গোলাম রাব্বানী বিপ্লব
প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ম্যাজিক স্মৃতি
সব দেশের দর্শক 'স্বপ্নডানায়'-এর সঙ্গে কমিউনিকেট করতে পেরেছে
গোলাম রাব্বানী বিপ্লব

বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা গোলাম রাব্বানী বিপ্লব। যিনি মাত্র দুইটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই এ দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। তার প্রথম চলচ্চিত্র স্বপ্নডানায় ‘সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল’-এ এশিয়ান নিউট্যালেন্ট কম্পিটিশনে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লাভ করে। পৃথিবীর কোনো শীর্ষ স্থানীয় চলচ্চিত্র উৎসবে এখনো পর্যন্ত এটিই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একমাত্র অফিসিয়াল পুরস্কার। একই বছর স্বপ্নডানায় ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল অব ইন্ডিয়া-তে সিলভার পিকক অর্জন করে। এছাড়া এটি বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম চলচ্চিত্র উৎসব টরেন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অফিসিয়াল সিলেকশনসহ প্রায় ৪০টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শন হয়। হলিউডের বিখ্যাত ‘ভ্যারাইটি’, ‘নিউইয়র্ক টাইম্স’সহ পৃথিবীর বিখ্যাত সব সংবাদপত্রে প্রশংসিত হয়। এ বছর স্বপ্নডানায় মুক্তির ১০ বছর পূর্ণ হলো। এই উপলক্ষে স্বপ্নডানায় নির্মাণের পিছনে থাকা নানান গল্প নিয়ে গোলাম রাব্বানী বিপ্লব স্মৃতিচারণ করেছেন ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সঙ্গে।
২০০৪ খ্রিস্টাব্দে তখনো আমি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয়; দেশের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের সহ-সভাপতি এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশনের এশীয় অঞ্চলের সচিব। একদিন ‘চ্যানেল আই’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শিশু সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র প্রযোজক ফরিদুর রেজা সাগর ভাই আমাকে ফোনে বললেন, ‘তুমি কি আমার সঙ্গে একটু দেখা করতে পারবে?’ সাগর ভাইয়ের সঙ্গে ফিল্ম সোসাইটি নিয়ে আমার সম্পর্ক আরো আগে থেকে। আমি ছিলাম সত্যজিৎ রায় ফিল্ম সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, সাগর ভাই ছিলেন সহ-সভাপতি। কথানুযায়ী আমি তার সঙ্গে দেখা করলাম।
দেখা হওয়ার পর সাগর ভাই আমাকে বললেন, ‘আমরা এমন কিছু সিনেমা বানাতে চাই, যেগুলোর মূল উদ্দেশ্য ব্যবসা নয়; সেগুলো দেশের বাইরে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হবে বলে আশা করি। এ রকম সিনেমা কাকে দিয়ে বানানো যায়, বলো।’ আমি আমার কয়েকজন বন্ধুর নাম বললাম। আমি নিজে তখনো সিনেমা বানানোর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, মানে সেই আত্মবিশ্বাস ছিলো না। যদিও তার কয়েক বছর আগে থেকেই আমরা বন্ধুরা নানাধরনের স্ক্রিপ্ট তৈরি করছিলাম; তবে সেসবের অধিকাংশই ছিলো শর্টফিল্মের। আমাদের লেখা সেসব স্ক্রিপ্ট কখনো সিনেমা হয়ে ওঠেনি। তবে ফিচার ফিল্মের জন্য তখনো কোনো ধরনের মানসিক প্রস্তুতি ছিলো না। একপর্যায়ে সাগর ভাই বললেন, ‘তুমিই সিনেমা বানাও। তোমাকে বাংলাদেশের ফিল্ম কালচারে যদি থাকতে হয়, তাহলে সিনেমা বানিয়েই থাকতে হবে। ফিল্ম সোসাইটি করো সেটা তো কোনো আইডেন্টিটি না। চলচ্চিত্র পরিচালক একটি আইডেন্টিটি।’ যদিও আমি কোনোদিনই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস অনুভব করিনি। তবুও সাগর ভাইয়ের কথায় একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়লাম। সাগর ভাই বললেন, ‘আমি বিভিন্ন মানুষকে দিয়ে প্রথম কাজ করিয়েছি। আমি দেখেছি প্রথম দিন ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে কার চেহারা কেমন ছিলো, তাদের রিঅ্যাকশন দেখেছি। তুমি সিনেমা বানাও; ইমপ্রেস প্রোডিউস করবে। তবে মাথায় রেখো তোমার প্রোডিউসার একজন মধ্যবিত্ত মানুষ।’
আমি ফিরে আসলাম, ভাবতে শুরু করলাম। মনে পড়লো প্রায় বছর পাঁচেক আগের একটা ঘটনা। ২০০১ খ্রিস্টাব্দের দিকে আমি কিছুদিন ইউরোপে থেকে (ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স) দেশে ফিরে এসেছি। তখন আমার মামা নওগাঁর পোরশা উপজেলার একটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। আমার নানাবাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর, সেটা আবার পোরশার শেষ প্রান্তে (মহাডাঙ্গা)। অন্য পাড়ে ভারতের মালদহ, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে পুনর্ভবা নদী। নদীর দুই পাড়ে বিল। শৈশব-কৈশোরে এই বিল আর পুনর্ভবা নদী আমার খুব প্রিয় জায়গা ছিলো। আমার পৈতৃক বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুরে। একদিন গ্রাম থেকে বাবা ফোন করে জানালেন, আমার মামা আমাদের মহাদেবপুরের বাড়িতে তার পরিচিত এক লোককে নিয়ে এসেছিলেন। কারণ লোকটি বাজার থেকে কেনা পুরনো এক কাপড়ের মধ্যে ইতালিয়ান লিরা’র (ইতালিয়ান মুদ্রা) একটি এক লাখ টাকার নোট পেয়েছেন। ঘটনাটা ২০০২ খ্রিস্টাব্দের। সেই ইতালিয়ান লিরাটি ভাঙাতে তারা ঢাকায় আসতে চায়। আমি জানিয়ে দিলাম, এই নোট ভাঙাতে ঢাকায় আসার দরকার নেই। কারণ লিরা বাতিল হয়ে কমন কারেন্সি ইউরো চালু হয়ে গেছে। তারপরও এটা পাল্টানোর সুযোগ আছে হয়তো, কিন্তু সেটা ঢাকায় হবে কিনা জানি না। আর যদি হয়ও এর দাম হবে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা হবে। তখন তারা আর ঢাকায় আসেনি। ঘটনাটা সেখানেই শেষ। কিন্তু আমার কাছে রয়ে গেলো একটি দৃশ্য। রুক্ষ, শুষ্ক বরেন্দ্র ভূমির ধুলোর রাস্তায় ছুটে চলেছে একটা ভাঙাচোরা মোটরসাইকেল, আরোহী দুইজন। একটি বাতিল হয়ে যাওয়া বিদেশি টাকার নোট; তাদের হয়তো অনেক স্বপ্ন।
দৃশ্যটি আমার কাছে অনেক রোমাঞ্চকর ছিলো; কারণ আমার নিজের জন্ম বরেন্দ্র ভূমিতে। বরেন্দ্র ভূমির মানুষ আর প্রকৃতিকে আমি চিনতাম। তাই মাঝে মাঝেই দৃশ্যটা নিয়ে ভাবতাম। গল্পের ডালপালা মেলানোর চেষ্টা করতাম। একটা গল্পের খসড়া লিখেও ফেলেছিলাম। তখনো নাম ঠিক করিনি। আমার বন্ধু সারোয়ার জাহান খান এবং স্বপ্নডানায়-এর এডিটর জোনায়েদ হালিমকে গল্পটা দেখালাম। দুইজনই খুব পছন্দ করলো। সারোয়ার ভাইয়ের বাসায় আমরা তিনজনে মিলে স্ক্রিপ্টটা লেখার চেষ্টা করলাম। কয়েকদিন বসলাম, কথা বললাম। কিন্তু চিত্রনাট্য আর লেখা হয় না। কারণ সিনেমা বানানোর কোনো সম্ভাবনাই তখন ছিলো না। সাগর ভাই আমাকে যখন সিনেমা বানাতে বললেন, তখন আমি এই গল্পটা আরো কয়েকজনকে শোনালাম। সাধারণত কেউ চলচ্চিত্র নির্মাণ বা মুক্তির আগে কাউকে গল্প বলে না। কিন্তু আমার কথা ভিন্ন। আমার মাথায় কোনো গল্প আসলেই আমি দু-চারজনকে শোনাই; বোঝার চেষ্টা করি আসলে গল্পের শক্তিটা কোথায়? আদৌ গল্পটার মধ্যে শক্তি আছে, নাকি আমি কোনো ঘোরের মধ্যে আছি? গল্পটা শুনে সবাই বললো, এটা ভালো সিনেমা হবে। তার পরও আমার মধ্যে একধরনের কনফিউশন ছিলো, আমি আট-দশ পাতার মধ্যে গল্পটা আরো বিস্তারিত লিখে ফেললাম। এরপর শুরু হলো চিত্রনাট্য লেখার কাজ।
তবে গল্পটা আরেকটু ডিটেইল করার জন্য আরো বিন্যাসের দরকার ছিলো। সেটার জন্য আমি আনিসুল হকের সঙ্গে দেখা করে কথা বললাম। আনিস ভাই সবকিছু শুনে বললেন, ‘গল্পটা ভালো, সবই ঠিক আছে। কিন্তু চ্যানেল আই (ইমপ্রেস টেলিফিল্ম) এই ধরনের সিনেমা কেনো বানাবে? তারা তো সাধারণত এই ধরনের সিনেমা বানায় না। (মোস্তফার সরয়ার ফারুকীর ব্যাচেলর তখন শেষ হয়েছে, মেইড ইন বাংলাদেশ প্রস্তুতি পর্যায়ে। এই সিনেমাগুলোর অভিজ্ঞতায় আনিস ভাই বেশকিছু হতাশাব্যঞ্জক অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন।)’ আমি আনিস ভাইকে বললাম, আমার সিনেমার কাহিনি নিয়ে তাদের কিছু বলার নেই। সাগর ভাই নিজে থেকে আমাকে এ কথা বলেছেন। আনিস ভাই বললেন, ‘তার পরও আপনি আরেকবার কথা বলে আরেকটু নিশ্চিত হয়ে নেন।’ আমি সাগর ভাইয়ের সঙ্গে আবার কথা বললাম। দেখলাম, সাগর ভাই আর আনিস ভাইয়ের কথা মিলছে না। আমি চিত্রনাট্যের কাজ শুরু করলাম। আনিস ভাইও কাহিনি বিন্যাসের কাজ শুরু করলেন।
এবার আমার ইউনিট গড়ার পালা; প্রথমেই সিনেমাটোগ্রাফার। সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে আমি কলকাতা থেকে অপেক্ষাকৃত নতুন একজনকে নিতে চেয়েছিলাম। যিনি পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউট থেকে পাশ করে ইতোমধ্যে কয়েকটি আলোচিত চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। এ বিষয়ে প্রোডিউসারেরও কোনো আপত্তি ছিলো না। কিন্তু আমি কাহিনি, চিত্রনাট্য রচনা এবং পরিচালনা করে যে সম্মানী পাবো, তার প্রায় তিনগুণ টাকা দাবি করে বসলেন সেই সিনেমাটোগ্রাফার। তারপর তাকে ঢাকায় আনা, রাখা, অন্যান্য খরচ তো ছিলোই। কথা বললাম, সিনেমাটোগ্রাফার আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু অপু রোজারিও’র সঙ্গে। অপু ভাই তখন পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউট থেকে পাশ করে এসে বিজ্ঞাপন ও সিনেমায় নিয়মিত কাজ করছেন। উনি বললেন, আমি তো তিন মাসের জন্য লোহাখোর প্রামাণ্যচিত্রের জন্য ব্যস্ত। সীতাকুণ্ডে শুটিং, সেখানেই আছি। এরপর আমি খানিকটা বিপদেই পড়লাম। তখন পরিচালক আবু সাইয়ীদ ভাই বললেন, ‘আপনি মাহফুজ ভাইকে (মাহফুজুর রহমান খান) নিয়ে কাজ করেন, আপনি যেটা চান তাকে দিয়ে সেটাই করতে পারবেন।’ কিন্তু আমি তো তখনো মাহফুজ ভাইকে সেভাবে চিনি না। অন্যদিকে উনি আবার গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রির সিনেমাটোগ্রাফার, সেটা নিয়েও আমার মধ্যে একধরনের দ্বিধা ছিলো।
আমি ব্যাপারটা সাগর ভাইকে জানালাম। বললাম, আমি তাহলে বাংলাদেশের কোনো সিনেমাটোগ্রাফারকে নিই। তখন উনি নিজে থেকে বললেন, কাকে নিবে? অপু রোজারিও নাকি মাহফুজুর রহমান খান? অপু ভাইয়ের কথা জানালাম, বাকি রইলো মাহফুজ ভাই। কিন্তু মাহফুজ ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই, তাকে চিনিও না। সাগর ভাই বললেন, তোমাকে পরিচয় করে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। এর দুইদিন পরে মাহফুজ ভাই আমাদের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসে এলেন আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। দেখলাম, বয়সে প্রবীণ হলেও খুব স্টাইলিশ আর বিনয়ী মানুষ। ঘণ্টা দুয়েকের আড্ডায় মিলে গেলো। সঙ্গে ছিলেন পরিচালক শাহ আলম কিরণ। যিনি পরে এই সিনেমা নির্মাণে আমাকে রাস্তাঘাটগুলো চিনিয়ে দিয়েছেন। আড্ডাতে বসেই মাহফুজ ভাই বলে বসলেন, আগে চলেন লোকেশনে যাই। আমি আশ্চর্য হলাম। আমার ধারণা ছিলো, বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে সফল এই সিনেমাটোগ্রাফার পেশাদারিত্বের খাতিরেই আগে চুক্তি ও সাইনিং মানির কথা বলবেন। মাহফুজ ভাই সম্পর্কে আমার শঙ্কা ও দ্বিধা কাটতে শুরু করলো।
কয়েকদিন পর আমরা লোকেশনে চলে গেলাম; অনেক দূর, নওগাঁর শেষ প্রান্তে পোরশা, বরেন্দ্র ভূমিতে। ঢাকা থেকে সকালে যাত্রা করলে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। ওখানকার ভাঙাচোরা একটা ডাকবাংলোতে বসে সন্ধ্যা বেলায় আমি যখন তাকে গল্পটা শোনালাম, তখন মাহফুজ ভাই জানতে চাইলেন, ‘আসলে আপনি যেসব জায়গার কথা বর্ণনা করছেন সেসব জায়গা কোথায়?’ আমি বললাম, সব আছে। উনি তখন আমাকে বললেন, ‘আপনি কি আমাকে এই জায়গাগুলো দেখাতে পারবেন?’ আমি বললাম, হ্যাঁ। পরদিন সকালে লোকেশন দেখতে বের হলাম চারজন—আমি, মাহফুজ ভাই, কিরণ ভাই আর আমাদের প্রোডাকশন ম্যানেজার বাবুল শরীফ। আমি ভীষণ কনফিডেন্ট ছিলাম, ওই লোকেশনগুলো দর্শকের কাছে এক্সপোজ নয়। আমাদের এখানে গ্রামবাংলা মানে বিস্তীর্ণ সবুজ সমতল; কিন্তু বরেন্দ্র অঞ্চলের যে ল্যান্ডস্কেপ সেটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। সিনেমা দশর্কের কাছে একেবারে অপরিচিত। এই নতুন ল্যান্ডস্কেপ, আঁকাবাঁকা মাটির রাস্তা, মাটির ঘর সবমিলিয়ে লোকেশনটা সবাই অত্যন্ত পছন্দ করলো।
এরপর আসলো অভিনয়শিল্পী নির্বাচন। নারীচরিত্রের জন্য আমার তেমন বেগ পেতে হয়নি। রোকেয়া প্রাচী এবং মোমেনা চৌধুরী করা চরিত্র নিয়ে আমি খুব কনফিডেন্ট ছিলাম। তুষ্টি’কে খুঁজে পেতে একটু সময় লেগে গিয়েছিলো। শুটিংয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে তাকে পাওয়া গেলো। বাচ্চাদের খুঁজে পেতে খুব একটা কষ্ট হয়নি। মেম্বার চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবুকে নিয়েও আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। কিন্তু কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র ফজলু কবিরাজের জন্য কোনো অভিনেতাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পেশাদার কয়েকজন অভিনেতার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কিন্তু আস্থা রাখতে পারিনি। হঠাৎ করেই মাথায় আসলো মাহমুদুজ্জামান বাবুর কথা। বাবু ভাই সঙ্গীতশিল্পী; আমার খুব ভালো বন্ধুও, তবে দেখা-সাক্ষাৎ একটু কম হয়। একদিন বাবু ভাইকে ডেকে এনে গল্পটা শোনালাম। তারপর বললাম, এই চরিত্রে আপনাকে অভিনয় করতে হবে। বিস্মিত হয়ে বাবু ভাই বললেন, ‘আমি এখানে কেমন করে অভিনয় করবো? আমি তো অভিনেতা না।’ আমি বললাম, কেমন করে অভিনয় করবেন সেটা তো আমি দেখবো। আপনি কেবল বিষয়টির সঙ্গে ধীরে ধীরে ইনভলভ হন। এরপর উনিও ইনভলভ হওয়া শুরু করলেন। এক্ষেত্রে উনার ইনভলভমেন্টটা আমরা এই পর্যন্ত নিয়ে আসলাম যে, টায়ারের সোল দিয়ে ওনার জন্য জুতা বানাতে হবে; আমি বললাম, এটার জন্য আপনিই পুরান ঢাকায় যান। উনি সেটা করলেন। উনার জামাকাপড় লাগবে, বললাম, এটাও আপনি করে নিয়ে আসেন। তখন উনি গিয়ে সেগুলো বানিয়ে আনলেন। যদিও এগুলো স্বাভাবিকভাবেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকজনরা করে, মানে আলাদা লোক আছে। কিন্তু তাকে কাজটার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা খুব প্রয়োজন ছিলো। তারপর ওষুধ বিক্রির জন্য কিছু হকার আছে, যারা শহরের বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে ওষুধ বিক্রি করে। তখন ঢাকায় এসব হকারদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। বাবু ভাই খবর আনলেন, গাজীপুরের টঙ্গিতে গেলে তাদের দেখা মিলতে পারে। আমি তখন বললাম, সেখানেই যান। তখন উনি বাসে করে টঙ্গিতে গিয়ে তাদের আচার-ব্যবহার দেখে আসলেন। এছাড়া সিনেমার স্বল্পস্থায়ী চরিত্রগুলোর জন্য স্থানীয় মানুষের মধ্যে থেকেই অভিনয়শিল্পী বের করার পরিকল্পনা ছিলো আমার প্রথম থেকেই। সেজন্যই প্রতিবার লোকেশন দেখতে গিয়ে বার বার স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি এবং অভিনয়শিল্পী খোঁজা চেষ্টা করেছি।
একপর্যায়ে শুটিংয়ের সব প্রস্তুতি শেষ হয়। আমি একদিন আগে লোকেশনে যাই। কিরণ ভাই আর বাবু ভাইয়ের দায়িত্ব রইলো পরদিন পুরো ইউনিটকে একটি বাসে করে লোকেশনে নিয়ে আসা। এর মধ্যে অবশ্য প্রোডাকশন ম্যানেজার বাবুল শরীফ কয়েকবার গিয়ে আমাদের থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করে আসেন। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিলো। ওখানে থাকার জন্য কোনো হোটেল নেই। ডাকবাংলোর মাত্র দুইটি কক্ষ, সেটাও শুটিং ক্যাম্প থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছিলো, যার দোতলায় ডাক্তার ও অন্যান্য স্টাফদের থাকার কথা। আমাদের নারী অভিনয়শিল্পীদের সেখানে থাকার জন্য দোতলাটির ব্যবস্থা করে দিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। আর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তার সম্পূর্ণ ভবনটি ছেড়ে দিলেন আমাদের থাকার জন্য। টানা এক মাস।
সিডিউল অনুযায়ী শুটিং শুরু হলো। শুটিংয়ের প্রথম শট্ হিসেবে বেছে নিলাম একটি লঙ শট্। পুকুর পাড়ে, ক্যামেরা ক্রেনের উপরে, ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসবে। হাতে চালানো ক্রেনগুলোর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিলো না। শটটা ওকে হিসেবে নিয়ে নিলাম। পরে এডিটিংয়ের সময় শটটা দেখে অনেক আফসোস করতে হয়েছে। ক্রেন নিচের দিকে নেমে এসে যেখানে ক্যামেরাসহ স্থির হয়, সেখানে অস্বাভাবিক রকম কাঁপছিলো। বিষয়টা আমি লক্ষ করিনি। অর্থাৎ শটটা ওকে নয়, এন জি ছিলো। পরে অবশ্য আবহসঙ্গীত এবং শব্দ দিয়ে সেটাকে এমনভাবে ম্যানেজ করেছিলাম, কেউ আজ পর্যন্ত সেই শটের ভুলটা ধরিয়ে দিতে পারেনি। এটা করতে গিয়ে আমি শিখলাম, সিনেমা আর সিনেমাটোগ্রাফির পার্থক্য।
আমরা যেখানে কাজ করছিলাম, সেখানে থাকা-খাওয়া-কাজ করা খুবই কষ্টের ছিলো। ফলে ওই রকম জায়গায় কাজের জন্য ইউনিটের সবার পারস্পরিক বন্ধনটা খুব দরকার ছিলো। ইউনিটের একজনের সঙ্গে আরেকজনের আন্তরিক যোগাযোগ ছিলো। সিনেমার ইউনিটের নেতৃত্ব দেন পরিচালক। অনেকগুলো মানুষকে নিয়ে পরিচালকই একটা স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন। সেখানে প্রত্যেককেই নিজের সর্বোচ্চ নিবেদন দিয়ে কাজ করতে হয়। একদল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সন্তুষ্টির মধ্য দিয়েই একটা ভালো সিনেমা তৈরি হয়।
বরেন্দ্র ভূমিতে ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় আমাদের শুটিং চলছিলো। নানা অভিজ্ঞতায় একধরনের পিকনিকের আনন্দ। ওখানে ইউনিটের কেউ পানি খেতে চাইলে দেওয়া হতো সেলাইন। কারণ যে পরিমাণ ঘাম ঝরতো তাতে সাধারণ পানিতে টিকে থাকা সহজ ছিলো না। প্রতিদিন সকালবেলা প্রোডাকশনের ছেলেরা বড়ো বড়ো পানির ড্রামে অনেকগুলো সেলাইন ঢেলে রাখতো। ঘাম মোছার জন্য টিস্যু পেপারে কাজ হতো না। তাই সবার কাঁধে থাকতো একটা করে গামছা। প্রোডাকশনের ছেলেদের কাজ ছিলো প্রত্যেকের কাঁধ থেকে কিছুক্ষণ পর পর গামছাগুলো নিয়ে পানিতে চুবিয়ে একটু চিপে কিছুটা পানি ফেলে আবার দিয়ে দেওয়া। গ্রীষ্মের বরেন্দ্র ভূমিতে এভাবেই আমাদের কাজ করতে হচ্ছিলো। তবুও সবার মধ্যে অনেক আনন্দ। অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী তখন দুখাই এবং মাটির ময়না করে বেশ প্রতিষ্ঠিত। বিদেশের কোথা থেকে যেনো একটি ফোল্ডিং চেয়ার আর ছাতা নিয়ে এসেছিলেন। যে ধরনের চেয়ার আর ছাতা অভিনয়শিল্পীরা (তারকারা) আউটডোরে ব্যবহার করে থাকে আর কি। উনার একজন সহকারী ছিলেন, যার দায়িত্ব ছিলো চেয়ারটা বহন করা এবং ছাতাটা মেলে ধরা। প্রথম দুই দিন শুটিংয়ে গিয়ে যখন দেখা গেলো, দিনে কয়েকবার পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার তাদের ইউনিট নিয়ে গাছতলায় ঘাসের উপর বসে মিটিং করছে, তখন থেকে অবশ্য সেই চেয়ার আর ছাতাটা কখনো আর দেখা যায়নি। সেই চেয়ার আর ছাতা কোথায় গেলো আজ পর্যন্ত প্রাচীকে জিজ্ঞাসাও করা হয়নি। তবে তিনিও আমাদের সঙ্গে গাছতলার মানুষ হতে পেরেছিলেন। স্বপ্নডানায় যে ইউনিট ছিলো, তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও বন্ধন ছিলো অত্যন্ত দৃঢ়। শেষ পর্যন্ত একটি সিনেমা হয়ে ওঠা, দেশ-বিদেশে প্রশংসা ও পুরস্কার পাওয়া এসব কিছুর মূলে ছিলো, এই সম্পর্ক ও বন্ধন। আমি সিনেমা বানিয়েছি মাত্র দুইটি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, একজন পরিচালক একা কখনো সিনেমা বানাতে পারে না। সিনেমা বানানোর জন্য প্রয়োজন একদল মানুষ, যারা পরস্পরের সঙ্গে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ এবং একটি ভালো কাজের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। একজন পরিচালকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, তার দল গঠন এবং দলের মধ্যে গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা।
শুটিং শেষ হওয়ার কয়েকদিন আগে আমাদের একটি দুর্ঘটনা ঘটলো। স্পট পরিবর্তনের সময় বড়ো দুইটা নসিমনে (শ্যালোমেশিন চালিত স্থানীয় যান) করে লাইট ইউনিটের সব জিনিসপত্র নিয়ে আসা হচ্ছিলো। আমরা আগেই মাইক্রোবাসে করে নতুন স্পটে চলে আসি। ওখানে গিয়ে একটা চায়ের দোকানে বসে আমি, মাহফুজ ভাই, কিরণ ভাই, মাহমুদুজ্জামান বাবু, ফজলুর রহমান বাবু ভাই কেবল চায়ের জন্য বলেছি। এমন সময় কাছাকাছি একটি বিকট শব্দ শোনা গেলো। দৌড়ে গিয়ে দেখি আমাদের নসিমনটা উল্টে গেছে। সবাই কমবেশি আহত, তবে রজব আলী নামে একটা ছেলের শরীর থেকে পায়ের পাতার হাড় আলাদা হয়ে গেছে। আলাদা মানে কেবল কয়েকটা সাদা শিরার সঙ্গে আটকে আছে। তখন কিরণ ভাই গিয়ে দ্রুত ওই পা জোড়া লাগিয়ে দিলেন, একই সঙ্গে উনার মাথার ক্যাপ দিয়ে ওই জায়গাটা ঢেকে দিলেন; যাতে অন্যরা ওই জখমটা দেখতে না পায়। ওই দুর্ঘটনার পুরো চিত্র নিজের চোখে দেখে আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। ঘটনাস্থল থেকে সরে একটু দূরে একটা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না, ঝরঝর করে পানি পড়ছে। অন্য কেউ দেখেছে কিনা জানি না। তবে মাহফুজ ভাই বিষয়টা লক্ষ করেছিলেন; পরে বিভিন্ন সময় তিনি সেটা বলেছেনও।
চোখের পানি মুছে সাগর ভাইকে ফোন করলাম। পুরো বিষয়টা বলার পর উনি আমার মানসিক অবস্থা বুঝে বললেন, তুমি ভেঙে পড়ো না। প্রয়োজন হলে আমি হেলিকপ্টারে করে ওদের ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করছি। আগে কাছাকাছি কোনো হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। পরে অবশ্য হেলিকপ্টারে করে ওদের ঢাকায় আনার প্রয়োজন পড়েনি। তবে সাগর ভাইয়ের সেই কথা আমাকে অনেক আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিলো। ততক্ষণে যারা আহত ছিলো কিরণ ভাই সবাইকে নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর হাসপাতালে রওনা হয়ে গেছেন। সেখান থেকে রাজশাহী তারপর ঢাকা।
এই ঘটনার পর আর শুটিং করা গেলো না। কারণ শুটিং করার মতো মানসিক অবস্থা তখন ছিলো না। আসলে আমাদের বন্ধনটা এমন ছিলো, দলের কয়েকজন সদস্যকে হাসপাতালে পাঠিয়ে আমাদের পক্ষে শুটিং করা সম্ভব ছিলো না। এরপর সবকিছু প্যাকআপ করে ঢাকায় চলে আসলাম। আহতদের চিকিৎসার সব খরচ প্রযোজক দিয়েছিলেন। রজব আলীর দীর্ঘদিন চিকিৎসা করতেও কখনো কার্পণ্য করেনি প্রযোজক। রজবের অবস্থা এমন ছিলো যে সে আর কোনোদিন ভারী কাজ করতে পারবে না। তখন নির্বাহী প্রযোজক হাসান ভাই (ইবনে হাসান খান) আমাকে বললেন, “রজবকে নিয়ে আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। ও একটু সুস্থ হলে নিয়ে আসুন, ‘চ্যানেল আই’-এর স্টুডিওতে লাইটম্যান হিসেবে বসিয়ে দেবো, কোনো ভারী কাজ করতে হবে না; সারাজীবন বসে বসে বেতন পাবে।” রজবকে সে কথা বলেছিলাম, কিন্তু রজবের বাবা-মা তাকে আর এ ধরনের কাজ করতে দেয়নি।
আমাদের এখানে এখন লো বাজেট, ভালো সিনেমার কথা বলে শিল্পী ও কলাকুশলীদের টাকা না দেওয়া, কম দেওয়া, ঠকানো এই যে প্রবণতা সেটা অতীতেও ছিলো, তবে বর্তমানে এগুলো বেড়ে গেছে। ফলে বর্তমানের সিনেমাগুলো দাঁড়াতে পারে না। গত কয়েক বছরে আমি অনেকগুলো সম্ভাবনাময় সিনেমার পরিণতি দেখেছি। সেগুলো শেষ পর্যন্ত নির্মাতার কাঙ্ক্ষিত জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। এর পিছনে আমার মনে হয়েছে, এদের টিম ওয়ার্ক ভালো ছিলো না। কিন্তু স্বপ্নডানায় সেগুলো ছিলো না। শুধু মাঠের কর্মীরা নয়, প্রযোজকদের মধ্যেও ছিলো গভীর দায়িত্ববোধ। একজন ডিরেক্টরের বড়ো দায়িত্ব হলো, তার টিমটা শক্তিশালীভাবে বানানো এবং প্রযোজকও এই ইউনিটেরই অংশ।
ভারতে তখন ৩৫ মিলিমিটার ফিল্মের পোস্ট প্রোডাকশন করার জন্য সরকারের অনুমতি নিতে হতো। অনুমতি পেতে আরো তিন মাস সময় লেগে গেলো; ফিল্মগুলো তিন মাস পড়েছিলো। ওখানে ইমারশনগুলো খুলে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের কপাল ভালো যে, ওগুলো পেয়েছিলাম; তবে ভালো পাইনি। এ কারণেই স্বপ্নডানায়-এর প্রিন্টের অবস্থা খুব বেশি ভালো না। স্বপ্নডানায় নিয়ে আরেকটি ঘটনা না বললেই নয়। বাংলাদেশে তখন সফটওয়্যারে এডিট করা যেতো না। সফটওয়্যারে এডিট করার জন্য তখন ৩৫ মিলিমিটার থেকে টেলিফিল্মে ভিডিওটা ট্রান্সফার করে ২৪ ফ্রেমে এডিট করা হতো। এটা করার জন্য কলকাতার প্রসাদ স্টুডিওতে যাই, আমি আর এডিটর জুনায়েদ ভাই। তো সেখানে যাওয়ার পর, এডিট শুরু করতে যাবো, এমন সময় ৬৫-৭০ বছরের এক লোক এসে—নামটা ঠিক এখন মনে নেই—আমাকে একটা কার্ড দিলেন। তার পর বললেন, স্যার, আমি গিল্ট থেকে এসেছি। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি, গিল্ট আবার কী? বললাম, ঠিক আছে। এটা দেখে জুনায়েদ ভাই বললেন, চাচা, আপনি বসেন আমরা আপনাকে ডাকবো। তারপর তিনি আমাকে ভিতরে ডেকে নিয়ে বললেন, গিল্ট হচ্ছে কলকাতায় সিনেমার যতো কর্মী আছে তাদের একটা ইউনিয়ন। এদের নিয়ম হচ্ছে, তুমি যেখানেই সিনেমার কাজ করো না কেনো, এডিট করতে গেলে ওদের একজন প্রোডাকশন ক্রু নিতে হবে। এই ভদ্রলোক হচ্ছেন সেই প্রোডাকশন ক্রু। উনাকে প্রতিদিন পাঁচশো-ছয়শো টাকা করে দিতে হবে। আমি বললাম, কেনো দিতে হবে? মানুষ তো কেবল আপনি আর আমি, ও কী সার্ভিস দিবে আমাদের? জুনায়েদ ভাই বললেন, তুমি চা, নাস্তা, ভাত যাই খাবে, টাকা দিলে উনি তোমাকে এনে দেবে। এটা এখানকার সিস্টেম। নিরুপায় আমি বললাম, ঠিক আছে।
তারপর থেকে আমি ওই লোকের ওপর খুব বিরক্ত। এমনিতেই স্বল্প বাজেটের সিনেমা, এর মধ্যে আবার একটা অপ্রয়োজনীয় খরচ। কী আর করা কিছুক্ষণ পর মনে হলো আচ্ছা, লোকটাকে যখন টাকা দিতেই হবে, তো সার্ভিসটা নিই। তখন আমি উনাকে বললাম, আঙ্কেল আমাদের একটু সিঙ্গারা আর চা খাওয়ান; টাকা নিয়ে তিনি আনতে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে আসলেন, তখন জুনায়েদ ভাই এডিট করছেন। আমি সিঙ্গারা-চা খাচ্ছি আর তার সঙ্গে গল্প করছি। যদিও তার ওপর আমি একটু বিরক্ত! তো একপর্যায়ে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার বাড়ি কি কলকাতা শহরে? তিনি বললেন, এখানেই থাকি, তবে গ্রামের বাড়ি অন্যখানে। তারপর উনি কী যেনো একটা গ্রামের নাম বললেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার, আপনি কি আমার গ্রামটাকে চিনতে পেরেছেন? আমি বললাম, না তো চিনতে পারিনি; আমি পশ্চিমবঙ্গের কোনো গ্রাম চিনি না। তিনি বললেন, পথের পাঁচালী সিনেমা দেখেছেন? বললাম, হ্যাঁ। ওখানে যে গ্রামটা দেখেছেন, ওটাই আমার গ্রাম।
আমি বললাম, তাই নাকি! তা আপনি কতদিন ধরে এই প্রফেশনে আছেন? উনি বললেন, ওই পথের পাঁচালীর সময় থেকেই আছি। মানিক বাবু (সত্যজিৎ রায়ের ডাকনাম) তো পথের পাঁচালীর শুটিংয়ের সময় কলকাতা থেকে সব লোকজন নিয়ে যাননি, ওই গ্রামের লোকজন দিয়েই অনেক কাজ করিয়েছেন। আমি তখন ঝুঁকে গেলাম উনার সঙ্গে। এ কথা শোনার পর ওই লোক তো আমার কাছে হেরিটেজ পার্সনে পরিণত হয়ে গেলো। এমনকি আগে যে বিরক্তি ছিলো, সেটাও কেটে গেলো। এরপর তার সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবন, আরো অনেক কিছু নিয়ে কথা হলো। তার তিন ছেলে আর এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তিন ছেলেই প্রোডাকশনে কাজ করে। এবং এটা করে তারা কলকাতায় একখণ্ড জমিও কিনেছে। সেখানে একটা ছোটো বাড়িও করেছে তারা। সেখানেই সবাই মিলে থাকে।
যাহোক, ভেবেছিলাম কয়েকদিন পরে এসে আবার শুটিং শুরু করবো। মাসখানেক পরে গিয়ে দেখি, লোকেশন বদলে গেছে; বর্ষায় গাছের পাতা, ঘাসের রঙ বদলে গেছে। ধুলো রাস্তায় কাদা জমে গেছে। কিন্তু কিছু করার ছিলো না। তবে এই সময় আমাদের প্রাথমিক এডিটিং হয়ে গেলো। প্রাথমিক এডিটিংয়ের পর পর কয়েকদিন আমাদের সভা চললো। আমিসহ সভায় থাকতো, মাহফুজ ভাই, জুনায়েদ হালিম ভাই আর আমাদের আমন্ত্রণে আসা দেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা মুজিবর রহমান দুলু ভাই। নিঃসঙ্কোচে দুলু ভাই অনেক মতামত দিলেন, আমরাও সেগুলো গ্রহণ করলাম। সাউন্ডের জন্য লোক খুঁজে পাচ্ছিলাম না। প্রথমে ভেবেছিলাম রতন দাকে (রতন কুমার পাল) দিয়ে সাউন্ড ডিজাইন করাবো। রতন দা চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। কিন্তু তাদের সাউন্ড স্টুডিও ধ্বনিচিত্রে ডাবিং করতে গিয়ে যে হয়রানি ও হেনস্তার শিকার হয়েছিলাম, তাতে মনে হলো রতন দা ৪৬ নিউ এলিফ্যান্ট রোডের সেই দিনগুলির কথা ভুলে গেছে!
অবশেষে কলকাতায় অনুপ মুখোপাধ্যায়ের শরণাপন্ন হলাম। অনুপ দা ভারতের অনেক বড়ো সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, পাঁচ-সাতবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। বাঙালি নির্মাতাদের অনেক কাজই তার হাতে হয়েছে। নবীন পরিচালকের কাজ হিসেবে তিনি এটাকে হালকাভাবে নিলেন না। বরং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দায়িত্ব নিলেন, টাকাপয়সার কোনো চুক্তি ছাড়াই। অনুপ দা বাঙালি মূল্যবোধের মানুষ; নিবেদিত প্রাণ, শিল্পী। আমার সঙ্গে গভীর হৃদ্যতা তৈরি হলো। তার তত্ত্বাবধায়নে সাউন্ড ডিজাইনের কাজ চলতে থাকলো। একই সঙ্গে চলতে থাকলো আবহসঙ্গীতের কাজ। বাপ্পা মজুমদার তখন কমার্শিয়াল মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ। সিনেমাটার গল্প শোনার পর তিনি আগ্রহ নিয়ে এর মিউজিকের কাজ ধরলেন। প্রথমে ভাবেননি এটার কাজ এতো কঠিন হবে। অনেক সময় নিলেন, কিন্তু কাজটা করলেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে।
প্রথম দফায় দুর্ঘটনায় শুটিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঠিক একবছর পর আমরা আবার শুটিংয়ে গেলাম। ছয়দিনের শুটিং করা হলো। হয়তো ওই দুর্ঘটনা না হলে আমরা তিনদিনের মধ্যে শুটিং শেষ করতে পারতাম। পরে আরো কিছু আইডিয়া মাথায় এলো। সাধারণত সিনেমায় ‘প্যাচওয়ার্ড’ বলে একটা টার্ম আছে। যেখানে এডিট কমপ্লিট করার পরও শুট হয়। যদি কোনো জায়গায় কোনো সুনির্দিষ্ট দৃশ্যের প্রয়োজন হয়। আমরা একবছর প্যাচওয়ার্ডগুলো করে ফেলেছিলাম। স্বপ্নডানায় মোট ৩৫ দিনের শুটিং করেছিলাম।
যাইহোক, সিনেমার কাজ শেষে আমরা দুইটি ফিল্ম ফেস্টিভালে সেটা সাবমিট করলাম। একটি জার্মানির বার্লিন, অন্যটি নেদারল্যান্ডের রটরড্যাম ফিল্ম ফেস্টিভাল। বার্লিন উৎসবে সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্বপ্নডানায়-এর নাম আসার পর অপেক্ষা করতে থাকলাম। অন্যদিকে সিনেমাটা আমি জার্মানির একটা ইন্টারন্যাশনাল সেলস এজেন্সির কাছে পাঠালাম। তারা সিনেমাটা দেখে পছন্দ করলো। কিন্তু শর্ত দিলো সিনেমাটা অবশ্যই বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভালে নির্বাচিত হতে হবে। আমি বললাম, কেনো একটি মাত্র উৎসবের মধ্যে চুক্তিটাকে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে; আরেকটি উৎসবের সুযোগ থাকা উচিত। তারা রাজি হলো। তারা বার্লিনের সঙ্গে রটরড্যামকেও যুক্ত করলো। বার্লিন অনেক বড়ো উৎসব হলেও রটরড্যাম কোনো ছোটো উৎসব নয়; বরং নতুন নির্মাতার জন্য কখনো কখনো বার্লিনের চেয়ে রটরড্যাম উৎসব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ সেখানে নতুন নির্মাতাদের সিনেমাকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়। বার্লিনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই রটরড্যাম স্বপ্নডানায়-কে সিলেক্ট করে ফেললো। কিন্তু সেটা নন কম্পিটিটিভ সেকশনে। তবে আমার সেটা নিয়ে বেশ আফসোস ছিলো। রটরড্যামে সিলেক্ট হওয়ার পর আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম—রটরড্যামে যাবো নাকি বার্লিনের জন্য অপেক্ষা করবো। কারণ এই মাপের দুইটি চলচ্চিত্র উৎসবে একসঙ্গে যাওয়া সম্ভব নয়, বার্লিন ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার চাচ্ছিলো। তখন চলচ্চিত্র প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান—যিনি আমার অত্যন্ত কাছের মানুষ; সবকিছু শুনে পুরনো বাঙালি মূল্যবোধ থেকে তিনি বললেন, ‘সাদা ভাত পায়ে ঠেলতে নেই। তোমার জীবনের প্রথম সিনেমা প্রথম কোনো উৎসবে নির্বাচিত হয়েছে, সেটা আবার কোনো ছোটো উৎসবও না, ফলে বার্লিনের জন্য অপেক্ষা না করে রটরড্যামে যাও।’ আমি তার উপদেশটা গ্রহণ করলাম।
এর মধ্যে একটা ইন্টারন্যাশনাল সেলস এজেন্সি ডিসট্রিবিউশনের জন্য আমার সিনেমাটা নিয়ে নিলো। রটরড্যামে আমার সিনেমাটি রাত ৯টার সময় প্রথম শো হলো। হল ভর্তি লোক, খুব ভালো প্রশ্নোত্তরপর্ব হয়েছিলো। রটরড্যামে পাবলিক স্ক্রিনিংয়ের আগে একটা ইন্ডাস্ট্রি স্ক্রিনিং ছিলো। মোট দুইটি ইন্ডাস্ট্রি স্ক্রিনিং ছিলো; একটা শুরুর দিকে আরেকটা শেষের দিকে। আমি একটাতে উপস্থিত ছিলাম না। ইন্ডাস্ট্রি স্ক্রিনিংয়ের পরেই ডারবার ফিল্ম ফেস্টিভাল থেকে আমাকে মৌখিকভাবে নিশ্চিত করা হয়, তোমার সিনেমাটা আমরা দেখাবো। তারপর আরো কয়েকটা ফেস্টিভাল থেকে বলা হলো তারা আমার সিনেমাটি দেখাতে চায়।
এভাবে জানুয়ারি চলে গেলো; ফেব্রুয়ারিতে আর কোনো ফেস্টিভাল ছিলো না। এরপর মার্চে সিনেমাটি বুলগেরিয়ার সোফিয়া ফিল্ম ফেস্টিভালে দেখানো হলো। সোফিয়া ফিল্ম ফেস্টিভাল পূর্ব ইউরোপের একটি বড়ো ফেস্টিভাল। তবে এখানে কোনো পুরস্কার পাইনি। এখানে পুরস্কার না পাওয়ার কারণ হিসেবে আমার মনে হয়েছে, ওখানকার জুরি বোর্ডে যারা ছিলো তারা সবাই সিনেমাটা অ্যাকাডেমিকভাবে পড়ে এসেছে। একেবারেই অ্যাকাডেমিক প্রফেশনাল তারা। অন্যদিকে আমি তো আর অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে সিনেমা বানাতে আসিনি, বা শিখেও আসিনি। ফলে ন্যাচারালি কনটেন্টগতভাবে পিছিয়ে না থাকলেও টেকনিকাল দিক থেকে আমার সিনেমাটি তাদের কাছে পিছিয়ে ছিলো। এটা নিয়ে আমার কোনো আফসোসও ছিলো না। এরই মধ্যে সিনেমাটি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় রিভিউ হয়ে গেছে। এগুলো আমি জানতাম না। পরে বিভিন্ন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা হলে তারা সেগুলো জানায়।
স্বপ্নডানায় নির্মাণের আগে প্রোডিউসারদের আশা ছিলো, গোটা দশেক আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে দেখালেই হবে। তারপর যখন বড়ো বড়ো ফিল্ম ফেস্টিভালে দেখানো হলো, তখন তাদের মনোভাব হলো, কী প্রতিযোগিতায় আছে? প্রতিযোগিতায় না থাকলে তো কোনো ইন্টারেস্ট নেই। আর পুরস্কারও পাচ্ছে না? সেটা তো আরো হতাশার! ‘নিউহয়র্ক টাইম্স’ প্রতিদিন একটি করে সিনেমা তাদের রিডারদের জন্য রিকমেন্ট করে। একদিন স্বপ্নডানায় তারা রিকমেন্ট করলো। এটা সাগর ভাইকে বললাম, তখন উনি বললেন, ‘কী লাভ বলো, পুরস্কার আসবে নাকি টাকা আসবে?’ সেসময় পৃথিবীতে কমপক্ষে পাঁচ থেকে সাত হাজার সিনেমা নির্মাণ হতো। এরপর ফেস্টিভালে কয়েক হাজার সিনেমা দেখানো হয়। তার মধ্যে ‘নিউহয়র্ক টাইম্স’ ৩৬৫ দিনে ৩৬৫টা সিনেমার কথা বলে। তো সেখানে স্বপ্নডানায়-এর কথা বলেছে, সেটা আমার কাছে ভালোলাগার ছিলো।
এরপর সাংহাই ফিল্ম ফেস্টিভালে স্বপ্নডানায় জমা দিলাম। সেখানে এটা সিলেক্ট হবে আমরা কখনো ভাবতে পারিনি। এখানে স্বপ্নডানায় সিলেক্ট হলো, এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট কম্পিটিশন বিভাগে। সাধারণত কোনো ফেস্টিভাল সিনেমার প্রিন্ট আনা নেওয়ার জন্য যাওয়া কিংবা আসার যেকোনো একটির খরচ দেয়। কিন্তু সাংহাই দুইটিরই খরচ দেয়। এখন পরিবর্তন হয়েছে হয়তো, কিন্তু তখন নিয়ম ছিলো প্রতিযোগিতা বিভাগে ওরা সাধারণত নির্বাচিত সিনেমার কোনো পরিচালক, প্রযোজক কিংবা কোনো অভিনয়শিল্পীকে যাওয়া-আসার বিমান ভাড়া দেয় না। পুরস্কারের ব্যাপার ছিলো বলে হয়তো সেটা করতো। তারা টিকিট দেয় কেবল জুরি, স্পেশাল গেস্ট আর নন কম্পিটিশন বিভাগে যেসব বড়ো বড়ো পরিচালক আছে তাদেরকে। আমি তখন ওদেরকে আমাকে টিকিট দেওয়ার জন্য বিস্তারিত লিখলাম। কিন্তু ওরা বলল, না। কারণ কম্পিটিশন বিভাগে যেহেতু বড়ো একটি অ্যাওয়ার্ড মানি আছে, সেহেতু পলিসিগতভাবে এটা দেওয়া হয় না। আমার তখন এতো টাকা নেই যে, টিকিট কেটে সাংসাইয়ে যাবো। তখন আমি বললাম, প্রিন্ট আনা-নেওয়ার জন্য তোমাদের কোনো টাকা দিতে হবে না। ওগুলো আমিই সঙ্গে করে নিয়ে আসবো, তোমরা শুধু আমাকে টিকিট দাও। তখন তারা জানালো, দুঃখিত, আমরা এটাও করতে পারবো না। কারণ আমাদের সবাইকে একই পলিসির মধ্যে রাখতে হবে। তখন আমি বাকিতে একটা টিকিট কেটে চলে গেলাম।
সাংহাই চলচ্চিত্র উৎসব দর্শকের দিক থেকে এক নম্বর। এর আলাদা কয়েকটা কারণও আছে, এটা অনেক ঐতিহ্য আর জনপ্রিয় একটি শহর। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহরও এটি, যা ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে। এই ফিল্ম ফেস্টিভালে পুরস্কার পাবো সেটা আমি কখনো ভাবিনি। তবে সাগর ভাই প্রথম থেকেই বলছিলেন, ‘দর্শকের মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে এই পুরস্কার আমরাই পাবো।’ আমি বললাম, দর্শক তো এই পুরস্কার দিবে না, দিবে জুরি বোর্ডে স্পেলাইজড লোকজন। তখন উনি বললেন, ‘আচ্ছা, ওকে। না পেলে না পেলো। এটা নিয়ে দুঃখ করার কিছু নেই।’ যেদিন পুরস্কার দেওয়া হয়, সেদিনও ওখানকার একটা বড়ো মাল্টিপ্লেক্সে স্বপ্নডানায় দেখানো হয়। সেখানে দর্শকের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে একজন সাগর ভাইকে প্রশ্ন করলেন, ‘টাকা উঠে আসবে না, বিনিয়োগ উঠে আসবে না জেনেও কেনো আপনি এই সিনেমা প্রোডিউস করলেন।’ সাগর ভাই বললেন, ‘আপনারা সিনেমাটার জন্য অনেক হাততালি দিয়েছেন, আমরা জানি, মানি অ্যান্ড ক্লাপ্স নেভার কাম টুগেদার। আপনাদের হাততালিতেই আমাদের প্রাপ্তি।’
যাই হোক, শো থেকে আমরা যখন ওখানে ফিরে আসি, তখন এসে দেখি গ্র্যান্ড আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। হঠাৎ আমি অনুভব করলাম, খুব টেনশন লাগছে। তখন সাগর ভাই বললেন, ‘যা হবার ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে, এখন আর টেনশনের কিছু নেই। সুতরাং শান্ত থাকো।’ যখন সেরা চলচ্চিত্রনির্মাতা ঘোষণা করা হলো, আমার বামপাশে থাকা ইন্টারপ্রেটার বললো, ‘বিপ্লব এটা তুমি।’ ওখানে তো আগে কোনো কিছু চাইনিজ ভাষায় বলে তারপর ইংরেজিতে। সাগর ভাইও বললেন, তুমিই। কিন্তু আমি ঠিক ইংরেজি ঘোষণা না শুনে শিওর হতে পারছিলাম না। এরপর ঘোষণা হলো, আমি গিয়ে পুরস্কার নিলাম। এখন ওই সময়কার অনুভূতি প্রকাশ করাটা একটু কঠিন। কারণ অন্য ধরনের পরিস্থিতি ছিলো। আসলে এ রকম মুহূর্তে অনুভূতি একধরনের ভোঁতা হয়ে যায়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে যদি ফিল্ম ফেস্টিভালের অফিসিয়াল দিক হিসাব করা হয়, তাহলে এখন পর্যন্ত সাংহাইয়ের সেই অ্যাওয়ার্ডটাই সবচেয়ে বড়ো। এর পর স্বপ্নডানায়, বৃত্তের বাইরে কিংবা অন্য আরো চলচ্চিত্র অনেক পুরস্কার পেয়েছে, কিন্তু এটার মতো এতো বড়ো মাপের কোনো চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পায়নি। পরে অবশ্য সাংহাই উৎসবে প্রতিযোগিতা বিভাগে বাংলাদেশের নির্মাতার কয়েকটি চলচ্চিত্র দেখানো হয়েছে (মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পিঁপড়াবিদ্যা ও ডুব)। সেগুলো পুরস্কার না পেলেও ওখানে চলচ্চিত্র দেখানোও অনেক বড়ো ব্যাপার। তবে সাংহাইয়ে পুরস্কার পাওয়ার পরই শুরু হয় স্বপ্নডানায়-এর জার্নিটা।
স্বপ্নডানায় নিয়ে একটা খুশির বিষয় হলো, বিশ্বের যতোগুলো চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছি সব দেশের দর্শক স্বপ্নডানায়-এর সঙ্গে কমিউনিকেট করতে পেরেছে। কাউকে কোথাও কিছু বলতে হয়নি। হলের পিছনে সিনেমার শেষ ৩০ মিনিট আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখতাম। তখন লক্ষ করতাম, যেখানে যে প্রতিক্রিয়া দেখানো দরকার, তারা ঠিক সেই সেই জায়গায় সেটা দিচ্ছে। বাংলাদেশের দর্শক যেমন রিঅ্যাক্ট করছে, বুলগেরিয়া, তুরস্ক, চিন, ভারতের দর্শকও তেমনই করেছে। তার মানে সিনেমাটার ভাষা তারা সবাই একভাবেই বুঝেছে। এটা আমার অনেক ভালোলাগার একটা বিষয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশে আমার অনেক বন্ধু বলেছে, স্বপ্নডানায়-এর আবহসঙ্গীত তাদের পছন্দ হয়নি। তবে বিদেশে অনেকে এটা খুব পছন্দ করেছিলো। বিদেশের ওরা তো ভীষণ নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে বসবাস করে। ফলে অনেকে এমন প্রশ্নও করেছিলো, আপনার সিনেমার আবহসঙ্গীতের কোডটা কোথায় পাওয়া যাবে? তখন আমি বললাম, যদি অনলাইনে রিলিজ হয়, তখন এটা পাওয়া যাবে। শেষ পর্যন্ত স্বপ্নডানায় প্রায় ৪২টি চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়। মজার বিষয় হলো, এগুলোর অধিকাংশই ছিলো অনেক বড়ো বড়ো চলচ্চিত্র উৎসব। এমনও হয়েছে কোনো ছোটো চলচ্চিত্র উৎসবে আমি সিনেমাটা পাঠালাম, তখন সেই উৎসবে সিনেমাটি সিলেক্ট করা হয়নি। অথচ ওই দেশেই সবচেয়ে বড়ো ফিল্ম ফেস্টিভালে সেটাকে দেখানো হয়েছে। এক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা গেছে, টরেন্টো ফিল্ম ফেস্টিভালে অন্য আরেক উৎসবের লোকজন এসে সিনেমাটি দেখে পছন্দ করলো। তখন তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ না করে, সেলস এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
ইস্তাম্বুল ফিল্ম ফেস্টিভাল ইউরেশিয়ার দেশগুলোর একটা বড়ো ফিল্ম ফেস্টিভাল। এই উৎসবের একটা সেকশন ছিলো ইয়ঙ মাস্টার। যারা জীবনের প্রথম বা দ্বিতীয় সিনেমায় কোনো না কোনোভাবে মুন্সিয়ানা দেখায়, তাদের সিনেমা ওখানে দেখানো হয়। ওরা প্রথমে সেলস এজেন্সির কাছ থেকে সিনেমাটা নেয়, তারপর আমাকে আমন্ত্রণ জানায়। সবমিলিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে তারা স্বপ্নডানায় উৎসবে দেখায়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিলেকশন ছিলো টরেন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল। এটা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো ফিল্ম ফেস্টিভাল। হলিউড যেহেতু বড়ো একটা ইন্ডাস্ট্রি সেহেতু টরেন্টো ফিল্ম মার্কেটটাও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। টরেন্টোর ওরা আমার সিনেমাটা দেখে রটরড্যাম ফিল্ম ফেস্টিভালে। তবে টরেন্টোর যে প্রোগ্রামার এশিয়ান ফিল্ম দেখেন, তিনি সিনেমাটা দেখেননি। এটা ওখানে দেখে অন্য প্রোগ্রামাররা। এরপর ওরাই ওই প্রোগ্রামারকে সিনেমাটার কথা জানায়। সাধারণত জানুয়ারিতে যে সিনেমার প্রিমিয়ার হয়, সেপ্টেম্বরে সেটা ওরা দেখায় না। খুব সামান্য কয়েকটা সিনেমা ওরা বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভাল থেকে নেয়, আর কান ফিল্ম ফেস্টিভাল ও তার পরবর্তী কিছু উৎসবে দেখানো সিনেমা থেকে কিছু নেয়। যেগুলোর অধিকাংশই সরাসরি ল্যাব থেকে উৎসবে নিয়ে আসা হয়। এছাড়া রটরড্যাম ফিল্ম ফেস্টিভালে দেখে অক্টোবর মাসের জন্য সিনেমাটা বুক করেছিলো শিকাগো ফিল্ম ফেস্টিভাল। আমার এখনো মনে আছে, ওরা ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমাকে অফিসিয়ালভাবে চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো।
টরেন্টো ফিল্ম ফেস্টিভালের এখন যিনি আর্টিস্টিক ডিরেক্টর, তখন তিনি এশিয়ান-আফ্রিকান সিনেমার হেড ছিলেন। উনার নাম ক্যামেরুন বেলি। এখন উনি এ ফিল্ম ফেস্টিভালের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন। তো উনি কান উৎসবে গিয়ে আমাদের যে সেলস এজেন্সি ছিলো, সেখানে স্বপ্নডানায়-এ যে ফ্লায়ার লাগানো ছিলো, সেটা দেখেন। ওদের কাছ থেকে তখন উনি একটা ডিভিডি নেন, তারপর দেখেন সিনেমাটা। এরপর উনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আমাকে বলেন, ‘আমরা এতো পুরনো সিনেমা দেখাই না। তবে অ্যাট লিস্ট নর্থ আমেরিকান প্রিমিয়ার করা যেতে পারে, সেখানে একটা সুযোগ আছে।’ তারপর ওরা স্বপ্নডানায় ওখানে দেখালো। স্বপ্নডানায় বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা, যেটা টরেন্টোতে প্রথম অফিসিয়ালি সিলেক্ট করা হয়। পরে আমার বৃত্তের বাইরেও দেখানো হয়। এরপর মেঘমল্লারও দেখানো হয়েছে। সবমিলে স্বপ্নডানায়-এর যে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সেটা ভীষণ সমৃদ্ধ ছিলো।
তারপর গোয়া ফিল্ম ফেস্টিভালে স্বপ্নডানায় সিলভার পিকক অ্যাওয়ার্ড পেলো। সেখানে ‘ওয়ে অব স্টোরি টেলিং’ উল্লেখ করে মেক্সিকান একজন অভিনেতার সঙ্গে যৌথভাবে আমাকে পুরস্কারটা দেওয়া হয়। সাংহাইতেও যখন পুরস্কার দেওয়া হয়, তখনো বলা হয় ‘ওয়ে অব স্টোরি টেলিং’। স্বপ্নডানায় ব্যাঙ্গালুরু উৎসবেও ওপেনিং সিনেমা ছিলো। ২০১০ কি ২০১১ খ্রিস্টাব্দের দিকে ব্যাঙ্গালুরুতে ওই উৎসবে আমি গিয়েছিলাম। তখন এক ভদ্রলোককে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো, তিনি সেখানকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, প্রোডিউসার, ডিরেক্টর এবং একটা ফিল্ম ইন্সটিটিউটের শিক্ষক। তো খাবার টেবিলে উনি আমাকে বললেন, ‘তোমাদের বাংলাদেশের একটা সিনেমা আমাদের ইন্সটিটিউটে রেফারেন্স ফিল্ম হিসেবে পড়ানো হয়।’ আমি বললাম, কোন সিনেমা? তখন উনি স্বপ্নডানায় এর ইংরেজি নাম উইন্স অব ড্রিমস-এর গল্প বলা শুরু করলেন। আমাদের পাশেই আরেকজন ইন্ডিয়ান প্রোডিউসার ছিলেন, উনি আমাকে চিনতেন। তখন উনি বললেন, এটা তো বিপ্লবেরই সিনেমা। ওই ভদ্রলোক তখন খুব আগ্রহ নিয়ে বললেন, আসলে আমি জানতাম না এটা তোমার সিনেমা। এটা আমরা খুব গুরুত্ব দিয়ে ক্লাসে পড়াই। স্বপ্নডানায় নিয়ে এ রকম অনেক ভালো, অনেক মজার অভিজ্ঞতা আছে।
তবে দেশে সিনেমাটা সেভাবে ফোকাসে আসেনি। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জানুয়ারি সিনেমাটা প্রথম দেখানো হয় নেদারল্যান্ডের রটরড্যাম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে, তারপর বুলগেরিয়ায় সোফিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে, তার পর জুন মাসে পর্তুগালের ফেস্টোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে। এটা পর্তুগালের সবচেয়ে বড়ো চলচ্চিত্র উৎসব। এই উৎসবে ম্যান ভার্সেস নেচার শিরোনামে একটি প্রতিযোগিতা বিভাগে স্বপ্নডানায় দেখানো হয়। এছাড়া কবে, কোথায়, কার পরে সিনেমাটা দেখানো হয়েছে এখন সেটা আর বিস্তারিত মনে নেই। আসলে বেশ কয়েক বছর ধরে এটা বিভিন্ন ফিল্ম উৎসবে চলেছে। আমি সরাসরি যুক্ত ছিলাম রটরড্যাম আর বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভালের সঙ্গে। রটরড্যামে সিনেমাটি নির্বাচিত হওয়ার পর আমাকে আর কিছুই করতে হয়নি। সবকিছুই সেলস এজেন্সি করেছে। তবে পরে সাংহাইতেও আমরা পাঠিয়েছিলাম। মোট এই তিনটি উৎসবে আমরা নিজে থেকে সিনেমাটা পাঠিয়েছিলাম। মূলত, স্বপ্নডানায় অনেক উৎসবে যায় টরেন্টো ফিল্ম ফেস্টিভাল থেকে।
অন্যদিকে স্বপ্নডানায় বাংলাদেশে সম্ভবত ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে আগস্টের ৭ বা ১১ তারিখে মুক্তি পায়। আসলে বাংলাদেশে প্রিভিলেস ক্লাস দেশের সিনেমা টিকিট কেটে দেখতে চায় না। স্পেশালি যারা ওপেনিয়ান বিল্ডার, তারা বাংলাদেশের সিনেমা টিকিট কেটে দেখে না। তারা কলকাতা থেকে যেসব পাইরেটেড সিনেমা আসে সেগুলো দেখে এবং একটা বড়ো অংশের দর্শক সেসব নিয়েই থাকে। স্বপ্নডানায় নিয়ে অনেককেই বলতে শুনেছি, ও হ্যাঁ, সিনেমাটার নাম শুনেছি। কারণ পত্রিকায় সিনেমাটা নিয়ে বেশ প্রচার হয়। পুরস্কার পাওয়ার পর অনেক নিউজ হয়েছিলো, সবমিলিয়ে অনেকের কাছেই সিনেমাটার নাম ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে সিনেমাটা মুক্তির পর ‘স্টার সিনেপ্লেক্সে’ প্রথম সপ্তাহে চারটা করে শো ছিলো। সবমিলে প্রায় তিন মাস সেখানে সিনেমাটা চলেছে।
স্বপ্নডানায়-এর মতো আমার দ্বিতীয় সিনেমা বৃত্তের বাইরেও জীবনেরই গল্প ছিলো। এই গল্প হয়তো অনেকেই জানে, কিন্তু কেউ যদি বলতে চায় তাহলে তাকে বলতে দেওয়া হয় না। অবশ্য অনেকে বলে-ই না। কারণ এই গল্প বললে জীবনে অনেক ক্ষতি হয়। যদি বৃত্তের বাইরে আমার দ্বিতীয় সিনেমা না হতো, তাহলে আমাকে এভাবে বসে থাকতে হতো না। এই একটি সিনেমাটার কারণেই আমার জন্য এ সময়টা অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। তবে সেসময় আমি মনে করেছিলাম, শিল্পী হিসেবে আমার এ কথাগুলো বলা উচিত। ফলে আমার এটা নিয়ে কোনো আফসোস নেই, এটা আমার ক্যারিয়ারকে ধ্বংস করেছে। এখনো এই সিনেমাটা কাউকে দেখাতে দেওয়া হয় না। আমার এ সিনেমার যে গল্প সেটা আমাদের সমাজে অনেক বেশি ঘটে।
ঢাকা শহরে গত ৩০-৩৫ বছরে যে করপোরেট জীবন, ভোগবাদী জীবনের যে প্রসার হয়েছে; সেখানে এ রকম ঘটনা অহরহ ঘটছে। তাদের নাম বলে লাভ নেই। আমরা গ্রাম থেকে অমুককে তুলে এনে পুরস্কার দিচ্ছি, তমুককে তুলে এনে পুরস্কার দিচ্ছি। তার সঙ্গে আমার সোশিও-পলিটিকাল কমিটমেন্টকে মার্কেটিং করছি। করপোরেটগুলো কী করে—সি এস আর মানে করপোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি। এটা আসলে কী? আমি যে করপোরেট লুটপাট করছি, ধনসম্পদ কামাচ্ছি সেগুলো আড়াল বা ঢাকার জন্য সি এস আর খুলছি। তারা বোঝায়, আমরা এই এই ভালো কাজ করছি। মানুষ কিন্তু বলে, ওই কোম্পানি তো ভালো কাজ করছে। কিন্তু আসলে অমুক কোম্পানির কাজটা ভালো ছিলো না। ওই কোম্পানির কাজ ছিলো যথাযথভাবে তার পণ্যটি কম দামে ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া। কিন্তু সে তার পণ্যটাও মানসম্মতভাবে মানুষের হাতে তুলে দেয়নি। তার বিজ্ঞাপন খরচটাও ছিলো বেশি; ক্রেতার সঙ্গেও সে প্রতারণা করেছে। আর এই প্রতারণা আড়াল করার জন্যই সে সি এস আর চালু করেছে। কিন্তু তোমার তো কাজ না বাংলাদেশের বাগেরহাট থেকে একজনকে ধরে এনে পুরস্কার দেওয়া। তোমার কাজ সাবান বানানো, তুমি কম পয়সায় সাবান বানিয়ে সেটা জনগণের হাতে তুলে দাও। এগুলো তো জনগণকে একধরনের ঠকানো।
তবে বৃত্তের বাইরে করার সময় এ গল্প বলার ক্ষেত্রে এতোটা ঝুঁকি আছে, আমার সেটা মনে হয়নি। আসলে আমরা তো সবসময় রাজনৈতিক দল, সরকারের আচার-আচরণ নিয়ে তাদের সমালোচনা করি, তাদের কাজ নিয়ে সমালোচনা করি। আর এ রকম একটা পরিস্থিতিতে থাকতে থাকতেই আমরা ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও অসহনশীল হয়ে পড়েছি। কিন্তু কেউই নিজের সমালোচনা সহ্য করতে পারি না। বৃত্তের বাইরে আমি নির্দিষ্ট কারো চরিত্র নিয়ে করিনি। আমার চোখের সামনে তখন এ রকম অনেক ঘটনা ছিলো, তার মধ্য থেকে আমি কিছু চরিত্র দাঁড় করেছি মাত্র। কিন্তু তারা সেটাতে এতোটা প্রতিক্রিয়া জানাবে সেটা আমি ভাবিনি। হতে পারে কেউ কারো বিরুদ্ধে কোনো কবিতা লিখেছে কিংবা বই লিখেছে, কিন্তু সেটার জন্য তাকে নিষিদ্ধ করতে হবে, সেটা তো মেনে নেওয়া যায় না। বৃত্তের বাইরেতে কিন্তু কোনো ব্যক্তির সমালোচনা ছিলো না। বরং রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতির সমালোচনা ছিলো।
স্বপ্নডানায় যদি কেউ খেয়াল করে দেখে, সে বুঝতে পারবে এর পিছনের যে গল্প রয়েছে, সেটা কিন্তু অর্থনীতি, সাম্রাজ্যবাদ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের। সাম্রাজ্যবাদ বলতে ডলার এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, পৃথিবীব্যাপী মানুষ এটাকে চেনে। ডলার মানেই অনেক টাকা। সিনেমার গল্পে ওটা যে কঙ্গোর টাকা সেটা ব্যাংকে গিয়ে জানতে পারে। তার আগে তো ওরা সেটাকে ডলার বলেই মনে করেছিলো। আবার প্রান্তিক কোনো মানুষের মধ্যে যখন অন্য সমাজের কোনোকিছু, অর্থনীতি তার স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে যায়, তখন সেটা তার জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করে। তাদের জীবনকে অস্থিতিশীল করে তোলে। টাকার পিছনে ছুটে সিনেমায় যেটা হয়েছে, ফজলু কবিরাজের জীবনের সম্পর্কগুলো বদলে গেছে। সম্পর্কের পরিবর্তন হয়ে গেছে স্ত্রী, বন্ধুর সঙ্গে। যে বন্ধুর সঙ্গে তার কোনো অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিলো না, সেই বন্ধুর সঙ্গে তার দর কষাকষি, সমঝোতা করতে হচ্ছেকতো পারসেন্ট সে নিবে আর কতো পারসেন্ট দিবে। স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে, স্ত্রীকে ফেলে সে অন্য নারীর কথা চিন্তা করে। একজন ভোগী মানুষ তার মধ্যে জেগে ওঠে। সন্তানদের সঙ্গেও তার একই আচরণ। একসময় এই খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে এসব থেকে বের হওয়ার শক্তিও আসে। সেরকম স্বপ্নডানায়-এ ফজলু অনেক স্বপ্ন দেখতে থাকেন, সেই স্বপ্ন তাকে জীবন থেকে বিচ্যুত করে; একপর্যায়ে যখন সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় আবার তিনি ঘুরে দাঁড়ান; সম্পর্কগুলোর কাছে ফিরে আসেন; তার নিজের পেশা নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। সবমিলে গল্পের পিছনেও যে অনেক গল্প থাকে সেটাই বোঝানো হয়েছে।
অন্যদিকে আমার কাছে মনে হয়েছে, সিনেমার সমালোচনা বাংলাদেশে সেই অর্থে হয় না; এজেন্ডার সমালোচনা হয়। আমি যদি কোনো এজেন্ডাকেন্দ্রিক সিনেমা করি, সেটা আলোচনা হবে। কিন্তু স্বপ্নডানায় ওই রকম তাৎক্ষণিক কোনো এজেন্ডাভিত্তিক সিনেমা নয়। তবে এই সিনেমাটা নিয়ে কোনো ভালো রিভিউ আমি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে দেখিনি। দুয়েকটা পত্রিকায় হয়েছে কয়েকটা। তবে সেখানে সিনেমার রিভিউয়ের চেয়ে আমার কথাই বেশি ছিলো। সেই অর্থে ভালো রিভিউ হয়নি। ভালো রিভিউ বলতে, সাবজেক্টের ভিতরে গিয়ে বলা। এভাবে কেউ ভাবে না, বুঝতেও চায় না। স্বপ্নডানায় নিয়ে সেই অর্থে কোনো রিভিউ হয়নি দেশে। বিদেশে কিছু হয়েছে, কিন্তু আমাদের প্রতি বিদেশিদের দৃষ্টিভঙ্গি তো পূর্ব নির্ধারিত। ওরা ধরেই নিয়েছে বাংলাদেশ এই, বাংলাদেশ এই রকম। যদিও বৃত্তের বাইরেকে তারা অন্যভাবে ট্রিট করেছে। টরেন্টোর মতো বড়ো উৎসবগুলো সিনেমার সিনোপসিস ছাপে না, রিভিউ ছাপে। ওখানে তারা বৃত্তের বাইরেকে কাফতার হিরোর সঙ্গে তুলনা করেছে। আবার বৃত্তের বাইরে অনেকে পছন্দই করেনি, তেমনও হয়েছে। কারণ এই রাজনীতিটা তো সমাজে যারা ভালো আছে, তাদের কারো জন্য স্বস্তিদায়ক নয়; তারা এ গল্প শুনতে চায় না। ফলে কমবেশি সব দেশই সিনেমাটি একইভাবে দেখেছে। কারণ সিস্টেমটা তো সব দেশেই এক!
তবে টরেন্টোতে এ রকম হয়নি। টরেন্টোতে সিনেমাটি সাধারণ দর্শক ভীষণ পছন্দ করেছে। কিন্তু আমেরিকান সমালোচকরা খুব বেশি পছন্দ করেনি। মানে তারা খুব কড়া সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে ইরানি সমালোচকরা ভীষণ পছন্দ করেছে বৃত্তের বাইরে। স্বপ্নডানায় ইরানের ফজর ফিল্ম ফেস্টিভালে সিলেক্ট হয়নি, কিন্তু বৃত্তের বাইরে সেখানকার কম্পিটিশনে সিলেক্ট করা হয়েছিলো। উত্তর কোরিয়ার ওরাও খুব পছন্দ করেছিলো। এখানে পলিটিকাল মাইন্ড সেটআপটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আসলে বৃত্তের বাইরে বিদেশেও সমালোচনার মূল কারণ হলো, সারাবিশ্বে ওই একই রাজনীতিতে কাজ চলছে। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবে সেই ধরনের ইতিবাচক কথা তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, একজন কবি তার কবিতা লেখার সময় চিন্তা করে না তার কবিতাটা পাঠক পছন্দ করবে কিনা। চিত্রশিল্পীও করে না। সে নিজের চিন্তা-ভাবনা দিয়ে কাজ করে বা প্রকাশ ঘটায়। সিনেমার ক্ষেত্রে এ বিষয় তো আরো জটিল। আমি যে সিনেমা বানাই, সেখানে আমি আমার চিন্তার প্রকাশ ঘটাই। কারো দেখে যদি ভালো লাগে, তাহলে আমারও সেটা শুনে ভালো লাগে। আর যদি না লাগে তাহলে আমার বেশিকিছু করার থাকে না। সবকিছুতেই আমি কেবল আমার অবজারভেশনটাই প্রকাশ করি অন্য কিছু না।
অনুলিখন : ইব্রাহীম খলিল
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন