মোহাম্মদ নূরুজ্জামান
প্রকাশিত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘আমার ফিলোসফি হলো দরকার পড়লে গল্প চেঞ্জ করবো, সবকিছু চেঞ্জ করবো, কিন্তু কাজ থামাবো না’
মোহাম্মদ নূরুজ্জামান

আম কাঁঠালের ছুটি খ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামান-এর বেড়ে ওঠা নদী বন্দরের শহর নারায়ণগঞ্জে। এটাই তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র। বিশ্বের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে দেখানো হয় আম কাঁঠালের ছুটি। এবং ২০২২ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার চেবাক্সারি আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে চলচ্চিত্রটি বিশেষ জুরি পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি প্রশংসাও কুড়ায়।
অবশ্য নূরুজ্জামানের অন্য একটি পরিচয়ও আছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্যে পড়ালেখা শেষ করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন স্থাপত্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘নির্মাণ উপদেষ্টা’। চলচ্চিত্রকে এখনো তিনি পেশা হিসেবে নেননি। প্যাশনের জায়গা থেকেই তার চলচ্চিত্রে আসা। তাই চলচ্চিত্র নিয়ে তার ভাবনাটাও খানিক ভিন্ন। তিনি মানুষের যাপিত জীবনের গল্পকেই তার চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু করতে চেয়েছেন শুরু থেকে। এ কারণে তার চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পী হিসেবে দেখা মেলে সেই সব সাধারণ মানুষের; কোনো পেশাদার অভিনয়শিল্পীর নয়।
নদী বন্দরে বেড়ে ওঠা জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়েই নূরুজ্জামান সম্প্রতি নির্মাণ করেছেন মাস্তুল। চলচ্চিত্রটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি ও তার দল। এরই মধ্যে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৪৭তম আসরে স্পেশাল মেনশন অ্যাওয়ার্ড (জুরি) অর্জন করেছে মাস্তুল।
গত ১০ মে ২০২৫-এ নিজের চলচ্চিত্র যাপন নিয়ে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেন মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মইনুল ইসলাম। সেই আলাপের প্রথম পর্ব ও শেষ পর্ব পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
‘মানে সিনেমাটাও হবে ওই ব্যান্ড মিউজিকের মতো’
ম্যাজিক লণ্ঠন : আলোচনাটা আমরা মাস্তুল দিয়ে শুরু করতে পারি। দেশের বাইরে এটা নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন হলো, যদি বলতেন?
মোহাম্মদ নূরুজ্জামান : মাস্তুল-এর প্রিমিয়ার হলো মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে; এটা আমার জন্য অবশ্যই খুব আনন্দের। এই প্রথম আমি ওখানে গেলাম ব্যাপারটা এ রকম না। আদিম-এর কো-প্রোডিউসার হিসেবে যুবরাজ শামীমের সঙ্গে গিয়েছিলাম ২০২২ সালে। ফলে এনভায়রনমেন্টটা আমার জানা। তারও আগে আমি আরো ছোটোখাটো কয়েকটা ফেস্টিভালে গিয়েছি। বাইরে প্রিমিয়ারের সবচেয়ে মজাটা হলো ভাষা সংক্রান্ত। আমাদের সিনেমাগুলো দেশের দর্শকরা কীভাবে কানেক্ট করে, এটা মোটামুটি প্রেডিক্ট করা যায়। তবে বাংলা না জানা দর্শকের রিয়েকশন নিয়ে আমি বরাবরই কৌতূহলী। কারণ আমি নিজেই আসলে সাবটাইটেল দেখে সিনেমা এনজয় করতে পারি না।
যখন দেখি সাবটাইটেল পড়ে অথবা শুধু ভিজ্যুয়াল দেখে বিদেশি লোকজন কানেক্ট করতে পারছে-তখন মনে হয় সিনেমাটা হয়তো হয়েছে; সার্টেইন একটা সিন, একটা মোমেন্ট হয়তো ক্রিয়েট হয়েছে; যেটা আমি চেয়েছিলাম। এটা ইন্টারেস্টিং! আমি আম কাঁঠালের ছুটির বেলায় দেখেছি, বাইরের লোকজন অনেক জায়গায় কানেক্ট করতে পারে না। যেটা দেশের লোকজন পারে। কারণ ব্যাকগ্রাউন্ডটা তাদের জানা। নিজের গল্প। মাস্তুল-এর বেলায় অবশ্য এমন পরিস্থিতি হয়নি। আরেকটা ভালো জিনিস হচ্ছে, মেজর ফেস্টিভালগুলোতে দর্শক কিন্তু সিনেমাটা যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে দেখে। আমজনতার মতো করে দেখে না। ফলে সিনেমার শেষে এমন ধরনের কিছু কোয়েশ্চেন আসতে থাকে, যেগুলো হয়তো রেগুলার দর্শক কখনো চিন্তাও করে না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এতো বড়ো ফেস্টিভালে যাওয়ার পরে নির্মাতা হিসেবে কি কোনো চাপ অনুভব করছেন? মানে পরের সিনেমাটা ঠিক কেমন হবে?
নূরুজ্জামান : আমার কাছে কোনো চাপ মনে হয় না, কারণ সিনেমা বানাতেই হবে-এমন কোনো দায় নাই। সিনেমা বানাই আমি মনের আনন্দে। হয়তো আপনারা জানেন, এটা আমার ‘ব্রেড অ্যান্ড বাটার’ না। যেহেতু এটা নিজের শখের জায়গা-প্যাশনের জায়গা-ই বলি আমি। শখ বা প্যাশন যাইহোক, কাজটা কিন্তু আমি অ্যামেচারিশ হিসেবে করি না। যথেষ্ট প্রফেশনালি করার চেষ্টা করি। তবে এটা থেকে আর্ন করতে হবে, এ রকম কোনো তাড়াও আমার নাই। ফলে আপনি যেটা বললেন, পরের সিনেমার জন্য চাপ, আমার কাছে এটা কখনোই মনে হয়নি।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনি তো বুয়েটে স্থাপত্য নিয়ে পড়ালেখা করেছেন, সিনেমায় আসার জার্নিটা যদি বলতেন?
নূরুজ্জামান : সিনেমায় আমার আসাটা অ্যাক্সিডেন্টাল। অ্যাক্সিডেন্টটা এই রকম, বুয়েটে চান্স পাওয়ার পর ক্লাস শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত এক বছরের একটা গ্যাপ টাইম থাকতো সেশনজটের কারণে। তখন লম্বা লম্বা সেশনজট ছিলো। এই সময়টা কী করা যায়? কোনো কাজ নাই। তখন নারায়ণগঞ্জ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি বলে একটা অর্গানাইজেশন ছিলো। উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন চুনকা পৌর পাঠাগারে দেখি, তাদের ফটোগ্রাফি এক্সিবিশন চলছে। দেখলাম। ওইদিন ওটার ক্লোজিং ছিলো; সাম সর্ট অব একটা কম্পিটিশনও ছিলো। সেই কম্পিটিশনের পুরস্কার বিতরণ হচ্ছে-আমি বলছি ১৯৯৬ সালের কথা-ওইটার প্রধান অতিথি ছিলেন দৃক-এর শহিদুল আলম স্যার। তখন তো আমি ওনাকে চিনি না, জানি না। উনি ইংল্যান্ডে পড়ালেখা করতে গিয়েছিলেন একদম ডিফ্রেন্ট সাবজেক্ট কেমিস্ট্রি নিয়ে-ওনার সেদিনের বক্তৃতার একটা লাইন আমার এখনো মনে আছে। উনি বললেন, ‘আমি যখন ক্যামেরায় চোখ রাখলাম তখন দেখলাম ঘাসের মধ্যেও একটা আলোছায়ার খেলা আছে।’ এই কথাটা আমাকে স্ট্রাইক করে। তার মানে হলো, ক্যামেরায় চোখ রাখলে দুনিয়াটাকে নতুনভাবে দেখা যায়, এ রকম কিছু একটা।
আমি পুরো অনুষ্ঠান মানে কথাবার্তা শুনলাম, অ্যাওয়ার্ড দিলো। যে ফার্স্ট প্রাইজটা পেলো, একদিন আমাদের মহল্লার মধ্যে তাকে দেখলাম। আমি যেহেতু ক্যাডেট কলেজে ছিলাম, তাই এলাকার অনেককেই চিনতাম না। কারণ বছরে বাসায় থাকতাম মাত্র ৩০-৪০ দিন। সাহস নিয়ে ওনার সঙ্গে কথা বলতে গেলাম। জানলাম ওনার নাম হাবিবুল বাহার চৌধুরী। বললাম, ‘ভাই আপনাকে ওইদিন দেখেছি।’ আমি কী করি, তিনি জানতে চাইলেন। তার পর বললেন, ‘তুমি কি ফটোগ্রাফি শিখতে চাও?’ আমি বললাম, ‘আপনি যদি শেখান তাহলে শিখবো।’ হাবিব ভাই বললেন, ‘একা তো শেখানো যাবে না, দেখি আরো দুই-চারজন পাওয়া যায় কিনা।’ তার পর এ রকম আরো চার-পাঁচ জন জুটলো। আমরা এক-দুই দিন পর পরই সন্ধ্যাবেলা, উনি অফিস থেকে আসলে ওনার বাসায় যেতাম। উনি টুকটাক বেসিক মানে ফটোগ্রাফির টেকনিকাল জিনিস শেখানো শুরু করলেন। আমি যেহেতু সায়েন্সের স্টুডেন্ট, লেন্স বা টেকনিকাল কোনো কিছু বুঝতে তো আমার ১০ মিনিটও লাগে না; অন্যদের অনেক সময় লেগেছে!
হাবিব ভাই আমাকে পছন্দ করা শুরু করলেন। তখন ছুটির দিনগুলোতে উনি বিভিন্ন জায়গায় আউটিংয়ে যেতেন, অন্য কাউকে না নিলেও আমাকে নিতেন। একটা সময় মনে হলো, আমার একটু নিজের মতো ছবি তোলা দরকার, কিন্তু ক্যামেরা নাই! তখন এস এল আর ক্যামেরার অনেক দাম-১৯৯৬ সালের কথা বলছি। উনি আমাকে অফার দিলেন, তার একটা এক্সট্রা ক্যামেরা আছে, ওই ক্যামেরা দিয়ে তিনি অনেকগুলো অ্যাওয়ার্ড উইনিং ছবিও তুলেছেন। তিনি বললেন, ‘পেন্টাক্স কে-১০০০ মডেলের এই ক্যামেরাটা আমি এখন ইউজ করি না, তুমি চাইলে আমার কাছ থেকে এটা কিনতে পারো।’ আমি বললাম, ‘আমার তো টাকা নেই।’ উনি জবাব দিলেন, ‘তুমি আস্তে ধীরে আমাকে টাকা দিও।’ তখন আমি যেটা করলাম, ক্যামেরা কেনার জন্য একটা টিউশনি শুরু করলাম। এটা আমার জীবনের প্রথম রোজগার আরকি। আস্তে আস্তে ওনার টাকাটা শোধ করলাম। তারপরও মনে হয় কিছু টাকা বাকি থাকলো।
ততোদিনে আমার বুয়েটে ক্লাস শুরু হয়ে গেলো। তখন উনি আমাকে একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিলেন-‘বাকি টাকা দিতে হবে না; তুমি একটা কাজ করবা-বুয়েটে তোমার যে পাঁচ বছর, প্রতিদিন একটা করে ছবি তুলবা ক্যাম্পাসের।’ তারপর যখন পাশ করে আসবে তখন এই ছবিগুলো নিয়ে আমরা একটা এক্সিবিশন করবো। এক্সিবিশন কীভাবে কী করতে হবে সেটারও দায়িত্ব নিলেন উনি। বুয়েটে যাওয়ার পর অনেকদিন এই কাজটা করতে থাকলাম। তখন সেলুলয়েডের সময়। ফটোগ্রাফি খুব কস্টলি ছিলো। আর বুয়েটে আমার যে ডিপার্টমেন্ট মানে আর্কিটেকচারে পড়ালেখাও খুব কস্টলি। ক্লাস শুরুর আগে এটা আমারও জানা ছিলো না, এতো কস্টলি! অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে যা লাগে, তার চার-পাঁচ গুণ খরচ এখানে হয়। প্রচুর জিনিসপত্র কিনতে হয়। ফলে একটা সময় দেখলাম, এটা কন্টিনিউ করা যাচ্ছে না আরকি! তবে এতোদিনে যেটা হয়েছে, বুয়েটের অনেকেই আমাকে ফটোগ্রাফার হিসেবে চিনে ফেলেছে। এবং ওই সময় বুয়েটে কোনো ইভেন্ট হলে আমার ডাক পড়তো!
যাইহোক, এর মধ্যে ১৯৯৭ সালের দিকে-এর আগে কম্পিউটার অনেক কস্টলি ছিলো-ট্যাক্স উঠিয়ে দিলো। বুয়েটে যখন শুরুতে গিয়েছিলাম, তখন যারা কম্পিউটার সায়েন্সে পড়তো শুধু তাদেরই একটা করে কম্পিউটার ছিলো; কস্টলি হওয়ার কারণে অন্যদের প্রায় ছিলো না। ওই সময়ে দাম অর্ধেক কিংবা তারও কম হয়ে গেলো ট্যাক্স কমানোর জন্য। ফলে সবার একটা করে কম্পিউটার হওয়া শুরু হলো। এক রুমে আমরা চারজন করে থাকতাম। দেখা গেলো সবার টেবিলে একটা করে কম্পিউটার। কম্পিউটার তো আর সারাদিন কাজে লাগে না। তখন শুরু হলো রাতের বেলা সিনেমা দেখা। আপনি ভিসিডি, ডিভিডি দেখেছেন?
ম্যাজিক লণ্ঠন : আমরা তখন বয়সে বেশ ছোটো।
নূরুজ্জামান : কম্পিউটারে আমরা ভিসিডিতে সিনেমা দেখা শুরু করলাম। প্রচুর ছবি দেখা হয়েছে, ডেইলি প্রায় একটা করে সিনেমা দেখা হতো! সারাজীবনে যা ছবি দেখেছি, বেশিরভাগটাই তখন দেখা। সেসময় একটা দোকান ছিলো নিউ পল্টনে; নিউ মার্কেটের পেছনের দিকটায়। ওই দোকানে আমরা যেতাম ভিসিডি কালেক্ট করতে। হলিউডের ছবি মেইনলি দেখা হতো। আমাদের এখানে ভিসিডির ব্যবসাটা এমন হলো যে, এতো মানুষ তখন সিনেমা দেখা শুরু করলো, আমাদের আর ওই দোকানে যেতে হতো না। দোকান থেকে তাদের লোকজন ব্যাগ ভরে ভিসিডি নিয়ে আসতো, কার কোনটা লাগবে! ফলে এটা আরেকটা কাহিনি হলো, এক ব্লকে হয়তো চারটা রুম, চারটা রুমে চারটা ভিসিডি রাখা হলো; পরে সবাই সবগুলো দেখে ফেললো। মানে খরচ কমে গেলো, এতে ছবিও দেখা হলো প্রচুর।
ক্যাডেট কলেজে থাকতেই লেখালেখি করতাম, লিখতে এখনো ভালো লাগে, আমি পছন্দও করি। তখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছোটোখাটো গল্প প্রকাশ হতো আরকি। বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর আর এসব হলো না। ওই সময়টায় আমরা বাংলা টাইপিং শিখছিলাম। ‘প্রথম আলো’ পত্রিকা তখন কেবল বের হয়েছে। আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধু শাররুখ জামান পড়তো সি এস ই’তে। ও হঠাৎ বললো-“‘প্রথম আলো’ একটা কম্পিটিশনের আয়োজন করেছে, একটা প্রবন্ধ লিখতে হবে, ‘আমার দেখা সেরা চলচ্চিত্র’-তুই এতে অ্যাটেন্ড করতে পারিস।” নিজের দেখা সেরা ছবি নিয়ে ১০০০ শব্দের না কতো শব্দের একটা প্রবন্ধ লিখতে হবে। সেরা ১০ জনকে নিয়ে তারা একটা ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশনে কোর্স করাবে। শাররুখ বললো, ‘আমরা তো প্রতিদিন কতো ছবি দেখি, তুই একটা নিয়ে লেখ।’ ওর ইন্টারেস্ট ছিলো আরেকটা, টাইপিং প্র্যাকটিস করা। আমি লিখে দিলে সে টাইপিং প্র্যাকটিস করবে আরকি [হাসি]!
ম্যাজিক লণ্ঠন : জার্নিটা দারুণ তো, তার পর?
নূরুজ্জামান : কিছু একটা লিখে ফেললাম। ও সেটা টাইপ করলো। তার পর পাঠিয়ে দিলাম। একদিন আমার নামে চিঠি আসলো সেই অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করার। বুয়েটে আমাদের ডিপার্টমেন্টে অ্যাপ্রিসিয়েশনের অনেকগুলো কোর্স ছিলো; মানে অ্যাকাডেমিক কোর্স। যেমন, মিউজিক অ্যাপ্রিসিয়েশন, আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশন এ রকম। ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন বলে কোনো জিনিস ছিলো না। ফলে আমার একটু উৎসাহ হলো, দেখি তো ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন ব্যাপারটা কী! ফটোগ্রাফি কিন্তু আমাদের অ্যাকাডেমিক সাবজেক্ট ছিলো। অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সের মডারেটর ছিলেন তানভীর মোকাম্মেল। প্রথম দিন কথাবার্তা শোনার পর-আমি তানভীর ভাইয়ের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ-আমার মোটিভেশন চেঞ্জ হয়ে গেলো। এতোদিন সিনেমা যেভাবে দেখতাম, মনে হলো এটা কেবল এন্টারটেইনমেন্টের বিষয় নয়। ছবির পলিটিক্স আছে, এস্থেটিকস আছে, অনেক জিনিস আছে, যেগুলো আমি এতোদিন জানতাম না। আমি যে ডিপার্টমেন্টে পড়ালেখা করি, তার সব কাজকর্ম কিন্তু এস্থেটিকস নিয়ে। ফলে জিনিসগুলো আমার খুব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে, এমন মনে হয়নি। যেমন, তারা ফিল্মের ফর্ম নিয়ে কথা বলছিলো, এগুলো সামহাউ ফিল্মের ক্ষেত্রে না, তবে আর্কিটেকচারের ক্ষেত্রে আমি বুঝি। আমি দেখলাম দুইটার মধ্যে বেশ একটা যোগসূত্র আছে। এভাবে অ্যাপ্রিসিয়েশনের ক্লাস করছিলাম। আমার তখন পরীক্ষাও চলছিলো, ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা। হঠাৎ কী মনে হলো, স্ট্রাকচার ওয়ান পরীক্ষা সম্ভবত-এটা খুব জটিল পরীক্ষা-মনে হলো পরীক্ষাটা দেবো না, কারণ আমি পরে হয়তো এটা রিটেক নিতে পারবো। বরং অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সের শেষ ক্লাসটা করে আসি! যদিও এটার জন্য পরে আমাকে খুব সাফার করতে হয়েছে। আগের দিন প্রিপারেশন-ও ছিলো। কিন্তু সকালবেলা পরীক্ষা না দিয়ে গ্যেটে ইনস্টিটিউট চলে গেলাম। ওখানেই এটা চলছিলো। ওইদিন আসার পর থেকে আমার মাথায় কেবল সিনেমা ঘুরতেছিলো, আমি তখনো হলিউডের ছবি আগের মতো দেখছি, কিন্তু ঠিক ও রকম মজা পাচ্ছি না। হলিউডের ছবি এস্থেটিকালি আমাকে খুব টানছে না। কিংবা স্টোরিটেলিং খুবই স্টেরিওটাইপ মনে হচ্ছে। আমার কাছে মনে হচ্ছিলো, এগুলো তো আমি হরহামেশাই দেখছি, এখানে নতুন কী আছে!
ম্যাজিক লণ্ঠন : অনেকটা গৎবাঁধা ...
নূরুজ্জামান : আমি তখন দেখলাম হলিউডের সিনেমার ফর্মুলাটা আবিষ্কার করতে পারছি! ফলে আমার একটু বোরিং লাগা শুরু হলো। এর পর আমি কিছুদিন সিনেমাই দেখলাম না; কারণ আর ভালো লাগছে না!
ম্যাজিক লণ্ঠন : ব্যাপারটা কী এমন যে, আপনার চোখ খুলে গেছে বা অন্য কিছু?
নূরুজ্জামান : আমার টেস্ট হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে, আমি আর আগের সেই মজাটা পাচ্ছি না। এর মধ্যে যেটা হয়েছে, তখন চিঠির সময়, এই কোর্সটা করার ফলে আমি ঠিক জানি না ওনারা কোথায় কী করেছে; হয়তো ফিল্ম সোসাইটিগুলোর কাছে আমার নেম, অ্যাড্রেস গেছে সামহাউ। তখন কোনো সিনেমার প্রদর্শনী হলে, কোনো ফেস্টিভাল হলে, আমার হলে চিঠি চলে আসতো। একেক সময় দেখতাম একেক ফিল্ম সোসাইটির চিঠি। মনে হলো তারা নেটওয়ার্কিংয়ের সুবিধার জন্য অ্যাড করে রেখেছে। ফলে তখন যেটা হলো, সময় পেলেই আলিয়ঁস ফ্রঁসেস, গ্যেটে ইনস্টিটিউটে, রাশিয়ান কালচার সেন্টারে বিভিন্ন সিনেমা দেখতে শুরু করলাম। একদিন একটা সিনেমা দেখলাম গ্যেটে ইনস্টিটিউটে-কারা দেখিয়েছিলো আমার ঠিক মনে নাই-ত্রুফোর একটা সিনেমা আছে ফোর হান্ড্রেড ব্লোস। ওইটা দেখার পরে আমার মনে হলো, আমি তো ছবি বানাতে পারবো। কোনোদিন আমি ভিডিও ক্যামেরা ধরিও নাই, কীভাবে কী করতে হয়, চিত্রনাট্য লিখতে হয়, কিচ্ছু জানি না। শুধু ওই অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সের যতোটুক জানা। তার পরও কেনো মনে হলো জানি না, এবং ওটা খুব সহজ ছবিও না। এখন বুঝি ওটা তখন বিরাট রকমের ধৃষ্টতা ছিলো যে, ওইটা দেখে মনে হচ্ছে আমি ছবি বানাতে পারবো। তখন আমি মোটামুটি ডিসাইড করে ফেললাম একটা ছবি বানাবো। এটা ১৯৯৯ সালের কথা। তখন আমি যেটা করলাম, মানে ফিল্মের পড়াশোনা-সিনেমা নিয়ে বই, ম্যাগাজিন যা পাই-আজিজ মার্কেটে সিনেমা নিয়ে এমন কোনো বই ছিলো না যেটা আমি কিনি নাই ওই সময়ে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তখন এখানে বইপত্র কি খুব বেশি পাওয়া যেতো?
নূরুজ্জামান : তখন বই-ও ছিলো খুব কম, বেশিরভাগ বই ইন্ডিয়ান। আমার পরিচিত কেউ ইন্ডিয়ায় গেলে আমি বইয়ের একটা লিস্ট ধরিয়ে দিতাম। এটা চলছিলো, কিন্তু ঠিক সাহস পাচ্ছিলাম না। সেই সময় শর্টফিল্ম ফোরাম বা অন্য কেউ-ক্লিয়ারলি মনে নাই-একটা কর্মসূচি নিলো, পাঁচজন মিলে একটা ছবি বানাবে পাঁচ মিনিটের। আমি যদি ভুল না করে থাকি তাহলে ১৯৯৯ সালের ঘটনা এটা। একেকটা সিনেমার বাজেট ৫০,০০০ টাকা। তখনকার ৫০,০০০ টাকা কিন্তু এখনকার পাঁচ লাখ টাকারও বেশি। সো একেকজনের কোর্স ফি হচ্ছে ১০,০০০ টাকা করে, সেলুলয়েডে ছবি বানানো হবে। ওই সময় ১০,০০০ টাকা ম্যানেজ করাও তো সহজ ব্যাপার না; রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার!
ম্যাজিক লণ্ঠন : তো কী সিদ্ধান্ত নিলেন আপনি তখন?
নূরুজ্জামান : আমি হিসাব করলাম, যদি আমি ১০,০০০ টাকায় এই কোর্সে যাই, তার মানে আমার ভাগে পড়ছে এক মিনিট। তার চেয়ে আমি ১০,০০০ টাকায় একটা ফুল লেন্থ ছবি বানিয়ে ফেলবো-এ রকম মনে হলো আরকি! সেটা কীভাবে? তখন মনে হলো, আমার প্রথম ছবি তো নিশ্চয় মাস্টার পিস হবে না, ফর শিওর। আমি ভি এইচ এস-এ বানাবো-তখন বিয়ে বাড়িতে ভিডিও করতো না, ও রকম একটা ক্যামেরায় বানাবো। আমি যেহেতু ফটোগ্রাফি করতাম, টুকটাক ওয়েডিং ফটোগ্রাফিও করেছি-তখন খ্যাপ-ট্যাপ পেতাম। আমি জানি ৫০০ টাকায় ওই রকম একটা ক্যামেরা ভাড়া পাওয়া যায় একদিনের জন্য। সো, আমি ওইটাতেই বানাবো; কোয়ালিটি হয়তো শার্প হবে না। তাতে কী আসে যায়! মাথায় চাপলো, ওকে ফাইন একটা সিনেমা বানাবো! কী বানানো যায়, নিজে একটা গল্প মোটামুটি দাঁড় করালাম। বুয়েটে এক মাসের একটা বন্ধ ছিলো। সম্ভবত ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার পরের বন্ধ। তখন আমি একটা কোচিং সেন্টারে পড়াতাম। ক্যাডেট কলেজ ভর্তি কোচিং টাইপের। ওদেরও ভর্তি পরীক্ষা শেষ। বিশাল একদল পোলাপান আছে যারা আমার ফ্যান। ওরাই হচ্ছে আমার ক্যারেক্টার!
ম্যাজিক লণ্ঠন : তাদের নিয়ে কি সিনেমা বানাতে পারলেন শেষ পর্যন্ত?
নূরুজ্জামান : ছুটিতে এসেছি এক মাসের জন্য-তখন রমজান মাসের ছুটি ছিলো, কারো কোনো কাজ নাই। ওই পোলাপান নিয়ে বের হয়ে পড়তাম সকালবেলা; বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতাম। শ্যুট করতে করতে একটা গল্প সাজানোর চেষ্টা করছিলাম। ওটার নাম ছিলো বৃষ্টির প্রজাপতি। কিশোর ছেলেমেয়েদের নিয়ে ছবি। আমরা এক মাসের মতো শ্যুট করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম ১০,০০০ টাকার মতো লাগবে-এখানে আরো কাহিনি আছে, আমি তখন ক্যামেরা পাচ্ছিলাম না। আমার এক বন্ধুর মামা আসছে তখন সৌদি আরব থেকে। তিনি একটা ক্যামেরা নিয়ে এসেছেন। অনেক পটিয়ে-টটিয়ে তার কাছ থেকে ক্যামেরাটা নিলাম-হ্যান্ডিক্যাম টাইপের ক্যামেরা। আমাদের মেইন খরচ ছিলো, তখন ক্যাসেট কিনতে হতো। আমাদের ওয়েল রিটেন কিছু ছিলো না। জাস্ট একটা ধারণা ছিলো, শ্যুট করতে গিয়ে কোনো কিছু মনে হলে নোট নিতাম-এভাবে শ্যুট করা। আর তখন তো নিজেকে সত্যজিৎ রায় ভাবতাম! সত্যজিৎ রায়ের স্টোরি বোর্ড দেখেছি-এভাবে করে সিনেমা বানাতে হয়। বানালাম, কিছু জিনিসপত্র বাকি থাকলো। এর মধ্যে আমি আর সময় ম্যানেজ করতে পারলাম না। আবার যেটা হলো-আমার ছোটো বোন একটা থিয়েটারে কাজ করতো, সেখানকার কয়েকজন সিনিয়র লোকজনকে নিলাম, যাদের দরকার ছিলো। ভাবছিলাম তিন মাস পরে একটা ব্রেক পাবো, তখন বাকি কাজ শেষ করে ফেলবো। এ রকম করতে করতে আর হয় নাই। প্রায় দেড় বছর পরে একটা সুযোগ আসলো, তখন গিয়ে দেখি পোলাপানের চেহারা সব চেঞ্জ হয়ে গেছে! ওরা তখন সিক্স, সেভেনে পড়তো। এই বয়সের বাচ্চারা তো খুব র্যাপিডলি বড়ো হয়। ভয়েস চেঞ্জ হয়ে যায়, দাড়ি-গোঁফ উঠে যায়। ফলে এটা শেষ করার আর কোনো উপায় থাকলো না! এর মধ্যে আমারও পড়াশোনার চাপ বাড়লো। কিন্তু তখন যেটা হচ্ছিলো, আমি ছবি দেখছিলাম আবার। আমি যে ধরনের ছবি এখন পছন্দ করি, সেগুলো কোথায় পাওয়া যায় তার কিছু সোর্স পেলাম।
ম্যাজিক লণ্ঠন : মানে আপনার মনের মতো সিনেমা!
নূরুজ্জামান : মানে এখন আমি যে ধরনের ছবিকে ছবি মনে করছি! অ্যাপ্রিসিয়েশনের ওরিয়েন্টেশনের পরে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : ওই ওরিয়েন্টেশনের পরে তো আপনি নানা জায়গা থেকে দাওয়াতও পাচ্ছিলেন!
নূরুজ্জামান : এই সময়টাতে আমি যেটা করছিলাম, প্রচুর পড়াশোনা করেছি। সিনেমা নিয়ে যা পাচ্ছি মোটামুটি তাই পড়েছি। আপ টু ২০১০ ঢাকা শহরের এমন কোনো ফিল্মের ওয়ার্কশপ ছিলো না, যেটাতে আমি ছিলাম না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এর মধ্যে আপনি কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন?
নূরুজ্জামান : না। আমি কখনোই কোনো সংগঠনে জড়িত ছিলাম না। আর বুয়েটে তখনো ফিল্ম সোসাইটি হয়নি। আমরা চলে আসার পরে ওখানে ফিল্ম সোসাইটি হয়। কালচারাল অ্যাক্টিভিটিসে মোটামুটি নিয়মিত ছিলাম, বাট ফিল্মসংক্রান্ত কোনো কোনো সংগঠনের সঙ্গে ছিলাম না। আমি কেবল ওয়ার্কশপ করছিলাম। এর মধ্যে যেটা হলো পাশ করলাম। এর পর একটা নতুন স্ট্রাগল শুরু হলো। আমার ইচ্ছে ছিলো জীবনে কোনো দিন চাকরি করবো না। আলহামদুলিল্লাহ, এ পর্যন্ত আমাকে একদিনের জন্যও চাকরি করতে হয়নি। আমি তখন চিন্তা করলাম, আর ঢাকায় থাকবো না, নারায়ণগঞ্জ চলে আসবো। নারায়ণগঞ্জে তখন স্ট্রাগলটা আরো কঠিন ছিলো। কারণ আর্কিটেক্ট শব্দটাই লোকজন জানতো না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : কতো সালে নারায়ণগঞ্জ আসলেন?
নূরুজ্জামান : ২০০১-এ।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তখন তাহলে পড়ালেখা শেষ?
নূরুজ্জামান : না। পড়ালেখা তখন শেষের দিকে। পাশ করলাম ২০০৪-এ, যদিও এক বছর আগে পাশ করার কথা। হিসাবে আসলে আমাদের ২০০১-এ পাশ করার কথা; কিন্তু সেশন জটের কারণে-বুয়েটের শিক্ষার্থী সনি হত্যা মামলার কথা শুনেছেন কিনা জানি না, এ নিয়ে একটা বেশ বড়ো ধরনের আন্দোলন হয়েছিলো। যেসব কারণে আরো পিছিয়ে গেলো। এক সিনিয়র ছিলো নারায়ণগঞ্জে আমার ডিপার্টমেন্টেরই; জিয়া ভাই আর আমি মিলে প্রথমে একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর চেষ্টা করলাম-‘নির্মাণ উপদেষ্টা’। জিয়া ভাই আমার ছয় ব্যাচ সিনিয়র। এখন যে প্রতিষ্ঠানে আমরা বসে আছি সেটা শুরু করি ২০০১-এ। তখন এটা খুবই স্ট্রাগলিং ছিলো।
যাইহোক, এরপর যেটা হলো, রুটিরুজির জন্য সিনেমা আর মাথায় থাকলো না। এর পর ধীরে ধীরে একটু স্টেবল হতে ২০০৭-২০০৮ হয়ে গেলো। তখন আবার মনে হলো, না সিনেমা বানাবো। ভাবলাম কী করা যায়? তখন আগে যেগুলো শ্যুট করছিলাম; প্রথমে চিন্তা করলাম, ওগুলো একটু এডিট করার চেষ্টা করে দেখি। এডিট কোথায় করা যায়? অনেকে অনেক কিছু বললো, মানে অনেক হাতিঘোড়া দেখালো। কথায় কথায় হাইকোর্ট দেখানো-আমাদের লোকজন মানে সোসাইটিতে যাদেরকে আমি চিনি, যারা ফিল্ম নিয়ে কাজ করে! তারা বললো, ‘এটা কী করছো! ভিএইচএস ক্যাসেটে কেউ বানায়!’ ইত্যাদি ইত্যাদি! এটা এডিট করতে গেলে এই লাগবে, সেই লাগবে। আমার অফিস তখন যেখানে ছিলো, সেই বিল্ডিংয়ে একটা দোকান ছিলো, যারা বিয়ে বাড়ির ভিডিও এডিট করে গান টান দিয়ে। ওদের কাছে গিয়ে বললাম, আমি এটা এডিট করতে চাই। যেহেতু এটা ওই ক্যাসেটেই শ্যুট করা। ওই ভদ্রলোককেও আমি এখনো খুব স্মরণ করি-প্রদীপ দাশ। উনি এখন আর দেশে থাকেন না, অস্ট্রেলিয়া বা কোথায় যেনো থাকেন। ওনার আটটা-দশটা এডিটিং প্যানেল ছিলো। উনি যেটা করলেন-বুঝতে পেরেছিলেন আমি তো আর বিয়ের ভিডিও এডিট করাবো না। উনি বললেন, ‘এখানে যারা এডিটর আছে, ওদের নিয়ে আপনি কাজ করতে পারবেন না। তার চেয়ে আমি আপনাকে একটা প্যানেল ছেড়ে দিই, এটার জন্য আপনি ভাড়া দিবেন। আর আমি এডিটের বেসিক জিনিসগুলো আপনাকে শিখিয়ে দিচ্ছি, আপনি নিজেই করেন।’ এক মাস-এই ভদ্রলোকের ঋণ আমি শোধ করতে পারবো না। এই ঘটনা না ঘটলে আমি কখনো চিন্তা করতাম না নিজের ফিল্মের সব কাজ নিজে করবো।
উনি আমাকে কিছু বেসিক শিখিয়ে দিলেন, আমি তখন জোড়া লাগানোর চেষ্টা করলাম। করতে গিয়ে আটকে যাই, আবার একটু বইপত্র দেখি। এভাবে একটা পর্যায়ে মনে হলো এডিটটা বুঝতে শুরু করেছি। আমি যদি আরেকজনকে এডিট করতে দিতাম, তাহলে আমার এই শেখাটা আর হতো না। এডিট করতে গিয়ে দেখলাম, এটা এমন কিছু হচ্ছে না, যেটা লোকজনকে দেখানো যাবে। তখন ভেতরে আরেকটু তাড়না তৈরি হলো, ঠিক আছে ওটা যা করেছি তো করেছিই, এখন গুছিয়ে ঠিকঠাক মতো কিছু করবো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এই তাড়নাটাই তো সবার জন্য দরকার। যা দিনশেষে আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছাবে।
নূরুজ্জামান : এর মধ্যে আরো কিছু ইন্টারেস্টিং জিনিস আছে! আমার হতো কী, যেকোনো একটা নতুন টার্ম শুনলে মনে হতো এটা একটু জানার চেষ্টা করি। আমাদের এখানে যারা তখন শিক্ষিত বোদ্ধা ছিলো, তাদের কাছে গেলে কেউ পাত্তা দিতো না। এই যেমন ধরেন ফিল্মের ফর্ম, এটা নিয়ে আমি তখন অনেক ভেবেছি। কিন্তু তখন পরিষ্কার বুঝি নাই। আইজেনস্টাইন-এর ‘ফিল্ম ফর্ম’ বইটা পড়ে ফেলেছি। বইটা বাংলায় ছিলো, ধীমান দাশগুপ্তের অতি জঘন্য অনুবাদ, কিচ্ছু বুঝি নাই। তখন যাকে জিজ্ঞাসা করেছি, একেকজন একেক রকম ব্যাখ্যা দেয়। তখন আমি বুঝলাম, তাদের কেউ-ই জিনিসটা ভালো জানে না। আর তখন তো গুগলও ছিলো না।
যাইহোক, এভাবেই অনেকের কাছে যাই, একজন বললো ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে একটা ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কশপ করাবে। এটা ২০১০-এর ঘটনা। ফাইন! করবো! ওটাতে জয়েন করলাম। ওইখানে গিয়ে দেখলাম কয়েকজন ইন্টারন্যাশনাল পার্টিসিপেন্ট আছে, দেশি লোকজনও আছে। বাদল রহমান ছিলেন এটার মডারেটর। আর ইন্সট্রাক্টর সবাই বাইরের। দেশি কেউ ছিলো না। শুধু তারেক মাসুদ একদিন এসেছিলেন অল্প সময়ের জন্য। ওইখানে গিয়ে আমার এই না জানা জিনিসগুলো দেখছি লোকজন এক শব্দে বুঝিয়ে দিচ্ছে। থিংস আর সো সিম্পল। তখন মনে হলো, আমাদের লোকজন হয় বোঝে না; অথবা মনে করে আমি যেটা জানি আর কেউ কাউকে জানালে ভাণ্ডার শেষ হয়ে যাবে! ফলে তারা কেবল হাইকোর্ট দেখায়! ওখানে এদের কয়েকজনের সঙ্গে আমার মোটামুটি পরিচয় হলো। তখন ফেইসবুক জাস্ট আসছে। কিন্তু আমরা অতো ফ্রিকুয়েন্ট না। তারপরেও এক ধরনের যোগাযোগ তৈরি হলো।
ওই ওয়ার্কশপে ক্লিমেন্টাইন এভারভিন বলে একজন ছিলেন। ওনার নাম শুনে থাকতে পারেন, ডাচ ফিল্মমেকার। ওনার সঙ্গে আমার খুব ভালো একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছিলো। ও আরেকটা কথা! ওই সময় আমি আরেকটা কাজ করছিলাম, আমি ততোদিনে একটা হ্যান্ডিক্যাম কিনেছি; ওটা নিয়েই ঘুরতাম। তখন নারায়ণগঞ্জ শহরে একটা ট্রান্সফরমেশন ঘটছিলো। এখন যে শহর দেখছেন, সেটা তো পুরোপুরি জঙ্গল হয়ে গেছে! এটা কোনো শহর-ই না, কিন্তু নারায়ণগঞ্জ খুব চমৎকার একটা শহর ছিলো ১৯৯৫-৯৬ সাল পর্যন্ত। হঠাৎ করে গারমেন্টস যখন বুম করলো, তখন পুরা শহরটা ধ্বংস হয়ে গেলো। ওই ট্রান্সফরমেশনটা নিয়ে আমি ভাবলাম একটা ডকুমেন্টারি বানাবো। লম্বা সময়ের কাজ। আমি তখন যাকে পাই তারই ইন্টারভিউ করি, এ রকম আরকি। ফলে ওখানে যারা বাইরে থেকে আসছে, তাদের আমি ইন্টারভিউ করছিলাম ওই ডকুমেন্টারির জন্য। ওটার নাম ছিলো ইমেজ অব আ সিটি। নিজের সিটি সম্বন্ধে তাদের পারসেপশন কী, ইত্যাদি। এগুলো নিয়ে কিছু একটা করবো।
ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে ক্লিমেন্টাইনের সঙ্গে একটু বেশি ইন্টিমেসি হয়ে গেলো, তিনি অনেক বেশি আন্তরিক ছিলেন। একদিন ক্লিমেন্টাইন ওয়ার্কশপে একজন ছেলেকে নিয়ে আসলেন, মাথা ন্যাড়া। সেই ছেলে বিচিত্র ধরনের ইংরেজি বলে, আমরা ফার্স্ট টাইম দেখে ভেবেছি সে বোধ হয় বাংলাদেশের না। পরে ক্লিমেন্টাইন বললেন, এই ছেলেটাকে একটু দেখে রেখো। এটাই হচ্ছে যুবরাজ শামীম, ২০১০ সালে আমাদের পরিচয়।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তার মানে যুবরাজ শামীমের সঙ্গে আপনার পরিচয় তো অনেক দিনের!
নূরুজ্জামান : অনেক অনেক দিনের জার্নি। তারপর যেটা হলো, এই ওয়ার্কশপে চার-পাঁচ জন পেয়ে গেলাম যাদের সাথে কথা বলা যায়। যুবরাজ শামীম তখনো ওই দলে ঢুকে নাই। জাস্ট তখন ক্লিমেন্টাইন আমাকে বলেছে এই ছেলেটাকে দেখে রেখো। যাইহোক, সেখানে শিবলি ছিলো, ইমতিয়াজ, জাহাঙ্গীর এরাসহ আরো কয়েকজন। আমরা চিন্তা করলাম, ওয়ার্কশপের পরে সবাই আরেকবার বসি। বসলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আমরা চেষ্টা করলাম নিয়মিত বসার জন্য, সপ্তাহে অন্তত একদিন। এভাবে আমরা নিয়মিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসতে থাকলাম। এর মধ্যে একদিন শিবলি আমাকে বললো, ওই ছেলেটাকেশিবলির সঙ্গে আবার আমার থেকে শামীমের যোগাযোগ তখন অনেক বেশি হতো-একদিন নিয়ে আসি। দেখলাম যে, ওখানকার মধ্যে আমার বয়স সবচেয়ে বেশি, আর শামীমের বয়স সবচেয়ে কম। প্রায় ১৪-১৫ বছরের একটা গ্যাপ। এ রকম আড্ডা দিতে দিতেই হঠাৎ মনে করলাম, আমরা একটা টিম ফর্ম করি। আইডিয়াটা ছিলো অনেকটা ব্যান্ড মিউজিকের মতো। ব্যান্ডে একজন গিটার বাজায়, একজন কিবোর্ড, একজন গান গায়, একজন ড্রামস বাজায়। কিন্তু দিনশেষে গানটা হলো ‘সোলস’-এর গান বা ‘মাইলস’-এর গান বা ‘এল আর বি’র গান। আইয়ুব বাচ্চুর গান না বলে বলতেছে ‘এল আর বি’র গান।
ম্যাজিক লণ্ঠন : ভেরি ইন্টারেস্টিং আইডিয়া তো।
নূরুজ্জামান : মানে সিনেমাটাও হবে ওই ব্যান্ড মিউজিকের মতো। এটা আমার সিনেমা না, বা আরেকজনের সিনেমা না। সিনেমা হবে দলের। তখন দেখলাম, শামীমের গল্পের আইডিয়া ভালো। ওকে রাখলাম স্ক্রিপ্টরাইটার হিসেবে। আমরা এভাবে কিছুদিন আলাপ-আলোচনার পরে চেষ্টা করলাম একটা সিনেমা বানানোর। তবে সেটা শেষ পর্যন্ত হয় নাই। ওটার স্ক্রিপ্ট সবকিছু রেডিই ছিলো। গল্পটা ছিলো শামীমের আর স্ক্রিপ্ট আমি লিখেছি। সবকিছু রেডি এবং পরিস্থিতি এমন যে একদিনের মধ্যে সিনেমা বানিয়ে ফেলবো! এখন বুঝি, সেটা কতোটা অপরিপক্ব চিন্তা ছিলো। এবং সিনেমাটা বানাবো একটা রিয়েল লোকেশনে। বিরুলিয়াতে একটা মেলা হয়, চৈত্র সংক্রান্তি। ওই মেলাতে হলো আমাদের ঘটনা, মানে রিয়েল লোকেশনে একদিনে করে ফেলবো সিনেমা।
ম্যাজিক লণ্ঠন : সিনেমা নির্মাণের জিনিসপাতি কোথায় পাবেন তখন?
নূরুজ্জামান : পরিকল্পনা ছিলো প্রফেশনাল সেটআপের ক্যামেরা নেবো। মোটামুটি ধরেন ২৫,০০০ না ৩৫,০০০ টাকা লাগবে এ রকম। ওই সময় এটাও আমাদের কাছে অনেক টাকা। ২০১০ সাল। সবমিলিয়ে এইটা হলো না শেষ পর্যন্ত। এখন বুঝি, ওটা না হওয়াটাও খুব কাজের ছিলো। এবং খুবই দরকারি ছিলো। কারণ ওটা হলে আমাদের স্পিরিট নষ্ট হয়ে যেতো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আড্ডাও কী তখন চলছিলো আপনাদের?
নূরুজ্জামান : হ্যাঁ, এটা তো চলছে তখন। আমরা একদিন করে বসি সপ্তাহে। সম্ভবত শনিবার বসতাম। ওই সিনেমাটা না হওয়াতে সবার একটু মন ভেঙে গেলো। দেখা গেলো, আমাদের আড্ডাতে আর কেউ আসে না। শুধু আমি আসি, আর শামীম আসে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : মানে সিনেমা না হওয়ার ফলে শনিবার আর কেউ আসতেছে না!
নূরুজ্জামান : হ্যাঁ। এভাবে কোনো এক শনিবারে শামীম বললো-ও তখন পলিটেকনিকে পড়ে-‘তেজগাঁও স্টেশনে আমি দুইটা ছেলেকে ফলো করতেছিলাম ওখানে একটা সিনেমা পাইছি।’ আমি তখন শামীমকে বললাম, ‘তুমি এটা লিখে ফেলো।’ ও তখন লিখে নিয়ে আসছে আমার কাছে। সেসময় ওকে বললাম, কেউ থাক বা না থাক তুমি আর আমি চলো সিনেমাটা বানাই।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এটা কী আদিম-এর কথা বলছেন?
নূরুজ্জামান : না, আদিম তো আরো পরে। ওটা একটা শর্টফিল্ম ছিলো। ওটা দুই দিন শ্যুট করলাম। মানে ফাইনালি পাঁচজনের একটা টিম হয়েছিলো আমাদের। সেই পাঁচজনের মধ্যে আবার সবাইকে পাই নাই সবসময়।
ম্যাজিক লণ্ঠন : মানে আপনারা দুইজন ছিলেন আর দরকার হলে তাদেরকে আসতে বলতেন?
নূরুজ্জামান : না না, সবাইকেই আসতে বলা হতো। কিন্তু তারা সেভাবে মোটিভেটেড না। হয়তো ভেবেছিলো, এভাবে হবে না। তখন ওই যে আমি যেটা বললাম, আমার যে হ্যান্ডিক্যামটা ছিলো ওটা দিয়েই দুইজন সিনেমাটা করে ফেললাম।
ম্যাজিক লণ্ঠন : শ্যুট কোথায় করলেন?
নূরুজ্জামান : টঙ্গীতে করেছি। শুধু টঙ্গী স্টেশনে। খুব ভোরবেলা আমি এখান থেকে চলে যেতাম। এভাবে আমরা দুই দিন শ্যুট করেছি। এর মধ্যে যেটা হলো এলিফ্যান্ট রোডে আমি একটা অফিস নিলাম। তখন আমার কিছু ক্লায়েন্ট ছিলো ঢাকায়। তাদের জন্য লিয়াজোঁ অফিস টাইপের এক রুমের অফিস নিলাম। পরবর্তী সময়ে ওইটাই আমাদের ফিল্মের অফিস হয়ে যায়। বেশ কিছুদিন মানে প্রায় দুই বছরের মতো ওটা আমাদের অফিস ছিলো। আমরা টিমের নাম দিলাম হচ্ছে ‘সিনেমাকার’। চলচ্চিত্রকার আর সিনেমা মিলিয়ে সিনেমাকার।
যাইহোক, ওইটা শ্যুট করে আমরা এলিফ্যান্ট রোডের অফিসে একদিন বসছি সবাইকে নিয়ে, কী শ্যুট করেছি সেটা দেখার জন্য। যেটা হলো, রাশ দেখার অভিজ্ঞতা কারোই ছিলো না। শুধু আগে কাজ করার কারণে কেবল আমি জানি, রাশ এডিট হওয়ার পরে চেহারা কতো চেঞ্জ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে আমার কিছু ধারণা আছে, ওদের কারো ধারণা নেই সেভাবে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : ফুটেজের রাশ?
নূরুজ্জামান : হ্যাঁ। ফুটেজের রাশ মানে র্যান্ডমলি শ্যুট করলে ওটা জোড়া না লাগানোর আগ পর্যন্ত তো কোনো গল্প দাঁড়ায় না, বা ওটা কোনো কিছু মিন করে না। এটা দেখে ওরা পুরোই হতাশ।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এডিটিংয়ের পরে তো অনেক কিছুই চেঞ্জ হয়ে যায়।
নূরুজ্জামান : তখনো এডিট হয়নি। মানে খালি শটগুলো দেখছি একটার পর একটা। ওরা সবাই হতাশ এবং মোটামুটি আশাও ছেড়ে দিয়েছে কিছু হবে না। কিন্তু তখন আমার মনে হলো, টিমটা বাঁচানো দরকার। এনিহাউ এটা ওয়ার্কঅ্যাবল করতে হবে। তখন আমি ওগুলো নিয়ে চলে আসলাম নারায়ণগঞ্জে। এডিট করার পর যখন একটা কিছু দাঁড়ালো-আমার মনে আছে-আমি সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিলাম, আসো একসঙ্গে বসে এডিট করি।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তাদের থেকে কেমন রেসপন্স পেলেন?
নূরুজ্জামান : ওরা সবাই এসেছে, কিন্তু কোনো মজা পাচ্ছে না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : কিছু হয়নি, এ কারণে?
নূরুজ্জামান : না না, কী বানিয়েছিলাম সেটার জন্য না। প্রক্রিয়াটা তো বোরিং। আপনি যতোক্ষণ না এই কাজে ঢুকে পড়বেন ততোক্ষণ পর্যন্ত তো মজা পাবেন না। দেখা গেলো, একই জিনিস তিনবার দেখতে হচ্ছে, পাঁচবার দেখতে হচ্ছে; মানে এগোয় না তো। আমার মনে আছে, অফিসের সামনের ওয়েটিং বেঞ্চ আছে না, শামীম সারারাত ওই বেঞ্চে ঘুমালো। কারণ মনই টানতেছে না ওর! এরপর যখন একটু দাঁড়ালো, আমাদের আরেকজন ছিলো ইমতিয়াজ, ও আবার খবর পেলো কারা যেনো একটা ছোটো ফিল্ম ফেস্টিভাল করছে। ওখানে শর্টফিল্ম কম্পিটিশন হবে। বললো, ‘ভাই চলেন, আমরাও ওখানে যাই।’ আমাদের কাজ তখনো শেষ হয়নি। হাতে সময় আছে বোধ হয় একদিন কিংবা দুই দিন। তখন কোনোরকমে এটা শেষ করলাম। সেসময় এডিটিং-ও তো ভালো জানি না। সিনেমার যে নাম দেখাবো, মানে টাইটেল কেমনে বসাতে হয় সেটাই জানি না! যা আছে কপালে এভাবেই জমা দেবো। ও সিনেমাটার নাম ছিলো জংশন।
ম্যাজিক লণ্ঠন : টাইটেল ছাড়াই?
নূরুজ্জামান : কোনো টাইটেল নাই। খালি জোড়া লাগিয়ে জমা দিলাম।
ম্যাজিক লণ্ঠন : মানে খালি একটা গল্প হয়েছে ...
নূরুজ্জামান : গল্প হয়েছে, সেটাও খুবই আনফিনিশড অবস্থায়। কালার গ্রেডিং বাদ। ওটা তো জানিই না। ওখানে ইমতিয়াজ জমা দিলো। জমা দেওয়ার পরে আমরা সিলেক্টেড হলাম।
ম্যাজিক লণ্ঠন : সিলেক্টেড হয়ে গেলেন এভাবেই!
নূরুজ্জামান : আমরা খুব খুশি। রাশান কালচার সেন্টারে আমরা গেলাম দেখতে। পর্দায় দেখার পরে বুঝছি কী কী ঝামেলা আছে। দেখার পরে বিকালবেলা আমরা লেকের পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি। সেসময় একসঙ্গে আমি আর শিবলি ছিলাম; আর বাকিরা চলে গেছে। শামীমও চলে গেছে সন্ধ্যার আগেই। সন্ধ্যার দিকে আমরা বসে গল্প করছি, সেসময় আমার ফোনে একটা কল আসছে। অর্গানাইজারদের কল। তারা বলছে, ‘আপনারা কোথায়?’ বললাম, ‘আমরা তো লেকের পাড়ে।’ তখন তারা বললো, ‘ভাই, দৌড়ে আসেন।’ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেনো, কী ব্যাপার?’ বললো, ‘আপনারা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন!’ জানি না কীভাবে সম্ভব! পরে জানতে পেরেছি জুরিদের মধ্যে আতিক ভাই [নূরুল আলম আতিক] ছিলেন। সামহাউ তারা হয়তো সেখানে কোনো একটা সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছে। আমরা ফার্স্ট, সেকেন্ড পুরস্কার পাই নাই। কিন্তু স্পেশাল ম্যানশন থাকে না, সান্ত্বনা পুরস্কার ওই টাইপ আরকি, সেটা পেয়েছি।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এটাই তো দরকার ছিলো আপনাদের ওই সময়ে।
নূরুজ্জামান : হ্যাঁ, ওইটাই আমাদেরকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আমরা সব মোটিভেটেড হলাম, টিম স্পিরিট চলে আসলো। এরপর এই জংশন সিনেমাটাই আবার আমরা ঠিকঠাক করলাম। এবার ঢাকা ফেস্টিভালে দেখানো হলো। তখন ২০১২ সাল।
ম্যাজিক লণ্ঠন : ওই সময়ের জার্নিটা সম্পর্কে যদি একটু বলতেন।
নূরুজ্জামান : তখন ঢাকায় ফেস্টিভাল হতো এক বছর পর পর। এখন তো প্রত্যেক বছর হয়। ২০১০-এর পরে ’১২-তে যখন হলো, তখন সেখানেও আমাদের সিনেমাটা দেখানো হলো। ওই বছর আরেকটা ওয়ার্কশপ হলো। এবং ওই ওয়ার্কশপে দেখা গেলো, সবাই জংশন নিয়ে কথা বলছে। ওখানে আমরা বেশ হাইলাইটেড হলাম। ইন্টারন্যাশনাল যারা আসছে তারা আমাদের রেফারেন্স দিচ্ছে! আমাদের টিম স্পিরিট তখন একদম হাই। তখন মনে হলো, এবার একটা ফুল লেন্থ সিনেমা বানাবো। আমার সবকিছু কিন্তু খুব জাম্প দেওয়া। মানে আমি জীবনে প্রথম যেটা শুরু করেছিলাম ওটা কিন্তু শর্টফিল্ম ছিলো না, ফুল লেন্থ ছিলো। যেটা হয় নাই আরকি। না বুঝলে যা হয়।
এরপরে আমি যাত্রা বলে একটা গল্প লিখলাম। এটা তখন আমরা শ্যুট করবো। এর মধ্যে আমাদের একটা উন্নত ক্যামেরা হলো। একটা ডি এস এল আর কিনলাম। এটারও একটা দারুণ গল্প আছে। ওই ফেস্টিভালেই মালয়েশিয়ান এক ফিল্মমেকার বললেন, ‘আমি তোমাদের ক্যামেরার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’ আমার এক ফ্রেন্ড আবার মালয়েশিয়ায় ছিলো। ওরে দিয়ে পাঠিয়ে দিলো ক্যামেরা! এই কানেকশনগুলো কাজে লাগছিলো আরকি। যাত্রা শ্যুট করতে গিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হলো। দুই বার, তিন বার শিডিউল চেঞ্জ হলো। ততোদিনে যেটা হয়েছে, আমি আর শামীম ছাড়া-সবাই ইউনিভার্সিটিতে পড়তো,-তাদের পড়ালেখা শেষ। এরা পড়ে গেছে স্ট্রাগলে, চাকরির জন্য ঘুরছে এখানে ওখানে। ফলে এরা অনিয়মিত। তখন আবারও সেই আমি আর শামীম।
আমরা ওটা শ্যুট করতে গেলাম মানিকগঞ্জে। প্রথম আমরা সিরাজগঞ্জের শ্যুট করার জন্য কয়েকবার গিয়ে রেকি করে আসছি; সব ঠিকঠাক। পরে আর হয় নাই। একপর্যায়ে আমরা হতাশ হয়ে গেলাম সিনেমা তো হবে না! তখন শামীম বললো, ‘ভাই, আমাকে আপনি ৫০০ টাকা দেন। আমি লোকেশন খুঁজতে যাবো।’ ওকে টাকাটা দিলাম। ট্রেনে ঘোরাঘুরি করে বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাকে ও ছবি তুলে পাঠাচ্ছে তখন। ৫০০ টাকা দিয়ে ও কেমনে কী করেছে ওই জানে! মানে এটা অসম্ভব কাহিনি। পরে আমরা মানিকগঞ্জে শুটিং লোকেশন পেলাম, ওর এক বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে। সেখানে গেলাম আমরা শ্যুট করতে। সেখানেও বেশ ঝামেলায় পড়লাম। জার্নির শুরু থেকে আমি ডিটারমাইন্ড ছিলাম রিয়েল পিপল দিয়ে অভিনয় করাবো, কোনো অ্যাক্টর না। আমরা চিন্তা করেছিলাম গ্রামের লোকজনই বিভিন্ন ক্যারেক্টারগুলো করবে। ঝামেলা বাঁধলো যখন ক্যামেরা নিয়ে গেলাম, তখন দেখলাম, নারীরা আর অভিনয় করবে না। কারণ এই সমস্যা, সেই সমস্যা-বাড়ি থেকে দিবে না অভিনয় করতে, ইত্যাদি। ফলে হলো কী গল্পটার যে স্ক্রিপ্ট ছিলো, সেটার অর্ধেকও শ্যুট করতে পারলাম না!
এই পর্যায়ে নিয়ে এসে চিন্তা করলাম ফুল লেন্থ বাদ, এটাকে শর্টফিল্ম বানাবো। বানালাম। এখন পর্যন্ত আমার মনে হয় এটা আমাদের সবচেয়ে দুর্বল কাজ। অথচ এটা ওই সময়কার হিসেবে সবচেয়ে বড়ো বাজেটের কাজ ছিলো। ওইটা যখন করেছিলাম তখনই শামীম আমাকে একটা গল্প বলছিলো। ও আমাকে ক্যামেরাটা দেওয়ার জন্য বলে। ওকে দিলাম। ও একটা সিনেমা শ্যুট করে নিয়ে আসলো পুতুল নামে। পুতুল-এর নাম শুনছেন? খুব চমৎকার একটা শর্টফিল্ম। এটা শামীমের প্রথম কাজ। ওইটা আমরা এডিট করলাম। এডিট করতে গিয়েই আবার শামীমকে এডিট শিখালাম। মানে তখন ব্যাপারটা এ রকম যে, নিজেদের সব কাজ নিজেরাই করতাম। করতে করতে টেকনিকাল জিনিসগুলো টুকটাক আমরা শেখা শুরু করলাম, কালার ও সাউন্ড ইত্যাদি। এই হলো মোটামুটি অবস্থা।
ম্যাজিক লণ্ঠন : কাজ করতে গিয়ে নানা উত্থান আর পতনের মুখোমুখি হয়েছেন, সেখান থেকেই আবার শিখেছেন আরকি।
নূরুজ্জামান : এই করে ২০১৫-এর দিকে মনে হলো শর্টফিল্ম না, আমরা এবার সত্যি সত্যি একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য বানাবো। কী নিয়ে বানানো যায় এই নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম। আমার গল্প ছিলো ডানা। এটা এখনো বানাইনি, বানাবো ইনশাআল্লাহ। ওইটার স্ক্রিপ্ট আমাদের মোটামুটি রেডি সেই ২০১৫ সাল থেকেই। কিন্তু এটার যে অ্যারেঞ্জমেন্ট এবং যেই বাজেট, সেইটা আমাদের তখন ছিলো না আসলে। আমরা চিন্তা করলাম, ওটা বানানোর আগে ওয়ার্ম আপ একটা প্রজেক্ট করি। ওয়ার্ম আপের কাজটা হচ্ছে আম কাঁঠালের ছুটি। তখন এই সিনেমাটার নাম এটা ছিলো না। ওয়ার্ম আপ প্রজেক্ট করতে গিয়ে একটা গল্প পেলাম আমার ছেলেবেলার ফ্রেন্ড শরীফ উদ্দিন সবুজের ‘মইন্না ভাই বল্লা রাশি’ বইয়ে। ও বইয়ে যে গল্পগুলো বলছে সেটা আমাদের ছোটোবেলার গল্প এবং খুব কমন গল্প। এবং তার কিছু কিছু গল্পের ক্যারেক্টারও আমি, এ রকম আরকি।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এইটা কোন সময়কার ঘটনা?
নূরুজ্জামান : ২০১৫-তে আমরা প্রথম শ্যুট করেছি। শ্যুট করার পর ওখানে কিছু ঝামেলা হলো। ঝামেলা বলতে গল্পটা হচ্ছে গ্রীষ্মকালের। মানে এখনকার যেই এনভায়রনমেন্ট এটা চাচ্ছিলাম। ওই বছর হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। বৃষ্টিতে পুরো এলাকা চেঞ্জ হয়ে গেলো, ফলে আর কাজ করতে পারলাম না। ভাবলাম পরের বছর গিয়ে করবো। পরের বছর দেখা গেলো ক্যারেক্টারদের চেহারা-সুরত চেঞ্জ হয়ে গেছে! ফলে আগে যা শ্যুট করেছি সব ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে শ্যুট করলাম। সেটাও শেষ হয় নাই। আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। দেন বাকিটা আমরা ২০১৭-তে শেষ করলাম। বুঝতে পারলেন?
‘আমার ফিলোসফি হলো দরকার পড়লে
গল্প চেঞ্জ করবো, সবকিছু চেঞ্জ করবো,
কিন্তু কাজ থামাবো না’
শেষ পর্ব.
ম্যাজিক লণ্ঠন : ওই সময়টাতেই তো মনে হয় সিনেমাহল তৈরির পরিকল্পনা করলেন? তাই না?
নূরুজ্জামান : সিনেমাহলের গল্পটায় একটু পরে আসি। এর একটা ধারাবাহিকতা আছে। আমার জীবনে প্ল্যান করে কোনো কিছু হয় নাই, সব হুটহাট হয়েছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আচ্ছা, তাহলে ধারাবাহিকভাবেই শুনি।
নূরুজ্জামান : যেটা আপনাকে একটু আগে বলছিলাম, ডানার কিছু টেকনিকাল চ্যালেঞ্জ ছিলো, যেটা করার মতো সামর্থ্য আমার তখন ছিলো না। প্লাস ওটার যে বাজেট সেই বাজেটও তখন আমাকে কাজটা করতে পারমিট করছিলো না। আমার ফিলোসফি হলো দরকার পড়লে গল্প চেঞ্জ করবো, সবকিছু চেঞ্জ করবো, কিন্তু কাজ থামাবো না। ধরেন, আমার এই মুহূর্তে একটা কাজ করা দরকার, এখন যে সামর্থ্য আছে, সেই সামর্থ্য দিয়ে করতে পারি এমন একটা প্রজেক্ট আমি করবো। সবসময় আমি এভাবেই কাজ করি। যে কারণে আমার কখনো বাজেটের চিন্তা করতে হয় না। এইটা না হলে ওইটা হবে না ভেবে আমি বসে থাকতে চাই না। যখন দেখলাম ডানা করতে পারছি না, তখন মনে হলো, ওয়ার্ম আপ কাজ করে দেখি, একটা ফুল লেন্থ বানাতে পারি কি না। ব্যাপারটা ছিলো এ রকম-আমরা কাজটা করবো, একদম জান-প্রাণ দিয়েই করবো। যদি ফেইল করি তাহলে ফেইল; কাউকে দেখাবো না।
ওই সময় ওয়ার্ম আপের জন্য আমি কিছু গল্প খুঁজছিলাম। নিজেই একটা গল্প লিখবো এই রকম আরকি। তখন আমার এক বন্ধুর একটা বই বের হয়। ছোটোবেলার বন্ধুর গল্প সংকলন। বইটা আমার কাছে আসছিলো প্রুফ রিডিংয়ের জন্য। আসলে ওর প্রুফ রিড করানোর জন্য তখন টাকা ছিলো না। আমাকে পাঠিয়েছে প্রুফ দেখতে। ওইটা পড়তে গিয়ে দেখলাম, গল্পগুলো সব আমাদের গল্প, আমাদের ছোটোবেলার গল্প। যেখানে কিছু কিছু গল্পের ক্যারেক্টার আমিও আছি।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এর নিশ্চয় কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। সেটা শুনতে চাচ্ছি।
নূরুজ্জামান : এর ব্যাক স্টোরিটা হচ্ছে, আমার মেয়ের তখন প্রায় ছয় বছর বয়স। ওই বয়সের বাচ্চাদের যা করতে হয় প্রতিদিন গল্প শোনাইতে হয়। রাত্রে ঘুম পাড়ানোর জন্য গল্পের স্টক তো খুব সীমিত আমার। একটা পর্যায়ে দেখলাম যেই গল্পই বলছি ও বলছে এটা তো বলেছো; নতুন কিছু বলো। নতুন গল্প কই পাবো!
তখন তাকে ছোটোবেলার এটা সেটা বলতাম। এটা বলতে বলতে একটা পর্যায়ে গিয়ে মনে হলো, আমার ছোটোবেলার এসব নিয়ে যদি একটা গল্প বানাই তাহলে কেমন হয়? ওই সময়টাতেই আমার বন্ধু শরীফ উদ্দিন সবুজ-এর বইটা প্রুফ রিড করার জন্য আসে। আসলে ওইটা পড়তে গিয়েই মনে হলো, আমি যে গল্পগুলো মেয়েকে শোনাচ্ছি সেগুলো এর খুব কাছাকাছি। তখন ভাবলাম, নতুন করে লেখার থেকে এগুলো নিয়ে একটা স্ক্রিপ্ট করলে কেমন হয়। বন্ধুরে বললাম, সে রাজি হয়ে গেলো। আমি তারপরে ওটা নিয়ে স্ক্রিপ্ট বানালাম।
প্রথমে অবশ্য স্ক্রিপ্টটা লেখার কথা আমার ছিলো না। স্ক্রিপ্ট লেখার কথা ছিলো শামীমের [যুবরাজ শামীম]। এ জন্য ওকে বইটা দিয়ে দিলাম। বললাম, এই এই গল্প নিয়ে আমি কাজটা করতে চাই। একটা আইডিয়া দিয়ে ওরে বললাম, প্রি-প্রোডাকশনের জিনিসপত্র আমি সামলাই। তুমি স্ক্রিপ্টটা লেখো। ওই সময় শামীম একটা স্কুলে চাকরি নিয়েছিলো। ও কিন্তু কিছুদিন টিচিং করেছে ওই সময়টাতে। ও কোনোভাবেই টাইম ম্যানেজ করতে পারছিলো না। এদিকে আমার এই গল্পটা করতে হবে সামার ভেকেশনেই। সময় খুব সঙ্কীর্ণ। তো একটা পর্যায়ে একরকম বিরক্ত হয়েই আমি স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু করলাম। ওরে বললাম, ‘ঠিক আছে। তুমি তোমার স্কুল সামলাও, কিন্তু শুটিংয়ের সময় থাকতে হবে।’
ম্যাজিক লণ্ঠন : যেহেতু আপনাদের নিজেদের গল্প, স্ক্রিপ্টটা নিজে লেখাতে তো মনে হয় অনেক কিছু করা সহজ হয়েছে।
নূরুজ্জামান : স্ক্রিপ্ট লিখতে বসে দেখলাম, আমার জীবনে যেটা হয় নাই, পরে সেটার চেয়ে ভালো কিছুই হয়েছে। শামীম লিখলে ও এই গল্পের মধ্যেই থাকতো। আমি স্ক্রিপ্ট লিখতে বসে দেখলাম, আমি মূল গল্প থেকে হয়তো ফোরটি পারসেন্ট নিয়েছি, সিক্সটি পারসেন্ট অ্যাড করেছি। ফলে ওই বইয়ের সঙ্গে কেবল স্ট্রাকচারের মিল আছে। বাকি সবকিছুই আবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে। আরেকটা দৃষ্টিভঙ্গিতে গল্পটা হয়েছে ফাইনালি। এটা আমরা শুরু করেছিলাম ২০১৫-এর মে মাসের ২৩ তারিখে সম্ভবত। তখন আমরা গেলাম গাজীপুরের হারবাইদ এলাকায়। এখন শামীম যেখানে থাকে তার কাছাকাছি এলাকাটা। ওইখানে বেশকিছু লোকেশন স্কাউটিং করলাম। তারপরে শামীমের পাঠাগার থেকে বাচ্চাদের নিলাম। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাদের সিলেক্ট করলাম। ওরাই আসলে ক্যারেক্টারগুলোতে অভিনয় করেছে।
আর যে গ্রাম খুঁজছিলাম-আমি চাচ্ছিলাম আমার ছোটোবেলার গ্রাম। ছোটোবেলা বলতে মিড এইট্টিজ, আর্লি নাইন্টিজ। ওই সময়কার গ্রাম তো এখন আর নাই! আমি চাচ্ছিলাম একটা ইলেকট্রিক পোস্ট, একটা ইটের বাড়িও যেনো না থাকে ভিজ্যুয়ালের মধ্যে। সেরকম গ্রাম বের করা আমাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালো। সেসময় একটা বেস ক্যাম্প করেছিলাম হারবাইদে। বেস ক্যাম্প থেকে মোটামুটি ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার আমরা হেঁটে হেঁটে বেড়িয়েছি। প্রচুর হাঁটাহাঁটি করছি। সিনেমাতে যে গ্রামটা দেখা যায়, সেটা আসলে ২০-২৫টা গ্রাম। ওগুলো আবার এমনভাবে করতে হয়েছে যেনো মনে না হয় আলাদা জায়গা। এটা বের করা খুব টাফ ছিলো। কিন্তু তখন খুব মজা পেয়েছি। প্রত্যেকদিন ভোরবেলা উঠে-ইউনিটের সবাই ঘুমাচ্ছে তখন, আমি শামীম আর আমাদের কিছু পার্টের ডি ও পি [ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি] ছিলো সাব্বির-হাঁটতে বের হয়ে যেতাম। হেঁটে হেঁটে লোকেশন খুঁজতাম। প্রথম বছর আমরা শেষ করতে পারলাম না বৃষ্টির জন্য। পরের বছর আবার শুরু করলাম ২০১৬ তে। তখন দেখলাম কাজ অনেকটা হয়ে গেছে। প্রায় ফিফটি পারসেন্টের উপরে হয়ে গেছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তাহলে এই কাজ শেষ হলো কবে গিয়ে?
নূরুজ্জামান : ওই বছরও আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। বৃষ্টি হলে গ্রামের চেহারা তো পুরো চেঞ্জ হয়ে যায়। ফলে আর কাজ করতে পারলাম না। পরে ভেবেছিলাম, বৃষ্টি একটু কমলে কাজ শুরু করবো। আমরা কাজ শেষ করেছি জুনের দিকে। ভাবলাম তিন চার মাস গ্যাপ দিয়ে আবার কাজ করবো। ওই সময় আবার বাচ্চাদের স্কুলের পরীক্ষা শুরু হলো! এগুলোর জন্য ওরা বিজি, সময় দিতে পারলো না। ডিসেম্বরে ওদের পরীক্ষা শেষ হলো, তারপরে বাকি কাজটা শেষ করলাম। শুটিংয়ের কাজটা। ওই শুটিংয়ের সময়টাতে শামীম আদিম-এর গল্প বানাচ্ছে। ওখানে প্রতিদিন আমরা আলাপ করি শুটিংয়ের ফাঁকে।
শ্যুট করা তো হয়ে গেলো। আবার ঝামেলায় পড়ে গেলাম। কারণ এডিটের জন্য যেই ধরনের পিসি দরকার তা আমাদের নাই। তখন আমরা যেটা করলাম, সিনেমাটাকে সাতটা ভাগ করলাম। ওগুলোকে নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করবো। কারণ পিসি লোড নিতে পারছে না। সেজন্য ছোটো ছোটো ভাগ করে কাজ করছিলাম। এগুলো করতে সময় লাগলো। এর মধ্যে যেটা হয়েছে, আমরা দেখলাম, এখানে কিছু অ্যানিমেশনের কাজ লাগবে। তাহলে সেটা কাকে দিয়ে করাবো! দুই-একজনের সঙ্গে কথাও হলো, তারা যে ধরনের টাকাপয়সার কথা বললো, সেটা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। চিন্তা করলাম আমরা নিজেরাই অ্যানিমেশন শিখবো। ওই সময় যেটা হলো, বেশ কয়েকজন চলে আসলো-ওরা তখন পড়াশোনা করে-ছয়-সাত জনের একটা টিম। ওরা বললো, ‘আমরা অ্যানিমেশন শিখবো।’ প্রফেশনাল কাজের জন্য টুকটাক কিছু অ্যানিমেশন আমিও জানতাম-ওই রকম একটা কাজ দেখেই ওরা আসছিলো আরকি!
তখন চিন্তা করলাম, আমরা সবাই একসঙ্গে শিখবো। আমিও শিখবো, ওরাও শিখবে। কাজ করতে করতে শিখবো। তারপরে শুধু অ্যানিমেশন না, ফিল্মের ব্যাপারে বিভিন্ন কথাবার্তা বলতে গিয়ে দেখলাম, ওদের মধ্যে কয়েকজন আগ্রহী। কয়েকজন আবার অনলাইনের জন্য কনটেন্টও বানায়। তখন মনে হলো, আমরা যেটা করছি সেটাকে একটা ফর্মে আনা যায় কি না! একটা স্কুলের ফর্মে-এমন স্কুল যেখানে কেউ টিচার না; সবাই টিচার, সবাই স্টুডেন্ট। যে, যে ব্যাপারে জানে সে ব্যাপারে সে বলবে। আমরা এটার নাম দিলাম ‘সিনেপীঠ’। স্কুল নিয়ে ভবিষ্যতে একটা বড়ো পরিকল্পনা আছে। এরপরে আমরা সেখানে বেশকিছু ওয়ার্কশপ করেছি। স্কুলের কনসেপ্টটাই হচ্ছে সবাই স্টুডেন্ট।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনাদের স্কুলটা কী নারায়ণগঞ্জেই? স্কুল নিয়ে কী ধরনের পরিকল্পনা করছেন?
নূরুজ্জামান : হ্যাঁ। এখন আমরা আরো একটু বড়ো পরিসরে চিন্তা করছি। স্কুলটা এখন অনিয়মিতভাবে চলছে। আমরা নিয়মিত করার চেষ্টা করছি। দেখি কতোটুকু করা যায়।
যাইহোক, আগের আলাপে ফিরি। সিনেমাটা এডিট করা হলো। কালার-টালার করতে আমাদের জান ক্ষয় হয়ে যাচ্ছিলো। আমরা তো সবসময় হাতে যা আছে তাই দিয়েই ট্রাই করি। আমি আপনাকে বলেছিলাম, সিনেমাটা শ্যুটের সময় আমার ক্যামেরা ছিলো ক্যানন 600D। এটা লোকজনকে বললে বিশ্বাস করে না। কিন্তু আমি তো জানি, আমার কতোটুকু দরকার! আরেকটু ভালো ক্যামেরা হলে হয়তো ভালো হতো। কিন্তু আমার যা দরকার সেটা আমি পেয়েছি। আমি যেই টোন চাই, কিংবা প্রত্যেকটা ইমেজের তো একটা মুড আছে, যেই মুডটা আমার চাই, সেটা ওই ক্যামেরা দিতে পারে। সো, আমি ওটা নিয়ে কখনোই হেজিটেটেড ছিলাম না। আমরা যে পিসিতে এডিট করেছি, সেটা শুনলে লোকজন হাসাহাসি করবে! ওটা ছিলো একটা কোর টু ডুয়ো প্রসেসরের পিসি। আমার অফিসে একটা এক্সট্রা পিসি ছিলো। এখন অবশ্য আমাদের মোটামুটি যা দরকার, সেই জিনিসপত্র আছে। ওই মুহূর্তে তা ছিলো না। প্রথমে সিনেমাটা সাত পার্ট করলাম, পরে সাতটা পার্ট জোড়া লাগালাম। রেন্ডার করতে অনেক সময় নিতো। আমরা করতাম কী, রেন্ডার দিয়ে চলে যেতাম। দেখা গেলো, দেড় দিন পরে রেন্ডার হয়েছে-এ রকম আরকি!
আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, আমি একটানা কাজ করতে পারি না। আমার যেহেতু এটা প্রফেশন না, আমি যখন সুযোগ পাই তখন করি। দেখা গেলো আজকে কাজ করলাম, আবার হয়তো দুই মাস পরে একটু কাজ করলাম। কোনো এক শুভ দিনে এসে দেখি, আমাদের সাউন্ড ট্র্যাকটা পুরা উধাও হয়ে গেছে! পুরো সিনেমার কিচ্ছু নাই, মিউট সিনেমা। ওই সময় মোটামুটি ইস্তফা দিয়ে ফেলতে পারতাম। আবার মনে হলো, আচ্ছা তাহলে একটা কাজ করি পুরো সিনেমার সাউন্ডটা নতুন করে বানাই! এইটা করতে গিয়ে প্রত্যেকটা সাউন্ড ধরে ধরে বানালাম। ফোলি করার চিন্তা আসলো আমাদের। কিন্তু ফোলি সম্বন্ধে কিছু জানি না। তখনই শিখলাম ফোলি। নিজেরাই করলাম! আমাদের স্টুডিও ছিলো না। এখন যে এসি রুমটায় বসছি, এটাও ছিলো না। পাশে আরেকটা রুম আছে, ওই রুমটাতে কাজ করতাম। শ্যুটের জন্য যখন বেস ক্যাম্পে আমরা থাকতাম, তখন কিছু তোশক বালিশ কেনা হয়েছিলো। সাউন্ড প্রুফ করার জন্য পুরো ওয়ালে তোষক বালিশ লাগালাম। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে এসি নাই! আমরা রীতিমতো খালি গায়ে ঘামতে ঘামতে ফোলি করেছি আরকি!
ম্যাজিক লণ্ঠন : সব তো নতুন করেই করলেন তাহলে। সেটা কি আগের থেকে বেটার কিছু হলো?
নূরুজ্জামান : এভাবে সাউন্ড বানানো হলো। সব ডায়ালগ আবার নেওয়া হলো। লিপ দেখে দেখে ডায়ালগ লিখতাম তখন। কারণ স্ক্রিপ্টে একটা আছে, বলার সময় ও বলেছে ওর মতো করে। তখন দেখলাম, মজার মজার ডায়ালগ বের হওয়া শুরু হয়েছে। যেটা হয়তো শুটিংয়ের সময় সে বলেইনি। এভাবে আমরা ডাবিং করলাম। তারপরে কালার করার চেষ্টা করলাম। এটা করতে মোটামুটি আড়াই বছর সময় গেলো। বাট যেটা হয়েছে, এটা যেহেতু ওয়ার্ম আপ ছিলো-কোথাও দেখাবো কি দেখাবো না, সেটা জানি না। কিন্তু আমরা চাচ্ছিলাম কাজটা যতোটুকু সম্ভব নিখুঁতভাবে শেষ করতে। এর মাঝখানে আবার অন্য আরেকটা গল্প নিয়ে স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু করলাম। ‘ঘোর’ বলে একটা গল্প। ওইটার প্রি প্রোডাকশন শুরু করেছিলাম। ওটা হলো একটা স্ট্রিট ম্যাজিশিয়ানের গল্প।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এটা কোন সময়ের কথা বলছেন?
নূরুজ্জামান : এটা ২০১৮ সালের কথা বলছি-২০১৭-এর মাঝামাঝি বা ২০১৮। ওই ক্যারেক্টারটা হচ্ছে রিয়েল। ওই ভদ্রলোককে নিয়ে আমরা বেশ কয়েকদিন রিহার্সেল করলাম। হঠাৎ করে লোকটা উধাও হয়ে গেলো! উধাও তো উধাও; ফোন ধরে না, কিচ্ছু না। এর মধ্যে আমরা কিছু ভালো ইকুয়েপমেন্ট কিনে ফেলি। ক্যামেরার এখন যে সেটআপে কাজ করি, সেই সেটআপটা কেনা হয়েছিলো ওটার জন্য। কারণ ওখানে লো লাইটে কাজ করতে হবে এবং রিয়েল লোকেশনে-এমন একটা জায়গা যেখানে লোকজনকেও বুঝতে দেওয়া যাবে না, এখানে শুটিং হচ্ছে। এর মধ্যে শামীম আদিম-এর স্ক্রিপ্ট শেষ করে ফেলছে। আদিম শুরু করবে মানে আদিম-এর জন্য তখন বস্তিতে থাকছে। আর এদিকে আমি আমার পরের সিনেমার কাজ করছি, সাউন্ড বানাচ্ছি। তখন আমাদের ‘সিনেপীঠ’-এর ছেলেরা পুরা অ্যাকটিভ। ওরা তখন এই পার্টে কাজ করছে। এই সময়ে ওই লোক উধাও হয়ে গেলো!
শামীম তখন আসছে আমার এখানে এডিট করতে। আমাদের একটা মোটামুটি মানের এডিটিং প্যানেল তৈরি হয়েছে। এগুলো সব একটু একটু করে আমি কিনেছি। কোনোটাই তো একবারে করার মতো এতো সামর্থ্য নাই। তাই একটু একটু করে আপডেট করতে থাকি। এভাবে প্যানেলটা হয়েছে। ওখানে শামীম আদিম এডিট করেছে। এডিটের পরে ও একটা ফার্স্ট লুক রিলিজ করলো। তখন লোকজন শামীমকে চেনা শুরু করেছে। ওই সময়টাতে আমরা মোটামুটি রেডি ঘোর-এর শ্যুটের জন্য। এর মধ্যে যারে নিয়ে ভাবতেছি সে উধাও! এ নিয়ে মেজাজ খুব খারাপ! তখন চিন্তা করলাম, ওখানে কাজই করবো না। নদীর পাড়ে গেলাম বিকালবেলা, তখন খুব মন খারাপ! আমি আর শামীম, মন মেজাজ ভালো নাই তাই নদীর পাড়ে গিয়ে বসছি। হঠাৎ আমার কী মনে হলো শামীমকে বললাম, ‘আমি সিনেমাটা বানাবো। এখন যেখানে বসে আছি এইটাই লোকেশন।’ কী বুঝে বলেছি জানি না। কিন্তু তখন এটা বিশ্বাস করতাম, যেকোনো জায়গায় চাইলে আমরা সিনেমা বানাতে পারি। এই বিশ্বাসটা ছিলো। ওকে বললাম, ‘আমি এই লোকেশনে সিনেমা বানাবো। এই নদীর পাড়েই বানাবো।’
তখনো গল্প কী হবে, না হবে জানি না। শামীম বললো, ‘ভাই, করেন কোনো সমস্যা নেই।’ এর মধ্যে আমার একটা কল আসছে। আমি ফোনে কথা বলছি। কল শেষ করেছি-তখন শামীম বললো, ‘মাথায় একটা ইমেজ আসছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, একটা লোক নদীতে পয়সা ফেলছে’-বললাম ফাইন, চলো এটাই আমাদের গল্প। একটা লোক নদীতে পয়সা ফেলছে, সেই লোকটা কে হতে পারে জানি না। এই নিয়ে আমরা বিভিন্ন কথাবার্তা বলছি। নদীর পাড়ে বসেই আমরা ভাবছি এই ক্যারেক্টারটা কে হতে পারে? ওই সময়টায় আমি রেডিওতে জীবনের গল্প টাইপের অনুষ্ঠান খুব শুনতাম। আমার হঠাৎ মনে হলো, ওখানে একটা গল্প পেয়েছিলাম এ রকম-একজন লোক জাহাজের বাবুর্চি, তার দুনিয়াতে কেউ নাই। আত্মীয় পরিজন কেউ নাই। যেখানে জাহাজ ভিড়ে সেখানে গিয়ে সে কিছু লোকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করে। আত্মিক সম্পর্ক-বন্ধুবান্ধব বানায়। সে যা বেতন পায়, ওই লোকজনকে সাহায্য করে শেষ করে ফেলে। এই রকম একবার সে তার সব টাকাপয়সা একজনের কাছে রাখতে দিয়েছে-তার সারা জীবনের সঞ্চয়-সেই লোক টাকাপয়সা মেরে দিয়েছে। মানে ডাঙার বা বন্দর এলাকার লোক। হঠাৎ করে মনে হলো এই লোকটা তো ওই লোক হতে পারে।
এইভাবে আমাদের গল্প এগোচ্ছে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এর মধ্যে একটা অয়েল ট্যাংকার চলে আসে-তেলবাহী জাহাজ আরকি। ওই এলাকা তো আমার চেনা ছোটোবেলা থেকেই। জাহাজের লোকজন সম্বন্ধে আমার ভালো ধারণা আছে। একটা জাহাজ এসে থামলে, দড়ি ছুঁড়ে মারে, যেটাকে বোলার্ড বলে। আমরা বোলার্ডের উপরে বসেছিলাম। একজন লোক দড়ি ছুঁড়ে মেরে বলছে, ‘ভাই, এটা একটু বেঁধে দেন।’ শামীম তো সবসময় প্রোঅ্যাক্টিভ। ওখান থেকে দড়িটা নিয়ে ও বাঁধছে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, লোকজন চলে আসছে, চলো যাই। শামীম বললো, ‘ভাই কোনোদিন জাহাজে উঠি নাই। চলেন একটু জাহাজে উঠি।’ যে লোক দড়ি ছুড়ে মারছে তারে বললাম, ‘ভাই, আমরা একটু জাহাজে উঠি?’ বললো, ‘ভাই সিগারেট না খাইলে ওঠেন। কারণ তেলের জাহাজ, সিগারেট খাওয়া যাবে না।’ আমরা তো কেউ সিগারেট খাই না। সমস্যা নাই। ওই লোক প্রচুর কথা বলে। সে জাহাজের নাড়িনক্ষত্র এটা-সেটা বলেই যাচ্ছে আরকি। সে ঘুরে ঘুরে সব দেখাচ্ছে। আমার হঠাৎ মনে হলো, গল্প তো এই জাহাজ নিয়েও হতে পারে। আমরা ওইদিনের মতো চলে আসলাম; কিন্তু মাথার মধ্যে ওটা ঢুকে গেলো। পরের দিন আবার গেছি। তখন ওই জাহাজ নাই। পরে জানলাম, ওরা সন্ধ্যার পরে আসে। আবার ওইদিন গিয়ে পাইলাম; ওই লোকরা তো খুব খুশি। কারণ আমরা তাদের কোনো সমস্যায় ফেলি নাই। তারা ওইদিন আবার চা-টা খাওয়ায় দিলো আমাদের। আর বিভিন্ন গল্প বের হচ্ছে ওই জাহাজের। এরপরে আমরা নিয়মিত যাওয়া শুরু করলাম। তিন-চার দিন যাওয়ার পর মোটামুটি একটা গল্প দাঁড়ালো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এটা কি ২০১৮ সালের ঘটনা? তিন-চার দিনেই গল্প রেডি হয়ে গেলো?
নূরুজ্জামান : হ্যাঁ। ২০১৮ সালের। টোটাল তিন-চার দিনের কাহিনি। আপনি যেটা বললেন, গল্প নিয়ে অনেকদিন বসে থাকতে হয়-এ রকম কিছু না আসলে। উইদইন ওয়ান উইক আমার ফিল্মের স্ক্রিপ্ট রেডি। বুঝছেন? মানে ফরমেটেড স্ক্রিপ্ট, যেটা লোকজনকে দেওয়া যায়। এর মধ্যে আমরা লোক খুঁজছিলাম। আগের ধারণা অনুযায়ী বা যেভাবে কাজ করবো সেই অনুযায়ী আমরা চাচ্ছিলাম, লোকাল কিন্তু নন প্রফেশনাল লোকজনই কাজ করবে। জাহাজে যারা আছে তারাই কাজ করবে। কিন্তু তখনো এ রকম কোনো কিছু তাদের বলি নাই। বাট মাথায় এ রকম একটা চিন্তা নিয়ে ঘুরছি। মেইন ক্যারেক্টারটার জন্য কোনো সুবিধাজনক লোক পাচ্ছিলাম না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : একটু আগে যার কথা বললেন তাকে দিয়ে করা যাচ্ছিলো না?
নূরুজ্জামান : মিলছিলো না। এটা পোর্ট্রে করতে পারবে এমন কাউকে খুঁজছিলাম। আমরা চিন্তা করছিলাম, যাদেরকে চিনি এমন নন প্রফেশনাল কাউকে দিয়ে কাজটা করাতে। যারা এই পুরা জিনিসটা ধরতে পারবে। কারণ এই চরিত্রটা একটু কঠিন। পুরো সিনেমায় তার ডায়ালগ নাই; কিন্তু সে হলো মেইন ক্যারেক্টার। এভাবে চরিত্রটা বানানো হয়েছে। এর মধ্যে মনে হলো, আমরা প্রফেশনাল কাউকে দিয়ে চেষ্টা করবো কি না। আমার কাছে একটা জিনিস সবসময় মনে হয়েছে, হয় নন প্রফেশনাল, না হলে একদম সুপার প্রফেশনাল। মাঝামাঝি কাউকে দিয়ে কাজ হবে না। যে খুব ভালো জানে আর যে কিচ্ছু জানে না, এই দুজনকে দিয়ে আমি কাজ করতে পারবো। যে অল্প জানে তারে দিয়ে পারবো না। এ রকম খুঁজছিলাম।
ম্যাজিক লণ্ঠন : শেষ পর্যন্ত ফজলুর রহমান বাবুকে ঠিক করলেন। তাকে কীভাবে পেলেন?
নূরুজ্জামান : স্বপ্নজাল সিনেমা আছে না গিয়াসউদ্দিন সেলিম-এর, ওটা হলে দেখতে গিয়েছিলাম। ওখানে গিয়ে বাবু ভাইয়ের অভিনয় ভালো লাগে। আমার বাসায় টিভি নাই লাস্ট থার্টি ফাইভ ইয়ার্স অলমোস্ট। কখনো টিভি আমি রাখতেও চাই না। যে কারণে টিভির নাটকগুলো দেখা হয় না, আর ইউটিউবে নাটক দেখার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। ফলে কে কেমন কাজ করছে এটা আমি জানি না। বাবু ভাইয়ের আমি অল্প কিছু কাজ দেখেছি। দেখে মনে হয়েছে, ওনাকে দিয়ে হলে হতেও পারে। শামীমের আদিম-এর ফার্স্ট লুক রিলিজ হওয়ার কারণে ইন্ডাস্ট্রিতে অ্যাট লিস্ট অনেকে ওর নামটা জানা শুরু করছে। আমি শামীমকে বললাম, ‘চলো ওনাকে অ্যাপ্রোচ করে দেখি কাজ করবে কি না।’ শামীম কেমনে কেমনে যেনো ওনার ফোন নম্বর বের করলো। ওনার সঙ্গে একটা অ্যাপোয়েনমেন্ট সেট করা হলো। আমি ওনাকে গিয়ে প্রথমেই যেটা বললাম, ‘ভাই, এটা হচ্ছে আমার স্ক্রিপ্ট। আই অ্যাম নোবডি। আপনার যদি স্ক্রিপ্ট দেখে মনে হয়, এই কাজটা করবেন, তাহলে ইয়েস বলেন। আদারওয়াইজ আমরা আর কোনো কথাই এগোবো না।’
ওই সময় তো উনি অনেক ব্যস্ত। ব্যস্ত আবার জনপ্রিয়ও। উনি বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি দুই দিন পরে জানাবো।’ দুই দিন পরে উনি বললেন, ‘আমরা আরেকবার বসি।’ উনি স্ক্রিপ্ট দেখে মোটামুটি কনভিন্সড। কিন্তু আমার কোনো কাজ তো নাই তখনো; তাকে দেখাবো এমন কোনো কাজও নাই। ফলে উনি ঠিক কনফিডেন্সও পাচ্ছেন না, এটা আমি বুঝতেছি। এর পরে পারিশ্রমিকের ব্যাপারে কথা আসলো। উনি রেগুলার একটা সিনেমায় যেরকম পান, আমি তার ১০ ভাগের এক ভাগ হয়তো দিতে পারবো। এর বেশি দিতে পারবো না। দুইটা সমস্যা, একটা হচ্ছে আই অ্যাম নোবডি; আরেকটা হচ্ছে, পারিশ্রমিকের পরিমাণও অনেক কম। আমি বললাম, ‘ভাই, এভাবে এভাবে আমি কাজ করি। আমার পেছনে ও রকম কোনো ডোনার নাই। আপনার যদি মনে হয় আপনি করবেন ফাইন, আদারওয়াইজ না।’ উনি ওইদিন না করে দিলেন। বললেন, ‘এই পারিশ্রমিকে আমি করতে পারবো না।’ তার একদিন বা দুই দিন পরে সকালবেলায় বাবু ভাই ফোন দিলেন। বললেন, ‘আপনারা যেভাবে কাজ করেন-বন্ধুবান্ধবের কাছে চাঁন্দা-টান্দা নিয়ে-মনে করেন, আমি আপনারে চাঁন্দা দিলাম। আমি কাজটা করবো।’ এই হলো শুরু।
বাবু ভাই ইয়েস বলাতে আমি বিরাট বিপদে পড়ে গেলাম। বিপদে পড়লাম এই জন্য যে, আম কাঁঠালের ছুটিতে আমিই ক্যামেরা চালিয়েছি। তারপর আমরা যে দরিদ্র সেটআপে কাজ করি, ওই রকম একটা হাইলি প্রফেশনাল লোক এসে এই সেটআপ দেখলে তো মুশকিল! এটাতে আমি ক্যামেরা নিজে চালাতে চাচ্ছিলাম না। আমরা ঠিক করেছিলাম, আদিম-এ যে ক্যামেরা চালিয়েছে হামজা, ও করবে। কিন্তু আমি বুঝলাম, বাবু ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করতে গেলে হামজাকে দিয়ে হবে না। হঠাৎ মনে পড়লো আমার এক ফ্রেন্ড আছে, আরিফুজ্জামান। ও ‘বি বি সি’তে কাজ করতো। আমরা ইউনিভার্সিটি সময়কার ফ্রেন্ড। ওকে জানালাম। ও বললো, ‘স্ক্রিপ্ট পাঠা।’ পাঠালাম। ও পরের দিন এসে হাজির। বললো, ‘আমার অন্য কাজ আছে, কিন্তু আমি এটা করবো।’ এখন ও এসে আমাকে অন্য প্যারা দেওয়া শুরু করলো!
ম্যাজিক লণ্ঠন : কেমন সেটা?
নূরুজ্জামান : আমরা নিজেরাই লাইট করি, আর্টের কাজ-সব তো নিজেরাই করি। আম কাঁঠালের ছুটি সিনেমা জাস্ট চারজন মিলে বানিয়ে ফেলেছি। একজন চারটা-পাঁচটা করে ডিপার্টমেন্ট সামলিয়েছে। কিন্তু ও বলছে এভাবে কাজ হবে না! এখন লাইটের একটা ডিপার্টমেন্ট লাগবে, ও ‘বি বি সি’র একটা টিম নিয়ে আসলো। ‘বি বি সি’তে ওর সাথে কাজ করছে এ রকম আর্ট ডিপার্টমেন্ট আসলো, ক্যামেরা অ্যাসিস্টেন্ট আসলো। একটা গল্প আছে না, একজন সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য পাহাড়ে গেছে, শুরুতে একটা ইঁদুর আসলো, আস্তে আস্তে তার পুরো ফ্যামিলি আসলো। আমার অবস্থা হয়েছে এমন! আমি তো নন প্রফেশনাল নিয়ে কাজ করি। এখানে এসে পুরো সেটআপে আস্তে আস্তে কেমনে যেনো প্রফেশনাল লোক চলে আসলো! এসব প্রফেশনাল আসার পরে যেটা হলো-বাবু ভাই একা প্রফেশনাল হলেও মুশকিল। তখন আরো কিছু অভিনেতা প্রফেশনাল হওয়া দরকার পড়লো। তখন আমরা প্রত্যেকদিন এরে খুঁজি, ওরে খুঁজি। এই করে আমাদের টিম দাঁড় হলো। অ্যাক্টরও মোটামুটি সব প্রফেশনাল। সেইসঙ্গে মিক্স করলাম একেবারে জাহাজের লোকজন আর আরেকটা বাচ্চা ক্যারেক্টার আছে, ওটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক করলাম, আম কাঁঠালের ছুটির একজন কাজ করেছে, ওকে দিয়ে কাজ করাবো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : নন প্রফেশনাল দিয়ে কাজ শুরু করবেন ভাবলেন, কিন্তু দিনশেষে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র কিংবা কলাকুশলী প্রফেশনাল হয়ে উঠলো। এর পরের গল্পটা কী আপনাদের অনুকূলে ছিলো?
নূরুজ্জামান : এইভাবে শুরু করলাম আরকি! মিলছিলো না তো। সবকিছু এভাবে ঠিকঠাক, কিন্তু জাহাজের পারমিশন পাবো কি না তখনো জানি না। কারণ জাহাজের তো কাজকর্ম আছে। ফলে যার জাহাজ সে তো আমাকে এটা দিবে না। যেই লোকটা প্রথম আমাদের জাহাজ ঘুরে দেখালো, তার সঙ্গে কথা বললাম। সে নিচের দিকের কর্মচারী। সে বললো, ‘আমাদের কোম্পানির মালিক খুব ভালো মানুষ; ম্যানেজারও খুব ভালো। তারে যদি আপনি বুঝাইয়া বলতে পারেন সে রাজি হইতে পারে।’এদের কোম্পানির জাহাজ হচ্ছে ৬০-৬৫টার মতো। যিনি মালিক সে আবার নড়াইলের এম পি হওয়ার লড়াইয়ে আছে। আমরা যখন কাজ করছি, তখন মাশরাফিকে নমিনেশন দেওয়ার পর তিনি চুপচাপ হয়ে গেছেন। সবার কাছে ম্যানেজারের নম্বর চাই, কিন্তু কেউ দেয় নাই। একজন চুপচাপ নম্বর ও ঠিকানা দিলো, ধানমন্ডিতে অফিস। একটা চিঠি লিখে নিয়ে গেলাম। ধরেই নিয়েছি রাজি হবে না। কী মনে করে লোকটা রাজি হয়ে গেলো! বললেন, ‘ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের কাজকর্মে কোনো ডিস্টার্ব করবেন না, তাহলেই হবে। আপনাদের যে কয়দিন লাগে ব্যবহার করবেন।’ এইতো শুরু হলো শুটিং।
এটা ২০১৮ সালের শেষের দিকের ঘটনা। ২০১৯-এর মার্চে শুরু করলাম। আমরা যেরকম আবহাওয়া চাচ্ছি, সবকিছু মিলে মার্চের দিকে শ্যুট করলাম। কয়েকদিন শ্যুট করার পর ঈদের মৌসুম ছিলো। মাঝখানে বাবুভাই তিন দিনের ছুটি চাইলেন। ঈদের কাজ করবেন। বললেন, ‘আমাকে তিন দিনের জন্য ছাড়তে হবে ভাই, তারপরে কাজ করবো।’ আল্টিমেটলি সেই তিন দিন ১০ দিনে গড়ালো। আমরা কিছু কাজ করলাম। এর মধ্যে একটা ক্যারেক্টার কিছুই পারছিলো না। আমি সাধারণত কারো সঙ্গে শাউট করি না। ওইদিন আমার এতো মেজাজ খারাপ হয়েছে। কারণ আমাদের চলতে হয় জাহাজ যেভাবে চলে সেভাবে। হয়তো বন্দর এলাকায় জাহাজের একটা শ্যুট আছে, আমি জানি জাহাজটা এখানে ৩০ মিনিট থাকবে। ফলে ওই ৩০ মিনিটের মধ্যে কী করা যায় সেটা নিয়েই আমাকে ভাবতে হবে।
এর মধ্যে এক ভদ্রলোক, সেও একজন প্রফেশনাল অভিনয়শিল্পী, তার অভিনয়েরও অনেকে প্রশংসা করেছে। সে কাজটাকে গুরুত্ব দিচ্ছিলো না। বার বার ভুল করছিলো। এদিকে হাতে সময় নাই। তাকে একটু বকাঝকা করলাম, সিনিয়র লোক। সে মনে করেছে তাকে বোধহয় বাদ দিয়ে দিবো। সে করেছে কী, গিয়ে চুল কেটে ফেলেছে। পরে যখন তাকে ডেকেছি সে বলতেছে, ‘ভাই, আমি তো মনে করছি আপনি আমারে বাদ দিয়ে দিবেন। এজন্য চুল কেটে ফেলছি।’ তার এই চুলের জন্য আমাদের আবার এক বছর ওয়েট করতে হয়েছে! পরবর্তী সময়ে ২০২০-এ এসে আবার কাজটা করেছি। বললাম না আমার লাইফে সবকিছুই কেমন জানি, খারাপ কিছু থেকে ভালো কিছু হয়। চুল কাটার জন্য শ্যুট বন্ধ করতে হলো। ওই সময়টাতে কিছু নিউজ হয়েছে, আমরা ১৮ সালের ডিসেম্বরে সিনেমাটা মুক্তি দিচ্ছি! এটা একটা বিরাট ঝামেলার বিষয়! নিউজ হয়েছে, ‘দেশ টিভি’তে, একটা ইন্টারভিউও দিয়েছি। আর এর মধ্যে এই কাহিনি।
এরপর যেটা হয়েছে, আমার অফিস থেকে নারায়ণগঞ্জে একটা কালচারাল সেন্টার ডিজাইন করা হয়েছিলো-আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তন। ওইখানে জমি নিয়ে একটা বিরোধ আছে। ওটা সিটি করপোরেশনের প্রজেক্ট ছিলো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : মানে আপনারা যে সিনেপ্লেক্সটা তৈরি করলেন ওইটা?
নূরুজ্জামান : এইটার গল্প আসবে এখন।
ম্যাজিক লণ্ঠন : কখন করলেন সেটা?
নূরুজ্জামান : ২০১৯-এর মার্চে মাস্তুল-এর কাজ করছিলাম। আমরা এটার ডিজাইন করেছি আরো অনেক আগে। বিল্ডিং হয়ে গেছে। বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে। জমির বিরোধের কারণে যেখান দিয়ে পার্কিংয়ে গাড়ি ঢুকবে, পাশের জমির মালিক জায়গা আটকিয়ে সেখানে বিল্ডিং বানিয়ে ফেলছে! এখন তো ওখানে গাড়ি ঢুকতে পারবে না। আমাদের মেয়র আইভী আপা [সেলিনা হায়াৎ আইভী], উনি তখন পড়েছেন মহাবিপদে। জনগণের টাকায় এটা বানানো হয়েছে। কিন্তু জায়গাটা ইউজলেস হয়ে গেছে। গাড়ির পার্কিংয়ের জন্য একটা বেসমেন্ট বানানো হয়েছে, কিন্তু সেখানে গাড়ি ঢুকতে পারবে না। বুঝছেন? একদিন উনি খুব হতাশ হয়ে আমাকে বললেন, দেখো তো এখানে কী করা যায়? আমার হুট করে মনে হলো গাড়ির যে র্যাম্প আছে, ওই জায়গাটায় একটা সিনেমাহল বানানো যেতে পারে। আমি জানি না, আউট অব নো হোয়ার কোথা থেকে এটা মনে হলো!
আমার ছোটোবেলার একটা গল্প আছে, ক্লাস থ্রি-ফোরে পড়ি তখন মেবি, আমরা একটা সিনেমাহল বানাচ্ছিলাম। বাচ্চাদের খেলার জায়গা আছে না, ওই রকম আরকি! আমার তখন খুব সিনেমা দেখা হতো। বিজ্ঞান মেলা হয় না? স্কুলে বিজ্ঞান মেলায় দেখলাম, একজন একটা প্রজেক্টর বানিয়েছে। স্লাইডশো প্রজেক্টর। ও রকম দেখে দেখে প্রজেক্টটা বানিয়ে ফেললাম। দেখে মনে হলো, এটা তো সিনেমাহল। আমার আরো কিছু বন্ধুবান্ধব মিলে-চার আনা মানে তখন ছিলো ২৫ পয়সা-টিকিট দিয়ে লোকদের স্লাইড দেখাতাম। ওই থেকে সিনেমাহলের প্রতি আমার একটা ফ্যাসিনেশন আছে। মাঝখানে এসব ভুলে গেছি, কিন্তু ওই জায়গাটা দেখে আমার মনে হলো, এখানে সিনেমাহল হতে পারে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : মেয়র আইভী কীভাবে প্রস্তাব দিলেন তখন?
নূরুজ্জামান : আপা বললেন, ‘ওকে, ফাইন। সিনেমাহল কে বানাবে? সিটি করপোরেশন থেকে কোনো টাকাপয়সা দিতে পারবো না। বাজেট নাই।’ আমার কাছে তখন কিছু টাকা জমানো ছিলো, আমি একটা ফ্ল্যাট কিনবো এজন্য আরকি। আমার কী মনে হলো আপাকে বললাম, ‘আমি বানালে আমাকে জায়গাটা দেবেন নাকি?’ উনি বললেন, ‘তুমি নিজের খরচে বানালে আমি জায়গা দেবো।’ আমার কী মনে হলো, তখন আমি সর্বস্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। উইদইন সিক্স মান্থস আমরা সিনেমাহল বানিয়ে ফেললাম। সেপ্টেম্বরে ওপেন করলাম সিনেমাহল। আমি বাইরে কিছু জায়গায় দেখেছি-২০১২-তে জংশন নিয়ে ব্যাঙ্গালুরুতে গিয়ে কিছু ছোটো সিনেমাহল দেখেছি। এই ছোটো সিনেমাহলগুলো আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং ছিলো। সিনেমাহলের আসন সংখ্যা সীমিত। কিন্তু এসি আছে, সাউন্ড কোয়ালিটি ভালো, প্রজেকশন ভালো। আমার কাছে জিনিসটা মজার লাগছে!
ম্যাজিক লণ্ঠন : ওরা সিনেমাহল বাড়াচ্ছে আর আমরা দিন দিন নাই করে ফেলছি!
নূরুজ্জামান : আমাদের এখানে সিনেমাহলগুলোর যে অবস্থা! নারায়ণগঞ্জের পুরনো সিনেমাহলগুলোতে ১,০০০ সিটের ক্যাপাসিটি, লোক হয় ১০ জন! ওখানে তো রানিং কস্ট অনুযায়ী বেনিফিট আসে না। আমি ব্যাঙ্গালুরুতে যেগুলো দেখেছি, সেগুলো ধরেন ৭০-১০০ জন করে ক্যাপাসিটি। ২০১৫-তে আমি চিনে গিয়েছিলাম, পর পর দুইবার গেলাম সেখানে। ওইখানেও দেখেছি, একটা বড়ো কোনো অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং, যেখানে হয়তো ৫০০ ইউনিট আছে, সেটাতে এ রকম একটা ছোটো সিনেমাহল আছে। ওখানে ওরাই মানে ওই ৫০০ ফ্যামিলির লোকজন সিনেমা দেখে। আমার কাছে মনে হলো, এটা আমরা এখানে করতে পারি। ডিজাইন করে দেখলাম, এখানে খুব ভালোভাবে ৩৫ জনের একটা সিনেমাহল বানাতে পারি। আমার যা টাকা ছিলো, সব দিয়ে এটা বানালাম। আমরা সিনেমার শ্যুট করেছি এপ্রিল পর্যন্ত, মাঝখানে এইটার কাজ করেছি, আবার সেপ্টেম্বরে এর উদ্বোধন। মানে একটার পর একটা কীভাবে কীভাবে যেনো হয়েছে আরকি!
বেশ ভালো সাড়া পাওয়া গেলো তখন। এটা নিয়ে নিউজ-টিউজ হলো। হঠাৎ দেখি একদিন আমাকে এক ভদ্রলোক ফোন দিয়েছে, বলছে উনি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর পি এস। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কী ব্যাপার? তিনি বললেন, ‘স্যার আপনার সঙ্গে একটু চা খেতে চেয়েছেন।’ আমার তো কলিজা শুকিয়ে গেছে! স্যার, আমার সঙ্গে কেনো চা খেতে চাইবেন! তখন সেই স্যারের নামও আমি জানি না! কারণ কিছুদিন আগে আসাদুজ্জামান নূর ছিলেন। উনি চলে যাওয়ার পর কে এসেছেন, তার নামও জানি না। ফাইন, না তো আর করা যায় না। আমি আইভি আপাকে বললাম, ‘আপা এই অবস্থা।’ উনি বললেন, ‘যাও, ডাকছে গিয়ে চা খেয়ে আসো।’ পরে ওনার নাম জেনেছি-কে এম খালিদ, ম হামিদ-এর ভাই। উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘সবাই যখন সিনেমাহল ভেঙে ফেলছে, তখন আপনি একটা সিনেমাহল বানিয়েছেন। এটা আমার কাছে খুব ভালো লাগছে।’সে কোথা থেকে এটা পড়ছে আল্লাহ-ই জানে। কোন পেপারে নিউজ হয়েছে আমি তাও জানি না। তখন আমার মনে হলো, কিছু একটা হয়েছে! এর পর দেখলাম আরো লোকজন খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলো।
এদিকে আমরা আবার মার্চের অপেক্ষা করছি মাস্তুল-এর শুটিংয়ের জন্য। পরের মার্চে এসে আবার কয়েকদিন কাজটাজ করলাম। আমাদের মার্চের ২০ তারিখ থেকে শিডিউল ছিলো একটা।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এটা তো ২০২০ সালের কথা বলছেন, তাই না?
নূরুজ্জামান : হ্যাঁ। এর মধ্যে বাবু ভাই একদিন ফোন করলেন। বললেন, ‘ভাই আমার ফ্যামিলি তো বের হতে দিতে চাচ্ছে না।’ কেনো? কারণ তখন করোনা। আবার পড়ে গেলাম লকডাউনের মধ্যে। ২৬ না ২৭ মার্চ থেকে লকডাউন শুরু হয়ে গেলো। বাবু ভাই তখন আসতে পারছেন না, কিন্তু ওই সময়কার সব সিকোয়েন্সগুলো ছিলো বাবু ভাইয়ের। সেবার আর কাজ করা হলো না। পুরো লকডাউন বসে থাকলাম। পরের বছর গিয়ে মানে ২০২১-এ কাজ শেষ হলো। এর মধ্যে যেটা হলো আম কাঁঠালের ছুটির একটা স্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে গেছে। এদিকে আদিম শেষ হয়েছে। আমরা চিন্তা করলাম, ওগুলো নিয়ে কাজ এগোই আর এখন মাস্তুল এডিট করতে থাকি।
মাস্তুল এডিট করলাম। একটা ভার্সন দাঁড়ালো। ওখানে দেখলাম কিছু আবার প্যাচ শ্যুট লাগবে। প্যাচ শ্যুট করতে গিয়ে আবার একটু ঝামেলায় পড়লাম। আমাদের যে জাহাজটা এখানে ছিলো, সেটা এই এলাকায় নাই। চলে গেছে বঙ্গোপসাগরে। তখন বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে গিয়ে শ্যুট করে আসলাম। সেখানে গিয়ে এমন কিছু ভিজ্যুয়াল পেয়ে গেলাম, যেটা ছবির কোয়ালিটি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াইড ছবিগুলো এখানে নিতে পারছিলাম না। ওখানে গিয়ে আমি যেটা কল্পনাও করি নাই, ওরকম কিছু শট্ পেয়ে গেছি। সেটা অবশ্যই সিনেমার প্রোডাকশন ভ্যালু বাড়িয়েছে।
ওইটা শেষ করলাম। এর মধ্যে আদিম মস্কোতে গেলো। তারপর আম কাঁঠালের ছুটি ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়াতে গেলো। এরপর আদিম ও আম কাঁঠালের ছুটি রিলিজ হলো। এগুলো করে ২০২৪-এ মোটামুটি মাস্তুল-এর কাজ শেষ হয়ে এলো। মাঝখানে আসলে দুই বছর মাস্তল নিয়ে কোনো কাজই করা হয়নি ওগুলো নিয়ে থাকার কারণে। পরে সাউন্ড করলাম, ফোলি করলাম। ইন্ডিয়াতে গিয়ে সাউন্ডের পোস্ট প্রোডাকশন করলাম, এই তো। তার পর মাস্তুল মস্কোতে গেলো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আচ্ছা, বর্তমান নিয়ে একটু আলাপে ফিরি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে অনেকে হতাশার কথা বলে। আপনার মন্তব্য জানতে চাচ্ছি।
নূরুজ্জামান : প্রথম কথা হচ্ছে, আমি ইন্ডাস্ট্রির লোক না। এই জন্য এতো বড়ো স্কেলে আমি চিন্তা করতে পারি না। আমি খুব ছোটো স্কেলে চিন্তা করি। এটাকে ইন্ডাস্ট্রি না বলে কটেজ ইন্ডাস্ট্রি বলতে পারেন। আমি যেভাবে চিন্তা করি, ইন্ডাস্ট্রির ব্যাপারটা আসলেই আমার চিন্তার বাইরে। ফিল্মকে কীভাবে একটা আর্ট হিসেবে চিন্তা করতে হয়, আমি ওতোটুকুই পারি। কিন্তু আপনি যখন ইন্ডাস্ট্রি বলছেন, সে ব্যাপারে আমার খুব জানা বা বোঝা নাই। যে ফিল্ম বানাতে চায় মনের চাহিদার জন্য; এটা থেকে খুব আর্ন করতে চায় না; কমার্শিয়ালি সাকসেসফুল হতেই হবে এমন তাড়না যার নেই-তার ব্যাপারে আমি বলতে পারি। কিন্তু যাদের এটাই রুটি-রুজি, তাদের ব্যাপারে আসলে আমার বলার কোনো এখতিয়ার নাই। আমি এটাকে একটা কুটির শিল্পের মতো চিন্তা করি। কুটির শিল্পে কী হয়? নিজেই আর্টিস্ট, নিজেই প্রোডাক্ট বানায়, নিজেই ফেরি করে বেচার চেষ্টা করে, তাই না? নিজেই বাঁশ কাটে, বাঁশ বাকায়, রঙ করে-সব নিজেই করে। আবার সেটা সে হাটেও নিয়ে যায়। আমি নিজেকে ও রকম একজন কুটিরশিল্পী মনে করি। আমার সবকিছু নিজের মতো করে বানাবো, একটু একটু করে। এখানে যেটা হয় অনেক ইমপারফেকশন থাকে। এই শ্রম, ঘামের চিহ্ন থাকতেই পারে। একদম সুপার পারফেক্ট হতে হবে, আমি কখনো এটা ফিল করিনি। কারণ আমি সিনেমা বানিয়েছি এভাবেই।
একটা মেশিন মেইড প্রোডাক্ট আর হ্যান্ড মেইড প্রোডাক্ট তো এক না। এই হ্যান্ড মেইড প্রোডাক্টেরও কিন্তু একটা নির্দিষ্ট বাজার আছে। এবং যে এটা পছন্দ করবে, সে মেশিন মেইড প্রোডাক্টের চেয়ে চার-পাঁচ গুণ দাম দিয়েও কিনতে রাজি আছে। আপনি দেখেন, একটা গ্লাস যেটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্ট, এইটার দাম যদি হয় ১০ টাকা; ওই একই জিনিস যদি হাতে কেউ বানায় এবং সেটা আড়ং থেকে কিনতে গেলে লাগবে ১০০ টাকা। আপনার ১০ টাকার গ্লাসের ভোক্তা যদি হয় এক লাখ, ওটার হয়তো ১০,০০০। আমার মনে হয়, আমি যেভাবে সিনেমা বানাই এটারও একটা এ রকম কমার্শিয়াল ভ্যালু আছে। এটা যদি আমি বেচতে না পারি, সেক্ষেত্রে আমি তো আর পরের কাজটা করতে পারবো না।
আমার যেহেতু উৎপাদন খরচ কম ইন্ডাস্ট্রির তুলনায়-ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্টের অনেক মেকানিজম আছে। ওটার জন্য তার যেই এক্সট্রা খরচ হচ্ছে, আমার সেটা নাই। যেহেতু প্রোডাকশন খরচ কম, আমার যে মার্কেটটা আছে, সেটা থেকে এটা তোলা সম্ভব। আমার আগের সিনেমার কথা বলতে পারি; আম কাঁঠালের ছুটির টাকা উঠে গিয়েছে। আদিম-এর টাকা উঠে গেছে। আমরা এখানে হয়তো সুপার প্রফিট করি নাই, মানে এই সিনেমা করে গাড়ি বাড়ি বানিয়ে ফেলি নাই। বাট আমার যে উৎপাদন খরচ ছিলো, সেটা উঠে গেছে, এটা সম্ভব। আমি এটাই বলতে চাই, এটাকে যে আর্ট পিস মনে করে-আমি সিনেমাটা আমার নিজের জন্য বানাবো, নিজের মনের চাহিদা মেটানোর জন্য বানাবো-সে ক্ষেত্রে টাকার অভাবে বসে থাকবো, এই না হলে এটা হবে না, আমি এটাতে বিশ্বাসী না। আমার মনে হয়, আপনি কাজটা করে ফেলেন এবং আলটিমেটলি এটা গন্তব্য নিজেই খুঁজে নিবে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনার কী কখনো মনে হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিতে কোনো ধরনের সংস্কার দরকার বা এ রকম হলে ভালো হতো?
নূরুজ্জামান : এটা বলার এখতিয়ারও আমার নাই। কারণ ইন্ডাস্ট্রি আমি বুঝি না। আমি জানি না ইন্ডাস্ট্রিটা কীভাবে কাজ করছে বা কোনটাকে আপনি ইন্ডাস্ট্রি মিন করছেন। সেটা নিয়েও আমার একটু দ্বিধা আছে। বাংলাদেশে যেটাকে ইন্ডাস্ট্রি বলছেন, সেটা কয় টাকার ইন্ডাস্ট্রি? ইন্ডাস্ট্রি হতে গেলে মানে তার বাজার কতো বড়ো হলে সেটাকে আপনি একটা ইন্ডাস্ট্রি বলবেন? বাংলাদেশের বাজার মানে যদি ফিল্মের কথা বলি, নাটক-টাটক বাদ দিলাম-বছরে কয়টা সিনেমা হয়?
ম্যাজিক লণ্ঠন : কতো আর হবে খুব বেশি তো না!
নূরুজ্জামান : সিনেমাহলের মালিক হওয়ার পরে আমি জানি আসল ঘটনা। প্রতি সপ্তাহে একটা নতুন সিনেমা তো আমি পাই না। একটা সিনেমায় গড়ে কয় টাকা খরচ হয়? দুই কোটি টাকা করে ধরেন। আমি ধরলাম, ১০০টা সিনেমা হয়। কতো টাকা হয় তাহলে, ২০০ কোটি। ২০০ কোটি টাকা দিয়ে একটা ইন্ডাস্ট্রি হতে পারে, বলেন? এখানে কতোগুলো লোক ইনভল্ভড। তাদের মাথাপিছু কয় টাকা করে পড়ে? এইটাকে যদি আপনি ইন্ডাস্ট্রি বলেন ভাই, মানতে আমার দ্বিধা আছে। ইন্ডাস্ট্রি শুড নট বি লাইক দিস।
ম্যাজিক লণ্ঠন : বুঝলাম। একটু অন্য প্রশ্নে যাই। ফেস্টিভালে নিয়মিত বাংলাদেশে সিনেমা যাচ্ছে। আমরা হয়তো জানি ফেস্টিভালের সিনেমার ট্রিটমেন্ট কেমন হয়। আপনাদের সিনেমাও যাচ্ছে ফেস্টিভালে। পুরো প্রক্রিয়াটা যদি বলতেন।
নূরুজ্জামান : ফেস্টিভাল আরেক দুনিয়া। এবং ফেস্টিভাল সম্বন্ধে আমাদের কারোর খুব ক্লিয়ার ধারণা আছে, সেটাও না কিন্তু। ফেস্টিভালগুলোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমার যা ধারণা ছিলো, আর যাওয়ার পরের ধারণা এক না। অনেকেই মনে করে, আমি চাইলেই বোধ হয় ফেস্টিভালে সিনেমা দিতে পারি। ঘটনা তো সেটা না। ওখানে প্রচুর সিনেমা জমা পড়ে। সেখান থেকে তারা সিলেক্ট করে; তার পর শর্টলিস্ট করে মানে অনেকগুলো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ফাইনাল ক্যাটাগরি আসে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : কোনো একটা তো মানদণ্ড আছেই, তাই না?
নূরুজ্জামান : আপনি যেটা মিন করছেন, আমিও আগে তাই ভাবতাম। ছকে পড়তে হয় সেটা যেমন আছে, আবার নাইও। ছক দিলে তো মানুষ এটা ফর্ম ফিলাপের মতো করে ফেলতো। বাণিজ্যিক সিনেমার যে ফর্মুলা আছে, এই সিনেমারও তো তাহলে একটা ফর্মুলা বানানো সম্ভব, তাই না? সেটা কি হচ্ছে? কয়জন এ রকম ছক অনুযায়ী সিনেমা বানিয়ে পরে টার্গেট পূরণ করতে পারছে? এবার আমার মস্কো ফেস্টিভালের যে প্রধান নির্বাচক, ওনার সঙ্গে কথা হচ্ছিলো। উনি বলছিলেন, ‘আমাকে প্রায়ই লোকজন জিজ্ঞাসা করে কী কী হলে একটা ফেস্টিভালের সিনেমা হবে?’ উনি বললেন, ‘আমি এই রাবিশ কোয়েশ্চেন শুনতে শুনতে বিরক্ত! কারণ ওখানে এ রকম কোনো কিছু নাই আসলে।’ কিছু আছে, যেমন, একেকটা ফেস্টিভালের একেক বছর একটা থিম থাকে। সেগুলোর সঙ্গে যদি এলাইন করে যায়, তাহলে ফাইন। এখন সেটা এলাইন করবেই, এটা কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কারণ আপনি একটা সিনেমা বানিয়েছেন, সেটা হয়তো আপনি পাঁচটা ফেস্টিভালে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। পাঁচটা ফেস্টিভালের থিম তো আর এক না, কিংবা একটা ফেস্টিভালের এই বছরের থিম আর পরের বছরের থিমও তো এক না। তারা কী চাচ্ছে, কী চাচ্ছে না, সেটা প্রেডিক্ট করা ভেরি ডিফিকাল্ট। কারণ সিনেমা বানাতে আপনার দুই বছর লাগবে। ফলে আপনি যা চিন্তা করে সিনেমা বানাচ্ছেন, সেই থিম তো চেঞ্জ হয়ে যাবে।
আর ট্রিটমেন্টের যে কথা বললেন, সেটাতে আমি কিছুটা এগ্রি করি, আবার কিছু জায়গায় করি না। কিছু এগ্রি করি এই জন্য যে, একেকটা অঞ্চলকে মানুষ একেকভাবে দেখতে অভ্যস্ত। যেমন, বাংলাদেশ শুনলেই মনে হয়, এখানে সব লোকজন দুর্যোগের মধ্যে আছে। এখানে সব দরিদ্র মানুষ, প্রতিদিন খেতে পারে না, এ রকম লোকজন! তারা একটা প্রিকন্সিভ আইডিয়া নিয়ে বসে আছে। আপনার সিনেমায় যদি ওইটা থাকে, তখন তার মনে হয়, ওকে ফাইন। আমি যা ভাবলাম তাইতো! সেটা কিন্তু সে সহজে কানেক্ট করতে পারে। কিন্তু আপনি যখন এই ধারার বাইরে যাবেন, সে মনে করবে বাংলাদেশ কি আদৌ এমন? বাংলাদেশ তো এতো সুখ-শান্তির জায়গা না! বাংলাদেশে তো ইত্যাদি ইত্যাদি ...। সেই ক্ষেত্রে কিছু কিছু জায়গায় সমস্যা হয়।
বাট ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, একটা ফিল্ম হচ্ছে ইউনিভার্সাল। সেটা তখনই ইউনিভার্সাল হবে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজনকে আপনি কানেক্ট করতে পারবেন। আম কাঁঠালের ছুটির একটা অভিজ্ঞতা আপনাকে বলি। আমি খুব ডাউটফুল ছিলাম ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে এটা যাবে কি না! কারণ এটা একান্তই আমাদের গল্প, আমার ছোটোবেলার গল্প, যেটার সঙ্গে দুনিয়ার অন্যান্য রিজিওনের কোনো রিলেশন নাই। সো, তারা এটা কানেক্টই করতে পারবে না, বুঝতেই পারবে না-এমনটাই ভেবেছিলাম। প্রথম আমার এটা প্রিমিয়ার হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার জোগজা ফেস্টিভালে, এটা এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভাল। বিশ্বাস করেন, জাস্ট এই আত্মবিশ্বাসের অভাবে-অন্য কেউ কানেক্ট করতে পারবে না-বড়ো কোনো ফেস্টিভালে পাঠাইনি। ভেবেছি, খামাখা পাঠিয়ে কী হবে! প্রত্যেকটা ফেস্টিভালে পাঠাতে একটা খরচ আছে। ৪,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকার মতো ফি দিতে হয়। পরে আমি আফসোস করেছি, ট্রাই করলে পারতাম! জোগজাতে যখন হলো, তখন আমি ভেবেছি, যেহেতু এশিয়ান ফেস্টিভাল ওরা কানেক্ট করতে পেরেছে সামহাউ।
এরপর আমি রাশিয়ায় গেলাম। কারণ প্রিমিয়ার হয়ে গেলে বড়ো ফেস্টিভালে যাওয়া যায় না। একটা ফেস্টিভালে প্রিমিয়ার হলে পরে সেটা ক্লাস বি ফেস্টিভালগুলোতে দেওয়া যায়। এ ক্লাসের ফেস্টিভালগুলোতে ওগুলো জমাই নেয় না। আমি রাশিয়া একটা বি ক্লাসের ফেস্টিভালে গেলাম। ওখানেও ওরা সিলেক্ট করেছে, এটাতে আমি খুবই অবাক হয়েছি। শো’র পরে ধরেন ৪০-৫০ জন লোক আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছে। তাদের সবার বয়স ৫০-এর উপরে। তারা আসলে সোভিয়েত আমলে বড়ো হওয়া, মানে ওই সময় বেড়ে উঠেছে। তারা নাকি সবাই সিনেমাটাকে কানেক্ট করতে পারছে। তাদের ছোটোবেলাও এ রকম কিন্তু ডিফারেন্ট ফর্মে। তারপরেও তারা কানেক্ট করতে পেরেছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনার সিনেমাহলে ব্যবসা কেমন চলছে এখন? এই ধরনের ছোটো সিনেমাহলের সম্ভাবনা কেমন দেখছেন বাংলাদেশে?
নূরুজ্জামান : আপনাকে একটা মজার তথ্য দিই। কমার্শিয়াল সিনেমা, যেগুলো তাদের ডিস্ট্রিবউটরা আমার এখানে দিতে আগ্রহী; ওরা সিনেমা দেওয়ার আগে অগ্রিম ধরেন দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা চায়। আমার এখানে কিন্তু তারা বিনাপয়সায় সিনেমা দেয়। কেনো দেয় জানেন? কারণ আমার এখানে সব হিসাবনিকাশ ট্রান্সপারেন্ট। ধরেন, তারা নারায়ণগঞ্জের ৬০০ সিটওয়ালা হলে এক সপ্তাহ চালানোর পরে যে টাকা পায়, আমার ৩৫ সিটের সিনেমাহলে তার চেয়ে বেশি টাকা পায়। কারণ হচ্ছে দুইটা-এক, আমার ট্রান্সপারেন্সি আছে; দুই হচ্ছে, আমার এখানে ভালো কোয়ালিটি। প্রজেকশন, সাউন্ড, এনভায়রনমেন্ট ভালো দেওয়ার কারণে দর্শক এখানে আসতে পছন্দ করে। এখন কিন্তু আগের সেই গরমে ঘামতে ঘামতে সিনেমা দেখার দর্শক নাই। বড়ো একটা হলে এই ফ্যাসিলিটি দিতে গেলে তাদের যে কস্টিং হবে, সেটা কিন্তু তারা অ্যাফোর্ড করতে পারবে না। আমার এখানে কিংবা সিরাজগঞ্জের ওটা করার পরে, আরো কেউ কেউ এ রকম করছে। আমার মনে হচ্ছে, এটা এক্সপান্ড করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, দেশের প্রত্যেকটা জেলা শহরে-যদি উপজেলায়ও হয়-আপনি যেটাকে বাংলাদেশের ইন্ডাস্ট্রি বলছেন সেটার কালেকশন পাঁচগুণ হয়ে যাবে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : একদম শেষ প্রশ্ন, বর্তমান ওটিটি নিয়ে আপনার কোনো অবজারভেশন আছে কি না?
নূরুজ্জামান : কমার্শিয়ালি ওটিটি একটা ভালো প্লাটফর্ম। আমি পজিটিভলি এটাকে দেখি। কিন্তু অ্যাজ আ ফিল্মমেকার আমি অবশ্যই ওটিটির জন্য সিনেমা বানাবো না। আমি বড়ো স্ক্রিনের জন্য বানাবো। কারণ বড়ো স্ক্রিনে আপনি একই জিনিস যেভাবে এক্সপেরিয়েন্স করবেন, ওটিটি প্লাটফর্মে সেটা দেখবেন কীভাবে? হয়তো ফোনে দেখবেন, না হয় টিভিতে। আমি মনে করি একটা ফিল্ম এমন হওয়া উচিত-দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা স্প্যান যাইহোক না কেনো-অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে দর্শক দেখবে। আমি সিনেমাহলে যখন যাই, একটা প্রিপারেশন নিয়ে যাই কিন্তু। এই দুই ঘণ্টা আমি কোনো ফোন রিসিভ করবো না, অন্য কিছু করবো না, মানে মেডিটেশনের মতো একটা ব্যাপার আছে। আমি আমার দর্শকের কাছে এটা আশা করি। যে কারণে আমি শুধু ওটিটির জন্য কখনোই সিনেমা বানাতে চাই না। আমার স্ক্রিনিংয়ের যে একটা সাইকেল আছে, এই সাইকেলটা শেষ হওয়ার পরে আমি ওটিটিতে অবশ্যই দিতে চাই। কারণ সবাই তো আর বড়ো স্ক্রিনে দেখতে পারবে না। অ্যাট লিস্ট একটা ঠিকানা থাকলো যে, আরো পাঁচ বছর পরেও কেউ চাইলে দেখতে পারবে।
মোহাম্মদ নূরুজ্জামান
mnzaamaan@yahoo.com
মইনুল ইসলাম, জাগোনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম-এ প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত।
moynulislam2071@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন