Magic Lanthon

               

দীপ্ত উদাস

প্রকাশিত ১৭ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আসা যাওয়ার মাঝে

দেখার মতো চলচ্চিত্র নয় ... কিংবা ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’

দীপ্ত উদাস

 

মানুষ যে যার অবস্থান অনুযায়ী পারিপার্শ্বিক যাবতীয় বিষয়ের মানদণ্ড নির্ণয়ের প্রয়াস চালায়। বেকার অবস্থার কথাই ধরা যাক। বিশ্বাস করুন, আমি অনেক বিষয়ের অবতারণার মাধ্যমে লেখাটির আরম্ভ করবো ভেবেছিলাম। কিন্তু যে বিষয়টিই প্রারম্ভিকা অবতারণায় ভেবেছি কোনোটাতেই ঠিক তুষ্ট হতে পারিনি। বার বার মনে হয়েছে, নাহ এই বেকারত্ব, কাজহীন, অর্থহীন, লাঞ্ছনাপূর্ণ জীবনের চেয়ে কোনো কষ্টের জীবন হয় না। রাজধানী শহরের রাতের ফুটপাতে ঘুমন্ত মানুষ দেখেও আমার চেয়ে বেশি কষ্টে আছে বলে মনে হয়নি। তারচে রাস্তায় ফুল হাতের ছোটো শিশুটি যে রোজ কিছু ‘পঁচা’ ফুল বিক্রি করে নিজের পেটের বন্দোবস্ত করে চলেছে, তাকেই বেশি সক্ষম মনে হয়েছে। ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বহুদিন তাদের দেখে হিংসা হয়েছে। নিজেকে ধিক্কার দিয়েছি, অথর্ব ভেবেছি।

বেকারত্ব বলতে আমাদের সমাজ কেবল চাকরিহীনতাকে, অর্থ উর্পাজনহীন কাজকেই বুঝিয়ে থাকে। এই যে লিখতে বসেছি, এটাও তো কাজ। কিন্তু পরিবার, সমাজে এর কোনো মূল্যায়ন নেই। এই লেখালেখির সৃজন কাজকর্ম দিয়ে হয়তো দু’চারটে প্রেম করা যায়, তবে বিয়ে করা হয়ে ওঠা সম্ভব নয় ঠিকঠাক। আর যদি বিয়ে-টিয়ে করাও হয়, তাহলে ঠিক আসা যাওয়ার মাঝে চলচ্চিত্রটির মতো হয়ে যাবে জীবন।

চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলাটা আমার উদ্দেশ্য নয়, বা সে ব্যাপারে আমার পারঙ্গমতাও নেই। আর যদি বলেই ফেলি তাহলে বলবো, সংলাপহীন চলচ্চিত্র বোঝা এবং সে সম্পর্কে কিছু তথ্য দেওয়া আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আমি কেবল আলী বাবা চল্লিশ চোর কিংবা চ্যাপলিন অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় মঞ্চে মূকাভিনয় করেছিলাম তার কথা বলতে পারি।

কথা না বলে দর্শককে বোঝানোর মতো কঠিন কাজ আর নেই। আজকালকার মানুষকে তো কথা বলেই বোঝানো মুশকিল। বলবেন একটা আর বুঝবে আরেকটা। আলী বাবা চল্লিশ চোর সেই সময়েই সেটা করতে সক্ষম হয়েছিলো বলে অবশ্যই তা অনুসরণীয় নির্বাক চলচ্চিত্র। আর অনেক পরে আসা যাওয়ার মাঝে কথাহীন চলতে থাকে ঘণ্টার উপরে। এই চলচ্চিত্রটিতে এমন এক সহজ কাহিনি এর গল্প রূপে উপস্থাপিত হয়েছে, তা সহজে বুঝতে পারা যায়। আর এ কারণেই শিরোনামে বলেছি, আসা যাওয়ার মাঝে দেখার মতো চলচ্চিত্র নয়। একেই তো কথা নেই, হাসিতামাশা নেই, গান, রাজনীতি, ফাইটিং নেই, তার ওপরে চলচ্চিত্র শুরুই হচ্ছে ব্যাকগ্রাউন্ডে চাকরি হারানোর সংবাদ দিয়ে। তাও আবার মিল কারখানার শ্রমিকের। আচ্ছা, এমন খবর কী আপনারা কখনো শুনেছেন, বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনো দেশের পোশাক কারখানার শতাধিক ম্যানেজিং ডিরেক্টরের চাকরি একসঙ্গে চলে গেছে। তারা রাস্তায় নেমে কোট-টাই পরা অবস্থায় অনশন করছে, মাইকে তাদের চাকরি পুনর্বহাল করার হুমকি ভেসে আসছে। আপনিও শোনেননি, আমিও শুনিনি। কারণ হলো দেশে যা অনাচার হয়, তা নিম্নবিত্তের ওপর দিয়েই হয়। চলচ্চিত্রটির শুরুর ঘটনা একেবারে স্বাভাবিক এজইউজিয়াল। তবে ‘যার চলে যায় সেই বোঝে হায়’, সেই কেবল বুঝতে পারে, সে কী হারালো। কতোগুলো ছোটো ছোটো স্বপ্ন মরে গেলো।

সাহিত্যের ‘অ্যাবসারডিটি বা বিমূর্ত’ বিষয়টি মানব মনে কতোটা তরপানি তুলতে পারে, তা আমরা সবাই কমবেশি জানি। শেক্সপিয়রের ‘ওথেলো’র কথা মনে পড়ছে। ডেসদিমোনার বুকে ওথেলো ছুরি ঢুকাচ্ছে আর বলছে, তোমার বুকে ছুরি ঢুকলে তুমি যতোটা কষ্ট পাবে তার চেয়ে অধিক কষ্ট রয়েছে আমার বুকে। ছুরি বুকে ঢুকলে, নিশ্চিত মানুষের মৃত্যু হবে; কিন্তু ওথেলোর বুকের কষ্ট সেই মৃত্যুর অধিক। মৃত্যুতে মানুষের যতোটা কষ্ট হয়, তার চেয়ে বেশি কষ্ট নিয়ে ওথেলো বেঁচে থাকে কিংবা মানুষ তার যাপিত জীবন ধুকে ধুকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মিথ্যে স্বপ্ন বুনে। আসা যাওয়ার মাঝের দুটি চরিত্রও তাই। পরস্পর পরস্পরের কাছে বিসর্জিত হয়ে অর্থ উপার্জন করছে। একটু ভিমড়ি খাওয়ার মতো আয়োজন দিয়ে শুরুর দিকটা শুরু হয়েছে চলচ্চিত্রটির। বিসমিল্লাহ খানের সানাইয়ের সুর শুনলেই, মনে হয় অবশ্যই কারো বিয়ের কাজটা শুরু হবে বা হচ্ছে। বিসমিল্লাহ খানের সানাই বাজছে কিন্তু পর্দায় যখন চরিত্রের আগমন ঘটে, তখন হন হন করে হাঁটা এক নারীচরিত্রের দেখা মেলে। ধক করে বুকে একটা ধাক্কা লাগে। কী হলো? বিয়ে হয়েই কাক ডাকা ভোরে ভেঙে গেল? এর উত্তর পেতে যদিও বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না, কেননা আমি নিজেও ঠিক সেরকম এক পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করছি। ছোটো আয়তনের মাসিক উপার্জনের জন্য যে কী পরিমাণ ছোটাছুটি! নগর পরিবহনের লোকাল বাসে ঝুলে ঝুলে ঠিক সময়ের আগে কর্মস্থলে পৌঁছানোর একই তাড়া সেই নারীচরিত্রটির ভিতরেও যেনো আমি নিজেকে খুঁজে পাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মনে পড়ছে ভীষণ। ওনাকে অবশ্য সর্বদাই আমাদের স্মরণে রাখতে হয়। নানা কারণে। উনি বলেন, ‘অল্প লইয়া থাকি, মোর যাহা যায় তাহা যায়।’ তার পিতার হয়তো অগাধ ছিলো, কিন্তু তিনি তো নির্দিষ্ট পরিমাণই লইতেন। আসা যাওয়ার মাঝের চরিত্রও তাই। যদি কোনো কারণে হেরফের ঘটে কর্মস্থলে, তবে তাহা চলে যাবে, তাতে সে হয়তো সর্বশান্ত হয়ে যাবে।

পরের কিছু সময় পরে একটি চলচ্চিত্রিক উপস্থাপনে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলাম, এক দৃশ্যে আমার প্রিয় অভিনেতাদের একজন (ঋত্বিক চক্রবর্তী) যার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিলো বাকিটা ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ‘চিহ্ন’ সাহিত্য আড্ডায় শহীদ ইকবাল স্যার একদিন বললেন, এটা দেখেছিস? বললাম, না স্যার। উনি বলেন, ‘কী যে দেখিস তোরা, এই বয়সেও এই সিনেমা দেখিস নাই-অ্যাহ!’ সেই রাতেই চলচ্চিত্রটি খুঁজে দেখে মুগ্ধ হয়েছি। সেই থেকে তার সঙ্গে পরিচয়। দেখছি আসা যাওয়ার মাঝেতে আমার প্রিয় অভিনেতা বেশ দায়িত্বশীল পুরুষের মতো বউয়ের শাড়ি, পেটিকোট, নিজের পাজামা-পাঞ্জাবি সকাল সকাল রোদে মেলে দিচ্ছেন। তবে চলচ্চিত্রের শেষাংশে পৌঁছালে পুরো ভিন্ন বার্তা দেয় এই পেটিকোট-পাজামা। প্রথমে ভেবেছিলাম, প্রেমের কারণে পরিবারের অমতে বিয়ে করে দুজন মিলে হয়তো উপার্জন করছে; আর প্রেম যা, তাই আছে। কিংবা বিয়ের পর চলে এসেছে বড়ো শহরে। তাই দুজন মিলে গড়ছে নিজেদের। ত্রিশোত্তর কবি ও পঞ্চপান্ডব খ্যাত বিষ্ণু দে বলেন, ও প্রেম-ট্রেম বাজে, দুজন শুধু দুজনকে খোঁজে। কিন্তু নারী-পুরুষ তো যেকোনো একটা কিছুর টানে পরস্পরের কাছে আবদ্ধ থাকে। তবে এখানে পরিচালক যেনো বর্তমান সমাজের এক প্রতিবিম্ব দেখাতে সক্ষম হন। হয় আত্মিক মেলবন্ধন কিংবা শারীরিক মোহ যেকোনো একটা তো থাকবে। তাদেরও আছে, এ দুটো বিষয়ের প্রতি দুজন খুবই সচেতন কিন্তু সময় নেই! একজনের বুকে আরেকজনের মাথা রাখার সময় নেই; সময় নেই বলার হাতঘড়িটা, ওয়ালেটটা, শার্টটা, সু জোড়া ঠিকঠাক আছে কি না! ওইতো সকালে রেখে যাওয়া কাপড় শুকাতে দেয় স্বামী, স্ত্রী তখন কর্মস্থলে; আর স্ত্রী সন্ধ্যায় ফিরলে স্বামী যায় পত্রিকা অফিসে নাইট ডিউটিতে। বাড়িতে একা থাকাকালীন তারা বিছানায় ছটফট করতে করতে সময় পার করে। সঙ্গম-সোহাগ নৈব নৈব চ, কাপড় কাঁচা চলে রোজ।

ম্যাকবেথ কিংবা ইডিপাসের মতো রক্তাক্ত ট্রাজেডি এখানে নেই। ডাকিনীর প্ররোচনায় ও স্ত্রীর উৎসাহে রাজাকে খুন করে ম্যাকবেথ পরে কেবল রক্তমাখা হাত দেখে নিজেকে নিজে ক্ষমা করতে পারে না। ইডিপাস ভাগ্য-পূর্ববাণী কর্তৃক বলি হয়। বাস্তবতা তাকে মায়ের সঙ্গে সহবাস করায়। অনুশোচনায় তিনি নিজের চোখ নিজেই নষ্ট করে ফেলেন। রক্ত ঝরে। এগুলোতে রক্ত ঝরে, যা আমরা দেখতে পাই। কিন্তু আসা যাওয়ার মাঝেতে এক অনবরত ঝরা রক্ত সহজে আমরা এড়িয়ে যাই। জীবনের জন্য জীবনকে আমরা কতো কষ্ট দিতে পারি, তা দেখা যায় এই চলচ্চিত্রে। একজন কাজে যায় আরেকজন কাজ থেকে আসে। এই যে আসা এবং যাওয়ার মধ্যবর্তী সময় তখন তাদের দেখা হয়, কথা হয় না। ঘড়ি মেপে তারা চোখে চোখ রাখে। চোখে চোখের মায়া থাকে না। যাবার সময় হয়ে যায়, কেউ কাউকে পিছু ডাকে না। মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিনিধিরা বেশ পরিপাটি হয়। দেখবেন কম দাম দিয়ে কেনা হলেও সেগুলো বেশ খাতির করে ব্যবহার করে তারা। কেনা চাল, ডাল, পোশাক পরিপাটি করে রাখে। সীমিত আসবাব তৈজসের পরিপূর্ণ ব্যবহার করে। ব্যাকগ্রাউন্ডে নজরুলগীতি কিংবা রবীন্দ্রসঙ্গীত ও অন্যান্য চাকরি পুনর্বহাল মাইকি আওয়াজ চলচ্চিত্রটিকে পরিপাটি করে তোলে বটে! কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যেনো আপনার, আমার, আমাদের ছোটাছুটিই উঠে এসেছে।

চলচ্চিত্রের বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরা দেয়াল, শ্যাওলা পরা গলি, নগর পরিবহন, ট্রাম, বাইসাইকেল ইত্যাকার বিষয়গুলো মূলত একটি শ্রেণিকে নির্দেশ করে। যে শ্রেণির মানুষেরা জীবনের প্রথম পর্যায়ে বিভিন্ন রঙের স্বপ্ন দেখে, শিক্ষিত হয়, উচ্চশিক্ষিত, ভালো চাকরি খোঁজে, ব্যর্থ হয়ে তখন জীবনের ঘানি টানতে টানতে মৃত্যু তাদের হতাশ করে। আর যারা চেষ্টা করে, আসা যাওয়ার মাঝের নায়ক-নায়িকার মতো তাদের পুরো জীবন বিসর্জন দিতে হয়। জীবনযাপনকালে তারা কখনোই জীবন নামক সত্তার সঙ্গে দেখা করতে পারে না। জীবন তাদের দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে। কবিতা, উপন্যাস পড়ে যেমন একটি চিত্র নিজের মতো করে এঁকে নেওয়ার সুযোগ থাকে চলচ্চিত্রে কিন্তু তেমনটা সম্ভব নয়। আবার বই পড়ে যে চিত্র একবার আপনি আঁকবেন চলচ্চিত্রে সেই চিত্রটিই যতো ভালো উপস্থাপন করা হোক না কেনো, তা হয়তো আপনার ভালো লাগবে না। উদাহরণস্বরূপ আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’র জয়গুণের বাড়ির উঁচুভিটা, তালগাছ, সবুজ গাছে ঘেরা পরিবেশটি বইয়ে পড়াবস্থায় যেমন চিত্র আমি এঁকেছিলাম, চলচ্চিত্র আমার সেই পিপাসা মেটাতে পারেনি।

আবার যেমন চলচ্চিত্র পথের পাঁচালীতে অপু-দূর্গার ট্রেন দেখার দৃশ্যটি সত্যজিৎ রায় যতোটা ফুটিয়ে তুলেছেন, উপন্যাসটি পড়ার সময় আমি এতোটা গভীরভাবে ভাবতে পারিনি। চলচ্চিত্র, সাহিত্যের এমন একটি মাধ্যম যা দর্শককে সরাসরি একটি বিষয় উপস্থাপন এবং দর্শকও শ্রবণ ও দর্শনের মাধ্যমে সেই বিষয়টি উপলব্ধি করে। এখানে ক্ষেত্র বিশেষে সমালোচনা করা যায় খুব অল্প জায়গা নিয়ে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমালোচনা করাটাও বোকামি। কেননা গল্প লেখক হয়তো একভাবে গল্পের প্লট তৈরি করেন, পরিচালক আবার তার মতো করে গল্পটির চিত্রায়ণ করেন। এটুকুন বলতে পারি যে, যা নিয়ে চলচ্চিত্রটি হয়েছে মূলত সে বিষয়টির তথা মানুষ নিজের প্রেম, ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে কেবল অর্থ জমানোর পিছনে ছুটছে, সেটা ভিখারী থেকে আমলা পর্যন্ত বজায় আছে তাতে একটা বিষয় খুব মোটা দাগে উঠে এসেছে চলচ্চিত্রটিতে। মানুষ নিজের সত্তাকে ভুলে কেবল এই একটা কাজের ভিতরে ডুবে গেছে।

অর্থ জমানোর নেশায় পেয়েছে মানুষকে। নেশাগ্রস্তরা যেমন অনেক কিছু ভুলে থাকার ব্যর্থ চেষ্টায় নেশা করে থাকে, আবার খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ভুলে যায় বেমালুম, তেমনই বর্তমান সময়ে বাস করা মানুষগুলোর জীবনে কোনো বিনোদনের চাহিদা নেই, মানুষের সঙ্গে একটু হেসে কথা বলার সময় নেই, যেনো যন্ত্রচালিত রোবট একেকটা। নয়টা-পাঁচটা গোছের। আবার এই যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, এই ব্যাপারটির ভিতরে যদি আপনি না থাকেন বা এ ব্যাপারে আপনি একজন প্রতিযোগী না হন বা চাকরি করবেন, চাকরি চলে গেছে, আবার চাকরি পাচ্ছেন, প্রেম, বিয়ে, বর্তমান বাজারের চড়া উত্তাপ, অসুস্থ বাবা-মার দায়িত্ব, সন্তানের স্কুল ফি ইত্যাদি বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকেন তাহলে বলবেন, ‘ধুর, জীবনে এতো অর্থের দরকার কী? দুটো ডাল-ভাত ফুটিয়ে খেয়েই তো জীবন পার করা যায়।’ কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার বোধ হয় এই ব্যাপারটার মধ্যেই ছিলেন, তাই হয়তো বলেছেন,

                                    কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে

                                    কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে

মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর ঈশ্বরী পাটনীর মাধ্যমে যে প্রার্থনা করেছিলেন, তবে তার কী হবে‘আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে-ভাতে।’ সন্তানের মঙ্গলার্থে হলেও আমরা ছুটছি। হীরক মুশফিক তার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মরীচিকা মায়াতে ব্যাকগ্রাউন্ডে বলেন, বাবার উপার্জিত টাকায় ‘সাধ’ পূরণ করা যায় কিন্তু নিজের উপার্জিত টাকায় যা মেটানো যায় তা হলো প্রয়োজন। এ সত্য বাক্য আমি অস্বীকার করতে পারছি না। আপনি? আমাদের সন্তানেরাও কী তাই নয়? তাই বলছি, এ চলচ্চিত্র ভালো বা মন্দ হয়েছে কী না জানি না; তবে বলবো, এটা দেখার মতো চলচ্চিত্র নয়, কেননা বস্তুত চিত্রে এতে যা দেখায় তাতে আসলেই কারো সঙ্গে কোনো প্রকার কথা বলারই দরকার নেই আজকাল। মানুষ কেবল ছুটছে কাজের পিছনে, কাজের পিছনে আর কাজের পিছনে। দেখলে কেবল নিজেকে খুঁজে পাবেন সেখানে, আর সাথে কষ্ট। তখন ভাববেন, তাই তো, আমিও কী তবে রোবটিক হয়ে যাইনি!       

 

লেখক : দীপ্ত উদাস, বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন। বর্তমানে ঢাকার ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলে বাংলা পড়ান।

diptoudas93@gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন