Magic Lanthon

               

আসাদ লাবলু

প্রকাশিত ২৫ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

'নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ' : কোনোরকমে একটা গল্প বলার চেষ্টা

আসাদ লাবলু


ভয়াবহতা কিংবা ব্যাপ্তির ভিত্তিতে তালিকা করলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে উপরের দিকেই রাখতে হবে। এই যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ পর্যন্ত চলচ্চিত্র হয়েছে প্রায় একশো ৩২টি। যুদ্ধ-সংগ্রামের ইতিহাসে অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে `আমেরিকান রেভ্যুলুশনারি ওয়ার’ নামে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ওপর এ পর্যন্ত চলচ্চিত্র হয়েছে প্রায় ২৯টি। ভারতীয় উপমহাদেশে ‘৪৭-এর দেশভাগ’ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ নিয়ে হিন্দি-বাংলা মিলে চলচ্চিত্র হয়েছে ২৭টির মতো। এ অবস্থায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে এখন পর্যন্ত চলচ্চিত্র হয়েছে অন্তত ৫৫টি। সংখ্যার বিচারে এটা কম না বেশি, সে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং সংখ্যার হিসাবে অর্ধশত পেরিয়ে একটি যুদ্ধের চলচ্চিত্র নতুন করে কী বলতে চায়, কিংবা কোন উপযোগিতা হাজির করতে চায়, সেটাই দেখার বিষয়। এ রকম একটা চলচ্চিত্রের নাম নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ।

প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার, কেবল মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র হিসেবে এ আলোচনায় নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। অন্তত আরো তিনটি বিশেষত্ব রয়েছে চলচ্চিত্রটির। প্রথমত, নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা চলচ্চিত্রের খেতাব পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, এটি নির্মিত হয়েছে সরকারের অনুদানের টাকায়। আর তৃতীয়ত, চলচ্চিত্র করা হয়েছে কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ কবিতা অবলম্বনে। এ আলোচনার ঝোঁক প্রথম ও দ্বিতীয় বিশেষত্বের দিকেই বেশি থাকবে। এর মধ্যে প্রথম বিশেষত্বের সঙ্গে একটি বিশেষ ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে। সেই বিশেষ ঘটনাটি আলোচনার ধারাবাহিকতায় খানিকটা পরেই আসবে।

.

নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ সম্পর্কে কয়েকটি টুকিটাকি তথ্য জেনে নেওয়া যেতে পারে। চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন তরুণ নির্মাতা মাসুদ পথিক। ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ কবিতা অবলম্বনে এর চিত্রনাট্য তিনি নিজেই লিখেছেন। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন। এর শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন জুয়েল জহুর (নেকাব্বর), শিমলা (ফাতেমা), মামুনুর রশীদ (মুন্সি), আফফান আহমেদ (তোরাব আলী), প্রবীর মিত্র (আয়েনউদ্দিন, ফাতেমার বাবা) ও বাদল সরকার (বৃদ্ধ নেকাব্বর)। এ ছাড়া কবি বিমলের বৃদ্ধ বয়সের দৃশ্যে অভিনয় করেছেন নির্মলেন্দু গুণ নিজেই।

চলচ্চিত্রটির কাহিনি সংক্ষেপে এ রকম¾নেকাব্বর, একজন বঞ্চিত মানুষের প্রতিকৃতি। স্বজন অর্থে আপন কেউ তার নেই। থাকার জায়গাটুকু বাদে জমিজমাও নেই। সবচেয়ে কাছের মানুষ বলতে প্রেমিকা ফাতেমা। প্রকৃতির সঙ্গেও একটা প্রেম আছে তার। নেকাব্বরের মতো গ্রামের বেশিরভাগ মানুষেরই জমি নেই। সবাই তালুকদারের (মুন্সি) জমি চাষ করে খায়। তালুকদার এক শোষণের প্রতীক। ইতিহাসের বিবর্তনে জমিদারের পূর্বপুরুষ হিসেবে যে তালুকদারের আবির্ভাব, এই মুন্সি আক্ষরিক অর্থে সেই চরিত্রেরই। এর বিপরীত চরিত্রে অবস্থান নেকাব্বরের। নেকাব্বর আর মুন্সির এই দ্বিমুখিতা অব্যাহত থাকে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলেও। নেকাব্বর যুদ্ধের জন্য, দেশের জন্য নিজের প্রেমিকাকে হারায়। যুদ্ধে একটা পাও হারায় নেকাব্বর। দীর্ঘদিন থাকতে হয় পাগলাগারদে। পাগলাগারদ থেকে বেরিয়ে নেকাব্বরের দিন কাটে রাস্তাঘাটে; থাকতে হয় অনাহারে। লাঞ্চনা আর বঞ্চনা ছাড়া কিছুই জোটে না তার কপালে। এ রকম একটা দুঃস্বপ্নের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে মৃত্যু হয় নেকাব্বরের। নির্মাতা যার নাম দিয়েছেন নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ। খুব বড়ো না হওয়ায় এখানে নির্মলেন্দু গুণের ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ কবিতাটি পুরোপুরি তুলে ধরা খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এতে করে পাঠক নিজের মতো করেও অনেকটা বোঝাপড়া সেরে নিতে পারবে।

নেকাব্বর জানে তাঁর সম্পত্তির হিসাব চাইতে আসবে না

কেউ কোনোদিন।

এই জন্মে শুধু একবার চেয়েছিল একজন,কী কইরা

পালবা আমারে,

তোমার কী আছে কিছু তেনা?’

সন্ধ্যায় নদীর ঘাটে ফাতেমাকে জড়িয়ে দু’হাতে বুকে পিষে

বলেছিল নেকাব্বর;

‘আছে, আছে, লোহার চাককার মতো দুটা হাত,

গতরে আত্তীর বল¾আর কীডা চাস্ মাগী।’

‘তুমি বুঝি খাবা কলাগাছ?’

আজ এই গোধুলিবেলায় প্রচণ্ড ক্ষুধার জ্বালা চোখে নিয়ে

নেকাব্বর সহসা তাকালো ফিরে সেই কলাবাগানের গাঢ় অন্ধকারে।

তিরিশ বছর পরে আজ বুঝি সত্য হলো ফাতেমার মিষ্টি উপহাস।

পাকস্থলি জ্বলে ওঠে ক্ষুধার আগুনে, মনে হয় গিলে খায়

সাজানো কদলীবন;

যদি ফের ফিরে পায় এতটুকু শক্তি দুটি হাতে, যদি পায়

দাঁড়াবার মতো এতটুকু শক্তি দুটি পায়ে।

কিন্তু সে কি ফিরে পাবে ফের?

ফাতেমার মতো ফাঁকি দিয়া সময় গিয়েছে ঢের চলে।

কারা যেন ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে গেছে সব শক্তি তার।

বিনিময়ে দিয়ে গেছে ব্যাধি, জরা, দুর্বলতা, বক্ষে ক্ষয়কাশ¾

অনাদরে, অনাহারে কবরে ডুবেছে সূর্য, ফাতেমার তিরিশ বছর।

এখন কোথায় যাবে নেকাব্বর?

হয়তো গিলেছে নদী তার শেষ ভিটেখানি, কবর ফাতেমা¾

কিন্তু তার শ্রম, তার দেহবল, তার অকৃত্রিম নিষ্ঠা কারা নিলো?

আজ এই গোধুলিবেলায় এই যে আমার পৃথিবীকে মনে হলো পাপ,

মনে হলো হাবিয়া দোজখ¾কেউ কি নেবে না তার এতটুকু দায়?

মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চায় না সুদুরে চলে যেতে, নেকাব্বর ভাবে,

অজানা অচেনা স্বর্গে বুঝি মেটে বাস্তবের তৃষ্ণা কোনোদিন?

তবু যারা চায়, তারা কেন চায়? তারা কেন চায়? কেন চায়?

নেকাব্বর শুয়ে আছে জীবনের শেষ ইস্টিশনে। তার পচা বাসী শব

ঘিরে আছে সাংবাদিক দল। কেউ বলে অনাহারে, কেউ বলে অপুষ্টিতে,

কেউ বলে বার্ধক্যজনিত ব্যাধি, ¾নেকাব্বর কিছুই বলে না।

.

একটু আগেই বলা হয়েছে, নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ নিয়ে এই আলোচনার অন্যতম উপযোগিতা তৈরি করেছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তবে এই পুরস্কার প্রাপ্তির একটা বিশেষত্ব আছে। সেটি হলো, আরেকজনের কপাল পুড়ে কপাল ফেরে নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ-এর। কারণ, প্রথমে সেরা চলচ্চিত্রের মর্যাদা পেয়েছিলো মুরাদ পারভেজ পরিচালিত বৃহন্নলা। কিন্তু গল্প চুরির অভিযোগে বৃহন্নলার তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বাতিলের পর ওই তিন ক্যাটাগরিতে নতুন করে’ বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে সরকার গঠিত কমিটি। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের সেরা চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার জিতে নেয় নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ

এই হলো পুরস্কার প্রাপ্তির বিশেষত্ব। এবার দেখা যাক, কী আছে নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ-এ। এক্ষেত্রে প্রথমেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মধ্য দিয়ে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে মোট ২৮টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া হয়। এর মধ্যে সবার চোখ থাকে মূলত ‘সেরা চলচ্চিত্র’র দিকে। কারণ এই খেতাব যে চলচ্চিত্র পায় স্বাভাবিকভাবে ধরেই নেওয়া হয়, অন্য ২৭টি বিভাগেও এই চলচ্চিত্রের আধিপত্য থাকবে। ধরে নেওয়াটা প্রাসঙ্গিকও বটে। ‘সেরা চলচ্চিত্র’ তো মোটেও বায়বীয় কোনো ব্যাপার নয়। নিশ্চয় চলচ্চিত্রটি গল্পের দিক থেকে সেরা ছিলো, মুন্সিয়ানা ছিলো নির্মাতার, নারী-পুরুষ অভিনয়শিল্পী ভালো অভিনয় করেছে, সংলাপ ছিলো মনে দাগ কাটার মতো¾এ রকম আরো অনেক কিছুই অনুমান করা যায়, অনুমান করা হয়। উদাহরণ হিসেবে আগের বছরের (২০১৩) সেরা চলচ্চিত্র মৃত্তিকা মায়ার কথাই বলা যেতে পারে। সে বছর গাজী রাকায়েতের এ চলচ্চিত্রটি একাই পুরস্কার জিতে নেয় ১৭টি বিভাগে। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ নির্মাতা, শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী নারী, শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী পুরুষ, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনয়শিল্পী নারী, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনয়শিল্পী পুরুষ, শ্রেষ্ঠ খলচরিত্র, শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকসহ কারিগরি বিভাগের আটটি পুরস্কারের সবগুলোই ছিলো মৃত্তিকা মায়ার দখলে।

এবার দেখা যাক, নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ কোন কোন বিভাগে সেরা হয়েছে। সেরা চলচ্চিত্র বিভাগ ছাড়া চলচ্চিত্রটি আরো পাঁচটি বিভাগে পুরস্কার জিতেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক, শ্রেষ্ঠ সুরকার, শ্রেষ্ঠ গীতিকার, শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী (রুনা লায়লার সঙ্গে যৌথভাবে মমতাজ পেয়েছেন এ পুরস্কার, যিনি একই সঙ্গে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য) ও শ্রেষ্ঠ রূপসজ্জা। অর্থাৎ সেরা অভিনয়শিল্পী পুরুষ, সেরা অভিনয়শিল্পী নারী, সেরা পরিচালক ‘না থাকার পরও’ এবং শ্রেষ্ঠ কাহিনি, শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য কিংবা শ্রেষ্ঠ সংলাপ পুরস্কার না পাওয়া সত্ত্বেও চলচ্চিত্রটি সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পায়। এখানে মনে রাখা দরকার, নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটা চলচ্চিত্র। এবং মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে গল্প ও তার উপস্থাপন মুখ্য হওয়া স্বাভাবিক। অথচ সঙ্গীতের চারটি বিভাগ আর রূপসজ্জা ছাড়া ৩৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আর কোনো বিভাগে সেরা হতে পারেনি চলচ্চিত্রটি। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ সেরা চলচ্চিত্র হলো কীভাবে? এ প্রশ্নের ‘নিশ্চিত’ উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে দুটো বাস্তবতা মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে¾প্রথমত, এটি একটি অনুদানের চলচ্চিত্র। দ্বিতীয়ত, চলচ্চিত্রটিতে মুক্তিযুদ্ধ হাজির। এই দুই বাস্তবতার ওপর অনুমাননির্ভর একটা উত্তর দেওয়া যেতে পারে, চলচ্চিত্রের সব কলা বাদ দিয়ে গল্পের ‘বিষয়বস্তু’ হয়তো নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণকে সেরা চলচ্চিত্রের খেতাব জিততে সহায়তা করেছে।

.

এতক্ষণ বাইরে থেকে নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ নিয়ে কথা হলো। এবার চলচ্চিত্রের ভিতরে ঢুকে আলোচনা করা দরকার। এক্ষেত্রে ‘ভালো লাগা’ ও ‘খারাপ লাগা’¾এ দুটো ভাগে পরের আলোচনাটুকু করা যেতে পারে। প্রথমে ‘খারাপ লাগা’ অংশটুকু নিয়ে আলোচনা হোক।

চলচ্চিত্রটির শুরুতেই দেখানো হয়, একটি রেল স্টেশনের একপাশে নেকাব্বরের মরদেহ পড়ে আছে। অর্থাৎ, চলচ্চিত্রটির শুরুতেই দর্শককে চলচ্চিত্রের শেষে নিয়ে যাওয়া হয়। এটা গল্প বলার একটা ঢঙ; ঠিক আছে। এই ঢঙ নতুন কোনো ব্যাপারও নয়। তবে এক্ষেত্রে নির্মাতার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ থেকে যায়। গল্পের ‘পাঞ্চ লাইন’ শুরুতেই বলে ফেললে, সেই গল্পের বাকিটা শোনানোর ক্ষেত্রে দর্শক-শ্রোতার আগ্রহ ধরে রাখাটা নির্মাতার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তার ওপর মাসুদ পথিকের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ যুক্ত করেছে ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ কবিতা। কারণ অনেক দর্শকের হয়তো প্রেক্ষাগৃহে ঢোকার আগেই কবিতাটি পড়া ছিলো। আর কবিতাটি পড়া থাকার মানে হলো, দর্শক নেকাব্বরের পরিণতি সম্পর্কে আগেই অবগত। ফলে নির্মলেন্দু গুণের কাছ থেকে শুনে মাসুদ পথিকের কাছেও গল্পের শুরুতে শেষটা দেখে দর্শক একধরনের ‘অবসরে’ চলে যায়। গল্প শুরু হলেই দর্শক বুঝতে পারে এটি কোথায় গিয়ে মিলবে। তবে আগেই ‘ওয়াকিবহাল’ দর্শককে গল্প শোনানোটা কঠিন বটে; অসম্ভব নয়। মাসুদ পথিক সে পরীক্ষায় খুব একটা মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে পারেননি। চলচ্চিত্রটি শুরু হওয়ার খানিকটা পরই বোঝা যায়, গল্প যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু গল্পের সেই গন্তব্যে পৌঁছাতে এতোটা সময় লেগে যায় যে, ততক্ষণে দর্শকের মনোযোগ ঝুলে যাওয়ার উপক্রম। মনে হয় যেনো, একটি কথা বলার জন্য দর্শককে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আর সেই কথা বলার জন্য এটা-ওটা বলে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে।

বাস্তবজীবনেও দেখা যায়, একই গল্প কিংবা কৌতুক একই সংলাপে কারো মুখে রসালো লাগে; আবার কারো মুখে রসহীন। অর্থাৎ চলচ্চিত্র হোক, আর সাহিত্যই হোক, গল্প বলার ঢঙ একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এই ঢঙ যতক্ষণ না আয়ত্তে আসবে, ততক্ষণ কাহিনি যতোই রসালো আর চমকপ্রদ হোক না কেনো, গল্পকার শ্রোতাদের মন কাড়তে পারবে না। নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ দেখে স্পষ্টই বোঝা যায়, এখানে নির্মলেন্দু গুণের কবিতার সঙ্গে আরো অনেক কিছু যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু জোড়া লাগানোর দাগগুলো নির্মাতা চলচ্চিত্রের নিজস্ব শক্তি দিয়ে মুছে ফেলতে খুব একটা সফল হননি। অনেক সংলাপ, অনেক দৃশ্য মনে হয়েছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, উপলক্ষহীন। আগে সংলাপের কথাই বলা যাক। নেকাব্বর কৃষক। সেও দার্শনিকের মতো কথা বলতে পারে। কিন্তু সেই ‘ভারী’ কথার ভাষা মানানসই হলে ভালো হতো। লালন ফকিরও পুঁজিবাদের ‘আধিপত্য’ নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু তার কোনো গানে পুঁজি, পুঁজিবাদ, বুর্জোয়া, প্রলেতারিয়াত¾এসব শব্দ আসেনি। তিনি বলেছেন, ‘মানুষ লুকাইলো কোন শহরে’। নেকাব্বরকে দিয়ে নির্মাতা হয়তো ‘র রিয়ালিজম’-এর কথা বলাতে চেয়েছেন; কিন্তু সেসব কথা কৃষক নেকাব্বরের মুখে ঠিক মানানসই মনে হয়নি। যেমন, বিমলের সঙ্গে ডোবার পানিতে গোসল করার সময় কোনো ধরনের উপলক্ষ ছাড়াই নেকাব্বরকে বলতে শোনা যায়, ‘এহন আর নদীতে কুমির-টুমির নাই!’ জবাবে বিমল (কবি চরিত্রে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী) বলে, ‘না, এখন সব কুমির ডাঙায় উঠে গেছে।’

এরপর ধানের জমির পাশে বসে আরেকটি দৃশ্যে হরিদাস নামের এক কৃষককে বলতে শোনা যায়, ‘কী ভাবতাছো নেকাব্বর?’ নেকাব্বর জবাব দেন, ‘ভাবতাছি, প্রকৃতির কী খেলা! একটা কিরাও বোঝে কী কইরা বাইচা থাকন যায়। বালা কইরা বাইচতে অইলে অতীত আর ভবিষ্যতের মাঝে একটা পুল বানান লাগে। অথচ আমরা মাইনশেরা ক্ষণে ক্ষণে অতীত বুইলা যাই।’ নেকাব্বর বলতে থাকেন, ‘হরিদাস, কইতে পারবা, মানুষ কবে আগুন জ্বালান হিকসিলো?’ তখন পাশের জমি থেকে আরেক কৃষক জবাব দেয়, ‘হেইডা কি আমরা জানি?’ সঙ্গে সঙ্গে আরেক কৃষক পাল্টা নেকাব্বরকে প্রশ্ন করেন, ‘মাইনশে বলে চান্দেও গ্যাছে?’

দৃশ্যপটের পরিপ্রেক্ষিতে এসব সংলাপ আরোপিত মনে হয়। মনে হয় চলচ্চিত্রে উপযুক্ত উপলক্ষ তৈরি না করেই সংলাপগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। পুরো চলচ্চিত্রে এ রকম আরো কয়েকটি দৃশ্যে উপলক্ষহীন সংলাপ ব্যবহার করা হয়েছে।

এবার দৃশ্য কিংবা চলচ্চিত্রে ঘটনার পরম্পরার কথায় আসা যাক। ধানের জমির পাশে বসে হরিদাসের সঙ্গে নেকাব্বরের আলাপের শেষ দিকে সেখানে যান কবি বিমল। তখন হরিদাস চলে যান। কথা হতে থাকে নেকাব্বর আর বিমলের মধ্যে। বিমল প্রশ্ন করেন, ‘কী ভাবতাছেন নেকাব্বর ভাই?’ নেকাব্বর জবাব দেন, ‘না, কিছু না, কী আর ভাবুম?’ পরের সংলাপে বিমল বলেন, ‘এইবার মনে হয় ফলন বালো ওইবো না।’ নেকাব্বর বলেন, ‘হ, ঠিকই কইছো।’

এই দৃশ্যের সময় এবং এর আগে ফসলের মাঠের যেসব চিরসবুজ দৃশ্য দেখানো হয়েছে, তাতে একবারও মনে হয়নি, এবার ফসল ভালো হবে না। সে ধরনের কোনো আভাসও কোনো সংলাপে পাওয়া যায়নি। আভাস দেওয়া হয়েছে নেকাব্বর ও বিমলের কথোপকথনের পরের দৃশ্যেই। দেখা যায়, গ্রামের ছোটো-ছোটো ছেলেমেয়েরা ‘আল্লাহ ম্যাগ দে, পানি দে’ বলে বাড়ি-বাড়ি ঘুরে চাল তুলছে। এটা ঠিক, গ্রামে এই সংস্কৃতি আছে। কিন্তু সেটা কখন হয়! শীতকালে হয় না নিশ্চয়ই। অথচ নির্মাতা ‘আল্লাহ ম্যাগ দে, পানি দে’ দৃশ্যের আগে ও পরে একাধিক শটে শীতের সকাল তুলে ধরেছেন। সকালে কুয়াশা, ধানের শীষে শিশিরবিন্দু দেখিয়েছেন কয়েক বার।

আরেকটি ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। তালুকদারের সঙ্গে গ্রামের কৃষকদের বিবাদ হয়। কৃষকদের নেতৃত্বে থাকে নেকাব্বর। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে নেকাব্বরকে মারার জন্য লাঠিয়ালদের খবর দেওয়ার দায়িত্বটা আয়েনউদ্দিনের (ফাতেমার বাবা) ওপর দেয় তালুকদার। আয়েনউদ্দিন তালুকদারের লোক। বাড়ি গিয়ে আয়েনউদ্দিন মেয়ে ফাতেমার সামনে স্ত্রীকে বলেন, ‘কয়ডা বাত দে, লাইঠালগো খবর দিতে যাইতে ওইবো।’ স্ত্রী জিজ্ঞাসা করেন, ‘ক্যারে, কি ওইছে?’ আয়েনউদ্দিন জবাব দেন, ‘নেকাব্বর হারামজাদা তালুকদার সাহেবের লগে বেয়াদবি করছে। কত্ত বড়ো সাহস! এইবার বুঝবো মজাডা।’ এরপর তিন লাঠিয়াল তালুকদারের সঙ্গে দেখা করে।

এই দৃশ্যের পর নেকাব্বরের বাড়ির উঠানে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে ফাতেমা। স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে, প্রেমিকা এবার প্রেমিককে আসন্ন বিপদের কথা জানাবে। কিন্তু ফাতেমা অনেক কথা বললেও একবারও নেকাব্বরকে বলেন না যে, তাকে মারার জন্য লাঠিয়ালদের খবর দেওয়া হয়েছে। এমনকি চলচ্চিত্রের পরবর্তী অংশে লাঠিয়ালদের আর দেখা যায় না। তারা কোনো কারণ ছাড়াই চলচ্চিত্র থেকে হারিয়ে যায়। এভাবে পুরো চলচ্চিত্রের ঘটনার গাঁথুনিগুলো ভালো হয়নি। অর্থাৎ, নির্মলেন্দু গুণের কবিতার সঙ্গে কিছু ঘটনা জোড়া দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতা কিংবা কবিতার ঘটনার সঙ্গে সেগুলোর আত্মীকরণের বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি ভাবনাচিন্তা হয়নি। এছাড়া চলচ্চিত্রের শুরু থেকেই তেমন একটা গতি ছিলো না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়েনি। এককথায় বলতে গেলে, অনেক চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে ‘নাটক-নাটক’ মনে হওয়ার যে অভিযোগ, তা থেকে নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ বেরিয়ে আসতে পারেনি; ব্যবহার করতে পারেনি চলচ্চিত্র মাধ্যমটির নিজস্ব ভাষা ও উপাদানসমূহ।

.

এবার গল্পের ‘সারমর্ম’ নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। চলচ্চিত্রজুড়েই নেকাব্বর একটা লাঞ্চনা-বঞ্চনার ভিতর দিয়ে গেছে। তার পরিণতিও ‘অস্বাভাবিক’। আলোচনার স্বার্থে হতভাগা নেকাব্বরের জীবদ্দশাকে দুটো ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একটি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী জীবদ্দশা; আরেকটি যুদ্ধপরবর্তী। যুদ্ধ-পূর্ববর্তী বঞ্চনার অন্যতম মূল হোতা তালুকদার। আর এই তালুকদার কেবল কয়েক বিঘা জমির মালিক নয়; এই তালুকদার এক শোষণের প্রতীক, একটা ঐতিহাসিক শোষণমূলক ব্যবস্থার বিবর্তিত রূপের প্রতীক। দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে শত্রুপক্ষে এই প্রতীকও ছিলো। এবং চোখের দেখায় মুক্তিযুদ্ধে এই শত্রু নির্মূল না হলেও পরাজিত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের পর ভাগ্যের নতুন বিড়ম্বনায় পড়ে নেকাব্বর। যুদ্ধে একটা পা হারিয়ে, মানসিক বোধ হারিয়ে পাগলাগারদে থাকতে হয় তাকে। পাগলাগারদ থেকে বেরিয়ে দু-মুঠো খাবার জোটে না তার কপালে। মেলে না চিকিৎসা; বাসস্থান। মানসম্মান বা সামাজিক মর্যাদা তো দূরের কথা। নেকাব্বরের এই পরিণতি নিশ্চিতভাবেই ঐশ্বরিক কোনো ব্যাপার নয়; এর দায় কাউকে না কাউকে নিতেই হবে। কিন্তু নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ-এ নেকাব্বরের যুদ্ধ-পরবর্তী জীবদ্দশার জন্য দায়ী কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। দায়ী কাউকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাও চোখে পড়ে না। নির্মলেন্দু গুণ কবিতায় অভিযোগ না হোক, অন্তত অনুযোগের কণ্ঠে দায়ী খোঁজার চেষ্টা করে বলেছেন, ‘কারা যেন ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে গেছে সব শক্তি তার। বিনিময়ে দিয়ে গেছে ব্যাধি, জরা, দুর্বলতা, বক্ষে ক্ষয়কাশ’। কিন্তু নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ-এ সেই অনুযোগও তোলা হয়নি কারো বিরুদ্ধে। নিয়তি ছাড়া দোষ দেওয়ার জন্য আর কাউকে রাখা হয়নি নেকাব্বরের জন্য। পাশাপাশি নেকাব্বরের যুদ্ধে যাওয়ার যে প্রেক্ষাপট চলচ্চিত্রে দেখানো হয়, তা নির্মলেন্দু গুণের নেকাব্বরের মাথাকে নিচু করেছে, উঁচু করেনি মোটেও। পুরো চলচ্চিত্রে নেকাব্বরের দেশপ্রেম ফুটে উঠলেও তার যুদ্ধে যাওয়ার উপলক্ষ ছিলো পুলিশ। জমিদারকে মারধরের পর পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে রাতের আধারে কবি বিমলের সঙ্গে ঢাকায় পাড়ি জমান নেকাব্বর। সেই উপলক্ষে যুদ্ধে অংশ নেন তিনি।

.

এবার ‘ভালো লাগা’ অংশটুকু আলোচনার মধ্য দিয়ে আলোচনা শেষ করা যেতে পারে। সে রোমান্টিক চলচ্চিত্রে হোক, আর মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রেই হোক; বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যের উপস্থিতি শুরু থেকেই ছিলো, এখনো আছে। এর আগে হাঙর নদী গ্রেনেড, আগুনের পরশমনি, একাত্তরের যীশু’র মতো মুক্তিযুদ্ধের অনেক চলচ্চিত্রই উপন্যাস তথা সাহিত্যের ওপর নির্ভর করে নির্মিত হয়েছে। সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র করা নিয়ে অন্যতম সমালোচনা হলো বর্তমানের অনুপস্থিতি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, উপন্যাসটি যে সময়টি ধরে লেখা, নির্মাতা কেবল সেই সময়টুকুই ধরার চেষ্টা করেন। বর্তমানের বাস্তবতা কিংবা বর্তমানে সেই উপন্যাসের প্রাসঙ্গিকতা চলচ্চিত্রে থাকে না। কয়েক দশক আগে ঋত্বিক ঘটক এ ধরনের অভিযোগ তুলে বলে গেছেন,

... সিরিয়াস চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের কাজের জন্য মহৎ কিছু খুঁজতে লাগলেন এবং তা করতে গিয়ে তাঁরা পূর্ববর্তীকালের মহান লেখকদের কাছে ফিরে গেলেন। ফলে তাঁদের কাজেও সমকাল সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত থাকল। কিন্তু চলচ্চিত্র কি তার চারপাশ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থেকে বিকশিত হতে পারে? তা কোনো কালে হয়নি, এটা সম্ভবই না।

সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র করলেও মাসুদ পথিক ঋত্বিক ঘটকের এ সমালোচনা থেকে রেহাই পেয়ে গেছেন। তিনি অতীতে গেছেন; কিন্তু বর্তমান ধরে। তিনি অতীত ভোলেননি, কারণ নেকাব্বরের মতে ‘বালা কইরা বাইচতে অইলে অতীত আর ভবিষ্যতের মাঝে একটা পুল বানান লাগে।’ এ দিক থেকে নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ প্রশংসার দাবি রাখে।

পরিশেষে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নিয়ে একটা আক্ষেপের কথা রয়েছে। রয়েছে একটা প্রশ্নও। আক্ষেপটা হলো, গত দুই-তিন দশকে যতগুলো চলচ্চিত্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এক মনপুরা ছাড়া আর কোনো চলচ্চিত্র ব্যবসায়িক সফলতা পায়নি বললেই চলে। আর প্রশ্নটা হলো, চলচ্চিত্র বুঝনেওয়ালা এতোগুলো লোকের সমন্বয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য গঠিত জুরি বোর্ড যে চলচ্চিত্রকে সেরা আখ্যা দেয়, সেই চলচ্চিত্রে কেনো দর্শক হয় না? হলিউড-বলিউডের বেশিরভাগ পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রই ব্যবসায়িকভাবে সফল। কিন্তু আমাদের এখানে সফলতা আসে না। এই নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ নাকি মাত্র নয়টি প্রেক্ষাগৃহে চলেছে। তাহলে সমস্যা কি মানুষের রুচির ঠাটে? নাকি আমাদের চলচ্চিত্র আমাদের দর্শকের ঠাট বুঝতে পারছে না? অন্য কোনো লেখায় এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা হবে।

 

লেখক : আসাদ লাবলু, কালের কণ্ঠ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

asadmcru@gmail.com

তথ্যসূত্র ও টীকা

১. https://bangla.bdnews24.com/glity/article1138233.bdnews; retrieved on 06.09.2016

২. চলচ্চিত্রের শুরুতে টাইটেল কার্ডে ভেসে ওঠে একটি ‘র’ রিয়ালিজম তৎপরতা।

৩. ঋত্বিক কুমার ঘটকের ‘বেঙ্গলি সিনেমা; লিটারেরি ইনফ্লুয়েন্স’ প্রবন্ধের ভাষান্তর থেকে নেওয়া। জোনায়েদ রশিদের ভাষান্তর করা প্রবন্ধটি https://www.istishon.com/?q=node/ ১৩০৮৪ ওয়েবসাইটে আছে।

৪.https://bn.wikipedia.org/wiki/ নেকাব্বরের¾মহাপ্রয়াণ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন