Magic Lanthon

               

আমিনুল ইসলাম

প্রকাশিত ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ভীতি-রোগ ও সমাজ-বাস্তবতা উপলব্ধির এক অনন্য আধেয়

আমিনুল ইসলাম



Of all the many wonders, none is more wonderful than man ... who has learnt the arts of speech, of wind-swift thought, and the living in neighbourliness.                                                     

¾ Sophocles


মানবসত্তার সারবস্তু হলো আবেগ। প্রাণী হিসেবে মানুষ উঁচুমাত্রার ও গভীর আবেগ সম্পন্ন। বলা যায়, মানুষজাতি হলো আবেগীয়-সামাজিক জীব। এই আবেগ মানুষের জন্য সবকিছুর প্রেরণা ব্যবস্থা হিসেবে কাজে করে। মানুষের জীবন ও আচরণে আবেগের প্রভাব খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের জাগতিক চৈতন্য, উপলব্ধিবোধ, চিন্তা, কল্পনা, ক্রিয়া-অক্রিয়া, ব্যক্তিত্ব বিকাশ, যৌনতা, বিয়ে, পিতৃত্ব-মাতৃত্ববোধ, দেশাত্ববোধ, নাগরিকত্ববোধ, ধর্মবোধ-ধর্মচর্চা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও মিথস্ক্রিয়া সবকিছুতে গভীরভাবে প্রথিত থাকে আবেগ। আবেগের কারণে মানুষ ভালোবাসে, ঘৃণা করে, আত্মঘাতী গভীর বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয় কিংবা মেতে ওঠে বিজয় আনন্দে; তারা লজ্জাবোধ, অপরাধবোধ, বিচ্ছিন্নতা বোধ করে; আবার প্রাণী হিসেবে তারা প্রতিশোধ নেওয়ার উপায়ও খোঁজে। এই আবেগই মানুষকে অনন্যতা দান করেছে। আর সেই অনন্যতার অন্যতম কারণ হলো আবেগের মাত্রা, তীব্রতা ও বিচিত্রতা। এক পলকেই মানুষ বিপুল সংখ্যক আবেগ প্রকাশ ও ব্যাখ্যা করতে পারে। এই জগতে মানুষের মতো অন্য কোনো প্রাণিসত্তা বৈচিত্র্যময় ও বহু সংখ্যক আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। মাত্রাতিরিক্ত আবেগ থেকেই তাই কখনো কখনো মনোরোগের জন্ম হয়। বর্তমান আলোচনাটি এমনই একটি আবেগ নিয়ে। আর সেই আবেগটি হলো ভীতি-রোগ। এই মানবীয় আবেগটি উপলব্ধির চেষ্টা করা হবে ভারতের হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্র ফোবিয়া’র আলোকে। ফোবিয়া নামক জটিল ভীতি-রোগে আক্রান্ত এই চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র অ্যাগোরা। বলে রাখা ভালো, এই আলোচনা ফোবিয়ার কনটেক্সুয়াল বিশ্লেষণ, মোটেই টেক্সুয়াল নয়।


মানবীয় আবেগ


অনুভূতির মানবীয় প্রকাশ ও যেকোনো চৈতন্যগত অভিজ্ঞতাই হলো আবেগ। এই আবেগই তাকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। আবেগ শব্দটির অর্থময়তার মধ্যে প্রথিত রয়েছে বৈচিত্র্যময় ও বহুসংখ্যক অনুভূতি, আচরণ অভিজ্ঞতার সন্নিবেশ। দেহ ও মনে জৈবিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদল ঘটে এই অনুভূতি, আচরণ ও অভিজ্ঞতার। মানবীয় আচরণ, মিথস্ক্রিয়া এবং সামাজিক সংগঠন ও কাঠামোর সঙ্গেও এর ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে। তবে মানুষের আবেগ জৈবিক না সাংস্কৃতিক তা নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে। মানবীয় আবেগের বিভিন্ন মাত্রাকে পাঁচটি সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করা যায়। আর সেই তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণগুলো হলো : ড্রামাটারজিকাল তত্ত্বসমূহ (damaturgical theories), প্রতীকী মিথস্ক্রিয়া তত্ত্বসমূহ (symbolic interactionist theories), মিথস্ক্রিয়া সামাজিক-রীতি তত্ত্বসমূহ (interaction ritual theories), ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা তত্ত্বসমূহ (power and status theories), বিনিময় তত্ত্বসমূহ (exchange theories)। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী মানুষের মৌলিক আবেগ হলো ছয়টি; সেগুলো হলো-সুখ, দুঃখ, ভয়, রাগ, বিস্ময় ও বিরক্তি।


মানবীয় আবেগ নিয়ে কল্পনা, চিন্তা, গবেষণা সেই অতীতকাল থেকেই চলমান। দার্শনিক অ্যারিস্টটল মানুষের ১৪ ধরনের আবেগীয় প্রকাশের কথা উল্লেখ করেছেন। আর সেই আবেগগুলো হলো-ভয়, আত্মবিশ্বাস, রাগ, বন্ধুত্ব, প্রশান্তি, শত্রুতা, লজ্জা, লজ্জাহীনতা, করুণা, দয়া, হিংসা, ক্ষোভ, অনুকরণ প্রবণতা, অবজ্ঞা/অমান্য। বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের ওপর গবেষণা করে পল ইকমান ছয়টি মৌলিক আবেগের কথা উল্লেখ করেন। সেগুলো হলো-রাগ, বিরক্তি/বিতৃষ্ণা, ভয়, সুখ, দুঃখ ও বিস্ময়। রবার্ট প্লুটচিক ও হেনরি কেলারম্যান বলেছেন আট ধরনের মৌলিক আবেগের কথা-সুখবোধ, দুঃখবোধ, আস্থা, বিরক্তি/বিস্বাদ, ভয়, রাগ, চমক ও প্রত্যাশা। অন্যদিকে দুই হাজার একশো ৮৫ জন ব্যক্তির ওপর গবেষণা করে অ্যালান এস কাউয়েন (Alan S. Cowen) ও ড্যাচার কেল্টনার (Dacher Keltner) দেখিয়েছেন, মানুষের মধ্যে ২৭ ধরনের স্বতন্ত্র আবেগীয় অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই আবেগগুলো হলো-শ্রদ্ধাবোধ, ভক্তিবোধ, সৌন্দর্যবোধ, হাস্যরসবোধ, দুশ্চিন্তা, ভয়, অস্বস্তি, বিরক্তি, প্রশান্তভাব, বিভ্রান্তি, তীব্র আকাক্সক্ষা, বিরক্তি, সমানুভূতি বেদনা, আহ্লাদ, হিংসা, উত্তেজনা, ভীতি, হরর, আগ্রহ, উল্লাস, স্মৃতিকাতরতা, প্রেম, দুঃখ, পরিতুষ্টি, যৌনাকাক্সক্ষা, সহানুভূতি এবং বিজয়। এছাড়াও মানুষের রয়েছে অন্যকে গ্রহণ করা, অন্যের প্রতি উষ্ণ মমতা, আগ্রাসন, বিষণ্নতা, সন্দেহ, উল্লাস, ক্ষমা, হতাশা, কৃতজ্ঞতা, মনোযন্ত্রণা, অপরাধবোধ, ঘৃণাবোধ, আশা, প্রতিহিংসা, গৃহকাতরতা, ক্ষুধা, আতঙ্ক, আগ্রহ, একাকিত্ব, ভালোবাসা, অহংকার, ক্রোধ,  দুঃখবোধ।


প্রসঙ্গ ভীতি-রোগ


ভীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ ফোবিয়া (phobia)। এটি গ্রিক শব্দ ফোবোস (phobos) থেকে এসেছে। ফোবোস ছিলেন গ্রিক যুদ্ধ-দেবতা আরেস (Ares)-এর ছেলে। ফোবোস তার বাবার সঙ্গে যুদ্ধে যেতেন। তিনি প্রচণ্ড ভীতির সঞ্চার করতেন যুদ্ধের ময়দানে। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রিটাস (Hippocrates) ব্যক্তির আচরণ বৈকল্য বোঝাতে শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। বাঁশির সঙ্গীতে প্রচণ্ড ভীতি আছে এমন ব্যক্তিকে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি প্রয়োগ করেন এই শব্দটি। এর প্রায় পাঁচ হাজার বছর পর রোমান চিকিৎসক সেলাস (Celsus) ব্যক্তির প্রচণ্ড পানি ভীতি বোঝাতে ফোবিয়া শব্দটি ব্যবহার করেন। আধুনিককালে মনোবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন লেখা ও গবেষণায় এই শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায় প্রচুর। বিশেষত ১৯ শতকের শেষের দিকে এবং ২০ শতকের গোড়ার মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড-এর বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং আধুনিক যুগের গবেষকদের গবেষণাগারে ভয় ও ভীতি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে ব্যাপক পরিমাণে।


ভয় ধারণাটি অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। এটি মানবীয় জৈবসত্তা ও পরিবেশের অতি জটিল মিথস্ক্রিয়ার ফল। জগতে মানুষ এমন অনেক বস্তু বা পরিস্থিতির মোকাবিলা করে যা তার পছন্দের সঙ্গে মেলে না। যেমন, অনেকেই হয়তো ব্যাঙ, সাপ, মাকড়সা, কোলাহলময় রাস্তা, রাজনৈতিক সভা, পুরাতন বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, বিশাল আকৃতির গাছ, গ্রামের কাদাময় পথ, শহরের জ্যাম, পাহাড়, জঙ্গল, বিশাল জলাধার পছন্দ করে না। শুধু তাই নয়, দেখা যায়, অনুভব করা যায়, শোনা যায়, কিংবা ঘ্রাণ নেওয়া যায় এমন অনেক কিছুই কোনো মানুষের পছন্দের তালিকায় নাও থাকতে পারে। আর এই অপছন্দের বিষয়গুলোতে ভীতি আছে বলে মানুষ মনে করে। এই অপছন্দগুলো অযৌক্তিক হলেই ভীতি ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কাজেই বিশেষ কোনো বিষয়ের প্রতি অযৌক্তিক, দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র ভয়ই হলো ভীতি


মোটাদাগে ভীতিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়-সুনির্দিষ্ট ভীতি বা সাধারণ ভীতি, সামাজিক ভীতি এবং অ্যাগারো ফোবিয়া বা জনপরিসরগত ভীতি। কোনো বিশেষ বস্তু বা পরিস্থিতি সম্পর্কে ভয় পাওয়াকে বলা হয় সুনির্দিষ্ট ভীতি। আর সমাজে হেয় প্রতিপন্ন, অপমানিত, মর্যাদাহানি, ছোটো হওয়ার ভয়কে বলা হয় সামাজিক ভীতি। অন্যদিকে নিরাপদ কোনো স্থানের বাইরে যাওয়ার ভয়ই হলো অ্যাগোরাফোবিয়া বা পরিসরগত ভীতি। ভীতিগত বৈকল্য আসলে অনেকগুলো দুশ্চিন্তা বৈকল্যের সমষ্টি। এর অন্তর্ভুক্ত বৈকল্যগুলো হলো প্যানিক ডিসঅর্ডার বা আতঙ্কগ্রস্ত বা উন্মাদ হয়ে পড়া; পোস্ট ট্রমাটি স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা কোনো কারণে প্রচণ্ড মানসিক বা শারীরিক আঘাত পাওয়ার পর চিন্তা ও আচরণে ব্যাপক নেতিবাচক পরিবর্তন আসা, অবিন্যাসিত হয়ে পড়া, অগোছালো হয়ে পড়া; এবং অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার বা কোনো বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস বা মনোভাবের কারণে আচরণে বৈকল্য সৃষ্টি হওয়া। কাজেই ভয় ধারণাটিকে তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। প্রথমত, কোনো পরিবেশ বা পরিস্থিতে হুমকি; দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি বা বিপদের উপস্থিতি এবং তৃতীয়ত, শারীরিক লক্ষণ ও এড়িয়ে যাওয়ার আচরণ।


ভীতি হলো, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তাময় অনুভূতির হঠাৎ, তাৎক্ষণিক ও তীব্র প্রকাশ। ব্যক্তির মধ্যে ভীতিবোধ জাগ্রত হলে বিষণ্নতা ছাড়াও এক বা একাধিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে-অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন, বুক ধড়ফড় করা কিংবা হৃৎস্পন্দনের গতি অস্বাভাবিক বেড়ে কিংবা কমে যাওয়া। এছাড়াও হঠাৎ ও স্বাভাবিক ঘাম ঝরা, কাঁপুনিবোধ, মুখের ভিতর শুকিয়ে যাওয়া, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, বুকে ব্যথা কিংবা অস্বস্তি বোধ, হজম ঠিক মতো না হওয়া, ঝিমুনি বোধ, সবকিছুতে অস্থির লাগা, মূর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি হওয়া, মাথার ভিতর হালকা মনে হওয়া, চারপাশের সবকিছুকে অবাস্তব মনে হওয়া, সবসময় একরকম স্বপ্নময় ঘোরের মধ্যে থাকা, প্রতিনিয়তই মৃত্যু ভয়ে আতঙ্কিত থাকা, কখনো কখনো শরীরের কোনো অংশে কোনো অনুভূতি বোধ না করার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এই অনুভূতি একধরনের ছাইচাপা আগুনের মতো। কিংবা বলা যায়, সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো, যেকোনো মুহূর্তেই এই আগ্নেয়গিরির উদগিরণ হতে পারে।


ব্যাখ্যাতীত, অযৌক্তিক, ইচ্ছাবিরুদ্ধ, নিয়ন্ত্রণাতীত ও মাত্রাতিরিক্ত ভয়ই হলো ভীতি-রোগ। এর ফলে কোনো পরিস্থিতিতে ব্যক্তি মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কল্পিত পরিস্থিতিকে এড়াতে চায়। ভীতি আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাপন, কাজ, দায়িত্ব পালন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, শিক্ষা, পেশা অর্থাৎ জীবনের সার্বিক গুণগতমানকেই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। নিজ, পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সমাজ এবং সামগ্রিকভাবে বাহ্যিক জগৎ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই ভীতি-রোগ আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনে সৃষ্টি হয় অনাকাক্সিক্ষত ও অপমানজনক পরিস্থিতির। যে পরিস্থিতি মনের গহীনে আরো ভয় গেঁথে দেয়। ব্যক্তি প্রতিনিয়তই হীনমন্যতায় ভোগে। ফলে এড়িয়ে চলে পারিপার্শ্বিক সবাইকে। একান্ত অনুভূতি, আবেগগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে সে অতি তীব্রভাবে অসহায় বোধ করে।


মানুষের মধ্যে এমন কেউ নেই, যাকে প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো ভয় তাড়া করে না। প্রত্যেকের ভয়ই স্বতন্ত্র। অন্যের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না। কোনো কোনো ভয় মানবজাতির মধ্যে শত শত বছর ধরে বিরাজমান। যেমন ধরা যাক, বর্ষাকালে বজ্রপাত ও বিজলি চমকানোর কথা। বজ্রপাত ও বিজলির ভয় (Brontophobia) মানুষের চিরদিনের। ঠিক একইভাবে বলা যায়, জ্বর হওয়া (Febriphobia), সাপের ভয়ের (Ophidiophobia) কথা। এসব ভয় মানুষকে আদিকাল থেকেই তাড়া করে আসছে। 


এই ধরনের ভীতি ব্যক্তির জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। শুধু তাই নয়, এটি পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনকেও প্রভাবিত করে ব্যাপক মাত্রায়। ভীতির কারণে ব্যক্তির মনের গহীনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সে বিশেষ কোনো বস্তু, স্থান কিংবা পরিস্থিতিকে এড়িয়ে চলতে চায়। কোনো ব্যক্তির যদি খাদ্য ভীতি (Cibophobia) থাকে, তাহলে সে এক সপ্তাহ কিংবা এক মাস তেমন কোনো খাবারই গ্রহণ করবে না; আবার কারো মধ্যে সময় ভীতি (Chronophobia) থাকলে কখনোই নির্ধারিত সময়ে কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবে না। বিশেষ কোনো ভীতির কারণে কখনো কখনো ব্যক্তি পেশা কিংবা কর্মস্থলও বদলে ফেলতে পারে। যেমন, পশ্চিমা বিশ্বে চলমান সিঁড়িতে উঠতে ভয় পাওয়ার কারণে চাকরি ছাড়ার ঘটনা ঘটে অহরহ।



ভীতি একধরনের বিষণ্নতা বৈকল্য। এর ফলে ব্যক্তি কোনো পরিস্থিতি, প্রাণী, স্থান, বস্তু সম্পর্কে তীব্র ভয় অনুভব করে। যা কিনা অযৌক্তিক। জীবজগতের নানা প্রাণী সম্পর্কে ভীতি, প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ সম্পর্কে ভীতি, শারীরিক অসুস্থতা সম্পর্কে ভীতি, সামাজিক ভীতি। জীবজগতের নানা প্রাণী সম্পর্কে ভীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে মৌমাছি ((apiphobia; melisophobia), মাকড়সা (arachnophobia), ব্যাঙ (batrachophobia), পোকামাকড় (entomophobia), ঘোড়া (equinophobia), মাছ (icthyphobia), ইঁদুর (musephobia; murophobia), সাপ (ophidiophobia), কুকুর (cynophobia), পাখি (ornithophobia) ও অন্যান্য প্রাণী (zoophobia)। প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ সম্পর্কে ভীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে রাত/অন্ধকার (acluphobia; nyctophobia), উচ্চতা (acrophobia; hysophobia), ঝড়ো বাতাস (anemophobia), আকাশে বিদ্যুৎ চমকানো (astraphobia), বজ্রপাত (brontophobia; keraunophobia), বৃষ্টি (ombrophobia), নদী (ঢ় potomophobia), নক্ষত্র (siderophobia)।


অন্যদিকে রক্ত/শারীরিক আহত/অসুস্থতাজনিত ভীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে শারীরিক ব্যথা বা যন্ত্রণা, সুচ, রক্ত (hemophobia) ও জ্বর। সামাজিক ভীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে-কেউ ছুঁয়ে ফেলবে এমন বা অন্যের সংস্পর্শে আসা (aphephobia; haptephobia), মান-মর্যাদাহানি বা হেয় প্রতিপন্ন হওয়া (catagelophobia), লজ্জা পাওয়া (ereuthophobia), ব্যর্থতা (kakorrhaphiophobia), কেউ দেখছে এমন (scopophobia), অপরিচিত কোনো ব্যক্তি (xenophobia) ইত্যাদি। অন্যান্য ভীতির মধ্যে রয়েছে আকাশ ভ্রমণ সম্পর্কে ভীতি (pteromerhanophobia) ও  বদ্ধ স্থান সম্পর্কে ভীতি (claustrophobia)।


ফোবিয়ায় ভীতি-রোগের রূপায়ণ


ফোবিয়ার প্রধান চরিত্র মেহেক (রাধিকা আপ্তে) একজন চিত্রশিল্পী। তিনি অ্যাগোরাফোবিয়া (agoraphobia) বা উন্মুক্ত জনপরিসর ভীতি নামে জটিল মনোরোগে আক্রান্ত। এটি একধরনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বা দুশ্চিন্তা বৈকল্য। এই বৈকল্যে আক্রান্ত হওয়ার কারণে ব্যক্তি বাহ্যিক জগতের সবকিছুতেই ভয় পায়। বাড়ির বাইরের দুনিয়াকে সে বন্দিশালা মনে করে। তীব্র অসহায় বোধ করে বাইরে বের হওয়ার প্রশ্নে। প্রতিনিয়তই উৎকণ্ঠিত থাকে। এমন আশঙ্কায় থাকে কেউ তাকে অপমানিত করবে। অযৌক্তিক ভয় এবং অজানা ও অবাস্তব বিপদের আশঙ্কা, উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের জালে আষ্ঠেপৃষ্ঠে আটকে থাকার কারণে সে বাড়ির বাইরে একা কোথাও যেতে চায় না; গণপরিবহনে উঠতে চায় না; পাড়ার কোনো দোকান কিংবা বাজারে যায় না; লোকারণ্যের কোনো সারিতে দাঁড়াতে চায় না; বিনোদনস্থল কিংবা প্রেক্ষাগৃহে যায় না। এমনকি হাঁটতে ভয় পায় ব্যস্ত কোনো রাস্তায়। মোটকথা বাইরের দুনিয়ার সমস্ত পরিসর ও পরিস্থিতিকে সে এড়িয়ে চলতে চায়। দুনিয়ার সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। কেবল শোয়ার ঘর ও বাড়ির চার দেয়ালে আটকে ফেলে নিজেকে। এই বন্দিদশা শারীরিক ও মানসিক উভয়ই। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবার কাছ থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত ও কর্মক্ষেত্রের কোনো সম্পর্কই বজায় রাখতে পারে না। নিজেকে খুব অসহায় বোধ করে। দৈনন্দিন জীবনযাপনে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে অন্যের ওপর। শুধু তাই নয়, সে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাও অনুভব করে। এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে বুকে ব্যথা, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট হওয়া, ঝিমুনি, দেহে ঝাঁকুনি অনুভব করা, সবকিছু বিরস মনে হওয়া, চিন্তা ও কাজে বিশৃঙ্খলা, চোখে আবছা দেখা, সবসময় নেতিবাচক চিন্তা করা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা কমে যাওয়া, পেটে পীড়া, সবসময় বিষণ্ন থাকা।     


ফোবিয়ায় মেহেকও বাড়ির বাইরে যেতে তীব্র ভয় পায়। তার এই ভীতির জন্ম যৌন নিগ্রহের শিকার হওয়ার পর থেকে। রাতে ট্যাক্সিতে করে বাড়ি ফেরার সময় চালকের হাতে তিনি এই নিগ্রহের শিকার হন। মেহেক প্রতিনিয়তই অজানা এক আতঙ্কের মধ্যে থাকে। ঘন ঘন শ্বাস নেন, ব্যাপক মাত্রায় ঘামেন এবং গুছিয়ে কথা বলতে পারেন না, মুখমণ্ডলে সবসময় থাকে আতঙ্কের ছাপ।


ফোবিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটি হলো, বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটি খুবই সমসাময়িক এবং বর্তমান সময়, সমাজ ও নগর জীবনে নারী-পুরুষ সম্পর্ক, তাদের জীবনযাপন ও উৎকণ্ঠা-উদ্বেগকে উপলব্ধির প্রশ্নে খুবই প্রাসঙ্গিক। এটি মূলত সমাজে সহিংসতার উপস্থিতি ও মানুষের ওপর এর প্রভাব উপলব্ধির একটি জানালা দর্শকের সামনে খুলে দেয়। তুলে ধরে শহরের বহুমাত্রিক জটিলতা ও মানুষের ওপর অভিঘাতের জায়গাটি। জরাগত উপাদানের দিকে খেয়াল করলে এখানে দেখা যায়, চলচ্চিত্রটিতে হরর ও মনস্তাত্ত্বিক বৈকল্যের একধরনের বুনন হাজির করা হয়েছে; পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর শঙ্কা, ভয়, ভীতির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যৌন নিগ্রহের শিকার একজন নারীর জীবনসংগ্রামকে। নিরাপত্তার নামে সেই নারী নিজেকে আটকে রাখে চার দেয়ালের ঘেরাটোপে। মেহেক কেবল সেলুলয়েডের ফিতার একটি চরিত্র নয়, বরং এটি শত শত, হাজার হাজার, লাখ লাখ নারীর জীবন বাস্তবতার প্রতিনিধি। এই বাস্তবতা ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই বিরাজমান। যার প্রমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ, নৃশংস ধর্ষণের ঘটনাগুলো। এসব ঘটনার কিছু উঠে এসেছে পত্রিকায়, টেলিভিশনের পর্দায়। কিন্তু বেশিরভাগ ঘটনাই নাই হয়ে গেছে।


অ্যাগোরাফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত ওপেন স্পেস নিয়ে ভয় পায়। মেহেকও ব্যতিক্রম নয়। ওপেন স্পেসে কিংবা জনপরিসরে নারীরা যৌন নিগ্রহের শিকার হওয়ার ভয়ে মেহেক পরিপার্শ্ব থেকে, জগৎ থেকে, দুনিয়ার সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। শুধু মেহেকই নয়, বর্তমানে মানুষ এমন এক দুনিয়ায় বাস করছে যাকে মোটাদাগে বলা যায় ভয়ের সংস্কৃতির যুগ। এখানে প্রতিনিয়তই চলছে ভয়ের ব্যবসা। রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, বিভিন্ন অ্যাডভোকেসি গ্রুপ কিংবা পণ্য বিক্রেতা ভয়ের ঝাণ্ডা উড়াচ্ছে। তাদের লক্ষ্য মানুষের মধ্যে ভয়বোধ জাগ্রত করে ভোটের সংখ্যা বাড়ানো, সার্কুলেশন কিংবা রেটিং বাড়ানো, দাতাদের কাছ থেকে অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা কিংবা নিজ পণ্যের বিক্রি বাড়ানো ও বাজার দখল করে রাখা।


ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক স্বার্থ কিংবা করপোরেট লাভ নিশ্চিত করার জন্য ভয়ের উৎপাদন ও প্রসার চারদিকেই। ভয় যেনো আজ গল্পের সেই বোতলবন্দি ভূতের মতোই। বোতল থেকে মুক্ত হয়ে সে আজ নিজের আলাদা একটি জীবন পেয়েছে; পেয়েছে নতুন শক্তি। এই ভয়ের কারণে আজ ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, সমাজে সমাজে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে সৃষ্টি হয়েছে বিভক্তি। ব্যক্তিমানুষের জীবন, মন, বোধ, উপলব্ধি, চেতনা সবই অনিশ্চয়তায় ভরপুর। প্রতিনিয়তই মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত থাকে। এই বুঝি জঙ্গি আক্রমণ করলো, সঙ্গী ছেড়ে গেলো, একা হয়ে পড়লাম, স্বপ্ন ভেঙে গেলো, পরাজিত হলাম, পিছিয়ে পড়লাম অন্যের তুলনায়, কমে গেলো আমার সামাজিক অবস্থান।


রাজনীতিবিদরা মানুষের মধ্যে বিভিন্ন কলাকৌশলে ভয় দেখায় জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসের, অপরাধ কর্মকাণ্ডের। গবেষক, ব্যবসায়ী, ওষুধ কোম্পানি, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ভয় দেখায় জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষ কোনো রোগের প্রাদুর্ভাবের, অনিশ্চয়তা কিংবা ভোগের, সৌন্দর্যে ও মর্যাদায় পিছিয়ে না পড়ার। নতুন নতুন প্রযুক্তি আজ মানুষের হাতের মুঠোই। প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ ও স্বপ্ন ভাঙাগড়া আজ অদৃশ্য ভার্চুয়াল জগতে। এসবের জন্য কাউকে আজ বাড়ির বাইরে বেরুতে হয় না। অনেকে বাড়ির বাইরে বেরুতেও চায় না। বাইরে বেরোলেই যেনো আক্রমণ করবে জঙ্গি, শরীরে বাসা বাঁধবে রোগ জীবাণু, কালো হয়ে যাবে গায়ের রঙ। পাড়ার মোড় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের আড্ডাগুলো আজ ফেইসবুকেই সীমাবদ্ধ। অদৃশ্য ভয়ে আজ মানুষ নিজেদের আটকে ফেলেছে চার দেয়ালের মধ্যে। এই দেয়াল কেবল ইট-কাঠ-পাথরের নয় বরং মনে, চৈতন্যে ও বোধে। পুরো সমাজব্যবস্থাই আজ যেনো ভীতি-রোগে আক্রান্ত


উপসংহার


ভয় একটি মৌলিক ও সর্বজনীন আবেগ। প্রাণিসত্তা হিসেবে এই জগতে টিকে থাকার প্রশ্নে ভয়বোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বর্তমানে বিশ্ব, সমাজ প্রক্রিয়াকে উপলব্ধির প্রশ্নে ফোবিয়া খুবই প্রাসঙ্গিক। কেননা অ্যাগোরাফোবিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা কেবল নিজেকে ছাড়া দুনিয়ার সবকিছুই ভয় পায়। বর্তমানে মানুষের বোধ, চৈতন্য, উপলব্ধি সবকিছুই ভয়ের জালে আটকা। তবে ভয় ব্যক্তিজীবনে দরকারিও বটে। কেননা ভয় থেকেই মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় উদ্যোগী হই। যেকোনো বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি সতর্ক ব্যবস্থা হিসেবেও কাজ করে। ফলে মানুষ যেকোনো বাস্তব কিংবা অনুভূত বিপদ উপলব্ধি করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে তাৎক্ষণিক। আর এজন্য আলাদাভাবে চিন্তা করতে হয় না। যাই হোক, ফোবিয়ার মেহেক চরিত্রটি যেনো বর্তমান সমাজ-বাস্তবতার প্রতীকী রূপ হিসেবেই হাজির হয়। সমাজের প্রত্যেকেই যেনো একেকজন মেহেক। মেহেকের এই অবস্থার মূলে রয়েছে পোস্ট ট্রমাটিক ডিসঅর্ডার, যার কারণ মানুষ নামের কিছু নিকৃষ্ট জীবের যৌন লালসা। অন্যদিকে সমাজের ভীতি-রোগের উৎস মূল খোঁজার সময় বোধ হয় এসে গেছে। এর উৎস মূলেই হয়তো পাওয়া যাবে সমাজের হারিয়ে যাওয়া হৃদয়টিকে।


লেখক : আমিনুল ইসলাম, রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে পড়ান। সম্প্রতি তার প্রকাশিত গ্রন্থ ‘মানবীয় যোগাযোগ’।


mukul.ru@gmail.com


তথ্যসূত্র

1

১. Izard, C. E. (1978); Human Emotions; Plenum Publishing Corporation, New York.

২. প্রাগুক্ত; Izard (1978).

৩. Turner, J. H. & Stets, J. E. (2006 : 25-52); `Sociological Theories of Human Communication’; Annual Reviews; vol.32.

৪. Ekman, P. (2007); Emotions Revealed: Recognizing Faces and Feelings to Improve Communication and Emotional Life; Henry Holt and Company, New York.

৫. Plutchik, R. & Kellerman, H. (1980); `Emotion: Theory, Research, and Experience’; Theories of Emotion; Volume 1, Academic Press, New York.

৬. Cowen, Alan S. & Keltner, D. (2017); `Self-report captures 27 distinct categories of emotion bridged by continuous gradients’; Proceedings of the National Academy of Sciences;201702247, DOI: 10.1073/pnas.1702247114

৭. Bhardwaj, A. (2008); Fear and Phobias; Goodwill Publishing House, New Delh.

৮. Glassner, B. (2010); Culture of Fear: Why Americans Are Afraid of the Wrong Things; Basic Books, USA.

৯. Bandelow, B. & Michaelis, S. (2015: 327-335); `Epidemiology of anxiety disorders in the 21st century’; Dialogues in Clinical Neurosciences; vol. 17 (3).

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন