Magic Lanthon

               

বিউটি মন্ডল

প্রকাশিত ২৬ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার

বিব্রতকর পরিস্থিতির বিতর্কিত সমাধান

বিউটি মন্ডল

 

শিল্প ও শিল্পী

শেষ বলে কিছু নেই জীবনে; প্রতিটি মুহূর্তে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চার হয়। জীবন থাকলে সেখানে পরিবর্তন কিংবা ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবেই। তবু মানুষের প্রচেষ্টা থাকে জীবনকে একমুখী করে সুখের দিকে ধাবিত করা। তার পরও সৃষ্টি হয় জীবনের বিচিত্র সব গল্প। সেই গল্প কখনো রঙিন, কখনো রঙহীন, ধূসর, বিবর্ণ। হৃদয় ছোঁয়া অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে জীবনের ক্ষণে ক্ষণে। ক্রমাগত জীবনের রূপ বদলালেও বলা হয়ে থাকে `জীবনবীণার তারখানা একবার ছিঁড়ে গেলে সময়ের পরিক্রমায় জোড়া লাগে ঠিকই কিন্তু সুরের মলিন রাগিনী আর বাজে না’। আসলে এটাও চিরস্থায়ী নয়। কারণ সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে নেয়, তারপর সুযোগ বুঝে ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায়। তবে যারা জীবনের পরিবর্তন ও উত্থান-পতন মেনে নিতে জানে, তাদের জন্য চলা আরো সহজ হয়ে ওঠে। কারণ চলার আরেক নামই জীবন।  

জীবনে চলার অনুপ্রেরণা জোগায় নানা শিল্প। কারণ শিল্পের মধ্যেই মানুষের জীবন বিধৌত প্রেষণা লুক্কায়িত। শিল্পের দ্বারাই বার বার দেখার ক্ষেত্র পরিবর্তন করে মানুষ। একসময় সে হয়তো এভাবে পরিণতও হয় শিল্পবান মানুষে। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির হতে হয় না। চাই কেবলই সাধনা। সেই সাধনার মাধ্যমে একজন মানুষ শিল্প বিষয়টিকে একটি নিজস্ব ছকের মধ্যে নিয়ে আসতে পারে। যে ছক তৈরি হয় শিল্পবান মানুষটির নিজের মতো করেই। আর তার এই নানান চিন্তার গভীরতা থেকেই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় নির্যাস উৎসারিত, উদ্ভাবিত হয়।

শিল্প কিংবা শিল্পীর এমন স্বরূপ ব্যক্তিমানুষ প্রত্যক্ষ করলেও সবাই সেটার মূল্যায়ন করতে পারি না। কারণ প্রতিনিয়ত তারা ছুটতে থাকে অর্থ, সম্পদ, বিলাসিতার টানে; শিল্পের সমাদর কিংবা শিল্পীর বেদনার কথা শোনার কোনো সময় নেই। তার পরও সাধারণ মানুষের কাছে যা অস্থিরতা, শিল্পীর কাছে তা সৌন্দর্য্যরে সন্ধান, ধ্যান। তাইতো চরম সঙ্কটের মুহূর্তেও শিল্পী হয়ে ওঠে পরম সহানুভূতিশীল। সত্য ও সুন্দরকে প্রকাশ করে; সংগ্রাম করে মিথ্যা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এই সংগ্রামে শিল্পী একটি লক্ষ্যে হয়তো পথ চলতে পারে, কিন্তু চরম লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনেক বেগ পেতে হয়। তাই শিল্পীর পথচলা অতৃপ্ত পূরণের জন্য মহাযাত্রা। কেননা রাষ্ট্র, জাতীয়তা নামক প্রতিষ্ঠানগুলো যতদিন থাকবে ততদিন তো শিল্পের মুক্তি অসম্ভব! সেজন্যই হয়তো অতৃপ্তি ও সংগ্রামের ভিতর দিয়েই শিল্পীর মহাপ্রয়াণ ঘটে। তেমনই এক সংগ্রামরত শিল্পবান ভায়োলিনবাদকের গল্প নিয়ে নির্মিত বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায়ের দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার (২০১৬)। কেনো শিল্পীকে সবকিছু ভুলে গিয়ে পুঁজির পিছনে ছুটছে হচ্ছে, কেনোইবা তার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া স্ত্রীর যৌনদৃশ্য মেনে নিতে হয় কিংবা আদৌ তিনি সবকিছু মেনে নিতে পারেন কি না, এসব তুলে ধরার প্রয়াস থাকবে এ প্রবন্ধে।

দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার ও তার স্রষ্টা

‘মুম্বইতে [মুম্বাইতে] আমি এমন একটি মানুষকে জানি, যার সঙ্গে এইরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। গল্পটি তার মুখ থেকে শোনার পর, আমার মনে হয়েছিলো এটা নিয়ে ছবি বানানো যায়। তারপর আর কি! লিখতে বসে পড়লাম।’ কথাগুলো দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার-এর নির্মাতা বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায়ের। তার মানে ভায়োলিন প্লেয়ার সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। আর তিনি সেই সত্য ঘটনাকে নিজের মতো করে আরেকবার চলচ্চিত্রের বাস্তবতায় দেখাতে চেয়েছেন। তবে আলোচনা শুরুর আগে বৌদ্ধায়ন সম্পর্কে খানিকটা জেনে নেওয়া যেতে পারে।

ভারতের অন্যতম বিজ্ঞাপননির্মাতা বৌদ্ধায়ন ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১ জুন জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায়। তার ডাকনাম বাডি। বাবা বনজ মুখার্জী ছিলেন কবি (শারীরিক প্রতিবন্ধী) আর মা মিরা মুখার্জী স্কুলশিক্ষক। ছেলেবেলা থেকেই শিল্পসাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বৌদ্ধায়নের। তার এই সৃজনশীল প্রবৃত্তি জাগ্রত হয়েছিলো বাবার অনুপ্রেরণায়। বিশেষ করে তার আগ্রহ ছিলো ক্রিকেট, বাংলা সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের প্রতি। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে স্কুলজীবন শেষে কলকাতায় সেন্ট জ্যাভিয়ের্স কলেজে ভর্তি হন তিনি, সেখানেই ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। কলেজ শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পেনিসিলভেনিয়ার ক্লারিয়ান কলেজ অব কমিউনিকেশন-এ বিজ্ঞাপন নিয়ে অধ্যয়ন করেন বৌদ্ধায়ন। এ পর্যন্ত তিনি তিনশোর বেশি বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেছেন।

২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর ‘লিটল ল্যাম্ব ফিল্মস’ নামে বৌদ্ধায়ন একটি বিজ্ঞাপন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান করেন। খাদ্য তৈরির ধারণা থেকেই বৌদ্ধায়নের মাথায় এ প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ধারণা আসে। তার মতে, ‘চলচ্চিত্র-নির্মাণ একটা খাবার প্রস্তুত করার মতো। কেননা একটা সুস্বাদু খাবার তৈরির জন্য সঠিক অনুপাতের সঙ্গে যেমন সঠিক উপাদানের প্রয়োজন, তেমনিভাবে মনস্তাত্ত্বিক উপাদানগুলোর সঙ্গে সববিষয়ের পূর্ণতায় নির্মিত হয় চলচ্চিত্র।’ এই প্রতিষ্ঠান থেকেই ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধায়ন নির্মাণ করেন তার প্রথম কাহিনিচিত্র তিনকাহন। চলচ্চিত্রটি জয়পুর (ভারত) আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা কাহিনিচিত্রের পুরস্কার, দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সম্পাদনা বিভাগে সেরা পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের ৪৭টি উৎসব থেকে পেয়েছে ১৭টি পুরস্কার। এরপর ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি নির্মাণ করেন হিন্দি ভাষায় তার প্রথম কাহিনিচিত্র দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার

মাত্র দু’টি চলচ্চিত্র বানিয়েই বৌদ্ধায়নের ঝুলিতে জমা হয়েছে ৪০টিরও বেশি পুরস্কার। দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা কাহিনিচিত্রের পুরস্কার পায়। মাদ্রিদে ইমাজিন ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে সেরা অভিনেতা ও সিনেমাটোগ্রাফারের পুরস্কার পেয়েছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী ও অভীক মুখোপাধ্যায়। এই দেখে মনে হয়, আন্তর্জাতিক ছবির অলিন্দে সত্যিই যেনো বৌদ্ধায়নের বেহালার সুর পৌঁছে গেছে। কারণ নিজের ঘরেও কম প্রশংসা পায়নি চলচ্চিত্রটি। এবার আলোচিত এ চলচ্চিত্রের কাহিনি সংক্ষেপ জেনে নিই। 

গল্পটা এক বেহালাবাদকের একদিনের জীবন নিয়ে। নাম রবি চট্টোপাধ্যায়। বয়স ৪০-এর কম¾বেশি হবে। রবির স্ত্রী অনিতা কাজ করেন চলচ্চিত্রের এক্সট্রা হিসেবে। দুইজনের ছোট্ট সংসার। কিন্তু বেহালা বাজিয়ে ও স্ত্রীর স্বল্প রোজগারে ঠিকঠাক সংসার চলে না তাদের। বাড়িতে একটার পর একটা বিল জমা হলেও তা তাদের পরিশোধের সামর্থ্য নেই। প্রতিদিনের মতো বেহালা বাজিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন রবি। হঠাৎ খেয়াল করেন স্টেশনে একটা লোক তাকে অনুসরণ করছে। রবি কিছুটা ভয়, কিছুটা ইতস্তত বোধ করেন। কিছুক্ষণ পর লোকটি রবির সামনে আসেন, পরিচয় দেন চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে। কথার একপর্যায়ে তিনি একটি চলচ্চিত্রে রবিকে একক ভায়োলিন বাজানোর প্রস্তাব দেন। প্রথমদিকে রবির চোখেমুখে অনাগ্রহ ফুটে উঠলেও, কাজের আগে অর্ধেক টাকা ও একক ভায়োলিন বাজানোর লোভে রাজি হন তিনি। এমন সুখবর স্ত্রীকে জানানোর জন্য বার বার ফোন দিলেও তা বন্ধ পান। এরপর ওই নির্মাতার সঙ্গে একটি পুরনো বাড়িতে যান রবি। কী চলচ্চিত্র, কী মিউজিক, নির্মাতা কে, কী বাজাতে হবে রাস্তায় যেতে যেতে রবি এমন নানাবিধ প্রশ্ন করতে থাকেন। কিন্তু রবির প্রশ্নে খানিকটা বিরক্ত হন লোকটি।

অন্ধকার, পুরনো, পলেস্তার খসা একটা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় রবিকে। সেখানেই স্টুডিও বলে একটি সাধারণ ঘরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। নানা শর্ত, শঙ্কা নিয়ে রবি যখন বাজানোর প্রস্তুতি নেন, তখন তিনি বুঝতে পারেন তাকে পর্নোগ্রাফিতে বেহালা বাজানোর জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। রবি হয়তো তখনো জানতেন না, এর চেয়ে বড়ো বিস্ময় তার সামনে অপেক্ষা করছে! এরপর সামনে থাকা মনিটরে ভিডিও দেখে রবি যখন বেহালা বাজাতে শুরু করেন, তখনই তিনি খেয়াল করেন পর্নোগ্রাফিতে অভিনয় করা নারী তারই স্ত্রী! থমকে যান রবি, কিন্তু নির্মাতাকে কিছুই বুঝতে দেন না। ছল ছল চোখে নির্মাতার বিরক্তিভাব দূর করতে¾সরি, এক্সট্রেমলি সরি, বলে ভায়োলিন বাজানো শুরু করেন রবি। বাজনা শেষে ফিরে আসার সময় অনেক কিছু তার মাথায় ঘুরপাক খায়। কিন্তু ঘরে ফিরে রবি স্ত্রীকে আর কিছুই বলেন না।

কে বলে রে আমি আমি, এই আমি কী সেই আমি

চোখে চশমা, মুখে অযত্নে বেড়ে ওঠা দাড়ি; শরীর মৃদু ঘর্মাক্ত। এমন অবয়ব নিয়ে খুব মনোযোগ সহকারে ইংরেজি দৈনিক পড়ছেন রবি। ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রতিবেশি পরিবারের দ্বন্দ্ব-কলহের শব্দ ভেসে আসছে। তার পিছনে রান্নাঘরে কাজের শব্দ। হঠাৎ নারীকণ্ঠ¾আজ ঘরেই আছো না? বুঝতে অসুবিধা হয় না এ কণ্ঠ রবির স্ত্রীর। রবি তাকে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন, তিনি আজ ঘরে থাকবেন না। কিছুক্ষণ পর রবির স্ত্রী জুনিয়র আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মিটিং আছে এবং ফিরতে দেরি হবে বলে বাইরে চলে যান। এতোক্ষণে দর্শকের মনে পরিবারটির অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা তৈরি হয়।

চলচ্চিত্রের ছয় মিনিট ৪২ সেকেন্ডে দরজায় কড়া নাড়েন সংবাদপত্রের হকার। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে হকার রবির হাতে বিল ধরিয়ে জানিয়ে দেন, গত মাসের টাকাও বাকি; টাকা না দিলে আর পেপার দিবেন না। কিন্তু রবির মুখভঙ্গি দেখে মনে হয়, তিনি কোনো কথাতেই কর্ণপাত করেননি। বরং হকারের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেন। এরপর দেয়ালে একটি তেলাপোকা দেখে থমকে দাঁড়ান রবি। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রথমে পা থেকে জুতা খুলে তেলাপোকার দিকে ছুঁড়ে মারেন। কিন্তু সেটা লক্ষভ্রষ্ট হয়। তেলাপোকাটি পালিয়ে খাটের নিচে আশ্রয় নেয়। রবি এবার ঝাড়ু দিয়ে খাটের নিচ থেকে তেলাপোকাটিকে নিঃশব্দে বের করে ঘরের ফাঁকা জায়গায় নিয়ে আসেন। এরপর তিনি স্থির থাকা তেলাপোকাকে ঝাড়ু দিয়ে সজোরে আঘাত করেন। সেই আঘাতে তেলাপোকাটির কী হয় দেখা যায় না। তবে রবি থামেন না; তিনি ক্রমাগত তেলাপোকাটিকে আঘাত করে যান। আঘাত করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ততোক্ষণে তিনি তেলাপোকাটিকে ১৭ বার ঝাড়ু দিয়ে আঘাত করে ফেলেছেন! শেষ পর্যন্ত তেলাপোকাটিকে নড়তে না দেখে স্বস্তি পান রবি; ক্লান্তি দূর করতে চোখ বন্ধ করেন।

একটা নিরীহ তেলাপোকার ওপর রবির এতো রাগ খানিকটা অস্বাভাবিকই লাগে। মনে হয়, অনেকদিনের পুষে রাখা কোনো রাগ-ক্ষোভ তিনি এ হত্যার মাধ্যমেই নিরসন করলেন। প্রশ্ন জাগে, যে প্রাণীটার সামান্য আঘাতেই মৃত্যু হয়, সেটাকে এতোগুলো আঘাতের কারণ কী? রবি কি কোনো কারণে মানসিকভাবে অস্থির আছেন, যার বহিঃপ্রকাশ এ বীভৎস হত্যাকাণ্ড? নাকি সদ্য মৃত তেলাপোকাটি তার অনেক দিনের যন্ত্রণার কারণ ছিলো? আবার এমনও হতে পারে, নানা পরিবেশ মাড়িয়ে এখনো কেনো এই একমাত্রটি পৃথিবীতে বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে!

চলচ্চিত্রের ২১ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে দেখা যায়, কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার সময় স্টেশনে রবিকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে বেহালা বাজাতে রাজি করান এক চলচ্চিত্রনির্মাতা। ওই নির্মাতা জানান, তিনি সবকিছুই এক টেকে নেন এবং সেটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিতে হবে। রবির বাজানো বেহালার সুরও একবারই নিবেন তিনি। ফলে তিনি যখন হাতের ইশারা দিবেন, তখনই রবিকে বেহালা বাজানো শুরু করতে হবে। সবকিছু ঠিকঠাক করে নির্মাতা হাতের ইশারা দেন, কিন্তু রবি শুরু করতে পারেন না। তার সামনে থাকা কম্পিউটার মনিটরে চোখ স্থির হয়ে যায়। কারণ স্ত্রীর রতিক্রিয়ার সঙ্গে রবিকে বেহালা বাজাতে হবে! অবশেষে স্থবির রবি বেহালা বাজাতে শুরু করেন। বেহালার সুর কাঁদে, কেঁদে চলে রবির পুরো পৃথিবী। একসময় মনে হয়, জীবনের সবটুকু সুর দিয়ে ভগ্ন হৃদয়ে তিনি বেহালা বাজিয়ে চলেছেন। নির্মাতার ইশারা অনুযায়ী একসময় বেহালা বাজানো শেষ হয়। কিন্তু রবি আবারও বাজাতে শুরু করেন। তবে এবার আর নির্মাতার জন্য নয়, নিজের জন্য। মন কেমন করা সেই সুর শুনে নির্মাতা বলে ওঠেন, নাইস। রবির অবশ্য তাতে কিছুই যায় আসে না। টাকা নিয়ে তিনি নিঃশব্দে বেরিয়ে যান।

বাসায় ফেরার সময় তখন অনেক রাত। ফাঁকা রাস্তায় একা হেঁটে চলেছেন রবি। ট্রেনেও তখন তেমন কোনো যাত্রী নেই; চলন্ত ট্রেনে তিনি ঘেমেই যাচ্ছেন। অথচ কয়েক আসন পিছনে বসা একজন শীতে জড়সড়। বুঝতে অসুবিধা হয় না, এ ঘামার কারণ বাহ্যিক নয়, মনের গভীরের কোনো প্রদাহ। ট্রেন থেকে যখন রবি নামেন, তখন স্টেশনও ফাঁকা হয়ে গেছে। আবহসঙ্গীতে রবির বাজানো সেই বেহালার সুর। কিছুক্ষণ পর রবি বাড়িতে পৌঁছেন, দর্শকের মধ্যে টান টান উত্তেজনা! বাড়িতে ফিরে কী করবেন তিনি? রবির স্ত্রী দরজা খোলেন, কয়েক সেকেন্ডের জন্য তিনি স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। রবির কানে তখন স্ত্রীর অভিনয় করা পর্নোগ্রাফির বালতিতে পানি পড়ার শব্দ বাজছে।

নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না রবি। স্ত্রীর গলা টিপে ধরেন; অনিতা বাঁচার চেষ্টা করলেও রবির ক্ষোভ-ঘৃণা আর শারীরিক শক্তির কাছে তাকে পরাজিত হতে হয়। অনিতাকে মেঝেতে ফেলে রবি তার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত গলা টিপে ধরে রাখেন। তখনো আবহে বালতিতে পানি পড়ার শব্দ আর অনিতার বেঁচে থাকার আকুতি ভেসে আসছে। অনিতার শরীর অসাড় হয়, কিন্তু রবির রাগ এতোটুকু কমে না! একপর্যায়ে বেহালা দিয়ে স্ত্রীর মাথায় আঘাত করতে থাকেন তিনি। প্রথম আঘাতেই বেহালাটা ভেঙে যায়। তার পরও ভাঙা বেহালা দিয়ে তিনি আঘাত করতেই থাকেন ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত। বেহালা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলে থামেন রবি। তারপর থুথু নিক্ষেপ করেন অনিতার মুখে। তখনো তার চোখে-মুখে ঘৃণা-রাগের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু একটু পরেই বোঝা যায়, এ হত্যাকাণ্ড আসলে রবির কল্পনায়! বাস্তবে দরজা খোলার পর রবি স্ত্রী অনিতাকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি কীভাবে জীবনের প্রথম একক বেহালা বাজিয়ে ২০ হাজার টাকা আয় করলেন সেই গল্প তাকে শোনান। আবহে বেহালার সুর বাজে।

আসলে জীবন কখন কোন দিকে বাক নিবে সেটা বলা মুশকিল। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চার হয় এটাও সত্য। যে রবি একটি তেলাপোকাকে নির্মমভাবে হত্যা করে; সেই রবি তার জীবনকে এলোমেলো করে দেওয়া স্ত্রীকে কিছুই বলেন না! ভাবি, এটাই জীবন, এটাই জীবনের সৌন্দর্য। জীবনের সেই সৌন্দর্যকে অসাধারণভাবে শিল্পে তুলে ধরেছেন বৌদ্ধায়ন। স্ত্রীকে পর্নোগ্রাফিতে অভিনয় করা নিয়ে কিছুই বলেন না রবি। পরবর্তী সময়ে কি হতে পারে, তার তেমন কোনো ইঙ্গিতও দৃশ্যত চলচ্চিত্রে নেই। তবে চলচ্চিত্রের শেষে পর্দায় ভেসে ওঠে পাবলো পিকাসোর বিখ্যাত সেই উক্তি¾প্রতিদিন আত্মায় যে ধুলা জমে, শিল্প সেটাকে ধুয়ে ফেলে। তার মানে কিছু যে একেবারেই বলেননি নির্মাতা, সেটা বললে সত্যের অপলাপ হবে। আর এর মধ্যে দিয়ে সবচেয়ে বড়ো যে বিষয়টির পরিচয় বৌদ্ধায়ন দেন, সেটা হলো তার পরিমিতিবোধ।

হাতের কাছে নড়ে চড়ে খুঁজলে জনমভর মেলে না

চারপাশে নানা ধরনের শব্দের মধ্যে ঘরে ইংরেজি দৈনিক পড়ার ফাঁকে রবি স্ত্রীর বিভিন্ন কথার জবাব দেন। এমন সময় চলচ্চিত্রের দুই মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করেন তিনি; পুরো পর্দা অন্ধকার হয়ে যায়; তবে আবহে আগের সব শব্দ থাকে। তিন মিনিট তিন সেকেন্ড পর্যন্ত তিনি এভাবেই চোখ বন্ধ করে থাকেন। এরপর আট মিনিট ছয় সেকেন্ডে একটি তেলাপোকাকে ঝাড়ু দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেন রবি। টানা ১৭ বার ঝাড়ু দিয়ে আঘাতের পর তিনি শান্ত হন। এরপর তিনি আবারও চোখ বন্ধ করেন। পর্দা আবারও অন্ধকার হয়ে যায়। তবে এবার মনে হয়, রবির এ চোখ বোজা কেবল ক্ষণিকের ক্লান্তির জন্য নয়, তার চেয়ে বেশিকিছু। হয়তো সেটা জীবনের ক্লান্তি, নতুবা অসহায় রবির ভিন্ন কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের পর কিঞ্চিত শান্তি লাভের প্রত্যাশা।

১৬ মিনিট চার সেকেন্ডে স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় থাকা রবি খেয়াল করেন একজন অচেনা লোক তাকে অনুসরণ করছেন। ইতস্তত বোধ করেন রবি। এ সময় দুইজনের মাঝখানে থাকা রেললাইনে ট্রেন এসে থামে; লোকটি আড়াল হয়। লোকটিকে না দেখতে পেয়ে রবি কিছুটা স্বস্তি পান। কিন্তু ট্রেন চলে যাওয়ার পর তিনি খেয়াল করেন, লোকটি তখনো তার দিকেই তাকিয়ে আছে। এবার কিছুটা ঘাবড়ে যান তিনি; রুমাল দিয়ে মুখ মুছে শান্ত থাকার চেষ্টা করেন। ১৭ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে একইভাবে চোখ বন্ধ করেন রবি। পর্দাও যথারীতি অন্ধকার হয়ে যায়। ১৭ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে চোখ খুলে দেখেন লোকটি তখনো তার দিকেই তাকিয়ে আছেন।

রবির এই চোখ বন্ধ করা, পর্দা কালো হওয়ার মানে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। রবি হয়তো এর মধ্য দিয়ে বাস্তবতা থেকে পালাতে চান। চোখ বন্ধ করে তিনি বোঝাতে চান, যেহেতু নিজে কিছু দেখছেন না, তা-ই অন্যরাও তাকে দেখছে না! কিন্তু শারীরিক ক্লান্তির জন্য চোখ বন্ধ করে যেভাবে কিছুটা চাপ হালকা হওয়া যায়, একইভাবে বাস্তবতা থেকে আদৌ পালানো যায় কি? নির্মাতা এখানে রবিকে প্রতীক হিসেবে হাজির করেন। হয়তো বলতে চান সমাজের সবাই এক্ষেত্রে একেকজন রবি। যারা অধিকাংশই বাস্তবতা থেকে পালাতে চায়। তারা কষ্ট, ভয়, অজানার মুখোমুখি হতে চায় না। বরং কোনো দুঃসময় এলে বার বার মনে উদয় হয়¾হায়, এ যদি কেবল স্বপ্ন হতো! ফলে রবিও চোখ বন্ধ করে পরিত্রাণ পান না।

বাস্তবতাকে ভয় পাওয়া রবিকে অচেনা লোকটির মুখোমুখি হতে হয়। চলচ্চিত্রনির্মাতা রবিকে বেহালা বাজানোর প্রস্তাব দেন। রবির ইতস্তত বোধ তখনো কাটে না। একপর্যায়ে ওই পরিচালকের সঙ্গে তিনি ট্রেনে ওঠেন। কথা কম বলা, শান্ত রবিকে এবার বাচাল বলে মনে হয়। নিজের সম্পর্কে অনেক প্রশংসা তুলে ধরেন নির্মাতার কাছে। তবে নির্মাতার বিরক্তিভাব দেখে তিনি শান্ত হন। এবার তিনি হারিয়ে যান অন্য জগতে। ট্রেনের মধ্যেই রবি ঘাড়-ভ্রু-মাথা ঘুরিয়ে মনে মনে বেহালা বাজাতে থাকেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে বেহালার সুর বাজে। ৩২ মিনিট ৫২ সেকেন্ডে আবার চোখ বন্ধ করেন রবি। পর্দা আবারও অন্ধকার হয়। রবি কল্পনার জগতে গভীরে প্রবেশ করে বেহালা বাজিয়ে চলেন, জনতার হাততালি পান। আবার নতুন সুরে বাজান, জনতার হাততালির শব্দ আরো জোরালো হয়। ৩৩ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে চোখ খোলেন তিনি, তবে সেটা জনতার হাততালিতে নয়। একজন কিশোরীর ভিক্ষা চাওয়ার শব্দে। বাস্তবতায় ফিরে মনের অজান্তেই জনতার পাওয়া হাততালি আর নিজের ভাবনার কথা ভেবে মৃদু হেসে ওঠেন রবি।

সবমিলিয়ে রবির মন উৎফুল্ল। কিন্তু তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। ৪৮ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে তিনি নিজের স্ত্রীর পর্নোগ্রাফিতে অভিনয় দেখে স্তব্ধ হয়ে যান। তার পরও ‘অসহায়’ রবি সেই পর্নোগ্রাফিতেই বেহালার সুর তোলেন। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে অন্য পুরুষের মন্থন নিজের চোখে সহ্য করতে পারেন না তিনি। ফলে মনিটরে যখন স্ত্রীর সঙ্গে অন্য পুরুষের চুম্বন দৃশ্য আসে, তখন তিনি চোখ বন্ধ করেন। দর্শকেরও কিছু দেখার সুযোগ থাকে না। কারণ পর্দায় আগের রীতি মেনে অন্ধকার নেমে আসে। তবে বোঝা যায়, রবি বেহালা বাজিয়ে চলেছেন। কিন্তু ৫২ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে জোর করে তার বন্ধ চোখ খুলে দেন পর্নোগ্রাফির নির্মাতা; নির্দেশ দেন মনিটর দেখেই তাকে বেহালা বাজাতে হবে। অসহায় রবি নির্মাতার ইচ্ছে মতোই বেহালা বাজান।

জীবন তো আসলে বৈচিত্র্যে ভরা, কখনো কখনো এমন সব পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, বিব্রতকর সেই পরিস্থিতিতে পালানোর কোনো পথ থাকে না। রবিও পালাতে পারেননি। চোখ বন্ধ করে বাস্তবতা থেকে পালাতে চেয়েছিলেন তিনি, পরিত্রাণ মেলেনি। পুঁজির কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছুই করার ছিলো না রবির। পুঁজিপতিরা সমাজের সবখানে ছড়িয়ে আছে অচেনা-অজানা সেই নির্মাতার মতো। তাদের কোনো নাম নেই, তারা সুযোগ সন্ধানী। ফলে রবি যখন বেহালা বাজান তখন তাকে অসহায়, নির্জীব মনে হয়। নিজের নিষ্ঠুর পরিণতি নিজের চোখে দেখতে বাধ্য করা হয়। যখন সেই বন্দিদশা থেকে রবি মুক্তি পান, তখন নিজের মতো করে হৃদয় দিয়ে বেহালা বাজান। কিন্তু মনে কোনো তৃপ্তি আসে না। কারণ রবি জানেন, মুক্তি নয়, আরো দুঃসহ শিকলে আবদ্ধ হলেন তিনি।

এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিট ১৩ সেকেন্ডে বেহালা বাজিয়ে বাড়ি এসে স্ত্রীকে হত্যার পর, চোখ বন্ধ করেন রবি। পর্দায় আবারও অন্ধকার নেমে আসে। রবির অবয়ব দেখে মনে হয়, খানিক শান্তি পেলেন। তবে এবার এক ভিন্ন দৃশ্যের দেখা মেলে। আগে যে পাঁচ জায়গায় রবি চোখ বন্ধ করেছিলেন, চোখ খোলার পর ঠিক সেখানেই ফিরে গেছেন। কিন্তু এবার চোখ খোলার পর দেখা যায়, রবি আসলে খুন করেননি। তিনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্ত্রীকে হত্যার কথা কল্পনা করছিলেন। একই সঙ্গে এও কল্পনা করছেন, স্ত্রীকে হত্যা করতে পারলেই তিনি শান্তি পাবেন। আর সেজন্যই তিনি অভ্যাসানুযায়ী চোখ বন্ধ করেছিলেন! পরে স্ত্রীর স্পর্শে তার চেতন ফেরে।

প্রশ্ন জাগে, রবি কি আসলেই অতোটা নিরুপায়, নির্জীব; যতোটা চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে? কেনো তিনি স্ত্রীকে কিছুই বলতে পারছেন না। প্রশ্ন জাগে, যদি কখনো তিনি স্ত্রীর কাছে তা প্রকাশ নাই করতে পারেন, তাহলে পারস্পরিক বিশ্বাস, বোঝাপড়ার যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে সেটার সমাধান হবে কী করে? নাকি তার মনে স্ত্রীর উপার্জন ভিন্ন কেনো চিন্তা ছিলো? ব্যক্তি-মানুষের কাছ থেকে এর উত্তর পাওয়া কিন্তু সহজ নয়।

এ কোন আজব কারখানা

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির কল্যাণে পর্নোগ্রাফির রমরমা ব্যবসা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইতালি, জাপানসহ সারাবিশ্বে রয়েছে পর্ন ইন্ডাস্ট্রি। কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই পর্নোগ্রাফি চলচ্চিত্র স্টুডিও রয়েছে কমপক্ষে ৬৫টি। ইতালিতে ‘ইতালিয়ান স্ট্যালিয়ন’ (Italian Stallion) নামে রয়েছে একটি পর্ন বিশ্ববিদ্যালয়! বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ইতালির বিখ্যাত পর্ন অভিনেতা রোকো সিফরেডি। যেখানে শিক্ষক হিসেবে আছেন বিশ্বের নামকরা সব পর্নস্টার। বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট দুই সপ্তাহের কোর্সে পরীক্ষায় যারা ভালো করে, কেবল তারাই পরে পর্ন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পায়! সবমিলে বর্তমানে উন্নত, উন্নয়নশীল সব দেশেই হানা দিয়েছে পর্নোগ্রাফি। তবে উন্নত দেশ এটাকে সামলে উঠতে পারলেও উন্নয়নশীল দেশের জন্য পর্নোগ্রাফির অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার-এ ১৬ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে অচেনা এক নির্মাতা যখন রবিকে ভাঙাচোরা বিল্ডিংয়ের দিকে নিয়ে যান, তখন রবি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, এইদিকে স্টুডিও! কারণ সাধারণত স্টুডিওগুলো যেরকম হয়, সেরকম জায়গা হয়তো তিনি দেখতে পাননি। কিন্তু এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেন না নির্মাতা। তিনি রবিকে নিয়ে প্রবেশ করেন পুরনো, নির্জন বাড়িতে। যখন আলো-আধারের মধ্য দিয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে তারা ভাঙা বাড়ির উপরে উঠতে থাকেন, তখন ওই ভবনকে আরো দুর্গম মনে হয়। নিস্তব্ধতার মধ্যে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ, বাড়ির ভগ্নদশা অবস্থা আর আলোর স্বল্পতা সবমিলে একটা গা ছমছমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরক্ষণেই অবশ্য এর কারণ বোঝা যায়। ওই নির্মাতা সাধারণ কেউ নন, তিনি পর্নোগ্রাফি চলচ্চিত্র তৈরি করেন! আর এখানকার একটি কক্ষই তার সেই পর্নোগ্রাফি নির্মাণের স্টুডিও।

দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার-এ ৪৩ মিনিট ২০ সেকেন্ডে রবি ওই নির্মাতাকে বলেন, ‘স্যার, কয়েকটা ফুটেজ যদি দেখাতেন, তাহলে আমি ভালো বাজাতে পারতাম।’ কিন্তু নির্মাতা রাজি হন না। উল্টো তিনি বলেন, ‘আমার স্বতঃস্ফূর্ত মিউজিক পছন্দ; এবং আমি সেটা এক টেকেই নিবো।’ অবাক হয়ে রবি জিজ্ঞাসা করেন, ‘মাত্র একটা?’ নির্মাতা বলেন, ‘আমি শ্যুটিংও এভাবেই করি। আপনি প্রস্তুত হলে বলবেন।’ তার মানে রবির স্ত্রীকে দিয়েও ঠিক এক টেকেই তিনি পর্নোগ্রাফি বানিয়েছেন। কিন্তু পর্ন ভিডিওতে রবির স্ত্রী অনিতাকে অন্য পুরুষের সঙ্গে যৌনমিলনে দেখা গেলেও এটা ভাবার কোনো কারণ নেই, তিনি সবকিছু স্বতঃস্ফূর্তভাবে করেছেন। আসলে পর্নোগ্রাফি স্বতঃস্ফূর্ত কিছু নয়, এর মূল বিষয় হলো নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব। একইসঙ্গে পর্নোগ্রাফি যতোটা না যৌনতার প্রকাশ, তার চেয়ে অনেক বেশি পুরুষের ক্ষমতার চর্চা। ফলে পর্নোগ্রাফি কেবল যৌনকর্মের প্রদর্শনী নয়। এর সঙ্গে ক্ষমতা, লৈঙ্গিক সম্পর্কের বিষয়ও জড়িত।

চলচ্চিত্রে রবি যখন তার স্ত্রীকে কল্পনায় হত্যা করেন, তখন ওই পরিস্থিতিতে হয়তো দর্শক হিসেবে অনেকে তৃপ্ত হয়। আবার কল্পনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসার পর যখন স্ত্রীকে কিছুই বলেন না, তখনো তাকে মহানুভব মনে হয়। তার মানে ভালো-খারাপ সবকিছুই রবির পক্ষে যায়। কিন্তু রবির স্ত্রী অনিতার জন্য এতোটুকু সহানুভূতি তৈরি হয় না। অথচ একজন এক্সট্রা আর্টিস্ট কেনো উপার্জনের জন্য এ পথ বেছে নেয়, সে খবর জানা যায় না। একবারও মনে প্রশ্ন আসে না, চোখের সামনে যা দেখা যায়, সেটাই কি সত্য? ফলে চলচ্চিত্র দেখে কেবল পুরুষ রবির প্রতি সহানুভূতি কখনো কখনো সমানুভূতিও হয়! অথচ অনিতাকে নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। এখানেও সেই নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্বের বিষয়টি চলে আসে। নারীর কোনো ভাষা নেই, নারীর কোনো মত নেই, তার আছে কেবল পরিণতি! বিভিন্ন মানুষের সুখ লাভ আর সামনে যাওয়ার কারণ কেবল নারী। তার মতামত, জীবনাচরণ বাস্তবে যেমন আড়ালে থাকে, তেমনই থেকে যায় দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার-এও।

তাছাড়া পর্নোগ্রাফিতে নারীর অধস্তনতাকে অধিকাংশ পুরুষ তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই মনে করে না। পুরুষরা (কখনো কখনো নারীও) ধরেই নেয়, কেউতো কোনো নারীকে পর্নোগ্রাফিতে বাধ্য করে না, তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব কাজ করে। বরং এ কাজের জন্য নারী, এখানে অভিনয় করা পুরুষের চেয়ে বেশি টাকা পান। কিন্তু এই পেশার সঙ্গে জড়ানোর পিছনের কারণ কী, সেটা অগোচরে থেকে যায়। জানা যায় না, সেইসব পুরুষের কথা যারা অনিতাকে এই পেশায় নামতে বাধ্য করেছে। এর কোনোকিছুই ভাবার, প্রশ্ন তোলার সুযোগ দেননি নির্মাতা বৌদ্ধায়ন¾এমন কি এর কোনো ইঙ্গিতও নেই। বরং তার নির্মাণশৈলীতে রবির দুঃখে দর্শক দুঃখিত হয়, নির্মাতা হিসেবে তাকে বাহবা দেয়; অন্যদিকে অনিতা হয়ে ওঠে মুখরোচক আলোচনার বিষয়বস্তু।

এই ছিলো মোর ঘটে!

প্রযুক্তির বদৌলতে এক ইলেকট্রনিক কীবোর্ড নামের যন্ত্রের কাছেই প্রয়োজন ফুরিয়েছে অনেক বাদ্যযন্ত্র ও যন্ত্রীর। ফলে বাদ্যযন্ত্রীদের অনেকেই, যারা এ দিয়ে জীবন যাপন করতেন, বর্তমানে বেকার হয়ে পড়েছেন। বেকার এইসব শিল্পীদের জীবন কী করে চলছে তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই কারোরই। আবার নায়িকার পিছনে দলবেধে যাদের নাচতে দেখা যায়, কিংবা চলচ্চিত্রের খুব ছোটো ছোটো চরিত্রগুলো যারা করে, সেইসব সহশিল্পী বা এক্সট্রার জীবন কীভাবে চলে তাও বেশিরভাগ মানুষই জানে না। দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার-এর গল্পটা আসলে এমনই দুইজন শিল্পীর। চলচ্চিত্রের এক মিনিট ১২ সেকেন্ডে অনিতা বলেন রবিকে, তোমার কাছে কিছু টাকা হবে? রবি জিজ্ঞাসা করেন, কতো? অনিতা বলেন, ৬৭০ টাকা। রবি উত্তরে জানান, তার কাছে ২৫০ টাকা হবে। তখন অনিতা বলেন, যখনই রাস্তায় বের হই পাওনাদাররা টাকা চায়, খারাপ ব্যবহার করে। একটু পরেই তার প্রমাণও মেলে বাড়িতে যখন সংবাদপত্রের হকার বিল দিতে আসেন। হকার বলেন, গত মাসের পেপার বিল বাকি; বিল না দিলে পেপার দেওয়া বন্ধ করে দিবো। পরের দৃশ্যে দেখা যায়, অনেকগুলো বিলের কাগজ জমা হয়ে আছে।

শুধু রবি কিংবা অনিতা নয়, বেশিরভাগ সহশিল্পীর জীবনের গল্পটা হয়তো এমন। কিন্তু রুপালি পর্দার ঝলমলে আলোয় জীবনের এই করুণ গল্প ঢাকা পড়ে গেছে। সাধারণের কাছে তা একেবারেই অজানা। এক শাকিব খান, অপু বিশ্বাস, মাহী, ফারিয়া, পরিমনি কী খেতে পছন্দ করে, আর করে না, তা নিয়েই দর্শক বেশি উৎসাহী; এর বিপরীতে রবি-অনিতাদের গল্প শোনার সময় কোথায় তাদের। নির্মাতা বৌদ্ধায়ন এই গল্পটা বলতে চেয়েছেন¾নিঃসন্দেহে এজন্য তিনি প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু সাধারণ চোখে দেখার বাইরেও এ গল্পের যে আরো নানা দিক আছে, সেগুলো তুলে আনার কোনো চেষ্টাই তিনি করেননি। শিল্পশ্রমিক (ইন্ডাস্ট্রি অর্থে) আর এই শ্রমিকদের শোষণের মাত্রা যে একই স্তরের, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিতও দ্য ভায়োলেন প্লেয়ার-এ নেই।

২০০১ খ্রিস্টাব্দের দিকে ঢাকাই চলচ্চিত্রে একধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। সেসময় চলচ্চিত্রের মধ্যে গল্পের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এমন সব ভিডিও সংযুক্ত করা হতে থাকে। কাটপিস নামে এসব ভিডিওতে এক্সট্রা শিল্পীদের দিয়ে পর্নোগ্রাফি জাতীয় নাচ-গানে অভিনয় করানো হয়। দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার-এ অনিতাও এমনই একজন এক্সট্রা অভিনয়শল্পী। যার সংসারে অভাব; পাওনাদার রাস্তায় পেলে যাকে কটু কথা শোনায়। ভালোয়িন বাদক স্বামী অক্ট্রেস্ট্রাতে বাজিয়ে সামান্য আয় করে। সবমিলিয়ে তার অবস্থা ভালো নয়। ফলে বাধ্য হয়েই হয়তো অনিতাদের বেঁচে থাকার তাগিদে অন্য পেশায় নামতে হয়।

আবার অনেক নামকরা শিল্পীও শেষ জীবনে চরম অর্থকষ্টে পড়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাবানদের দারস্থ হয়। সারাটা সময় শিল্পের জন্য মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই মানুষগুলোকে তখন রাষ্ট্র নামমাত্র কিছু টাকার চেক ধরিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। কোনো কোনো শিল্পী এ সাহায্যটুকুও না পেয়ে আক্ষেপ করে বলে বসেন, ‘যখন লাইফ সাপোর্টে থাকব, তখন অনেকেই দেখতে যাবেন। মারা গেলে শহীদ মিনারে নিয়ে ফুল দেবেন। দাফন করার সময় রাষ্ট্রীয় স্যালুট দেবেন। এই সবের আমার কিছু দরকার নেই। আমি আরো কিছুদিন বাঁচতে চাই।’ এক্সট্রা শিল্পীদের কথা তো বাদই দিলাম। তারা হয় ভিক্ষা করতে রাস্তায় নামে নতুবা পুতুল নাচের নামে অশ্লীল নৃত্য কিংবা অনিতার মতো পর্ন চলচ্চিত্রে নামে। এসব অভিনয়শিল্পীদের জীবনের খণ্ডাংশ নিয়ে হয়তো এ ধরনের দুই¾একটা চলচ্চিত্র হয়; কিন্তু সেটাও তাদের পক্ষে থাকে না!

তার পরও বৌদ্ধায়ন বন্দনা

রবি এ রকম পরিস্থিতিতে হয়তো কখনোই পড়েননি। স্টেশনে একজন অচেনা লোক কেনো তার পিছু নিয়েছে, তিনি কিছুই জানেন না। তাকে দেখে মনেও হয় না তিনি কারো অনিষ্ট করতে পারেন। তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাবেন, সেটাও পারছেন না রবি। কারণ তার ট্রেন আসতে এখনো অনেক দেরি। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অচেনা লোক তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে অস্বস্তিতে পড়ে যান রবি। একসময় সেই অস্বস্তি ভয়ে রূপ নেয়। তাই ভয় কাটাতে তিনি স্থান পরিবর্তন করে অন্য দোকানের সামনে গিয়ে একটি কোমল পানীয়র বোতল কেনেন। অন্যদিকে রেললাইনের অন্য পাশে থাকা ওই লোকটিও স্থান পরিবর্তন করে দোকান থেকে এক কাপ চা নেন। রবি স্বাভাবিক হতে পানীয় পান করেন। কিন্তু লোকটির তাকানো রবির কাছে ঠিক সুবিধের মনে হয় না। ১৯ মিনিট ২৩ সেকেন্ডে কোনো শব্দ পাওয়া যায় না, রবির পানীয় খাওয়ার শব্দ ছাড়া। অন্যদিকে অচেনা লোকটিও চায়ে চুমুক দেন। সেখানেও কেবল ওই ঢোক গেলার শব্দ। রবি মাঝে মাঝে আড় চোখে লোকটির দিকে তাকান। কিন্তু ওই লোকটি তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। কাট কাট দৃশ্যে দুইজনের ঢোক গেলা আর চোখের চাহনি দেখানো হয়। এর ফলে এক অদ্ভূত দৃশ্যের অবতারণা হয়। দেখে মনে হয়, একজন শিকার, অন্যজন শিকারি। রবি ও তাকে অনুসরণ করা ব্যক্তির ঢোক গেলার শব্দ একই রকম মনে হলেও দুই শব্দ দুই ধরনের অর্থ তৈরি করে। ফলে এর জন্য সত্যিই বৌদ্ধায়ন প্রসংশার দাবিদার।

এছাড়া চলচ্চিত্রে মোট ছয় জায়গায় চোখ বন্ধ করেন রবি। এই সময়গুলোতে ব্যাকগ্রাউন্ডের শব্দ থাকলেও পর্দা যেভাবে অন্ধকার হয়, তা নতুন এক চলচ্চিত্র ভাষা শেখায়। ছয় জায়গায় পর্দা অন্ধকার হলেও ছয় জায়গারই ভিন্ন ভিন্ন অর্থ তৈরি হয়। এক ঘণ্টা ১২ মিনিটের দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার-এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও এতোটুকু বিরক্ত লাগে না। বরং শেষ হলে রবির সঙ্গে মন কখন একাত্ব হয়ে যায় টের পাওয়া যায় না। বরং চলচ্চিত্রের শেষে যখন নাম উঠতে থাকে, তখন বিষাদে মন ভারি হয়ে ওঠে। সবমিলিয়ে দ্য ভায়োলিন প্লেয়ার-এ ক্যামেরার ব্যবহার, গল্প বলার ঢঙ এবং আবহসঙ্গীতের ব্যবহার এক কথায় দুর্দান্ত। চলচ্চিত্র দেখতে গিয়ে মনেই হয় না এটি নির্মাতার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। ফলে সামনের দিনগুলোতে বৌদ্ধায়ন দর্শকের মনে আবারও দাগ কাটবেন বলে আশা রাখা যেতেই পারে।

লেখক : বিউটি মন্ডল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।

beautymcj@gmail.com

তথ্যসূত্র ও টীকা

১. https://goo.gl/KUjbyV; retrieved on 13.09.17

২. http:/ww/w.littlelambfilms.com; retrieved on 13.09.17

৩. http:/ww/w.imdb.com/title/tt3479530/awards; retrieved on 17.09.17

৪. https://goo.gl/gvkaEK; retrieved on 19.09.17

৫. https://goo.gl/5pw76e; retrieved on 29.10.17

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন