রোকেয়া প্রাচী
প্রকাশিত ২৮ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
কথামালা ৬
অভিনয় ও পেশাদারিত্ব
রোকেয়া প্রাচী

কথামালা ৬
১২৩, রবীন্দ্র কলাভবন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
২৯ মার্চ ২০১৭
বিকেল সাড়ে চারটা
শেষ কিস্তি.
দীলিপ রায়, অর্থনীতি বিভাগ : সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে একজন অভিনয়শিল্পীর ভূমিকা কী? চরিত্র নির্বাচনে কিংবা পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রভাব কি পড়ে?
রোকেয়া প্রাচী : ধন্যবাদ, দীলিপ রায়। সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে একজন অভিনয়শিল্পীর ভূমিকা অনেক বেশি। আমি আগেই বলেছি, একজন অভিনয়শিল্পী কিন্তু সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে, মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। কাজেই তিনি চাইলেই সবকিছু করতে পারেন না। চরিত্রটা যদি এ রকম হয় ‘খুব টেনশন করছে’ তাকে স্মোক করানো হচ্ছে বা অ্যালকোহল দেওয়া হচ্ছে কিংবা এমন পোশাক পরানো হচ্ছে যেটা কেবল নতুনত্ব তৈরির জন্য। অথচ সেই চরিত্র বা গল্প তা ডিমান্ড করে না। আমি মনে করি, একজন অভিনয়শিল্পীর সেটা করা উচিত হবে না। আমি এমন চরিত্র বা এমন কিছু করতে পারি না, যেটা সমাজকে বা আমার প্রজন্মকে ভিন্ন কোনো বার্তা দিবে। সে জায়গায় অবশ্যই দায়িত্বশীল হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি যখন আমি একটি ভালো চলচ্চিত্রে অভিনয় করবো, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাবো কিংবা দর্শকের ভালোবাসা পাবো; তখন আমারও দায়িত্ব আছে, আমি পরের চলচ্চিত্রটায় কী অভিনয় করছি, সেটা দেখে-বুঝে করার।
আমি দুখাই-এ অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলাম। সবাই আমাকে অনেক ভালোবাসলো। তারপরে আমি কী কাজ করলাম, মাসে ১০টা করে প্যাকেজ নাটক করলাম। এফ ডি সি’তে গিয়ে মেইনস্ট্রিম ফর্মুলার পাঁচটি চলচ্চিত্র করলাম। তাহলে, দর্শকের আগের সেই রেসপেক্ট থাকবে? থাকবে না। আমি যখন আমার নিজের পর্যালোচনাটা করবো, আমি রোকেয়া প্রাচী কোন ধরনের শিল্পী, আমি কোন ধরনের কাজ করছি। আমি নিজেকে কোথায় দেখতে চাই। এই ভাবনাটা যদি ভিতরে না থাকে, তাহলে আমার নিজের দায়িত্বশীলতার সেই জায়গাটা তৈরি হবে না। শিল্পের কিন্তু নিজেকে ব্র্যান্ডিং করার দায়িত্ব রয়েছে। আমি দুখাই-এর পর চার বছরে আর কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয় করিনি। এই চার বছরে মাত্র একটা প্যাকেজ নাটকে অভিনয় করেছিলাম। সেই একটা নাটকে অভিনয় করে আমি বেস্ট ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিলাম। প্রশ্ন হলো, আমি কেনো আরো কাজ করিনি? এমন নয় যে, আমাকে কেউ ডাকেনি। আমার মনে হয়েছিলো দুখাই আমাকে যে মাত্রা দিয়েছে, আমার পরের চলচ্চিত্র বা কাজটা সেই মাত্রায় হতে হবে। আমার শিল্পের প্রতি একটা দায়িত্ব রয়েছে, সমাজের প্রতিও। আমি এমন চরিত্র বা চলচ্চিত্রে অভিনয় করবো না, যেটা সমাজের কথা বলে না, জীবনের কথা বলে না। আমি চার বছর অপেক্ষা করে মাটির ময়না করেছি। তার পর দুই বছর অপেক্ষা করে অন্তর্যাত্রা। আমার ২০ বছরের ক্যারিয়ারে আমি কিন্তু ২০টি চলচ্চিত্রও করিনি!
আমার টেলিভিশন ও মঞ্চ মিলিয়ে প্রায় ২৭ বছরের ক্যারিয়ার। আমি কিন্তু দুশো নাটকে অভিনয় করিনি। দু’বছর হয়েছে যে শিল্পীর, তার কিন্তু পাঁচশো নাটকে অভিনয় হয়ে গেছে! আমি এখনো দুশো নাটকে অভিনয় করিনি ২৭ বছরের ক্যারিয়ারে। পুরস্কার পেয়েছি ২০টিরও বেশি; সম্মাননা পেয়েছি দুশোরও বেশি; ভালোবাসা পেয়েছি একশো কোটিরও বেশি। এটাই হচ্ছে দায়িত্ব, এটাই হচ্ছে শিল্পীর সেই দায়িত্বশীল হওয়ার জায়গা।
মো. রাকিব রায়হান, মার্কেটিং বিভাগ, তৃতীয় বর্ষ : আমাদের বাংলাদেশে কি যোগ্য পরিচালকের অভাব নাকি যোগ্য অভিনয়শিল্পীর অভাব; শ্রদ্ধাবোধের অভাব নাকি অল্প জেনে আমরা বেশি কথা বলি?
প্রাচী : না, বাংলাদেশে যোগ্য পরিচালকের অভাব নেই। মোরশেদুল ইসলামের চাকা আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছিলো। দুখাই জাপানের ডিজিটাল মিডিয়ার অর্থায়নে নির্মিত। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এম কে টু আব্বাস কিয়ারোস্তামি’কে সবসময়ই প্রোডিউস করতো। তারা তারেক মাসুদকে প্রোডিউস করেছিলো। তারেক মাসুদের হাত ধরে কান এবং অস্কারে আমাদের যাত্রা শুরু। আমাদের অনেক পরিচালকই ভালো কাজ করেছেন/করছেন, ভালো ভালো উৎসবে গেছেন এবং তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। অভিনয়শিল্পীরাও ভালো কাজ করেছেন। তাহলে এসব প্রশ্ন কেনো? হ্যাঁ, সংখ্যার দিক থেকে সেটা হয়তো অনেক কম। এর মধ্যে হয়তো ভালোর সংখ্যা কম, খারাপের সংখ্যা বেশি। ২০ বছরে যে জন্যে আমার ২০টা চলচ্চিত্রও হয়নি, আবার অনেকের দুশো চলচ্চিত্র হয়ে গেছে; এটা থাকবেই।
একটা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর তার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল দাঁড়িয়ে থাকে। রাজনৈতিক অবস্থার যখন পরিবর্তন হয়, তখন সাংস্কৃতিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে? আমি খুব ডিটেইল পলিটিকাল আলোচনায় যেতে চাই না। তবে আমার বিশ্বাস, আপনারা বুঝতে পারছেন। এ দেশের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতায় কিন্তু ছন্দপতন ঘটেছে। তবে সে কারণে শুধু চলচ্চিত্র কিংবা অভিনয়েই নয়, গণসঙ্গীতে, কবিতায়, উপন্যাসে, সাহিত্যে, দর্শনে আমাদের ছন্দপতন ঘটেছে। এসবই হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে। এখন সংস্কৃতি-বান্ধব সরকার, জনগণ অনেক বেশি সচেতন; আমরা একটা স্থিতিশীল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের মধ্যে এখন রাজনৈতিক সচেতনতা এসেছে। আমরা সংস্কৃতি নিয়ে ভাবছি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে পারছি। আমাদের চলচ্চিত্রে যখন মুক্তিযুদ্ধ অনুপস্থিত থাকবে, শিল্প-সাহিত্যে চেতনার চর্চা কমে যাবে, তখন ভালো কিছু সৃষ্টি হবে না। আমরা সেই সঙ্কটকাল পেরিয়ে এসেছি। আমরা আশাবাদী, সামনে হয়তো আরো ভালো কাজ পাবো। সেটা আপনাদের মতো নবীনদের হাত ধরেই আসবে।
পলাশ, মার্কেটিং বিভাগ : আমি সমকাল নাট্যচক্রে কাজ করি। নিজেকে একজন সফল নাট্যকার হিসেবে গড়ে তুলতে কোন কোন দিকে লক্ষ রাখা উচিত? নাট্যকার হওয়ার প্রবল আগ্রহ আমার।
প্রাচী : চোখ খোলা থাকবে, কান খোলা থাকবে, নাক খোলা থাকবে। সাংবাদিক হতে গেলে তিনটি বিষয় লাগে। নাক, চোখ ও কান। তাই না? শিল্পী হতে গেলেও নাক, কান ও চোখ লাগে এবং এ সবকটিকেই ব্যবহার করতে হবে। আমরা যা কিছু দেখি, সব কি দেখি? দেখি না; খালি তাকাই। কিন্তু আমাদের সবকিছু দেখতে হবে, পড়তে হবে, জানতে হবে; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে আধুনিক ও শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাহলেই আপনি একজন ভালো নাট্যকার হতে পারবেন। যেকোনো শিল্পীকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষিত হয়ে উঠতে হবে। আমি যদি না জানি, আজকে আমেরিকায় কী পলিটিক্স হচ্ছে, তাহলে আমি কিন্তু এই সময় একটি চরিত্রকে উপস্থাপন করতে পারবো না। অবশ্যই আমার জানতে হবে আমেরিকায় কী পলিটিক্স চলছে। আমার জানতে হবে, ইরানের মেয়েরা কী করছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একজন অভিনেত্রী, নাট্যকার, পরিচালককে অবশ্যই আধুনিক ও শিক্ষিত হতে হবে। তাহলেই আপনি সফল নাট্যকার হতে পারবেন। সফল অভিনেতা ও ডিরেক্টরের ক্ষেত্রেও একই ফর্মুলা। নাক, কান, চোখ, একদম খোলা; হান্ড্রেড পার্সেন্ট তীক্ষ্ন হতে হবে। ধন্যবাদ।
হেমন্ত বাবু, অর্থনীতি বিভাগ : ভালো অভিনয়শিল্পী হবার পিছনে থিয়েটারের ভূমিকা কতোটুকু? বর্তমানে চলচ্চিত্রে থিয়েটার কর্মীরা কেনো তেমন সুযোগ পায় না?
প্রাচী : এখানে দুটো প্রশ্ন আছে। আমি মনে করি, থিয়েটার হচ্ছে বাল্যশিক্ষা। ছোটোবেলায় যেমন মা আমাদের অ, আ, ক শিখিয়ে দেন। অ, আ, ক না শিখে আমরা কিন্তু আম, জাম লিখতে পারবো না। তেমনই আমি বিশ্বাস করি, আমি যেহেতু থিয়েটার থেকে এসেছি, থিয়েটার আপনাকে পরিশীলিত করবে, অভিনয়ের বাল্যশিক্ষাটুকু শিখিয়ে দিবে। আপনাকে তৈরি করে দিবে এই থিয়েটার। কেমন করে শৃঙ্খল জীবন নির্বাহ করতে হবে, কীভাবে শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে সেটা শেখায়। সে কারণে আমি মনে করি, একজন শিল্পীকে টেলিভিশন বা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে থিয়েটার অনেক বেশি এগিয়ে দেয়। থিয়েটারের অভিজ্ঞতা থাকাটা খুব জরুরি।
দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিলো, থিয়েটার কর্মীরা তেমন সুযোগ পায় না কেনো? এটা খুব কঠিন প্রশ্ন। মাধ্যম হিসেবে থিয়েটার আর চলচ্চিত্রের মধ্যে পার্থক্য আছে। থিয়েটারের অভিনয়টা একটু লাউড। সেখানে লাইটকে আমি অনুসরণ করছি, আমি আমার চরিত্রের কাছে পৌঁছে যাচ্ছি। আমি আমার সংলাপটা যদি ভুলেও যাই, আমার কো-আর্টিস্ট এগিয়ে আসছে। থিয়েটারে পারফমেন্সের যে স্টাইল, আর চলচ্চিত্রের যে স্টাইল; দুটোর মধ্যে অনেক পার্থক্য। দুটোর লেন্সই আলাদা। কাজেই এই যে দুটো ধরন, এই ধরনটুকু ধরে অভিনয় করার একটা শিক্ষা বা একটা পারদর্শিতা তৈরি করা প্রয়োজন। এটা অনেক সময় অনেক শিল্পী গ্রহণ করতে পারে না কিংবা সেটার সঙ্গে যেতে পারে না। সে কারণে অনেক ক্ষেত্রে থিয়েটার পারফর্মাদের চলচ্চিত্রে বা টেলিভিশন মিডিয়াতে খানিকটা অসুবিধা হয়।
আর আমি তো মনে করি, থিয়েটার চলচ্চিত্রের চাইতে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। ধরুন, আজকে আমি আপনাকে যে কথাটা বলছি, সেটা এক ঘণ্টা পর আমি যখন রিভিউ করবো, আমার মনে হতে পারে উত্তরটা আমি একটু অন্যভাবেও দিতে পারতাম। কিন্তু এটা যদি আমার টেলিভিশনের ক্যামেরা হতো, আমি বলতাম, রাখো, রাখো। এটা আরেকবার দিবো। সেকেন্ড টাইম না পারলে থার্ড টাইম দিতে পারতাম। কিন্তু এখানে আমি যা বলছি, যে ভুল বলছি, সেটা আপনি সারাজীবন মনে রাখবেন, রোকেয়া প্রাচী একটা ভুল কথা বলে গেলো। হয়তো পরে আমার গিয়ে মনে পড়বে, ইস্ এ কথাটা আমি কেনো বললাম? এটা তো আমি এভাবে বলতে চাইনি। আমরা যখন কথা বলি, তখন এ রকম হয়ে যায়। মঞ্চে আজকে আমি যে পারফর্মেন্স করবো, দর্শক কিন্তু সেটাই মনে করে বাড়ি ফিরে যাবে। এটা বদলানোর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু চলচ্চিত্র বা টেলিভিশনে সেই সুযোগ রয়েছে। মিডিয়ার পার্থক্যের জন্য অনেক সময় থিয়েটার পারফর্মাররা এই লাউড জায়গা থেকে, খুব সূক্ষ্ম জায়গায় নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে না। সে কারণে এই পার্থক্যটুকু হয়, অনেক থিয়েটার কর্মীরাও পারে না; অবশ্য এ না পারাটা খুব দোষেরও নয়, দুটো মাধ্যমই খুবই শক্তিশালী।
সিনথিয়া, অর্থনীতি বিভাগ : নৈতিকভাবে রাজনীতির শিকার হচ্ছে আমাদের চলচ্চিত্র। শুধু আমাদের না, পুরো বিশ্বেই। বেশির ভাগ চলচ্চিত্রে পুরুষ নায়কনির্ভর কেনো? মেয়েরা তো অভিনয় করছে, করতে পারছে। তবুও তারা কেনো এভাবে ব্যবহার হচ্ছে?
প্রাচী : বাহ! আমি আপনাকে একটু দেখতে চাই সিনথিয়া। (দর্শক সারিতে সিনথিয়া দাঁড়ালেন) প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। কিছুদিন আগে আমি কলকাতায় গিয়েছিলাম একটা সেমিনারে। সেমিনারের সাবজেক্ট ছিলো, ‘ইজ দেয়ার অ্যানিথিং কল্ড উইমেন সিনেমা?’ পৃথিবীতে উইমেন সিনেমা খুব কম। একজন উইমেন ডিরেক্টর হলেই কিন্তু উইমেন সিনেমা হবে না। ধরুন, একজন মেয়ে স্ক্রিপ্ট রাইটার, মেয়ে ডিরেক্টর, মেয়ে পারফর্মার, তাহলেই কি এটা উইমেন সিনেমা হবে? মোটেও না। উইমেন ইস্যু নিয়ে যদি কোনো সিনেমা হয়, তাহলে আমরা বলতে পারি সেটা উইমেন সিনেমা। সেই সিনেমার সংখ্যা খুবই কম। উইমেন ইস্যু নিয়ে পুরুষও কথা বলতে পারে। উইমেন ইস্যু নিয়ে উইমেনই কথা বলবে এমন কোনো বিষয় নেই। যেমন, সবচেয়ে বেশি নারীবাদী কিন্তু রবীন্দ্রনাথ। তিনি নারীদের নিয়ে যেমন পর্যালোচনা করেছেন, এই বিশ্বে অন্য কোনো নারী আজ পর্যন্ত নারীদেরকে এভাবে দেখেনি। তাহলে পুরুষের মধ্য দিয়েই কিন্তু নারী আবিষ্কৃত হয়েছে। হ্যাঁ, আমাদের নারী চলচ্চিত্রকার, নারী সিনেমার সংখ্যা খুবই কম। তবে যে কয়েকটা নারী ইস্যু নিয়ে সিনেমা হয়েছে, সেই কয়েকটায় নারী ইস্যু খুব স্পেসিফিক সাবজেক্টেরিয়ান হওয়ার কারণে সেগুলো একটু আড়াল হয়ে গেছে। তবে আমি মনে করি, এটা হওয়া দরকার।
আর আপনার প্রশ্নে যে ইঙ্গিতটা ছিলো, মেইন ক্যারেক্টার ডমিনেন্ট করছে ছেলেরা। এটা ডিপেন্ড করছে আপনি কীভাবে দেখছেন। ধরেন, মাটির ময়নায় আমি এবং কাজী মানে আয়েশা এবং কাজী। এখন আপনারা বলেন, মাটির ময়না কি উইমেন ডমিনেন্ট ফিল্ম নাকি পুরুষ ডমিনেন্ট ফিল্ম? মাটির ময়না হান্ডেড পার্সেন্ট উইমেন ডমিনেন্ট ফিল্ম। কারণ দেখেন সিনেমায় আয়েশা সারাক্ষণ জানালা খুলছে আর কাজী জানালা বন্ধ করছে। আয়েশা তার সন্তানকে মেলায় পাঠাচ্ছে, কাজী ধমক দিচ্ছে। আয়েশা তার ছেলেবেলায় ফেরত যাচ্ছে, কাজী ওকে টেনে নিয়ে আসছে। আয়েশা কাঁথায় পাখি আঁকছেন, কাজী তাকে বলছেন ‘এটা না-জায়েজ কাজ। মেয়েটি গুনগুন করছেন। কাজী এসে থামিয়ে দিচ্ছেন এবং ফাইনালি, তিনি ঘর থেকে বেরোন না সেই সময়। আয়েশা স্বামীর কাছ থেকে সন্তানের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। যখন তিনি বেরিয়ে আসেন, তার মাথার ঘোমটা পড়ে যায়। আর এর মানেই হচ্ছে, নারী একসময় পরিবার, সোসাইটির দায়িত্ব নিচ্ছে। এটা উইমেন ফিল্ম; উইমেন ডমিনেটেড ফিল্ম।
কিন্তু পুরো সিনেমাতে আমরা আয়েশাকে দেখি, স্লো; তিনি অনেক নীরবে যাচ্ছেন। অথচ পুরো সিনেমাতে প্রতিবাদটা আয়েশাই করেন। ইনার ফাইটিং, নারীর ইনার মনস্তত্ত্ব। হান্ড্রেড পার্সেন্ট উইমেন ডমিনেটেড ফিল্ম মাটির ময়না। কিন্তু আমরা যখন পর্দায় অ্যানালাইসিস করি, তখন হয়তো এভাবে অ্যানালিসিস করি না। হয়তো বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মাটির ময়নাকে কখনো উইমেন ডমিনেন্ট সিনেমা বলবো না। কিন্তু সারা পৃথিবীতে আমি যতোগুলো ফেস্টিভালে গিয়েছি, মাটির ময়না উইমেন সিনেমা হিসেবে সব জায়গায় আলোচিত হয়েছে।
অন্তর্যাত্রাও উইমেন ডমিনেটেড ফিল্ম, দুখাই ডেফিনিটলি মেইল ডমিনেটেড ফিল্ম; সেখানে মেইল ক্যারেক্টারটাই ডমিনেট করে। আবার অনেক সিনেমা আছে, সেখানে প্রতিবাদটা হয়তো খুব স্লো ওয়েতে যাচ্ছে। সব প্রতিবাদ, সব ডমিনেটের ভাষা হয়তো লাউড না। সে কারণে আমরা মিস করি, কোনটা মেল সিনেমা, কোনটা উইমেন সিনেমা; কোনটা ফিমেইল ইস্যুনির্ভর সিনেমা আবার কোনটা হিউম্যান বিঙ সিনেমা। এ জায়গাগুলো আমরা আসলে আলাদা করতে পারি না। এটাকে আমরা একটা ফরমেটের মধ্যে ফেলে দিই। অল্টারনেটিভ ফিল্ম, মেইনস্ট্রিম ফিল্ম; এই জায়গাগুলো নিয়ে আমাদের ভাববার সময় এসেছে।
হারুন-অর-রশিদ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের বর্তমান অবস্থার পিছনের দায়টা কার বলে আপনি মনে করেন?
প্রাচী : আমাদের সবার। যারা সিনেমাহল ভেঙে বিল্ডিং, শপিং কমপ্লেক্স, অ্যাপার্টমেন্ট বানিয়েছে, তারা এর জন্য ৪০% দায়ী, আর ৬০% দায়ী আমরা; যারা এই পেশার সঙ্গে জড়িত এবং আপনারা। আমাদের চোখের সামনে সিনেমাহলটা ভাঙছে, আমরা দেখছি। ওই যে ভানুর কৌতুক, দেখি না ব্যাটা যায় কোথায়? সিনেমাহল ভাঙছে, আমরা দেখছি। আমরা শিল্পীরা ভাবছি, আরে সিনেমাহল ভাঙছে তো আমাদের কী! কী জন্য আমরা ওখানে কথা বলতে যাবো? আজ ভারতীয় সিনেমা আসছে; আসছে তো আমার কী, আমি কেনো যাবো? এই যে ‘আমার কী’, ‘আমার কী’ করছি¾এটা তো আসলে আমাদেরই। সিনেমাহল ভেঙেছে, আমরা কিন্তু কেউ তখন কথা বলিনি। আজকে সিনেমাহল নেই! আপনি একটা প্রোডাক্ট লঞ্চ করলেন, সে প্রোডাক্টটা কোথায় বিক্রি করবেন, যদি দোকান না থাকে। দোকান লাগবে তো; দোকান ছাড়া আপনি কিনতে পারবেন না। আজ দোকানটাই ভেঙে গেছে, আমি সিনেমা দেখাবো কোথায়?
যখন ওই দোকান ভেঙে গেলো, তখন ওই সিনেমাটা চলে গেলো পকেটে, টেলিভিশন স্টেশনগুলোতে। আল্টিমেটলি সিনেমা হারিয়ে গেলো। মুনাফা যাদের করার, তাদের কাছে পৌঁছে গেলো। আমরা ধরা খেলাম। সেজন্য দায়ভারটা আমাদের। আমরা নীরব থেকেছি, ভেবেছি এ সমস্যা আমাদের না। এ সমস্যা যারা অভিনয় করে তাদের। অভিনয়শিল্পী ভেবেছে, এ সমস্যা আমার না ডিরেক্টরের। আর ডিরেক্টর ভেবেছে এটা আমার না, প্রোডিউসারের। আল্টিমেটলি সবাই এর ফলাফল ভোগ করছি। আজকে সিনেমাহল ভেঙে যাওয়াতে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে, মাদক গ্রাস করেছে। সিনেমা তো বিনোদন। আর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যদি বিনোদন না থাকে, সে কী করবে? সে তো অন্যায় করবেই, ভুল পথে যাবেই।
অধরা মাধুরী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : মঞ্চে অভিনয় এবং ক্যামেরার সামনে অভিনয়ে চরিত্র উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কৌশলের কি কোনো পার্থক্য আছে?
প্রাচী : হুম, আছে। মঞ্চের ক্ষেত্রে নাটকীয় বাস্তবতার কথা বলেছি। ক্যামেরার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বাস্তব জীবন থেকে কীভাবে আলাদা? মঞ্চে অভিনয় আর ক্যামেরার সামনের অভিনয়ের মধ্যে খুব পার্থক্য আছে। মঞ্চে লাইটটা সেট করা থাকবে, মিউজিকটা সেট করা থাকবে, কো-আর্টিস্ট এর ডায়লগ সেট করা থাকবে। রিহার্সেল করে আমরা সবাই মিলে বিসমিল্লাহ বলে মঞ্চে ঝাঁপিয়ে পড়বো এবং সবাই মিলে একসঙ্গে অভিনয় করে মঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসবো। ডিরেক্টর ওই দূরে দাঁড়িয়ে চুল ছিঁড়বেন। লাইট ডিজাইনার লাইট মিস করলে, ডিরেক্টর ওখান থেকে বকাবকি করবেন, মিউজিক ডিজাইনার মিস করলে বকা দিবেন। কিন্তু কো-আর্টিস্ট তার অ্যাকশন ভুল করলে কিছু করার থাকবে না। মঞ্চে একবার আমি আর মামুন ভাই (আবদুল্লাহ আল মামুন) ‘খেলাঘর’ নাটকে¾কাঠের মঞ্চ, একদম ভাঙাচোরা, আমাকে হাই-হিল পরতে হতো, সঙ্গে বড়ো গাউন। মামুন ভাই হাত বাড়াবে, আমি দৌড়ে এসে হাতটা ধরবো; উনি আমাকে ঘোরাবেন। কিন্তু তিনি হাত বাড়াননি, অথচ আমি ওই অ্যাকশন নিয়ে তার কাছে চলে গেছি। তিনি একটা বিট মিস করায়, আমি একটা চক্কর খেলাম; এতে আমার একটা হিল মঞ্চের পাটাতনের কাঠের মধ্যে ঢুকে গেলো।
এদিকে মামুন ভাই তার পরের বিটে আমার ডান হাত ধরেছেন, আমাকে ঘোরাবেন। কিন্তু আমি তো উঠতেই পারছি না, আমার হিল ঢুকে পা তো আটকে আছে। এখন এই দুই-এক সেকেন্ডের মধ্যে আমি কী করতে পারি? তখন আমি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার দুই পা খালি করে ফেলা উচিত। তখন আমি আমার অন্য পাও খালি করে ফেললাম। পরে অভিনয় শেষে আমি যখন মঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসলাম, সেখানে শুধু দুটো হিল দেখা যাচ্ছে। দর্শক তখন বুঝেছে ঘটনা কী। পরের দৃশ্যে আগে আরেকজন গিয়ে হিলটা টেনে তুলে নিয়ে আসলো। তো মঞ্চ হচ্ছে এ রকম। সেখানে অনেক রকম ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু কিছু করার থাকে না। দাঁড়ানোর কথা লাইটের আলোয়, কিন্তু দাঁড়াতে পারলাম না; সেখানে লাইট নাই, কিছু করার নেই। কিন্তু টেলিভিশন বা সিনেমায় আপনি লাইটটা মিস করলেন, তাহলে আবার নেন; লেন্স ঠিক নেই, আবার করেন; চোখের পানিটা ঠিকমতো পড়লো না, আবার গ্লিসারিন নেন, চোখ দিয়ে কান্না বের করেন। হাজারটা শট্ নেন, সেটা ৩৫ মিলিমিটারে হোক বা ডিজিটালে হোক। এখন তো সব ডিজিটাল। আগে প্রথম শটটা রিহার্সেল করার পর, ডিরেক্টর ও প্রোডিউসার মনে মনে আল্লাহ-খোদা সবাইকে ডেকে ফেলতেন। কারণ ওই এক শট্ নষ্ট হওয়া মানে তার ওই ফিল্মটুকু ফেলে দেওয়া, মানে টাকা নষ্ট। এজন্য তখন তারা আর্টিস্টকে বলতেন, আপা শট্ নেবো? চা খাবেন? কারণ ওই শটটা যাতে ঠিকমতো হয়।
কিন্তু এখন ডিজিটাল হওয়ার কারণে আপনি ১০ বার টেক দিতে পারছেন। যতোক্ষণ না হয় আরকি। মাটির ময়নায় একটা শট্ ২৭ বার নিতে হয়েছিলো এবং ওই ২৭ বারই আমাকে ওই ইমোশন দিতে হয়েছে; কিছু করার নেই। ডিরেক্টর কেবল বার বার বলেন, আবার করেন। কিন্তু এখন ডিজিটাল হওয়াতে কোনো পয়সা খরচ নেই, একশো বার নেন। আজকে দিলেন, ভালো লাগলো না, কালকে আবার শট্ নিবেন। অন্তত এই সুযোগটা রয়েছে। এই জন্য এই দুটো খুব আলাদা। আর বাস্তব জীবন থেকে তো একদমই আলাদা। বাস্তব জীবনে আমি রোকেয়া প্রাচী টোটালি আলাদা মানুষ। আমি আপনাদের সামনে যে রোকেয়া প্রাচী বসে আছি, সে তো আমি নই। সে হলো অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী। এখানেই তো আমার আমি’র সঙ্গে আপনাদের পার্থক্য। আমি আজকে যে এখানে বসে আছি, সেই কি প্রকৃত আমি? নিশ্চয়ই না। এই পার্থক্য করতে না পারলে তো কোনো পেশাই পেশা হয়ে উঠবে না। আমার বাস্তব জীবনে অনেক কিছুই তো ইচ্ছা করে, আমি অনেক অন্যরকম। সেই অন্যরকম আমি তো এখানে প্রযোজ্য নই। কাজেই এখানেই সেই আমি যখন প্রযোজ্য নই, ক্যামেরার সামনে তো আরো নই। সব চরিত্র, সব সত্ত্বাই আলাদা। একজন মানুষের মধ্যেই একশোটা সত্ত্বা থাকে।
গোলাম মোস্তফা, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পীদের পেশাদারিত্ব কোন দিকে এগোচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?
প্রাচী : বাংলাদেশের শিল্পীদের পেশাদারিত্বের অনেক ঘাটতি আছে। আমি আমার অনেক কো-আর্টিস্টকে দেখেছি, মাঝখানে পরিচালককে গিয়ে বলছে, দুই ঘণ্টার জন্য আসতেছি, খুব জরুরি। কী জন্য? এই দুই ঘণ্টা সে কিন্তু আরেক সেটে গিয়ে আরেকটা সিন করে আসছে। কিংবা এই দুই ঘণ্টায় সে তার কোনো পার্সোনাল কাজ করে আসছে। এটা করার কোনো অধিকার একজন শিল্পীর নেই। একজন শিল্পী একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময় কখনোই অন্য সেটে যেতে পারে না। আমি যখন মাটির ময়না করি, তখন তানভীর মোকাম্মেল লালসালু করছিলেন। আমাকে লালসালু করার জন্য তিনি বলেছিলেন। কিন্তু আমি বলেছিলাম, দুটো সিনেমার সিডিউল পাশাপাশি। উনি বললেন, তারেক তো আমার বন্ধু, আমি তারেককে বলি? আমি তখন তারেক ভাইকে বললাম, উনি (তানভীর মোকম্মেল) আসলে, আপনি বলবেন প্রাচীর কোনো গ্যাপ নেই। কারণ আমি নিতে পারবো না। দুটো চরিত্র ব্যাক টু ব্যাক আমি নিতেই পারবো না। আমার জন্য সেটা খুব কঠিন হবে। তাই আপনি তাকে (তানভীর মোকাম্মেল) না করে দিবেন।
আমি কিন্তু লালসালু করিনি। আমি উনাকে মিস করেছি। আমি উনার কোনো সিনেমাতেই কাজ করতে পারিনি। আমার জন্য ব্যাক টু ব্যাক কাজ করা অসম্ভব। এটা আমি পারি না এবং আমার কাছে এটা অসম্ভব মনে হয়। একসঙ্গে যেমন দুজনের সঙ্গে প্রেম করা যায় না, তেমনই একসঙ্গে দুটো চরিত্রে অভিনয় করা যায় না। ট্রাস্ট মি, এটা খুব ডিফিকাল্ট। একজনের ম্যাসেজ আরেক জায়গায় চলে যায়। বুঝছেন? (হাসি) সামনে আমার শুটিং আছে সেপ্টেম্বরে, যেটা এপ্রিলে হওয়ার কথা ছিলো। এপ্রিল মানে গত মাসে শুনলাম, আমার ডিরেক্টর শুটিং করবেন সেপ্টেম্বরে। তার মানে এ সময় পর্যন্ত আমি বেকার, কোথাও চেহারা দেখাচ্ছি না, অভিনেত্রী হিসেবে। অনেক রিকোয়েস্ট করার কারণে প্রাণ গ্রুপের একটা কাজ করলাম এবং আমার হোম প্রোডাকশনে দুটো কাজ করেছি। আর কোনো কাজ করিনি। লম্বা সময়ের কোনো চুক্তিতেও যেতে পারিনি। কারণ এটা সম্ভব না। একসঙ্গে দুটো উপন্যাস কি কেউ লিখতে পারে? আজকে একটার ১০ পাতা, কালকে অন্যটার ১০ পাতা। একসঙ্গে দুটো অ্যাসাইনমেন্ট পেপার কি লেখা সম্ভব? সম্ভব না। তেমনই চরিত্রও সম্ভব না।
সাজু আহমেদ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : ছোটোবেলায় যখন প্রেম বুঝতাম না, তখনো অনেক অভিনয়শিল্পীর অভিনয় দেখে প্রেমে পড়েছি। হয়তো এখনো পড়ে আছি। কিন্তু এখন যখন প্রেমে পড়ার বয়স, তখন প্রেমে পড়ার মতো কোনো অভিনয়শিল্পী বর্তমান অভিনয় জগতে আসছে না কেনো? (হাসি, হাততালি)
প্রাচী : (হাসি) এটা শুনলে আমাদের অভিনেত্রীরা সুইসাইড করবে। আসলে এক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের অভাব, খুব ভালো স্ক্রিপ্টের অভাব, খুব ভালো সিনেমার অভাব, প্রেজেন্টেশনের অভাব; এটাই একমাত্র কারণ। স্ক্রিপ্ট রাইটারকে তো গল্প দিতে হবে, চরিত্র তৈরি করতে হবে। সেই চরিত্রটা ডিরেক্টরকে সাজাতে হবে, প্রোপার কাস্টিং করতে হবে, তারপর অভিনয়; এই তিনটার সমন্বয় হচ্ছে না। ফলে আপনাকে হয়তো চিরকুমারই থাকতে হবে। (হাসি)
শ্রাবন্তী আনোয়ার, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : রোকেয়া প্রাচী ব্যক্তিগত জীবনে কতটুকু রোকেয়া প্রাচী আর কতটুকু চরিত্র? এ পর্যন্ত আপনার অভিনীত কোন চরিত্রকে বেস্ট মনে হয়েছে?
প্রাচী : আমি ব্যক্তি রোকেয়া প্রাচী খুবই অপরিচিত আপনাদের কাছে। ব্যক্তি রোকেয়া প্রাচীকে চেনে খুবই কম মানুষ। হাতেগোনা একজন¾দুজন। এটাই প্রকৃত সত্য। বলা যায়, এটাই আমার জীবনের ট্রাজেডি। আমি প্রকৃত কী মানুষ, সেটা খুব কম মানুষ জানে এবং সেটা অনেক অন্তরালের। হয়তো এটাই ট্রাজেডি একজন শিল্পীর। আর আমি যখন যেখানে যেটা, সেটাই। এখন আপনাদের সঙ্গে যখন কথা বলছি, সেখানে একজন অভিনয়শিল্পীকে ধারণ করা, একজন সংস্কৃতিকর্মী আমি। আর যখন অভিনয় করছি, সেই চরিত্রের আমি। কাজেই এ সবকিছুর মধ্যে ব্যক্তি রোকেয়া প্রাচী কিন্তু কোনোদিনও আপনাদের সামনে আসেনি। আমি নিশ্চিত করে বলছি আপনাদের, আমি ব্যক্তি মানুষ ভীষণ আলাদা।
আর এখন পর্যন্ত আমার বেস্ট চরিত্র কোনটা সেটা বলা খুবই কঠিন। ধরুন, আমার দুই মেয়ে, কোন মেয়েটাকে আমি বেশি ভালোবাসি, সেটা তো বলা যাবে না। তবে প্রথম প্রেম দুখাই, সেটার একটা আলাদা ইমোশন আছে। মাটির ময়না আমার জীবনে খুব ভিন্নতর একটা জায়গা, কারণ এর মধ্য দিয়েই আমি পরিণত, পরিশীলিত ও বিনির্মিত হয়েছি। তারেক মাসুদের মতো চলচ্চিত্রকারের সিনেমাতে যদি আমি অভিনয় না করতাম, আমি শিল্পী হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারতাম না। প্রত্যেক শিল্পীর কিন্তু এক্সপেরিমেন্টালের ভিতর দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, চ্যালেঞ্জ নেওয়ার, ভাঙচুর হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তারেক মাসুদের সঙ্গে কাজ করার কারণেই আমার সেটা হয়েছে। আমার মধ্যে তারেক মাসুদের প্রভাব রয়েছে অনেকখানি। আমি মাটির ময়নাকে যেমন এখনো ধারণ করি, তেমনই কারণে-অকারণে শিল্পে-দর্শনে তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রের ফিলোসফি আমার মাথায় কাজ করে। সে কারণে আমি সবসময় বলি, দুখাই থেকে মাটির ময়না¾এই সময়টা আমার জীবনের উল্লেখযোগ্য সময়। আর মাটির ময়না থেকে তারেক মাসুদের মৃত্যু পর্যন্ত সময়টা আমার জীবনের প্রকৃতার্থে বিনির্মাণের সময়, নিজেকে ভেঙে ভেঙে তৈরি করার সময়; আবিষ্কৃত হয়ে নিজেকে চেনার সময়। প্রত্যেক শিল্পীর কিন্তু নিজেকে চেনার প্রয়োজন রয়েছে। সেটা কিন্তু আমার পরিচালক বা চলচ্চিত্র স্রষ্টার হাত ধরেই হয়েছে। সে কারণে মাটির ময়নার প্রতি আমার ভালোবাসা অন্যরকমের। আয়েশা আমাকে অন্য একটি মনস্তাত্বিক পরিচয়ের সঙ্গে পরিচিত করেছে। আয়েশা কিন্তু আমাদের সবার ভিতরে আছে। আমরা কেউ আয়েশাকে দেখতে পাই, কেউ পাই না। আয়েশা আমার মধ্যে এখনো আছে। আমি দেখতে পাই। এই আয়েশাকে আমি দেখতে চাই সারাজীবন।
মোহাম্মদ আব্দুর রহমান আকন্দ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : ঠিক কোন জিনিসটি আপনাকে অভিনয়ের দিকে আহ্বান করেছে?
প্রাচী : আসলে আমার জীবনের লক্ষ্য ছিলো আর্মি অফিসার হওয়া। ইউনিফর্ম থাকবে, আর্মস থাকবে। তো সেটি যখন হয়নি, তখন অন্যরকম এক আর্মি হয়ে গেলাম। স্কুলে খেলাধুলা, কালচারাল প্রোগ্রাম¾এসবের মধ্যে আমার একটা ডিক্টেটরশিপ তৈরি হয়ে গেলো, আগ্রহ তৈরি হয়ে গেলো। ছোটোগল্প লেখা, কবিতা পড়া, স্কুলের নাটকে অভিনয় করা¾এসব করতে করতে আমি একসময় অভিনয়শিল্পী হয়ে গেলাম। আর সেই যে হয়ে গেলাম, এখন মনে হয় আমার আর কিছু করার ছিলো না। এটাই হওয়ার কথা ছিলো। তবে এখনো আমার আর্মি অফিসার হওয়ার সুযোগ থাকলে আমি আর্মি অফিসারই হবো। (হাসি)
কাজী ইব্রাহিম পিয়াস, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আমি শুধু মাটির ময়নার আনুর মা কিংবা দুখাই-এর সেই গ্রাম্য বধু রোকেয়া প্রাচীকে দেখতে এসেছি। দেখলাম। এখন আমার প্রশ্ন হলো, অভিনয়শিল্পী হিসেবে আপনি একজন পরিচালকের মধ্যে কী কী গুণাবলি দেখতে পছন্দ করেন? অথবা একজন ডিরেক্টরের কীভাবে অভিনয়শিল্পীকে ডিল করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
প্রাচী : অভিনয়শিল্পীকে একজন ডিরেক্টর তার নিজের সন্তানের মতো ডিল করবেন। সন্তানের ভালোটাও ডিল করতে হয়, মন্দটাও ঢেকে দিতে হয়। সন্তানকে বকা দিয়ে, আদর করে, ভালোবেসে বুঝিয়ে কাজটা আদায় করে নিতে হবে। কিন্তু হোমওয়ার্কটা করিয়ে নিতে হবে। বাচ্চাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না, কাজটা সে ভালো করেনি। এই আদর যত্নটা শিল্পীর প্রতি থাকতে হবে। আর এই সবকিছু মিলেই হচ্ছে রেসপেক্ট, যেটা থাকা জরুরি। শিল্পীর প্রতি যত্ন থাকতে হবে। এগুলো থাকলে শিল্পী অবনত চিত্তে তার চরিত্রে অবগাহন করবে। শিল্পের প্রতি, শিল্পীর প্রতি পরিচালকের ভালোবাসা শ্রদ্ধা থাকা খুব জরুরি। তাহলে একজন পরিচালক তার সবকিছু শিল্পীর ভিতর দিয়ে দিতে পারবেন। যে ডিরেক্টর এটাতে ব্যর্থ হয়েছে, আমি বলবো তিনি ভুল করেছেন। তিনি যেটা চান সেটা আদায় করতে পারবেন না।
হাবিব, পরিসংখ্যান বিভাগ : আপনার ব্যক্তিজীবনে অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচীর প্রভাব কতোটুকু? যদি প্রভাব থাকে, সেটা ব্যক্তিজীবনে কীভাবে সমন্বয় করেন?
প্রাচী : কোনো প্রভাব থাকে না। কারণ আমি যখন ঘরের বাইরে যাই, তখন আর ব্যক্তি থাকে না; রোকেয়া প্রাচীই থাকে, অভিনয়শিল্পীই থাকে। সবাই অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচীকেই চেনে, তার সঙ্গে ছবি তোলে, তার সঙ্গে কথা বলে। যেহেতু এটা আমার প্রফেশন, এটা আমার পরিচয়, এটা আমার সামাজিক দায়িত্বশীলতার জায়গা; কাজেই সেটাই মেইনটেইন করা উচিত। যখন আমি সাধারণ মানুষ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের কাছে থাকি, তখনই আমি ব্যক্তি রোকেয়া প্রাচী হওয়ার অধিকার রাখি। যখন আমি শিল্পী তখন আমাকে জনসমক্ষে শিল্পীর দায়িত্বটুকুই পালন করতে হবে। সেটা মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত। আমি আমার কাছের মানুষদের কাছে, শুধু আমি হতে পারি। কাছের মানুষদের কাছে অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। এই পার্থক্যটুকু না বুঝলে খুব সমস্যা। আমার ছোটো মেয়েটা আমার সঙ্গে কোনো ছবি তুলতে চায় না। কারণ ওর কাছে রোকেয়া প্রাচী কোনো বিষয় না, ওর কাছে আমি মা। কেনো সেল্ফি তুলতে হবে? কাজেই এই যে ব্যক্তিজীবন, এই বিউটিটাকে এক্সসেপ্ট করতে হবে।
তাসনিয়া মিন্নি, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : নারী অভিনয়শিল্পীদের সততা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কি কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়? হলে, কীভাবে সেটাকে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
প্রাচী : না, আমি মনে করি না। অভিনয়শিল্পী নারী হলেই সে কিছু প্রতিবন্ধকতার স্বীকার হবে, আমি সেটা মনে করি না। সবারই সমান প্রতিবন্ধকতা। একজন পুরুষ শিল্পীর যেমন অনেক যোগ্যতা নিয়ে কম্পিটিশনে যেতে হয়, রেষারেষির স্বীকার হতে হয়; তাকে যেমন যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়; তেমনই নারীকেও সেটা করতে হবে। তবে হ্যাঁ, আপনি যদি অন্য কোনোকিছু মিন করে থাকেন, যেমন একজন নারীকে নারীসুলভ কোনো আচরণ দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে কি না? দেখেন, এই বিষয়গুলো চাকরি করতে গেলে, বিজনেস করতে গেলেও ফেইস করতে হতে পারে। আপনি ঘরে থাকলেও কি শ্লীলতাহানির স্বীকার হতে হয় না? হয়। সেটা সব মাধ্যমেই থাকে। একজন নারীর ঘরে-বাইরে সব জায়গায় আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ, আশঙ্কা থাকে। নারীকে সেটা এড়িয়ে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পাশ কাটিয়ে আসতে হবে। আপনাকে কিন্তু কেউ জোর করছে না। আপনার সামনে দুটো পথ খোলা আছে। একটা শর্টকাট, আরেকটা পরিশ্রমের পথ। আপনি কি শর্টকাটে কারো হাত ধরবেন, নাকি যোগ্যতা দিয়ে মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচবেন? আপনি যে পথে যাবেন, সে পথটাই আপনার হবে। নিজের ইচ্ছাটাই সেখানে বড়ো। অসৎ হয়েও কাজ করা যায়, সৎ হয়েও কাজ করা যায়। সৎ হয়ে কাজ করলে ফলাফলটা দীর্ঘ সময়ের আর অসৎ হলে সেটা তাৎক্ষণিক।
সৈকত আরেফিন, শিক্ষক, বাংলা বিভাগ : তারেক মাসুদের মাটির ময়নাতে আমরা আপনাকে দেখেছি। পরিচালক হিসেবে কেমন ছিলেন তারেক মাসুদ? তার পেশাদারিত্ব নিয়েও আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
প্রাচী : আমার কাছে এখন পর্যন্ত তারেক মাসুদ একমাত্র পরিচালক যিনি শতভাগ সততার সঙ্গে কাজ করতেন। উনি কাজটাকে ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন শিল্পীদের; উনি এক্সপেরিমেন্ট করতে জানতেন। তারেক ততোটুকুই চাইতেন, যতোটুকু তিনি করতে পারেন। তবে সেটুকু করার জন্য তিনি কোনো কম্প্রোমাইজ করেননি। উনি উনার কাজ শতভাগ মন দিয়েই করতেন। তারেক চলচ্চিত্রকার না হয়ে এনজিও’র কাজ করতে পারতেন, টি ভি সি বানাতে পারতেন, কনসালটেন্সি করতে পারতেন, টেলিভিশনে সিরিয়াল বানাতে পারতেন¾অনেককিছুই করতে পারতেন। কিন্তু উনি কিছুই করেননি। শুধুই সিনেমা নিয়ে ছিলেন; স্রোতে গা ভাসিয়ে দেননি। নিজে ভালো থেকেছেন, আমাদের ভালো রেখেছেন। তারেক ভালো, সুন্দর জিনিসের সঙ্গে থেকেছেন, আমরা উনার সহচার্যে ছিলাম, আমাদেরকেও তেমনই বানিয়েছেন। আমাদের জন্য দুয়ারটা খুলে দিয়েছেন; সেই পথটাই, যে পথটায় উনি গেছেন। তারেক মাসুদ না হলে আজকে বাংলাদেশের সিনেমা এতোদূর হাঁটতো না। আরেকজন তারেক মাসুদ আসবে না আমাদের জীবনে। তারেক মাসুদের জন্য সময়টা বেশ সংক্ষিপ্ত; আমি এটুকু বলেই শেষ করলাম।
রহমান রাজু, শিক্ষক, নাট্যকলা বিভাগ : অভিনয়কে যারা নেশা হিসেবে নেন, তারা ভালো অভিনয়শিল্পী নাকি যারা পেশা হিসেবে নেন, তারা ভালো অভিনয়শিল্পী?
প্রাচী : নেশা শব্দটির সঙ্গে আমি একমত নই। এটা সবসময় আমার কাছে নেগেটিভ শব্দ মনে হয়। আমি নিজেকে একশো ভাগ পেশাদার অভিনয়শিল্পী মনে করি। আমি পেশাদারিত্বের সংজ্ঞা আপনাদের দিয়েছি। নেশার মাধ্যমে যেটা বোঝায় সেটা হলো তাৎক্ষণিক ইমোশনাল। আজকে নেশা আছে, কাল নাও থাকতে পারে। কিন্তু আমি যদি পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করি, তাহলে নেশা শব্দটি দিয়ে যে কাজটা এক্সট্রিমলি বোঝানো হচ্ছে, আমি সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো। কিন্তু যদি আমি শুধু নেশা হিসেবে এটা বেছে নিই, তাহলে আমার সেই কাজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, ডিসিপ্লিন থাকবে না, আমি দীর্ঘদিন সেই কাজের প্রতি লেগে থাকতে পারবো না। আর যদি আমি পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করি, তাহলে যা কিছু নেশার কাজ, ভালোবাসার কাজ সেটাকে আমি ধারণ করে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারবো। তাই আমি মনে করি, একজন অভিনয়শিল্পী তার পেশাদারিত্বের মাধ্যমে অনেক দূর যেতে পারবে। কিন্তু নেশা হিসেবে নিলে পারবে না। এটা আমার অভিমত।
মু. কবিরুল ইসলাম, নাট্যকলা বিভাগ : সমসাময়িককালে অধিকাংশ নির্মাতা অভিনয়শিল্পীদের বলে দেন, আপনার এই পরিবেশ, এই চরিত্র, এই ঘটনা; আপনি এবার অভিনয় করে দেখান। এ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
প্রাচী : হ্যাঁ, এ রকম হচ্ছে। স্ক্রিপ্ট নাই, কিছু নাই; বলছে, আপা করে দেখান। এ রকম আছে বলেই আমরা তাৎক্ষণিক কিছু চমকদার বিষয় দেখি। একটা দুইটা এ রকম প্রোডাকশন ভালো লাগবে। কিন্তু এটাই যখন আমাদের সিস্টেম হয়ে যাবে, তখন লঙ রানে গিয়ে আমাদের কাজ ভালো হবে না। একটা চরিত্র বা দৃশ্য ইম্প্রোভাইজ করে করা যেতে পারে। কিন্তু একটা নাটকে সব দৃশ্যই যদি এ রকম হয়, সবগুলো চরিত্রই যদি বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে, তাহলে চরিত্রের যেই কাঠামো সেটার তো হোমওয়ার্কই থাকলো না। আপনি একটা সিনেমা করছেন, সেই সিনেমার তো একটা লাইন আপ থাকতে হবে; তার ঘটনা প্রবাহ থাকতে হবে। ধারাবাহিকতা থাকতে হবে গল্প বলবার, উপস্থাপনের। কিন্তু আপনি সেটা না করে সবই বানিয়ে বানিয়ে বলছেন, সবাই বানিয়ে বানিয়ে কথা বলছে। তাহলে তো ঘটনার ধারাবাহিকতা থাকলো না। ফলে ঘটনার ভিতর দিয়ে যখন যাবে, তখন মূল বক্তব্য থাকবে না। চরিত্রের যেই কাঠামো, সেটা থাকবে না। তখন দর্শক গল্পের মধ্যে ঢুকতে পারবে না। চরিত্রটি কখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে না।
আমাদের নাটক, সিনেমার জন্য এটা ভীষণ ক্ষতিকর। আমি মনে করি না এভাবে কাজ করা উচিত। এটা ভীষণ অপেশাদারসুলভ আচরণ। শিল্পীদের উচিত এ ধরনের কাজ বয়কট করা। অনেক পরিচালক কোনো স্ক্রিপ্ট ছাড়া, কোনো লাইন আপ ছাড়া, কোনো গল্প বিন্যাস ছাড়া সেটে আসবেন, তারপর বলবেন, বলেন বলেন। আর্টিস্টের উচিত এ রকম পরিকল্পনাহীন সেট থেকে চলে আসা। সত্যি উচিত। যদিও সেটা সম্ভব হচ্ছে না অনেকের দ্বারা। আমি অনেকের সেট থেকে চলে এসেছি, অনেকের সঙ্গে আমি কাজ করি না। আমি মনে করি, তাতে আমি ক্ষতিগ্রস্থ হইনি বরং লাভবান হয়েছি।
আসাদুজ্জামান রাসেল, সাংবাদিক : আমাদের চলচ্চিত্রে অনেক সমস্যা, হতাশা। এগুলো দূর হবে বলে আপনি মনে করেন? বাংলা চলচ্চিত্রকে ভবিষ্যতে কোথায় দেখেন?
প্রাচী : হ্যাঁ, হতাশা আছে, সমস্যাও আছে। এটা সব প্রফেশনেই আছে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও আছে। আমাদের অন্যান্য সেক্টরে কি কম বেশি এসব নেই? আছে। তাই বলে কি সবাই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে? শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে, তাই বলে কি এখন শেয়ারবাজার বন্ধ? শেয়ারবাজার কিন্তু একইভাবে চাঙ্গা, কেনো? কারণ প্রত্যেকটা পেশাতেই এ রকম থাকে। আমাদের চলচ্চিত্রে দুঃসময় আছে এবং সেটা কাটিয়েও উঠতে হবে। আজকের এ অবস্থার জন্য আমরা সম্মিলিতভাবেই দায়ী। ধরুন, এতো হতাশার কথা বলছেন, তাহলে আপনারা এতো কষ্ট করে এই দুপুর বেলা আমের দেশের মানুষ হয়ে না ঘুমিয়ে কথা শুনছেন কেনো? আমাকে ঢাকা থেকে এখানে নিয়ে এসেছেন কেনো? যদি হতাশার পরিবেশ থাকতো, তাহলে আপনারা এটা করতেন না। তার মানে সমস্যা আছে, তবে কোথাও না কোথাও আলোর ঝলকানি আছে, সম্ভাবনা আছে।
আমাদের কাজ করতে হবে, তাহলে সম্ভাবনাগুলো বেড়ে যাবে। আমাদের ক্রিকেট দলটি একসময় খালি হেরে যেতো। আজকে দেখেন তো। আজকে সব টাইগার। হেরে গেলে বলি বিড়াল। যখনই জিতে যায় ফেইসবুকে ছবিসহ টাইগার, টাইগার বলি। ছবি শর্ট পড়ে যায় টাইগারের। আর হেরে গেলে আমরা বিড়াল দিয়ে ভরে ফেলি ফেইসবুক। আমাদের চলচ্চিত্রে এখন বিড়াল কন্ডিশন যাচ্ছে। তবে টাইগার কামিং সুন। ক্রিকেটের মতো আমরা টাইগার হয়ে যাবো। আর টাইগার হওয়ার জন্য আসুন আমরা আগে বিড়ালের ছবি সরিয়ে দিই। আমরা প্রথমে টাইগার দেখাই। টাইগার দেখে যখন আমাদের নতুন কর্মীরা উদ্বুদ্ধ হবে, তখন তারা টাইগারের মতো আচরণ করবে। আর আমরা সবসময় হতাশ হতাশ করলে ওরা ভাববে, আচ্ছা এখানে তো কিছুই হয় না, আমার এতো কষ্ট করার দরকার কী? সব সময় পজেটিভ, আশাবাদী কথা বলতে হবে।
আমি সবসময় পজেটিভ, আশাবাদী মানুষ। আমার জীবনে অনেক দুঃসময় এসেছে। আমি তখনো অনেক জেগে স্বপ্ন দেখেছি। আবার স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জেগে উঠেছি। আর সেই কারণেই আজকে আমি এখানে বসে থাকতে পারছি। স্বপ্ন না দেখলে কিছুই হয় না। হতাশা যা আছে থাকুক, তাতে আমার কী? আমার কাজ আমি করবো। হতাশার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? আপনার তো চরিত্রের সঙ্গে প্রেম করতে হয়েছে, হতাশার সঙ্গে নয়। আমি তিনটি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। তিনটি সিনেমা কান চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছে। আমার তিনটি সিনেমা কান-এ যাওয়া মানে তিন জন পরিচালকের সিনেমা কান-এ গেছে। প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে আমাদের সিনেমা বিভিন্ন ফেস্টিভালে যাচ্ছে। প্রতি বছর একশো কোটি টাকা মূলধন সিনেমায় লগ্নি হচ্ছে। কোথায় হতাশা? হয়তো খুব ভালো কিছু হচ্ছে না। কিন্তু কাজ তো হচ্ছে। একশো কোটি টাকা মিনিমাম বলছি, হয়তো আরো বেশি হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রি স্ট্রং হচ্ছে, কতোগুলো টিভি চ্যানেল হয়েছে দেখেন, মঞ্চে কাজ হচ্ছে। আপনি শক্তিশালীভাবে কাজ করেন, আপনি হান্ড্রেড পার্সেন্ট দেন, তাহলে উনিও হান্ড্রেড পার্সেন্ট দিবে, সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট দিবে। আপনি ৪০, সে ২০ এভাবে দিলে হবে না। ডু ইয়োর ওন জব। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় লাইট বন্ধ করেন, গ্যাসের চুলা বন্ধ করেন, ফ্যান বন্ধ করেন। দায়িত্ব পালন করলে দেশও সুন্দর হবে, সবকিছুই ভালো হয়ে যাবে।
ইসমাত জাহান জিনিয়া, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : অভিনয় করতে গিয়ে এমন কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছে, যেটা আপনাকে আজো তাড়া করে?
প্রাচী : আমি থিয়েটার থেকে এসেছি। তো আমি একবার থিয়েটারের শো করছি। আমাদেরকে উইঙসের পিছনে গিয়ে কস্টিউম চেঞ্জ করে আসতে হতো। সময়টা এতো কম ছিলো যে, আমি সালোয়ার কামিজ থেকে শাড়ি পরে আসার সময়টা খুবই কম পেয়েছি। উইঙস এর পিছনে শাড়ি পরা তো সম্ভব না। গ্রিনরুমে যাওয়া, গ্রিনরুম থেকে আবার শাড়ি পরিবর্তন করে স্টেইজে আসা সম্ভব ছিলো না। ফলে প্রথম শো, আমি অত্যন্ত বাজে পারফর্মেন্স করলাম। আমার সমস্ত মনোযোগ ছিলো, কখন আমি গ্রিনরুমে যাবো, কখন সালোয়ার কামিজ পরবো আর কখন শাড়ি পরবো। আমি মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হলাম। মঞ্চ থেকে গিয়ে আমি শাড়ি পরে আসলাম, মঞ্চে উঠতে আমার ২০ থেকে ২৫ সেকেন্ড লেট হয়; আমি বুঝতে পারছিলাম, শাড়ি পরাটা ভালো হয়নি। আমার টোটাল মনোযোগটা শাড়িতে। ফলে মঞ্চে আমি একবার শাড়িটা এই দিকে গুঁজছি, আরেকবার ওই দিকে। অভিনয়টা আমার মাথায় নেই। আমার কো-আর্টিস্ট বিষয়টা টের পেয়েছেন, কিন্তু কিছু করার নেই। ওটাই হচ্ছে আমার মেজর জায়গা, যেখানে আমি হাসতে হাসতে ঢুকবো। অনেক কথা বলবো। আমার একাই ওই জায়গাটুকু। পুরো ১০ মিনিট আমার একা পারফর্মেন্স। এতো বাজে ছিলো সেটা, আমি সারাজীবনে অতো খারাপ কাজ আর করিনি।
সেদিন যেসব দর্শক আমাকে দেখেছে, তারা হয়তো সারাজীবন মনে করবে, রোকেয়া প্রাচী মঞ্চে অতো ভালো না। কিংবা সেটা কেউ ভাবেইনি বা এটা নিয়ে কেউ কখনো আলোচনাই করেনি। কিন্তু আমি আমার নিজের কাছে চোর হয়ে আছি এখনও। এখনও আমার সেটার জন্য লজ্জা লাগে। মানে এমনভাবে মঞ্চে আমি ফেইল করেছি, সেই ব্যর্থতা আমি সারাজীবনেও আর ভুলতে পারবো না। আজ পর্যন্ত আমি সেই শো-এর কথা অনেককে জিজ্ঞেস করেছি, শো কেমন ছিলো? তারা বলেছে, শো ভালো ছিলো। কিন্তু আলাদা করে বলেনি, আপনি অসাধারণ ভালো অভিনয় করেছেন। আমি তো শুনতে চাই, আমি অসাধারণ অভিনয় করেছি। আমাকে খারাপ বলেনি কেউ। হ্যাঁ, সবাই চরিত্র অনুযায়ী অভিনয় করেছে। আমিও হয়তো চরিত্রানুযায়ী অভিনয় করেছি। কিন্তু অসাধারণ অভিনয় করিনি। হয়তো আমি ফাঁকিবাজি করেছি, আমি সবটুকু দিতে পারিনি, আমি আমার মধ্যে ছিলাম না। আমাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করে, আমি লজ্জিত হই এবং আমার মনে হয়, ওই লজ্জা থেকে বাঁচতে আমি আরেকবার মঞ্চে অভিনয় করবো। এটা যে কী বেদনা, সেটা বলে বোঝানো যাবে না।
আর আমার সুখের অভিনয়ও আছে। মাটির ময়নায় আমার মেয়ে আমার সঙ্গে অভিনয় করেছিলো। সিনেমাতে আমার মেয়ে মারা যায়। ওকে তারেক মাসুদ যখন কাস্ট করে, তখন আমি ওই পয়েন্টটা ভাবিনি। ও অভিনয় করেছে ঠিকঠাক। কিন্তু মেয়ে মারা যাবার পর, আমি যখন আয়নার সামনে কাজী সাহেবের সঙ্গে কথা বলছি, আমি তো চরিত্রের ভিতরে। তখন আমি অনুভব করলাম সন্তান মারা গেলে কেমন লাগে। এখনও আমার মনে হয়, এটা আসলে একটা মায়ের জন্য ইম্পর্টেন্ট ফিজিক্স যে, তার সন্তান মারা যাচ্ছে চোখের সামনে। তখনই আমার মনে হয়েছে, আর কোনোদিনই আমি আমার বাচ্চাকে আমার সঙ্গে অভিনয়ে নিবো না। অ্যাট লিস্ট আমার সন্তান হিসেবে মারা যাচ্ছে এবং ওই দিন সারাদিনই আমি জায়নামাজে বসেছিলাম। আমার দুই পা ফুলে গিয়েছিলো এবং অনবরত চোখ দিয়ে পানি পড়ছিলো। এ রকম অবস্থা দেখে, সেদিন কেউ লাঞ্চ ব্রেক নেয়নি। ইন্ডিয়ার একটা টিমও আমাদের সঙ্গে কাজ করছিলো। ওরাও লাঞ্চ ব্রেক নেয়নি। আমার চরিত্রের এতো শট্ ডিভিশন ছিলো যে, সেটা একদিনে করা সম্ভব ছিলো না। কিন্তু আমি ইমোশনালি এতো ভিতরে ঢুকে পড়েছিলাম, ওরা কন্টিনিউ করবে কিনা সেটা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলো। তারেক মাসুদ আমাকে বললেন, আমরা কি কন্টিনিউ করবো? আমি বললাম, হ্যাঁ।
পুরো দৃশ্যটাতে অভিনয় করার পর মনে হলো, আমার শুধু হাত দুটোতে প্রাণ আছে। আর সবকিছু অবশ হয়ে গেছে। আমি উঠতে পারছিলাম না, আমাকে ধরে উঠানো হয়েছে। আমি সেদিন ফিল করেছি, সন্তান যখন মারা যায়, এর চেয়ে বেশি কিছু হতে পারে না। আমার জন্য সাংঘাতিক একটা অভিজ্ঞতা ছিলো মাটির ময়না। আরেকটি নাটকে আমি কাজ করেছিলাম, সেটার নাম চোর। আসাদ ভাই হলো আমার হাজবেন্ড। সেটা ছিলো পুরুষ ডমিনেন্ট একটা নাটক বা টেলিফিল্ম। কামলা দিয়ে যে টাকা পাওয়ার কথা, তাকে সেটা দেওয়া হয় না। যার জন্য সে চুরি করতে বাধ্য হয় এবং ধরা পড়ে। সে যখন ধরা পড়ে, তাকে মারতে মারতে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তার পিছন পিছন তার বউ গ্রামের সবার হাতে-পায়ে ধরে তাকে ছাড়ানোর জন্য। এটা খুব লাউড একটা জায়গা ছিলো। প্রথমে আমি এটা করতে রাজি হইনি। কারণ আমার মনে হয়েছিলো, চরিত্রটা আমি করতে পারবো না। তারপর নাটকটা যখন করি, পুরো দৃশ্যটা ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মতো ছিলো। এক টেকে দৃশ্য ধারণ শেষ হয়ে গেলো, আমি তখনো কাঁদছি, গ্রামের লোকজনও কাঁদছে, পরিচালক, ক্যামেরাম্যানও কাঁদছে। কোনো কাট হয়নি। সবাই কাঁদছে। একপর্যায়ে আসাদ ভাই, পরিচালক এসে আমাকে পানি-টানি দিয়ে নরমাল করলেন। এ জিনিসগুলো আমাকে ভীষণভাবে তাড়িত করে, চরিত্রের কাছে চলে গেলে সেগুলো খুব কষ্ট দেয়। অনেক কষ্ট হয়েছে আমার মাটির ময়না করতে গিয়ে। এগুলো আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক আছে, অনেক ধন্যবাদ সবাইকে।
আরিফ ভাই (আরিফ হায়দার), অনেকদিন পর আপনাকে দেখে ভালো লাগলো। অনেকদিন পর দেখা। কলকাতা থেকে আমাদের দুইজন অতিথি এসেছেন, আমি ভীষণ অনুপ্রাণিত হলাম। খুব ভালো লাগছে। আমাদের স্যার আছেন সামনে এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাংবাদিক ভাইয়েরা, ম্যাজিক লণ্ঠন-এর বন্ধুরা, এতো সময় ধরে এখানে আমার কথা শোনার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আমি অনেক উপকৃত হলাম। কারণ কথা শোনা অনেক কঠিন কাজ। এটা একটা পানিশমেন্ট। আমি আপনাদের কতোটা পানিশমেন্ট দিয়েছি, সেটা জানি না। বেশি পানিশমেন্ট দিয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমা করবেন। আবার দেখা হবে। আপাতত বিদায় নিই। (দর্শকের হাততালি)
সঞ্চালক ১ : আমাদের অতিথির অসাধারণ অভিজ্ঞতার বয়ান আপনারা শুনলেন; আমি দর্শকের কাছে তার জন্য আরো একবার হাততালির অনুরোধ করছি। (হাততালি) যারা প্রশ্ন জমা দিয়েছেন, আশা করছি সেসব প্রশ্নের বেশিরভাগেরই উত্তর দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু প্রশ্ন একই রকম হওয়ায় সেখান থেকে বাছাই করা হয়েছে। আশা করি, সবাই বুঝতে পেরেছেন। এখানে উপস্থিত আছেন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক আরিফ হায়দার। উনি যদি কিছু বলতে চান। স্যারকে অনুরোধ করছি কিছু বলার জন্য।
আরিফ হায়দার : আপনাদের সবাইকে অনেক শুভেচ্ছা। রোকেয়া প্রাচী আমার খুব কাছের একজন মানুষ। আমরা একসময় আন্দোলনের মুখোমুখি থিয়েটার করেছি। এই রোকেয়া প্রাচীকে অনেকদিন টি এস সি’র দিকে দৌড়াতে হয়েছে আন্দোলনের কারণে। সেই আন্দোলনের কারণে এই শিল্পীরা তৈরি হয়েছে? আপনারা নিশ্চয় সেই অতীত জানবেন। এই রোকেয়া প্রাচী একসময় নাটকের অসাধারণ একটি পত্রিকা ‘নখদর্পণ’-এর সম্পাদক ছিলেন। আমি পড়তাম সেটা। আমি প্রায় ২০ বছর আগের কথা বলছি। সেই সময়ে কলকাতা থেকে বড়ো সাইজের ১৬ পৃষ্ঠার এ ধরনের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হতো। সেটার সঙ্গেও আমাদের যোগাযোগ ছিলো।
যাইহোক, ধন্যবাদ ম্যাজিক লণ্ঠন-এর কর্মীদের। এখানে আসতে পেরে ভালো লাগছে। প্রাচীর সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ১৫ থেকে ১৭ বছর পরে আমার দেখা হলো। সেই জায়গা থেকে আজকে যখন আমি এখানে প্রবেশ করেছি তখনই আমাদের চোখে চোখে একধরনের কথা হয়ে গেছে। তো এই যে ভালোলাগাটা, আজকে যারা এখানে উপস্থিত আছেন প্রত্যেকে প্রত্যেকের চেহারা চিনে রাখি আমরা। একই অবয়বে কাজ করছি আমরা, আমি শিক্ষক হিসেবে আছি নাট্যকলায় আর প্রাচী কাজ করছেন চলচ্চিত্রে, মঞ্চে। কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে, সেটা হলো আমরা মানুষের কাছে আছি কি না? মানুষের সঙ্গে আছি কি না? আমরা জানি, প্রাচী অত্যন্ত ব্যস্ত। তারপরও তিনি এখানে এসেছেন। আমার মনে হয়, তিনি এই জিনিসটা, চলচ্চিত্রটা, থিয়েটার ভালোবাসেন বলেই এখানে এসেছেন। এখানে আমি আরো যাদেরকে দেখছি, তাদের মধ্যে চারুকলার শ্রদ্ধেয় মাসুদ স্যার, আমার গুরুজনের মতো। তাদেরকে কাছে পাওয়া, তাদের সঙ্গে ঘোরা, আমি মনে করি তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। এই যে রোকেয়া প্রাচী এসেছেন, উনি চলেও যাবেন। তবে আপনি কিন্তু এখনই চলে যাবেন না। আপনি বসবেন, একটু আড্ডা দিবেন।
একজন প্রশ্ন করলেন, আপনি চা খান কিনা, আড্ডা দেন কিনা। আমার বিশ্বাস সুযোগ পেলেই প্রাচী সেটা করেন। সুযোগ পেলে ওই টি এস সি’র ওখানে বসে চা খান। ওই জায়গাগুলোর এখনো আলাদা একটা ইমেজ আছে। আমি মনে করি, ম্যাজিক লণ্ঠন-এ যে অসাধারণ জায়গা তৈরি হয়েছে, সেটা ব্যবহার করে তারা যদি মাঝেমধ্যে এ রকম আয়োজন করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভীষণভাবে উপকৃত হবে। এখানে কলকাতা থেকে দুইজন অতিথি এসেছেন। আমার ভালো লাগছে। কারণ আমি রবীন্দ্র ভারতীর ছাত্র ছিলাম। ওখানেও আমার একটা বন্ধুমহল আছে। খুব ভালো লাগছে যে, বাইরের দুইজন মানুষকে পেয়েছি। বাইরের বলতে কী, তারাও বাংলা ভাষায় কথা বলেন। আপনারা ভালো থাকবেন, সুন্দর থাকবেন। রোকেয়া প্রাচীকেও অনেক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ। (দশর্কের হাততালি)
সঞ্চালক ১ : ধন্যবাদ আরিফ হায়দার স্যারকে। আমাদের এখানে উপস্থিত আছেন চারুকলা অনুষদের শিক্ষক মাসুদ চৌধুরী। তাকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করছি।
মাসুদ চৌধুরী : আরিফ হায়দার ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্র ধরে আমার প্রসঙ্গ এনেছেন। আজকে আমাদের যিনি মধ্যমণি, অভিনয়শিল্পী এবং অনেক গুণী একজন মানুষ রোকেয়া প্রাচী। একটা কথা আমার অকপটে স্বীকার করতে অসুবিধা নেই, সেটা হলো আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন যে রোকেয়া প্রাচী, তার একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত আমি। তার অভিনয় আমি দেখি, উপভোগ করি এবং শিক্ষিতও হই বটে। এটা বিনয় নয়, সরল স্বীকারোক্তি। আর একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন বোধ করছি; কারণ এই কথাগুলো একটু বলা দরকার। তবে এটাকে মোটেও আত্মপূজা মনে করবেন না কেউ। আমি আসলে রোকেয়া প্রাচীর সঙ্গে একটা যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করছি। ছাত্রাবস্থায় আমি একটা থিয়েটার গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিলাম এবং সিরিয়াসলি সেখানে কাজও করেছি। এখন এই শিল্প করে কী প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সেই হিসাব-নিকাশে আমি যাবো না। কিন্তু আমার যেটা মনে হয়েছে, সেই সময়ের যে চর্চা¾আজকে আমি যে পেশায় আছি, সেখানে যদি আমার কোনো ভ্রুণ অভিজ্ঞতা থেকে থাকে¾সেটা সম্পূর্ণ সেই সময়ের, সেই চর্চার অবদান।
কারণ ক্লাস রুমে আমরা যাই বলি না কেনো, প্রথম বেঞ্চ থেকে লাস্ট বেঞ্চ পর্যন্ত সেই কথাগুলো পৌঁছাতে হয়; সেটাতে পাণ্ডিত্য থাক অথবা নাই থাক, সেটা পরিষ্কারভাবে বোঝাতে হবে, এটা আমাকে শিখিয়েছে থিয়েটার বা নাটক। সেই জায়গা থেকে রোকেয়া প্রাচীর সঙ্গে আমি নিজেকে সমগোত্রীয় বলে মনে করি। উনি আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন এবং বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তার যে অভিজ্ঞতা তা বর্ণনা করলেন, আমাদের কিছু প্রশ্নেরও উত্তর দিলেন। সবমিলে একটা চমৎকার সময় আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাটালাম। সেজন্য উনাকে আত্মিক কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আর একটা কথা না বললেই নয়, কাজী মামুন হায়দার আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন এবং প্রিয়জনদের অন্যতম। সে দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে যে কাজটি করে যাচ্ছে, সেটা অবিস্মরণীয় বলে আমি মনে করি। তার পত্রিকা এবং এই কথামালা সিরিজ¾কথামালা সিরিজের এই বক্তৃতায় যতো বার আমি উপস্থিত হয়েছি, একটা নতুন কিছু নিয়ে, কিছু আলো নিয়ে এই কক্ষ থেকে বের হয়ে গেছি। সবাই ভালো থাকবেন। আবারও বলছি, ভালো থাকবেন, অন্যদের ভালো রাখবেন।
সঞ্চালক ২ : ধন্যবাদ মাসুদ চৌধুরি স্যারকে। আমরা আগেই জেনেছি, আমাদের মাঝে অতিথি উপস্থিত আছেন কবি তৃপ্তি সান্ত্রা। তাকে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করার জন্য মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি।
তৃপ্তি সান্ত্রা : নমস্কার সবাইকে। আমার ভীষণ ভালো লাগছে এই রাজশাহীতে। আমার বাবা, কাকা, দাদারা এখানে থাকতেন। তারা ৪৭-এর আগে এখান থেকে চলে যান। আমি গেলো বছর অবসর গ্রহণ করেছি। এতদিন সময় পাইনি, খুবই ইচ্ছে ছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার। ঢাকা থেকে আমার একটা বই বেরিয়েছে, সেই উপলক্ষে আমি ১৯ তারিখে (মার্চ ২০১৭) এখানে এসেছি। এখানে এসে পলক, নুসরাত, নাজ এদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে; এদের মধ্যে পলকের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলো ফেইসবুকে। তারপর এখানে এসে দেখা হলো। কিন্তু রাজশাহীতে এসে ওরা আমাকে যেভাবে সাহায্য করলো, শহরটা ঘুরে দেখালো¾গোয়ালপাড়া, সাগরপাড়া¾সারাজীবন আমি বাবা-মার কাছে এই রাজশাহীর কথা শুনেছি। আমি মূলত ঢাকা, বরিশাল, কুষ্টিয়া হয়ে রাজশাহী এসেছি। আবার ছোটো সোনা মসজিদ দিয়ে বের হয়ে যাবো।
সারাজীবন মা-বাবার মুখে আমি জপ মন্ত্রের মতো রাজশাহীর কথা শুনেছি। সেই নিয়ে আমার একটা কবিতা আছে। কবিতাটি একটু পড়ছি। কবিতার নাম ‘জপ’।
শেষদিকে যখন হাতের তালু অব্যবহৃত হতে হতে
অকেজো তেলতেলে হয়ে গেল
তখনও কষ্টে আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জপ করত
মা। নরম নখগুলো বড় হয়ে গেছে
ষাট বছরের ধাঁধা উনুন হেঁশেল
কলোনির তাসের আড্ডা সদরঘাটের হেনে মাসিমার
বাড়ির হাস্নুহানা উঠোনে ‘যোগিনীবেশ লাগে না ভাল’র
সুর সব স্থির হয়ে গেছে তালুতে
বিশ্ব ঘুরছে বেড়ে যাওয়া নখের ডগায়। ছেলেবেলায়
কী যে কৌতুহল ছিল মন্ত্র নিয়ে
কী বল বল না, বল না কী বল
কত যে জ্বালিয়েছি। দূর, তা কি বলতে আছে
পারানির কড়ি¾তোর মন্ত্র হলে জানবি
আমাদের কোনও মন্ত্র নেই জপের, যাপনের
মন্ত্র মানে জাদু, মন্ত্র মানে যা হবে না তারই ইচ্ছে-খেলা
ভুল হয়ে যাচ্ছে দৃষ্টি, খাওয়া কমে
আসছে। মসৃণ তালুতে আঙুল ঘুরছে
টলতে টলতে। বিড়বিড় করছে মা
‘রাজশাহী রাজশাহী’
সঞ্চালক ১ : ধন্যবাদ কবি তৃপ্তি সান্ত্রা। এবারে একটি বিশেষ পুরস্কারের কথা বলতে চাই, আমাদের মাঝে উপস্থিত ক্ষুদে শ্রোতা পারিভা আফরিন। সে একটা ছবি এঁকেছে, সেটা আমাদের অতিথি রোকেয়া প্রাচীকে উপহার দিতে চায়। তার জন্য একটা করতালি।
প্রাচী : বাহ! খুব সুন্দর।
সঞ্চালক ২ : ধন্যবাদ পারিভাকে। আমরা আলোচলার প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি। আলোচনা শেষ, আমাদের প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ; অতিথি যদি আর কিছু সংযুক্তি করতে চান, একদম শেষ করার আগে।
প্রাচী : এক বছর ধরে আসবো আসবো করে শেষ পর্যন্ত আসা হলো। মনে হচ্ছে, আরো আগে এলে ভালো হতো; মনে হচ্ছে আবারও আসবো। আমি সত্যি মুগ্ধ! আমি তো খুব আশাবাদী মানুষ, খুবই স্বপ্ন দেখা মানুষ। এখানে আসার পর আমার স্বপ্ন আরো বেড়ে গেছে, আশাটা বেড়ে গেছে। কলকাতার প্রেমেন্দ্র (মজুমদার) দা আর বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে কথা বলতে বলতে রাজশাহীর কথা হচ্ছিলো; কলকাতার মানুষও এই আড্ডার কথা জানে, রাজশাহীর ছেলেমেয়েরা চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবে; আর কাউকে চিনুক বা না চিনুক রাজশাহীর আমের কথা যেমন জানে, রাজশাহীর মামুনের কথাও জানে। আমি গত মাসে কলকাতা গিয়েছিলাম; আমি, প্রেমেন্দ্র দা, বুদ্ধ দা আমরা একসঙ্গে গল্প করছি দুপুরে খাবার পর, গল্পের মধ্যে মামুন এসে হাজির। মামুনের বিষয়ে অনেক কথা হলো, রাজশাহীর চলচ্চিত্র আয়োজনের কথা হলো এবং আমি কলকাতায় বসে এই রাজশাহীর চলচ্চিত্র আন্দোলনের কর্মীদের জন্য ভীষণ গর্বিত হওয়ার সুযোগ পেলাম।
আমার মনে হয়েছে, এভাবে স্বপ্নগুলো আমাদের শক্তি জোগায়। মামুনরা কাজ করে বলে, আমার মনে হয় চলচ্চিত্রের নতুন কর্মী তৈরি হয়। সুদিন কেনো আসবে না? রাজশাহীতে বসে, ঢাকা শহরও নয় যে, এক প্রোগ্রামে ১০টা ক্যামেরা আসবে, মামুনের ১০টা ছবি ছাপা হবে; অধরা মাধুরী এখানে উপস্থাপনা করছে, তাকে নিউজে দেখাবে; তেমন সম্ভাবনাও রাজশাহীতে থেকে নেই। তার মানে অনেক প্রাণের টানে, সত্যিকার ভালোবাসাতেই আপনারা কাজ করছেন। এই ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আমরাও দেখাতে পারিনি। অনেক অনেক শ্রদ্ধা, অনেক অনেক ভালোবাসা আপনাদের জন্য। আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, নীরবে-নিভৃতে রাজশাহীতে অনেক প্রতিকূলতায় দাঁড়িয়ে কাজ করছেন। এই ঋণ মনে হয়, আমরা অনেক পরে শোধ করার সুযোগ পাবো কিংবা সবাই বুঝতে পারবো। সত্যি মামুন আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ, আপনার ভালোবাসার আয়োজনে। আমি মুগ্ধ, এখানে যারা উপস্থিত রয়েছে সবার এতো ধৈর্য, এতো ভালোবাসা¾আপনারা এতো সময় নিয়ে এখনো বসে আছেন। ঢাকায় আমাদের প্রতিষ্ঠিত লোকেরা এতো বসে থাকে না। কথা বলেন, প্রশ্ন করেন, চলে যান। সত্যি আপনারা সফল। অনেক ধন্যবাদ, অনেক কৃতজ্ঞতা; সবাইকে অনেক অনেক ভালোবাসা।
সঞ্চালক ১ : ধন্যবাদ রোকেয়া প্রাচীকে। অনুষ্ঠানের একদম শেষে আমি মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি কাজী মামুন হায়দার স্যারকে কিছু বলার জন্য।
কাজী মামুন হায়দার : অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বলার তেমন কিছু নেই, আমি ধন্যবাদ দিতে এসেছি। আপনারা দীর্ঘ সময়, প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে কথা শুনেছেন, সেজন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। প্রাচী আপা অত্যন্ত কষ্ট করে ঢাকা থেকে এসেছেন, শেষ পর্যন্ত এসেছেন, সেজন্য ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পক্ষ থেকে তাকে আবারও ধন্যবাদ জানাই। ম্যাজিক লণ্ঠন নিয়ে, আমাকে নিয়ে অনেক কথা হলো; কিন্তু এই কৃতিত্বের কোনোকিছুই আমার নয়, আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকি। আমার কর্মীরা গত ১৫ দিন ধরে নিরলস পরিশ্রম করেছে, এটা তাদের জন্য একটা আবেগের জায়গা। সেটা নিয়েই ম্যাজিক লণ্ঠন চলছে গত ছয় বছর ধরে। আপনারা সবাই আমাদের পাশে থাকবেন, সবাইকে আবারও ধন্যবাদ।
সঞ্চালক ১ : ধন্যবাদ স্যারকে। আমরা দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত কথামালা ৬ সফলভাবে শেষ করতে পারলাম। সবাইকে সেজন্য আমি আবারও ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমাদের অতিথিকে আবারও বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি তার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য। ধন্যবাদ সবাইকে।
rokeyarachylife@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন