সাদেক আলী
প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সঙ্কট-সম্ভাবনার ভারতীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি
সাদেক আলী

কিছুদিন আগে একটা প্রতিবেদন পড়েছিলাম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’তে, সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে মাত্র দুই শতাংশ চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল। এতো বড়ো ইন্ডাস্ট্রি, যার গ্ল্যামার সব জায়গায়-লোকে ভাবে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি মানে অনেক টাকার ব্যাপার এবং বক্স অফিসের হিসাবে সেই টাকা দেখাও যায়। অথচ সফলতার হার মাত্র দুই শতাংশ! এটা ঠিক কী করে হয়, এটা অর্থনীতির কোনো হিসাবেই আসে না আর কি! তাহলে এই ইন্ডাস্ট্রিতে যে লাখ লাখ লোক কাজ করছে, সেটা কীভাবে করছে! আবার মজার ব্যাপার হলো, এই ইন্ডাস্ট্রির অনেক লোকের হাতেই কিন্তু কাজ নেই। কাজ নেই এই অর্থে যে, বছরে কারো হাতে হয়তো এক মাসও কাজ থাকে না; অথচ সে পুরো বছরটা বসে থাকছে ওই একটা কাজের জন্য। এক অর্থে এই লোকেরা আসলে বেকার, কিন্তু তাদের বেকার ধরা হচ্ছে না।
এখন নাকি বলিউডে একশো কোটি টাকার নিচে কোনো চলচ্চিত্র হয় না। তারপর বক্স অফিস দেখায়, সেটা তিনশো কোটি, পাঁচশো কোটি, এক হাজার কোটি টাকা ব্যবসা করেছে। সেখানে বছরে একটা চলচ্চিত্র এ ধরনের ব্যবসা করছে, তাহলে বাকিগুলোর অবস্থা কী? অনেক চলচ্চিত্র বানানো হচ্ছে, সেগুলো হয়তো মুক্তিই পাচ্ছে না। তাহলে সেই চলচ্চিত্রগুলো কোথায় যাচ্ছে? এছাড়া যে প্রোডাকশন হাউজ দুই হাজার কোটি টাকা রোজগার করছে, সেটা তো তার নিজস্ব টাকা। সেই টাকা প্রযোজক না চাইলে ইন্ডাস্ট্রিতে ফেরত আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। দৃশ্যত হয়তো মনে হচ্ছে, ভারতের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক কিছু হচ্ছে, আসলে কিন্তু কিছুই হচ্ছে না।
অন্যদিকে প্রেক্ষাগৃহের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব প্রেক্ষাগৃহ/অডিটরিয়াম কেবল চলচ্চিত্র দেখানোর জন্যই ব্যবহৃত হয়, সেই সব প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। দুই এক বছর আগে কৌশিক গাঙ্গুলি একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সিনেমাওয়ালা (২০১৬)। সেখানে দেখা যায়, একজন লোক প্রেক্ষাগৃহে চাকরি করতো, সে আর অন্য কিছুই করতে পারে না। এখন সেই প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ। ফলে তার আর কোনো কাজ নেই। কৌশিক ওখানে একটা পরিসংখ্যানে জানান, এই কিছুদিন আগেও কলকাতায় সাতশোটি প্রেক্ষাগৃহ ছিলো, এখন খুব বেশি হলে দুইশো ৫০টি চালু আছে।
তাহলে প্রেক্ষাগৃহের অবস্থা যদি এই জায়গায় এসে দাঁড়ায় এবং ক্রমশই যদি তা কমতে থাকে; একসময় হয়তো সব প্রেক্ষাগৃহই বন্ধ হয়ে যাবে। মফস্বল, শহরতলি সব জায়গার প্রেক্ষাগৃহের ক্ষেত্রেই এই ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে শহরে সিনেপ্লেক্স গড়ে উঠছে-একটা শপিংমল হচ্ছে, যেখানে প্রচুর কাপড়ের দোকান, ইলেকট্রনিকের দোকান, খাবারের দোকান থাকছে। এসব সিনেপ্লেক্সে কয়টা চলচ্চিত্র চলে তারও ঠিক নেই।
ভারতের মুম্বাইয়ে প্রথম যিনি মাল্টি সিনেপ্লেক্সের ব্যবসা শুরু করেন, সেই মনমোহন শেট্টি একবার বলেছিলেন, এই সিনেপ্লেক্সগুলো চলে কেবল পপকর্ন বিক্রির টাকায়। পরবর্তী সময়ে অবশ্য মনমোহন এটা রিলায়েন্স গ্রুপকে দিয়ে দেন। সম্ভবত সেটা এখন সিনেম্যাক্স। মাল্টিপ্লেক্সে যে চলচ্চিত্রগুলো রিলিজ দেওয়া হয়, সেখানে শুধু চলচ্চিত্র দেখিয়ে যে পয়সাটা পাওয়া যায়, তাতে চলে না। মূলত সিনেপ্লেক্সটা চলে ওখানে যে পপকর্ন বিক্রি হয়, সেই টাকায়-মনমোহনের এই কথা কিন্তু মারাত্মক। এই যে আমরা এতো সফলতার কথা বলছি, চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে প্রচুর টাকা, প্রচুর টাকা, তাহলে টাকাটা কোথায়! যারা প্রেক্ষাগৃহ চালাচ্ছে, তারাও বলছে ঠিকঠাক চলচ্চিত্র নেই। আর এভাবে যদি প্রেক্ষাগৃহ ক্রমশ বন্ধ হতে থাকে, তাহলে চলচ্চিত্র নির্মাণের জায়গাটা থাকবে কোথায়? অর্থনীতির ভাষায় বলে, কোনো জিনিস উৎপাদন করতে গেলে আগে বাজার যাচাই-বাছাই করতে হয়। ফলে বিক্রি করার জায়গায়টাই যদি না থাকে, তাহলে উৎপাদন হবে কোথা থেকে!
মুম্বাই চলচ্চিত্রের অবস্থা এখন যেটা হয়েছে তা হলো, কেবল গুটিকয়েক প্রোডাকশন হাউজের হাতে কাজ রয়েছে। বাকি মানে এই ইন্ডাস্ট্রিতে যারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতো কিংবা যারা ছোটো ছোটো প্রযোজক ছিলো, যারা সবকিছু দিয়ে কাজ করতো, তাদের অবস্থা এখন খুবই খারাপ। তাদেরকে এখন প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। এখন আস্তে আস্তে যে ঘটনাটা ঘটছে, ওখানে যারা বড়ো বড়ো অভিনয়শিল্পী আছে, অন্যভাবে বললে হিরো-শাহরুখ খান, আমির খান, সালমান খান, সাইফ আলী খান, অজয় দেবগন-প্রত্যেকেরই একটা করে প্রোডাকশন হাউজ রয়েছে। তার মানে অভিনয়শিল্পী বা নায়করা প্রযোজনার অংশ হয়ে গেলো। আর্টিস্ট ইটসেল্ফ অ্যা বিজনেসম্যান।
তারপর যেটা দেখা যাচ্ছে, এরা আবার একজন আরেকজনের সঙ্গে-যেমন, শাহরুখ খান বোধহয় জুহি চাওলার সঙ্গে মিলে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে। এভাবে একটা প্রোডাকশন হাউজ আরেকটার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, ফলে আস্তে আস্তে বাজার ছোটো হয়ে আসছে। এতে কাজের সংখ্যা কমে গেছে মারাত্মকভাবে; তাই এখন বহু লোকই সেই অর্থে বেকার। তারপরও অনেকে আসলে এক ধরনের নেশার মধ্যে আছে, যেহেতু তারা কাজটা করেছে, শিখেছে; অন্য কোনো কাজ করেনি; ফলে এখান থেকে তারা অন্য কোথাও যেতেও পারছে না।
তবে এটাও ঠিক ভারতে বর্তমানে চলচ্চিত্র, ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনাও করছে তরুণ ছেলে-মেয়েরা। এখন ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট পুনে, কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইন্সটিটিউটের বাইরেও অনেকগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হয়েছে। এর অন্যতম মুম্বাইয়ে সুভাষ ঘাইয়ের ‘ইউসলিঙ উড ফিল্ম স্কুল’। এটা মুম্বাই ফিল্ম সিটির মধ্যেই অবস্থিত। এখন প্রশ্ন এই শিক্ষার্থীরা যাবে কোথায়? তবে আরেকটা ঘটনাও ঘটছে, অনেকে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করার পর করপোরেট হাউজে কাজ করছে। কেউ আবার অন্য কোনো ব্যবসায় জড়িত হচ্ছে। এছাড়া এই ছেলে-মেয়েগুলোর যাওয়ার তো কোনো জায়গা নেই। আমার এতো বছরের অভিজ্ঞতা থেকে এটা বলতে পারি, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা আর মাঠে হাতেকলমে কাজ পুরোপুরি আলাদা। পুনের ফিল্ম ইন্সটিটিউট বা সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইন্সটিটিউট-যেখান থেকেই হোক, পড়াশোনা করে কেউ যখন আসছে-তখন সে নিজেকে এ ব্যাপারে শিক্ষিত মনে করছে। সে ভাবছে, আমি তো চলচ্চিত্র সম্পর্কে অনেক কিছু জানি; কিন্তু সে যখন মাঠে কাজ করতে যায়, দুটো জিনিস মেলে না। তাকে তখন কারো সহকারী হিসেবেই কাজ করতে হচ্ছে, সেখানে মেলানোটাও তার জন্য কঠিন হয়ে যায়। অনেকে এই অবস্থায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে; মনে করছে, এই জায়গাটা তার নয়। আমি মনে করি, আমাদের এখানে মানে ভারতেও এখনো সেই অর্থে পেশাদারিত্ব নেই চলচ্চিত্র নির্মাণে। হলিউডে হয়তো কিছুটা আছে। তারাও যথেষ্ট শিক্ষিত।
চলচ্চিত্রে কাজ করা মানে এটা মনে করার কারণ নেই যে, সবাই পরিচালক হবে কিংবা চিত্রগ্রাহক হয়ে যাবে। এগুলো ছাড়াও চলচ্চিত্রে প্রচুর মানুষের অংশগ্রহণ দরকার পড়ে, সেখানে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ আছে। কিন্তু চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ালেখা করা বেশিরভাগই ভাবে, সে পরিচালক হবে। ফলে যখন কেউ সেই সুযোগ পায় না, তখন হতাশ হয়ে পড়ে, কেউ কেউ চলচ্চিত্র বাদ দিয়ে অন্য কিছু শুরু করে। তবে এখন অনেকে বিজ্ঞাপনে কাজ করছে। বিজ্ঞাপন বা বিজ্ঞাপন নির্মাণ কিন্তু আর্ট বা অন্য কিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও পুরোপুরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত। বাজারে বেচাকেনা থাকলে বিজ্ঞাপনও থাকবে। ফলে বিজ্ঞাপনের কিছু কাজ সবসময় থাকছেই। তবে সেটারও একটা সীমা আছে; কতোজনইবা সেই কাজ করছে।
এখন যেহেতু প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়েছে-ফলে অনেক কিছুই ডিজিটালাইজ-নতুন নতুন ভাবনার জায়গাও তৈরি হয়েছে। এখন নতুনরা যদি এই সমস্ত বিষয় নিয়ে না ভাবে, তাহলে তো টিকে থাকা সম্ভব হবে না। আর এটা যদি হতেই থাকে, তাহলে শিক্ষার পদ্ধতি পাল্টাতে হবে। আগে তো অ্যানালগ ক্যামেরা মানে ৩৫ মিলিমিটার ও ১৬ মিলিমিটারে শুট করা হতো, আগে ছিলো ফিল্ম ক্যামেরা। এখন তো ফিল্ম ক্যামেরা পুরোপুরি বন্ধই হয়ে গেছে। ফিল্মে এখন আর কেউই চলচ্চিত্র বানাচ্ছে না। এটার সঙ্গে অবশ্য খরচেরও একটা সম্পর্ক আছে, ফিল্মে বানালে একটা কপি প্রিন্ট করতেই লাখ টাকা খরচ হয়। এর বিপরীতে ডিজিটালে করলে সার্ভারে কিংবা একটা পোর্টেবল হার্ডডিস্কে নিলেই হয়। সেই জায়গা থেকে যারা চলচ্চিত্র বানাচ্ছে, তারা ভাবনাটাকেই পরিবর্তন করে ফেলেছে। এখন দেখছি, অনেকেই চলচ্চিত্র বানাচ্ছে পাঁচ মিনিট, দুই মিনিট, চার মিনিট করে। কিন্তু আমি ঠিক জানি না, এগুলো আদৌ চলচ্চিত্র নাকি চলচ্চিত্র নয়। যেহেতু প্রযুক্তি এসেছে, কেউ মোবাইলফোন সেট দিয়ে বানাচ্ছে, কেউ হ্যান্ডিক্যাম দিয়ে বানাচ্ছে। এটাও ঠিক যে, কেউ যদি প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে ডেভেলপড করতে না পারে, তাহলে তো তাকে পিছিয়ে পড়তে হবে।
ফলে ইন্টারনেটে যে খোলা একটা জায়গা তৈরি হয়েছে, সেখানে কেউ নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে নিজেই প্রচার করছে। এতে কারো ওপর কোনো নির্ভরশীলতা অন্তত তৈরি হচ্ছে না। আগে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হতো, অথচ পরিবেশকের অভাবে সেই চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়া যেতো না। এ ধরনের চলচ্চিত্র অনেক আছে। এখন অন্তত যারা চলচ্চিত্র বানাচ্ছে, তারা এতোটুকু জানে, এটা পরিবেশকের অভাবে পড়ে থাকবে না। এখন একটা জায়গা আছে, যেখানে নির্মাতা নিজেই প্রযোজক ও পরিবেশক।
একটা জিনিস মাথায় রাখা জরুরি, আমাদেরকে কিন্তু সময়ের সঙ্গে চলতেই হবে। সময় যেদিকে আমাদের নিয়ে যাবে, সেভাবেই যেতে হবে। এখন যেহেতু সবকিছুই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে, প্রেক্ষাগৃহগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চলচ্চিত্র দেখানোর জায়গা থাকছে না, তখন তো আমাদের সামনে আর কোনো রাস্তা নেই। এই পরিস্থিতিতে তো ইউটিউবেই যেতে হবে। ঠিক জানি না, ভবিষ্যৎ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, কিংবা পরের প্রজন্ম নতুন করে ভাববে কি না আমাদের সেই সেলুলয়েডই ভালো ছিলো। কিংবা আগের মতো অ্যানালগেই প্রজেকশন হওয়া উচিত। যদি এ রকম হয়, তাহলে তখন না হয় নতুন করে একটা জায়গা তৈরি হবে।
সিনেমাওয়ালাতে আমি দেখেছি, একজন প্রেক্ষাগৃহ মালিক কোনোভাবেই সেলুলয়েডের বাইরে ফিল্ম প্রজেকশন মেনে নিতে পারছেন না। আর এই মেনে নিতে না পারার পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত একজন কর্মচারীকে আত্মহত্যা করতে দেখা যায়। তার মানে তাহলে কি আমরা বলবো, চলচ্চিত্র আত্মহত্যা করছে? আত্মহত্যা করা নিশ্চয় কোনো সমাধান নয়। যতোদিন পৃথিবীর গতি আছে, ততোদিন সবকিছুরই একটা গতি থাকবে।
দেখুন, আগের সেই সেলুলয়েড এবং বর্তমানের ডিজিটাল নিয়ে যে চিন্তাভাবনা হচ্ছে না, এমন নয়। তার মানে আমরা যে ডিজিটালের কথা বলছি, এটা একটা ভার্চুয়াল জিনিস, এখানে আমাদের হাতে কিন্তু কিছুই নেই। একটা পেনড্রাইভ, একটা হার্ডডিস্ক, একটা কম্পিউটার-ঠিক এই ধরনের একটা জায়গায় আমাদের চলচ্চিত্রটা রয়েছে। এর বাইরে আমাদের তো কোনো কিছু নেই। একটা পেনড্রাইভ একবার কম্পিউটারে ঢুকিয়ে বের করার পর আবার ঢোকালে সেটা চলতেও পারে, নাও চলতে পারে। ওই চলচ্চিত্রটা পেনড্রাইভের মধ্যে আছে কি নেই, সেটা কিন্তু আমরা জানি না। আমরা ধরে নিচ্ছি, ওখানে চলচ্চিত্রটা আছে এবং অনেক সময় আমরা সেটা পেয়েও যাই। কিন্তু এ ঘটনা তো অনেক সময়ই ঘটে যে, সেটা আর খুলছেই না। তাহলে থাকলো কী, আমাদের কাছে কিন্তু কিছুই থাকছে না। একটা সিডির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। হার্ডড্রাইভও যেকোনো সময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাহলে একটা চলচ্চিত্রকে কোথায় কোথায় রাখা যেতে পারে, এখানে কোনো কিছুই ভিজিবল নয়, ছুঁয়ে দেখতেও পারছি না সেটাকে। তো এই জায়গা থেকে একটা ভাবনাচিন্তা নতুন করে শুরু হয়েছে।
এখন মানুষও একটা যান্ত্রিক সিস্টেমের মধ্যে পড়ে গেছে। আমি প্রথমে একজন শিল্পী তারপর শিল্পনির্দেশক। এখন ছবি আঁকার ক্ষেত্রে যেটা হচ্ছে-ছবি তো আসলে একটা জায়গা মানে কাগজ বা কাপড় বা দেয়াল বা কাঠ কোনো কিছুর উপর আঁকতে হয়। এখন অনেকেই দেখছি, কম্পিউটারেও ছবি আঁকছে। কম্পিউটারে তারা কোথায় আঁকছে ছবিটা! এরপর তারা একটা প্রিন্ট আউট নিচ্ছে, সেই প্রিন্ট আউটের কিন্তু কোনো গ্যারান্টিও নেই, সেটা ঠিক কতোদিন থাকবে। কোনো কিছুকে ডিজিটালি করা এবং হাতে আঁকা এই দুটোর মধ্যে যে পার্থক্য, সেটা তো দেখলেই বোঝা যায়। ডিজিটালের মধ্যে কোনো প্রাণ থাকে না।
এভাবে অনেক দিন থেকে অনেকে ছবি আঁকার চেষ্টা করেছে, সেগুলোর কোনোটাই খুব বেশি সফলতার জায়গায় যেতে পারেনি। এমনকি মকবুল ফিদা হুসেন-ভারতের এতো বড়ো একজন শিল্পী-তিনিও কিছুদিন ডিজিটাল ছবি এঁকেছিলেন, প্রদর্শনীও করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই জায়গায় আর থাকেননি। তিনি আবার আগের জায়গাতেই ফিরে এসেছেন। আমার মনে হয়, এর কোনো বিকল্প নেই। যেকোনো সৃষ্টিশীল জিনিসের ক্ষেত্রেই এটা ঠিক। টেকনোলজি টেকনোলজির জায়গায় থাকবে, কোনো কিছু উন্নয়নে সেটার ব্যবহার অবশ্যই ঠিক আছে। সৃষ্টিশীল কাজটা আমার মনে হয়, স্বাভাবিক নিয়মেই করা দরকার, যেভাবে আগে হতো। ডিজিটাল যেভাবে আমাদের গ্রাস করছে, তাতে এর নানা প্রভাব আছে। এই ধরেন, এতে সবসময় মনে হতে থাকে, কতো বেশি কাজ করতে পারি, কতো বেশি প্রোডাকশন করতে পারি। এই চমকের জায়গায় তো অনেকে প্রভাবিত হয়, তাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই সৃষ্টিশীল কাজগুলো।
যখন আমি কম্পিউটারে পেইন্টিংটা করি, সেটা থাকে কেবল ইন্টারনেটে আর কম্পিউটারের স্ক্রিনে। এর বাইরে তো আমি এটাকে ছুঁয়ে দেখতে পারি না। একটা বই যেমন, হাতে নিলে তার একটা গন্ধও আছে, সেটাও অনেক বেশি আমাকে আকর্ষণ করে। বিপরীতে আমি যখন কম্পিউটার বা মোবাইলফোন সেটের স্ক্রিনে বই পড়ি, তখন আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় না ওটার সঙ্গে কোনো আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে বইয়ের তো কোনো বিকল্প নেই। আমার নিজের মতো করে বইটাকে দেখলাম, রাখলাম, পড়লাম-বই তো বই-ই।
তবে টেকনোলজির জায়গাতেও হয়তো সময়ের পরিক্রমায় নিরাপদ কোনো জায়গা তৈরি হবে। হয়তো এমন কিছু একটা ফর্ম পাবো, যেটাকে ছুঁয়ে দেখা যাবে। আমি অন্তত সেটা এখনো আশা করি।
এই ইন্ডাস্ট্রিতে আমি ২৫ বছর ধরে কাজ করছি। আগেই বলেছি, এখন কাজ অনেক কমে গেছে। এতোদিন অন্যের চলচ্চিত্রে শিল্পনির্দেশনার কাজ করতাম, এখন নিজেই কাজকর্ম করার চেষ্টা করছি। এখন কাজ করছি বেশ কয়েকটি বায়োপিক ডকুমেন্টারি ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে। প্রথম বায়োপিক করেছি লেখক আদিত্য সেনের ওপর। উনি নয়া দিল্লিতে থাকেন। আদিত্যের আরেকটা পরিচয় আছে, উনার দাদা চাণক্য সেন। এই আদিত্য সেনের ওপরে আমি ৪০ মিনিটের একটা ডকুমেন্টারি বানিয়েছি।
আরেকটা ডকুমেন্টারির কাজ করছি, আমার যেখানে বাড়ি দূর্গাপুরে, সেখানে একটা স্টিল সিটি আছে; এই স্টিল সিটির ভাবনা ছিলো, একসময়ের মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধান চন্দ্র রায়ের। কিন্তু যাদের জায়গায় ও বিশেষ সহযোগিতায় দূর্গাপুর স্টিল সিটি গড়ে ওঠে, তার নাম হলো আনন্দ গোপাল মুখোপাধ্যায়। আনন্দ গোপালের জীবনের ওপরে একটা কাজ আমি শুরু করেছি। আরো বেশ কয়েকটা কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে।
এছাড়া ছোটোগল্প নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র করেছি, সেগুলো এখনো মুক্তি দেওয়া হয়নি। ২৫ বছরে মুম্বাইয়ের সব বড়ো বড়ো নির্মাতা মণিরত্নম, মহেশ ভাট, কেতন মেহতা, সুজিত সরকার, অনুরাগ বাসু এদের সঙ্গে কাজ করেছি। এখন নিজের জন্য কিছু করবো।
লেখক : সাদেক আলী, চলচ্চিত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা শিল্পনির্দেশনায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। রবীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি ও সমীর চন্দ-এর মতো বিখ্যাত শিল্পনির্দেশকের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন বলিউড ও টালিগঞ্জে। চারশোর বেশি বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করা সাদেক-এর উল্লেখযোগ্য হিন্দি কাহিনিচিত্র প্যারানইয়া, শাট আপ লিসেন, কুচ লাভ জ্যায়সা, বাই চান্স, ফয়সালা, কুচ রোকে হুয়ে পাল। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল চারটা ২০ মিনিটে সাদেক আলীর সঙ্গে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পক্ষ থেকে কথা হয় একুশে গ্রন্থমেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। সেখান থেকেই এই প্রবন্ধটি তৈরি করা হয়েছে।
sadekart@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন