Magic Lanthon

               

কৌশিক আহমেদ

প্রকাশিত ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ডুব-এর আবহসঙ্গীত

ছকে বাঁধা পথ থেকে বেরিয়ে

কৌশিক আহমেদ


প্রাসঙ্গিক কথন


চলচ্চিত্রের অবয়বে সঙ্গীত আলঙ্কারিকভাবে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সঙ্গীতবিহীন চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রের রসাস্বাদনে শুন্যতায় এক বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ। নির্বাক চলচ্চিত্রে যন্ত্রের কট কট ঘট ঘট শব্দ তাগাদা দেয় সঙ্গীতের। যার মাধ্যমে বিরক্তিকর বিকট শব্দ ঢেকে রাখার তাগিদে নির্বাক চলচ্চিত্রে প্রথম সঙ্গীতের ব্যবহার শুরু হয়। তবে সেই সময় পর্দার আড়াল থেকে সরাসরি যন্ত্র বাজিয়ে সঙ্গীতের ব্যবহার করা হতো। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় চলচ্চিত্রে পরিবর্তন এসেছে। দর্শক পেয়েছে সবাক চলচ্চিত্র। নির্বাক, সবাক যাই বলি, দুই ধারার চলচ্চিত্রেই পরিবর্তন প্রবর্তনের ধারায় সঙ্গীত একটি অনন্য স্থানে অধিষ্ঠিত। অভিনয়শিল্পীদের অভিনয়ের মাধ্যমেই কেবল চলচ্চিত্রের স্বার্থকতা নয় বরং এর সঙ্গে শব্দ, আলো, নৃত্যের গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্যময়তা একটি চলচ্চিত্রকে স্বার্থক করে তোলে। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ডুব-এ সঙ্গীতের ব্যবহার এক্ষেত্রে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। যদিও চলচ্চিত্রটি নানা কারণে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তারপরেও এর শব্দ, ছন্দ, গান তথা সামগ্রিক অর্থে সাঙ্গীতিক আবহ চলচ্চিত্রে এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছে। প্রাকৃতিকভাবে বাস্তবিক জীবনে যে আবহ ব্যক্তিমানুষ অনুভব করে, তারই প্রতিফলন ঘটেছে ডুব-এর সঙ্গীতে।


চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের ব্যবহার


নির্বাক চলচ্চিত্র যখন দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাতে বসেছিলো, ঠিক তখনই সঙ্গীতের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করা যায়। ফল হিসেবে চলচ্চিত্রে যোগ হয় শব্দ ও আবহসঙ্গীত। প্রকৃতির বৈচিত্র্যে নানা সুর বৈভবে চারপাশ সমৃদ্ধ। তাই মানুষের নিত্যদিনের কাজের মধ্যে বিচিত্র বাস্তব মুহূর্তগুলোর সঙ্গে সঙ্গীতের এক অকৃত্রিম বন্ধন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। হাটের মানুষ, ঘাটের মানুষ তথা সামগ্রিক জীবনাচরণে মানুষের সঙ্গে গানের বাণী, সুর প্রতিনিয়ত উসকে দেয় তার মানবিক অভিব্যক্তিগুলোকে।


তাই চলচ্চিত্রেও কোনো না কোনোভাবে সুর চলে আসে, সেই সুর লোকমুখে হরহামেশা গীতও হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে গান ছাড়া কোনো চলচ্চিত্র যেমন ভাবাই যায় না। আর ঢাকাই চলচ্চিত্র গান ছাড়া কল্পনা করা তো অসম্ভব প্রায়। এর কারণও অবশ্য আছে।


বাঙালি জীবনের সঙ্গে পাকে পাকে জড়িয়ে আছে গান। বারো মাসের অসংখ্য পালাপার্বণের সঙ্গে রয়েছে গীতধর্মী আসর। জীবনে তো বটেই, মৃত্যুতেও থাকে সংকীর্তন গানের আয়োজন। ভিখিরিও গান গেয়ে ভিক্ষে চায়, পেশার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে গান। নৌকোর বৈঠা চালানো থেকে ছাদ পেটানো পর্যন্ত বহু শ্রমসাধ্য কাজের অনুষঙ্গ হিসেবেও গান আসে। গানবিহীন বাঙালি-জীবন কল্পনা করাও কষ্টসাধ্য। নাটকেও, তাই দর্শকের আবেগকে কাজে লাগাতে গানের ব্যবহার ছিল পর্যাপ্ত। সিনেমার মতো ‘আশ্চর্য’ শিল্প-মাধ্যমের ক্ষেত্রে অতএব ব্যতিক্রম হওয়া সম্ভব ছিল না। তাই জন্মলগ্ন থেকেই সিনেমার সঙ্গে গানের গাঁটছড়া বাঁধা হয়ে গেছে।


এই বিচিত্রধর্মী বাস্তব-জীবনের প্রতিচ্ছবিই তো চলচ্চিত্র। সুতরাং চলচ্চিত্রের একেকটা দৃশ্যে একেক রকম সঙ্গীত ব্যবহারের তাগাদা এসে পড়ে। চলচ্চিত্রের অবয়বে গান তাই লেপ্টে থাকে অকৃত্রিম আঙ্গিকতায়। কমলকুমার মজুমদারের ভাষায়,


আমাদের দেশের ছবিতে যে গান থাকবে এ আর এমন আশ্চর্য কি। আমাদের দেশের ছবিতেই তো গান থাকবে। পৃথিবীর অন্য কোন দেশের ছবিতেই [আমাদের দেশের] মতো গান নেই। তারা গানের জন্য, বিশেষ করে গানের জন্যই, আলাদা করে ছবি তোলে, তার নাম দেয় ‘গীতিচিত্র’। তারা গান বলতে বোঝে যতো চটুল আনন্দের রূপকে। আমাদের গানে আনন্দের চটুলতাও আছে, গভীরতাও আছে। আবার বেদনার অতলস্পর্শী স্তব্ধতাও আছে সুরে। তখন অবাক হয়ে কথা হারায়। তাই আমরা যেখানে সেখানে যখন তখন কথার আগে গান খুঁজে পাই, কিছু বা বলি কিছু বা শুনি গানে। আমাদের ছবির এটা নিজস্ব রূপ, একমাত্র রূপ বলতে পারি, যাকে কেন্দ্র করে আমরা ডুবে থাকতে পারি। হোকনা হাসির ছবি, হোক সুখের কি দুঃখের, গান আছে কিনা জানতে চাই সবার আগে আমরা। পরিচালনার অভাব হলে ক্ষমা করি, ফটোগ্রাফি আশ্চর্য না হলেও বসে থাকি; তারপরেও একটা গানও যদি ভালো না হয়, সহ্য হয় না আমাদের। এ স্বকীয় রূপটাই আসলে আমাদের ছবির প্রাণ।


দর্শকের প্রয়োজনে চলচ্চিত্র আর চলচ্চিত্রের মূল্যায়নে দর্শক। আর এই বিচারে সঙ্গীত এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সঙ্গীতবিহীন চলচ্চিত্র দর্শকের কাছে তাই অগ্রহণযোগ্য, অসহ্য ও অসহনীয় ক্ষোভের বিষয়।


সাঁইত্রিশ সালে তৈরী ওয়াদিয়ার ‘নওজওয়ান’ ছবিটিতে কোনো গান, না থাকায়, দর্শকরা এত ক্ষুদ্ধ হয়েছিলেন যে, ছবির আগে পর্দায় ব্যাখ্যা করে দিতে হয়েছিল, কেন ছবিতে গান রাখা যায়নি। নীরেন লাহিড়ির ‘ভাবীকাল’ ছবিটিতেও কোনো গান ছিল না।


অতীতের ছবিতে এত গানের আয়োজন রাখতে, প্রতি পদেই কমপ্রোমাইজ করতে হতো নির্মাতাদের। সেদিনের শব্দধারণ ব্যবস্থায় ছিল রীতিমতো দৈন্য, স্টুডিও দুর্লভ-ফলে পার্কে, ঘোড়ার আস্তাবলেও গান রেকর্ডিং করতে হয়েছে। উপরন্তু অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরই গাইতে হত ঐ সব গান। একই সঙ্গে সু-গায়ক এবং সু-অভিনেতা পাওয়া সহজ নয়, ফলে গানকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অভিনয়ের ক্ষেত্রে দুর্বলতা মেনে নিতে হয়েছে। ছবির চরিত্রের সঙ্গে অভিনেতার বয়স বা চেহারা মানানসই না হলেও গায়ন-সামর্থ্য সম্পন্ন হলেই তাকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করানো হয়েছে। ছবিতে কোনো চরিত্রের কণ্ঠে গান প্রয়োগের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, সেই অভিনেতা গান না জানার ফলে, অন্য গান-জানা অভিনেতাকে দিয়ে গান গাইয়ে চাহিদা মেটাতে হয়েছে। অর্থাৎ যাবতীয় অসংগতি সত্ত্বেও গানের প্রয়োগ অব্যাহত থেকেছে।


তাই গান লেখার পূর্বশর্ত কল্পনায় অনেক বড়ো চিত্রকল্প, গল্প, কাহিনি ধারণ করে, সুরের আদলে কথা বসিয়ে যতো ছোটো করা যায় কিংবা দীর্ঘ কল্পনার সার-সংক্ষেপ কথায় সুর বসানো হয়। দীর্ঘ গল্পের সার-সংক্ষেপই গানের চরিত্র। সুতরাং একটি চলচ্চিত্রে বছরের পর বছরের দীর্ঘ কাহিনিকে দুই ঘণ্টা কিংবা আড়াই ঘণ্টার ফ্রেমে চিত্রায়িত করতে গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুতরাং শুধু ব্যবসাসফল কিংবা ভালোলাগার জন্যেই নয়, চলচ্চিত্রের পুরো অবয়ব প্রস্তুতকরণেও অন্যতম প্রধান ভূমিকা রাখার দাবিদার সঙ্গীত।


চলচ্চিত্রে আবহসঙ্গীত


সামগ্রিক শিল্পের সমন্বিত প্রকাশ চলচ্চিত্রশিল্প। চলচ্চিত্র এককভাবে নিজস্ব সত্ত্বার প্রকাশ ঘটাতে পারে না। তাই এই সামগ্রিক শিল্প মাধ্যমে আবহসঙ্গীত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাক চলচ্চিত্রের সময়েও পদ্মার আড়াল থেকে বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার করা হতো।


বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় শতকের [দশকের] মাঝামাঝি চলচ্চিত্র শিল্প একটি সমস্যার সম্মুখীন হল। দেখা গেল, নির্বাক ছবি দেখে-দেখে দর্শকরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। নিছক স্বার্থরক্ষার খাতিরে দর্শকদের চলচ্চিত্রাভিমুখী করার উদ্দেশ্যে প্রভূত সাহসের সঙ্গে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ১৯২৭ সালে ‘দ জ্যাজ সিঙ্গার’ নামে একটি ছবি বাজারে ছাড়লেন। সেই ছবিতে দর্শকরা অ্যাল জনসন নামক তৎকালীন একজন বিখ্যাত গায়ককেই যে কেবল দেখতে পেল তা নয়, শুনতে পেল তাঁর কণ্ঠস্বরও। চলচ্চিত্র শিল্পে ফিরে এলো নতুন জীবন। স্বল্প কালের মধ্যেই শুরু হল সম্পূর্ণ সবাক ফিলম তৈরির কাজ। ছবিতে বাস্তবতা সৃষ্টি সুযোগও যেমন বাড়ল, তেমনি তার সঙ্গে তাল রেখে মাধ্যমটির কল্পনাসমৃদ্ধ ব্যবহারের প্রয়াসও বেড়ে গেল।


চলচ্চিত্রে কল্পনাসমৃদ্ধ সিকোয়েন্সগুলোকে বাস্তব করে তোলার প্রয়াসে ধীরে ধীরে প্রযুক্তিগতভাবে আবহসঙ্গীত প্রয়োগের ধারা সূচিত হলো এবং তা প্রযুক্ত হলো চলচ্চিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। বলা হয়, চলচ্চিত্র যেখানে ক্যামেরার ভাষা-সংলাপ-অভিনয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ-অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে না, সঙ্গীত সেখানেই তার অন্তর্নিহিত ভাব প্রকাশে এগিয়ে আসে।


চলচ্চিত্রে গানের সঙ্গে ছোটো ছোটো টুকরো মিউজিক কিংবা টুকরো টুকরো শব্দ (sound) ব্যবহৃত হয়। সিকোয়েন্স অনুযায়ী যেগুলো প্রয়োজন অনুভব করে। সিকোয়েন্স-এর পূর্ণতা দানে ব্যবহৃত এই টুকরো মিউজিক পিচ ও শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


আমাদের চলচ্চিত্রে তিন ধরনের সংগীত রয়েছে আবহসংগীত, নেপথ্য সংগীত এবং কণ্ঠ সংগীত। আবহ সংগীত কে Theme song, Title sequenceইত্যাদিও বলা হয় পাশ্চাত্যে। মূলত সিনেমার শুরুতে এবং শেষে এই ধরনের গানের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যদিও গানের চেয়ে বাদ্যযন্ত্রই এই ধরনের সংগীতে বিশেষ জনপ্রিয়। সাধারণত ছবির নাম, পরিচালক, প্রযোজক, অভিনয়শিল্পী ও অন্যান্য কলাকুশলীদের নাম প্রকাশ করা হয় এই অংশে। পরবর্তী পর্যায়ে ছবির বিভিন্ন সিকোয়েন্স অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের মিউজিক ব্যবহার করা হয় যা ডায়ালগ, দৃশ্যায়নের নেপথ্যে ভেসে ওঠে। তাই এই ধরনের মিউজিককে Background Musicবা Sequence Musicও বলা হয়। Background Musicহলো ছবির প্রাণ। ছবির বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন Background Musicব্যবহারের ফলে সংশ্লিষ্ট দৃশ্যের আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। যেমন: নায়ক-নায়িকার রোমান্টিক কথোপকথনের নেপথ্যে ভেসে আসা রোমান্টিক কোন সূর [সুর] উক্ত দৃশ্যটিকে হৃদয়গ্রাহ্য করে তোলে। চলচ্চিত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কণ্ঠ সংগীতের ব্যবহার। একে প্লেব্যাক বলা হয়। প্লেব্যাক অর্থাৎ স্টুডিওতে রেকর্ড করা গান পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দৃশ্যে সংযোজিত হয় যেখানে ঐ গানে ঠোট মেলান অভিনয়শিল্পী। সিনেমা জনপ্রিয়তার মতই সমান জনপ্রিয় এই গানগুলোর কারণেই চলচ্চিত্র ব্যবসা সফল হয়।


তবে চলচ্চিত্রে আবহসঙ্গীতের ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং চিন্তাশীল বিষয়। সিকোয়েন্সের সঙ্গে সাদৃশ্যতা রেখে এ ধরনের টুকরো সঙ্গীত ব্যবহার করা হয়, যা দৃশ্যমান চিত্রকে প্রভাবিত করে। যার কারণে দর্শক-শ্রোতা আপ্লুত হয় এবং চলচ্চিত্রের দৃশ্যে মনোযোগী হতে পারে। এছাড়া চলচ্চিত্রে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে যে ধরনের শব্দ ব্যবহার হতে দেখা যায়, সেগুলো চলচ্চিত্রের কোনো দৃশ্যকে আকর্ষণীয় করে তোলে। চলচ্চিত্রের সিকোয়েন্সের সঙ্গে দর্শকের একাত্ম হওয়ার নিমিত্তে আবহসঙ্গীত অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। চলচ্চিত্রে শব্দ আবিষ্কারের প্রয়াস থেকে আবহসঙ্গীতের ধারা সূচিত হয়। পরবর্তী সময়ে প্লেব্যাক সঙ্গীতের ব্যবহার শুরু হয়। যা দর্শকচিত্তকে প্রসন্ন করে। ঋত্বিক ঘটকের ভাষায়,


সংগীত এটি ছবিতে একটি বিপুল অস্ত্র, সময় সময় ব্রহ্মাস্ত্র। সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে আমরা অপর একটি স্তরে সমান্তরালভাবে ছবির বক্তব্য প্রকাশ করার চেষ্টা করি। নানা রকম আছে যেমন ধরুন সংগীতের পুরো দৃশ্যটিকে মনের মধ্যে গেথে নিয়ে তার প্রথম সুরটিকে বসানো হয়। ... শেষ পরিণতিতে সেই বিশিষ্ট সুরটিই বক্তব্যে দ্যোতক রূপে কীভাবে ব্যবহার করা হবে সেটা ভেবে সুর তৈরী করা। ... সংগীত অত্যন্ত সংকেতবহ। সেই সংকেত স্বাভাবিকভাবে চিত্র স্রষ্টার। কাজেই তা ব্যবহৃত হয় বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। তার পিছনে একটা সচেতন নক্সা থাকে।


তাই চলচ্চিত্রের সাঙ্গীতিক ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। যাকে বাদ দিলে সত্যি চলচ্চিত্রের পূর্ণতা আসে না। চলচ্চিত্রের আবহসঙ্গীত এর সংলাপকে যেমন প্রভাবিত করে, তেমনই দর্শকচিত্তেও আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়। এই ধারাবাহিকতায় আজ অব্দি চলচ্চিত্রে গান এবং আবহসঙ্গীত গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।


ডুব-এর সাঙ্গীতিক আবহ


ফারুকীর ডুব একটি পারিবারিক কাহিনির চিত্র। অকৃত্রিম ভালোবাসার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা জাভেদ ও মায়ার সংসার। তাদের অমোঘ ভালোবাসার বন্ধনে তৃতীয় ভালোবাসা অশনি ঝড়ো হাওয়া হয়ে আঘাত করে। জাভেদ-মায়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতায় দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে মেয়ে সাবেরি। মায়ার জীবন থেকে জাভেদের প্রস্থান, অতঃপর তৃতীয় ভালোবাসা নিতু স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয় জাভেদের জীবনসঙ্গী হিসেবে। কী এক নিরব বিচ্ছিন্নতায় নিথর হয়ে পড়ে মায়াসহ তাদের দুই সন্তান। অন্তর্দহনে হৃদয় পুড়ে যায়, অদৃশ্য বর্ষণে ডুবে যায় মায়ার বন্ধন। একপর্যায়ে হয় জাভেদের প্রয়াণ। এমন এক নাটকীয় কাহিনিতে সঙ্গীতের ব্যবহার ডুব-এর দৃশ্যগুলোকে মর্মস্পর্শী করে তুলেছে। গভীর চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে ডুব-এর সাঙ্গীতিক ব্যবহারে। গাস্তঁ রোবের্জ চলচ্চিত্রে ব্যক্তিমানুষের আবেগ ও সঙ্গীতের সঙ্গে এর সম্পর্ককে দেখেছেন এভাবে-


চলচ্চিত্র শিল্প শুধুমাত্র বাস্তব গতিই ধরতে চায় না, আরো অনেক অধরা বিচলনকেও ধরতে চায়-আবেগজাত, ইন্দ্রিয়বোধজাত, বুদ্ধিজাত এবং এমন কি ব্যক্তিগত, যেমন চলচ্চিত্রে যখন একজনের ব্যক্তিত্বের বিকাশ বা অবনমন দেখানোর সময়। সংগীত যেমন বাস্তব গতি প্রদর্শনে সাহায্য করে এ-সব ক্ষেত্রেও সংগীত তেমনই মানসিক বা অন্তর্লীন বিবর্তনের আভাস দেয় বা তাকে আরো তীব্র করে তোলে।


মূলত চলচ্চিত্রের আবহকে অনেক বেশি প্রভাবিত করে সঙ্গীত প্রয়োগের পরিমিতি, সুর, ছন্দ তথা সিকোয়েন্সগুলোর সঙ্গে আবহসঙ্গীতের সাদৃশ্যতা।


ক. প্রকৃতি আর যন্ত্র যেনো একাকার


ডুব-এ প্রাকৃতিক আবহ এবং তার অনুষঙ্গে সঙ্গীতের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো এক বাস্তব চিত্রকল্প। জাভেদ ও মায়ার পালিয়ে যাওয়ার তথ্যানুসন্ধানের সিকোয়েন্সে খাবার হোটেলে মুজিব পরদেশীর লোকসঙ্গীতের সুর; নিতু পালিয়ে জাভেদের সঙ্গে দেখা করার সময় সেতার ও ঠুমরি গানের মৃদু সুর এবং তার সঙ্গে ঝি ঝি পোকার ডাক এক অনবদ্য সাঙ্গীতিক আবহ সৃষ্টি করেছে; যা চলচ্চিত্রে বাস্তব প্রাকৃতিক আবহ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সাঙ্গীতিক আবহ যেনো প্রাকৃতিক আবহ সৃষ্টিতে অনবদ্য এক নান্দনিক প্রয়োগ।


খ. স্মৃতির অতলতায় সাঙ্গীতিক আবহ


কলেজের পুনর্মিলনীতে মিলনায়তনের দোতলায় সাবেরি বসে বসে কী যেনো ভাবছে। সেখানেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় নিতুর। নিতুর সঙ্গে এই সাক্ষাৎ যেনো সাবেরির মর্মস্পর্শী ভাবনায় স্মৃতির অতলতায় ডুবে যাওয়ার প্রকটতর প্রণোদনা। স্মৃতিচারণের প্রণোদনায় (দুই মিনিট ৫৭ সেকেন্ড) কি-বোর্ডের অনুষঙ্গে হৃৎকম্পনের ধিক ধিক কম্পনের মতো সাবেরির অন্তরের স্মৃতিকাতরতা প্রকম্পিত হতে থাকে এবং তা তিন মিনিট ১১ সেকেন্ডে এসে থেমে যায়। আবার তিন মিনিট ৩০ সেকেন্ডে শুরু হয়ে তা চার মিনিট ১৬ সেকেন্ডে একটা সাঁই শব্দের মাধ্যমে যেনো ডুব-এর অতলতায় ডুবিয়ে দেয়। শুরু হয় হারানো স্মৃতির অতলতায় ডুবে যাওয়া মানুষগুলোর হৃদয়বিদারক উপাখ্যান। হৃদকম্পনের ধিক ধিক ছন্দে আবহসঙ্গীতের যথার্থ প্রয়োগ পাঁচ মিনিট ১৫ সেকেন্ড পর্যন্ত চলতে থাকে। চলচ্চিত্রের নামকরণের সঙ্গে আবহসঙ্গীতের নোটেশন হৃদস্পন্দনের ছন্দবদ্ধতায় সাবেরির স্মৃতিকাতরতার প্রারম্ভিকতাকে অনেক বেশি প্রভাবিত করেছে। সাবেরির মানসিক অবস্থার খেয়ালে সঙ্গীতের ব্যবহার একাত্ম হয়েছে।


গ. ভাঙনের অশনি সঙ্কেত


বান্দরবান রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে সবুজের সমারোহে জাভেদ ও মায়ার কথোপকথন। স্মৃতির অভিব্যক্তিগুলো যেনো জাভেদের অন্তরে বুঁদ বুঁদ করতে থাকে। জাভেদ অবলীলায় ব্যক্ত করে স্মৃতিময় সেই জীবনের গল্প। মায়া প্রতিক্রিয়া দেখান-‘এখানে আসার পর তুমি বার বার অতীতের কথা বলছো কেনো? স্মৃতিতে ফিরে যাচ্ছো কেনো বার বার? তার মানে তুমি বুঝে গেছো বর্তমানে আমাদের আর কিছু নেই? সবকিছু শেষ হয়ে গেছে আমাদের?’


নির্বাক জাভেদের বুক হাহাকার করে ওঠে। বোবা কান্নায় গুমড়ে ওঠেন জাভেদ। তাৎক্ষণিক ১৮ মিনিট তিন সেকেন্ড থেকে ১৯ মিনিট ১৪ সেকেন্ড পর্যন্ত কি-বোর্ডের অনুষঙ্গে পিয়ানোর বিষাদী সুর দূর বহুদূরের ইঙ্গিত করে। সেই সুর যেনো দুইজনকে দুই ভাগে বিভাজিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এভাবে যন্ত্রসঙ্গীত চলতে চলতে ১৮ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে প্রতাপী ঝড়ের আভাস আসে। ঝড়ের তাণ্ডব যেনো জাভেদ-মায়ার জীবন ঝড়ের বাস্তবিক প্রকাশ। অদম্য অশনি ঝড় মায়া-জাভেদের বিভাজনের সূচনাকে প্রভাবিত করেছে; প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছে হৃদয়িক ঝড়ের বিচ্ছিন্নতাকে।


ঘ. অস্বস্তিময় শিকলি জীবনে সঙ্গীতের প্রণোদনা


বাবা-মার অকৃত্রিম স্নেহে লালিত সাবেরি। হঠাৎ তৃতীয় কোনো ভালোবাসা অশনি হয়ে এসে অতিষ্ঠ করে তোলে পরিবারের সবাইকে। বাবা-মার ভালোবাসার শিকলে বাঁধা পড়ে সাবেরি। কোন দিকে যাবে সে? অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে টানাপড়েনের দহনে জ্বলতে থাকে সে। ভয়াবহ এ অস্বস্তি যেনো তাকে চেপে ধরে। ভালোবাসার শিকলি জীবনে তাকে যেনো লেফ্ট-রাইট-লেফ্টের মতো সমান তালে চলতে হচ্ছে। অথচ অসহনীয় সেই জীবনের বেড়াজাল থেকে সে বেরিয়ে আসতে চায়। সাবেরির স্কুল পালানোর দৃশ্য তারই প্রকাশ। তারপর সাবেরির ওভারব্রিজের সিঁড়ি থেকে নিচে নামার সময় নূপুরের ন্যায় সাঙ্গীতিক ছন্দবদ্ধ শব্দ শিকলি জীবনেরই ইঙ্গিত করে। একই সময় নিজ বাসায় জাভেদও সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছেন বাধাহীনভাবে।


এই দৃশ্যে ২২ মিনিট ৫১ সেকেন্ড থেকে ২৪ মিনিট ৩৩ সেকেন্ড পর্যন্ত যে আবহসঙ্গীতের ব্যবহার হয়, তার শুরুটা মাত্র দুইটি সাঙ্গীতিক নোট-এর মাধ্যমে-মা সা মা- মা সা মা-বোধ হয় সামরিক বাহিনীর লেফ্ট-রাইট-লেফ্টেরই চলন বোঝানো হয়। সঙ্গে কি-বোর্ডের ইফেক্টের মাধ্যমে আর্তনাদি সুর উদাসীন করে তোলে সাবেরিকে। অমোঘ ভালোবাসায় বিভাজনের টানাপড়েন সামরিকতার মতো তাকে শিকলে বেঁধে ফেলেছে। উভয় সঙ্কটে বাঁধা শিকলি হৃদয়কে উসকে দিচ্ছে আবহসঙ্গীতের সুর। আর লেফ্ট-রাইটের রিদম যেনো তাকে ধাবিত করছে নিশ্চিত আশ্রয়ের দিকে-বাবা নয়তো মায়ের কাছে।


ঙ. চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বহমানতায়


জাভেদের একাকিত্বে নিতুর জোরালো সাক্ষাৎ। অন্ধকারের পাশ কাটিয়ে ভীতি-শঙ্কা মাড়িয়ে নিতু তার ভিত পোক্ত করার সুযোগ নেয়। একপর্যায়ে জাভেদ নিতুকে বলেন, ‘সিগারেট আছে?’ নিতুর উল্টো প্রশ্ন, ‘লাগবে? ইউ হ্যাভ টু শেয়ার, শেয়ার করতে হবে তাহলে।’ এই দৃশ্যে জাভেদ ও নিতুর সিগারেট ভাগাভাগি এক নান্দনিক রূপকতা। জাভেদ যেনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। সিগারেট ভাগাভাগি করার সঙ্গে সঙ্গে ৫০ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডে কি-বোর্ডের ইফেক্টে ঢেউয়ের মতো ভাসমান সুরের ধারার সঙ্গে হৃদস্পন্দনের অনুরণনে যুক্ত হয় জলতরঙ্গের টুপটাপ সাঙ্গীতিক ছন্দবদ্ধ শব্দ। ছন্দবদ্ধ এ সাঙ্গীতিক শব্দ যেনো মায়ার জীবন থেকে জাভেদের ঢেউয়ের মতো ভেসে চলা নতুন কূলের কিনারায়। সুরের স্থির মিড়ের প্রয়োগ তরঙ্গায়িত করেছে উপরের এই দৃশ্যটিকে। জাভেদ ও নিতুর সিগারেট ভাগাভাগির দৃশ্যে ধোঁয়ার সঙ্গেও সুরের সাদৃশ্যতা স্বচ্ছভাবে প্রকাশিত হয়। সুরের ধারায়, ধোঁয়া যেনো মিশে যায় ভাসমান জীবনের বহমানতায়।


চ. চূড়ান্ত ডুবে সুরের ব্যাকুলতা


অকৃত্রিম বন্ধনের ইমারতে গড়ে ওঠা মায়া-জাভেদের সংসারে অশনির আঘাতে সবার হৃদয় যেনো ওষ্টাগত। তিক্ততা আর বিপর্যস্ততায় ভালোবাসা যেনো ফুরিয়ে গেছে। ভালোবাসার লীলাভূমি মরুভূমির মাঠে চিত্রায়িত। জাভেদ বলে ওঠেন-‘ইট ইজ মাই ক্রাইম। আই সুড লিভ।’ চূড়ান্ত ডুবের আর্তনাদ যেনো তখনই ডুকরে ওঠে। মেয়ে সাবেরির নীরব বুকফাটা আর্তনাদ দুঃখের অতলস্পর্শী ব্যাকুলতা। এই দৃশ্যে কি-বোর্ডের ইফেক্টের মাধ্যমে এক ঘণ্টা ৪০ সেকেন্ড থেকে এক ঘণ্টা এক মিনিট ৩৭ সেকেন্ড পর্যন্ত ড্রামের হালকা বিট এবং কাঁশার যন্ত্র বিশেষে ‘এক। দুই। একদুই। তিন’ ছন্দে হৃদকম্পনের মতো রিদমের সঙ্গে পিয়ানোর হৃদয়স্পর্শী সুরের প্রণোদনা হয়। সাবেরির স্মৃতি রোমন্থন হাহাকারের এক অসহনীয় ব্যাকুলতার প্রকাশ। ঠিক এক ঘণ্টা এক মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে চিরকুট ব্যান্ডের সুমির কণ্ঠে আবহে ভেসে আসে,


                                    আহা পারতাম

                                    যদি পারতাম

                                    আঙ্গুলগুলো ছুঁয়ে থাকতাম।

                                    বিষাদের জাল টালমাটাল

                                    এ কোন দেয়াল

                                    এ কোন আড়াল।

                                    ছাঁই হয় গোধূলি কারে যে বলি

                                    এ কোন শ্রাবণ আজ বয়ে চলি।

                                    আহারে জীবন আহা জীবন

                                    জলে ভাসা পদ্ম যেমন/জীবন।


এই গানের মাধ্যমে যেনো সামগ্রিক পরিস্থিতির পূর্ণ প্রকাশ ঘটে। পাহাড়ি রাগের মিশ্রণে সুরের চতুর্মাত্রিক ছন্দে গানের বাণীগুলো যেনো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। অতীত যেনো স্মৃতি কাঁটা হয়ে জীবনকে বিষাক্তময় করে তুলেছে। স্মৃতির প্রত্যেকটি টুকরো জীবন ক্যানভাসে বিষাদময়তার রঙ লেপ্টে দিচ্ছে। অতীতের সমস্ত স্মৃতি যেনো ডুবে যাচ্ছে বিষাদের অতলতায়। অসম্ভব এক নান্দনিক সাঙ্গীতিক চিন্তার প্রকাশ ডুব-এর এ সঙ্গীতায়োজন।


ছ. ডুবে যাওয়া জীবনে উচ্ছ্বাসের সুর


নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জীবনের গতি চলে অদম্যতায়। কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে ব্যক্ত হয় জীবন উচ্ছ্বাসের অভিব্যক্তি। মা মায়ার জন্মদিনে আশুলিয়ায় সবুজের সমারোহে কাশফুলের স্নিগ্ধ শোভা আর মৃদু-মন্দ উচ্ছ্বাসিত হাওয়ায় মেয়ে সাবেরির আয়োজন। অতঃপর একটু পাশে গিয়ে মোবাইলফোন সেটে মায়ের সঙ্গে কথোপকথন। সাবেরি অনুতপ্ত, গত দুই-তিন মাসে মায়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাক্সিক্ষত আচরণগুলোর জন্য। সাবেরির অনুভূতির অভিব্যক্তিগুলো মায়ের প্রতি যথার্থ সম্মানের বাঙময় প্রকাশ-You are the most beautiful women in this world. We are proud of you Ma.


এমন উচ্ছ্বসিত ক্ষণে এক ঘণ্টা ৩২ মিনিট ১৭ সেকেন্ড থেকে এক ঘণ্টা ৩৩ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড পর্যন্ত চলতে থাকে ডুবে যাওয়া জীবনে উচ্ছ্বাসের সুর। পিয়ানোর সেই সুর, আনন্দ বিহ্বলতায় একাকার হয় সজীবতার পূর্ণতায়। প্রকৃতির সবুজের বৈচিত্র্য যেমনভাবে সজীবতার ইঙ্গিত করে, ঠিক তেমনই পিয়ানোর সুর প্রকাশ করে উচ্ছ্বসিত জীবনের অভিব্যক্তির নিপুণ ভাবনাগুলোকে। মা মেয়ের বুকে জড়াজড়ি, অকৃত্রিম ভালোবাসার কথোপকথন-I Love you, I Love you too Ma । উচ্ছ্বসিত এমন ক্ষণে সুরের প্রণোদনা যেনো আরো বেড়ে যায়। প্রকৃতির উদারতায় সুরের ইন্দ্রজালে উন্মুক্ত হয় জীবনের উচ্ছ্বাস। ডুব-এর এই দৃশ্যে আবহসঙ্গীতের এই ব্যবহার ভাবনাগুলোকে প্রকাশ করেছে সরল ও সাবলীলতায়।


সামগ্রিক ভাবনায় সঙ্গীত


ফারুকীর ডুব-এ সাঙ্গীতিক আবহ গভীর ভাবনার পূর্ণতায় নতুনত্বের বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গতানুগতিক সঙ্গীত ব্যবহারের খোলস থেকে বেরিয়ে ডুব নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। ডুব-এর দৃশ্যের পর দৃশ্যের সঙ্গে সংলাপ এবং দুইয়ের সমন্বয়ে সাঙ্গীতিক আবহ, পরিষ্কার বক্তব্য প্রকাশে সমর্থ হয়েছে। সুরেরও যে ভাষা আছে এবং সুরও যে সামগ্রিক অভিব্যক্তির সর্বজনীন প্রকাশ; ডুব-এ ব্যবহৃত সঙ্গীত তারই সাক্ষ্য বহন করে।


বিরল কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে ঐ সব আবহসংগীতও সিনেমায় শিল্প গুণান্বিত প্রয়োগ হয়ে উঠতে পারেনি। বরং ক্রমশ বাঁধা ছকের আবহসংগীত প্রয়োগটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুঃখ-আনন্দ-ভয়-সংঘাত-কৌতুক এমন কয়েকটি প্রধান অনুভূতিকে সোচ্চার ক’রে তোলার জন্য কিছু নির্দিষ্ট বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার প্রায় প্রথা হয়ে গেছে।


টাইট্ল মিউজিক মানে ছবির কোনো গানের সুর বাদ্যযন্ত্রে বাজানো, দুঃখের দৃশ্যে বেহালার ছড়ের টান, খুশি হলে পিয়ানোর চাবিতে দ্রুত আঙুলের চলন, বিরহে বাঁশির ফুঁ, মজার দৃশ্যে গুপীযন্ত্র বা বাঁয়ার ট্রিটমেন্ট আর মাঝে মাঝেই বাদ্যবৃন্দের প্রয়োগ; সকালের দৃশ্য হলেই, ‘ভৈরবী’র কিঞ্চিৎ সুরবিহার, বৃষ্টির সংকেত থাকলেই ‘মলহার’ বা মিলনের ইংগিতে ‘বসন্ত’ রাগের আভাস হয়ে উঠেছে সাধারণ ঘটনা। বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য, দৃশ্যের চাহিদা অনুযায়ী পরিমিত সুরবিহারের লজিক সেখানে গৌণ। দৃশ্যের উপলব্ধিকে তীক্ষè করে তোলার বদলে অনেক সময়ই এই সব আবহসংগীত হয়ে দাঁড়ায় কম্যুনিকেশনের পথে প্রতিবন্ধক। নিজেকে জাহির করবার, সোচ্চার হওয়ার এই প্রবণতাই, সংগীতকে সিনেম্যাটিক হবার পথে এগোতে দেয়নি। এক দিকে চিত্র পরিচালকের সংগীতবোধের অনটন বা ঔদাসীন্য, অন্য দিকে সংগীত পরিচালকের সিনেমার মাধ্যমটি সম্পর্কে যথার্থ ধারণার অনটন, ‘মেইনস্ট্রিম’ সিনেমার সংগীত উৎকর্ষের অভিমুখী হতে পারেনি।


ডুব-এর এক ঘণ্টা ১১ মিনিট তিন সেকেন্ড থেকে এক ঘণ্টা ১২ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের দৃশ্যে নিতুর মাছ কেনার জন্য দাম-দর করা, বাসার অন্যান্য কর্মচারীদের কথোপকথন, সবমিলিয়ে এক পারিবারিক সাধারণ পরিবেশে বাসার কোনো এক কক্ষ থেকে প্রখ্যাত ঠুমরি শিল্পী বেগম আখতারের রাগ পিলুর সুরে মৃদু মন্দ ভেসে আসা সুর-জোছনা করেছে আড়ি/ আসে না আমার বাড়ি/ গলি দিয়ে চলে যায়/ লুটিয়ে রুপলি শাড়ি-উচ্চমার্গীয় সাঙ্গীতিক রুচির পরিচয় বহন করে। যদিওবা নিতুর চরিত্র, অন্যান্য কথোপকথন সবমিলিয়ে এই দৃশ্যের সঙ্গে গানটির বাণী এবং সুরের ব্যাপ্তি বেমানান মনে হয়েছে। তারপরেও প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা জাভেদ হাসানের বাসা থেকে এমন উচ্চমার্গীয় ঠুমরি গানের সুর সাধারণভাবে পারিবারিক শুদ্ধ রুচির স্বাভাবিক সমন্বয়তা প্রকাশ করেছে।


এছাড়া চলচ্চিত্রজুড়ে আবহে ব্যবহৃত সাঙ্গীতিক যন্ত্রগুলোর ব্যবহার কখনো কখনো একঘেয়েমি মনে হলেও একটা অন্যরকম নতুনত্ব ছিলো। ব্যবহৃত সেই সঙ্গীতে ভাবনার রূপকতাও রয়েছে। সাঙ্গীতিক ভাষার প্রকাশ পরিব্যাপ্ত হয়েছে চলচ্চিত্রের পুরো অবয়বজুড়ে। কিন্তু জাভেদ যখন পরপারের নিশ্চিত যাত্রী; চিরদিনের মতো হারিয়ে যাচ্ছেন না ফেরার দেশে; এমন সময়ে সাবেরি বাবার কফিনে মাথা ঠুকে আর্তনাদ করছে। অসহ্য যন্ত্রণা তাকে তাড়িত করছে। সাবেরি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বলছে-‘বাবা, শুনতে পাচ্ছো বাবা? আমি  তোমার মেয়ে সাবেরি, শুনতে পাচ্ছো বাবা? তুমি একবার আমাকে বলছিলা না বাবা, তুমি একবার বাবা ডাক শুনতে চাও। এই যে আমি তোমাকে বাবা ডাকতেছি। বাবা, ও বাবা, আমি শুনতে পাইতেছি।’ এই সিকোয়েন্সে এক ঘণ্টা ৩৮ মিনিট ৪৩ সেকেন্ড থেকে পিয়ানোর টুপটাপ শব্দে সাবেরির হৃদয়ে বর্ষণের রূপকতা প্রকাশ করা হয়। এরপর ক্যামেরা চলে যায় কলেজের সেই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে। সে সময় অবধি পিয়ানোর টুপটাপ ছন্দবদ্ধ সুর বাজতেই থাকে। অর্থাৎ বাবার মৃত্যুর অসহনীয় শোকে তার হৃদয় তখনো পুড়ছে। এর পরেই এক ঘণ্টা ৩৯ মিনিট তিন সেকেন্ডে কি-বোর্ডের যন্ত্রানুষজ্ঞে শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয় গান-‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়!/ ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা সেকি ভোলা যায়/ আয় আর একটিবার আয়রে সখা প্রাণের মাঝে আয়/ মোরা সুখের দুঃখের কথা কব, প্রাণ জুড়াবে তায়।’ আর এর মধ্যে দিয়েই মূলত ডুব-এর পরিসমাপ্তি ঘটে।


চলচ্চিত্রের পরিসমাপ্তিতে আবহে রবীন্দ্রনাথের এই গানের ব্যবহার বেমানান লেগেছে। কারণ রবীন্দ্রনাথের এই গানে স্মৃতি রোমন্থনের যে রোমান্টিকতা, তার সঙ্গে চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভের কোনো সামঞ্জস্য নেই। এটা অনেকটা সারাঘর লেপে দরজায় কাঁদা রাখার মতো।


লেখক : কৌশিক আহমেদ, উচ্চাঙ্গসঙ্গীত (ধ্রুপদ) শিল্পী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।


Koushikrubel99@gmail.com

 

তথ্যসূত্র


১.চক্রবর্তী, অতনু (১৯৯৬ : ৩৬৮-৩৬৯); ‘বাংলা সিনেমায় সঙ্গীতের প্রয়োগ’; শতবর্ষে চলচ্চিত্র প্রথম খণ্ড : অনুভব ও অভিজ্ঞতা; সম্পাদনা : নির্মাল্য আচার্য্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লি., কলকাতা।

২. মজুমদার, কমল কুমার; ‘চলচ্চিত্রে গানের ব্যবহার’; ছায়াছন্দ; সম্পাদনা : [?]; প্রথম বর্ষ, ৩১ সংখ্যা, এপ্রিল ১৯৮৬, ঢাকা, পৃ. ৫।

৩. প্রাগুক্ত; চক্রবর্তী (১৯৯৬ : ৩৬৯)।

৪. রোবের্জ, গাঁস্ত (২০০৬ : ১৩২); ‘শব্দ ও সংগীত’; চলচ্চিত্রের টেকনিক ও টেকনোলজি; সম্পাদনা : ধীমান দাশগুপ্ত; বাণীশিল্প, কলকাতা।

৫. করিম, রুখসানা (কানন) (২০১৭ : ২৭-২৮); বিবর্তনের ধারায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গান ১৯৫৬-২০১৫; বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, ঢাকা।

৬. বাগচি, তপন (২০১০ : ২৬); চলচ্চিত্রের গানে ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান; বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, ঢাকা।

৭. প্রাগুক্ত; রোবের্জ (২০০৬ : ১৩৭)।

৮. প্রাগুক্ত; চক্রবর্তী (১৯৯৬ : ৩৭১)।  

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন