আ. আল মামুন
প্রকাশিত ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সাক্ষাৎকার
জিহাদিদের প্রশিক্ষণ ঘটেছে আধুনিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে
আ. আল মামুন

সাক্ষাতের দিন সকাল ১০টার দিকে যখন আ. আল মামুনের চেম্বারে পৌঁছালাম, তখন মনে হলো বেশকিছু সময় ধরেই তিনি অপেক্ষা করছিলেন। তাই সামান্য কুশল বিনিময়ের পরেই রেকর্ডার চালু করতে হলো—‘এবার আমরা শুরু করতে পারি?’ মামুন বললেন, ‘তুমি তো খুব ফরমাল ইন্টারভিউ নিচ্ছো দেখছি। তার চেয়ে বরং গল্প করতে করতে আলাপ করি।’ কিন্তু গল্প শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যে সেটা আর গল্প থাকলো না। যখন তিনি নেশনের ধারণা, বাইনারি পদ্ধতিতে অর্থ উৎপাদন, সেক্যুলারাইজেশন ও ইসলামিক র্যাডিক্যালাইজেশন প্রক্রিয়া, জঙ্গিবাদী তৎপরতা, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বলতে শুরু করলেন, তখন আলাপ ‘কঠিন’ হয়ে উঠলো। একপর্যায়ে তো মামুনই প্রশ্ন করে বসলেন, ‘আচ্ছা তোমার সঙ্গে আমার কথার লেভেল মিলছে তো? আমার কথা বুঝতে পারছো?’ তাত্ত্বিক আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে মামুন যখন শাহবাগ আন্দোলনের খুঁটিনাটি এবং হলি আর্টিজান হামলার পূর্বাপর ও পশ্চিমা গণমাধ্যমে এর উপস্থাপন নিয়ে কথা বললেন, আলাপ তখন আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠলো। শাহবাগ আন্দোলনের প্রথম স্লোগান, ‘আঁতাতের রায় মানি না, মানব না’ বিশ্লেষণ করে তিনি বললেন, ‘কার সঙ্গে কার আঁতাত? সরকারের সঙ্গে জামায়াতের। সরকারের জন্য এটা ছিলো এক ভয়ঙ্কর স্লোগান।’
এভাবেই গল্প/আলাপ/কথা চলে ঘণ্টা দুয়েক। আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে থাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থীর সঙ্গে। প্রায় দুই দশক ধরে নিজেই এখন সাংবাদিকতা পড়ান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। যোগাযোগ, সাংবাদিকতার সঙ্গে সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্রের সম্পর্ক, বোঝাপড়া নিয়ে লেখা তার প্রবন্ধ আগেই পড়েছি। দীর্ঘদিন ধরে যৌথভাবে সম্পাদনা করছেন যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘যোগাযোগ’। এই পত্রিকাটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনায় এক নতুন পথ তৈরি করেছে। অনেক আগেই অনুবাদ করেছেন নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস. হারম্যানের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ম্যানুফেকচারিং কনসেন্ট : দ্য পলিটিকাল ইকোনমি অব দ্য ম্যাস মিডিয়া’। এছাড়া মামুন ক্ষমতা নিয়ে মিশেল ফুকো, চমস্কির বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ একখণ্ড ভূমিকাসহ ভাব-ভাষান্তর করেছেন ‘মানবপ্রকৃতি : ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা—মুখোমুখি নোম চমস্কি এবং মিশেল ফুকো’ নামে। বর্তমানে মামুন শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করছেন কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস-এ।
[গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র কলাভবনের ৩৩৩ নম্বর কক্ষে আ. আল মামুনের সঙ্গে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পক্ষ থেকে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীর আলম। চলতি সংখ্যায় এই আলোচনার প্রথম কিস্তি প্রকাশ করা হলো।]
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, আমি যতখানি জানি, আপনি তো শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে পিএইচ ডি করছেন। শুরুতেই থিসিস সম্পর্কে জানতে চাই।
আ. আল মামুন : আমি মূলত নেশনের ধারণা নিয়ে কাজ করছি। আমি দেখতে চাচ্ছিলাম, এখানে কীভাবে নেশনকে রিলিজিয়ন আর সেক্যুলার, এই দুই বর্গে ভাগ করা হয়—তা কতোটা টেকসই। রিলিজিয়াস বনাম সেক্যুলার—এই দুই বাইনারির বাইরে এসে নেশনকে ভাবা যায় কিনা। ইসলামিস্ট ও সেক্যুলারিস্ট বাইনারি ঠিক কি না? নেশন মানে কি সেক্যুলার? এই ধারণা পশ্চিম থেকে এসেছে, নেশনকে অবশ্যই সেক্যুলার হতে হবে। সেক্যুলার বলতে কী বোঝায়? ৬০ ও ৭০-এর দশকে বহু মুসলিম প্রধান দেশে চালু হওয়া রাষ্ট্রীয় সেক্যুলারাইজেশন প্রজেক্ট বাতিল করতে হয়েছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে আমরা এটা আরো পরিষ্কার দেখতে পাই, যে সেক্যুলারাইজেশন প্রজেক্ট এখানে নেওয়া হয়েছে, যে নেশনের কথা বলা হয়েছে, সেখানে ধর্ম থাকবে না। প্রাইভেট স্ফিয়ারে থাকবে, তবে রাষ্ট্র হবে সেক্যুলার, তা সেক্যুলার প্র্যাকটিস অনুযায়ী চলবে। এভাবে সংবিধানেও লেখা হয়েছে। এটা সম্ভব কি না? আদৌ সম্ভব কি না? এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছি।
শাহবাগ আন্দোলন একটা ঘটনা, যেখানে নাটকীয়ভাবে এসব বিষয় উঠে এসেছে। এটা চমৎকার একটা সময়, যখন শাহবাগের ঘটনা ঘটেছে, তখন রিলিজিয়নের বর্গে যারা বসবাস করে, ধর্মীয় জীবনযাপনের মধ্যে যারা থাকে, তাদের র্যাডিকেলাইজ করে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একইভাবে সেক্যুলার প্রকল্পের মধ্যে সেক্যুলার বলতে কী বুঝবো, তার কঠোর সীমানা গড়ে তোলা হয়েছে। এ সীমানার মধ্যে বাঙালি বলতে কী বোঝায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ—এ ধারণাগুলো পপুলার অর্থে ভীষণভাবে চর্চা করা হয়েছে। র্যাডিকেলভাবে চর্চা করা হয়েছে শাহবাগ আন্দোলনের ছয়—সাত বছর আগে থেকেই। যার পরিণতি শাহবাগ আন্দোলন। এ দুটো শক্তি পরস্পর বিরোধী হয়েছে অত্যন্ত র্যাডিকেল পথে। এক পক্ষ বলছে, আমি থাকলে তুমি থাকবে না। অন্য পক্ষও বলছে, আমি থাকলে তুমি থাকবে না। ইসলামিস্টরা থাকলে সেক্যুলারলিস্টরা থাকবে না; সেক্যুলারিস্টরা থাকলে ইসলামিস্টরা থাকবে না। আমার প্রশ্ন, তাহলে মানুষ কোথায় থাকবে?
এখান থেকেই প্রশ্নটা হাজির হয়, কেনো শাহবাগ আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে গেলো? রাষ্ট্র ও সমাজে ইসলামের প্রশ্ন ডিল করতে ব্যর্থতার কারণেই তো! অন্যদিকে, হেফাজতের পক্ষে হাজার হাজার লাখ লাখ লোক এসেছিলো। সেই লোকগুলোইবা কোথায় চলে গেলো? কেনো মানুষ হেফাজতের রিজিড মৌলবাদী ধারণাগুলোতে আটকে থাকলো না? হেফাজত চাইলেই কি এখন এ রকম জনসমাগম করতে পারবে? কেনো পারবে না? তাহলে নেশন বলতে আমরা কাকে বুঝবো? এর সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক কী? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে এসেছি।
পরে আমি কয়েকটি চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছি; সমসাময়িক চলচ্চিত্র; তারেক মাসুদসহ আরো কয়েকজনের। এগুলোর মধ্য দিয়ে দেখা—এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে, একটি জনগোষ্ঠী একই সময় সেক্যুলার ও রিলিজিয়াস—দুই ক্ষেত্রেই তারা বসবাস করে; ধর্মের ভিতর থেকেও যেমন সে যুক্তি ও সংহতির শক্তি পায়, একইভাবে সেক্যুলার চর্চাগুলোও সে করে চলে। আগের একটা ঐতিহ্য আছে যা সমন্বয়বাদী ধারা নামে পরিচিত। ‘দ্য ইসলামিক সিনক্রিটিসটিক ট্রাডিশন ইন বেঙ্গল’ নামে অসীম রায়ের একটি বই আছে। এটা খুব বিখ্যাত বই। বাংলাদেশের ইসলাম হচ্ছে সমন্বয়বাদী ইসলাম। সমন্বয়বাদী ইসলামের এই ধারণা দিয়ে বর্তমান সময় ও সমাজকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না বলেই আমার মনে হয়। সমন্বয়বাদী ধারণা বলতে অসীম রায় যা ঝুঝেছেন ও বলেছেন তা হচ্ছে, এখানকার মুসলমানরা অ্যারাবিক মুসলমান নন। এখানকার মুসলমানদের মধ্যে বহু বৈচিত্র্য আছে। সমন্বয়বাদী ইসলামের অনেক রকম চর্চা ছিলো। অনেক ‘অ-ইসলামী’ এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের ভিতরে সে জীবনের মানে খুঁজে পায়। যেমন : গাজী কালুর গান, অনেক রকম পুজো—মনসার পুজো; একই মাজারে হিন্দু-মুসলিম আসে। এই ঐতিহ্যগুলো রয়েছে। কিন্তু এই ঐতিহ্যকে সেক্যুলাররা নানাভাবে নানা স্বার্থ থেকে সেক্যুলার প্রজেক্টের অংশ হিসেবে ব্যবহার করে। সেক্যুলাররা প্রস্তাব করতে থাকেবাংলাদেশের মুসলমানদেরকে সেই পুরাতন সমন্বয়বাদী ধারায় প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
মানুষ তো গতিশীল; সময় বদলায়, তারই সঙ্গে আমাদের চিন্তা ও উপলব্ধির পদ্ধতি-প্রকরণ বদলায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস বদলায়। ওই সময় সমন্বয়বাদী ইসলাম হিসেবে যা বলা হয়েছে, তাতে বোঝা যায়, আসলে ইসলাম সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত ধারণা ছিলো না। ধারণা তৈরির সুযোগও ছিলো না। এখানে সেখানে ওয়াজ মাহফিলে যতটুকু শুনেছে, পুঁথি ও কবিগান যেটুকু শুনেছে, সেটাকেই তারা ইসলাম বলেছে। আল্লাহ, প্রভু ও নিরঞ্জন একই। ১৫০০ থেকে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে এটা ঘটেছে মূলত জ্ঞানের অভাবে। পার্শ্ববর্তী হিন্দু সমাজ থেকে তারা স্বতন্ত্র পরিচয় ধারণ করেছে, কিন্তু সেই পরিচয় চর্চার মতো সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ও পরিভাষা তার আয়ত্তে নাই। সমসাময়িককালে যখন সব তথ্য সামনে আছে, হাদিস-কোরআন থেকে শুরু করে সবকিছু মানুষ পড়তে পারে। তখন সে আর সমন্বয়বাদী ধারণার কাছে থাকছে না। সে অন্য কথা বলছে—আমি মুসলিম, আমি এই ইসলামিক চর্চাগুলো করি। তার অর্থ এই নয় যে, বাঙালিত্বকে সে অস্বীকার করছে। মূলত সে সাংস্কৃতিক ইসলামের কথা বলছে। একই সময় সে সেক্যুলার স্পেসেও বসবাস করে—সে তার বাঙালিত্ব ও ইসলাম উভয়কেই রিডিফাইন করছে। ফলে ‘মডার্ন ইসলামিক সেক্যুলার’ নামে আলাদা স্পেস তৈরি হয়েছে, যা সমন্বয়বাদী ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
আমার বিতর্কটা এখানে এসে থামে। আগের সমন্বয়বাদী ধারা এখন আর বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। কিন্তু এটাকেই সেক্যুলাররা বার বার রিভাইভ করতে চায়। লালনকে নিয়ে এতো উত্তেজনা কেনো? সমন্বয়ের প্রতীক তাই তো? কিন্তু পরবর্তী সময়ে যে জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, তারা সমন্বয়বাদী ধারণা নিয়ে থাকেনি। সে দাবি করে, সে মুসলিম। সে ধর্মের চর্চাগুলো করে। একই সঙ্গে সে সেক্যুলার স্পেসের সঙ্গেও আছে—নিজেকে বাঙালি বলেও ক্লেইম করছে। আর মাঝের মানুষগুলো নিয়েই নেশন।
ম্যাজিক লণ্ঠন : নতুন যে মানুষের কথা বলছেন, যারা ধর্মীয় আচরণের চর্চা করছে এবং একই সঙ্গে সেক্যুলার স্পেসের সঙ্গেও আছে, পরবর্তী সময়ে তারাই কি জঙ্গি হয়ে উঠছে? এর সঙ্গে ইসলামি র্যাডিকেলাইজেশনের কোনো সম্পর্ক আছে?
মামুন : না, কোনো সম্পর্ক নেই। জঙ্গিবাদের ধারণা অন্য ক্যাটাগরি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হবে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, একটু বিস্তারিত বলবেন কি?
মামুন : জঙ্গিবাদ বলতে কী বোঝায়? যেকোনো মতবাদই জঙ্গি হয়ে উঠতে পারে। বেশিরভাগ রাজনৈতিক ভাবাদর্শের জঙ্গিবাদী প্রবণতা থাকে। মার্কসীয় ভাবাদর্শে বলা হয়েছে, দুনিয়ার মজদুর এক হও। শ্রেণি শত্রু খতম কর। রাজনীতিতে সহিংসতার ব্যবহার সবসময় ঘটেছে। সমস্যাটা শুরু হয়েছে ধর্ম ও রাষ্ট্রে সম্পর্ক কী হবে সেখান থেকে। হবসের থিওরি, যেখানে তিনি সেক্যুলার রাষ্ট্র কায়েমের কথা বলছেন। ইউরোপে ৩০ বছরের (১৬১৮—১৬৪৮) ধর্মযুদ্ধ শেষে একটি চুক্তি হয়, সবধরনের সহিংসতা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার। সহিংসতার কর্তৃত্ব থাকবে কেবল রাষ্ট্রের হাতে। রাষ্ট্র পরিচালিত হবে কিছু সেক্যুলার চুক্তি ও বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে। এখান থেকে রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে পার্থক্য হতে শুরু করলো। সেটা নানা দেশে, নানারূপে বিকশিত হলো। ফ্রান্সে একরকম; ইংল্যান্ডে অন্য রকম; আমেরিকাতে একরকম। আমাদের ভারতবর্ষে আরেক রকম। সেক্যুলারিজম বলতে আমরা এখন যে ধর্ম নিরপেক্ষতা বুঝি তা এভাবে হাজির হয়েছে। মুশকিলটা এখানে, ধর্ম পাবলিক স্ফিয়ারের বাইরে থাকবে কি না? কিন্তু চার্চ ও রাষ্ট্রের ঝগড়া যেভাবে ইউরোপ সুরাহা করেছে, সেই একইভাবে কি নন-ইউরোপীয় বা ক্রিশ্চিয়ান ট্রাডিশনের বাইরের দেশেও ধর্ম ও রাষ্ট্রের সমস্যা সুরাহা করা সম্ভব? এই তর্কগুলো আজকাল অনেক গবেষক তুলে আনছেন এবং দাবি করছেন, ইউরোপীয় সেক্যুলার প্রকল্প নিয়ে নতুন বোঝাপড়ার।
ধর্ম বলতে কী বুঝি? সেক্যুলার বলতে কী বুঝি? এ ধারণাগুলো আমাদের এখানে ভয়ঙ্কর রকমভাবে সমস্যাপূর্ণ। অ্যারিস্টটল বলছেন, ম্যান ইজ অ্যা পলিটিক্যাল অ্যানিমেল। মানে কী? মানুষ হচ্ছে রাজনৈতিক প্রাণি। মানুষ যদি রাজনৈতিক প্রাণি হয়, তাহলে তার প্রতিটি প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক। তার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও রাজনৈতিক। মানুষ যেসব সংগঠন তৈরি করে, সেগুলোও রাজনৈতিক। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র ও রাজনীতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও চর্চাকে বাইরে রাখার চেষ্টা করছে; সেক্যুলারিজম বা ইহজাগতিকতা ধর্মকে বাইরে রাখার চেষ্টা করেছে। এটা তো মানুষের স্বভাব বিরুদ্ধ। এখন বহু তাত্ত্বিক বলছেন, মানুষ যদি রাজনৈতিক প্রাণি হয়ে থাকে, তাহলে তার যে কোনো আর্টিকুলেশন ও চর্চা রাজনৈতিক হতে পারে। পাবলিক স্ফিয়ারে ধর্মের উপস্থিতি অস্বীকার করার উপায় নেই।
এখন ধর্মের নামে যে সহিংসতা ও জঙ্গি তৎপরতা গড়ে উঠছে, তা ধর্মের ভিতর থেকে ঘটছে, নাকি রাজনীতির ভিতর থেকে? ধর্ম জঙ্গি তৈরি করছে নাকি ধর্মের ট্র্যাক ব্যবহার করে জঙ্গি তৈরি করা হচ্ছে? আমি বলব, দ্বিতীয়টা ঘটছে। জঙ্গি কোনো ধর্মের ভিতর থেকে আসছে না। রাষ্ট্র এবং সমাজের ক্ষমতার ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে সক্রিয় গোষ্ঠীগুলো ধর্মের ট্র্যাক ব্যবহার করছে। কিন্তু সে মূলত রাজনীতি করছে। সে আধুনিক রাজনীতিই করছে।
এভাবেও দেখা যায়, আধুনিক রাষ্ট্রের সিম্বলগুলো মূলত ধর্মীয় সিম্বল। এটা ধর্ম থেকে এসেছে। যেমন, সংবিধান কী? পবিত্র। শহীদ মিনার? পবিত্র। সার্বভৌম ক্ষমতা কী? জনগণ হচ্ছে সার্বভৌম। রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা বিয়ন্ড লিগাল ক্যাটাগরি। সেই সার্বভৌম ক্ষমতা কেমন হয়? আমরা বলি, আল্লাহ সবকিছু করে। এ সার্বভৌম ক্ষমতা আল্লাহর ক্ষমতার পর্যায়ে। তাকে তুমি কোনো আইন দিয়ে বাঁধতে পারো না। কিন্তু সে তোমাকে নানান আইন দিয়ে বাঁধতে পারে। রাষ্ট্র সেই সার্বভৌম কর্তৃত্ব বাজায় রাখে। এটা ধর্মের একধরনের প্রতিস্থাপন। এরপর রাষ্ট্র যখন রিলিজিয়ন হয়ে ওঠে, অন্য ছোটো ছোটো ধর্মকে সে সাইজ করে, পকেটবদ্ধ করে, নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করেও ব্যবহার করে। ফলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। তখন তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়।
আচ্ছা, তোমার সঙ্গে আমার কথার লেভেল মিলছে? আমার কথা কি বুঝতে পারছো? আমি ফিলোসফিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছি।
ম্যাজিক লণ্ঠন : না, সমস্যা নেই স্যার। ঠিক আছে। দেশীয় পরিপ্রেক্ষিতে জঙ্গিবাদের উদ্ভব নিয়ে পরে জানতে চাইবো। বিশেষত বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে আপনার তত্ত্বাবধানে সম্প্রতি একটা এম এস এস পর্যায়ে গবেষণা হয়েছে, তার ফলাফল নিয়ে কথা বলবো। তার আগে তাত্ত্বিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে চাই। ধরুন, একটা রাষ্ট্রে ১০—১৫ শতাংশ করে কয়েকটি ধর্মের মানুষ আছে। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠান শুরুর আগে প্রত্যেক ধর্মের মানুষ দাবি করলো, তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করতে হবে। তাহলে তো সমস্যা হবে। তার চেয়ে বরং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ধর্মগ্রন্থের পাঠ বন্ধ করাই তো সুবিধাজনক।
মামুন : ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কী হবে, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক কী হবে, তা একেক দেশে একেক রকম। আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে স্টেট রিলিজিয়ন রয়েছে। আমেরিকা ইজ অ্যা ক্রিশ্চিয়ান নেশন; উই আর অ্যা ক্রিশ্চিয়ান নেশনআমেরিকার সংবিধানে বহু জায়গায় এ রকমের উদাহরণ আছে। এর বিপরীত চর্চা হয়েছে ফ্রান্সে। আমেরিকায় বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহ দেওয়া হয়। কিন্তু ফ্রান্সে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা, তারা সেখানে ধর্মকে পাবলিক স্ফিয়ার থেকে প্রাইভেট স্ফিয়ারে নিয়ে গেছে। এটা তাদের সেক্যুলারাইজেশন প্রজেক্টের অংশ। আবার ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে চার্চের প্রতিনিধিত্ব আছে।
বাংলাদেশে কী হচ্ছে? এখানে বলা হয়েছে, আমাদের প্রধান নীতি হবে ধর্মনিরপেক্ষ থাকা। কোনো ধর্মকে আমরা উৎসাহ দেবো না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠের যে ধর্ম, তার প্রভাব রাষ্ট্রীয় চর্চার ওপর পড়ে। হিন্দু ধর্ম বলতে আমরা যে ধর্ম বুঝি, দুইশো বছর আগে তা এ রকম ছিলো না। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক চর্চার মধ্য দিয়ে কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা বলতে চাইলো, উই আর হিন্দু। উই আর অ্যা রিলিজিয়ন। অন্য যেসব ধর্ম সম্পর্কে জানি, যেমন ইসলাম একটা রিলিজিয়ন, যা সেমেটিক ঐতিহ্য থেকে এসেছে। ইসলাম, ক্রিশ্চিয়ানিটি, জুডাইজম—একই সেমেটিক ট্রাডিশন থেকে প্রধান তিনটি ধর্ম এসেছে। আগে হিন্দু বলে আদৌ কিছু ছিলো না। হিন্দুকুশ পর্বতের এ পাড়ে যারা বসবাস করে তাদেরকেই চিহ্নিত করতে পারসিকরা হিন্দ বা হিন্দুস্থান বলা শুরু করেছিলো। মাত্র দুইশো বছর আগে ‘হিন্দু’ নামে একটা ধর্মীয় বর্গ তৈরি হতে থাকে। আরো গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার, তা হলো ক্যাটাগরি হিসেবে ধর্ম বলতে তুমি বা আমি যা বুঝি তা পশ্চিমাদের নির্ধারণ করা। তালাল আসাদ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলেছেন। ‘ফর্মেশন অব সেক্যুলার’ বইয়ে তিনি বলছেন, কীভাবে ধর্মের ক্যাটাগরি ডিফাইন করে বর্গ হিসেবে হাজির হচ্ছে। ধর্ম হিসেবে আমরা ইসলামকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করি, তা পশ্চিমাদের নির্ধারণ করা। অন্য যেকোনো ধর্মের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ধর্ম বলতে বোঝায়, পারলৌলিক বিশ্বাস; সঙ্গে চর্চা। এই সংজ্ঞা দুইশো বছর আগে দেওয়া হয়েছে। এর আগে ছিলো না।
রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক কী হবে তা অমীমাংসিত। এটা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়, আমদানি করার বিষয়ও নয়। তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক পশ্চিমাদের মতো করে একটা সেক্যুলার রাষ্ট্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন। সেক্যুলারাইজেশন প্রজেক্ট নেওয়া হয়েছে আফগানিস্তানেও; অবশ্য সেটা তুরস্কের পরে। তুরস্কে কী করা হয়েছে? ইসলামকে কোনোভাবে উৎসাহ দেওয়া যাবে না। ইসলামিক চর্চাকে কোনোভাবে সমর্থন করা যাবে না। সেক্যুলার চর্চাকে উৎসাহিত করতে হবে। সেক্যুলার চর্চা কোনগুলো? যেগুলোকে আমরা বলি মর্ডানাইজেশন প্রজেক্ট, ইউরোপিয়ানাইজেশন, সেইগুলো। তোমরা মর্ডানাইজেশন থিওরি পড়ো। এর সঙ্গে শিল্পায়ন, নগরায়ন, প্রযুক্তি, নয়া প্রযুক্তি, নতুন মূল্যবোধএগুলোর চর্চা ওই দেশগুলোতে করা হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে সেগুলো ব্যর্থ হয়েছে। মানুষের ধর্মীয় চর্চার ইতিহাস অনেক বেশি লম্বা। জীবন ও সংস্কৃতিকে ধর্মীয় চর্চা থেকে আলাদা করা যায় না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : ইসলাম অর্থ শান্তি। বর্তমানে পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইসলাম আর জঙ্গিবাদ তো সমর্থক হয়ে গেছে। দুইশো বছরের যে ইতিহাসের কথা বলছেন, এটা কখন ঘটেছে?
মামুন : ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম সন্ত্রাসীর ধর্ম, ইসলাম হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক ধর্ম, ইসলাম যৌনতার ধর্মযতো রকমের ধারণা আছে, সবগুলোই আংশিক এবং ভুল ব্যাখ্যা। ইসলাম কখনো শান্তির ধর্ম ছিলো না। ইসলাম শান্তি প্রতিষ্ঠার যে পথগুলো নিয়েছে তা কি শান্তির? শান্তির ধর্ম কে বলছে? কে এটা প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে? সেক্যুলারিস্ট ও আধুনিক রাষ্ট্রের রাজনীতি বলছে, ইসলাম শান্তির ধর্ম। মানে তুমি শান্তিতে ঘরের মধ্যে বসে থাকো। ব্যাপারটা তো তাই! এটা বলা খুবই সমস্যাপূর্ণ। কারণ ইসলাম শান্তির ধর্ম বলার মাধ্যমে আমি ইসলামকে বলতে চাই, তুমি রাজনীতির ধারে কাছে আসবে না। তুমি যে বিশ্বাস নিয়ে থাকো, তাতে রাজনীতিতে আসবে না। কিন্তু ইসলাম কেনো আসবে না? প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষকে রাজনৈতিক প্রাণি যদি আমি বলি, তার সব কার্যক্রম ও প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক হয়, তাহলে কেনো ইসলাম রাজনীতি করবে না?
ইসলাম সবসময়ই রাজনীতি করেছে। মক্কা থেকে যখন মদিনায় হিজরত হচ্ছে, সেটা ভীষণ রকম রাজনৈতিক। ইসলাম শান্তির ধর্ম হলে তো, গৌতম বুদ্ধের মতো সব বাসনার বিনাশ ঘটিয়ে নির্বাণ লাভের কথা বলতো। সুতরাং আমাদের এই আর্টিকুলেশনগুলো সমস্যাপূর্ণ। রিলিজিয়ন বা সেক্যুলার—পলিটিকাল স্ফিয়ারে আমরা কীভাবে হাজির হবো, তার কিছু মান ঠিক করা দরকার। সবাইকে নিয়ে বসে আমাদের মানগুলো ঠিক করতে হবে। যেমন : বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটা ভিত্তিমূলক মান হওয়া দরকার, বাংলাদেশ একটা স্বাধীন রাষ্ট্র। মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে এর ফাউন্ডিং ন্যারেটিভ। মুক্তিযুদ্ধ যে স্বীকার করে না, তার সঙ্গে কোনো আলাপ চলতে পারে না। এ দেশে অসংখ্য রকমের জাতি ও জনগোষ্ঠী বাস করে। তুমি তোমার ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে পারো। কিন্তু তুমি অন্য ধর্মকে খারিজ করতে পারো না। অন্য ধর্মের মানুষ দেশে থাকবে নাযেমনটা বি জে পি বলে, এটা তুমি করতে পারবে না। আমি যে আর্টিকুলেশনগুলো করতে পারি—রিলিজিয়াস অথবা নন-রিলিজিয়াস, তার একটা সীমা থাকবে। সেগুলো সবাই মিলে দরকষাকষির বিষয়। এটাই করা হয়নি; কিন্তু করা দরকার। তাই ইসলাম শান্তির ধর্ম কিংবা সন্ত্রাসীর ধর্ম, দুটো ধারণাই সমস্যাপূর্ণ। ইসলামের মধ্যে দুটো বিষয়ই আছে। কোনটা ব্যবহার করছো, কীভাবে ব্যবহার করছো, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামকে সন্ত্রাসীর ধর্ম বলার ইতিহাস একদিনের না। তুমি যদি এডওয়ার্ড সাঈদের ‘অরিয়েন্টালিজম’ পড়, সেখানে দেখবে ইউরোপের মহৎ মহৎ বুদ্ধিজীবীরা যেমন ভলতেয়ার, ইসলাম সম্পর্কে কী বলছেন? অন্যরা কী বলছেন? জঘন্য জঘন্য সব কথা!
ম্যাজিক লণ্ঠন : ৮০’র দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের সময় ইসলামপন্থিদের সঙ্গে আমেরিকার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এখন তো আমেরিকা তাদের জঙ্গি বলছে।
মামুন : ভারতীয় উপমহাদেশে জিহাদের ধারণা বেশ পুরনো। ইসলামি চিন্তায় আত্মঘাতী হওয়ার যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেখানে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। মওদুদিরও অনেক আগে জিহাদের ধারণা পাওয়া যায়। বালাকোটে শিখদের সঙ্গে যুদ্ধ, যা ওহাবি ট্রাডিশন নামে পরিচিত। আমাদের এখানে তিতুমীর এলো। যদিও এটাকে আমি ওহাবি ঐতিহ্য বলে মনে করি না। ওই সময়ে জিহাদের ধারণাগুলো আসতে শুরু করে। ঠিক আসতে শুরু করেছে বলা ঠিক হবে না, মূলত এই ধারণাগুলোর চর্চা শুরু হয়েছে। এটা সম্রাট আকবরের সময়ও ছিলো। ব্রিটিশ আমলে নতুন করে আর্টিকুলেশন ঘটেছে—খিলাফতের দাবিতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তখন জিহাদের ধারণাগুলো তৈরি হচ্ছে। তবে এ সময় আলীগড় আন্দোলনসহ অন্য যেসব আন্দোলন গড়ে উঠছে, তা জিহাদি ঐতিহ্যের বাইরে। যেমন : আমাদের এখানে নবাব আবদুল লতিফের যে ধারা, তা আলীগড় আন্দোলনের সমর্থক। তারা বলছে, ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা করো, নিজেদের শিক্ষিত করো, চাকরি করো। এর বাইরে আরেকটা দেওবন্দকেন্দ্রিক ঐতিহ্য, যারা এর বিরুদ্ধে ছিলো। এখন তাদের সমর্থক হেফাজতে ইসলাম। ওই সময় থেকে এখানে জিহাদের ধারণা তৎপর।
ওহাবি ট্রাডিশনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এরা ভীষণভাবে আচারনিষ্ঠ। স্ক্রিপ্টের বাইরে আর কোনো ধর্ম নেই। ধর্ম বলতে স্ক্রিপ্টটা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। এটা হচ্ছে তার বিধান। আফগানিস্তানে যেটা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা হচ্ছে ট্রাইবালিজম। শব্দটা হচ্ছে আসাবিয়া, যার অর্থ ভ্রাতৃত্ব। ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্ক, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে সম্পর্ক। আসাবিয়া সেখানকার প্রধান উপাদান। আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আসাবিয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের এখানকার ভাইয়েরা, বোনেরা, জনগণ দিয়ে এটি বোঝা যাবে না। ট্রাইবালিজমে কৌমের লোক আর কৌমের বাইরের লোক সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কৌমের লোকেরা মিলে এমন একটা সম্পর্ক তৈরি করে, যেখানে কাউকে হত্যা করা হলে কৌমের আরেক সদস্য তার বদলা নেয়। তাদের নীতি রক্তের বদলা রক্ত। এটা আফগানিস্তানে রয়েছে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন আফগানিস্তান দখল করে, তখন এটাকে ব্যবহার করা হয়েছে। জিহাদি চর্চার নতুন ডাইমেনশন তৈরি হয়েছে। এটা একটা নতুন যুগ। নিউ টাইপ অব জিহাদ। আগের যুগের যে জিহাদঔপনিবেশিক আমলে ছিলো, তারও আগে মুঘল আমলে ছিলো, তার থেকে এই নতুন জিহাদিরা একবারেই আলাদা। বিন লাদেনকে কেন্দ্র করে যে জিহাদি তৎপরতা শুরু হলো, সেটা ডিজেনারেশন হয়ে আল-কায়েদার পরে হলো তালেবান। ভয়ঙ্করভাবে অন্ধ একটা জনগোষ্ঠী। আল-কায়েদা খুবই আধুনিক। লাদেন কোথায় কোথায় পড়েছে? টুইন টাওয়ারে যারা হামলা করেছে, তারা কী করে? রাতে কোথায় খায়? কোথায় ঘুমায়? বান্ধবীর সঙ্গে কোন ধরনের ড্রিংকস নিতে পছন্দ করে? ঔপনিবেশিক আমলের জিহাদি এবং এই জিহাদিদের বৈশিষ্ট্য একেবারেই আলাদা। এদের প্রশিক্ষণসহ সবই ঘটেছে আধুনিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে। এটা একবারেই পরিষ্কার।
ম্যাজিক লণ্ঠন : বাংলাদেশে স্টেরিওটাইপ ধারণা আছে, জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িতরা মাদ্রাসা থেকে আসে, আধুনিক শিক্ষা নেয় না, দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কিন্তু হলি আর্টিজান হামলার সঙ্গে জড়িতরা তো ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা করেছে, ধনী পরিবারের সন্তান।
মামুন : এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় যুক্ত। আমার কাছে অলিভার রায়ের (ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক) ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। তিনি বলছেন, ‘আমরা আধুনিক জীবন বলে যা যাপন করি, তুমি, আমি, উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা, সে জীবন সম্পূর্ণ অর্থহীন। জীবনে বড়ো কোনো লক্ষ্য নেই। কোনো স্বপ্ন নেই, যা পূরণ করা দরকার। কোনো বাসনা নেই, যা পূরণ হয়নি। এবং যা ভীষণভাবে বিচ্ছিন্ন (আইসোলটেড)।’
এ সময়ে যে জীবনযাপন-সমাজ, রাষ্ট্র, মিডিয়া প্রভৃতির যে অ্যারেজমেন্ট, তার দুটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। শরীর হচ্ছে সিঙ্গুলার, নিরাপদ, সতীত্ব—ধারণাগুলো অচল হয়ে গেছে। ঠিক কি না? এ সময়ে সহিংসতার নানারকম চর্চা তুমি দেখতে পাবে। অলিভার রায় বলছেন, আজকের যে নতুন প্রজন্ম, যে যুব সমাজ তৈরি হচ্ছে, তাদের মধ্যে সহিংসতা একটা সাধারণ প্রবণতা। যেকোনোভাবে নিজেকে জাহির করা। সে নিজে মারা যাচ্ছে কিংবা কাউকে মেরে টুকরো টুকরো করে রেখে দিচ্ছে।
আই এস-এর ক্ষেত্রে যেটা ঘটছে—বহু ছেলেমেয়ে আছে যারা ধর্মীয় ট্র্যাকটা ব্যবহার করছে। আই এস-এ যারা যোগ দিয়েছে, তারা কারা? আই এস-এর বেশিরভাগ সৈন্য কোথা থেকে এসেছে? ইউরোপ থেকে গেছে বেশিরভাগ; বেলজিয়াম থেকে, অস্ট্রিয়া থেকে, ফ্রান্স থেকে গেছে। অস্ট্রিয়ান ব্রিগেড, ফরাসি ব্রিগেড—এ রকম একেক ব্রিগেডের সৈন্য আছে সেখানে। এরা কোন প্রজন্মের মুসলিম? এরা দ্বিতীয় প্রজন্মের মুসলিম।
অলিভার রায় পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বলছেন, তাদের বাবা প্রথম মুসলিম হয়েছে। ফলে জন্মগতভাবে তার ছেলে মুসলিম। অথচ সে ইউরোপীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু ওই সংস্কৃতি থেকে সে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ইসলামের সঙ্গেও তার যে রুট থাকার কথা তা নেই। রুটেড ট্রাডিশনের কথা তালাল আসাদের লেখায়ও তুমি পাবে। ফলে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ তাকে সবসময় তাড়া করতে থাকে। সে সহিংসতার সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন করতে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটা ঘটেছে। হলি আর্টিজেনের ঘটনায় ওই ছেলেগুলো ধর্মীয় কারণে মিসগাইডেড বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, আমি তা মনে করি না। অন্য যেকোনোভাবে কথিত মিসগাইডেড হতো তারা। এটা মসজিদে যেমন হতে পারে, পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতেও হতে পারে, আরো অনেক জায়গায় হতে পারে। সংস্কৃতির সঙ্গে বিযুক্ত যে জনগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে, তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। সহিংসতা তার কাছে একটি ভাষা হয়ে ওঠে। সহিংসতা তার কাছে প্রকাশের একটি ভাষা। কাল একটা রিপোর্ট এসেছে, দেখেছো বোধহয়, র্যাম্প মডেল থেকে জঙ্গি। সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী পরিবর্তন কীভাবে হয়? সহজেই হয়। ওর কাছে র্যাম্প থেকে যে আনন্দ, সেই একই আনন্দ সহিংসতা থেকে। সহিংসতা আনন্দ তৈরি করে। ভীষণ আনন্দ তৈরি করে।
বেহেশতে যাচ্ছি বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, যেমনটা হলি আর্টিজানের ক্ষেত্রে। সেখানে হামলাকারীরা বলছে, আমরা একটু পরই বেহেশতে চলে যাবো। তুরীয় যেকোনো অবস্থা, যেমন : তোমার যদি তীব্র জ্বর হয়, তাহলে হ্যালুসিনেশন তৈরি হয়। সেটাই তাদের মধ্যে হয়েছে। হলি আর্টিজান হামলার সবচেয়ে বড়ো যে বৈশিষ্ট্য, তা হলো আই এস বা ইসলামি জঙ্গিবাদ বলে যে জিওগ্রাফি এতদিন ছিলো, তার সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত ছিলো না। এ হামলা বাংলাদেশকে সেখানে যুক্ত করেছে। হলি আর্টিজান কোনো স্থানীয় ঘটনা নয়, এটা বৈশ্বিক ঘটনা। বৈশ্বিক জিহাদের অর্থ ও বিস্তৃতি থেকে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে হবে। বৈশ্বিক জিহাদের অর্থকে অবশ্যই পাঠ করতে হবে সমসাময়িক অর্থনীতি ও রাজনীতির অবস্থান থেকে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : বিষয়টি আর একটু ব্যাখ্যা করবেন?
মামুন : বর্তমানে এথনিক আইডেনটিটি ইজ পলিটিকাল আইডেনটিটি। এটি তৈরি করা পরিচয়। এটি বিশুদ্ধ কোনো পরিচয় নয়। তুমি কি বাঙালি? তুমি কতো বছর আগে থেকে বাঙালি? তোমার দাদার কাছে জিজ্ঞাসা করো, সে বলবে আমি জানি না। কারণ সে বাঙালি ধারণাই জানে না। বাঙালি ধারণাটাই তৈরি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ বছর আগে। জাতিগত পরিচয়ের যে দাবি আমরা করি, তা ভীষণভাবে রাজনৈতিক এবং নির্মিত একটি ধারণা। এ ধারণাগুলো রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে তৈরি হয়। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই জড়িত। বাঙালি কেনো এই ধারণা তৈরি করলো?
ম্যাজিক লণ্ঠন : জাতি, রাষ্ট্র গঠনের জন্য?
মামুন : অবশ্যই। তা ছাড়া আর কেনো? বাংলাদেশের মুসলমানরা কেনো বাঙালি ধারণা নিয়ে যুদ্ধ করতে গেলো?
ম্যাজিক লণ্ঠন : পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য।
মামুন : ভীষণভাবে অর্থনৈতিক স্বার্থ থেকে। ইসলামি জঙ্গিবাদ ধারণাটাও একইভাবে সক্রিয়। এটা অর্থনীতির একটা অপরিহার্য ক্যাটাগরি। আধুনিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির এটা অপরিহার্য ক্যাটাগরি। এখানে আই এস আসতেই থাকবে, বাংলাদেশ যুদ্ধ করতেই থাকবে। বাংলাদেশ বলতেই থাকবে এখানে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেই।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, এটার কারণ কী মনে হয় আপনার কাছে?
মামুন : কারণ খুব পরিষ্কার। আলী রীয়াজসহ অনেকেই বলছেন, সরকার কেনো স্বীকার করছে না, তাতে আমাদের লাভ হবে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে অসুবিধা হবে। সরকার বার বার বলছে, এরা নব্য জে এম বি। হয়তো এরা কোনোভাবে আই এস-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে পোশাক-আশাক নিয়ে অভিযান চালিয়েছে। হলি আর্টিজানের ঘটনা অনলাইনে প্রথম কে কাভার করছে? সিএনএন লাইভ করছে। বাংলাদেশের কোনো টেলিভিশন লাইভ করেনি। তথ্যটা লিক করেছে কে? রিটা খাজ (Rita Katz)। তাই না? রিটা খাজ কে? এ খবরগুলো নিশ্চয় রাখো?
ম্যাজিক লণ্ঠন : হ্যাঁ, রিটা খাজ, সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের প্রধান।
মামুন : হলি আর্টিজেনের ঘটনা সিএনএন-এ লাইভ হচ্ছে, অথচ বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলো সম্পূর্ণ ব্ল্যাক আউট। এ ঘটনা তুমি কীভাবে ব্যাখ্যা করবে? এটার উদ্দেশ্য কী ছিলো? এই যে হিউজ কাভারেজ। এর উদ্দেশ্য কী? সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক অর্থাৎ ইসলামি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করা। এভাবে যুক্ত করলে কার লাভ বেশি? আমাদের মিলিটারির বেশি। মিলিটারির একটা বড়ো অংশের লাভ বেশি। আমাদের প্রতিবেশীদের বেশি। বাইরের কারো স্বার্থ বেশি। বৈশ্বিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বাংলাদেশকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে স্বার্থটা কোথায় বেশি? আমাদের দক্ষিণ দিকে, সাগরে—সাগরের সম্পদ দখল, বন্দর করার জন্য, ঘাঁটি করার জন্য। এখানে আই এস আছে, প্রমাণ করতে পারলে, এগুলো করার ন্যায্যতা তারা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশ আগেই তাদের সাফ বলে দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এখানে খুব কৌশলী হয়েছে। আসলে তার সামনে আর কোনো পথও ছিলো না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : সরকার তো তাহলে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে।
মামুন : সরকার বোধ হয় সবসময় দুই দিকের সঙ্কটের মধ্যে থাকে। তার কোনো উপায় থাকে না। যেমন : ইসলামের প্রশ্নে হেফাজতকে মেরে তাড়িয়ে দেয়, পরে তাদের সঙ্গে দরকষাকষি করে। ব্যাপারটা হচ্ছে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার কথা ভাবতে হয় সবসময়। বাংলাদেশে যে সরকারই থাকুক না কেনো, তাদেরকে এভাবেই অস্তিত্ব রক্ষার কথা ভাবতে হয়।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, আপনার কী মনে হয়, হলি আর্টিজানের ঘটনা আত্মঘাতী হামলা?
মামুন : আত্মঘাতী হামলা বলতে আমরা কী বুঝি? সবচেয়ে বেশি আত্মঘাতী হামলা হয়েছে শ্রীলঙ্কায়, এল টি টি ঘটিয়েছে। এরপর ঘটেছে ফিলিস্তিনে। আত্মঘাতী হামলার চরিত্র কী? এমন তীব্র ক্ষমতার চাপ, যেখানে আমার আর কোনো প্রকাশের সুযোগ নেই। সেখানে আমার শরীরকে একটা বোমা বানাবো, যাতে ওই ক্ষমতার বিরুদ্ধে সহিংস প্রকাশ ঘটে। বাংলাদেশে কি এমন পরিস্থিতি আছে? আমরা শুনেছি, গুলশান লেকের পিছনের দিকে একটা নৌকা ছিলো। কিন্তু সেই নৌকার গল্প আর আমরা জানি না। হামলার পর তারা ওই নৌকায় করে পালিয়ে যেতে পারতো। আসলে ওই রকম পরিস্থিতিতে নানান কিছু ঘটে। এ সময়ে যে হামলাগুলো হচ্ছে, তাতে তারা মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়েই যাচ্ছে। আই এস-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কিছু মানুষ এটা করছে। এই অর্থে এটাকে আত্মঘাতী হামলা বলা যায়।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনার তত্ত্বাবধায়নে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ এবং গণমাধ্যমে এর উপস্থাপনা নিয়ে মাস্টার্স-এ একটা থিসিস হয়েছে শুনেছি, সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে কী ফলাফল পাওয়া গেলো? তার আগে বৈশ্বিক গণমাধ্যমে জঙ্গিবাদ কীভাবে উপস্থাপন হয়, সে বিষয়েও একটু জানতে চাই।
মামুন : জঙ্গি যদি একটা ক্যাটাগরি হিসেবে ভাবি, তাহলে এটা একটি নেতিবাচক ক্যাটাগরি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি আরো নেতিবাচক। আমাদের ইতিহাসের মধ্যে ইসলাম, যদিও সেটা ইসলাম বলা যায় না, জামায়াতে ইসলাম একটা কলঙ্ক হিসেবে রয়েছে। যারা পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে মিলে এমন একটা ধর্মীয় ন্যারেটিভ ব্যবহার করেছে, যেখানে বলা হয়েছিলো, পাকিস্তান রক্ষা করা মানে ধর্ম রক্ষা করা। ধার্মিক হওয়া মানে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করা। ফলে এদের প্রতি একধরনের নেতিবাচক ধারণা আগে থেকেই ছিলো।
এখন যখন জঙ্গি ধারণাটা আসছে, এটাকে খারিজ করে দেওয়া এবং নেতিবাচক রিপ্রেজেন্টেশনের মধ্যে রাখা—একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। পশ্চিমা বিশ্বে বহুদিন থেকেই ইসলাম নেতিবাচক রিপ্রেজেন্টেশনের শিকার। ৯/১১ পরবর্তী সময়ে এটা আরো বেড়ে গেছে। এটি সেখানকার বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে পপুলার মোবিলাইজেশনের একটি উপাদান। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের একটা অর্থনীতি রয়েছে। এটাকে বলা হয় লো ইনটেনসিভ ওয়ারফেয়ার। আধুনিক সমাজে আর কোনো বড়ো যুদ্ধ হবে না। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে আর যুদ্ধ হবে না। যুদ্ধ হবে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে। বিভিন্ন গোষ্ঠী, দল, সংগঠন বিভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধ করবেবিভিন্ন ধারণাকে কেন্দ্র করে। এ রকম একটা ইস্যু হচ্ছে জঙ্গি, যেটা বৈশ্বিক যুদ্ধ, লো ইনটেনসিভ ওয়ারফেয়ার এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভিতরে যুদ্ধ। যেমন : মাদকবিরোধী যুদ্ধ, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ। এ রকম যুদ্ধগুলো চলছে, চলতে থাকবে। এ যুদ্ধের অর্থনীতি খুব কৌতূহলোদ্দীপক। যুদ্ধের জন্য সাবজেক্ট লাগবে। যুদ্ধ করা মানে এর জন্য জঙ্গি তৈরি হতে হবে। যেহেতু মানুষ শোষিত, নির্যাতিত তাদের কেউ কেউ জঙ্গি হয়, কেউ নিজেই উৎসাহ নিয়ে হয়। কেউ এই ন্যারেটিভের মধ্যে পড়ে হয়। জিহাদিরা যেমন কাউকে উসকে দিয়ে সেখানে নিয়ে যেতে পারে, আবার অন্যরাও তাকে জিহাদের পথে নিয়ে যেতে পারে।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে আমেরিকায় যা ঘটে, তা হলো ব্যাপক প্রচারণা, সেখানে গণমাধ্যমের ব্যাপক সমর্থন থাকে। এর অনেকগুলো দিক আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বড়ো অঙ্কের তহবিল আছে। গবেষকরা এ নিয়ে গবেষণা করছে। আমাদের আলী রীয়াজ যেমন গেছেন এবং কাজ করছেন। বহু অস্ত্র-কোম্পানি অস্ত্র তৈরি করছে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের জন্য। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার যে খাত, সেটার বিশেষ একটা নাম আছে, সেটা বাস্তবায়ন হতো না, যদি ৯/১১ না ঘটতো। সেই পরিকল্পনায় সরকার ও কোম্পানিগুলোর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর সঙ্গে মিডিয়ার ব্যবসা আছে। এসব ব্যবসায়িক স্বার্থ, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, একটা এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখা—এগুলো জঙ্গি ডিসকোর্সের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর ফলে হয় কি, প্রাধান্যশীল গণমাধ্যমে অত্যাবশ্যকভাবে এর একটা নেতিবাচক রিপ্রেজেন্টেশন ঘটে। রিয়েল স্টোরিগুলো, রিয়েল নিউজগুলো আমাদের জানা দরকার; কিন্তু সেটা কখনোই জানা হবে না। সেগুলো আমরা দেখতে পারবো না, বুঝতেও পারবো না। যে স্টোরিগুলো হবে, সেগুলো শুধু পপুলার মোবিলাইজেশনের জন্য, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে।
দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশেও একই ঘটনা ঘটে, যদিও এটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এখানে দুটো বিষয় রয়েছে—এক. এখানে মিডিয়া ব্যবহৃত হয় ব্যবসার স্বার্থে এবং তাদের ভাবাদর্শও পশ্চিমাপন্থি। দুই. পাকিস্তানকে নিয়ে আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আছে, যেখানে ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিলো। ফলে আগে থেকেই ধর্ম সম্পর্কে আমাদের একটা নেতিবাচক ধারণা আছে।
শাহবাগ আন্দোলনের সময় স্লোগান দেওয়া হয়েছে, হেফাজত ও জামায়াত এক। হেফাজত ইসলাম হচ্ছে র্যাডিকাল ইসলাম। অথচ, হেফাজত ও জামায়াতের বৈশিষ্ট্য, স্বভাব, সম্পর্ক একেবারেই আলাদা।
ধানমন্ডি ৩২-এর মাথায় যে ঘটনা ঘটলো তা রিয়েল না কি নির্মিত? পুলিশের ওপর এখন অনেক চাপ আছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে নিম্নতর পর্যন্ত, উৎসাহও আছে। তুমি যখন জঙ্গি অভিযানে সফল হও, তার মানে তুমি কয়েকটা পুরস্কার পাবে। পকেটে ফেনসিডিল দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার অনেক উদাহরণ আছে এ দেশে। ঈদের আগে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে আগের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বাংলাদেশে প্রতিবার ঈদের আগে গ্রেপ্তার বাণিজ্য হয়। জঙ্গিও একটা বাণিজ্যের অংশ। পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা সরকারকে এভাবে খুশি রাখতে চায়; দেখায়, তারা কতোগুলো জঙ্গি মেরে ফেলেছে। নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও এতে উৎসাহী হয়, তারা পুরস্কার পাবে। এভাবে অনেক ঘটনা ঘটে। অনেক ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, কেনো এগুলো ঘটেছে। পোড়া লাশের কঙ্কাল ছাড়া আমরা আর কিছুই দেখতে পাই না। ঘটনার কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই, ব্যাখ্যা নেই।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এ বিষয়ে তো র্যাব ও পুলিশের মধ্যে দ্বন্দ্বও হচ্ছে।
মামুন : শুধু এ নিয়ে কেনো, ফরহাদ মজহারকে খুলনা থেকে কে ধরে আনবে তা নিয়ে র্যাব-পুলিশের দ্বন্দ্ব হয়েছে! দ্বন্দ্বটা কেনো? কারণ এটা আমি করেছি, এটা আমার কৃতিত্ব; সাফল্য দেখানোর জন্য। গল্প সাজানো ও গল্প দেখানো একই প্রক্রিয়ার অংশ। শুধু তাই নয়, এটা আমাদের রাজনীতিরও অংশ। আমাদের এই এলাকায় (রাজশাহী) জঙ্গিদের যে উত্থান ঘটেছে—জে এম বি বা জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ—এর পিছনে ব্যাখ্যা কী?
ম্যাজিক লণ্ঠন : আলী রীয়াজ তার একটি বইয়ে এজন্য তৎকালীন বি এন পি-জামায়াত জোট সরকারকে দায়ী করেছেন।
মামুন : তাদের সঙ্গে চুক্তিটা কী? জে এম বি’কে এখানে আনার শর্তটা হলো, তারা এখানে যেসব র্যাডিকাল উপাদান আছে, সেগুলোকে নিশ্চিহ্ন করবে। আওয়ামী লীগের দাপট একেবারে ধুলিসাৎ করবে। এগুলো নিয়ে যখন টানাপড়েন হয়েছে, গণমাধ্যমে সংবাদ আসার কারণে যখন অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তখন তাদের দমন করা হয়েছে। এখানকার রাজনৈতিক চর্চার সঙ্গে সহিংসতার সম্পর্কটা দেখার বিষয়। রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে সহিংসতাকে ব্যবহার করে। এখন তুমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারো না, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন লবি জঙ্গিদের ব্যবহার করে না। শিবিরের সঙ্গে যে বিজনেস ডিল, তাদের নিপীড়নের প্রক্রিয়া, পুলিশ যেভাবে শিবিরের নেতা-কর্মীদের ঘরে থাকতে দেয় না, তার সঙ্গে যে অর্থনীতি, এগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
জঙ্গি ধারণা শুধু ভাবাদর্শগত নয়—যেমন, এ রাষ্ট্র ভালো নয়, ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করতে হবে—কেবল এ ধরনের ধারণা থেকে জঙ্গি তৈরি হচ্ছে, এ রকম সরল ন্যারেটিভ সঠিক নয়। আবার ইসলাম শান্তির ধর্ম কিংবা ইসলাম সন্ত্রাসীর ধর্ম—এ ন্যারেটিভও ভুল। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে দুইটা ট্র্যাকই ব্যবহৃত হয়।
ঔপনিবেশিক যুগের দিকে যদি তুমি ফিরে তাকাও, সেখানে দেখবে ধর্ম কী অর্থে ব্যবহার হচ্ছে? গৌতম ভদ্রের ‘ঈমান ও নিশান’ যদি পড়ে থাকো, পার্থ চ্যাটার্জি কিংবা রণজিৎ গুহের লেখা যদি পড়ে থাকো, তাহলে দেখবে বাংলার কৃষক বিদ্রোহে ধর্মের ভূমিকা অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের ভূমিকা খুবই র্যাডিকাল ও ইতিবাচক। ধর্ম এখানে ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। আমি বলি অধর্ম করবো না, অর্থাৎ অন্যায় করবো না। রাজার ধর্ম প্রজা পালন করা। প্রজার ধর্ম রাজাকে অনুসরণ করা। এখন রাজা যদি প্রজা পালন না করেন, তাহলে তিনি প্রজাবৎসল নন। তিনি সত্যিকারের ভালো রাজা নন। তিনি অধর্ম করছেন, তার বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে। এখানকার কৃষকরা এই জিহাদ করেছেন। ধর্মের ওই ব্যবহার এ সময়েও হতে পারে। অন্য অসংখ্য দেশেও নিম্নবর্গের মধ্যে সংহতি গড়ে তুলতে ধর্ম সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের দেশগুলোতে ওই ভাবাদর্শ কিছু কিছু ক্ষেত্রে থেকে যেতে পারে। কিন্তু সেটাকে অপব্যবহারের জন্যও চারদিকে বহু রকমের মেকানিজম সক্রিয় রয়েছে।
আমাদের এখানে গণমাধ্যমে জঙ্গিদের নির্মাণ ভয়ঙ্করভাবে নেতিবাচক, আংশিক ও প্রচারণায় ভরপুর। প্রচারণার বাইরে গণমাধ্যমের দিক থেকে অনুসন্ধানের কোনো আগ্রহ এ পর্যন্ত দেখা যায়নি। পুলিশ ও র্যাব যে ন্যারেটিভ সরবরাহ করে, তার বাইরে তারা খুব একটা যায় না। যখন কোনো পরিবার দাবি করে, কেউ হারিয়ে গেছে, পাওয়া যাচ্ছে না, তখন একটা ফলোআপ রিপোর্ট হয়। তার পর ওই ঘটনা হারিয়ে যায়। এর অর্থ হলো এখানকার জঙ্গি ধারণা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে সাধারণ মতৈক্য তৈরি হয়েছে, সে ধারণার বাইরে আমরা যাচ্ছি না। এটা ভয়ঙ্কর খারাপ দিক। তবে আরেকটা কথা, যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা তুমি করছো না-বাংলাদেশ কি কোনো জঙ্গি রাষ্ট্র হয়ে উঠতে যাচ্ছে? বাংলাদেশ কি ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে উঠবে? পশ্চিমাদের কাছে শাহরিয়ার কবির, তথাকথিত নাস্তিক বা অন্যদের বিক্রির প্রধান উপাদান কি? বাংলাদেশে কি ইসলামি চর্চার তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছে? আলী রীয়াজের ভাষায়, জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যাচ্ছে। এটা একটা হুমকি। সমাধান কী? সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রায় এ রকমই যে, অবশ্যই মিলিটারি দিয়ে দমন করতে হবে। এটাই হচ্ছে সাধারণ মতৈক্যের ধারণা। বেড়ে যাচ্ছে বলতে তারা বোঝায়, জঙ্গিরা ধর্ম দিয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছে; ধর্ম তাদের বিভ্রান্ত করেছে। তারেক মাসুদের রানওয়ে নিয়ে আলোচনায় আমি এ রকম একটা জায়গায় সমালোচনা করেছিলাম।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে রাজনৈতিক উপায়ে, কোন কোন মেকানিজম ব্যবহার হচ্ছে? বলা হচ্ছে, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যায় বিভ্রান্তি অবশ্যম্ভাবী, ধর্মের ভিতর থেকে বিভ্রান্তির উপাদান আসছে; কিংবা বলা হয়, কিছু মানুষ, রাজনৈতিক দল তাদের স্বার্থে এটা করছে। সেই মানুষ ও দলগুলোও ধার্মিক। আমার কাছে ব্যাপারটা একদমই তা মনে হয় না। আধুনিক রাষ্ট্র, দল ও ইন্টারেস্ট গ্রুপগুলো এখানে জড়িত থাকে। তাদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া বাংলাদেশে যে চর্চাগুলো হচ্ছে, তা হতে পারতো না। জঙ্গিদের অর্থায়নের উৎস কী? বলা হয়ে থাকে, এর উৎস সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ। আমার কাছে এটাও ঠিক মনে হয় না। সি আই এ এখানে বড়ো ফান্ড দিতে পারে। সঙ্গে আরো অনেক এজেন্সি এ কাজ করতে পারে। তাদের এখানে একটা জঙ্গি ফিল্ড দরকার। সি আই এ যেভাবে আই এস’কে সহায়তা করেছে, রক্ষা করে গড়ে তুলেছে, বিন লাদেনকে যেভাবে রক্ষা করেছে, গড়ে তুলেছে, সেখানে তুমি কীভাবে অস্বীকার করতে পারো বাংলাদেশে যা ঘটছে, সেখানে সি আই এ এবং অন্য এজেন্সি যুক্ত নেই।
(চলবে)
জাহাঙ্গীর আলম, প্রথম আলো পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
alam_rumc05@yahoo.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন