Magic Lanthon

               

আলি আহমেদ নিশান

প্রকাশিত ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দশ দিগন্তের নীলক্ষা আকাশজুড়ে আলো ছড়ানো শশী

আলি আহমেদ নিশান


আলোয় ভুবন রাঙা

                                    হাম জিন্দেগি কো আপনি কাঁহাতক সাম্ভালতে,

                                    ইস কিমতি কিতাব কা কাগাজ খারাব থা।

৪ ডিসেম্বর, ২০১৭। অমিতাভ বচ্চন নিজের ব্লগে তার লেখাটা শুরু করেন রুমি জাফরির এই কবিতা দিয়ে। যার অর্থ ‘জীবনটাকে আর কতোদূর সামলাতাম, দামি এই বইটার কাগজই যখন নষ্ট ছিলো।’ ব্লগটি তিনি লেখেন বন্ধু শশী কাপুরের মৃত্যুশোকে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে শশী কাপুর এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নাম। শশী কাপুর ছিলেন এমন একজন অভিনয়শিল্পী, যিনি কখনো ‘স্টার’ হতে চাননি, হিরো হতে চাননি। অথচ কঠোর সাধনা আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বিশ্বাঙ্গনে নিজেকে পরিচিত তো করিয়েছেনই, সঙ্গে টেনে নিয়ে গেছেন পুরো বলিউডকে, দেশকে। বলিউডি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত শশী ছেলেমেয়েদের অভিনয় শেখানোর উদ্দেশ্যে কাজ করেছেন থিয়েটারে। নিজে খুব বেশি বিকল্পধারার চলচ্চিত্রে অভিনয় না করলেও, প্রযোজনা করেছেন এই ঘরানার বেশকিছু চলচ্চিত্র। খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছেন এক ইংরেজ নারীকে, তাদের ভালোবাসা আমৃত্যু অটুট ছিলো। আর সর্বোপরি শশী সারাজীবন স্বচ্ছ থাকার চেষ্টা করেছেন নিজের বিবেকের কাছে। ঘটনাবহুল এই জীবনে একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তিনি, নষ্ট হয় জীবন নামের দামি বইটার প্রত্যেকটা পৃষ্ঠা। ডিসেম্বর জীবনের উপসংহার টানেন শশী।

বইটি লেখা শুরু হয় গত শতকের মধ্যভাগেরও খানিক আগে। ‘ভারত-ছাড় আন্দোলন’ তখনো শুরু হয়নি। পুরো ভারতবর্ষ বৃটিশদের অধীনে থেকে, নিপীড়িত হতে হতে তখন অতিষ্ঠ। বড়ো কিছুর জন্য অপেক্ষায় পুরো দেশ। অন্যদিকে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র আলম-আরার (১৯৩১) পর থেকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সফরটা বেশ ভালোই চলছিলো। নতুন জিনিস হিসেবে চলচ্চিত্রের ঘোর তখনো জনমানুষের মাথা থেকে মুছে যায়নি। তাই নতুন চলচ্চিত্র আর ভালো ব্যবসা প্রায় সমার্থক হয়ে দাঁড়ায় এ সময়টাতে। ততোদিনে অশোক কুমার, পৃথ্বীরাজ কাপুরের মতো অভিনয়শিল্পীদের শক্ত হাত পেয়ে যায় বলিউড। আর সারাদেশে প্রত্যেক বছরই মুক্তি পেতে শুরু করে হিন্দি ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি ভাষার চলচ্চিত্র।


এই রকম পরিস্থিতিতে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ পৃথ্বীরাজ কাপুর ও রামসরণী দেবীর তৃতীয় ছেলের জন্ম হয় কলকাতায়। নাম রাখা হয় বালবীর রাজ কাপুর। বাবা পৃথ্বীরাজ কাপুর তখন ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে বড়ো নাম তো বটেই, ইতোমধ্যে বড়োভাই রাজ আর শাম্মিও অভিনয়ের দিকেই ঝুঁকেছেন। তাই তার জন্মের আগে থেকেই মোটামুটি ঠিকঠাক হয় যে, পরিবারে আরেকজন অভিনয়শিল্পীই আসছে। তার যখন ছয় বছর বয়স, তখন পৃথ্বীরাজ কাপুর নির্মাণ করেন থিয়েটার দল ‘পৃথ্বী থিয়েটার’। আর সেইটুকু বয়স থেকেই অভিনয়শিল্পী বাবা আর থিয়েটারের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকেন শশী। ফলে যে বয়সটাতে শিশুরা ভাষা, আদবকায়দা আর এ বি সি ডি শিখতে হিমশিম খায়, সে বয়সেই তিনি শেখেন অভিনয়। তারপর পুরো জগৎটাকে দেখেছেন রঙ্গমঞ্চ হিসেবে, যেখানে তিনি ছিলেন আজীবন নায়ক।

শশীর পেরোনো একরাশ অন্ধকার

শশীর বাবা ‘পৃথ্বী থিয়েটার’ শুরু করেন ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে। মূলত এটি ভ্রমণকারী থিয়েটার দল। দলটি সেসময় থিয়েটার করতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চার-পাঁচ মাসের জন্য ভ্রমণে বের হতো। এভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই তারা দেশের নানা প্রান্ত ঘুরে ফেলে এবং খ্যাতি ও সাফল্যের দেখা পায়। বেশিরভাগ সময় শশীও বাবার সঙ্গে যেতেন। তাই খুব ছোটো থেকেই থিয়েটার, মঞ্চ ও অভিনয়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। এভাবেই খুব অল্প বয়সেই তিনি অনেকগুলো নাটকেও অভিনয় করেন।

চলচ্চিত্রে শশীর যাত্রা শুরু ১০ বছর বয়সে। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে বড়ো ভাই রাজ কাপুরের ছোটোবেলার চরিত্রের জন্য একজন শিশুশিল্পী প্রয়োজন হয়। চারপাশ ঘুরে সেই শিশুশিল্পীকে শেষে নিজের বাড়িতেই খুঁজে পায় রাজ। তবে গোল বাঁধে নাম নিয়ে। কারণ বলবীর নামের আরো একজন শিশুশিল্পী তখন ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলো। তাই এবার বলবীরের নাম পাল্টে রাখা হলো শশীরাজ কাপুর। আরো অনেক পরে এটি হয়ে যায় কেবল শশী কাপুর। তারপর বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে তিনি শিশুশিল্পী হিসেবেই কাজ করেছিলেন। শিশুশিল্পী হিসেবে সহজেই পর্দায় ঠাঁই পেলেও পরের পথটা তার জন্য সহজ ছিলো না মোটেও।

সুনীল দত্তের প্রথম চলচ্চিত্র পোস্ট বক্স-৯৯৯ (১৯৫৮)-এ শশী সহকারী পরিচালনার সুযোগ পান। পরে রবীন্দ্র দেবের গেস্ট হাউজ (১৯৫৯), দুলহা দুলহান (১৯৬৪), শ্রীমান সত্যবতী (১৯৬০)-এর মতো কিছু চলচ্চিত্রে তিনি ছিলেন সহকারী পরিচালক। শেষের দুটি চলচ্চিত্রে বড়ো ভাই রাজ কাপুর ছিলেন প্রধান নায়ক। এভাবে পরিবারের একটা সহায়তা বা সমর্থন কিন্তু সবসময় ছিলো তার ওপর। যদিও শশীর নিজের মত এক্ষেত্রে ভিন্ন। শশী খুব জোর দিয়েই বলতেন,

আমি পারিবারিক যোগাযোগের জন্য চলচ্চিত্রে কাজ পেতাম, বিষয়টা মোটেও সেরকম ছিলো না। আমাকে চলচ্চিত্রে আসতে হয়েছিলো নিজের সংসারের জন্যই। কারণ ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দেই আমার বড়ো ছেলের জন্ম হয়। তখনই আমার মনে হয়েছিলো, আরো টাকা উপার্জন করা দরকার। আর তাই থিয়েটার ছেড়ে চলচ্চিত্রে চলে এসেছিলাম। অবশ্য ততোদিনে মানে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দেই ‘পৃথ্বী থিয়েটার’ বন্ধ হয়ে গেছে।

পেশাগত ব্যাপারে বাবা পৃথ্বীরাজও যে তার সন্তানদের খুব বেশি সহায়তা করতেন তা কিন্তু নয়। বড়োভাই রাজ কাপুরকে নিয়ে একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। বাবা পৃথ্বীরাজ কাপুর তখন হিন্দি চলচ্চিত্রে কেনো, বলতে গেলে ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। লেখাপড়া সাঙ্গ করে ছেলে রাজ বসে আছে বেকার। বসে থাকলে চলবে না, কিছু করতে হবে তোমাকে-এই ছিলো বাবা পৃথ্বিরাজ কাপুরের কথা। ছেলেকে তাই পাঠিয়ে দেন নির্মাতা কেদার শর্মার কাছে। তবে রাজ পৃথ্বীরাজের ছেলে হলেও তার প্রতি কেদার শর্মার বাড়তি কোনো দুর্বলতা ছিলো না। কারণ তাকে কাজ শিখতে হবে। কিছু না শিখে বাজিমাত করার কথা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারতো না। রাজকে তাই শর্মা ক্ল্যাপস্টিক বয়ের কাজে নিযুক্ত করেন। পৃথ্বীরাজের ছেলে কাজ করছেন স্টুডিওর ক্ল্যাপস্টিক বয় হিসেবে!

চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজের পর শশী প্রথম নায়ক হিসেবে পর্দায় আসার সুযোগ পান চার দিওয়ারি (১৯৬১)-তে। তারপর একই বছর যশ রাজ চোপড়ার প্রথম চলচ্চিত্র ধর্মপুত্র-এ। কিন্তু দুটো চলচ্চিত্রই ভালো ব্যবসা করতে পারলো না। শোনা যায়, শশী কাপুর নাকি ধর্মপুত্রর জন্যে সেই বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তিনি নাকি সেটা প্রত্যাখানও করেন। এরপর ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শশী আরো ছয়টি হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। প্রায় সবকটাতেই তিনি ছিলেন প্রধান চরিত্র। সবকটারই বক্স অফিস রিপোর্ট প্রায় একই, ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ। যদিও এর মধ্যেই তিনি একটি ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ফলে একদিকে ধারাবাহিকভাবে ব্যবসায়িক ব্যর্থতা অন্যদিকে স্ত্রী-সন্তান-সংসার নিয়ে বেশ টানাটানির মধ্যে পড়ে যান শশী। 

এ রকম সময়ে যশ চোপড়া নির্মাণ করেন ওয়াক্ত (১৯৬৫)। এই চলচ্চিত্রে শশীর সঙ্গে বলরাজ সাহানি, রাজ কুমারও অভিনয় করেন। ওয়াক্তই শশী অভিনীত প্রথম হিন্দি চলচ্চিত্র যেটা ভালো ব্যবসা করে; যেটা সেই বছরের সর্বাধিক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। একই বছর মুক্তি পায় যব যব ফুল খিলে; ওয়াক্ত-এর মতো এটিও ব্লকবাস্টার হয়। এখানে অবশ্য শশী একক নায়ক হিসেবেই ছিলেন।

জোছনায় যখন ঢল নামলো

মূলত ওয়াক্ত-এর পর থেকেই ব্যবসাসফল অভিনয়শিল্পী হিসেবে শশীর পথচলা শুরু। তিনি একের পর এক ব্যবসাসফল সব চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকের সামনে হাজির হতে থাকেন। তবে বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেই শশীর সঙ্গে এক বা একাধিক কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকতো। উদাহরণ হিসেবে দিওয়ার (১৯৭৫), কাভি কাভি (১৯৭৬), ত্রিশুল (১৯৭৮), সুহাগ (১৯৭৯), কালা পাত্থার (১৯৭৯), শান (১৯৮০), নমক হালাল (১৯৮২) চলচ্চিত্রগুলোতে শশীর সঙ্গে অমিতাভ বচ্চনও অন্যতম প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। আরেকটু খতিয়ে দেখলে, রোটি কাপড়া অর মাকান (১৯৭৪)-এ মনোজ কুমার, আ গালে লাগ জা (১৯৭৩) ও ক্রান্তি (১৯৮১)-তে শত্রুঘ্ন সিনহা, প্রেম কাহানিতে (১৯৭৫) রাজেশ খান্নার মতো তারকা ছিলেন শশীর সঙ্গে। এরপর ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে ঘর এক মন্দির-এ শশী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন।

ইন্টারনেট ঘেঁটে ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শশী কাপুরের সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করা ১৯টি চলচ্চিত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অন্তত ১২টি চলচ্চিত্রে তার সঙ্গে অন্য আরেকজন বা একাধিক নায়ক ছিলো।

সেই সময়ের চলচ্চিত্র

৬০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ৮০’র দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রগুলোর জন্য শশী এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছিলেন। এসব চলচ্চিত্র সাধারণত জাঁকজমক নাচগান, জনপ্রিয় তারকা সমাবেশ, প্রেম ও ভক্তির ভাবালুতা, খুনজখম ইত্যাদি উপাদান আর ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে এগুলোর মোহময় ও উত্তেজক উপস্থাপনায় নির্মিত হতো। যদিও এইসব উপাদান ছিলো বেশ ব্যয়বহুল। তাই ওই সময় লগ্নি করা টাকা উঠাতে প্রয়োজন পড়ে বেশি দর্শকের। ফলে বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রগুলো দর্শকের মধ্যে তাৎক্ষণিক ঘোর লাগালেও সুদূরপ্রসারী কোনো চিন্তার উদ্রেক ঘটাতে পারে না। সাধারণ দর্শক-রুচি তখন এ উপাদানগুলোর মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকে। আর একশো বছর ধরে চলচ্চিত্রের চর্চায় গ্র্যান্ড ন্যারেটিভস দাঁড়িয়ে গেছে-চলচ্চিত্র মানেই একটি ব্যয়বহুল ব্যাপার, এখানে প্রযুক্তির ভূমিকা শিল্প সৃষ্টির থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই যেকোনোভাবেই হোক শিল্প ও বাণিজ্যের সমঝোতা এখানে অনিবার্য। চলচ্চিত্র মানেই পুরুষ-দৃষ্টিসর্বস্ব একটি দৃশ্যমাধ্যম এবং জনমানুষের মগজ ধোলাইয়ের জন্য শাসকশ্রেণির একটি বড়ো অস্ত্রও বটে।

আর তাই বাণিজ্যিক ধারার পাশাপাশি বিকল্প একটা ধারার পথচলার প্রয়োজন হয়েছে। যেখানে প্রতিষ্ঠানবিরোধী কথা বলা যায়; যেখানে শিল্পীর স্বাধীনতা দর্শকের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; যেখানে শিল্প ও শিল্পীকে ছাপিয়ে প্রযুক্তি প্রভু হয়ে বসে না। এই ধারার চলচ্চিত্র কথা বলে মানুষের, বিশেষ করে পিছিয়ে থাকতে বাধ্য হওয়া মানুষের। ভারতে এই পথের অগ্রপথিক হিসেবে বিমল রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, মনি কাউলরা চলচ্চিত্র বানিয়েছেন। তারা চলচ্চিত্রে সমাজ ও রাজনীতিকে যেমন দেখিয়েছেন, তেমনই দর্শককে নিয়ে গেছেন জীবন ও বাস্তবতার একেবারে কাছাকাছি। 

ভারতে বিকল্পধারার যাত্রা শুরু কীভাবে তা বলার জন্য একটা ছোটো প্রসঙ্গ তোলা যেতে পারে। চলচ্চিত্রের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে অর্থ মন্ত্রকের অধীনে এফ এফ সি (Film Finance Corporation) নামের একটি সংস্থা গঠন করা হয়। এ সংস্থাটি মূলত প্রতিষ্ঠা হয় মূলধারার চলচ্চিত্রকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য। এখানে বেশ কয়েক বছর মূলধারার বাইরের কোনো চলচ্চিত্রকে সাহায্য করার কথা বিবেচনায় আনা হয়নি। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকধারার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এফ এফ সি অনুদান দেয় মৃণাল সেন, মনি কাউল আর বাসু চ্যাটার্জির তিনটি চলচ্চিত্রকে-ভুবন সোম, উসকি রোটি ও সারা আকাশ। মৃণালের ভুবন সোম সেসময় বেশ আলোচিত ও দর্শকপ্রিয়তাও পায়। যার কারণে চলচ্চিত্রবোদ্ধারা মৃণালের ভুবন সোমকেই চিহ্নিত করে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ‘নতুন ধারা’ হিসেবে। এরপর ৭০-এর দশকজুড়ে নতুন ধারার বেশকিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। এ সময়টাতেই বলিউডে আগমন ঘটে শাবানা আজমি, অমরেশ পুরি, নাসিরুদ্দিন শাহ, স্মিতা পাতিল, মোহন আগাসের মতো অভিনয়শিল্পীদের; গোবিন্দ নিহলানির মতো ক্যামেরাম্যান আর বনরাজ ভাটিয়ার মতো সঙ্গীত পরিচালকের।

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে হৃষিকেশ মুখার্জি নির্মাণ করেন আনন্দ। ভারতে নতুন ধারার চলচ্চিত্রকে দর্শকের কাছাকাছি আনতে এ চলচ্চিত্রটির অবদান ছিলো অনন্য। শোনা যায়, ‘আনন্দ’ চরিত্রটির জন্য প্রথমে শশীকে ঠিক করা হলেও রাজেশ খান্না বেশ আগ্রহ দেখান। যার কারণে শশীকে বাদ পড়তে হয়; যাক সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। শশী তার নিজের মতো করেই বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে কাজ করতে থাকেন। একপর্যায়ে শশী হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি যেসব চলচ্চিত্রে কাজ করছেন সেগুলো কালের আবর্তে হারিয়ে যাবে। তাই নিজের প্রোডাকশন হাউজ খুলে বসলেন। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘ফিল্ম ভালাস’ থেকে একে একে নির্মাণ হয় জুনুন (১৯৭৮), কলিযুগ (১৯৮১), ৩৬ চৌরঙ্গি লেন (১৯৮১), বিজেতা (১৯৮২), উৎসব (১৯৮৪)-এর মতো ইতিহাস গড়া সব চলচ্চিত্র। সমালোচকদের দৃষ্টিতে এসব চলচ্চিত্র ব্যাপক প্রশংসাও কুড়ায়। জুনুন তো তিনটি শ্রেণিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। বাকিগুলোও বেশকিছু জাতীয়, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।  

বিদেশ-বিভুঁই ঘুরে

১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে কিছুটা খারাপ সময় যেতে থাকে শশীর। তখন পর্যন্ত তার ঝুলিতে ব্যবসাসফল কোনো চলচ্চিত্র নেই। তিন-চারটে হিন্দি চলচ্চিত্র এর মধ্যেই ফ্লপ। এদিকে পৃথ্বী থিয়েটারও বন্ধ হয়ে গেছে। মানে একদিকে শশীর ভবিষ্যৎ অস্বচ্ছ আর অন্যদিকে অতীতে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। এই রকম এক কঠিন সময়ে আমেরিকান প্রোডাকশন হাউজ ‘মার্চেন্ট-আইভরি প্রোডাকশন’ থেকে দ্য হাউজহোল্ডার-এ অভিনয়ের প্রস্তাব পান শশী। প্রতিষ্ঠানটি আগে প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও হাউজহোল্ডারই তাদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

সেসময় বড়ো ভাই শাম্মি কাপুর একের পর এক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র নিয়ে হাজির হচ্ছেন। দেব আনন্দ, রাজকুমারের মতো ‘নায়ক’রা বলিউডকে ধরে আছে দাপটের সঙ্গে। নতুনদের মধ্যে ধর্মেন্দ্রও কয়েকটি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ফেলেছেন। অথচ একের পর এক ফ্লপের পরও মার্চেন্ট-আইভরি শশীকে নেয় মূলত তার অভিনয় দক্ষতা দেখেই। যাহোক হাউজহোল্ডার-এর কাজ যথারীতি শেষ হয়। চলচ্চিত্রজুড়ে অসম্ভব রকমের প্রতিভা আর অভিনয় দক্ষতার ছাপ রাখেন শশী। এটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তাও পায়। আসলে সবমিলিয়ে এটাই শশীর প্রথম হিট চলচ্চিত্র। পরবর্তী সময়ে মার্চেন্ট-আইভরির সঙ্গে আরো বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

৬০-এর দশকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে তখন অব্দি ভারতীয়দের উপস্থিতি বলতে গেলে ছিলোই না। শশী কাপুর একেবারে শুরুর দিকের মানুষ, যিনি ভারত থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এরপর জীবনের বিভিন্ন সময়ে শেক্সপিয়রওয়াল্লা (১৯৬৫), প্রেটি পোলি (১৯৬৭), বম্বে টকি (১৯৭০), সিদ্ধার্থ (১৯৭২), হিট অ্যান্ড ডাস্ট (১৯৮২), স্যামি অ্যান্ড রোজি গেট লেইড (১৯৮৭), দ্য ডিসিভারস (১৯৮৮)সাইড স্ট্রিটস (১৯৯৮)-এর মতো চলচ্চিত্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ কিছু চরিত্রে অভিনয় করেন শশী। এর মধ্যে বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই বক্স অফিসে ভালো ব্যবসা করে। এবং শশীর খ্যাতিও দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বে। সর্বশেষ তিনি ন্যারেটর হিসেবে কাজ করেছেন জিন্নাহ (১৯৯৮)-তে। তারপর শশীকে আর কখনো চলচ্চিত্রে দেখা যায়নি।

দৃঢ়চেতা শশী

যেকোনো কাজে হাত দেওয়ার আগে বরাবরই শশী সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন। চলচ্চিত্রে আসার সিদ্ধান্ত তিনি নাকি নিয়েছিলেন একেবারে শৈশবে বাবার অভিনয় দেখে। যার ফলে মাত্র ১২ বছর বয়সে ক্যামেরা হাতে নেমে পড়েন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য। আর ১৮ বছর বয়সে নিজের থেকে চার বছরের বড়ো জেনিফারকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন জোরালোভাবে। সেটাকে পরিণতিও দেন দু’বছর পরে।  

জীবনের যে সময়টাতে শশী নায়ক হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়, ঠিক সে সময়ে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে অভিনয়ের কথা ভাবেন তিনি; করেনও তাই। বয়সের রদবদলটাকে শশী রপ্ত করেছিলেন বেশ, যা তার বেশিরভাগ সমসাময়িক অভিনয়শিল্পীই ধরতে পারেনি। এ বিষয়ে তার নিজের মতামত, ‘আমি আমার সমসাময়িকদের দেখে মাঝে মাঝে বিব্রতবোধ করি, যখন তারা কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকে আর ছোটো ছোটো মেয়েদের সঙ্গে গাছের নিচে গান গেয়ে বেড়ায়।’৮ অমিতাভ কিংবা ধর্মেন্দ্রর এ ব্যাপারটা টের পেতে দেরি হয়েছিলো খানিকটা।

১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মে শশীর বাবা মারা যায়। অদ্ভুত এক শূন্যতা নেমে আসে তার জীবনে। মাত্র ১৫ দিনের মাথায় মা রামসরনী দেবীও চলে যায় তাকে ছেড়ে। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে শশীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সংলাপ ‘মেরে পাস মা হ্যায়’ মিথ্যে হয়ে যায়। দিওয়ার-এ অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কথোপকথনের একপর্যায়ে শশী খুব গর্ব নিয়ে বলেছিলেন এই সংলাপ-‘আমার সঙ্গে মা আছে’। বাস্তবেও মায়ের মৃত্যুতে পুরো পৃথিবীটাই অন্ধকার হয়ে যায় শশীর। এ সময়টাতে কোনো কিছু করেই ঠিক শান্তি পাচ্ছিলেন না তিনি। যদিও একের পর এক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেই যাচ্ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে আ গালে লাগ যা (১৯৭৩), দিওয়ার (১৯৭৫), ত্রিশুল (১৯৭৮), সত্যম শিবম সুন্দরম (১৯৭৮) বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।

এ রকম একটা সময়েই ঠিক করেন জীবনের প্রথম প্রেম অর্থাৎ থিয়েটার নিয়ে আবার কাজ শুরু করবেন। অবশ্য থিয়েটার নিয়ে কাজ শুরু করতে চাওয়ার পিছনে অন্য আরেকটা কারণও ছিলো। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তিনি বুঝেছিলেন, নতুনদের অভিনয় শেখার তেমন কোনো জায়গা নেই ভারতে। নতুনরা যারা চলচ্চিত্রে আসতে চায়, তাদের নানারকম কোর্স করেই ক্ষান্ত দিতে হতো। কিন্তু অভিনয় তো আর দুই-চারটা কর্মশালা আর কোর্সের বিষয় নয়। একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে মনে ও শরীরে অভিনয়কে ধারণ করতে হয়। আর সেজন্য থিয়েটারের বিকল্প নেই বললেই চলে। তাই শশী থিয়েটার নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি একটি হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। এবং সে অনুযায়ী শশী তার স্ত্রী জেনিফারকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন ‘পৃথ্বী থিয়েটার’ হল। এরপর চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি থিয়েটারের সঙ্গে কাজ করে গেছেন সারাজীবন।

থিয়েটার হল নির্মাণের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শশী চলচ্চিত্র প্রযোজনায় নাম লেখান। তবে এক্ষেত্রে শশী একেবারে ভিন্ন অবস্থান নেন। নিজে বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও প্রযোজক হিসেবে একের পর বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করতে থাকেন। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিলো। কিন্তু ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে জেনিফারের মৃত্যু শশীর জীবনে যেনো প্রলয়ংকারী ঝড় হয়ে এসে সবকিছু তছনছ করে দেয়। তারপরও ভেঙে পড়েন না শশী। ব্যক্তিগত জীবন থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেলেও পেশাদারিত্বের জায়গায় শশী আগের মতোই থাকেন অটল, অবিচল। অভিনয়টা চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে নিজের প্রযোজনা ও পরিচালনায় করেন আজুবা। তবে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের পর শশী চলচ্চিত্র থেকে একেবারেই বিদায় নেন। শেষের দিকে পৃথ্বী থিয়েটার আর নিজের মধ্যেই নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি।

শশী কাপুরকে একবার প্রশ্ন করা হয়, জীবন যদি আপনাকে আরেকটা সুযোগ দেয় তবে কোন কাজগুলোকে ভিন্নভাবে করবেন? তিনি বলেন, ‘আগেরগুলোই হয়তো ভালোভাবে করবো, কিন্তু বার বার ওই একই কাজ করবো।’

‘মুঝে জো কারনা হ্যায় কারনে দো’

যদিও শশী ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ঘাঁটাঘাটি খুব বেশি পছন্দ করতেন না। তারপরেও জীবনের নানা পর্যায়ে নানাভাবে তিনি স্ত্রী জেনিফারের কথা বলেছেন, প্রশংসা করেছেন। আশ্চর্য রকমের ভালোবাসা ছিলো শশী-জেনিফারের। শশী কাপুর নাকি রবিবারে কখনো কাজে যেতেন না। ছুটির দিনটি পুরোটাই রাখতেন তার পরিবারের জন্যে, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির জন্য। সফল হওয়ার জন্য ঘরের বাইরেরটা যেমন শশী সামলেছেন, ঠিক তেমনই ভিতরেরটা পোক্ত করতে দক্ষতার ছাপ রেখেছেন জেনিফার। তবে জেনিফার নিজের সত্তাকে একেবারে মরে যেতে দেননি কখনো। তাকে বিভিন্ন সময়ে পর্দায় দেখা গেছে। শেক্সপিয়রওয়াল্লা (১৯৬৫), বম্বে টকি (১৯৭০), জুনুন (১৯৭৮), ৩৬ চৌরঙ্গি লেন (১৯৮১), হিট অ্যান্ড ডাস্ট (১৯৮৩), দ্য ফার প্যাভিলিয়নস (১৯৮৪), ঘরে বাইরে (১৯৮৪) চলচ্চিত্রগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তিনি অভিনয় করেন। এছাড়া মুক্তি (১৯৭৭) ও জুনুন (১৯৭৮) চলচ্চিত্রে জেনিফার কস্টিউম ডিজাইনও করেন।

শশী ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে এক সাক্ষাৎকারে জেনিফারের সঙ্গে তার পরিচয় নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন এভাবে-

সালটা ১৯৫৬, আমার এখনো মনে আছে। আগস্টে আমরা কলকাতায় ছিলাম। কলকাতা আমাদের জন্য খুব ভালো প্ল্যাটফর্ম ছিলো। কারণ ওখানকার মানুষ থিয়েটার খুবই ভালোবাসে, হিন্দি থিয়েটারকেও। আর সেসময় তো ‘পৃথ্বী থিয়েটার’ তারায় তারায় ভর্তি। মানে পৃথ্বীরাজ কাপুর, রাজ কাপুর, শাম্মি কাপুর, প্রেমনাথ সবাই ছিলো। যার কারণে কলকাতায় আমাদের কদর আরো বেড়ে গেছিলো। ফলে আমাদের আরো কিছুদিন থাকতে হলো এম্পায়ার থিয়েটারে। আমি তখন সহকারী মঞ্চ ব্যবস্থাপক। বয়স মাত্র ১৮। যদিও আমার নিজেকে আরো বড়ো মনে হতো। যাহোক মঞ্চের পিছনে একটা ফুটো থাকতো দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। তো আমি কয়েকদিন ধরে খেয়াল করছিলাম, একটা নীল চোখওয়ালা খুব সুন্দর মেয়ে প্রতিদিনই আসছে। এবং সে একই সারিতে বসতো। আমি ভাবলাম মেয়েটা রাশিয়ান। পরে জানতে পারলাম মেয়েটি ‘শেক্সপিরিয়ানা কোম্পানি’র এবং ওরা পৃথ্বী থিয়েটারের যাওয়ার অপেক্ষা করছিলো। মানে আমরা যেহেতু নির্ধারিত সময় পার করে ফেলেছিলাম। তাই আমরা এম্পায়ার থিয়েটার ছেড়ে গেলেই ওরা শুরু করবে।১০

বলে রাখা ভালো, মেয়েটি অর্থাৎ জেনিফার কেন্ডেল-এর বাবা জিওফ্রে কেন্ডেল ‘শেক্সপিরিয়ানা কোম্পানি’ নিয়ে ৪০ ও ৫০-এর দশকে ভারতবর্ষ ভ্রমণে বের হন। এরা মূলত শেক্সপিয়রের নাটক মঞ্চস্থ করতো।

ওরা এম্পায়ার থিয়েটারের খুব কাছাকাছিই ফেয়ারলন হোটেলে উঠেছিলো। আমি কলকাতা গেলে এখনো এ হোটেলেই থাকি। তো আমি খুব লাজুক ছিলাম। তাই আমি নিজে থেকে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। আমার চাচাতো ভাই আমাকে নিয়ে গেলো ফেয়ারলনে। আমাদের পরিচয় হলো। তারপর ধীরে ধীরে তৈরি হলো সম্পর্ক। আসলে আমি শুরুতেই ওর প্রেমে পড়েছিলাম। কিন্তু জেনিফার একটু সময় নিয়েছিলো।১১

শশী-জেনিফার কিছুদিন মেলামেশার পরই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পরিবার থেকে তাদের বাধা দেওয়া হয়। বিশেষ করে জেনিফারের বাবা জিওফ্রে কেন্ডেল। অন্যদিকে শশীর বাবা তাকে কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলেন। দুই পরিবার থেকেই এ সম্পর্ক সহজে মেনে না নেওয়ার পিছনে দুটো কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, দুজনের ধর্ম ভিন্ন; দ্বিতীয়ত, জেনিফারের থেকে শশী বয়সে চার বছরের ছোটো। শেষ পর্যন্ত সব বাধা কাটিয়ে দুই বছর পর তারা বিয়ে করে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাইয়ে। এরপর শশী-জেনিফার ২৬ বছর সংসার করে। শশীকে উৎসাহ যুগিয়েছেন জেনিফার, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন স্ত্রী হিসেবে, একজন অভিনয়শিল্পী, বন্ধু, দার্শনিক হিসেবে এবং পথপ্রদর্শক হিসেবেও। তাই শশীকে বলতে শোনা যেতো, ‘জেনিফারের সঙ্গে তো আমার একশো বছরের বিয়ে। গত জন্মের কিছু যোগাযোগ ছিলো আর পরের জন্মেও কপালে হয়তো ওই আছে।’১২

১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন জেনিফার। তার এই অকালমৃত্যু শশী ঠিক মেনে নিতে পারেননি। এরপর থেকেই জীবনের প্রতি কেমন যেনো উদাসীন হয়ে পড়েন তিনি। শশীর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি চলচ্চিত্রের নায়িকা ছিলেন রাখি গুলজার। তাই তাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিলো রাখির। শশীর মৃত্যুর কিছুকাল পরেই শশী-জেনিফারের সম্পর্ককে মূল্যায়ন করে একটি গণমাধ্যমকে রাখি বলেন,

“জেনিফারজি শশীজির খাওয়া কন্ট্রোল করতেন। উনি ফ্লাস্কে ব্ল্যাক কফি আর স্যালাড পাঠাতেন। শশীজি বলতেন ‘ঘাসফুস’। জেনিফারজি চলে যাওয়ার পর শশীজির জীবন থেকে কন্ট্রোলটাই চলে গেলো। আমার সঙ্গে ওঁর বহুবছর দেখা হয়নি। শশীজি বাইরে বেরোতেন না। আমিও না। ওঁর সঙ্গে শেষ দেখা বম্বে এয়ারপোর্টে। বললাম, কী ব্যাপার, এতো মোটা হয়ে যাচ্ছেন? বললেন, ‘মুঝে জো কারনা হ্যায় কারনে দো’ (আমি যা করি করতে দাও)।”১৩

জেনিফার মারা যাওয়ার পর শশী আরো ৩৩ বছর পৃথিবীতে ছিলেন, একা। তিনি চাইলেই আরেকজন সঙ্গী খুঁজে নিতে পারতেন। কিন্তু আরেকটা বিয়ে তো দূরের কথা, শেষের ৩৩ বছরে একটা স্ক্যান্ডেলের ইশারা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি তার বিরুদ্ধে। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার ও প্রতিশ্রুতির এ নজির শুধু বলিউডে নয় সারাবিশ্বেই বিরল।

শশী বন্দনায় সমাপন

শশী মারা যাওয়ার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি টুইট করেন, যা খুবই অল্প কথায় শশীর পুরো জীবনের গল্পটা বলে দেয়-

Shashi Kapoor’s varsatality could be seen in his movies as well as in theatre, which he promoted with great passion. His brilliant acting will be remembered for generations to come. Saddened by his demise. Condolences to his family and admirers.14

মোদির ভাষায়, ‘তার অসাধারণ অভিনয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে।’ প্রজন্ম শুধু তার অভিনয়টাই মনে রাখবে না, মনে রাখবে তার ব্যক্তিত্বের মাধুর্য, ভাবনার গভীরতা আর অভিনয় নিয়ে সাধনার কথা। যুগের পর যুগ মানুষ স্মরণ করবে শশীর শিল্পীসত্তাটাকেও, যেভাবে করেছে বিশ্ব চলচ্চিত্রাঙ্গনের সবচেয়ে বড়ো আসর, ৯০তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে।১৫

লেখক : আলি আহমেদ নিশান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

nissan.mcj26@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

1. srbachchan.tumblr.com/post/168195742311; retrieved on: 05.04.12; 04:05pm

2. https://www.youtube.com/watch?v=cw8RBx8uerY; retrieved on: 08.03.18; 02:14pm

৩. দত্ত, সন্তোষ; ‘অশোককুমার থেকে অভিষেক : নায়কদের পালাবদল’; পূজাবার্ষিকী আনন্দলোক; সম্পাদনা : দুলেন্দ্র ভৌমিক; বাংলা ১৪০৪, আনন্দবাজার লিমিটেড, ভারত, পৃ. ৮০।

4. https://goo.gl/dfBUQ8; retrieved on; 08.03.18; 10:21am

5. https://goo.gl/uzSXdf; retrieved on; 17.03.18; 2:17pm

৬. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৮৪); ‘চলচ্চিত্রে মতানৈক্যের কণ্ঠস্বর : বিকল্প চলচ্চিত্র’; সিনেমা; ধানমন্ডি, ঢাকা।

৭. রাহা, কিরণময় (২০০৯ : ৩৯৫); “ভারতীয় সিনেমায় ‘নতুন ধারা’”; শতবর্ষে চলচ্চিত্র দ্বিতীয় খণ্ড : ইতিহাস ও বিবর্তন; সম্পাদনা : নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লি., ভারত।

8.  https://www.youtube.com/watch?v=cw8RBx8uerY; retrieved on: 08.03.2018; 02:14pm

9. https://www.youtube.com/watch?v=cw8RBx8uerY; retrieved on: 08.03.2018; 02:14pm

10. https://www.youtube.com/watch?v=sKt1fMd5dNQ; retrieved on:08.03.2018; 11:39am

11. https://www.youtube.com/watch?v=sKt1fMd5dNQ; retrieved on:08.03.2018; 11:39am

12. https://www.youtube.com/watch?v=KqkPlXIKF8I; retrieved on:08.03.2018; 01:25pm

13. https://goo.gl/5AaSE8; retrieved on: 08.03.2018; 10:24am

14. https://goo.gl/QDhJzo; retrieved on: 10.04.2018; 6:16pm

15. https://goo.gl/KsjM63; retrieved on: 10.04.2018; 5:43pm

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন