শাকিল আহাম্মেদ
প্রকাশিত ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
পুরানো সেই দিনের কথা : প্রসঙ্গ জামালপুরের প্রেক্ষাগৃহ
শাকিল আহাম্মেদ

শাহ্ জামালের জামালপুর
ইয়েমেন থেকে ভারতবর্ষে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক ধর্মগুরু হযরত শাহ্ জামাল (র.)। সেটা ছিলো মোঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকাল (১৫৪২-১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ)। প্রাচীন বঙ্গের গৌড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী এলাকায় শাহ্ জামাল আস্তানা গড়ে তোলেন। ধারণা করা হয়, গৌড়ের সেন বংশের রাজত্বকালেই (১১০০-১২০৩ খ্রিস্টাব্দ) এই অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছিলো। এ জনপদটি সুদীর্ঘ সময় ধরে ছিলো গৌড়ের অধীনেই। সুফি সাধক হযরত শাহ্ জামাল (র.)-এর আগমনের মধ্যে দিয়েই জনপদটি আরো বিকশিত ও বিস্তৃতি লাভ করে। তার নাম অনুসারেই আজকের জামালপুর জেলা।১
বর্তমানে জামালপুর বাংলাদেশের উত্তর-মধ্যাংশে ময়মনসিংহ বিভাগের একটি প্রশাসনিক জেলা। সীমান্তবর্তী এই জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে টাঙ্গাইল, পূর্বে ময়মনসিংহ, পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ অবস্থিত। ব্রহ্মপুত্রের কূল ঘেঁষে গড়ে ওঠা প্রাচীন এ অঞ্চলটি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। মূলত ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বৃহৎ প্রবাহ এবং এর কারণে অন্যান্য স্থানের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর প্রমাণ মেলে বিখ্যাত ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’য়। মহুয়া-মলুয়ার এ লোকগীতি জামালপুরের মানুষকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।
একসময় জলপথে আসাম, বিহার, রাজপুতনা’র সঙ্গে জামালপুরের নিবিড় সম্পর্ক ছিলো। ফলে এ জেলার লোক-সংস্কৃতিতে সেসব অঞ্চলেরও প্রভাব লক্ষণীয়।২ এসব মিলেই ধীরে ধীরে বিস্তৃত রূপ লাভ করে জামালপুরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। গড়ে ওঠে যাত্রাপালার দল, নাট্যগোষ্ঠী, রচিত হয় জারি, সারি, যুবো, ঘাটু প্রভৃতি গান। এই ধারাবাহিকতায় বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেশ ভাগের আগেই জামালপুরে গড়ে ওঠে প্রেক্ষাগৃহ। তখনকার দিনে ফুটবল, নৌকা বাইচ, যাত্রা, নাটক, ঘোড়দৌড় প্রভৃতিতে ডুবে থাকা মানুষ সেলুলয়েডের পর্দায় নিজেদের প্রতিরূপ দেখে বিস্মিত হয়; অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে গ্রহণ করে চলচ্চিত্র ও প্রেক্ষাগৃহকে। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে জামালপুরে প্রতিষ্ঠা হয় প্রথম প্রেক্ষাগৃহ ‘রতনদেবী টকিজ’। তারপর বিভিন্ন সময়ে গড়ে ওঠে ‘নিরালা’, ‘কথাকলি’, ‘সুরভি’ ও সর্বশেষ ‘মনোয়ার’। এই প্রবন্ধ জামালপুরের এসব প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে।
‘রতনদেবী টকিজ’ থেকে ‘ইন্তেজার’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ও ধ্বংসলীলার তাণ্ডবে যখন পুরো বিশ্ব আতঙ্কিত, তখন এই উপমহাদেশে চলছিলো ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলা ভাগের রাজনীতি। ঠিক এই রকম একটা সময়ে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ‘রতনদেবী টকিজ’-এর যাত্রা শুরু। আনন্দী লাল তৌদি নামে এক মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী জামালপুরে এই প্রেক্ষাগৃহটি প্রতিষ্ঠা করেন। রতনদেবী, সম্পর্কে আনন্দী লাল তৌদি’র ঠিক কে ছিলেন, তা জানা যায় না।
সেসময় আসাম, বিহার ও রাজপুতনা থেকে বাংলায় এসে যারা ব্যবসা করতো তাদের মাড়োয়ারি বলা হতো। মাড়োয়ারিরা সাধারণত গরুগাড়ি কিংবা নৌকাযোগে পাট, তুলা, লবণের ব্যবসা করতো। ব্যবসায়ী আনন্দী লাল তৌদি জামালপুরের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন লোক-বিনোদন মাধ্যম যেমন, যাত্রা, নাটকের প্রতি একধরনের ঝোঁক লক্ষ করেন। এই চিন্তা থেকেই তিনি সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। শহরের প্রাণকেন্দ্র তমালতলায় একটি খাল ভরাট করে তিনি গড়ে তোলেন প্রেক্ষাগৃহটি। যতোদূর জানা যায়, হিন্দি চলচ্চিত্র পতেঙ্গা প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে ‘রতনদেবী টকিজ’-এর পথচলা শুরু হয়।
১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে প্রেক্ষাগৃহটি কিনে নেন জামালপুরের তৎকালীন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী অংকের শঙ্কর দীক্ষিত। ঠিক কী কারণে আনন্দী লাল প্রেক্ষাগৃহটি বিক্রি করেছিলেন তা জানা যায় না। অংকের শঙ্কর প্রেক্ষাগৃহটি কেনার পর এর নাম পরিবর্তন করেন। নিজ মেয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নামকরণ করেন ‘লাকী টকিজ’। দেশভাগের পর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে লাকী টকিজ কিনে নেন আবদুল কাদের পাহ্লোয়ান। কাদের পাহ্লোয়ান ছিলেন জামালপুরের বড়ো কাপড়ের ব্যবসায়ী। একসময় এই অঞ্চলে তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী হিসেবে খ্যাত ছিলেন এবং তার পূর্ব পুরুষরা জমিদার ছিলো। কাদেরের চাচা মৌলবি মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার পাহ্লোয়ান অবিভক্ত বাংলার আইনসভার সদস্য ছিলেন।৩ সেই সঙ্গে তিনি শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে পূর্ব বাংলা ঋণ সালিশী বোর্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। পাহ্লোয়ানাবাদ স্টেট নামে জামালপুরে বিশাল অঞ্চলজুড়ে তাদের আধিপত্য ছিলো; এর মধ্যে ছিলো যমুনা নদীর একাংশও।
জমিদার প্রথা উঠে গেলে পাহ্লোয়ান পরিবারের সব জমি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে তারা বিশাল আর্থিক সঙ্কটে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে কাদের পাহ্লোয়ান চট্টগ্রামে পাড়ি জমান ব্যবসার উদ্দেশ্যে। কিছুদিন পর সেখানে ভালো কিছু করতে না পেরে আবার জামালপুরে ফিরে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। কাপড়ের ব্যবসার পাশাপাশি পরে তিনি প্রেক্ষাগৃহের ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেন। এই চিন্তা থেকেই ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি লাকী টকিজ কেনেন। কাদের এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘ইন্তেজার’। ইন্তেজার কোনো ব্যক্তির নাম ছিলো না। জানা যায়, প্রেক্ষাগৃহটি কেনার পর কাদের পাহ্লোয়ান তার বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেওয়ার সময় এই নামটি ঠিক করেছিলেন। হিন্দি শব্দ ইন্তেজার-এর অর্থ অপেক্ষা করা। কাদের পাহ্লোয়ান নাকি বলতেন, এই প্রেক্ষাগৃহটি দর্শকের জন্য অপেক্ষা করবে।
অবশ্য দর্শকের জন্য ইন্তেজার-এর অপেক্ষার পালা শেষ হয় ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে। ইন্তেজার-এর জায়গায় এখন বহুতল আবাসিক ভবন। লোকজনের সঙ্গে কথা বলে খোঁজ পেয়ে যাই কাদের পাহ্লোয়ানের ছেলে খোকা পাহ্লোয়ান ও শহিদুল পাহ্লোয়ানের কাছে। বহুতল সেই আবাসিক ভবনেই দুই ভাই থাকেন পরিবার নিয়ে। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরের এক বিকেলে তাদের সঙ্গে দেখা করতে যাই সেখানে। দুই ভাইকে একই সঙ্গে পেয়ে গেলেও শহিদুল ব্যস্ততার কারণে অল্প কথা বলেই চলে যান। পরদিন শহরের ফৌজদার এলাকায় তার আইনব্যবসার চেম্বারে আসতে বলেন। এরপর বহুতল ভবনের সামনের এক খাবার হোটেলে দীর্ঘ সময় কথা হয় খোকার সঙ্গে। ৭০ বছরের খোকা জানান, তার বাবা যখন প্রেক্ষাগৃহটি কেনেন, সেটা ছিলো উঁচু একটা টিনের ঘর। দর্শক তিন শ্রেণিতে চলচ্চিত্র দেখতো। প্রথম শ্রেণিতে সবচেয়ে উঁচু জায়গায় ছিলো বাঁশের তৈরি বেঞ্চ, যেখানে দর্শককে পাশাপাশি একসঙ্গে বসতে হতো। দ্বিতীয় শ্রেণিতে অপেক্ষাকৃত কম উঁচু জায়গায় চট বিছানো থাকতো। আর তৃতীয় শ্রেণির দর্শকের জন্য একেবারে পর্দার সামনে বিছানো থাকতো খড়। এখানে বসেই মানুষ চলচ্চিত্র উপভোগ করতো।
খোকা বলেন, বাবা সিনেমাহলটি কেনার পর ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে কিছুটা সংস্কার করেন। টিনের ঘর মেরামত করে কাঠের দোতলা করা হয়। ভিতরে বসার জায়গার উন্নয়ন, সঙ্গে পাখার ব্যবস্থাও করা হয়। প্রথম শ্রেণিতে গদিওয়ালা চেয়ার, দ্বিতীয় শ্রেণিতে হাতলওয়ালা বেঞ্চ, তৃতীয় শ্রেণিতে সাধারণ বেঞ্চ এবং চতুর্থ শ্রেণির দর্শকের জন্য খড়ের বদলে ব্যবস্থা করা হয় চটের। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খোকা বলেন, ‘সেসময় দর্শকের কী ভিড়! শো শুরু হওয়ার এক ঘণ্টা আগেই দর্শক চলে আসতো এবং তখন টিকেটের জন্য লম্বা লাইন হয়ে যাইতো। সেসময় টিকেটের এতো চাহিদা ছিলো যে, মাঝেমধ্যে মারামারি, ধাক্কাধাক্কি লেগে যাইতো। এমনও হয়েছে লোহার গেটে অনেকের হাত-পা পর্যন্ত কেটে গেছে।’
খোকা জানান, ইন্তেজার-এ সেসময় প্রচারণা করা হতো পায়ে হেঁটে, চোঙা ব্যবহার করে। তবে কখনো কখনো রিকশা ও গরুগাড়ি ব্যবহার করা হতো। সেসময় চলচ্চিত্রের প্রচারের লোক দেখলেই লোকজন ছুটে আসতো, অনেকে পোস্টার চাইতো। তখন মানুষের দুর্দান্ত আগ্রহ ছিলো এসব নিয়ে। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ চলচ্চিত্র দেখতে আসতো হেঁটে, সাইকেলে এবং গরুগাড়ি করে পরিবার-পরিজন নিয়ে। সেসময় বাস, ট্রেন ও নৌকাযোগে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও শেরপুর থেকেও লোকজন আসতো। প্রেক্ষাগৃহের পাশেই ‘হনুমান মন্দির’ নামে একটা মন্দির ছিলো, যেখানে মাড়োয়ারিরা পূজা করতো। দূর থেকে যারা রাতের শো দেখতে আসতো এবং ফিরে যাওয়ার মতো যানবাহন পেতো না তারা হনুমান মন্দিরে রাতে থেকে যেতো। এজন্য অনেকে বাড়ি থেকে সঙ্গে করে পিঠা, মুড়ি-মুড়কি ও চাল নিয়ে আসতো। কেউ কেউ সেখানে রাতে সেই চাল দিয়ে রান্না করেও খেতো এবং পরদিন সকালে চলে যেতো।
খোকা পাহ্লোয়ান আরো জানান, ৭০-এর দশকে হজ নিয়ে আধা ঘণ্টার একটা প্রামাণ্যচিত্র দেখানোর জন্য আনা হয় ইন্তেজার-এ। মূল চলচ্চিত্র শুরুর আগে সেটা দেখানো হতো। হজ নিয়ে চলচ্চিত্র, এটা শোনার পর সেসময়ের রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ-যারা কখনো প্রেক্ষাগৃহে আসতো না, এটাকে ইসলামবিরোধী, গুনাহের কাজ মনে করতো-তারাও এসেছিলো দেখার জন্য। বাড়ি থেকে পাঞ্জাবি-পায়জামা-টুপি পরে, এমনকি নারীরা বোরকা পরে এই প্রামাণ্যচিত্রটি দেখতে আসে। খোকা খানিকটা মজা করে বলেন,
সিনেমাহলে ঢোকার আগে তখন কাউকে কাউকে ওজু পর্যন্ত করতে দেখা গেছে। শো শুরু হওয়ার আগে অবশ্য সিনেমাহলের পক্ষ থেকেও আমরা ভিতরে আগরবাতি জ্বালানো ও গোলাপজল ছিটাইতাম। মজার ব্যাপার হইলো, বেশকিছু লোকজন কেবল হজের সিনেমাটা দেখতেই আসতো। আবার এমনও হইছে, সিনেমা দেখতে আসা নিয়মিত দর্শকের অনেকেই হজের ডকুমেন্টরিটা দেখার পর সিনেমাটা আর দেখেই নাই।
খোকার সঙ্গে কথা বলে পরদিন যাই শহিদুল ইসলাম পাহ্লোয়ানের চেম্বারে। আইনজীবী হিসেবে জামালপুর শহরে শহিদুলের বেশ নাম-ডাক আছে, তাই ফৌজদার মোড়ে গিয়ে তার চেম্বার চিনতে খুব বেশি কষ্ট হয়নি। সেখানে গেলে দেখেই চিনতে পারেন শহিদুল। বেশ আগ্রহ নিয়ে অনেকক্ষণ চলচ্চিত্র ছাড়াও দেশ-বিদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন তিনি। শহিদুল জানান, প্রথম দিকে চাহিদা অনুযায়ী বাংলা চলচ্চিত্র না থাকায় হিন্দি, কলকাতার চলচ্চিত্র বেশি দেখানো হতো। ৭০-এর দশক থেকে প্রেক্ষাগৃহে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী শুরু হয়। উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেনের চলচ্চিত্র দর্শকের খুব প্রিয় ছিলো। তাদের অভিনীত হারানো সুর টানা চার মাস চলেছিলো ইন্তেজার-এ। এই চলচ্চিত্র তিন-চার বার দেখেছে এমন দর্শক অনেক ছিলো। শহিদুল বলেন,
এখন তো সেই গান আর নাই। তখন কেউ কেউ সিনেমা দেখতে আসতো শুধু গান শোনার জন্য। সিনেমাহলের বাইরে ভবনের উপরের দিকে মাইক লাগানো ছিলো। সিনেমা শুরুর আগে সেই মাইকে গান ছাড়া হইতো। এই মাইকের আওয়াজ শোনা যাইতো অনেক দূর থেকে। গান শুনেও অনেক লোকজন আসতো সিনেমা দেখতে।
তখন বেশিরভাগ সময়ই প্রেক্ষাগৃহ হাউজফুল থাকতো। নতুন চলচ্চিত্র আসলে প্রথম তিন-চার দিন এতো পরিমাণ দর্শক হতো যে জায়গায়ই দেওয়া যেতো না বলে জানান শহিদুল। সেসময়ের দর্শক নিয়ে শহিদুল বলেন,
মানুষের আবেগ-অনুভূতি ছিলো সাংঘাতিক। কোনো করুণ বা দুঃখের দৃশ্য আসলে পুরো সিনেমাহলে একটা করুণভাব চলে আসতো। আবার মিলনের দৃশ্যে দর্শক আনন্দে নাচানাচি শুরু করে দিতো, কারো কোনো কথাই মানতো না। সাধারণত তখন দিনে দুটো শো চালাইতাম আমরা। তবে বিশেষ কোনো দিবসে, যেমন ঈদ, পূজা, অষ্টমিতে টানা তিন-চার দিন সারা দিনরাত সিনেমা চলতো। শ্রমিক, ব্যবসায়ী, রিকশাওয়ালা, ছাত্র-শিক্ষক ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষ সেসময় সিনেমা দেখতে আসতো। তখনকার দিনে কেউ বিয়ে করলে শ্যালক-শালিকা নিয়ে নতুন দম্পতির সিনেমা দেখতে যাওয়া একরকম বাধ্যতামূলক ছিলো বলা যায়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২০ ডিসেম্বর আব্দুল কাদের পাহ্লোয়ান ইন্তেকাল করেন। জীবদ্দশায় তিনি নিজেই প্রেক্ষাগৃহটি পরিচালনা করতেন। তবে এর পর থেকে তার দুই ছেলে শহিদুল ইসলাম পাহ্লোয়ান ও খোকা পাহ্লোয়ান পর্যায়ক্রমে পরিচালনা করেন।
১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মার্চ। রাতের শো’তে চলছিলো সুখে থাকো নামের একটি চলচ্চিত্র। শো শেষে দর্শক বের হওয়ার পর হঠাৎই প্রেক্ষাগৃহের ভিতরে আগুন দেখতে পায় কর্মচারীরা! কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রেক্ষাগৃহের কিছু সরঞ্জামসহ ভিতরের সব আসবাবপত্র পুড়ে যায়। পরদিন থেকে প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে আর সংস্কার করা হয়নি ইন্তেজার। প্রেক্ষাগৃহটি পরবর্তী সময়ে ভেঙে ফেলা হয়।
পাটের গুদামে ‘নিরালা’
ইন্তেজার প্রতিষ্ঠার প্রায় এক যুগ পরে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে জামালপুরে যাত্রা শুরু করে ‘নিরালা’ নামে আরেকটি প্রেক্ষাগৃহ। সফিউদ্দিন আহমেদ নামে জামালপুরের এক বিড়ি ব্যবসায়ী এটি প্রতিষ্ঠা করেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সবার কাছে সফি মিয়া নামে পরিচিত এই ব্যবসায়ী বিভিন্ন সমাজ সেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেসময় যে কয়েকজন জামালপুরে শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে সফি তাদের অন্যতম। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি জামালপুরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। স্ত্রী জাহেদা ও সফির নামে ‘জাহেদা-সফি মহিলা কলেজ’টি বর্তমানে জামালপুরের একমাত্র সরকারি মহিলা কলেজ। এছাড়া শহরের গেইটপাড় এলাকায় ‘সফি মিয়ার বাজার’ নামে একটি বাজার রয়েছে।
নিরালা’র ব্যাপারে খোঁজ নিতে শহরের নিরালা মার্কেট এলাকায় যাই। সেখানে গিয়ে কয়েকজন দোকানির সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কথা বললে তারা জানান, এখানে মজিবর নামে নিরালা’র একজন কর্মচারী আছেন। তিনি নিরালা প্রেক্ষাগৃহে সেসময় টিকেট বিক্রি করতেন; এখন নিরালা মার্কেটের পার্কিংয়ে কাজ করেন। মজিবরের খোঁজে পার্কিংয়ে গিয়ে জানা যায়, তিনি নেই। পার্কিংয়ের দায়িত্বে থাকা অন্য একজনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নম্বর নিয়ে কথা বলি তার সঙ্গে। মজিবর জানান, তিনি মিনিট দশেক পরে আসবেন। কিছু সময় পর মজিবর আসলে তার সঙ্গে নিরালা নিয়ে কথা বলতে চাই। কিন্তু মজিবর প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে খুব বেশি কিছু জানেন না বলে বার বার তাদের মালিক শহিদুর রহমান বাদলের সঙ্গে কথা বলার জন্য পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত মজিবরের কাছ থেকে বাদলের বাসার ঠিকানা নিয়ে সেদিনের মতো ফিরে আসি।
পরদিন শহরের গেইটপাড়ের বাগানবাড়ি এলাকায় বাদলের বাড়িতে সরাসরি হাজির হই। পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে নিরালা নিয়ে কথা বলতে চাইলে, ষাটোর্ধ্ব বাদল ব্যস্ত থাকার কারণে একেবারেই সময় দিতে চাচ্ছিলেন না। তবে আগ্রহ দেখে শেষ পর্যন্ত তিনি অল্প সময়ের জন্য কথা বলতে রাজি হন। কিন্তু কথা বলতে শুরু করার পর বাদল কেনো জানি আর থামছিলেন না। এরপর বেশ সময় নিয়েই আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
বাদল বলেন, ‘১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলিমাবাদ এলাকায় বাবা যেখানে সিনেমাহলটা শুরু করেছিলেন সেই জায়গাটা ছিলো মূলত পাটের গুদাম। গুদামটি সংস্কার করে গড়ে তোলা হয় নিরালা। সেখানে আমাদের জমি ছিলো ৬০ শতাংশ।’ বাদল জানান, তার বাবা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি তৎকালীন জামালপুর মহকুমা আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতিও ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার বাবার ভালো সম্পর্ক ছিলো। এছাড়া শহিদুর রহমান বাদল দাবি করেন, বঙ্গবন্ধু নাকি তাদের নিরালা প্রেক্ষাগৃহটি উদ্বোধন করেছিলেন। তখন তার বয়স ছিলো চার-পাঁচ বছরের মতো। যদিও এ ব্যাপারে তিনি কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি।
১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর সফি মিয়া মারা গেলে তার বড়ো ছেলে সামছুজ্জোহা মুকুল দুই-তিন বছর নিজ তত্ত্বাবধায়নে প্রেক্ষাগ্রহটি পরিচালনা করেন। তারপর বাদল প্রেক্ষাগৃহটির দায়িত্ব নেন। বাদল পুরোপুরি প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তার ভাষায়, ‘৯০-এর দশকের পর থেকে সিনেমাহলে দর্শকের সংখ্যা কমতে থাকে। এই সময়ের মধ্যে শহরে আরো তিনটা হল হয়। ফলে তখন সবমিলে নিরালা’র ব্যবসা কমে যায়। তাই ২০১২ সালে এসে আমরা সিনেমাহলটি বন্ধ করে দেই। এর কিছুদিন পর ভবনটি ভেঙ্গে ফেলা হয়।’
তবে ৮০’র দশকে প্রেক্ষাগৃহের ব্যবসা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাদলের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। তিনি জানান, সেই সময় বেদের মেয়ে জোস্না টানা চার মাস নিরালা’য় চলেছিলো। তার ভাষায়, ‘তখন যেকোনো সিনেমা দুই-তিন সপ্তাহের কমে চলতো না। বেদের মেয়ে জোস্না আগের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলে। আমার যতোদূর মনে আছে, এর আগে উত্তম-সুচিত্রার হারানো সুর সিনেমাটা ইন্তেজার-এ চার মাস চলছিলো। তবে সেই সিনেমা নিয়ে দর্শকের যে উচ্ছ্বাস ছিলো, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিলো বেদের মেয়ে জোস্নায়।’ এছাড়া সাত ভাই চম্পা, রঙ্গীন রূপবান নামের চলচ্চিত্রগুলোও এক মাসের বেশি সময় ধরে প্রেক্ষাগৃহে চলেছে বলে শহীদুর জানান।
এদিকে নিরালা নিয়ে খোঁজখবর করতে গিয়ে ভিন্ন আরেকটি তথ্য পাওয়া যায়। স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণের সঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, নিরালা’র নাম নাকি শুরুতে ‘বিশ্বনাথ টকিজ’ ছিলো। পরবর্তী সময়ে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় নিরালা। বিশ্বনাথ টকিজ থেকে ঠিক কী প্রক্রিয়ায় প্রেক্ষাগৃহটির নাম নিরালা হলো, এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য অবশ্য তারা দিতে পারেনি।
কথায় কথায় ‘কথাকলি’
জামালপুরে তৃতীয় প্রেক্ষাগৃহ হিসেবে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে পথ চলা শুরু করে ‘কথাকলি’। কথাকলি’র প্রতিষ্ঠা করেন ওয়াজেদ আলী চৌধুরী নামে একজন। ওয়াজেদ ঠিক কী করতেন এ সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের মার্চে প্রেক্ষাগৃহটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। জানা যায়, নির্মাণ কাজ শেষ হতে সময় লেগেছিলো প্রায় চার বছর। মাঝখানে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় নির্মাণ কাজ এক বছর বন্ধ ছিলো। অবশেষে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত কার বউ মুক্তির মধ্য দিয়ে উদ্বোধন হয় কথাকলির।
কথাকলি সম্পর্কে জানার জন্য প্রথমে স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণের সঙ্গে কথা বলি। ষাটোর্ধ্ব সোনাহার নামে একজন সার-বীজের ব্যবসায়ী-যিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে কাজ করেছেন-তার কাছ থেকে কথাকলি সম্পর্কে নানা তথ্য পাওয়া যায়। সোনাহারের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারি ওয়াজেদ আলীর ছেলে বাবুল চৌধুরী সম্পর্কে। পরে সোনাহারের সাহায্যে বাবুলের সঙ্গে দেখা করি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে। বাবুল এখন একটি আবাসিক হোটেল চালান।
বাবুল জানান, তার বাবাকে সবাই চাঁন চৌধুরী নামেই চিনতো। মূলত এই অঞ্চলের মানুষের চলচ্চিত্রের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ থেকেই তার বাবা একটি প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। তার বাবা ও তার কয়েকজন বন্ধুর একত্রে অনেকখানি জায়গা ছিলো জামালপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে; সেই বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন অংকের শঙ্কর দিক্ষিত, রমেশ পাল প্রমুখ। সেই সময় তারা জামালপুরের পরিচিত ধনাঢ্য ব্যক্তি। পরবর্তী সময়ে তার বাবা বন্ধুদের কাছ থেকে সেই বিশাল জায়গার কিছু অংশ কিনে নেন এবং সেখানে প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেন।
প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের আগে সেখানে একটা পাটের গুদাম ছিলো। পাটের গুদামটি ভেঙেই কথাকলি নির্মাণ করা হয়। সেসময় প্রেক্ষাগৃহের সব যন্ত্রপাতি, আসবাব করাচি থেকে আনা হয়েছিলো বলে জানান বাবুল। অপেক্ষাকৃত আধুনিক হওয়ায় জামালপুরের অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহের চেয়ে কথাকলি সেসময় দর্শকের কাছে বেশি জনপ্রিয় ছিলো। মূলত এই প্রেক্ষাগৃহটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে, এটাকে কেন্দ্র করেই এর আশপাশে ব্যবসা জমে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ওই জায়গাটি প্রেক্ষাগৃহের নামে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘কথাকলি মার্কেট’ নামে।
বাবুল বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে আমি দেশের বাইরে যাই। সেখানে তিন বছর থাকার পর বাবার অসুস্থতার কারণে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে দেশে ফিরে আসি। সেই বছরের ১১ নভেম্বর বাবা ইন্তেকাল করেন। এরপর আমরা ভাইয়েরা ও বাবার বন্ধুরা মিলে সিনেমাহলটি পরিচালনার দায়িত্ব নিই। কিন্তু তাতে কিছু সমস্যা হচ্ছিলো। পরে আমি একা সিনেমাহলটি দেখাশোনা করতে থাকি।’ বাবুল আরো বলেন,
আমি একা তিন-চার বছর সিনেমাহলটি পরিচালনা করলেও এটা মূলত যৌথ মালিকানাতেই ছিলো। পরে আমাদের ১১ ভাই-বোনের মধ্যে সিনেমাহলটির মালিকানা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। একপর্যায়ে আমরা সিনেমাহলটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। কিছুদিন পর আবার সমঝোতার মাধ্যমে সিনেমাহলটি চালু করা হয়। কিন্তু সেটাও স্থায়ী হয়নি। কারণ মালিকানা নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত ২০০১ খ্রিস্টাব্দে আমরা চিরতরে সিনেমাহলটি বন্ধ করে দেই।
কথাকলিতে প্রদর্শিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র শাহ আলম কিরণের চুড়িওয়ালা বলে জানান বাবুল। এর কিছুদিন পরে প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে ফেলা হয়। এখন অবশ্য ওই জায়গাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
‘সুরভী’র সৌরভ আর নেই
জামালপুরের মূল শহর থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে বর্তমান পালপাড়া এলাকায় ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ মার্চ ‘সুরভী’ নামে আরো একটি প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠা হয়। শরফুদ্দিন নামে এক পাটের ব্যবসায়ী এই প্রেক্ষাগৃহটি প্রতিষ্ঠা করেন। জানা যায়, শরফুদ্দিনের স্ত্রীর নাম ছিলো সুরভী। লালু ভুলু প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে সুরভী চালু হয়। যদিও এখন সুরভী’র কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে ফেলে জমি প্লট করে বিক্রি করা হয়েছে।
সুরভী সম্পর্কে জানতে জানুয়ারি ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে পালপাড়ায় যাই। সুরভী না থাকলেও ওটাকে ঘিরে যে ব্যবসা গড়ে উঠেছিলো তার কিছুটা নমুনা এখনো আছে। সুরভীর সামনে তেমনই এক চা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। উজ্জল কুমার পাল নামের সেই চা বিক্রেতার কাছ থেকে প্রাথমিক কিছু তথ্য পাওয়া যায়। সুরভী’র সঙ্গে নানা সময়ে যুক্ত ছিলেন এমন কয়েকজন লোকের কথা জানান উজ্জল। তার কাছ থেকে বাড়ির ঠিকানা নিয়ে পরদিন দেখা করি ফিরোজ আহমেদ, মধু নাগ, উত্তম দত্তের সঙ্গে। এরা বিভিন্ন সময়ে প্রেক্ষাগৃহটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।
শরফুদ্দিন প্রেক্ষাগৃহটি প্রতিষ্ঠার পর হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব দেন ফিরোজ আহমেদকে। ফিরোজ জানান, ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি এখানে হিসাবরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার সময়ে লাইলী মজনু মুক্তি পায়। লাইলী মজনু চালানো নিয়ে মজার তথ্য দেন ফিরোজ। তার ভাষায়,
লাইলী মজনু সিনেমাটি আমরা দুই সপ্তাহের জন্য রেন্টালে আনছিলাম। কিন্তু তিন দিন চলার পর দেখা গেলো কারেন্ট বিলের টাকাও উঠছে না। তখন আমরা সিনেমাটা নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু যেহেতু রেন্টালে আনা হইছে, তাই টাকা ফেরতের কোনো উপায় ছিলো না। এজেন্টকে আমরা অনুরোধ করলাম, অন্তত কিছু টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য। তখন এজেন্ট উল্টা আমাদেরকে সিনেমাটা চালানোর জন্য অনুরোধ করলো এবং কিছু টাকা ফেরত নিয়ে হলেও দুই সপ্তাহ চালাইতে বললো। এটা ঠিক যে, সিনেমাটা নিয়ে তখনো অবশ্য খুব বেশি প্রচার-প্রচারণা হয় নাই। তাই দর্শক আসছিলো না। তারপরও আমরা রিস্ক নিয়ে লাইলী মজনু চালাইতে থাকলাম, সঙ্গে কিছু প্রচার-প্রচারণাও চলতে থাকলো। প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে দর্শক কিছুটা বাড়তে শুরু করলো। আর দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরু থেকে তো ঢল নামলো দর্শকের। মজার ব্যাপার হলো, শেষ পর্যন্ত লাইলী মজনু এখানে ৩৫ দিন চলছিলো। সিনেমাটা সেই সময় পুরা জামালপুরে সাড়া ফেলে দেয়।
এছাড়া চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, অস্বীকার, সন্ধিও খুব ভালো ব্যবসা করেছিলো বলে জানান ফিরোজ।
জানা যায়, ব্যাংক ঋণের কারণে ২০০০ খ্রিস্টাব্দে শরফুদ্দিন প্রেক্ষাগৃহটি বিক্রি করে দেন। হাসিনা দৌলা নামে একজন রাজনীতিক প্রেক্ষাগৃহটি কিনে নেন। এরপর তিনি প্রেক্ষাগৃহটি পরিচালনার দায়িত্ব দেন পূর্বপরিচিত মধু নাগ’কে। এর কিছুদিন আগে ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে ‘সুরভী’র ব্যবস্থাপক হিসেবে ঢুকেছিলেন উত্তম দত্ত। উত্তম জানান, তাকে শরফুদ্দিন পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সেসময়ের চলচ্চিত্রের কথা জানতে চাইলে উত্তম বলেন, “খায়রুন সুন্দরী, মনের মাঝে তুমি, সত্যের মৃত্যু নাই সিনেমাগুলো খুব দর্শকপ্রিয়তা পাইছিলো। খায়রুন সুন্দরী এক মাসের বেশি চলছিলো সুরভী’তে।” উত্তমের মতে, সালমান শাহ ও পরে মান্নার মৃত্যুর কারণে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ধস নামে। তার ভাষায়, ‘আসলে সমস্যা তো সিনেমাহলের না, ভালো সিনেমা যদি হয়, তাহলেই তো দর্শক সেটা দেখবে। এক নায়কের ওপর বাংলাদেশের সিনেমা ভরসা করে আছে। এখন ওই নায়কের ওপরও দর্শকের আস্থা নেই, তারা আর দেখতে চায় না।’
উত্তম মনে করেন, প্রেক্ষাগৃহের ব্যবসা নির্ভর করে ব্যবস্থাপকের ওপর। তখন জামালপুর শহরের একদম মাঝখানে আরো দুটো প্রেক্ষাগৃহ ছিলো। সুরভী খানিকটা শহরের বাইরে থাকার পরও ঢাকার সঙ্গে সমানতালে ভালো ভালো চলচ্চিত্র তখন চালানো হয়েছিলো সেখানে। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে উত্তম সুরভী’র চাকরি ছেড়ে দেন। উত্তমের ভাষায়, ‘আমি বের হয়ে আসার পর সুরভী আর আগের মতো চলে নাই। দুই বছরের মাথায় সিনেমাহলটি মালিকপক্ষ বিক্রি করে দিলে এটা বন্ধ হয়ে যায়।’
মধু নাগের সঙ্গে কথা হয় শহরের গেইটপাড় এলাকায় তার ইলেকট্রনিক সামগ্রীর দোকানে। কমপক্ষে ৬৫ বছরের মধু নাগ প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কথা বলতে মোটেও আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন না। তারপরও সামান্য সময়ের জন্য কথা হয় তার সঙ্গে। মধু নাগ জানান, ২০১২ খ্রিস্টাব্দে সুরভী বিক্রি করে দেওয়া হয়। নাম্বার ওয়ান শাকিব খান ছিলো সুরভীর সর্বশেষ চলচ্চিত্র।
সবে ধন নীলমণি ‘মনোয়ার’
জামালপুরের সবশেষ প্রেক্ষাগৃহ হিসেবে ২০০২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠা হয় ‘মনোয়ার’। মনোয়ার হোসেন লেবু মল্লিক নামে একজন ঠিকাদার এটি প্রতিষ্ঠা করেন। অবশ্য ততোদিনে বন্ধ হয়ে গেছে জামালপুরের প্রথম ও তৃতীয় প্রেক্ষাগৃহ ইন্তেজার, কথাকলি। তখন পর্যন্ত বাকি দুটো প্রেক্ষাগৃহ নিরালা ও সুরভী ভালোভাবেই চলছিলো। জামালপুরে প্রেক্ষাগৃহ বলতে এখন আছে কেবল মনোয়ার। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০২ খ্রিস্টাব্দে মনোয়ার-এর উদ্বোধনী চলচ্চিত্র ছিলো মনতাজুর রহমান আকবর পরিচালিত ভয়ানক সংঘর্ষ।
শহরের রেলস্টেশনের কাছে বর্তমান গেইটপাড় এলাকায় মনোয়ার নিজের জমির ওপর এই প্রেক্ষাগৃহটি গড়ে তোলেন। প্রেক্ষাগৃহটি নিয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরের এক সন্ধ্যায় যাই মনোয়ার-এ। তখন ছয়-নয়টার শো-এর প্রস্তুতি চলছে। প্রেক্ষাগৃহের সামনের করিডোরে দর্শক নেই বললেই চলে। প্রেক্ষাগৃহে ঢুকেই কথা হয় গেইটম্যান মজিবরের সঙ্গে। তিনি অবশ্য খুব একটা পাত্তা দিচ্ছিলেন না। দুই-একটা বিষয় জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে গিয়ে মালিকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তবে তার সঙ্গে অল্প কথায় এতোটুকু বুঝি, তিনি শুরু থেকেই এই প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে আছেন।
এরপর মালিকের খোঁজ করতে থাকি; তাকে না পেয়ে, কথা হয় রুবেল নামে একজনের সঙ্গে। রুবেল নিজেকে মনোয়ার-এর গেইটম্যান হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি ১০ বছর হলো কাজ করছেন এখানে। তার কাছ থেকে অবশ্য প্রাথমিক কিছু তথ্য পাওয়া যায়। রুবেল জানান, মূল মালিক মনোয়ার অনেক আগেই মারা গেছেন। এখন তার শ্যালক আলমগীর হোসেন এটি দেখাশোনা করেন। তবে তিনি বেশিরভাগ সময় জামালপুরের বাইরে থাকেন। রুবেলের কাছ থেকে আলমগীর হোসেনের মোবাইলফোন নম্বর নিয়ে সেদিনের মতো চলে আসতে হয়। পরদিন মোবাইলফোনে আলমগীরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পেয়ে যাই। আলমগীর রাজনীতিতে জড়িত থাকায় বেশিরভাগ সময়ই ব্যস্ত থাকেন বলে জানান। এজন্য দেখা না করে তাকে ফোনেই প্রেক্ষাগৃহ সম্পর্কে কথা বলার জন্য অনুরোধ করি। এরপর অনেকবার তার সঙ্গে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করেও তা আর হয়ে ওঠেনি। তিনি ফোন রিসিভ করে ঠিক কথা বলতে অপারগতাও প্রকাশ করতেন না, আবার কথাও বলতেন না। এভাবে মোবাইলফোন সেটে ১৫-২০ বার চেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত সামান্য সময়ের জন্য কথা হয় তার সঙ্গে।
আলমগীর জানান, ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে মনোয়ার হোসেন ক্যান্সারে মারা যান। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী শাহনাজ মল্লিক প্রেক্ষাগৃহটির মালিক হন। পরবর্তী সময়ে রতন বাবু নামে একজন ভাড়া নেন এটি। কিন্তু তিন বছর চালানোর পর তিনি ২০১০ খ্রিস্টাব্দে মনোয়ার ছেড়ে দেন। এরপর থেকেই এর পরিচালনার দায়িত্ব নেন আলমগীর হোসেন। তিনি সম্পর্কে শাহনাজ মল্লিকের আপন ছোটো ভাই।
আলমগীর খানিকটা হতাশা নিয়ে বলেন, ‘ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। বর্তমানে দেশে ভালো কোনো সিনেমাই হচ্ছে না। ফলে দর্শকও নাই। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সিনেমাহলটি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকবো না।’
হারানো সেই দিনের কথা
জামালপুরের প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্তের পর শুরুর দিকে একদিন ইন্তেজার-এর খোঁজে বের হই। আগেই বলেছি, ইন্তেজার ভেঙে বহুতল ভবন করা হয়েছে। তাই চাইলেও এই সময়ে এসে ইন্তেজার খুঁজে বের করা খুব সহজ ছিলো না। তারপরও ইচ্ছে ছিলো, জায়গাটা অন্তত দেখে আসার। দু-একজন প্রবীণের সঙ্গে কথা বলে পেয়েও যাই ইন্তেজার। সেই জায়গায় গড়ে ওঠা বহুতল ভবনের সামনে এক খাবার হোটেলে বসে কথা হয় ইন্তেজার-এর মালিক আব্দুল কাদের পাহ্লোয়ানের ছোটো ছেলে খোকা পাহ্লোয়ানের সঙ্গে। সত্তরোর্ধ্ব খোকা সেদিন একটা মজার গল্প বলেছিলেন, আগেরকার দিনের এক দর্শকের চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে। খোকার ভাষায়,
তখন পাকিস্তান আমল। এক লোক সিনেমাহলে আসছেন জীবনের প্রথম সিনেমা দেখতে। টিকিট কাইটা তিনি পর্দার একেবারে কাছাকাছি সামনের সারিতে গিয়া বসেন। যে সিনেমাটা সেসময় চলছিলো, তাতে একটা বাঘের হুংকার দিয়ে দৌড়ায় আসার দৃশ্য ছিলো। যেই না সেই দৃশ্যটা আসছে, ওই লোক ভয়ে চিৎকার দিয়া দৌড়ায় সিনেমাহল থেকে বেরিয়ে গেছে। প্রথমে দর্শকসহ সবাই তো বেশ ভয় পেয়ে গেছিলো, বড়ো কিছু মনে হয় হইছে। পরে অবশ্য এই ঘটনাটা জানাজানি হয়।
পাহ্লোয়ানের এই বর্ণনা থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না, চলচ্চিত্র মানুষকে বাস্তবের কতোটা কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। অন্য অর্থে বললে, চলচ্চিত্র হচ্ছে একধরনের ম্যাজিক। যেটা দেখার জন্য বিশেষ এক পরিবেশ, পরিস্থিতি ও স্থানের দরকার পড়ে। আর সেই স্থানটাই হলো প্রেক্ষাগৃহ। অন্ধকার ঘরের মধ্যে, উচ্চ শব্দে, একই সঙ্গে অনেক দর্শকের সমাগমে চলচ্চিত্র দেখা একমাত্র প্রেক্ষাগৃহেই সম্ভব।
জামালপুরে এভাবে বিভিন্ন সময়ে চলচ্চিত্র দেখার জায়গা গড়ে উঠেছিলো পাঁচটি। সময়ের আবর্তে তার চারটিই বিলীন হয়ে গেছে। শুধু জামালপুরে নয়, পুরো বাংলাদেশ এখন প্রেক্ষাগৃহ সঙ্কটে ভুগছে। ৯০-এর দশকে এদেশে ১২শো প্রেক্ষাগৃহ থাকলেও বর্তমানে আছে সবমিলে শ দুয়েক। প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার সেই সংস্কৃতি এখন হারিয়ে গেছে। দর্শক এখন ঘরে বসে টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইলফোন সেটে চলচ্চিত্র দেখছে। অথচ চলচ্চিত্রের প্রকৃত স্বাদ অর্থাৎ তার ম্যাজিক বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে প্রেক্ষাগৃহেই।
লেখক : শাকিল আহাম্মেদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
shakilmcj26@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. আরমান, আরিফুল ইসলাম (২০০৮ : ৭); ‘আমাদের জামালপুর : জামালপুর জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি; প্রকাশক : শামীমূর রশীদ সোহেল, জামালপুর।
২. প্রাগুক্ত; আরমান (২০০৮ : ৭)।
৩. https://goo.gl/j41rWE; retrieved on: 28.05.18
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন