Magic Lanthon

               

মামুন অর রশিদ

প্রকাশিত ২৪ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দেখা অতঃপর লেখা

'অনিল বাগচীর একদিন' : সাহসী হয়ে ওঠার গল্প

মামুন অর রশিদ

 

প্রাসঙ্গিক কথন

চলচ্চিত্র শক্তিশালী এক বিনোদন মাধ্যম। চলচ্চিত্রের বার্তা মানুষের ওপর অন্য মাধ্যমের চেয়ে একটু বেশিই প্রভাব ফেলে। কারণ চলচ্চিত্র দৃশ্য তথা ভিজ্যুয়াল বিশ্বের একটা সাযুজ্যতা বা সমন্বয় থাকায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব সহজে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। যা আর কোনো শিল্পমাধ্যম দ্বারা এতো নিখুঁতভাবে সম্ভব নয়। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী চলচ্চিত্রগুলো জনগণের মধ্যে বেশ সাড়া জাগাতে পারে। সংস্কৃতির সঙ্গে চলচ্চিত্রের রয়েছে এক গভীর সম্পর্ক। একেক সংস্কৃতির উপাদান একেক রকমের, ফলে বিশ্বে নিজ নিজ সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করছে সেই সব দেশের চলচ্চিত্র। একটি চলচ্চিত্রে থাকে নানা অনুষঙ্গ। যা সেই চলচ্চিত্রকে পূর্ণতা দেয়।

চলচ্চিত্রের প্রাণ হলো চিত্রনাট্য। একটি সহজ, বাস্তবিক, সরল, সুন্দর, শিক্ষামূলক গল্পই চলচ্চিত্রকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারে। এছাড়া ভালো অভিনয়, সম্পাদনা, প্রেক্ষাপট, সঙ্গীত, চিত্রায়ণও জনপ্রিয় করে তুলতে পারে কোনো চলচ্চিত্রকে। যখন কোনো চলচ্চিত্রে সবগুলো অনুষঙ্গ সমানভাবে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে কাজ করে, তখন সেই চলচ্চিত্র পরিপূর্ণতা লাভ করে। অনেক সময় দুর্বল চিত্রনাট্য হলেও ভালো সম্পাদনা এবং সঙ্গীতের কারণে কোনো কোনো চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হয়। তবে ব্যবসাসফল আর দর্শক সমাদৃত হওয়া দুটিই ভিন্ন জিনিস। বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এমন বহু চলচ্চিত্র ব্যবসায়িক দিক দিয়ে সফল না হলেও ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে এমনই ঘটনা লক্ষ করা যায় মোরশেদুল ইসলামের অনিল বাগচীর একদিন নিয়ে। চলচ্চিত্রটির মূল উপজীব্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। এটি ব্যবসায়িকভাবে সফল না হলেও বাপজানের বায়োস্কোপ-এর সঙ্গে যৌথভাবে সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৫ অর্জন করেছে।

প্রাক-আলোচনা

পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক নবারুণ ভট্টাচার্যের ভাষায়,

দিশেহারা মানুষকে নেশায় বুঁদ করে রাখার জন্য যেমন মদের দোকান দরকার, সে রকম টেলিভিশন সিরিয়াল দরকার, নোংরা প্রোগ্রাম দরকার। এগুলো অঢেল সাপ্লাই বা বিশাল বিতরণের ব্যবস্থা দরকার। মানুষ যদি চুপ করে যায়, মানুষ যদি একটা ধোঁয়ার মধ্যে থাকে, সে কোনো প্রশ্ন করবে না।

জনসাধারণের ওপর এই হলো গণমাধ্যমের প্রভাব। সামাজিকীকরণ ও দর্শক রুচি তৈরিতে যা শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। আগেই বলেছি, গণমাধ্যমের শক্তিশালী এক উপাদানের নাম চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, জাঁকজমক আর জৌলুস থাকলে তা অনেক ক্ষেত্রেই জনপ্রিয়তা পায়। সেই সঙ্গে মূলধারার গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবিরাম প্রচারের মাধ্যমেও দর্শককে প্রলুব্ধ করা হয় এমন চলচ্চিত্র দেখার জন্য। এ ধরনের জৌলুসপূর্ণ আর বিনোদনে ভরপুর চলচ্চিত্র দেখলে মনে হয়, সমাজে কোনো সমস্যা নেই। অথচ প্রতিদিনের সংবাদপত্র জানান দেয়, বিভিন্ন সমস্যা কতো প্রকট হয়ে উঠছে। বিনোদনধর্মী এসব চলচ্চিত্র মানুষকে অগভীর আনন্দে বুঁদ করে রেখে সেসব সমস্যা ঢেকে রাখছে।

১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ৩ আগস্ট আব্দুল জব্বার খান পরিচালিত মুখ ও মুখোশ নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। গত ৪৬ বছরে প্রতিবছরই মুক্তি পেয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র। আর এসব চলচ্চিত্রের অধিকাংশই নির্মিত হয়েছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। সমাজের নানা সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার মতো চলচ্চিত্র খুবই কম নির্মিত হয়েছে। কাহিনি আর নির্মাণশৈলীর দিক থেকে এদেশের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই আটকে আছে গতানুগতিক গণ্ডিতে। বাণিজ্যিক দিককে গুরুত্ব দিয়ে নির্মিত চাকচিক্যময় এসব চলচ্চিত্র হয়তো ব্যবসাসফল হতে পারে; কিন্তু বিশ্ব চলচ্চিত্র পরিসরে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব নয়। চলচ্চিত্রের শৈল্পিক মান যথেষ্ট আকর্ষণীয় না হলে সেই চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বীকৃতি এবং প্রশস্তি পাবে না।

ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালি সময় বলা হয় ৮০ এবং ৯০ দশককে। তবে সেই সোনালি সময়েও যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে এমন নয়। এমন কী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো অর্জন মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরেও খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। যদিও আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩), হুমায়ূন আহমেদের আগুনের পরশমণি (১৯৯৪) ও শ্যামল ছায়া (২০০৪), তানভীর মোকোম্মেলের নদীর নাম মধুমতি (১৯৯৫), চাষী নজরুল ইসলামের হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭), তারেক মাসুদের মাটির ময়না (২০০২), তৌকির আহমেদের জয়যাত্রা (২০০৪), রুবাইয়াত হোসেনের মেহেরজান (২০১১), নাসির উদ্দিন ইউসুফের একাত্তরের যীশু (১৯৯৩), গেরিলা (২০১১) খানিকটা ব্যতিক্রম। সেই ধারাবাহিকতায় প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘অনিল বাগচীর একদিন’ অবলম্বনে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনিল বাগচীর একদিন। চলচ্চিত্রটিতে মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক রিপ্রেজেন্টেশন তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে এই প্রবন্ধে।

তাত্ত্বিক কাঠামো

চলচ্চিত্র সমালোচক ও তাত্ত্বিকরাও দর্শক, কিন্তু তাদের চলচ্চিত্র দেখার ধরন সাধারণ দর্শকের চেয়ে ভিন্ন। কারণ তারা এক বা একাধিক তাত্ত্বি¡ক পরিকাঠামোর আওতায় চলচ্চিত্রটি পাঠ করেন। তাদের পাঠ যে একে অন্যের সঙ্গে মিলে যাবে তেমনও নয়। একই চলচ্চিত্রের ভিন্ন ভিন্ন পাঠ হতে পারে। এটা অনিল বাগচীর একদিন-এর বেলায়ও প্রযোজ্য। অধ্যাপক কেলি অলিভার চলচ্চিত্র পাঠের সময় বিশেষ তিনটি বিষয় আমলে নেওয়ার প্রস্তাব করেন। ক. নির্মাতা কোন ধরনের ভাবাদর্শগত কাঠামো (ideological structure) ব্যবহার করছেন; ভাবাদর্শের রূপায়ণ কী ধরনের কাহিনি দ্বারা সম্পন্ন করেছেন। খ. কাহিনিস্থ চরিত্রগুলোর মানসিকতা কী রকম; কী ধরনের নির্মাণরীতি-আঙ্গিক ব্যবহৃত হয়েছে। গ. চলচ্চিত্রটি প্রাধান্য বিস্তারকারী (dominant ideology) ভাবাদর্শে স্থিত অপাদর্শকে আক্রমণ করছে কি না, না করে থাকলে কাজটি কীভাবে করা যেতে পারতো।

দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক কেলি আরো বলেন,

একটি চলচ্চিত্র কখনই তার নিজের শরীরে বিরাজ করে না। নির্মিত চলচ্চিত্র যখন ব্যাখ্যা করা হয় কেবল তখনই চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে। সাধারণ দর্শক চলচ্চিত্রটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ না করলেও এটি দেখার সময় চলচ্চিত্রটিতে যা যা ঘটে তার একটা নিজস্ব ব্যাখ্যা দাঁড় করান। তার ব্যাখ্যা থেকেই চলচ্চিত্রটি জন্ম নেয়। তিনি দ্বিতীয়বার চলচ্চিত্রটি প্রত্যক্ষ করতে পারেন এবং দ্বিতীয়বার প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা প্রথমবারের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে; দ্বিতীয়বার দেখার অভিজ্ঞতা দ্বিতীয় আরেকটি চলচ্চিত্রের জন্ম দিতে পারে। আবার চলচ্চিত্র আলোচক ও চলচ্চিত্রতাত্ত্বিকরা একই চলচ্চিত্র ব্যাখ্যা করে চলচ্চিত্রটির শরীরে বিদ্যমান নানা উপাদান উদঘাটন করে এর ভিন্ন একটি পাঠ সাধারণ দর্শকদের জন্য উপস্থিত করতে পারেন। তাদের আলোচনা চলচ্চিত্র অনুধাবন ও আস্বাদানের চলিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে।

একটি গবেষণার ব্যাপকতাও গভীরতা এনে দিতে পারে লাগসই তত্ত্ব এবং একে প্রতিষ্ঠাযোগ্য করে তুলতে পারে সুনির্বাচিত গবেষণা পদ্ধতি। চলচ্চিত্রটিকে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাত্ত্বিকভিত্তি হিসেবে স্টুয়ার্ট হল-এর রিপ্রেজেন্টেশন তত্ত্বকে বেছে নেওয়া হয়েছে। রিপ্রেজেন্টেশন হলো, ভাষাকে ব্যবহার করে অর্থবোধক কিছু বলা বা তৈরি করা। এর মাধ্যমে বিশ্বকে মানুষের কাছে অর্থপূর্ণভাবে উপস্থাপনও করা হয়। ভাষার মাধ্যমে অর্থের রিপ্রেজেন্টেশন কীভাবে হয়ে থাকে তা ব্যাখার জন্য তিন ধরনের অ্যাপ্রোচ রয়েছে১. প্রতিফলনকারী অ্যাপ্রোচ (Reflection) ২. স্বেচ্ছাকৃত অ্যাপ্রোচ (Intentional) ৩. নির্মাণমূলক অ্যাপ্রোচ (Constructionist)। এই প্রবন্ধ স্টুয়ার্ট হলের নির্মাণমূলক অ্যাপ্রোচের আলোকে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। নির্মাণমূলক অ্যাপ্রোচ বলতে বুঝানো হয় বস্তু বা বিষয়ের নিজস্ব কোনো অর্থ থাকে না, রিপ্রেজেন্টেশন পদ্ধতির ধারণা ও চিহ্নের আলোকে বস্তু বা বিষয়ের অর্থ নির্মাণ করা হয়।

অনিল বাগচীর একদিন : সাদামাটা চোখে দর্শক যা দেখে

হুমায়ূন আহমেদের ৬৩ পৃষ্ঠার ‘অনিল বাগচীর একদিন’ উপন্যাসকে মোরশেদুল ইসলাম একশো ২০ মিনিটে সেলুলয়েডের ফিতায় দৃশ্যে-কাব্যে বন্দি করেছেন। চলচ্চিত্রটির গল্প এগিয়েছে ২৬ বছরের এক যুবককে কেন্দ্র করে। আজন্ম ভীতু, দুঃস্বপ্নে আচ্ছন্ন যুবক অনিল বাগচী। ঢাকায় একটি ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কাজের সুবাদে তিনি মেসে থাকেন। বাবা স্কুলশিক্ষক ও একমাত্র বড়ো বোন অতসী থাকেন গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের রূপেশ্বরে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়; একদিন খুব ভোরে অনিল একটা চিঠি পান। চিঠিটা লিখেছেন রূপেশ্বর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি জানান, তার (অনিলের) বাবাকে মিলিটারিরা হত্যা করেছে। বোন এখন তার (হেডমাস্টারের) বাসায়। অনিল সিদ্ধান্ত নেন, গ্রামে গিয়ে বোনের দায়িত্ব নেবেন। এরপর তিনি বাসে করে রওনা দেন গ্রামের উদ্দেশ্যে। বাসে আলাপ হয় সহযাত্রী আইয়ুব আলীর সঙ্গে। অনিলের সব ঘটনা শুনে তাকে আপন করে নেন আইয়ুব। রাস্তায় মিলিটারিরা বাস থামালে জীবন বাঁচানোর তাগিদে অনিলকে মুসলিম পরিচয় দিতে অনুরোধ করেন আইয়ুব। কিন্তু বাবার দেওয়া শিক্ষার ব্যত্যয় ঘটাতে চান না অনিল। মিলিটারিরা জিজ্ঞেস করলে অনিল বাগচী বলেই নিজের পরিচয় দেন। ভীতু যুবকের কাছে মৃত্যুও যেনো হাস্যকর হয়ে ওঠে। এভাবেই অনিলের একদিনের বাসযাত্রা আর কিছু ফ্ল্যাশব্যাক দিয়ে শেষ হয় অনিল বাগচীর একদিন

চলচ্চিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শন হয় ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে, শ্রীলঙ্কার কলম্বো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। একই বছরের ১১ ডিসেম্বর এটি বাংলাদেশে মুক্তি পায়। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ১৮তম মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে অনিল বাগচীর একদিন দুটি বিভাগে পুরস্কৃত হয়।

পটভূমি যুদ্ধ কিন্তু গল্পটি মানবিক

অনিল বাগচীর একদিন১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত হলেও এতে নেই কোনো যুদ্ধের ঝনঝনানি। বরং রয়েছে মানবিক গল্প ও মূল্যবোধ। সেদিক থেকে মোরশেদুল ইসলামের গল্প নির্বাচন সঠিক হলেও চলচ্চিত্রিক মানের বিষয়টি প্রশ্ন সাপেক্ষ রয়ে গেছে। চলচ্চিত্রের প্রারম্ভিক দৃশ্যে অনিলের দুঃস্বপ্ন দেখানোটা দুর্দান্ত। সাধারণত মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রগুলোতে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকবাহিনীর যুদ্ধ এবং তাদের নানা সহিংসতাধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, অত্যাচারের দৃশ্য। কিন্তু এই চলচ্চিত্রে তার অবতারণা হয়নি। সেদিক থেকে চলচ্চিত্রটি কিছুটা হলেও ভিন্নতা পেয়েছে। চলচ্চিত্রটির মানবিকতার একটি বড়ো দিক হলো এটির অসাম্প্রদায়িক চিত্র। বাসের মধ্যে আলাপের মাধ্যমে আইয়ুব আলী যখন জানতে পারেন অনিল হিন্দু, তখন তিনি অনিলকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘আপনি হিন্দু হয়ে বাসে করে যাত্রা দিলেন আপনার সাহস তো কম নয়’। এরপর তিনি অনিলকে আপন করে নেন এবং মিলিটারিদের কাছে তার শ্যালক বলে পরিচয় দিয়ে নিজের নাম মোহম্মাদ মহসিন বলার অনুরোধ করেন। যাতে করে মিলিটারি অনিলকে মুসলমান জেনে ছেড়ে দেয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু-মুসলিম অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য উদাহরণ এটি। তবে বাবার দেওয়া শিক্ষা, সদা সত্য বলার আদর্শ ধারণ করায় মিলিটারির কাছে হিন্দু বলেই পরিচয় দেন অনিল। অনিল তার পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইয়ুব মিলিটারিদের বলে ওঠেন অনিল তার ডাকনাম, আসল নাম মোহাম্মাদ মহসিন। ততক্ষণে অবশ্য বাঙালি দোভাষী মিলিটারিদের জানান, অনিল বাগচী হিন্দুর নাম।

মিলিটারির হাত থেকে অনিলের শেষ রক্ষা না হলে তাকে আশ্বস্ত করে আইয়ুব জানান, অনিলের বোনের দায়িত্ব তিনি নেবেন। যুদ্ধের মতো ভয়াবহ অবস্থায় বিপরীত ধর্মের কারো প্রতি এমন সহানুভূতি চলচ্চিত্রটির মানবিকতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। এছাড়া পুরো চলচ্চিত্রে ধর্ষণের কোনো দৃশ্য দেখানো হয়নি। যদিও অনিলের বড়োকর্তার সঙ্গে পাকিস্তানি কর্নেল ইলাহির কথোপকথন থেকে দর্শক জানতে পারে সারাদেশে ব্যাপকহারে ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি নারীরাও ধর্ষিত হচ্ছে। ফলে চলচ্চিত্রের পটভূমি যুদ্ধ হলে গল্পটি হয়ে উঠেছে মানবিক।

অস্তিত্ব সঙ্কটের চলচ্চিত্রিক প্রকাশ

চলচ্চিত্রটিতে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহে শুধু অনিলের ব্যক্তি অস্তিত্বের টানাপড়েন নয়, তার অভিজ্ঞতার চিত্রে ১৯৪৭-এর দেশভাগ, উত্তর-পূর্ববঙ্গের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অস্তিত্বের সঙ্কটও খুঁজে পাওয়া যায়। পাশাপাশি দেখা যায়, যুদ্ধকালীন সঙ্কটের সব চিত্র। যুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষী মনোভাব যে চরম মাত্রায় উঠেছিলো সেটারও দেখা মিলে চলচ্চিত্রে। একজন হিন্দু যুবকের অস্তিত্বের টানাপড়েন এবং তার বিয়োগান্ত পরিণতির এক চমৎকার চলচ্চিত্রিক প্রকাশ এটি। এছাড়াও যুদ্ধের সময় যে মানবিক সঙ্কট হয়েছিলো, অনিলের চাচা নিজের বাড়িসহ জায়গা-জমি বেচে দিয়ে শরণার্থী হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার ঘটনা যেনো তারই প্রতিচ্ছবিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

অস্তিত্বের সঙ্কট বনাম ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব

সকালে অফিসে যাওয়ার মুহূর্তে পাকবাহিনী বেষ্টিত বিদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন অনিল। ওই মুহূর্তে অন্তর্জগতে বাবার কণ্ঠের অনুরণন তার চেতনাকে সাহসী করে তোলে। অস্তিত্বের চরম সঙ্কট মুহূর্তে ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বে আপাত ভীতু অনিল হয়ে ওঠেন চরম সাহসী। অবরুদ্ধ ঢাকার পরিস্থিতি সাংবাদিককে খারাপ বলতেও তিনি দ্বিধা করেন না। এমনকি বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে অফিসের বড়োকর্তা তার পাশটি দিয়ে সহযোগিতা করতে চান, সেই সুযোগও প্রত্যাখ্যান করেন অনিল। আবার মিলিটারি যখন সবাইকে বাস থেকে নামিয়ে নাম জিজ্ঞাসা করে, যেখানে জীবন সঙ্কটাপন্ন; তার পরও সত্যি পরিচয় দিতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হন না অনিল।

কেবল উপন্যাসেরই চিত্রিক বয়ান

হুমায়ূন আহমেদ তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলতেন, এমনকি লিখেছেনও যে, প্রকাশকের চাপে, টাকার জন্য তিনি অনেক হাবিজাবি লিখেছেন। আহমেদ ছফা তার এক লেখায় এজন্য দুঃখ প্রকাশও করেছিলেন। নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামের চলচ্চিত্রগুলোর একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে, সেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রটাকে তিনি একটু অন্যরকমভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। এতে করে মূল চরিত্রটিকে ছাপিয়ে অন্য কোনো চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না। কিন্তু অনিল বাগচীর একদিন-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে অনিল নাম ভূমিকায় আরেফ সৈয়দ থাকলেও আইয়ুব আলী চরিত্রে গাজী রাকায়েত অনেক ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় চরিত্রকে ছাপিয়ে গেছেন। ফলে কখনো কখনো তা খানিক বেমানানই লেগেছে। আবার হুমায়ূন ‘অনিল বাগচীর একদিন’ উপন্যাসটি যেভাবে শেষ করেছেন মোরশেদুল ইসলাম চলচ্চিত্রে ঠিক একই রকম সমাপ্তি টেনেছেন। ফলে যা হয় আর কি, চলচ্চিত্রটি হুবহু উপন্যাসেরই চিত্রিক বয়ান হয়ে উঠেছে।

অভিনয়, দৃশ্য ধারণ ও সঙ্গীত

চলচ্চিত্রে অনিল বাগচীর চরিত্রটি রূপায়ণ করেছেন আরেফ সৈয়দ। এ ধরনের চরিত্র করা যেকোনো অভিনয়শিল্পীর জন্য চ্যালেঞ্জিং। আরেফ সেই চ্যালেঞ্জটা নিয়েছেন এবং সফলও হয়েছেন। আরেফ খুব সহজেই চরিত্রটির মধ্যে যে একঘেয়েমি তা থেকে সরে আসতে পেরেছেন। ভীত হওয়ার দৃশ্যগুলোতে তিনি মানানসই অভিনয়ই করেছেন। রাতে স্বপ্নের মধ্যে যখন মিলিটারি তার বাসায় এসে দরজায় টোকা দেয়, তখন অনিল জিজ্ঞাসা করেন কে? মিলিটারিরা যখন দরজা খুলে বিকট হাসি দেয়, অনিল ভয়ে খাটের উপর উঠে দলামলা হয়ে বসে থাকেন। বাবা সুরেশ বাগচীর ছবি সামনে ভেসে ওঠে, যখন সত্য বলার জন্য তিনি অনিলের প্রশংসা করতেন; তখন অনিলের উৎফুল্ল হওয়ার দৃশ্যটিও সুন্দর। আবার বাবার নিহতের সংবাদ শুনে গ্রামে যাওয়ার সময় বিষণ্ন চিন্তায় মগ্ন হওয়ার দৃশ্যেগুলোতে ভালো দক্ষতা দেখিয়েছেন অনিলের ভূমিকায় আরেফ।

চলচ্চিত্রে অনিলের বাসে করে গ্রামে যাওয়ার দৃশ্যে হালকা কাঁচা-পাকা গোঁফের, চশমা পরা আইয়ুবের আগমন। অল্প সময়ের আলাপে খুব সহজেই তাকে আপন করে নেন আইয়ুব। সিগারেটের গন্ধে স্ত্রীর বমি আসছে শুনে ছেলেকে উদ্দেশ্য করে আইয়ুবের স্বতঃস্ফূর্ত ভাষ্য, তোর মাকে বল তিনি তো আর জেনারেল টিক্কা খান নন যে, তার হুকুমে সবকিছু চলবে; আবার মিলিটারি যখন বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে ধর্মীয় পরিচয় জানার জন্য একজনকে প্যান্ট খুলতে বললে আইয়ুবের চিৎকার করে বলা, প্যান্ট যদি খুলতে হয় তাহলে তোর মুখে পেসাব করে দিব আল্লাহর কসম; অনিলকে বাঁচানোর চেষ্টা করা, তাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিসবমিলে গাজী রাকায়েতের অভিনয় ছিলো অসাধারণ। অন্যদিকে অনিলের বাবা সুরেশ বাগচী চরিত্রে তৌফিক ইমন একঘেয়েভাব কাটানোর ক্ষেত্রে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারেননি। তৌফিক চরিত্রকে খুব একটা ধারণ করতে পেরেছেন বলে মনে হয়নি, তাই হয়তো অভিনয়টা আরোপিত মনে হয়েছে। 

নির্মাতা মোরশেদুল প্রথমবারের মতো এই চলচ্চিত্রে গ্রিন স্ক্রিন ক্রোমার ব্যবহার করেন। গ্রিন স্ক্রিন ক্রোমার হলো, দৃশ্য ধারণের সময় অবজেক্ট বা বস্তুর ব্যাকগ্রাউন্ডে সম্পূর্ণভাবে সবুজ পর্দার আবরণ ব্যবহার করা। এতে করে দৃশ্য সম্পাদনার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে কাঙ্ক্ষিত ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রিন স্ক্রিন ক্রোমার ব্যবহারে দৃশ্য ধারণ করা হয়। ফলে অবজেক্ট বা বস্তুকে দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায় সহজেই। অনিল বাগচীর একদিন-এ গ্রিন স্ক্রিন ক্রোমারের সফল ব্যবহার হয়েছে বলে মনে হয়। চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে জোৎস্না রাতে পুকুর পাড়ের দৃশ্য, শেষের দিকে নদীর পারের দৃশ্যগুলো মনে রাখার মতো। এছাড়া অনিলের ভয় পাওয়ার দৃশ্য, ভোরের কোরআন তেলাওয়াত, মেঘলা আকাশের দিনে বাস থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী, গ্রামের বাড়ির ভিতরের দৃশ্যগুলোও চোখে লাগার মতো। আর চলচ্চিত্রের একেবারে শেষ দিকে অনিলের চোখ বন্ধ করে থাকাটা দর্শকের মনে অনেকক্ষণ পর্যন্ত লেগে থাকে। তাছাড়া চলচ্চিত্রে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ঢাকা বোঝানোর জন্য মুড়ির টিন বাস, চায়ের দোকানের দেয়ালে টাকা আনা পাই চলচ্চিত্রের পোস্টার নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

সঙ্গীতের ব্যবহার দৃশ্যের বিমূর্ততা সৃষ্টিতে সবসময়ই আবেদন রাখে। অনিলের বোন অতসীর নিঃসঙ্গতার অনুভূতি প্রকাশ হয়েছে সঙ্গীতে। যদিও সে মুহূর্তে পড়া যায় না, অতসীর একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গ মনের অভিব্যক্তির ভাষা।  অতসীর এ নিঃসঙ্গতার কারণ জানা যায় শেষ দৃশ্যে আইয়ুবকে বলা অনিলের একটি কথা থেকেতার বোন যেনো পছন্দের ছেলেটিকে বিয়ে করে। যদিও দর্শক জানতে পারে না ছেলেটি কে। কেবল সাদা-কালো দৃশ্যের ভাষা জানান দেয়, বিপরীত কোনো পাত্রের কথা। এছাড়া গানের দৃশ্যায়নের লোকেশন নির্বাচনেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন মোরশেদুল।

পরিশেষ

মুক্তিযুদ্ধ ছিলো এ দেশের মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। এ যুদ্ধ দেশটির স্বকীয়তার যুদ্ধ। যার ফল আজকের বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ড। এই মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে নানান ফ্রেমে তৈরি চলচ্চিত্র ও নাটকের প্রতি সঙ্গত কারণেই দর্শকের রয়েছে আবেগ মাখানো ভালোবাসার অনুভূতি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া নানা কাহিনি নিয়ে গড়ে ওঠা চিত্রনাট্যে কোনোটিতে প্রত্যক্ষ, কোনোটিতে পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধকে দেখানো হয়েছে। অনিল বাগচীর একদিন (২০১৬) মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মোরশেদুল ইসলামের তৃতীয় চলচ্চিত্র। এর আগে তিনি খেলাঘর (২০০৬) ও আমার বন্ধু রাশেদ (২০১১) নামে দুটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র করেছেন। অনিল বাগচীর একদিন-এ মোরশেদুল মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর অনিশ্চয়তা, মানবিকতা, স্বপ্ন, সম্প্রীতি প্রভৃতি অনুষঙ্গকে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। রঙ্গিন এবং সাদা-কালো এই দুই ভাগে বিভক্ত এর ঘটনাপ্রবাহ। ফ্লাশব্যাকগুলো রঙ্গিন আর বর্তমানটা সাদা-কালো। সাধারণত চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে উল্টোটাই দেখা যায়। কিন্তু অনিল বাগচীর একদিন-এ ফ্ল্যাশব্যাকের সিক্যুয়েন্সগুলো রঙিন, পুরোটাই মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগের ঘটনা দিয়ে সাজানো। এটি চলচ্চিত্রভাষায় একেবারে নতুন সংযোজন।

সবমিলিয়ে অনিল বাগচীর একদিন-এ ক্যামেরার কাজ, লাইটিং, চরিত্রায়ণ, সংলাপ, আবহসঙ্গীত ও সম্পাদনা সবকিছুর চমৎকার এক সাযুজ্যপূর্ণ সঙ্গতি চোখে পড়ে। বিশেষ করে ক্যামেরার ধীরগতির সঙ্গে গল্পের টেনশন একটা দ্বান্দ্বিক অবস্থা তৈরিতে দারুণভাবে কাজ করেছে।

লেখক : মামুন অর রশিদ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন-এ পড়ান।

mamun.rashid20@gmail.com

তথ্যসূত্র ও টীকা

১. http://www.thedailystar.net/bangla/anandadhara/24/08/; retrieved on 10.11.2017   

২. জুনাইদ, নাদির (২০১৫ : ২৫); বাংলা রাজনৈতিক চলচ্চিত্র : সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের প্রতিবাদী ছবি; বিডিনিউজ পাবলিশিং লিমিটেড, ঢাকা।

৩. জুনাইদ, নাদির (২০১৪ : ৩৩); দশটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র : বক্তব্য ও নির্মাণশৈলী; জনান্তিক প্রকাশনী, ঢাকা।

৪. আউয়াল, সাজেদুল; ‘পিপড়াবিদ্যা’; বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নাল, সংখ্যা ৮, জুন ২০১৫, ঢাকা, পৃ. ৭৫।

৫. প্রাগুক্ত; আউয়াল (২০১৪ : ৭৫)।

৬. হল, স্টুয়ার্ট; ‘রেপ্রিজেন্টেশন’; অনুবাদ : ফাহমিদুল হক; যোগাযোগ, সংখ্যা ৪, ২০০৭, ঢাকা, পৃ. ১১২।

৭. https://bangla.bdnews24.com/glity/article1078386; retrieved on 12.11.2017

৮.http://m.banglatribune.com/entertainment/news/62203; retrieved on 12.11.2017

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন