অনুপম সেন অমি
প্রকাশিত ২০ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
মহব্বত আলীর 'ঘুড্ডি' : একটি বেহাত বিপ্লবের গল্প
অনুপম সেন অমি

সালাউদ্দিন জাকি’র পরিচালনায় ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয় ঘুড্ডি। ষষ্ঠ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ঘুড্ডির সংলাপ রচয়িতা হিসেবে সালাউদ্দিন জাকি পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। সাদা-কালোয় নির্মিত দুই ঘণ্টা ২৫ মিনিটের এই দীর্ঘ চলচ্চিত্রটি মূলত একটা রোমান্টিক নাট্যচিত্র হলেও এর মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী জীবনযাপনের হালচাল ও রাজনৈতিক পরিক্রমণের এক মনস্তাত্ত্বিক গল্প খুঁজে পাওয়া যায়। অনেকেই ঘুড্ডিকে বিকল্পধারার নির্মাণ হিসেবে দেখতে চান/চেয়েছেন, তবে এটি প্রথাবিরোধী চলচ্চিত্র কি না সেটা এক ভিন্ন ডিসকোর্স; যেই আলোচনা চলচ্চিত্রের প্রায়োগিক দিক নিয়েই বেশ চিন্তিত এবং মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গে একটা তুলনামূলক ব্যাখ্যার ব্যাপারেই অনেক আগ্রহী। এই লেখায় আমি সেই আলোচনায় যাবো না, বরং আমি আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই কীভাবে এই চলচ্চিত্রে একাত্তর পরবর্তী বাস্তবতা ও ‘হঠাৎ বদলে যাওয়া’ সমাজ এক ফ্রেমে উঠে এসেছে সেই প্রসঙ্গে। এর পাশাপাশি ন্যারেটিভে দেখতে চাইবো, সেই সময়ের সমাজে (বিশেষত ঢাকা শহরের) বিদ্যমান শ্রেণি-বাস্তবতার চিত্র, বুর্জোয়া আধুনিকতার ছোঁয়া, উঠতি বেনিয়া সমাজের হালচাল, আর একটি বেহাত বিপ্লবের গল্প। পুরোদস্তুর এই চলচ্চিত্রকে আমি রাজনৈতিকভাবে পাঠের চেষ্টা করবো। এরই স্বার্থে এখানে চলচ্চিত্রের প্রাথমিক যে রোমান্টিক বয়ান তাকে আমি ফ্রেম ন্যারেটিভে রেখে, অন্য ন্যারেটিভে আমার রাজনৈতিক পাঠকে চেষ্টা করবো প্রতিস্থাপনের। আমার বোধে অথবা আমার ভাবনা-চিন্তা প্রকল্পে এই চলচ্চিত্রের যে রাজনৈতিক অভিব্যক্তি, তাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিপরীতে পাঠের একটা প্রয়াস হতে পারে এই লেখাটি।
দুই.
বেহাত বিপ্লবের গল্প বলছি এই কারণেই যে, যুদ্ধ-পরবর্তী দশকের যে ঢাকা শহরকে চলচ্চিত্রের পর্দায় আমরা দেখি, সেখানে নব্য ধনতন্ত্রের একটা বুনিয়াদ টের পাওয়া যায়। এই বুনিয়াদ যে খুব শক্ত তা বলা যাবে না, কিন্তু এর ভিতরে যে এক অসম পুঁজির উল্লম্ফন তা বেশ বিশ্বাসযোগ্য। এই বিকৃত পুঁজির দৌরাত্ম্য সমাজের শ্রেণি বৈষম্যের অন্যতম কারণ। যুদ্ধের/স্বাধীনতার ফসল যে জনতা শ্রেণির ঘরে ওঠেনি, ঘুড্ডির নায়ক মহব্বত আলীর (আসল নাম আসাদ) বয়ানে তা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে—‘হেই আমলে শুনতাম বাইশ চোর, আর এই আমলে ...’। যুদ্ধের পরেই যে একটা মধ্যবিত্ত সুবিধা শ্রেণি ক্ষমতায় আঁকড়ে বসে পুরো অর্থনীতিকে মজ্জাগত করছে/করে নিয়েছে, তার একটা প্রামাণ্য-দলিল হতে পারে ঘুড্ডি।
একজন মহব্বত আলীর—‘একাত্তরে কুড়ি ছুঁই ছুঁই যার বয়স’ এবং যার ‘হিরো হওয়ার খুব শখ’ মাঠে-ময়দানের, কলমের অথবা পর্দার, এই নব্য পুঁজির শহরে তার নিজের খোলস পাল্টানোর যে শখ, শ্রেণি পরিবর্তনের যে আগ্রহ—তা তো দেশের মুক্তিযুদ্ধের যে স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা তাকে কোথাও প্রতিফলিত করে না। বরং সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—তিন স্তম্ভের ওপর দেশের স্বাধীনতার যে আকাঙ্ক্ষা জনমনে প্রস্ফুটিত হয়েছিলো, তারই এক ব্যর্থ নিদর্শন দেখা যায় চলচ্চিত্রের পরতে পরতে। মহব্বত আলীর ‘পোশাক পরিবর্তনের’ মতোই হুট করে দেশের স্বাধীনতা যে গণজাগরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তারই রূপান্তর ধরা পড়েছে সমাজে। পুঁজির অসম উন্নয়ন যে সত্যিকার অর্থেই মানবিক উন্নয়ন হতে পারে না এবং শ্রেণি নিরপেক্ষতা যে এই সদ্য স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্র, তার চরিত্রে ধারণ করেনি/করে না; সেই নৈরাষ্ট্রের/নৈরাজ্যের অভ্যন্তরে একজন মহব্বত আলীর মতো মধ্যবিত্ত মুক্তিযোদ্ধাও স্বপ্নভঙ্গের দোহাই দিয়ে তাই শ্রেণি উত্তরণের সহজ রাস্তা খুঁজতে থাকে/পারে। রাষ্ট্র থেকে নৈরাষ্ট্রের অভিমুখে যে যাত্রা, তার পটভূমিকায় একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধার আপাত সামাজিক শ্রেণি ব্যর্থতা ও এর দায়ভার সহজেই কোনো নব্য বুর্জোয়া দলভুক্ত হওয়ার তাগিদ তো তাকে দিতেই পারে। তাই মূল ব্যর্থতার দায়ভার পুরোপুরি একজন মহব্বত আলীর ওপরেই শুধু বর্তাবে না; বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের গতিপথ স্বাধীনতার প্রধানতম আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে কিনা সেটাও তো দেখা প্রয়োজন।
চলচ্চিত্রের নায়ক মহব্বত আলীর বন্ধুমহলের মধ্যেই এই নয়া-ধনিক শ্রেণিকে দেখতে পাই এবং তিনি নিজেও চাকরি ছেড়ে তার এই উঁচুতলার বন্ধুমহলের সঙ্গে সামিল হতে চান। ‘আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার’ এই সহজ তরিকার সঙ্গে ৭১-এ কুড়ি ছুঁই ছুঁই বয়সের সেই মুক্তিযোদ্ধা তরুণের যে স্বপ্ন/আদর্শ তার আপসনামার সহজ সমীকরণই দেখতে পাই ঘুড্ডির শুরু থেকে। একেবারে শুরু থেকেই চলচ্চিত্রটিতে সহজ শ্রেণি পরিবর্তনের একটা সুযোগ চোখে পড়ে। এই শ্রেণি পরিবর্তনের শুরুটা হয় সেই ‘মোটকুর লন্ড্রি’র দোকান থেকেই, যেখানে নিজের পুরনো পোশাক পাল্টে ‘আসাদ’ রূপান্তরিত হতে পারে কেতাদুরস্ত কোনো মহব্বত আলীতে। এই রূপান্তর খুব সহজ হলেও সস্তা হয়তো নয়। এই পোশাকি রূপান্তরের তাৎপর্য কিছুটা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন, কেননা এই পোশাক তাকে যে শুধু একটা কেতাদুরস্ত নাম দিচ্ছে তাই নয়, এটি তার আত্মপরিচয়ের খোলনলচেই পাল্টে দিচ্ছে। এই নব্য রূপে হাজির হয়েই তিনি উচ্চ-শ্রেণিতে অবস্থান করা এক শিক্ষিত তরুণীর প্রেমের যোগ্য হয়ে উঠেন। যদিও ফকিরাপুলের দরিদ্র গলিতে থাকা এই মুক্তিযোদ্ধা তরুণের ঘরের দেয়ালে এখনো মাও সে তুঙ-এর পোস্টার ঝোলানো থাকে, তবুও তার অন্তর্ভাবনায় সমাজতান্ত্রিক বোধ/সমাজ-কাঠামো বদলের আকাঙ্ক্ষা আর প্রকাশ পায় বলে মনে হয় না। আমরা বুঝতে পারি সমাজ-কাঠামো পরিবর্তনের একটা স্পৃহা তার মধ্যে হয়তো ছিলো বিগত সময়ে, কিন্তু তা ব্যর্থ হওয়ার কোনো নজির অথবা সফল করার চেষ্টা ঘুড্ডির ন্যারেটিভে দেখা যায় না। বরং যা দেখি, তাহলো এই বিদ্যমান সমাজ-কাঠামোর ফাঁকফোকর গলে নিজেকে এই সিস্টেমের একজন অংশীদার বানানো।
মহব্বত আলীর নয়া পরিচয় মোটেও বৃত্তের বাইরে থেকে কেন্দ্রের প্রতি কোনো কাউন্টার নয়; বরং বৃত্তের বাইরে থেকে কেন্দ্রে প্রবেশের চেষ্টা। তাই খুব সহজেই রিকশা থেকে নেমে বন্ধুর নতুন ও দামি মডেলের গাড়িতে চড়ে ফাইভ স্টার হোটেলের সামনে দামি সিগারেট ফুঁকানো, একই সঙ্গে নয়া বেনিয়া সমাজের প্রতি পরোক্ষ তিরস্কারও যেমন হতে পারে, তেমনই নিজের প্রান্তিক অবস্থানের অনুপযোগিতাকেও নির্দেশ করে/করতে পারে। আবার তার শ্রেণি চরিত্রের একটা ফ্লুইডিটিও লক্ষ করার মতো। বিষয়টা এমন নয় যে, তার কেতাদুরস্ত ‘মহব্বত আলী’ হয়ে ওঠা কোনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত; দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার শ্রেণি চরিত্র/পেশাতেও ঘটে বিস্তর রূপান্তর। তার নিজের ভাষ্যে,
সকালে মোটকুর লন্ড্রি সুপারভাইজার, বিনিময়ে পোশাক-আশাক যখন যেটা খুশি [পরা যায়]।
দুপুরে অফিস সুপারভাইজার মতিঝিল/দিলকুশা, যখন যে টাইমে যার অফিস কাছে। একবার ঢু মারলেই হলো।
সিগারেট চুন্নু আর লাঞ্চ ফরিদ আলী। নো চিন্তা; ডু ফুর্তি।
এই ভবঘুরে জীবন কি শ্রেণিহীনতার অপর রেপ্রিজেন্টেশন কিনা সেটা ভাববার বিষয়। কারণ মহব্বত নিজেই এই সহজ শ্রেণি/পেশা উত্তরণকে জাস্টিফাই করতে চান/চেয়েছেন একটা ভিন্ন উপায়ে। তিনি বলেন, ‘ফ্রড নই; ফটকাবাজও নই। যুদ্ধশেষের প্রাপ্য। হিসাবের পাওনা।’
এই যুদ্ধশেষের প্রাপ্য/হিসাব কী হতে পারে? যদি ধরেই নিই অন্য সবার মতো অর্থ-বিত্তের মালিক তিনি হতে পারেননি; আর সে কারণেই কি শুধু তার এই সামাজিক বৈষম্যের ভিতর নিজের সুবিধাজনক জায়গা খুঁজে নেওয়ার প্রয়াস না কি এই বেনিয়া সমাজে নিজের সর্বহারা অস্তিত্বের উপস্থিতি জানান দেওয়ার ইচ্ছা? কিন্তু চলচ্চিত্রের এক পর্যায়ে ঘুড্ডির (চলচ্চিত্রের নাম চরিত্র এবং নায়িকা) করা শ্রেণিহীন সমাজে তার বিশ্বাস আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে যে হেঁয়ালি জবাব মহব্বত আলী দেন, তা থেকে তার রাজনৈতিক মনস্তত্ব পাঠ যতোদূর করা সম্ভব, তাকে একজন অ্যামভিব্যালেন্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবেই মনে হয়।
ঘুড্ডি : আপনি বলেছিলেন জনতা ক্লাস। ক্লাস। আপনি ক্লাসলেস সোসাইটিতে বিশ্বাস করেন?
মহব্বত আলী : হুম, করি। রোববার। সানডে। সানডে কমিউনিস্ট। আমি রোববারের কমিউনিস্ট।
ঘুড্ডি : সানডে কমিউনিস্ট? আহা, বুঝিয়ে বলবেন তো।
মহব্বত আলী : রোববার সকালে যখন অফুরন্ত অবসর, খবরের পাতায় যখন গরম খবর, আহ্, সর্বহারা জনতা, আহ্, দুর্ভিক্ষ, খরা; আহ্, তখন আমার মনের ভেতর জেগে ওঠে উদাত্ত রবীন্দ্রসংগীত ‘বাঁধ ভেঙ্গে দাও, বাঁধ ভেঙ্গে দাও, বাঁধ ভেঙ্গে দাও’। আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথ কি বিপ্লবী ছিলেন?
তার দ্বিধাগ্রস্ত/উভয়মুখী/দ্বিচারী এই অভিব্যক্তি (যেখানে সর্বহারা শ্রেণিতে তার বিশ্বাস আছে কি নেই, সেই উত্তর পাওয়াটা মুশকিল) তার ব্যক্তিক অবস্থান নিয়ে নিজের সংশয় প্রকাশ করে অথবা প্রকাশ করে বুর্জোয়া-প্রলেতারিয়েতের বাইনারিতে তার মধ্যবর্তী অবস্থান। শ্রেণির প্রশ্নে এই ‘ইন বিটুইননেস’ তার ব্যক্তি মানসে চলতে থাকা বহমান এক দ্বন্দ্ব, যা থেকে এক ঝটকায় পোশাক পরিবর্তন/গাড়ি ধার করেই মহব্বত আলী হয়ে ওঠার মতো সহজিয়া উপায় আর থাকে না। এই ‘ইন বিটুইননেস’, যার কারণে তার শ্রেণি চরিত্র/ব্যক্তি বিশ্বাস দ্বিধান্বিত একটা অবস্থানে রয়ে যায়, হতে পারে তার ব্যক্তি মানসে যে পরিবর্তন তারই এক অ/সচেতন উৎপাদন। এই আদর্শিক অ্যামভিব্যালেন্স আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে তারই নিজের এক মনোলগে—‘মেয়েটা বলছিলো যুদ্ধ। যুদ্ধের স্মৃতি। আর আমি? আমি আসলে খুঁজছি। একাত্তরের ধ্বংসস্তুপ থেকে খেতাব, প্রতাপ আর ইন্ডেন্টিং এর দালানের ভিতর। কী? আমিও তো যুদ্ধ করেছিলাম। আমার পরিচয়? এখন মুক্ত?’
তিন.
মুক্তির ব্যাপারে তার নিজের সংশয়ই প্রমাণ করে তিনি মুক্ত নন। তার পরিচয় নিয়ে তিনি নিজেই সন্দিহান। এই দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান থেকেই তার কাছে শ্রেণিচ্যুতির/জনতা ক্লাসের আহ্বান আর উদাত্ত/ভয়েসড হয়ে পৌঁছুতে চায়/পারে না। সে যে পরিচয়/মুক্তি খুঁজতে চায়, তা হয়তো ‘একাত্তরের ধ্বংসস্তুপ থেকে’ আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেই পারেনি। বিদ্যমান সমাজ-কাঠামোর এই নিয়মে তার আসাদ থেকে মহব্বত আলী, তারপর রোববারের শখের কমিউনিস্ট হয়ে ওঠা, তা নিতান্তই একটা ‘মকারি’। এই ‘মকারি’ তার নিজেকে/নিজের আদর্শিক অবস্থানের দুর্বলতাকে অথবা রাষ্ট্র-কাঠামোকে, যা শ্রেণি উত্তরণের সহজপাঠ সমাজে চালু রেখেছে এবং স্বাধীনতার মৌলিক চেতনাকেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রান্তিক করে তুলেছে। যে মুক্তিযোদ্ধা স্বাপ্নিক এক তরুণের কাছে শেষমেষ ‘একটা গোষ্ঠীবিপ্লবের চিন্তা’ ছিলো প্রধান, সেই কিনা নয়া বুর্জোয়া শ্রেণির উত্থানে নিজের আত্মপরিচয় হারাচ্ছে। তাই শ্রেণি বাইনারির মধ্যবর্তী স্পেইসে তার অস্তিত্ব সঙ্কটাপন্ন।
চার.
রোববারের কমিউনিস্ট কি কোনো শখের/রোমান্টিক বিপ্লবী অবস্থান নাকি উচ্চ/মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিতে ‘কমিউনিজম’ ধারণার যে হাল-ফ্যাশনের চর্চা তাকে বোঝাচ্ছে? এই উচ্চ/মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতি মহব্বত আলীর যে একটা আনকনশাস ক্ষোভ আছে, সেটা বেশ পরিষ্কার। যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য কার কাছ থেকে তিনি আদায় করতে চান, সে ব্যাপারেও একটা প্রচ্ছন্ন ধারণা চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভে আছে। বন্ধুদের গাড়ি ব্যবহার, থ্রি ফাইভ সিগ্রেট ফুঁকানো, বিদেশি মদ এই সব সুবিধা আদায়, সে তো এই ধনিক বন্ধু শ্রেণিদের থেকেই করছে ঠিকই, আবার তাদের শ্রেণিকে ‘বেনিয়া, শালা, জাত বেনিয়া’ বলতেও তার দ্বিধা দেখি না। এই নতুন করপোরেট সমাজে কমিউনিজমও তো এক পণ্য বই কিছু নয়। রোববারের কমিউনিজমকে আবার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যুক্ত করাটাও বেশ চমকপ্রদ। রবীন্দ্রনাথ নিজেই হয়তো শ্রেণি নিরপেক্ষ ছিলেন না।
অন্যদিকে বাঙালি মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির রুচির প্রশ্নে রবীন্দ্র সাহিত্য/সঙ্গীতের যে গ্রহণযোগ্যতা, তা তো এই বিশ্বকবিকে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির কবিতেই রূপান্তরিত করে। তার সঙ্গে এই কমিউনিজমের সংশ্লেষ ঘটানো তাই চিন্তার অর্থে যথেষ্টই অভিনব, কিন্তু শ্রেণির প্রশ্নে সাংঘর্ষিক। এই সাংঘর্ষিক তুলনাবোধ হয়তো মহব্বত আলীর মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির রুচির প্রশ্নেই একটা আঘাত। এই ভাবনাও অমূলক নয় যে, কমিউনিজম ধারণাকে রবীন্দ্রচেতনা দিয়ে রোমান্টিসাইজ করলে এর আপাত মৌলিক ধারণার যে সঙ্কোচন এখানে ঘটতে পারে, তা এই বিশ্বায়নের যুগে কমিউনিজমের কঠিন উদ্দেশ্য থেকে এটিকে সস্তা সংজ্ঞায় বদলিয়ে ফেলে। সঙ্কোচনের এই একই ব্যাপার আবার ঘটতে দেখা যায়, ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এই শব্দবন্ধকে নিয়েও। একটি কথোপকথন এখানে তুলে ধরা হলো,
ঘুড্ডি : গণ্ডগোলের সময় কোথায় ছিলেন?
মহব্বত আলী : গণ্ডগোল? আমার মাথায় তো কোনো গণ্ডগোল নেই।
ঘুড্ডি : আরে যুদ্ধ।
মহব্বত আলী : কোন যুদ্ধ?
ঘুড্ডি : আমাদের যুদ্ধের কথা বলছি।
মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠলো গণ্ডগোল। আমরা ভাবিলাম ‘সমাজ-বিপ্লব’ আর পরম প্রভু করিলেন গণ্ডগোল। এখন ইহার নাম বিশ্বায়ন। এই জাতীয় ঘটনাকেই ইতালির মহাত্মা আন্তনিও গ্রামশি ডাকেন ‘বেহাত বিপ্লব’১ নামে। ঘুড্ডিকে যদি তার শ্রেণির প্রতিনিধি ধরে নিয়েই দেখি, তবে বোঝা যায়, এই স্বাধীনতা যুদ্ধ তার তীব্রতা হারিয়ে গণ্ডগোলে পর্যবসিত হয়েছে। সবার কাছে এটি মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠেছে কিনা সেটা অবশ্যই ভাববার বিষয়। এটাতে যে কেবল নাম সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে তা নয়; মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিরও ক্রমান্বয় হ্রাস হচ্ছে বোঝায়। তাই রোববারের কমিউনিজমও যদি এক ধরনের বাঁকা ইঙ্গিত হয়ে থাকে, তবে আমাদের সমাজ/জাতি বিপ্লবেরও আরেক সংজ্ঞাগত ও আদর্শিক পতন হয়েছে সেই নয়া পুঁজিবাদী ক্ষমতার হাতে।
চলচ্চিত্রের আলোচ্য এই সংলাপ খুব গুরুত্বপূর্র্ণ। কেননা মুক্তির সংগ্রাম যে সর্বস্তরের শ্রেণির মুক্তি ঘটাতে পারেনি তা যেমন মহব্বত আলীর আদর্শচ্যুতি আর আত্মপরিচয়ের অবলুপ্তি থেকে বুঝতে পারি, আবার তেমনই সমাজ-কাঠামোর যে বিষম চিত্র তা থেকেও উপলব্ধি হয়। এমনকি ঘুড্ডির পক্ষেও তো তার শ্রেণি ছেড়ে বেরিয়ে আসা খুব সম্ভবপর কোনো কাজ ছিলো না। আসাদ যদি নতুন মডেলের গাড়ির সামনে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে কেতাদুরস্ত মহব্বত আলী হয়ে না উঠতে পারতো, তবে তাদের ভালোবাসার পরিণতি অতো সহজ হতো কিনা তাও বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে।
ভালোবাসার চেয়েও এখানে শ্রেণি কি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না? অন্যথায়, কেনো মহব্বত আলীর পক্ষে ঘুড্ডিকে নিজের সঠিক পরিচয় জানাতে এতো কুন্ঠাবোধ ছিলো? সে কি হারানোর ভয়ে? নিজের শ্রেণিগত অবস্থান প্রকাশ পেলেই শ্রেণি উত্তরণের সম্ভাবনাও হাতছাড়া হতে পারে এবং সেই সঙ্গে ভালোবাসাও। এই পরিস্থিতি অনেকটা প্যারাডক্সিকাল এবং এই প্যারাডক্স থেকে মহব্বত আলীর মুক্তি ছিলো কিনা জানা যায় না, তবে এটা অনেকটা পরিষ্কার হয় যে, এই পুঁজিবাদী বিন্যাসে ভালোবাসাও শ্রেণি-নিরপেক্ষ কোনো প্রপঞ্চ নয়। আর সেজন্যই হয়তো চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভে শ্রেণি মুক্তির অথবা সমাজ পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা দেখাতে না পারলেও, মহব্বত আলী আর ঘুড্ডির ভালোবাসা চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে পরিণতি পেতে পারে। আশার কথা হলো, এটাই এই চলচ্চিত্র।
তবে তাদের নাগরিক ভালোবাসা কিন্তু এই শ্রেণি সঙ্কটের নগরে আর আটকে থাকে/থাকতে পারেনি। হয়তো নগর ছেড়ে মহব্বত আলী নদী উপকূলে আশ্রয় না পেলে এই ভালোবাসার কী পরিণতি হতে পারতো, তা জানতে পারি/পারবো না। সমতলে পৌঁছানোরও একটা মাজেজা আছে। এটাই সম্ভবত চলচ্চিত্রের একটা নিরপেক্ষ সেটিং, যেখানে নগরের অবক্ষয় এসে পৌঁছায়ই না এবং পাশাপাশি এই নিরপেক্ষ স্পেইস হয়তো একটা সাম্যবাদের সম্ভাবনাকেও চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে মূর্ত করে তুলতে পারে। সেই প্রসঙ্গে মহব্বত আলী/আসাদের উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে—‘দুনিয়ার সমস্ত জমিন যদি এমন সমান হইতো! উঁচা নাই, নীচা নাই ...’।
উঁচুনিচু সমাজ থেকে মুক্তিই হয়তো খুঁজছিলেন তিনি, কিন্তু তার প্রকাশ হয়তো সেই নাগরিক আবহে তৈরি করা তার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। তাই আত্মহত্যার যে চেষ্টা, তা হয়তো ভিন্ন অর্থে তার নিজের আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ারই একটা প্রয়াস ছিলো। আর এই সমতলে এসে তার যে উপলব্ধি, তা হয়তো একাত্তরের ধ্বংসস্তূপ থেকেই বের করে এনে নতুন এক সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে এই সমতল নদী হয়তো উঁচুনিচু নগরের যে বৈষম্য চিত্র তাকে কাউন্টার করে/করতে পারে। এবং সেই সঙ্গে এক শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্নকেও প্রকট করে, যা হয়তো মহব্বত আলীকে প্রান্ত ও কেন্দ্রের মধ্যবর্তী অবস্থান থেকেও আকাঙ্ক্ষিত মুক্তি দিতে পারবে।
লেখক : অনুপম সেন অমি, ইউনিভার্সিটি অব ইন্টার্ন ফিনল্যান্ডে ইংলিশ অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ নিয়ে পড়াশোনা করছেন।
anupams@uef.fi
তথ্যসূত্র ও টিকা
১.কয়েক বছর আগে সলিমুল্লাহ খানের সম্পাদনায় ‘বেহাত বিপ্লব’ টার্মটি ব্যবহার করে একটি গ্রন্থ প্রকাশ হয়। খান, সলিমুল্লাহ (সম্পা., ২০০৭); আহমদ ছফা মহাফেজখানা প্রথম খণ্ড : বেহাত বিপ্লব ১৯৭১; অন্বেষা প্রকাশন, ঢাকা।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন