হায়দার রিজভী
প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সাক্ষাৎকার
সিনেমার চেয়ে ভালো ব্যবসা দুনিয়াতে আছে?
হায়দার রিজভী

আগে থেকেই তার সঙ্গে কথা বলার সময় নির্ধারণ করা ছিলো। সন্ধ্যা ছয়টায় যখন হায়দার রিজভীর বাসায় পৌঁছাই, তখন তিনি মাগরিবের নামাজ পড়ছিলেন। বাসার তত্ত্বাবধায়ক আমাদের সেই ঘরেই নিয়ে যান। আমরা ঘরের এক পাশে থাকা সোফায় গিয়ে বসি। মেরুন রঙের টানা লম্বা সোফা; তার পাশেই একটা বইয়ের আলমারি রাখা। ঘরে ঢোকার দরজার ঠিক পাশেই একটা চেয়ারে বসে রিজভী নামাজ পড়ছিলেন। অল্প সময় পর নামাজ শেষ করে তিনি সরাসরি সোফায় এসে বসেন। কালো প্যান্ট চেক শার্ট পরা রিজভীর সঙ্গে সামান্য কুশল বিনিময় করেই কথা শুরু হয়। রিজভীর বাবা পাকিস্তান আমলের সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। ছেলেকে ইন্টারমেডিয়েট পাসের পর বিলেতে পাঠান ব্যবসা প্রশাসন নিয়ে পড়তে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তা না করে, তিনি অভিনয়ের প্রেমে পড়ে যান। পরে অভিনয়ের ওপর ডিপ্লোমা করে দেশে ফিরে আসেন রিজভী। তার ভাষায়, ‘তখন অভিনয় নিয়ে এতোই ঘোরের মধ্যে ছিলাম যে, কুয়াশার মধ্যে শেক্সপিয়রের সংলাপ বলতে বলতে লন্ডনের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কতদিন যে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছি!’
দেশে ফিরে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। সেখানে প্রযোজনার পাশাপাশি অনেকগুলো টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেন। এছাড়া বাংলাদেশের অন্যতম নাট্যদল ‘থিয়েটার’-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন রিজভী। চাকরি আর অভিনয় ভালোই চলছিলো। এরই ফাঁকে সুযোগ হয় বিদেশে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ালেখা করার। উচ্চতর শিক্ষার জন্য পোল্যান্ড সরকারের বৃত্তি নিয়ে চলে যান সেখানে। পরিচালনার ওপর (১৯৭৬-৮০) চার বছর মেয়াদি কোর্স সম্পন্ন করেন পোল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ন্যাশনাল ফিল্ম স্কুল ইন লড্জ’ বা ‘লড্জ ফিল্ম স্কুলে’। সেখানে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে Prussian OfficerPrussian Officer নামে গ্রাজুয়েট ফিল্ম নির্মাণ করেন। এরপর বিভিন্ন সময় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন স্টিফেন স্পিলবার্গ, রোমান পোলানস্কি, আন্দ্রে ভাইদা, লার্স ভন তিয়ার-এর মতো বিশ্বখ্যাত নির্মাতাদের সঙ্গে। পরে নিজে পোলিশ ভাষায় নির্মাণ করেন Nursery Rhymes নামে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। দীর্ঘদিন পোল্যান্ডে থাকাকালীন রিজভী বেশকিছু টিভি সিরিয়াল নির্মাণ করেন। বর্তমানে দেশে ফিরে শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও পড়ান। গত ১ মার্চ ২০১৭ গুণী এই নির্মাতা, চলচ্চিত্রশিক্ষকের সঙ্গে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পক্ষ থেকে কথা বলেছেন রাজীব আহসান ও জাবের হাসান। চলতি সংখ্যায় সেই আলোচনার দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হলো।
দ্বিতীয় পর্ব.
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, ইউরোপের ফিল্ম স্কুলগুলো নিয়ে কিছু বলেন।
হায়দার রিজভী : তোমাদের একটা ঘটনা বলি, তাহলে চলচ্চিত্র নিয়ে তাদের চিন্তাভাবনা বুঝতে পারবে। রুশ ফিল্ম স্কুলের হিসাব এমন ছিলো যে, ওদের কারেন্সিতে এক মিলিয়ন ডলার লাগে জেট প্লেনের একজন পাইলট তৈরি করতে; তারা ঠিক একই পরিমাণ অর্থ খরচ করবে একজন চলচ্চিত্রনির্মাতাকে শিক্ষা দিতে। এই উদাহরণটা দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, যে সমাজ শিল্পকে পেট্রোনাইজ করে¾তারা মনে করে একজন নির্মাতার জন্য ততো টাকা খরচ করতে হবে, যতো টাকা একজন পাইলটের জন্য খরচ হবে। যে পাইলট দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় লড়াই করবে। একবার ভাবো, কতো অসাধারণ চিন্তা¾একদিকে যুদ্ধ, আর একদিকে শিল্প। ন্যাচারালি ইট ইজ ইনফ্লুয়েন্সড বাই লেনিন।
সিনেমা আর কিছু না করুক, একটা জিনিস তো করে¾সংস্কৃতি মানে কী, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সাহিত্য, ঐতিহ্য¾একজন পরিচালক, শিল্পী, আমাদের ঐতিহ্য, শিকড়কে একটু হলেও তুলে ধরে, তাহলে বাকিরাও তো আস্তে আস্তে আলোকিত হবে। এটাও ঠিক কথা যে, আমাদের অনেক সমস্যা আছে¾ইটস মাচ মোর প্রবাবলি ইম্পর্টেন্ট দ্যান আর্ট। আমার দেশের শিক্ষার অভাব, চিকিৎসার অভাব, আরো অনেক কিছুর অভাব¾এটা ঠিক আছে। কিন্তু যখন সব ঠিক হয়ে যাবে, তখন হয়তো সংস্কৃতির শিকড় খোঁজার প্রয়োজন হবে। তবে আমার কেনো জানি ভয় লাগছে, স্বাধীনতা লাভের এই ৪৬ বছরে আমরা যেনো কোথায় এটাকে ভুলে গেছি। আগামী প্রজন্ম জানবে না আমাদের ইতিহাস। ভালো-মন্দ যাই হোক, আমার দেশ স্বাধীন হয়েছে, লাখ লাখ লোক মারা গেছে, এটা আমরা আগামী প্রজন্মকে কীভাবে জানাবো¾শুধু বইয়ে লিখলে তো হবে না। তাই তোমাদের জেনারেশনের উচিত, হ্যাভ টু মেক মোর ওয়ান হান্ড্রেডস অব ফিল্মস অব দিস ফাইট।
তোমরা যদি খেয়াল করো দেখবে, আজকে পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর সিনেমা হচ্ছে। আমার ভয় লাগছে কেনো, যারা ক্ষমতায় আছেন, আমরা যখনই তাদের বলবো একে পেট্রোনাইজ করা দরকার; তখনই তারা বলেন, হ্যাঁ আমরা করছি তো, পাঁচটা সিনেমাকে ৩৫ লক্ষ টাকা করে, পাঁচটা সিনেমাকে ১০ লক্ষ টাকা করে অনুদান দিচ্ছি। এই তো, আর কী! (হাসি) আমি সবসময় বলে আসছি, এটা ফকিরের পেশা না; এটা ব্যয়বহুল পেশা। এর জন্য কেবল সরকার না, আমাদের অনেক ব্যবসায়ীকে সি এস আর করতে হবে, তাদের এগিয়ে আসতে হবে। সিনেমার ওপর কেনো সি এস আর হয় না! সবাইকে যদি অর্থ মন্ত্রণালয় বলে দেয়, আপনারা এই খাতে টাকা দিলে, ট্যাক্স মওকুফ পাবেন।
আমার মনে হয়, আজকে সিনেমাহলের টিকিটের ওপর যদি পাঁচ টাকা করে অতিরিক্ত নিই, যে টাকাটা চলে যাবে ‘প্রমোশন অব বাংলাদেশ সিনেমা’ নামে একটা ফান্ডে। তাহলে বছরে একটা বড়ো অঙ্কের টাকা আসতে পারে ।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, আরেকটা বিষয় হলো, আমরা সিনেমা বানাতে পারছি না; অন্যদিকে আমাদের সিনেমার কিন্তু কোনো পরিচিতিও নেই। যেমন ধরেন, আমরা একসময় ইরানি কালচারাল সেন্টারে গিয়ে সিনেমা দেখেছি, জার্মান কালচারাল সেন্টারে গিয়ে ফাসবিন্ডারের সিনেমা দেখেছি কিংবা রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে তারকোভস্কির সিনেমা দেখেছি। কিন্তু আমাদের সিনেমা কোথাও দেখানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ যদি ফেস্টিভালে বা ভালো কোনো জায়গায় যায়, সেখানে অনেকে আমাদের চেনেই না মানে আমাদের সিনেমা বা দেশ!
হায়দার : অবশ্যই, অ্যাবসোলুটলি অল রাইট। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ নিয়ে আরো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। এই ধরো, এখানকার ইতালিয়ান অ্যাম্বাসি মাসে একবার করে আমাদের ডাক দেয়। অ্যাম্বাসেডর সাহেব তার বাসায় আমাদের সিনেমা দেখান আর সঙ্গে সালাদ ও এক গ্লাস পানি খাওয়ান। লোকে সেখানে সিনেমা দেখতে যায়। সারা পৃথিবীতে আমাদের যে দূতাবাসগুলো আছে, তারাও তো অন্তত মাসে এটা করতে পারে। এটাতে তো তেমন কোনো খরচ নাই¾সালাদ আর এক গ্লাস পানি। আর দূতাবাসরা চাইলে সিনেমাগুলোও বিনা টাকায় পাবে। কারণ তারা প্রমোশন করছে। এটা নিয়মিতভাবে ভারত করছে। ভারত-কোথায় যেনো পড়লাম সেদিন¾অস্কারের জন্য যে পরিমাণ টাকা খরচ করছে!
ম্যাজিক লণ্ঠন : তারা নিয়মিত অ্যাকাডেমির মেম্বারদের সিনেমা দেখাচ্ছে, খাওয়াচ্ছে।
হায়দার : আর ইরানে দেখো, ফারহাদি সাহেব প্রমাণ করে দিলো তারা চলচ্চিত্র জগতের ওয়ান অব দ্য টপ কান্ট্রি, তাই না? কয়জন পরিচালক আছেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে, যিনি এতো অল্প সময়ের মধ্যে দুইবার অস্কার পেয়েছেন!
ম্যাজিক লণ্ঠন : ফেলেনি যতোদূর সম্ভব পাঁচটি পেয়েছেন। আর ফারহাদির তো এখনো বয়স আছে।
হায়দার : মানে কথা হচ্ছে যে, তাহলে ওরা কী করে পারে!
ম্যাজিক লণ্ঠন : ওরা যে অনেক বাজেটের সিনেমা বানাচ্ছে বিষয়টা কিন্তু এমনও না।
হায়দার : একদম ঠিক কথা।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তবে ওরা কিন্তু ইউরোপের প্রোডিউসার পাচ্ছে। ওদের প্রতিভা দেখে ইউরোপ এগিয়ে আসছে। আমরা কিন্তু সেটা পারছি না।
হায়দার : আশা করছি, যদি তোমাদের মধ্যে থেকে তিনজন কান-এ গিয়ে ওয়ার্কশপ করে আসতে পারো¾কীভাবে ঠিক ফান্ড জোগাড় করা যায়। বিলিভ মি, আমি লাস্ট নভেম্বরের কথা বলতে পারি, পোল্যান্ডে ছিলাম। আমার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, আমি ওদের জিজ্ঞাসা করলাম কী করছো? তখন ওরা বললো, জার্মানি থেকে পেলাম আমি দুই লাখ, ফ্রান্স থেকে পেলাম দুই লাখ, পোল্যান্ড দিলো পাঁচ লাখ¾এভাবে চার-পাঁচটা ইউরোপিয়ান দেশ নিয়ে আমরা একটা সিনেমা করছি। আমাকে আজ যদি কেউ অধিকার দিতো, তাহলে আমি গিয়ে সরাসরি দিল্লিকে বলতাম, আপনারা সরকারিভাবে পাঁচটা সিনেমার জন্য আমাদের টাকা দেন।
দেখো, সরকারকে বললেই বলে, আমাদের কতো সমস্যা। সেগুলো সমাধান করতে পারছি না। কিন্তু আমার শিকড় কী, আমার সংস্কৃতি কী, আমার বাবা-মা কে, আমি যদি নাই চিনতে পারি, তাহলে কী হলো! এই শিল্প মানে সিনেমার মাধ্যমে এটা সহজে করা সম্ভব।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, দেখেন ইরান তো খুব বেশি ধনী দেশ নয়। কিন্তু এখন সারা পৃথিবী তাদের সম্মান করছে! আজের্ন্টিনারও কিছু সিনেমা আছে, এরা ভেনিসে গিয়ে প্রতিযোগিতা করছে।
হায়দার : আমার সুযোগ হয়েছিলো, ২০১২ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইরানের ফজ্র ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে জুরি হিসেবে কাজ করার। আমি তখন ওদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোমরা কীভাবে এগুলো করো? ওরা বললো, অনেক কষ্ট! এখান থেকে একটু নিই, ওখান থেকে নিই। জানো, ওদেরও নাকি এ ব্যাপারে কোনো ফিক্সড ফান্ড নেই। কিন্তু সরকার ...। ফজ্র-এ আমরা যেদিন পুরস্কার ঘোষণা করবো, কল্পনা করতে পারবে না; আমাদের হোটেলের সামনে পুলিশের সে কী নিরাপত্তা! যেনো মন্ত্রীরা যাচ্ছেন। আমরা জুরি মেম্বাররা যে বাসটাতে উঠলাম সেটাকে একেবারে কর্ডন করে তারা নিয়ে গেলো। তারপর উৎসবস্থলে নামার পর সে কী সম্মান! ট্রানসেলেটররা এসে বার বার আমাদের বলে যাচ্ছে, কী করতে হবে, কখন আমরা মঞ্চে উঠবো¾এসব।
আমি বললে হয়তো খারাপ শোনাবে, আমরা শিল্প ও শিল্পীকে সম্মান করতে জানি না। কিন্তু সেই বড়ে গোলাম আলি খাঁ যখন পদ্মভূষণ পেয়ে দিল্লিতে গেলেন, তখন পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু দাঁড়িয়ে বললেন, ওস্তাদজি আইয়ে আইয়ে আইয়ে ...। এই সম্মানটা! কী সেটা? তিনি সঙ্গীতের একজন ওস্তাদ, বিশেষজ্ঞ।
ইরানে দেখো, মাইকে প্রচার হলো ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান; সেখানকার সম্মানিত লোকজনেরা সবাই বউদের নিয়ে এসেছেন। মওলানাদের পরনে জোব্বা, বউদের বোরকা। কিন্তু ওরা সবাই আমাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে, কথা বলছে। আমি তো ওদের এই আচরণ দেখে অবাক¾এই মওলানাদের সঙ্গে সিনেমার কী সম্পর্ক!
ম্যাজিক লণ্ঠন : এটা কি স্যার পার্সিয়ান কালচারের কারণে¾ধর্মের বাইরেও ওদের একটা কিছু আছে।
হায়দার : আমি ঠিক জানি না, কেনো তাদের এমন হয়! হয়তো হাজার বছরের ঐতিহ্য। আমার অনেক বন্ধুবান্ধব আছে, যারা অনেকবার ইরানে গেছে বিভিন্ন উৎসবে; তাদের একজন ওই যে ব্ল্যাক হক ডাউন-এর পরিচালক রিডলি স্কট (Ridley Scott) আমাকে বললো, ‘দোস্ত ওরা সব ধরনের আপ্যায়ন করায়। মেয়েরা ট্রেতে করে স্যামপেনের গ্লাস নিয়ে ঘোরে। আমার তো কিছুক্ষণ পর মনে হলো, বাইরে ফোয়ারাতে যে পানি উঠছে সেটাও স্যামপেন!’ তো এই হলো ব্যাপার।
আর একটা বিষয় হলো, ওরা মানুষকে সম্মান করতে জানে। অথচ আমাদের এখানে দেখো, কোনো একজন নামকরা শিল্পী যদি একুশে কিংবা স্বাধীনতা পদক পায়, তখন আসলে দাঁড়িয়ে যে একটা ...
ম্যাজিক লণ্ঠন : আমাদের এখানে এটা নাই বললেই চলে। বরঞ্চ পুরস্কার প্রাপ্তরা অনেক সময় পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ লোকজনেরা সামনের চেয়ারে বসে থাকে। এটা আসলে ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
হায়দার : কথা হচ্ছে যে, আমার ওস্তাদ মোস্তফা মনোয়ার সাহেব একবার বললেন, মিয়া, তুমিও যেমন সম্মান করো, তোমার ছোটো ভাইটাও (গওহর রিজভী) তেমনই। ভরা মিটিংয়ে আমাকে যেভাবে পরিচয় করিয়ে দিলো! যেভাবে আমাকে সম্মান করলো! আমি বললাম, ঠিকই তো করেছে। আমার ভাই তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; তাতে কী, বাংলাদেশে মোস্তফা মনোয়ার তো একটা।
তাই শিল্পীকে সম্মান করা শিখতে হবে; তাছাড়া তো শিল্পী তৈরি হবে না। এজন্য তো আমাদের দেশে শিল্পী তৈরি হচ্ছে না। তোমরা আমাকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের দুইজন শিল্পীর নাম বলো, যারা যথাযথ সম্মান পেয়েছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আমাদের এখানে স্যার যাদের এ ধরনের পুরস্কার দেওয়া হয়, তাদেরকে অনেক সময় করুণার দৃষ্টিতে দেখা হয়। ছবি তোলার সময় পুরস্কার প্রাপ্ত প্রবীণরা পিছনে দাঁড়িয়ে থাকেন আর ক্ষমতাবানরা কেনো জানি চেয়ারে বসে থাকেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এখনো এ ধরনের পুরস্কারের কিছুটা সম্মান আছে।
হায়দার : আমি ঠিক জানি না, কেনো এমন হয়! আমি অনেকভাবে এর কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছি¾এটা কি আমাদের ধর্মের ব্যাপার, কৃষ্টির ব্যাপার। এটা তো কৃষ্টির ব্যাপার হতে পারে না! ওদের মানে পার্শ্ববর্তী দেশের কৃষ্টির সঙ্গে আমাদের কৃষ্টির আর কতো পার্থক্য, বলো?
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, আর একটা ব্যাপার মনে হয়, আগে যে কথাটি আপনি বললেন, ফান্ডিংয়ের জন্য শিল্পপতিরা কেনো এগিয়ে আসছে না? আমার মনে হয়, তারা একটা মাদ্রাসা কিংবা মসজিদ করছেন; কারণ এতে তাদের পূণ্য হবে; ফিল্মকে তারা এখনো পাপের কাজ হিসেবে মনে করে। কারণ যাদের টাকা হওয়ার কথা ছিলো এই দেশে, তাদের টাকা হয় নাই; মানে বুর্জোয়া বিকাশটাই এখানে যথাযথভাবে হয় নাই।
হায়দার : এই যে আজকে যারা দেশে বিরাট বিরাট শিল্পপতি, তাদের ছেলেমেয়েরা সবাই বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে আসছে। তারা সবাই আমেরিকা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ইতালি থেকে পড়াশোনা করে আসছে। এদের মধ্যেও এই বোধটা নাই! তাই খুব সহজে আমি এটার ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এখানে স্যার আমরা কেবল দুই-এক জনের এ ধরনের মানসিকতা দেখতে পাই।
হায়দার : আরে দুই-এক কেনো; আমি তোমাকে কমপক্ষে দুইশো জনের একটা তালিকা দিতে পারি যারা অনায়াসে এ ধরনের কাজ করতে পারে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার আরেকটা বিষয়ও হতে পারে, আমরা হয়তো তাদের এদিকে আগ্রহী করাতে পারছি না।
হায়দার : সেটাও হতে পারে। আমার, তোমার তো এসব জায়গায় যাওয়ার সুযোগ নাই।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, আমরা যদি চমৎকার সব সিনেমা বানাই, তাহলে আস্তে-ধীরে ওরাও আসবে।
হায়দার : আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, একজন কোটিপতির ছেলে যে বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে এসেছে সে জানে, সিনেমায় বিনিয়োগ করা মানে কী। ইটস নট অ্যা অনলি ইনভেস্টিং ইন ইউর কালচার, অসলো ইনভেস্টিং ইন দ্য ফিল্ম, উইথ দ্য হোপ ইট উইল বি ফাইভ টাইমস মোর দ্যান হোয়াট হি হ্যাজ অ্যা ইনভেস্টিং।
কাউকে তুমি যদি এক কোটি টাকা দাও, তাহলে এক বছরের মধ্যে সে তোমাকে পাঁচ কোটি টাকা এনে দিতে পারে। সিনেমার চেয়ে ভালো ব্যবসা দুনিয়াতে আছে? বেনিফিটের এই মাত্রা আমার জানা মতে আর কোনো ব্যবসায় নাই।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আমরা এ বাজারটা তৈরি করতে পারি নাই বলেই কি এই অবস্থা? অথচ ভারতে দেখেন ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রযোজক কিন্তু রিলায়েন্স-এর মতো বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান। তার নৌকাডুবির প্রযোজক ছিলো, সুভাষ ঘাইয়ের মতো প্রোডিউসার। কিংবা সত্যজিতেরও কিন্তু প্রোডিউসার ছিলো।
হায়দার : আমি যতোখানি বুঝি, তাতে বাংলাদেশে এখন ফারুকী আর অমিতাভ রেজা মনে হয় ডিরেক্টর হিসেবে একটু ভালো অবস্থানে আছেন। প্রোডিউসাররা তাদের ওপর একটা হয়তো আস্থা রাখতে পারছে। কিন্তু ওই দুইজনকে দিয়ে তো আর এতো বড়ো ইন্ডাস্ট্রি চলবে না। কারণ যেখানে আমাদের কম করে হলেও বছরে দশটা জেনুইন ভালো সিনেমা হওয়া দরকার। আমি মনে করি, এটা হওয়ার সম্ভাবনাও আমাদের আছে, আমাদের প্রতিভা আছে। এখন কেবল পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। আই অ্যাম শিওর, বাইরে থেকে পড়ে আসা হলেও তারা মনেপ্রাণে বাঙালি, তারাও দর্শক। একটা স্ক্রিপ্ট পড়লে নিশ্চয় তারাও কিছু আইডিয়া দিতে পারবে।
আজকে হলিউডে প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট ছাড়া কোনো সিনেমা হয় না। সিনেমার মধ্যে ঘরে যে টেলিভিশনটা দেখানো হচ্ছে সেটা হয়তো সনি’র কিংবা যে টেলিফোনে নায়ক কথা বলছে, ক্লোজশটে দেখানো হচ্ছে সেটা হয়তো স্যামসাঙ। অথচ আমাদের এখানে নতুন কিছু হচ্ছে না। বলতে খারাপ শোনায়, আমি দুঃখিত, এর অনেক কিছুই এখনো মান্ধাতার আমলের। এদের পয়সা আছে, ব্যবসা করছে; কিন্তু সেই ব্যবসায় নতুনত্ব নেই। তাই এম বি এ পাস করা ছেলেদের এখন স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করা দরকার। অথচ তারা কেবল ব্যাংকার হচ্ছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আর স্ক্রিপ্টের ব্যাপারে আরেকটা বিষয় হলো, আমার অনেক বন্ধু বলে আমরা প্রোডিউসার পাচ্ছি না। তো আমি একদিন ওদের কয়েক জনের কাছে একজন প্রোডিউসারের জন্য স্ক্রিপ্ট চাইলাম, ওরা কিন্তু তখন দিতে পারলো না। এটা কিন্তু একটা সমস্যা।
হায়দার : ওটা তো আমি আগেই বলেছি, ওদের কোনো ডিসিপ্লিন নেই। ওরা শুধু কথা বলে কিন্তু সিনেমার প্রথম যে অক্ষর ‘সি’, সেটা সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই। ওরা খালি ‘বকর-বকর’ করে¾আমি সিনেমা বানাবো, সিনেমা বানাবো। পোল্যান্ডে এখনো আমার অনেক বন্ধু তিন-চার বছর ধরে বগলে করে একটা স্ক্রিপ্ট নিয়ে ঘুরছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, ওখানে স্ট্রাগলটা কেমন?
হায়দার : সবখানেই স্ট্রাগল আছে। কিন্তু ভালো সিনেমা করতে পারলে সেটা অনেক কমে যায়, দরজা খুলে যায়। ইরানের ফারহাদি সাহেবের মতো, সিনেমা বানানোর টাকা দেওয়ার জন্য পাঁচ দেশের প্রোডিউসার চলে আসবে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : অনেকের কাছে শুনেছি, ইউরোপের প্রোডিউসাররা নাকি টাকা নিয়ে বসে আছে। কিন্তু ভালো স্ক্রিপ্ট নাই।
হায়দার : এই কিছুদিন আগে ইউরোপের আমার এক বন্ধুর সঙ্গে প্রোডিউসার নিয়ে কথা হয়েছিলো। উনি আমাকে বললেন, কী বলো তুমি, ওরা কোথায় চেষ্টা করে? আমি প্রত্যেক মাসে অফার পাই হলিউডে গিয়ে একটা এপিসোড করে আসার জন্য। কিন্তু আমি যাই না, কারণ ওগুলো আমার পছন্দ হয় না। তাহলে ওরা কই যায়!
নতুনদের সমস্যা হলো¾খোঁজ নিয়ে দেখো স্ক্রিপ্টের অর্ধেক আছে, অর্ধেক নাই। একটা কমপ্লিট স্ক্রিপ্ট করতে খুব বেশি হলে ছয় থেকে নয় মাস সময় লাগে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আমাদের এখানে যারা একটু সক্রিয়, তারা কিন্তু এ ধরনের কিছু ফান্ডিং পাচ্ছে।
হায়দার : ইটস গুড।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, ডিস্ট্রিবিউশনটা সম্পর্কে আমাদের জানা থাকা উচিত।
হায়দার : এ নিয়ে স্ট্যানলি কুবরিকের একটা গল্প তোমাদের বলতেই হয়। উনি ইংল্যান্ডে শুট্ করলেন ২০০১ অ্যা স্পেস ওডিসি। তো সব কাজ শেষ, এখন মুক্তির আগে প্রিন্ট করা হচ্ছে। সিনেমাহল বুকিং দেওয়া হয়েছে সেখানে কুবরিক সেই প্রিন্ট দেখবেন। উনি ওখানে একটা একটা করে প্রিন্ট দেখা শুরু করলেন। একজন বললো, কালকের মধ্যে আমাদের প্রিন্ট দিতে হবে, এছাড়া ওরা আমাদের মেরেই ফেলবে। কিন্তু কুবরিক বললেন, আমি এখানেই আছি, সারারাত থেকে সব প্রিন্ট দেখে যাবো।
এখন তোমরা ডিস্ট্রিবিউশনের কথা বলছো¾শিক্ষিত ছেলেরা যারা সিনেমার কালার, সাউন্ড এগুলো বোঝে¾তার কাজ হবে যেহেতু ‘বসুন্ধরা’, ‘ব্লকবাস্টার’ আর ‘বলাকা’য় একসঙ্গে ছাড়া হবে সেহেতু তাদের ডি সি পি’টা কী সেটা দেখে দিতে হবে। অথচ আমরা খালি দোষ ধরে বেড়াই¾সিনেমাহলের মালিকরা ভালো না, এটা ঠিক নাই, এগুলো। কিন্তু তুমি জানো, আমি জানি ‘বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে’র যে মালিক মাহবুব, ওর বউ তো বিদেশি। ওর রুচি কীভাবে খারাপ হবে। এটা তো ঠিক বউয়ের কিছু গুণাবলি ও দোষ, না চাইলেও স্বামীর ঘাড়ে গিয়ে পড়ে। ইউরোপিয়ান সাইকোলজিতে বলে, স্বামী আর স্ত্রীর চেহারা একটা সময় পর দেখতে একই ধরনের হয়ে যায়। (হাসি)
তাই কথা হচ্ছে যে, আজকে ওই সিনেমাহলগুলোকে দোষারোপ না করে নিজেদের অবস্থা ঠিক করা দরকার। তবে হ্যাঁ, এখন এমন যদি হতো ওর কাছে একটা ভালো সিনেমার ডি সি পি আছে, তখন ও মাহবুবকে বললো, ভাই আপনি আমাকে সামনের সপ্তাহে দেন, তাছাড়া আমার লস হয়ে যাবে!
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি, আমাদের (রাজীব আহসান) এলাকা মানে নরসিংদীতে যে সিনেমাহলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, তা ভালো সিনেমা না পাওয়ার কারণেই হয়েছে। তাদের বক্তব্য, আর কতো লোকসান দিয়ে আমরা সিনেমাহল চালাবো! একজন মালিকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিলো, তিনি বললেন, ভাই আমাকে মানুষ চিনতোই এই সিনেমাহলের জন্য। যেদিন এই সিনেমাহল ভাঙা হচ্ছিলো, সেদিন কিন্তু তিনি নীচে বসে বসে কাঁদছিলেন। অথচ অন্যভাবে দেখলে, এই সিনেমাহল ভেঙে ফেলে তিনি কিন্তু আর্থিকভাবে লাভবানই হচ্ছেন। কারণ সেখানে মাল্টিস্টোরেজ বিল্ডিং হচ্ছে, মার্কেট হবে। কিন্তু ওই মালিকের মনের মধ্যে একটা হাহাকার¾সিনেমাহলটা বন্ধ হয়ে গেলো! একজন মানুষ কিন্তু এতো ব্যবসা থাকতেও অনেক স্বপ্ন নিয়ে সিনেমাহল করে। কারণ ওই শিল্পের প্রতি তার একটা ভালোবাসা আছে। অথচ এখন আমরা খালি সিনেমাহল মালিকদের দোষারোপ করছি।
হায়দার : শোনো, সিনেমা ইজ অ্যা ড্রিম। আমার গুরু ইঙ্গমার বার্গম্যান বলেন, আমরা সবাই ম্যাজিশিয়ান। কারণ সিনেমা একমাত্র পেশা, যা দর্শকের স্বপ্নটা পূরণ করতে পারে। আই অ্যাম শিওর, যে জীবনে একবার ভালো সিনেমা দেখেছে, তার জন্য এটা ছাড়া সমস্যা। ইট ইজ অ্যা লাভ অ্যাট ...। ও ডিস্ট্রিবিউশন করে, এটা করে ওটা করে ভালো পয়সা কামাই করেছে। কিন্তু ওর স্বপ্ন হলো সিনেমা নিয়ে। ওই যে মজা পেয়ে গেছে, দুইজন লোক হয়তো সিনেমা দেখে ভালো বলেছে।
আমরা এই পেশায় আছি কেনো? আজকে এই বৃদ্ধ বয়সে ইনু সাহেবের (মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু) বাসায় হঠাৎ একটা দাওয়াত পেলাম। ওখানে গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, তানভীর মোকাম্মেলও ছিলো। তানভীর, তারেক মাসুদ সেই সময় ওরা আমার সিনেমাটা (Prussian Officer) দেখেছিলো। সেটাও ৩৪ বছর আগে। তো তানভীর মোকাম্মেল এখন ইনু সাহেবরে কয়, ইনু ভাই আপনি তো হায়দার ভাইয়ের সিনেমাটা দেখেন নাই, দেখলে বুঝতেন! আই অ্যাম হিউম্যান বিঙ, ভেরি অনেস্ট, এই কথা শুনে আমার কিন্তু ভালো লাগছে! এই বুড়া বয়সেও আমার ভালো লাগছে¾তানভীর মোকাম্মেলের মতো একজন চলচ্চিত্রকার বাংলাদেশের একজন মন্ত্রীর কাছে গল্প বলছে যে, আপনি হায়দার ভাইয়ের সিনেমা দেখেন নাই।
তখন মন্ত্রী বললো, সেটা কোথায় আছে, কোথায় আছে? তখন আমি বললাম, আমার কাছে আছে। মন্ত্রী বললো, তাহলে আমার অফিসে সেটা দেখানোর ব্যবস্থা করেন। সিনেমায় যদি এটা না থাকতো, তাহলে সত্যজিৎ রায়ও হতো না, কুরোসাওয়াও হতো না, অরসন ওয়েলস, ফেলিনি কেউই হতো না। দিন শেষে এই প্রশান্তি, আমি একটা ভালো কাজ করেছি।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, আপনার জীবনবৃত্তান্তটা যদি বলতেন মানে ঠিক জন্মস্থান, লেখাপড়া, চাকরি, পোল্যান্ডে যাওয়া¾এইসব আর কী।
হায়দার : আমার জন্ম ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ১ অক্টোবর কিশোরগঞ্জে। আমার বাবা সৈয়দ নাসিরুদ্দিন হায়দার রিজভী সাব-ডিভিশনাল অফিসার (এস ডি ও) ছিলেন। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুর জেলা থেকে আমি মেট্রিক পাস করি; খুব খারাপ রেজাল্ট, থার্ড ডিভিশন। আমি অঙ্কে খুবই দুর্বল ছিলাম।
ম্যাজিক লণ্ঠন : সেই অর্থে আপনার ভাইয়েরা খুব মেধাবী ছিলো লেখাপড়ায়!
হায়দার : ওই যে আমি তো সবসময় সিনেমা নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম; উত্তম কুমার আর সুচিত্রা সেনের সিনেমা দেখার পর মাথায় আর কিছু থাকে! আমার এখনো মনে আছে, আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। অক্টোবরের কোনো একসময় হবে, পাকিস্তানের একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলো লিয়াকত আলী খান সাহেব, উনাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্কুলে ক্লাস শেষ হয়ে গেছে, আমি দেখলাম একটি ক্লাসে একজন শিক্ষক একটা ছাত্রকে বলছে, বুঝলা বাবা, তুমি বলবা, পাকিস্তান জিন্দাবাদ আর সঙ্গে সঙ্গে গুলি খেয়ে পড়ে যাবা। আমি কাছে গিয়ে শোনার চেষ্টা করলাম, স্যার কী বলে। তো ওই ছেলেটা স্যারের কথা বুঝতে পারছিলো না। আমি বাইরে থেকে স্যারকে বললাম, আমি ওটা করে দেখাই স্যার। স্যার বললো, পারবি? তাহলে আয়। আমি তারপর পাকিস্তান কো জিন্দাবাদ বলে গুলি খাওয়ার ভান করে পড়ে গেলাম। টেবিলের কোণায় সেদিন সে কী বাড়ি খেলাম।
স্যার, ওটা দেখে বললো, বাহ, তুমিই করবা এটা। এই যে মাথায় ঢুকলো অভিনয়!
ম্যাজিক লণ্ঠন : ইন্টারমিডিয়েট কোথা থেকে করলেন স্যার, কতো খ্রিস্টাব্দে?
হায়দার : নটরডেম কলেজ থেকে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে। আমার ক্লাসমেট ছিলো আলী যাকের।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, নটরডেমে তখন নিশ্চয় খুব কড়া শাসন ছিলো?
হায়দার : আরে সে কথা আর বলো না! সেসময় ঢাকা কলেজের বেতন যদি আট টাকা হয়, নটরডেমের বেতন ছিলো ১৫ টাকা। যদিও আমার বাবা খুব সৎ মানুষ ছিলেন, কিন্তু তার স্বপ্ন ছিলো ছেলেমেয়েদের ভালো জায়গায় শিক্ষা দেওয়া নিয়ে। তখন অবশ্য ভর্তি পরীক্ষা ছিলো না। মার্কসশিট দিলেই ভর্তি হওয়া যেতো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : নটরডেম থেকে পাস করে কী করলেন?
হায়দার : আমার এক বন্ধু ছিলো লন্ডনে, আমার মাথায়ও ভুত চাপলো লন্ডনে পড়তে যাওয়ার। আমার বাবা বলে, ব্যাটা, আমার তো অতো টাকাপয়সা নাই, টিকিটের ব্যবস্থা কীভাবে করি। তারপরও ঠিক আছে আমি দেখতেছি। তুমি যাও, চাটার্ড অ্যাকাউন্টটেন্ড পড়ে আসো। আমিও মিথ্যা চাপা মেরে বললাম, জ্বী আব্বা। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে বাবাকে চাপা দিয়ে আমি ইংল্যান্ডে গেলাম চাটার্ড অ্যাকাউন্টটেন্ড পড়তে।
কিন্তু আমার তো চিন্তা অন্য; রাস্তায় হাঁটি আর সংলাপ বলি। এককালে লন্ডনে যখন ফগ পড়তো তখন কাছের মানুষও দেখা যেতো না। আমার এমন অনেকদিন হয়েছে, আমি সংলাপ বলতে বলতে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ কোনো ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে সেই জোরে ধাক্কা লেগে গেছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তার মানে আপনি গিয়ে আর ভর্তি হলেন না চাটার্ড অ্যাকাউন্টটেন্ডে?
হায়দার : কীসের চাটার্ড অ্যাকাউন্টটেন্ড! আমি তো পৃথিবী বিখ্যাত অভিনেতা হবো! তাই ‘স্টেজ’ নামে একটি পত্রিকায় আমি নিয়মিত খোঁজ নিতে থাকি, কোথায় অভিনয়ের একটু সুযোগ পাওয়া যায়। এখনো অবশ্য ইংল্যান্ডে ‘স্টেজ’ পত্রিকাটি প্রকাশ হয়। ওখানেই খোঁজ পেলাম যে, নাইট কোর্সে অ্যাক্টিংয়ের ওপর দুই বছর মেয়াদি একটা গ্রাজুয়েশন করার সুযোগ আছে। এইটা জানার পর আমি সারাদিন টেম্পোরারি বেসিসে নানাধরনের কাজ করতাম আর রাতে ওখানে ভর্তি হলাম। তারপর অ্যাক্টিংয়ে একসময় গ্রাজুয়েশন করলাম।
যাক তখন পাকিস্তানি অভিনেতা ছিলো জিয়া মহিউদ্দিন। খুব নামকরা অভিনেতা। এই জিয়া মহিউদ্দিনও আমার ইনস্টিটিউট থেকেই গ্রাজুয়েশন করেছে। ফলে তখন আমার মাথায় চিন্তা হলো জিয়া মহিউদ্দিন যদি পারে, আমি পারবো না কেনো? এরপর আমি কষ্টে রোজগার করা টাকা দিয়ে ব্রিটিশদের মতো ইংরেজি শেখার জন্য ভর্তি হলাম। আরে আল্লাহ সেকি কষ্ট! এক ঘণ্টা শেখার জন্য এক পাউন্ড দিতে হয়। তখন সেটা অনেক টাকা। সপ্তাহে একদিন টাকা জমিয়ে, না খেয়ে সুন্দর করে ইংরেজি শিখতে যেতাম। এভাবেই চলছিলো।
‘স্টেজ’ পত্রিকার সুবিধা ছিলো কী¾সারা ইংল্যান্ড, ওয়েলসে ও নর্দান আইল্যান্ডে যতো থিয়েটার কোম্পানি আছে, তাদের ডিরেক্টররা অডিশন নেওয়ার জন্য আসতো লন্ডনে¾সেই খবর তারা প্রকাশ করতো। পত্রিকায় এইভাবে লেখা থাকতো¾আজ বিকাল তিনটায় অডিশন হবে বার্মিংহাম থিয়েটার কোম্পানির জন্য। ওইসব অডিশনস্থলে গিয়ে দেখা যেতো ফাঁকা অন্ধকার স্টেজ, সামনে অডিয়েন্স। সেই স্টেজে উঠে নাম, কোথা থেকে আসছি এবং কী করতে চাই বলতে হতো। আমি ওই অডিশনে গিয়ে যা পারতাম, ড্রামা স্কুলে যা শিখেছিলাম তাই মুখস্থ ঝেড়ে দিয়ে আসতাম। ওরা যখনই বলতো, ‘ডোন্ট কল আচ, উইল কল ইউ’ তখনই বুঝতাম হবে না।
এভাবেই একবার ওয়েলস এর ফ্রাঞ্জিস থিয়েটারের অডিশনে গেলাম। এর ডিরেক্টর একজন নারী ছিলো। আমি অভিনয় করার পর তিনি বললেন, দেখো, আমরা তো আর প্রতি সিজনে ‘প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ করতে পারি না¾ ‘প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ নামে তখন একটা নাটক ছিলো¾তারপরও তুমি কি আমাদের এখানে অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেজ ম্যানেজার হিসেবে কাজ করবে? আমি ওখানে কাজ শুরু করে দিলাম, ছয় মাস করলামও। তারপর আমি বিবিসি’র প্রোডাকশনে এক্সট্রা হিসেবেও কাজ করছি। ওরা তো আর কোনো কিছু শুট্ করার জন্য তখন ইন্ডিয়ায় আসতো না, জানালা দিয়ে দেখাতো রাস্তা দিয়ে ইন্ডিয়ান হেঁটে যাচ্ছে। আমার মতো ১৫-২০ জন ইন্ডিয়ান এক্সট্রাদের নিয়ে তারা এ কাজ করতো। এভাবেই তখন আমার দিন যাচ্ছিলো। ততদিনে আমার গার্লফ্রেন্ডও হয়ে গেছে। কিন্তু দেশে ফেরার কোনো নাম নাই। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন বাবা না কে যেনো একটা চিঠি দিলো, বাবার শরীর খুব খারাপ। আমি সঙ্গে সঙ্গে দেশে চলে আসলাম।
আসার পর বাবা খুব খুশি; তিনি ভাবতেছেন, আমার ছেলে তো চাটার্ড অ্যাকাউন্টটেন্ড হয়ে এসেছে। মতিঝিলে তখন বিএনপি’র সেই অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের চাটার্ড অ্যাকাউন্টটেন্ড অফিস রহমান অ্যান্ড রহমানের অফিস ছিলো। বাবা কীভাবে যেনো তাদের চিনতেন। বাবা আমাকে সেখানে পাঠালেন। বাবা অবশ্য ততদিনে জেনে গেছে, আমি লন্ডনে গিয়ে সি এ করিনি। তখন উনি আমাকে বললেন, ওখানে যখন করোনি, তাহলে এখানে করো।
সাইফুর রহমানের সঙ্গে যিনি পার্টনার ছিলেন মানে আরেক রহমান, তিনি ছিলেন পাড় মাতাল। আমার ঠিক নামটা মনে নেই। তো উনাদের কথার ঠিক ছিলো না। বাবা, খানিকটা রেগে গিয়ে বললেন, এদের কথার ঠিক নাই, আমি অন্য জায়গায় দেখছি।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, বিটিভি’তে যোগ দিলেন কখন, কীভাবে?
হায়দার : আরে বলছি; এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন পত্রিকায় দেখলাম, তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে প্রযোজক নেওয়া হবে। সময়টা ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে। তো এই বিজ্ঞপ্তি দেখে আমি আবেদন করলাম। তখন তো আমার সেই অবস্থা! লন্ডন থেকে অভিনয়ের ওপর ডিগ্রি করে আসা লোক, আমার সামনে কে দাঁড়ায়। তারপর ভাইভা হলো; বোর্ডে বাংলাদেশ, পাকিস্তান দুই দেশের লোকই ছিলো। নিয়োগ পেয়ে গেলাম। টেলিভিশন থেকে আমাদের তখন টিকিট দেওয়া হলো রাওয়ালপিণ্ডি যেতে হবে ছয় মাসের ট্রেনিংয়ে। ট্রেনিংয়ে আমি ফাস্ট হয়ে গেলাম। তখন আমাকে বলা হলো, আপনি করাচিতে জয়েন করেন। আমি বললাম, দীর্ঘদিন আমি দেশের বাইরে ছিলাম, এখন আমি দেশেই থাকতে চাই। তারপর আমি চলে এলাম।
একটা বিষয় তোমাদের বলি, তখন কিন্তু আমরা সরাসরি বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না। আমরা কথা বলতাম মায়ের মাধ্যমে। মা ছিলো আমাদের মিডিয়াম। তো, মা আমাকে একদিন বলতেছে, বাবা নাকি তাকে রাগ হয়ে বলেছে, আমার ছেলে ওইসব খারাপ মেয়েদের সঙ্গে কাজ করবে! আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ওখানে সব বদমায়েশ লোকজন কাজ করে। আমি তখন আম্মাকে বললাম, আম্মা, আপনি আব্বাকে জিজ্ঞাসা করেন তো, টেলিভিশনের কয়জন লোকের সঙ্গে উনার পরিচয় আছে কিংবা কয়জনকে উনি চেনেন? আম্মা বললো, না বাবা, আমি এগুলো বলতে পারবো না; তবে তুমি কাজ শুরু করো, আমি তোমার আব্বারে বোঝাচ্ছি। এভাবে শুরু হলো, আমার টেলিভিশনের যুগ ও সেখানে আমার অভিনয়।
(চলবে)
রাজীব আহসান ও জাবের হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। বর্তমানে চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করছেন।
rayibaahsan@gmail.com
leenjaber01@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন