Magic Lanthon

               

নুসরাত নুসিন

প্রকাশিত ০৮ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

রাজশাহীতে চলচ্চিত্রযাত্রা : ইতিহাসের সেকাল-একাল

নুসরাত নুসিন


শেষ কিস্তি.


চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটির হাত ধরে শূন্য দশকে রাজশাহীতে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কার্যক্রমে কিছুটা গতি আসে। এ সময়ে সংগঠনটি রাজশাহীতে নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন ছাড়াও ক্ষুদে নির্মাতাদের জন্য নির্মাণ কর্মশালা, সেমিনার প্রভৃতির আয়োজন করে। ঢাকা থেকে প্রখ্যাত নির্মাতা, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদকদের এনে সেসময় তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হতো। ফলস্বরূপ চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটির ক্ষুদে নির্মাতাদের হাতে একে একে নির্মিত চলচ্চিত্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জন করে। চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটির যাত্রা শুরুর পর রাজশাহীর চলচ্চিত্রপ্রেমীরাও এ ক্ষেত্রটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। এ সময়ে চলচ্চিত্রচর্চার প্রায়োগিক ক্ষেত্র তৈরিতে তাদের জোর প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। প্রথমেই তারা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রদর্শন ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের। এ ধরনের চিন্তার অংশ হিসেবে ২০০৮ থেকে ২০১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজশাহীতে পর পর তিনটি স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র সংসদ গঠিত হয়। চলচ্চিত্রের সার্বিক বিকাশের লক্ষ্যে সংসদগুলো সক্রিয় হতে শুরু করে।


প্রথমে ভালো চলচ্চিত্র দেখা ও দেখানোর উদ্দেশ্যে নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে তাদের কর্মপরিধি বিস্তৃত হয়। তারা বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র উৎসব, চলচ্চিত্রনির্মাণ বিষয়ক কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করতে থাকে। এ পর্যন্ত রাজশাহীতে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ভারত-বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসব, আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ফোরাম চলচ্চিত্র উৎসব, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঋত্বিক চলচ্চিত্র সংসদ ২০১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে চলচ্চিত্রে অবদানের জন্যে ঋত্বিক ঘটক সম্মাননা পদক ও চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করে আসছে। অন্যদিকে প্রকাশনার ক্ষেত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত ষাণ¥াসিক পত্রিকা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন চলচ্চিত্রের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য সংসদগুলোও অনিয়মিতভাবে কিছু প্রকাশনা করে থাকে। বলা চলে, এইসব কর্মপ্রচেষ্টার ফলে রাজশাহীতে বর্তমানে চলচ্চিত্রের একটি সক্রিয় কর্মপরিবেশ বিরাজমান রয়েছে।


২০০৮ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রলেখক মনিস রফিক রাজশাহীতে চলচ্চিত্র সংসদ গঠনের তাগিদ অনুভব করেন। এই তাগিদ থেকেই তিনি রাজশাহীর চলচ্চিত্রনির্মাতা আহসান কবীর লিটনের সঙ্গে আলাপে বসেন। লিটন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের টি এস সি সির নাট্য নির্দেশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রথম নির্মাণ করেন দ্য ফ্ল্যাগ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ৩৫ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটিতে কোনো সংলাপ ব্যবহার হয়নি। চলচ্চিত্রটি নির্মিত হওয়ার পর সেটি বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও উৎসবে প্রদর্শিত হয়। বেশ সাড়াও ফেলে চলচ্চিত্রটি। এরপর তিনি একে একে নির্মাণ করেন নীরবতার স্বপ্ন, মৃত্তিকার খোঁজে প্রভৃতি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। মনিস রফিক ও আহসান কবীর লিটন কয়েকজন থিয়েটার কর্মীকে নিয়ে রাজশাহীতে একটি স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র সংসদ গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।


২০০৯ খ্রিস্টাব্দে ডা. এফ এম এ জাহিদকে আহ্বায়ক ও রাশেদুজ্জামান উজ্জ্বলকে সদস্য সচিব করে রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটি নামে একটি চলচ্চিত্র সংসদ গঠন করা হয়। পরের বছর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয় আহসান কবীর লিটনকে সভাপতি ও শরীফ আহমেদ বিল্টুকে সাধারণ সম্পাদক করে। এ সভা থেকেই তারা রাজশাহীতে বেড়ে ওঠা প্রখ্যাত নির্মাতা ঋত্বিক কুমার ঘটকের জন্মবার্ষিকী পালনের সিদ্ধান্ত নেন। তখন অনেকে প্রস্তাব করেন, রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটির নাম পরিবর্তন করে ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটি নামকরণের। এমতাবস্থায় এ সভা থেকে ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটি নামে আলাদা আরেকটি স্বতন্ত্র ফিল্ম সোসাইটি গঠন করা হয়। বলা হয়, ঋত্বিক চর্চাকে এগিয়ে নিতে এ সংসদের কাজ হবে স্বতন্ত্র। ডা. এফ এম এ জাহিদকে সভাপতি ও মাহমুদ হোসেন মাসুদকে সাধারণ সম্পাদক করে ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটি নামে আরেকটি সংসদ গঠন করা হয়। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটি প্রথমবারের মতো ঋত্বিকের জন্মবার্ষিকী পালন করে।


২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে লিটনের দ্য ফ্ল্যাগ-এর ধারাবাহিকতায় ৭১র পটভূমিকায় রাশেদুজ্জ্বামান উজ্জ্বল নির্মাণ করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি। প্রায় এক ঘণ্টা ব্যাপ্তিকালের এ চলচ্চিত্রটি সম্পূর্ণ ছায়া দ্বারা নির্মিত। মুক্তি পরবর্তী সময়ে রাজশাহীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রদর্শিত হয়। এরপরে লিটন চারটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। ২০০৮ থেকে ২০১১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজশাহীতে অনেকগুলো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এসব চলচ্চিত্র নির্মাণে রাজশাহী চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি, রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটি ও রাজশাহী ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটির পৃষ্ঠপোষকতা ছিলো। নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে তাওকীর ইসলামের দ্য ইউনিট, আন্নাবা কবীর প্রকৃতির প্রত্যাবর্তন, আবুল কালাম আজাদের চ্যাপলিন রিটার্নস, মোস্তাহাব হোসেনের দূরন্ত, মাহফুজ আহমেদের স্মৃতিচিহ্ন, সাজিদ হোসেনের জীবিকার খোঁজে, হেমন্ত সাদিকের সীমান্তের খোঁজে অন্যতম। এছাড়া খেলাঘরের পিদিম নয়ন ও সাইফুল ইসলামের নবযাত্রা, সাইফ রায়হানের স্বপ্নসেলাই, আসিফের সন্ধিক্ষণ ও আমার দেখা কলকাতার নাম উল্লেখ করার মতো। সবমিলিয়ে রাজশাহী চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটির নির্মাতারা এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধ-শতাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি দেশব্যাপী প্রতিবছর যে আন্তর্জাতিক চিলড্রেন ফিল্ম ফেস্টিভালের আয়োজন করে, তাতে রাজশাহী ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা নিয়মিতভাবে ঢাকার সঙ্গে রাজশাহীতেও আয়োজন করে এই ফেস্টিভালের।


ঋত্বিক চর্চার লক্ষ্যে ২০১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ঋত্বিক ফিল্ম সোসাইটি তার জন্মবার্ষিকীতে ঋত্বিক ঘটক সম্মাননা পদক ও চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করে আসছে। প্রতিবছর চলচ্চিত্র ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ সম্মাননা প্রদান করা হয়। এ পর্যন্ত যাদের সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে তারা হলেন-নির্মাতা তারেক মাসুদ, নাট্যশিল্পী মাস্টার তফাজ্জ্বল হোসেন, ঋত্বিকের জমজ বোন প্রতীতি দেবী, অভিনেতা প্রবীর মিত্র, প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান, নির্মাতা জহির রায়হান, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, অভিনেত্রী শর্মিলী আহমেদ, নির্মাতা সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকি, আলোকসম্পাত শিল্পী মো. আবু তাহের, ড. তসিকুল ইসলাম রাজা, চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ, ফিল্ম সোসাইটি কর্মী প্রেমেন্দ্র মজুমদার, নির্মাতা বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ও মোরশেদুল ইসলাম, অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক, অধ্যাপক ফজলুল হক, ভারতের কেরালার নির্মাতা ভি কে জোসেফ, কলকাতার অভিনয়শিল্পী ব্রাত্য বসু, অভিনয়শিল্পী আসাদুজ্জামান নূর ও জয়া আহসান প্রমুখ। সংগঠনটি প্রকাশনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে মনিস রফিকের সম্পাদনায় ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে ‘সুবর্ণরেখা নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে। এই গ্রন্থে ঋত্বিক ও তার চলচ্চিত্র বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখা স্থান পেয়েছে। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে অধ্যাপক ফজলুল হকের সম্পাদনায় তারা আরো একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে ‘ঋত্বিক ঘটক এক বিরলপ্রজ প্রতিভার নাম নামে। এতে ঋত্বিকের জীবনালেখ্য পাওয়া যায়। ঋত্বিক ফিল্ম সোসাইটি মেঘ পালক নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণে রাজশাহীর তরুণদের পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে।


এদিকে নগরীর ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজের বরেন্দ্র থিয়েটারের কর্মীরা ২০১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিজয় চলচ্চিত্র উৎসব করে আসছে। প্রতিবছর ডিসেম্বরে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহের নির্মাতারা ছাড়াও সারাদেশের নির্মাতারা অংশ নেয়। প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে একটি চলচ্চিত্রকে সেরা মনোনীত করা হয়। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিজয় চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় জ্যাঁ নেসার ওসমানের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উচ্চৈঃশ্রবার উচ্চাভিলাষ। তৃতীয় বিজয় উৎসব ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় মো. আবিদ মল্লিকের ব্রাউন প্যাক। উৎসব চলাকালে রাজশাহী কলেজ অডিটরিয়ামের নিচে চলে সেমিনার, আলোচনা সভা, প্রবন্ধ পাঠ। মঞ্চ নাটক ও চলচ্চিত্র উৎসবের বাইরে বরেন্দ্র থিয়েটার তাদের নিজস্ব প্রযোজনায় স্বপ্নচোর (২০১১), দ্য গ্রিন ওয়ার্ল্ড (২০১২), লাভ ইউ সাকিব (২০১৪) নামে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করে।


২০১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করে রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটি। পদ্মাপাড়ের লালন শাহ মঞ্চ ও বড়কুঠি মঞ্চে সাত দিনব্যাপী এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবে অংশগ্রহণ করে আগন্তুকের লাল গোলাপ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ নির্মাতার পুরস্কার পান যৌথভাবে মীর গালিব ও ইশতিয়াক। শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফার নির্বাচিত হন শাহরিয়ার চয়ন। এছাড়া স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন নাহিদা সুলতানা সূচি তার ঘুড়ির জন্য। এ বছরই নগরীতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই উৎসবে নর্থ বেঙ্গল ফিল্ম ক্যাটাগরিতে তিনটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে নির্বাচিত করা হয়। তরুণ নির্মাতা শাহরিয়ার চয়নের ফানুস এতে প্রথম স্থান অধিকার করে। মাহমুদ হোসেন মাসুদের আলোর দেখা দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করে আরিফ হোসেন হৃদয়ের মুখোশ। এছাড়াও এ উৎসবে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড লাভ করে এস আই মুন্নার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র যদি সে জানতো।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বজলুল মবিন চৌধুরীর চলচ্চিত্র সংসদ কার্যক্রমের প্রায় তিন দশক পরে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. সাজ্জাদ বকুল প্রতিষ্ঠা করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মাধ্যমে ঢাকার ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের অনুমোদিত সংগঠন হিসেবে এটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ৫ ডিসেম্বর সংসদের উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয় কাজলার অক্ট্রয় মোড়ে অবস্থিত হেরিটেজ আর্কাইভে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে সংগঠনটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে সাত দিনব্যাপী দুই বাংলার চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করে। এছাড়া সংসদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করা হয়। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ড. সাজ্জাদ বকুল  দাবানল : শহীদ ড. শামসুজ্জোহা ও আমাদের স্বাধীনতা নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। 


দ্বিতীয় দশকের শুরুতে রাজশাহীর চলচ্চিত্রকর্মীরা ভাবতে শুরু করে এ শিল্পের আঞ্চলিক বিকাশ নিয়ে। চলচ্চিত্রকে বিকেন্দ্রীকরণে তারা ‘কমিউনিটি সিনেমা নামে নতুন চিন্তার শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে কমিউনিটি চলচ্চিত্র ভাবনার অন্যতম কর্মী আহসান কবীর লিটনের বক্তব্য এমন-


কমিউনিটি সিনেমা ঠিক কমিউনিটি রেডিও বা কমিউনিটি টেলিভিশনের মতো নয়। এটি একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা। কমিউনিটি সিনেমা হতে পারে কমিউনিটিকে কেন্দ্র করে, আবার হতে পারে মূল সিনেমা বলতে যা বোঝায় তারই অনুরূপ। মূলত এ সিনেমাতে চলচ্চিত্রশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপকরণাদি যেমন, ক্যামেরা, ক্যামেরাম্যান, ট্রলি, এডিটিং, জিব-আর্ম, অভিনেতা-অভিনেত্রী ইত্যাদি হবে আঞ্চলিক। ধরা যাক, রাজশাহীতে একটি কমিউনিটি সিনেমা নির্মাণ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সিনেমার পরিচালক, ক্যামেরা, ক্যামেরাম্যান, ট্রলি, এডিটিং, জিব-আর্ম, অভিনেতা-অভিনেত্রী ইত্যাদি হবে রাজশাহী অঞ্চলের। এদের সম্পৃক্ততায় নির্মাণ হবে কমিউনিটি সিনেমা। এভাবে খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল নির্মাণ করবে কমিউনিটি সিনেমা। অর্থাৎ যেকোনো অঞ্চল নির্মাণ করবে কমিউনিটি সিনেমা।১৪


এই কর্মপ্রয়াসের অংশ হিসেবে আহসান কবীর লিটন নির্মাণ করেন পূর্ণদৈর্ঘ্য কমিউনিটি চলচ্চিত্র প্রত্যাবর্তন। এই চলচ্চিত্র নির্মাণে যাবতীয় সহযোগিতা দিয়েছে রাজশাহীর আলুপট্টিতে অবস্থিত ‘বরেন্দ্র প্রোডাকশন হাউজ। এমনকি চলচ্চিত্রটির নির্মাণ খরচও যোগাড় করা হয় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার প্রযোজকদের কাছ থেকে।


কমিউনিটি সিনেমার সঙ্গে জড়িত কর্মীরা মনে করেন, এতে করে এক অঞ্চলের সঙ্গে আরেক অঞ্চলের আন্তঃযোগাযোগ যেমন বাড়বে তেমনই কেন্দ্রের ওপরে নির্ভরতা কমবে। চলচ্চিত্রকে কেন্দ্রের বলয় থেকে মুক্ত করে আঞ্চলিকভাবে ছড়িয়ে দিতে না পারলে চলচ্চিত্র সংস্কৃতিকে বিস্তৃত করা সম্ভব নয় বলেও তারা মনে করে। এজন্য অবশ্য প্রথমেই প্রয়োজন চলচ্চিত্রচর্চাকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংসদ গঠন, চলচ্চিত্র প্রদর্শন প্রভৃতি কার্যক্রমের তৎপরতা বাড়ানো। এছাড়া প্রতিটি অঞ্চলে প্রোডাকশন হাউজ প্রতিষ্ঠা, চলচ্চিত্র নির্মাণ, স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও চলচ্চিত্রচর্চার অন্যান্য হাতিয়ারসমূহের একটি প্রয়োগিক ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য তারা কাজ করছে।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের আরেক শিক্ষক কাজী মামুন হায়দারের সম্পাদনায় চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন ২০১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। দেশে চলচ্চিত্রের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জন্য চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। মুহম্মদ খসরু সম্পাদিত ‘ধ্রুপদীর পর থেকে খণ্ড খণ্ড সময়ে কিছু পত্রিকা চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের চাহিদা মিটিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেসব পত্রিকার কোনো ধারাবাহিক শৃঙ্খলা লক্ষ করা যায় না। এ পর্যন্ত ষাণ্মাসিকভাবে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন-এর নিয়মিত ১৩টি সংখ্যা প্রকাশ হয়েছে। এর প্রতিটি সংখ্যায় দেশ-বিদেশে চলচ্চিত্রের সমসাময়িক পরিস্থিতি, সঙ্কট, সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়েছে নানা আঙ্গিকে। একটি নির্দিষ্ট কালখণ্ডের এসব লেখা, চলচ্চিত্র ক্ষেত্রটি নিয়ে জানা ও বোঝার জন্য ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।


১৯০০ খ্রিস্টাব্দে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় হাত ধরে যে প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে রাজশাহীতে চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিলো, তার উত্তরণ খুব একটা না ঘটলেও বর্তমানে নগরীর চলচ্চিত্রপ্রেমীরা ক্ষেত্রটিতে গতিময়তা দিচ্ছে। চলচ্চিত্রের যাত্রাকালে রাজশাহীর গোটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেই একটা সুবাতাস ছিলো। অক্ষয়কুমার, কুমার শরৎকুমার রায়, রাজেন্দ্রলাল আচার্য, শশী শেখরেশ্বর রায়, বিমলাচরণ মৈত্র, কান্ত কবি রজনীকান্ত সেন, কবি শশধর রায় প্রমুখদের হাত ধরে সাহিত্য, সঙ্গীত, নাট্যচর্চা ছিলো খুবই সমৃদ্ধ। শিক্ষানগরী হিসেবে যে গৌরবের ধারা এখানে বয়ে চলেছে, তার বীজটি আকাশ পেয়েছিলো সম্ভবত এ সময়েই। সেসময়ের রাজশাহী মহাত্মা গান্ধী, সরোজিনী নাইডু, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদচারণায় মুখর ছিলো। কিন্তু পুনঃপুন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে রাজশাহীর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের উন্নততর বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়নি।


৩০-এর দশকে ‘রূপেন সিনেমা ও ৪০-এর দশকে সূর্য মাড়োয়ারির ব্যবসায়িক উদ্যোগ সফল হলে হয়তো রাজশাহীতে চলচ্চিত্রের যাত্রা পরবর্তী সময়ে আরো গতিময়তা পেতো। কেননা স্থানীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার সুযোগ তখন ছিলো। সেসময় রাজশাহীর শিক্ষিতজন ও জমিদারদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ছিলো উদার ও প্রজ্ঞাপূর্ণ। রাজশাহীর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের উল্লেখযোগ্য সব কাজ জমিদার ও প্রভাবশালী হিন্দু শিক্ষিতজনের অনুদানেই হতো। কিন্তু ৪৭-এর দেশভাগে জমিদারদের টানাপড়েন, প্রভাবশালী হিন্দুদের দেশত্যাগ সংস্কৃতির গতিশীল অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিতভাবেই ব্যাহত করেছে। এরপর পাকিস্তান পর্বে সরকারি রক্ষণশীল মনোভাব, পাক-ভারত যুদ্ধ, ভারতের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পরে তা বন্ধ, মুক্তিযুদ্ধ-এসব রাজনৈতিক পালাবদল সংস্কৃতির উত্তরণকে রুদ্ধ করে রেখেছিলো। একইভাবে এসব ঘটনাপ্রবাহ রাজশাহীতে প্রভাব ফেলেছিলো নেতিবাচকভাবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরও বাংলাদেশের সংস্কৃতি রক্ষণশীল ঘেরাটোপে বন্দিদশা কাটায়। সংস্কৃতির বিকাশে রাষ্ট্র উদার মনোভাব ও প্রজ্ঞা কখনই দেখাতে পারেনি। ফলে চলচ্চিত্রের একশো বছরের অধিক যাত্রা পথে ক্ষেত্রটিতে যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব ছিলো, তা আর জনগণ দেখতে পায়নি।


বর্তমান সময়ে যোগাযোগ ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় ক্ষেত্রটিতে কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। প্রযুক্তির সহায়তায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মতো চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কর্মপ্রয়াস রাজশাহীতেও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে রাজশাহীতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে লক্ষ করার মতো। চলচ্চিত্রচর্চার এসব প্রয়াস অবশ্যই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি সময়কালের গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচ্য হবে।


লেখক : নুসরাত নুসিন, রাজশাহী কলেজের অর্থনীতি বিভাগের স্নাতক (সম্মান) পর্বের শিক্ষার্থী। তিনি নিয়মিত কবিতা লেখেন।


nushinnushrat@gmail.com


তথ্যসূত্র

১৪. বাংলাদেশের প্রথম ‘কমিউনিটি সিনেমা প্রত্যাবর্তন-এর প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা ‘প্রত্যাবর্তন এ আহসান কবীর লিটনের প্রবন্ধ ‘তারেক মাসুদ ও আমাদের কমিউনিটি সিনেমা ভাবনা থেকে নেওয়া। পৃ. ১০, প্রকাশকাল : নেই।

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন