Magic Lanthon

               

মুহাম্মদ হাসান ইমা

প্রকাশিত ০৭ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ধারাবাহিক পাঠ : চলচ্চিত্রের কথা

মুহাম্মদ হাসান ইমা



পর্ব ৪


সবাক যুগের শুরু


নির্বাক চলচ্চিত্র থেকে সবাক চলচ্চিত্রে উত্তরণের সময়কাল ১৯২৬-১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ ধরা হলেও বিভিন্ন জনের আলোচনায় এটি আরেকটু বিস্তৃত ইতিহাসকে তুলে ধরে। ১৯৯০-১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে নর্থ ইস্ট হিস্টরিক ফিল্ম পরিচালিত মৌখিক এক ইতিহাসের সূত্র ধরে The Jazz Singer (1927), Sonny Boy (1929), Seventh Heaven (1927)  Wings (1927) চলচ্চিত্রগুলোকে দর্শকরা সবাকচিত্রের প্রথম অভিজ্ঞতা বলে মনে করে। অনেকে অবশ্য সবাকচিত্রের আগমনকে বিরাট ব্যাপার, অনেক বেশি বাস্তব এবং অলৌকিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে। ১৯২৫-১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সবাকচিত্রের উন্নতি ও ওই সময়ে প্রণীত হলিউডের মাস্টারপ্ল্যান তেমন সফলভাবে অর্জিত হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো শব্দের সূচনাকে বাস্তবায়িত করতে চেয়ে নতুন প্রযুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ যেনো সংগ্রামে পরিণত হয়। এছাড়া চলচ্চিত্র পরিবেশনায় প্রদর্শন, কথ্য ভাষার নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিক ও দর্শকের ব্যাপারে যথাযথ অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মতো ব্যাপারগুলো সামাল দিতে হয়।


যদিও হলিউডের যথাযথ উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়ে, কিন্তু ৩০-এর মন্দা সবকিছুর ওপর নেতিবাচক ভূমিকা ফেলে। নতুন নতুন লেখক, প্রযোজকদের আগমন এবং পুরাতনদের অবসান, নতুন শিল্পীদের উত্থান ও পুরাতনদের বিদায়, শ্রমিক অসন্তোষ এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ অর্থনৈতিক মন্দাকে তুঙ্গে নিয়ে যায়। অন্তত ১০ বছর সময় ধরে সবাকচিত্রের অধিষ্ঠান সারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। সবাকচিত্রের আরেক নাম দেওয়া হয় ‘বৈদ্যুতিক বিনোদন’। যাবতীয় কৃৎকৌশলগত সমন্বয়ে যথেষ্ট সময় লাগলেও ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ভাইটাফোন এবং ফক্সের মুভিটন শব্দ সংযোজনের ল্যাবরেটরির সক্ষমতাকে যথেষ্টভাবে সাহায্য করে। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন-এর বিদ্যুৎ আবিষ্কার সেকারণে শব্দযন্ত্রের উন্নয়নে সর্বাধিক প্রভাব রাখে। ইতোমধ্যে টেলিফোন, রেডিও ও টেলিভিশনের আবির্ভাব সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিরাট সাফল্য ও বৈচিত্র্য নিয়ে আসে, যা কাজ করে সবাকচিত্রের সহায়ক হিসেবে।৩৫ 


.

১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে লস অ্যাঞ্জেল্স বেসিনে একটি গ্রামে হলিউডের প্রতিষ্ঠা হয়। এর আগে মার্কিন চলচ্চিত্রের প্রধান কেন্দ্র ছিলো নিউইয়র্ক সিটি। এমনকি প্রথম দিকে ‘ওয়েস্টার্ন’ চলচ্চিত্রগুলো নির্মাণ হতো নিউ জার্সির উত্তরাংশে; এছাড়া শিকাগোকে কেন্দ্র করেও চলচ্চিত্র হতো। সেদিক থেকে লস অ্যাঞ্জেল্সের পরিবেশ ছিলো চলচ্চিত্র তৈরির জন্য অত্যন্ত সহায়ক। সাংবাৎসরিক মধ্যম জলবায়ু, সুপ্রশস্ত বেলাভূমি, নিকটবর্তী পর্বতশৃঙ্গ ও গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ এই জায়গাটি অনেকেরই দৃষ্টি কাড়ে। এডিসনসহ বিভিন্ন নির্মাতারা হলিউডে তাদের স্থাপনা গড়ে তোলেন। এদের মধ্যে ‘প্যারামাউন্ট পিকর্চাস’ অন্যতম। শতাব্দীব্যাপী প্যারামাউন্ট পিকর্চাস চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বিতরণে এক বিরাট ইতিহাস গড়ে তুলেছে। ‘প্যারামাউন্ট পিকর্চাস’ হলিউডের সবচেয়ে পুরাতন প্রতিষ্ঠানও বটে। অন্যান্যদের মধ্যে ওয়ার্নার ব্রাদার্স, হব্স, ইউনিভার্সাল, কলম্বিয়া, ইউনাইটেড আর্টিস্ট, এমজিএম অন্যতম। কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কার্যালয় নিউইয়র্ক সিটিতে থাকলেও চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ হলিউডেই সম্পন্ন হতো। এসব কোম্পানি তাদের নিজ নিজ প্রচেষ্টায় যেসব চলচ্চিত্র তৈরি করতো সেগুলো ছিলো গুণে-মানে ও প্রযুক্তিতে উঁচু মাত্রার। The Birth of a Nation (১৯১৫) হলিউডের উচ্চ মাত্রার চলচ্চিত্র নির্মাণের সূচনা করে এবং ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নির্বাক চলচ্চিত্রে এ ধারা অব্যাহত থাকে।


.

শব্দ ও বক্তব্যের সুসমন্বয় সাধনের মধ্য দিয়ে The Jazz Singer-এর আবির্ভাব সবাকচিত্রের শব্দ সাফল্য নিয়ে আসে। এক্ষেত্রে ওয়ার্নার ব্রাদার্স অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট শক্তির পরিচয় দিলেও পরবর্তী সময়ে প্যারামাউন্ট, ফক্স, এমজিএম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড়ো বড়ো শহরের প্রেক্ষাপটে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে থাকে। ‘সাটার্ডে ইভনিং পোস্ট’ পত্রিকায় প্রায় ২০ বছর পর আল জলসন স্বীকার করেন-


The Jazz Singer appealed to me more than any other role because it was a story of my own experiences. I was reliving part of my own life¾my early environment and upbringing, my refusal to follow in my father's footsteps and become a Rabbi, my unbreakable preoccupation with singing and acting. As I started making the picture in 1927, I was thirlled by the fact that it was to be the first picture to have singing in it, but I didn't dream that it would also introduce dialogue to the screen. The speaking was accidental. When I sat down to the piano as we began work on a singing scene, I adlibbed: `Wait till you hear this, mamma! If I'm a big hit, I'm gonna take you to Coney Island and I'll buy you a black silk dress that 'll make a noise when you walk!' The Warnners decided the words might be effective, so several takes were made and the moving pictures had begun to talk.36


.

শব্দ ও কথনের সমন্বয়ে চলচ্চিত্র তৈরির সঙ্গে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে, আর তাহলো অস্কার পুরস্কার প্রবর্তন। দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার অস্কারের জন্য ১৯২৮-১৯২৯ ও ১৯২৯-১৯৩০ নির্বাচিত হলো The Broadway MelodyI All Quiet on The Western Front। ১৯২৮-১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচিত চলচ্চিত্রটি এমজিএম-এর একটি সঙ্গীতভিত্তিক চলচ্চিত্র। সেদিক থেকে বলা যায়, পরবর্তী ৫০ বছরব্যাপী এ ধরনের সঙ্গীতভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি বিরাট ঐতিহ্য তখন থেকেই শুরু হয়েছিলো। The Broadway Melody-এর জন্য হ্যারি বোমন্ট পরিচালকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, তিনি এর আগে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে Our Dancing Daughter's নির্মাণ করেন, যা নির্বাক যুগের সমাপ্তিকাল নির্দেশ করে।


The Broadway Melody-এর কিছু অংশ ছিলো রঙিন (টেকনিকালার), যা সাদাকালোর জগতে রঙিন চলচ্চিত্রের দৃষ্টান্ত হিসেবে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে। All Quiet on The Western Frontএকটি ভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র ছিলো, যা জার্মান লেখক এরিক মারিয়া রেমার্কের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়। গ্রন্থটি ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছিলো তার যুদ্ধবিরোধী বক্তব্যের জন্য। এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনায় অস্কার লাভ করে।


.

জুনিয়র লেমল ও তার ইউনিভার্সাল স্টুডিও যে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন তা যথেষ্ট সাধারণ ও আনন্দদায়ক হয়েছিলো। এরপর মুক্তি পায় জেমস হোয়েল-এর Frankenstein (১৯৩১)। এই চলচ্চিত্রের কাহিনির প্রেক্ষাপটে শব্দের ব্যবহার ছিলো অত্যাবশ্যক ও অতুলনীয়। ৭০ মিনিটের হলেও এই চলচ্চিত্রটি আজ পর্যন্ত দর্শককে দারুণভাবে আকৃষ্ট করতে পারে। চলচ্চিত্রটিতে প্রযুক্তির চেয়ে সৃষ্টিশীল কল্পনা ও চাতুর্য যথেষ্ট মাত্রায় প্রভাব রেখেছে। সেসময় চলচ্চিত্রটি নির্মাণে খরচ হয়েছিলো দুইশো ৬২ হাজার ডলার; যা অবশ্য হলিউডের সাধারণ ব্যয়বহুল চলচ্চিত্রগুলোর চেয়ে কম। এই চলচ্চিত্রে কোনো সঙ্গীত ছিলো না, তবে শব্দের কারুকার্য ছিলো বেশ উচ্চমানের। চলচ্চিত্রটি থেকে পরবর্তী সময়ে দৈত্য চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। কিং কং এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এডগার ওয়ালেশ ও মেরিয়ান টুপার রচিত কাহিনি অবলম্বনে কিং কং চলচ্চিত্র এতোটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো যে, কিং কং হলিউডের আইকনে পরিণত হয়। এ চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য লেখেন জেম্স ক্রিল্যান্ড ও রুথ রোজ; পরিচালনা করেন কুপার ও আর্নস্ট স্কোয়েডস্যাক। কিং কং-এর শিল্প নির্দেশনা দেন ক্যারল ক্লার্ক ও আল-হারমান। একদল চলচ্চিত্রকার একটি দ্বীপ থেকে একটি এপ (ape) ধরে আনেন নিউইয়র্ক সিটিতে। কিন্তু সেটি হঠাৎ করেই পালিয়ে যায়। এই চলচ্চিত্রে প্রথম কিছু অ্যানিমেশন ব্যবহার করা হয়, যার ফলে দর্শক এক বিকট গরিলার হাতের তালুতে প্রধান অভিনেত্রীকে দেখে অভিভূত হয়ে যায়। এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের উচ্চ শিখরে ওঠার বিষয়টি ফটোগ্রাফির এক অভিনব ব্যবহার প্রদর্শন করে। ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’ কাহিনির আলোকে একটি ধ্রুপদী কাহিনি তৈরি করার মধ্য দিয়ে কিং কং ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র হিসেবে সুনাম অর্জন করে। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে কিং কং পুনর্নির্মিত হয় এবং তারও পরে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত কিং কং-এ কম্পিউটার সহযোগে ডিজিটাল ইমেজ ও ইফেক্ট আনা হয়।


১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইউনিভার্সাল আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে The Bride ofFrankenstein। চলচ্চিত্রটির নির্মাণ পরম্পরার একটি সার্থক সূচনা। এরপরে আসে চার্লি চ্যাপলিনের City Lights(১৯৩১)। যদিও এই চলচ্চিত্রটিকে চ্যাপলিনের শেষ নির্বাকচিত্র মনে করা হয়, তবুও সঙ্গীতসহ শব্দের ব্যতিক্রমী ও ব্যাপক ব্যবহার এখানে রয়েছে। চলচ্চিত্রটির কাহিনি ছিলো চমকপ্রদ। ট্রাম্প একটি অন্ধ মেয়ের প্রেমে পড়েন। মেয়েটি মনে করতো, ট্রাম্প খুব অর্থশালী এবং সে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য ট্রাম্পের অর্থ সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এদিকে অর্থ উপার্জনের জন্য ট্রাম্প বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে থাকেন। একদিন এক মাতাল বিত্তশালী তাকে অনেক অর্থ দেয়, যা দিয়ে ভিয়েনায় মেয়েটির চোখের চিকিৎসা করানো সম্ভব হতো। ঘটনাক্রমে এর মধ্যে সেই মাতালের বাড়িতে ডাকাতি হয় এবং সে ভুলে যায় যে, একটা বিরাট অঙ্কের টাকা সে ট্রাম্পকে দান করেছিলো। বরং ট্রাম্পকে সে এই ডাকাতির জন্য দায়ী করে এবং পুলিশের হাতে তুলে দেয়।


চার্লি চ্যাপলিন মনে করতেন, হলিউডের বাইরে চাইলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সফল চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায়। ১৯৩০-এর দশকের প্রথমার্ধে অস্কার পাওয়া চলচ্চিত্রগুলো ছিলো হলিউড নির্মিত। কারণ অস্কার মনোনয়নকারীরা অধিকাংশই হলিউডের সঙ্গে জড়িত ছিলো। তারা সাধারণত ব্যয়বহুল চলচ্চিত্রগুলোকেই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করতো। Cimarron এমনই একটি ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র। যা ১৯৩০-১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের সবচেয়ে ‘সুন্দর’ চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণে খরচ হয় এক লাখ ২৫ হাজার তিনশো ডলার। ৩০-এর দশকে অস্কার পাওয়া চলচ্চিত্রগুলোর তালিকা দেখলে এ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে।


.

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে এমজিএম নির্মাণ করে Mutiny on the Bounty; যা অস্কার পায়। বলা হয়ে থাকে, এই চলচ্চিত্র থেকে ধ্রুপদী হলিউডের উত্থান।৩৭ ক্যাটালিনা দ্বীপে এ চলচ্চিত্রের অধিকাংশ দৃশ্য ধারণ করা হয়। অভিজাত ব্যক্তির সমুদ্র অভিযান এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামমুখর এক কাহিনি নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মিত। এরপরে কমেডি চলচ্চিত্র হিসেবে A Night at the Operaমুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি বক্স অফিসে হিট হয়। বক্স অফিসের রিভিউ অনুযায়ী ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ A Night at the Opera মার্কস ব্রাদার্সের শ্রেষ্ঠ কমেডি চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।


১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে The Great Ziegfeldঅস্কার লাভ করে। ‘লিবার্টি’ পত্রিকায় বলা হয়, It lacks humour and intimate appeal, but still provides a great show¾it gives you, your money's worth with its fifty stars and three hundred beauties.38 স্বাভাবিকভাবেই এতো বিপুল সংখ্যক অভিনেতা-অভিনেত্রীর সমন্বয়ে খুব কম চলচ্চিত্রই এ সময়ে নির্মিত হয়। ‘গ্ল্যার্মাস স্টুডিও’র হিসেবে ১৯৩০-এর দশকে এমজিএম উচ্চ স্থানে অবস্থান করছিলো। এই সময় বায়োপিক (In Biography) প্রকৃতির এই চলচ্চিত্র একদিকে উঁচু সংখ্যক কলাকুশলী এবং অন্যদিকে ব্যাপক সঙ্গীতের আয়োজন এক নতুন জেনেরা (ধারা) তৈরি করতে পেরেছিলো। ‘লস অ্যাঞ্জেল্স টাইম্স’ তাদের পর্যবেক্ষণে বলে,


Hollywood passed judgement on The Great Ziegfeld last night, The verdict, which will probably take from today, was that this spectacular musical creation of the film is one of the most beautiful lavish and incertain episodes, gorgeous pictures ever produced.39


এই চলচ্চিত্রে মূলত জিগফেল্ড (Ziegfeld)-এর জীবনী নিয়ে গল্পের শুরু। তার জীবনে বেশকিছু নারীর ভূমিকা তুলে ধরে এই গল্প। শেষত জিগফেল্ড স্বাভাবিক জীবন শুরু করেন বিয়ের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু মঞ্চে সাফল্যের চূড়ান্ত লগ্নে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব এসে পড়ে। কেউ কেউ জিগফেল্ড-এর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের যুক্তি খুঁজে পান না। তারা মনে করেন, জিগফেল্ডকে চরিত্রগতভাবে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং শিল্পী হিসেবে তাকে সুপারম্যান বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। জিগফেল্ড-এর নারী পরিবেষ্টিত সঙ্গীতময় বেলেল্লেপনা আসলে চলচ্চিত্রে ফুটে ওঠেনি; তবে অনেকের মতে, একটি ভিন্ন ধারার জীবনাশ্রয়ী চলচ্চিত্র হিসেবে জিগফেল্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যথেষ্ট দর্শকপ্রিয়তা লাভ করেছিলো। স্টেজ পারফরমেন্সভিত্তিক এই চলচ্চিত্রে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়।


Swing Time(১৯৩৬), RKO নির্মিত, যা ৩০-এর দশকের সঙ্গীত সমৃদ্ধ চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম। এই চলচ্চিত্রে ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার (Astaire) নাচ করেছেন ডিনজার রজার্স জোন-এর সঙ্গে। এই দুজনের নাচের ১০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে থেকে এটিকে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বলা হয়ে থাকে। হালকা গল্পের ভিত্তিতে নির্মিত চলচ্চিত্রটি মনোমুগ্ধকর কিছু গানের কলি চিরস্মরণীয় করে রেখেছিলো এর দর্শককে, যেমন : The Way you Look to Night, Fine Romance I Pick Yourself Up। অ্যাস্টেয়ার ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মঞ্চের গায়িকা ছিলেন, এরপর খুব সহজেই নিজ গুণে তিনি হলিউডে প্রবেশ করেন। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রজার্সের সঙ্গে অ্যাস্টেয়ার নাচগানের এক অভূতপূর্ব ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এরপর তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে এবং রজার্স সঙ্গীত বহির্ভূত ভূমিকায় অভিনয় শুরু করেন। এবং শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে Kitty Foley(১৯৪১) চলচ্চিত্রে অস্কার লাভ করেন। 


Swing Time -এ মার্গারেট ওয়াটসনের সঙ্গে ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার সম্পৃক্ত ছিলেন। এরপর রজার্স জোনের সঙ্গে একটি নৃত্যদল তৈরি করেন। Swing Timeএকটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সরল প্রকৃতির চলচ্চিত্র। এফ এক্স ফিনি ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে এই চলচ্চিত্র সম্পর্কে মন্তব্য করেন, Some of the most perfectly photographed, supple and expressive moments of pantomine in any film.40‘নিউইয়র্ক টাইম্স’ পত্রিকায় Frank S Nugunt মন্তব্য করেন,


There was not riot outside the (Radio city) Music Hall yesterday; the populace was storming the Rockefeller's cinema citadel for a glimpse of the screen's nimblest song and dance team... The picture is good, of course. But ... it is a disappointment, Blame it. Primarily, upon the music. Jerome Kern has shadow-boxed with swing. 41


ÔMotion Picture DailyÕতে এই চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে বলা হয়েছে,


The best of the Astaire-Rogers films to date, Swing Time is a golden boom at the box office. The film seems much shorter than its 100 minutes because of the featherweight quality achieved by the brilliant balance of comedy, music, dancing and the plot none of which is over-emphasized and none slighted. 42

 

.

১৯৩০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে সঙ্গীত সমৃদ্ধ ও কমেডি চলচ্চিত্রের দারুণ উত্থান ঘটে। এ সময় চার্লি চ্যাপলিন তার জনপ্রিয় চরিত্র ‘লিটল ট্র্যাম্প’কে নিয়ে Modern Times(১৯৩৬) নির্মাণ করেন। আধুনিক শিল্প সমাজের ক্রমবর্ধমান সংগ্রামমুখর জীবনে ট্র্যাম্পের বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়ে এই চলচ্চিত্রের কাহিনি। এ সময়ের অবারিত পুঁজিবাদী উৎপাদন কীভাবে মানুষের ওপর প্রভাব ফেলেছিলো তা সুন্দরভাবে এই চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করেন। শ্রমজীবী মানুষের অমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ার বর্ণনা চ্যাপলিনের নিজস্ব কৌতুক ও হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে সার্থকভাবে চিত্রায়িত হয়। গল্পের নায়ক উপর্যুপরি বিভ্রান্তির মধ্যে পতিত হন। ঘটনাক্রমে এই চরকিবাজী দুঃসময়ে ট্র্যাম্প কমিউনিস্ট পার্টির শোভাযাত্রায় আসেন। এবং এক ভবঘুরের প্রেমে পড়েন-যে ছিলো আসলে চ্যাপলিনের বাস্তব জীবনের রোমান্টিক পার্টনার।



চ্যাপলিনের নির্বাক চরিত্রের অনুরাগ Modern Times-এর শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে চাতুর্যপূর্ণভাবে কথকতার অন্তঃসারশূন্যতা প্রকাশ পায়। দীর্ঘদিনের নির্বাক চরিত্রের নির্মাণকারী ও অভিনেতা চ্যাপলিন Modern Times-এ ট্র্যাম্পকে দীর্ঘ সময় নির্বাক রেখেছেন। কেবল তার প্রেমিকার জন্য তাকে গান গাওয়ার সুযোগ দেন চলচ্চিত্রে। এতে তিনি যে সাবটাইটেল ব্যবহার করেছেন, সেটিও মোটেই সুন্দর ও শোভন হয়নি বলে অনেক সমালোচক মনে করে। কারণ দর্শক এসব টাইটেল লক্ষ করার সুযোগ খুব একটা পায় না। এসব ক্রটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও Modern Times-কে একটি সফল চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে সাধারণ সমর্থন ছিলো। একজন সমালোচকের ভাষায়,


Modern Times is one-hundred percent a one-man picture as is probably possible. Produced, starring, authored, composed (special music) and directed by Chaplin, the pantomimist stands or falls by his two years work as it unreels.43


সামাজিক সমস্যা ও সে ব্যাপারে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য চলচ্চিত্রের যে একটা ভূমিকা রয়েছে, তা চ্যাপলিনের এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে উৎসাহিত হয়। পুঁজিবাদী সমাজের নরক যন্ত্রণা ব্যক্তিজীবনের মধ্য দিয়ে প্রদর্শিত হলেও সামাজিক পরিবর্তনের আহ্বানকে সমাজতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। কমিক জিনিয়াস হিসেবে চ্যাপলিনের ভাবমূর্তির পাশাপাশি সমাজ সমালোচক হিসেবে একটি নতুন পরিচয় এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৩০-এর দশকে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটকে ক্ষণস্থায়ীভাবে রূপ দেওয়ার জন্য একজন চিত্রপরিচালক, লেখক ও অভিনেতা হিসেবে চ্যাপলিন যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। চলচ্চিত্রটিকে শুধুমাত্র হাস্য-রসাত্মক বিনোদনমূলক চরিত্র দাঁড় করার জন্য চ্যাপলিন অনেক সহজ উপায় অবলম্বন করতে পারতেন, কিন্তু সামাজিক দায়কে অস্বীকার না করে তিনি সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। Modern Times, Swing Time I The Great Ziegfeld চলচ্চিত্র তিনটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্বকালে হলিউড ক্ল্যাসিক হিসেবে গণ্য করা হয়।


.

এ সময়ে অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র তৈরিতে একটি আলাদা ধারার সৃষ্টি করে ওয়াল্ট ডিজনি ও তার ভাই রয় ডিজনি। তারা অনেক আগেই পারিবারিকভাবে চলচ্চিত্র তৈরির জন্য স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ৩০-এর দশকের শেষের দিকে ডিজনি প্রথম অ্যানিমেডেট চলচ্চিত্র তৈরি করেন। আর ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেডেট চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করেন ডিজনি। Snow White and the Seven Dwarfs নামের সেই চলচ্চিত্রটি নির্মাণে ডিজনির পাঁচ বছর সময় লাগে এবং খরচ হয় ১৫ লাখ ডলার। সেই সময়ে এটি ছিলো যেমন ব্যয়বহুল, তেমন ঝুঁকিপূর্ণ। মজার ব্যাপার হলো, ডিজনির অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনার কথা শুনে অনেকেই তাকে পাগল ঠাওরালেও আজ পর্যন্ত এই ধারা সচল সাবলীল ও জনপ্রিয় রয়েছে। এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য আলাদা ধরনের কৃৎকৌশলগত অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়; যা অন্য কেউ করেনি। প্রাণি নিয়েও ডিজনি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। অ্যানিমেশনের কৌশলকে তিনি এমনভাবে বিকশিত করেন, যা সত্যিকার মানুষ ও প্রাণির মতো চলাফেরা ও ভাবভঙ্গি করতে পারতো। এছাড়া শব্দ ও সঙ্গীতের সমাহারও ছিলো সবাকচিত্রের মতো। স্নো হোয়াইট চলচ্চিত্রে ডিজনির ‘মিউজিক’ ও ‘লিরিক’-এর ব্যবহার সমালোচনার সৃষ্টি করে। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ডিজনির এই চলচ্চিত্রের ৫০ বছর পূর্তি হয়। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচারস আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস ডিজনিকে তার চলচ্চিত্রের জন্য বিশেষ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। প্রথম বছরেই চলচ্চিত্রটি খরচের ১০ গুণ আয় করতে সক্ষম হয় এবং ১৫ বছরের মধ্যে ৩৩০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে সক্ষম হয়। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, বিশ্ব চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাসে একটি আলাদা জেনেরা হিসেবে আবির্ভূত হয় চলচ্চিত্রটি।


১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে পরিচালক ফ্রাঙ্ক ক্যাপরা Mr. Smith Goes to Washigton নির্মাণ করতে গিয়ে একটি নতুন নিরীক্ষার জন্ম দেন। তিনি তার কলাকুশলীদের নিয়ে ওয়াশিংটন শহর ঘুরে বেড়ান। শহরের বিভিন্ন লোকেশনে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার আলোকে তিনি শুটিং করেন। এ ধরনের বাস্তব প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারাকে ফ্রাঙ্ক ক্যাপরা অ্যাবসলুট রিয়েলিজম হিসেবে উল্লেখ করেন। বাস্তবতা বলতে, পর্যবেক্ষণ বলতে, জীবনের যেকোনো ঘটনা বোঝায়; কিন্তু রিয়েলিজমের মধ্য দিয়ে ফ্রাঙ্ক ক্যাপরা একটা নান্দনিক তত্ত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই চলচ্চিত্র এবং এর অনুকরণে পরবর্তী সময়ে নির্মাণ করা বিভিন্ন চলচ্চিত্রের বাস্তবতা অনেক সময় বাস্তবতার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে (বাস্তবতা) গুলিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। চলচ্চিত্রটির ব্যাপারে ওয়াশিংটনের অনেক সিনেটর ও প্রশাসক কিছুটা উষ্মা প্রকাশ করলেও ক্যাপরা বলেন, তিনি মার্কিন গণতন্ত্রকে আদর্শায়িত করার জন্য চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন, আক্রান্ত করার জন্য নয়। তবে অনেকেই মনে করে, নাৎসি জার্মানি, ফ্যাসিস্ট ইতালি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এই চলচ্চিত্র দেখে যতোটা আনন্দিত হবে মার্কিন জনগণ ততোটা হবে না। কারণ মার্কিন গণতন্ত্র চর্চার অনেক অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, তাদের নেতিবাচক দিকগুলোকে প্রতিভাত করবে।


এই কাহিনিচিত্রকে নিয়ে এতো বেশি ভাবনাকে প্রশয় না দিয়ে বলা যায়, বিভিন্ন দিক থেকে চলচ্চিত্রটি নতুনত্বের দাবিদার। মার্কিন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ÔThe Daily WorkerÕ চলচ্চিত্রটিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করে। স্নায়ুযুদ্ধের প্রাক্কালে বিখ্যাত ‘ভ্যারাইটি’ পত্রিকায় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাদের মতে, সোভিয়েত ইউনিয়ন চলচ্চিত্রটিকে মার্কিনবিরোধী প্রোপাগান্ডায় ব্যবহার করতে পারে।৪৪ ‘লস অ্যাঞ্জেল্স বিজনেস জার্নাল’ বলে, বাস্তবতার প্রকৃত দিক এই চলচ্চিত্রে প্রস্ফুটিত হয়নি। দীর্ঘদিন চলচ্চিত্রটি নিয়ে এ ধরনের বিতর্ক চলেছে এবং সেটিই প্রমাণ করে চলচ্চিত্রটিতে দেখার মতো কিছু আছে। তবে সাধারণ্যে চলচ্চিত্রটির তেমন নেতিবাচক সমালোচনা দেখা যায় না।


.

১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে It Happened One Night অস্কার লাভ করায় মোশন পিকচার ইন্ডাস্ট্রির সবাই কিছুটা অবাক হয়। অনেকে মনে করে, এই পুরস্কার ছিলো অপ্রত্যাশিত ও অনভিপ্রেত। এই চলচ্চিত্র পাঁচটি বিভাগে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লাভ করে-পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রী, চিত্রনাট্য ও চলচ্চিত্র। বিভিন্ন পেশাজীবী, সমালোচক, পণ্ডিতজন আজও এই চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি লাভকে প্রশংসার চোখে দেখে। এরপর ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ঝঃধমবপড়ধপয একটি তাৎপর্যপূর্ণ চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আধুনিক ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের সূচকে চলচ্চিত্রটির কাহিনি গড়ে উঠেছে আইন, বিশৃঙ্খলা, অসহিষ্ণুতা ও স্থায়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে। হলিউড ওয়েস্টার্নের প্রমিত গল্পের ধারা অবলম্বন করে এটি রূপায়ণ করা হয়। যেখানে ইন্ডিয়ানদের আক্রমণ একটি স্থায়ী ভীতিকর পটভূমি তৈরি করে। এছাড়া আইন লঙ্ঘনকারী নায়ক, সৎ আইন কর্মকর্তা, জালিয়াত ব্যাংকার, সৎ-হৃদয় পতিতা চরিত্রগুলো চমকপ্রদ আধুনিক গল্পের উপাদান হিসেবে উঠে আসে। পলিন কায়েল ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ‘নিউ রিপাবলিক’ পত্রিকায় লেখেন, Just about every good Western made since 1939 as imitatated Stagecoach or has learned something from it.45


আরিজুয়ানা মনুমেন্ট ভ্যালি’র পটভূমিতে চলচ্চিত্রায়িত এই চলচ্চিত্রে সেখানকার ভূ-দৃশ্য সুন্দরভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। এছাড়া আমেরিকার লোকসঙ্গীত ব্যবহারের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটির সঙ্গীত দৃশ্যগুলো ধারণ করা হয়। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হলিউডের ইতিহাসে জন ওয়েন তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।


Wuthering Heights আরেকটি প্রশংসিত ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্র, যা ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়। গ্রেক টোল্যান্ড এতে সিনেমাটোগ্রাফির জন্য অস্কার লাভ করেন। ‘ভ্যারাইটি’ পত্রিকা এই চলচ্চিত্রের ওপর মন্তব্য করে, Wuthering Heights will have to depend on class audiences. Its general somberness and psychological tragedy is too heavy for general audiences.46 এ ধরনের মেলোড্রামায় হলিউড ঐতিহ্য অনুসারে সাধারণ ঘরের মেয়েদেরকে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বড়ো চরিত্রে আনার পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ওয়েইলার একজন ধীর ও সুক্ষ্ম দৃষ্টির পরিচালকের পরিচয় দেন। হিথক্লিফ একজন উদ্বাস্তু জিপসি বালক, যাকে লিভারপুলের রাস্তা থেকে সম্ভ্রান্ত ইংরেজ পরিবারে আনা হয়। সেখানেই সে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। বাড়ির মালিকের মেয়ে ক্যাথির সঙ্গে প্রেমজ সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। এদিকে ক্যাথির প্রেমে পড়েন অর্থশালী ও সম্ভ্রান্ত এডগার লিন্টন। এবং তারা শেষত বিয়ে করেন। ইতোমধ্যে হিথক্লিপ আমেরিকায় যান এবং বিপুল অর্থ ও সৌভাগ্য নিয়ে ফিরে আসেন। তিনি প্রসিদ্ধ Wuther Heights কাউন্টি ক্রয় করেন। লিন্টনের ছোটো বোন ইসাবেলা প্রেমে পড়েন হিথক্লিফের; তাদের বিয়েও হয়। ক্যাথি মৃত্যুশয্যায় হিথকে জানান, তিনি আসলে তাকেই ভালোবাসেন। তবে বিভিন্ন কারণে তিনি তার ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতে পারেননি। চলচ্চিত্রটির প্রশংসা করে ‘নিউইয়র্ক পোস্ট’-এর সমালোচক আর্চার উইস্টেন বলেন, এটি গভীরভাবে কল্পনা শক্তির এক আবহ সৃষ্টিকারী কাহিনি, যা এমিলি ব্রোন্টির গল্পের সার্থক চলচ্চিত্রায়ণ বলা যায়।৪৭ ‘নিউইয়র্ক টাইম্স’ লেখে, ব্রোন্টির কাহিনির রোমান্টিক বৈশিষ্ট্য যথাযথভাবে চলচ্চিত্রে ফুটে উঠেছে।৪৮ Wuthering Heights একটি ক্ল্যাসিক হলিউড চলচ্চিত্র হিসেবে পেশাভিত্তিক নির্মাণকারীদের হাতে ব্রিটিশ উপন্যাসকে যথাযথ রূপদান করতে পেরেছে।


১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে এক বাম্পার বছর। বিভিন্ন জেনেরা ও ব্যাপক পরিসরের প্রযোজকরা এ সময় চলচ্চিত্র নির্মাণে অংশগ্রহণ করে। কিছু কিছু চলচ্চিত্র ছিলো হলিউডের ক্ষুদ্র অথচ শক্তিশালী ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রযোজকদের; যেমন : ওয়াল্টার ওয়ানকারের Stagecoach এবং স্যামুয়েল গোল্ডউইন-এর সদ্য আলোচিত Wuthering Heights। ভিক্টোর ফ্লেমিংয়ের পরিচালনায় নির্মিত হয় The Wizard of Oz। এল ফ্রাঙ্ক বোম্ব রচিত উপন্যাস অবলম্বনে এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়। ওজ (Oz) সিরিজের প্রায় ১৪টি ভলিউম আছে। সেগুলো নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রচেষ্টা লেখক এর আগে করে এসেছেন। কিন্তু সফল হন নাই। পরিশেষে হলিউডের গোল্ডউইন ওজ গল্পগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে কিনে নেন। অবশ্য পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে তিনি তার স্বত্বাধিকার এমজিএম-এর কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এই চলচ্চিত্রে ফ্লেমিং একশো মিনিটের ১৪ শতাংশ সময় সঙ্গীতে ব্যবহার করেন। উইজারড্ হিসেবে ফ্রাঙ্ক মর্গান আর টিন ম্যান হিসেবে জ্যাক হ্যালিকে নির্বাচিত করেন। যখন এমজিএম চলচ্চিত্রটি সমাপ্ত করে এবং মুক্তি দেয়, তখন এ নিয়ে সমালোচনা ছিলো মিশ্র প্রকৃতির। এই চলচ্চিত্রটি দুটি অস্কার পায়। হার্বাট স্টথার্ট সঙ্গীতে এবং শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত হিসেবে ÔOver the RainbowÕ অস্কার লাভ করে। গত শতাব্দীতে এই চলচ্চিত্রটি সব বয়সের সর্বাধিক দর্শক আকর্ষণ করতে পারে, যা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিরল।


১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কৃত হয় Gone With the Wind যাকে মেগা ব্লক বাস্টারও বলা হয়ে থাকে। তিন ঘণ্টা ৪০ মিনিট দৈর্ঘ্যরে এই কাহিনিচিত্রে সেসময়ের রেকর্ড পাঁচজন নির্মাতার মেধা সমর্পিত হয়। যদিও ভিক্টোর ফ্লেমিং প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এছাড়া ১৮ জন চিত্রনাট্যকার ৫৯ জন প্রধান চরিত্রাভিনেতা এবং আড়াই হাজারের মতো অতিরিক্ত শিল্পী কাজ করেন। পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া মার্গারেট মিচেল-এর উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে উপন্যাসটি প্রকাশ হওয়ার প্রথম দিনেই ৫০ হাজার কপি বিক্রি হয় বলে জানা যায়। তবে সেক্সিস্ট এবং মতাদর্শগতভাবে দুর্বল হিসেবে চলচ্চিত্রটি সমালোচিত হয়।


১০.

১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে আলফ্রেড হিচকক পরিচালিত Rebecca শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। হিচকক মূলত ইংল্যান্ড থেকে হলিউডে আসেন চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য। প্রথম সুযোগেই তিনি বিরাট সাফল্য পান। ডেফনি ডু মরিয়ার রচিত ‘Rebecca’ উপন্যাসটি সুপরিচিত ছিলো। তবে তার কাহিনি ও বক্তব্য চলচ্চিত্রের জন্য কতোটা উপযুক্ত হবে তা বলা কঠিন ছিলো। এই চলচ্চিত্রটি সেল্ঝনিক ইন্টারন্যাশনালের ব্যানারে নির্মিত; অবশ্য প্রতিষ্ঠিত নামকরা স্টুডিওগুলোর মধ্যে একে ফেলা যায় না। উপন্যাসটির চিত্রায়ণ কঠিন ছিলো এ কারণে যে, এর প্রধান চরিত্র কখনোই জনসম্মুখে আসে না। রেবেকা ছিলো রহস্যময় ম্যাক্স দে উইন্টার-এর মৃত স্ত্রী। তার দ্বিতীয় স্ত্রী ম্যাক্সকে বিয়ে করেন এবং তাদের পারিবারিক স্টেটে বসবাস করতেন। সে পরিবারে মৃত রেবেকার উপস্থিতি অমোচনীয় ছিলো। এ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখেন জর্জ বার্নস। প্রথমে একটি ভূতুড়ে গল্প মনে হলেও পরবর্তী সময়ে হত্যার রহস্য বেরিয়ে আসে। এবং শেষতক একটি মনস্তাত্ত্বিক গোয়েন্দা কাহিনিতে রূপান্তরিত হয়। ম্যাক্সের সঙ্গে তার মৃত স্ত্রীর ভালোবাসা ও ঘৃণার মিশ্র সম্পর্ক ছিলো এবং এই ঘটনার সঙ্গে তাদের প্রাক্তন পরিচারিকা ড্যানভারস্ সম্পর্কিত ছিলো।



হিচকক-এর আগে ব্রিটেনে দুটি রহস্য চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। এগুলো হলো দ্য থার্টি লাইন স্টেপস এবং দ্য লেডি ভ্যানিশেস। এগুলোকে রেবেকার কাহিনির সমগ্রোত্রীয় জেনেরায় ফেলা যায়। চলচ্চিত্রটি নির্মাণের ক্ষেত্রে হিচকক একটি পরিপাটি দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করেছিলেন এবং তার চিত্রনাট্যকারকে প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় ও চরিত্রের ওপর আলোকপাত করার নির্দেশ দেন। এর ফলে সামাজিক সংঘাত, বৈবাহিক জীবনের অস্থিরতা, প্রতারণা এবং অবমাননা সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। এই কাহিনিতে ২২ বছর বয়সি ফন্টেনের মধুচন্দ্রিমা সমাপান্তে ফিরে আসার ঘটনাটি হিচকক গুরুত্ব দেন এবং উইস্টারের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে একধরনের অপূর্ণতার অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ রাখেন। পরবর্তী সময়ে ফন্টেন তার ‘নো বেড অব রোজেস’ শীর্ষক গ্রন্থ বলেন,


[Hitchcock] would constantly tell me that no one thought I was any good except myself and that nobody really liked me ... He seemed to relish the cast not liking one another, actor for actor, by the end of the film.49


রেবেকা হিচককের প্রথম মার্কিন চলচ্চিত্র। এরপর তিনি কমপক্ষে ৩০টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। তবে সেলঝনিকের আর কোনো চলচ্চিত্র তিনি পরিচালনা করেননি।


রেবেকার বিপরীতে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে The Philadelphia Story মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির জীবনকাহিনি নিয়ে লেখা; যদিও প্রাচুর্যহীন জনগণের কাছে অপাক্তেয় ছিলো না। ক্যাথরিন হেপবার্ন এই সিনেমার নায়িকা নির্বাচিত হন। যদিও এক বছর আগে গন উইথ দ্য উইন্ড চলচ্চিত্রে পরিত্যক্ত হন তিনি। এর কারণ ছিলো, হেপবার্ন তার যৌনতাকে যথাযথভাবে পরিহার করতে পারবে। বর্তমান চলচ্চিত্রে হেপবার্নকে অন্তর্ভুক্ত করার একটি কারণ ছিলো-তার ভাবমূর্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এখানে হেপবার্ন একজন সমব্যথী উচ্চবিত্তের মেয়ে, যে তার স্বামীকে অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্য পরিত্যাগ করেন এবং বিয়ে করেন শিল্পপতি জর্জ’কে। এদিকে জেমি স্টুয়ার্ড ডেকস্টারের পক্ষে তার মনোভাব পরিবর্তনের জন্য তোষামোদ করতে থাকেন। জিমি আসলে স্ক্যান্ডাল জাতীয় একটি পত্রিকার সাংবাদিক। তিনি চাইছিলেন, হেপবার্ন তার পূর্ববর্তী স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করুক। যদিও হেপবার্নের ক্যারিয়ার পুনরুদ্ধারের নিমিত্ত ছিলো, কিন্তু স্টুয়াডের (ম্যাকলি কনর) অভিনয় সবার দৃষ্টি কাড়ে। এবং তিনি বেস্ট অ্যাক্টর হিসেবে অস্কার লাভ করেন। পরবর্তী দশকে অবশ্য এই চলচ্চিত্রটি High Society (১৯৫৬) নামে পুনর্নির্মাণ করা হয়।


জন স্টেইনবার্গের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে The Grapes of Wrathনির্মিত হয়। সামাজিক নীতিবোধের একটি শক্তিশালী গল্প মার্কিন চলচ্চিত্রে নতুন সংযোজন বলা যেতে পারে। জন ফোর্ড চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে উপন্যাসটি প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে দারিল এফ জানুক এর চলচ্চিত্র স্বত্ব ৭৫ হাজার ডলারে কিনে নেন এবং হলিউডে প্রযোজক নানালি জনসনকে চিত্রনাট্য লেখার দায়িত্ব দেন। এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র টম জোডের জন্য হেনরি ফন্ডাকে নিযুক্ত করা হয়। গ্রেক টোল্যান্ড চলচ্চিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চলচ্চিত্রটি নির্মাণের জন্য মোটামুটি সাতশো ৫০ হাজার ডলার নির্ধারণ করা হয়।


মূল গল্পের অনুসরণে এখানে একটি পরিবারের স্থানান্তরকে দেখানো হয়; যেখানে তারা ওকলাহোমার ডাস্ট বোল থেকে বিশ্বমন্দার আগে ক্যালিফোর্নিয়া চলে আসে। এই নতুন জায়গায় এসে তারা যে আগ্রাসী মনোভাবের শিকার হন তা চিত্রনাট্যকার খুব আবেগীয়ভাবে তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। দ্য গ্রেপ্স অব র‌্যাথ সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য নিয়ে লেখা তুলে ধরে, যেখানে পরিবারটি আগন্তুক হিসেবে নিগৃহীত হয় এবং আগের মর্যাদাটুকু রক্ষা করতে পারেনি। ওকিস্টদের জীবনের সরলতা ও সংগ্রাম ফন্ডাসহ অন্যান্য চরিত্রগুলো অত্যন্ত নিপূণভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। টোল্যান্ড অবশ্য ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে মারা যান। তার কাজের সূক্ষ্ম কৌশল, আত্যন্তিক মনোযোগ চলচ্চিত্রটির সাফল্যে বড়ো অবদান রাখে। শান্ত প্রকৃতির অন্তর্মুখী যে চরিত্রটিতে ফন্ডা অভিনয় করেন, সেখানে অনেক অভিনয় কৌশল এককভাবে তাকে সম্পন্ন করতে হয়। এজন্য দর্শক এই চলচ্চিত্রের পরিচালক জন ফোর্ড ও অভিনেতা ফন্ডার প্রশংসা করে। ‘নিউইয়র্ক টাইম্স’ এর চিত্র সমালোচক ফ্রাঙ্ক নাগেট মন্তব্য করেন,


In the vast library where the celluloid literature of the screen is stored, there is one small, uncrowded shelf devoted to the cinema's masterpieces, to those films which by dignity of theme and excellence of treatment seem to be of enduring artistry. To that shelf of screen classics Twentieth Century-Fox yesterday added its version of John Steinback's The Grapes of Wrath.50


১১.

Fantasia ওয়াল্ট ডিজনির পরবর্তী চলচ্চিত্র, যাকে তিনি নিজেই Most Exciting Adventure বলে উল্লেখ করেছেন। কল্পনা, সংবেদন ও সৌন্দর্যের প্রতি নমনীয় সব বয়সের দর্শকের জন্য এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়। এছাড়া রঙ, শব্দ, গতি এবং গল্প বলার ধরনের দিক থেকে এটি ছিলো একটি উচ্চমানের নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্র। আগের চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সময় ডিজনি সবসময় সব সঙ্গীদের সমন্বয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের চিন্তা করেন। এ সময় ফিলাডেলফিয়া অর্কেস্ট্রা লিওপোল্ড স্টোকওয়াসি’র সঙ্গে তার আলাপ হয়। স্টোকওয়াসি ডিজনির পরিকল্পনাকে সাধুবাদ জানান এবং তাকে ফ্যান্টাসিয়ার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এই চলচ্চিত্রটির জন্য স্টেবিওফনিক টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়; যা আগে কোনো চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে করা হয়নি। এতে করে কিছু সঙ্গীতজ্ঞ বিষয়টিকে বাখ, বিটোভেন ও আরো ছয়জন ধ্রুপদী সঙ্গীত সঙ্কলকের ‘Leopold Stowkowsi-ization’ বলে উল্লেখ করেছেন।


অবশ্য সাধারণ লোকেরা মনে করতো, স্টোকওয়াসি ধ্রুপদী সঙ্গীতকারদের জনপ্রিয়করণে কাজ করে। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। ‘নিউইয়র্ক টাইম্স’-এ বসলি কাউথার লেখেন, Motion Picture history was made last night.51চার বছরব্যাপী সাতটিরও বেশি অ্যানিমেটর ফ্যান্টাসিয়ায় কাজ করে। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচারস ডিজনিকে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করে। এই পুরস্কারের উদ্দেশ্য ছিলো মোশন পিকচারে শব্দ ব্যবহারের অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখা।


প্রেস্টন স্টারজেস ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে Sullivan's Travelsনির্মাণ করেন। তিনি তার নিজ নামে লিখিত আত্মজীবনীতে অন্যান্য চলচ্চিত্র নির্মাণকারীদের প্রচলিত প্রবণতার সমালোচনা করেন। ‘মেসেজ ফিল্ম’ নির্মাণের প্রবণতার বিরুদ্ধে তিনি নির্মাণ করেন তার এই বিদ্রুপাত্মক চলচ্চিত্রটি। জন এল সুলিভান ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, কিন্তু তিনি ঘোষণা দেন, তার পরবর্তী চলচ্চিত্র (সুলিভান্স ট্রাভেলস) মানবীয় দুর্দশাকে তুলে ধরবে। বিনোদনের পরিবর্তে সত্যিকার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতকে তার চলচ্চিত্রে তুলে আনবেন। তিনি সত্যিকার আমেরিকার দুরবস্থাকে দেখার জন্য বেরিয়ে পড়েন। অবশেষে সিনক্লেয়ার বেকস্টাইনের উপন্যাস অবলম্বনে চিত্র নির্মাণের ঝুঁকি নেন। পরিশেষে পরিস্থিতিটা এমন দাঁড়ায় যে, এই চলচ্চিত্রের নির্মাতা নিজের ওপর এবং শৈল্পিক মাধ্যমের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। তবে তার নিজস্ব সহজাত গুণ ও পারদর্শিতার বদৌলতে কাজটি সম্পন্ন করেন। ভেনোরিকা লেককে নির্মাতা স্টারজেস ম্যাকক্রিয়ার বিপরীতে অভিনয়ের জন্য নির্বাচিত করেন। সবশেষে এই চলচ্চিত্র নির্মাণের খরচ দাঁড়ায় ছয় লাখ ৭৬ হাজার ছয়শো ৮৭ ডলারে। হলিউড সম্প্রদায়ে চলচ্চিত্রটির মর্যাদা কিংবদন্তিতুল্য হতে পেরেছিলো। সমালোচকরাও চলচ্চিত্রটি প্রশংসার দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করে।


১৯৯৭ ও ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউটের তালিকায় যে চলচ্চিত্রর নাম প্রথমে আসে সেটি হলো Citizen Kane, যা ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায়। শ্রেষ্ঠ ও বিখ্যাত চলচ্চিত্রের তালিকায় বার বার এই চলচ্চিত্রটি নির্বাচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও এ ঘটনা সমরূপ ছিলো। তবে বক্স অফিস অথবা মুনাফা কোনোটিই এই চলচ্চিত্রের খ্যাতি ও স্বীকৃতির জন্য দায়ী নয়। চলচ্চিত্রটির প্রথমবার মুক্তি পাওয়ার পর উপার্জিত অর্থ ছিলো এর ব্যয়ভারের চেয়ে কম। এটি বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হওয়ার অন্যতম কারণ ছিলো চলচ্চিত্রটির শৈল্পিক গুণাগুণ, যা সেসময় হলিউড স্টুডিও সিস্টেমে অভাবনীয় বলে লক্ষ করা যায়। এ চলচ্চিত্রের নির্মাতা অরসন ওয়েলস-এর চিত্রনাট্য লেখার কাজে সহযোগিতা করেন। এবং নাম ভূমিকায় অভিনয়ও করেন। ১৯৫০-এর দশকে ফ্রান্সে Citizen Kane অত্যর তত্ত্বের প্রেক্ষাপটে প্রসিদ্ধ চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।৫২


 (চলবে)


লেখক : প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।


himam_ru@yahoo.com

 

তথ্যসূত্র ও টীকা


৩৫. প্রযুক্তিগত উন্নতির খুঁটিনাটি বিবরণ জানার জন্য দেখতে পারেন : Crafton, Donald; (1997) History of American Cinema 4 The Talkies: American Cinema’s Transition To Sound, 1926-31; Charles Scribner’s Sons, New York.

36. Monaco, Paul (2010: 25); A History of American Movies; New York, The SCARECR O W Press, INC.

৩৭. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 43).

৩৮. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 44).

৩৯. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 45).

৪০. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 46).

৪১. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 47).

৪২. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 48).

৪৩. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 49).

৪৪. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 60).

৪৫. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 61).

৪৬. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 62).

৪৭. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 62).

৪৮. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 62).

৪৯. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 68).

৫০. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 72).

৫১. প্রাগুক্ত; Monaco (2010: 73).

52. The Auteur theory, which holds that the greatest films are those marked by the permeating creative creative force of an individuals. Whose presence in the movie is like that of an author of a novel was formulated in the 1950s in France; cÖv¸³; Monaco (2010: 76).

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন