আহমেদ মাসুম
প্রকাশিত ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
প্রসঙ্গ পর্নের ভবিষ্যৎ
আহমেদ মাসুম

বিশ্বব্যাপী পর্নোগ্রাফি এক নিদারুণ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। দিনকে দিন বাড়ছে পর্নোগ্রাফির চাহিদা। এর পিছনে অবশ্য মোটাদাগে কাজ করছে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা। তবে ভোক্তা আর সেই প্রথাগত পর্ন দেখে তৃপ্ত নয়। তারা দেখার সঙ্গে সঙ্গে এতে মিশে যেতে চায়। আর এ চাহিদা পূরণে পর্ন ইন্ডাস্ট্রিও বসে নেই। পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে যুক্ত করা হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি, যার বদৌলতে পর্ন ভোক্তারা বাস্তবিক পর্নজগতে পৌঁছতে পারবে বলে তারা আশা করছে। এ প্রবন্ধটি পর্ন ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ, এর বিস্তার ও নানামুখী শঙ্কা নিয়ে সাজানো হয়েছে। এজন্য ইংরেজি ভাষার একটি প্রবন্ধকে বাংলায় ভাব-ভাষান্তর করা হয়েছে। ম্যজিক লণ্ঠন-এর পাঠকের জন্য ভাব-ভাষান্তরটি করেছেন আহমেদ মাসুম।
[পাঠক মূল লেখাটির হদিস পেতে ঢু মারতে পারেন ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এই ঠিকানায় : http://www.davidyerle.com/the-future-of-porn-a-disturbing-possibility/; retrieved on: 20.05.2018]
ইন্টারনেটের বদৌলতে ভবিষ্যতের পর্ন ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা ঠিক কী হবে, সেটা নিয়ে বর্তমানে সাধারণের মধ্যে চিন্তাভাবনা একেবারে হচ্ছে না বললেই চলে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে ভার্চুয়াল জগৎ, থ্রিডি মডেলিং১ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে বড়ো ধরনের সাফল্য আসছে। কম্পিউটার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আই বি এম (কম্পিউটার উৎপাদনকারী আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানি) দাবি করছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা এর সাহায্যে গন্ধ, স্বাদ এমনকি স্পর্শও অনুভব করতে পারবে।
ইন্টারনেটের কারণে এখন আপনি যেখানেই থাকুন না কেনো, পর্নের রাজ্যে বসবাস করা কোনো ব্যাপারই নয়। সত্যি বলতে কি, ওয়েবসাইটের ১২ শতাংশ জুড়ে আছে পর্ন ভিডিও। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০ শতাংশ পুরুষ তাদের কর্মক্ষেত্রে পর্ন দেখে। সুতরাং আর যাই হোক, পর্নের বাজার টিকে থাকবে। প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আগামী পাঁচ বছরে পর্নোগ্রাফি সম্পর্কে সমস্ত ধারণা নতুনভাবে তৈরি হবে, এতে যোগ হবে নতুন মাত্রা। এটা মোটেও পর্নের বিবর্তনের প্রসঙ্গ নয়; বরং নতুন আঙ্গিকে ভোক্তাদের কাছে পর্ন পৌঁছে দেওয়ার ‘বিপ্লব’।
বর্তমানে পর্নোগ্রাফির সবচেয়ে বড়ো সঙ্কটের জায়গা হলো, এটা কেবলই একপাক্ষিক, যা দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এতে দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেওয়া বা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। এতে সুযোগ নেই অনুভূতি, স্পর্শ ও গন্ধের কোনো প্রত্যক্ষ বিনিময়ের। তবে এই অবস্থা মোটেও আর বেশিদিন থাকবে না, দ্রুত নানা দিক থেকে এর পরিবর্তন হবে/হচ্ছে।
প্রথমত যে পরিবর্তনটা আসছে সেটা হলো, পর্ন দেখার সময় স্পর্শ, গন্ধ ও স্বাদের অনুভূতি সংযোজন। এটা হবে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন। আই বি এম বলছে, পরিবর্তনটি আগামী পাঁচ বছরে অল্প অল্প করে ঘটবে। এর ফলে পর্নোগ্রাফি আগে যেমন কেবলই দেখার বিষয় ছিলো, সেটার সঙ্গে ব্যক্তির শারীরিক সম্পৃক্ততা সৃষ্টি হবে। পর্নোগ্রাফির এই বিপ্লব হবে নানা দিক থেকে।
পর্নোগ্রাফির এই আমূল পরিবর্তনে মূল ভূমিকায় আছে থ্রিডি মডেলিং। সাম্প্রতিক ভিডিও গেইমগুলো দেখতে একদম বাস্তবের মতো মনে হয়; এই ধারা অব্যাহত থাকবেই। পাঁচ বছরের মধ্যে নিয়মিতভাবে এবং অল্প খরচে থ্রিডি চরিত্র বানানো সম্ভব হবে এবং এসব চরিত্র দেখতে ও কাজ করবে অবিকল মানুষের মতো। পর্ন ইন্ডাস্ট্রির তাই আর কোনো অভিনয়শিল্পীর প্রয়োজন হবে না। কেবল একদল প্রোগ্রামার ও ডিজাইনারের সমন্বয়েই পর্ন ভিডিও তৈরি সম্ভব হবে। অবশ্য এর মধ্য দিয়ে ব্যক্তিমানুষ একধরনের পারস্পরিক ক্রিয়ার অনুভূতির মধ্যে প্রবেশ করবে; যেটা সে আগে কখনোই পায়নি। এটা অনেকটা কম্পিউটারে গেইমের মতো; যেখানে একজন গেইমের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ এবং সেখানে হাজির থাকা অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ক্ষমতা রাখে। এ ব্যাপারটি আগের পর্ন ইন্ডাস্ট্রির একপাক্ষিক নিষ্ক্রিয় প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি পরিবর্তন আনবে। বর্তমানে একই ধরনের বিষয় বিস্তর চলচ্চিত্রশিল্প ও ভিডিও গেইমে দেখা যায়।
পর্নোগ্রাফির পরিমণ্ডল এখন শুধু অন্য কেউ যৌন সঙ্গমে লিপ্ত আছে-এমনটি দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কম্পিউটারের মাধ্যমে এমন একটা কৃত্রিম পরিস্থিতির তৈরি করা হবে, যে পরিস্থিতিতে কেউ পর্ন দেখছে সে নিজেও এর মাধ্যমে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হতে পারবে। আগে থেকে চেনাজানা এক পরিস্থিতির মধ্যে ব্যক্তি থাকবে, সেখানে হাজির থাকবে অন্য কেউ; যার মাধ্যমে বাস্তবে কারো উপস্থিতি ছাড়াই ভার্চুয়ালি যে কেউ যৌন শরীর ভোগ করতে পারবে।
এবার এ সংক্রান্ত দ্বিতীয় আলোচনায় আসা যাক। প্রযুক্তি দুনিয়ায় কী ঘটতে চলেছে সেই খোঁজখবর যারা রাখে, তারা সম্ভবত ‘অকুলাস রিফট’২ (Oculus Rift)-এর কথা শুনে থাকবে। এটি ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি ডিভাইস; যা কোনোকিছুকে হুবহু কপি করার কাজে ব্যবহৃত হয়। এটি যেকোনো ব্যক্তিকে গেইম খেলার সময় ত্রিমাত্রিক অভিজ্ঞতার মধ্যে নিমজ্জিত করবে। এ প্রযুক্তির ব্যবহার যে পর্নোগ্রাফিতে হবেই ব্যাপারটি একদম নিশ্চিত। এই প্রযুক্তির সাহায্যে ভার্চুয়ালি অবিকল মানুষ তৈরি করা যাবে এবং তার সঙ্গে যতোভাবে কল্পনা করা যায়, ততোভাবে পারস্পরিক ক্রিয়া করতে পারবে।
এসব উন্নয়নে অবশ্য খুবই বাস্তবিক ঝুঁকি আছে। তবে এ কাজ এখনো হচ্ছে; কিছু গেইম যেমন, ‘ড্রাগন এইজ: অরিজিন্স অর স্কাইরিম’-এর মাধ্যমে ব্যক্তিমানুষের চেহারা অবিকল তৈরি করা যায়। একই ভাবে পর্ন শিল্পের মাধ্যমে উন্নত ইন্টারেক্টিভ সফ্টওয়্যার দ্বারা ভার্চুয়াল অস্তিত্বসম্পন্ন চেহারা সৃষ্টি করা যাবে। এটা একটা বড়ো ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করবে, পর্ন ইন্টারেক্টিভ সফ্টওয়্যার আপনার দৃশ্যমান ছবি দিয়ে ভার্চুয়াল জগতে আপনাকেই কাস্টমাইজ করবে।
শুধু চুলের রঙ নির্বাচন করা নয়, তাদের মুখাবয়ব, নাক-কানের আকৃতিও দেওয়া যাবে। আরো মারাত্মক ব্যাপার হলো, ওই ব্যক্তিদের পুরো দেহের চিত্র ভার্চুয়ালি করা যাবে। এটা শুধু প্রযুক্তির একার পক্ষে করা সম্ভব নয়, এক্ষেত্রে পর্ন শিল্পকে অবশ্যই এর উন্নয়নে কিছু না কিছু করতে হবে। যে কেউ চাইলেই তার প্রিয় নায়ক-নায়িকার সঙ্গে ভার্চুয়ালি ঘুমাতে পারবে? বিষয়টি কেমন হবে-ধরেন, একজন তার সহকর্মীকে সবসময় কামনা করে, তাকে সে ভার্চুয়ালি পেলো? এই ফেইসবুকের যুগে এটা করতে যা লাগবে, তা হলো স্রেফ একটা ছবি; যা পাওয়া খুবই সহজ।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, সামনের দিনগুলোতে মানুষ এক ভয়ঙ্কর সমস্যার মুখোমুখি হবে। এমন একটি ভবিষ্যৎ আসবে, যে সময়ে যে কেউ যেকোনো মানুষের ছবি ব্যবহার করে তার অবিকল ছবি তৈরি করে, তার সঙ্গে ঘুমাতে পারবে। ছবির এ ধরনের ব্যবহার হতে ব্যক্তিমানুষ কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখবে? তখন অনলাইন থেকে সব ছবি তুলে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় হয়তো থাকবে না! বিকল্প হিসেবে এর প্রতিকার করার জন্য আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে; সেটা কতোটা সম্ভব, তাও বলা কঠিন। এক্ষেত্রে সফ্টওয়্যারের ব্যবহার হবে অবৈধ।
অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারে, এটা কি সত্যি সত্যি ঘটবে? উত্তরে সম্পূর্ণ নিশ্চিত করে বলা যায়, এমনটিই ঘটবে। বর্তমানে যে প্রযুক্তি আছে এবং তার বিকাশ ঘটানোর জন্য শক্ত অর্থনৈতিক কাঠামোও আছে। ঘটনাটি যদি সত্যিই ঘটে, তাহলে এমন একটা জগতে বসবাস করা শুরু করতে হবে, যেখানে ব্যক্তিমানুষের একটি ছবিই হবে মহা মূল্যবান জিনিস। তখন যা হবে, অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যের মতো ছবিও নতুন কোনোভাবে কিংবা সূক্ষ্মভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজন হবে।
আহমেদ মাসুম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে অনার্স শেষ করতে পারেননি। বর্তমানে নিজ গ্রামে ফিরে তিনি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা শেখানোর কাজে নিয়োজিত আছেন।
টীকা
১. থ্রিডি মডেলিং : থ্রিডি মডেলিং হলো কোনো বিশেষ সফ্টওয়ারের মাধ্যমে কোনো জড় বা জীবের ত্রিমাত্রিক গাণিতিক উপস্থাপন। অর্থাৎ বিশেষ সফ্টওয়ারের সাহায্যে কোনো বস্তুর যে ত্রিমাত্রিক উপস্থাপন সেটাই থ্রিডি মডেলিং।
২. ফেইসবুক মালিকানাধীন অকুলাস রিফট হলো ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির এমন একটি হেডসেট, যা ইউ এস বি-এর সাহায্যে ব্যক্তিগত কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায় এবং মাথার সামান্য নড়াচড়াতেই ব্যক্তি ত্রিমাত্রিক জগতের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে পারে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন