Magic Lanthon

               

মফিজ ইমাম মিলন

প্রকাশিত ১০ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ধারাবাহিক পাঠ

সিনেমা দেখার গল্প

মফিজ ইমাম মিলন

 

ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকালে আপনা-আপনিই তুলনা এসে পড়ে। আমাদের কালে এতো আনন্দের উৎস কোথায়ইবা ছিলো আর কেনোইবা তা হারিয়ে গেলো; কে বলবে? সেকালে একটা সিনেমা দেখার প্রস্তুতি কতোদিন আগে থেকেই না নিতে হতো। একাল তো বোঝা যায়, বর্তমান সময়টা। কিন্তু সেকাল? সপ্তম এডওয়ার্ডের টাকমাথা অথবা মুকুটপরা রানি ভিক্টোরিয়ার প্রতিকৃতি বসানো রূপার টাকার আমল; বৃদ্ধাঙ্গুলি আর তর্জনীর মাথায় বসিয়ে টোকা দিয়ে যে টাকার শব্দ শুনে বোঝা যেতো, সেটা আসল না খাদ-মেশানো-সেই কাল? সেই বৃটিশ আমল? না, আমাদের সেকাল মানে ষাটের দশকের পাকিস্তান আমল।


সেসময়ে একটা সিনেমা দেখার প্রস্তুতি কতোদিন আগে থেকেই না নিতে হতো। কে কে যাবে, কার সাথে যাবে, বড়ো বুকে খবর দাও, ছোটোটাকে সঙ্গে নাও, রিকশাওয়ালাকে ঠিক করে রাখো; কয়টার শো ভালো হবে? এমনই কতোই না প্রস্তুতি দেখেছি মা-খালাদের। এরপর তাদের ছিলো সাঁজ-গোঁজের একটা বিষয়। সিনেমা দেখে যখন বাড়ি ফিরতো, তখন কলকল করতে থাকতো সবার মুখ। কয়েকদিন তো তারা কেমন জানি একটা ঘোরের মধ্যেই থাকতো। ওই সিনেমার গান মুখে মুখে ফিরতো তাদের; সুর মিলুক না মিলুক, গান গাওয়া চাই-ই চাই। তবে গান গাওয়ার ক্ষেত্রে বিরহের গানের মর্যাদাই ছিলো বেশি। কালে কালে টেলিভিশন, ভি সি আর, ডিশ, ডি ভি ডি, আইফোন, স্মার্টফোনসেট তো এখন হাতে হাতে। সিনেমা ছাড়া আরো অনেক কিছুই দেখা যায় সেগুলোতে।


দুই.

৬৮ খ্রিস্টাব্দের কথা, উপন্যাসিক আকবর হোসেনের ‘অবাঞ্ছিত উপন্যাসকে সিনেমা বানিয়েছিলো জুপিটার ফিল্মস। সারাদেশে বিশেষ করে নারীদের মধ্যে দারুণ সাড়া জাগে এই সিনেমা দেখার। অন্যান্যদের সঙ্গে আমাকেও নেওয়া হয় সিনেমাহলে। ‘অবাঞ্ছিত শব্দের অর্থ কী, মা, ছোটোখালা কেউই বলতে চাননি। একসময় বিরক্ত হয়ে ছোটোখালা বললেন, অবাঞ্ছিত মানে গুনাহ। গুনাহ শুরু হয়ে গেলো; হঠাৎ নায়ক আজিমের লিপে গান-


                                    চোখ ফেরানো যায় গো

                                    তবু মন ফেরানো যায় না

                                    কেমন করে রাখি ঢেকে

                                    মনের খোলা আয়না


নায়িকা সুজাতা বৃষ্টিতে ভিজে সাদা কাপড় শরীরের সঙ্গে সাটিয়ে রেখেছেন। পায়ের হাঁটু পর্যন্ত কাপড় দুহাত দিয়ে চিপড়ে পানি ঝরাচ্ছেন। আমার তো নজর স্থির হয়ে গেছে হাঁটু পর্যন্ত। সেসময় মেয়েদের হাঁটু দেখা শুধু গুনাহ-ই ছিলো না, ছিলো কবিরা গুনাহ; ইচ্ছে করলে সে অপরাধে দোররা মারতে পারতেন যেকোনো হুজুর। মাঝে মাঝে নায়িকা, নায়ক আজিমকে নিষেধ করছে, ‘দুষ্টু এদিকে তাকাবে না কিন্তু। এই কথা কানে ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গে আমি বেদম শরম পেলাম। তখন বুঝতেও পারলাম এইটাতো সত্যিই গুনাহ। কিন্তু পয়সা খরচ করে দূর-দূরান্ত থেকে এসে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে, আবার কেউ কেউ ব্ল্যাকে টিকিট কেটে এই গুনাহ দেখার জন্য কেনো আসে?


আরো অনেক ঘটনা সেই সিনেমার, সব মনে আসছে না। তবে নায়িকার ছেলে হারিয়ে গেছে; তিনি নদীর পার, হাটের ভিতর অপরিচিত মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা করে চলেছেন-তোমরা আমার খোকাকে দেখেছো কি না। খোকা, খোকা তুই কোথায় গেলি? আমরা যারা দর্শক তারা কিন্তু কয়েকবার খোকাকে দেখতে পেলাম। এক ছেলে হাওয়াই মিঠাই খাচ্ছে, খোকা তার পিছন পিছন ঘুরছে। তার মা সুজাতা পাশ দিয়েই হেঁটে গেলো, দেখতে পেলো না তার খোকাকে! এই না দেখার কষ্টে সিনেমাহলের সব নারীরাই ইস্ ইস্ করে উঠলো। কেউ বললো, আরে হতভাগী তোর কপালে আছে কষ্ট, তুই তোর ছাওয়াল দ্যাখবি ক্যোমনয়ে। একপর্যায়ে আবদুল আলীমের দরাজ কণ্ঠে গান বেজে উঠলো সিনেমাহলের সাদা পর্দায়,


                                    কেহই করে বেচাকেনা

                                    কেহই কান্দে

                                    রাস্তায় পরে ধরবি যদি তারে

                                    চলো মুর্শিদের বাজারে।

 

                                    ... নিজের ঈমান ওজন করো

                                    বিসমিল্লাহকে চাপা রাখ

                                    হৃৎপিণ্ডের ভিতরে ...

                                    চলো মুর্শিদের বাজারে


আমি জিজ্ঞাসা করি মা, মুর্শিদ কী? মুর্শিদের বাজার কোথায় মেলে? আরো কিছু জিজ্ঞাসা করতে চাচ্ছিলাম; তার আগেই ঠুটি চেপে ধরেছে ছোটোখালা-‘চুপ, একদম চুপ। গান শুনতে দে। শীতকালে ঠোঁট এমনিতেই ফাটা ফাটা থাকে। হলুদ পমেট ছাড়া ছেলেদের জন্য কিছু বরাদ্দ থাকে না। হিমানি স্নো-পাউডার ঠোঁট পালিশ সব মেয়েদের জন্য। ছেলেদের জন্য লাল কারবলিক সাবান, যাতে শরীরে খুজলি পাঁচড়া না হয়। খালার ঠুটি চিপায় আমার ততোক্ষণ রক্ত আসতে শুরু করেছে ঠোঁটে। পাশের সিটের মাঝবয়সী দুই নারী আসো আসো করে তাদের কাছে টেনে নেয়। মানুষ মাত্রই আদর সোহাগ পছন্দ করে। মানুষ কেনো জীবজন্তু, পশুপাখিও তাই করে। ভদ্রমহিলাদের আদর-সোহাগ পেয়ে আমিও ব্যথার কথা ভুলে গেলাম, কান্না থেমে যাচ্ছিলো। হঠাৎ ছোটোখালা বাজপাখির মতো ছো মেরে তাদের কাছ থেকে আমায় ছিনিয়ে আনলেন। এই দুর্ব্যবহারের কারণ কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে ভদ্রমহিলা দুজন প্রতিবাদ তো দূরের কথা কোনো আওয়াজও করলেন না। ছোটোখালার দিকে অদ্ভুত এক উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলেন। তাদের দৃষ্টিতে কী কথা ছিলো আমি বুঝতে পারিনি। তবে ফেরার পথে যেটুকু বুঝেছিলাম তা হচ্ছে, ওনাদের পায়ে স্যান্ডেল ছিলো না। জুতা-স্যান্ডেল  পায়ে দেওয়া তাদের নিষেধ। সেকালে হাটে-বাজারে পতিতাপল্লীর মেয়েদের খালি পায়ে আসতে হতো। তারা ‘দেহ ব্যবসা করে। তাদের কোলে চড়ার জন্য বাসায় এসে আর অতিরিক্ত মার খেতে হয়নি। কিন্তু ‘মুর্শিদ, ‘দেহব্যবসা, ‘পতিতাপল্লী এসব শব্দের অর্থ কিছুই বুঝতে পারলাম না।


বড়ো ভাই আর আমার বয়সের ফারাক মাত্র তিন বছরের। সারাক্ষণ একসঙ্গে থাকা, এক টেবিলে পড়া, একই খাটে ঘুমানো, এক গামছায় গা মোছা, তার পুরনো জুতা-স্যান্ডেল পায়ে দেওয়া-এমন সবকিছুতেই মিল থাকায় মনের কথা তাকেই খুলে বললাম। সে যথারীতি বাবার ঘর থেকে ইংলিশ টু ইংলিশ ডিকশনারি এনে ফাতা-ফাতা করে ফেললো। কিন্তু ‘মুর্শিদ, ‘দেহব্যবসা, ‘পতিতাপল্লী খুঁজে তো পেলোই না, বরঞ্চ কী খুঁজছে মায়ের এ প্রশ্নের জবাব ঠিকমতো না দিতে পারায় খিঁচুনি খেলো। তবে শব্দ তিনটি তারও মনে ধরেছে বুঝতে পারলাম। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কায়দে আযম লাইব্রেরির বাংলা অভিধান থেকে উদ্ধার করেছে ‘মুর্শিদকে। মুর্শিদের অর্থ খুবই কঠিন। মুর্শিদ আধ্যাত্মিক গুরু; যিনি ‘এরশাদ করেন, তিনিই মুর্শিদ। এরশাদ অর্থ নির্দেশ। মোট কথা, আধ্যাত্ম সাধনার পথে নির্দেশ দেন যিনি, তিনিই মুর্শিদ। এইটা আরবি শব্দ। এমন করে আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, যা লিখে নিয়ে এসেছে। হঠাৎ দুই ভাইয়ের দুই কান ছিড়ে ফেলার নিয়ত করে টেনে ধরলেন মা। ফকির-ফাকরা হবা! লেখাপড়া বাদ দিয়ে দয়াল মুর্শিদের আলোচনা!


অন্য একদিন পড়ার টেবিলে বড়ো ভাই একটা চিরকুট ধরিয়ে দিলো-একা একা পড়ে দেখিস। গোপনে পড়ার মজাই আলাদা। ‘সচিত্র নর-নারী, ‘ঝিনুক পত্রিকার এর স্টেপলার খুলে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ে অনেক কিছুতেই আনন্দ পেয়েছি। কিন্তু আজ এই চিরকুট পড়ে হাত-পা কেঁপে উঠলো, দেহব্যবসা আর পতিতাপল্লী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করলাম। আবার মনে প্রশ্নও জাগলো, তাহলে যেকোনো নারীই এই কাজ করতে পারে? না, আলাদা বেটা ছেলেরা আছে, যারা অন্য জায়গায় বাস করে-এমন অনেক প্রশ্ন জাগলো কিন্তু উত্তর জানবার আর চেষ্টা করলাম না।


তিন.

সিনেমা দেখার গল্প করতে যেয়ে পারিবারিক ঘটনায় মশগুল হয়েছি। আমাদের শৈশবে সুচন্দা ছিলেন হার্টথ্রুব নায়িকা। যেমন ছিলো তার বড়ো বড়ো দুটো চোখ, তেমন দুচোখ মোটা পুরু করে কাজল দেওয়ার ঢঙ। কী যে সুন্দর লাগতো, যখন সে দুচোখের পাপড়ি ঘন ঘন মেলতো! প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক জহির রায়হান তার পাণি গ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য এর আগে শ্রীমতি সুমিতা দেবীকে তিনি বিয়ে করেন। তিনিও বাংলা চলচ্চিত্রের এক নক্ষত্র। আমি সেই ছেলেবেলায় বিভিন্ন সিনেমাহল ঘুরে ঘুরে সুচন্দা অভিনীতি কাগজের নৌকা, বেহুলা, রাখাল বন্ধু, নয়নতারা, জীবন থেকে নেয়া, দুই ভাই, ধীরে বহে মেঘনা, সুয়োরানী দুয়োরানী, অশ্রু দিয়ে লেখা, রাজবন্দী, সংগ্রাম, আয়না ও অবশিষ্ট, সুখ দুঃখ, ফুলের মালা এমন অনেক সিনেমা দেখেছি আর মুগ্ধ হয়েছি।


সেসময় সিনেমা শুরুর আগে কিছু বিজ্ঞাপন, সিগারেট না খাবার সতর্কতা, বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে সিনেমা বন্ধ হলে কী হবে, বিনা টিকিটে সিনেমাহলে প্রবেশ করলে কী হবে, এরপর আসিতেছে, ইনশা আল্লাহ আগামী শুক্রবার শুভমুক্তি বলে কিছু স্ক্রল দেখানো হতো। তারপর জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের সময় না দাঁড়ালে কতো টাকা জরিমানা সেকথাও জানিয়ে দিতো। চেকাররা টর্চ ফেলে ফেলে উঠে দাঁড়ানোর কথা স্মরণ করিয়ে দিতো। তবে অধিকাংশ দর্শক-শ্রোতাই সেসময় দাঁড়িয়ে জাতীয় পতাকাকে সম্মান জানাতো। আস্তে আস্তে এই প্রথা কমতে থাকে। সিনেমা দর্শকরাই উল্টো চেকারকে শাসানো শুরু করলো-এইটা কী স্কুলঘর যে আমাগো শিখাও উইঠ্যা খাড়াইতে হবে। স্বাধীনতার পর দাঁড়ানোর রেওয়াজটাই পাল্টে গেলো। সিনেমার শুরুতে দর্শক প্রবেশ করতে থাকে, ফলে তারা আর উঠে দাঁড়ায় না। ফলে সিনেমা শেষে যখন সমাপ্ত বা দ্য য়েন্ড পর্দায় ভেসে ওঠে, দর্শক বের হওয়ার জন্য এমনি উঠে দাঁড়ায়, তখন জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত বাজানো শুরু হলো। তবে বিরতির সময় দর্শক বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠতো। কেউ প্রস্রাব করবে, বাদাম কিনবে, বিড়ি-সিগারেট ধরাবে, এমন আর কী। যারা দোতলায় প্রেমিকাকে রেখে এসেছে, মা-খালার খোঁজ নিতে বা বাদামের প্যাকেট পৌঁছে দিতে তারা বেশি ব্যস্ত থাকতো। আবার আরেক দল ছিলো, তারা একজন আরেকজনকে সান্ত্বনা দিতো-দেহিসেনে এরপর আউল্যা-ঝাউল্যা ড্যান্স আছে। এমন হাজার বিষয় ছিলো সেসময় আলোচনার।



বিরতির পর সিনেমা শুরুর আগে তিব্বত স্নো, কসকো গ্লিসারিন সোপ, আসিতেছে, ইনশা আল্লাহ শুভমুক্তি-এমন আকর্ষণীয় কিছু বিজ্ঞাপন দেখানো হতো। তবে দেশের উন্নয়নবিষয়ক একটি প্রামাণ্যচিত্র থাকতোই থাকতো। সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের শালিমার বাগ, পাহাড় কেটে রাস্তা, বড়ো বড়ো গাড়ি আর দালানের দৃশ্য দেখানো এবং পূর্ব পাকিস্তানের সোনালি আঁশ অর্থ আনে বলেই মাজা-পানিতে দাঁড়িয়ে কৃষকের পাট ছড়ানোর দৃশ্য, আদমজী মিল, শ্রমিকরা স্লোগান দিচ্ছে, ঘাড়ে টুকরি বেঁধে চা পাতা তুলছে নাক চ্যাপ্টা মেয়েরা ও মনিপুরি মেয়েদের নাচ দেখানো হতো। এর সঙ্গে আরেকটা জিনিস হতো,


                                    তুমি চেয়েছিলে মুক্ত স্বদেশ ভূমি

                 তুমি চেয়েছিলে এ বিরাণ মাঠে

                                    ফসলেরও মৌসুমী

                                    মিথ্যারে তুমি মানো নাই, নত করোনি শির

                                    গোলামের বন্ধন ভেঙেছ তুমি

                                    এনেছ স্বাধীন ভূমি


এই কবিতাটি ঠিক আবৃত্তি নয়, ধারা বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়দে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর শেরওয়ানি পরা, প্রিন্স কোর্ট, চোস্ত পাজামা আর তারই নামের জিন্নাহ ক্যাপ পরা ছবি ভেসে উঠতো পর্দায়। আবার ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের বিশাল দেহের অবয়বও দেখা যেতো।


চার.

যুগের পরিবর্তনে জেলা ও বিভাগীয় শহরে আধুনিক সিনেমাহল তৈরি হচ্ছে। সেসব সিনেমাহলের দেয়ালের ভিতরে থেকে গানের আওয়াজ বের হয়। চিনামাটির প্রস্রাবখানায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব ঝাড়তে হয়। তার মধ্যে আবার ন্যাপতুল দেওয়া। বাসাবাড়িতে যা লেপ-তোষক আলমিরার কাপড়ে রাখা হতো, সেই জিনিস প্রস্রাবখানায়, কেমন লাগে বলেন! আমরা বন্ধুরা মতিঝিলের ‘মধুমিতা, পোস্তগোলার ‘ডায়না, খুলনার ‘বৈকালি, কুষ্টিয়ার ‘রক্সি, রাজশাহী ‘বর্ণালী-এমনসব সিনেমাহলে সিনেমা দেখা শুরু করলাম। সিনেমার চেয়ে সিনেমার পোস্টারের ওপর তখন বেশি আকর্ষণ ছিলো। সিনেমাহলের ভিতরে যেখানে বসবার, ঘুরে বেড়াবার জায়গা, সেখানে কাঠ আর নেটের তৈরি বক্সের মধ্যে সিনেমার কিছু বিশেষ বিশেষ দৃশ্যের স্টিল ছবি রাখা হতো। যেগুলো সবই ছিলো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। ব্ল্যাক হলে কী হবে সেগুলো জ্যান্ত মনে হতো। মেয়েরা যখন শাড়ি পরে চলাফেরা করে, তখন যদি নায়িকাকে ডেটিপ্যান্ট, কোমরে পিস্তল এবং দুই ঠ্যাঙের (পা) মাঝ দিয়ে ট্রেন চলে যেতে দেখা যায়, সেটা কার না নজর কাড়ে! এমন দৃশ্য রিকশা-গাড়ির পিছনেও আঁকানো ছবিতে প্রায়ই দেখা যেতো। নীলু নামে পাকিস্তানের এক নায়িকা ছিলো, সে কিছু মানতো না। তখন মোহাম্মদ আলী জেবা, ওয়াহিদ মুরাদ, নাদিম ছিলো নায়ক। সেরেগুল রঙিলা ছিলেন কৌতুকাভিনেতা- রঙিলা নামে একটা চলচ্চিত্রও বানানো হয়েছিলো। সেটার পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক, শিল্পনির্দেশক এমন কী নায়কও ছিলেন রঙিলা। সিনেমাটি যেমন দর্শককে আনন্দ দিয়েছিলো, তেমনই তারা কষ্টও পেয়েছিলো। শেষ দৃশ্যে রঙিলা কাঁচের বোতল ভেঙে নিজের দুচোখ অন্ধ করে ফেলে। কারণ বেঈমান, মোনাফেক, ঠগি নায়িকার মুখ যেনো আর এই চোখ দিয়ে দেখতে না হয়। রঙিলাতে একটা গান ছিলো-গা-মেরে মানুয়া গা-তা যারে/ যা না হ্যায় হামকো দূর ...।


পাঁচ.

নায়িকা সুচন্দাকে কেনো যে এতো পছন্দ হতো বলতে পারিনে। অতোটুকুন ছেলেমানুষ তখন, পছন্দ-ভালোলাগা-ভালোবাসারইবা কী বুঝি! তার পরেও যেখানে তার একটা ছবি দেখতাম, অমনি কেটে গোপনে কোনো বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখতাম। যেনো সুচন্দা আমার এবং একার-কী যে মুগ্ধ ছিলাম তাতে। সেকালে বাসা-বাড়িতে ‘চিত্রালি, ‘পূবাণী সিনে পত্রিকা দিয়ে ঘরের বেড়া, খুটি ঢেকে রাখতো। আমাদের এক আত্মীয়ের ছেলে হয়েছে, সে উপলক্ষে তাদের বাড়িতে মিলাদ; যেয়ে দেখি পুরো ঘরের বেড়ায় নানান পদের রঙিন ছবি। হঠাৎ বেহুলা সিনেমার একটা বিজ্ঞাপন চোখে পড়লো। সুচন্দা ময়ূর নাচের ঢঙে পাখনা পরে আছে, যথারীতি চোখে কাজল। নায়ক রাজ্জাক মা মনসার অভিশাপের শিকার হয়ে ভেলায় শুয়ে আছে। ভেলার চারপাশে রঙিন চার ফররা। আমজাদ হোসেন বিষুমিস্ত্রী, যিনি লোহার বাসর ঘর ফুটো করে দিয়েছিলো, তিনি বাটাল-রানদা হাতে পোস্টারের এক কোণায় দাঁড়িয়ে। ময়ূর তো ঠাণ্ডা প্রাণি, কিন্তু সুচন্দা চোখে কাজল মেখে দর্শক গরম করার ভাবে দাঁড়ানো। মনে হলো, সুচন্দার ওই ছবি আমার চাই-ই চাই। মিলাদ শুরুর আগেই আস্তে যেয়ে হুজুরকে বললাম-এই ঘরে মানুষের ছবি আছে, এখানে কি নামাজ-মিলাদ হবে? হুজুর আমার ধর্মজ্ঞান দেখে বেশ খুশি হলেন এবং তাৎক্ষণিক আদেশ দিলেন, সব ছবি ছিঁড়ে ফেলা হোক, না হলে মিলাদ হবে না। এই কথা শুনে পাড়ার সব ছোটো ছোটো ছেলেরা মুহূর্তের মধ্যে তামান বেড়া, খুঁটি টেনে ছিড়ে পরিষ্কার করে ফেললো। কিন্তু তাদের আগেই আমি সুচন্দার বেহুলা সিনেমার সেই দৃশ্য ছিঁড়ে পাঞ্জাবির নীচে গেঞ্জি, তার তলে ঢুকিয়ে ফেলেছি। সমস্যা হলো একটু নড়াচড়া করলেই খচখচ করে আওয়াজ হতে থাকলো সেটা। ভয়ও পাই, সুচন্দা না হয় কিছু বলবে না, কিন্তু সাপের ছবি আছে যে! আবার সুচন্দাকে বুকের ভিতর রাখছি, তারও একটা আলাদা ইমেজ কাজ করছিলো। মোট কথা তখনকার সেই অনুভূতি ঠিক কেমন ছিলো, তা আর এখন ব্যক্ত করতে পারবো না।




হঠাৎ মিলাদওয়ালা বাড়ির এক মুরব্বী এসে ছোটো ছেলেদের ওপর রাগারাগি, গালাগাল শুরু করেন। পরের বাড়ি এসে বেড়া, ঘর ফাতা-ফাতা করার মানে কী? হুজুর তখন হাদিসের কথা কিছুই বললেন না। অন্যান্য ছেলেরা আমাকে দেখিয়ে দিলো-আমি নাকি শুরু করেছি। আমার আব্বা চাকরি করেন, সেই সুবাদে ওই মুরব্বী আমায় তেমন কিছু বলেননি। কিন্তু আমি রাগ, দুঃখ, গ্লানি সহ্য করতে না পেরে, মিলাদের জিলাপি-বাতাসা না নিয়েই বাড়ি ফিরলাম। বাড়িতে ঢুকতেই মা জিজ্ঞাসা করলেন, দেখি মিলাদে কী মিষ্টি দিয়েছে? আমার হাতের মধ্যে তখন মিলাদের মিষ্টির বদলে সুচন্দার সেই ময়ূর নাচের ছবি। খোলা হাতে মা সেটা দেখে অনেকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। এরপর বা হাত শক্ত করে ধরে বললেন-বল তোর সুচন্দাকে এতো ভালো লাগে কেনো? কেনো তুই তার ছবি কেটে জমিয়ে রাখিস?


মায়ের এই প্রশ্ন শুনে পিটুনি খাবার ভয়ে সেদিন কেঁদে উঠেছিলাম। মা সেদিন কেনো জানি আমায় আর পিটুনি দেননি; কী ভেবেছিলেন জানি না। আমিও সেদিন মায়ের সামনাসামনি বলতে পারিনি। আজ মা নেই অনেকদিন। এখন বলতে পারি-মা তুমি যেমন করে চোখে কাজল পরতে, কোথায় যেনো মিল খুঁজে পেতাম তোমার সাথে। মা তোমাকে সুচন্দার চেয়েও সুন্দর লাগতো কাজল পরলে!   

     

(চলবে)


লেখক : মফিজ ইমাম মিলন, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক। তিনি ফরিদপুর থেকে ‘উঠোন নামে একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।


uthon.faridpur@gmail.com


 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন