাড়ার জায়গাও ছিলো কিছুটা। বাবা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তা। বাবা-মা দুজনই ছিলেন বেশ সংস্কৃতিমনা। কোনো কোনো ব্যাপারে তারা হয়তো কন্যাকে এক ফোটা ছাড় দিতো না, কিন্তু সংস্কৃতিচর্চায় মেয়েকে চুপ থেকেও যেনো বেশ যত্ন করেই সায় দিয়ে যেতেন। অর্থাৎ তারা পেয়ারাকে কখনো গান, নাচ কিংবা মঞ্চাভিনয় করতে বলেননি, তবে পেয়ারা নিজের উৎসাহে করতে গেলে বাধাও দেননি। একটা অলিখিত শর্ত কিন্তু ছিলোই যা-ই করো পর্দা মেনে করো। ছোটোবেলাতেই পেয়ারা বাবার সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন পুরো ঢাকা শহর। আর সেই সঙ্গে নিজের অভিনয় প্রতিভার চোখে আলো ফোটাতে পরিবারের সাংস্কৃতিক চেতনাকে পেয়েছিলেন একটা মস্ত হাতিয়ার হিসেবে। তাই তো থেমে থাকেননি পেয়ারা। কোথাও গান, নাচ, থিয়েটার হবে জানলে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যেতেন সেখানে অংশ নিতে। কখনো কখনো সমবয়সি পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্টেজ বানিয়ে নাটকও করতেন। মজার ব্যাপার হলো, মা-বাবা, অভিভাবকরা তাদের অভিনয় দেখতো, প্রসংশাও করতো। আর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মা-বাবার এই হাতে হাত রাখা আর পায়ে পা মিলিয়ে চলাটুকুই স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছিলো পেয়ারাকে ভীষণভাবে। তা যেনো পারিবারিক রক্ষণশীলতা ছাপিয়ে উঠতে তাকে সাহায্য করেছিলো পথ্যের মতোই।
স্টেজে অভিনয় যেমন পেয়ারাকে অভিনয়ের কৌশল ধরতে সাহায্য করেছিলো, তেমনই আগ্রহের রসটুকু যে মূল থেকে উঠে আসতো তা তিনি পেয়েছিলেন চলচ্চিত্র দেখে। ছোটো থেকেই চলচ্চিত্র দেখতে খুব পছন্দ করতেন পেয়ারা। আগামসি লেন থেকে ‘তাজমহল’ আর ‘নিউ পিকচার হাউজ’ প্রেক্ষাগৃহ দুটো খুব কাছেই ছিলো। স্কুলে যেতেন ওই পথ ধরেই। যাওয়া আসার সময় যদি দেখতেন মধুবালা, নার্গিস কিংবা সুরাইয়ার কোনো চলচ্চিত্র এসেছে, তাহলে জেদ ধরে হলেও ছোটোভাই আব্দুল গফুরকে নিয়ে তা দেখতে যেতেন। কখনো সঙ্গে নিতেন বান্ধবী জহরত আরা’কে। মা-বাবাকে অনেক বলে রাজি করালেও পর্দাটা করতেই হতো তখনো।
পেয়ারার অভিনয়ে আগ্রহের জায়গাটা ছিলো ধারালো। তাই তো তার খিদে ছিলো অভিনয়চর্চায় প্রাতিষ্ঠানিক নানা আয়োজনের প্রতিও। কামরুন্নেসা স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই একদিন খবরের কাগজে দেখলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে রণপ্রসাদ সাহার স্কুল ভারতেশ্বরী হোমসে সাইকেল চালানো, প্যারেড ও নাটক শেখানো হয়। আগ্রহের জায়গাটুকু যেনো উঁচিয়ে উঠলো পেয়ারার। বাবাকে রাজি করিয়ে সেখানে ভর্তি হলেন ক্লাস নাইনে; উঠলেন হোস্টেলে। প্রতিদিন খুব আগ্রহ নিয়ে নাটকের রিহার্সেলে যেতেন। প্রতিবছর দুর্গাপূজায় স্কুলে নাটক হতো। সেখানে ‘নটীর পূজা’সহ কয়েকটি নাটকে প্রধান ও পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। আর পি সাহা তাকে সেসময় খুব উৎসাহ দিতেন; বলতেন, ‘খুব ভালো করেছো’। এভাবেই অর্জন, আকাক্সক্ষা আর সম্ভাবনা সবই যেনো বাড়তে থাকে পেয়ারার। এরপর ম্যাট্রিক দিয়ে আবার ঢাকায় চলে আসেন। ভর্তি হলেন ইডেন গার্লস কলেজে।
সেই সব অপরিপক্ক সময় এবং একটি উত্তেজিত উদ্যোগ
পেয়ারা যে সময় চলচ্চিত্র দেখতো, ঠিক সে সময়টায় এদেশের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে আধিপত্য ছিলো ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের। পাশাপাশি উর্দু বা হিন্দি চলতো দু-একটা। দেশীয় চলচ্চিত্রের স্বাদ নেওয়ার অভাববোধ থেকেই হোক বা জাতীয়তাবোধের অনুপ্রাস থেকেই হোক, নিজের চোখে নিজেদের চলচ্চিত্র দেখতে না পারাটা, আফসোস থেকে কখন একসময় দর্শকের চাহিদায় পরিণত হয়েছিলো। যে দু-একটি চক্ষু এই চাহিদা অবলোকন করেছিলো, তারা যে চাহিদানুযায়ী জোগান দিতে সমর্থ হয়নি, তা দেখা গেছে দেশভাগের আগেই। নবাববাড়ির খাজা আজমল তার প্যাসে ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন সুকুমারী (১৯২৭) ও দ্য লাস্ট কিস (১৯২৯) নামের দুটি নির্বাক চলচ্চিত্র। এরপর থেকে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৩ আগস্ট মুখ ও মুখোশ-এর মুক্তির আগ পর্যন্ত একেবারেই যে আর কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি, তেমনটা না বলা গেলেও তা খুব জোর দিয়ে উল্লেখ করার দাবিও রাখে না। বোঝাই যাচ্ছে সময়টা বেশ দীর্ঘ।
স্বদেশী বাংলা চলচ্চিত্রের পরিপক্কায়নের এ কাজটায় কেউ হাত রাখতেও যখন পুরোপুরি এগিয়ে আসছিলো না, এমন সময় পশ্চিম পাকিস্তানের এক প্রযোজক এফ দোসানী পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রযোজনার ব্যাপারে এক বিরূপ মন্তব্য করে বসেন। দোসানী বলেন, ‘এদেশের আর্দ্র আবহাওয়া চলচ্চিত্র নির্মাণের পক্ষে উপযোগী নয়। বরং এ আবহাওয়ায় শুটিং করতে হলে বিশেষ ধরনের নেগেটিভ তৈরি করতে হবে যা এদেশে কখনোই সম্ভব নয়।’২ দোসানীর এমন উদ্ভট ও সাংস্কৃতিক বিকাশ বিদ্বেষী কথায় অনেকে চটে যান। তন্মধ্যে অন্যতম প্রতিক্রিয়াশীল ছিলেন আবদুল জব্বার খান।
দোসানীর বক্তব্যের প্রতিবাদস্বরূপ এবং অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়েই ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আবদুল জব্বার ঘোষণা দেন, এদেশের প্রথম চলচ্চিত্রটি তিনিই বানিয়ে দেখাবেন। বলা চলে পশ্চিম-পাকিস্তানীদের প্রতি এটাও ছিলো এদেশীয় মানুষের এক যুগান্তকারী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। যদিওবা আবদুল জব্বার ব্যক্তিগতভাবে মিলিত পাকিস্তান নীতিতেই বিশ্বাসী ছিলেন। তবে ঠিক সেসময় আঞ্চলিকভাবে সাংস্কৃতিক বঞ্চনা রোধকল্পে তিনিও খানিকটা ব্রতী হন। তবে সেটা ছিলো ব্যক্তিগত লাভের অভিপ্রায়। এটা যে প্রথম চলচ্চিত্রনির্মাতার তকমা অর্জনার্থে তাও বলা যায়। যদিও তা ব্যক্তিগত জেদেরও ফল বলা চলে।
এরপর আবদুল জব্বার চলচ্চিত্র নির্মাণের তোড়জোর যথার্থই শুরু করলেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি চলচ্চিত্রাভিনয়ে নতুন মুখ চেয়ে বিজ্ঞাপন দিলেন তৎকালীন বিনোদন ম্যাগাজিন ‘চিত্রালী’তে। সেই বিজ্ঞাপন চোখে পড়লো সুযোগের সন্ধানে থাকা পেয়ারার। কিন্তু এই কাজের সিদ্ধান্ত নিতে পেয়ারা একা পেরে উঠলেন না। বান্ধবী জহরত আরা’কেও রাজি করালেন। তারপর একদিন দুজন বেশ পরিকল্পনা করেই বাসায় জানিয়ে দিলেন আজ বান্ধবীর বাসায় কাজ আছে। ব্যাস, তারপর বেশ সাবধানে বেরিয়ে পড়লেন নবাব কাটরায় ইকবাল ফিল্মের অফিস খুঁজতে। যখন দুজন অফিসে ঢুকলেন, দেখলেন আবদুল জব্বার তার দুজন সঙ্গী নিয়ে বসে আছেন।
আসার উদ্দেশ্য জেনে আবদুল জব্বার রীতিমতো প্রশ্ন করা শুরু করলেন খানিক ভয়ার্ত আর উদ্বিগ্ন চোখের দুই বালিকাকে। তারা অভিনয় পারে কিনা, আগের অভিজ্ঞতা আছে কিনা-এসব বেশ খুঁটিয়ে শুনলেন। মজারভাবেই কথার বাঁকে পড়ে পেয়ারা-জহরতের সাক্ষাৎকারের লগ্নটা যেনো আরো দীর্ঘ হয়ে গেলো। পেয়ারা যেইনা বললেন, সামনের দিন কার্জন হলে যে নাটকটি মঞ্চস্থ হবে তাতে নায়িকার রোলটি তার করার কথা। আর তাতেই আবদুল জব্বারও কার্জন হলে গিয়ে তার সম্ভাব্য নায়িকার অভিনয়প্রতিভা স্বচক্ষে দেখতে চাইলেন। শেষমেষ নির্ধারিত দিনে গিয়ে দেখলেনও। সেদিন পেয়ারা রবী ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
অতঃপর অন্ধকার পেরিয়ে
আবদুল জব্বারের কাছে সাক্ষাৎকার দিয়ে আসার পর থেকে পেয়ারা তার ফলাফল নিয়ে বেশ সন্দিহান ছিলেন। মনোনীত হবেন কি না সে প্রশ্ন পেয়ারার মনে উঁকি দিতো প্রায় সময়েই। মাঝে মাঝে তিনি এ নিয়ে বেশ অস্থিরও হয়ে পড়তেন। এরই মধ্যে একদিন আবদুল জব্বার পেয়ারাকে ডেকে বলেছিলেন, ‘সেদিন তোমার অভিনয় বেশ ভালো লেগেছে।’৩ তবে পেয়ারা নায়িকা হিসেবে চূড়ান্ত কিনা তা জানাননি। বেশকিছু দিন পর হঠাৎ একদিন পেয়ারা যেনো চমকে উঠলেন‘চিত্রালী’ আজ নায়িকা রাশিদা’র (মুখ ও মুখোশ-এ পেয়ারার অভিনীত চরিত্র) ছবি ছাপিয়েছে! ‘চিত্রালী’তে নায়িকা হিসেবে নিজের ছবি দেখে পেয়ারা আনন্দ পেলেও, তখন বড়ো ভয় বাবা এটাকে কীভাবে দেখবেন তা নিয়ে।
আগে ছিলো নায়িকা হিসেবে মনোনয়নের চিন্তা আর এখন পরিবার নিয়ে। ঠিক এই রকম পরিস্থিতিতে বাবা ডেকে নিয়ে গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘ছবিটা কি তোমার? কখন কী করলে না করলে কিছুই তো জানতে পারলাম না। আমাদের সমাজে এতো [এ তো] কেউ ভালো চোখে দেখে না। আমি তোমাকে পারমিশন দিচ্ছি না। পড়াশোনাই করো, এসব লাইনে যাওয়ার দরকার নেই।’৪ এ কথা শুনে ঝলকিত মুখ যেনো বেশ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো পেয়ারার। অন্যদিকে জহরত আরার বড়োভাই ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক। স্বভাবতই ওর পরিবার থেকে কোনো চাপ এলো না।
প্রকৃতই সেই কঠিন পরিস্থিতিতে বেশ অসহায় হয়ে পড়লেন পেয়ারা। কোনো সমাধান খুঁজে না পেয়ে বান্ধবী জহরতকে নিয়ে দেখা করলেন আবদুল জব্বারের সঙ্গে। তারা গিয়ে দেখে, আবদুল জব্বার শুটিংয়ের প্রায় সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছেন। সব শুনে তিনি আশাহত হলেন বলে মনে হলো না। তিনি হয়তো আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন এমন কিছুই হবে। খানিক ভেবে তিনি পেয়ারার বাবার সঙ্গে নিজে গিয়ে দেখা করবেন বলে তাদের আশ্বস্ত করলেন। পরের দিন আবদুল জব্বার পেয়ারার বাসায় এসে তার বাবাকে সুকৌশলে বোঝালেন; বললেন, ‘আপনার মেয়ে তো আমারও মেয়ে। শুটিং শেষ করেই ওকে দিয়ে যাবো আপনার কাছে।’৫ মনে হয়, পেয়ারার বাবা নরম হলেন। তিনি বললেন, ‘আপনি যখন বললেন। ঠিক আছে।’ এরপর আর কোনো বাধা আসেনি। বরং পেয়ারা তার পরিবার থেকে পরবর্তী সময়ে সাহায্যই পেয়েছিলেন।
আগেই বলেছি, সামাজিক বাঁকা দৃষ্টির ছড়ানো জাল মাড়িয়ে এতোদূর আসাটা পেয়ারার জন্য কখনোই সহজ ছিলো না। পেয়ারা ছিলো সেই যুগের মেয়ে, যে যুগ ছিলো নামমাত্র আধুনিকতার বেশভূষাধারী, বিপরীতে তার দুই পিঠেই ছড়ানো ছিলো সেই মধ্যযুগ থেকে পাওয়া ধর্মের আচার আর কানুন। সেই সময়ে পর্দাপ্রথা ছিলো যেনো মেয়েদের সর্বোচ্চ মান্যতা। যদিও বাঙালিরা প্রথাগতভাবেই ছিলো বেশ চেতনাশীল। তবে সেই চেতনা যতোটা না ছিলো বাঙালিয়ানার প্রতি, তার চেয়ে বেশি ধর্ম নিয়ে। ফলে তাদের আত্মায় ছিলো মধ্যপ্রাচ্যের সব ধর্মানুভূতির সমাবেশ। এই সমাবেশের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়েছিলো পেয়ারাদের। শহুরে আর গ্রাম্য সমাজের মধ্যে এর প্রকটতার পার্থক্য খুব একটা ছিলো না। তাই পেয়ারা শহুরে মেয়ে হলেও তার স্বাধীনতার পাল্লাটায় রাখা বাটখারার ওজন ছিলো অতিশয় হালকা।
এসব ছাড়াও সেই যুগে কিছু মানুষ চলচ্চিত্রের পর্দায় যা দেখতো, তা বাস্তবজ্ঞান করতো। তাই চলচ্চিত্রে অভিনয় করার মতো স্বাধীনতা পাওয়াটা নারীর জন্য বেশ কষ্টসাধ্যই ছিলো। সবকিছুর পরেও পেয়ারা তা পেরেছিলেন। ব্যক্তি পেয়ারা ছিলেন বেশ শান্ত মেজাজের আর ধৈর্য্যশীল। প্রথম থেকেই শিল্প-সংস্কৃতিতে যে অসীম আগ্রহ তিনি দেখিয়েছিলেন তা প্রসংশনীয়। এর ফলে তার আশপাশের মানুষ ও পরিবার বিষয়টা সহজভাবেই নিতে থাকে। এছাড়া অভিনয়ে লেগে থাকার চেষ্টাটা হয়তো পেয়ারার বাবার কাছে আবেদন সৃষ্টি করেছিলো। তাই শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেন পেয়ারা। সেই সঙ্গে দর্শক পেয়ে যায় একজন পেয়ারী বেগমকে।
অতঃপর তুরাগ নদীর তীরে
১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ আগস্ট শাহবাগ হোটেলে মুখ ও মুখোশ-এর মহরত অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের গভর্নর ইস্কান্দার মির্জা, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মুখ ও মুখোশ-এর প্রযোজক নুরুজ্জামানসহ আরো অনেকে। এরপর অচিরেই শুটিং শুরু হয় টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে। শুটিং শুরুর দিনে আবদুল জব্বার ঘটা করেই পেয়ারী বেগমের নাম পাল্টে রাখলেন নাজমা। প্রকৃত নাম-পরিচয় নিয়ে অভিনয় করে পেয়ারার কোনোরকম সম্মানহানি হোক কিংবা কোনো বিপদে পড়ুক আবদুল জব্বার তা চাননি। এরপর যথারীতি শুটিং শুরু হলো। শুটিংয়ে পেয়ারী বেগমের সহকর্মী হিসেবে ছিলেন বান্ধবী জহরত আরা, পূর্ণিমা সেনগুপ্ত, বিনয়বাবু, রহিমা, আলী মনসুর, সাইফুদ্দিন (জব্বারের শালা) ও আমিনুল হক (পেয়ারী বেগমের স্বামী)।
বেশিরভাগ শুটিং মূলত ধারণ করা হয় তুরাগ নদীর তীরবর্তী জঙ্গল আর গ্রামে। পেয়ারাকে শুটিংয়ের জন্যে অবশ্য একেবারে বাড়ি ছেড়ে এসে থাকতে হয়নি। যেদিন তার শট্ থাকতো সেদিন প্রযোজক গাড়ি পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যেতেন। শুটিং শেষে বাসায় রেখে আসতেন। মাঝে মাঝে আবদুল জব্বার তাকে গাড়িতে বসিয়েই রিহার্সেল করাতেন। যেহেতু আবদুল জব্বার নির্মাতা ছাড়াও পেয়ারার সহঅভিনেতা ছিলেন, তাই অভিনয়ের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা তাকে দিতেন বেশ সময় নিয়ে। পেয়ারার সঙ্গে তাকে যেমন ক্যামেরার পিছনে থেকে চোখের ইশারায় যোগাযোগ রাখতে হতো, তেমনই সহঅভিনেতা হিসেবে ক্যামেরার সামনেও পায়ে পা মেলাতে হতো। অর্থাৎ পুরো সেটেই তাদের দুজনের যোগাযোগটি ছিলো অত্যন্ত নিবিড় আর শক্তিশালী। আবদুল জব্বারের এই সহযোগিতার কারণেই হয়তো অপরিচিত চিত্রজগৎকে পেয়ারার কাছে অচেনা আর দুর্বোধ্য মনে হয়নি। বরং ওটা তার কাছে যথেষ্ট আনন্দের আর আগ্রহেরই মনে হতো।
বয়সের ক্ষীণতা, অতি-উৎসাহ অথবা অভিজ্ঞতার সারশূন্যতা, যে কারণেই হোক পেয়ারা মাঝেমধ্যে অভিনয়ে এতোটাই নিমজ্জিত থাকতেন যে, তিনি ক্যামেরার সামনের অনুভূতি আর আবেগকে বাস্তবের তটরেখায় যুক্ত করে ফেলতেন। মাঝে মাঝে এমন হয়েছে, চলচ্চিত্রের কোনো ভয়ার্ত চরিত্রের সামনে অভিনয় করতে গিয়ে সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে যেতেন তিনি। এমনকি ছুটে ক্যামেরাসীমার বাইরে চলে যেতেন। তার এমন ছোটাছুটি সেটের অন্যান্য কর্মীদের বেশ মজা দিতো।
এসব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে কখনো যে পেয়ারা অপেক্ষাকৃত বড়ো কিছু দোলাচলের মুখে পড়েননি, তা নয়। কিন্তু সে দোলাচলের হাওয়া তাকে দোলাতে পারেনি। এমনই একটি বাধা আসে শুটিংয়ের মাঝ পর্যায়ে। কাহিনির প্রয়োজনে একটি বিশেষ দৃশ্যে পেয়ারাকে পুকুরে নেমে গোসল করতে হয়। তিনি বিব্রত না হয়ে, ধীরচিত্তে তা সম্পন্ন করেন। কেননা সেটা ছিলো তার কাজ, কর্তব্য। ফলে সেটা কে কীভাবে নেবে বা নেবে না, সে বিবেচনার চাপ তাকে টলাতে পারেনি। একজন অভিনয়শিল্পীর কাছে যখন তার অভিনয়টাই হয়ে যায় একান্ত বাধ্যগত ব্যাপার, তখন তার উচিত-অনুচিত বিচারে না আনাটাই জরুরি। এটা বাংলা চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
দৃষ্টিগোচরে মুখ ও মুখোশ
মুখ ও মুখোশ তার নামের মতোই তৎকালীন সমাজের মুখগুলোর কদর্য মুখোশ সবার সামনে মুক্ত করেছিলো। স্বাধীনতার পূর্বে এবং ব্রিটিশ শাসনের অব্যবহিত পরে বাংলা যখন পাকিস্তানি কুচক্রীদের গলাধঃকরণ; বাংলার পরতে পরতে অনাহার আর দরিদ্রতা; ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা; তখন কিছু এলাকায় লোকজন কাজ না পেয়ে ডাকাতিকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। মুখ ও মুখোশ-এ নির্মাতা এ সমস্যাই তুলে ধরেছেন সুকৌশলে। এদিক থেকে প্রথম সবাক বাংলা চলচ্চিত্রকে নাবালক বলার কোনো অবকাশ থাকে না।
দর্শক আকর্ষণ ধরে রাখার মতো পেয়ারার অনাবিল সতেজ অভিনয় মুখ ও মুখোশ-এর দীপ্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলো বহুগুণ। বিশেষত ব্যক্তি পেয়ারার বালিকাসুলভ স্বাভাবিক যে ভঙ্গিমা, তারই প্রকাশ চলচ্চিত্রে যেনো আরো বহুগুণ নান্দনিকতা জুগিয়েছে। পেয়ারা যে পুরোপুরি এক কৃত্রিম ব্যক্তিত্বকে পর্দায় আনতে ব্যর্থ, তা চলচ্চিত্র দেখামাত্রই দর্শক অবহিত হবে। কাহিনির বহমানতায় কোথাও নেই তার চঞ্চলতা বা অট্টবাচ্য। যদিও রাশিদা চরিত্রটির বেড়ঘেষে তা থাকতে পারতো কিছুটা বাঙালি মধ্যবিত্ত তরুণীর স্বরূপ প্রকাশে। কিন্তু নির্মাতা তা এড়িয়ে গেছেন বেশ অসাবধানেই। তবে সেই কৃত্রিমতা না আনতে পারার যে ব্যর্থতা, তারই অন্য পিঠে লেগেছিলো পেয়ারার নিজস্ব এক প্রাকৃতিক অবয়ব। পেয়ারা সেটুকু যে দ্বিধাহীনভাবেই পর্দায় জ্ঞাপন করেছেন সেটাই মূল ধর্তব্য।
ঢাকায় চলচ্চিত্র প্রিন্ট করার যন্ত্র না থাকায় আবদুল জব্বারকে যেতে হয়েছিলো লাহোরে। তাই মুখ ও মুখোশ-এর সম্পূর্ণ কাজ শেষ হতে দুই বছর লেগে যায়। বহু জল্পনা-কল্পনার শেষে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৩ আগস্ট চলচ্চিত্রটি মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির প্রথম দিনে মুখ ও মুখোশ মফস্বলের কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহসহ সদরঘাটের ‘রুপমহল’ এ চলেছিলো। প্রথম দিনে প্রেক্ষাগৃহ পরিদর্শনে গিয়ে পেয়ারা যখন দেখলেন উপচে পড়া ভিড়, তখন বিশ্বাসই হচ্ছিলো না তার অভিনীত চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে চলছে। তার নাকি মনে হচ্ছিলো যেনো মধুবালার কোনো চলচ্চিত্র দেখতে লোকজন এতো ভিড় জমিয়েছে। কিন্তু একেকটা প্রদর্শনী শেষে যখন লোকজন তাকে দেখতে আসছিলোজ্জযে পেয়ারী বেগম’ই পর্দার রাশিদা কিনাজ্জতখন নাকি পেয়ারা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ওটা আসলে তিনি, মধুবালা নয়।
শেষ অবধি যখন ভিড় ঠেলে পেয়ারাকে বাড়ি ফিরতে হয়েছিলো, তখন যেনো তিনি যথার্থই কল্পনা করেছেন, তার স্বপ্নের মধুবালা আজ সত্যিই তার চারদিকে বিরাজমান।
প্রস্ফুটিত পেয়ারার পাপড়িগুলোর দ্বি-প্রহরেই ঝরে পরা
মুখ ও মুখোশ মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা চলচ্চিত্র নামক বৃক্ষটির আরেকটি শুষ্ক ডালজুড়ে কচি পাতার আবির্ভাব ঘটে। যেনো গাঢ় এক শীতের রিক্ততা শেষে বসন্তের আগমনী বার্তা বয়ে যায় বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনজুড়ে। পেয়ারা ছিলো আসলে সে ডালেরই এক কচি পাতা। যে পাতাটি পরে আর গাঢ় সবুজ হতে পারেনি। এদেশীয় চলচ্চিত্র যা কিছু হারিয়েছে সেই তালিকার প্রথম দিক থেকে পেয়ারার নামটি কোনোভাবেই বাদ দেওয়ার নয়। শারীরিকভাবে তিনি এ জগতে হয়তো আজও টিকে আছেন, কিন্তু চলচ্চিত্রজগৎ থেকে তার যে তিরোধান তা মেনে নেওয়ার মতো নয়।
মুখ ও মুখোশ-এর শুটিং স্পটে শুধু একটি দৃশ্যে পেয়ারী বেগম ও আমিনুল হক মিলিত হলেও আগে থেকেই তাদের একসঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ছিলো। কয়েকটি নাটকে তারা একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। তখন থেকেই তাদের ব্যক্তিগত চেনাজানা। চেনাজানার এই জগৎটা বোঝাপড়ার স্তরে গিয়ে ঠেকলে মুখ ও মুখোশ মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই তাদের দাম্পত্য জীবনের স্বপ্নগুলোও পাখা মেলে পরিবারের সম্মতিতে। কিন্তু এতোসব স্বপ্নমুক্তির ভিড়ে, পেয়ারার ক্রমাগত অভিনয় করে যাওয়ার স্বপ্নটা যেনো আর পাখা মেলতে পারলো না। আমিনুল চাইলেন না, তার স্ত্রী আর অভিনয় করুক। হয়তো স্বামীর ভালো না লাগাটাই পেয়ারা আমলে নিলেন। ত্যাগ করলেন অভিনয়! কিন্তু কেনো? যে পেয়ারা কতো ত্যাগ-তিতিক্ষার পর বাবা, সমাজের বাধা জয় করে অভিনয়ে আসলেন, তাতে একটু স্বস্তিতে নড়েচড়ে বসতে না বসতেই তাকে প্রস্থান করতে হলো? আসলে সে সময়ে মেয়েদের সামাজিক অবস্থান ছিলো অত্যন্ত নড়বড়ে। সামাজিক বাঁকা দৃষ্টি পেরিয়ে একজন নারীর স্বাধীনভাবে কাজ করা কিংবা বাঁচা ছিলো রীতিমতো চ্যালেঞ্জ। তাই হয়তো পেয়ারা স্বামীর কথার অমতে কিছু করেননি। দু-একজন প্রযোজক তাদের নতুন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব আনলে, তা সাত-পাঁচ না ভেবেই ফিরিয়ে দেন তিনি। ফলে যে মানুষটার স্বদেশি চলচ্চিত্রের নতুন রোপণ করা গাছটায় পানি ঢালার কথা, সেই তিনি নিজেকে ঢেলে দিলেন স্বামীসেবায়।
ইদানীং পেয়ারা এবং
পেয়ারী বেগমের বয়স বেড়েছে; থাকছেন একমাত্র ছেলে রাবিউল আমিনের সঙ্গে। স্বামী আমিনুল হক তাকে ছেড়ে ওপারে গেছেন বেশ আগেই, ২০১১ খ্রিস্টাব্দে। আজবধি স্বামীর সেই সাজানো বাগান আঁকড়ে ধরে আছেন পেয়ারা। আগের সেই তারুণ্য-জাগরুক পেয়ারা হারিয়ে গেছেন বহুদিন আগেই। তবে উচ্ছ্বাস পুরোপুরি হারায়নি এখনো। পেয়ারা এখনো বাঁচার আনন্দেই বাঁচেন। দুই নাতির সঙ্গে বেশ খানিকটা সময় কাটান। তবে স্বামীকে খুব মনে পড়ে তার। মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আবার ছেলে, ছেলের বউয়ের সেবায় সুস্থও হয়ে ওঠেন। সেই অর্থে বেশ ভালোই আছেন তিনি। তবে তার মনে কিছু ক্ষোভ আর অভিযোগ বাসা বেঁধেছে শেষ বয়সে এসে। তাই মাঝে মাঝে তার সময়গুলো খুব অস্থির হয়ে ওঠে। তবে তার সেসব অভিযোগ বরং নির্লিপ্ত আর অপ্রতিভাত বলাই সমুচিত। কারণ সেগুলো কারো কানে পৌঁছায় না; পেয়ারার মনেই থেকে যায়। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মে তাকে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ৩৮ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে অতিথি করে আনা হয়। সেখানে পেয়ারা টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন,
আসলে কী বলবো, বলতেও দুঃখ লাগে। কারণ কোনো অনুষ্ঠানেই আমাকে কেউ ডাকে না। টিভিতে পত্রিকায় চলচ্চিত্র অনুষ্ঠানের বিভিন্ন খবর পাই, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠান দেখি। আসতে মন চায়। কিন্তু কেউ না ডাকলে কিভাবে আসবো? দাওয়াত দিলে অবশ্যই আসবো। আসলে আমাদের কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না।৬
পেয়ারী বেগমের এই বক্তব্য যেনো তার প্রতি অবমূল্যায়নের এক শ্লেষাত্মক প্রতিবাদ। আসলে জাতিগতভাবেই যেনো অবমূল্যায়নের এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। আজও নিজেদের সাংস্কৃতিক-স্বকীয়তা অনেকে বুঝে উঠতে পারেনি। কোনো বিশেষ সাফল্য বা উদ্ভাবনের পিছনে অবদান রাখা মুখগুলোর কথা কেনো জানি সবাই খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যায়। পেয়ারাদের কেনো মূল্যায়ন করবো, আর কেনোইবা করা উচিত, সে ভাবান্তরের উদয় মনে হয় না কখনোই। তাই কখনো কখনো নিজেদের বড়োই স্বার্থপর জাতি মনে হয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আজ যে স্তরে এসে পৌঁছেছে, তার পিছনে হয়তো পেয়ারা, আব্দুল জব্বার কিংবা জহরত আরা’দের খুব বেশি অবদান নেই। তবে মনে রাখা উচিত, তারাই কিন্তু এদেশের চলচ্চিত্রের দাঁড় উন্মুক্ত করেছিলো। অথচ জাতি আজ যেনো শিকড়কেই ভুলতে বসেছে।
সেই সময় নারীদের সম্ভাবনার এক নতুন ক্ষেত্রের দিশা দিয়েছিলেন পেয়ারা। নারী-স্বাধীনতা যেখানে জীর্ণতায় ভুগছিলো, সেখানে পেয়ারা বহু প্রতিকূলতা অস্বীকার করে সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন, নারীদেরও অনেক কিছু করার আছে। তিনি অভিনয়ের মাধ্যমে নারীদের এ আশ্বাসও দিয়েছিলেন, তাদের যথেষ্ট সামর্থ্য আছে, তারা দুর্বল নয়। তার দেখানো সেই পথেই পরে নারীরা হেঁটেছে, অনেকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে অভিনয়কে। অথচ এতোসব নারীকে যে নারীশ্রেষ্ঠ পথ দেখালেন, সেই পেয়ারাই যেনো আজ মাথা উঁচু করে চলতে পারছেন না। তিনি নিজেই ভুগছেন পরিচয় সঙ্কটে। তাকে আজ কেউ চেনে না, এমনকি ইতিহাসের তলানি ঘেঁটে দেখা বিজ্ঞরাও না।
বলতে দ্বিধা নেই, তাকে আজ পর্যন্ত ন্যূনতম কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত পর্যন্ত করা হয়নি। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে গান্ধী চলচ্চিত্রের পোশাক পরিকল্পনার জন্য প্রথম ভারতীয় হিসেবে অস্কার পেয়েছিলেন ভানু আথাইয়া নামের এক নারী। সেই ভানুকে নিজ দেশে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো সম্মানে ভূষিত করা হয়নি। অথচ হাল আমলের অনেকে বাগিয়ে নিয়েছেন এসব রাষ্ট্রীয় সম্মান। আবার এমনও হতে পারে, নারী বলেই হয়তো তারা সমাজের সর্বময় ক্ষমতার প্রতিভূ পুরুষ দৃষ্টির গোচর হয়নি। পুরুষের সর্বময় অবদানের স্বীকৃতির ধ্বনিতে হয়তো পেয়ারা-ভানুর অবদান লীন হয়ে গেছে, বড়োই কম পৌঁছেছে পুরুষ কুম্ভকর্ণদের কানে।
লেখক : তানভীর শাওন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
shawonmcj26@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. লেখক তানভীর শাওনের স্বরচিত কবিতা ‘মিথ্যে দোহাই’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৮) থেকে নেওয়া।
২. ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ’; দৈনিক সংবাদ, ৩ আগস্ট ২০১৬।
৩. বেগম, পেয়ারী; ‘ইচ্ছে ছিলো নামকরা অভিনেত্রী হব’; কালের কণ্ঠ-এর শুক্রবারের বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘কথায় কথায়’, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬।
৪. প্রাগুক্ত; বেগম; কালের কণ্ঠ, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬।
৫. প্রাগুক্ত; বেগম; কালের কণ্ঠ, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬।
৬. https://goo.gl/MrDd3R; retrieved on: 20.01.2018
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন