আনতারা সোনিয়া
প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘ফেলেনি’ : কল্পনা ও বাস্তবকে এক করেছেন যিনি
আনতারা সোনিয়া

জীবন, ভালোবাসা আর ফেলেনি
অভিব্যক্তি প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম চলচ্চিত্র। যেহেতু শিল্পের সবগুলো মাধ্যম চলচ্চিত্রের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট, তাই অভিব্যক্তি প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র। আর শিল্প এবং জীবন তো একে অন্যের পরিপূরক। তাই শিল্প (art) হিসেবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জীবনের যোগসূত্র স্থাপন না হলে, চলচ্চিত্র প্রাণহীন বাজারি পণ্যে পরিণত হয়। কোনো কোনোভাবে মানুষ, জীবন ও মানবিকতা চলচ্চিত্রের অংশ হয়ে উঠলেই তা পায় অনন্যতা। অন্যদিকে সততা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সত্যের প্রতি আস্থা প্রতিষ্ঠা হলে মানবজীবন হয় সুন্দর ও মধুময় এবং পৃথিবীতে নেমে আসে স্বর্গীয় শান্তি। এজন্য সৃষ্টিকে ভালোবাসা, স্রষ্টাকে ভালোবাসারই অংশ। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, নিজের ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা, নিজেকে আবিষ্কার করা, সদিচ্ছা, সৎ অনুভূতি আর নিজের আদর্শে প্রগাঢ় আস্থা নিয়ে যিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, নির্মাতা হিসেবে তিনিই হয়ে ওঠেন অনন্য। সেরকমই একজন নির্মাতা ফেদেরিকো ফেলেনি।
ফেলেনি : ‘সিনেমাই যার জীবন’
মানুষ জন্ম নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে অবস্থান করে। তবে এমন অনেকেই নিজ নিজ কৃতকর্ম দিয়ে বেঁচে থাকে অনেককাল। যদিও কথায় আছে, ভোরের সূর্যই বলে দেয় দিনটা কেমন যাবে, কিন্তু সত্যিই কি এটা বলা সম্ভব! মাত্র ১২ বছর বয়সে যে শিশুটি বাড়ি থেকে পালিয়ে সার্কাসে যোগ দিয়ে জেব্রা দেখাশোনা করতো; সেই আবার তরুণ বয়সে আইন পড়েছে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছে গোটা ইতালি; তাদের জন্য ছবিও এঁকেছে। আবার নিজ দেশ ইতালিতে মার্কিন সেনা অনুপ্রবেশ করলে, ‘মজার মুখ’ নামে দোকান খুলে সৈন্যদের ব্যঙ্গ ছবি আর পোট্রেট এঁকেছেন। এমন কী, নিদারুণ দরিদ্রতায় এই লোককে রেস্টুরেন্টে বসে স্কেচ আঁকতে হয়েছে, কাজ করতে হয়েছে ক্যাফেতেও। দিন শেষে আবার এই মানুষটি সূর্যের মতো প্রতাপ নিয়ে আলো ছড়িয়েছেন সারাবিশ্বের চলচ্চিত্র আকাশে। তিনি ফেদেরিকো ফেলেনি। এক জীবনে অস্কার জিতেছেন পাঁচবার। তাত্ত্বিক, সমালোচকরা বলে, তার চলচ্চিত্রে কোনো দার্শনিক জিজ্ঞাসার উত্তর নেই। তিনি ঈশ্বরকে অনুসন্ধান করেননি, ঈশ্বরের সৃষ্টিকে ভালোবেসেছেন। আবার ফেলেনি নাকি ঠিক যতখানি দার্শনিক, ঠিক ততখানিই কবি।
ফেলেনির জন্ম ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ২০ জানুয়ারি, ইতালির রিমনির মধ্যবিত্ত এক পরিবারে। তার বাবা উরবানো ফেলেনি (Urbano Fellini) পেশায় ছিলেন ফেরিওয়ালা। মা ইডা বারবিয়ানি (Ida Barbiani) রোমের বুর্জোয়া ক্যাথলিক পরিবারের মেয়ে। স্কুল ও কলেজের পড়াশোনা শেষ করে ফেলেনি নিজের নয়, বাবা-মায়ের ইচ্ছায় ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব রোম-এ; আইন বিষয়ে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল ভর্তিই হয়েছিলেন ফেলেনি, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হননি একদিনও। তখন চারদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটা। এই দেখে কী ফেলেনি বসে থাকতে পারেন! ভ্রাম্যমাণ এক নাটকের দলের সঙ্গে পুরো ইতালি ঘুরে এসে ফ্লোরেন্সে থেকে যান তিনি। সেখানে কিছুদিন থাকার পর তিনি আবার রোমে ফিরে আসেন। এবার ফেলেনি কাজ শুরু করেন হিউমার ম্যাগাজিন ‘মার্ক অরেলিউ’র লেখক ও চিত্রশিল্পী হিসেবে। পাশাপাশি তিনি রেডিওতে নাটক লিখতেন। রেডিওতে কাজ করার সূত্রেই ফেলেনির সঙ্গে জুলিয়েত্তা মাসিনা (Giulietta Masina) নামে এক নারীর আলাপ হয়। পরে ওই নারীকে বিয়ে করেন ফেলেনি।
একই বছর ফেলেনি ‘Il Piccolo’ ও ‘Il Popolo di Roma’ নামে দুটি পত্রিকায় শিক্ষানবিশ প্রতিবেদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে ফেলিনির কাজ ছিলো, স্থানীয় আদালত থেকে সংবাদ সংগ্রহ করা। অল্প সময়ের মধ্যে এই কাজে তিনি বিরক্ত হয়ে পড়েন এবং চাকরি ছেড়ে দেন। এর চার মাস পর রোমের সেই সময়ের প্রভাবশালী পাক্ষিক হিউমার ম্যাগাজিন ‘Marc' Aurelio’ এ ফেলেনির প্রবন্ধ প্রকাশ হয়। পত্রিকাটির সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। এই ম্যাগাজিনে ফেলেনি এবার নিয়মিতভাবে ‘But Are You Listening’ টাইটেলে কলাম লিখতে শুরু করেন।
ম্যাগাজিনটির সঙ্গে ফেলেনি ১৯৩৯-১৯৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জড়িত ছিলেন। এখানে কাজ করার সূত্রেই লেখক, কমেডিয়ান, স্ক্রিপ্ট-রাইটারদের সঙ্গে তার পরিচয় হতে থাকে। এছাড়া ম্যাগাজিনে তার বেশ কয়েকজন সহকর্মীও ছিলো, যারা কাজে-কর্মে চৌকস এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিও আগ্রহী। এরা হলেন এত্তোর স্কোলা (Ettore Scola), মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও চিত্রনাট্যকার সিজার জাবত্তিনি (Cesare Zavattini) ও বার্নারদিনো যাপ্পোনি (Bernardino Zapponi)। এই সময় ফেলেনি একটি চলচ্চিত্র ম্যাগাজিনের জন্য ইতালির বিখ্যাত অভিনেতা অ্যালদো ফাব্রিজি’র সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পান। এই সাক্ষাৎকারের বদৌলতে ফাব্রিজির সঙ্গে ফেলিনির ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ফাব্রিজিই তাকে চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ করে দেন। তখনো অবশ্য ফেলেনির বয়স ২০ হয়নি; তিনি ফাব্রিজির সহযোগিতায় মারিও মাত্তোলির The Pirates Dream-এ কমেডি লেখক হিসেবে জীবনের প্রথম চলচ্চিত্রে নাম ব্যবহারের সুযোগ পান।
আগে থেকে চলচ্চিত্রের লোকজনের সঙ্গে পরিচয় ছিলোই, তার ওপর ফাব্রিজির সঙ্গে কাজের কারণে ফেলেনির বন্ধু মহলের পরিধি বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে পরিচয় হয় ঔপন্যাসিক ভিতালিয়ানো ব্রানকাটি (Vitaliano Brancati) এবং চিত্রনাট্যকার পাইরো তেলেনি’র (Piero Tellini) সঙ্গে। এভাবে শিল্প-সাহিত্য ও চলচ্চিত্র পরিসরে ফেলেনির পরিচিতি বাড়তেই থাকে। এর মধ্যেই ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুন মুসোলিনি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধে ফেলিনির একটা লাভ হয়, একে একে তিনি কাফকা’র (Kafka) ‘মেটামরফসিস’, ইউক্রেনের বংশোদ্ভূত রাশিয়ান নাট্যকার নিকোলাই ভাসিলিয়াভিক গগল (Nikolai Vasilievich Gogol), জন স্টেইনবেক (John Steinbeck), উইলিয়াম ফকনার (William Faulkner)-এর কাজের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকেন। এছাড়াও ফ্রান্সের চলচ্চিত্রনির্মাতা মার্সেল কার্নে (Marcel Carne), রেনে ক্লেয়ার (Rene Clair) এবং জুলিয়েন দুবিবিয়ার’দের (Julien Duvivier) কাজের সঙ্গেও তিনি পরিচিত হন।
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে ফেলিনিকে Knights of the Desert নামে একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখার জন্য ইতালির দখল করা লিবিয়াতে পাঠানো হয়। চলচ্চিত্রটির নির্মাতা ছিলেন ওসভালদো ভ্যালেন্তি ও জিনো তালামো। এই কাজটিকে ফেলেনি খুব গুরুত্ব সহকারে নেন; কারণ এর মধ্য দিয়ে তিনি আরো কাজে সুযোগ পাওয়ার চেষ্টায় ছিলেন। এই চলচ্চিত্রে চিত্রনাট্য লেখার পাশাপাশি তিনি এর প্রথম দৃশ্যে নির্দেশনার কাজও করেন।
১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে মুসোলিনির পতনের পর, একই বছরের ৩০ অক্টোবর জুলিয়েত্তাকে বিয়ে করেন ফেলেনি। রাজনীতি নিয়ে ফেলেনির খুব বেশি আগ্রহ না থাকলেও ফ্যাসিবাদকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখতেন না। তার মতে, ফ্যাসিবাদ হলো সর্বক্ষম নির্বুদ্ধিতা আর অজ্ঞতা।১ ফ্যাসিবাদের মধ্যে তিনি সত্যিকারের স্বাধীনতার প্রতি হুমকির চিহ্ন দেখতে পেতেন। কিন্তু প্রকাশ্যে তিনি কখনোই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেননি।
ক. বাস্তববাদ, নব্য-বাস্তববাদ এবং ফেলেনি
১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে এলিয়েড লিবারেশনের পর ইতালিতে যখন অভিনেতার অভাব, অর্থলগ্নিকর্তার অভাব, স্টুডিওর অভাব ঠিক তখনই সূত্রপাত হয় নিও রিয়েলিজম বা নব্য-বাস্তববাদের। ফেলেনি তখন বন্ধু এনরিকো দি সেতা’র সঙ্গে রোমে দোকান খুলে বসেছেন পোস্টার এবং আমেরিকান সেনাদের নিয়ে নানা ব্যঙ্গচিত্র আঁকার জন্য।
বিখ্যাত নির্মাতা রবার্তো রোসেলিনি (Roberto Rossellini) তখন নব্য-বাস্তববাদ ধারার চলচ্চিত্র রোম, ওপেন সিটি নিয়ে কাজ করছেন। ফাব্রিজির সঙ্গে ফেলিনির কাজ দেখে রোসেলিনি তার সম্পর্কে আগেই জেনেছিলেন। ফলে তিনি ফেলেনির দোকানে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন এবং রোম, ওপেন সিটি’র কমেডি অংশ ও সংলাপ নিয়ে কাজ করার প্রস্তাব করেন। ফেলেনি মোটেও এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া করার লোক নন। তিনি কাজে লেগে যান। পরে যৌথভাবে তিনি সারজিও অ্যামিদেই-এর সঙ্গে নব্য-বাস্তববাদ ধারার প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে খ্যাত রোম ওপেন সিটির চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে এই চলচ্চিত্রটির জন্য যৌথভাবে তারা চিত্রনাট্য ক্যাটাগরিতে অস্কার মনোনয়নও পান। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে রোসেলিনির পরের চলচ্চিত্র পয়সার জন্যও ফেলেনি চিত্রনাট্য লেখেন এবং একই সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। চলচ্চিত্রটি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে চিত্রনাট্য ক্যাটাগরিতে অস্কার পায়। সমসাময়িক নব্য-বাস্তববাদ ধারার অন্যান্য নির্মাতাদের চেয়ে রোসেলিনিকে একটু ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করতেন ফেলেনি। তিনি মনে করতেন, ‘নিওরিয়্যালিজমে রসেলিনি ঈশ্বর প্রতিম। ’২ নব্য-বাস্তববাদ ধারার প্রকৃত শিক্ষাটাও ফেলেনি নিয়েছিলেন রোসেলিনি’র কাছ থেকেই। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে রোসেলিনির L’Amore এর জন্যও ফেলেনি চিত্রনাট্য লেখেন। এছাড়াও নব্য-বাস্তববাদ ধারার আরেক নির্মাতা অ্যালবার্তো ল্যাটুয়াডা’র (Alberto Lattuada) Without pity ও The Mil on the po-এর জন্যও চিত্রনাট্য লেখেন তিনি ।
বাস্তব ও নব্য-বাস্তববাদ নিয়ে ফেলেনির নিজস্ব বোঝাপড়া ছিলো। তার দৃষ্টিতে সব কিছুই বাস্তবের সমতুল্য। কল্পনা আর বাস্তবের মধ্যে তিনি কোনো পার্থক্য খুঁজে পাননি। ফেলেনি কল্পনার মধ্যেই বাস্তবকে দেখতে পেতেন।৩ অন্যদিকে বাস্তবের চেয়ে নব্য-বাস্তববাদ নিয়ে ফেলেনির অবস্থানও বেশ শক্ত ছিলো। তার ভাষায়,
নিওরিয়্যালিজম হচ্ছে কোনো প্রকার পূর্বসংস্কার ছাড়া, বাস্তব আর তার মধ্যে কোনরকম গতানুগতিক প্রথার অনুপ্রবেশ ছাড়া বাস্তবকে দেখার একটা পদ্ধতি। কোন রকম পূর্বধারণা ছাড়া তার মুখোমুখি হওয়া, সৎভাবে তার দিকে তাকানো—সে বাস্তবের চেহারা যেমনই হোক না কেন, শুধু সামাজিক বাস্তবতাই নয়, তার সঙ্গে আধ্যাত্মিক বাস্তবতা, অধিবিদ্যক বাস্তবতা, যা-যা মানুষের মধ্যে আছে, থাকে—তার সবটুকু।৪
এই নব্য-বাস্তববাদ দিয়েই সারা বিশ্বের নজর কেড়েছিলো ইতালি।
তবে নব্য-বাস্তববাদ দিয়ে শুরু করলেও, ফেলেনি শেষ পর্যন্ত এই ধারাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। যুদ্ধের সময় নব্য-বাস্তববাদের যে প্রভাব ছিলো যুদ্ধ অব্যবহিত পরে সেই উদ্দীপনা আর ছিলো না। ফেলেনির ভাষ্যমতে,
নিও-রিয়্যালিস্টরা নিশ্চয়ই এরকম আশা করেনা যে যুদ্ধ দারিদ্র্যের কোনদিন অবসান হবে না, যেহেতু তাদের সেরা সব বিষয়ের সন্ধান একদা তারা এখান থেকেই পেয়েছিল ... কিন্তু কখনও-কখনও এরকমও মনে হয়, যেন নিও-রিয়ালিস্টরা ভেবেছিল যে ক্যামেরার সামনে জরাজীর্ণ নোংরা একটা লোককে শুধু দাঁড় করিয়ে দিলেই ছবি হয়ে গেল।৫
তবে ফেলেনি এই ভাবনাটাকে ভুল মনে করতেন। নব্য-বাস্তববাদ প্রচুর ভাবাবেগীও ছিলো।৬ শিল্প (art) কখনো কোনো নির্দিষ্ট ধারায় আটকে থাকতে পারে না। নতুনের প্রতি আকাক্সক্ষাই একজন শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই ফেলেনিও মানুষকে উপহার দিতে চেয়েছেন নতুন ধরনের চলচ্চিত্র। তিনি রহস্য উদঘাটন করে, বস্তুর বাইরের ত্বক পেরিয়ে ভিতরের জিনিস দেখাতে চেয়েছেন। সবমিলিয়ে ফেলেনি নব্য-বাস্তববাদ থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা এবং অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করে নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেন।৭ তাই তার চলচ্চিত্র সংশ্লেষণধর্মী, কাব্যিক, কখনো বিবরমুখী। তিনি বার্গম্যানকে মনেপ্রাণে শ্রদ্ধা করতেন। তার চলচ্চিত্রে বার্গম্যানের প্রভাবও পরিলক্ষিত।
খ. ফেলেনির চলচ্চিত্র সাম্রাজ্য
মানুষের জীবনের ব্যাপ্তি দৈর্ঘ্যরে হিসেবে নয়, কর্মের হিসেবে। ফেলেনির কর্মজীবনের ব্যাপ্তি প্রায় ৫০ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে চলচ্চিত্রে তার অর্জন নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়। দৃশ্যত ফেলেনি এই চলচ্চিত্র জীবনের শুরু করেছিলেন ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে তার প্রথম চলচ্চিত্র লুচি দেল ভ্যারিয়েতা (Louci del varieta) নির্মাণের মধ্য দিয়ে। চলচ্চিত্রটি ভালো ব্যবসা করতে পারেনি সেসময়। ভালোভাবে প্রচার না হওয়ায় এমনটি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে দুঃখের কথা হলো, ব্যবসাসফল না হওয়ার কারণে এই চলচ্চিত্রের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যায়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ফেলেনি লো শ্যেইকো বিয়াঙ্কো (LO Sheiko bianko) এবং পরের বছর আই ভিত্তেল্লনি (I vitelloni) নির্মাণ করেন। আই ভিত্তেল্লনি ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার লায়ন জয় করে। এই পুরস্কার ফেলেনিকে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক নির্মাতার খ্যাতি এনে দেয়।
একই বছর তিনি নির্মাণ করেন উৎ আজেনৎসিয়া (Uth ajenothsia)। চলচ্চিত্রটির খসড়া সেন্সর কর্তৃপক্ষ বাতিল করে দেয়। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ফেলেনি নির্মাণ করেন লা স্ত্রাদা (La strada)। এই চলচ্চিত্রে প্রথমবারের মতো তার স্ত্রী জ্যুলিয়েত্তা মাসিনা অভিনয় করেন। লা স্ত্রাদা ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কার অর্জন করে। অস্কারপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়েও তাকে প্রায় জন পনেরো প্রযোজকের পিছনে ছুটতে হয়েছিলো। এটি প্রেমের গল্প হলেও গতানুগতিক প্রেমের গল্প থেকে আলাদা এবং একটু বেশিই মর্মান্তিক। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ফেলেনি নির্মাণ করেন দ্য নাইটস অব কাবিরিয়া (The nights of cabiria)। চলচ্চিত্রটি হচ্ছে কাবিরিয়া নামের এক হাস্যোজ্জ্বল নারীকে নিয়ে। যে নারীকে তার প্রেমিক সামান্য স্বর্ণ ও টাকার জন্য নদীতে ফেলে দেয়। একদল যুবক তার প্রাণ বাঁচায়। এরপর পতিতাবৃত্তি দিয়ে পুনরায় জীবন শুরু করলেও একটি সুস্থ জীবনের আশা তার মনে সবসময়ই ছিলো। এটিও বিদেশি ভাষার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কার অর্জন করে। অবশ্য এর ফাঁকে ফেলেনি ইল বিদোনে (Il bidone) নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে।
ফেলেনির আলোচিত চলচ্চিত্র লা দোলচে ভিতা (La dolce vita, ১৯৫৯) খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ হয়। চলচ্চিত্রটি ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে কান চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন পাম অর্জন করেন। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয় লে তেনতাৎসিওনি দেল দত্তর অ্যান্তনিও (Le tentatsioni del dottor antonio)। এভাবে ফেলেনি একের পর এক অসাধারণ সব চলচ্চিত্র উপহার দিতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ হয় এইট অ্যান্ড হাফ (Eight and half)। এটিও ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে বিদেশি ভাষার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ কস্টিউম ডিজাইনারের জন্য অস্কার পায়। এরপর একে একে নির্মাণ করেন জ্যুলিয়েত্তা দেল স্পিরিতি (Julietta del spiriti, ১৯৬৫), টবি ড্যামিট (Tobi damit, ১৯৬৮), ব্লক নোটস দ্য অন রেজিস্তা (Block notes the on rejista, ১৯৬৮), ফেলেনি সাতরিকিন (Felleni satyricon, ১৯৬৯), ই ক্লাউনস (I clowns, ১৯৭০), রোমা (Roma, ১৯৭১)।
১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে ফেলেনি নির্মাণ করেন আমারকর্দ (Amarcord)। প্রায় এক যুগ বিরতি দিয়ে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কার পায়। এই চলচ্চিত্রের দৃশ্যকল্প মূলত কমেডিধর্মী। তিতা নামের এক কিশোরকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রটি। আর এই কিশোরের আগ্রহ ছিলো ইতালির বিভিন্ন নিয়মের ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে। এরপর ফেলেনি নির্মাণ করেন-ইলকাসানোভা দ্য ফেদেরিকো ফেলেনি (Ilcasanova the Federico Felleni, ১৯৭৬), প্রোভা দ্য অর্কেস্ত্রা (১৯৭৯), সিটি অব উইমেন (City of women, ১৯৮০), অ্যান্ড দ্য শিপ সেলস অন (And the ships sell’s on, ১৯৮৩), জিঙ্গার ফ্রেদ (Zinger Fred, ১৯৮৭), ইন্তারভিত্তা (Intervista, ১৯৮৭), ভয়েস অব দ্য মুন (The voice of the moon, ১৯৯০)। এর মধ্যে ইন্তারভিত্তা ৪০তম কান চলচ্চিত্র উৎসব এবং মস্কোর ১৫তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ৪২তম ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ফেলেনিকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। এছাড়া ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে অস্কার কমিটির পক্ষ থেকে ফেলেনিকে দেওয়া হয় আজীবন সম্মাননা। এর মধ্য দিয়ে পঞ্চম বারের মতো অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন ফেলেনি।
গ. ‘ওহ জীবন, ওহ জীবন রে’
১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে অসুস্থ হয়ে পড়েন ফেলেনি। একই বছরের ১৬ জুন জুরিখের কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে উরু-সন্ধীয় ধমনির এনজিওপ্লাস্টির জন্য তিনি ভর্তি হন। পরে সেখান থেকে তাকে ইতালির রিমনির গ্র্যান্ড হোটেলে আনা হয়। সেখানে অবস্থানের দুই মাস পর তার মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হয় এবং তার শরীরের আংশিক প্যারালাইজড হয়ে যায়। এই অবস্থায় খানিকটা সুস্থ হলে আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য তাকে ইতালির ফেরারায় পাঠানো হয়। সেখানে কিছুদিন কাটানোর পর বিশ্বখ্যাত এই মানুষ ফিরে আসেন তার স্ত্রীর কাছে। জুলিয়েত্তা অবশ্য আগে থেকেই রোমের পলিক্লিনিকো’র এক হাসপাতালে শয্যাশায়ী ছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে ফেলেনির দ্বিতীয়বারের মতো মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হয়। এরপর তিনি কোমায় চলে যান। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ অক্টোবর ৭৩ বছর বয়সে মহান এ নির্মাতা না ফেরার দেশে পাড়ি দেন।
বাস্তবতা ও সত্যের সন্ধানে এইট অ্যান্ড হাফ
এইট অ্যান্ড হাফ যার ইতালিয়ান টাইটেল অট্টো ই মেজ্জো (Otto e meyyo)। এইট অ্যান্ড হাফকে নির্মাতা ফেদেরিকো ফেলেনির আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র বললে ভুল হবে না। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে নির্মিত সেরা ৪৫ চলচ্চিত্রের একটি হিসেবে এটিকে ভ্যাটিক্যান কমপিলেশনে লিপিবদ্ধ করা হয়। ১৩৮ মিনিটের চলচ্চিত্রের গল্পটা এক বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতাকে নিয়ে। যার নাম গুইডু। একসময় তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিভিত্তিক নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে, তিনি আর এগোতে পারেন না। গুইডুর মনে হয়, তিনি তার সব শৈল্পিক সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছেন। অন্যদিকে স্ত্রীর সঙ্গেও গুইডুর বনিবনা হচ্ছিলো না। কিন্তু এতোসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নতুনের সন্ধান করতেই থাকেন। এজন্য ছুটে যান চলচ্চিত্র সমালোচকদের দ্বারে দ্বারে। তার মাথায় একটাই চিন্তা কীভাবে নতুন কিছু করা যায়। কিন্তু সমালোচকরা তাকে শুধু হতাশই করে। গুইডু হতাশ না হয়ে চালিয়ে যান নতুনের জন্য গভীর অনুসন্ধান। একসময় পেয়েও যান আদর্শ ভাববাদী এক নারীচরিত্র। আর এই নারীচরিত্রটিই হয়ে ওঠে তার নতুন চলচ্চিত্রের নায়িকা।
গুইডু চলচ্চিত্রে নিমগ্ন হতে হোটেলে ওঠেন। সেখানে তিনি এড়িয়ে চলতে থাকেন তার বন্ধু, সাংবাদিক ও অভিনেতাদের। চলচ্চিত্র নিয়ে উত্তেজনা চরমে উঠলে তার শৈশবের নস্টালজিয়া চেপে বসে। গুইডু ভাবতে থাকেন, তার মাতামহীর সঙ্গে পার করা রাত, পতিতা এড্রে গেলার সঙ্গে সমুদ্রতীরে নৃত্য, সেই ক্যাথলিক স্কুল। একপর্যায়ে কার্ডিনাল নামের বিখ্যাত এক যাজকের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সুযোগ হয় গুইডোর। গুইডুর বন্ধুরা যাজককে সব খুলে বলতে বলেন। কার্ডিনালের সঙ্গে মাত্র পাঁচ মিনিট আলাপে গুইডু জানান, তিনি সুখী নন। কার্ডিনাল তাকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে বলেন, গীর্জার বাইরে কোনো শান্তি নেই।
সবমিলিয়ে একটা অস্থির সময় কাটাতে থাকেন গুইডু। এই পরিস্থিতিতে বিচ্ছেদ হওয়া স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে চান গুইডু, ভালোবাসার কথা বলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটাও হয় না। কারণ যে চলচ্চিত্র গুইডু বানাতে চান, তার জন্য একা থাকতে হয়। চলচ্চিত্রে একটা সত্য বলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন তিনি। এক কল্পনার সাগরে ডুবে যান গুইডু। সেই কল্পনায় তিনি নিজেকে হারেম বাসিনী একদল নারীর রাজা মনে করেন। ওই নারীরা তাকে গোসল করায়, শরীর মুছে দেয়, প্রসাধন মাখায়। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন জ্যাকলিন, তিনি খুব চেঁচামেচি করেন; কারণ তিনি বয়স্ক কোনো নারীদের সঙ্গে থাকবেন না। তার বয়স মাত্র ২৬ বছর, তিনি দেখতে সুন্দর। গুইডু সবাইকে চাবুক দিয়ে আঘাত করেন। জ্যাকলিন গান গেয়ে গুইডুকে বিদায় জানায়। এই কল্পনা তার জীবনের অপ্রিয় সত্যগুলোকে মনে করিয়ে দেয়, যা তার যৌন জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
প্রযোজক গুইডুকে স্ক্রিন টেস্টগুলো নিতে বললেও গুইডু কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। স্ক্রিন টেস্ট শুরু হলে, গুইডুর স্ত্রী লুইসা, চলচ্চিত্রে তার নিজের অবস্থান দেখে রেগে চলে যান। এমন সময় সেখানে গুইডুর সেই স্বপ্নের নায়িকা ক্লাউডিয়া চলে আসেন। ক্লাউডিয়াকে নিয়ে গুইডু সেটে চলে যান এবং তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দেন। তিনি বলেন, চলচ্চিত্রটিতে এক অগ্নিদগ্ধ পুরুষ তার প্রিয়ার মধ্যে শান্তি খুঁজে পাবে। ক্লাউডিয়া মনোযোগ দিয়ে শুনে বলেন পুরুষটির মধ্যে ভালোবাসা নেই এবং তাই সে ভালোবাসা পাবে না। প্রযোজক ও ফিল্ম স্টাফরা এক কনফারেন্সের আয়োজন করে। গুইডু সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেন। তাকে চলচ্চিত্র সম্পর্কে কিছু বলতে বললে হামাগুড়ি দিয়ে তিনি টেবিলের নিচে গিয়ে মাথায় আঘাত করেন। অবশেষে চলচ্চিত্রটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। চলচ্চিত্র সমালোচকরা গুইডুর সিদ্ধান্তকে অভিবাদন জানায়। মিউজিকাল ক্লাউনরা একে অন্যের হাত ধরে নাচতে থাকে। লুইসা ও গুইডু তাদের সঙ্গে যোগ দেন।
লেখক : আনতারা সোনিয়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
soniaislam.kgc@gmail.com
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. ফেলেনি, ফেদেরিকো (২০০২ : ৬৩); ফেদেরিকো ফেলেনি আত্মজৈবনিক রচনা বক্তৃতা সাক্ষাৎকার; সম্পাদনা ও ভাষান্তর : দেবাশীষ হালদার ও সন্দীপন ভট্টাচার্য; সিনে সেন্ট্রাল ও মনচাষা, কলকাতা-আলিপুরদুয়ার।
২. প্রাগুক্ত; ফেলেনি (২০০২ : ৮৫)।
৩. প্রাগুক্ত; ফেলেনি (২০০২ : ৬৩)।
৪. প্রাগুক্ত; ফেলেনি (২০০২ : ৬৩)।
৫. প্রাগুক্ত; ফেলেনি (২০০২ : ৬৩)।
৬. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ১২); ‘ফেদেরিকো ফেলেনি : একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য’; সিনেমা; ফ্ল্যাট ১/বি, বাড়ি ২৮, সড়ক ১৫ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৯।
৭. প্রাগুক্ত; হোসেন (২০১০ : ১২)।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন