অধরা মাধুরী
প্রকাশিত ২২ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
'মেরি বেটি সানি লিওনি বাননাহ্ চাহ্তি হ্যায়' : নারীবাদের ঘাড়ে উঠে পুরুষতন্ত্রের আস্ফালন
অধরা মাধুরী

‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’
বেগম রোকেয়া সমাজকে একটা গাড়ির সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, গাড়ির দুই চাকার (নারী আর পুরুষ) একটা ছোটো আর একটা বড়ো হলে গাড়ি চক্রাকারেই ঘুরতে থাকবে। কখনোই এগোতে পারবে না। এই একবিংশ শতাব্দীতে নারীবাদ, পুরুষতন্ত্র আর সমতা নিয়ে যখন গোড়া থেকে আলোচনা শুরু করতে হয়, তখন বোঝা যায় সমাজ বেশি দূর এগোতে পারেনি; চক্রাকারে ঘুরছে অনেকদিন থেকে। শুধু পুরুষই যে সবসময় নারীর চলার পথে বাধা সৃষ্টি করেছে আর পিছন থেকে টেনে ধরেছে তা নয়; দীর্ঘদিন থেকে নারী নিজের মধ্যে এক পুরুষতান্ত্রিক সত্তা লালন করে নিজেই নিজের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। ফলে এখন নারী যখন জনসম্মুখে নিজের কথা বলতে শুরু করেছে, তখন অনেকের মধ্যেই দেখা যায়—‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার প্রবণতা। যেনো নারীমুক্তি তখনই হবে, যখন নারী ‘পুরুষ’ হয়ে উঠবে। এই বিকট ভুলের চক্রে ঢুকে পড়েছে সমাজ। যে সমাজে নারীকে ‘পুরুষ’ বললে তা প্রশংসা আর পুরুষকে ‘নারী’ বললে তা গালি হয়। তথাকথিত সচেতন নারীরাও আবার এই সূত্র মানছেন! নারীকে মানুষ হতে বলছেন ঠিকই, কিন্তু তার নারীত্বকে খুব একটা উৎসাহ দিতে চাচ্ছে না তারা। মানুষ করতে গিয়ে তারা নারীদের ‘পুরুষ’ হতে বলছেন। কারণ দীর্ঘদিন থেকে চাপা পড়ে থাকা এই যে নারী সত্তা, তারা বোধহয় নিজের অচেতনেই ‘পুরুষ’ আর ‘মানুষ’কে সমার্থক করে ফেলেছে!
তাহলে নারীদের ওপর ‘নারীবাদ’ কি আরোপিত? সমতা, লিঙ্গবৈষম্য, নারীবাদ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে। ভারতবর্ষে আরো প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে। ইদানীং আবার আরেকটি শব্দ বেশ আলোচনায় এসেছে, সুডো ফেমিনিজম (Psudo feminism)। সুডো অর্থ ছদ্ম বা নকল। শব্দটা নতুন নয়, নতুন হলো সম্প্রতি এর বিপুল ব্যবহার। সুডো ফেমিনিজম হলো নকল নারীবাদ। এখন ভাবার বিষয়—হঠাৎ এই শব্দটি এতো জনপ্রিয় হলো কেনো?
ভারত উপমহাদেশ ভূখণ্ডের যে ইতিহাস তার প্রায় শুরুর দিক থেকেই নারী নিকৃষ্ট অবস্থানে ছিলো; সেটা অর্থনৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক সবদিক দিয়েই। তারপর ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে এই পরিস্থিতিতে একটু একটু করে পরিবর্তনের হাওয়া লাগতে শুরু করে। কিন্তু মনের মধ্যে যে পুরুষতন্ত্র শিকড় গেড়ে বসে গেছে, তা থেকে মুক্তি সহজ নয়। মানুষ হিসেবে নারীর অধিকার দাবি করতে করতেই তারা সাম্যের কথা বলতে শিখেছে। নারীবাদ তাই পুরুষতন্ত্রের বিপরীত শব্দ নয়; নারীবাদ মানে পুরুষের বদলে নারীকে অসীম ক্ষমতা দিয়ে তাকে মালিক বানানো নয়। কিন্তু বর্তমান এই ‘আধুনিক’ সমাজে পরিস্থিতিটা এমন যে, নিজেকে ‘নারীবাদী’ বলা পুরুষতান্ত্রিক মানুষের কাছে এক ধরনের ‘কৌশল’ আর ‘ফ্যাশনে’ পরিণত হয়েছে। তাদের কাছে নারীবাদের সমার্থক পুরুষবিদ্বেষ। সুডো ফেমিনিজমে নারীবাদের প্রধান ধারণাই অনুপস্থিত—সাম্য।
আদর্শের দূষণ একটি বড়ো সমস্যা তো অবশ্যই, কিন্তু আরো বড়ো সমস্যা তৈরি হয়, যখন সমাজের সৃজনশীল মানুষেরা পুঁজিবাদের কাছে নিজেকে বিক্রি করে দিয়ে মানবতার প্রতি নিজের দায়িত্ব নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চান না। সম্প্রতি ভারতের চলচ্চিত্রনির্মাতা রাম গোপাল ভার্মা নিজেকে নিয়ে এমন বিতর্কের সূত্রপাত করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে প্রকাশিত এক উক্তির মাধ্যমে।
বাকস্বাধীনতা কি ‘বাকস্বেচ্ছাচারিতা’?
নির্মাতা রাম গোপাল ভার্মা তার টুইটার অ্যাকাউন্টে, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ নারী দিবসে লিখেছিলেন, ‘আমি চাই পৃথিবীর সব মেয়ে পুরুষদের ততোটাই আনন্দ দিক, যতোটা সানি লিওনি দেয়।’ (I wish all the women in the world give men as much happiness as Sunny Leone gives.) বলাই বাহুল্য, এই আনন্দ বলতে নিশ্চয় তিনি চলচ্চিত্রশিল্প থেকে পাওয়া আনন্দের কথা বোঝাননি। সানি লিওনি চলচ্চিত্রে আসার আগে দীর্ঘদিন পেশাদার পর্নস্টার ছিলেন; ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পে আসার পরেও নির্মাতারা তাকে যেসব চরিত্রে ও যেভাবে উপস্থাপন করে, তাতে সানি লিওনি আগের পেশাজীবনের পরিচিতি ব্যবহারের কোনো সুযোগই হাতছাড়া করে না তারা। নারী দিবসে সানি লিওনির সেই পরিচয় ব্যবহার করেই টুইটে বক্তব্য প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে রাম গোপাল ভার্মা ব্যাপক সমালেচনা ও ধিক্কারের মুখে পড়েন; যদিও তিনি যাবতীয় দোষারোপ ও নিন্দাকে অপ্রাসঙ্গিক দাবি করে বোঝাতে চেয়েছেন, যারা এই বিষয়টি নিয়ে তাকে নিন্দা জানিয়েছে, সেসব ‘অশিক্ষিত’১ মানুষেরা তার কথা আদৌ বোঝেনি। বিতর্কিত টুইটটি নিয়ে অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা, সমাজকর্মী, দর্শকসহ অনেকেই নিন্দা প্রকাশ করে এবং তাকে ভুল স্বীকার করতে বলেন। এমনকি আদালত পর্যন্ত গড়ায় বিষয়টি। এদিকে সানি লিওনি একটি ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে রাম গোপালকে বলেন, এ ধরনের কথা বলা রাম গোপাল ভার্মার উচিত হয়নি। আরো ভেবে-চিন্তে তার কথা বলা উচিত। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে রাম গোপাল আত্মপক্ষ সমর্থন করে টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘টুইটার কোনো পাবলিক প্লাটফর্ম নয়; সেখানে ভাব বিনিময় হয় তার ও তার ফলোয়ারদের মধ্যে। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তার ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা আছে; তাই তিনি যা ইচ্ছা লিখতেই পারেন, এ নিয়ে কারো অভিযোগ করা উচিত নয়। কাউকে আঘাত করা তার উদ্দেশ্য ছিলো না।’২ এজন্য কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে তিনি তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশও করেন।৩
ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে একটি প্রশ্ন এখানে খুব প্রাসঙ্গিক—একজন শিল্পীর ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা আর একজন সাধারণ নাগরিকের ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা কি একই মানদণ্ড দিয়ে বিচার করা যায়? আইনত একজন শিল্পীর বাকস্বাধীনতা অন্য যেকোনো নাগরিকের অধিকারের সমান, এ কথা মানতেই হয়; তবুও একটা মৌলিক পার্থক্য থেকে যায়। তা হলো সমাজ, রাষ্ট্র ও গণমানুষের প্রতি একজন শিল্পীর দায়িত্বের দায়বদ্ধতার জায়গা। একজন সাহিত্যিক, কবি, চলচ্চিত্রনির্মাতা, চিত্রশিল্পী তার শিল্পের মধ্য দিয়ে যোগাযোগ করেন। জগৎকে দেখার তার যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা উন্মুক্ত করেন তার শিল্পভাষার মাধ্যমে। প্রতিটি শিল্প তার নিজ ক্ষেত্র থেকে মানুষকে যতোটা প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে, তা নতুন করে বিস্তারিত বর্ণনা করার কিছু নাই। একজন শিল্পী সমগ্র সমাজের স্বপ্ন নির্মাণ করে। দর্শক-শ্রোতার সামনে আদর্শ ও দর্শনের মূর্ত রূপ হাজির করে। তাই প্রযুক্তির এই যুগে একজন শিল্পীর শুধু শিল্প নয়, জনসম্মুখে তার প্রতিটি শব্দ ও আচরণও প্রায় তার শিল্পের মতোই গুরুত্ব বহন করে। আবার তার শিল্পের ব্যাখ্যাও হতে পারে সেসব আচরণের ভিত্তিতে। এজন্যই আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নারী দিবসে রাম গোপাল ভার্মার প্রকাশিত টুইটটি একজন শিল্পীর দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কতোটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
টুইটের ওই একটি লাইনের দিকে তাকালে একজন গোড়া পুরুষতান্ত্রিক মানুষকে দেখা যায়। যিনি পৃথিবীর সব নারীকে পর্নোগ্রাফিতে উপস্থাপিত নারীর মতো যৌনদাসী রূপে দেখতে চান; যে নারীর অস্তিত্বের একমাত্র উদ্দেশ্য পুরুষকে যৌনসুখ দেওয়া। নারী-পুরুষের বৈষম্য মিটিয়ে সমমর্যাদা দাবি করার এই যুগে মূলধারার চলচ্চিত্রের একজন নির্মাতার এরূপ আদর্শগত অবস্থান কি আদৌ শিল্পীসুলভ? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কোনো একক মানুষের কাজ নয়। এর উত্তর দেওয়ার কথা সমাজের।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর সংবাদ মাধ্যমে কথার লড়াইয়ের পরে রাম গোপাল ভার্মা এই তর্ককে একটু মুখোশ পরিয়ে নিয়ে আসেন চলচ্চিত্র মাধ্যমে। নির্মাণ করেন সাড়ে ১১ মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মেরি বেটি সানি লিওন বাননাহ্ চাহ্তি হ্যায়। পর্নোগ্রাফিতে উপস্থাপিত নারীর যে ‘মহিমান্বিত’ ভূমিকা, তার পক্ষে নিজের যুক্তিগুলো আরেকজন নারীচরিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়াই এই চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্য। এই সাড়ে ১১ মিনিট মূলত রাম গোপাল ভার্মার তৈরি করা পূর্ববর্তী বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের কৌশল। তার যুক্তির কাটাছেঁড়া করেই এগিয়ে গেছে এই আলোচনার পরবর্তী অংশ।
‘ফ্যান্টাসি’ ওয়ার্ল্ড : পর্নোগ্রাফি
বিশ্বের লাভজনক ব্যবসাগুলোর অন্যতম পর্ন ইন্ডাস্ট্রি। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রি ধারণাটির সঙ্গে এখন সবাই কমবেশি পরিচিত। সেই বিবেচনায় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি আর পর্ন ইন্ডাস্ট্রি শুনতে হালকাভাবে একই ধরনের মনে হতে পারে। তাহলে পার্থক্যটা কোথায়? শিল্প (Art) আর ব্যবসার মধ্যকার সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেছে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি; অর্থাৎ শিল্পের (Art) প্রয়োজনে শিল্প (Industry)। অন্যদিকে মানুষের প্রাকৃতিক আচরণ—যৌনতাকে রঙচঙ দিয়ে, অতিরঞ্জিত করে তা ব্যবসার উপযোগী পণ্য হিসেবে তৈরি করে গড়ে ওঠেছে বিশাল পর্ন ইন্ডাস্ট্রি। এখানে মুনাফা তৈরির একমাত্র কাঁচামাল যৌনতা। বলে নেওয়া দরকার, সব শিল্পেই যৌনতার উপস্থিতি আছে, নানাভাবে তা উপস্থাপন করা হয়; হয়তো বিক্রিও হয়। শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ যৌনতা; কারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনে সর্বোচ্চ প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর একটি তার যৌনক্রিয়া। কিন্তু পর্নে বিক্রি করা হয় প্রত্যক্ষ যৌনক্রিয়া ও বিশেষভাবে সংজ্ঞায়িত যৌনসঙ্গম।
চলচ্চিত্রে পর্নোগ্রাফি কেবলই সেক্স নয়। এটা এক ধরনের বিশেষায়িত ধারণার ওপর গড়ে ওঠা বিশেষ ঘরানার সেক্স। পর্নোগ্রাফির এই সেক্স গড়ে উঠেছে কর্তৃত্ব ও আনুগত্যশীলতার ওপর ভিত্তি করে; এই কর্তৃত্ব পুরুষের, আর নারী তার অনুগত। কর্তৃত্ব ও আনুগত্যশীলতার যৌনকরণই পর্নোগ্রাফি।৪
তর্কের সময় অনেকেই যুক্তি দিয়ে থাকে যে, নারী পর্নস্টাররা এ কাজ করেন অর্থের বিনিময়ে এবং স্বেচ্ছায়। তাই এ ধরনের ব্যাখ্যা অমূলক। অন্যদিকে কর্তৃত্ব ও যৌনতার সম্পর্কের এ সংজ্ঞার সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে বিপরীতমুখী একটা তথ্য হলো—পর্নোগ্রাফি একমাত্র ইন্ডাস্ট্রি যেখানে একজন নারী পর্নস্টার একেকটি পর্নোগ্রাফির জন্য একজন পুরুষ পর্নস্টারের তুলনায় প্রায় তিন থেকে চারগুণ বেশি পারিশ্রমিক পেতে পারে; যেখানে চলচ্চিত্রশিল্পে নারী অভিনয়শিল্পী তার পুরুষ সহকর্মীর অর্ধেক পারিশ্রমিকও পায় না। নারী যদি নিপীড়িতই হয়, তাহলে এই রকম ভিন্ন চিত্রের কারণ কী? আগেই বলা হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে বিপরীতমুখী; আরেকটু গভীরে গেলেই তথ্যগুলোর সমন্বয়টা চোখে পড়ে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে পর্নতে মূলত থাকে পটভূমিহীন ধারাবাহিক যৌন দৃশ্য। যদিওবা সংক্ষিপ্ত কোনো পটভূমি তৈরি করা হয়, তার মূল উদ্দেশ্য যে চরিত্রগুলোর যৌনসঙ্গমের দৃশ্যে পৌঁছানো, তা স্পষ্ট। দুজন মানুষের যৌনতা এবং যৌনসঙ্গম জীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক বিষয়গুলোর একটি হলেও পর্নে স্বাভাবিক যৌনসঙ্গম বা দৃশ্য খুব বেশি দামে বিক্রি হয় না। এমনকি পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে একজন পর্নস্টার গতানুগতিক সংজ্ঞানুযায়ী কতোটা ‘সুন্দরী’ বা ‘সুদর্শন’ তার থেকে বেশি গুরুত্ব বহন করে তার রুচি, পছন্দ ও যৌনক্রিয়ায় তার বৈচিত্র্য; আর সেসব বৈচিত্র্য স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক যৌনতার তুলনায় কতোটা ‘বিকৃত’। একজন পর্নস্টার বিখ্যাত হয়ে ওঠে এসবের ভিত্তিতেই। আর পারিশ্রমিকের বিষয়টা হলো—একটি যৌন দৃশ্যে সর্বাধিক ‘বিকৃত’ অ্যাক্সপেরিমেন্ট করা যায় নারীটির ওপরই; অন্যদিকে নারী শরীরের নগ্নতা বিক্রির বিষয় তো আছেই। এসব কারণেই নারী পর্নস্টারের পারিশ্রমিকও বেশি। পর্নোগ্রাফির যে বৈশিষ্ট্য, সেখানে দর্শকের চোখ পর্নস্টারের কাছে যা আশা করে তা কোনো মতেই পুরুষ বা নারীর স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক যৌনতা নয়। তাই পর্নোগ্রাফিকে দর্শকের যৌন ফ্যান্টাসি নাম দিয়ে অতি উদারতার দৃষ্টান্ত সৃষ্টির মাধ্যমে যারা একে বৈধতা দিতে চান, তাদের কাছে পাল্টা জিজ্ঞাসা—‘পর্নোগ্রফি যদি কোনো দিক থেকে ফ্যান্টাসি হয়; তাহলে আমাদের প্রশ্ন কেন এগুলো ফ্যান্টাসি? আরো প্রশ্ন, এই ফ্যান্টাসি আমাদেরকে আমাদের সম্বন্ধে কী বলে?’৫
পর্নোতে ফ্যান্টাসি নাম দিয়ে যা দেখানো হয়, তা আসলে কার ইচ্ছার প্রতিফলন? সেই ইচ্ছাগুলোইবা কী কী? পর্নোগ্রাফির কয়েকটি ধরন বা সাবজেনারের কথা বলা যাক। এক ধরনের পর্ন রয়েছে, যেখানে একটা নির্দিষ্ট পরিবেশে কয়েকটি চরিত্র তৈরি করে তাদের মধ্যে হঠাৎ করে ‘অনুচিত’ যৌনসঙ্গমের দৃশ্য শুরু হয়ে যায়। যেমন, পুলিশ কাস্টাডিতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অফিসার-আটককৃত ব্যক্তি, হাসপাতালের ডাক্তার-রোগী-নার্স, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পরিবারের ভিতরে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, ধর্ষক-ভিক্টিম, এমনকি খুনি-ভিক্টিম প্রভৃতি। এখানে প্যাটার্নটা স্পষ্ট। যেসব প্রেক্ষাপটে যৌনতা অপরাধ বা যেসব আচরণ নিজেই অপরাধ, সেসব পরিস্থিতির যৌনকরণের মাধ্যমে এসব পর্ন তৈরি করা হয়। এসব অপরাধপ্রবণতাকে প্রচুর দর্শক ফ্যান্টাসি নামে খুব হালকা মেজাজে বিবেচনা করে; যেনো এমন প্রবৃত্তি আর ফ্যান্টাসিই মানুষের স্বাভাবিক আচরণ! পর্নোগ্রাফির আরো অনেক ধরন আছে। প্রসঙ্গক্রমে সেগুলোও কিছু কিছু আসবে আলোচনায়।
নারীবাদের মুখোশ: মেরি বেটি সানি লিওনি বাননাহ্ চাহ্তি হ্যায়
প্রতিটি চলচ্চিত্র হলো একেকজন নির্মাতার চোখে দেখা বাস্তবতা, অর্থাৎ নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি। একজন শিল্পীর ভাব প্রকাশের ভাষা মূলত তার শিল্পভাষা; তার মুখের ভাষার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই অধিক গুরুত্ব বহন করে তার শিল্পের ভাষা। ২০১৭’র মার্চে টুইটারে নির্মাতা রাম গোপাল ভার্মার বক্তব্য প্রকাশের ঘটনায় তৈরি হওয়া পরিস্থিতির ধারাবাহিকতাতেই, তিনি আলোচ্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন বলে মনে হয়। চলচ্চিত্রটির নাম ও প্রসঙ্গ তেমনটাই নির্দেশ করে।
স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্রটিতে একজন তরুণী তার বাবা-মাকে বলছেন, তিনি সানি লিওনি হতে চান; অভিনয়শিল্পী সানি লিওনি নয়, তিনি পর্নস্টার হতে চান। ১১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের চলচ্চিত্রটি জুড়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে নারীর ‘স্বাধীন চিন্তা’র কথা, তার যৌনতার ও পেশার স্বাধীনতার কথা। সাড়ে ১১ মিনিটের এই কথোপকথনে মেয়েটি যুক্তি দিয়ে তার বাবা-মাকে বোঝাতে চাচ্ছেন, নিজের যৌনতাকে উন্মুক্ত করে তিনি নিজের ‘স্বাধীন সিদ্ধান্তের’ বহিঃপ্রকাশ করতে চান। নারী চিন্তার স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি খুব নতুন নয়। দীর্ঘদিন থেকেই প্রচুর মানুষ এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন। যুগ যুগ ধরে দমিত-দলিত নারীর চিন্তাকে বেড়িমুক্ত করার কথা বলছেন। কিন্তু এই মুক্তির পথ কোনটা, মুক্ত নারীর আচরণ ঠিক কেমন হবে, এই বিষয়গুলোর দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্রে মেয়েটির বক্তব্য। যে বক্তব্যে নারীকে সেক্স অবজেক্ট হিসেবে বিবেচনা করার বস্তাপচা ধারণাগুলোই নারীবাদের মুখোশ পরিয়ে হাজির করা হয়েছে!
চলচ্চিত্রটির শুরুতেই পর্নস্টার পেশার পরিচয় দিয়ে মেয়ে তার বাবাকে বলছেন,
পর্নস্টার; যেমন আপনি একজন অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার, সরকারি অফিসে কাজ করেন। মা গৃহিণী, বাসার দেখাশোনা করেন। দিদি টিচার; আঙ্কেল ডক্টর আর আমাদের প্রতিবেশী পাইলট। সেরকম সানি লিওনিও পর্নস্টার। তার কাজ কিছু সময়ের জন্য কোটি কোটি মানুষকে খুশি করা। আপনার বিশ্বাস না হলে সানি লিওনির ডেইলি লাইক চেক করে নেন।
তার ভাষ্যমতে, আর যেকোনো দশটা পেশার মতো এটিও একটি পেশা, যা পর্নস্টাররা স্বেচ্ছায় বেছে নেয়; এবং তাদের কাজ হলো মানুষকে খুশি করা।
এখন কথা হলো, এতো সরল করে একটা সংজ্ঞা দিয়ে পর্নোগ্রাফির পিছনের নিগূঢ় সত্যগুলোকে ঢেকে দেওয়া যায় কি! নিজের যৌনতা চেনা-অচেনা সবার জন্য মুক্ত করে দিয়ে, তাদের খুশি করা যে একটি ভালো কাজ, তার প্রমাণ হিসেবে মেয়েটি যুক্তি দিচ্ছেন, ইন্টারনেটে সানি লিওনির লাইকের সংখ্যার কথা। মেয়েটি তার বাচনভঙ্গি দিয়ে এই ‘খুশি দেওয়া’কে প্রায় ‘জনসেবা’ হিসেবে উপস্থাপনের কাছাকাছি নিয়ে যেতে চেয়েছেন বলে মনে হতে পারে! তিনি বলেন, নারীর চিন্তা দীর্ঘদিন থেকে দমন করে পুরুষ তা নিজের মতো করে নিয়েছে, এ কথা সত্য। তাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন বায়োলজিকাল নারীও নিজের ভিতরে একটি পুরুষ সত্তা লালন করে। তাহলে মানুষকে খুশি করার যে যুক্তি, সেই মানুষগুলো কারা? যারা এই পর্নোগ্রাফি দেখতে চায় বলে স্বল্পদৈর্ঘ্যে চলচ্চিত্রের মেয়েটি পর্নোগ্রাফির দুনিয়ায় নিজেকে প্রত্যাশিত মনে করছে। কিন্তু কারা সেই দর্শক? এই প্রশ্নটি তোলা হয়নি কোথাও। তার যুক্তি,
পৃথিবীতে সবাই কিছু না কিছু বিক্রি করে, যা তার বিশেষত্ব। কেউ কথা বিক্রি করে, কেউ নিজের শিল্প, কেউ নিজের পরিশ্রম। সেরকমই সানি লিওনি নিজের যৌন আকর্ষণ বিক্রি করে। জীবনের সরল সত্য এটা—কিছু কিনতে হলে কিছু বিক্রি করো।
তাই মেয়েটি তার বাবাকে বলছে, ‘আমার যৌনতা আমার আমানত, আমার ক্ষমতা। আমি গর্বের সঙ্গে তা ব্যবহার করতে চাই।’ যাদের কাছে নিজের যৌনতা বিক্রি করে তিনি নিজেকে স্বাধীন মনে করছেন, যাদের সেবায় নিজের যৌনতাকে বিলিয়ে দিতে চাচ্ছেন, তারা আসলে কারা?
এই কথার ধারাবাহিকতায় আবার পর্ন ব্যবসার প্রসঙ্গ চলে আসে। পর্নকে ‘ফ্যান্টাসি’ (Fantasy) বলে উল্লেখ করছেন চলচ্চিত্রটির প্রধান চরিত্র। ফ্যান্টাসি আসলে কী? শব্দটি প্রচলিত হলেও অর্থটা সাধারণ নয়। ফ্যান্টাসি হলো মানুষের মনে চেপে রাখা ইচ্ছা, অনেক ক্ষেত্রে কখনো পূরণ হবে না এমন ইচ্ছাও। আবার অনেক সময় বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো কল্পনা। ফ্যান্টাসির সঙ্গে আবার খুব গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে ডিজায়ারের (Desire)। ডিজায়ার হলো, সাধ, প্রবল আকাঙ্ক্ষা বা কামনা। ফ্যান্টাসি বা ডিজায়ারের বাংলা করলে সূক্ষ্ম সম্পর্কটা বোধগম্য হওয়া কঠিন। ফ্যান্টাসি হলো কল্পনা আর ডিজায়ার হচ্ছে কামনা। কামনা তৈরি হওয়ার সঙ্গে ফ্যান্টাসির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাহলে পর্ন যদি ফ্যান্টাসি হয়, কার কল্পনা আর কামনাকে প্রতিফলিত করে পর্নোগ্রাফি?
পর্ন কী, সেই বিষয়ে কিছু কথা ইতোমধ্যে হয়েছে; এখানে পর্নের আরো কয়েকটি ধরন নিয়ে কথা বলা দরকার। মূলত সহিংস আর ‘বিকৃত’ যেসব ধরন বা সাবজেনার আছে, সেরকম কয়েকটার পিছনের ফ্যান্টাসি ও তা থেকে তৈরি হওয়া ডিজায়ারকে বোঝা প্রয়োজন।
রাফ সেক্স : স্যাডিজম (sadism) ও স্যাডোমাসোসিজম (sadomasochism)-এর চর্চা হয় এখানে। অর্থাৎ সঙ্গমের সময় প্রহার করা, শারীরিকভাবে নির্যাতন করা (প্রায় সবক্ষেত্রে নারী পর্নস্টারকে), অপমানিত করা ইত্যাদি।
রেপ পর্নোগ্রাফি : একজন ভিক্টিমকে ধর্ষণ করার প্রেক্ষাপটে সঙ্গমের অভিনয়।
‘স্নাফ’ (snuff) : এই জাতীয় পর্নোগ্রাফি বেআইনি। এখানে একজন মানুষের প্রকৃত অর্থে মৃত্যু হয়, অর্থাৎ খুন করা হয়। এই জেনারটি খুব বেশি প্রচলিত না হলেও অস্তিত্ব রয়েছে। প্রকৃত মৃত্যু ছাড়াও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার অভিনয় করেও পর্নোগ্রাফি তৈরি হয়।
‘বেস্টশিয়ালিটি’ : পশুর সঙ্গে মানুষের যৌনতা।
ইনসেস্ট পর্নোগ্রাফি : পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে যৌনতা।
এ রকম অসংখ্য জেনারের উদাহরণ দেওয়া সম্ভব; তবে এই কয়েকটি উদাহরণই যথেষ্ট পর্ন ফ্যান্টাসিকে বোঝার জন্য। এগুলো মূলত ‘বিকৃত’ পর্নোগ্রাফি; তবে যেগুলোকে ‘স্বাভাবিক’ পর্নোগ্রাফি বলা হয়ে থাকে সেসবের অধিকাংশেও নারীর অবস্থান যৌনদাসীর থেকে আলাদা কিছু নয়। এসব কথা মূলত পেশাদার ও খ্যাতিপ্রাপ্ত পর্নোগ্রাফির স্টারদের বিষয়ে। নারী-পুরুষের সাধারণ যৌন আচরণও অনেক সময় গোপনে ভিডিও করে ইন্টারনেটে উন্মুক্ত করার মতো অপরাধ করে অনেকে; কেউ কেউ স্বেচ্ছায় বিক্রিও করে। সেসবকে পর্ন বলা হলেও এখানে আলোচনা শুধু পেশাদারদের নিয়েই। তাহলে এই যে ফ্যান্টাসির কথা বলা হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় তা প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক কোনো ব্যক্তির যৌনকল্পনা; না হয় মানসিক বিকারগ্রস্ত কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রবণতা।
এবারে বোধ হয় উত্তরটা পাওয়া গেছে, কাদেরকে যৌনসুখ দিয়ে নিজের যৌনতার স্বাধীনতা দাবি করছে চলচ্চিত্রের মেয়েটি? তারা সেইসব মানুষ, যারা যুগ যুগ ধরে মেয়েদের শুধু সেক্স অবজেক্ট বা যৌনদাসী হিসেবে দেখে। যাদের কাছে নারীকে মূল্যায়ন করার একমাত্র মাপকাঠি তার যৌন আকর্ষণের মাত্রা। তাদেরই সেবায় নিজেকে, নিজের দেহকে নিয়োজিত করার আদর্শ লালন করে ‘স্বাধীন চিন্তা’র কথা বলছে মেয়েটি!
এবারে আসা যাক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটিতে ‘সৌন্দর্য’ এবং নারীর মূল্যায়নের যে সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, সেই প্রসঙ্গে। মেয়েটির মা তাকে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘তুই নারীর জীবনে শুধু সেক্স দেখতে পাস?’; এর উত্তরে মেয়েটি যে যুক্তি উপস্থাপন করেছে তা শুধু অদ্ভুতই না, রীতিমতো ভয়ঙ্কর। মেয়েটি উত্তর দিচ্ছে,
আমি জানি নারী শুধু সেক্স নয়; সে একজন মা, বোন, দাদি-নানি সবকিছুই। কিন্তু একজন নারী সব থেকে বেশি মূল্যবান হয় তার সৌন্দর্য আর যৌন আবেদনের জন্য। পৃথিবীতে অনেক যুদ্ধ হয়েছে নারী সৌন্দর্যের জন্য, কোনো মা-বোন দাদি বা নানির জন্য নয়। এই কথা কেউ ভাবে না যে, সানি লিওনির মা কে? দিদি কে? যখন সে কাপড় খোলে তখন শুধু তার সৌন্দর্যই দেখা যায়।
মেয়েটির যুক্তি অনুযায়ী প্রথমত, একজন নারীর সৌন্দর্য কেবল তার শরীরে; শুধু শরীরেই নয়, তার নগ্ন শরীরে! তাই নিজেকে ‘মূল্যবান’ করে তুলতে চাইলে নিজের নগ্নতা প্রদর্শন করতে হবে, এটাই সার্থকতা। দ্বিতীয়ত, পুরাণ আর ইতিহাসে নারীকে কেন্দ্র করে যেসব যুদ্ধ হয়েছে (ধরা যেতে পারে রামায়ণের সীতা থেকে শুরু করে ট্রয়ের হেলেনের কথা) সেসব নারীর ‘সৌন্দর্যে’র জন্য। কারণ মেয়েটির বক্তব্য অনুযায়ী নারীর মূল্যের মাপকাঠি তার শরীরের নিখুঁত গঠন আর যৌন আবেদন। স্বাধীন চিন্তার নামে এই যে কথাগুলো বলছে মেয়েটি, তা কী বিকট পুরুষতান্ত্রিকতায় ভরা!
একেকটি বিবাদ বা যুদ্ধে যে নারীর নাম উল্লেখ আছে, তাদের অস্তিত্বকে যে আদৌ মানুষ হিসেবে বিবেচনাও করা হয়নি সেই কথার উল্লেখও হতে দেওয়া হলো না চলচ্চিত্রটিতে। ইতিহাসে নারীর দৈহিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার ঘটনা আছে এ কথা ঠিক, তবে যুদ্ধ-খুনোখুনি আর কাড়াকাড়ি হয়েছে মূলত নারীর মালিকানা নিয়ে। আর সেই মালিক সবসময় থেকেছে পুরুষ। নারী সেখানে সম্পত্তি, অহমের মাপকাঠি, মানুষ নয়। সেসব ঘটনার ভিত্তিতেই আলোচ্য চলচ্চিত্রটি নিজের যৌন আবেদন আর নিজ সত্তার অস্তিত্বের মধ্যে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ সেই চেতনা হারিয়ে ফেলেছেন।
মেয়েটি তার বাবাকে বলেন, ‘সানি লিওনির নাম যদি মানুষ এক লাখ বার নেয়, তো যাকে আপনি সম্মান করেন তার নাম হয়তো একশোবার উচ্চারণ করে। এ রকম মূল্যহীন সম্মান দিয়ে কার কী যায় আসে?’ সম্মানের মতো একটা বিমূর্ত ধারণার সঙ্গে ব্যক্তির নাম উচ্চারণের তুলনা করার এ রকম যুক্তি যথেষ্টই হাস্যকর শোনায়। সাড়ে ১১ মিনিট ধরে কু-যুক্তির এই ধস্তাধস্তির পরে মেয়ে তার মাকে বলছেন,
মা, তোমার মতো অনেকে আছে; যাদের নিজের চিন্তা বলে অবশিষ্ট কিছুই নেই। কারণ তোমার চিন্তা করার যোগ্যতাকে পুরুষরা যুগ যুগ ধরে একটা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নষ্ট করে দিয়েছে। আমি আপনাকে যা বলছি, আপনি যদি তা মনোযোগ দিয়ে শোনেন আর একটুও বুঝতে পারেন, তাহলে আপনি খুশি হবেন যে, আমি কেনো সানি লিওনি হতে চাই। আর যখন আপনি পুরোপুরি বুঝে যাবেন, তখন আপনারও আফসোস হবে যে, আপনি কেনো সানি লিওনি হননি।
অর্থাৎ, মেয়েটির এসব যুক্তি যারা মানবে না বা দ্বিমত পোষণ করবে, তাদের মাথায় এসব যুক্তি বোঝার মতো শিক্ষা নাই। শুধু যখন কেউ তার কথায় সহমত দিবে, তখনই যুক্তিদানকারী বুঝবে যে সামনের জন তার কথা একটু হলেও বুঝতে পেরেছে! এর মানে দাঁড়ায়, যুক্তিগুলো বুঝলে এর বিপরীত মত কারো থাকতেই পারে না! এই শেষ কথাটি শুনলে নির্মাতা রাম গোপাল ভার্মার সবাইকে ‘অশিক্ষিত’ আখ্যায়িত করে প্রকাশ করা টুইটটির কথা খুব জোরালোভাবেই মনে পড়ে যায়।
উন্মুক্ত যৌনতা সমানুপাতিক নারীমুক্তি : হুমকির মুখে সাম্য
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটিতে মেয়েটি পর্নোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে গ্রহণের পক্ষে যুক্তির পাহাড় দাঁড় করিয়েছেন, তার বক্তব্যের মূল সুরটা একটু পৃথক গুরুত্ব দিয়ে শোনা প্রয়োজন। আদৌ কি নারী স্বাধীনতা, স্বাধীন চিন্তা, নারীর পেশা নির্বাচনের অধিকার আর যৌনতার মুক্তির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক আছে, নাকি সেগুলো শুধুই অন্তঃসারশূন্য মুখস্ত বুলি?
সানি লিওনির ‘ডেইলি লাইক’-এর প্রাচুর্য, কাপড় খোলার পরে তার উন্মুক্ত শরীরের ‘সৌন্দর্য’; যুগে যুগে নারীর সৌন্দর্য ও তার মালিকানা নিয়ে সংঘটিত যুদ্ধ (তার মতে, এসব যুদ্ধ আবার নারীকে গুরুত্ব দেওয়ার উদাহরণ!); নারীর যৌনতাকে ঘিরে গোড়া পুরুষতান্ত্রিক নারী-পুরুষের ব্যবসা; নারীকে যারা যৌনসুখ মেটানোর যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে তাদের চোখকে যৌনতৃপ্তি দিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জনের রাস্তা তৈরি করা এবং এই কাজকে অনেকটা ‘জনসেবা’র মতো করে উপস্থাপন করাকে ‘স্বাধীন চিন্তা’র নাম দিয়ে নিজের আদর্শে পরিণত করেছেন চলচ্চিত্রের আলোচ্য চরিত্রটি। এ কথা মাথায় আসতে খুব একটা কষ্ট হয় না যে, নির্মাতা রাম গোপাল ভার্মা নারী দিবসে লেখা তার টুইটটির পক্ষে যা যা যুক্তি দিতে চান, তাই বলিয়ে নিচ্ছেন চলচ্চিত্রের চরিত্রটির মুখ দিয়ে।
নারীর নারীত্ব, তার সত্তা, যৌনতা আর যৌনতার স্বাধীনতার সঙ্গে পর্নোগ্রাফিকে তিনি এমনভাবে মিশিয়ে নিয়ে উপস্থাপন করেছেন যে, হঠাৎ করে যুক্তিগুলো শুনে হয়তো অনেকে খেয়ালই করবেন না যে কতোটা পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন তিনি। যেমন, চলচ্চিত্রে বাবা-মায়ের চরিত্র দুটিও কোনো উত্তর খুঁজে পায়নি। যারা তার এই গোলমেলে আদর্শকে মানবে না তাদেরকে অনেকটা নির্বোধ আখ্যায়িত করে ওই একই নীরবতা তিনি তাদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে চান। রাম গোপাল ভার্মা নারীবাদের সঙ্গে পর্নোগ্রাফির যে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়েছেন তা দেখে মনে হয়, যৌনতাই যেনো নারী মুক্তির একমাত্র রাস্তা; আর নারীর যৌনতার স্বাধীনতা সমানুপাতিক পর্নোগ্রাফি!
নারী তুমি মানুষ হও, যেনো ‘নারীবাদ’ অর্থহীন হয়
একবিংশ শতাব্দীর এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, যখন নারীরা তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার, চিন্তা ও যৌনতার স্বাধীনতা নিয়ে সত্যিকার অর্থে ভাবতে আর খোলাখুলিভাবে কথা বলতে শুরু করেছে, তখন এ রকম একদল পুরুষতান্ত্রিক নারীকে নারীবাদের মুখোশ পরিয়ে নারীদের সামনেই দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে সমাজের ক্ষমতাবান গোড়া পুরুষতান্ত্রিকতা। নিজ সত্তার এই বিভ্রান্তিকর ধারণা নারীকে আবার এক শতাব্দী পিছনে নিয়ে যাওয়ারও ক্ষমতা রাখে।
তাই নারীকে ‘পুরুষ’ বলে প্রশংসা করার কোনো কারণ নেই; পুরুষকে ‘নারী’ বলে গালি দেওয়াও নারীর জন্য চূড়ান্ত অপমানজনক। নারী বা পুরুষ দুটি পৃথক সত্তা, প্রকৃতির তৈরি করা স্বাভাবিক বৈচিত্র্য। নারীকে পুরুষ করে তোলার যে চেষ্টা করছে নকল নারীবাদীরা, তারা আসলে সমতা বোঝে না। নারীকে মানুষ হতে বলার জন্য তো তার নারীত্বকে বিপন্ন করতে বলার কথা নয়। প্রাকৃতিক পুরুষ যেমন মানুষ, প্রাকৃতিক নারীকে তেমন মানুষ ভাবতে কোথায় বাধে? নারীকে মানুষ হওয়ার জন্য ‘পুরুষ’ হতে বলা শুধু অর্থহীনই নয়, অন্যায়ও বটে। ছোটোবেলা থেকে নারীকে শেখানো উচিত তার নারীত্বকে সম্মান করতে। মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষের সাদৃশ্যকে গ্রহণ করতে শেখা আর প্রকৃতির দেওয়া শারীরিক-মানসিক বৈচিত্র্যকে তার মর্যাদা দেওয়া, দুটোই মানবতাবাদীর কাজ। সত্যিকথা বলতে, প্রতিটি মানুষ যদি প্রকৃত মানবতাবাদী হতে পারে, তাহলে এই সমাজে ‘নারীবাদ’ বলে কোনো শব্দেরই প্রয়োজন থাকে না।
লেখক : অধরা মাধুরী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
adharamadhuri18@gmail.com
তথ্যসূত্র ও টিকা
১. http://www.news18.com/news/movies/ram-gopal-varma-lands-in-trouble-complaint-filed-over-his-sunny-leone-tweet-1357881.html; retrieved on 20.09.2017
২. https://www.youtube.com/watch?v=bRCJlxwtijc; retrieved on 22.08.2017
৩. http://www.deccanchronicle.com/entertainment/bollywood/100317/after-uproar-over-sexist-tweet-on-sunnny-leone-ram-gopal-varma-finally-apologises.html; retrieved on 08.09.2017
৪. জেনসেন, রবার্ট; ‘কর্তৃত্ব ও আনুগত্যশীলতার যৌণকরণই পর্নোগ্রাফি’; ভাব-ভাষান্তর : আহমেদ মাসুম; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, বর্ষ ৩, সংখ্যা ৫, জানুয়ারি ২০১৩, পৃ. ১২৪।
৫. প্রাগুক্ত; জেনসেন (২০১৩ : ১২৪)।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন